"রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বাণিজ্য-মনস্কতা--রাহুল রায়-এর প্রবন্ধ"



রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বাণিজ্য-মনস্কতা

রাহুল রায়



প্রজাদের সঙ্গে জমিদার রবীন্দ্রনাথ

চার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বাঙালি জাতিকে ব্যবসা করার উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন বাণিজ্যের মাধ্যমেই এই জাতির জড়তা কাটিয়ে আর্থিক ও সামাজিক উন্নতি সম্ভব। বলা বাহুল্য যে বাঙালি আচার্যের এই ‘কল টু আর্মস’-এর ডাকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। বরং অন্যের চাকরি করে, সংসার সামলিয়ে ও অবসরকালে পরনিন্দা, পরচর্চার পর অবশিষ্ট সময়ে গান-বাজনা-সাহিত্য করে জীবন-যাপনের পথ অবলম্বন করেছে।

বিতর্কিত হলেও এটা বেশ জোর দিয়েই বলা যায় যে বাঙালির এই সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতার অন্যতম কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবি ঠাকুর আমাদেরই লোক। তিনি সাহিত্য করে, গান লিখে, নাটক করে পৃথিবী-খ্যাত হয়েছেন, পেয়েছেন এশিয়ায় প্রথম নোবেল প্রাইজ। গুরুজন যে-পথে চলে, সেই পথ আমাদের হবে না কেন? সত্যি কথা। নি:সন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সংস্কৃতির পুরোধা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কীর্তির মধ্যে বাণিজ্য-মনস্কতার (বিসনেস একুমেন) কোন অভাব ছিল না। আর সেই অনুযায়ী বাঙালি জনগণ রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করেছে কিছুটা মাঝামাঝি ভাবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানেই আমাদের মানসচক্ষে ভেসে ওঠে সৌম্যদর্শন, ঋষিসুলভ চেহারার এক ব্যক্তি। বৈদিক যুগে মুনি-ঋষিদের দেখতে কেমন ছিল তা জানার কোন উপায় নেই। কিন্তু সিনেমা-থিয়েটার-নাটক-নভেলে অতীতের মুনি-ঋষিদের লম্বা চুল-দাড়ি-গোঁফ থাকবেই। অতএব, গোঁফ-দাড়ি কামানো কাউকে কি মুনি-ঋষি বলে মানা যায়! তাই রবীন্দ্রনাথের লম্বা জোব্বা-পরা, ঢেউ-খেলানো সাদা চুল-গোঁফ-দাড়ির ছবি দেখলেই মনে হয় অতীতের কোন ঋষি বোধহয় ওঁর মধ্য দিয়ে কলিকালে আবির্ভূত হয়েছেন। মজার কথা হল রবীন্দ্রনাথের যৌবনকালের ছবি যে পাওয়া যায় না তা নয়। জানা নেই কবে তিনি চুল-দাড়ি-গোঁফ ছাঁটা বন্ধ করেছিলেন, কিন্তু আমরা যেন তার জন্যই অপেক্ষা করেছিলাম। আলুলায়িত সাদা চুল-গোঁফ-দাড়ির রবীন্দ্রনাথ আর সব রবীন্দ্রনাথের ইমেজারিকে ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যা হল, তার ফলে ‘মানুষ রবীন্দ্রনাথ’ ‘ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ’-এ পর্যবসিত হয়েছেন।

এইরকম একজন লোককে ব্যবসা-বুদ্ধি সম্বলিত মর্ত্যের সাধারণ লোকের মধ্যে টেনে আনলে, বা সেই পর্যায়ে ফেললে কি অপরাধ করা হয়? আমাদের সনাতন ভারতীয় চিন্তাধারা মেনে নিলে নির্ভয়ে বলা যায় — হাঁ হয়। সাধারণ ধারণা অনুসারে ব্যবসায়ী মানেই তার চিন্তা কী ভাবে জনগণকে শোষণ করে নিজের বিত্ত বাড়ানো যায়। পুরাকালে এ-রকম ব্যবসায়ী বা শ্রেষ্ঠীর উদাহরণ আছে ভুরি-ভুরি। মার্চেন্ট অফ ভেনিসের শাইলক দ্য জ্যু-র মত দেনা আদায় করতে তারা গা থেকে মাংস কেটে নিতেও পিছপা হন নি। বর্তমানেও তার অভাব নেই। যদিও এই ধারণা যে সত্যি এ মনে করার কোন কারণ নেই। কিন্তু জনগণের ধারণা সবসময় যুক্তি মেনে চলে না।

যাইহোক, রবীন্দ্রনাথকে ব্যবসায়ী-বুদ্ধি-সম্পন্ন বললে আমাকে ক্যারাক্টার অ্যাসাসিনেসনের অপরাধে অভিযুক্ত করবেন কেউ-কেউ। আপনি আমাদের ঋষিতুল্য রবি ঠাকুরকে ব্যবসায়ীর পর্যায়ে টেনে নামালেন--আপনার স্পর্ধা তো কম নয়! একেবারে ব্ল্যাশফেমির পর্যায়ে। জানেন মধ্যযুগে এর জন্য আপনাকে ক্রশ-বিদ্ধ করা হত, অথবা মেরে ফেলা হত ঢিল ছুঁড়ে, তিল-তিল করে।

কলকাতায় জোড়াসাঁকোর প্রবল প্রতাপশালী জমিদার ও ব্রাহ্মধর্ম-প্রচারক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোদ্দ ছেলে-মেয়ের সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছোট থেকেই তাঁকে প্রথাগত বিদ্যার ধার ধারতে হয় নি। স্কুল-পালানো রবীন্দ্রনাথের নানা বিষয়ে গৃহ-শিক্ষার কোন অভাব হয় নি। তিনি কুস্তি করেছেন, বিজ্ঞান-শিক্ষা করেছেন, চর্চা করেছেন পৃথিবীর নানান ভাষা, ওস্তাদের কাছে শিখেছেন প্রাচ্য সঙ্গীত, আর পাশ্চাত্য সঙ্গীত-শিক্ষকের কাছে শিখেছেন ক্লাসিকাল মিউসিক, নিজের বাবার কাছে ভারতীয় বেদ-উপনিষদ পড়ে তা হৃদয়ঙ্গম ও ব্যখ্যা করতে শিখেছেন, অন্য দিকে পড়েছেন পৃথিবীর ইতিহাস, সাহিত্য। অন্যভাবে বলতে হয় যে কোন মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য যা-যা প্রয়োজন বালক-যুবক রবীন্দ্রনাথের শিক্ষায় তার কোন অভাব হয় নি। সুতরাং তিনি হতে পারতেন বৈজ্ঞানিক,[১] নানা ভাষায় দক্ষ পণ্ডিত, ব্যায়ামবীর, সঙ্গীতজ্ঞ, বা আরো অনেক কিছু। কিন্তু বয়স একটু বাড়ার পর, অর্থাৎ কৈশোর থেকে যৌবনে পৌঁছনোর পর ষোল বছর বয়সে তিনি লিখলেন ভানু-সিংহের পদাবলী। অমিত বিত্তশালী ঠাকুর বাড়ির ছোট ছেলে হলেন কবি! মজার কথা এই শিক্ষাটা তিনি কারোর কাছে পান নি। কারণ কবিত্ব কাউকে শেখানো যায় না।

আমি নিশ্চিত যে ঠাকুরবাড়ির অনেকেই এ ব্যাপারে বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়েন। মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট, অন্য দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ —কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, আর এক দাদা হেমেন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-প্রচারক, দিদি স্বর্ণকুমারী সুলেখিকা। সহজেই চিন্তা করে নেওয়া যায় যে ঠাকুরবাড়ির আড়ালে–আবডালে কথা উঠেছে রবির ভবিষ্যতে যে কী আছে কে জানে! কবি হয়ে কী কেউ কোন দিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে!

দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ দ্বারকানাথের নানান ব্যবসার বিনিময়ে ‘ঠাকুর এস্টেট’-কে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচান। বাকি থাকে পূর্ব বাংলার শিলাইদহ, পতিসর, সাজাদপুর (দ্বারকানাথের মধ্যম পুত্র গিরীন্দ্রনাথের এজমালি সম্পত্তি যা দেবেন্দ্রনাথ দেখাশুনো করতেন) ও উড়িষ্যায় বালিয়া ও পাণ্ডুয়ার বিশাল জমিদারি। উনি নিজেই এই জমিদারি দেখাশুনো করতেন। কিন্তু শীঘ্রই দেবেন্দ্রনাথ ধর্মাচরণ ও ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ও নিয়মিত জমিদারি দেখাশুনোর ভার অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁর প্রতিনিধি হয়ে বিভিন্ন সময়ে জমিদারি দেখাশোনা করেছেন বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ ও তাঁর ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথ, পঞ্চম ছেলে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, বড় জামাই সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে সত্যপ্রসাদ।

সব শেষে আসেন সর্বকনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ। পূর্ব বাংলার বিশাল জমিদারির তত্ত্বাবধান করতে হবে, নিয়মিত খাজনা আদায় করার ব্যবস্থা করতে হবে, প্রজাদের দেখ-ভাল করার প্রয়োজন, সুযোগ থাকলে জমিদারি কি করে বাড়ানো যায়, তাও দেখতে হবে। কয়েক মাস সেখানে থাকতে হবে। এদিকে পদ্মায় জমিদারের বজরা আছে। সেখানে থেকে সময়মতো ডাঙায় নেমে প্রজাদের সাথে দেখাশোনার ব্যবস্থা করা যাবে। আর সময় পেলে বজরায় বসে যতো ইচ্ছে কবিতা লেখো। কবি হওয়াটা তো কেউ আটকাচ্ছে না! বাবামশায়ের এই প্রস্তাবে সম্মতি জানানো ছাড়া রবির কোন উপায়ই ছিল না। এই ছিল ঠাকুরবাড়ির রীতি। অর্থাৎ বাবামশায়ের কথার ওপরে কোন কথাই চলতো না।

অতএব রবীন্দ্রনাথ গেলেন পূর্ব বাংলার জমিদারির তত্ত্বাবধান করতে।এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি করেন প্রায় পঞ্চাশ বছর, তার মধ্যে ১৮৮৯ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩১ বছর ঠাকুর এস্টেটের বেতনভোগী কর্মচারী হিসাবে। নিজে জমিদারির মালিকানা পেয়েছেন ১৯২০ সালে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উনি দেখিয়েছিলেন যে হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের মধ্যে সম্প্রীতি এনে, তাদের শোষণ না করে, তাদের উন্নতির দিকে চোখ রাখলে জমিদারির স্বাস্থ্য ভালোই থাকে।[২]

প্রথমে আলোচনা করা যাক বর্তমানে অর্থাৎ একবিংশ শতাব্দীতে ধনতন্ত্রবাদের প্রতিভূ আমেরিকায় বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসার রূপ বা বিজনেস মডেল কি ধরনের, আর তার পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত উনবিংশ শতাব্দীর বিজনেস মডেল কেমন ছিল।

বর্তমান পৃথিবীতে স্মোক-স্ট্যাক বা ইঁট-কাঠ–লোহা-লক্কড়ের ব্যবসার দিন শেষ। হাই টেক বা ইনফরমেশন টেকনোলজি আর বায়োলজিকাল টেকনোলজি বা বায়োটেক কোম্পানিগুলির আজ জয়জয়কার। আলোচনা করা যাক সেই ‘টেক কোম্পানি’-রা তাদের কর্মচারীদের কি চোখে দেখছে।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে এই কোম্পানিগুলি ক্রমশ:ই তাদের কর্মচারীদের জন্য ‘পজিটিভ এনভায়রনমেন্ট’ সৃষ্টি করতে উৎসাহী। দেখা গেছে তাতে কর্মচারীদের কর্মক্ষমতা বা প্রডাক্টিভিটি অনেক বেড়ে যায়। তাতে কোম্পানিরই লাভ। এবার দেখা যাক কি-কি আছে সেই ‘পজিটিভ এনভায়রনমেন্ট’-এ। তাতে আছে কাজের জায়গায় জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ ব্যতিরেকে সকলের সমান সুযোগ থেকে নিখরচায় বেবি-সিটিং-এর ব্যবস্থা, জীম বা ব্যায়াম করার ব্যবস্থা যাতে শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকে, আর আমোদ-প্রমোদের জন্য বছরে কয়েকবার বাইরে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। বলা বাহুল্য সবই সেই লাভের দিকে চোখ রেখে।

এবার দেখা যাক জমিদারের প্রতিনিধি ও পরে জমিদার হয়ে রবি ঠাকুর কি-কি করেছিলেন, আর সেই কাজের প্রতিফলন ঠাকুর পরিবারের ব্যবসা বা জমিদারির ওপর কতখানি পড়েছিল।

জমিদারের প্রতিনিধি হয়ে এসে প্রথমেই তিনি হিন্দু ও মুসলমান প্রজাদের আলাদা হুঁকোর ব্যবস্থা তুলে দেন। তাছাড়া কাছারিতে সবাইকে একসাথে বসতে হত। ভারতবর্ষের বুকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে এমন দৃঢ় পদক্ষেপ আর কেউ নিয়েছিল কী না আমার জানা নেই। এবার আসা যাক প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায়ের ব্যাপারে তিনি কি করেছিলেন।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জমিদারের প্রতিনিধি-স্বরূপ জমিদারের নায়েব বা দেওয়ান থাকত রাজস্ব বা কর আদায়ের দায়িত্বে। কর আদায় করতে অনেক সময়ই তার সঙ্গে থাকত পাইক-বরকন্দাজের দল। প্রজারা কর দিতে না পারলে পালিয়ে বেড়াত নায়েবের দৃষ্টি এড়াতে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে বিশেষ ভাবে অত্যাচারী ছিলেন তা মনে করার কোন কারণ নেই। এটাই ছিল তখনকার দিনের নিয়ম।

এদিকে জমিদারের প্রতিনিধি হয়ে খাজনা তোলা বা ট্যাক্স কালেকসনের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ করলেন পুণ্যাহ-এর ব্যবস্থা। আর সেই পুণ্যাহ সম্বন্ধে জমিদারের হাব-ভাব তিনি নিজেই লিখেছেন ‘সৌন্দর্যের সম্বন্ধ’ নামক প্রবন্ধে — ‘আমি কহিলাম–তাহারই প্রমাণ এই পুণ্যাহের বাঁশি। একজনের ভূমি, আর-একজন তাহারই মূল্য দিতেছে, এই শুষ্ক চুক্তির মধ্যে লজ্জিত মানবাত্মা একটি ভাবের সৌন্দর্য প্রয়োগ করিতে চাহে। উভয়ের মধ্যে একটি আত্মীয়সম্পর্ক বাঁধিয়া দিতে ইচ্ছা করে। বুঝাইতে চাহে ইহা চুক্তি নহে, ইহার মধ্যে একটি প্রেমের স্বাধীনতা আছে। রাজাপ্রজা ভাবের সম্বন্ধ, আদানপ্রদান হৃদয়ের কর্তব্য। খাজনার টাকার সহিত রাগরাগিণীর কোনো যোগ নাই, খাজাঞ্চিখানা নহবত বাজাইবার স্থান নহে, কিন্তু যেখানেই ভাবের সম্পর্ক আসিয়া দাঁড়াইল — অমনি সেখানেই বাঁশি তাহাকে আহ্বান করে, রাগিণী তাহাকে প্রকাশ করে, সৌন্দর্য তাহার সহচর। গ্রামের বাঁশি যথাসাধ্য প্রকাশ করিতে চেষ্টা করিতেছে, আজ আমাদের পুণ্যদিন, আজ আমাদের রাজাপ্রজার মিলন। জমিদারি কাছারিতেও মানবাত্মা আপন প্রবেশপথ নির্মাণের চেষ্টা করিতেছে, সেখানেও একখানা ভাবের আসন পাতিয়া রাখিয়াছে।’[৩]

কর বাদে, রবীন্দ্রনাথ প্রজাদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখে শুরু করলেন পুষ্করিণী-সম্মার্জনীর কাজ, দাতব্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা, যার চিকিৎসক জমিদার-তনয় নিজে, তাছাড়া, স্ত্রী-শিক্ষার জন্য পাঠশালা, ধান চাষের জন্য প্রজারা যেন সহজে দাদন পায় তার জন্য গ্রামীণ ব্যাঙ্ক। উল্লেখযোগ্য যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ সেই টাকার বেশ বড় অঙ্ক সেই পতিসর গ্রামীণ ব্যাঙ্কে লগ্নী করেন, যাতে প্রজারা অল্প সুদে দাদন পেতে পারে।

এ কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বকবি’ হয়ে ওঠার পর, নিজের নানান কর্মকাণ্ড ও বিদেশ ভ্রমণের ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জমিদারি ও প্রজাদের ভুলে যান নি। নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথকে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়েস, আর্বানা-শ্যাম্পেন-এ এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে পাঠান। রথীন্দ্রনাথ, তাঁর সেই কৃষি-বিদ্যার লব্ধ জ্ঞান জমিদারির প্রজা-হিতার্থে কাজে লাগান। বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়েছিল উচ্চ-ফলনের বীজ, মাটির গুণ পরীক্ষা করার জন্য তৈরী হল গবেষণাগার। আর, অবিশ্বাস্য মনে হলেও পতিসরের জমিতে ট্রাক্টর চালানোর ব্যবস্থা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ-রথীন্দ্রনাথ পিতা-পুত্র জুটি। রবীন্দ্রনাথ ১৯১১ সালের উইলে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দান করেন রথীন্দ্রনাথকে। তা ছাড়া তিনি একটি চিঠিতে লেখেন — “জমিদারি সম্পত্তির আয় নিজের ভোগে না লাগাইয়া প্রজাদের হিতার্থে যাহাতে নিযুক্ত করেন রথীকে সে সম্বন্ধে বার-বার উপদেশ দিয়াছি। তদনুসারে এইরূপ মঙ্গল অনুষ্ঠানে তিনি যদি তাহার পৈত্রিক সম্পত্তি প্রসন্নচিত্তে উৎসর্গ করিতে পারেন তবে আমার বহুকালের একান্ত ইচ্ছা পূর্ণ হয়...”

বলা বাহুল্য রবি ঠাকুরের এই উদার জমিদারি বাণিজ্য-নীতির ফলে জমিদারির কোন ক্ষতি হয় নি, বরং তার স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। এটা নি:সন্দেহে রবীন্দ্রনাথের বাণিজ্য-বুদ্ধির পরিচায়ক। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারা প্রায় দুশো বছর এগিয়ে ছিল। সম্প্রতি ডা: মহম্মদ ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাঙ্ক-এর প্রচার ও প্রসারের জন্য নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তি রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারার নির্ভুলতা প্রমাণ করে। বোলপুরে শান্তিনিকেতনের পাশে শ্রীনিকেতনে ক্ষুদ্র-শিল্পের প্রতিষ্ঠা সেই একই চিন্তাধারার ফসল।

জমিদার রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে দীর্ঘ আলোচনার কারণ অন্য নানান কাজ বাদ দিয়েও তিনি জমিদারি ও ব্রাহ্ম সমাজের উপাচার্যের কাজ একই সাথে করেছেন সমান দক্ষতায়। রবীন্দ্র-অনুসারী সমীর সেনগুপ্ত লিখছেন — “দেবেন্দ্রনাথের চরিত্রের মধ্যে দার্শনিকতা ও বৈষয়িকতার অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী সহাবস্থান ছিল।”[৪] তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথ এই মনোভাব থেকে একচুলও দূরে ছিলেন না।

রবীন্দ্রনাথের বাণিজ্য-মনস্কতার এখানেই শেষ নয়।

রবীন্দ্রনাথ নিজের মতাদর্শ প্রচার ও প্রসার করতে কলকাতা থেকে বহু দূরে বোলপুরে তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘শান্তিনিকেতন’। এটা ছিল বেদ-উপনিষদের আদর্শে গড়ে তোলা একটা আশ্রমিক বিদ্যালয় বা বোর্ডিং স্কুল। স্কুলের জমি পাওয়া গেছে বাবামশায়ের কাছ থেকে, কিন্তু সেটা চালানোর খরচ বা অপারেটিং কষ্ট আসবে কোথা থেকে! ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকদের জন্য ঘর-বাড়ি, সে কুঁড়ে ঘর হলেও তৈরী করা, শিক্ষকদের বেতন দেওয়া, সবাইয়ের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা — এসবের জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। রবীন্দ্রনাথ তখনো নোবেল প্রাইজ পান নি, সুতরাং চাইলেই টাকার সম্বল তাঁর ছিল না।

প্রতিমা দেবী, রানি মহলানবিশ, রানি চন্দ, প্রমথনাথ বিশী, প্রশান্তকুমার পাল, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ও আরো অনেকে যাঁরা শান্তিনিকেতনের প্রথম দিকের কথা লিখেছেন, তাঁরা এক বাক্যে শান্তিনিকেতনে প্রচণ্ড অর্থকষ্টের কথা বলেছেন।[৫] নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলেও অর্থ-কষ্ট একেবারে চলে যায় নি। রবীন্দ্রনাথ বার-বার বিদেশে গেছেন বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। দেশের মধ্যে তিনি নৃত্য-নাট্যের দল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন সেই একই উদ্দেশ্যে।

রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে একবার অর্থসংগ্রহের জন্য উত্তরভারত অঞ্চলে সফরে বের হলেন। রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কানে এ কথা ওঠে। এই সংবাদে গান্ধীজী ব্যথিত হলেন। দিল্লীতে সদলবলে কবির সঙ্গে গান্ধীজীর সাক্ষাৎ হলে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিকে ফেরত পাঠালেন। ওয়ার্ধা থেকে ১৩/১০/১৯৩৫ তারিখে তিনি কবিকে চিঠি লিখলেন — “এ-কথা আমার নিকট ভাবনার অতীত বলে মনে হইতেছে যে আপনার এই বয়সে আপনাকে আবার ভিক্ষার উদ্দেশ্যে বাহির হইতে হইবে, আপনার শান্তিনিকেতনের বাইরে পা বাড়ান ব্যতিতই এই অর্থকে আপনার নিকট পৌঁছাইতে হইবে।” গান্ধীজীর অনুরোধে ব্যবসায়ীরা রবীন্দ্রনাথের নিকট ৬০ হাজার টাকা পৌঁছে দিলেন। ওই টাকায় শান্তিনিকেতনের বহু ঋণ শোধ হয়।[৬]

যাইহোক, ক্রমশ: বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থকষ্টের অবসান হয়ে এটা একটি স্ব-নির্ভর প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রসঙ্গে বলা বোধ হয় বাহুল্য যে অন্য যে কোন ব্যবসার মতো বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর জন্য ব্যবসায়ী বুদ্ধি লাগে। সেখানেও একাউন্টিং বা হিসাব-নিকাশ, লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ করতে হয়। ‘খাতা না মিললে’ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চত্ব পেতে বেশি সময় লাগে না।

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ং-নির্ভর হয়ে পড়া কার বুদ্ধিতে সম্ভব হোল? রবীন্দ্রনাথ আর্থিক ব্যাপারে কোন নামজাদা বিশেষজ্ঞর সাহায্য নিয়েছিলেন এ কথা জানা নেই। সুতরাং বিশ্বভারতীর নামজাদা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে পরিণত হওয়ার মূল হোতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা ভালো যে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের মধ্যে আছেন অমর্ত্য সেন, ইন্দিরা গান্ধী ও সত্যজিৎ রায়। আরো যারা সংযুক্ত ছিলেন তাদের নাম করতে গেলে সে কালের সারা পৃথিবীর ‘হ্যু ইস হ্যু’ হয়ে যাবে। মজার কথা রবীন্দ্রনাথ কোন বিজনেস কেন, কোনো স্কুলেই পড়েন নি, আর এম-বি-এ তো দূর অস্ত।

রবীন্দ্রনাথের বাণিজ্য-মনস্কতা ছিল বহুমুখী। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। আরো একটা দিক বিশ্লেষণ করা যাক। যে কোন ব্যবসা বাড়াতে গেলে কোন পণ্য বা পরিষেবার মান নির্ণয় করে তা ধরে রাখা বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল অবশ্য-প্রয়োজনীয়। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আমরা যদি কোন এক ব্রান্ডের মাজনে দাঁত মেজে অভ্যস্ত থাকি, আর সেই মাজন যদি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানের হয়, তাহলে আমরা দ্বিতীয় বার তা কেনার কথা ভাববো? সারা পৃথিবীতে ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকার অন্যতম অবদান বোধ হয় ম্যাকডনাল্ড ‘ফাস্ট-ফুড রেস্তোরা’। এর যাথার্থ নিয়ে তর্ক করা যায়। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে ক্ষিদে পেলে খাবারের মান ম্যাকডনাল্ড ১ থেকে ম্যাকডনাল্ড ২, ৩, ৪... কোথাও কোন তফাৎ হবে না। এটা কোয়ালিটি কন্ট্রোলের একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এবার দেখা যাক রবীন্দ্রনাথ কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ব্যাপারে কি ভেবেছিলেন ও করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন —বাঙালি আমার সব কিছু ভুলে গেলেও, আমার গান তারা ভুলবে না। একশোরও বেশি বছর বাদে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপ্রিয়তা সেই ‘প্রফেসি’ সমর্থন করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শুধু ‘প্রফেসি’ দিয়েই ক্ষান্ত হন নি। তিনি বুঝেছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে একটা নির্দিষ্ট মানের হতে হবে। আর সবাইকে দিয়ে সেই মান রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই তিনি বিশ্বভারতীর হাতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মান বাঁচিয়ে রাখার ভার দেন। প্রায় প্রত্যেকটি গানের স্বরলিপি নিজে লিখে বা অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে ও তা স্বরবিতান নামে বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি প্রচেষ্ট হয়েছিলেন।

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে বাণী-ভিত্তিক রবীন্দ্রসঙ্গীত এক অভিনব সৃষ্টি। সমীর সেনগুপ্ত লিখছেন — “আর এইখানেই ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য থেকে রবীন্দ্রনাথ দূরে সরে যান। ইনি গান রচনা করেছেন, কিন্তু মালকোষে গান রচনা করেন নি। রবিশংকর যখন দু-ঘন্টা মালকোষ বাজিয়ে ওঠেন, তখন তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করে না ‘মশাই, এই যে দু-ঘন্টা মালকোষ বাজালেন, ঠিক কী বলতে চাইলেন বলুম তো?’ সেটা যতোখানি বেয়াদপি হবে, ততখানিই বেয়াদপি হবে রবীন্দ্রনাথের কোন গান, যেটা মালকোষের মত লাগছে, কিন্তু স্বর সবসময় মালকোষের মত চলছে না, বা কোথাও এমন পর্দা লাগছে যেটা মালকোষে লাগে না, সেটা মালকোষ হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ করা; কারণ রবীন্দ্রনাথ মালকোষে গান বাঁধেন নি। এবং সেখানেই তিনি রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন যেখানে তিনি মালকোষ থেকে সরে গেছেন।”[৭]

রবীন্দ্রনাথ নিজের সৃষ্টির অভিনবত্বের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন, ও তা সংরক্ষণের ব্যাপারে তিনি ছিলেন যথেষ্ট স্পর্শকাতর ও কিছুটা কঠোর, যা ছিল তাঁর চরিত্র-বহির্ভূত। যেমন রবীন্দ্রনাথ বহু বছর প্রখ্যাত গায়ক দিলীপ কুমার রায়, যাঁর ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ওপর দখল ছিল প্রবাদপ্রতিম, তাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ডিং করাতে বাধা দিয়েছেন। কারণ রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন মার্গ সঙ্গীতের আবশ্যিক তান কর্তব, মুড়কি ইত্যাদি রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণী ও বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে দেবে।[৮]

এইবার আলোচনা করা যাক রবীন্দ্রসঙ্গীতের শুদ্ধ গায়কী, স্বরলিপি-অনুসরণ ইত্যাদির ওপরে রবীন্দ্রনাথের নিজের ও বিশ্বভারতীর কোয়ালিটি কন্ট্রোল বা খবরদারির ফল কি হয়েছে তা নির্ণয় করা ও একই সাথে তাঁর বাণিজ্য-মনস্কতার আর এক দিকের খোঁজ করা।

যদি রবীন্দ্রনাথ নিজের গানের ওপরে খবরদারি না করতেন, তা হলে যে কোন শিল্পী তাঁর নিজের ইচ্ছামত রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারতেন। স্বরলিপির বিশেষ কোন প্রয়োজন লাগতো না। আর ধীরে ধীরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বকীয়তা হারিয়ে যেতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাথে অন্য কোন গানের কোন তফাত বিশেষ থাকত না। সত্যি কথা বলতে কী আজ একশোরও বেশি বছর পর রবীন্দ্রসঙ্গীত বেঁচে থাকতো কিনা সে সম্বন্ধে সন্দিহান হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টি যেন বেঁচে থাকে প্রজন্মর পর প্রজন্ম। তিনি বুঝেছিলেন যে তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রয়োজন, আর সেই প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখতে গেলে সমান ভাবে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বয়ং-সম্পূর্ণতা, যা রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্যের সাথে করেছেন। বর্তমানে পৃথিবী-ব্যাপী কয়েক হাজার ব্যক্তি, সংগঠন, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রসঙ্গীত ও তার আনুসঙ্গিক কলা শেখানোয় রত রয়েছে।[৯] এটা রবীন্দ্রনাথের সফল বাণিজ্যিক চিন্তার ফসল।

আরো মনে রাখা ভালো যে এই প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে উঠে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছড়িয়ে দিচ্ছে বাঙালি-অবাঙালি, স্বদেশী-বিদেশীর মধ্যে। রবীন্দ্র-পরবর্তী সাহানা দেবী, অমিয়া ঠাকুর, মালতী ঘোষাল, শান্তিদেব ঘোষ, সন্তোষ সেনগুপ্ত, কনক দাস থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক, দেবব্রত বিশ্বাস, কনিকা বন্দোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, বনানী ঘোষ থেকে আজ রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, শ্রীকান্ত আচার্য, মোহন সিং, বিক্রম সিং, মনোজমুরলী নায়ার থেকে ক্যানাডায় জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা অনিরুদ্ধ (সাসা) ঘোষাল। একেই কী পরম্পরা বলে না? বিশ্ব-পরম্পরা! রবীন্দ্রনাথ নিজের গান গাওয়ার ওপরে খবরদারি না করলে এটা কি সম্ভব হোত? আর সেই কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ওপর খবরদারি রবীন্দ্রনাথের বাণিজ্য-মনস্কতার অন্যতম পরিচায়ক।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার আর এক উদাহরণ হোল বাংলা ও হিন্দি সিনেমা, সে আর্ট ফিল্ম হোক বা নিতান্ত বাজারী ছবি হোক — সর্বত্রই রবীন্দ্রসঙ্গীতের গমগমে উপস্থিতি। নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেগুলি গাওয়া হয়, সঙ্গে বাজানো হয় নানান বাজনা। কয়েক বছর আগেও বিশ্বাস করা যেতো না রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে এরকম অর্কেস্ট্রেশন সম্ভব। সব প্রজন্মেরই নিজস্ব একটা রীতি-নীতি, গাওয়ার ধরন থাকে। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে সেই পরিবর্তন মাথায় রাখতে হবে। এই পরিবর্তনই রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নতুন করে তুলে ধরছে ও ধরবে। রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’-য় অমিত-এর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন ‘ফজলি আম ফুরোলে বলব না, আনো ফজলিতর আম; বলব, নতুন বাজার থেকে বড়ো দেখে আতা নিয়ে এসো তো হে।’[১০] আবার তাঁর দূরদর্শিতার সফল ইঙ্গিত।

উপসংহারে বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী ও একেবারে স্বকীয় বাণিজ্য-মনস্কতা ও দূরদর্শিতার ফল তাঁকে, বিশেষ করে তাঁর সৃষ্ট গানকে অমরত্ব দান করার পথে এগিয়ে চলেছে।


তথ্যনির্দেশঃ-

[১] বালক-বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানের প্রতি, বিশেষ করে জ্যোতির্বিদ্যার আকৃষ্ট ছিলেন। মাত্র তের বছর বয়সে তিনি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় লেখেন ‘গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি’। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল সারা জীবনব্যাপী। তিনি লিখেছেন বিজ্ঞান-ভিত্তিক উপন্যাস ‘ল্যাবরেটরি’। ভারতীয় ও পৃথিবীর বহু বিজ্ঞানীর সাথে তিনি বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে আছেন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাথ সাহা, সি.ভি. রামন, ভার্নার হাইসেনবার্গ, উইলহেল্ম সমারফিল্ড, আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। Rabindranath’s Thoughts on Science, Sisir K. Majumdar, Frontier, vol 44, 2011.

[২] কুলদা রায়, সচলায়তন, অন্য আলোয় দেখা -২ : জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরhttp://www.sachalayatan.com/porimanob/35085 ফেসবুক, http://www.facebook.com/notes/kulada-roy/anya-aloya-rabindranatha-1/10150263212500338.

[৩] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী, পঞ্চভূত, প্রথম খন্ড, বিশ্বভারতীগ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা।

[৪] সমীর সেনগুপ্ত, রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।

[৫] স্মৃতিচিত্র রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য, প্রতিমা দেবী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; রানী চন্দ, গুরুদেব, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা; নির্মল কুমারী মহলানবিশ, বাইশে শ্রাবণ, মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা; মৈত্রেয়ী দেবী, স্বর্গেরকাছাকাছি, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা; প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র জীবন কথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রমথনাথবিশী, রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা।

[৬] http://www.eidesh.com/bangladesh/blogs/view/713

[৭] সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, কলকাতা.Reba Som, Rabindranath Tagore: The singer and his song. Penguin Books Limited, India.

[৮] সম্প্রতি পরলোকগত ভারতীয় মার্গ-সঙ্গীতের প্রখ্যাত শিল্পী কিশোরী আমনকর সতীর্থ অজয় চক্রবর্তীকে বলেছিলেন “অজয়ভাই, দরবারীমে তান কর্তব কি জরুরত হ্যায় ক্যায়া?” দেশ, ১৭ই এপ্রিল সংখ্যা, ২০১৭।

[৯] বনানী ঘোষ দীর্ঘকাল ধরে উত্তর আমেরিকায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে রত ছিলেন। বস্টন অঞ্চলে স্বপ্না রায় আজ বারো বছরের ও বেশি এ দেশে জন্মানো, এক বর্ণও বাংলা-না-বলা ছেলে-মেয়েদের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়ে চলেছেন।

[১০] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শেষের কবিতা, বিশ্বভারতীগ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা।