Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines



পরবাসে ভবভূতি ভট্টাচার্যের
লেখা


ISSN 1563-8685




খট্টরবাবা
(বিজুদা সিরিজের সপ্তম গল্প)

|| ১ ||

পাস্‌ করে হাতের বইখানা পাশের বিছানার ওপর ফেলে দিয়ে মস্ত এক আড়মোড়া ভেঙে বিজুদা বললেন, “এসো এসো ষষ্ঠীচরণ...এসো এসো বসো বসো, খাট পেতে দিই ভাত বেড়ে দিই, খাবে ভাই?”

বুঝলাম, বেশ মুডে আছেন আজ বিজুদা। কারণ কি ঐ বইটা? আড়চোখে নামটা দেখে নিই, ‘দ স্ট্রেঞ্জ লাইফ অব নিকোলা টেস্‌লা’। তিনি আবার কিনি? প্রশ্নটা বিজুদাকে করতে ডরি, এই হয়তো ‘এটাও জানিস না?’-গোছের লুক দেবেন। দিলেনও, আর সঙ্গে সঙ্গে ফুস্‌ করে সিলিং ফ্যানটি গেলো থেমে। অবধারিত পাওয়ার কাট।

সেদিকে খরচোখে তাকিয়ে বিজুদা বলেন, “এই বিশ্বচরাচর শক্তি দিয়ে বাঁধা। শক্তি, শক্তি অনাবিল অনন্ত শক্তি! তাকে ধরে বেঁধে মানুষের কাজে লাগানো চাই। তবেই খতম হবে মানুষের পাওয়ার রিকোয়ারমেন্টের ঘাটতি। সে অনেক শতাব্দীর মানুষের কাজ!”

“সৌরশক্তি? উইন্ডমিল? এইসবের কথাই না বলছেন? সে তো অনেক শতাব্দী ধরেই ঘস্‌টানি চলছে।” বলি।

“বেশ বলেছিস, ঘসটানিই বটে। প্রয়াস জারি হ্যায়, কিন্তু পার্মানেন্ট সল্যুশন আজও অধরা। কিন্তু এই যে সৌরজগত ঘুরছে, নানান গ্রহ-তারকারাজি, এর পেছনে শক্তি নেই? তাকে হার্নেস করতে হবে। মানুষ একদিন পারবে করতে তা। সেদিনই মানুষের শক্তির...”

“হেলে ধরতে পারে না, কেউটে! পাগল...” আলটপকা বেরিয়ে গেল আমার মুখ দিয়ে।

“পাগল? নিকোলা টেস্‌লা পাগল ছিলেন বলতে চাস? আজ যে এই অলটারনেট কারেন্ট আমরা ব্যবহার করছি, তার জনক এই টেস্‌লা সাহেব তা জানিস? ‘ফ্যারাডে’ ‘এম্পিয়ার’ ‘হার্জ’-এর মত এক পরিমাপের মানক হল ‘টেস্‌লা’---চৌম্বকশক্তির, সেটা তো কলেজে পড়েছিস? আমাদের দেশের টাকায় যেমন মহাত্মা গান্ধীর ছবি থাকে, ডলারে যেমন জর্জ ওয়াশিংটনের, তেমনি সার্বিয়ার দিনারে থাকে টেস্‌লার ছবি। কী মাপের মানুষ ছিলেন তাহলে টেস্‌লা, ভাব। সমানে টক্কর দিয়ে গেছেন এডিসন-আইনস্টাইনদের সঙ্গে। বেলগ্রেডের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি টেস্‌লার নামে। একবার নোবেল প্রাইজের জন্য...”

আমি ‘তিষ্ঠ তিষ্ঠ’ হাত দেখিয়ে ক্ষান্ত করি বিজুদাকে। “দাদা, বুঝতে পারছি আপনি বইখানি এইমাত্র শেষ করে বেশ চার্জড হয়ে আছেন। আমি কিন্তু ঐ টেস্‌লা সাহেবকে খাটো করতে চাইছি না, কেবল বলছি, এই পৃথিবীতেই শক্তির এত উৎস রয়েছে তাকে হার্নেস না করে একলাফে সৌরজগতকে...”

“তা ঠিক বলেছিস বটে সত্যচরণ। তা ঠিক বলেছিস। এই পৃথিবীতেই...” কেমন যেন আনমনা হয়ে যান শ্রীবিজনবিহারী সরকার মশায়। ঘাড় নাড়তে নাড়তে মেনে নেন উদাস স্বরে। এই স্বরটা যে আবার আমাদের বড্ড চেনা। এর পেছনেও বিজুদার কোন গল্প লুকিয়ে আছে নাকি? কে জানে?

*

আজ উল্টোটা ঘটেছে। মানে, আমাদের ফ্ল্যাটে বিজুদার পদার্পণ নয়, আমিই ঈদের ছুটির সকালে বিজুদার বাড়িতে ঢুঁ মেরেছি, দুপুরে হামিদের বাড়িতে বিরিয়ানির নেমন্তন্নে যাবার পথে। ডোরবেল বাজাতে ভোলাদা দরজা খুলে ভুরু তুলে দোতলা দেখিয়ে বলল, “যাও না, ওপরে পড়ার ঘরে রয়েছে।” সেই থেকে স্টাডির দরোজায় দাঁড়িয়ে আছি পাক্কা সাত মিনিট। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন দেখে আর বিজুদাকে বিরক্ত করিনি। তারপরই ওই ধপাস্‌ করে হাতের বই ফেলে...

হেসে বলি, “দাদা কিন্তু অনেকদিন পায়ের ধুলো দেননি আমাদের গরীবখানায়।”

“তা বলে এর পেছনে কিন্তু কোনো গল্প লুকিয়ে নেই।” বিজুদার গম্ভীর ঘোষণা। আমার কায়দাটা ধরে ফেলেছেন উনি।

হেসে বলি, “সেটা তো আপনার খুদে ভক্তদের ডিপার্টমেন্ট, আমি তার কী বলি? কিন্তু আপনার বোন সেদিন ছানাবড়া বানাতে গিয়ে রুখে গেল আপনি খেতে ভালোবাসেন বলে। যেদিন আসবেন...”

“ছানাবড়াক? বলিস কী? আগে বলবি তো?”

যদিও এর পরেও দু’তিন সপ্তাহ কেটে গেছে। টেস্‌লা সাহেব আর পাওয়ার ক্রাইসিসের গল্প ভুলতে বসেছি।

|| ২ ||

কটা ছোট্ট কাচের খেলনা। এক সারসপক্ষী সামনের পাত্রে ঠোঁট ডুবিয়ে ডুবিয়ে সুধা পান করে চলেছে। চলেছে তো চলেইছে। একবার ঠোঁট ডোবায় আর ওঠে আবার ডোবায় ওঠে আবার আবার---করেই চলেছে। শেষই আর হয়না তার পান। কোনো ইলেক্ট্রিক পাওয়ার নেই, নেই কোনো ব্যাটারি বা চৌম্বকশক্তি। তবু এ’কল চলতেই থাকে চলতেই থাকে। থামবার নামমাত্র নেই। গত আধাঘন্টা তাকিয়ে আছি। ঘরের ফ্যান অফ্‌ করে দিয়েছি---এই ভেবে, হয়তো হাওয়ার তোড়েই চলছে, থামতে চাইছে না। গিন্নি এবার ঘরে ঢুকে বললেন, “সে কি? তুমি সেই তখন থেকে ওটার দিকে তাকিয়ে আছো? কী দেখছ অত?”

“দেখছি, ওটা কতক্ষণে থামে।”

“থামবে না ওটা, চলতেই থাকবে...” পেছন থেকে গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ শুনে ফিরে দেখি মূর্তিমান বিজুদা! হ্যাঁ, আমাদের আদি ও অকৃত্রিম শ্রীবিজনবিহারী সরকার মহাশয়! চমকে সমস্বরে বলে উঠি আমি-সুমি, “দাদা, আপনি? মানে...কখন...”

“কোনো মানেটানে নেই। সুমির হাতের ছানাবড়ার টানটা প্রবল হয়ে উঠতে...অনেক ক’টা রোববার সকাল মিস্‌ করেছি আমাদের ছোট্ট বন্ধুদের ছাড়া। অতএব অয়নবাবু,..”

পুত্রটি আমার জেঠুর হাত জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি অলরেডি সকলকে আসতে বলে দিয়েছি।”

“সে কি? অলরেডি? কী করে তুমি জানলে যে আমি আজ আসবো?”

“আমাদের ব্যালকনি থেকে নিচে তোমাকে গাড়ি পার্ক করতে দেখেই তো আমি রূপা-গুগ্‌গুল-সীমাআন্টিদের হোয়াটসএপ করে দিলাম মায়ের মোবাইল থেকে...”

ধপাস্‌ করে সোফাটায় গা-এলিয়ে দিয়ে বিজুদা বললেন, “সুমি, দাও দেখি কুঁজো থেকে এক ঘটি ঠান্ডা জল গড়িয়ে। নব্যপ্রজন্মের সঙ্গে আর যা হোক্‌ প্রযুক্তির ব্যবহারে আমরা বুড়োরা কখনও এঁটে উঠতে পারবো না।”

“জেঠু...”, গুগগুল।

“দাদা...”, অনু।

পাশের ফ্ল্যাট থেকে অনু-গুগ্‌গুলরাই সবচেয়ে আগে এসে পড়ল তক্ষুণি তক্ষুণি।

“কতদিন পরে এলেন দাদা। কাল আপনার ভাই যখন সি আর পার্ক থেকে মোচা কিনে এনেছে, তখনই জানি রোববার সকালে গন্ধে গন্ধে...”

কপট ভ্রূকুটি করে বিজুদা বললেন, “দ্যাখ্‌ দ্যাখ্‌ সুমি তোর বান্ধবী কী ফচ্‌কে হয়েছে! দাদার সঙ্গে ফুক্কুড়ি হচ্ছে? আমি কি পেটুক যে...”

টিংটং করে আমার মোবাইলে ম্যাসেজ এসে গেল, “আস্ক সুমি টেক মোর রাইস। লাঞ্চ এট ইয়োর্স।” শ্যামল। বিজুদাকে এস.এম.এস-টা দেখাতে বললেন, “বাঃ ! প্রোফেসর সাআবও যে আষাঢ়ে গপ্পের ভক্ত হয়ে পড়েলেন দেখছি। আজ কিন্তু আমি কেবল বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করব ও ওদের গল্প শুনব বলে এসেছি। দুপুরে মোচার ঘণ্ট দিয়ে ভাত খেয়ে সটান একটা ঘুম।”

আর ঘুম! বিজুদা এলে থোড়াই ঘুম-টুম হয়। মেলা লেগে যায় আমাদের এই ছোট ফ্ল্যাটে। জয়পুর থেকে নীতিনের বাবা-মা এসেছেন। তাঁদেরও আমন্ত্রণ জানাই। নীতিন-সীমার আসতে তাই একটু দেরি হল।

***

ডান কব্জিতে বাঁধা হলুদ তাগাটা বাম-তর্জনী দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বিজুদা বললেন, “তোরা নান্দেড় সাহেবের নাম নিশ্চয় শুনেছিস?”

“কে? ন্যান্ডেড? ইজ হি আ ফ্রেঞ্চম্যান?” সুদীপের জিজ্ঞাসা।

“ইতিহাসের মেসোমশায়!” বিজুদা।

“সুদীপ, নান্দেড় হল শিখদের পঞ্চমহাতীর্থের এক তীর্থ। গোদাবরী নদীতীরে, মহারাষ্ট্রে। দশম ও শেষ গুরু গোবিন্দের প্রয়াণস্থল।” অধ্যাপক শ্যামলবাবু চুপেচুপে জানান।

“তাহলে তাকে আবার ‘সাহেব’ বলে ঘুলিয়ে দেওয়া কেন?” সুদীপের সুরে গাঁইগুঁই।

বিজুদা বললেন, “এই ‘সাহেব’ বলতেই লালমুখো ইয়ুরোপিয়ান ভাবাটা আমাদের বাঙালিদের মাছভাতের মত মজ্জাগত হয়ে গেছে। আরে বাপু, ‘সাহিব’ একটা আরবি শব্দ, মানে ‘মহাশয়’; হিন্দিতে যেমন ‘জী’। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে কথা বলাটা শিখধর্মের এক অঙ্গ বলে তাঁরা বলেন গ্রন্থ-সাহিব, নিশান-সাহিব, হরমন্দির-সাহিব।

প্রায় তিনদশক পরে নান্দেড় গিয়েছিলাম, কাল ফিরেছি। ওখানকারই এই ধাগাটা। আর দেখ কী সমাপতন, এসেই তোদের এই ড্রিঙ্কিং বার্ডটা দেখতে পেলাম।”

“এতে কোইন্সিডেন্সের কী আছে, দাদা? সেখানে কী পেল্লায় পেল্লায় সর্দাররা সব কৃপাণের পরিবর্তে ড্রিঙ্কিং বার্ড নিয়ে ঘোরে?” সুদীপের প্রশ্নটা শুনতে গোবেচারা হলেও তার ভিতরের হুলটা সকলকেই খোঁচা দিয়ে গেলো। আমরা অভিজ্ঞ কানে বুঝলাম, এ’হল পাকা গাইয়ের সামনে বেসুরো গেয়ে তাকে উস্কে দেওয়া। বিজুদার ঠোঁটের কোণের মিস্‌চিভাস হাসিটি দেখে আমার পুত্রবরও আড়চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়েছে। আমরা সকলে বুঝলাম কালবৈশাখীর আগের হাওয়া পড়ে এলো---তৈরি হচ্ছে বিজুদার একটা নতুন গল্পের মুখড়া।

***

"বিই পরীক্ষা দিয়ে তখন, বুঝলি, সারা ভারত ঘুরে বেড়াচ্ছি।" শুরু হয়ে গেল বিজুদার আজকের গল্প, “এই গেলাম মায়াবতী আশ্রম তো পরের মাসেই সোমনাথ, এক বন্ধুর সঙ্গে তার মামার কাছে। ফিরে এসেই নাহারকাটিয়ায় মেজ্‌কার শালার তেল-কোয়ার্টারে। সেখান থেকে ফিরতেই বাবা হাতে একটা চিঠি ধরালেন, “সারা ভারত তো তচ্‌ করে বেড়াচ্ছো। চাকরি-বাকরির কোনো চেষ্টা আছে কী? এই নাও, সুধীর লিখেছে বালুজ থেকে। ওদের প্ল্যান্টে লোক নিচ্ছে। কালই রওয়ানা হয়ে পড়ো।”

“বালুচ? বালুচিস্তান? সে তো পাকিস্তানে পড়ে গিয়েছে। আমার তো এখনও পাসপোর্ট হয়নি...” আমি প্রমাদ গণি।

“ভূগোলে কতো পেতে? বালুচ্‌ নয়, বালুজ। মহারাষ্ট্রে অরঙ্গাবাদের কাছে। বাজাজদের কারখানা আছে সেখানে... ”‌ বাবা বললেন।

অরঙ্গাবাদ শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম। ওর কাছেই অজন্তা-ইলোরা, নয়? তা বেশ বেশ, চাকরি হোক্‌ না হোক্‌ কৈলাসমন্দিরটা তো দেখে আসা যাবে কম-সে-কম।

তখন কী আর জানি গো সুমি, যে অরঙ্গাবাদ থেকে অজন্তা-ইলোরার দিকে যাওয়াই হয়ে উঠবে না, বরং সম্পূর্ণ উলটো দিকে...

সুমিত্রা অর্গানিক টি-র কাপখানা বাড়িয়ে দিতে গল্পের সাময়িক ছেদ পড়ল।

***

সুধীরদা হল আমার বড়দার বয়সী, বিজুদা গল্পের খেই ধরে বলে চলেন, আমার নিজের দাদারই মত। বাবার বন্ধু অনিলকাকার বড় ছেলে সে। কয়েক বছর আমাদের বৌবাজারের বাড়িতে থেকে জর্জ-টেলিগ্রাফে মেকানিকাল ড্রাফটস্‌ম্যানশিপ পড়তো। তার হাতে কাঠের ‘টি’ নিয়ে ক্লাস করতে যাওয়াটা ছেলেবেলা আমাদের চোখে মস্ত একটা গেরম্ভারি বিষয় ছিল। সুধীরদার বিয়েও আমাদের বাড়ি থেকেই হয়। সুধীর-বৌদির হাতের রান্না অমৃতসমান---সেটা কয়েক বছর আগে একবার রেণুকুটে তার কর্মস্থলে বেড়াতে গিয়েই টের পেয়েছিলুম। তাই সুধীরদার কাছে যাবার কথাতেই আমি নেচে উঠলুম।

চাকরির উমেদারি করতে বালুজে এসেছি যদিও, তবু ভাই বটি তো। তাই আদর-আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি হল না। সুধীর-বৌদির হাতের পাঁঠার কালিয়ার স্বাদ ট্রেন থেকে নেমেই পেয়েছি দুপুরে। পরের দিন সকালে সুধীরদা বলল, “বিজু তুই এসেছিস, খুব ভালোই হয়েছে। কাল আমাকে একবার যেতে হবে নান্দেড়ের দিকে। কোম্পানি নতুন প্রজেক্টের জন্য জমি খুঁজছে। দেখতে যাবো। মাপজোপের কিছু কাজ আছে। আমি পোদগাওকারকে বলে রেখেছি, আমার ভাই আসছে, বি.ই. কলেজের ইঞ্জিনিয়র...”

রেজাল্ট তখনও বেরোয়নি, তাতেই ‘ইঞ্জিনিয়র’! বেশ। অরাঙ্গাবাদ থেকে পূবে যেতে হয় নান্দেড়, প্রায় পৌনে দুশো মাইল। কোম্পানির জিপে পরদিন সকালে দুগ্‌গা দুগ্‌গা করা গেল সুধীরদার লেজুড় হয়ে। ঘন্টা সাতেক লেগেছিল, যদিও ১৯৭০-এর দশকে তখনই ওদিকের রাস্তাটাস্তা চমৎকার।

না, নান্দেড়ের ‘হুজুর-সাহিব’ মন্দির সে-যাত্রা দেখা হয়নি যদিও, আমরা বেঁকে গিয়েছিলুম হোত্তালের দিকে, যেখানে রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন চালুক্য আমলের সিদ্ধেশ্বর মন্দির, তার পাশেই সাইট, যেখানে কোম্পানির ক্যাম্প পড়েছে।

সারাদিন জমি মাপজোপের কাজ চলে, তাতে সুধীরদা যুক্ত। আমার সারাদিন কোনো কাজ নেই, বনজঙ্গল-মন্দির দেখে বেড়াই। কী বিশাল এই সিদ্ধেশ্বর মন্দির, তা তার আজকের ভগ্নদশা দেখেই মালুম হয়, আর মন্দিরগাত্রে কী অপূর্ব কারুকার্য। সেকালে কোন্‌ প্রযুক্তির সাহায্যে এ’মন্দির গড়া হয়েছিল--ভেবে আশ্চর্যান্বিত হই।

দ্বিতীয়দিন এক অদ্ভুত টেলিপ্যাথেটিক যোগাযোগ ঘটে গেল! বালুজ প্ল্যান্ট থেকে অনেক কাগজপত্রের সঙ্গে ডাকে আমার নামে এক চিঠি এসেছে, বাবা কলকাতা থেকে রিডাইরেক্ট করে দিয়েছেন সুধীরদার ঠিকানায়। আমার ক্লাসমেট শিবশম্ভূ অনন্তমূর্তি তার কপিবুক ইংরেজি হাতের লেখায় লিখছে, “বিজন, পরীক্ষার পর থেকে খুব বেড়াচ্ছো যে! এরমধ্যে দু’বার কলকাতায় তোমার বাড়ি গিয়ে আন্টির কাছে শুনলাম আজ পাহাড়ে তো কাল ডিগবয়ে গেছ। চাকুরি কিছু পেলে নাকি? এই গ্রীষ্মে আমি গ্রামে যাবো...”

লাফিয়ে উঠলাম অনন্তর চিঠি পড়ে। কী অদ্ভুত যোগাযোগ দেখ। অনন্তমূর্তির কাছেই নান্দেড়-সাহিবের নাম প্রথম শুনি কলেজে পড়াকালে, যার পাশেই ওর আদি গ্রাম, যেটা অবশ্য পড়ে যায় অন্ধ্রপ্রদেশে, জিলা নিজামাবাদ। ওর বাবা রেলে চাকরি করেন খড়্গপুরে, সেই সূত্রে ওর শিবপুরে পড়তে আসা। আর দেখ, আজ আমি ওর গ্রামের অতি সন্নিকটে বসে হঠাৎ তার চিঠি পেলাম। একে টেলিপ্যাথি ছাড়া আর কী বলবে?

পরদিন সক্কালবেলায় অনন্তর বাড়ির দরোজা ঠক্‌ঠকালে সে কী প্রকার আশ্চর্য হবে ভাবতে ভাবতে সুধীরদার কাছে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে চল্লুম বন্ধুর বাড়ি। বাবু গুগ্‌গুল, তখন কী জানি যে এ’যোগাযোগ না ঘটলে জীবনের এক অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতাম আমি?!

আমরা শ্রোতৃদল এ’-আলাপ শুনে নড়েচড়ে বসি। এবার আসল কাহানি শুরু হবে যে!

|| ৩ ||

কটা ব্রেক নেওয়া যাক। চলে যাওয়া যাক্‌ তিনশ’ বছরের পুরনো ইতিহাসের পাতায়। বিজুদা বলে চলেন।

মারাঠাওয়াড়া। মধ্যদক্ষিণ ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। অষ্টাদশ শতাব্দীর আদ্যভাগে মোগল দব্‌দবা তখন নিভে গেছে, নাদির যদিও তখনও দিল্লি আক্রমণ করেনি, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ হতেও তখনও দশক-তিন দেরি আছে---এই সময়টা ভারতের ইতিহাসে মারাঠা আধিপত্যের যুগ। পুণের পেশাওয়া, নাগপুরের ভোঁসলে, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, বড়ৌদার গায়কোয়াড়রা তখন ভারত কাঁপাচ্ছে। ইয়ুরোপীয় শক্তিগুলো তখন ভারতে জমি খুঁজে পেতে চাইছেঃ পর্তুগিজ শক্তি নিভন্ত, ওলন্দাজ-ফরাসি-ইংরেজরা উঠে আসছে। এই সময়টায় প্রচুর সংখ্যক ইয়ুরোপিয় মার্সিনারি, স্থপতি, চিত্রকর, চিকিৎসক প্রভৃতি পেশার মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ভারতের এ’রাজ্য থেকে ও’রাজ্যে ঘুরে বেড়াতো।

বোম্বাই তখন এক চিলতে জেলে-গ্রাম। পর্তুগিজ কন্যে ক্যাথরিনকে বিয়ে করে বৃটিশরাজ দ্বিতীয় চার্লস সদ্য তা যৌতুক পেয়েছেন ও ছোট্ট এক বৃটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছে সেখানে। পশ্চিমভারতের প্রধান বন্দর তখনও সুরত, অর্থাৎ সুরাট, যা এককালে ছিলো মোগল কাস্টমসের প্রধান আখড়া। সুরাটে তো তার দু’শ বছর আগে থেকেই পালতোলা ইয়ুরোপিয় বাণিজ্যপোত আসছে, আর তাতে চড়ে আসছে ঐ সকল পেশার নানা মানুষজনও। আমাদের আজকের গল্পের পর্দা উঠছে এই সুরাট শহরেই, কালটা অষ্টাদশ শতকের চতুর্থ দশক।

*

নাম তাঁর শাহ্‌বাজ খান। পদাধিকারে সুরাটের কাস্টমস-প্রধান। দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজ-আমলা---রাজকোষের একটা বড় আদায় দেয় তাঁর বিভাগ, তাই।

তাঁর গৃহে সেই জুম্মাবারে কোতোয়াল নিয়ে এসেছে রোগাসোগা ফ্যাকাশে গাত্রবর্ণের এক ফিরঙ্গীকে, লালচুল, নীল নয়নমণি। কী যেন একটা নাম বলল, গট...দিয়ে খটোমটো? তা, নামে কী এসে যায়? কাজটা কী এর? কেন এসেছে খানসাহেবের কাছে?

পেয়াদা জানায়, “হুজৌর, এ’ ফিরিঙ্গী চমৎকার কল বানাতে পারে। জলতোলা থেকে গমপেষাই---সাতটা জওয়ানের কাজ এর একটা কল করে দিতে পারবে এক দিনে। এখন হুজৌর যদি একটা সুযোগ করে দেন?”

হ্যাঁ, ঠিক লোকের কাছে এনেছে বটে পেয়াদা। শাহ্‌বাজ খানের শখ ছিল ইয়ুরোপীয় কলকব্জা ও ইয়ুরোপীয় সারমেয়র উপর। তাঁর গৃহে ইতোমধ্যে স্থান পেয়েছে একটা কম্পাস ও দূরবীন এবং এক মস্ত নেপলিজ কুত্তা।

“বটে। তুমি তো গুণের মানুষ দেখছি হে। তা, তুমি কী কাজ করে দিতে পারবে আমার ঘরে?” শুধোন রাজ-আমলা।

“আজ্ঞে, এই যেমন ধরুন আপনার এই ইঁদারা থেকে জল তোলা। এই কাঠের বালতিগুলো ঘুরে ঘুরে নামবে আর জল ভরে ভরে তুলে আনবে আমার যন্ত্র।” ভাঙা-ভাঙা হিন্দোস্তানীতে জানালো সে জর্মান সাহেব।

“সে নাহয় বুঝলুম। কিন্তু বাপু, এ’তো আমার শহরের ডেরা। গ্রাম তো নয় যে প্রচুর জায়গা আছে, তিনটে বলদ সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরে জল তোলার কল চালিয়ে যাবে।”

“না, হুজুর। কোনো বলদ-টলদের জরুরত নেই। সেকাজ তো আমার যন্ত্রই করবে।” বললো সাহেব।

“কিন্তু তোমার যন্ত্রটিকে ঘোরাবে কে? উট-বলদ না হোক্‌, সারাদিনের জন্য কি চারটে জোয়ান খিদ্‌মতগার রেখে দিতে হবে আমায়?”

“তাও নয়, হুজুর। আমার এ’যন্ত্র আপনা-আপনি চলবে, নিজের শক্তিতে!”

“বল কী হে? কল চলবে আপনা-আপনি? নিজের শক্তিতে?” খানসাহেব বিস্মিত! “বেশ, তাহলে শুরু কর তোমার কাজ। দেখি তোমার কল কেমন নিজে নিজেই চলে। কী ইনাম আশা কর?”

ফিরিঙ্গির সকুর্নিশ নিবেদন, “হুজুরের নেকনজর!”

***

কাঠের কলখানি বানাতে সেই জার্মান সাহেবের মাসখানেকের মত সময় লেগেছিল। যন্ত্রের আসল শক্তির উৎসটি দেড়-মানুষ উঁচু দু’-হাত বাই এক হাত একটি অংশে, সেটি মোটা চাদরে ঢাকা। সেটুকু গোপনীয়, সাহেবের ট্রেড সিক্রেট। তার ভেতর থেকে অনেকগুলো কাঠের ঢ্যালার অবিরত ওঠাপড়ার শব্দ এসেই চলেছে। সেটাই চালাচ্ছে আটহাত উঁচু কাষ্ঠচক্রটিকে, বেশ কয়েকটি লম্বা লম্বা হাতলের সাহায্যে।

নির্ধারিত দিনে খানসাহেব এলেন চেলাচামুণ্ডো নিয়ে ফরিঙ্গি-কলের উদ্ঘাটনে। সে জর্মান তো দিনেই পীয়ে বসে থাকে, চক্ষু তার লাল, লালচুল উস্কোখুস্কো, হুজুরকে আসতে দেখে মুখে রেশমি রুমাল চাপা দিলে, কারণ শাহ্‌বাজ পাঁচ-ওয়ক্তের নমাযি, দারুপানের ঘোর বিরোধী। কিন্তু সে-ই যখন তার যন্ত্রের বাহাদুরি দেখাতে হাত লাগালো, যেন এক অন্য মানুষ! হিন্দোস্তানি ভাষা তার ভালো রপ্ত নেই, তাতে পরোয়াও নেই, চেলা পেয়াদা-দোভাষীর সাহায্যে ছুটলো তুখোড় ডিমন্সট্রেশনঃ “হুজৌর, এই দেখুন, সব চুপচাপ স্তব্ধ রয়েছে। রয়েছে তো? এই দেখুন আমি আস্তে করে কাঠের এই বড় চাকাটি ঘুরিয়ে ছেড়ে দিলাম। এটি এখন দো-চার পল ধীরলয়ে ঘুরবে। ঘুরছে তো? বেশ। দেখুন, পাঁচ-সাত পল থেকে এ’ যন্ত্র তার পুরো গতি পেয়ে গেল---মিনিটে ছাব্বিশটি ঘুর্ণন! হুজৌর, এরই সঙ্গে লাগানো রয়েছে জল তোলার বালতি চারটে। ওই দেখুন, কী গতিতে তারা গভীর ঐ ইঁদারায় নেমে যাচ্ছে ও পূর্ণপাত্র জল তুলে আনছে। এ’ জল এখন চাষের কাজে লাগান বা... ”

সমাগত অভ্যাগতগণের চোখে বিস্ময়ের অবধি নেই! না উট-বলদ, না জওয়ান মজদুরের পেশি। ঘুরছে কী করে মস্ত ঐ চক্র? থামবেই বা এ’ কী করে?

