Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর লেখা :

বই


ISSN 1563-8685




অন্য কোনখানে

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

প্রচ্ছদ | ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ |

চতুর্থ অধ্যায় (ক্রমশ)
খ্রিঃ ৩০০০৮






********

“সোমক?”

মাথার ওপর রৌদ্রছায়ার আঁকিবুকি ছড়ানো পাতাগুলির বাতাসে মৃদু সরসর শব্দটিই যেন বোধ্য একটি শব্দমালা হয়ে ঝরে পড়ল যুবকটির কানে।

“কে? নেরা?”

“না না উঠে বোসো না। সমুদ্রের তীরের এই স্বর্ণাভ বালুকাবেলায় তোমার শরীরটি একটি আশ্চর্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে—আমায় দেখতে দাও—”

সোমকের শরীরের ওপরে ঝুঁকে পড়া ধূলিকণার স্রোতটির মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে একটি অপরূপ সুন্দর মুখ রূপ নিচ্ছিল। “এ কী নেরা? এ তো তুমি নও—”

আশ্চর্য সুন্দর নারীমূর্তিটি ততক্ষণে পূর্ণরূপ নিয়েছে। সুপক্ক গোধূমবর্ণ আকর্ষণীয় দেহটি তার। উঁচু হনু ও দুটি সমুদ্রনীল চোখ আশ্চর্য সুষমা দিয়েছে স্বর্ণাভ কেশে ঘেরা মুখটিকে। মধ্যাহ্নের সূর্যকিরণমালা তার উন্মুক্ত শরীরের বাঁকগুলিতে খেলা করছিল।

সোমকের দৃষ্টির মুগ্ধতা তার নজর এড়াতে পারল না। ধীরে ধীরে পাশে এসে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধের ওপর মুখটি রেখে সে বলল, “যে রূপটি নিয়ে আমি তোমার কাছে আসি, এ বুঝি তার চেয়েও সুন্দর? না না, কিছু বোলো না। আমি তোমার মনটি পড়তে পারি যে!”

“তবে প্রশ্ন কেন কর যন্ত্রচেতনা? কিন্তু তার সঙ্গে এ-ও তো পড়তে পারো—”

“যে আমার পরিচিত রূপটিকেই তুমি সবচেয়ে বেশি কামনা করো—তাইতো?”

একরাশ উজ্জ্বল বাঁধভাঙা হাসি দিয়ে হঠাৎ নারীদেহটি বদলে গেল নেরার পরিচিত চেহারায়। কৃষ্ণকেশ, ইষৎ শ্যামলবর্ণ সে চেহারায় প্রচলিত ব্যাকরণগত সৌন্দর্য নেই, কিন্তু লাবণ্য ও বন্যতার এক আকর্ষণীয় সংমিশ্রণ আছে। তার চোখে চোখ রাখল সোমক। দেহের গভীর থেকে তার একটি তিরতিরে উত্তেজনা উঠে আসছিল। ধীরে ধীরে তাতে সাড়া দিয়ে উঠল নারীদেহটিও। তারপর এক বাঁধভাঙা আবেগে ভেসে গেল আলিঙ্গনবদ্ধ শরীরদুটি।


********

কিছুক্ষণ বাদে সোমকই নিস্তব্ধতা ভাঙল প্রথম, “নেরা?”

বেলাভূমির ওপর পাশাপাশি শুয়ে ছিল তারা দুজন। গালে হাতের ভর রেখে তার দিকে পাশ ফিরল নেরা। “বলো।”

“আমার পরিকল্পনাটার বিষয়ে—”

“আমি জানি। এখানে আসবার আগে আমি প্রথমে নৌশৃঙ্গে গিয়েছিলাম। হবিষ্ট আমায় সব জানিয়েছেন।”

“তোমার কী মনে হয়? আমি সফল হব?”

“আমার সম্ভাব্যতা গণিতের হিসাব বলছে, তা অসম্ভব।” “কেন অসম্ভব নেরা?”

উত্তরে মৃদু হাসল যন্ত্রইশ্বরী, “মানবীটির মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ একটি প্রতিচ্ছবি, তার যাবতীয় স্মৃতি আমি আমার স্মৃতিকোষে সংগ্রহ করে নিয়ে ফিরেছি। তোমার তা কাজে লাগবে। মিলনের সময় আমার স্মৃতিকোষ থেকে তোমার স্মৃতিকোষে তা সঞ্চারিতও করেছি। তার মনটিকে তুমি একবার দেখ সোমক। বলো, কী দেখছ? একটি হিংস্র অস্তিত্ববাদি মারণযন্ত্র। এর দেহের প্রতিটি কোষের জিনগত চেতনা নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোনো প্রাণ বা অপ্রাণের অস্তিত্বের অধিকারকে স্বীকার করে না। তাকে তুমি কী করে—”

একটুক্ষণ নীরব থেকে সোমক বলল, “তুমি ঠিকই বলেছ নেরা। তবে মনটিকে না দেখলেও আমি তোমার সঙ্গে একমতই হতাম। আমি যে নিজেও যে একসময় সেই অস্তিত্বেরই অংশ ছিলাম। আমার থেকে তা আর কে বেশি জানবে? কিন্তু তবু, আমার মস্তিষ্কচেতনায় “ভালোবাসা” নামের শব্দটির সঙ্গে জড়িত যে অজ্ঞেয় গাণিতিক রহস্যটির সন্ধান পেয়েছিলে, এর মস্তিষ্কচেতনাতেও তার উপস্থিতি যে রয়েছে তা কি তোমার নজরে পড়েনি?”

“পড়েছে সোমক। বড়ো ক্ষীণভবে—”

“ওই ক্ষীণ অজ্ঞেয় অনুভূতিটিকেই আমি ব্যবহার করতে চলেছি নেরা। দেখতে চাইছি, তাকে ফের শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব কিনা। একটা শেষ চেষ্টা। তাতে সফল না হলে—”

হঠাৎ মৃদু কেঁপে উঠল নেরার শরীরটি। গাঢ় আলিঙ্গনে সোমককে বেঁধে তার চোখে নিজের চোখদুটি ধরে রেখে সে বলল, “বোলো না। আমি জানি এর ব্যর্থতার শাস্তি কী হতে চলেছে। আমি তোমাকে হারাতে চাই না সোমক—আমি—”

বলতে বলতেই সে দু হাত বাড়িয়ে পুরুষটিকে ডাক দিল, “এসো—”

--এবং সময় স্থির হয়ে রইল সেই নির্জন দ্বীপটিতে। মিলনতাড়িত দেহদুটিকে ঘিরে বারে বারে আছড়ে পড়ছিল সমুদ্রের রৌদ্রলাঞ্ছিত উত্তাল তরঙ্গমালা। বাতাসে বনজ পুষ্পগন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল সমুদ্রজলের লবণাক্ত ঈষৎ কটু সুবাস—

“চোখ খুলে দেখ সোমক—”

পুরুষদেহটি তার সুখনিমীলিত চোখদুটি খুলে ধরল সেই ডাক শুনে। আর তারপর সচকিত হয়ে তার গাঢ় আলিঙ্গনকে ঠেলে সরিয়ে দিতে গেল। কিন্তু প্রত্যুত্তরে আলিঙ্গনটি গাঢ়তরই হয়ে এল শুধু। অস্ফূট কন্ঠে সে বলছিল, “এই গোধূমবর্ণ নীলাক্ষি দেহটিকে ভালো করে চিনে নাও হে পুরুষ। অভ্যস্ত হয়ে নাও এর স্পর্শসুখের অনুভূতিতে। নিজেকে শান্ত কর। প্রথম স্পর্শের উত্তেজনাকে সংবরণ করতে শেখো। গভীরতম রতিরঙ্গের মুহূর্তে, যখন একান্তই মানবিক প্রবৃত্তিতে তার মনের আগলটি খুলে যাবে, সেই মুহূর্তটিতে নিজেকে শান্ত রেখে তার মনের ভেতরে ঢুকে--তোমাকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে যে সোমক-—” তার শেষ কথাগুলি সোমকের কানে যাচ্ছিল না। সুতীব্র সুখের উল্লাস তখন তার সমস্ত চেতনাকে অন্ধ করে দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল নারীদেহটির গভীর থেকে গভীরতর সুখস্থানের সন্ধানে—


********

কয়েক মুহূর্ত বাদে দীর্ঘপক্ষ্ম নীল চোখদুটি তার দিকে তুলে ধরে নেরা বলল, “আর মাত্র দুটি দিন পরে সে এসে পৌঁছাবে এইখানে। আমি নিজে তাকে এইখানে নিয়ে আসবো সোমক। যুবতীটি রণকৌশলে নিপুণ। শৈশবকাল থেকে তাকে তার প্রজাতির সমস্ত সদস্যের মতই রণনিপুণ করে গড়ে তোলা হয়েছে। তার যানটি একাই এই গ্রহটিকে মহাশূন্যে ধূলিপুঞ্জ করে উড়িয়ে দেবার মতো শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত। আগামি দু দিন সে না আসা পর্যন্ত আমি তার রূপ ও স্মৃতিকে নিয়েই তোমার কাছে থাকব। শত্রুকে নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করে নাও সোমক। তার সমস্ত স্মৃতি, আবেগ, তার দেহজ ও মানসিক সুখদুঃখের নিয়ন্ত্রক পদ্ধতিগুলিকে অধিগত করো ধৈর্য ধরে। তোমাকে জয়ী হতে হবে সোমক। আমি--আমি যে তোমাকে—”

তার সুন্দর মুখটি দু হাতের মধ্যে ধরে ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠটি স্পর্শ করল পুরুষটি, “যে শব্দটি দিয়ে তোমার যন্ত্রমস্তিষ্কের এই অপরিচিত আবেগটিকে প্রকাশ করতে চাইছ, সেটিকে যেদিন নিজের উপলব্ধি থেকে উচ্চারণ করতে পারবে সেদিন থেকে আমি তোমায় আর যন্ত্রমস্তিষ্ক বলে সম্বোধন করব না নেরা—”

নেরা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ঠোঁটে একটুকরো রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল, “জানি না সোমক। এককভাবে তাকে অধিগত করবার শক্তি আমার সৃষ্টিকর্তারা আমাকে দেননি। তবু আমি চেষ্টা করে যাব। পারতে আমাকে হবেই—”


********

নক্ষত্রটি প্রক্ষেপণক্ষেত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি উজ্জ্বল হলুদ বিন্দুর মতন দেখাচ্ছিল। ছবিটি যন্ত্রগণকের স্মৃতিতে সঞ্চিত মহাকাশ মানচিত্র থেকে নেয়া। আটশো আলোকবর্ষ দূর থেকে দূরবীক্ষণে এখনও তা ধরা পড়বে না। সীমাল অন্যমনস্কভাবে সেইদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাতের একটি ইশারা করতে মানচিত্র মুছে গিয়ে বাইরের মহাকাশের ছবিটি ভেসে উঠল সেখানে। তারাহীন আকাশের একপাশে ক্যানি মেজরির অতিকায় মনোসেরস বলয়ের নক্ষত্রস্রোত চোখে পড়ে শুধু। এত দূর থেকে তা অন্ধকার আকাশের বুকে একটি ঝাপসা দাগের মতন দেখায়। নক্ষত্রের নদী। শৈশবে স্কুলে পড়া একটি কবিতার কথা মনে আসছিল তার--তারানদী বহে যায় অবিরাম, পার হয়ে আকাশী দিগন্ত--

প্রক্ষেপণক্ষেত্রের ডানদিকের কোণে একটি লাল সংকেতবিন্দু হঠাৎ দপদপ করে উঠল। খবর আসছে কিছু। হাতের ইশারায় সম্মতি জানাল সীমাল। ছবিটা বদলে গেল। মহাকাশের অন্ধকার পটভূমিতে ধুলো ও আগুনের পিণ্ডের ভেতর থেকে দশটি অতিকায় যুদ্ধযান বের হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। খোলা আকাশে বের হয়ে আসতে আসতেই নিজেদের একটি অতিকায় তীরের মতো করে সাজিয়ে নিচ্ছিল তারা।

সীমালের ঠোঁটে সামান্য একটা হাসির আভা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। গণকের উদ্দেশ্যে চাপা গলায় সে বলল, “নির্দেশক জিমুয়েলা তাং”

পর্দার বুকে একটি রণতরীর নিয়ন্ত্রণকক্ষের ছবি ভেসে উঠেছে। সেখান থেকে হাসি হাসি একটি পীতবর্ণের মুখ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সীমাল মৃদু গলায় বলল, “অভিনন্দন জিমুয়েলা। কোনো প্রতিরোধ?”

“নোভোস গ্রহের দশটি রণতরীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করবে ঘৃণ্য কার্তি স্ক্যাম্পানদের দল? হাঃ। তুমি যদি তাদের সেই হাস্যকর হাহাকারের শব্দ শুনতে সীমাল। নোংরা কেঁচোর মতো সর্বস্বের বিনিময়ে আমাদের কাছে প্রাণভিক্ষা করছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।”

“সর্বস্ব বলতে কী বোঝাচ্ছিল ওরা জিমুয়েলা? আশা করি কার্তি স্ক্যাম্পানদের ওই রুগ্ন পুরুষগুলির দেহ তোমাকে উপঢৌকন দিতে চাইছিল না?” ভাঙা কাচের মত মধুর টুংটাং হাসিতে ভেঙে পড়ল বহু আলোকবর্ষের ব্যাবধানে বসে থাকা দুই যোদ্ধাই। খানিক বাদে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে জিমুয়েলা বলল, “আমরা চাইলে হয়তো প্রাণভিক্ষার জন্য তাতেও আপত্তি করত না এরা, কিন্তু আস্তাকুঁড়ে মুখ দেবার মত দুর্দশা এখনো নোভোসের কোনো সেনাপতির হয়নি। তবে হ্যাঁ, অন্য কিছু মূল্যবান বস্তু সংগ্রহ করা গেছে। বিনামূল্যে।”

“যেমন?”

“এদের ভাণ্ডারে জমা রাখা অবশিষ্ট সমস্ত শক্তিসংগ্রাহক ঘনক। সেইগুলি আমাদের তরীতে এসে পৌঁছোবার মিনিটকয়েকের মধ্যেই গ্রহটিকে--আহা, মহাকাশের অন্ধকার পটভূমিকায় সেই রোশনাইয়ের মতো সুন্দর ছবি খুব কমই হয়।”

“অভিনন্দন জিমুয়েলা। কিন্তু নক্ষত্রপুঞ্জের অন্য কোনো সদস্য একটি নিরপেক্ষ গ্রহের ধ্বংসে আমাদের ভূমিকার কথা যদি জানতে পারে, তবে তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ভুক্ত হবে। আশা করি প্রয়োজনীয় গোপনতা—”

“নিশ্চিন্ত থাকতে পারো সীমাল। আমাদের যানগুলি এই অভিযানে শূন্যজ শক্তিসংগ্রাহকের ব্যবহার করেছে। প্রতিটি নক্ষত্রকে সযত্নে দূরে রেখে মহাকাশের তারকাহীন এলাকাগুলি দিয়ে ভেসে গেছে আমাদের নৌবহর। ফলে নক্ষত্রপুঞ্জের কোনো অঞ্চলেই আমাদের চলাচলের কোনো সাক্ষ্য থাকবে না। এই শূন্যজ শক্তি এক আশ্চর্য আবিষ্কার। স্কার্তি ক্যাম্পানদের মত জঘন্য নীচজাতীয় মানুষেরা কীভাবে এর আবিষ্কার করল তা বোঝা আমার সাধ্য নয়।”

সীমাল মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, “খুবই অসাধ্য কি? উপকথায় আছে, পরমাণুর শক্তি নির্গমনের সূত্রটি প্রাগৈতিহাসিক যুগে যিনি প্রথম নির্ণয় করেন তিনিও একজন—”

হঠাৎ অস্থিরভাবে হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলেন জিমুয়েলা, “যাক সে কথা। উপকথার সত্যাসত্য নিয়ে বরং পরে কখনো বিশ্রামের সময়ে আলোচনা করা যাবে সীমাল। এখন তোমার খবর বলো।”

সীমাল একটু উদাস গলায় বলল, “তোমার মতো সৌভাগ্য কি আর আমার আছে? পদমর্যাদার নিরিখে আকোনা অভিযানে আমার স্তরের একজন সহ নির্দেশকের নেতৃত্বই যথেষ্ট ছিল। মাত্র দশটি রণতরীর নেতৃত্ব দেয়া একজন নির্দেশকের পক্ষে অবমাননাকর। অথচ তাও তুমি আমাকে সরিয়ে নিজে এর দায়িত্ব নিলে। পরিবর্তে আমি উপনিবেশ স্থাপনের নির্বিষ গবেষণা অভিযানে এক বর্বরগ্রহের সন্ধানে চলেছি—”

“এ কথা বোলো না সীমাল। ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধ হিসাবে কার্তি স্ক্যাম্পানের বিরুদ্ধে এ অভিযান আমার প্রাপ্য ছিল। তাছাড়া যুদ্ধ তো যে কোনো নারীই করতে পারে। কিন্তু অন্য নক্ষত্রপুঞ্জে মানুষের প্রথম অগ্রগামী অভিযানটির সুযোগ পেয়েছ তুমি।”

সীমাল আর কথা বলল না। জিমুয়েলার স্তোকবাক্যের আড়ালে লুকানো অহংকারটি তার নজর এড়ায়নি। মাত্রই দু দিন আগে বেঞ্জারিনা আরিয়ানাকে নিজের হাতে হত্যা করেছে জিমুয়েলা। নোভোসের মহাকাশ বন্দরের চত্বরে দীর্ঘ তিন ঘন্টা ধরে চলা সেই হত্যাদৃশ্য গোটা নোভোস গ্রহে সম্প্রচারিতও হয়ছে বারংবার। এই মুহূর্তে সে গ্রহের সবচেয়ে চর্চিত ঘটনাও বটে তা। ব্যক্তিগত অপমানের প্রতিশোধ হিসাবে সেইটুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু প্রতিহিংসা চরিতার্থ হবার পরেও আকোনা অভিযান থেকে একরকম জোর করেই সীমালকে অপসারিত করে জিমুয়েলা। চিরকালের প্রচারলোভী সে। উচ্চপদে উঠেও তার সেই লোভ গেল না। বরং প্রতিনিয়ত তা আরো--

যন্ত্রগণকের থেকে বের হয়ে আসা সুরেলা একটা শব্দ তাকে অস্বস্তিকর অবস্থাটা থেকে মুক্তি দিল। যানের শক্তিকোষগুলি সম্পূর্ণ ভরে উঠেছে। এই শূন্যজ শক্তি একটি আশ্চর্য রহস্যময় ব্যাপার। মাত্রই কয়েকটি দিন হল তা হাতে এসেছে তাদের। এখনও তার প্রযুক্তির রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করা হয়নি। তার সময়ও নয় এখন।

শক্তিকোষ ভরে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে ওপরের প্রকোষ্ঠ থেকে শিরস্ত্রাণটি নিজে নিজেই সীমালের মাথার ওপরে নেমে এসেছে। গুনগু্ন শব্দ উঠছিল তার থেকে। তরীর যন্ত্রমস্তিষ্ক তার মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছে। এইবারে শেষ ঝাঁপ।

চোখদুটি বন্ধ করে আটশো আলোকবর্ষ দূরের হলুদ আলোকবিন্দুটির কথা ভাবতে শুরু করল সে। কয়েকমুহূর্ত বাদে মৃদু একটি ঝাঁকুনিতে ফের যখন চোখ খুলল, প্রক্ষেপণক্ষেত্রের কেন্দ্রে তখন পীতবর্ণের অগ্নিগোলকটি ভাসছিল। তার পাশাপাশি নিচ থেকে ওপরের দিকে কিছু তথ্যের স্রোত বয়ে চলেছে তখন। সীমাল একবার উদাসীন ভঙ্গিতে সেগুলির দিকে চোখ বুলিয়ে নিল। নতুন কিছুই নেই তাতে। আকাশগঙ্গায় এখন অবধি আবিষ্কৃত সমস্ত বাসযোগ্য গ্রহ ও তাদের নক্ষত্রদের চরিত্র সাধারণত একইরকম হয়ে থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হবার কারণ নেই কোনো। তার ইশারায় যানটি ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে গ্রহমণ্ডলটিকে ঘিরে রাখা ধূলিকণার মেঘের গহনে ঝাঁপ দিল। তার লক্ষ্য গ্রহমণ্ডলের সাত সদস্যের মধ্যে দ্বিতীয়টির কক্ষপথ।


********

ক্ষীণ সংকেতটা বহুদূর থেকেই তার চেতনায় ধরা পড়েছিল। সে আসছে। ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে নোভোস গ্রহের যানটির যন্ত্রমস্তিষ্কের পরিচিত সংকেত। গ্রহটির কক্ষপথে ভাসমান ধূলিপুঞ্জটি সতর্ক হয়ে উঠল। পায়ের অনেক নিচে সোমকও সেই আভাস পেয়েছে। সংকেত পাঠাচ্ছে, সে প্রস্তুত। ধূলিপুঞ্জটি প্রত্যুত্তর সংকেত পাঠিয়ে দিল তার উদ্দেশ্যে। তারপর ধীরে ধীরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে অপেক্ষায় রইল আগন্তুক যানের--


********

কী অসামান্য সুন্দর গ্রহটি। যন্ত্রের বিশ্লেষণ জানাচ্ছে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাইশ শতাংশ। নাইট্রোজেন সাতাত্তর শতাংশ। বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি নেই। ব্যাপারটা সামান্য অস্বাভাবিক। জীবসৃষ্টির জন্য এই আদর্শ বাতাস, মনুষ্যবাসোপযোগী কোনো গ্রহেই শুরুতে থাকে না। আকাশগঙ্গায় বহু সহস্রাব্দি ধরেই অসংখ্য গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন করে চলেছে মানুষ। তার প্রতিটিতেই প্রথমে পরিবেশগত বদল ঘটিয়ে বাতাসের এই নির্দিষ্ট মিশ্রণটি সৃষ্টি করে নিতে হয়েছে। তাহলে--

কিন্তু সে চিন্তাটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না তার মাথায়। যানের জানালাগুলির স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে এইবারে। গ্রহটিকে ঘিরে নিজস্ব কক্ষপথের নিকটতম বিন্দু দিয়ে ভেসে চলেছে সে এখন। জানালার পাশে অতিকায় নীলবর্ণ গ্রহটির সুবিশাল জলরাশি চোখে পড়ে। তার উপরে ভাসমান মেঘের স্তূপ থেকে নক্ষত্রের উজ্জ্বল স্বর্ণাভ কমলা রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। চোখ ফেরাতে পারছিল না সীমাল। আকাশগঙ্গার কত গ্রহকেই তো সে দেখেছে কাজের সূত্রে। প্রতিটি গ্রহই বিদ্যুৎ প্যানেলের আলোকশোষক কালো আবরণে ঢাকা থাকে। তার বুকে এসে পড়া সুর্যরশ্মির একটি কণাকেও তা প্রতিফলিত করতে নারাজ। মহাকাশ থেকে তাই প্রতিটি বাসযোগ্য গ্রহকেই এখন এক একটি অন্ধকার গোলকের মত দেখায়। অথচ এই গ্রহটি—

বহু ছোটোবেলায় পড়া একটি গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। মাতৃগ্রহ পৃথিবীর আদিমকালের কথা। সেইখানে এইরকম একটি ছবি আঁকা ছিল। তবে তা ছিল শিল্পীর কল্পনা। কল্পনার সাধ্য কি, চোখের সামনে ভাসমান এই দ্যূতিময় রত্নগোলটির রূপকে তুলিতে ধরে!

ঠিক সেই মুহূর্তে তার অগোচরে যানের কাছাকাছি অঞ্চলে ফের ঘনবদ্ধ হয়ে উঠছিল তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ধূলিকণাগুলি। একসময় ধূলিপিণ্ডটির যান্ত্রিক চেতনা অনায়াসে খুঁজে নিল যানের গণকের চেতনাকে। সংযোগ স্থাপনে কোনো সমস্যা হল না তার। কিছুক্ষণ বাদে, গণকের নিম্নস্তরের চেতনাটি তার বশ্যতা মেনে নেবার পর তাকে প্রথম আদেশটি দিল সে—

যানটির একটি মৃদু ঝাঁকুনিতে হঠাৎ চেতনা ফিরে এল সীমালের। জানালাগুলি দ্রুত স্বচ্ছতা হারাচ্ছে ফের। সীমাল তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের দিকে চোখ ফেরালো। আর তারপরই চমকে উঠে দ্রুত গণকের সঙ্গে সংযোগকারী শিরস্ত্রাণটি মাথায় পরে নিল সে। খানিক আগের সেই মুগ্ধতার জায়গা নিয়েছে তখন শিক্ষিত যোদ্ধার শীতল, কুশলী মস্তিষ্কটি।

গণকের চেতনার সাথে সংযোগের প্রাথমিক মুহূর্তটিতে হঠাৎ করেই একটি অপরিচিত চিন্তাতরঙ্গের আভাস ভেসে এসেছিল তার শিরস্ত্রাণে। কিন্তু সেটিকে ভালো করে অনুভব করবার আগেই গণকের চৈতন্যের মধ্যেই মিলেমিশে হারিয়ে গেল তা। সে নিয়ে চিন্তা করবার অবকাশ তখন সীমালের আর নেই। তার অঙ্গুলিহেলনে তখন যানের আক্রমণকারী অস্ত্রগুলি জেগে উঠছে একে একে। সুতীব্র শক্তির ভাণ্ডার সঞ্চিত হয়ে উঠছে তাদের ঘাতকবিন্দুগুলিতে—

“যান কেঁপে উঠল কেন?”

তার মস্তিষ্কের মধ্যে গণকের মৃদু কন্ঠটি জেগে উঠল এইবার, “একটি আকস্মিক মহাকর্ষীয় বিচলন।”

“প্রাকৃতিক না কৃত্রিম?”

গণক কোনো উত্তর দিল না।

“উত্তর দাও—”

প্রত্যুত্তরে হঠাৎই থরথর করে ফের কেঁপে উঠল যানটি। তীব্র অভিকর্ষের ধাক্কায় নিজের আসনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল সীমাল। তাপমাপক প্যানেলগুলিতে দেখাচ্ছিল, যানের বাইরের আবরণের তাপমাত্রা দু হাজার ডিগ্রি স্পর্শ করেছে।

আর, তারপরেই হঠাৎ তার মাথার মধ্যে গণকের প্রত্যুত্তর ভেসে এল, “আমরা অবতরণ করছি--এই গ্রহের জলমণ্ডলের মধ্যেকার একটি ছোটো দ্বীপে—”

“জানালাগুলিকে স্বচ্ছ করো প্রথমে।”

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই স্বচ্ছ হয়ে উঠল যানের জানালাগুলি। ঘন ফিল্টারের আড়াল থেকে বাইরে আবহমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠা লেলিহান অগ্নির ইঙ্গিত বোঝা যায়।

“কার আদেশে তুমি অবতরণের স্থান নির্বাচন করেছ?”

একটু থেকে যন্ত্রগণকটি উত্তর দিল, “আপনারই আদেশে সীমাল। আপনার কি তা মনে নেই?”

“আমার আদেশে?”

“হ্যাঁ সীমাল। আমি প্রক্ষেপণক্ষেত্রে অবতরণের আদেশটির তরঙ্গসুচকগুলি দেখাচ্ছি। সেগুলি আপনারই মস্তিষ্কতরঙ্গ—”

প্রক্ষেপণক্ষেত্রে ভেসে ওঠা সংকেতগুলি তীক্ষ্ণ চোখে দেখছিল সীমাল। নিঃসন্দেহে এগুলি তারই মস্তিষ্কতরঙ্গ—অথবা—

হঠাৎ তার চোখদুটি আক্রান্ত পশুর চোখের মতোই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। এ গ্রহটি বুদ্ধিমান জীবশূন্য নয়। কেউ তার মস্তিষ্কতরঙ্গকে অনুকরণ করে—

“গ্রহটির উত্তর মেরুবিন্দুতে লক্ষ্যস্থির করো--প্রতিবস্তু কামান এক, তিন ও পাঁচ—একসঙ্গে আঘাত হানবে—”

“তা আর সম্ভব নয় সীমাল। আপনারই আদেশে গ্রহবিনষ্টক কামানগুলিকে এইমাত্র স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে—”

“যান কক্ষপথে ফিরিয়ে নিয়ে চল—” সুতীব্র চিন্তাতরঙ্গটি বোধ্য জগতে একটি তীব্র চিৎকারের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারত।

গণকের প্রত্যুত্তরে একেবারেই যন্ত্রসুলভ নিস্পৃহতা ছিল, “তা আর সম্ভব নয়। আমরা এই মুহূর্তে যে গতিতে এ গ্রহের অভিকর্ষক্ষেত্রের মধ্যে প্রবেশ করছি তাতে অভিমুখ পরিবর্তনের জাড্য এটিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”

“আমি তোমায় আদেশ দিচ্ছি গণক—” বলতে বলতে নিজের বাকি আদেশটা না দিয়েই থেমে গেল সীমাল। আরোহীর জীবনসংশয় হয় এমন যে-কোনো আদেশকে অমান্য করবার শক্তি আছে এই শ্রেণীর গণকের।

বড়জোর মিনিটকয়েকের মধ্যে মাটি ছুঁতে চলেছে যানটি। দ্রুত চিন্তা করছিল সীমাল। এই গ্রহে যে-ই থাকুক না কেন সে তার যানটি চায়। কিন্তু—তাকে তাদের প্রয়োজন আছে কি?

হঠাৎ একটু কেঁপে উঠল সীমাল। ভয়ানক সত্যটা তার সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে! যারা সদ্য আগত একটি জীবের মস্তিষ্কতরঙ্গকে দূর থেকে অনুকরণ করে যানের গণককে বিভ্রান্ত করতে পারে তাদের পক্ষে তার যাবতীয় স্মৃতির প্রতিলিপি কক্ষপথে থাকাকালীনই তৈরি করে নেয়া অসম্ভব নয়। অতএব তাকে তাদের প্রয়োজন নেই। এর একটাই অর্থ হয়! এই যানটিকে তাদের প্রয়োজন, তাকে নয়।

কিন্তু কেন? কী বিশেষত্ব আছে এই যানটির, যা তাদের নেই? এত উন্নত প্রযুক্তি যাদের করায়ত্ত তারা কেন এতদিন আকাশগঙ্গায় প্রবেশ করেনি? কেন? এর একটিই উত্তর হয়—

হঠাৎ মুখে একটি বিচিত্র হাসি ছড়িয়ে গেল সীমালের। মাথা থেকে মনোসংযোজক শিরস্ত্রাণটি খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেলল সে। এইবার—গণকটি, এবং ফলত তার নিয়ন্ত্রণকারী অজানা শত্রুটি, আর তার চিন্তাতরঙ্গকে অনুসরণ করতে পারবে না--নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে দ্রুত কয়েকটি গোপন সংকেতশব্দ প্রবেশ করিয়ে দিয়ে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল সে। তারপর একটি বার্তা সৃজন করতে শুরু করল।

কয়েক মুহূর্ত বাদে মৃদু গুমগুম শব্দ করে একবার কেঁপে উঠল যানটি। বিপদসংকেতকারী যন্ত্র থেকে তীব্র শিসের শব্দ উঠছে। প্রক্ষেপণক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছিল যানের পেছনের দিকে একটি ছোট ক্ষত তৈরি হয়েছে। স্বয়ংচালিত মেরামতিব্যবস্থা ক্ষতটিকে দ্রুত ঢেকে দিচ্ছিল কঠিন একটি নিরাপত্তা আবরণে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সীমাল। শূন্যজ শক্তিশোষক ঘনকটিকে বাষ্পীভূত করে দেয়া হয়েছে। এর সামান্যতম অবশেষও আর শত্রুর হাতে পড়বার উপায় রইল না। সেইসঙ্গে, তারও আর ফিরে যাবার পথ রইল না তবে। কিন্তু সে বন্দিদশা বেশিক্ষণের জন্য নয়। ডেইকি তরঙ্গে ভর করে তার বিপদসংকেত বার্তাটি এতক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে আকাশগঙ্গায় নোভোস গ্রহে। এইবারে যে বাহিনীটি এগিয়ে আসবে এইখানে, তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েই আসবে—

দ্রুতগতিতে কাজ করছিল সে। অভ্যস্ত দক্ষতায় নিজেকে সাজিয়ে তুলছিল বিভিন্ন মারণাস্ত্রে। দেখতে দেখতে তার কোমল দেহটি ঢেকে গেল ঘন কালো বর্মে। এ বর্ম সমস্ত অস্ত্রের আঘাত থেকে, গভীর সমুদ্রতল হতে আগ্নেয়গিরির গর্ভে, কিংবা মহাকাশের শূন্যতাতেও দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষা করে চলবে তার দেহকে।

ধীরে ধীরে গতি কমে আসছিল যানের। জানালার বাইরে আগুনের হলকা প্রশমিত হয়েছে। হালকা কমলাবর্ণের সূর্যালোক ঢুকে আসছিল যানটির ভেতরে। সেইদিকে একবার চেয়ে দেখল কৃষ্ণকায় বর্মে সজ্জিত যোদ্ধা। তারপর নিয়ন্ত্রক প্যানেলের গায়ে পরপর কিছু নির্দেশ দিয়ে নিজের আসনটিতে এসে বসল ফের। আসনের চারপাশ থেকে অজস্র তন্তু বের হয়ে এসে তাকে ঘিরে একটি রক্ষাকবচ তৈরি করল, তারপর সহসা যানের নিচের দিকের কিছুটা এলাকার আবরণ খুলে গিয়ে আসনটি ছিটকে বের হয়ে এল বাইরের আবহমণ্ডলে।

একটি অতিকায় পতঙ্গের মতন ধীরে ধীরে ভাসতে ভাসতে আসনটি নেমে চলেছিল পায়ের নীচে প্রসারিত দ্বীপটির দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, তার আরোহীর দৃষ্টির আড়ালে, মাথার ওপর ভাসমান পরিত্যক্ত যুদ্ধযানটির দেহ থেকে একরাশ ধূলিকণা ধীরে ধীরে ভেসে উঠছিল বাতাসের গায়ে। তারপর হঠাৎ বাত্যাতাড়িত ধূলিঝড়ের মতোই তা ধেয়ে গেল পায়ের নিচের পর্বতমালার মধ্যে মাথা জাগিয়ে থাকা একটি নৌকাকৃতি গিরিশৃঙ্গের দিকে।

পরক্ষণেই একটি প্রলয়ংকর বিস্ফোরণে একটি অতিকায় অগ্নিপিণ্ডে বদলে গেল যুদ্ধযানটি। লেলিহান অগ্নিশিখাগুলি ক্ষণকালের জন্য ম্লান করে দিয়েছে এই গ্রহের সূর্যালোককে।

একটু বাদে বিস্ফোরণক্ষেত্রের থেকে চোখ ফিরিয়ে পায়ের নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল সীমাল। মেঘমণ্ডল ছাড়িয়ে আস্তে আস্তে সে তখন ভেসে চলেছে একটি স্বর্ণাভ সমুদ্রতটের দিকে। তার একদিকে ছোটো ছোটো পাহাড়, সারিবদ্ধ সৈন্যদলের মত ব্যূহ রচনা করেছে। তাদের শরীরের হরিতবর্ণ অরণ্যের আবরণ এসে বড়ো আদরে স্পর্শ করেছে স্বর্ণাভ সেই বালুকাবেলাকে। সমুদ্রের নীল জলরাশি পীতবর্ণ তটের ওপর দিয়ে বারংবার এগিয়ে এসে স্পর্শ করতে চায় সেই গাঢ় সবুজ বনমালাকে—

হঠাৎ, বালুকাবেলা ও অরণ্যের সীমান্তরেখার একটি ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলের দিকে চোখ আটকে গেল সীমালের। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না তার। অভ্যস্ত প্রতিবর্তক্রিয়াতেই যেন বা, তার হাতে উঠে এল একটি ভয়াল মারণাস্ত্র। ভাসমান আসনটি তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে সেই ছায়াচ্ছন্ন অঞ্চলটির দিকেই--


********






“এসো নেরা। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম।”

নৌশৃঙ্গের একপ্রান্তের উচ্চতম বিন্দুটির কাছে বসেছিলেন হবিষ্ট। দূর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বসন্তের বাতাস তাঁর সফেদ কেশরাশি নিয়ে খেলা করছিল।

“আগন্তুক যান আবহমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল দেবর্ষী। কিন্তু—”

“জানি। তার যাত্রী যানের শূন্যশোষক যন্ত্রটিকে বাষ্পীভূত করে দিয়ে তারপর যানটিকে ধ্বংস করেছে। আমরা যানটির থেকে প্রেরিত অন্তিম সাংকেতিক বার্তাটির অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছি।”

“আকাশগঙ্গার উদ্দেশে প্রেরিত বার্তাটির সম্প্রচার আটকানো গেছে তা হলে?”

“না নেরা। ডেইকিনির্ভর কোনো সম্প্রচার আটকানো যায় না। তবে প্রথমেই তোমাকে অভিনন্দন। যানটির গণককে বশীভূত করে তুমি নিপুণভাবে তার প্রথম আক্রমণের সম্ভাবনাকে নির্মূল করেছ। এইবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। সীমাল নামের যোদ্ধাটির গত কয়েকদিনের স্মৃতি উদ্ধার করতে পেরেছ কি?”

“পেরেছি দেবর্ষী। এই যে—” বলতে বলতেই প্রক্ষেপণক্ষেত্রের দিকে ইশারা করল নেরা। সেখানে তখন আকোনার ধ্বংসলীলা এবং সীমাল ও জিমুয়েলার কথোপকথনের ছবিটি ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে।

সম্প্রচারটি শেষ হলে কিছুক্ষণ চুপ স্থির হয়ে বসে রইলেন হবিষ্ট। তারপর ফের যখন মুখ খুললেন, তখন তাঁর কন্ঠস্বর থেকে কিছুক্ষণ আগের উদ্বেগটির চিহ্ন সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে, “ধন্যবাদ নেরা। বড়ো মূল্যবান সংবাদ বয়ে এনেছ তুমি। আর উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।”

“কিন্তু আকাশগঙ্গা নক্ষত্রমণ্ডলে ওই যোদ্ধার বার্তাটি পৌঁছালে—”

“আমরা তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করব। এখন তুমি যাও। ইকসা দ্বীপে সোমকের ওই যোদ্ধার মুখোমুখি হওয়ার সময় হয়েছে। তোমাকে তার প্রয়োজন হতে পারে।”


********

“দুঃস্বপ্নের অবসান হবার সময় হয়ে এল ক্ষিতিজ।”

সামনের প্রক্ষেপণক্ষেত্রটিতে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রিয় অঞ্চলের একটি মানচিত্র ভাসছিল। মানচিত্রের মাঝখানে নোভোস গ্রহের একটি চিত্র ফুটে আছে। সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই অন্যমনস্কভাবে ক্ষিতিজ বললেন, “আমি একমত নই। বরং এর ফলে যুদ্ধ আসন্নই হল। ওই যোদ্ধার প্রেরিত সংবাদ আকাশগঙ্গায় পৌঁছোবার সঙ্গেসঙ্গেই প্রতি আক্রমণ আসবে হবিষ্ট।”

“স্বাভাবিক। তবে নেরা যা সংবাদ বহন করে এনেছে তাতে সে আক্রমণের তীব্রতা, আগে যতটা আশংকা করা হয়েছিল, তার থেকে অনেক কম হবে। তাকে প্রতিহত করা আমাদের পক্ষে কষ্টকর হবে না।”

“কোন ভিত্তিতে আপনি—”

“ভিত্তি অবশ্যই রয়েছে দেবর্ষী। এই যোদ্ধার স্মৃতিতে সঞ্চিত তথ্য থেকে বিষয়টি পরিষ্কার--নোভোস গ্রহটি যে প্রযুক্তির নাগাল পেয়েছে সেটিকে সে তার বন্ধু উপনিবেশগুলির সঙ্গেও ভাগ করে নেবে না। এককভাবে ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হবার স্বপ্ন দেখছে তারা। ফলে আমাদের মাত্রই একটি গ্রহের আক্রমণকে প্রতিহত করতে হবে, একটি নক্ষত্রপুঞ্জের নয়।”

“কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এলে—”

“না ক্ষিতিজ। সে সম্ভাবনা নেই। দানবজাতির চরিত্রকে বহুকাল ধরে অধ্যয়ন করেছি আমি। এরা নিজের অধিকারকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ঘৃণা করে। অধিকারের বৈষম্যই এদের সমাজজীবনের মূল চালিকাশক্তি। এই চরিত্রের বিরুদ্ধাচরণ করতে হলে এদের সমাজব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বলাবাহুল্য তা সম্ভব নয়।”

“বেশ। স্বীকার করছি উপস্থিত আক্রমণটিকে আমরা প্রতিহত করতে সক্ষম হব। কিন্তু অন্য একটি সমস্যার কথা কি আপনি ভেবে দেখেছেন দেবর্ষী? এই নতুন প্রযুক্তি, নোভোসকে ক্রমেই ওই নক্ষত্রপুঞ্জে প্রধান শক্তিতে পরিণত করবেই। কয়েক শতাব্দির মধ্যে আকাশগঙ্গার একটি বৃহৎ খণ্ডকেও যদি সে তার অধীনস্থ করতে সক্ষম হয় তাহলেও তার মিলিত শক্তির হাত থেকে উত্তরসূরীদের এই গ্রহকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠবে আমাদের। কতকাল তাদের আটকে রাখতে পারব আমরা?”

হবিষ্ট মৃদু মাথা নেড়ে বললেন, “আমার পরিকল্পনাটি যদি কার্যকর হয় তাহলে, এই একবারের বেশি এই গ্রহের দিকে আক্রমণ চালাবে না নোভোসের দানবেরা। আপনি ডেইকি বর্তনী সক্রিয় করুন। নেরার সংগৃহীত ওই যোদ্ধার স্মৃতিতে সঞ্চিত তথ্যগুলি আকাশগঙ্গার প্রতিটি মনুষ্যবসতিতে, সমস্ত প্রচারতরঙ্গে সম্প্রচার করুন। তারপর, বহুকাল বাদে এই নৌযান ফের একবার মহাকাশচারণে নির্গত হবে—”


********






মানুষটি অলসভঙ্গিতে অরণ্যের ছায়ায় তৃণশয্যায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সীমাল আসনটিকে তার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নামাল। সুন্দর পেশীবদ্ধ চেহারার একজন পুরুষ। তবে সামান্য একটি পুরুষ হলেও এক্ষেত্রে অসাবধান হবার ফল বিপজ্জনক হতে পারে। আসন থেকে নেমে এসে আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গিতে তার দিকে মুখ করে দাঁড়াল সীমাল। তারপর হাতের অস্ত্র থেকে একটি শক্তির ঝলক ছুঁড়ে দিল মানুষটির পাশের বেলাভূমিতে।

তীব্র একটা অগ্নিশিখা দপ করে জ্বলে উঠেই অদৃশ্য হল ফের। জায়গাটির বালি গলিত কাচে পরিণত হয়েছে। পুরুষটি একটু নড়ে উঠল এইবার। তার আচরণে পুরুষসুলভ সন্ত্রস্ততার কোনো চিহ্ন ছিল না। সীমাল অস্ত্রটি উঁচিয়ে ধরে অপেক্ষা করছিল।

ধীরে ধীরে উঠে বসল পুরুষটি। তার মাথার ঘনকৃষ্ণ কেশরাজি এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পেশিবদ্ধ বুকে পিঠে। দুটি উজ্জ্বল চোখে কৌতুকের দীপ্তি ছড়িয়ে সে তার দিকে তাকিয়ে রইল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর মৃদু হেসে বলল, “আমি নিরস্ত্র। বর্মহীন। নোভোস গ্রহের যোদ্ধারমণীরা কি আজকাল একজন নিরস্ত্র পুরুষের সামনেও ভয় পেয়ে বর্ম ও অস্ত্রের আড়ালে আত্মগোপন করে থাকে?”

“কে তুমি?”

মৃদু হাসল পুরুষটি। তার ঠোঁটের গড়নটি ভারী আকর্ষণীয়। তারপর বলল, “যদি উত্তর না দিই?”

জবাবে হাতের অস্ত্রটি ফের একবার তার দেহের দিকে উঁচিয়ে ধরল সীমাল।

“কেন বৃথা চেষ্টা করছ নোভোস গ্রহের যোদ্ধা সীমাল। তুমি আমার কাছে অনেক কিছু জানতে চাও। তার আগে আমাকে তুমি হত্যা করবে না তা আমি জানি।”

“কিন্তু আহত করতে পারি।” এই প্রথম কোনো পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু অসহায় বোধ হচ্ছিল সীমালের। অস্ত্রের শক্তি কাজ না করলে—পরক্ষণেই নিজের দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে দিল সে। হাতের অস্ত্রটি কোমরে গুঁজে রেখে একটি নতুন অস্ত্র তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ধরল পুরুষটির বুকের দিকে, “এই যন্ত্রটি আমরা সাধারণত যন্ত্রণাদানের জন্য ব্যবহার করে থাকি পুরুষ। এটি সরাসরি তোমার মস্তিষ্কের যন্ত্রণা অনুভবকারী স্নায়ুগুলিকে উত্তেজিত করে তুলবে। এর প্রয়োগ দেখতে না চাইলে এখনও বল, তুমি আমার কথা জানলে কী করে?”

“যুবকটি উঠে দাঁড়াল এইবার। পরনে যৎসামান্য লজ্জাবরণ ভিন্ন আর কোনো পোশাক নেই তার। পেশিবহুল বাদামি দেহটি স্বাস্থ্যের ঔজ্জ্বল্যে ঝলমল করছে যেন। তার মাথার দীর্ঘ, এলোমেলো চুলগুলি নিয়ে সমুদ্রের হাওয়া খেলা করছিল। ধীরে ধীরে তার সামনে কয়েক পা এগিয়ে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল সে, “কই, দেখাও?”

অস্ত্রটিকে সর্বোচ্চ শক্তিস্তরে বেঁধে দিয়ে তার বোতামে সজোরে একটি চাপ দিল সীমাল। অদৃশ্য জিটা কণিকার স্রোত গিয়ে আছড়ে পড়ছে যুবকটির সর্বাঙ্গে—কিন্তু তারপরই তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা সম্পূর্ণ অজানা অনুভূতি এসে সীমালের বুদ্ধিবৃত্তিকে অবশ করে দিল। ভয়! ভয় পেয়েছে সে! যে শক্তির ধাক্কা একদল মানুষকে এক মুহূর্তে যন্ত্রণায় অচেতন হতে বাধ্য করে, সেই আঘাতকে নির্বিকারে নিজের শরীরে গ্রহণ করেও মুখের হাসিটি অবিচল রয়েছে পুরুষটির মুখে। তারপর হঠাৎ বড়ো বড়ো পদক্ষেপে তার দিকে এগিয়ে এসে সে তার হাতের থেকে অস্ত্রটি টেনে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলল একপাশে। প্রতিবর্তক্রিয়াতেই যেন বা, সীমালের ডান পা-টা পলকের মধ্যে উঠে এসেছিল যুবকটির হৃৎপিণ্ডকে লক্ষ্য করে। এবার ফের একবার চমকে দিল পুরুষটি তাকে। এতটুকু বিচলিত না হয়ে সে অবলীলায় তার পায়ের গোড়ালিটা ধরে ফেলে লাথির সম্পূর্ণ শক্তিটুকুকে যেন শুষে নিল নিজের হাতের চেটোতে। তারপর ছোট্ট একটা মোচড়ে তাকে ভারসাম্যহীন করে দিল।

এলিয়ে পড়া শরীরটা দুটো শক্তপোক্ত হাতের মধ্যে ধরা দিয়েছে এইবারে। একটি হাত বিচিত্র কৌশলে তার কাঁধের নিচে চাপ দিয়ে ধরে সম্পূর্ণ অচল করে রেখেছিল তাকে। আস্তে আস্তে চাপ বাড়াচ্ছে হাতটা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল সীমালের। কাঁধের তীব্র যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে উঠছিল বিস্ময় আর তীব্র অপমানের অনুভূতি—একটা সামান্য পুরুষ—তুচ্ছ যৌনদাস—

পুরুষটির অন্য হাতটি এইবার তার বর্মের মুখোশটির দুপাশে মৃদু একটু চাপ দিতে মুখোশটা খুলে এলো সীমালের মুখ থেকে। স্বর্ণাভ একরাশ উদ্দাম কেশ ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখের চারপাশে। সেইদিকে তাকিয়ে নিজের উদ্যত হাতটা হঠাৎ পাশে নামিয়ে নিল মানুষটা। তারপর তার চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বলল, “মানবজাতির সভ্যতার চমৎকার নিদর্শন স্থাপন করছ তুমি সীমাল। অতিথি হয়ে এসে প্রথমেই গৃহকর্তাকে ভয় দেখিয়ে বশীভূত করবার চেষ্টা। তোমাদের সম্পূর্ণ সমাজটাই কি এইরকম অসভ্য, নাকি তুমি একাই একটি ব্যতিক্রমী অপরাধী?”

“তুমি—আপনি কে?”

তাকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়াল বিচিত্র পুরুষটি। দুটি উজ্জ্বল কালো চোখ একদৃষ্টে তকিয়ে রয়েছে তার দিকে। পুরুষের দৃষ্টিতে সাধারণত সম্ভ্রম ও ক্ষুধার যে মিশ্রণ শৈশব থেকেই দেখে অভ্যস্ত সীমাল, এ দৃষ্টিতে তার কোনোটাই ছিল না। একটি হালকা কৌতুক খেলা করছিল তার চোখে। যেন একটি ক্রীড়ার সামগ্রী হাতে পেয়ে কৌতুক বোধ করছে এক উদ্ধত কিশোর।

হঠাৎ ফের একবার হত্যাযন্ত্রটি হাতে তুলে নিল সীমাল। তারপর সেটিকে তার দিকে নিশানা করে বলল, “ভুল করেছ পুরুষ। এই যন্ত্রটি শুধু হত্যা করে না। তোমার স্নায়ুমণ্ডল আমার পীড়ক যন্ত্রকে কীভাবে প্রতিরোধ করেছে আমি জানি না। কিন্তু নিচু শক্তিতে বাঁধা থাকলে এই হত্যাযন্ত্র তোমার প্রাণ নেবার বদলে তোমার শরীরের বাইরেটাকে পুড়িয়ে দেবে।”

পুরুষটির মুখে কৌতুকের হাসিটি এইবার ব্যাঙ্গের হাসিতে পরিণত হল। একটুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, “নোভোস গ্রহের যোদ্ধারমণীরা তাহলে অস্ত্র ছাড়া পুরুষের সামনে অসহায়। আমি নিরস্ত্র। তবু অস্ত্র ছাড়া আমার সামনে দাঁড়াবার সাহস তোমার নেই। অবশ্য সেইটিই স্বাভাবিক।”

“দাঁড়াও—”

পেছন ফিরে অরণ্যের দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল সোমক। ডাকটা কানে যেতে ঘুরে দাঁড়াল সে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। অস্ত্রশস্ত্রসহ শরীরের বর্মটি খুলে রেখে সীমাল ঝাঁপ দিয়েছে তার শরীর লক্ষ করে। তার পা দুটি বিদ্যুতের মতন এসে আঘাত করেছে পুরুষটির কাঁধে। ছিটকে বালির ওপর পড়ে গিয়েই আশ্চর্য নমনীয়তায় শরীরটিকে বেঁকিয়ে একপাশে গড়িয়ে গেল সোমক। ওপর থেকে তার শরীর লক্ষ করে নেমে আসা নারীশরীরটি আছড়ে পড়ল বালির ওপর, আর তারপর বিচিত্র দক্ষতায় তার পা দুটি দিয়ে বজ্র বাঁধনে সোমকের গলা জড়িয়ে ধরে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে নিজের শরীরের ওপর তুলে নিল। তার কোমরের কাছে পায়ের বাঁধন দিয়ে বন্দি করে রেখে দুটি হাতের মুঠি নামিয়ে আনল সোমকের কপালের দু পাশে।

মাথার মধ্যে খিলখিল করে হাসির শব্দটা হঠাৎ করেই বেজে উঠল সোমকের, “সাহায্য লাগবে কি?”

সীমালের দ্রুতসঞ্চরমাণ হাতদুটিকে আঁকড়ে ধরবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতেই সোমক জবাবি বার্তা পাঠাল, “না নেরা। এ একেবারেই আমার একার লড়াই।”

“তোমার যান্ত্রিক শরীর তো অনেক বেশি শক্তির আধার সোমক। তাহলে একে পরাস্ত করতে এত সময় লাগছে কেন তোমার? নারীদেহটির স্পর্শ উপভোগ করছ?”

“যন্ত্রমস্তিষ্ক, তুমি জৈবমস্তিষ্কের দুর্বলতাগুলিকে বুঝবে না। একবার দেখ তো, পুরুষের হাতে সম্পূর্ণ পরাজয়ের স্বাদ এর মস্তিষ্কের ব্যক্তিত্বকেন্দ্রটিকে কতটা আঘাত করবে?”

সীমাল তার আক্রমণকে প্রতিহত করে ততক্ষণে তার বুকের ওপর উঠে বসেছে। দুহাতে প্রাণপণে তার কন্ঠনালীটিকে চেপে ধরবার চেষ্টা করে চলেছে সে।

হঠাৎ করেই একেবারে স্থির হয়ে গেল যোদ্ধাটির শরীর। অচেতন দেহটি এলিয়ে পড়েছে সোমকের বুকের ওপর। উষ্ণ, সুপুষ্ট নারীদেহটির মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছিল তার দেহকে স্পর্শ করে। স্পর্শটি সোমককে উত্তেজিত করে তুলছিল।

কিন্তু সে কেবল একটি মুহূর্তের জন্য। তারপরেই ফের উঁচু হয়ে উঠে বসল সে। নতুন উন্মাদনায় ফের আক্রমণ করল তার প্রতিপক্ষকে। খণ্ডমুহূর্তের সেই সংজ্ঞাহীনতা তার চেতনায় লিপিবদ্ধ হয়নি।

“ঠিকই বলেছিলে সোমক। ব্যক্তিত্বটি সম্পূর্ণ অব্যবহার্য হয়ে পড়বে সেক্ষেত্রে। মস্তিষ্কটি বিচিত্র। কোনো পরাজয়কেই মেনে নিতে পারে না। কেন এমন হয় সোমক?” সোমকের মাথার মধ্যে নেরার বিস্মিত কন্ঠস্বরটি প্রতিধ্বনিত হল এইবারে।

“সে তুমি বুঝবে না যন্ত্রমস্তিষ্ক। তুমি ঈশ্বরজাতির সৃষ্ট, তবু, সৃজনপ্রযুক্তিতে ঈশ্বরজাতি এখনও প্রকৃতির কাছে শিশু। এইজন্যই আমি এই যোদ্ধাকে সম্পূর্ণ পরাজয়ের স্বাদ দিতে চাই না। আমি আমার শক্তিকে একেবারেই মানবিক স্তরে সীমাবদ্ধ করে নিয়েছি।”

সীমালের হাতদুটিকে ততক্ষণে নিজের মুষ্টিতে ধরে ফেলেছে সোমক। দেহটির ওপর উপুড় হয়ে নিজের শরীর দিয়ে সেটিকে বন্দি করে রেখেছে বালুকাশয্যায়। শক্তিশালী শরীরটি প্রাণপণে যুঝছিল সোমকের বিরুদ্ধে। তারপর পেশিশক্তির এক সহসা বিস্ফোরণে সোমককে ছিটকে ফেলে দিয়ে সে ফের উঠে বসল তার বুকের ওপর।

সেই নির্জন বালুকাবেলায় যুযুধান দুটি মানুষের দেহ বেয়ে কমলাবর্ণের সূর্যকিরণ ধীরে ধীরে আকাশের একপাশ থেকে অন্যপাশে ঢলে পড়ছিল। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে নোভোস গ্রহের যোদ্ধাটি। কিছু পরে তার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়াল সোমক। যোদ্ধাটিও ভূমিশয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। তার শরীরে ক্লান্তির সুস্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

হঠাৎ সামনের দিকে ছিটকে গিয়ে সে তার অস্ত্রশস্ত্রসহ বর্মটিকে তুলে নেবার চেষ্টা করল। কিন্তু সোমক ততক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেগুলিকে নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। একটা তিক্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল যোদ্ধাটির মুখে। ধীরে ধীরে দেহের আবরণ সরিয়ে সে তার উদ্ধত শরীরটি তুলে ধরল পুরুষটির সামনে, “এইবারে আমায় হত্যা করবে তো? করো। তারপর নোভোস গ্রহের সশস্ত্র নৌবহর এসে পৌঁছোলে তারা আমার হত্যার মূল্য দাবি করবে এই গ্রহের কাছে।”

হাতে ধরা অস্ত্রটি গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে দেখতে দেখতেই পুরুষটি মৃদু হেসে বলল, “তোমাদের মতো বর্বর জাতির পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। হত্যা ছাড়া সভ্যতার আর কোনো সংজ্ঞাই তোমরা জানো না। তবে আমি নিরস্ত্রের প্রতি অস্ত্রসন্ধান করি না সীমাল। তোমার দেহটি শক্তিশালী। সম্মুখযুদ্ধে আমি তোমাকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করতে পারিনি। সেইজন্য আমি তোমাকে অভিনন্দন জানাই।”

“মূর্খ। আমাকে হত্যা করো। নয়তো প্রথম সুযোগে তুমি আমার হাতে নিহত হবে।”

“না সীমাল। কেন আমি নিরস্ত্রের ওপর অস্ত্রসন্ধান করি না, তা বোঝবার মতো চিন্তাশক্তি এখনও তোমাদের বর্বর জাতিদের হয়নি। তোমার মনটিও তোমার দেহের মত শক্তিশালী হয়ে উঠলে তখন এর কারণ তুমি বুঝতে পারবে। তাছাড়া এই শান্তিময় দ্বীপে এই অস্ত্রগুলির কোনো প্রয়োজনও আমার নেই। এ আমি তোমায় প্রত্যর্পণ করে গেলাম। তাকিয়ে দেখ, নক্ষত্রদেবতা অস্ত যাচ্ছেন। এই দ্বীপে বন্যশ্বাপদের অভাব নেই। তাছাড়া তোমাকে নিজের খাদ্য ও আশ্রয়ের বন্দোবস্তও করতে হবে, যতক্ষণ না তোমার নোভোস যুদ্ধযানেরা তাদের এক অসহায়, অসভ্য সদস্যকে উদ্ধার করতে এসে উপস্থিত হয়। আমি এখন যাব।”

“দাঁড়াও। শ্বাপদ—কী?”

পেছন ফিরে অরণ্যের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই সোমক বলল, “অস্ত্রের শক্তিতে উত্তর দাবি করছ কি? সেক্ষেত্রে তুমি আমায় পেছন থেকে স্বচ্ছন্দে হত্যা করতে পার। আমি জবাব দেব না।”

“না। তুমি ফিরে দেখ। আমার হাতে অস্ত্র নেই। আ-আমি কেবল জানতে চাইছি—”

পুরুষটি ঘুরে দাঁড়াল, “শ্বাপদের অর্থ হল হিংস্র জন্তু।”

“হিংস্র জন্তু? কিন্তু তারা তো মানবনিয়ন্ত্রিত পশুশালায় উৎপন্ন হয়—”

“তোমাদের আকাশগঙ্গার সভ্যতায় তাই শিখেছ বুঝি সীমাল? এই গ্রহের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রটি কিন্তু অক্ষত আছে। এখানে আমরা ভিন্ন আরও লক্ষ লক্ষ প্রজাতির জীবের বাস। তার মধ্যে শ্বাপদও আছে। ক্ষুধা তাদের একমাত্র প্রবৃত্তি। তোমার সুন্দর শরীরটি তাদের কাছে উদরপূর্তির উপযুক্ত রক্তমাংসের একটু স্তূপ বই আর কিছু নয়।”

“বর্বর গ্রহ। মনুষ্যেতর জন্তুর বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে কোনো উন্নত জাতি—”

“সহাবস্থান করে না। তাই তো? শৈশব থেকে তুমি তাই শিখে এসেছ তোমার সমাজের কাছে। অতএব তুমি সিদ্ধান্ত করেছ এই গ্রহ তোমাদের তুলনায় উন্নত নয়।

“অথচ তোমাকে কত সহজে নিরস্ত্র করা হয়েছে দেখ। কোনো রক্তক্ষয় হয়নি। কোনো প্রাণ যায়নি। তোমার উন্নত যান, উন্নততর মারণাস্ত্র সবকিছুকেই অনায়াসে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়েছে। তাহলে?”

সীমাল নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল পুরুষটির দিকে। খানিক বাদে ফের মুখ খুলল পুরুষটি, “আরো একটি কথা। ক্ষুধা কাকে বলে তা তুমি তোমাদের কৃষ্ণবর্ণ ধাতুনগরীতে বসে কোনোদিন জানতে পারনি। এই গ্রহে প্রত্যেককে নিজের খাদ্য নিজেকেই প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করে নিতে হয়। তুমিও তার ব্যতিক্রম হবে না। এইবারে, তোমার উদ্ধারকর্তারা এসে পৌঁছানো অবধি একাকি সেই জ্ঞানটিকে অধিগত কর যোদ্ধা সীমাল। আর, কখনো একান্ত প্রয়োজন হলে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আমাকে ডেকো। আমি আসব।”

সূর্য অস্ত গিয়েছেন ততক্ষণে। পূর্বের আকাশ বেয়ে এ গ্রহের দুটি চাঁদ উঠে আসছিল ধীরে ধীরে। তাদের মায়াবি আলো এসে পড়েছে যোদ্ধাটির অনাবৃত শরীরে। সামান্য নিচু হয়ে একটু দ্বিধাভরেই সীমাল ফের একবার হাতে তুলে নিল তার বর্মটিকে। তারপর ঘন অরণ্যের অন্ধকারে দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকা মানুষটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কী মনে হতে বলে উঠল, “শোনো, কী বলে ডাকব তোমায় আমি?”

“সোমক। এককালে ওই নামেই পরিচিত ছিলাম আমি তোমার পূর্বপুরুষদের কাছে।”

তার অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলা দেহটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল সীমাল। অপরিচিত কিছু বিচিত্র অনুভূতির স্পর্শ লাগছিল তার মনে। অবিশ্বাস্য। এই প্রথম শক্তি ও রণকৌশলে নিজের সমকক্ষ কোনো পুরুষের দেখা পেয়েছে সে। বিচিত্র কথা বলে মানুষটি। তার এতদিন ধরে শিখে আসা সমস্ত কিছুর মূর্তিমান প্রতিবাদ যেন, ঠিক যেমন তার পরিচিত যেকোনো গ্রহের প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তুতন্ত্রের মূর্ত প্রতিবাদ এই বিচিত্র জলময় গ্রহটি—

মানুষটির অনাবৃত, অরক্ষিত পিঠ তার দিকে ফিরে রয়েছে। রশ্মি অস্ত্রটিকে ধীরে ধীরে তুলে ধরল সে সেইদিকে নিশানা করে। একটি মৃদু চাপ--তাতেই এক মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে যাবে ওই অতি আত্মবিশ্বাসী অহংকারী পুরুষ!

কিন্তু তারপরই একটু কেঁপে উঠে হাতের অস্ত্রটিকে নামিয়ে নিল সে। মানুষটি তাকে বিশ্বাস করে তার অস্ত্রগুলি ফেরত দিয়ে গেছে। বিশ্বাস? অস্ত্রধারী শত্রুকে? কেন? তাকে জানতে হবে। কোন মন্ত্রে একজন পুরুষ একজন যোদ্ধা নারীকে দৈহিক বলে পরাজিত করতে সক্ষম হয়? কোন মন্ত্রবলে সে তাকে মারণাস্ত্র হাতে দিয়ে বিশ্বাস করবার শক্তি পায়? তার মহাকাশযানটিকে কি এই মানুষটিই নিয়ন্ত্রণ করছিল? যদি তাই হয় তাহলে যানটিকে নিজে অধিকার করবার বদলে কেন সে তাকে তা ধ্বংস করবার সুযোগ দিল? কে ও? এমন হিসেবের গরমিল কীভাবে হয়? কীভাবে--

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি গম্ভীর গর্জনে কেঁপে উঠল সন্ধ্যার বাতাস। একেবারেই অপরিচিত শব্দটি তার বুকের ভেতর ফের সেই অজানা কাঁপুনিটিকে ফিরিয়ে আনল। ভয় পেয়েছে সে।

পরমুহূর্তেই তার রণক্ষেত্রে টিঁকে থাকবার প্রশিক্ষণের স্মৃতিটি জেগে উঠল। হাতের অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে মৃদু আলোকিত বালুকাবেলাটি ছেড়ে সে সমুদ্রের জলের দিকে এগিয়ে গেল। শ্বাপদটি স্থলচর জীব হলে সম্ভবত জলের ভিতর সে আক্রমণ করতে সাহস না-ও পেতে পারে। মৃদু ঢেউগুলি তার শরীরকে বারে বারে ভারসাম্যহীন করে দিচ্ছিল। গর্জনটি সামনের বনরেখার অন্তরালে ক্রমাগত আগপিছু করে চলেছে। সম্ভবত অরণ্যের অন্ধকার থেকে তার ওপর সতর্ক নজর রেখে চলেছে সেটি—


********

চাঁদদুটি মধ্যগগনে উঠে এসেছে এইবারে। সমুদ্রের অগভীর জলে ঘুমন্ত নারীদেহটি ভাসছিল। অন্ধকার বনানীর অন্তরাল থেকে দুটি মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সেইদিকে। শ্বাপদটি এতক্ষণ তার কোনো বন্য শিকারকে অনুসরণ করছিল মাত্র। অপরিচিত এই জীবটির দিকে তার প্রকৃত আকর্ষণ ছিল না। সে তার শিকারকে অনুসরণ করে বহুদূরে সরে গিয়েছে। জায়গাটি এখন নিরাপদ।

জলের মধ্যে নেমে গিয়ে পুরুষটি সযত্নে দেহটিকে কোলে তুলে নিল। ঘুমের মধ্যেই নারীটি তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার ভেজা চুলে চন্দ্রালোক পড়ে চিকমিক করছিল।

অরণ্যের অন্ধকারে অন্য নারীটি একটি পর্ণশয্যা রচনা করে অপেক্ষা করছিল। পুরুষটি তার কাছে এসে ঘুমন্ত নারীদেহটিকে সযত্নে শুইয়ে দিল সেই পর্ণশয্যায়। শরীরের ভেজা পোশাক ছাড়িয়ে মেলে দিল একপাশে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চন্দ্রদেবীদের একচিলতে আলো এসে পড়েছে তার মুখে। ঘুমন্ত মুখটিকে বড়ো নিষ্পাপ দেখাচ্ছে এই মুহূর্তে।

তার পাশে সামান্য কিছু বনজ ফল ও পত্রপুটে কিছুটা জল সাজিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল সোমক। তার সঙ্গিনী মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তার দিকে দেখছিল। হঠাৎ পুরুষটি নিচু গলায় তাকে সম্বোধন করে বলল, “চলে আসবার সময় সীমাল আমার দিকে তার অস্ত্র নিশানা করেছিল। আমি তার চিন্তাস্রোতের আভাস পেয়েছিলাম তখন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে আমাকে আঘাত করেনি। তুমি কি—”

“হ্যাঁ সোমক। আমি তার মনটিকে সামান্য প্রভাবিত করেছিলাম সেই মুহূর্তে। কিন্তু তার জন্য আমাকে বিশেষ শক্তিপ্রয়োগ করতে হয়নি। নারীটির মনে তার যোদ্ধা সত্তাটির অন্তঃস্থল থেকে হঠাৎ করেই দ্বিতীয় একটি সত্তা অংকুরিত হয়েছে। আমি তার চরিত্রটি বুঝতে পারিনি। তবে তা তার হিংস্রতার বিরুদ্ধাচরণ করছে সেইটুকু অনুভব করে সেইটিকেই একটু বিবর্ধিত করেছি মাত্র।”

“অর্থাৎ অস্ত্রটি তাকে নামিয়ে নিতে তুমিই বাধ্য করেছ।”

নেরা তার চোখদুটি তুলে ধরল সোমকের দিকে, “মনোনিয়ন্ত্রণ একটি সূক্ষ্ম কাজ সোমক। তুমি তার সামান্যই অধিগত করতে পেরেছ এই দীর্ঘ সময়ে। এর জটিলতার সম্বন্ধে এখনও তোমার কোনো ধারণা নেই। অস্ত্রটি প্রয়োগ করবার ইচ্ছা যদি তার তীব্র হত তাহলে তাকে রোধ করতে গেলে যতটা শক্তি আমাকে প্রয়োগ করতে হত তাতে তার চিন্তনপদ্ধতিতে স্থায়ী ক্ষতি আসতে পারত। কিন্তু তাহলে তোমার মূল গবেষণাটি বাধা পেত যে। তোমার তো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সুস্থ দানবমস্তিষ্কের প্রয়োজন সোমক। তাকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা না দিলে—”

সোমক একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল নেরার দিকে, “তুমি জান আমি ঠিক কী করতে চলেছি?”

উত্তরে দুটি হাত গভীর আশ্লেষে তার দেহটিকে জড়িয়ে ধরল এসে, “জানি। আমি তোমার মনটিকে কত গভীরভাবে জানি তার কোনো ধারণা তোমার নেই সোমক।”

“কিন্তু তবু, তার সবটা তুমি জানো না যন্ত্রমস্তিষ্ক,” পুরুষটির আঙুলগুলি তার চুলের ভিতরে খেলা করছিল, “কিছু অনুভূতি এখনও তোমার অধরাই থেকে গেছে যে—”

“জানি সোমক। এই পরীক্ষায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের দায় শুধু তোমার আর দেবর্ষীদের। আমি এতে অংশ নিয়েছি শুধু একটিই আশায়--সেই অজ্ঞাত অনুভূতিটিকে অধিগত করবার লোভে সোমক।”

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সোমক যখন ফের কথা বলল, তখন তার স্বরে আশ্চর্য এক কোমলতা ছিল, “নেরা, শোন। তোমার যন্ত্রমনের গঠন যে বিশুদ্ধ গাণিতিক ভিত্তিতে সৃষ্ট তাতে কার্যকারণের সরলরৈখিক পথটিই তার একমাত্র চালিকাশক্তি। ভালোবাসা শব্দটির সঙ্গে যে অজ্ঞেয় অনুভূতি সংশ্লিষ্ট থাকে তার গণিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এককভাবে তোমার মনের পক্ষে তার যুক্তিটিকে অধিগত করা সম্ভব নয়। এ চেষ্টা তুমি কোরো না।”

“না সোমক। তুমি যে বলেছ একমাত্র সেটিকে অধিগত করতে পারলে তবেই তুমি আমাকে আর কখনো যন্ত্রমস্তিষ্ক বলে সম্বোধন করবে না—”

সোমকের গলায় মৃদু কাঠিন্যের স্পর্শ এল, “আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মধ্যে রয়েছি নেরা। ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে তুমি চিন্তিত থাকলে আমার কাজে বিঘ্ন ঘটবে। তুমি—”

হঠাৎ চোখদুটি যেন দপ করে জ্বলে উঠল যন্ত্র ঈশ্বরীর, “যখন সীমালের রূপ ধরে তোমার কাছে এসেছি বারংবার তখন সেই অজ্ঞেয় অনুভূতিটির যে প্লাবন বয়ে গেছে তোমার মনে আমি কি তাকে অনুসরণ করিনি সোমক?”

“তোমার সঙ্গে সহবাসকালে আমার ভেতর সে অনুভূতি কি তুমি কখনই টের পাও নি?”

“পেয়েছি সোমক। আর তার ভিত্তিতেই বারে বারে ব্যর্থ চেষ্টা করেছি ভালোবাসার গাণিতিক রূপ সৃষ্টি করতে। কিন্তু সীমালরূপটির সঙ্গে মিলনের সময়কার মতো তীক্ষ্ণতায় তা কখনোই পৌঁছায়নি। তোমার অনুভূতির সেই সুতীব্র প্লাবনটিকে আমি আমার চেতনাতেও অনুভব করতে চাই সোমক। ঠিকই বলেছ তুমি। এককভাবে আমার পক্ষে কোনোদিন তা সম্ভব হবে না। কিন্তু—”

“কিন্ত কী নেরা?”

হঠাৎ তার চোখে চোখ রেখে একটুকরো হাসল যন্ত্র ঈশ্বরী, “আমি সে কথা তোমায় বলব না সোমক। কিন্তু কথা দিচ্ছি, যদি সফল হই তাহলে তুমি তোমার আরব্ধ কাজটি সমাপ্ত করবার জন্য একটি মূল্যবান অস্ত্র হাতে পাবে—না, চেষ্টা কোরো না সোমক। আমার পরিকল্পনাটি আমার মনের অভ্যন্তরে সুরক্ষিত আছে। মনোনিয়ন্ত্রণে আমার যন্ত্রমস্তিষ্কের জন্মগত অধিকার। তোমার কাছে তা একটি অধীত শাস্ত্রমাত্র। তুমি আমার প্রতিরক্ষাকে ভাঙতে পারবে না হে পুরুষ। তার চাইতে—এসো--কাছে এসো আমার।”

পর্ণশয্যায় স্বর্ণবর্ণের মানবীটিকে নিদ্রিত রেখে মূর্তিদুটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল আলোকোজ্জ্বল সেই সমুদ্রতটের দিকে। সমুদ্রে জোয়ার এসেছে। উঁচু হয়ে আসা তরঙ্গগুলির মাথায় আলিঙ্গনবদ্ধ ভাসমান দেহদুটি দেবী ইরো ও ভালিয়ার আলোকবর্ষণে ঝিকমিক করে। রাত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে আসে--

(চলবে)



(পরবাস-৬৩, জুন - জুলাই, ২০১৬)





এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: