"জীবনানন্দের বেড়াল; পিউ দাশ (জীবনানন্দ দাশ বিভাগ--পরবাস) 


কবিতার অন্তরঙ্গ পাঠঃ জীবনানন্দের 'বেড়াল'

পিউ দাশ



স্রষ্টা ও দ্রষ্টা হিসেবে জীবনানন্দের মূল্যায়ন বাংলা সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে হয়েছে। নতুনভাবে তাঁর ও তাঁর কবিতার সম্পর্কে আলোচনার আর কোনও প্রয়োজন হয়তো নেই-ই।

কিন্তু প্রত্যেক মানুষ কবিতা পড়ে বিভিন্নভাবে। আর জীবনানন্দের কবিতা, তার ভাবপ্রকাশভঙ্গির বৈচিত্রে, তার বলিষ্ঠতায়, তার প্রতি স্তরে স্তরে অন্তর্নিহিত অর্থে একজন মানুষেরই কাছে জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে বিভিন্ন বার্তা বহন করে নিয়ে আসে। তাই, তাঁর কবিতা সম্পর্কিত আলোচনার প্রয়োজন কোনদিনই হয়তো ফুরোবেও না।

কবি মানেই দ্রষ্টা। সত্যকে তিনি নিজের মধ্যে খুঁজে পান, এবং কাব্যে হয় সেই দর্শনের প্রকাশ।

জীবনানন্দ ছিলেন এমন এক আত্মসচেতন কবি যিনি নিঃসংকোচে বলতে পেরেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’। এবং, তাঁর এই ঘোষণার সমর্থনে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যাঁরা কবি তাঁরা “কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে।” একথা এমন নিঃসংশয় সহজভাবে এবং এমন জোরের সঙ্গে যিনি বলতে পারেন তিনি নিজে যে একজন প্রথম শ্রেণীর কবি ছিলেন তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বাংলাসাহিত্যে আধুনিক কবিতার আগমন যে প্রধানত তাঁরই হাত ধরে তাতেও নয়।

জীবনানন্দের কবিতা সত্যি সত্যিই কবিতা এই হিসেবে যে তার বৌদ্ধিক বিশ্লেষণ যেমন সম্ভব, শুধু সম্ভবই নয়, তার কাটাছেঁড়া বিশ্লেষণ পাঠকের কাব্যরসবোধকে পরিপুষ্টই করে, (অর্থাৎ কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে রস জিনিষটাই মার খেয়ে যায় না), তেমনই সেই কবিতা অনুভূতির সেই স্তরে মনকে স্পর্শ করে যা অর্থ-অর্থহীনতার উর্দ্ধে শুধুই ভাবাবেশ। কাব্যের অর্থকে যখন স্পষ্ট করে আয়ত্ত করতে পারি না, তখনও কাব্যরস অবচেতনায় মনকে ঠিকই স্পর্শ করে যায়। সার্থক কবিতার সার্থকতা তো এখানেই।

কবি হিসেবে জীবনানন্দের বহু সমালোচনা হয়েছে। ভাল ও মন্দ দু-ধরনেরই। কিন্তু, তাঁর কবিপ্রতিভাকে সবচেয়ে সার্থকভাবে বর্ণনা করেছেন বুদ্ধদেব বসু--‘আত্মনিমগ্ন কবি’, ‘নির্জনতার কবি’। কবিদের ‘কবি’ হয়ে ওঠার যে প্রেরণা, যে প্রবল সৃষ্টির উদ্যমে কবিদের চালিত করে, তাকে যদি বলি 'মিউজ' (muse), তবে সেই মিউজ যে বাইরের কোন শক্তি নয়, কবির অন্তর্বাসিনী কাব্যোন্মাদনাই তাতে কোনও সন্দেহ নেই--বাইরের শক্তি ক্যাটালিস্টের কাজ করতে পারে, কিন্তু, সৃষ্টির আবেগ আসে ভিতর থেকে।

কিন্তু সকলের ক্ষেত্রে এই মিউজ-এর রূপ এক নয়। কবিদের ব্যক্তিত্ব যেমন ভিন্ন, কবিদের মিউজ-এর প্রকাশও তেমন ভিন্নভাবে। রবীন্দ্রনাথের মিউজ অবশ্যই ছিলেন, যাঁকে তিনি বলেছেন, তাঁর “জীবনদেবতা”। কবি রবীন্দ্রনাথের মানসে তাঁর নিজের কবিসত্ত্বা দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল, একভাগ সৃষ্টির প্রেরণা দেন, অন্যভাগ সৃষ্টি করেন। নিজের অন্তর্বাসিনী সেই প্রেরণাদায়িনী শক্তিকে রবীন্দ্রনাথ নিজের চেয়ে ঊর্দ্ধে স্থান দিয়েছেন। কবি এবং মানুষ রবীন্দ্রনাথের অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে, কিন্তু যাঁকে উদ্দেশ্য করে তিনি গান গেয়েছেন তিনি সমস্ত ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে এক উপস্থিতি। সেই নিষ্কলঙ্ক উদাসিন্ স্থৈর্যে পৌঁছনোর সাধনা রবীন্দ্রনাথের। তাই তাঁর লেখাকে লোকে বলে আধ্যাত্মিক, বলে মিস্টিক।

জীবনানন্দ বাংলাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব কাটিয়ে ওঠা কবি, কিন্তু, তার চেয়ে বড় কথা তিনি একজন সর্বার্থে সার্থক আধুনিক কবি। নিজের অন্তরাত্মাকে কোন রোম্যান্টিকতায় নিজের চেয়ে উঁচুতে স্থান দেওয়ার প্রেরণা তিনি পাননি। তাই তাঁর মিউজ তাঁর ভিতরের কবিসত্ত্বার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাঁর লেখা একেবারেই ব্যক্তিগত, একেবারেই নিজের জন্য; তিনি নিজের ভুল-ত্রুটি দোষকে ফেলে রেখে উপরে উঠতে চান না। তাদের স্বীকার করে--আলিঙ্গন করে বললেই ঠিক হয়--নিজের প্রকৃত স্বরূপে উদ্‌ঘাটিত করে দেখতে চান বিজ্ঞানীর সতর্ক উদাসিনতায়। তাই তিনি ‘আত্মনিমগ্ন কবি’।

তাঁর বিখ্যাত স্যুররিয়ালিস্টিক কবিতা ‘বেড়াল’ পড়ার সময় সেকথা মনে রাখতে হবে।

এই কবিতাটি জীবনানন্দের লেখা আমার অন্যতম প্রিয় কবিতাগুলির মধ্যে একটি*। আমার কেমন যেন মনে হয় এখানেই স্যুর্‌রিয়ালিজ্‌মের আপাত ধোঁয়াশার মধ্যে কবি নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন সবচেয়ে বেশি নিবিড় করে।

কবিতার শুরু হচ্ছে, - ‘সারাদিন একটা বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে-ফিরে কেবলই আমার দেখা হয়:’।

প্রথমেই, ‘বেড়াল’, বেড়াল কেন? বেড়াল কিসের প্রতীক? আমাদের মনে হয়, এই বেড়ালই কবির নিজ অন্তরাত্মার প্রতিনিধি। ‘ভণ্ড তপস্বী’ যে বেড়াল, ‘curious’ যে cat. ভেবে দেখলে দেখা যাবে, বেড়াল ছাড়া আর কোনও কিছুর সঙ্গেই যে তুলনা করা চলে না জটিল মানবপ্রকৃতির! তার ভণ্ডামির, তার উদাসিনতার, তার কৌতূহলের, তার চৌর্যপ্রবৃত্তির। তার আপাত নিরীহ নরম থাবার তলায় লুকিয়ে থাকা ধারালো নখরের হিংস্রতার।

দেখি, ‘ঘুরে-ফিরে কেবলই’ বিড়ালের সঙ্গে কবির দেখা হয়--‘ঘুরে-ফিরে কেবলই’--সবসময় কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে সে জানান দিয়ে যায় নিজ উপস্থিতি। সত্যিই তো, সবসময় তো আমরা আত্ম-সচেতন থাকি না। মাঝে মাঝে, ‘ঘুরে-ফিরে কেবলই’ নিজ সত্ত্বার মুখোমুখি হয়ে পড়ি, নিজের ইচ্ছাতেও যে তা ঘটে সবসময় তাও নয়। কখন ঘটে তবে এই আত্মদর্শন? কবি বলছেন পরের পঙ্‌ক্তিতে যে, তা ঘটে, ‘গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে;’ এ সৌন্দর্যের বর্ণনা, প্রকৃতির বর্ণনা। তবে কি সৌন্দর্যের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যেই কবি নিজ অন্তরাত্মার মুখোমুখি হয়ে পড়েন শুধু? না, শুধু যে প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে গিয়েই কবি নিজেকে খুঁজে পান তাই তো নয়, তিনি নিজের মুখোমুখি হন, ‘কোথায় কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর’-ও। অর্থাৎ, হ্যাঁ, বিষয়চিন্তা, ক্ষুধা, তাও মনে পড়ায় নিজেকে। এখানে একটা জিনিষ লক্ষ্য করবার মত। ‘কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতা’ এই বাক্যটির মধ্যে সফলতা কথাটি বিশেষ করে নজর কাড়ে না কি? বাক্যটার মধ্যে কোথাও একটা আত্মতৃপ্তি (smugness) প্রচ্ছন্ন আছে। যেভাবেই জোগাড় হয়ে থাক এই মাছের কাঁটা, তার জন্য বেড়াল কারও কাছে কৃতজ্ঞ নয়। ওই মাছের কাঁটা তার নিজের ‘সফলতা’র নিদর্শন। এই সফলতার মধ্যে কবির নিজেকে আবিষ্কার করায় পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বিষয়চিন্তার ক্ষুদ্রতার মধ্যেও আত্মতৃপ্তি আছে, এবং হঠাৎ নিজেকে তিনি সেভাবেও খুঁজে পান। এবং ‘গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে’র সাথে এক নিশ্বাসে ‘মাছের কাঁটার সফলতা’ও স্থান পেয়ে যায় সহজেই, যতই এদের মধ্যে আপাত বিরোধ থাক না কেন।

এখানে একথা ভুললে চলবে না, ‘বেড়াল’ স্যুররিয়ালিস্টিক কবিতা। প্রথম পঙ্‌ক্তিদুটিতে যদি ‘বেড়াল’কে সত্যিই নিজের অবচেতনার প্রতীক বলে ধরা হয়, তবে প্রতীক হিসেবে তা যে যথাযথ তাতে সন্দেহ থাকে না ঠিকই, কিন্তু স্যুররিয়ালিস্ট শিল্পে্র যে প্রধান শর্ত--স্বপ্ন ও জাগরণের মাঝের সীমারেখাটাকে অতিক্রম করা, তা ওই পঙ্‌ক্তি-দুটিতে ঘটে না। সুন্দর প্রতীকী কবিতার মতই শোনায়। পরের পঙ্‌ক্তিতে কিন্তু সেই স্বপ্ন ও জাগরণের সীমাভঙ্গের শর্তপূরণ করেন কবি।

‘তারপর শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর
নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হয়ে আছে দেখি;’

হ্যাঁ, এইবারে ঠিক স্বপ্নের মত শোনাচ্ছে। এই তো বেড়ালের সাথে দেখা হয়েছিল ‘মাছের কাঁটার সফলতার’ পরে, আর এখনই সে ‘নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হয়ে আছে’, আবার, ‘শাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর’! মাছের কাঁটার সফলতার সঙ্গে বেড়ালকে তো জোড়া যায় সহজেই, কিন্তু, নিজের হৃদয়কে নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকা, তাকে যেন বেড়ালের সাথে জুড়ে উঠতে পারি না। যেন, disjointed, এলোমেলো কথাবার্তা, উদ্ভট স্বপ্ন, কোনও মানেই হয় না যার। সাদা চোখে মানে হয়তো হয় না, কিন্তু, মনোবৈজ্ঞানিকেরা বলবেন, যতই এলোমেলো হোক, স্বপ্নের মানে আছে। এবং সে অর্থ এমনই যা অবচেতন মনের গভীরতায় ডুব দেয়।

সাদা মাটির যে কঙ্কাল, হাড়ে তৈরি যে পাঁজর তার ভিতরে আমাদের হৃদযন্ত্র থাকে লুকোনো। আর আমরা সেই হৃদয়কে নিয়ে মগ্ন থাকি, সযত্নে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করি সারাটি জীবন ধরে, আক্ষরিক অর্থেও, কারণ, হৃদযন্ত্র বন্ধেই আমাদের মৃত্যু; আবার প্রতীকী অর্থেও, হৃদয়ে আঘাত যেন না লাগে সে দিকে আমাদের যত্নের অন্ত নেই। নিজের হৃদয়কে নিয়ে পরম স্বার্থপরতায় মগ্নই হয়ে থাকি আমরা সারাটাজীবন ধরে। কবিও তাই থাকেন। যেন শ্রমিক মৌমাছির মৌচাক সৃষ্টি ও রক্ষা করার মত প্রবল উদ্যমে। অথচ সত্যিই কেন নিজের হৃদয়ের প্রতি আমাদের এত মমত্ব সে প্রশ্নও আমরা কদাচ করি না, সেও শ্রমিক মৌমাছির মতই উদাসিনতায়। এ আমাদের প্রকৃতিদত্ত সহজাত প্রবৃত্তি।

এই প্রবৃত্তিকে ছেড়ে উর্দ্ধে ওঠার চেষ্টারও কিন্তু আমাদের অন্ত নেই। তারপরের পঙ্‌ক্তি, 'কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়াচ্ছে/ সারাদিন সূর্যের পিছনে-পিছনে চলছে সে।' চমক লাগায়। কেন? কারণ আগের পঙ্‌ক্তিতেই অর্থহীন স্বার্থপরতায় শুধু নিজের হৃদয়কে নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকার কথা বলার পরেই কবি বলছেন, ‘বেড়াল’, অর্থাৎ কবির অবচেতনা কিন্তু, কৃষ্ণচূড়া গাছকেও অগ্রাহ্য করে না। কৃষ্ণচূড়া যদি সৌন্দর্যের প্রতীক হয়, তবে তার গায়ে নখ আঁচড়ানো কি সৌন্দর্য্যকে চিরে চিরে দেখতে চাওয়ার দ্যোতনা বহন করে নিয়ে আসে? কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ আঁচড়েই নিজের ধারালো অথচ গোপন নখে শান দেয় সে।

আবার, সে সারাদিন সূর্যের পিছনে পিছনে চলে। সূর্য আলোর উৎস। সূর্য সময়ের প্রতীক, আবার জ্ঞানেরও। বেড়ালরূপী মনুষ্যপ্রকৃতি, কবিপ্রকৃতি সেই আলোর হাতছানি, জ্ঞানের ডাককেও অস্বীকার করতে পারে না। সত্যের পিছনে সারাদিন চলে অক্লান্তে।

সেই আলোর পিছনে, সেই সত্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে সে বহুবার পথভ্রষ্টও হয়। তাই, 'একবার তাকে দেখা যায়,/ একবার হারিয়ে যায় কোথায়।'

তারপরের পঙ্‌ক্তিতে কবি বলেন, 'হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান-রঙের সূর্যের নরম শরীরে/ শাদা থাবা বুলিয়ে-বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে;' এ এক অপূর্ব মাধুর্যে ভরা ছবি। এ চিত্রকল্প অসামান্য।

হেমন্ত বাংলাসাহিত্যে চিরজীবনই শেষকালের প্রতীক, প্রৌঢ়ত্বের প্রতীক। হেমন্ত-সন্ধ্যা জীবনানন্দের কবিতায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে, কখনো, সে নিরুদ্যমতার প্রতীকরূপে। কখনো আবার গতিহীন স্তব্ধতা এবং অবারিত শান্তির প্রতীক হয়ে।

হেমন্তের সন্ধ্যা যদি হয় পরিণত বয়সের প্রতীক আর সূর্য যদি হয় জ্ঞানের আলোর প্রতীক, তবে হেমন্তের সন্ধ্যার জাফরান রঙের সূর্যের নরম শরীরে শাদা থাবা বুলিয়ে খেলা করা নিশ্চয়ই সারাজীবন ধরে সঞ্চিত জ্ঞানটুকুকে নিয়ে পরম মুগ্ধতায় নাড়াচাড়া করে খেলা করাকেই বোঝায়। কিন্তু, সেই জ্ঞান নিয়ে নাড়াচাড়াতেই বেড়াল থেমে থাকল না। 'অন্ধকারকে ছোটো-ছোটো বলের মতো থাবা দিয়ে লুফে আনল সে,'--তারপর--'সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিল।' পরম নিরাশাবাদিত্বের মধ্যেই কবিতার সমাপ্তি হল। জ্ঞানের পিছনে ছোটাছুটি করেও, সৌন্দর্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার পরেও, পৃথিবীকে বেড়াল উপহার দিল শুধু অন্ধকারই।

এইখানেই কবির আত্মবিশ্লেষণের চরম পরিসমাপ্তি। বেড়ালের রূপকল্প, বেড়ালের জীবনযুদ্ধ কখন কবির আত্মকথনের সাথে জুড়ে যায় যেন স্বপ্নের মত, আর সেই আত্মকথনের শেষে আমরা দেখি কবির আত্মবিক্ষোভ।


*: বেড়ালঃ প্রথম প্রকাশ, বু.ব.'র 'কবিতা' পত্রিকায়, ১৩৪৩ সালে, পরে 'বনলতা সেন' বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই লেখায় ব্যবহৃত পাঠ 'জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র' (সম্পাঃ ক্ষেত্র গুপ্ত, ভারবি, এপ্রিল ২০০৪) থেকে নেয়া। 'ভারবি' প্রকাশনারই 'জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা' (ডিসেম্বর ২০১২) বইতে আবার কবিতাটি 'বিড়াল' নামে, এবং 'মহাপৃথিবী' গ্রন্থের একটি কবিতা বলে চিহ্নিত! এই দুই মুদ্রণে অন্য বানান-ভেদও আছে।


পরবাস, ডিসেম্বর ২০১৬

অলংকরণঃ গুগল 'ওপেন অ্যাকসেস' থেকে নেয়া