“কেন? এই যে! থামিয়ে দিলাম!” আলগা হাত রাখে ফরিঙ্গি ওই কাষ্ঠচক্রে আর ওমনি ঘ্যা---স্‌স্‌স্‌ করে থেমে পড়ে সে যন্ত্র! ভারি মজা তো!

আবার চলবে তো?

“এই যে, হুজৌরের আদেশে সে ফের চালু!” চক্রটি একবার হেঁইয়ো বলে ঘুরিয়ে ছেড়ে দিতেই ভেতর থেকে সেই কাষ্ঠখণ্ডের খটর খটর ওঠাপড়ার শব্দ ফের চালু ও বনবন করে ঘুরতে লাগল সে আজব কল এবং তুলতে লাগল জল।

“তা হ্যাঁ হে ফরিঙ্গি, তোমার এই যন্তোর কি কেবল জলই তুলতে পারে, না...?” আরেক রঈস আমলার জিজ্ঞাসা।

“এ’ হলো হজৌরের চব্বিশঘণ্টার খিদমতগার। জল তোলা, গম-যব-বাজরা পেষাই থেকে ইমারৎ বানাতে ভারি পাত্থর উপরে তোলা পর্যন্ত যে কোনো কাজই...” জর্মনের নিবেদন।

মস্ত জয়জয়কার পড়ে গেল সেই জর্মান পাগলাসাহেবের---যে কখনো রেগে উঠে তেড়ে যায় আবার কখনো মহান সাধকের মত ঘন্টার পর ঘন্টা তার যন্ত্র নিয়ে পড়ে থাকে। শাহবাজ খাঁ তাকে দশ দশটি বাদ্‌শাহি আশরফি বখশিস দিলেন, যন্ত্র বানানোর খরচ ছাড়াও। আর সিফারিশ-পত্র লিখে দেন মহারাজ সওয়াই জয়সিংহের নামে---অষ্টাদশ শতকের ভারতে যিনি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ সাধক-নরেশ। মহারাজ তখন অম্বরের কাছে জয়নগরে নতুন রাজধানী বানানোর কাজে হাত দিয়েছেন, এমন যান্ত্রিকের জরুরত তাঁর পড়তে পারে।

|| ৪ ||

গ্রামের নাম কুদ্‌রিরা, জিলা নিজামাবাদ, অন্ধ্রপ্রদেশ। হেত্তালের কাছে বাজাজ কোম্পানির সাইট থেকে জিপে ঘন্টাখানেক লাগলো পৌঁছতে। সেই কাকভোরে আমাকে বাড়ির দরোজায় দাঁড়াতে দেখে অনন্ত কী পরিমাণ অবাক হবে ভাবতে ভাবতে সত্যিই দেখি সে হাই আটকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো, ‘বিজু, তু....ই!’

‘কেমন সারপ্রাইজখানা দিলাম বল দেখি?’

তারপর আলিঙ্গন থেকে তার খুড়োদাদুদের প্রণাম-ট্রণাম করা-টরা চলল। অনন্তের বাবা-মা-ভাইবোনেরা থাকে খড়্গপুরে, ও এখন একাই এসেছে আদিবাড়িতে। গ্রামের মানুষের আন্তরিকতা, বুঝলি জলধর, বিজুদা আমার দিকে ফিরে বলেন, বাঙলা হোক অন্ধ্র-মারাঠাওয়াড়া হোক্‌, সর্বত্রই এক। গ্রামের তামাম কচিকাঁচার দল ঘিরে এলো। তবে, ভাষা একটা সমস্যা। ওনারা কেউ হিন্দি-ইংরিজি বোঝেন না। অনন্তের জন্মকর্ম তো খড়্গপুরে। সে তো আধা-বাঙালিই হয়ে গেছে।

মস্ত ছড়ানো বাড়ি বন্ধুবর শ্রীমান শিবশম্ভূ অনন্তমূর্তিদের। প্রধান বসতবাড়িটি দোতলা পাকা কোঠাবাড়ি, চারপাশে ছড়ানো ছিটোনো লাল টালি বা খড়ের ছাউনি দেওয়া চারচালাঘর গোটা পাঁচ-ছয়, অনেকখানি চত্বর জুড়ে। মাঝে এক শ্বেত পাথরের শিবমন্দির। মস্ত গোয়ালঘরে গোটা বিশেক গরু। অনন্ত দেখালো, ওদের রান্নাঘরের জ্বালানি থেকে আরম্ভ করে রাতে ঘরের আলো জ্বলে মিথেন গ্যাস থেকে। বাড়ির পিছনে বিরাট গোবর গ্যাসের প্ল্যান্ট রয়েছে। এমনটা আমি আগে বইয়ে পড়েছিলাম বটে, কিন্তু বাস্তবে সেই প্রথম চোখে দেখলাম।

সারাদিন ধরে আমার ‘ভারতভ্রমণের’ গল্প হতে লাগল, সোমনাথে নৈনিতালে কী কী সব দেখে এলাম। আগামি দিনের চাকুরির বাজারের কথাও হল। অনন্তর এক দিদি-জামাইবাবু মালেশিয়ায় থাকেন। ও’ সেখানে যাবার চেষ্টা করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই রকম গল্প করতে করতে সারাদিন কেটে সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। আমাদের কথার মাঝখানে এক বালিকা এসে ঘরের দরোজার বাইরে থেকে অবোধ্য ভাষায় অনন্তকে কী যেন বলে গেল, আর সে অমনি ‘ওঃ, এই-য্‌যাঃ---ভুলে গেছি’-গোছের জিভ বের করে দৌড়ে দুড়্‌দুড়্‌ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। আমি একা একা দোতলার বারান্দা থেকে দূরের সবুজ গাছপালা, গ্রামের পথ দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ খুব নিকট থেকে খটর খটর করে একটা মেশিন চলার শব্দ আসতে শুরু করলো, যেন সুইচ টিপে কেউ কোনো মেশিন চালিয়ে দিলো। কিন্তু শব্দটা মোটরের মত ধাতব ঘটাং ঘটাং নয়, কেঠো। যেন কোনো মস্ত এক কাঠের কৌটোর ভেতরে দশটা কাঠের কিউব পুরে কেউ সেটাকে ওলট-পালট করে চলেছে। কী যন্তোর রে বাবা? খড়কাটার কল? তা, সেটা চালাতে অনন্ত অমন দৌড়ে চলে গেল কেন, যেন ঠাকুরপুজোর দেরি হয়ে গেছে? শব্দটা আসছে অনন্তদের প্রাঙ্গণের মাঝবরাবর শ্বেতপাথরের শিবমন্দিরটি থেকে। সকালে দেখেছি, তার দরোজা-জানালা সব ভেজানো। এখন দেখলুম অনন্ত সে মন্দিরের দরোজা ফাঁক করে বেরিয়ে এসে ফের বন্ধ করে দিলো তা।

রাতের খাওয়া সেরে সদ্য-শেখা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে শুধোলুম অনন্তকে এ’বিষয়ে। কিন্তু সে যেন ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলল, “তুই এসেছিস ভালোই হয়েছে, বিজু। হায়দরাবাদ থেকে কাল শ্রীনি-র ও আসবার কথা। ও-ও আমার সঙ্গে মালেশিয়া যেতে চায়। সে-বিষয়েই কথাবার্তা হবে।”

‘কোন্‌ শ্রীনিবাস?’ আমি শুধোই, ‘সেই যে আমাদের থেকে দু’বছরের সিনিয়র, ড্রপ দিয়ে দিয়ে...’ পুছি আমি।

‘হ্যাঁ, সে ছাড়া আর কে?’ অনন্ত বললো।

‘সে তো মহা ধড়িবাজ ছেলে রে, অনন্ত। তুই তাকে নিয়ে মালেশিয়া যাবি? দেখিস বাপু।’

‘এই দেখ্‌ না, এই চিঠি লিখেছে...’ অনন্ত উঠে দেরাজ থেকে এক নীল ইনল্যাণ্ড লেটার টেনে আনলো, ‘সঙ্গে আবার কে এক পাদ্রি মাস্টারমশায়ও আসবেন, লিখেছে।’

আমি একটু ব্যাজার হলুম।

***

পরের দিন থেকে এ’গল্পের আসল কোর-এ’ আসা গেল, বুঝলি... বিজুদা বলে চলেন।

পরদিন সকালে, এজ পার এপয়েন্টমেন্ট, শ্রীমান কোঠাপল্লি রামাদাসু শ্রীনিবাসন মশাই এসে পৌঁছলেন হায়দ্রাবাদ থেকে, সঙ্গে তার মাঝবয়সী এক লালচুল সাহেব, কাঁধে ঝোলাব্যাগ, পায়ে স্যান্ডেল।

শ্রীনিবাসন আমাকে দেখে অবাকের চেয়ে অখুশী যেন বেশি হলো, ‘ক্যা রে বিজন, তু কহাঁ সে আ গয়া...?’ আমিও খেজুরে করলুম কিছুটা, পরিচয় হলো সঙ্গী মিস্টার কার্ল হাইনরাইখ বেসলার সাহেবের সঙ্গে, তিনি হায়দ্রাবাদের সন্নিকটে এক মিশনারি স্কুলে নাকি ফিজিক্স ও ম্যাথস্‌ পড়ান। অচিরেই যদিও ওনার সঙ্গে ভাব জমে যেতে দেরি হলো না। উনি দক্ষিণ ভারতের নানান জায়গার চার্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও আছেন, অজস্র অভিজ্ঞতা ঝুলিতে।

‘তো স্যর, আপনি কবে প্রথম ভারতবর্ষে এসেছিলেন?’ বিকেলে মাঠ-নদীর ধার থেকে হেঁটে-বেড়িয়ে ফিরতে ফিরতে অনন্তমূর্তি এমনিই আলগা প্রশ্নটা করলো বেসলার সাহেবকে। ‘ভারতবর্ষে... এসেছি... আমি?’ কাষ্ঠ হেসে বলেন সে সাহেব, ‘মিঃ মূর্তি, আমি ভারতীয়ই। আমার জন্ম ভারতেই, বিজাপুরে। গত প্রায় আড়াইশ’ বছর আমাদের বংশ ভারতেই আছে। আমার বংশের আদিপুরুষ দ লেট গটফ্রিড আর্নস্ট ইলিয়াস বেসলার ভারতে এসেছিলেন সেভেন্টিন থার্টিজে...’

‘তিনিও কি মিশনারি ছিলেন?’ আমার জিজ্ঞাসা।

‘না, তিনি ছিলেন একজন প্রযুক্তিবিদ...’

সন্ধে হয়ে এসেছে। হঠাৎ অনন্ত ‘এই য্‌যাঃ, ভুলে গেছি’ বলে প্রায় দৌড়তে শুরু করলো, ‘তোমরা এসো,’ বলে।

অনন্তের এই আচমকা গল্প ছেড়ে দৌড় মারায় ওঁরা অবাক হয়েছেন, আমি হই নি। কারণ আমার মনে পড়ে গেল গত সন্ধেতেও এমন...

*

দশ মিনিট পরে আমরা যখন অনন্তদের বাড়িতে ঢুকছি, সন্ধের অন্ধকার নেমে এসেছে, গো-গ্যাসের প্ল্যান্টের আলো জ্বলছে ঘরে ঘরে। ও’ আমাদের জন্যে দরোজার সামনেই অপেক্ষা করছিলো।

‘কী হলো, অনন্ত, তুমি অমন ছুট্টে বাড়ি ফিরে এলে কেন, আমাদের ফেলে?’ শ্রীনি শুধোয়।

‘ও কিছু না। একটা কাজ আমি ভুলে গিয়েছিলাম। হয়ে গেছে সেটা। চলো, ছাদে বসে গল্প করি।’

পাদ্রি বেসলার সাহেব এ’সময়ে হঠাৎ মন্দ্রগম্ভীর স্বরে শুধোন, ‘ওটা কিসের শব্দ আসছে, মিঃ মূর্তি?’ অনন্তদের গৃহের মাঝখানে সেই মন্দির থেকে কালকের মত খটর খটর শব্দটি আসছে বেশ জোরে জোরে।

বেসলার যেন স্থানু পাথর হয়ে গেছে। তাকালো একবার শ্রীনির দিকে।

‘ওটা বাদ দিন স্যার। ওটা কিছু না। ওটা একটা কাঠের কল আছে, ধান-টান ভানা হয়,’ অনন্তের গলা কিন্তু খুব কনভিন্সিং নয়।

‘মিঃ মূর্তি, একবার ঐ কাঠের মেশিনটি দেখা যেতে পারে?’ সাহেবের গলায় কিন্তু অনুরোধ নেই, কঠিন সে কণ্ঠস্বর।

‘সে হবে এখন। এখন চলুন আমরা ছাদে বসে গল্প করি।’ বুঝলুম, অনন্ত এড়িয়ে যেতে চাইছে বিষয়টা।

‘তার মানে প্রমিস করলেন, মিঃ অনন্তমূর্তি? পরে আমাদের একবার দেখাবেন সেই কাঠের মেশিন।’

‘চলুন না আমরা ছাদে গিয়ে বসি। ওখানেই আমাদের জলখাবার দেওয়া হয়েছে,’ অনন্ত এবার যেন একটু বিরক্ত হয়েছে। স্বাভাবিক। অতিথির উচিত তার অধিকারের সীমা লঙ্ঘন না করা।

*

বিকেলের জলপানে ছিল এক নতুনত্বঃ নামটা ‘সর্বপিণ্ডি’ হলে কী হবে, আদা-রসুন দিয়ে ভাজা চাল-ডালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো মস্ত বড় বড় বড়া---কী সুস্বাদু খেতে রে! সঙ্গে ছিল সুইট ডিশ ‘আরিসেলু': চালের গুঁড়ো গুড় আর ঘী দিয়ে বানানো নাড়ু। যা খেতে না! ভারতের প্রত্যেক জায়গারই নিজ নিজ খাদ্যাখাদ্যের বিশেষত্ব আছে যেটা সেই সেই স্থানের সঙ্গে ওতঃপ্রোত জড়িত। সেটা আস্বাদন না করলে সেখানকার ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আরিসেলুর প্লেটটা রাখতে রাখতে শুধোয় অনন্ত, ‘শ্রীনি, তুমি পাসপোর্টের আবেদন করে দিয়েছো তো?’

‘তো স্যর। অনুমান, আপনার অনুসন্ধানের শেষ চ্যাপ্টারে এসে পড়েছেন আপনি,’ অনন্তের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সেই পাদ্রিকে বললো শ্রীনিবাসন।

আমরা কিছু বুঝলুম না। অনন্ত আর আমি মুখ তাকাতাকি করতে লাগলুম।

চাঁদের আলোয় বিস্তীর্ণ কুটঙ্কে আমরা চারিটি প্রাণী মস্ত এক মাদুর পেতে বসে আছি। গরমকাল, যদিও চারিভিতের অজস্র গাছপালায় হালকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। আলো-আঁধারি। হঠাৎ হঠাৎ কোনো রাতজাগা পাখি ডেকে উঠছে। ছাদের কোণে এক গ্যাসবাতি জ্বালিয়ে রাখা আছে।

‘কী বললে, শ্রীনি, কিছু বুঝলাম না। তুমি যে মালেশিয়া যাবার কথা বলছিলে, তা পাসপোর্ট....’ অনন্ত।

‘আপনারা কি কেউ এলিক্সিরের কথা শুনেছেন?’ গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করলেন সেই অদ্ভুত পাদ্রি, যিনি নাকি ফিজিক্সের শিক্ষক।

এ’ আবার কী বেয়াড়া প্রশ্ন? হঠাৎ এখানে এর প্রাসঙ্গিকতাই বা কী? ভাবি।

‘অমৃত?’ বললাম আমি।

‘সেটা তো মিথলজিতে। যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষ এমন এক পানীয়ের সন্ধান ও তার জন্যে গবেষণা করে চলেছে যা তাকে অনন্ত যৌবন দেবে, মৃত্যু থেকে দূরে রাখবে, বহু দূরে।’

‘যযাতি’, বললাম।

হাসলেন সাহেব। যযাতির গল্প জানবেন নিশ্চয়ই উনি, আজন্ম ভারতে আছেন যখন।

‘আচ্ছা বিজনবাবু। এলকেমি সম্বন্ধে আপনার মতামতটা কী?’ সাহেবের এবারের প্রশ্নটা আমাকে।

‘গাঁজাখুরি গল্প। মানুষের অশেষ স্বর্ণসন্ধান... লোভ’, বলি।

‘স্বয়ং স্যর আইজ্যাক নিউটনও এলকেমির ওপর গবেষণা করতেন, অগোচরে, সেটা ভুলে যাবেন না মিঃ বিজন সরকার, একে গাঁজাখুরি আখ্যা দেবার আগে,’ সাহেব বললেন।

চুপ করে থাকি।

‘আর এটাও কি জানেন যে স্যার আইজ্যাক এমন আরেক বৈজ্ঞানিক সমস্যাকে সমাধানের-অযোগ্য বলে দেগে দিয়ে গিয়েছিলেন যার নিদান তাঁর মৃত্যুর তিন দশকের মধ্যে হয়েছিল, করেছিলেন ইয়র্কশায়ারের এক অশিক্ষিত ছুতোর মিস্ত্রি? হ্যাঁ, সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই।’

‘আপনি কি দ্রাঘিমা-সমস্যার কথা বলছেন?’ বললাম।

‘ঠিক তাই। আপনি জানেন দেখছি।’

‘আমি আজ আপনাদের এমন আরেক ছুতোর মিস্ত্রির কথা বলবো, ক্রোনোমিটারের আবিষ্কারক জন হ্যারিসনের মত যাঁর কাজ কিন্তু স্বীকৃতি পায়নি। তাঁকে পাগল ও চার্চবিরোধী বদনামে দেশছাড়া হতে হয়। তাঁর আবিষ্কার সফল হলে পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হতো।’ জ্বলজ্বল করে উঠলো সেই প্রৌঢ় পাদ্রির চোখ, দেখা গেল আলো-আঁধারিতেও।

***

‘কী রূপা-মা? এ’ গল্পটা একটু লম্বা, নয়? বোরিং লাগছে?’ জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতে বাড়াতে শুধোন বিজুদা। রূপার দু’-দিকে জোরে জোরে ঘাড় ঘোরানো উড়িয়ে সীমা বললো,

‘বিজুদা, আপ কহানি কে বীচ রূক কেঁও যাতে হেঁ?’ অধৈর্য সে।

ঘটনাচক্রে নীতিনের বাবা আজ আমাদের এই আসরে উপস্থিত। উনি এক নামী বিজ্ঞানী ছিলেন। এখন অতি বৃদ্ধ, শুধোলেন, ‘আপ যোহান অরফিরিয়াস কে বারে মেঁ তো নহী বোলনে যা রহে হেঁ, সরকার-সাব? বাট ওয়জ হি নট এন ইম্পস্টার, আ ফ্রড?’

‘স্যর, আপনি অভ্রান্ত, আজকের গল্পের নায়ক উনিইঃ জর্মান প্রযুক্তিবিদ্‌ যোহান আর্নস্ট ইলিয়াস বেসলার, ‘অরফিরিয়াস’ উপনামেই যিনি ইতিহাসে সমধিক প্রসিদ্ধ। তবে ভণ্ড-অভণ্ড বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আমি যে যে রকম শুনেছিলাম সেদিন এ’ কাহিনি, তেমনই আজ বলবার চেষ্টা করবো আপনাদের সামনে।

‘...সেই অন্ধ্রপ্রদেশের গ্রামে সেই সন্ধেবেলায় এক অদ্ভুত গল্প শুনলাম আমরা। তার পরবর্তী ঘটনাবলীও কম লোমহর্ষক নয়।’ বলে চলেন বিজুদা।

‘এবার সেই পাদ্রি-সাহেবের বলা গল্পটা হুবহু বলি, শোন্‌:

‘জর্মানি তখন ‘হোলি রোমান এম্পায়ার’-এর অন্তর্ভুক্ত, ছোট ছোট বহু রাজন্যবর্গ রয়েছে তার মধ্যে। তেমনই এক নগণ্য গ্রামের কৃষক পরিবারে এক শিশু জন্ম নেয় ১৬৮০ খৃ নাগাদ, পুঁথিগত পড়াশুনোর বাইরে যার অদম্য আগ্রহ ছিল নানান যন্ত্রপাতি বানানোর। ১৭১২ নাগাদ ইনি এক মস্ত কাঠের চাকার প্রদর্শনী করেন যা বাইরে থেকে কোনোরূপ শক্তির কন্টিনিউয়াস প্রয়োগ ছাড়াই ঘুরবে, থামবে না কদাচ। গম পেষাই থেকে জল তোলার মত হরেক কাজ করা যাবে এ’যন্ত্র দ্বারা! এখন, এ’হেন যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের আইনের বাইরে পড়ে যায়, চার্চও মানতে চায়নি একে। তাই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ জোটে অরফিরিয়াসের কপালে, ও বিতাড়ন। এক রাজ্য থেকে অন্যত্র হন্যে হয়ে বেড়াতে থাকেন সেই ছুতোর মিস্ত্রি যতক্ষণ না মহাবিজ্ঞানী লিবনিৎসের নজরে পড়ে যান লিপজিগ শহরের কাছে তাঁর এমন এক প্রদর্শনীতে।

‘লিবনিৎস, মানে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে যাঁর নাম নিউটনের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করা হয়?’ গল্পের মাঝে ঠোক্‌ পাড়াটা সুমির পক্ষে একটু আনইউজুয়াল। না রেগে ঘাড় নাড়েন বিজুদা।

'...লিবনিৎজ এমনকি রুশসম্রাট পিটার-দ-গ্রেটের কাছেও এই ছুতোর মিস্ত্রি অরফিরিয়াসের যন্ত্রের প্রশংসা করে লেখেন। শোনা যায় সম্রাট ভালো দামে এ’যন্ত্র কিনতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু সে যে বহু দূরের পথ। পাড়িও জমালেন অরফিরিয়াস, কিন্তু পথে এক দেশীয় রাজ্য হেস-কাসেলের রাজা ল্যান্ডগ্রেভ কার্লের নেকনজরে পড়ে গেলেন তিনি, যাঁর কাছে এই প্রথম সম্মান ও স্বীকৃতি জুটলো অরফিরিয়াসের। কার্লের তত্ত্বাবধানে তাঁর দুর্গে বারো ফিট ব্যাসের এক মস্ত ‘অন্তহীন কল’ বানালেন অরফিরিয়াস, যেটা পরীক্ষা করতে আমন্ত্রণ পেলেন নিউটনের বন্ধু প্রখ্যাত ডাচ গণিতজ্ঞ অধ্যাপক উইলেম‘স গ্রেভসেণ্ড। ১২ই নভেম্বার ১৭১৭ খৃ. তারিখে এ’হেন তাবড় তাবড় বৈজ্ঞানিক ও রাজন্যবর্গের সম্মুখে সেই ‘অনন্তকল’ হালকা হাতের ঠেলায় চালিয়ে দিয়ে ঘর সিল করে দিলেন অরফিরিয়াস, গেটে পড়লো রাজার মোহর, বসলো সশস্ত্র রক্ষী। প্রায় দু’মাস পরে চৌঠা জানুয়ারি ১৭১৮ খৃ. সেই কক্ষের দ্বার ফের উন্মুক্ত করা হলো সর্বসমক্ষে, দেখা গেল কল সেই সমান গতিতে ঘুরে চলেছে... ঘণ্টায় ছাব্বিশ পাক!!!

‘"এর রহস্য কী? চক্রটি দু'মাস একাদিক্রমে ঘুরে চলবার শক্তি পেলো কোত্থেকে?" গ্রেভসেণ্ডের অবাক প্রশ্ন।

‘"কোনো রহস্য নেই হুজুর। এ’ অতি সরল বিজ্ঞান। আমি মার্ধাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়েছি আটটা ওভার-ব্যালান্সড কাষ্ঠ-কিউবের সাহায্যে...যা ঐ ক্যানভাসের মোড়া সিলিন্ডারটির মধ্যে আছে।"

‘"সে কি অতি জটিল কোনো যন্ত্র?"

‘"এক্কেবারেই না। শুধোন না রাজামশাইকে। উনি তো দেখেছেন"

'ঘাড় নাড়েন রাজা কার্ল। হ্যাঁ, একমাত্র তাঁকেই বিশ্বাস করে দেখিয়েছিলেন অরফিরিয়াস তাঁর সরল অথচ অশেষ প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন ‘অনন্তকল’—বিশ্বের ইতিহাসকে যা বদলে দিতে পারতো।

‘"তাহলে এখন আমাদের তা দেখাচ্ছো না কেন," বিজ্ঞানীপ্রবরের অধৈর্য প্রশ্ন।

‘"হুজুর, বান্দার সামান্য ইনামের প্রয়োজন"

‘"কত?"

‘"বিশ হাজার ইংলিশ সভরেন!"

‘"বিশ হাজার?" অধ্যাপক গ্রেভসেণ্ড প্রায় উলটে পড়ে যান শুনে।

‘"কেন হুজুর। মাঝদরিয়ায় দ্রাঘিমার সঠিক নির্ণয়ের জন্যে বৃটেনের পার্লামেন্ট তো ঠিক এই পরিমাণ অর্থই ইনাম রেখেছেন, শুনেছি। আমার এ’ যন্ত্রের কার্যকুশলতা যে তার চেয়েও বহুগুণ বেশি। সমগ্র পৃথিবীর শক্তির প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি মেটাবে এ', চিরকালের জন্য!" অরফিরিয়াসের নিবেদন।

'বিজ্ঞানী গ্রেভসেণ্ড এ’ যন্ত্রের তারিফ করে নিউটনকে চিঠি লিখলেন, লিখলেন রুশসম্রাট পিটার-দ-গ্রেটকেও....

‘"তাহলে সে অনন্তকল সফল হলো না কেন? কোথায় হারিয়ে গেল তা?" সেই সন্ধ্যায় অনন্তমূর্তির বাড়ির ছাদে পাদ্রিসাহেবের কাছে এ’ গল্প শুনে আমি অধৈর্য প্রশ্ন করে ফেলেছিলাম,' বললেন বিজুদা।

'হেসে জবাব দেন পাদ্রি, "বাকিটুকু শুনুনই না বিজনবাবু..."

'বলতে থাকেন সাহেব, “...বছরের পর বছর উপেক্ষা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ শুনতে শুনতে অতি হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন অরফিরিয়াস, অল্পেতেই রেগে উঠতেন। লোকে বলে বেশ পাগলামির লক্ষণও নাকি দেখা দিয়েছিল তাঁর মধ্যে; অবশ্য কোন্‌ প্রতিভাধরই বা একটু-আধটু পাগলাটে না হন? তাঁর কাজকে স্বীকৃতি দিতে বিজ্ঞানী গ্রেভসেণ্ডের এই অযথা দেরি করায় অধৈর্য হয়ে পড়েন অরফিরিয়াস। ঘটনা তুঙ্গে উঠলো একরাত্রে যখন জানতে পারলেন দু’জন লোক চুপিচুপি সেই হলঘরের পেছনে ঢুকেছে যেখানে তাঁর ‘অনন্তকলের’ হৃৎপিণ্ডখানি রাখা আছে ক্যানভাসে মোড়া। তাঁকে তাঁর রয়ালটির টাকা না দিয়েই চুরি করে জেনে নেবার প্রচেষ্টা তাঁর ট্রেড সিক্রেট? এটা বিজ্ঞানীর মস্ত এক বেইমানি বলে মনে করলেন অরফিরিয়াস, ও প্রচণ্ড রাগে উন্মাদ হয়ে প্রকাণ্ড এক কুঠার হাতে সে ঘরে ঢুকে সমস্ত ভেঙেচুরে লণ্ডভণ্ড করে দিলেন সেই ‘পাগল’ বিজ্ঞানী। শেষ করে দিলেন নিজের কীর্তিকেই। রাজা কার্ল স্বয়ং ছুটে এসেও তাঁর সামনে দাঁড়াতে সাহস পেলেন না সেই অভিশপ্ত রাতে, রোখা গেলো না প্রতিভাধর ‘মিস্তিরি’ অরফিরিয়াসকে সে ‘অনন্তকল’ ভেঙে ফেলা থেকে, বিশ্বের ইতিহাস নতুন করে লেখা আর হলো না।'

*

'পাদ্রির গল্প শুনে সে রাত্রে আমরা চুপ,' বুঝলে অয়নবাবু? 'মুখে কথা নেই কারো। উদাস হয়ে চেয়ে আছি তারা ভরা আকাশের দিকে।'

‘না, এ’গল্পের শেষ এখানেই হয়নি, সাহেব ফের বলতে থাকেন, "অরফিরিয়াসের একমাত্র ভাই, প্রাণাধিক প্রিয় গটফ্রিড, যিনি ছিলেন চিন্তায়-ভাবনায়-কাজে দাদার দক্ষিণহস্ত, তিনি প্রস্তাব দিলেন নিউ-ওয়ার্ল্ডে চলে যাবার, মানে আমেরিকায়, সেখানে গিয়ে ফের নতুন উদ্যোগে কাজ শুরু করার। কিন্তু আমেরিকা যাবার উচ্চ জাহাজভাড়া জোগাড় হলো না, না তার বদলে দাসখৎ লিখে দিয়ে তুলোর ক্ষেতে কাজ করার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য। তখন অরফিরিয়াস ভাইকে ভারতে যেতে পরামর্শ দেন... সেখানে বহু বড়ো বড়ো রাজ্য বহু বড়ো বড়ো রাজা। "তুমি ভারতে চলে যাও ভাই, দেখো সেখানে চেষ্টা করে। এ’ যন্ত্র মান্যতা পেলে দাসব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। বিশটা দাসের কাজ একা করবে আমার এ’ যন্ত্র। মঙ্গল হবে পৃথিবীর। আমি ইউরোপেই থেকে যাই। নতুন করে চেষ্টা চালাই রুশদেশে যাবার জন্যে"---চোখের জলে ভাইকে বিদায় দিতে দিতে বললেন অরফিরিয়াস।

'হের্‌ গটফ্রিড আর্নস্ট ইলিয়াস বেসলার সুরাট-বন্দরে এসে পৌঁছন ১৭৩৪-এর জুন মাসে এক সস্তা ওলন্দাজ মাল-জাহাজের সওয়ার হয়ে। ছয় মাসের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, সঙ্গে তাঁর মা-মরা কন্যা মারিয়া ও শিশুপুত্র এডলফ্‌, বয়স যথাক্রমে বারো ও পাঁচ।'

এর পরের গল্পটুকু আমরা আগেই শুনে নিয়েছি।

'সুরতের কাস্টমস-প্রধান শাহবাজ খান সাহেবকে মুগ্ধ করে সেই যে জয়পুরের পথে পাড়ি দিয়েছিল গটফ্রিড তাঁর ‘সুপারিশ-পত্র’ হাতে নিয়ে, সেখানে কিন্তু তিনি পৌঁছুতে পারেননি। কারণ: দু’টো। এক, পথিমধ্যে মারিয়া হঠাৎ ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ে রাজপুতানার বুন্দির কাছে এসে। একদল শিখ তীর্থযাত্রী, যাঁরা নান্দেড়-সাহেব দর্শনে যাচ্ছিলেন, তাঁদের শুশ্রূষায় মেয়ে সুস্থ হয়। আর দ্বিতীয় ও প্রধান কারণ, গটফ্রেড তখন জানতে পারলেন, পাঁচশ’ বছর আগের এক অসামান্য ভারতীয় বিজ্ঞানী, ভাস্কর নাম তাঁর, তিনি নাকি এমনই এক চক্র আবিষ্কার করে ছিলেন যা একবার ঘুরিয়ে দিলে আর থামে না, চলতে থাকে অবিরাম নিজের শক্তিতেই! শুনেই রোমাঞ্চ হলো সাহেবের। তবে কি তিনি সঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছেন? ভাস্কর জন্মেছিলেন দক্ষিণে, আজকের বিজাপুরের কাছে। অতএব মোড় ঘুরে গটফ্রিড সপুত্রকন্যা চললেন দক্ষিণে, সেই শিখ তীর্থযাত্রিদলের সঙ্গে।'

*

'"এরপর আমাদের বংশের ইতিহাসে আর কিছু লেখা নেই ভাই অনন্ত, নেই আর কিছু চার্চে রক্ষিত বুকসেও," বললেন পাদ্রি বেসলার সাহেব। "তবে, তাঁর একটা চিঠিতে সামান্য হদিস পাওয়া যায়, বিজাপুরের পথে তিনি নাকি এই নান্দেড় সাহেবের কাছেপিঠে কোথাও আস্তানা গেড়েছিলেন কিছুদিন। এখানেই নাকি তিনি এমন এক ‘অনন্তকল’ বানান, যা কিনা আজও চলছে!!!"

‘"আপনাদের বংশ, মানে?"’ মৌনতা ভেঙে প্রশ্ন অনন্তমূর্তির।

‘"মিঃ মূর্তি, অধমের পুরো নাম কার্ল হাইনরাইখ বেসলার, আর দ লেট এডওয়ার্ড গটফ্রিড বেসলার ছিলেন আমারই অতি অতিবৃদ্ধ প্রপ্রপ্রপিতামহ!!"'

আমরা স্তব্ধ!

‘"তাহলে বুঝতেই পারছেন মিঃ মূর্তি, আপনার চাইতে এই অনন্তকলের ওপরে আমার দাবী অনেক বেশি। বস্তুতঃ, বিগত আড়াইশ’ বছর ধরে আমাদের বংশধরেরা এই কলেরই সন্ধান করে বেড়াচ্ছে, আমি তো সারা জীবন ধরেই। আমার পূর্বপুরুষের করা সুরাটের সেই কল শীঘ্র বিনষ্ট হয়ে যায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। অতএব আজকের বিশ্বে যোহন বেসলার অরফিরিয়াসের ফর্মুলায় বানানো মাত্র একটি কলই জ্যান্ত আছে, যার শব্দ এই সন্ধেবেলা আমরা শুনে ফেলেছি। অতএব চলুন এই কলের কলকব্জা আমায় খুলে দেখান, দেখাতেই হবে। এটা আমার দাবী।" প্রখর গলায় বলে উঠলেন সেই পাদ্রি সাহেব।'

‘"মিঃ বেসলার। চলুন আমরা উঠে পড়ি। আপনি এই মুহূর্তে আমাদের ঘরের অতিথি। নৈশাহার প্রস্তুত। গ্রহণ করুন। আমিও এই বাড়িতে দু’চারদিনই এসেছি। আমি আমার দাদু-কাকাদের সঙ্গে কথা বলছি। কাল সকালে আপনাকে জানাবো।"’

*

'তখনও জানিনা রে সীমা কী কঠোর পরিসমাপ্তি অপেক্ষা করে আছে এ’ গল্পের,' বলেন বিজুদা।

'থমথমে পরিবেশে নৈশাহার সমাপ্ত হলো। শ্রীনিবাস ও বেসলারের শয়নের আয়োজন হয়েছে পাশের অতিথি-নিলয়ে। আমি কালকের মত অনন্তের সঙ্গেই ওর দোতলার ঘরে শুলাম।

'দাদু ও কাকাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে গভীর রাতে শুতে এলো অনন্ত। আমি তখনও জেগে আছি। আমি তো এ’গৃহে দু’রাতের অতিথি, তবু কেন জানি না টেনশন আমারও হচ্ছে। আমি কি তবে আড়াইশ’ বছরের পুরনো কোনো ইতিহাসের শেষটুকুর সাক্ষী হতে যাচ্ছি? আচ্ছা, এই অনন্তকলের গল্পটা কি আদৌ সত্যি? এমন কি হতে পারে? আমাদের কলেজে পড়া থার্মো-ডায়নামিক্স কি মিথ্যে ছিল তাহলে? কিন্তু ঐ যে অনন্তদের রুদ্ধমন্দিরে সারা সন্ধে খটর খটর মেশিন চলা, ঐ যে পাদ্রি বেসলারের দীর্ঘ কাহিনী... সে সব কি মিথ্যা? একবার মেশিনটা দেখতে পেলে বেশ হতো, ভাবি।

'অনেক রাতে খুট্‌ করে ভেজানো দরোজা খুলে অনন্ত ঘরে ঢুকলো। আমি বিছানায় উঠে বসেছি।

‘"ঘুমোসনি তুই, বিজু?"

‘"না রে"

‘"ঘুমো ঘুমো। বৃথা টেনশন করিস না।"

‘"কী কথা হলো কাকাদের সঙ্গে? ওনারা কী বললেন?"

‘"দ্যাখ্‌ বিজু আমি আজন্মকাল দেখে আসছি এই কল, যাকে ঐ সাহেব অনন্তকল না কী বলে বর্ণনা করলো।"

‘"সত্যিই কি এ’ কল আপনা আপনি চলে?"

‘"বোধহয় তাই।"

‘"বোধহয় মানে?"

‘"দেখ্‌, আমি আজন্ম দেখে আসছি সন্ধ্যারতি করার মত সন্ধ্যা লাগলে বাড়ির বড় ছেলে ছোট্ট করে একটা ঠেলা দিয়ে তাকে জাগ্রত করে দিয়ে আসে। আবার রাত দশটায় ছোট্ট স্পর্শ করা মাত্রই তিনি নিদ্রা যান। আমার বাবা তাঁর প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাই তিনি এখানে থাকলে এই প্রক্রিয়া তিনিই করেন। আমি থাকলে আমাকেই করতে হয়। এটাই আমাদের বংশের এক রীতি বিগত দুই শতাব্দী ধরে চলে আসছে। না, কোনো তেল বা বিদ্যুৎ বা কোনো বাইরের শক্তি একাদিক্রমে লাগে না এ’কলে, শুধুমাত্র একটা ছোট্ট ঠেলা দিয়ে প্রথম চালিয়ে দেওয়া ছাড়া।" ‘"সত্যিই কি এ’ জল তোলা, গম পেষাইয়ের মত সব কাজ করতে পারে?"

'‘‘এ’ বলোনা, বিজু, ‘ইনি’। এই অনন্তকল আমাদের গৃহদেবতার সম্মান পেয়ে আসছেন বিগত দু’শ বছর ধরে। অনেক আগে আগে শুনেছি এই কল দিয়ে আরও নানা প্রকার কাজ হতো, কিন্তু বিগত বহু বৎসর শুধুমাত্র সকাল বিকেল কল চালিয়ে পাশের ইঁদারা থেকে জল তুলে মন্দিরের শিবলিঙ্গে ঢালা হয়। পুরো কাজটাই অটোমেটিক্যালি করেন 'অনন্তকল', সেটাই রীতি। এ’পর্যন্ত, শুনেছি, দু’বারই মাত্র এর মেরামতির দরকার হয়েছে, যখন ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের চাকা সারানো হয়। যন্ত্রের মূল শক্তি ও নীতি কিন্তু অপরিবর্তিতই আছে..."'

*

'হঠাৎ খট্‌ করে একটা শব্দ পাওয়া গেল আর খট্‌ খট্‌ খট্‌ খট্‌ খট্টর খট্টর করে অনতিদূর থেকে সেই মেশিন চালানোর শব্দ ভেসে আসতে লাগলো।

‘"সর্বনাশ! ও’ সাহেবের নিশ্চয়ই কাল সকাল পর্যন্ত তর সয়নি। মন্দিরে ঢুকে বাবাকে জাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন তো চালাতে নেই। কুপিত হবেন..." তড়াক্‌ করে লাফ মেরে উঠে অনন্ত দৌড়লো মন্দিরের দিকে। আমিও পিছু পিছু। রাত তখন দেড়টা বাজে।

'আমরা মন্দিরে ঢোকার আগেই আচম্বিতে সেই অনন্তকলের শব্দ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেল ও প্রবল জোরে এক মানুষী আর্তনাদ শোনা গেল। কেউ যেন প্রচণ্ড জোর কোনো আঘাত পেয়ে লুটিয়ে পড়লো।

'আমরা দু’জন তখন মন্দিরের দ্বারে প্রায় পৌঁছে গেছি। শব্দ পেয়ে জেগে উঠে গৃহের অন্য অন্য সদস্যরাও দৌড়ে এসেছেন, অনেকের হাতেই লম্বা লম্বা টর্চ, যদিও ঝলমলে চাঁদের আলোয় কিছুই অগোচরে নেই।

'মন্দিরে প্রবেশ করে টর্চের আলোয় দেখি তার এক কোণে নিথর পড়ে আছে সেই পাদ্রি সাহেব, মাথা ফেটে তার রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। আর অন্য কোণে দাঁড়িয়ে থরথরে কাঁপছে শ্রীমান শ্রীনিবাসচন্দ্র! অনন্তকল ঘুরে চলেছে প্রচণ্ড জোরে খট্ খট্ খট্টর খট্টর করে!!

'সকলে মিলে ধরাধরি করে বেসলারকে এনে বৈঠকখানা ঘরে শোয়ানো হলো, নিথর সে। মুখে চোখে তার জল দেওয়া হলো। অনেকে অনেক কথা বলতে লাগলো অপরিচিত ভাষায়। বোঝা গেল, একজন সাইকেল নিয়ে দৌড়েছে ডাক্তারবাবুর কাছে। আরেকজনকে পাঠানো হলো স্থানীয় থানায়, পুলিশে খবর দিতে।

'এক বাটি গরম দুধ খেয়ে বুকে বল ফিরে পেল শ্রীনিবাস, নৈলে সে কোনো কথাই বলতে পারছিলো না ভয়ে।

'"কী হয়েছিল?"

'"হবে আবার কী? আমাদের আশঙ্কাই সত্য, মাঝরাতে মন্দিরে অনধিকার প্রবেশ গটফ্রিড বেসলারের, এবং কলকব্জার খুঁটিনাটি লুকিয়ে দেখে নিতে গিয়ে কী করে স্টার্ট হয়ে পড়লো মেশিনটা ওরা জানে না তা। হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ঘুরতে শুরু করে অনন্তকল। কেমন করে তার একটি হাতা ঘুরে এসে লাগে বেসলারের মাথায় ও’ সে ঠিক্‌রে গিয়ে পড়ে কোণায়।" ‘"বাবা অনধিকার প্রবেশ অনধিকার স্পর্শ সহ্য করেন না," ভাঙাভাঙা ইংরেজিতে বললেন অনন্তের ছোটদাদু। ‘"কিন্তু সাহেবের গল্প যদি সত্যি হয়, তবে সে-ই তো বর্তমানকালে এই অনন্তকলের আসল হকদার, উত্তরাধিকারী তো সে-ই," ---সরল ছেলে অনন্ত বিশ্বাস করে নিয়েছে পাদ্রিসাহেবের গল্প।

'"না না" সজোরে আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে ওঠে কোঠাপল্লি শ্রীনিবাসন, "ও আসল হকদার নয়।" দুধ খেয়ে সে বুকে বল ফিরে পেয়েছে।

‘"কেন? ওরই পূর্বপুরুষ না..."

'এবার বম্বটা ফাটালো শ্রীনিবাসন।

‘"না, এই লোকটার নাম গটফ্রিড বেসলার নয়। সে মারা গেছে গত মাসে হায়দ্রাবাদে। হায়দ্রাবাদের চার্চ-স্কুলে তার কাছে সব গল্প শুনে, তার ডায়েরি পড়ে, তার ‘বন্ধু’ এই লোকটা গটফ্রিড সেজে এসেছে...."

‘"সে কি ? তুমি সব জেনেশুনে এক উটকো ভণ্ডকে নিয়ে এসেছিলে?"

‘"লোকটা বলেছিলো আমায় বিদেশ যাবার প্যাসেজ মানি দেবে," নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি শ্রীনিবাসনের।

‘"কিন্তু তুমি কী করে এই কলের কথা জানলে, শ্রীনি?" এবার আমার প্রশ্ন।

‘"ঐ তো ঐ অনন্ত! এ বছর 'বেকাফেস্ট'-এর শেষ রাতে কথাপ্রসঙ্গে এক তরল-মুহূর্তে ও-ই কি হিন্ট দিয়ে ফেলেনি নিজের ঘরের এমন এক যন্ত্রের? তাই গত মাসে হায়দ্রাবাদে বাই চান্স যখন আসল বেসলারের কাছে অনন্তকলের কথা আমি শুনলাম..."’

‘"কিন্তু আসল বেসলার হোক্‌ বা নকল, জেনে রাখো ভাই তোমরা, এ’ অনন্তকলের ওপর আমাদের ঘরের হকই সবচেয়ে বেশি..." ছোটদাদু বললেন।

‘"কারণ?"

‘"সেই অষ্টাদশ শতকে নান্দেড়ের চারপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শিখধর্ম বড়ই জনপ্রিয় ছিল। হিন্দু ও শিখধর্মের মধ্যে সীমারেখা এখনো তেমন বড়ো কিছু নয়, সেকালে তো আরও ছিল না। বহু স্থানীয় হিন্দু ‘শিখপন্থে’ বিশ্বস্ত হয়ে পড়ে, সম্ভবতঃ আমাদের পূর্বপুরুষও, পরে যদিও ফের বৃহত্তর হিন্দুধর্মে ফিরে এসে মিশে যায়। সেই ১৭৩০-এর দশকে এখানে এসে গটফ্রিড সাহেব শিখধর্মের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট হয়ে পড়েন ও সপরিবার শিখপন্থ্‌ গ্রহণ করেন। হ্যাঁ, লম্বা কেশ-কৃপাণ ইত্যাদিও রাখতেন, মদ্যপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিলেন ... বংশপরম্পরায় শোনা গল্প আমাদের," ছোটদাদু বলে চলেন, "তাঁর কন্যা ফের ভয়ঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়লে আশ্রয় পান আমাদেরই এই গৃহে ও ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই মেয়ের সঙ্গেই বিবাহ হয় আমাদের বংশের এক জ্যেষ্ঠসন্তানের। অর্থাৎ মারিয়া দিদিমণি সম্পর্কে আমাদের এক বট্‌-ঠাকুরমা হতেন গো! এই বিবাহেই বাবা গটফ্রিড-সাহেব মেয়েকে যৌতুক দেন এই অনন্তকল, যা আজও সকাল-সন্ধে দু’দু’ঘন্টা করে চালিয়ে শিবঠাকুরের মাথায় জল ঢালার পরম্পরা চলে আসছে আমাদের গৃহে। এই অনন্তকলকে এক গৃহদেবতার মর্যাদা দিয়ে থাকি আমরাঃ আমাদের শিবমন্দিরে তিনি তাই পরম শ্রদ্ধেয় ‘খট্টরবাবা’, খট্ খট্ খট্টর খট্টর করে চলেন কিনা, তাই!"

'ইতিমধ্যে ভোর হয়ে এসেছে প্রায়।

'বাবা কিন্তু আজ সেই মধ্যরাত থেকেই সেই যে চলছেন তো চলছেনই। অবাক বিস্ময়ে আধো-আলোয় হাঁ করে আমি তাকিয়ে রইলুম সেই আজবকলের দিকে, পৃথিবীর ইতিহাসকে যে নাকি বদলে দিতে পারতো! যে কল সফল হলে ‘শিল্পবিপ্লব’ আরও অর্ধশতক আগেই শুরু হয়ে যেত, বৃটেনে নয়, জর্মানিতে!!

'এখানে, দক্ষিণভারতে এক প্রত্যন্ত কোণায় তিনি অবশ্য ইতিহাসের পরাজিত নায়ক নন, বন্ধুবর অনন্তমূর্তির ঘরের দেবতা!

'খট্‌ খট্‌ খট্টর খট্টর.....খট্‌ খট্‌ খট্টর খট্টর.....

'খট্‌ খট্‌ খট্টর খট্টর.....খট্‌ খট্‌ খট্টর খট্টর.....ঐ যে তিনি ঘুরে চলেছেন ইতিহাস থেকে অনন্তের পথে.....তিনি

'খট্টরবাবা’!!!



(পরবাস-৬৪, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)




এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: