Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines



পরবাসে শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর
আরো লেখা




ISSN 1563-8685




শতবর্ষের স্মৃতিযাপন


ছায়াছবির ছায়াপথে; রামানন্দ সেনগুপ্ত; অনুলিখন ও সম্পাদনা কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রথম প্রকাশ মে ২০১৬, দীপায়ন - কলকাতা, পৃষ্ঠাঃ ১৪৪; প্রচ্ছদ : সমরেশ সাহা

বাবা ছিলেন ব্রহ্মপুত্র স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির অধিকর্তা, সেই সূত্রে ঢাকা নারায়ণগঞ্জে শৈশব কাটানো রুমার গডনের লেখা ‘দ্য রিভার’ উপন্যাস ও ১৯৪৮-এ তার চলচ্চিত্রায়ণ বাংলার ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন ও বাংলা বাস্তববাদী সিনেমার সূচনার দিনগুলির সঙ্গে অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৭-এ চিদানন্দ দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ রায়, বংশী চন্দ্রগুপ্ত, হরিসাধন দাশগুপ্ত, মনোজ মজুমদার, চারু প্রকাশ ঘোষ প্রমুখের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি। আর ঠিক পরের বছরেই রুমার গডনের উপন্যাসটিকে চলমান চিত্রমালায় ধরতে কলকাতায় এলেন প্রখ্যাত ফরাসি পরিচালক জঁ রেনোয়া। ১৯৩৯-এ নির্মিত ‘রুলস অফ দ্য গেম’ ছবির জন্য ততদিনে রেনোয়া জগৎবিখ্যাত।


হরিসাধন, কল্যাণ গুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্ত ও রামানন্দ সেনগুপ্ত
কলকাতায় হাতের কাছে সেই রেনোয়াকে পেয়ে সত্যজিৎ-হরিসাধন কিংবা বংশী চন্দ্রগুপ্ত বা কমলকুমার মজুমদার নিজেদের চলচ্চিত্ররুচি গড়ে নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখেছিলেন। আর রেনোয়াও অকাতরে সঙ্গ দিয়েছেন এই তরুণ চলচ্চিত্রবিদ্‌দের। বরেণ্য চলচ্চিত্রকারের সান্নিধ্যে সত্যজিৎ যে নিজেকে আরও ধারালো করেছিলেন তা আজ সবাই স্বীকার করেন, কেননা ১৯৫৫-য় ভারতের সিনেমার ক্রোশফলক ‘পথের পাঁচালীর’ ওপর ইতালীয় নববাস্তববাদী ধারার ছবির যেমন প্রভাব আছে তেমনই আছে জঁ রেনোয়ার প্রভাবও। অর্থাৎ প্রকারান্তরে বাংলা নতুন-ধারার ছবি তৈরির সঙ্গে পরোক্ষে রেনোয়ার কলকাতায় ‘দ্য রিভার’ ছবি তুলতে আসার একটা সম্পর্ক আছে। সেইসঙ্গেই উল্লেখ করার মতো বিষয় হল এই ছবির শিল্প নির্দেশক ছিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত (পরে সত্যজিতের ছবিতেও একই কাজ করবেন), আর অপারেটিং ক্যামেরাম্যান ছিলেন রামানন্দ সেনগুপ্ত। পৃথিবী-বিখ্যাত পরিচালকের হলিউড-প্রজেক্টে দু-জন বাঙালির এই ভাবে সুযোগ পেয়ে যাওয়া এক আশ্চর্য যোগাযোগ তো বটেই, বাংলা সিনেমার কারিগরি দিকের পক্ষেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঘটনা।


পরিণত বয়সে রামানন্দ সেনগুপ্ত
অতিক্রান্ত শতবর্ষে (জন্ম ১৯১৩) রামানন্দ সেনগুপ্তের ‘ছায়াছবির ছায়াপথে’ বইটি (অনুলিখন ও সম্পাদনা কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায় ) পড়তে গিয়ে এই সব কথা মনে এল।

রামানন্দের ছোটবেলা কেটেছে বাবার কর্মস্থলে, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন তাঁর মায়ের পিসতুতো দাদা। তাঁরই উদ্যোগে রামানন্দ ছেলেবেলায় শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে গিয়ে ভর্তি হন। তখনও পাঠভবন রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে ভেঙে চলছে একটার পর একটা অচলায়তন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসছে। সে আক্ষরিক অর্থেই বিবিধের মাঝে মহানমিলন। রামানন্দের শান্তিনিকেতন-পর্ব চলে মাত্রই তিন বছর। কিন্তু সে তিন বছর জীবনের সবথেকে মূল্যবান তিনটি বছর। তাঁর সহপাঠী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দুই নাতনি — রথীন্দ্র-কন্যা নন্দিনী ও মীরা দেবীর মেয়ে নন্দিতা, নন্দলাল বসুর ছেলে গোরা, সাগরময় ঘোষ, ত্রিপুরা রাজপরিবারের রমেন দেববর্মণ। রামানন্দ স্মৃতি খুঁড়ে তুলে এনেছেন রবীন্দ্র-সান্নিধ্যের মুহূর্তগুলিও। মাঝে মাঝে গুরুদেব উত্তরায়ণে ডেকে পাঠিয়ে শিশুদের জিগ্যেস করতেন — “কেমন লাগছে তোদের এখানে? বৃষ্টিতে ভিজিস? খোয়াইয়ে যাস? বাড়িতে চিঠি লিখিস?” সেইসঙ্গে খবর রাখতেন বাচ্চাদের খাওয়াদাওয়া ও অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়ের। অসাধারণ সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড়ো হতে থাকেন রামানন্দ। কিন্তু পিতার মৃত্যুতে তাঁর শান্তিনিকেতনে থাকা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর ঢাকায় বেশ কিছুদিন কাটিয়ে কলকাতায় আসেন তিনি। বালিগঞ্জের জগবন্ধু ইন্সটিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে একটা টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি হয়ে চাকরির চেষ্টায় যান তদানীন্তন মাদ্রাজে। চাকরি হল না তবে দেখা হয়ে গেল মোশান পিকচার্স কম্বাইন্ড স্টুডিয়োর (পরে যার নাম হয় জেমিনি স্টুডিয়ো) ল্যাব ইনচার্জ ধীরেন দাশগুপ্তের সঙ্গে। তিনি মাদ্রাজে রামানন্দকে কাজ দিতে না পারলেও কলকাতায় কীভাবে স্টুডিয়োয় সুযোগ পাওয়া যেতে পারে তার ইঙ্গিত দিলেন। আর এভাবেই সিনেমার সঙ্গে রামানন্দের নিয়তি জড়িয়ে গেল।


ব্যালকনিতে রেনোয়া, ডিডো ও মিনু
১৯৩৮-এ অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে যোগ দিলেন ফিল্ম কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায়। সেখানে পিটার ব্র্যাডলি, এস এন মালহোত্র, অজিত সেনগুপ্ত, জি এস মেহতার কাছে কাজ শেখেন। প্রথম স্বাধীন কাজ ১৯৪৭-এ অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পূর্বরাগ’ ছবিতে। এরপরই রামানন্দের জীবনে আসে রেনোয়া-পর্ব। রেনোয়ার ‘দ্য রিভার’ ছবিটি ছিল রঙিন। টেকনিকালারে কাজের অভিজ্ঞতা সে সময় কারুরই বিশেষ না থাকায় রেনোয়া নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র ক্লদ রেনোয়ার সঙ্গে রামানন্দকে তিন মাসের জন্য ইংল্যান্ডে পাঠান। উদ্দেশ্য টেকনিকালারে অভিজ্ঞতা অর্জন। রামানন্দ-রেনোয়া সম্পর্কও নতুন উত্তাপ পায়। কেজো সম্পর্কের বাইরে সেনগুপ্ত পরিবারের আত্মীয়বর্গে ঢুকে পড়ে রেনোয়া পরিবার। এমনকী ব্যারাকপুরে শুটিং চলার সময় রোজ সকালে রেনোয়া রামানন্দের ব্যারাকপুরের অস্থায়ী আস্তানার সামনে এসে রামানন্দ-পত্নীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে তবেই শুটিংয়ে যেতেন। টুকরো টুকরো স্মৃতি রোমন্থন করে রামানন্দ জঁ রেনোয়ার মতো বিরাট ব্যক্তিত্বের পুনর্নির্মাণ করেছেন। তার মধ্যে কয়েকটি স্মৃতি সত্যিই মানুষ রেনোয়াকে চিনিয়ে দেয়। যেমন বাঙালি পরিচালক হরিদাস ভট্টাচার্য ভালো ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজকের অকারণ হস্তক্ষেপের কথা তুললে রেনোয়া বলেছিলেন — “পৃথিবীর সব দেশে কৃষকরা এক রকম, শিক্ষকরা এক রকম এবং ছবির প্রযোজকরা এক রকম।” তবে রেনোয়ার সংবেদনশীলতার চূড়ান্ত নমুনা পাই যখন রামানন্দ লিখছেন — “তখন ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিং চলছিল ব্যারাকপুরের কাছে ইস্টার্ন টকিজ স্টুডিয়োতে। পাশেই ট্রেন লাইন। ক্রমাগত হুইসলের শব্দে কোনোভাবেই শুটিং করা যাচ্ছিল না। আমরা সবাই স্টুডিয়োর বাইরে এসে দেখি পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজারে হাজারে মানুষ তাদের সমস্ত কিছু হারিয়ে কোনোভাবে প্রাণটুকু নিয়ে ট্রেনে করে পশ্চিমবঙ্গে আসছে। ট্রেনের ছাদও মানুষে ভর্তি। এই দৃশ্য দেখে রেনোয়া আমাদের কাছে জানতে চাইলেন ‘কী ব্যাপার? এত মানুষ কোথা থেকে আসছে?’ আমি বললাম, ‘আমাদের দেশ ভাগ হয়ে গেছে। আমাদের দেশের একটা অংশ পূর্ব পাকিস্তান হয়ে গেছে। যাদের বাড়ি পাকিস্তানে পড়েছে তারা প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে আসছে ভারতে।’ রেনোয়া বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এরা নিজের বাড়ি, জমি, সবকিছু ফেলে চলে আসছে চিরকালের মতো?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। রেনোয়ার মুখটা শুকিয়ে গেল। যেন মনে হল তাঁরই বাড়ি, জমি সব পাকিস্তানে পড়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘আমি যদি ভারতীয় হতাম তাহলে বাকি জীবনটা এই দেশভাগ আর ভিটেমাটি হারানো মানুষদের নিয়ে ছবি করে কাটিয়ে দিতাম।'”

রেনোয়ার সঙ্গে রামানন্দের অন্তত পত্রমাধ্যমেও যোগাযোগ ছিল ১৯৭৬ পর্যন্ত (রেনোয়া প্রয়াত হন ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯)। আর ক্লদ রেনোয়ার সঙ্গে পত্রবিনিময় চলেছে ১৯৮২ পর্যন্ত। কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃতিত্ব দিতে হয় ‘ছায়াছবির ছায়াপথে’ রেনোয়াদের বেশ কয়েকটি চিঠি সংযোজিত করার জন্য। যদিও ইংরেজিতে লেখা চিঠিগুলির বেশিরভাগই কোনো আশ্চর্য সম্পাদকীয় বিবেচনায় বাংলায় অনূদিত হয়েছে। মনে হয় চিঠিগুলি অবিকৃত থাকলে যথাযথ ঐতিহাসিকতা রক্ষা হত।

দেশভাগ নিয়ে রেনোয়ার ওই মন্তব্যের কথা রামানন্দ তাঁর বন্ধু ঋত্বিককুমারকে বলেছিলেন। বাংলা ছবির ‘আফাঁ তেরিবল’ ঋত্বিককুমার ঘটক। রামানন্দের কথে শুনে ঋত্বিক খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেন — ‘উনি জাঁ রেনোয়া বলেই এরকম কথা বলতে পারেন।’ রামানন্দের বিশ্বাস রেনোয়ার কথা ঋত্বিককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার ঋত্বিকের প্রথম ছবি ‘নাগরিক’-এর চিত্রগ্রাহক ছিলেন রামানন্দ। এবং সেটা বিনা পারিশ্রমিকে। কেননা ঋত্বিকের গোটা কাজটাই ছিল যৌথ উদ্যোগের ধাঁচে। অবশ্য সে ছবি রিলিজ করে ঋত্বিকের মৃত্যুর পর। রামানন্দ লিখছেন — “ঋত্বিকের ক্যমেরা ফ্রেমিং খুব অপ্রচলিত ছিল, যা ছিল আমার খুব পছন্দের। ঋত্বিক অরসন ওয়েলসের মতো ক্যামেরা ফ্রেমিং ভালোবাসতেন। ‘সিটিজেন কেন’ দেখলে বোঝা যায় অপ্রচলিত ক্যামেরা ফ্রেমিং কী। ১৯৫২ সালে ‘নাগরিক’ তৈরির সময় ঋত্বিকের মধ্যে একটা আগুন দেখেছিলাম।”

মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাতভোর’-এও রামানন্দ ক্যামেরার পিছনে ছিলেন। সলিল সেনের ‘নতুন ইহুদি’তেও তাঁরই হাতের ছোঁয়া।

রামানন্দ সেনগুপ্তের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল টেকনিসিয়ান্স স্টুডিয়ো গড়ে তোলা। ১৯৩০-৩২ সালে প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায় টালিগঞ্জে কালী ফিল্মস স্টুডিয়ো তৈরি করছিলেন। ১৯৫১ সালে আশুতোষ নাগ, দুর্গাদাস মিত্র, কল্যাণ গুপ্ত ও রামানন্দ সেনগুপ্ত যৌথভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কালী ফিল্মস স্টুডিয়ো রিসিভারের কাছ থেকে কিনে নেন। টেকনিসিয়ান্স স্টুডিয়ো নামটা রামানন্দেরই দেওয়া। অবশ্য স্টুডিয়ো পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও মূলধনের অভাবে টেকনিসিয়ান্স একসময় ধুঁকতে থাকে। পরে ১৯৭৯ সালে তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের তথ্য-সংস্কৃতিমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ব্যবস্থাপনায় রাজ্য সরকার টেকনিসিয়ান্স অধিগ্রহণ করেন।

এভাবেই শতবর্ষীয়ান রামানন্দ সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথায় বাঙালির চলচ্চিত্র সাধনার মনোজ্ঞ এক ইতিহাস রচনা করেছেন, যার সর্বাঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা ছবির এই মহীরুহের সুস্থ জীবনবোধ।



(পরবাস-৬৫, ডিসেম্বর ২০১৬)




এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas: