"An essay on Rabindranath--by Uday Narayan Singh; “ভাষার মধ্যে ভাষাতীত” : আমার রবীন্দ্রনাথ-- উদয় নারায়ণ সিংহ -এর প্রবন্ধ"



“ভাষার মধ্যে ভাষাতীত” : আমার রবীন্দ্রনাথ

|| ১ ||

ই রহস্যটা ভেদ করা সহজ কাজ নয় – “মৃত্যু – সে” কেমন করে “ধরে মৃত্যুর রূপ”, “দুঃখ”-ই বা কি-করে “হয় হে দুঃখের কূপ”? উত্তর কবি নিজেই ধরিয়ে দিচ্ছেন – হয় তখনি যখন “তোমা হতে”.. “বিমুখ” হয়ে আমরা “আপনার পানে চাই” । স্রষ্টার কথা না ভেবে, সমগ্র মানব-জাতির কথা না ভেবে যখন কিছু সংখ্যক মানুষ শুধু নিজের পানে চেয়ে কয়েক মুঠো মাটির উপর প্রভুত্ব করবে বলে অন্যদের দুয়ারে হানা দেয় আজ থেকে ১০১ বছর আগে ২৮শে জুলাই ১৯১৪ সালে, তখনি প্রথম বিশ্ব-জোড়া যুদ্ধের সূচনা হয় – দেখা গেছে ওই একই সময়ে কিছু মহান আবিষ্কারের সংগে সংগে সেগুলির অসত্ ব্যবহারের প্রয়াসও শুরু হল – যা আজ মনে করিয়ে দেয় তারও কয়েক দশকের ব্যবধানে দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধের সময়ে পরমাণু-বিদ্যার ও বায়বীয় প্রযুক্তিবিদ্যার প্রগতিকে যুযুধান দেশ চালকেরা কিভাবে অপ-ব্যবহার করেন এবং কেমন করে অশান্তি ডেকে আনেন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে – সেই উদাহরণ দিয়ে ।

কিন্তু এই মৃত্যুর রূপ কেমন? ‘প্রভাতসংগীত’ (১৮৭৮? ‘অনন্ত মরণ’) পর্বে কবির মনে হয়েছিল ‘মরণ’ বোধ করি একটা গন্তব্যস্তল – যেখানে যাওয়ার পথ তৈরী হয়েছে ধরণী দিয়েই; আবার একই সংগে মরণ যাত্রীও বটে – সেখানে দেখছি বসুন্ধরাও তাদেরই সংগে মহাকাশের যাত্রী – ছুটে চলেছে আর তারই “চারি পাশে” মৃত্যু চলে, মৃত্যু “হাসে খেলে”। এ জগৎ সেখানে নশ্বর, এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ – যেখানে “জীবনবধূ হবে তোমার / নিত্য অনুগতা (মরণ , আমার মরণ , তুমি / কও আমারে কথা)”। স্মরণ-এর ত্রয়োদশ সংখ্যক কবিতায় পড়ছি জীবন ও মরণের মাঝখানে নিস্তব্ধ হয়ে রয়েছে দাঁড়িয়ে ওঁর 'প্রিয়া' যে নিজ হাতে মরণকে করে তুলেছে জীবনের প্রিয় - যে জীবন-মৃত্যর মাঝখানের প্রভেদ মাঝের দেওয়াল-দ্বার দিয়েছে সরিয়ে —

মরণেরে জীবনের প্রিয়
      নিজ হাতে করিয়াছ প্রিয়া।
খুলিয়া দিয়াছ দ্বারখানি,
যবনিকা লইয়াছ টানি,
জন্মমরণের মাঝখানে
      নিস্তব্ধ রয়েছ দাঁড়াইয়া।
তুমি মোর জীবন মরণ
      বাঁধিয়াছ দুটি বাহু দিয়া।
কবির কথাতেই জানছি ‘গীতাঞ্জলি’র ১১৬-সংখ্যক কবিতায় — “বিজন রাতে পতির সাথে/ মিলবে পতিব্রতা” এই জীবন, মরণেরই সাথে । — ঠিক যেমন ভানুসিংহ হয়ে তাকে বলছেন ‘শ্যামসমান’ —
“কোটি কোটি ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে
           বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে,
           হাসে খেলে মৃত্যু চারি পাশে।
           এ ধরণী মরণের পথ,
           এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ।

যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল’ প্রাণ?
           সে তো শুধু পলক, নিমেষ।
অতীতের মৃত ভার পৃষ্ঠেতে রয়েছে তার,
           না জানি কোথায় তার শেষ।”
প্রাণের প্রতিটি পৃষ্ঠ-কোষে অতীতের স্মৃতি থাকে লেখা। যে অতীতের ভালবাসার হাত ছাড়িয়ে যূথিকা-কে হরণ করেও, “নির্মম মরণ / পারে নি করিতে তবু চুরি / তরুণ প্রাণের তব করুণ মাধুরী” (স্ফুলিঙ্গ ৪২), তার সৌরভ আজও পাওয়া যায় — তাকে নিয়েই ‘গীতালী/৬৯’-এ কবি লিখলেন : “তোমার কাছে এ বর মাগি মরণ হতে যেন জাগি / গানের সুরে”; নিজের সেই ভালোবাসাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন : “হারায় যারা রয়ে রয়ে।/ ভালোবাসা, তোমারে তাই মরণ দিয়ে বরিতে চাই” (পূরবী-র ‘চঞ্চল’-এ) — কবি কি তাহলে মরণকে জানতে পেরেছিলেন? নিজেকেও কি নিজে চিনতে পেরেছিলেন? দেখা যাচ্ছে যা ওঁর মনে হয়েছে যা-কিছু চেনা, “পরিচিত সে পুরানো সবচেয়ে”, যাকে মনে হয়েছে প্রথম থেকেই জানি — “ভাবিয়াছিনু বারে বারে/ প্রথম হতে জানি তারে” (নব পরিচয়, ‘বীথিকা’ থেকে) “আবেশকুহেলিকাজাল” ছিন্ন হলে দেখা গেল "নূতন সে যে , নূতন তারে জানি", কেননা “এ — সংসারে সব সীমা / ছাড়ায়ে গেছে যে — মহিমা/ ব্যাপিয়া আছে অতীতে অনাগতে”, তাকে “মরণ করি অভিভব/ আছেন চির যে — মানব/ নিজেরে দেখি সে — পথিকের পথে”।

সে একটা সময় ছিল যখন গ্রন্থকীট হয়ে পাঠাগার কর্মীদের হাতে প্রচুর দুর্ভোগ সইতে হয়েছিল। অথচ তাও ‘আরও-আরও’ ভাবটিকে কমানো-দমানো যায়নি। রবীন্দ্রনাথ মনে করিয়ে দিয়েছেন বলে নয়, এমনিতেও বিশ্বাস করতাম, কবিতা পড়ারও একটা ‘শিক্ষা’ দরকার। যেমন ‘নীরব কবি’ কথাটি কিছুটা সোনার পাথরবাটির মতনই, তেমনি প্রশ্নটা এই নয় যে পদ্যপুণ্ডরীকের রামবাবুর চেয়ে কবিতাচন্দ্রিকার শ্যামবাবু কত বড়ো কবি। প্রশ্নটা এই যে কবিতা হয়ে উঠল কি না, তা কোনো আলৌকিক বা কুগঠিত কলপনাদর্পণের বস্তুছায়া কি না, ইত্যাদি। একই সত্যে “দশজন কবি... দশ প্রকার বিভিন্ন কবিতা দেখিতে পাইবেন কিনা” (সমালোচনা থেকে ‘নীরব কবি ও অশিক্ষিত কবি’) সেটুকুই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বোঝা দরকার যে কবির সাধনাই হলো কীভাবে বর্ণে-বর্ণে অক্ষরে-স্বাক্ষরে তার হাত ছাড়িয়ে নিজেকে ডালপালার মতো মেলে ধরবেন, যার হাত ধরে তিনি ভাবের আঙিনায় প্রবেশ করেছেন। প্রতিটি সার্থক কবির কাছেই এই ভাষার হাত ছাড়ানোর ব্যাপারটা খুবই জরুরি। ভাষার ভিতরে ঢুকে তার বেড়া ভাঙার কাজটা না করতে থাকলে সেইখানে পৌঁছানো যায় না যেখানে গেলে বলা যায় —এইতো আমি অপরূপকে ধরে এনেছি রূপে, বচনে আমার অনির্বাচ, “ভাষার মধ্যে ভাষাতীতকে প্রতিষ্ঠিত” (‘সাহিত্যের তাৎপর্য’ থেকে) করার কাজ আমি করতে পেরেছি সাহিত্যে, সংগীতে, চিত্রেও।

আমার রবীন্দ্রনাথকে আমি কীভাবে জেনেছি? জেনেছি এমন কৃতিতে যেখানে সামান্য কথা ও সাধারণ ভাব কেমন করে অসাধারণ ধ্বনিরূপ পায় কবিতা ও গানের সুরে-স্বরে, কীভাবে ও কেন কথায় শুধুমাত্র কথা বলা নয়, ছবি আঁকা চাই--কেন না, “সাহিত্যে এই ছবি আঁকার সীমা নাই”, তেমন ভাষা-শিল্পী হিসেবেই জেনেছি তাঁকে। রবীন্দ্রনাথকে যত দেখেছি যত পড়েছি ততই মনে জেগেছে একটা হতাশ ভাব : তবে বুঝি আর কোনও নতুন কথা ভাবা বা লেখা সম্ভব নয়। অথচ, এও ঠিক যে আমাদের লেখা-কটি আমাদের সাহিত্য কোথাও থেমে থাকেনি। ক্ষণকালও তিষ্ঠনোর কথা যেন কেউ ভাবতেই পারে না। সময় কোথাও দাঁড়াতে দেয় না। মুকুল ধরলেই, বোল ফুটলেই মনে হতে থাকবে, আরও সুন্দর হয়ে উঠি। আরও সরস হই! আর ওই যাঁরা দূরে দাঁড়িয়ে ঢিল ও আঁক্‌শী হাতে দেখছেন এবং নানাও পরিকল্পনা আঁটছেন মনে মনে--ঠিক কীভাবে বাদে-প্রতিবাদে, তর্কে-বিতর্কে সেই কবির কৃতিকে নামিয়ে ফেলবেন বাস্তবের জমিতে, তাঁদের উদ্দেশ্যই দেখানো হল যে কবির নির্মাণ অতি নিম্নমানের নিরর্থক। প্রশ্ন হল, সেই ভয়ে কি সাহিত্যের “হয়ে ওঠার” এই প্রক্রিয়া থাকবে থেমে বা থমকে? আদৌ নয় :

গাছে ফল যে’কটা ফলিয়া ঊঠে তাহাদের এই দরকার হয় যে, ডালের মধ্যে বাঁধা থাকিলেই আমাদের চলিবে না; আমরা পাকিয়া, রসে ভরিয়া, রঙে রাঙিয়া, গন্ধে মাতিয়া, আঁটিতে শক্ত হইয়া, গাছ ছাড়িয়ে বাহিরে যাইব--সেই বাহিরের জমিতে ঠিক অবস্থায় না পড়িতে পাইলে আমাদের সার্থকতা নাই। (‘সাহিত্য-দৃষ্টি’ থেকে)
এই হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার দুটি বৈশিষ্ট্য আমার নজর কেড়েছে : এক, কেউ বলতে পারবেন না যে অমুক ভাবনার উপর আমার স্বত্বাধিকার--শুধুমাত্র আমারই মৌরসী চলবে এখানে, কিংবা জোর করে পাট্টা তারই হবে। তার কারণ আমার মনে হয়েছে একবার লিখে ফেললেই বা গেয়ে ফেললেই তখন তা ‘সবার’। তখন এমনও দেখা যেতে পারে যে সেই লেখা বা গান অথবা ছবি থেকে শুরু হবে আবার বাক্য-নির্মাণের নতুন পথে হাঁটা, সমাস ও সন্ধির খাঁজে-খাঁজে জড়ো হওয়া শব্দবর্ণগুলি। এজন্যই “দাশুরায়ের পাঁচালি দাশরথির ঠিক একলার নহে; যে সমাজ সেই পাঁচালি শুনিতেছে, তাহার সঙ্গে যোগে এই পাঁচালি রচিত” (ওই)। দুটিকে একই কারণে মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানে-কবিতায়-গাথায় তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা-ভাবনা কিংবা অমাবস্যা প্রতিপদের ছবি থাকে না--তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন। শুনতে শুনতে মনে হয়, এতো আমারই কথা; এই কম্পন, এই অনুরণন এতো আমারই। এ যেন পাঠিকারই ভিতরভুবনের প্রতিধ্বনি।

রবীন্দ্রনাথকে জানতে গিয়ে একথাও বুঝেছি যে বাইরের প্রকৃত জগৎ তার রঙ, রূপ, রস ও ধ্বনি যথাবৎ ওঁর বা আমদের মনে শুধু ছায়া ফেলে এমন নয়--কারণ, হৃদয়ের বেদনা, ভয়, বিস্ময়, ঈর্ষা, দ্বেষ, কুটিলতার রসে হারিয়ে এই বাইরের ‘অন্য’কে আমরা ‘অনন্য’ করে তুলেছি মনের আরশিনগরে। তদুপরি, তার প্রকাশের জন্য যে যন্ত্রানুষঙ্গটি ব্যবহার করছি, সেই মাধ্যমটিও আবার ছবিকে দৃষ্টিকে দিচ্ছে আরও বাঁকাচোরা করে, রঙটিকে দিচ্ছে অন্য রঙের সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে; অর্থাৎ কি না, আমাদের প্রকাশ-মাধ্যমও প্রজাত কৃতিকে করছে আবিষ্ট। “বাইরের বিশ্ব...মনের মধ্যে হৃদয়বৃত্তির নানা রসে, নানা রঙে, নানা ছাঁচে নানা রকম করিয়া তৈরি হইয়া উঠিতেছে। ভাবুকের মনে এই জগৎটি বাহিরের জগতের চেয়ে মানুষের বেশি আপনার” (সাহিত্য, প্রথম অধ্যায় থেকে)। মনে হয়েছে, ভিতর ও বাইরের দুটি পৃথিবীকে স্রষ্টা বুঝি তুল্যমূল্য করে দেখছেন এবং এই দুইয়ের মধ্যে যে সৃজন-জনিত ফারাক এসে গেছে তা দেখে হয়তো নিজেই অবাক-বিস্ময়ে আছেন তাকিয়ে। একথা সত্য যে ভাবের নদী আর ভবনদীর গুণ-টান-স্রোত সম্পূর্ণ আলাদা--একটি থেকে অন্যটির উদ্রেক হওয়া সম্ভব, কিন্তু সৃজন-প্রক্রিয়ার এমনই ষড়যন্ত্র যে এই দুটি যন্ত্রের ছড়ে ভাবের নদীতে জাগতে থাকে এক অন্য ধরনের জোয়ার।

মনের মধ্যে যেন অতৃপ্ত বাসনার মতোই অব্যক্ত ভাবনার ভিড় থাকে সর্বদা সচল, ঘুরেফিরে দেখতে থাকে কোথায় দানা বাঁধা যায়--চাই শুধু একটা সুযোগ, কিংবা যোগ; অথবা বলা যাক এইভাবে চাই মাত্র একটি যোগসূত্র। এমন একটি সুতো যার টানে, হাল্কা সুরে একটা বাঁশির রেশ ফুরতে না ফুরতেই তারা চলে আসে কদম্বের নীচে, “বুদ্ধির কড়াক্কড় পাহারা”-কে উপেক্ষা করেই। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “অব্যক্ত ভাবনাগুলা যেন মূর্তিলাভ করিবার সুযোগ-অপেক্ষায় নিদ্রায়-জাগরণে মনের মধ্যে প্রেতের মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে” (‘সাহিত্য-সৃষ্টি’-থেকে)। একটি ভাবনা টেনে ধরে আনছে অন্য একটিকে, সেটি আবার ভর করছে আরও একটি ভাবের পাখায়। এভাবে সৃষ্টির রাজ্যে সারাক্ষণই চলতে থাকে কোষ-নির্মাণের পালা। এতে স্রষ্টা যেন যন্ত্রীমাত্র, ভাবুক দর্শক শ্রোতা, একাধারে বক্তাও পাঠিকাও। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই নির্মাণ-প্রক্রিয়ার বাক্যে কোনো যতিচিহ্ন নেই, সীমার মাঝে চিহ্নহীন দীর্ঘ এক একা।

খন মনে হয় বোধকরি সব কথা বলা হয়ে গেছে, এক ধরনের নৈঃশব্দ আসে নেমে। অথচ তখনই, মনে হয় আবার, আবারও। আরও আরও কিছু শব্দ আছে তূণীরে ও তীরে। পুনশ্চ-র ঠিক আগে পরিশেষ-এ এসেছেন রবীন্দ্রনাথ, চলেছে নানান ভাবে কবিতাগুলির মাড়াই, ঝাড়াই, বাছাই ও গ্রন্থিতকরণ। সাধুতে-অসাধুতে, গুরুতে-লঘুতে বদলে যাচ্ছে এতদিনকার ভাষাবন্ধন। গদ্য এলো তার “বাঁধা ছন্দের বাইরে জমালো আসর” (‘নাটক’ পুনশ্চ, রচনাবলী, ৮ম খণ্ড, ২৩৭; ১৯৯৫ সং)। এখানে শ্রী-চিন্তা ও শ্রী-বৃদ্ধির কোনও চাপ রইলনা কবির মাথায়--একই সঙ্গে “সুশ্রী-কুশ্রী ভালোমন্দ” গর্জন ও গান, তাণ্ডব ও তাল, অর্থাৎ কিনা “ছেঁড়া কাঁথা আর শাল-দোলানো”--এসবই “এল জড়িয়ে মিশিয়ে।” (ওই)--তৈরি হলো “গদ্যবাণীর মহাদেশ।” দীর্ঘাবধি পদ্যজীবনের অভ্যস্ততার হাত ছাড়িয়ে যে রবীন্দ্রনাথ ইতিমধ্যে অসাধারণ গদ্যশিল্পী রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন গল্পে-উপন্যাসে এবং যেভাবে বোল-চালের ভাষাকে মিশিয়েছেন নিজের নাটকের সংলাপে, তাঁর পক্ষেও এ এক গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা। এ যেন বহু শতাব্দীর অবগুণ্ঠন খোলা, খুলে দেয়া ঝরনার গিঁট। পুনশ্চ-এর ভূমিকায় লিখছেন :

গদ্যকাব্যে অতিনিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষায় ও প্রকাশরীতিতে যে একটা সসজ্জ-সলজ্জ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীনক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এই আমার বিশ্বাস। (ওই পৃ ২৩১)
অথচ এই প্রবণতা কিন্তু কবির পাণ্ডুলিপিতে পরিশেষ পর্যায়েই চলে আসছে। প্রথমেই একটা উদাহরণ দেয়া দরকার।

দেখা যাচ্ছে, ‘সুসময়’--এই ‘সংযোজন’-এর মূল ও একাধিক কর্তিত-পাঠের থেকে বলছি--ফরমায়েশি সংকলক সম্পাদকের তাড়া খেয়ে কবি খুঁজে বেড়াচ্ছেন বাণীর উৎসমুখ, চক্ষে না-জানি “কোন ইশারার ভাষা” অথচ “মনের দুয়ার খোলা”। চারিদিকে উপরোধের কণ্ঠস্বর ‘লিখন দেহো, লিখন দেহো’ ডাক--অথচ বাণীকে পাওয়া যাচ্ছে না খুঁজে। সে শরমে মুখ ঢেকেছে, গভীর অজানায় করেছে বাসা, বক্ষে তার পুষ্পহার, নয়নে স্বপ্ন--আপন-ভোলা ভাব (ওই, পৃ ৭০৪)। এমন কুমোর নন যিনি চাওয়া মাত্র ভাষা দেবেন গড়ে--উনি তো শুধু করছেন বাণীর মাধুকরী--গাইছেন ‘তীখন কথার লিখন ভিক্ষা দেহো’ (পরিশেষ, গ্রন্থপরিচয়, সংযোজন, পৃ ৭০৫)। অথচ লেখা আমার, বাণীর ধরা পড়ার এই প্রসঙ্গের লেশমাত্র পাই না গ্রন্থিত ‘পরিশেষ, সংযোজন’-এর ‘সুসময়’ কবিতায়, যেখানে পাণ্ডুলিপির দ্বিধা, কুণ্ঠা, গুণ্ঠন সবই অনুপস্থিত; এখানে এসে পড়ছি জৈষ্ঠ্যের নিদাঘ-সময়ে নিম্নোক্ত ঘোষণা :

বৈশাখী ঝড় যতই আঘাত হানে,
সন্ধ্যা-সোনার ভাণ্ডারদ্বার-পানে
         দস্যুর বেশে যতই করে সে দাবি--
         কুণ্ঠিত মেঘ হারায় সোনার চাবি,
গগন যখন অবগুণ্ঠন টানে।

‘খোলো খোলো মুখ’ বনলক্ষ্মীরে ডাকে,
নিবিড় ধুলায় আপনি তাহারে ঢাকে... (পৃ ২১৮)
যেমনটা ‘মিছে মত্ততা’ কবি ভাষাকবিতায় ঠিক পর-পরই খুঁজবেন, এখানে তার কোনও লেশমাত্র নেই। এ নয় যে উনি এমন সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা পাঠ-কে বা পাঠককে মাথায় রেখে করছেন। কারণ পরিশেষ থেকে বাদ পড়া একটি গদ্যলেখায় (‘আরেক দিন’, সংযোজন, গ্রন্থপরিচয় রচনাবলী ৮, পৃ ৭০৩) উনি কমবয়সের কবির লব্ধ স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বহুকাল পূর্বে যখন উনি খ্যাতি-অখ্যাতির বাইরে “পাঠকমণ্ডলী-নামক প্রকাণ্ড একটি শনিগ্রহ...জীবনকে তার উপগ্রহদলে ভরতি করার জন্য টান মারেনি”, তখন “শৌখিনের দাবি” কিংবা “প্রশংসার বাঁধা খোরাক”-এর পরোয়া না করেই বাণীকে জুড়তেন শব্দের তানে মুক্ত পাখির মতো। অথচ ১৯৩২-এর আগস্ট মাস থেকেই যে কাব্যযাত্রা শুরু হলো, সেখানে যেন সহজকথা মুখের ভাষা ও ‘গৃহস্থপাড়ার’ ভাষা এসে দেখা দিলো ‘কোপাই’ থেকে পরবর্তী সব কবিতায়। বাদ দিলেন “প্রাচীন গোত্রের গরিমা” ও অলংকার, নিয়ে এলেন গ্রামের সঙ্গে গলাগলি, এমন “কলভাষা” (পৃ ২৩৪)। সাধুর সঙ্গে চলিতের, জলের সঙ্গে স্থলের বিরোধ গেল মিটে :
কোপাই আজ কবির ছন্দকে আপন সাথি করে নিলে,
         সেই ছন্দের আপস হয়ে গেল ভাষার স্থলে জলে,
                  যেখানে ভাষার গান আর যেখানে ভাষার গৃহস্থালি। (পৃ ২৩৫)

দ্যবাণীর দেশটি কেমন? পাশাপাশি তলভেদে অসম সমতল, দুর্গম, অরণ্যের পাশেই কঠিন মরুভূমি। ফলে এ এক এমন গদ্য যাতে “চিরকালের স্তন্ধতা আছে / আর চলতি কালের চাঞ্চল্য” (‘নাটক’, পুনশ্চ, ওই, পৃ ২৩৭)। এমনই এক গদ্যে লেখা হয়েছে নাটক। নিজের বাণীকে যেন পরিয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যের বাণীর অলঙ্কার (‘নূতন কাল’, ওই, পৃ ২৩৮)। ভ্রমণমঞ্চ যেখানে আসর-জমানোর জন্য কথা হবে বিস্তর, তাই কথার ঠাস-বুনোনিতে যাতে ফাঁক না পড়ে তাই মিথ্যা মিশিয়ে সত্যি ঢেলে ব্যাকরণটা কিছুটা রদবদলে “রঙে মন্দ, কিন্তু মন্দ নয় রসে” (‘অপরাধী’, ওই, পৃ ২৪৪)। এমন সব চরিত্রকে নিয়ে আসা হয় পাদপ্রদীপের সামনে। এখানে হর-হামেশাই “সত্যকে বাড়িয়ে তুলে বাঁকিয়ে দিয়ে” অন্যদের ভালো লাগবে বলে নিন্দা বানানো হয়--নিছক মনোরঞ্জন; এ যেন “যেমন-খুশির ব্রজধামে...বালগোপালের লীলা” (‘ফাঁক’, ওই, পৃ ২৪৬)। অথচ প্রায়ই ইচ্ছা করে যদি মাত্র “ছাপার কালিদাস” না হয়ে :

আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে।
তুমি যদি হতে বিক্রমাদিত্য
আর আমি যদি হতেম--কী হবে ব’লে।
জন্মেছি ছাপার কালিদাস হয়ে।
                 তোমরা আধুনিক মালবিকা
                কিনে পড় কবিতা...। (‘পত্র’, ওই, পৃ ২৪২)
আর তাই যদি সম্ভব হতো, হয়তো “ছাপাখানার শৈত্য তখন/কবিতার সময়াকাশকে/...(দিত না) লেপে কালি মাখিয়ে” (প্রথম বন্ধনীর শব্দ প্রাবন্ধিকের, ২৪২)। তাহলে হয়তো বাসা বাঁধা সম্ভব হতো ময়ূরাক্ষীর ধারে যেখানে শালবনে আর মহুয়ার ভাবের গল্প জানা কথা, যেখানে তালগাছের ফাঁক দিয়ে সকাল বেলার রোদ্দুর বাঁকা “চোরাই ছায়া ফেলে আমার দেয়ালে...”, “দেয়াল বাসন্তী রঙের, / তাতে ঘন কালো রেখার পাড়”, আর ঘরের মাঝেতে ফিকে নীল রঙের জাজিম পাতা, (‘বাসা’, ঐ, পৃ ২৪৮)। এই বাড়ির পিছনে রয়েছে ধানখেত, আম-কাঁঠালের বাগিচা আর আস-শেওড়ার বেড়ার ওপার থেকে ভেসে আসা প্রতিবেশিনীর গান, গুন-গুন করে গাইতে থাকে মাখন থেকে দই তোলার ফাঁকে ফাঁকে, এ গান কোনও “ছন্দে-গাঁথা কুঁড়েমির কারুকাজ”-ও নয় (‘দেখা’, পৃ ২৫১), এ শুধু “আকাশবীণায় গৌড়সারঙের আলাপ”--যে “আলাপ আসছে সর্বকালের নেপথ্য থেকে” (‘সুন্দর’, পৃ ২৫২), অথচ যে-সুর আপনাকে-আপনি জানে না, যে-সুরে গলায় “করুণা লাগে ঝাপসা হয়ে” “কোমলগান্ধার মনে মনে” (‘কোমলগান্ধার’, ওই, পৃ ২৫৩)।

সব সময়েই শেষবেলার কবির ভাষায় “দুলে দুলে উঠছে / মন্দাক্রান্তা ছন্দে বিরহীর বাণী” (‘বিচ্ছেদ’, পৃ ২৫৪)। তখন উনি সেতারের গুণ টানছেন যেভাবে তাতে স্পষ্ট যে, এই বিচ্ছেদের যাত্রাপথে ‘অপূর্ণ’ ও ‘পূর্ণ’র মধ্যে চলছে একটা বিরাট বোঝাপড়া যেখানে “অপূর্ণ...চলেছে পূর্ণের দিকে / তার বিচ্ছেদের যাত্রাপথে আনন্দের নব নব পর্যায়”, অথচ মনে হয়েছে সেখানেই ‘পরিপূর্ণ’ রয়েছে স্থির দাঁড়িয়ে “নিত্যই সে একা--সেই তো একান্ত বিরহী”। আবার কখনও এও মনে হয়েছে যে বোধকরি ‘পরিপূর্ণ’ও বুঝি স্থির হয়ে নেই, সুর তার এগিয়ে চলে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নদীর স্রোতের সঙ্গে “একই তালে” ও “যাত্রার ছন্দে” এবং “আহ্বানের সুরে”।

ভাষার সঙ্গে বিভাষার মধ্যে যাতায়াতের যে ‘টেনশান’ তাও বোধকরি এই পূর্ণ ও অপূর্ণের মধ্যেকার টানা-পোড়েনের মতনই। অন্তত একথাই মনে হয়েছে ‘পুনশ্চ’র পরের কবিতাটি (‘স্মৃতি’) থেকে। অপরাহ্নের শহরের অপর প্রান্ত থেকে এসে যে “কৃষ্ণ পাণ্ডুবর্ণ বিষণ্ণ” মুখ “মৃদুস্বরে পড়িয়ে যায় বিদেশী কবির কবিতা” (‘স্মৃতি’ পৃ ২৫৬), তবে ভিতরে ঢুকে কবির প্রথম যৌবন খুঁজবে “বিদেশী ভাষার মধ্যে আপন ভাষা”। এই যাত্রাপথের কোনও ‘সহযাত্রী’-কে দেখে ওঁর মনে হয়েছে এই স্বল্পভাষী প্রায়-চুপচাপ ছেলেটি যখন সবাইকে এড়িয়ে যেতে দেখে মিশতে যায় :

      ...চাটগাঁয়ের খালাসিদের সঙ্গে।
      তারা কয় তাদের ভাষায়,
ও বলে কী ভাষা কে জানে--
      বোধ করি ওলন্দাজি। (‘পুনশ্চ’, রচনাবলী ৮, পৃ ২৬১)
উপভাষার বীজের ভিতর ঢুকে রস খোঁজা নয়, ‘লেখনী’র সঙ্গেও কবির অনেক আলোচনা, বোঝাপড়া :
দুঃখের দিনে লেখনীকে বলি--
    লজ্জা দিয়ো না।
সকলের নয় যে আঘাত
    ধোরো না সবার চোখে।
ঢেকো না মুখ অন্ধকারে,
    রেখো না দ্বারে আগল দিয়ে।
দ্বার উন্মোচনের কথা, সহৃদয় সংমিশ্রণের কথা উনি বলছেন অক্লান্ত ভাবে। এও বলছেন যে বিশ্ব কিংবা ভাষা কিংবা সৌন্দর্য, সুখ, সৌকর্য--এ শুধু ওঁর একার নয় :
আমার সে নয়,
                 সে অসংখ্যের (‘বিশ্বশোক’,পৃ ২৬৩)
প্রায় এককভাবে কবি রবীন্দ্রনাথের লেখনীকে ডেকে কিছু বলার নামে নিজের জীবন-দর্শনের যে রূপ দেখালেন তা হলো :
কুল ছাপিয়ে উঠুক তোমার দান।
     দাক্ষিণ্যে তোমার
ঢাকা পড়ুক অন্তরালে
আমার আপন ব্যথা।
ক্রন্দন তার হাজার তানে মিলিয়ে দিয়ো
বিশাল বিশ্বসুরে। (ওই, পৃ ২৬৩)
বিরাটের মধ্যে, সমষ্টির মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যথা বেদনা ঢাকা পড়ে যাক যিনি মাত্র ‘আমার’ নয়, যিনি ‘অসংখ্যের’ তাঁর বাঁধা তানে ও বিশ্বসুরে। বারবার যে বাণীর সীমাকে ছাপিয়ে ছাড়িয়ে ওঠার কথা উনি বলেছেন তার সঙ্গে তুলনীয় হলো ওঁর দেশিকতাকে ছাড়িয়ে বিশ্বজাগতিকতার প্রতি আহ্বানের। সেখানেও উনি জাতীয়তা ও জাতিসত্তাকে বা তার চর্চাকে একটা সীমার মধ্যে রেখে আন্তর্জাতিকতাকে এবং বিশ্বমানবতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা একই সঙ্গে বলেছেন।

পুঁথিগত বিদ্যাশিক্ষা এবং দেয়ালবদ্ধ বিদ্যাদানের বিরুদ্ধে যে দ্রোহ কবির জীবনমনে সে-থেকেই পুনশ্চ-র ‘বালক’-এর মতন কবিতা দেখা দিল। মনে যেন জানা প্রসঙ্গ চেনা-কথা আবার ঘুরে এলো; বালককে তার জগৎ থেকে ধরে পাঠশালায় হাজির করতেই অথবা যেই তার মাঠ ঘাট হাট বাট জল স্থলের “স্বরাজ”-কে নেয়া হলো কেড়ে, অমনি :

...দেহটাকে ঘিরলে চার দেয়ালে,
মনটাকে আঠা দিয়ে এঁটে দিলে
পুঁথির পাতার গায়ে। (‘বালক’, ওই, পৃ ২৬৭)
সমস্ত পৃথিবীর বালকেরা যে “খোলা জগতের যুবরাজ”, যাদের জন্য বিধাতাও গড়ে রাখেন “অকর্মণ্যের অপ্রয়োজনের জল স্থল আকাশ”, যাদের অশোকবনে রামায়ণ পুঁথি থেকে বেরিয়ে অহরহ চলতে থাকে রামলীলা, দূরের স্বচ্ছন্দ অধিকার নিয়ে অবরুদ্ধ চাঞ্চল্যের অর্গল খুলে দিতে--তারা সবাই মনের ক্ষুধা আর চোখের দেখার খেলায় যোগ দেবে বলে “ঘরে ঘরে, / লাটাইয়ের সুতোয় মাখাচ্ছে আঠা, / তাদের মনের কথা তারাই জানে।” (ওই, পৃ ২৬৯) তারা অনেকেই হয়তো “পিঁপড়ের অন্তরের যবনিকা” তুলে ধরে দেখতে চায় ভেতরে কোন অঙ্ক কোন দৃশ্য হবে বলে চলছে আয়োজন, কিংবা “মাকড়শার জগৎ বন্ধ রইল চিরকাল” (‘কীটের সংসার’, পুনশ্চ, ওই, পৃ ২৭৪)--সে কথা জেনেও করছে আফশোস কত জানা রয়ে গেল বাকি মানুষ হিসেবে! তাদেরই কেউ হয়তো বালক নয়, নিতান্ত ‘সাধারণ মেয়ে’ যারা একটি ভাষাই জানে বাংলা ছাড়া--“তারা ফরাসি জার্মান জানে না, / কাঁদতে জানে” (‘সাধারণ মেয়ে’, ওই, পৃ ২৮২), যার স্বভাবের গভীরে অসাধারণ কিছু স্বপ্নকথা থাকে তলিয়ে, যাচ্ছে চোখ থেকে “কাঁচা বয়সের জাদু”, যৌবনে ধরা থাকে “অল্পবয়সের মন্ত্র” আর যারা বিকিয়ে যায় “মরীচিকার দামে” (ওই)। এরা সবাই তাকিয়ে আছে শরৎবাবু ও রবিবাবুর দিকে যাঁরা সাধারণ ভাষাকে মমতার যত্নে ব্যবহার করে তুলবেন অসাধারণ।

সেক্ষেত্রে ঠিক কীভাবে শরৎবাবু ও রবিবাবুরা বাংলা ভাষার মতন ‘সাধারণ মেয়ে’কে বিশ্বসুন্দরের পর্যায়ে তুলে দিলেন? বাংলা গদ্যের (এবং আধুনিক যুগে, বাংলা পদ্যেরও) নির্মাণে দেখা গেল একদল বাঁধা গতে ও পথে চলা মানুষজনকে, যাঁরা “এ ভাষার কখনো মুখদর্শন করেন নাই। এই সজীব ভাষা তাঁদের কাছে ঘোমটার ভিতরে আড়ষ্ট হইয়া ছিল, সেইজন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিলেন না” (‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’, রচনাবলী, খণ্ড ১৬, পৃ ৩৬২)। তার ফলে যা ঘটলো তা হলো ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থং একটা বেমালুম সংস্কৃতের জামা পরা টিকি-ধারী বাংলার সামান্য খাদ মিশেল করা এক পাঠক-তাড়ুয়া ভাষা যা দিয়ে বিদেশিদের সহজে প্রতারণা করা যায় কেল্লার (ফোর্ট উইলিয়াম) পরিধিতে, কিন্তু যার সঙ্গে সজীব মৌখিক বাংলার কোনও মিল নেই। এই ‘হাঁসজারু’ বাংলা তখনই ধরা পড়ে গেল যে-মুহূর্তে সেই ভাষায় সাহিত্য-নির্মাণ, সাময়িক পত্র, তর্ক-বিতর্ক এবং বিদ্যালয়-পাঠ্যপুস্তক নির্মাণ (‘স্কুল-বুক সোসাইটি’-র কল্যাণে) শুরু হলো। যে প্রতারণা বিভাষী ও বিদেশিদের কাছে চলবে তা দিয়ে যে কোনও মহৎ কার্য করা বা মহান ভাষার নির্মাণ করা যায় না, সেকথা ধীরে ধীরে বোঝা গেল।

তবে এও ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথ ‘সাহিত্য-সার্কাসের মল্লগিরি’ করতে নারাজ ছিলেন অথচ এও দেখা যাচ্ছিল যে দেশজ শব্দ ধাতু ক্রিয়ার সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় লেগে যে আত্মপ্রত্যয়হীন বাণীবিশ্বের নির্মাণ হচ্ছিল তাতে “মল্লবিদ্যা ছাড়া এক-পা চলিবার জো নাই”, অথচ “সাধারণের পক্ষে পদে পদে অগ্রসর হওয়ার চেয়ে পদে পদে পতনের সম্ভাবনাই বেশি” (ওই, পৃ ৩৬৪-৫) হয়ে দেখা গেল। ফলে উনি এবং সতীর্থরা গোড়াতে না হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধু ভাষায় যাদের “জলচল ছিল না”--এমন সব শব্দসম্ভারকে জায়গা করে দিতে থাকেন সহজে উচ্চার্য বোধগম্য ও ব্যবহার্য তৎসম ও তদ্‌ভব স্রোতশব্দের পাশাপাশি--প্রত্যয় ও উপসর্গেরও কিঞ্চিৎ সৃজনী মিশ্রণে এ এক নতুন বাংলা ভাষার নির্মাণের প্রকরণ শুরু হলো। ‘প্রার্থিত’ ‘প্রার্থনীয়’-র আদলে ‘চাওয়া’ থেকে ‘চায়িত’ ও ‘চাওনীয়’ চালানো সম্ভব না হলেও এমন সব পঙ্‌ক্তি লেখা সম্ভব হলো যেখানে ব্যাকরণের গণ্ডি ডিঙানো সম্ভব হলো; যেমন ‘চাহিবার’ বা ‘চাইবার’-এর বদলে এলো মৌখিক স্বরলোপের (ellipsis) সহজ উদাহরণ। ‘চাবার’ :

চাবার মানুষ চায় না যখন কেহ
‘তীখন কথার লিখন ভিক্ষা দেহো’...
                                  (‘সুসময়’, সংযোজন, রচনাবলী, ৮ম খণ্ড, পৃ ৭০৫)

ভাষা কখন উঠবে ঋতুমতী হয়ে? যখন তার সংস্কার-মোচন ঘটবে, হবে সম্প্রদায় বিশেষের প্রভুত্ব দূর। ব্রাহ্মণ্য বাংলার আগের সময় অবধি যেহেতু গদ্যভাষার উদাহরণ রূপে বাংলার ব্যবহার বহুল নয় ও যেহেতু শিক্ষা ও ব্যবসায়--উভয় ক্ষেত্রেই বাংলা ছিল বিবর্জিত, তাই রবীন্দ্র-পূর্ব যুগে একথা খুব বেশি সাহিত্যিক-মনীষী ভাবতে পারেননি যে “সংস্কৃত ভাষা যে-অংশে বাংলা ভাষার সহায় সে-অংশে তাহাকে লইতে হইবে, যে-অংশে বোঝা সে-অংশে তাহাকে ত্যাগ করিতে হইবে” (ওই, পৃ ৩৬৫)। বঙ্কিমচন্দ্র যে দক্ষতার সঙ্গে গুরু ও চণ্ডালকে একই সাথে একই পাতে বসিয়ে গদ্যের পরিবেশন এবং নির্মাণ করে যাচ্ছিলেন, তা সত্ত্বেও যে তাঁকে অনেক কটু কথা সহ্য করতে হয়েছে তা আজ অবিদিত নয়। পণ্ডিতের ভয়ে এই যে বঙ্কিম অথবা অন্যান্য ‘নবকুমার’ সতর্ক হয়ে চললেন না, তার থেকেও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে যে কমলাকান্ত ও আলালীরা ভাষাবিদ্রোহের বীজ বপন করলেন, তাই মহীরুহ হয়ে আত্মপ্রকাশ করলো রবীন্দ্রনাথের গদ্যে-বাচ্যে, কথায় ও কবিতায়। কবি লিখলেন :

পদ্য রচনার আমি প্রচলিত আইন-কানুন কোনোদিন মানি নাই...’ক্ষণিকা’য় আমি প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রাকৃত বাংলা ভাষা ও প্রাকৃত বাংলা ছন্দ ব্যবহার করিয়াছিলাম...এইখানে বলা আবশ্যক চিঠিপত্রে আমি চিরদিন কথ্য ভাষা ব্যবহার করিয়াছি...তা ছাড়া বক্তৃতাসভায় আমি চিরদিন প্রাকৃত বাংলা ব্যবহার করি, ‘শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থে তাহার উদাহরণ মিলিবে।                                                                     (ওই, পৃ ৩৬২)
অথচ এর অর্থ মোটেই এমন নয় যে বাংলাকে গড়ে তুলতে হবে শুধু এমন এক পথের বাংলারূপে যেখানে মেঠো মিষ্টতার থেকে শহুরে হট্টগোলই বেশ প্রাধান্য পায়। ‘সমাজ’-এ প্রকাশিত নিবন্ধ ‘চেঁচিয়ে বলা’য় (রচনাবলী, ওই, খণ্ড ১৭, পৃ ৩৮৮) রবীন্দ্রনাথ বেশ প্রাসঙ্গিক কথা বলেছেন : “...চেঁচিয়ে সমাজ সংস্কার করে, চেঁচিয়ে খবরের কাগজ চালায়” এমন যে আজকের বঙ্গসমাজ, “সেখানে চেঁচানোটাই চলিত হইয়াছে। ...জ্ঞানের অপেক্ষা বোধ করি অজ্ঞতার আওয়াজটা অধিক।” (ওই, পৃ ৩৮৮-৮৯)। সেই তুলনায় যে মমতার সাথে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন তার বহু উদাহরণ ওঁর সৃষ্টি ও অনুবাদকর্মে পাওয়া যায়, ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব-বিষয়ক বেশকটি গ্রন্থ ও নিবন্ধাবলী থেকেও। সহজ পাঠ-এর প্রয়োজন উনি ঠিক সেই কারণেই উপলব্ধি করেছেন যে-কারণে বিদ্যাসাগর খুব যত্ন ও চিন্তায় বর্ণপরিচয় রচনা করেছিলেন। ঠিক যে কারণে আমরা ভ্রান্তিবিলাস ও সীতার বনবাস-এর মতন মনোজ্ঞ গদ্য ও কথ্যগদ্য পেয়েছি অনুবাদে--ঠিক একইভাবে রবীন্দ্রনাথ নিজেও বহু বহু সৃজনপাঠকে প্রয়োজনে দৃঢ়বদ্ধ, প্রয়োজনে ললিতপাঠের অনুবাদশৈলীতে বাংলায় নিয়ে আসেন। এতে মূল পাঠ না মূলভাষার সাহিত্যস্রষ্টার জয়ধ্বনি করার থেকেও এই প্রদর্শন বেশি জরুরি ছিল যে বাংলাতেও এমন কৃতি সম্ভব। তুকারামের বেশ কিছু অভঙ্গের বঙ্গানুবাদ (‘নবরত্ন পালা’ এবং মালতী পুঁথিতে পাওয়া যায়), কিংবা সংস্কৃত, পালি, প্রাচীন হিন্দি কিংবা শিখ ভজনের অনুবাদ--এ সবই তার উদাহরণ। বাংলায় সম্ভাবনা কতটুকু বা কতখানি তার মাপ উনি যে সর্বক্ষণ মেপে চলেছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (প্রবাসী ১৯৪১; বঙ্গাব্দ ১৩৪১ অগ্রহায়ণ-ফাল্গুন সং) এই বক্তব্য থেকে :
রবীন্দ্রনাথ পূর্বে এ পদাবলী (সন্দর্ভ-সূত্র : গ্রিয়ার্সনের সংকলিত সম্পাদিত ‘মৈথিল উৎকর্ষপদাবলী সংগ্রহ’) পড়িয়া পদাবলীর আশেপাশে বাঙ্‌লায় গদ্যে ও পদ্যে অনেকগুলি পদের অনুবাদ করিয়াছিলেন। এই অনুবাদ সকল স্থানে সম্পূর্ণ পদের নাই--কোন পদের সম্পূর্ণ, কোন পদের আংশিক অনুবাদ আছে (রচনাবলী, খণ্ড ১৬, পৃ ৬৬১)।
দেখা যাচ্ছে এই কাজ যখন উনি করছিলেন তখন ওঁর নিজের বয়স অনূর্ধ্ব সপ্তদশ মাত্র, কারণ যে-বইয়ের মার্জিনে এসব প্রয়াস রবীন্দ্রভবনের অভিলেখাগারে রয়েছে সেখানে ফাল্গুন ১৮৮৪ বঙ্গাব্দের তারিখটিও উনি লিপিবদ্ধ করেছেন। অতএব বিদ্যাপতির অনুপ্রাসে অন্ত্যমিলে অন্য অলংকারের শিথিল সাজে বর্ণাবৃত পঙ্‌ক্তিগুলি (যেমন, কণ্টক মাঁহ কুসুম পরগাসে / বিকল ভমর নহিঁ পাবথি বাসে / ভমরা ভরমে রমে সভ ঠামেঁ / তুঅ বিনু মালতি নহিঁ বিসরামেঁ।।) যেভাবে সামান্য মাত্রা-বদলে আমাদের সামনে কিশোর রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা নির্মাণের মক্সো করতে করতে নিয়ে এসেছেন, সে-কথাই সাক্ষ্য দেয় আমার বক্তব্যের :
[ক]ণ্টকমাঝারে কুসুমপরকাশ,
[বি]কল ভ্রমর সেথা নাহি পায় বাস।
[ভ্র]মভরে ভ্রমর রমিছে নানা ঠাঁই--
[তু]হু বিনা, হে মালতী, বিশ্রাম নাই।
(রচনাবলী, খণ্ড ১৬, পৃ ১৬৩, তৃতীয় বন্ধনী প্রাবন্ধিকের দেওয়া)

বাংলার ছন্দপ্রকৃতি, স্বন-শ্বসন প্রক্রিয়া ও সিলেব্‌ল-ভেদে পঙ্‌ক্তিগুলির গঠনে এমন রদবদল আনা যেতেই পারে, অথবা কোনও কবি-অনুবাদক যদি ছন্দ-যতি-লয়কে মৈথিলির অনুগামী করতে চান, তিনি এ-ভাবেও সৃষ্টি-নিরীক্ষণ করতে পারেন :

কণ্টক-মাঝ কুসুম পরকাশে
বিফল ভ্রমর নাহি পাইছে বাসে
ভ্রমরা ভরমে রমে সব ঠাঁয়ে
তুমি বিনে মালতী নাহি বিশ্রামে।
কিন্তু সেক্ষেত্রে চলবে অনুবাদের আদর্শ ও প্রক্রিয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। যে কথার উপর আমি জোর দিতে চাই তা হলো রবীন্দ্রনাথের বাংলাভাষা নির্মাণের যে সচেতন প্রক্রিয়া ও প্রয়াস--যেখানে উনি উদাহরণ সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিচ্ছেন কেমন পথে এগোনো দরকার, এই প্রকল্প ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের মূল্যায়নের সময় এসেছে। বাংলা শব্দতত্ত্বের যে মন্তব্য-টীকা অভিমত ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যায় চিহ্নিত করে ভাষা-ভাবুক রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানাচ্ছেন, সেখানে শব্দনির্মাণ, প্রতিশব্দ-নির্মাণ, আর্থজাগতিক প্রসরণ (semantic expansion), শব্দ-যোজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা পরিভাষা-নির্মাণ--এসব নিয়েও সুচিন্তিত মতামত দিচ্ছেন এবং প্রতিটি অভিমতের পক্ষে বিপক্ষে তর্কগুলিও উপস্থাপিত করছেন। এ-থেকেও বোঝা যায় ওঁর ভাষা-ভাবনা ও ভাষা-নির্মাণ প্রকল্পের রূপরেখা। একথা স্বাভাবিক যে বহুক্ষেত্রে অনুবাদে মূলের তরঙ্গটির পুনর্সৃজন সম্ভব হয় না, দুটি ভাষার প্রকৃতিগত পার্থক্যের জন্য; কিন্তু এও দেখা গেছে যে কবি রবীন্দ্রনাথের কাব্যানুষ্ঠানে অনূদিত পঙ্‌ক্তিগুলি এক অন্যমাত্রায় রসাস্বাদনের দিকে নিয়ে যেতে পেরেছে পাঠককে, যা ‘পূর্বচাতকাষ্টক’-এর চতুর্থ শ্লোক-কবিতার সংস্কৃত থেকে বহু রূপান্তর থেকেই বোঝা যাবে :
গর্জসি মেঘ ন যচ্ছসি তোয়ং
চাতকপক্ষী ব্যাকুলিতোঽহম্‌।
দৈবাদিহ যদি দক্ষিণাবাতঃ
ক্ব ত্বং ক্বাহং ক্ব চ জলপাতঃ।।
বাংলা অনুবাদে আমরা পেয়েছি :
গর্জিছ মেঘ, নাহি বর্ষিছ জল--
আমি যে চাতক পাখি, চিত্ত বিকল--
দৈবাৎ আসে যদি দক্ষিণাবাত
কোথা তুমি, কোথা আমি, কোথা জলপাত!
প্রশ্ন হচ্ছে চাতকের হাহাকারটির ছন্দিত রূপ পাঠককে, বাংলা ভাষায় মর্মজ্ঞ পাঠককে, অভিভূত করছে কি না। সংরচনার দিক থেকে বাংলা যে ধাঁচের ভাষা, সেখানে শেষ পঙ্‌ক্তির মূলের সংক্ষিপ্তের পরিবর্তে বাংলার প্রসারিত রূপ আমাদের হৃদয়কে চাতকের আক্ষেপের প্রতিধ্বনিতে আজও অধিক মথিত ও ব্যথিত করছে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।

এ কোন্‌ কারণ যা রবীন্দ্রনাথকে বাংলা ভাষার উৎকর্ষ বিশ্বেরও দরবারে প্রমাণ করতে অনুপ্রেরিত করলো? অনুবাদে ও প্রাথমিক পদ্যরচনায় যার আরম্ভ তা কালে ভাষাটির হাত ধরে তাকে এমন জগতে নিয়ে গেল সেখানে সকল দেশের সমস্ত ভাষা--যাদের মধ্যে জিজীবিষা বর্তমান--তারা সবাই “অসীম কালের পটে নিজ নিজ নাম খুদিতেছে”। বঙ্গভাষার এই এক মহাজীবন ধরে ভ্রমণ ছিল জরুরি, কেননা “বহু বৎসর নীরব থাকিয়া বঙ্গদেশের প্রাণ ভরিয়া উঠিয়াছে। তাহাকে আপনার ভাষায় একবার আপনার কথাটি বলিতে দাও। বাঙালি-কণ্ঠের সহিত মিলিয়া বিশ্বসংগীত মধুরতর হইয়া উঠিবে” (‘লাইব্রেরি’, বিচিত্র প্রবন্ধ, রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড, পৃ ৬৭৪)। বিদ্যুৎকে যেমন মানুষ লোহার তার দিয়ে বেঁধেছে, তেমনই--অন্য কেউ না জানলেও রবীন্দ্রনাথ জেনে-বুঝেছিলেন যে “মানুষ শব্দকে নিঃশব্দের মধ্যে বাঁধিতে পারিবে” (ওই)। আর এভাবেই, এই কারণেই ভাষার মধ্যে অধিবাস অথচ ভাষাতীত হয়ে উঠেছে কবিতা, কথা, পত্রলেখা--এসবই সম্ভব হয়েছে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে।


এই লেখা আপনাদের কেমন লাগল?

Subscribe for updates to Parabaas:



©Parabaas 1997 - 2016. All rights reserved.