পিতা ও পুত্র


|| ১ ||

প্রতিভা এক বিস্ময়কর ব্যাপার, কেন, কীভাবে, কখন কার মধ্যে তার স্ফুরণ ঘটে তা নিয়ে বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব এবং অন্যান্য শাস্ত্রেও নিরন্তর চর্চা ধারাবাহিক ভাবে চলেছে। এই বিতর্কে বংশগতি এবং পরিবেশের প্রভাব দুটিই সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে থাকে। বিতর্কে শেষ সিদ্ধান্ত আজও উচ্চারিত হয়নি কিন্তু অযত্নে, অবহেলায় প্রতিভা যে অকালে ঝরে যেতে পারে এটি সকলেই স্বীকার করেন। কীভাবে প্রতিভাকে চিনে নিয়ে তাকে পরিপুষ্টি জোগানো যায় তা নিয়েও নানা ধরনের মত আছে। প্রশিক্ষণ ও পরিমার্জনার ফলে নৈপুণ্য বা দক্ষতা সৃষ্টি হয়, প্রতিভা তৈরি করা যায় না — একথা যেমন সত্য, তেমনি বাল্য ও কৈশোরে পারিবারিক ও সামাজিক আবহাওয়ায় যদি অবজ্ঞার ধুলো ওড়ে তবে স্ফুটনোন্মুখ প্রতিভা চিরতরে চাপাও পড়ে যায়। শিশুর পিতা ও মাতার ভূমিকা স্বভাবতই এখানে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ববিকাশের ক্ষেত্রে আমরা প্রেরণারূপিনী ভগবতী দেবীর কথা খুবই বলে থাকি কিন্তু ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় ভূমিকা না নিলে বালক ঈশ্বরচন্দ্র জ্ঞানে কর্মে পূর্ণ প্রকাশিত হতে পারতেন কি? অনেক সময় আবার পরিবারের প্রতিকূলতাও প্রতিভাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ শার্ল বোদলেয়ার এবং কাফকার কথা মনে পড়ে। বোদলেয়ারের মা এবং কাফকার বাবা সন্তানের প্রতিভা চিনে উঠতেই পারেননি। বরাবর তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে পরিবারের সার্বিক প্রভাবের কথা বহু আলোচিত। এই প্রবন্ধে পিতা কীভাবে পুত্রের বিকাশে এগিয়ে এসেছিলেন সেটি দেখতে চাই। আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই মহীরুহপ্রতিম মানুষকে নিয়ে কথা বলা খুব সহজ নয়। পাণ্ডিত্য প্রকাশের ক্ষমতা ও দুঃসাহস কোনোটাই আমার নেই — যা বলব তা আমার নিজস্ব অনুভব।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে এবং সে যুগের সমাজে দেবেন্দ্রনাথ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, জীবনাচরণের যা ধারা প্রবর্তন করেছিলেন সে বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত কনিষ্ঠ পুত্রের বয়ান দিয়ে শুরু করা যাক,

‘তিনি ব্রহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থ ছিলেন। কিন্তু তিনি যদি শুদ্ধমাত্র বিষয়ী হইতেন, তবে তাঁহার উদ্ধারপ্রাপ্ত সম্পত্তিখণ্ডকে উত্তরোত্তর সঞ্চয়ের দ্বারা বহুলরূপে বিস্তৃত করিতে পারিতেন। কিন্তু বিষয়বিস্তারের প্রতি লক্ষ রাখিয়া ঈশ্বরের সেবাকে তিনি বঞ্চিত করেন নাই। তাঁহার ভাণ্ডার ধর্মপ্রচারের জন্য মুক্ত ছিল — কত অনাথ পরিবারের তিনি আশ্রয় ছিলেন, কত দরিদ্র গুণীকে তিনি অভাবের পেষণ হইতে উদ্ধার করিয়াছেন, দেশের কত হিতকর্মে তিনি বিনা আড়ম্বরে গোপনে সাহায্য দিয়াছেন। ...এইরূপে তিনি আমাদিগকে ধনসম্পদের মধ্যে রাখিয়া ও আড়ম্বর ও ভোগোন্মত্ততার হস্ত হইতে রক্ষা করিয়াছেন। ...আজ এই কথা বলিয়া আমরা সকলের কাছে গৌরব করিতে পারি যে, এতকাল আমাদের পিতা যেমন আমাদিগকে দারিদ্র্য হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন তেমনি ধনের গণ্ডির মধ্যেও আমাদিগকে বদ্ধ করিয়া রাখেন নাই।’
এখানে একটা প্রশ্ন উঠে পড়বেই, পুত্রের দ্বারা পিতার ব্যক্তিত্বের নিরপেক্ষ বিচার কি হওয়া সম্ভব? এই সম্পর্কে যে জড়িয়ে থাকে প্রতিদিনের স্নেহ শ্রদ্ধা, মতান্তর, লাভক্ষতি মিলন বিরোধের ব্যক্তিগত স্মৃতি। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য দেবেন্দ্রনাথের সম্পর্কে লেখা ফর্মাল প্রবন্ধে ব্যক্তিগত স্মৃতি তেমন আনেননি। তিনি আসলে পুত্র হিসেবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সংকট সম্বন্ধে পূর্ণ অবহিত থেকেই দূরত্বের আকাঙ্ক্ষিত প্রেক্ষাটি রচনা করতে চেয়েছিলেন। আলাদা একজন মানুষ হিসেবে পিতাকে এভাবে দেখতে পারা খুবই কঠিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অকৃতকার্যতাই ঘটে। খুবই সংকোচভরে বলছি রবীন্দ্রনাথের মতো লোকোত্তর মানুষও হয়তো পুরো সফল হননি। তবে তিনি অসমসাহসিক একটি চেষ্টা করেছেন।
‘সংসারের সম্বন্ধ — বিচিত্র সম্বন্ধ, বিচিত্র স্বার্থ, বিচিত্র মত, বিচিত্র প্রবৃত্তি — ইহার দ্বারা বিচারশক্তির বিশুদ্ধতা রক্ষা করা কঠিন হয়, ছোটো জিনিস বড়ো হইয়া উঠে, অনিত্য জিনিস নিত্য জিনিসকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখে, সংসারের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে প্রকৃত পরিচয় প্রত্যহ খণ্ডিত হইয়া যায়। এই জন্যই পিতৃদেবের এই জন্মদিনের উৎসব তাঁহার আত্মীয়দের পক্ষে একটি বিশেষ শুভ অবসর। যে পরিমাণ দূরে দাঁড়াইলে মহত্ত্বকে আদ্যোপান্ত অখণ্ড দেখিতে পাওয়া যায়, অদ্যকার এই উৎসবের সুযোগে বাহিরের ভক্তমণ্ডলীর সহিত একাসনে বসিয়া আমার সেই পরিমাণ দূরে আসিব...।’
পিতাকে ‘ব্রহ্মনিষ্ঠ গৃহস্থ’ বলার মধ্যে মনে হয় সেই প্রার্থিত দূরত্ব রক্ষা পেয়েছে। পিতা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বারবারই রবীন্দ্রনাথ দেবেন্দ্রনাথের জীবনে মানসিক, সাংসারিক, আদর্শগত বিরোধের দুর্যোগ কীভাবে নেমে এসেছিল সেই প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি তো বিশ্বাস করতেন ‘আঘাত সে যে পরশ তব সেই তো পুরস্কার’। তাঁর দুঃখদর্শনের সঙ্গে পিতার জীবনের মূলসুরের তিনি সাদৃশ্য পেয়েছিলেন। সেই যুগে ধনীদের অমিতব্যয়ে প্লাবিত বাবুকালচারের কলকাতায় পারিবারিক ঐশ্বর্যজাত যাপন থেকে ক্রমশ বিখ্যাত ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র কীভাবে স্বতন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তা বিবৃত করেছেন রবীন্দ্রনাথ।
‘সম্ভ্রান্ত সমাজে তাঁহার যে বংশগত প্রভূত প্রতিপত্তি ছিল তাহার প্রতি দৃকপাত না করিয়া পিতৃদেব ভারতবর্ষের ঋষিবন্দিত চিরন্তন ব্রহ্মের — সেই অপ্রতিম দেবাদিদেবের আধ্যাত্মিক, পূজা প্রতিকূল সমাজের নিকট মুক্তকন্ঠে ঘোষণা করিলেন।’
আজ আমরা জানি দ্বারকানাথ বড়োছেলের ব্রাহ্ম ধর্ম নিয়ে এইভাবে নিমগ্ন থাকা খুব একটা পছন্দ করতে পারেননি। ব্যাপারটি স্বাভাবিক, কারণ রামমোহনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, সমাজসংস্কারে পরমোৎসাহী, পরোপকারী দ্বারকানাথ মূলত ছিলেন একজন উদ্যোগপতি — আজকের ভাষায় entrepreneur, উদ্যোগের মাপে পরবর্তী যুগের জামশেদজি টাটা, ঘনশ্যামদাস বিড়লা, লক্ষ্মীনিবাস মিত্তল, বা ধীরুভাই আম্বানির মতো। ব্যবসা তাঁর কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যই লাভালাভ। ব্যবসাতে ছেলের উৎসাহের অভাব তাঁকে খুশি করতে পারে না। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের কাছে পিতামহ পরমশ্রদ্ধেয় হলেও রোলমডেল ছিলেন না। রবীন্দ্রজীবনে আমরা দেখব বারে বারে ব্যবসার প্রচেষ্টা — লাভের আশা তাঁর নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়েছিল আরো অধিক কিছু। মৃত্যুর কয়েকবছর আগে শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাসকে তিনি তাঁর পল্লিপুনর্গঠনের কাজ সম্বন্ধে যে কথাগুলি বলেছিলেন তাতে তাঁর জীবনব্যপী প্রচেষ্টার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ পাই।
‘জাতীয় জীবনের প্রত্যেক বিভাগে দৃষ্টি ছিল আমাদের। দেশীয় বিদ্যালয় থেকে আরম্ভ করে দেশীয় সমবায় ভাণ্ডার সব কিছুরই পত্তন করেছিলাম। শিল্পপ্রসারের চেষ্টা তো ছিলই, পল্লিমঙ্গল, পল্লিগঠন, বৈজ্ঞানিক শিক্ষাবিস্তার, কুটীরশিল্প ও কলকারখানার সাহায্যে আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের যাবতীয় দ্রব্যনির্মাণ, আমরা করিনি কি?’
পল্লিপুনর্গঠন প্রয়াসে রবীন্দ্রনাথ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তার সঙ্গে যে দেবেন্দ্রনাথের ভাবনার খুব মিল আছে তা নয়। বস্তুত পাবনার প্রজাবিদ্রোহ বিষয়ে হরিনাথ মজুমদার তাঁর ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় অন্যান্য জমিদারদের সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথকেও কম দায়ী করেননি। তিনি ব্রাহ্মধর্মপ্রসারে ব্যস্ত থাকায় জমিদারিতে প্রজাকল্যাণে যথাযথ মন দেননি এটি হরিনাথের সরাসরি অভিযোগ। আসলে ব্রিটিশ আমলে, বিশেষ করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে বাংলার চাষিরা চিরকাল মহাজনী শোষণে দেনায় ডুবে থাকবে এটাই সবাই মেনে নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রথম রাজশক্তির কোনো সাহায্য ছাড়া নিজের জমিদারিতে সমবায় ব্যাঙ্ক স্থাপন করেন। ১৯০৫ এ পতিসরে কৃষিব্যাঙ্ক স্থাপিত হয়। তখন এই প্রয়াস অভূতপূর্ব। ব্যাঙ্ক স্থাপনের উদ্যোগ তো অনেক আগে থেকেই শুরু করেছিলেন, স্বভাবতই দেবেন্দ্রনাথের অনুমতি ছাড়া জমিদারিতে ব্যাঙ্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করা সম্ভব ছিলনা। দেবেন্দ্রনাথ কোনো বাধা দেননি। এই বাধা না দেওয়ার গুরুত্ব কম নয়। ব্যাঙ্কের মূলধন রবীন্দ্রনাথ নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার করেন। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের ৮২,০০০ টাকা ব্যাঙ্কে রাখাতে মূলধনের কিছুটা সুবিধা হয়। সুদের আটহাজার টাকায় শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের দরকার মিটত। চাষিদের অল্পসুদে টাকা ধার দেবার এই ব্যবস্থা জোর ধাক্কা খায় ১৯৩০ সালে Rural Indebtedness আইন প্রবর্তনের ফলে। নোবেল পুরস্কারের অনেকটা টাকা রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনকে হারাতে হয়। আজ বাংলাদেশে নোবেল- পুরস্কারজয়ী মহঃ ইউনুস তাঁর ‘গ্রামীণ ব্যাঙ্ক’ স্থাপন করে, ভারতে চন্দ্রশেখর ঘোষ ‘বন্ধন ব্যাঙ্ক’ স্থাপন করে এবং আরো বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে নিরন্তর কাজ করে সমস্যাটির মোকাবিলা করছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তো আছেই। তবু উপমহাদেশের কৃষক ঋণজালে জর্জরিত। রবীন্দ্রনাথ সেই অনন্য পথিকৃৎদের একজন যিনি এই সমস্যা মেটাতে শুধু চিন্তা ভাবনা করে থেমে যাননি, নিজে সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাঁর পল্লীউন্নয়ন ও কৃষি, শিল্পভাবনার সঙ্গে তাঁর পিতামহ বা পিতার সরাসরি যোগসূত্র খুব নেই।

ফিরে আসি পূর্বপ্রসঙ্গে — দ্বারকানাথের আকস্মিক অকালমৃত্যুর পর বিপুল ঋণভার সহ পরিবারের চূড়ান্ত দুর্দিনে দেবেন্দ্রনাথের সংগ্রাম ও আদর্শবোধ রবীন্দ্রনাথের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল।

‘সম্পদ যাঁহাকে অমৃতলাভ হইতে তিরস্কৃত করিতে পারে নাই, বিপদ ও তাঁহাকে অমৃতসঞ্চয় হইতে ব্যক্তি বঞ্চিত করিতে পারিল না। ... ঐশ্বর্যের সুখশয্যা হইতে তুলিয়া লইয়া ধর্ম ইঁহাকে তাহার পথের মধ্যে দাঁড় করাইয়া দিল।’
দেবেন্দ্রনাথের জীবনের আরেকটি বিপর্যয় ব্রাহ্মসমাজের প্রথম ভাঙন। তীব্র মতান্তর হল তাঁর প্রিয়শিষ্য ও সহকর্মীদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ ব্যাপারটি তাঁর অতুলনীয় ভঙ্গিতে এইভাবে জানিয়েছেন,
‘ভারতবর্ষের যাহা শ্রেষ্ঠ ধন তাহাও সার্বভৌমিক, য়ুরোপের যাহা শ্রেষ্ঠ ধন তাহা ও সার্বভৌমিক; তথাপি ভারতবর্ষীয়তা এবং য়ুরোপীয়তা উভয়ের স্বতন্ত্র সার্থকতা আছে বলিয়া উভয়কে একাকার করিয়া দেওয়া চলে না। ... তরুণ ব্রাহ্মসমাজ যখন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে এই কথা ভুলিয়াছিল, যখন ধর্মের স্বদেশীয় রূপ রক্ষা করাকে সে সংকীর্ণতা বলিয়া জ্ঞান করিত যখন সে মনে করিয়াছিল, বিদেশীয় ইতিহাসের ফল ভারতবর্ষীয় শাখায় ফলাইয়া তোলা সম্ভবপর এবং সেই চেষ্টাতেই যথার্থভাবে ঔদার্য রক্ষা হয় তখন পিতৃদেব সার্বভৌমিক ধর্মের স্বদেশীয় প্রকৃতিকে একটা বিমিশ্রিত একাকারত্বের মধ্যে বিসর্জন দিতে অস্বীকার করিলেন। ইহাতে তাঁহার অনুবর্তী অসামান্য প্রতিভাশালী ধর্মোৎসাহী অনেক তেজস্বী যুবকের সহিত তাঁহার বিচ্ছেদ ঘটিল।’
তেজস্বী যুবক বলতে অবশ্যই অন্যতম কেশবচন্দ্র সেন। দেবেন্দ্রনাথ যাঁকে ‘ব্রহ্মানন্দ’ উপাধি দিয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথকে সামনে রেখেই কেশবচন্দ্র ও তাঁর অনুগামীরা সমাজসংস্কারে ঝাঁপ দেন। বিধবাবিবাহ, অসবর্ণবিবাহ, জাতিভেদ বিরোধিতা, শিক্ষার প্রসার — সব কাজেই তরুণদলের তীব্র উৎসাহ। যজ্ঞোপবীত ত্যাগ করা ব্রাহ্মণ কিংবা অব্রাহ্মণ ব্রাহ্মসমাজের বেদীতে বসতে শুরু করলেন। ১৮৬৪ সাল থেকেই চলছিল মতপার্থক্য। দেবেন্দ্রনাথ ও তাঁর অনুগামীরা — রাজনারায়ণ বসু, নবগোপাল মিত্র, আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ, অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার অসবর্ণ বিবাহ সমেত অনেক সংস্কারের ক্ষেত্রেই ধীরে চলায় বিশ্বাসী ছিলেন। বিশেষত নারীমুক্তি আন্দোলনে কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বে নবীনগোষ্ঠী ছিলেন বিশেষ অগ্রণী। ১৮৬৬ সালে ১১ নভেম্বর ‘কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজ’ থেকে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করা হল। রাজনারায়ণ বসুর মন্তব্য সতর্ক — ‘দেবেন্দ্রবাবু চিরকাল ভক্তিপ্রধান ও রক্ষণশীল ব্যক্তি অথচ সংস্কারক।’ পিতার রক্ষনশীলতা যে রবীন্দ্রনাথকে কখনো কখনো বিব্রত, বিপন্ন করেনি তা নয়। সর্বাপেক্ষা যে ঘটনাটি তাঁর পক্ষে বেদনাদায়ক হয়েছিল বলে মনে হয় তা হল অকালপ্রয়াত ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথের কিশোরী বিধবা স্ত্রীকে পিতৃগৃহ থেকে ফিরিয়ে আনা। বলেন্দ্রনাথের পিতা বীরেন্দ্রনাথ ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। বীরেন্দ্রনাথ প্রফুল্লময়ীর একমাত্র সন্তান বলেন্দ্রনাথ প্রতিভাবান হলেও তাঁর স্বাস্থ্য ছিল দুর্বল। রবীন্দ্রনাথের পরম স্নেহাস্পদ এই ভাইপো নিতান্ত অল্পবয়েসে প্রয়াত হন। বলেন্দ্রনাথের বিধবা স্ত্রী সুশীতলতা বা সাহানাকে তার বাবা সার্জন-মেজর ফকিরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজের কাছে এলাহাবাদে নিয়ে যান এবং তার বিয়ের কথা ভাবেন। এমনসময় ফকিরচন্দ্রের মৃত্যু হয়। দেবেন্দ্রনাথ নাতবৌকে এই কাজটি নিজেদের কাছে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথকে এই কাজটি সম্পন্ন করতে পাঠানো হয়। এটি ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের কথা। রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী দেবীকে এলাহাবাদে পৌঁছে যে চিঠি লিখেছেন তাতে তাঁর অস্বস্তি টের পাওয়া যায়। স্পষ্টত দেবেন্দ্রনাথ বিধবা সাহানার পুনর্বিবাহে অসম্মত ছিলেন তাই ঠাকুর পরিবারে তাকে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত। পিতার নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন বলা যায়। তাঁর নিজের মত ঐ সময় কী ছিল তা অনুমান করতে পারি একটি অসাধারণ ছোটোগল্প থেকে। রবীন্দ্রনাথের ‘ত্যাগ’ গল্পটি সাধনায় ১২৯৯ বৈশাখ অর্থাৎ ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয়। ঐ গল্পে ব্রাহ্মণ হেমন্তর সঙ্গে অব্রাহ্মণ বিধবা কুসুমের বিবাহ ঘটেছে, যদিও এর পিছনে ছিল প্রতিশোধপরায়ণ প্যারিশংকরের চক্রান্ত, কিন্তু লেখকের নৈতিক সমর্থন যে হেমন্ত ও কুসুমের প্রতি — তা প্রছন্ন থাকেনি। কুসুমের প্রকৃত পরিচয় উদ্‌ঘাটিত হওয়ার পর হেমন্তর পিতা ‘দেবী চৌধুরাণী’র ব্রজেশ্বরের পিতা হরবল্লভের তুল্য আচরণই করেছেন।
‘অনেকক্ষণ হইয়া গিয়াছে, আর সময় দিতে পারিনা। মেয়েটাকে ঘর হইতে দূর করিয়া দাও। ...হেমন্ত উঠিয়া গিয়া পিতাকে বলিল,

‘আমি স্ত্রীকে ত্যাগ করিবনা।

হরিহর গর্জিয়া উঠিয়া কহিল, ‘জাত খোয়াইবি?’

হেমন্ত কহিল ‘আমি জাত মানি না।’

‘তবে তুই সুদ্ধ দূর হয়ে যা।’

প্রশান্তকুমার পাল একটি ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। উনিশ শতকের শেষ ও বিশের শুরুতে ঠাকুর পরিবারে অনেকগুলি বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় — সবগুলিরই প্রধান খরচ দেবেন্দ্রনাথের মূল তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইন্দিরাদেবীর ক্ষেত্রেও তাই। তিনি সেকালের তুলনায় বেশি বয়সে পরিণীতা হন।
‘মহর্ষির জীবৎকালে তাঁর পরিবারে এইটিই রীতি ছিল। সুতরাং তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা ও ২৩ ভাদ্র ১৩০৬ তারিখে (৮ সেপ্টেম্বর ১৮৯৯) তাঁর শেষ উইলে সম্পত্তির বিলিব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর পরিবারভুক্ত কেউ কেউ যদি কন্যাদায় থেকে অসময়েই উদ্ধার পেতে চান তাহলে তাঁদের বৈষয়িক বিচক্ষণতার প্রশংসা করতেই হবে।’
এখানে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের নিজের বালিকা কন্যাদের বিবাহ প্রসঙ্গটি এড়ানো যাচ্ছেনা। দু একটি তথ্য আমরা মনে রাখতে পারি, এর আগেই ‘হিন্দু বিবাহ’, ‘অকাল বিবাহ’ প্রভৃতি প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি, স্পষ্টত তাঁর মত প্রাপ্তবয়স্কের বিবাহের দিকে। তবে এটি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দ্বিধাগ্রস্ততা। দেবেন্দ্রনাথ এই ব্যাপারে কোনো চাপ সৃষ্টি করেছেন এমনটা জানা যায় না।

পিতা ও পুত্রের চিন্তাপ্রবাহ সর্বদা এক পথে চলেনি — পরে তার নানা প্রকাশ আমরা রবীন্দ্রজীবনে দেখব। তবু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস হয় পুত্রের সামনে আদর্শ ছিলেন পিতা। পরিবারের মধ্যেই তিনি অনুসরণযোগ্য চরিত্র পেয়ে গিয়েছিলেন। মত যে সব মিলতেই হবে এমন বদ্ধতায় তো রবীন্দ্রনাথ কোনোদিন বিশ্বাস করেননি। পিতা সম্বন্ধে ‘মহর্ষির জন্মোৎসব’ প্রবন্ধে যা বলেছেন তা পুত্র সম্বন্ধেও আমরা বলতে পারি, অবসাদ ও নৈরাশ্যকে দূরে সরিয়ে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হবার প্রবল মানসিক শক্তি, নিজের আদর্শে ও কর্মে অবিচল থাকার নিষ্ঠা, প্রতিদিনের মলিনতাকে কাটিয়ে নিজের অন্তরাত্মাকে আলোকপিপাসু করে রাখার নিরন্তর প্রয়াস তিনি সম্পূর্ণ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন এমন বলা সরলীকরণ হবে, নিজেই তিনি নির্বাচন করেছিলেন রোলমডেল।

‘এই জীবন আপন কল্যাণ যাত্রা আরম্ভ করিয়াছিল — তখন ইহার ক্ষীণ স্বচ্ছ ধারা কখনো আলোক, কখনো অন্ধকার, কখনো আশা, কখনো নৈরাশ্যের মধ্য দিয়া দুর্গম পথ কাটিয়া চলিতেছিল। বাধা প্রতিদিন বৃহদাকার হইয়া দেখা দিতে লাগিল, কঠিন প্রস্তরপিণ্ড সকল পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল — কিন্তু সে সকল বাধায় স্রোতকে রুদ্ধ না করিতে পারিয়া দ্বিগুণবেগে উদ্‌বেল করিয়া তুলিল, দুঃসাধ্য দুর্গমতা সেই দুর্বার বলের নিকট মস্তক নত করিয়া দিল।’

।। ২ ।।


বার আমি আমার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে প্রবেশ করছি। এটি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব বিকাশে দেবেন্দ্রনাথ কী ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই বিষয়ে আলোকপাতের চেষ্টা থাকবে, কীভাবে সেই বিশেষ ভূমিকা কবির জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তা দেখব। মহামানবের ব্যক্তিত্ব ঘিরে যে জ্যোতির্বলয় গড়ে ওঠে তা একটু ভুলে গিয়ে আমরা রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পিতার মানবিক সম্পর্কের দিকে তাকাচ্ছি। শ্রী অরবিন্দ একটি চিঠিতে লিখেছিলেন,

‘To me the ultimate value of a man is not to be measured by what he says, nor even by what he does, but by what he becomes’.
রবীন্দ্রনাথের এই ‘becoming’ এর ইতিবৃত্তে জীবনস্মৃতি ও ছেলেবেলার অনেক বর্ণনা নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ। দু একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করা যাচ্ছে। ধনীগৃহের সন্তান হবার দরুণ ঠাকুরবাড়ির শিশুদের উপর খবরদারি করত চাকর দাসীরা। সবাই জানে জীবনের এই অধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছেন ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্র’।
‘এই সকল রাজাদের পরিবর্তন বারংবার ঘটিয়াছে কিন্তু আমাদের ভাগ্যে সকল তা’তেই নিষেধ ও প্রহারের ব্যবস্থার বৈলক্ষণ্য ঘটে নাই। ...মার খাইলে আমরা কাঁদিতাম... বস্তুত সেটা ভৃত্যরাজদের বিরুদ্ধে সিডিশন। আমার বেশ মনে আছে, সেই সিডিশন সম্পূর্ণ দমন করিবার জন্য জল রাখিবার বড়ো বড়ো জালার মধ্যে আমাদের রোদনকে বিলুপ্ত করিয়া দিবার চেষ্টা করা হইত।’
এই অংশটি পড়লে আতঙ্কে গায়ে কাঁটা দেয় — ধনীগৃহে জন্মের কী পরিণাম! শিশুকালের শাসনকর্তাদের হাতে কিলচড় খাওয়া ছাড়াও, পরিমাণে কম খাদ্য পরিবেশন করা, গণ্ডি কেটে বসিয়ে রাখা, ইত্যাকার নানাবিধ পীড়নের কথা তিনি পরিষ্কার ভাবেই জানিয়েছেন। স্কুল তাঁর কাছে বরাবর অরুচিকর লেগেছে। সহপাঠী ছাত্রদের ব্যবহার অনেকসময়ই মনে হত অশুচি ও অপমানজনক। শিক্ষকদের মধ্যে একজন — হরনাথ পণ্ডিত এমন কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করতেন যে অশ্রদ্ধাবশত বালক রবীন্দ্রনাথ তাঁর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতেন না। সম্ভবত এউ হরনাথই ‘গিন্নি’ গল্পের শিবনাথ পণ্ডিতে কিয়দংশে রূপান্তরিত হয়েছেন। শ্রেণীকক্ষের নিরুত্তর বালকটি যখন পরীক্ষায় বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেল, হরনাথ পরীক্ষকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার নালিশ আনতে দেরি করেননি। বালক রবিকে আবার বাংলা পরীক্ষা দিতে হল — ‘এবারও ভাগ্যক্রমে আমি উচ্চস্থান পাইলাম।’ মারধোর, মানসিক নির্যাতনসহ স্কুল রবির কাছে জেলখানা হয়ে উঠেছিল। তিনি নানা উপায়ে স্কুল পালাতে শুরু করলেন।
‘দাদারা মাঝে মাঝে এক-আধবার চেষ্টা করিয়া আমার আশা একেবারে ত্যাগ করিলেন। আমাকে ভৎর্সনা করা ও ছাড়িয়া দিলেন। একদিন বড়দিদি কহিলেন, “আমরা সকলেই আশা করিয়াছিলাম, বড়ো হইলে রবি মানুষের মতো হইবে, কিন্তু তাহার আশাই সকলের চেয়ে নষ্ট হইয়া গেল।” আমি বেশ বুঝিতাম ভদ্রসমাজের বাজারে আমার দর কমিয়া যাইতেছে কিন্তু তবু যে- বিদ্যালয় চারিদিকের জীবন ও সৌন্দর্যের সঙ্গে বিছিন্ন জেলখানা ও হাসপাতাল-জাতীয় একটা নির্মম বিভীষিকা, তাহার নিত্য-আবর্তিত ঘানির সঙ্গে কোনোমতেই আপনাকে জুড়িতে পারিলাম না।’
অভিজাত বা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত — যে কোনো পরিবারেই একটি বালক স্কুলছুট হয়ে গেলে যে নৈরাশ্য এবং অন্ধকার ভবিষ্যতের চিন্তা অভিভাবকদের ঘিরে ধরে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়েছিল ভাববার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া তিনি ছিলেন বহুসন্তানবতী মাতার শেষদিকের সন্তান — স্বভাবতই কিছু অবহেলিত। অনেক অনেক বছর পরে ১৪মার্চ ১৯২৯ সালে রাণী মহলানবিশকে লেখা একটি চিঠিতে কবি স্মৃতিচারণা করছেন, ভেসে উঠছে তাঁর ছেলেবেলার একটি বিষণ্ণ ছবি। শীতের ভোরে কন্‌কনে ঠাণ্ডা এড়াতে রবি আগুনতাত পাবার লোভে চাকরদের তোষাখানায় ঢুকেছেন, তাঁর জ্যৈদার জন্য রুটি তোস্‌ হচ্ছে, মাখন গলার সুগন্ধ, কাঠের নরম আঁচের উত্তাপ। জ্যৈদা বিবাহিত, তাঁর জন্য ভাববার লোক আছে, সকাল থেকেই তাঁর জন্য রুটি তোস্‌ হচ্ছে আর রবি স্রোতের শ্যাওলার মতো, চাকরদের হাতে অনাদরে মানুষ।
‘কিন্তু কোথায় সেই সকাল, গুন্‌ গুন্‌ গান করা চিন্তে চাকর — আর জ্যৈদা, তাঁর যা-কিছু সমস্ত নিয়ে কোথায়! আজ সেই শীতের সকালের অনাদৃত রবি জাহাজে চড়ে চলছে বৃহৎ জগতে।’
এই স্মৃতিতে শুধু অমোঘ কাল সম্পর্কে দার্শনিক ভাবনা নেই, আছে নিজের ছেলেবেলা সম্বন্ধে একটা অভিমান। এর থেকেও তীব্র ১৯২৭ সালের দোসরা জানুয়ারি দিলীপকুমার রায় ও অতুলপ্রসাদ সেনের কাছে তাঁর স্মৃতিচারণ, যা লিপিবদ্ধ আছে দিলীপকুমার রায়ের বিখ্যাত ‘তীর্থঙ্কর’ গ্রন্থে।
‘আমি ছেলেবেলা থেকে যেরকম একলা একলা মানুষ হয়েছি ও যে অবজ্ঞার মধ্যে গড়ে উঠেছি তাতে আমার মধ্যে একটা ভীরুভাব — shyness বদ্ধমূল হয়ে গেছে যার প্রভাব আমি আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ...আমার শৈশবে যে কী অনাদর ও ঔদাসীন্যের মাঝখানে কেটেছে জানোনা। আমাকে সবাই ভাবত অপদার্থ।’
‘তীর্থঙ্কর’-এর ইংরেজি রূপান্তর ‘Among the great’ এ দিলীপকুমার ‘nonentity’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ঐ কথোপকথনের সময়েই ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্বন্ধে কবি বাঁশিওয়ালা আর রকমারি বাঁশির প্রসঙ্গ এনেছেন। অনেক বাঁশির মধ্যে কয়েকটি বাঁশি ভালোভাবে উতরে যায় ঐ বাঁশিকটিকেই বাজাতে বাঁশিওয়ালার বেশি ভালো লাগে। তেমনি ‘প্রতিটি মানুষকেই বিধাতা আলাদা আলাদা রূপে গড়েছেন আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতার ছাঁচে ঢালাই করে। কিন্তু কয়েকটা আধার বেশি উতরে গেল। এদের চরিত্র একটু অভিনিবেশ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে তাদের অভিজ্ঞতায় গঠনপ্রকৃতি, গুণসমাবেশ, ঘটনার যোগাযোগ সবেরই পিছনে যেন রয়েছে একজন অদৃশ্য কারিগরের, কি বলব — design — মতলব।’

কনিষ্ঠপুত্রের অসামান্য আধারটিকে নির্ভুল চিনেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। স্কুলপালানো, নিঃসঙ্গ, চুপচাপ বালকটিকে অনাদর আর অবজ্ঞা থেকে হাত বাড়িয়ে তিনি তুলে এনেছিলেন। যথার্থ অভিভাবকত্ব — proper parenting বিষয়ে আধুনিক পিতামাতার উনিশশতকীয় এই ব্যক্তিত্বের কাছে অনেক শেখার আছে। প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন বালকটির মধ্যে যে হীনমন্যতা, গুটিয়ে থাকার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে তা অনুভব করেই তিনি তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। মনস্তত্ত্ববিদরা বারবার এখন বলছেন শিশু ও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে জাগাতে হবে আত্মবিশ্বাস। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে, পরিবারে কিশোর-কিশোরীর selfesteem বাড়িয়ে বা কখনো জাগিয়ে তোলার জন্য কতো ধরনের আয়োজন। কর্মশালা, পাঠক্রমবহির্ভূত সৃজনীমূলক নানা কার্যক্রম এবং পেশাদারি counselling। দেবেন্দ্রনাথ উপনয়নের পর স্বভাবভীরু বালকটিকে নিয়ে গেলেন হিমালয়ে, প্রকৃতির অপরূপ শুশ্রূষার জগতে। পেনেটিতে বালকরবিকে বাড়ি থেকে ঠিকমত পরিচ্ছদ না পরে বেরোনোর জন্য বড়দের বকুনি খেয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। সে চলল নগাধিরাজের সান্নিধ্যে, অসাধারণ এক অভিভাবকের বটচ্ছায়ায় —

‘একদিকে আমার প্রচুর পরিমাণে স্বাধীনতা ছিল, অন্যদিকে সমস্ত আচরণ অলঙ্ঘ্যরূপে নির্দিষ্ট ছিল। যেখানে তিনি ছুটি দিতেন সেখানে তিনি কোনো কারণে কোনো বাধাই দিতেন না, যেখানে তিনি নিয়ম বাঁধিতেন সেখানে তিনি লেশমাত্র ছিদ্র রাখিতেন না।’
কীভাবে বালকপুত্রের নানা খেয়ালে দেবেন্দ্রনাথ উৎসাহ দিতেন জীবনস্মৃতি সেই বর্ণনায় ভরপুর। কুড়োনো পাথর দিয়ে মাটির পাহাড় সাজানো, খোয়াই এ বালক আবিষ্কৃত জলকুণ্ড থেকে স্নান ও পানের জল আনানো, নিজের ক্যাশবাক্স যত্ন করে রাখার দায়িত্ব, তাঁর সোনার ঘড়ি দম দেবার কাজ, ভগবদ্‌গীতার প্রিয় শ্লোক কপি করতে দেওয়া — এককথায় বালক পেয়ে গেলেন পুরো মানুষের মর্যাদা।
‘বাড়িতে আমি নগণ্য বালক ছিলাম, এখানে আমার পরে এই সকল গুরুতর কাজের ভার পড়াতে তাহার গৌরবটা খুব করিয়া অনুভব করিতে লাগিলাম।’
তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স এগারো — আজকের ভাষায় টীনএজের দ্বারপ্রান্তে তিনি। এই সময় পিতার সঙ্গ ও স্নেহ তাঁর আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা উদ্‌বোধনে মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল। তাকে যেন অসমবয়সী বন্ধু করে নিয়েছিলেন তাঁর বাবা। সকালবেলা বালকপুত্রকে নিয়ে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে গিয়ে ভজনে যোগ দেওয়া থেকে, সন্ধেবেলা ছেলের গলায় ব্রহ্মসংগীত শোনা — সব মিলিয়ে এই দিনগুলি রবির কাছে আত্মবিলুপ্তির বিপরীত মেরুতে। Peter Parley’s Tales এর অনেকগুলি বই দেবেন্দ্রনাথ ছেলেকে পড়াবেন বলে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। কলকাতায় লেখা চিঠিপত্রে তিনি রবির পড়াশোনার অগ্রগতি বিষয়ে নানা খবরও দিয়েছেন। কিন্তু এই পড়ানো ওপর থেকে চাপানো নয়, চিন্তাশক্তির গোড়ায় জল দেওয়া। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের ‘ঘোরতর সাংসারিক বিজ্ঞতা’ ও উপদেশবাক্যে বিরক্ত হয়ে ছেলেকে পড়ানোর সময় প্রতিবাদ না করে থাকতে পারতেন না। মনে হয় ছেলেকে গ্রন্থ পড়ার সমালোচনামূলক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন বাবা। ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হলেই তা মেনে নিতে হবে, বিখ্যাত কেউ লিখলেই তা প্রতিবাদযোগ্য হবেনা এমন সংস্কার যেন না থাকে। শব্দার্থ নিয়ে বালক পিতার সঙ্গে তর্ক করতে ছাড়তেন না। শুধু পুস্তক নয়, ছেলেকে গ্রহ নক্ষত্রের রহস্যময় সুবিশাল জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন তিনি। বহুকাল পরে ‘বিশ্বপরিচয়’ লিখতে বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে নম্রভাবে স্মরণ করেছিলেন,
‘দেখতে দেখতে গিরিশৃঙ্গের বেড়া দেওয়া নিবিড় নীল আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারাগুলি যেন কাছে নেমে আসত। তিনি আমাকে নক্ষত্র চিনিয়ে দিতেন, গ্রহ চিনিয়ে দিতেন। শুধু চিনিয়ে দেওয়া নয়, সূর্য থেকে তাদের কক্ষচক্রের দূরত্বমাত্রা, প্রদক্ষিণের সময় এবং অন্যন্য বিবরণ আমাকে শুনিয়ে যেতেন।’
শৃঙ্খলার দিকে অতন্দ্র মনোযোগ ছিল দেবেন্দ্রনাথের। রাতের অন্ধকার দূর না হতেই ছেলেকে তুলে সংস্কৃত পড়াতে বসাতেন, তারপর তাকে পাশে নিয়ে উপনিষদের মন্ত্রপাঠ করতেন। বাবার সঙ্গে পাহাড়ি পথে বেরিয়ে ফিরে ইংরেজি পড়া শুরু হত, তারপর বরফঠাণ্ডা জলে স্নান। গোটা জীবন রবীন্দ্রনাথ সূর্যোদয়ের আগে উঠে পুব দিকে মুখ করে ধ্যানে বসেছেন। এই ধ্রুবপদ তো বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন উপনিষদের গহন মরমিয়া জগতের দিকে। আয়ুর শেষ প্রান্তে পৌঁছে পারস্য ভ্রমণের সময় শিরাজ শহরে গিয়ে সুফী কবি হাফিজের সমাধিদর্শনে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মহান এই কবির দীবান ছিল দেবেন্দ্রনাথের পরমপ্রিয়। বাবার মুখে শুনেই রহস্যঘন সুফী অনুভূতির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করা শুরু হয়েছিল।

পাহাড়ে ছেলেকে একা ছেড়ে দিয়েছেন বাবা। হিমালয়ের কোলে বালক তার জীবনের প্রিয় সঙ্গিনী প্রকৃতিকে কাছে পেয়েছে নির্ভয়ে। ক্যাশবাক্স ভুল করে টেবিলে রাখার জন্য যেমন তিরস্কৃত হয়েছেন, পূর্ণ ব্যক্তির দাম পেয়ে প্রতিদিন পুরস্কৃত হয়েছেন বালক রবীন্দ্রনাথ। কয়েকমাস পর অনুচর কিশোরী চাটুজ্যের সঙ্গে বালককে একা কলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবা। একা পথ চলার শিক্ষার তো সেই শুরু। মুখচোরা ছেলেটি নিজের ভীরুতা, সংকোচ কাটিয়ে উঠে আত্মপ্রকাশের সাহস নিজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে। এর মূলে রয়েছে তাঁর পিতার অসীম প্রেরণা।

‘যেমন করিয়া তিনি পাহাড়ে-পর্বতে আমাকে একলা বেড়াইতে দিয়াছেন, সত্যের পথেও তেমনি করিয়া চিরদিন তিনি আপন গম্যস্থান নির্ণয় করিবার স্বাধীনতা দিয়াছেন। ভুল করিব বলিয়া তিনি উদ্‌বিগ্ন হন নাই।’
হিমালয়ভ্রমণ থেকে ফিরে বালক রবির মনে হয়েছিল, ‘এতকাল বাড়িতে থাকিয়াই যে নির্বাসনে ছিলাম সেই নির্বাসন হইতে বাড়ির ভিতরে আসিয়া পৌঁছিলাম। অন্তঃপুরের বাধা ঘুচিয়া গেল, চাকরদের ঘরে আর আমাকে কুলাইলনা। মায়ের ঘরের সভায় খুব বড়ো আসন দখল করিলাম। তখন আমাদের বাড়ির যিনি কনিষ্ঠ বধূ ছিলেন তাঁহার কাছ হইতে প্রচুর স্নেহ ও আদর পাইলাম।’ বালক রবির ভবিষ্যতের রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠার — অপরিচয়ের আবরণ ছিঁড়ে আত্মপ্রকাশের সেই সূচনা। রথীন্দ্রনাথ পিতা ও পিতামহের বিষয়ে অকপটেই লিখেছেন, ‘আমার পিতামহ তাঁর এই সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। অপেক্ষাকৃত অপরিণত বয়সে তাঁর মধ্যে অসাধারণ প্রতিভার বিকাশ দেখে তিনি নিশ্চয় গৌরব অনুভব করে থাকবেন।’

কিন্তু শুধুই কি প্রতিভার বিকাশ? বিষয়সম্পত্তির ব্যাপারেও তো দেবেন্দ্রনাথ কনিষ্ঠপুত্রের উপর কম নির্ভর করেননি। জমিদারি পরিচালনার কাজে তাঁকেই পাঠিয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গে পাঠানোর ফল রবীন্দ্রনাথের জীবনে কীভাবে দেখা দিয়েছিল — অবারিত প্রকৃতি, গ্রামীণ মানুষ ও তাঁদের সুখদুঃখ তাঁর সৃজনীশক্তির কী কী বিকাশ ঘটিয়েছিল তার আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক না হলেও অধিকন্তু হবে। তবে জীবনের ঐ বিশেষ সময়ে পদ্মার অতিথি হওয়া যেন আশীর্বাদের মতো এসেছিল রবীন্দ্রজীবনে।

পরিশেষে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের মতো একজন সর্বার্থে মহামানবের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ ও নির্মাণের জন্য আমরা দেবেন্দ্রনাথের কাছে ঋণী হয়ে আছি। ‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধমালার ‘দীক্ষা’ থেকে একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করছি।

‘হে দীক্ষাদাতা, হে গুরু, এখনও যদি প্রস্তুত হয়ে না থাকি তো প্রস্তুত করো, আঘাত করো, চেতনাকে সর্বত্র উদ্যত করো — ফিরিয়ে দিয়োনা, ফিরিয়ে দিয়োনা — দুর্বল বলে তোমার সভাসদদের সকলের পশ্চাতে ঠেলে রেখোনা। এই জীবনে সত্যকে গ্রহণ করতেই হবে — নির্ভয়ে এবং অসংকোচে। অসত্যের স্তূপাকার আবর্জনার মধ্যে ব্যর্থ জীবনকে নিক্ষেপ করব না। দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে — তুমি শক্তি দাও।’
পিতার কাছ থেকে পাওয়া রবীন্দ্রনাথের সত্যদীক্ষার কথা মনে রেখে এই অকিঞ্চিৎকর আলোচনা শেষ করা গেল।


(দেবেন্দ্রনাথের দ্বিশতজন্মবর্ষে এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রদত্ত বক্তৃতা।)


ছবিঃ ইন্টারনেটের সৌজন্যে প্রাপ্ত