• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৪ | অক্টোবর ২০২১ | প্রবন্ধ
    Share
  • দধিমঙ্গল : উদয় চট্টোপাধ্যায়

    কোন এক সমাজবিজ্ঞানী আক্ষেপ কিংবা কটাক্ষ করে বলেছিলেন স্তন্যপায়ী প্রাণীরা একটু সাবালক হলেই দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়, একমাত্র মানুষই সেটা ছাড়তে পারে নি। হক কথা। কিন্তু নাবালকত্ব কাটিয়ে উঠে মানুষ যে দুধ পান করে সেটা মাতৃদুগ্ধ নয়, মানুষের প্রতিপালিত কিছু জীবজন্তু, যেমন গোরু মোষ ভেড়া ছাগল উট ইত্যাদির দুধ। মানুষ দুধ খাওয়া ছাড়বে কেন? এটা তার উত্তরাধিকার। তার যাযাবর পূর্বপুরুষদের প্রধান খাদ্য ছিল পালিত জীবজন্তুদের মাংস আর দুধ, আর তার সঙ্গে বনজঙ্গল থেকে আহৃত ফলমূল। কৃষিসভ্যতা পত্তনের সাথে সাথে তার খাদ্যতালিকায় প্রধান স্থানকরে নিল কৃষিজাত ধান গম যব বজরা থেকে প্রস্তুত ভাত আর রুটি। গৃহপালিত পশুদের মাংস আর দুধ বাদ পড়ল না, বরং স্থায়ী জীবনযাপনের অবসরে নানা পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে জন্ম নিল ধান চাল থেকে শুধু ভাত নয় – মুড়ি চিঁড়া খই, পল বা মাংসমিশ্রিত ভাত পলান্ন –যাকে আমরা পোলাও বলি, গম থেকে শুধু রুটি নয়—পরোটা এবং মাংসের পুর দেওয়া পুরোডাশ, দুধ থেকে ক্ষীর ননি ছানা আর দই।

    দুধ জ্বাল দিলেই ক্ষীর হয়, দুধ মন্থন করলে উপরে ভেসে ওঠে ননি বা মাখন—যা চুরি করে খেয়ে বালক শ্রীকৃষ্ণ ননিচোরা, মাখনচোরা বা ননিগোপাল হয়ে ভক্তের হৃদয় জুড়ে আছেন। ননি চুরির জন্যে শাস্তি পেয়ে মা যশোদার কাছে তাঁর কাতর মিনতি ‘ম্যয় নহি মাখন খায়ো’র দৃশ্য সঙ্গীতে আর নৃত্যে এখনও জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। দুধ থেকে ক্ষীর বা মাখন তৈরি রীতিমতো আবিষ্কার, কিন্তু আরও বড়ো আবিষ্কার দুধ থেকে দই আর ছানা তৈরি। ঈষদুষ্ণ দুধে অম্ল মিশিয়ে এবং সেই তাপমাত্রা কয়েক ঘণ্টা ধরে রাখলে পাওয়া যায় দই, আর ফুটন্ত দুধে অম্ল মিলিয়ে হাতেনাতে পাওয়া যায় ছানা। দুধের মতো পবিত্র বস্তুকে বিশ্লিষ্ট করে ছানা কাটানো যে কোন কারণেই হোক উত্তর বা দক্ষিণ ভারতে সমাদৃত হয় নি, বরং তা গুনাহ্‌ বা পাপ বলে বিবেচিত হয়েছে।তাই ছানাকে বলা হয়েছে দুগ্ধবিকার। ছানা কাটানো এবং ছানার উপযোগের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে বঙ্গ কলিঙ্গ আর কামরূপ; কালক্রমে যা ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের সর্বপ্রান্তে।

    দইয়ের প্রাচীনতম উল্লেখ রয়েছে বৈদিক সাহিত্যে। পঞ্চামৃতের এক প্রধান উপাদান হল দধি--বাকিরা হল দুগ্ধ ঘৃত মধু ও চিনি। আর, পুরাণে বর্ণিত সাত সমুদ্রের একটি হল দধি সমুদ্র। দেখা যাচ্ছে বৈদিক ঋষিরা সুখাদ্যের মর্ম বুঝতেন। তাঁরা তাঁদের রসনাপ্রীতিকর খাদ্যবস্তু দিয়ে দেবতার নৈবেদ্য সাজিয়েছেন। দুধ বা ঘৃতের তুলনায় দই সহজপাচ্য, হজমের সহায়ক। তাই দইয়ের ব্যবহার নির্দেশিত হয়েছে নানা ধর্মীয় আর সামাজিক অনুষ্ঠানে। শারদীয়া পূজা-অন্তে দেবী দুর্গা পিতৃগৃহ থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন স্বামীগৃহে, মা মেনকা তাই আয়োজন করেন দধিকর্মার—যা আদতে চিঁড়ে আর দই—যাত্রাপথে যাতে শারীরিক বিঘ্ন না ঘটে। শেষ পাতে দই খাওয়ার রেওয়াজ এই একই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। যেখানে যথেষ্ট পরিমাণে দইয়ের আয়োজন আর্থিক বা অন্য কোন কারণে বিঘ্নিত, সেখানে রয়েছে দইয়ের ফোঁটার বিধান। অনুভূতিটাই প্রধান—দইয়ের ফোঁটাই প্রিয়জনের মঙ্গলসাধন করবে।

    আমাদের বাগধারায় ‘দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটানো’-য় এই একই ভাবনার প্রতিফলন—যদিও আমরা জানি দইয়ের স্বাদ ঘোলে না-মিটলেও ঘোলের স্বাদের নিজস্বতা আছে, আছে দ্রব্যগুণ। তামাম দক্ষিণ ভারতে যা ‘মাঠ্‌টা’ আর উত্তর ভারতে ‘ছাচ’ নামে ভোজনান্তে আবশ্যিক পানীয়, তা ঘোল ছাড়া আর কিছু নয়। তার সঙ্গে মেশানো তাজা ধনেপাতার কুচি কিংবা ভাজা জিরে-গুঁড়ো এর স্বাদে একটা অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। পারস্পরিক আদানপ্রদানের দাক্ষিণ্যে বাঙালি, অন্তত শহরাঞ্চলের বাঙালি, এখন এর রসগ্রাহী হয়ে উঠেছে।

    তবে দই তার স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত। এককালে ক্রিয়াকর্মে আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণদের অনেকেরই আপত্তি ছিল রান্নাকরা অন্নব্যঞ্জন গ্রহণ করতে। তাই তাঁদের জন্য আয়োজন করতে হত ফলারের। ঊনবিংশ শতকে রামনারায়ণ তর্করত্ন, ‘নাটুকে রামনারায়ণ’ নামে যাঁর খ্যাতি, তাঁর ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটকে উত্তম ফলার, মধ্যম ফলার আর অধম ফলারের বর্ণনা দিয়েছেন। ফলার বললেই চিঁড়ে আর দইয়ের কথাই আমাদের মনে আসে। তবে উত্তম ফলারে চিঁড়ে অনুপস্থিত। তাতে আছে ঘিয়ে ভাজা তপ্ত লুচি থেকে শুরু করে কচুরি, ছক্কা আর শাকভাজা, মতিচুর বোঁদে খাজা, জিলাপি গজা মণ্ডা ইত্যাদির সমারোহ; আর সবশেষে—

    খুরীপুরী ক্ষীর তায়        চাহিলে অধিক পায়
            কাতারি কাটিয়ে সুখো দই,
    অনন্তর বাম হাতে,        দক্ষিণা পানের সাথে,
            উত্তম ফলার তারে কই।
    মধ্যম ফলারে—
          সরু চিঁড়ে সুখো দই,      মত্তমান ফাকা খই,
              খাসা মণ্ডা পাত পোরা হয়,
         মধ্যম ফলার তবে, বৈদিক ব্রাহ্মণে কবে,
              দক্ষিণাটা ইহাতেও রয়।
    অধম ফলার নিতান্তই অধম; তার বর্ণনা —
         গুমো চিড়ে জলো দই,      তিত গুড় ধেনো খই,
              পেটভরা যদি নাই হয়,
         রৌদ্দুরেতে মাথা ফাটে,      হাত দিয়ে পাত চাটে,
              অধম ফলার তারে কয়।
    বর্ণনায় দইয়ের জাতিভেদ লক্ষণীয়। প্রথম দুটিতে ‘সুখো দই’-- তার মধ্যে উত্তম ফলারে ‘কাতারি কাটিয়ে সুখো দই’ অর্থাৎ চাপ দই, যা চামচ দিয়ে কেটে কেটে পরিবেশন করা হয়, আর অধম ফলারে ‘জলো দই’। সুখো দই নিঃসন্দেহে অতি-অভিপ্রেত, দইয়ের হাঁড়ি উলটো করলেও সে দই স্থানচ্যুত হবে না। এককালে দেওঘর বিখ্যাত ছিল এইরকম দইয়ের জন্য। একালেও বাংলার কিছু মিষ্টির দোকানে তার দেখা মিলবে। বাংলার লোকগীতিতে রয়েছে ‘গামছাবাঁধা দইয়ের’ উল্লেখ, যে দই যাত্রাপথে গামছায় বেঁধে অনায়াসে নিয়ে যাওয়া যায়। গামছায় দই বেঁধে তার থেকে জল ঝরিয়ে সেই শুখো দই ফেটিয়ে নিয়ে তার সঙ্গে চিনি আর এলাচ গুঁড়ো কিংবা কেশর মিশিয়ে মহারাষ্ট্রে তৈরি করা হয় এক অতি উপাদেয় মিষ্টান্ন, যার নাম ‘শ্রীখণ্ড’ বা ‘শিখন্দ্‌’।

    দই হয় দু ধরনের – টক দই আর মিষ্টি দই। টক দইয়ের আধিপত্য সারা উত্তর আর দক্ষিণ ভারত জুড়ে। মিষ্টি দই একান্তভাবে বাংলার নিজস্ব, তবে অবাঙালিদের মধ্যে এর সমাদর বাড়ছে। বছর কুড়ি আগে রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি যাওয়ার অবসরে পেয়েছিলাম এক রসিক সিন্ধি সহযাত্রীকে। খাওদাওয়ার গল্পের মধ্যে মিষ্টির প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি জানালেন তাঁর ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও এক পাইলট বন্ধুর মারফৎ তিনি কলকাতা থেকে মিষ্টি দই আর সন্দেশ মাঝেমাঝেই আনিয়ে নেন এবং দু-তিন দিনে সেগুলোর সদ্‌গতি করে আবার তিন মাসের কৃচ্ছ্রসাধন।

    রবীন্দ্রনাথ তার ‘ছেলেবেলায়’ চৈৎ-বৈশাখ মাসে রাস্তায় ‘বরীফ’ হেঁকে-যাওয়া ফেরিওয়ালাদের উল্লেখ করেছেন—এই বরীফ ছিল ‘হাঁড়িতে বরফ দেওয়া নোনতা জলে ছোটো ছোটো টিনের চোঙে’ রাখা কুলফি বরফ। দই ফেরির কথা তিনি জানান নি। তবে তাঁর ‘চণ্ডালিকায়’ রয়েছে ‘দই চাই গো দই চাই’ গান-গাওয়া দইওয়ালা, আর রয়েছে ‘ডাকঘরে’র সেই অবিস্মরণীয় দইওয়ালা—যাকে দেখে অমল দইওয়ালা হতে চেয়েছিল তার বন্দিজীবন থেকে ছাড়া পেয়ে মুক্তির আস্বাদ পেতে। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি কাঁধে বাঁক নিয়ে তার দুধারে হাঁড়ি বসিয়ে গ্রামের রাস্তায় ঘোষমশাইকে দই ফেরি করতে – একদিকের হাঁড়িতে টক দই, অন্যদিকের হাঁড়িতে মিষ্টি দই।

    সেই সময়, এবং তার পরে অন্তত সত্তর আশির দশক পর্যন্ত বাঙালির বিয়েবাড়ি বা ক্রিয়াকর্ম অনুষ্ঠানে একাধিপত্য চালিয়ে গেছে মিষ্টি দই। তার কোনটা সাদা আর কোনটা লালচে রঙের, আর হাঁড়িতে রাখা দইয়ের উপরিভাগে পুরু নবনীময় সরের স্তর। নিমন্ত্রিতদের সকলেরই লোভ ছিল ওই স্তরসমেত দইয়ের স্বাদ পেতে। কোন এক বিদগ্ধ খাদ্যরসিক তো বহুপূর্বেই খাদ্য নির্বাচনের নির্দেশিকা ঘোষণা করে গেছেন— ‘কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ/ দধির অগ্র ঘোলের শেষ’। খাওয়ার শেষে এক হাঁড়ি দই নিঃশেষ করার মতো সামর্থ্য অনেকেরই ছিল, এবং তাঁদের সন্তুষ্ট করতে নিমন্ত্রণকর্তার কার্পণ্য ছিল না। তবে কেউ কেউ যে বঞ্চিত হত না তেমন নয়, তাদেরই কারোর অভিযোগ ফুটে উঠেছে এই ছড়ায়—

    দে দই দে দই পাতে
    ওরে বেটা হাঁড়ি হাতে,
    সবাইকে দুবার দিলি
    আমায় দিতে ভুলে গেলি!
    কোন কোন স্থাননাম যেমন কিছু মিষ্টির সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছে—জনাইয়ের মনোহরা, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, বর্ধমানের সীতাভোগ—তেমনই হুগলির হরিপাল আর কলকাতার প্রান্তবর্তী মোল্লারচকের দই একসময় খ্যাতির শীর্ষে উঠেছিল। কাজের বাড়িতে দই সরবরাহ করার ব্যাপারে ওই অঞ্চলের দইওয়ালাদের নিষ্ঠা ও সতর্কতা এখন অবিশ্বাস্য মনে হবে। সত্তরের দশকে হরিপাল থেকে চোদ্দো মাইল দূরের এক গ্রামে দই পাঠানো হয়েছিল লোকের কাঁধ থেকে বাঁকে ঝুলিয়ে—বাসে করে বা ভ্যানে বসিয়ে নয়—কেননা ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকুনিতে দইয়ের চরিত্র আর স্বাদ বদলে যাবে!এখন রাস্তাঘাটের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কয়েক বছর আগে হলদিয়া থেকে গাড়ি করে কলকাতা ফেরার পথে কোলাঘাটের কাছে এক রাস্তার মোড়ে চোখে পড়ল ‘দধি ভাণ্ডার’ সাইনবোর্ড লাগানো এক দোকানের। দইয়ের আস্বাদ নিয়ে আপ্লুত হলাম। একটা হাঁড়ি কলকাতা নিয়ে গেলে দই ঠিক থাকবে কিনা সেই দ্বিধার কথা জানাতে দোকানদার হাঁড়ি উলটে দেখিয়ে অভয় দিলেন। তাঁর অভয়বাণী যথার্থ ছিল।

    খাওয়ার সঙ্গে স্বতন্ত্র পদ হিসাবে টক বা মিষ্টি দইয়ের প্রচলন ভারতের সর্বত্রই, তবে উত্তর ভারতে রয়েছে টক দইয়ের রায়তার বিশেষ সমাদর। দইকে একটু ঘেঁটে নিয়ে তার মধ্যে পেঁয়াজকুচি শশাকুচি আর একটু নুন মিশিয়ে তৈরি হয় রায়তা, আর পরিবেশন করা হয় তার উপরে একটু বিটনুন ছড়িয়ে দিয়ে। বিরিয়ানির সঙ্গে চমৎকার চলে। সিদ্ধ করা লাউ কিংবা আলুর টুকরো অথবা ভাজা বোঁদে, যাকে বলা হয় কড়া বুঁদিয়া, মিশিয়েও রায়তা তৈরির রেওয়াজ আছে। দইয়ে ডোবানো কলাইয়ের ডালের বড়া, যার পরিচিতি দহিবড়া নামে, উত্তর দক্ষিণ নির্বিশেষে সারা ভারতে সমাদৃত। একটু তেঁতুলের আচার, সেওভাজা আর বিটনুন সহযোগে দহিবড়া এক অতি উপাদেয় জনপ্রিয় চাট।

    রান্নায় বা ব্যঞ্জনে দইয়ের ভূমিকা কিছু নগণ্য নয়। গুজরাট রাজস্থান পাঞ্জাবে ‘কড়ি চাওয়ল’ এক খুবই প্রচলিত খাদ্য। ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হয় ‘কড়ি’ নামের এক ব্যঞ্জন। দই আর বেসন মিশিয়ে ঝোল তৈরি করে মেথি ফোড়ন দিয়ে তার মধ্যে বেসনের বড়া দিয়ে ফুটিয়ে নিলেই কড়ি প্রস্তুত। তামিলনাড়ুর ‘মোরকুড়ুম্ব’ সবজিতে দই মিশিয়ে রান্না এক তরকারি। বাঙালির নিরামিষ রান্নায় দই সেভাবে ব্যবহৃত না হলেও মাংস ‘মেরিনেট’ করতে দই অপরিহার্য। তবে দই-মাছ, বিশেষত দই-ইলিশ খেয়ে আপ্লুত না হয়েছে কোন্‌ বঙ্গনন্দন অথবা বঙ্গনন্দিনী!



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)