• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯৩ | জানুয়ারি ২০২৪ | গল্প
    Share
  • ইনভার্স মডেলিং : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

    ১ বাবুয়া দ্য সান্টাক্লজ়

    “আর্‌রে বাবুয়া, বহোত লেট কর দিয়া আজ। জলদি কর।”

    রবার্ট-বব-বাবুয়া... শেঠজি তাকে ঠেট ভোজপুরিতে বাবুয়া বলেই ডাকে। রবার্ট গোঁড়া ক্যাথলিক। পেশায় কশাই, সারাদিন মলের বেসমেন্টে রকমারি স্টোরের মিট কর্নারে মুর্গি জবাই করে। তবে ক্রিসমাসের দিন পনেরো আগে থাকতে সে ভোল পালটে সান্টাক্লজ় হয়ে যায়। লাল জোব্বা-পায়জামা-টুপি পরে, গালে নকল সাদা দাড়ি লাগিয়ে শেঠজির গিফ্‌ট শপের সামনে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের গাল টিপে, হাতে হোমমেড চকোলেট আর ক্যান্ডি গুঁজে দেয়। ঘণ্টা পিছু দেড়-শ টাকা।

    ক’দিন পরেই ক্রিসমাস। শেঠজির অস্থিরতার কারণ সেটাই। আজ মিট কাউণ্টারে ভিড় ছিল। রক্তের ছিটে লাগা অ্যাপ্রনটা ছেড়ে, হাত ধুয়ে আসতে আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল। গিফ্‌ট শপের ঘিঞ্জি চেঞ্জ রুমে ঘামের গন্ধলাগা লাল পোষাকটা পরতে পরতে মনে হল সকালে আসার সময় জুলি তাকে চুপিচুপি একটা চিরকুট দেখিয়েছে। যত ফন্দি তার বাবার সঙ্গে। জুলিকে সে বলেছিল সান্টাক্লজ়ের কাছে গিফ্‌ট চাইতে। মেয়ে গিফ্‌ট চায়নি, লিখেছে – ডিয়ার সান্টাক্লজ়, আই উইশ মাই পেরেন্টস স্টপ ফাইটিং দিস ক্রিসমাস। বলে রেখেছে বাপ-বেটি দু’জনে মিলে চিরকুটটাকে মোজায় ভরে ক্রিসমাসের আগের রাতে জানলার পাশে টাঙিয়ে রাখবে। বাড়িতে চিমনি নেই যে।

    মলের সব থেকে উপরের তলায় ফুডকোর্ট। তার এক ধারে শেঠজির গিফ্‌ট শপ। বাচ্চাদের হাতে ক্যান্ডি গুঁজে দিতে দিতে রবার্ট ভাবল এ’বছর জুলির ইচ্ছা পূরণ হবে। শীলা হয়তো ক্রিসমাসের আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। রোজ রাতে ফেরার সময়ই মনে হয় বাড়ি গিয়ে দেখবে শীলা নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই সে শাসাচ্ছে - চলে যাবে। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যাবে... রবার্ট জানে না। শীলা তাকে কোনওদিন বলেনি। তবে সে আন্দাজ করতে পারে। এই মলের ফুড কোর্টেই লোকটাকে দেখেছে, দু’দিন আগে। ওরা কফি খাচ্ছিল... শীলা আর সেই লোকটা – লম্বা, সুদর্শন, দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল ভদ্র লোক। কাঁধের পোর্টফোলিও ব্যাগটা চেয়ারের পাশে নামিয়ে রেখে শীলার সঙ্গে গল্প করছিল। শীলার অফিসেই কাজ করে বোধহয়।

    দেখল, লোকটা হাত নেড়ে শীলাকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছে। একবার শীলার হাত ধরারও চেষ্টা করল। শীলা হাত ছাড়িয়ে নিল। আরে, জবরদস্তি নাকি? রবার্টের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। একবার ভাবল, গাল থেকে নকল দাড়ি খুলে সোজা গিয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তাতে লোকজন জমা হয়ে হট্টগোল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। শীলা ব্যাপারটা পছন্দ নাও করতে পারে। তার চেয়ে বরং...

    রবার্ট জোব্বার নিচে জামার বুকপকেট থাবড়ে পেন আর একটা ট্রেনের টিকিট বার করেছিল। বেলাপুর-ভাসি টিকিট, সকালে আসার সময় কাটা। টিকিটের উলটো পিঠে লিখেছিল - লিইভ হার অ্যালোন অর আই উইল কিল ইউ। থলে থেকে একটা চকোলেট বার করে, রাংতার মোড়ক খুলে টিকিটটা দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে তার ওপর আবার রাংতা মুড়েছিল। চকোলেটটা হাতের পাতার মধ্যে আড়াল করে ওদের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।

    সান্টাক্লজ় সাজার একটা সুবিধে। কেউ সহজে চিনতে পারে না। ঘুরতে ঘুরতে ওদের একদম কাছাকাছি চলে এসেছিল রবার্ট। ও মাই গড! দে আর আরগুইং! কারসিং বিটারলি! বোথ অব দেম। শীলা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিল। রবার্ট দেখল সে দুমদুম করে পা ফেলে লিফটের দিকে চলে যাচ্ছে। লোকটা শীলাকে ডাকল। শীলা শুনল না। পিছন ফিরে তাকালও না। হড়বড় করে চেয়ারের পাশ থেকে পোর্টফোলিও ব্যাগটা তুলে লোকটাও উঠল। সম্ভবত পিছু ধাওয়া করে শীলাকে থামাবার জন্য। রবার্ট তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। হাতের চকোলেটটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, “এঞ্জয় ইয়োর ক্রিসমাস স্যর!”

    লোকটা অবাক হয়ে রবার্টের দিকে তাকিয়েছিল।

    ২ মেরী ক্রিসমাস

    ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। কাল ক্রিসমাস। শেঠজির দোকান থেকে জুলির জন্য একটা ডল কিনেছে রবার্ট। ডাগর-ডাগর চোখ। শুইয়ে দিলে ঘুমিয়ে পড়ে। সান্টাক্লজ় সাজার জমানো পয়সা থেকে। ছেলেটার জন্য একটা রিমোট অপারেটেড কার। বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। টেবিলে খাবার সাজিয়ে শীলা খেতে ডাকছে। গিফ্‌টের প্যাকেটগুলো ছেলেমেয়ের মাথার কাছে রেখে রবার্ট খেতে গেল। দুটো ফুটফুটে শিশু অকাতরে ঘুমোচ্ছে। মাই অ্যাঞ্জেলস!

    শীলাই দরজা খুলে দিয়েছিল। সো শি ইজ স্টিল দেয়ার! শীলা আর রবার্টের সঙ্গে থাকতে পারছিল না। রবার্টের গায়ে বনমানুষের মত লোম, অসহ্য ঘামের গন্ধ। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে শব্দ করে নাক ঝাড়ে। আ ডিসগাস্টিং বাণ্ডল অব ব্যাড হ্যাবিটস। সভ্য সমাজে তাকে নিয়ে বার হওয়া যায় না। শীলা মুক্তি চায়। ডেসপারেটলি। বিয়ের সাড়ে পাঁচ বছরে দুটো বাচ্চা। আর একটা পেটে। রবার্ট জানে না এখনও। শীলা বলেনি।

    রাজেশ বেশ কিছুদিন ধরে শীলার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। শীলার অফিসেরই। মলে ঘোরা, কফি শপে টুকটাক হাত ধরা। শীলার খারাপ লাগে না। শীলা জানে রবার্ট তাকে মন্দ বাসে না। কিন্তু রবার্টের ভালবাসা মানে তো শুধু – ধর তক্তা মার পেরেক। শীলার মাঝেমাঝে সন্দেহ হয় ভালবাসাবাসির সময় রবার্ট তাকে তার মীট কাউন্টারের মৃত পশুপাখির মাংসর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। শীলার যে একটা জীবন্ত শরীর আছে, তার একটা নিজস্ব চাহিদা থাকতে পারে – ভুলে যায়। রাজেশ বলে, “হোয়াই আর ইউ স্টিকিং টু দ্যাট ব্লাডি বুচার? মুভ ইন উইথ মি, শীলা।”

    শীলা চুপ করে থাকে। দোনামনা করে। তবে আন্তরিক লাগে। ক’দিন আগেই কফির কাপে চুমুক দিয়ে অনিশ্চিত ভাবে বলেছিল, “রাজেশ, ইউ নো, অ্যা’য়াম ক্যারিয়িং।”

    রাজেশ একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর বলেছিল, আমার চেনা নার্সিংহোম আছে। সেখানে অ্যাডমিট হয়ে যাও। ডঃ পাটিল আমার বন্ধু। আমি বলে দেব।

    শীলার মুখে সপাং করে চাবুক পড়েছিল। হি ওয়ান্টস মি টু কিল মাই বেবি!

    মুখে বলেছিল, “রিয়েলি... আর ইউ শ্যুয়ার?”

    মনে মনে ভেবেছিল, হ্যাভ আই ট্রাস্টেড দ্য রং পারসন? রাজেশের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “হোয়াট অ্যাবাউট আদার ট্যু কিডস?”

    রাজেশ বলেছিল, “লিইভ দেম উইথ দ্যাট রেচেড বুচার... এনি প্রবেলেম?”

    কী বোকার মত ওর ফাঁদে পা দিচ্ছিল! শয়তানটা আমার বাচ্চাদের ছেড়ে আসার কথা বলছে। ক্রিসমাসের আলো, ভিড়, সাজগোজ বিষাক্ত লেগেছিল শীলার। কান্না পেয়েছিল। গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল। টেবিল ছেড়ে উঠতে দাঁড়িয়েছিল। এই জঘন্য লোকটার সামনে আর একটা মুহূর্তও বসে থাকতে ইচ্ছা করেনি। বলে কী না পেটেরটাকে অ্যাবর্ট করাতে! এই খবরটাই রবার্ট জানলে আনন্দে লাফিয়ে উঠত।

    কাল ক্রিসমাসের ছুটি। ছেলেমেয়ের জন্য একটা কেক বানবে। লাঞ্চে ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন রান্না করবে। জুলিটা বড় রোগা। ছেলেটার মুখে সবে কথা ফুটছে। খাওয়ার টেবিলে বসে শীলা এই সব ভাবছিল। একবার ভাবল রবার্টকে পেটের বাচ্চাটার কথা বলবে। তারপর ভাবল পরে বললেই হবে। সময় তো আছে।

    রবার্ট দেখল, শীলা চুপ করে আছে। মাথা নীচু করে খাচ্ছে। জিজ্ঞেস করল, “সো হোয়াট হ্যাভ ইউ ডিসাইডেড, শীলা?”

    “আই ডিসাইডেড টু স্টে ব্যাক ফর দ্য টাইম বিইং,” শীলা মুখ তুলল।

    “থ্যাঙ্ক ইউ ডার্লিং,” রবার্ট খুশি হল। শীলার হাতের ওপর হাত রাখল, “চিলড্রেন উইল বি হ্যাপি।”

    তারপর দোনামনা করে জিজ্ঞেস করল, “বাট মে আই নো হোয়াট মেড ইউ চেঞ্জ ইয়োর মাইন্ড?”

    শীলা অন্য হাতে কোঁচকানো টেবিল ক্লথ সোজা করতে করতে ভাবল, মে বি বিকজ আই কুড নট ফাইণ্ড এনি ওয়ান লাইক ইউ, বব, উইথ অল ইয়োর ডার্টি হ্যাবিটস এণ্ড পসিব্‌লই অ্যাজ কেয়ারিং অ্যাজ ইউ... মুখে বলল, “নেভার মাইন্ড।”

    জানলার বাইরে কেউ তারাবাজি ছেড়েছে, তার আলো পড়ল শার্শিতে। শীলার হাতে চাপ দিয়ে রবার্ট বলল, “মেরী ক্রিসমাস, ডার্লিং।”

    ৩ মৃত মারমেড

    বিয়ে-থা না করার একটা সুবিধে হল যে নিজের ইচ্ছা মত জীবন যাপন করা যায়। সরকারি চাকরিতে থাকতে থাকতেই বাড়ি বানিয়েছিলাম শহর থেকে সামান্য দূরে। রোজ অফিস যেতাম, বাড়ি ফিরতাম পঁচিশ-পঁচিশ পঞ্চাশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে। বাংলো স্টাইলে নিজস্ব আস্তানা, দশটা লোকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ফ্ল্যাটবাড়ি নয়। জায়গাটাকে লোকে বলে ভাসি গাঁও, কিন্তু অল্প এগোলেই শহরের সমস্ত সুযোগ-সুবিধে হাতের মুঠোয়। বাড়ির পিছনেই অপার সমুদ্র। পশ্চিমের বারান্দার নিচে বালি, পাথর… পেরিয়ে আদিগন্ত জল। একটু সরে গিয়ে ধীবর বস্তি। ইতস্তত চোখে পড়ে উল্টানো জেলে নৌকো, মাছ ধরার জাল... চাটাইতে মাছ শুকায়। ওদের সারা বছরের খাদ্য।

    আজ ধীবর বস্তিতে হুলুস্থুল। এন্টোনি এসে খবর দিল, কোত্থেকে শুনে এসেছে - ট্রলারে নাকি মারমেড ধরা পড়েছে। এন্টোনির কালো কোলি শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে। এন্টোনির সঙ্গে আমার অনেক দিনের পরিচয়। সমুদ্র থেকে উড়ে আসা বালি আটকানোর জন্য করপোরেশন রাস্তার ধারে পাথরের দেওয়াল তুলেছিল। সেই দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো দেশী দারুর ঠেক, টোনিজ স্যাক। অস্থায়ী সামিয়ানার নিচে দু’চারটে কাঠের টেবিল আর বেঞ্চ পাতা। ঠা-ঠা রোদ্দুরের মাঝখানে এক টুকরো স্নিগ্ধ ছায়া। আমি গেলে অ্যান্টোনি খাতির করে ঠান্ডা বীয়ারের বোতল খুলে দিয়েছে কতওবার, সঙ্গে সদ্য ভাজা চিংড়ি।

    অ্যান্টোনি আমায় হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। না-গেলেই বোধহয় ভাল হত। আসমুদ্র নগ্নতা নিয়ে পড়ে থাকা মেয়েটির বিক্ষত দেহ চাক্ষুষ করতে হত না। দূর থেকেই দেখলাম, মেয়েটির মৃত শরীর নির্লজ্জের মত জল আর পাথরের মধ্যে জেগে রয়েছে। কার্বনে কার্বনে কালো, আরব সাগরের বালি জড়িয়ে আছে চুলে মূলে উরুতে। কেবল সকালের রোদ্দুর, রূপোলী আঁশের মত সারা শরীরে ঢেকে আছে। মেয়েটির মুখ কি পূর্বে দেখেছি? হয়তো...

    স্থানীয় লোকজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছে। দেখলাম অজয় দেশপাণ্ডে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকাল থানার আধিকারিক। সরকারি চাকরির বদান্যতায় তার সঙ্গে একবার আলাপ হয়েছিল। সে আমায় দেখে হাত নাড়ল। পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়, বেশীক্ষণ দাঁড়ান যায় না। ভিড়ের থেকে বেরিয়ে এসে দেখি এন্টোনি একটা পাথরের ওপর মাথায় হাত রেখে বসে। এই অঞ্চলে বালির রং কালো, বালির থেকে পাথর বেশি। অনেক পাথরের মধ্যে এন্টোনিও যেন এক পাথর হয়ে গেছে।

    কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠল, বলল, আঙ্কল, রিটা অরফ্যান ছিল।

    মনে হল ছেলেটা কথা বলে হালকা হতে চাইছে। বললাম, বলো শুনি।

    এন্টোনি রিটার গল্প বলল। ব্রাগাঞ্জা পরিবারে মানুষ। প্রতিপালনে হয়ত কিছু খোট ছিল। ভালবাসার কাঙাল হয়ে থাকত রিটা ব্রাগাঞ্জা। লোকে বলত নষ্ট মেয়ে, বহুগামী। মহল্লার অনেক ছেলেকেই জীবনের অগভীর জলে সাঁতার দিতে শিখিয়েছে রিটা। এন্টোনিও তাদের একজন। অদ্ভুত এক অতৃপ্তি কাজ করত রিটার মধ্যে। ভালবাসা পেয়ে তার আশ মিটত না, রাস্তার ভিখারির মত ভিখ মাঙত। অল্পদিনের মধ্যেই স্বভাবসিদ্ধ অস্থিরতায় অন্য কারও কাছে সরে গিয়েছিল রিটা। যেমন মাছ সরে যায়, ঘাই দেয় অন্য জলে।

    ছেলেরা ফয়দা নিত। বলতে বলতে রাগে, ঘৃণায় এন্টোনির মুখের পেশিতে টান ধরল। মুখ ঘুরিয়ে নিল। দূরে জলের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আচমকা জোয়ারের ঢেউ ভাঙল এন্টনির গালের উঁচু হাড়ের ব্যারিকেড পেরিয়ে, বলল, কিন্তু বিশ্বাস কর আঙ্কল, রিটার গায়ে দাগ লাগত না, মনেও না। রিটা সত্যিই মারমেড ছিল।

    ৪ ড্যানি ভাগলবা

    সকালবেলা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। অ্যান্টোনি এসে বলল, ড্যানিয়েলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ড্যানিয়েল এই তল্লাটের নামকরা মাতাল। তিন কুলে কেউ নেই। দিনের মধ্যে অধিকাংশ সময়ই বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকে। ছোটখাটো কাজ, উঞ্ছবৃত্তি করে নেশার খরচ জোটায়। রিটার মৃত্যুর পর থেকেই সে বেপাত্তা। ক্রিসমাসের দিন বিকেলবেলা রিটাকে নাকি ড্যানিয়েলের সঙ্গে ভাসি রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যেতে দেখা গিয়েছিল। প্রথমে রিটার অপঘাতে মৃত্যু, তারপর ড্যানিয়েলের নিখোঁজ হওয়ার খবর। শান্তশিষ্ট এই ধীবর পল্লীতে কী যে শুরু হয়েছে কে জানে!

    অ্যান্টোনি বলল, ড্যানিটা যে এমন হারামী, কল্পনাও করতে পারিনি।

    আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, এক মিনিট! ড্যানি আবার কী দোষ করল?

    অ্যান্টোনি বলল, ওই বেজম্মাটাই রিটাকে মেরেছে, আমি নিশ্চিত।

    আমি বললাম, ড্যানিই যে রিটাকে মেরেছে তার প্রমাণ কী?

    অ্যান্টোনি রাগে ফুঁসছিল, বলল, আরে আঙ্কল, বুঝলে না? না মারলে ভাগলবা হবে কেন? তাছাড়া অনেকেই দেখেছে স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ড্যানির কাঁধে একটা পেটমোটা ব্যাগ ছিল। আটঘাট বেঁধেই কাজে নেমেছিল শুয়োরের বাচ্চাটা।

    অ্যান্টোনিকে শান্ত করার জন্য বললাম, ভিতরে এসো। চা খেয়ে যাও।

    সে মাথা নাড়ল। ডামাডোলে গত দু’দিন টোনিজ স্যাক বন্ধ। আজকেও না খুললে গণেশ ঠাকুর কুপিত হবেন। অ্যান্টোনি চলে গেল। বলে গেল, আঙ্কল, সময় পেলে বিকেলের দিকে এসো। অনেক কথা আছে।

    অ্যান্টোনি যেতে না যেতেই, শুনতে পেলাম ঘরের ভিতর ল্যাণ্ডলাইন বাজছে। উঠে গিয়ে ধরলাম... দেশপাণ্ডে। কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করল, সায়েন্টিস্ট সাহেব কিছু খবরাখবর পেলে নাকি?

    আমি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোন ব্যাপারে?

    দেশপাণ্ডে বলল, ওই যে, ওই মেয়েটার খুনের ব্যাপারে? কানাঘুষোয় কিছু শুনতে পেলে? তুমি তো কাছাকাছিই থাক।

    আমি বললাম, একটা সাধারণ মেয়ের মৃত্যু নিয়ে পুলিশ এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল কেন? মেয়েটার স্বভাব-চরিত্রও খুব একটা সুবিধের ছিল না, শুনলাম। যৌন নির্যাতন, খুন... এসব তো আজকাল জলভাত হয়ে গেছে। খবরের কাগজ রিপোর্টও করে না।

    দেশপাণ্ডে বলল, খবরের কাগজের রিপোর্ট ছাড়ো দাদা। ওগুলোর অধিকাংশই বানানো গল্প। অটোপ্সি রিপোর্ট এসেছে। রেপ কেস নয়। অন্য কোনও লাফড়া আছে। দেশপাণ্ডের গলা চিন্তিত শোনাল। আসলে তোমাদের মহল্লার এক ছোকরা, অ্যান্টোনি না কী যেন নাম, বেফালতু ঝামেলা পাকাচ্ছে। মেয়েটার আশিক-টাশিক ছিল মনে হয়। গাঁওয়ের লোকজনদের ফুঁসলিয়ে এনে গত কাল থানার সামনে ধরনায় বসেছিল।

    আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি নিশ্চিত, রিটা খুন হয়েছে? কোনও দুর্ঘটনা নয় তো?

    দেশপাণ্ডে বলল, গলায় আঙুলের দাগ পাওয়া গেছে। মেয়েটাকে কেউ গলা দাবিয়ে মেরেছে, তারপর জলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

    বলো কী! মেয়েটা নাকি ঘনঘন প্রেমিক বদলাত। তাদের কেউ নয় তো? আমি আন্দাজে তির ছুড়লাম।

    কে জানে? সেই সব প্রেমিকপ্রবরেরা তো বহাল তবিয়তে গাঁওয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা তো কাল অ্যান্টোনির সঙ্গে ধরনাতেও এসে বসেছিল। দেশপাণ্ডের কথায় বিরক্তি।

    হেসে বললাম, শোনোনি? কথাই আছে - দু’কান-কাটারা গাঁওয়ের মধ্যে দিয়ে যায়।

    আমার রসিকতায় দেশপাণ্ডে খুব একটা আমোদিত হল না, বলল, ড্যানিয়েল বলে একটা আধবুড়ো লোক লা-পতা। রিটাকে শেষবার ওর সঙ্গেই দেখা গিয়েছিল।

    জিজ্ঞেস করলাম, মোবাইল ট্রেস হয়েছে?

    দেশপাণ্ডে বলল, ক্রিসমাসের দিন, সন্ধে পর্যন্ত... গেটওয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল দু’জনেই। সাতটা-সাড়ে-সাতটার পর থেকে নেটওয়ার্ক এরিয়ার বাইরে।

    আমি চুপ করে রইলাম। দেশপাণ্ডে বোধহয় ভাবল, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ওপর ভরসা করতে পারছি না। আমায় আশ্বস্ত করে বলল, ফিকর কোরো না দাদা। কত দিন আর মোবাইল অফ করে রাখবে। একবার স্যুইচ অন করলেই ড্যানিকে ঘাড় ধরে টেনে আনব।

    আমি বললাম, এক যাত্রায় কি আর পৃথক ফল হয় ভাই? ড্যানির মোবাইল আর কোনওদিন স্যুইচ অন হবে বলে মনে হয় না।

    দেশপাণ্ডে বলল, সে কী?

    বললাম, আমার তাই ধারণা। তুমি বরং ওদের কল লিস্ট চেক করে দেখো, সন্দেহজনক কিছু পাও কি না। বিশেষ করে ওই দিন সন্ধের, ওদের মোবাইল স্যুইচ অফ হওয়ার আগে।

    দেশপাণ্ডে বলল, আচ্ছা, একটু সময় দাও। দেখে জানাচ্ছি তোমাকে।

    ৫ বিজ্ঞান ও ধর্ম

    পরিণাম থেকে উলটো পথে হেঁটে কোনও সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করার তথ্য বিজ্ঞানের পরিভাষায় একটা গালভরা ইংরেজি নাম আছে – ইনভার্স মডেলিং। ডাক্তাররা যেমন লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করেন, অপরাধ শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরাও তেমনই সাক্ষী-সাবুদ, প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ ও অপরাধী খোঁজার চেষ্টা করেন। ঝামেলা হল সীমিত প্রমাণের ভিত্তিতে গড়া ইনভার্স মডেল অনেক সময়ই একাধিক সম্ভাবনার হিসেব দেয়। বিশেষজ্ঞের কাজ হল বাস্তব পরিস্থিতির বিচারে সঠিক সম্ভাবনাটিকে বেছে নেওয়া। ড্যানির গায়েব হওয়ার যে অন্য অনেক কারণ থাকতে পারে দেশপাণ্ডে ভাবেনি। পুলিশ অধিকাংশ সময়েই নানারকম চাপে থাকে। তাদের ঠান্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা করার অবসর থাকে না।

    রিটায়ারমেন্টের পর অনেকেই ডাকাডাকি করেছিল, আমি কোনও কাজ নিইনি। অফিসের তাড়ায় সারা জীবন দম ফেলার সময় পাইনি। ভেবেছিলাম অন্তত বছর দুই-তিন মাথাটাকে একটু বিশ্রাম দেব। বুকশেলফের যে বইগুলো কিনে ফেলে রাখেছি, একটা পাতাও ওলটাইনি, সেগুলো সব পড়ে ফেলব। মুশকিল হল – অভাগা যে দিকে যায়, সাগর শুকায়ে যায়। বিকেলবেলা বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। লাল আগুনের গোলাটা ভাসি ক্রীক ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার আগেই দেশপাণ্ডে এসে হাজির হল। সামনে চেয়ার টেনে বসে বলল, দাদা, তোমার কথাই ঠিক। জুহু চৌপাট্টিতে ড্যানির বডি পাওয়া গেছে। ফুলে-ফেঁপে ঢোল হয়ে ছিল বলে শনাক্ত করতে দেরি হল।

    আমি বললাম, তোমার কাজ বাড়ল। একটার জায়গায় এখন দুটো খুনের কিনারা করতে হবে।

    দেশপাণ্ডে বলল, বড়কর্তার অনুমতি নিয়ে এসেছি। তোমার সাহায্য চাই। ‘না’ বলতে পারবে না।

    আমি এড়াতে চাইলাম, বললাম, তোমাদের মত কাবিল পুলিশ অফিসার থাকতে আমি আবার কেন? তুমি তো একাই একশ।

    দেশপাণ্ডে বলল, তোমার কোনও বাহানা শুনছি না। ভাগম ভাগ যা করার আমি করব। তুমি শুধু মাথা খাটিয়ে বলো কোন দিকে দৌড় লাগাতে হবে।

    অন্ধকার ঘন হচ্ছিল। আমি উঠে গিয়ে বারান্দার লাইটটা জ্বালিয়ে দিলাম। দেশপাণ্ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, চা খাবে? দার্জিলিং টি...

    দেশপাণ্ডে বলল, তুমিও যদি খাও...

    স্বপাকে আহার করি। দু’-কাপ চা বানিয়ে এসে বসলাম। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, দু’জনের মোবাইলের কল-লিস্ট দেখেছ? কোনও সূত্র পেলে?

    দেশপাণ্ডে বলল, তেমন কিছু নয়। তবে দু’জনেই রবার্ট ডিসুজা বলে এক মক্কেলকে ফোন করেছিল বার দুই-তিন। সেদিন সন্ধেবেলাতেই।

    কে সে? আমি ভুরু তুললাম।

    দেশপাণ্ডে চায়ের পেয়ালায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, রবার্ট বেলাপুরে থাকে। আদ্যন্ত সংসারী। পেশায় কশাই। ক্রিশ্চিয়ান ক্যাথলিক। বাকি খোঁজখবর নিচ্ছি।

    ‘কমন কজ ফেলিওর’ বলে একটা কথা আছে। দুটো আলাদা আলাদা সিস্টেম এক সঙ্গে অচল হলে আমরা প্রথমেই খুঁজে দেখি – এমন তো নয় একটাই কারণে দুটো সিস্টেম বসে গেছে। রবার্ট কি সেই ‘কমন কজ’?

    দেশপাণ্ডে চা খেতে খেতে চোরা চোখে আমায় লক্ষ করছিল। বললাম, ক্যাথলিক বললে না? নিশ্চয়ই নিয়মিত চার্চে যায়। সেখানে লোক লাগাও। এদের দু’জনের সঙ্গে রবার্টের কী সম্পর্ক ছিল জানার জন্য একটু খোঁড়াখুঁড়ি করা দরকার।

    দেশপাণ্ডে বলল, ঠিক আছে। এখন উঠি। চায়ের জল চাপিয়ে রাখো। শিগগিরই আবার হানা দেব।

    আমি হেসে বললাম, তাড়াতাড়ি এসো। আর হ্যাঁ, চাইলে অ্যান্টোনিকে কাজে লাগাতে পারো। ও প্রতি রবিবার চার্চে যায়। ছেলেটা গোঁয়ার, কিন্তু সৎ।

    দেশপাণ্ডে গম্ভীর মুখে বলল, হুঁ...

    ৬ হাওয়ামোরগ

    দু’দিন কেটে গেল, দেশপাণ্ডের পাত্তা নেই। ভাবছিলাম কী হল? হাওয়ামোরগ কি দিক নির্দেশ করতে ভুল করল? সে রকম তো হওয়ার কথা নয়। দুপুরের খাওয়া সেরে একটা বই নিয়ে বসেছিলাম। মন দিতে পারছিলাম না। দেশপাণ্ডের ফোন এল। তার গলায় উত্তেজনা, দাদা, রবার্ট ডিসুজাকে তুলে এনেছি। একবার আসতে পারবে? বলো তো গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।

    বললাম, গাড়ি পাঠাতে হবে না। অটো ধরে চলে আসব। কিন্তু তাকে তুলে আনতে হল কেন?

    দেশপাণ্ডে বলল, ক্রিসমাসের আগের রবিবার চার্চের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রবার্ট রিটা আর ড্যানিয়েলের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘুটুর-ঘুটুর করেছিল। অনেকেই সেটা নজর করেছিল। আসলে রিটা আর ড্যানিয়েল দু’জনে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। একজন ছম্মক ছল্লো আর অন্যজন গটারে পড়ে থাকা বেওড়া। তাই বোধহয় লোকের চোখে উদ্ঘট লেগেছিল। ভুলতে পারেনি। সাক্ষী দেওয়ার লোকের অভাব হবে না।

    রবার্টের যদি কোনও অসদুদ্দেশ্য থাকত তাহলে কি সে সকলের সামনে দু’জনের সঙ্গে কথা বলত? জিজ্ঞেস করলাম, রবার্টের কী বক্তব্য?

    দেশপাণ্ডে বলল, ক্রিসমাসের দিন সন্ধেবেলা গেটওয়ে থেকে লাক্সারি বোট ছাড়ে, রাতভোর বোটপার্টি হয়, জানো নিশ্চয়ই। রবার্ট নাকি রিটা আর ড্যানিয়েলকে সেইরকম একটা পার্টিতে ফিট করে দিয়েছিল। রিটা গান-টান গাইবে আর ড্যানিয়েল সান্টাক্লজ় সেজে বাচ্চা-কাচ্চাদের মনোরঞ্জন করবে, তাই কথা ছিল।

    আমি বললাম, দাঁড়াও, দাঁড়াও... রবার্ট কি ইভেন্ট ম্যানেজারের কাজ করে? সে পার্টির খবর পেল কোথা থেকে?

    দেশপাণ্ডে বলল, না, না... রবার্ট কোন শেঠজির দোকানে কাজ করে। সে-ই শেঠজিই পার্টির হোতা... ইভেন্ট ম্যানেজার। আসলে ওই পার্টিতে রবার্টেরই সান্টাক্লজ় সাজার কথা। ক্রিসমাসের সন্ধেবেলাটা সে নিজের পরিবারের সঙ্গে কাটাতে চাইছিল বলে ড্যানিয়েলকে তার জায়গায় যেতে বলে। ড্যানিয়েল রাজি হয়ে যায়। তবে দাদা, আমার মনে হয় রবার্ট কিছু লুকোচ্ছে। পেটে রুলের গুঁতো পড়লে সত্যি কথাটা উগলোবে, তার আগে নয়।

    আমি বললাম, আমি না-আসা পর্যন্ত রবার্টকে নাস্তা-টাস্তা করাও। আমি এসে দুটো কথা বলি। তারপরে না-হয় তুমি তোমার মত করে জিজ্ঞাসাবাদ কোরো।

    দেশপাণ্ডে বলল, দেরি কোরো না। ঝটপট চলে এসো। আমার হাত চুলকোচ্ছে।

    থানায় পৌঁছে দেখলাম একটা বড়সড় চেহারার লোক কাঁচুমাচু মুখ করে দেশপাণ্ডের সামনের চেয়ারে বসে আছে। দেশপাণ্ডে আমায় খাতির করে বসাল, কাকে চা আনতে বলল। লোকটা বোধহয় ভাবল আমি সাদা পোশাকে কোনও বড় দরের পুলিশ কর্তা। হাউমাউ করে পায়ে এসে পড়ল। সে নিরপরাধ, রিটা আর ড্যানির খুনের ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ জানে না। আমি তাকে কাঁধ ধরে তুলে বসালাম। আমার জন্য নিয়ে আসা কাটিং চায়ের গ্লাসটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম। এমনিতেও ওই ঘন লাল চা ভর দুপুরে গলাধঃকরণ করলে অম্বল অনিবার্য।

    রবার্টকে আশ্বস্ত করতে কিছুটা সময় গেল। তারপর সে মুখ খুলল। দেশপাণ্ডে ঠিকই আন্দাজ করেছিল। রবার্ট লুকোচ্ছিল, কিন্তু বুঝতে পারেনি যে কথাগুলো লুকোচ্ছিল তার সঙ্গে খুনের কোনও সম্পর্ক আছে। নিজের বৌ যে পরপুরুষে আসক্ত সে কথা জনসমক্ষে স্বীকার করা সহজ নয়। ইদানীং অবশ্য সম্পর্কটা শুধরোচ্ছিল। তাই ভেবেছিল ক্রিসমাসের দিনটা পরিবারের সঙ্গে হুল্লোড় করে কাটাবে। রিটাকে পার্টিতে গান গাওয়ার কথা আগেই বলে রেখেছিল। শেষ মুহূর্তে শেঠজিকে না জানিয়েই ড্যানিইয়েলকে সান্টাক্লজ়ের কাপড়-চোপড়, গোঁফ-দাড়ি-পরচুলা সমেত বোটপার্টিতে পাঠিয়েছিল। সেইটুকুই তার অপরাধ।

    দেশপাণ্ডেকে এক পাশে ডেকে বললাম, রবার্টকে ছেড়ে দাও।

    হাতের সুখ করার সুযোগ ফসকে যাচ্ছে দেখে দেশপাণ্ডে অত্যন্ত অখুশি হল। চাপা গলায় প্রশ্ন করল, তুমি নিশ্চিত?

    বললাম, একশ ভাগ। ওর পেটে বোমা মারলেও আর কিছু বেরোবে না। বরং ওর থানার বাইরে থাকাটা জরুরী। একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে, বলছি তোমায় পরে।

    দেশপাণ্ডে রবার্টকে খানিকটা ধমক-ধামক দিয়ে ছেড়ে দিল। সে চলে যাওয়ার পর দেশপাণ্ডেকে বললাম, একটু শান্ত হয়ে বসো। দুটো কথা বলি।

    দেশপাণ্ডে বলল, বলো দাদা, উতকর্ণ হয়ে বসে আছি।

    বুঝলাম তার রাগ পড়েনি এখনও। বললাম, তুমি তো পোড় খাওয়া পুলিশ অফিসার, খুন দুটোর মোটিভ... মানে সাম্ভাব্য কারণ নিয়ে কিছু ভেবেছ?

    দেশপাণ্ডে মাথা নাড়ল, তুমিই বলো।

    আমি বললাম, শুনলে তো রবার্টের বৌয়ের একটি প্রেমিক ছিল। আমার ধারণা সে খুব একটা সুবিধের লোক নয়। সম্প্রতি রবার্টের বৌ ঝগড়া-ঝাঁটি করে তার মুখ দেখা বন্ধ করে দেয়। রবার্টও তাকে খুন করার হুমকি দেয়। যার ফলে সে খুব সম্ভবত প্রতিহিংসা-পরায়ণ হয়ে উঠেছিল।

    দেশপাণ্ডে অধৈর্য হয়ে বলল, কিন্তু সে রিটা আর ড্যানিকে মারবে কেন?

    আমি বললাম, আ কেস অভ মিসটেকেন আইডেন্টিটি... রাজেশ না কী যেন নাম লোকটার, ড্যানিকে চিনতে ভুল করেছিল। বোটপার্টিতে সান্টাক্লজ়ের পোশাকে ড্যানিকে দেখে ভেবেছিল সে রবার্ট।

    দেশপাণ্ডে বলল, দাদা, বোটপার্টিতে রাজেশের উপস্থিত থাকাটা একটু কাকতালীয় ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে না?

    আমি বললাম, না, আমার অনুমান সে খোঁজখবর নিয়েই বোটপার্টিতে গিয়েছিল। কিন্তু সান্টাক্লজ়ের পোশাকের নিচের মানুষটা বদলে গেছে জানত না। তারপরের ঘটনাটা তুমি নিজেও কল্পনা করে নিতে পারো। পার্টির নাচাকোঁদা শেষ হলে ড্যানি হয়তো নেশা করে ডেকের ধারে পড়ে ছিল। রাজেশ গিয়ে তাকে ঠেলা মেরে জলে ফেলে দেয়।

    দেশপাণ্ডে বলল, আর রিটা?

    বললাম, ধরে নাও রিটা ঘটনাটা দেখে ফেলে...

    দেশপাণ্ডে বলল, দাদা, মোটিভটা বড্ড বেশি অনুমানভিত্তিক হয়ে গেল না?

    আমি হেসে বললাম, ঠিক বলেছ। এটা জাস্ট একটা হাইপোথিসিস। অনুমানের ওপর নির্ভর করে তুমি রাজেশকে অ্যারেস্ট করতে পারবে না। হাইপোথিসিসটা ঠিক না ভুল সেটা যাচাই করা জরুরী। তবে কাজটা তোমার। আমি শুধু পাশে দাঁড়িয়ে দেখব। চাইলে বড় জোর দরকার মত ‘অ্যাকশন’ বলতে পারি।

    দেশপাণ্ডে বলল, চ্যালেঞ্জ অ্যাক্সেপ্টেড। তোমার প্ল্যানটা আমিও কিছুটা অনুমান করতে পারছি।

    ৭ ঝোপ বুঝে টোপ

    ভাসি স্টেশনের একদিকে যত রাজ্যের ব্যস্ততা, লোক চলাচল, অটোস্ট্যান্ড, মল, রেস্তোরাঁ, ইলেক্ট্রনিক গুডসের শোরুম। উল্টোদিকে নির্জনতা... খানিকটা খোলা জায়গা, তারপর ঝোপঝাড়, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, খোলা সমুদ্র। ট্রেন থেকে নেমে ম্যানগ্রোভের ধার ঘেঁষে হাঁটা লাগালে চট করে ভাসি গাঁওয়ে পৌঁছে যাওয়া যায়। দিনের আলোয় দু’-চারজন শর্টকাট নিলেও সন্ধে নামার পর পারতপক্ষে কেউ সে রাস্তা মাড়ায় না।

    নতুন বছর এসে পড়েছে। রুডলফ দ্য রেইন ডিয়ার টানা স্লেজ-এ চেপে সান্টাক্লজ়ের ফিরে যাওয়ার কথা সেই কবেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এ বছর সে এখনও নতুন মুম্বাইয়ের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অর্ধেক রাত্তিরে ভাসি গাঁও যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা ধরেছে। সেখানে তার কী কাজ পড়ল সে-ই জানে!

    স্টেশন চত্বরের বাইরে ক’খানা দম ফুরনো সোডিয়াম ভেপারের আলো শুধু টিমটিম করে জ্বলে আছে। অন্ধকার ঝুঁকে পড়েছে গরান গাছের ডালপালায়। ভাঁটার টানে জল সরে গেছে দূরে। শ্বাসমূলের ফাঁকফোকরে সাপ ঘুরছে। অ্যান্টোনি আমায় ডেকে দেখাল। সান্টাক্লজ়ের পিছন-পিছন বেশ কিছুটা ব্যবধান রেখে আমি আর অ্যাণ্টোনি হাঁটছিলাম। সেইরকমই কথা ছিল। দেশপাণ্ডে আর তার টিমও নিশ্চয়ই আছে আশেপাশেই।

    আজকের নাটকে পার্ট নিতে রবার্ট আপত্তি করেনি। সেও ঘটনাটার নিষ্পত্তি চায়। বিশেষ করে সন্দেহভাজন যখন তার বৌয়ের প্রেমিক। সম্ভবত বোঝেনি দেশপাণ্ডে তাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে। অবশ্য রবার্ট যে আজ এখানে এত রাত্তিরে আসবে, রাজেশের কাছে সেই মেসেজ গেছে শীলার মোবাইল ফোন থেকে, শীলার অজান্তেই। দেশপাণ্ডে আমায় বলেনি সেটা কী ভাবে সম্ভব হল। আমি জানতেও চাইনি।

    বেশ অস্বস্তিকর পরিবেশ। জনমানব নেই। সান্টাক্লজ় দুলকি চালে আগে আগে হেঁটে চলেছে। আর আমরা তাকে অনুসরণ করছি। কব্জিতে বাঁধা হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। মিনিট পাঁচেক হেঁটেছি। মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল। রাজেশ কি আসবে না? আমাদের চমকে দিয়ে একদল শিয়াল ডেকে উঠল কাছেই।

    অ্যান্টোনি কনুই দিয়ে আমার কাঁকালে খোঁচা মারল। উল্টো দিক থেকে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। এত দূর থেকে চেনা যাচ্ছে না। সান্টাক্লজ় দাঁড়িয়ে পড়ল। মূর্তিটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। সোডিয়াম ভেপারের স্তিমিত আলোতেও লোকটার হাতের মুঠোয় ছুরি ঝলসে উঠল।

    দেশপাণ্ডে কোথায়? সঙ্গে দু’-চারজন হাট্টাকাট্টা হাবিলদার নিয়ে তার আসার কথা ছিল। রবার্ট এমনিতেই নড়বড়ে। তার ওপর লোকটার হাতে ছুরি। অ্যান্টোনি আমায় ফেলে সান্টাক্লজ়ের দিকে দৌড়ল। আমিও যত দ্রুত সম্ভব এগোলাম। সান্টাক্লজ় আর আমাদের মধ্যে বেশ কিছুটা দূরত্ব। অ্যান্টোনি পৌঁছনোর আগেই দেখলাম সান্টাক্লজ় লোকটার ছুরি ধরা হাতটায় মোচড় দিচ্ছে। লোকটার হাত থেকে ছুরিটা খসে পড়ল। সান্টাক্লজ়ের মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত লোকটার চোয়ালে ঘা দিতেই লোকটা কাটা কলা গাছের মতো রাস্তায় শুয়ে পড়ল।

    কোত্থেকে মাটি ফুঁড়ে দুটো হাবিলদার এসে লোকটাকে মাটিতে চেপে ধরল। থানায় ছবি দেখেছিলাম, চিনতে অসুবিধে হল না... আমার অনুমান সঠিক, এই সেই রবার্টের বৌয়ের প্রেমিক – রাজেশ। অ্যান্টোনি তক্কে-তক্কে ছিল। অশ্রাব্য একটা গালাগাল দিয়ে রাজেশের পাছায় সজোরে একটা লাথি বসাল। সান্টাক্লজ় পিছন থেকে বলল, থামিস না। চালিয়ে যা।

    পিছন ফিরে দেখলাম সে জোব্বা খুলছে। গাল থেকে টেনে টেনে দাড়ি-গোঁফের আস্তরণ সরাচ্ছে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, এ কী! তুমি!

    দেশপাণ্ডে এক গাল হেসে বলল, কী ভেবেছিলে? রবার্টকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আমি থানায় বসে ঘুমব?

    আমি বললাম, অতটা ভাবিনি। জানতাম আশেপাশেই আছ। রাজেশের হাতে ছুরি দেখে রবার্টের জন্য ভয় পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারিনি তুমিই সান্টাক্লজ় সেজে... আচ্ছা বোকা বানিয়েছ যা হোক!

    দেশপাণ্ডে হাতে হাত ঘষে বলল, যাক সায়েন্টিস্টরাও কখনও-সখনও ভুল করে তাহলে।

    বললাম, সে আর বলতে! সায়েন্টিস্টদের কাজই হল ভুল করা। নেতি নেতি করেই ইতির সন্ধান করাই তাদের ধর্ম।

    দেশপাণ্ডে কী বুঝল কে জানে! বিজ্ঞের মত ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, ঠিক! ঠিক! তবে দাদা, প্রমাণ হয়ে গেল যে তোমার ইনভার্স মডেল একদম নির্ভুল ছিল।

    আমি শুকনো হাসলাম। আমাদের পাশ কাটিয়ে সরসর করে রাস্তার পাশে একটা নেউল নেমে গেল। সম্ভবত তার নৈশভোজের সময় হল। খাদ্য ও খাদকের চিরকালীন সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে মানুষ নিরর্থক খুনখারাপির এক নতুন বাস্তুতন্ত্র তৈরি করেছে। আমার কি সাধ্য তার মডেল করি! একটা গাঢ় অবসাদ আমার মাথার দখল নিচ্ছিল। অ্যান্টনি আমার হাতে নাড়া দিয়ে বলল, চলো আঙ্কল, আজ তোমায় দেশী দারু খাওয়াব।

    আমি বিষণ্ণ গলায় বললাম, চলো।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)