Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines





পরবাসে উদয় নারায়ণ সিংহের আরো
লেখা


বই


ISSN 1563-8685




শান্তিনিকেতনে




ই লেখাটার নাম হতে পারতো ‘ব্যক্তিগত শান্তিনিকেতন’ অথবা ‘আমার দেখা স্বপ্নগুলি’– কিন্তু অবশেষে নিজেকে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জুড়তে পারার কথাটাই সব ছাপিয়ে উঠবে মনে হয়, তাই এমন নাম; এখনকার ও এখানকার বর্ণনা শুধু দ্রিম-দ্রিম রবে বেজে-নেচে উত্সব-উদ্দীপনার আড়ালেই মনের অগোচরে থেকে গেছে। তাহলে এ-লেখায় আছেটা কী?

এতো কাছে কিন্তু এতো দূরে — ব্যাপারটা ছিলো কিছুটা এই রকম, শান্তিনিকেতন। কলকাতায় জন্ম-কর্ম, বিভিন্ন পাঠে, ভাষ্যে, ইতিহাসের পাতায় কিংবা রচনাবলীর নানান ছত্রে নামটা পড়া হয়, যাঁরা গেছেন বা যান তাঁদের কাছ থেকে অনুভূতির বর্ণনা শুনে একটা আবছা হাতছানি মনের পরতে কোথাও তৈরি হয়ে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে — কিন্তু সাহস হয় না তাকে নেড়ে-চেড়ে প্রত্যক্ষ ক’রে দেখার[১] , ভয় হতো যদি স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়, যদি দেখা যায় নাম-মাহাত্ম্য মাত্র, সেখানে আর কোনো রহস্য কোনো অস্পষ্টতার স্থান আর নেই! তাই কখনও আসি নি ইস্কুল জীবনে — শুধু গোটা গোটা রবীন্দ্র রচনাবলীর পৃষ্ঠায় তাকে দিয়েছি থাকতে, পাঠাগারের তাকেই; অথচ প্রথম দেখাটা হঠাৎ করেই হয়ে গেলো।

পরে শুনেছিলাম — হয়ত সত্যি নয়, কবিকে নিয়ে হাজারো রূপকথার মধ্যে একটা মাত্র, কিন্তু কিশোর রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম লৌহচক্রযানে ক’রে বোলপুরে এসেছিলেন, অন্ধকার নেমে এসেছিল বলে চোখ মেলে দেখতে চান নি বাইরের বিশ্বের দিকে, পরের দিন ভোরে এক বারে আলোকিত শান্তিনিকেতন দেখবেন বলে। তাই ভাবলাম, যখন বন্ধুরা বিনা কোনো প্রস্তুতিতেই বললে চলো শান্তিনিকেতনে পৌষ পাবনে, সেই রেলের চক্রযানেই, মনটা নেচে উঠলো। এই বুদ্ধি হলো না, কলকাতা থেকে ওখানকার শীত কতটা আলাদা, তার কেমন তৈয়ারী লাগবে, থাকবো কোথায়, কে দেবে আশ্রয় — কিছুই না; বিনা প্রস্তুতিতে একবার একাই রেলগাড়িতে গাদাগাদি যেমন পূর্ণ-কুম্ভের মেলায় হরিদ্বারে চলে গেছিলাম, পথে-ঘাটে-গাছতলায় কাটিয়েছিলাম, এও প্রায় তেমনই অ্যাডভেঞ্চার হবে ধরে নিয়েছিলাম — মিথিলায়, অর্থাৎ পূর্ণিয়া পেরিয়ে সীমরি বাখতিয়ারপুর অঞ্চলে উত্তর বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেঁয়ো পথ ধ’রে মাইলের পর মাইল হাঁটা, ঘোড়ায় চড়ে বা হাওদা ছাড়া শুধু পিঠে মাহুতের সঙ্গে দড়ি ধরে বেশ খানিকটা বন্ধুর পথ ও ছোট ছোট নদী পেরিয়ে রৌতা বা বারাহী চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যার ছেলেবেলা থেকেই হয়েছে, তার পক্ষে ডিসেম্বরের শীতের মূর্খতা স্বীকার করে নেওয়াটা যে খুব সহজ ও স্বাভাবিক হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী? আর বারৌনি অথবা মানসি বা কাটিহারের ট্রেনে বিনা নোটিসে সাধারণ কামরায় যাতায়াত ক’রে পোক্ত হওয়া প্রাণ কখনো ডরায় কলকাতা-বোলপুরের রেলগাড়ির পৌষ মেলার ভিড়কে?

ট্রেন থামার আগেই কি করে উঠে গিয়ে জায়গা দখল করা যায়, বহু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের ক’জনকে শিখিয়েই ছিল — আর সঙ্গে যদি ক্রমাগত নানান প্রসঙ্গে কথা বলে যাওয়ার মতো নবীন কবির দল থাকে (যার মধ্যে মনে পড়ছে অঞ্জন সেন, গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়দের নাম) তাহলে তো কথাই নেই। আশা ছিল, একটি নিতান্ত উজ্জ্বল ও উচ্ছল আনন্দলহরী বয়ে যাবে অজয় নদের থেকে কোপাইয়ের মধ্যে যোগাযোগের সেতু ধ’রে। তার আগে যা ছিল মাত্র উত্তেজনা — ‘দুই বাংলার কবিতা’-র প্রকাশনের জন্য বন্ধুরা কিভাবে ওপার থেকে কবিতা স্মাগল ক’রে এই বঙ্গে এনে ছাপাতেন তা নিয়ে, পরবর্তী সময়ে অঞ্জন ও আমার সম্পাদনায় (কখনও বীরেন্দ্র চক্রবর্তীও তাতে সামিল ছিলেন) ‘গাঙ্গেয় পত্র’ পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার পরিকল্পনায় (যাতে নীরদ মজুমদার-পরিতোষ সেন-গণেশ পাইন-শ্যামল দত্তরায়-রামকিঙ্কর বেজের সহযোগিতা ছিল অভাবিত) তা পরিণত হয়েছিল একটা সাহিত্য-আন্দোলনে যেখানে সম্পূর্ণ নতুন ক’রে এবং নিজেদের মত ক’রে ভাষা, সাহিত্য ও সাহিত্যের প্রতিমান নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় আমরা জুটেছিলাম; যাকে কিছু অগ্রজ সাহিত্যিকেরা ‘ধুত্তর-আধুনিকতা’ ব’লে আমাদের ‘উত্তর-আধুনিকতা’ আন্দোলনকে তুড়ি মেরে ওড়ানোর চেষ্টা করেন। সেবার আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পৌষ মেলার ভিড় ঠেলে আমাদের নিজস্ব ভাষা-চিন্তাকে শান্তিনিকেতনেও ছড়িয়ে দেওয়া। কে আমাদের পত্রিকা বিক্রি করতে জায়গা করে দেবে তা জানতাম না — কিন্তু সেসব চিন্তাকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রওনা হয়ে গেলেম সেই ম্যাজিক দুনিয়ার দিকে। জানতাম, সেই বর্ষীয়ান ভাষার জাদুকরও নেই, আর সেই ম্যাজিক লণ্ঠনও উধাও। শুনেছিলাম, এখন উত্তরাধিকার সূত্রে আশ্রমিকেরা অনেকেই যা পেয়েছেন তা সোনার দোয়াত-কলম নয়, শুধু ধারালো অস্ত্র-শস্ত্র যাতে একটা যদুবংশীয় যুদ্ধকে সচল রাখা যায়। ফলে, যা হয়, অনেকের সাবধান-বাণী উপেক্ষা করেই কিছু তরতরে তত্ত্ব-তরুণ চলল মেলাখেলার জগতে।

তখন আমি পৌষকালের বৈশিষ্ট্য বা কেন এই মেলা সে-নিয়ে কতটুকুই বা জানতাম? ‘চিত্রবিচিত্র’ সংকলনে শুধু চোখে পড়েছিল ‘পৌষমেলা’ কবিতাটি যেখানে দেখা যাচ্ছে জীবন ও জগতের একটি নিষ্ঠুর সত্য উদ্ভাসিত হচ্ছে — কেননা, পথে দেখা যাচ্ছে দু-তিন-টুক্‌রো কাঁচের রাঙা চুড়ি আর চিত্রাঙ্কিত মাটির ভাঙা পাত্র, যা-থেকে বোঝা যাচ্ছে শীতের দিনে বাদলের নেমে আসায় ভেস্তে যেতে যেতেও যে মেলাটা বসলো ও জমেও উঠলো, সেখানে সন্ধে বেলায় মাটির জিনিস কেনা-কাটির খুশিটুকু “কাদায় হল কাদা” — তাই, “পয়সা দিয়ে কিনেছিল/ মাটির যে ধনগুলা / সেইটুকু সুখ বিনি পয়সায় / ফিরিয়ে নিল ধুলা।” আবার পড়েছি সত্তর বছরের বৃদ্ধের নয় বছরের বালিকা পুপেদিদিকে সেইসব অকিঞ্চিত্কর গল্প বানিয়ে শোনানোর কথাও, যেসব গল্প জন্মায় কৌলিন্য ছাড়াই আগাছার মতন, পৌষ মাসে — সেসব গল্প প্রসঙ্গে ছোটগল্পকার দেখাচ্ছেন গল্প-গড়ার গোড়ার কথা; ঠিক যেমন বিধাতাকে এত লক্ষকোটি মানুষ সৃষ্টি করতে দেখেও মানুষের সৃষ্টির আশা মেটে না — “বলে, আমরা নিজে মানুষ তৈরি করব। তাই দেবতার সজীব পুতুল — খেলার পাশাপাশি নিজের খেলা শুরু হল পুতুল নিয়ে, সেগুলো মানুষের আপন — গড়া মানুষ।” ফলে গল্পের মানুষ ভাষায় গড়ে উঠলো কতোনা — রাজপুত্তুর, কোটালপুত্র, সুয়ো-আর-দুয়োরানী, মৎস্যকন্যা থেকে শুরু ক’রে মজুমদারদের জামাইয়ের মত, যে খুব খেতে ভালবাসে। জানতাম, যারা রবীন্দ্রনাথের গল্পে ভিড় করে এসেছে, তাদের জন্যেই কবি কোনো এক পৌষ-মাসে লিখেছিলেন:

“...শূন্য মাঠে তুচ্ছ ফুল ফোটে অগোচরে
আগাছার সাথে।
এমন কি আছে কেউ যেতে যেতে তুলে নেবে হাতে —
যার কোনো দাম নেই,
নাম নেই,
অধিকারী নাই যার কোনো,
বনশ্রী মর্যাদা যারে দেয় নি কখনো।”[২]
জেনেছিলাম সুইডেন-বাসী হ্যামারগ্রেন সাহেবের বাংলায় আগমনের গল্প — কবির জুবানিতে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, কিভাবে “কলিকাতায় বাঙালির নিমন্ত্রণসভায় উৎসবক্ষেত্রে ধর্মসমাজে এই শুভ্রকোর্তাধারী সৌম্য প্রফুল্লমূর্তি শ্বেতাস্য বিদেশীকে এক প্রান্তভাগে অনেকবার” দেখা গেছে, যাঁর জন্য উপকৃতেরা কিছু করে নি অথচ যিনি “পরজাতির গূঢ় হৃদয়গুহায় প্রবেশ করিবার জন্য যে-নম্রতাগুণের আবশ্যক”[৩] তা বহুবার নানান ক্রিয়াকলাপে বিশেষরূপে দেখিয়েছেন, এমন-কি “স্বদেশ ছাড়িয়া সমুদ্র লঙ্ঘন করিয়া জন্মভূমি ও আত্মীয়স্বজন হইতে বহুদূরে এই সম্পূর্ণ অপরিচিত পরজাতির মধ্যে...ছাত্রশিক্ষার...কার্যভার ...গ্রহণ করিয়াছিলেন” এবং “তাঁহার একটি সাধ ছিল আমাদের দেশীয় শিক্ষিত যুবকদের জন্য ভালো লাইব্রেরি এবং আলোচনাসভা স্থাপন করা। এই উদ্দেশ্যসাধনের জন্য রৌদ্রবৃষ্টি অর্থব্যয় এবং শারীরিক কষ্ট তুচ্ছ করিয়া তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করিয়া ফিরিয়াছেন।” দেখছি ইনি শান্তিনিকেতন আশ্রমে উৎসব-উপলক্ষে গত বৎসর পৌষ মাসে এসে “প্রাতঃকালে এক পেয়ালা চা খাইয়া তিনি ভ্রমণে বাহির হন। বিনা ছাতায় বিনা আহারে সমস্তদিন মাঠে মাঠে ভূতত্ত্ব আলোচনা করিয়া অপরাহ্ণে উৎসবারম্ভকালে ফিরিয়া আসেন — তখন কিছুতেই আহার করিতে সম্মত না হইয়া উৎসবান্তে রাত্রি নয়টার সময় কিঞ্চিৎ জলযোগ করিয়া পদব্রজে স্টেশনে গমনপূর্বক সেই রাত্রেই কলিকাতায় ফিরিয়া আসেন।” অথচ এঁর শেষ ইচ্ছে অনুসারে যখন মৃত্যুর পর এঁকে কবর না দিয়ে নিমতলার ঘাটে তাঁর মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল, যদিও “শাস্ত্রমতে অগ্নি ... পাবক এবং কাহাকেও ঘৃণা করেন না, তথাপি হিন্দুর পবিত্র নিমতলায় ম্লেচ্ছদেহ দগ্ধ হয় ইহাতে কোনো কোনো হিন্দুপত্রিকা গাত্রদাহ প্রকাশ” করলেন ব’লে কবি আশ্রম থেকে হায়-হায় করেছিলেন আমাদের সংকীর্ণ-মনস্কতার জন্য। ছোট-ইংরেজ বড়-ইংরেজ নিয়ে উনি লিখেইছিলেন কিন্তু অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ যে আমাদের যা-কিছু বা যে-কেউ সাদা-চামড়ার সেসবই পরিত্যাজ্য — অথচ বিশ্ব-ভারতী ও শান্তিনিকেতনের আদর্শ ও ঐতিহ্য যে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ বিদ্যা কৃতি শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিকে আপন ক’রে নেওয়ার কথাই শেখায় তা জেনেছিলাম।

তখন সদ্য ভাষাতত্ত্ব নিয়ে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শুরু করেছিলাম — আর এমনই সৌভাগ্য যে ঠিক তখনই আসছিল নানান তত্ত্ব ও বিপ্লব ভাষা চিন্তায় বিশ্ব জুড়ে। ওই সময়েই ‘সিট্যাকটিক স্ট্রাকচারস’ সদ্য ভারতে এসেছে — আর সদ্য দেখলাম বন্ধুবর প্রবাল দাশগুপ্ত SPE, অর্থাৎ কিনা ‘সাউন্ড প্যাটার্ন অফ ইংলিশ’ যোগাড় করেছে। এর আগে সুনীতি বাবুর ভাষাপ্রকাশ এবং রবীন্দ্রনাথের বাংলাভাষা পরিচয় ও শব্দতত্ত্ব শুধু ভরসা ছিল — দুই ভলিউম ODBL নেড়ে চেড়ে বুঝেছিলাম এতে দাঁত ফোঁটাতে অনেক সময় লাগবে — মাঝে মাঝে যে সংস্কৃত কলেজে সুনীতি বাবুকে পেয়েছি তাতে বক্তৃতায় মোহিত হয়েছি বেশি, বুঝেছি কম। সেই তুলনায় সহজ মনে হয়েছিল নোঅম চমস্কির অন্তর্নিহিত বনাম বহিঃস্থ সংরচনা-র (ডিপ ও সারফেস স্ট্রাকচার) তত্ত্ব যা নিয়ে উনি ভাষাতত্ত্বের জগতে এলেন। তার মূলে ছিল একটি বিশ্বাস যে আমরা জীবনের বাক-ব্যবহারের বিভিন্ন মুহূর্তে যে কথা যেমন শব্দ-সংরচনায় যে ধরনের অন্বয়ে বলতে চাই তা পারিনা। ফলে যে বাক্যটি বেরিয়ে আসে সংগঠিত হয়ে তার বহির্প্রকৃতি তারই ভেতরের আকরণের তুলনায় আলাদা হয়ে পড়ে। এমন কথা শুনলে কি মনে হয় না — “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই”?

আসলে, যাকিছু নিয়ে আমরা ভাবিত থাকি, তাই আমাদের অগোচরে স্বপ্নের আকার নিয়ে ঘুমের ঘোরে দেখা দেয়, অথচ যখন জেগে সেকথা বলতে চাই, যেন অন্য কোনো কথা হয়ে সে ফুটে ওঠে। রেল-চক্রযানের দোলায় মাঝে মাঝে একটা ঘোর এসে যাচ্ছে কারণ আমি বসে আছি যাকে বলে টঙ্গের ওপরে, যেখানে মাল-পত্র থাকার কথা আর নিচে চলছে অবাধ আলাপচারিতা ও ঘন ঘন ভাঁড়ের চা। সত্যি কথা বলতে কী, জীবনের একটা বিশাল সময় আমরা যে রাজ্যে বিচরণ করি তা হলো নিদ্রা-দেবী কিংবা গ্রীক সভ্যতার নিরিখে হিপ্নোস দেবতার অধীনে। জার্মান রূপকথায় বলে সেখানে ঘুমন্ত মানুষের বুকের ‘পরে ব’সে ‘মার’ (যার থেকে ইংরেজিতে এসেছে ‘নাইট-মেয়ার’-এর ‘মেয়ার’) নিঃশ্বাস-এর গতি-প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদের নির্মিত স্বপ্নগুলিকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে — সেইখানে আমাদের নিবাস। ক্রোশিয়ান কাহিনীতে দেখেছি এই অপদেবতা আবার ঘুমের মধ্যে পুরুষ মানুষদের জীবনী শক্তি টেনে নিয়ে তাদের অশক্ত ক’রে তলে। ট্রেনের কামরায় আধো-অন্ধকারে অনেক মানুষকেই মনে হয় চেনা-চেনা, কোথায় যেন দেখেছি; তার পর বোঝা যায় আসলে চিবুকের বর্ণনাটি হয়ত কোনো ছোট গল্পে পেয়েছি, শরীরের তুলনায় বড় মাথাটিও অন্যত্র। আবার অনেক অচেনা মানুষকে দেখলেও মনে হয় বোধ করি এঁকে স্বপ্নে দেখেছি। ভাবতে থাকি, দর্শনে অক্ষম মানুষেরাও কি দৃশ্য স্বপ্ন দেখেন — সেক্ষেত্রে কি জন্মান্ধ লোকেরা এক ধরনের ও অন্য যাঁরা পরে দৃষ্টি হারিয়েছেন, তাঁরা দৃশ্য স্বপ্ন দেখেন? একেবারে ছোট শিশুরাও কি স্বপ্ন দেখে? এমন অনেক কথার আলোচনা হবে সেই গ্রন্থে, যার সঙ্গে ভাষার যোগাযোগ রয়েছে। দুঃস্বপ্ন যাঁরা দেখেন তাঁরা এই ভেবে শান্তি পেতে পারেন যে অনেক সংস্কৃতিতে স্বপ্নভোজী জীবের — যেমন চিনের ‘বাকু’ ও জাপানের ‘মো’ — এঁরাও রয়েছেন আমাদের কল্পনায়, যাঁরা রাতের অন্ধকারে এসে খারাপ ও ভয়াবহ সব স্বপ্নগুলিকে খেয়ে ফেলেন, শুধু শোওয়ার আগে এঁদের প্রতীকি রূপকে স্মরণ করতে হবে, প্রায় শুয়ে পড়ার আগে তিনবার ‘লতা-লতা-লতা’ বলার মতোই। অলস মস্তিষ্ক যে শুধু শয়তানে ভাড়া করে তাই নয়, ভুতে পাওয়ার মতোই তাকে কবিতাতেও পায়, স্বপ্নেও।

মাথায় অনেক রকমের চিন্তা ভিড় করে আসে; একটা জটিলতা সবে পেরিয়ে এসেছি। সেটি হলো এই ভাবনা, বিশেষ ক’রে রবীন্দ্রনাথের খণ্ডের পর খণ্ড রচনাকৃতি সম্ভার ঘেঁটে যে আমাদের বোধ করি লেখার মতন নতুন আর কিছুই নেই — কেননা উনি গানে কবিতায় গল্পে উপন্যাসে ছবিতে কিছুই করা বাদ দেন নি। সবে ভাষাতত্ত্ব শিখিয়েছে যে কিছু সীমিত সংখ্যক ব্যাকরণগত সূত্রাবলী এবং সসীম শব্দাবলীর সাহায্যে অসীম বা অর্নিদিষ্ট সংখ্যক বাক্য তৈরী করতে পারে যেকোনো ভাষা-ভাষী — এমন সব বাক্যও যা এখনও উচ্চারিত হয়নি, গড়াও হয়নি এবং সম্পূর্ণ অভাবিত বাক্যের অন্বয় নিয়েও ভবিষ্যদ্বাণী করবে ব্যাকরণ যা ট্রান্সফর্মেশনাল-জেনারেটিভ গ্রামার বা সংরচনাত্মক ব্যাকরণে চমস্কি দেখিয়েছেন। প্রশ্ন জেগেছিল — তাই যদি সম্ভবে, তবে কোনো কৃতি, পাঠ বা শিল্প-কর্মকে তুমি এবং আমি কি বুঝব ভিন্ন ভিন্ন ভাবে? আইনস্টাইন, বহ্র, হাইসেনবর্গ প্রভৃতিরা কিংবা উত্তর-আধুনিক সমালোচকেরা কোনো রচনা, শিল্প-কর্ম, প্রমাণ নিয়ে যতই বলে থাকুন যে রাম যদুর বিষয়ে যা বলবে তা থেকে তুমি যত-না যদুর ব্যাপারে জানতে পারবে, তার থেকে ঢের বেশি জানবে রামের বিষয়েই — এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মার্সেল দুস্যাঁ (Marcel Duchamp) হাজার কথার এক কথা বলেছেন। একজন কবি বা শিল্পী রচনা শেষ হওয়ার পর যা বা যত কথাই বলুন না কেন নিজের শিল্প-কর্ম নিয়ে, সেই কৃতির মানেটা তখনই পূর্ণ হয় যখন তার পাঠক-দর্শকেরা নিজেদের মতন করে সেই কৃতিকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এবিষয়ে তো কোনো দ্বিমত নেই যে কোনো শিল্পীই বলবেন না যে ঠিক যা করতে চেয়েছিলেন, ঠিক তাই হয়ে উঠেছে কৃতিটা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে মানে-তত্ত্বর নিরিখে কোনো বাক্যের বা পাঠের বা শিল্পের যাত্রা শুরুই হয় তখন যখন তাকে কেউ পড়া শুরু করেন, বা দেখা শুরু করেন। আর ঠিক তখনই — বলছেন সেইমুর হাওয়ার্ড নোটস ইন দ্যা হিস্ট্রি অফ আর্ট-এর পঞ্চদশ খণ্ডের নিজের নিবন্ধে (‘আইকনলোজি, ইনটেনশন, ইমাগোস এন্ড মিথস অফ মীনিঙ’) — পাঠক বা দর্শক পুনর্নির্মাণ করেন শিল্প-কৃতি ও তার পৃথিবীকে, ঠিক যেমন ভাবে আমরা প্রতিদিন দুনিয়াটাকে নতুন করে চিনে নিচ্ছি, ঝালিয়ে নিচ্ছি আবার করে — কেননা মানুষের সম্প্রেষণের নিয়মই এমন।

অর্থাৎ কিনা, আমাদের প্রত্যেককে রবীন্দ্রনাথ বা শান্তিনিকেতনের মতন তৃতীয় অবস্থান-কে (থার্ড স্পেস) বুঝে নিতে হবে নিজের নিজের মতন ক’রে। ভেতরে যে (ভাষা-)’বিজ্ঞানী’ বসে আছে সে আবার মেনে নিচ্ছে যাঁ বিয়ালোস্তস্কির কথা যা উনি গেলে ১৭-খণ্ডের ‘এন্সাইক্লোপিডিয়া অফ ওয়ার্ল্ড আর্ট-এ ‘আইকনোগ্রাফি এন্ড আইকনলোজি’ নিবন্ধে (সপ্তম খণ্ড, ৭৭০-৭৮৬) বলছেন তার দিকে দেখলে বোঝা যাবে অর্থায়নের পদ্ধতি; উনি বলছেন “প্রথমে যেকোনো শিল্প-কর্মকে ব্যাখ্যা করতে হবে কতকগুলো আকারের এক গুচ্ছ মানে হিসেবে, তার পর দেখতে হবে এই আকৃতি কেমন সব কাহিনী, প্রতীক ও রূপকের প্রতি ইঙ্গিত করছে তার দিকে, এবং সবশেষে এই রেখাচিত্রগুলিকে বুঝতে হবে সংস্কৃতি ও কল্পনার ইতিহাসে বিধৃত একটি সময়ের বা লক্ষণের নিরিখে; প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাখ্যা নির্ভর করবে ইতিহাসের ঘটনা-প্রবাহ এবং ঐতিহ্যের ইতিহাসের ওপর”।

বাগর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে করতে স্বাভাবিক ভাবেই ভর্তৃহরি ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই এসে পড়ছেন — কারণ এর সঙ্গে এসে পড়ছে কিন্তু এরই সঙ্গে রয়েছে ভারতীয় দর্শনের ‘মহাবাক্য’-এর কথা — যা কখনও হয়ত বাংলা প্রাবন্ধিকেরা কোনো পাঠের আন্তর্বয়ান বা ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি বোঝাতে প্রয়োগ করেছেন, যদিও আদি শংকরের (৭৮৮-৮২০ খ্রী) ‘বাক্যবৃত্তি’-তে এই অবধারণার ব্যবহার অন্য অর্থে হয়েছে। চিন্ময়ানন্দ-কৃত ইংরেজি অনুবাদে এই ৫৩টি শ্লোক থেকে আমরা যা জানছি তাতে বোঝা যাচ্ছে গুরু-শিষ্যের এই বার্তালাপে ‘তৎ ত্বম অসি’ — এই ঔপনিষদিক মহাবাক্যের প্রকৃত অর্থ কী তা বোঝানোর প্রয়াস করছেন গুরু — বলছেন কেন সমস্ত পার্থিব বন্ধন ও শোক থেকে নিজের মুক্তির উপায় খুঁজতে অন্যত্র নয়, দেখতে হবে নিজের দিকেই, কেননা জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার নেই কোনো পার্থক্য; বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলির অর্থবোধের মধ্যেই যে পূর্ণ বাক্যের অর্থ আছে লুকিয়ে তা থেকেই দুই আত্মার অন্যোন্য সম্বন্ধ থেকে বোঝা সম্ভব; তাই নিজের দিকে তাকাতে জানলেই পূর্ণ দ্যোতনা হওয়া সম্ভব। তাকানোর অর্থ নিজের শরীরের দিকে নয়, কারণ আত্মন বলতে তো তোমার দেহ নয়, তোমার ভিতরের ‘বোধবিগ্রহ’-কে বোঝাবে। সমস্ত মনোনিবেশ করে যখন তুমি নিজেকে দেখবে তখন বুঝবে যে-তুমিকে দেখছ আর যে-তুমি দেখছে তারা এক নয়। এই প্রসঙ্গে আবার রবীন্দ্রনাথ আবার আমাদের ভীতি, দীনতা, শোক-জর্জরতার কারণ এবং আমাদের জাতিগতভাবে বিচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত ও হীনবল হওয়ার কারণ হিসেবে বলছেন আমাদের নিজেদের মধ্যে আবশ্যক অন্বয়ের অভাব, “আমাদের ‘চিত্তে বাচি ক্রিয়ায়াং’, মনে বাক্যে ও কর্মে বিরোধ, শিক্ষায় ও আচরণে বিরোধ, ধর্মে এবং কর্মে ঐক্য নাই” (‘ঔপনিষদ ব্রহ্ম’ থেকে)। বলছেন — জানবে যে এই পরমার্থ অথবা ব্রহ্ম আছেন সুখের সময়ে, আছেন দুঃখেও, বিপদের সময়েও! পরমাত্মার মধ্যে আত্মার অবাধ স্বাধীনতা আর অপরিসীম আনন্দকে উপলব্ধি করতে পারলে জানবে যে মহান্‌ আত্মা থেকে বাক্য-মনের নিবৃত্তি হয়, সেইখানে পৌঁছতে পারলে আসবে আনন্দ। আর তখনই “উপনিষৎ-কথিত সর্ব্বান্তর্যামী ব্রহ্ম আমার বাক্য প্রাণ চক্ষু শ্রোত্র বল ইন্দ্রিয়, আমার সমুদয় অঙ্গকে পরিতৃপ্ত” করবে। শান্তিনিকেতনকে তো এই ব্রহ্মবিদ্যারই কেন্দ্রভূমি হিসেবে দেখা হয়েছিল প্রথমে।

তিরিশ পৃষ্ঠার মূল ট্রাস্ট ডিডে (২০শে মার্চ, ১৯৮৮ সালের ৭৬৮৬-সংখ্যক দলিলে) বলা হয়েছিল “উক্ত শান্তিনিকেতন অপর সাধারণের একজন অথবা অনেকে একত্র হইয়া নিরাকার এক ব্রাহ্মর [?] উপাসনা করিতে পারিবেন। গৃহের অভ্যন্তরে উপাসনা করিতে হইলে ট্রস্টিগণের সম্মতি আবশ্যক হইবেক, গৃহের বাইরে ঐরূপ সম্মতির প্রয়োজন থাকিবেক না। নিরাকার এক ব্রাহ্মর [?] উপাসনা ব্যতীত কোন সম্প্রদায় বিশেষের অভীষ্ট দেবতা বা পশু, পক্ষী, মনুষ্যের বা মূর্তির বা চিত্রের বা কোন চিহ্নের পূজা বা হোমযজ্ঞাদি ঐ শান্তিনিকেতনে হইবে না। ধর্মানুষ্ঠান বা খাদ্যের জন্য জীব হিংসা বা মাংস আনয়ন বা আমিষ ভোজন বা মদ্য পান ঐ স্থানে হইতে পারিবে না। কোন ধর্ম বা উপাস্য দেবতার কোন প্রকার নিন্দা বা অবমাননা ঐ স্থানে হইবে না। এরূপ উপদেশাদি হইবে যাহা বিশ্বের স্রষ্টা ও পাতা ঈশ্বরের পূজা বন্ধনাদি ধ্যান-ধারণার উপযোগী হয় এবং যদ্দ্বারা নীতি, ধর্ম, উপচিকীর্ষণ এবং সর্ব্বজনীন ভাতৃভাব বর্দ্ধিত হয়। কোন প্রকার অপবিত্র আমোদ-প্রমোদ হইবে না। ধর্ম্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্রস্টিগণ বর্ষে বর্ষে একটি মেলা বসিবার(?) চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন। এই মেলাতে সকল ধর্মসম্প্রদায়ের সাধু-পুরুষেরা আসিয়া ধর্ম্ম-বিচার ও ধর্ম্মালাপ করিতে পারিবেন। এই মেলার উত্সবে কোন প্রকার পৌত্তলিক আরাধনা হইবে না ও কুত্সিত আমোদ-উল্লাস হইতে পারিবে না। মদ্য মাংস ব্যতিত, এই মেলায় সর্ব্বপ্রকার দ্রব্যাদি খরিদ বিক্রয় হইতে পারিবে। যদি কালে এই মেলা দ্বারা কোন রূপ আয় হয়, তবে ট্রস্টিগণ ঐ আয়ের টাকা মেলার কিংবা আশ্রমের উন্নতির জন্য ব্যয় করিবেন। এই ট্রাস্টর [?] উদ্দিষ্ট আশ্রমধর্ম্মর উন্নতির জন্য ট্রস্টিগণ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় ও পুস্তাকালয় সংস্থাপন অতিথি-সত্কার ও তজ্জন্য আবশ্যক হইলে উপযুক্ত গৃহ-নির্ম্মাণ ও স্থাবর ও অস্থাবর বস্তু ক্রয় করিয়া দিবেন এবং ঐ আশ্রমধর্ম্মের উন্নতি বিধায়ক সকল প্রকার কর্ম্ম করিতে পারিবেন।” (তৃতীয় ও পঞ্চম পৃষ্ঠা থেকে)।

অথচ আমি তখন অবধি মেলার সম্বন্ধে যা শুনেছিলাম তাতে বোঝা গেছিল যে পরবর্তী সময়ে যাঁরাই মেলার আয়োজনে ছিলেন, তাঁরা হয়ত এই সব উদ্দেশ্য থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন এবং সেই আনন্দ-আমোদ-উল্লাস ও ব্যবসায় মনস্কতার থেকে ফিরে যাওয়া হয়ত আর সম্ভব হবে না — ট্রেনের কামরাতেই দেখছিলাম নিষিদ্ধ সব কিছুর জন্য উত্সাহ উদ্দীপনা ও কৌতূহলের শেষ নেই — আজ শতাধিক বছর পরে যখন এই ট্রাস্ট ডিডের স্বাধীন ভারতের নিয়মানুসারে আবার ক’রে পঞ্জিকরণ করতে গিয়ে এবং আয়কর থেকে ছাড় প্রাপ্তির ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যখন এই দলিলের প্রাক-স্বাধীনতার সময় অবধি যে অনেক গুলি ভার্সান পুনঃপুনঃ স্ট্যাম্প পেপারে লিখিত হয়েছিল তাতেও অনেক পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়। এর সঙ্গেই অবশ্য মনে রাখতে হবে তখনও ব্রহ্মচর্যাশ্রম ও বিশ্ব-ভারতীর স্থাপনা হয়নি এবং তখনও মহর্ষির নির্ণয়েই এই পাঠ রচিত-লিখিত হয়েছিল — যাতে কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজেও কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। উদাহরণ-স্বরূপ, ‘ইংরেজি-সহজশিক্ষা’-র দ্বিতীয় ভাগে অনুবাদ-শিক্ষার জন্য দেওয়া একটি মেলা থেকে লেখা চিঠির খসড়ায় দেখতে পাচ্ছি মেলা সারারাত খোলা থাকে, দুই দিন ব্যাপী চলে — লোকে “গ্রাম থেকে শুক্‌নো খড় নিয়ে আসে। তাই রাত্রে মাটিতে বিছায়। তার উপরে শুয়ে রাত কাটায়।”[৪] আজ হয়ত সেকথা ভাবা সম্ভব নয় — তবে আমাদের কজনের পরিকল্পনা ঠিক এই রকমেরই ছিল — এখন মনে নেই কাদের সাহায্যে (সম্ভবত সত্তরের দশকের গোড়ায় এখানে পাঠরত কিছু ছাত্র-ছাত্রীর সাহায্যে আমরা একটা টেবিল যোগাড় ক’রে পত্রিকা সাজিয়ে বসেছিলাম — তখন ‘গাঙ্গেয় পত্র’ (প্রথম সংকলন আশ্বিন ১৩৮২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত) বিক্রি করা হত দুই-আড়াই টাকায়, বেশ কিছু বিক্রি হওয়ায় তাতেই আমরা মনে হয় মেঘের উপর দিয়ে হাঁটছি — তখন প্রথম সংখ্যায় শুরুই হয়েছিল আমাদের দুই শুভানুধ্যায়ী কমল কুমার মজুমদার ও নীরদ মজুমদারকে দিয়ে — যেখানে কমল কুমার লিখলেন ‘শরতবাবু ও ব্রাহ্মণ্য’ নিয়ে (যা ওঁর রচনা-সমগ্রে নেই) এবং নীরদ বাবু লিখলেন ‘আমাদের শিল্প-কলার দিক-নির্ণয়’; তেমনি উল্লেখযোগ্য ছিল শংখ ঘোষের ‘অনুবাদের দায়’, পুষ্কর দাশগুপ্তের ‘আজকের কবিতা ও কবিতার অনুবাদ’ কিংবা প্রবল দাশগুপ্তের ‘ভাষাবিদ্যার সাহিত্য-চিন্তা’ কিংবা একজন কবির চোখে শিবদূতীর মন্দিরের স্থাপত্যের জ্যামিতি নিয়ে লেখার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু ঝকঝকে অনুবাদ। অতএব বিক্রি হওয়ারই কথা।

তখন মেলায় খাওয়া-দাওয়াটা এত বড় হয়ে দেখা দেয়নি — মানে এখনকার কলকাতা বই মেলা বা শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার শয়ে শয়ে খাবারের স্টলের মত ছিল না — তাই অল্পে সন্তুষ্ট আমরা কজন অন্ধকার হতে হতে শীতের প্রকোপে প্রায় অপ্রস্তুত হয়ে খুঁজে বের করলাম আশ্রমের ভিতরেই কিছু ভাঙ্গা-চোরা কেউ-না-থাকা প’ড়োবাড়ি এবং তার পর দরকার হল খড় যোগাড় করার; তার পর আর আমাদের পায় কে? তবে বেরসিকের মতন প্রায় মাঝরাত পেরিয়ে টর্চ হাতে রক্ষীরা ধেয়ে এলো এই সব কবি-শিল্পী ছাগলের দলকে উত্খাত করতে। তারা কি বুঝবে সাহিত্য-চর্চার জ্বালা? শেষে তাড়া খেয়ে বহু দূর অবধি খেদিয়ে আমাদের পাঠিয়ে দিল রেল স্টেশনের দিকে; অগত্যা কিছু খবরের কাগজের ওপর ভরসা করে স্টেশনের প্লাটফর্ম-এ গিয়ে শুতে হল; ততক্ষণে আমার আর অঞ্জনের ওপর থেকে ভূতেরা বিদায় নিয়েছিল, কিন্তু গৌতম তখনও বেশ রঙ্গীন, যার কিছুটা পরিচয় আমরা ওর কাণ্ড-কারখানা থেকেই টের পেয়েছিলাম রাতের বাকি প্রহরে।

মেলায় আমাদের ঔত্সুক্য তো শুধুমাত্র বিচিত্র বিদ্যায় অথবা অজ্ঞাত বা অল্পজ্ঞাত প্রকাশনীতেই — যার মধ্যে একটি ছিল কবিরই তৈরী করে দেওয়া প্রশ্ননিচয়, যা গদ্য-গ্রন্থ রূপে ‘পাঠপ্রচয়’-এর তৃতীয় ভাগের জন্য রচিত প্রশ্নাবলী ও প্রশ্ন করার শৈলী নিয়ে; প্রতিটি ছত্রে ছত্রে তার রসবোধ — জিগ্গেস করছেন বিখ্যাত স্কুল-ছুট কবি: “প্রাণ আছে যারই আয়ু ফুরোলেই সে মারা যায়। সেই মৃতবস্তু খেয়ে ফেলে সরিয়ে দেয় দুই দল জীবাণু। তাদের খবর কী জানো বলো।" কিংবা আদ্য পরীক্ষায় জিগ্গেস করছেন: “...মানুষ চিরকাল গল্প শুনে আসছে, কত রূপকথা, কত কাব্যকথা, তার সংখ্যা নেই। এ রকম প্রশ্ন তার মনে যদি প্রবল হোত যে ঠিক এ রকম ঘটনাটি সংসারে ঘটে কি না, তবে সাহিত্যের বড়ো বড়োমহাকাব্যগুলির একটিও টিঁকতে পারত না। রাবণের দশমুণ্ড অসম্ভব, হনুমানের এক লম্ফে লঙ্কা পার হওয়া কাল্পনিক, সীতার দুঃখে ধরণী বিদীর্ণ হওয়া অদ্ভুত অত্যুক্তি, এই অপবাদ দিয়ে মানুষ গল্প শোনা বন্ধ করে নি। মানুষের কল্পনা এ সমস্ত অপ্রাকৃত বিবরণ পার হয়ে পৌঁচেছে সেইখানে গিয়ে যেখানে আছে মানুষের সুখদুঃখ। গল্পের ভিতর দিয়ে যদি তার হৃদয়ের সাড়া পাওয়া যায় তা হলে মানুষ নালিশ করে না। অসম্ভব গল্প ব’লে যে গল্পটা পড়েছ তার মধ্যে কোন্‌টুকু অসম্ভব এবং তৎসত্ত্বেও এ গল্পে কৌতূহল ও বেদনা সত্য হয়ে উঠেছে কেন বুঝিয়ে দাও। এবং যদি পারো এ গল্পটিকে বদল ক’রে দিয়ে সম্ভবপর ক’রে দিয়ে লেখো।” মনে হলো, হয়ত এক লহমার জন্যই যে হায় — আমরা যদি এমন সৃজনী মাস্টার মশাই পেতাম! জানতে চাইছেন, “একান্ত একলা মানুষ অসম্পূর্ণ, অশিক্ষিত, অসহায়। তাকে মানুষ হতে হয় দূরের এবং নিকটের, অতীতের এবং বর্তমানের বহুলোকের যোগে। তাকে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হয় গোচর এবং অগোচর অসংখ্য লোকের সঙ্গে সম্বন্ধে জড়িত হয়ে। মানুষের সৃষ্ট কোন্‌ উপায় আছে প্রধানত যার দ্বারা এই যোগসাধন ঘটে। বাইরের জগৎ নানা বস্তুতে তৈরি, যার রূপ আছে, আয়তন আছে, ভার আছে। মানুষের মনের মধ্যে আছে সেই জগতের একটি প্রতিরূপ, যার স্থূল আকৃতি নেই, বস্তু নেই, কিন্তু তা কী দিয়ে গড়া।” — এতসব ব’লে শুধোচ্ছেন: “প্রতীক কাকে বলে।” পাঠপ্রচয়-এর চতুর্থ ভাগের প্রশ্ন আরও অ্যাবস্ট্রাক্ট: “লাইব্রেরি বিস্ময়কর কী কারণে। অসভ্যজাতির ভাষায় প্রকাশ শব্দে। সেই সশব্দ ভাষাই আমাদের ভাবপ্রকাশের একমাত্র উপায় হইলে লাইব্রেরি সম্ভব হইত না। কী অসুবিধা ঘটিত। ভাষাকে চুপ করাইল কিসে।”

পৃথিবীতে কবির সংখ্যা ও সীমা নেই, কিন্তু কোন কবি আগামী দিনের শিশুর জন্য মমতায় নিজের সর্বস্ব দিয়ে একটি সৃজনী শিক্ষা-গ্রাম তৈরী করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার জন্য বেছে বেছে রত্ন নিয়ে এসেছিলেন সারা পৃথিবী থেকে জানা নেই। আজ সেই বাংলাকে “চুপ করাইল কিসে”? মনে পড়ছে আজ থেকে চার বছর আগে ঢাকায় সেনেট হলে একটি বক্তৃতায় আমার নিবন্ধের শীর্ষক ছিল: “ভাষা তুমি কার?” উত্তরটাও নামেই ছিল: “যে চাহে তাহার!”



সূত্রনির্দেশ :

[১] শতবর্ষে বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে যে আন্তর্জাতিক আলোচনা-চক্র আয়োজিত হয়েছিল নভেম্বর, ২০০৮-এ অসম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচরে — সেখানে বীজ ভাষণ (‘শরীর, শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’) দিতে গিয়ে বুদ্ধদেব–তনয়া দময়ন্তী জিগ্গেস করেছিলেন — এত নিবিড় ভাবে বুদ্ধদেব বসুকে পড়েছিলেন অথচ কখনও যাদবপুরে বা আবাসে ওঁর সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবেন নি কেন? উত্তরটা ছিলো একই রকম; ভয় ছিলো জানা কবি-সাহিত্যিককে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতে গিয়ে সব গোলমাল না হয়ে যায়!

[২] একক দীর্ঘ গল্প ‘সে’-র উত্সর্গ থেকে।

[৩] ‘সমাজ’-এর পরিশিষ্টে ‘বিদেশীয় অতিথি এবং দেশীয় আতিথ্য’ থেকে।

[৪] “এখন এখানে বেশ শীত। বড়দিনের ছুটিতে এখানে মেলা হবে। অনেক লোক জড়ো হয়। কেউ কাছ থেকে আসে, কেউ বা অনেক দূরের। মেলা দু-দিন ধ’রে হয়। অনেকে প্রথন দিন বাড়ি ফেরে না। তারা পাশের গ্রাম থেকে শুক্‌নো খড় নিয়ে আসে। তাই রাত্রে মাটিতে বিছায়। তার উপরে শুয়ে রাত কাটায়। ওদের কেন অসুখ হয় না? কখনও বা ওরা দিনের বেলায় শুক্‌নো ডাল ও গাছের গুঁড়ি সংগ্রহ ক’রে রাখে। রাত্রে আগুন জ্বালায়। আগুনের চারি দিকে ঘিরে বসে। দোকানগুলো সারারাত খোলা থাকে। একদল স্বেচ্ছাব্রতী (volunteer) মেলা পাহারা দেয়।”



(পরবাস-৬৪, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬)


অলংকরণঃ 'মেলার যাত্রী'--শিল্পী: নন্দলাল বসু; সুধীরঞ্জন দাসের 'আমাদের শান্তিনিকেতন' বই থেকে নেয়া হয়েছে



এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: