• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪০ | ফেব্রুয়ারি ২০০৮ | প্রবন্ধ
    Share
  • ইয়াংজী নদীর তীরে : ছন্দা চট্টোপাধ্যায় বিউট্রা

    সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতেই নাকে এল ভিজে ধোঁয়ার গন্ধ । বাইরে গিয়ে তাকাতেই দেখি দু'কূল জোড়া বাদামী, ঘন জলস্রোত । অজস্র ছোট ছোট ডিঙি নৌকা ও শামপান যাচ্ছে এদিক ওদিক । একেকটা এত কাছে ঘেঁষে যাচ্ছে যে পাটাতনে বাঁধা শূয়রের গন্ধও নাকে আসে ।

    আমি চীনের উ-হান শহর থেকে একটা ছোট্ট স্টীমারে চেপে ইয়াংজী নদীতে উজান বেয়ে যাচ্ছি, দেড়শ মাইল উত্তর পশ্চিমে চংচিং শহর পর্যন্ত । আমি গেছিলাম ইয়াংজীর বাঁধ তৈরি হবার আগে । ইয়াংজী নদীর এই অংশটি তখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত ছিল । নদীটি ঘন জঙ্গল, উঁচু পাহাড় ও সঙ্কীর্ণ গিরিবর্তের (গর্জ) মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে । দুপাশে পাঁচহাজার বছরের ঐতিহাসিক নিদর্শন । কিন্তু সম্প্রতি বাঁধের ফলে এসবই জলের তলায় । আমাজন ও নীল নদীকে বাদ দিলে, ইয়াংজীই পৃথিবীর বৃহত্তম নদী । সুদূর তিব্বতী হিমালয়ে প্রায় বাইশ হাজার ফুট উঁচুত্রে এই নদীর জন্ম । তারপর প্রায় চার হাজার মাইল পেরিয়ে শাংহাইয়ের কাছে সমুদ্রে সমাপ্তি । ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত নদীটির উত্স অজানা ছিল । লোকমুখে গল্প ছিল এক দুর্গম, অজানা জায়গা, সেখানে নাকি বিরাট লোমওয়ালা মনুষ্যেতর প্রাণী থাকে যারা মানুষের রক্ত, এমনকি চুল পর্যন্ত খেয়ে ফ্যালে । বলা বাহুল্য, ১৯৭৬ সালে চীনা আবিস্কারকরা এই কল্পনার সমাপ্তি ঘটিয়েছেন ।

    ইয়াংজী নামটি ইংরেজদের দেওয়া । ঠিক কী ভাবে এ নামের শুরু হয়েছিল তা আমার জানা নেই । চীনারা কিন্তু বহু শতাব্দী আগেই এই নদীর নাম দিয়েছে সাদামাটা চ্যাংজিয়াং, বা লম্বা নদী"। অথবা শুধু `জিয়াং' বা `নদী' । ভাবটা এমন যেন - নদী তো নদীই । তার আবার নাম নিয়ে অত আদিখ্যেতার কী দরকার ! তাই এমন সুন্দর ঐতিহাসিক নদীর কোনো ভালো নাম নেই । চীনাদের আর যাই হোক, নদী বিষয়ে রোমান্টিক বলা যাবে না ।

    সত্যি বলতে কী, ইয়াংজী বরাবরই একটা হাইওয়ের কাজ করে এসেছে । পূর্ব থেকে পশ্চিমে এই নদীটি চীনদেশকে দুভাগে বিভক্ত করেছে । উত্তরে আছে শতাব্দী আগে একটা বড় খাল (গ্র্যান্ড ক্যানাল) কেটে দুই নদীকে যোগ করা হয়েছে । হাজার বছর ধরে এইগুলিই সারা দেশকে খেতের জল জুটিয়েছেন এবং যাতায়াতের সুবিধা করেছে । এদেরই তীরে তীরে গড়ে উঠেছে চীনের বিভিন্ন যুগের ইতিহাস । দেশের এক চতুর্থাংশ কৃষিভূমি ইয়াংজী নদীর উপত্যকায় । আর পাহাড় ঘেরা সিচুয়ান প্রদেশে যেতে হলে এই নদী ছাড়া রাস্তা নেই । সেই দিকেই আমরা চলেছি ।

    সিচুয়ান প্রদেশ থেকে বেরিয়ে উহানে পৌঁছবার আগে নদীটি তিনটি গভীর গর্জের মধ্য দিয়ে নেমে আসে, প্রায় প্রতি মাইলে এক ফুট করে নামে । তাই নদীটির স্রোত খুব । মোটর বোট না থাকলে উজান বেয়ে ওঠা খুব কঠিন । আমাদের গন্তব্য এই দেড়শ মাইল যেতে তিনদিন লেগেছিল । ষাট বছর আগেও এই একই রাস্তা যেতে একমাসেরও বেশি সময় লাগত ।

    উজান বেয়ে নৌকা চালানো অসাধ্য বলে প্রায় দুহাজার বছর আগেই চীনারা গর্জ-এর পাহাড়ের গায়ে গায়ে সরু পথ খোদাই করেছিল । এখনও সেগুলোর চিহ্ন দেখা যায় । পায়ে চলা শ্রমিকরা দড়ি বেঁধে নৌকাগুলি সারা রাস্তা টেনে নিয়ে যেত । ড্রাম ও ঘন্টা বাজিয়ে ও চাবুক মেরে এদের কাজ করানো হত । নদী দুর্বার এবং পথ সরু ও পিছল বলে প্রতি বছরই কয়েক'শ লোকের মৃত্যু হত । এই ভাবে নৌকা টানা এই শতাব্দীর প্রথম ভাগেও প্রচলিত ছিল । কম্যুনিস্ট সরকার এই অমানুষিক ব্যবস্থা বন্ধ করেন ।

    আমার এই প্রথম চীন ভ্রমণ ১৯৯৪ সালে । সম্প্রতি চীনে কম্যুনিস্ট শাসনের লাগাম অনেকটা আলগা হয়েছে । পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য চলছে । শহরে, শহরে ক্যাপিটালিজমের হাওয়া বইতে শুরু করেছে । এমনকি তিয়ান-আন-মেনের ছাত্ররাও বিপ্লব ভুলে উপরি উপার্জনের ধান্ধায় মজেছে । সেইসঙ্গে ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করার জন্যে গড়ে উঠেছে ভালো ভালো হোটেল (জাপানী সহযোগিতায়) এবং ইংয়াজী নদীভ্রমণের জন্য সুন্দর মোটর বোটের ব্যবস্থা । আমি আমেরিকার স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম সংস্থার একটি দলের সঙ্গে গেছিলাম । প্রথম তিন-চারদিন যথারীতি বেইজিং-এ কাটালাম । সম্রাটের প্রাসাদ নিষিদ্ধ শহর, সাও-য়ের সমাধি ইত্যাদি যা যা একজন আদর্শ ট্যুরিস্টের দেখা দরকার, সবই দেখলাম । আমার কিন্তু এসব ধরাবাঁধা ট্যুর থেকে এখানে সেখানে নিয়মেএঅ ব্যতিক্রম করতেই বেশী ভাল লাগে । যেমন, প্রতি ভোরবেলা শহরের পার্ক, ময়দান জুড়ে, ছেলে-বুড়ো, মা-মেয়ে, সবাই মিলে ডাই-চি ব্যায়াম করে ।

    এককোণে বসে আমি দেখতুম কী গভীর আগ্রহ এবং বিশ্বাস প্রতিজনের মুখে । একটি ছোট্ট ছেলে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে, মায়ের দেখাদেখি হাত পা চালাচ্ছে । এক এক সময় চোখ বুজে, একই মুদ্রায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । বেচারার তো অত ধৈর্য্য নেই । সে একটুক্ষণ পরেই চোখ খুলে পিট পিট করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, আবার একটু পরেই চোখ বুজে ফেলেছে । মাও-য়ের সমাধির চেয়ে এইসব দেখতেই আমার বেশী ভাল লাগে । আরও মনে পড়ে, বৃষ্টির দিনে বেইজিংয়ে সাইকেলে ঝাঁক নীল, হলুদ, সবুজ রঙের রেনকোট ঢাকা সব সাইকেলে । একঝাঁক প্রজাপতির মতো, ধূসর দিনটা রঙীন করে তোলে ।

    গ্রেট ওয়ালের কথা অবশ্য আলাদা । পড়ন্ত বিকেলে দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম মাইলের পর মাইল দেয়াল চলে গেছে এঁকেবেঁকে চীনসমুদ্র থেকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত । এই দেয়াল তৈরী করতে হাজার শ্রমিক প্রাণ দিয়েছে, কত বিদেশী বাহিনী এর তলায় বিধ্বস্ত হয়েছে । গ্রেট ওয়ালই নাকি একমাত্র মানুষে গড়া জিনিস, যা মহাশূন্য থেকেও দেখা যায় । ভাবতেই রোমাঞ্চ হয় !

    বেইজিং ছাড়াও গেছিলাম শি-আন; প্রায় দুহাজার বছরের পুরনো টেরাকোটা সৈন্যবাহিনী দেখেছি । চীন সম্রাট (২০০ খ্রীষ্টপূর্ব) তৈরী করিয়েছিলেন হাজার হাজার সাইজের পদাতিক, অশ্বারোহী, জেনারেল, রথ, ঘোড়া সে সবই সম্রাটের সঙ্গে কবর দেওয়া হয়েছিল । সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে সেইগুলি আবিস্কৃত হয়েছে । এইখানে বলে রাখি, পাইডরা কথায় কথায় পুরনো ঐতিহাসিক যুগের কথা তোলে যেমন "অমুক পদ্ধতি হান যুগ (২০০ খ্রী:পূ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে চলছে" বা "তমুক কবির লেখা ট্যাং যুগের (৭০০ খ্রীষ্টাব্দ) বৈশিষ্ট্য" ইত্যাদি ইত্যাদি । একটু মোটামুটি ইতিহাসের ধারঞা বা থাকলে বোঝা মুশকিল কত বছর আগেকার কথা বলা হচ্ছে ।

    বেইজিং ও শিয়ানের তুলনায় শাংহাই অনেক আধুনিক । ভীড়, ধোঁয়া, ধুলো ও গাড়ীর হর্ণে ভর্তি । অনেকটা হংকং-এর মতো । সাইকেলের থেকেও মোটরগাড়ীর সংখ্যা বেশী । এবং সবাই মনে হয় উপরি ইনকামের ধান্ধায় হন্যে হয়ে ছুটছে । বলা বাহুল্য, শাংহাই আমার মোটেই ভাল লাগেনি । তবে শাংহাইয়ে থাকাকালীন আমার একটি আধুনিক চীনা হাসপাতাল দেখার সুযোগ হয়েছিল । সে গল্পটা পরে বলবো । শাংহাইয়ের তুলনায় শি-আন, টোকিওর তুলনায় কিয়োটো বা বম্বের তুলনায় আগ্রার মতো । শি-আন চীনের পুরনো সাংস্কৃতিক রাজধানী । এখন একটি ছোট্ট, ধুলোমাখা, চুপচাপ শহর । ঐ টেরাকোটা মূর্তির জন্যই যা ট্যুরিস্টদের আনাগোনা ।

    ইয়াংজী নদীতেই ফিরে আসি । উহান শহর থেকে আমাদের নদীযাত্রা শুরু । উহান শহরটি মাঝারি সাইজের । ইয়াংজী নদীর তীরে থাকার দরুণ মাঝে মাঝেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় । চারশ খ্রীষ্টপূর্ব থেকে অনেক সম্রাট এই নদীকে বাঁধ দিয়ে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছেন । যাঁরা পারেননি, তাঁদের কর্মচারীদের প্রাণ দিয়ে ভুল শুধরাতে হয়েছে । সম্প্রতিকালে, উহানের ঠিক কাছেই ইলিংয়ে চীন সরকার একটি বাঁধ তৈরী করেছেন । তাই বন্যার ধকল এখন কম । এছাড়াও একটি দ্বিতীয় বাঁধের সৃষ্টি হয়েছে । সেটি চীনের ও সম্ভবত: পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁধ । এটাই এখন আমার দেখা সব দৃশ্যই ষাট ফুট জলের তলায় । উহান থেকে উত্তরে চংচিং পর্যন্ত নদী ও দুই তীরের ঐতিহাসিক গ্রাম, মন্দির জঙ্গল, পাহাড় সব ডুবে গেছে এক বিরাট ৩৭০ মাইল লম্বা জলাশয়ে । এটি নদীর বন্যানিয়ন্ত্রণ ছাড়াও সারা দক্ষিণ চীনে ইলেকট্রিসিটি জোগাচ্ছে । কিন্তু এজন্য প্রায় একলক্ষ লোককে গৃহহীন হতে হয়েছে, এবং আমরা নদীতীরে যে প্রাকৃতিক শোভা দেখলাম, তার চিহ্নমাত্রও আর নেই ! অনেক আর্ন্তজাতিক সংরক্ষণ সংস্থা ও ট্যুরিজম পরিকল্পনার কর্তারা এই প্ল্যান বদলাবার অসফল চেষ্টা করেছেন । এ সেই পুরানো চিরাচরিত প্রশ্ন - পরিবেশ সংরক্ষণ আগে না পেটের ভাত ও পরনের কাপড় ? উহান শহরের বিশেষ দ্রষ্টব্য এক মিউজিয়াম, যা ঐতিহাসিক বাদ্যযন্ত্রের জন্য বিখ্যাত । প্রায় চারশ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে তৈরী এই বিরাট ব্রোঞ্জ ঘন্টা, ড্রাম, ইত্যাদি এক পুরনো কবরে পাওয়া গেছে । এসব এক ধনী সঙ্গীত রসিক জমিদারের কবরে রাখা ছিল । এই ভদ্রলোকের মমিও এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে । গল্প আছে যে এঁকে নাকি বিষ দিয়ে মারা হয়েছিল । সে বিষ কোন অজানা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এত হাজার বছর পরেও দেহটি মোটামুটি সংরক্ষিত করে রেখেছে । এ নিয়ে কোন রকম বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই ।

    পুরনো চীনে সম্রাট ও অন্যান্য ধনীদের সমারোহ করে সমাধি দেওয়া হত । যদিও সঙ্গে অনেক সোনাদানা ইত্যাদি রাখা হত, তবু কবরের বাইরেটা একেবারেই সাদামাটা মাটির ঢিপি । বেইজিং ও শি-আন শহরের আশেপাশে এরকম অনেক ঢিপি দেখা যায় । যার ওপরে হাজার বছর ধরে চাষীরা লাঙ্গল চালাচ্ছে । সবাই জানে কোন সম্রাটের দেহ ও সঙ্গে কত জিনিস কোন্‌ ঢিপিতে পোঁতা, কিন্তু কারুর খুঁড়ে দেখার কোন আগ্রহ নেই । কবরের খবর চীনা ইতিহাসে নিখুঁত ভাবে লেখা, কিন্তু কম্যুনিস্ট সরকার থেকেও এসব সংরক্ষণ, গবেষণা বা মিউজিয়ামে প্রদর্শন করার কোনও চেষ্টা নেই । স্থানীয় চাষীরা কখনো মাটির ওপর হাজার বছরের পুরনো জিনিস কুড়িয়ে পায় এবং সেগুলো চটপট কালোবাজারে চড়াদামে বিক্রী করে । সরকারী বাধা সত্ত্বেও আমি দেখেছি ভালো ভালো ঐতিহাসিক মূর্ত্তি ইত্যাদি হংকং, সিঙ্গাপুর পাচার হয়ে যাচ্ছে - সেখান থেকে হয়তো কোন ধনী আমেরিকানের প্রাসাদে । ভেবে দেখুন, অন্য কোন দেশে এরকম ঐতিহাসিক কবরস্থান অরক্ষনীয় ভাবে রাখা কল্পনাও করা যায় না ।

    এদেশের সরকারের ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও সংরক্ষণের ব্যাপারে ভীষণ আলস্য ও উদাসীনতা । হয়ত এসব ব্যাপার বুর্জোয়া বিলাসিতা বলে মনে করেন । রাজধানী বেইজিংয়ে ভাল মিউজিয়াম বলতে কিছুই নেই । কালচারাল রেভলুশনের সময় কম্যুনিস্ট সৈন্যরা ইচ্ছা করেই মিং সম্রাটের মমি, এবং হাজার রকম রেশম কাঠের ও কাগজের জিনিস পুড়িয়ে ফেলেছে । মন্দির ও প্যাগোডা লুট করেছে । এতে যে চীনের ও সমস্ত পৃথিবীর কতখানি অপূরণীয় ক্ষতি হল তা ভাবাও যায় না । সেইজন্যই তাইওয়ান আলাদা হয়ে যাওয়ার সময় ন্যাশনালিস্ট চীনারা মূল্যবান জেড, মুক্তা, হাতীর দাঁতের জিনিস, সিল্ক, পেন্টিং সব লুকিয়ে তাইওয়ানে নিয়ে এসেছিলেন । এখন তাইপেই-এর মিউজিয়ামে চীনের শিল্প ও সংস্কৃতির যে নিদর্শন দেখা যায় তা, মূলদেশ চীনের কোথাও পাওয়া যাবে না । এ নিয়ে চীনের বুদ্ধিজীবিদের খুব আক্ষেপ, তবু আমার মতে এই-ই ভাল, না হলে এ সবই হয়ত পুড়ে ছাই হয়ে যেত ।

    এখনও চীনে নৃবিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে গবেষণায় কোনও সরকারী সাহায্য পাওয়া যায় না । বেইজিং-এর পিকিং ইউনিভার্সিটিতে স্মিথসেয়ালের সাহায্যে সম্প্রতি একটি ছোট্ট মিউজিয়াম খোলা হয়েছে । শি-আনের মিউজিয়ামই বোধহয় চীনের সবথেকে বড় । উহানের মত শহরে তো মিউজিয়ামের অবস্থা খুবই খারাপ । খোলা জানলা দিয়ে রোদ, হাওয়া আসছে । শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা নেই । আলোর বন্দোবস্তও খারাপ । এরকম অবস্থায় পুরনো ভঙ্গুর এইসব জিনিষ কতদিন টিঁকে থাকবে তা বলা মুশকিল ।

    আমাদের স্টীমারের নাম এম. এস. বাশান । ছোট্ট স্টীমার, প্রায় পঞ্চাশজন লোক ধরে । ক্যাপটেনের নাম সিগমন্ড ও আমাদের চীনা গাইডের নাম ক্যাথি । এদেশে এখন পশ্চিমী নামের খুব চল হয়েছে । সত্তরের দশকের সময় মাও-য়ের আদেশে বাচ্চাদের চীনা নাম দেওয়া হত যেমন "আমেরিকা হটাও" বা "ইংরাজ দমন করো" ইত্যাদি । আজকাল সবাই এসব নাম বদলে ফিলিপ, ডেবি ইত্যাদি নাম নিচ্ছে । ক্যাথি বেইজিং-এর মেয়ে । মোটামুটি ইংরাজী বলতে পারে । ওর সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেছিল । এরকম নদীযাত্রায় ভারতীয়দের খুব একটা কেউ যায় না । তাই, আমার মুখে চীন সম্পর্কে যত প্রশ্ন, ওর কাছেও ভারত সম্পর্কে ততই । আমি অবশ্য সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে তেমন অবহিত নই । আমার মনে আছে ছেলেবেলায় চীন-ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ, তাই ভাবলাম এ সম্বন্ধে ওর ধারণাটা কী জিজ্ঞেস করি । কিন্তু সাধারণ চীনাদের ঐ যুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞান খুবই কম । সেই সময় সবাই কালচারাল বিপ্লবের ধাক্কা সামলাতেই ব্যস্ত ছিল । সাম্প্রতিক ভারত সম্বন্ধেও ওদের ধারণা খুবই আবছা । আমাকে অনেকেই জিগ্যেস করেছে, ভারত কেন অন্যান্য পূর্ব এশীয় দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক ব্যাপারে যোগ দেয় না । ভারত কী নিজেকে খুব উঁচু দরের মনে করে ? আরও প্রশ্ন ভারত কেন ঠিকমতো জন্ম নিয়ন্ত্রণ করছে না । পশ্চিমী দেশে চীনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যতই সমালোচনা হোক না কেন, বেশির ভাগ চীনাই "এক পরিবার একটি শিশু" সরকারী নিয়মের সাফল্য নিয়ে বেশ গর্ববোধ করে ।

    জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথায় একটি মজার গল্প মনে পড়ল । বেইজিং-এ ক্যাথি একদল আমেরিকান মহিলাদের চীনের ফ্যামিলি প্ল্যানিং বোঝাচ্ছে । সরকারী নিয়মমতো প্রতি পরিবারে একটিমাত্র শিশুর জন্ম দেওয়া চলবে । পরে অন্য কোনো গর্ভ অ্যাবর্শন করে বিনাশ করতে হবে । শুনে তো ক্যাথলিক মহিলাদের চোখ কপালে ! অ্যাবর্শন তো মহা পাপ ! একজন ভদ্রমহিলা ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, "যমজ বাচ্চা হলে কী করো তোমরা ?" ক্যাথির মাথায় একটি দুষ্টুবুদ্ধি এল । সে খুব গম্ভীর মুখে বলল "সরকারী নিয়মের তো কোনও ছাড় নেই । তাই তোমায় বাছতে হবে, দুজনের মধ্যে কোন্টিকে নেবে ।" শুনে মহিলাদল প্রায় মূর্ছা যান আর কী । ক্যাথি আর হাসি চাপতে পারল না । হাসিতে ফেটে পড়ে বলল "আমাদের কী ভেবেছ তোমরা, আমরা কী এতই অমানুষ ? যমজ জন্ম তো চীনে শুভ । অবশ্যই আমরা দুই শিশুই রাখবো ।"

    "এক পরিবার, এক শিশু" নিয়ম হয়েছে প্রায় কুড়ি পঁচিশ বছর হল । ইতিমধ্যে এক প্রজন্ম গড়ে উঠেছে যাদের কোনও ভাইবোন নেই । নেই কোনও মামাতো, খুড়তুতো, পিসতুতো, মাসতুতো দাদা বা দিদি । নেই কোনও ভাইপো, ভাগ্নে । পরের প্রজন্মে থাকবে না কোনও কাকা, জ্যাঠা, মাসী, পিসি । এরকম সমাজ অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা । কেমন হবে ভাবতে ভয় করে । এমনিতেই চীনের দশ বারো বছরের ছেলেরা (ছেলেই বেশী । ভারতের মতোই এরা মেয়েদের চেয়ে ছেলেই পছন্দ করে) বাপমা, ঠাকুমা, দিদিমার অতি যত্নের চোটে চেহারায় বেশ মোটা মোটা ও মেজাজে ভীষণ আদুরে ও দেমাকী । চীনারাই ঠাট্টা করে ওদের বলে "লিট্ল এম্পারার" বা "ছোট্ট সম্রাট" । দেশভর্তি এইরকম ছোট্ট সম্রাটরা বড় হয়ে উঠলে, সমাজের অবস্থা কী রকম দাঁড়াবে কে জানে ! তবু, এরকম কঠিন নিয়ম না করলে চীনের জনসংখ্যা এতদিনে দুগুণ হয়ে যেত ওদেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর সৃষ্টি হত তাই, এই নিয়ম ভাল কী মন্দ, সময়ই তার বিচার করবে, কিন্তু চীনের এই সাহসী পরীক্ষায় আমরা বাহবা না দিয়েই পারি না ।

    উহান পেরিয়েই প্রথম গর্জটির নাম শিলিংগর্জ । তিনটির মধ্যে, এটিই সবচেয়ে লম্বা । প্রায় পঁচিশ মাইল । দুপাশে খাড়া, উঁচু পাহাড়, সরু, খরস্রোতা নদী, চোরাবালি, পাথর ও ঘূর্ণিপাকে ভরা । স্টীমার নৌকা, শুধু দিনের বেলাতেই চলে । রাতের অন্ধকারে পাথরে ধাক্কা লেগে নৌকাডুবির সম্ভাবনা খুব ।

    পাহাড়ের কোণে কানাচে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যায় । বেশীর ভাগই চাষী বা মত্সজীবি । নদী ছাড়া যাতায়াতের কোনও রাস্তা নেই । পর্বত অগম্য জঙ্গল গভীর । দুপাশে নানা অদ্ভুত আকৃতির পাহাড় । হাজার বছর ধরে মানুষের কল্পনায় নানারকম নাম দিয়েছে । সিগমন্ড দেখাচ্ছিল - একেকটার অদ্ভুত নাম - যেমন ষাঁড়ের যকৃৎ বা ঘোড়ার ফুসফুস ইত্যাদি । (বিশ্বাস করুন, আমি মোটেই বানিয়ে বলছি না ।) আমি অবশ্য অনেক চেষ্টা ওসব কল্পনা করতে পারিনি । অনেক নামের সঙ্গে হয়তো পুরাকালে কোনও কাহিনী ছিল, এখন আর তা জানা যায় না । যেমন লন্ঠন পাহাড়, হলুদ বিড়াল ইত্যাদি । এখানে ওখানে দু-তিনশ বছরের পুরনো বুদ্ধ মন্দির দেখা যায় । যখন নদীতে কুয়াশা নামে, পাহাড়ের চূড়াগুলো ঝাপসা হয়ে যায়, তখন সমস্ত দৃশ্যটিকে কোনও পুরনো চীনা জলরঙের মতই অলীক ও মায়াবী মনে হয় ।

    শিলিং গর্জেই এক জায়গায় চিবি নামে একটি লালচে রঙের পাহাড় । সেখানে ২০৭ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণের রাজা ঝাও উ সঙ্গে উত্তরের সম্রাট চাও চাওয়ের মহাযুদ্ধ হয় । সেটা চীনা ইতিহাসে প্রায় কিংবদন্তী হয়ে আছে । শুধু তিরিশ হাজার সৈন্য নিয়ে ঝাও উ চাও চাওয়ের আট লক্ষ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন । এবং এটাই বোধহয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রথম যুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার । ঝাও উ নদীর বাঁকে লুকিয়ে থেকে বোমা ফাটিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেন চাও চাওয়ের নৌবাহিনীর ওপর । গল্পে বলে নদীর জল রক্তে ও আগুনে লাল হয়ে যায় । এমনকি আশেপাশের পাহাড়ও । সেই লাল পাহাড় এখনও দেখা যায় । এবং লোকমুখে ঝাও উ-র বীরত্বের কাহিনী শোনা যায় এখনও । এই নিয়ে ট্যাং যুগের বিখ্যাত কবি লি বাও পর্যন্ত কবিতা লিখে গেছেন ।

    শিলিং গর্জের পর আসে উ গর্জ বা ডাইনী গর্জ । এটি আকারে ছোট হলেও চোরাপাই নৌকাডুবির জন্য কুখ্যাত । রাতে আমরা নোঙর ফেলে বসে থাকতাম । শুধু দিনেই ঐ আকাঁবাকা মাইল লম্বা গর্জ পার হওয়া সম্ভব । এই গর্জে জিগুই নামে একটি জায়গায় ৩৩২ খ্রীষ্টপূর্বে এক জনপ্রিয় রাজা চীন সম্রাটের হাতে পরাজিত হয়ে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেন । লোকেরা তখন থেকে প্রত্যেক বছর ঐখানে ড্রাগন উত্সব পালন করে সেই শ্রদ্ধা জানায় ।

    আরেকটু দূরে আছে ফেয়ারী পিক বা পরীর চূড়া । কিংবদন্তী আছে যে স্বর্গের মাতৃরূপী দেবী সবচেয়ে ছোটমেয়ে শি ওয়াংগুয়ান নিজে মর্ত্যে নেমে সম্রাট ইউকে যুদ্ধজয়ে সাহায্য করেন শি ওয়াংগুয়ান পৃথিবীর সাতজন শ্রেষ্ঠা সুন্দরীর একজন । তিনি এখনও পরীর চূড়ায় বসে দুর্গম পথে যাত্রীদের সাহায্য করেন ।

    সারা ইয়াংজী নদীই এইরকম গল্প, কিংবদন্তীতে ভরা । অনেকটা আমাদের গঙ্গা যমুনার মতই । ঊ গর্জের পরে আসে একটা ছোট্ট শহর উশান । পাশ দিয়ে নেমে এসেছে ছোট্ট শাখা নদী ডানিং ডানিং-এর সবুজ জল উশানে ইয়াংজীর বাদামীজ মেশে । ডানিং নদীটি আরও গভীর জঙ্গল আরও সঙ্কীর্ণ তিনটি গর্জের মধ্য দিয়ে বয়ে এসেছে । তিনটির নাম ড্রাগন গেট, মিস্টি গর্জ ও এমারেল্ড গর্জ । বলা বাহুল্য এসবই ইংরাজদের দেওয়া নাম । কোনও চীনা নাম নেই । নদীটির দুপাশে খাড়া পাহাড়, উঁচু জঙ্গল ও স্ট্যালাক্টাইট ঝোলানো রহস্যময় গুহা । দুপাশে ঘন সবুজ বাঁশের জঙ্গলে অজস্র বানর, হরিণ ও বোধহয় পৃথিবীর সর্বশেষ কয়েকটি পান্ডা ভালুক । নদীর বাঁকে ছোট্ট বীচে ছড়িয়ে আছে নানা রঙের নুড়ি বা অজস্র ফুলের রাশি । দক্ষিণ চীনের এই জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা উজ্জ্বল মুক্তার মত সুন্দর এই জায়গাটি । ভাবলেই খারাপ লাগে যে আরও দুবছরের মধ্যে এ সবই ষাট ফুট জলের তলায় ডুবে গেল ।

    ডানিং নদীতে আমাদের স্টীমার চলবে ন । তাই একটি ছোট্ট মোটর লাগানো নৌকা নিয়ে উজানে যাচ্ছিলাম । পথে পড়ল সিলভার র্যাপিড বা জলপ্রপাত । তার দুর্ধর্ষ স্রোত বেয়ে ওপরে ওঠা মোটর বোটের পক্ষেও মুশকিল । আরওঅ দুটো নৌকা দড়ি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে আমাদের ওপরে তুলল । আর যে সব গরীব শামপানের মোটর নেই, তাদের রো নিজে নিজে ওঠার প্রশ্নই ওঠে না । তাদের জন্য আছে পেশাদার নৌকা টানার লোক । তারা পিছল পাড়ে দাঁড়িয়ে দড়ি দিয়ে নৌকা বেঁধে টেনে তোলে জলপ্রপাতের ওপর । সে এক দেখবার দৃশ্য ! দশজন মিলে নৌকা টানছে হঠাৎ নৌকায় বাঁধা গিঁটটা খুলে গেল । নৌকাটা তখন মাঝ প্রপাতে । শাঁ করে এক পাক ঘুরেই তীরবেগে পিছিয়ে গেল । ভাগ্যিস্‌ ডুবে যায়নি । তারপর আবার দড়িদড়া বাঁধা ও মাঝিদের বকুনি খাওয়া ।

    ডানিং গর্জগুলির একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো পাহাড়ের গায়ে খাঁজ কেটে ঝোলানো কফিন । প্রায় পনের'শ বছর আগে এই দুর্গম অঞ্চলে `বা' নামের আদিবাসীদের বসতি ছিল । পাহাড়ের গুহায় থাকত এবং নদীই ছিল যাতায়াতের রাস্তা । নদী ও জঙ্গল দুর্গম বলে বাইরের সভ্যতার সঙ্গে বিশেষ পরিচয় হয়নি । এরা কোন্‌ শতাব্দীতে কীভাবে উত্খাত হয় তা আমার জানা নেই । অবশ্য এদের সম্বন্ধে বিশেষ কোনো গবেষণাই হয়নি এখনো । মৃতদেহ কবর দেওয়ার মত মাটি নেই বলে এরা পাহাড়ের কোণে, কানাচে দড়ি বেঁধে কফিন ঝুলিয়ে রাখত । কোনোটা বা পাহাড়ের খাঁজে গুঁজে রাখা । এরকম প্রায় চল্লিশটি কফিন নদী থেকে দেখা যায় অত্যন্ত দুর্গম বলে কেউই এগুলো নামাবার চেষ্টাও করেনি । একটা কফিন শুধু উশানের ছোট্ট মিউজিয়ামে রাখা আছে । তাতে দেখা যায়, পনের'শ বছরের পুরনো দুটি কঙ্কাল । একটি পুরুষ ও একটি নারীর । দুজনেই মধ্যবয়সী । নারীটি অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সী তার মাথার করোটিতে একটি বিরাট গর্ত । যেন কে লাঠি মেরে মাথা ফাটিয়েছে । সম্ভবত: পুরুষটি কোনো প্রাকৃতিক কারণে মারা যাওয়ার পর জোর করে স্ত্রীকেও মেরে ফেলে একই কফিনে কবর দেওয়া হয় । হয়তো সতীদাহের মত এদেরও এই-ই প্রথা ছিল । এ নিয়ে কতই না গবেষণা করা যায় । কিন্তু হায়, চীনে কারুরই এ সব নিয়ে মাথাব্যথা তো নেই-ই, বাঁধের জল থেকে রক্ষা করার জন্য কফিনগুলি শুকনো ডাঙায় তোলার পর্যন্ত কোনো চেষ্টা হচ্ছে না । স্থানীয় লোকেরা এ বিষয়ে খুবই হতাশ । এখনতো এসবই জলে ডুবে গেছে চিরতরে ।

    উশানের ছোট্ট মিউজিয়ামটার চেষ্টা দেখে মনে পড়ে শি-আনের কথা । শি-আনে সরকারের আগ্রহ শুধু টৈরাকোটাঅ সৈন্যদের দেখিয়ে ট্যুরিস্ট আকর্ষণ করার । এছাড়াও শি-আনের আশে পাশে ছড়িয়ে আছে হান ও ট্যাং যুগের অজস্র নিদর্শন । শহরের ঠিক বাইরেই আমরা ২০০ খ্রীষ্টপূর্বের হান যুগের একটি খনন স্থান দেখলাম । চীনের একজন বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক একেবারেই একা একা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । মাটি খুঁড়ে দুর্মূল্য মূর্তি, রথ ইত্যাদি আবিষ্কার করেছেন । পয়সা ও জায়গার অভাবে কাছের এক গ্রামে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া করে জমাচ্ছেন সে সব । অন্য কোনো দেশ হলে এরকম ঐতিহ্যপূর্ণ বিষয়ে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যেত । কিন্তু এই ভদ্রলোক সরকারী বা প্রাইভেট কোনো সাহায্যই পাচ্ছেন না ।

    উশান ছাড়িয়ে আরও কিছুদূর গেলে পড়ে কিটাং গর্জ । এটি সবচেয়ে ছোট - প্রায় পাঁচ মাইল লম্বা । কিটাং ছাড়িয়ে আরও উত্তর পূর্বে গেলে পড়ে ওয়ান শিয়ান নামে একটি শহর । ওয়ানশিয়ানে ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য বলে বিশেষ কিছু নেই । কিন্তু আছে চীনের বিখ্যাত রেশম ও কার্পেট তৈরীর কারখানা । রেশমী গুটিপোকা গুলিকে গরম জলে প্রথমে সেদ্ধ করে নেয় । তারপর খুব যত্ন করে রেশমী সুতো গুটি থেকে টেনে বের করে । গুটিটি একদম শেষ হয়ে গেলে ভেতরের মরা পোকাটা বেরিয়ে পড়ে । সুতো জট ছাড়িয়ে পরিষ্কার করে নেয় । চীনের রেশম শিল্প হাজার বছরের পুরনো । এখান থেকেই সিল্করুটে রেশম যেত মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া ও ভারত এবং আরও দূরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ । একটা সিল্কের শার্ট তৈরী করতে লাগে প্রায় দুইহাজার গুটি পোকা । একটা সিল্কের শাড়ীতে কত লাগবে কে জানে ।

    মরা গুটিপোকা গুলোও ফেলা যায় না (চীনে কোনো কিছুই ফেলা হয় না ।) সেগুলি গরম তেলে ভেজে বিয়ারের সঙ্গে খেতে নাকি খুব ভালো । বাড়তি পোকাগুলো কোনো প্রসাধনী ত্রক্রীমে মেশানো হয় । এতে নাকি ত্বক "রেশম কোমল" হয় !

    সিল্কের জিনিসের দামও খুব সস্তা নয় । আমি একটি স্কার্ফ কিনেছিলাম - আঠরো ইউরো দাম । (এক ইউয়ান তখন প্রায় ভারতীয় একুশ টাকা)

    ওয়ানশিয়ানেই আমি প্রথম পা বাঁধা চীনা মহিলা দেখি । পা বাঁধার প্রচলন চীনে অনেক বছর ধরে । এই শতাব্দীতে কম্যুনিস্ট সরকার পা বাঁধা বেআইনী করেছেন । তাই খুব বুড়ো বয়সে না হলে পা বাঁধা মহিলা দেখাই যায় না । ছোট্টবেলা থেকেই পায়ের পাতার হাড়গুলো দুমড়ে-মুচড়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হত যাতে পা বাড়তে না পারে । পায়ের সাইজ হতো চার ইঞ্চি মত । সেটা নাকি ছিল মেয়েদের সৌন্দর্য্যের প্রতীক । ছোট্ট পায়ে টুকটুক করে হাঁটা খুব সেক্সি বলে মানা হত । ওরকম পায়ে হেঁটে কায়িক পরিশ্রম করা মুশকিল, তাই নিম্নশ্রেণীর মেয়েদের পা বাঁধা হত না । অতএব কালক্রমে পা বাঁধা শুধু সৌন্দর্য্যের নয়, আর্থিক স্বাচ্ছন্দের প্রতীক বলে সাব্যস্ত হল । অনেকটা পশ্চিমী দেশে দামী হাই হিল জুতার মত । দামও খুব আর পায়েরও অনেক ক্ষতি করে । তবুও সৌন্দর্য্যের নামে মেয়েরা যুগ যুগ ধরে অনেক অত্যাচারই সহ্য করে এসেছে ।

    আমার মতে বনসাই শিল্প পা বাঁধার মতই নিষ্ঠুর । আমি শাংহাই শহরের বুদ্ধ মন্দিরের প্রাঙ্গনে একটি বনসাইয়ের **** সবাই খুব তারিফ করছিল, কিন্তু আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল তার দিয়ে বেঁধে, ডালপালা ছেঁটে অপ্রাকৃতিক ভাবে একটি বিরাট মহীরুহকে কীরকম চার ইঞ্চি সাইজ করে রেখেছে । অবশ্যই, আর কেউই আমার সঙ্গে এ বিষয়ে একমত নন । এই নিয়ে সিগমন্ডের সঙ্গে আমার প্রায়ই তর্ক হত ।

    ওয়ানশিয়ান থেকে আমরা আবার চললাম নদীর উত্সমুখে । স্টীমারে বসে চারিদিকের দৃশ্য দেখতে দেখতে বেশ সময় কেটে যায় । আমাদের দলে একজন দোভাষী ছিল । ছেলেটি জন্মে ইটালিয়ান, বড় হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, পড়েছে বার্কলী ও নানজিংয়ে, এখন থাকে চীনে । এই নদীতে ওর অনেক চেনা লোক । ও খুব ভালো মান্দারিন বলে । আমাকে অবসর সময় একটু চীনাভাষা শেখাত । ওর নাম অ্যাটম । বাংলায় সংক্ষিপ্ত অনুবাদ হবে অণু । তাই আমি ওকে অণু বলে ডাকতাম । ওর কাছে শিখেছিলাম ডজন খানেক চীনা কথা - যা ট্যুরিস্টের খুব কাজে লাগে । যেমন, `নমস্কার', `সুপ্রভাত', `ধন্যবাদ', `এর কত দাম', `বাথরুমটা কোথায়' ইত্যাদি । একদিক দিয়ে চীনা ভাষা বলা সোজা, ব্যাকরণের নিয়ম ইংরাজী বা বাংলার চেয়ে অনেক সহজ । কিন্তু মুশকিল হল লেখা নিয়ে । অন্যান্য ভাষার মত অ্যালফাবেট নেই । আছে প্রায় দশ হাজার হায়ারোগ্লিফিকের মত ছবি আঁকা অক্ষর ও শব্দ । অনেকেই সবটা জেনে উঠতে পারেন না । আসলে সাধারণ কাজকর্মে চারশ'র বেশী জানারও দরকার নেই । আমি স্টীমারে তিনদিন সময়ে শিখেছিলাম আটটি অক্ষর । অণুর মতে এই-ই যথেষ্ট । চীনা অক্ষরগুলি বেশ মজার । তিনটে গাছ আঁকলে মানে দাঁড়ায় জঙ্গল । একটা মানুষ হাত পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে (এখানে একটা চিহ্ন হবে ***) মানে `ডা' বা বড় । `আন' বা শান্তির চিহ্ন হল এক গর্ভিনী নারীর প্রোফাইল ও মাথার ওপরে ছাত (ফেমিনিস্টরা নিশ্চয়ই এটা পছন্দ করবেন না) । সমুদ্র বা যেকোনো `জল' শব্দের চিহ্নে আঁকা হয় জলের ফোঁটা । অজানা অক্ষরের মানে আন্দাজ করাটা বেশ মজার খেলা ।

    চীনা ভাষার উচ্চারণ গত দশকে বদলে গেছে । আমাদের পরিচিত পিকিং হয়েছে বেইজিং । মাও-সে-তুং হয়েছেন মাও-জে-দং । পুরনো উচ্চারণ (Wade-Giles) দক্ষিণ চীন বা ক্যান্টন এলাকা থেকে নেওয়া হয়েছিল । এদের সাবেকী ভাষা মান্দারিনের উচ্চারণ Pinyin মতে । এবং এটা এদের মতে সঠিক উচ্চারণ ।

    চীনা ভাষা শেখার সবথেকে মুশকিল হল মৌখিক ভাষার বিভিন্ন সুরের ব্যবহার । মান্দারিন ভাষায় চারটি সুর ব্যবহার করা হয় (ক্যান্টনীয় ভাষায় নয়টা সুর চলে !)। একই শব্দ চার রকম সুরে বললে চার রকম আলাদা মানে হয় । যেমন মা - সোজা সুরে বললে মানে হয় মা ।
    মা / ওপরে সুর তুলে বললে মানে হয় পাটের দড়ি ।
    মা নীচু সুরে বললে মানে হয় নালিশ করা ।
    মা প্রথমে নীচু, তারপরে উঁচু মানে ঘোড়া । এবং ছোট্ট জিজ্ঞাসার সুরে `মা' মানে প্রশ্ন করা । কিছুক্ষণ মা-মা প্র্যাকটিস করার পর বুঝলাম চীনা ভাষা আয়ত্ত করা কত শক্ত । ইন্দো ইয়োরোপীয় ভাষার থেকে এটা একেবারে আলাদা । ঠিক করলাম ভবিষ্যতে কোনোদিন ভাল করে শিখতে হবে ।

    ওয়ানশিয়ান থেকে পাঁচঘন্টা পাড়ি দিয়ে পৌঁছই একটি ছোট্ট গ্রাম শিবাওজী । নদী থেকে পাড়ে উঠতে গেলে বেশ খাড়াই পথ । ট্যুরিস্টদের আরামের জন্য নদীর তীরে সারি সারি সিডান চেয়ার - অনেকটা ছোট্ট পাল্কীর মত । আপনি উঠে বসলেন আর দুটি লোক কাঁধে তুলে নিয়ে চললো । সাবেকী আমলে চীনে এর খুব চল ছিল । এখন শুধু ট্যুরিস্ট আকর্ষণের জন্যই । শিবাওজীর মত ছোট্ট গাঁয়ে নদীর ট্যুরিস্ট ছাড়া বিশেষ উপার্জনের রাস্তা নেই । নতুন বাঁধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এইসব গাঁ-ও তলিয়ে গেছে । সরকার প্রতি পরিবারকে কিছু টাকা দিয়েছেন, যাতে উঁচু ডাঙায় নতুন বসতি করতে পারে । এই টাকার লোভে কিছু লোক জেনেশুনেও নদীর ঠিক ধারে তাড়াতাড়ি কুটির বানাচ্ছে যাতে চটপট ভেঙে ফেলে সরকারের কাছ থেকে আরও দু'পয়সা উপরি পাওয়া যায় ।

    শিবাওজী গ্রামে একটি পুরনো বুদ্ধ মন্দির আছে । কথায় আছে তিনশ বছর আগে সেই মন্দিরের দেয়ালে একটি গর্ত দিয়ে চাল পড়ত । ঠিক উপাসকদের খাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই । এমনই চলছিল বেশ কয়েকবছর । তারপর একজন উপাসক লোভের বশে গর্তটা বড় করে ফেলে । আরও বেশী চাল বিক্রী করে লাভ বাড়াবে বলে । কিন্তু ফল হল ঠিক উল্টো । অতি লোভের শাস্তি স্বরূপ গর্তটা একেবারেই শুকিয়ে গেল । গল্পটা সত্যি কিনা জানিনা তবে গর্তটা সত্যিই ।

    অণূর সৌজন্যে আমি শিবাওজী গ্রামে ওর এক বন্ধু গ্রামীন চীনা ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম । তাঁর নাম ডাক্তার ওয়ং জিং রং । তিনি শুধু চীনার প্রাচীন মতে চিকিত্সা করেন । (অনেকটা আমাদের ভারতীয় আয়ুর্বেদের মত)।

    অণূর দৌলতেই আমি শাংহাইয়ে চীনের `আধুনিক' হাসপাতাল দেখাসাক্ষাৎ করতে পেরেছি । সাধারণত: এসবের জন্য সরকারী অনুমোদন পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় । অণু ও ক্যাথির জন্য আমাকে কিছুই করতে হয়নি । ওরাই আমার দোভাষীর কাজও করেছিল ।

    শাংহাইয়ের অভিজ্ঞতার কথাটাই আগে শাংহাইয়ের শিংগুয়া জেনারেল একটি বিরাট দু'হাজার বেডের হাসপাতাল । আধুনিক এযালোপ্যাথি চিকিত্সার মোটামুটি সব সরঞ্জামই মজুদ । যদিও একটি আধুনিক আমেরিকান হাসপাতালের তুলনায় বেশ সেকেলে কিন্তু কোনো ভারতীয় মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের মতই অবিকল । ভিড়, বেশ নোংরা, পেচ্ছাপের গন্ধ এখানে ওখানে । তবু, ডাক্তাররা খুবই দক্ষ এবং খুবই উন্নত মানের চিকিত্সা চালাচ্ছেন । যে সব রোগ দেখলাম, দেশ ছাড়ার পর সে সব অনেকদিন দেখিনি । বেশ লাগছিল, মনে হচ্ছিল আমার পুরনো হাসপাতালে ফিরে গেছি । বেশিরভাগ রোগীই কঠিন রোগাক্রান্ত । অল্প সল্প অসুখের জন্য ডাক্তারী বাড়িতেই হয় । সরকার সব খরচ দেন । ছোটখাট রোগে এঁরা অনেকেই চীনের পুরনো পদ্ধতির চিকিত্সা প্রথমে করেন, তা ঠিক না হলে পশ্চিমী পদ্ধতিতে হাসপাতালে চিকিত্সা হয় ।

    ভারতে যেমন আয়ুর্বেদী, য়ুনানী, হোমিওপ্যাথির আলাদা আলাদা প্র্যাকটিস চলে, চীনে কিন্তু তা নয় । চীনের পুরনো চিকিত্সা অনেক বেশী জনপ্রিয় । প্রায় হাজার বছর ধরে এর ত্রক্রমাগত উন্নতি হয়েছে এবং চলে । চীনের এই ***** কোরিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে । ইদানীং আমেরিকা, ইউরোপেও অনেক ত্রক্রনিক রোগের জন্য চীনা পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে । অনেক ক্ষেত্রে ভাল ফলও দেখা যাচ্ছে । যেমন আমেরিকায় বড় ক্যান্সার হাসপাতালে দু:সহ ব্যথার উপশম পাওয়া যাচ্ছে অ্যাকুপাংচার করে, যদিও এ উপায়ে ক্যান্সার সারে না কিন্তু ব্যথাটা সত্যিই কমে যায় । পুরনো চিকিত্সা বিদ্যা শেখবার জন্য চীনে আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল রয়েছে । সমস্ত বড় বড় হাসপাতালেই (যেমন শিংগুয়াতেও)। একই বিল্ডিং-এ অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি পুরনো চিকিত্সাও চলছে । বলা বাহুল্য, চীনা ডাক্তারীর ওয়ার্ডে পেচ্ছাপের গন্ধ অনেক কম । কড়া শেকড় বাকড়ের গন্ধেই ভরপুর ।

    চীনের পুরনো ডাক্তারীতে হাজার রকম ফল-মূল, পাতা, শেকড়, নানা রকম প্রাণীর রক্ত, চামড়া, হাড়, পিত্ত ইত্যাদির ব্যবহার চলে । যে কোনো বড় শহরে আপনি যদি কোনো চীনা ডিসপেনসারীতে ঢোকেন তো দেখবেন এক এলাহী ব্যাপার ! কচ্ছপের খোলা, সাপের পিত্ত, গন্ডারের শিং থেকে এহেন জিনিস নেই যা পাবেন না । চীনা ডাক্তারদের মতে এসবেরই কিছু না কিছু ঔষধি গুণ আছে । ভারতীয় উদ্ভিদের মতই অনেক চীনা শিকড় পাতা থেকে কড়া পশ্চিমী ওষুধ তৈরী হয়েছে ।

    চীনেও ভারতের মতই পশ্চিমী চিকিত্সা এসেছে ইংরাজদের সঙ্গে । তার আগে চীনা পদ্ধতিই একমাত্র চিকিত্সা ছিল । শিবাওজীতে ডাক্তার ওয়ং-এর সঙ্গে কথা বলে এবিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম । আয়ুর্বেদের মতই এরাও নাড়ী দেখাটা খুব জরুরী মনে করেন । এবং নাড়ী দেখে শুধু হার্টেরই নয় যকৃত্‌, কিডনী ইত্যাদির খবরও জানতে পারেন । এছাড়াও আছে ইন ও ইয়াং (নারী ও পুরুষ) রূপের থিয়োরী; চি বা প্রাণশক্তি সারা শরীরে বইছে; এবং সারা শরীরে শিরা প্রতিশিরার মত অ্যাকুপাংচারের লাইন আঁকা; যেমন পিঠের ব্যথার জন্য একটি পাতলা সরু ছুঁচ ঠোঁট ও নাকের ঠিক মাঝখানে ফুটিয়ে দেয়া হল, তাতে অকল্পনীয় ভাবে পিঠের ব্যথাটাও কমে গেল ! ডাক্তার ওয়াং-এর ডাক্তারী অফিসে আছে পুতুলের ওপর আকুপাংচারের লাইন কাটা, আর হাজার রকম শেকড় বাকড় বাক্স ভর্তি । এসবই এখানকার ডাক্তারের দরকার । চীনের এই চিকিত্সা এতই জনপ্রিয় হয়ে পড়ছে যে অন্যান্য দেশেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে - যেমন আফ্রিকায় গন্ডারের সংখ্যা খুব কমে গেছে কারণ গন্ডারের শিং দিয়ে চীনা ওষুধ তৈরী হয় বলে । জিনসেং বলে এক ধরণের শেকড় তো আমেরিকায় খুব ফ্যাশন, খেলে নাকি যৌনশক্তি বাড়ে । শেকড়টা দেখলাম অনেকটা মানুষের মত । চীনা নাম `রেন' বা মানুষ ।

    চীনা ডাক্তারীতে সাপের খুব গুরুত্ব । এরা ভালবেসে ডাকে শে-দান বা ছোট্ট ড্রাগন । ড্রাগন এদের শুভ প্রতীক । তাইওয়ানে খুব সাপ । তাইপেই এর পুরনো বাজারে দেখেছি সাপের তাজা রক্ত বিক্রী হয় । সাপের রক্ত টনিকের মত - শরীরে তাগদ বাড়ে । দোকানের সামনে পর্দার মত ঝোলে সারি সারি জ্যান্ত সাপ । আর ব্যস্ত খদ্দেরদের লম্বা লাইন । লম্বালম্বি করে সাপগুলোকে চিরে দিয়ে টাটকা রক্ত গেলাসে ঢেলে দেয় ও খদ্দেররা সেখানেই দাঁড়িয়ে খেয়ে নেয় । সাপগুলো তখনও নড়ছে আর টপটপ করে রক্ত পড়ছে সামনে কাদামাটিতে । সে দৃশ্য ভোলবার নয় !

    ডাক্তার ওয়ং-এর ছোট্ট এক কামরা ডিসপেনসারীতে বসে অণু ও ক্যাথির সাহায্যে কথা বলছিলাম । ডাক্তার ওয়ং আমার কোনো রোগ নির্ণয়ের জন্য চীনা মতে নাড়ী পরীক্ষা করছিলেন আর আমাদের চারপাশে সমস্ত গ্রাম মজা দেখতে ভীড় জমিয়েছিল । (প্রাইভেসির কোনো প্রশ্নই ওঠে না) সবাই ভাঙা চীনা ভাঙা ইংরাজীতে আমায় বোঝাবার চেষ্টা করছিল । বেশ মজা লাগছিল এদের সঙ্গে আড্ডা দিতে । ডাক্তার ওয়াং একজন পাক্কা চেইন স্মোকার । আমি সিগারেট সম্বন্ধে লেকচার দিতেই সবাই হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ল, ডাক্তার নিজেও । কথাবার্ত্তায় জানলুম যে সাধারণ গাঁয়ের লোকেদের স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালই । ম্যালেরিয়া বা মশা নেই । খাবার জল পরিষ্কার । হেপাটাইটিস ও শীতকালে নিমোনিয়া, ব্রংকাইটিসেরই প্রকোপ বেশী । বাচ্চাদের টীকা দেওয়া, প্রসূতি মায়ের দেখাশোনা ইত্যাদি সবই সরকারী ব্যবস্থায় হয় । এইড্স রোগ গাঁয়ে খুব কম, বড় শহরেই বেশী । কিন্তু সরকারী মতে চীনে এইড্স একেবারেই নেই ওটা শুধু বিদেশীদের রোগ । বেসরকারী মতে অবশ্য এ রোগ শাংহাইয়ের বস্তী ও বেশ্যাপল্লীতে বেশ ছড়াচ্ছে । পশ্চিমী সভ্যতার সঙ্গে শহরে ডিভোর্সের হার বেড়েছে । ড্রাগও আমদানী হচ্ছে । বিশেষ করে দক্ষিণ চীনে - বার্মার সীমান্ত হতে । চীনে ড্রাগ চালানোর শাস্তি মৃত্যু । সরকার সমকামীতাও পছন্দ করেন না । এঁদের মতে এইড্স-এর মতো এটাও একটা পশ্চিমী রোগ ।

    আমার খুব ইচ্ছা ছিল অ্যাকুপাংচার নেওয়ার । কিন্তু শত চেষ্টা করেও শরীরে কোথাও কোনো ব্যাথা বা ব্যাধি পেলাম না । বিনা কারণে কোনো ডাক্তারই অ্যাকুপাংচার করবেন না । তাই ভাবলাম অ্যাকুপ্রেশার ম্যাসাজ নিয়ে দেখব । ছুঁচ ফোটানোর বদলে এরা শিরার বিশেষ জায়গায় আঙুল টিপে মাসাজ করে, এতে ব্যাথা বেদনা কমে । কোনো ব্যাথা না থাকায় কোনো উপশমও পাইনি । উপরন্তু ভীষণ জোরে আঙুল দিয়ে চাপ দেওয়ায় আমার শরীর কনকন করছিল । শেষকালে "ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি" অবস্থা ।

    এসব ছাড়াও চীনা ডাক্তারীতে ব্যায়াম ও সঠিক নি:শ্বাস পদ্ধতিকে খুব প্রাধান্য দেওয়া হয় আয়ুর্বেদের যোগ ও প্রাণায়ামের মতই । সেই জন্যই প্রতি শহরে তাই চি ব্যায়ামের জনপ্রিয়তা । আসলে আয়ুর্বেদ ও চীনা ডাক্তারীর মধ্যে অনেক সাদৃশ্য আছে । কেউ এ বিষয়ে কোনো বই বা গবেষণার কথা জানালে বাধিত হব ।

    চীনা ডাক্তারীর একটি দুর্বলতা যে এরা কখনোই শব ব্যবচ্ছেদ করে না, তাই শরীরের ভেতরের কলকব্জা সম্বন্ধে জ্ঞান খুব কম । সার্জারীর চল তো একেবারেই নেই । এইখানেই পশ্চিমী চিকিত্সার কাছে এর হার । এখানে হাসপাতালে মারা যাওয়ার পরেও শব ব্যবচ্ছেদ করা হয় খুব কম । তাই আমি শাংহাইয়ে একজন ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম । "কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট বা মেডিকেল কলেজে ছাত্রদের অ্যানাটমী কি করে শেখান ?" ভদ্রলোক মুচকি হেসে জবাব দিলেন "কেন, জেলে মৃত্যুদন্ড দেওয়া বন্দীরা তো আছেই । তাদের তো আপত্তি করার কোনো অধিকার নেই"। শুনে আমি মানবিক অধিকার সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম । ভাবলাম কোনো লাভ নেই । পরে জেনেছিলাম যে এদেশে বন্দীদেরও মারা হয় খুব হিসেব করে । মাথায় একটি গুলি করলে, হার্ট, কিডনী ইত্যাদি অক্ষত থাকে ও ট্রান্সপ্লান্টে ব্যবহার করা যায় । অথবা বুকে গুলি চালিয়ে মারলে চোখের কর্ণিয়া অটুট অবস্থায় পাওয়া যায় ।

    শিবাওজী ও শাংহাইয়ের ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে দুই ভিন্ন চিকিত্সা পদ্ধতির তুলনা করতে পেরেছিলাম । তার জন্য অণু ও ক্যাথির কাছে কৃতজ্ঞ থাকব । ফেরার সময় ডাক্তার ওয়ং উপহার স্বরূপ আমাকে একটি ছোট্ট শিশিতে সাপের পিত্ত দিয়েছিলেন । খেলে নাকি সর্দি কাশি হাঁপানী ইত্যাদি সেরে যায় । আমি এখনও সেটা চেখে দেখার সাহস করে উঠতে পারিনি ।

    শিবাওজী ছেড়ে নদীতে আমাদের লাস্ট স্টপ হল চিংচং শহর । (পুরনো নাম চুংকিং)। চীনে এইটাই একমাত্র শহর যা পুরোপুরি পাহাড়ের গায়ে তৈরি । বাড়িগুলি খাঁজে কেটে বসানো । নদী ও পাহাড়ে ঘেরা বলে সবসময়ে ঘন কুয়াশা এবং ঝিরঝিরে বৃষ্টি । ঐ শহরেই চীনের ন্যাশনালিস্ট পার্টি ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত রাজধানীর কাজ চালিয়েছিলেন । কুয়াশা ও মেঘে ঢাকা বলে জাপানীরা বোমা ফেলতে পারেনি । এ শহরে সূর্যর মুখ এতই কম দেখা যায় যে কখনো সখনো রোদ উঠলে শহরের সমস্ত কুকুররা নাকি তারস্বরে চেঁচামেচি শুরু করে !

    এসব ছাড়া চংচিং শহরটা চীনের অন্যান্য শহরের মতই । মানুষের ও সাইকেলের ভীড় । শাংহাইয়ের মতো অতোটা না হলেও পশ্চিমী হাওয়া এখানেও চলতে শুরু করেছে । টিনএজারদের প্রিয় জায়গা হল ডিসকো বা কারাওকি বার । কারাওকি মানে রেকর্ডের সুরে গলা মিলিয়ে গান গাওয়া । সব ছেলেমেয়েরাই চীনের জনপ্রিয় গানগুলি এভাবে গাইতে ভালবাসে । এদেশে ভারী সিনেমা খুব চলে । অবশ্য এ সবই বম্বের নাচনকোঁদন ওয়ালা ছবি । উঁচুদরের হিন্দী বা বাংলা ছবির খোঁজ এখানে পাবেন না । এছাড়াও আছে পুরনো আমেরিকান ছবি - "জোরবা দি গ্রীক" বা "গন উইথ দ্য উইন্ড"। আমাদের চীনা গাইড শেষের ছবিটি কুড়িবার দেখেছে । আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ক্লার্ক গেব্ল্‌ ও ভিভিয়ান লী এখন কী করেন । দুজনেই অনেকদিন হল মারা গেছেন শুনে বেচারার কী দু:খ !

    সিচুয়ান খাবারের কথা না বললে চংচিং এমন কী চীনের গল্পও শেষ হবে না । আমি চীনা খাবারের ভীষণ ভক্ত । আর আমার সবথেকে প্রিয় হল ঝাল দেওয়া সিচুয়ান প্রদেশের খাবার । এর তুলনায় ক্যান্টনী খাবার (দক্ষিণ চীন, হংকং) একেবারেই জোলো মনে হয় । তাই চংচিং গিয়ে সিচুয়ান খাবারটা টেস্ট করতে হল । ঝালটা হয় সিচুয়ানের বিখ্যাত লংকার জন্য । এগুলি ছোট, কালচে বাদামী, গোল, গোলমরিচ থেকে একটু বড় সাইজের । শুধু মুখে খেলে একেবারেই অন্য মজা । চংচিং-এর খোলা বাজারে এক দোকানীর বস্তা থেকে দুটো দানা তুলে অণু খেতে দিয়েছিল । আমিও তো দিব্যি না জেনেশুনে কচমচ করে চিবিয়ে ফেললাম । সঙ্গে সঙ্গে ঝাল একটু লাগল বটে কিন্তু তারপরেই জিভ ও ঠোঁট অসাড় হয়ে গেল ! ত্রক্রমশ: অসাড় ভাবটা সারা মুখের ভেতরে গলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো ! আমার মুখের ভাব দেখে অণু, ক্যাথি ও দোকানীটি তো হেসেই কুটোপাটি । মিনিট পনেরো পরে আস্তে আস্তে অসাড় ভাবটা মিলিয়ে গেল । আমি অবশ্য একমুঠো আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলাম বন্ধুদের মজা করে খাইয়েছি ।

    সিচুয়ানের খাবার ছাড়াও বেইজিং-এ মঙ্গোলীয় খাবার খেয়েছিলাম - সেটা অনেকটা মধ্যপ্রাচ্যের মত । এছাড়াও চেখেছিলাম বিখ্যাত পিকিং হাঁস । কিন্তু আমার সবথেকে স্মরণীয় খাবার শি-আনের ডাম্পলিং, ভেতরে নানারকম মাছ, মাংস, সব্জী ইত্যাদির পুর দেওয়া । প্রত্যেকটি ডাম্পলিং হাতে গড়া - নানা রকম আকারের । যেমন চিকেনের পুর দেওয়া ডাম্পলিংটি দেখতে ঠিক একটি ছোট্ট মুরগির মত । কড়াইশুঁটির পুর দেওয়া হলে, দেখতে হবে লম্বা কড়াইশুঁটি, বাদামের পুর হলে ওপরটা হবে ঠিক কাজুবাদামের মত দেখতে । খেতে তো অপূর্ব কিন্তু দেখতেও এত সুন্দর যে ইচ্ছা করে পকেটে পুরে বাড়ি নিয়ে যাই । ছোট্ট বাঁশের খাঁচায় এক এক ডজন টেবিলে দিয়ে যায় ও নিমেষে শেষ হয়ে যায় । ঐ রেস্তরাঁয় শুধু ডাম্পলিং-ই বিক্রী হয় । তারই জন্য রোজ লম্বা লাইন পড়ে ।

    চীনে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মুন ফেস্টিভ্যাল বা চন্দ্রোত্সব নামে এক বড় উত্সব পালন হয় । মেয়েরা হাতেগড়া মুন কেক - ময়দা, ঘি ও চিনিতে ঠাসা - প্রিয়জনকে বিতরণ করেন । পুরনো দিনে এই মুন কেকের ভিতর লুকিয়ে চিঠি পাঠানো হত । এই ভাবেই নাকি মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের আয়োজন শুরু হয়েছিল । এই দিন সব স্কুল অফিস বন্ধ থাকে । সুযোগ থাকলে রাত্রিতে চাঁদ দেখার আয়োজন হয় । পুরাকালে অনেক বিখ্যাত কবি মুন ফেস্টিভ্যালের চাঁদ নিয়ে কাব্য করে গেছেন ।

    মুন কেক এদের অতি প্রিয় । আমি খেয়ে দেখেছি । দেখতে সুন্দর হলেও খেতে শক্ত ও অতিরিক্ত মিষ্টি । চীনা রান্নায় মিষ্টি খাবারের খুব একটা বৈশিষ্ট্য নেই । বাঙালী সন্দেশ, রসগোল্লার ধারে কাছে লাগে না ।

    চীনে থাকাকালীন আমরা সব খাবারই চপস্টিক দিয়ে খেয়েছি । কাঁটা চামচের কোনো বালাই ছিল না । হাত দিয়ে খাওয়া তো নয়ই । রাতারাতি আমরা সবাই চপস্টিকে দক্ষ হয়ে গেছিলাম - না হলে খিদেয় মরতে হত । ভাত খাওয়া থেকে শুরু করে মাছের কাঁটাও আমি এখন চপস্টিক দিয়ে বাছতে পারি । আমরা প্রায়ই বাজী ধরতাম যে কতগুলো চীনা বীয়র খাওয়ার পর কে একহাতে চপস্টিক দিয়ে একটি মটরদানা তুলতে পারে । বীয়র ছাড়াও আছে ভীষণ কড়া ড্রিংক মাও-টাই । চেয়ার মাও নাকি নিক্সনের প্রথম ঐতিহাসিক চীন ভ্রমণে তাঁকে এক বোতল উপহার দিয়েছিলেন । গলা দিয়ে জ্বলতে জ্বলতে পেটে নামতে থাকে । এটা খাওয়ার পর চপস্টিক দিয়ে মটরদানা তোলা সত্যিই কৃতিত্বের ব্যাপার । তিনসপ্তাহের মধ্যে আমি চপস্টিকে এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছিলাম যে প্লেনে ফেরার সময় খাবারের সঙ্গে কাঁটা চামচ দেখে হঠাৎ দিশাহারা হয়ে গেছিলাম ।

    চীনা খাবারের গল্প হল । এবার রাজনীতির কথা কিছু হয়ত বলা দরকার । রাজনীতিতে আমি নিতান্তই নিরক্ষর তাই অল্পেতেই সারবো । চীনকে দেখে মনে হয় রাজনীতির ক্ষেত্রে রাশিয়ার মত অমন ভেঙে চুরমার না হয়ে চীন কেন্দ্রীয় কম্যুনিস্ট শাসন অটুট রেখেই আস্তে আস্তে দেশের লোকদের ধনতন্ত্র সইয়ে নিচ্ছে । কে জানে, এই রকম এক্সপেরিমেন্টের ফলে হয়ত আমরা এক নতুন রাজনীতি দেখতে পাব - যা সবার পক্ষেই মঙ্গলজনক হবে । রাজনীতির এই চাল, কঠিন জন্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি দেখে আমার মনে হয় চীন যেন এক অজানা পরীক্ষায় নেমেছে । ফল অনিশ্চিত । কিন্তু আমরা চীনের ওপর কৃতজ্ঞ, কারণ চীনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনেক কিছুই শিখতে পারি ।

    চীনভ্রমণের সময়, আমেরিকান দলে থাকা সত্ত্বেও, আমি চীনকে দেখেছিলাম ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে । দেখেছিলাম দুই দেশের মধ্যে কত সাদৃশ্য - পুরনো ঐতিহ্য, সভ্যতা ও কৃষ্টি, বিশাল জনবহুল, কৃষিপ্রধান দেহ, জন্ম নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, পরিবেশ দূষণের সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি । কিন্তু অনেক জায়গায় দেখি বিরাট পার্থক্যও । সবথেকে প্রখরভাবে যেটা চোখে পড়ে তা হল কোনোরকম ধার্মিক অনুষ্ঠান বা ধার্মিক সংগঠনের অভাব । আধুনিক কম্যুনিস্ট চীনে ধর্মের কোনো গুরুত্ব নেই ও ধর্ম নিয়ে কেউই মাথা ঘামায় না । সেটা ভাল কী মন্দ সে তর্কে যাব না । যে কয়েকটা বুদ্ধ মন্দির দেখেছি সেগুলি সবই পুরনো, অবহেলিত ও কোথাও পূজার ভিড় নেই । গীর্জা বা মসজিদের তো প্রশ্নই ওঠে না । এতবড় পুরনো এক সভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের এরকম অনুপস্থিতি পৃথিবীর আর কোনও দেশে বোধহয় নেই ।

    চীনে তিনসপ্তাহ বেড়িয়ে বুঝতে পারলাম এদেশ সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা এখনও কত । চীন বলতে আমরা চীনা খাবার ও কম্যুনিস্ট রাজনীতিই জানি । ভাবতে অবাক লাগে যে এত কাছাকাছি ভারত ও চীন - দুই বিরাট ও প্রাচীন সভ্যতা, কিন্তু তাদের মধ্যে যোগাযোগ কত কম । পুরনো দিনে না হয় হিমালয় ও সমুদ্র অলঙ্ঘ্য ছিল, কিন্তু আজকাল তো আর তা নয় । সুদূর ইওরোপ, আমেরিকার তুলনায় আমরা চীন ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, সঙ্গীত, চিকিত্সা, সহিত্য, পুরাতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে কিছুই জানি না । আশা করি ভবিষ্যতে এই দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়বে এবং অবিশ্বাস ও অজ্ঞতা দূর হবে । চীনা রাজনীতি ও সামাজিকনীতি সম্পর্কে আমাদের যতই মতভেদ থাকুক না কেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশকে তো ভাল করে জানতেই হবে । এতে দু-পক্ষেরই মঙ্গল ।

    ছবি - লেখিকার তোলা

    এই ভ্রমণ কাহিনী আমার ১৯৯৪ সালের চীন ভ্রমণ নিয়ে । সম্প্রতি ইয়াংজী নদীর বাঁধ তৈরীর ফলে আমি যা যা দেখেছিলাম ও লিখেছি তার প্রায় সবই পঞ্চাশ ফুট জলের তলায় । এই Three Gorges Dam পৃথিবীর বৃহত্তম । এখনও এর কাজ চলছে কিন্তু গভীর গর্জগুলি বাঁধের জলে ভরে উঠেছে ।

    (পরবাস-৪০, জানুয়ারি, ২০০৮)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)