Ritwik & Satyajit -- Bengali essay by Sanjoy Mukhopadhyay - Parabaas-Satyajit Section, দেখার রকমফের: ঋত্বিক ও সত্যজিৎ, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, পরবাস-সত্যজিৎ বিভাগ



দেখার রকমফের: ঋত্বিক ও সত্যজিৎ

বৈশাখ শ্রাবণে, নিদাঘে প্লাবনে যূথীবনের দীর্ঘশ্বাসে ও রিক্ত রাজপথে যে তারা কত আলাদা! এক দশকে ভিন্ন দুই শিল্পী ধারণ করে রইলেন আমাদের আধুনিকতা: এই মৈত্রী, এই মনান্তর, বিপর্যয় ও সাম্যে। সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের চোখ কত দূরে চলে যায় পরস্পরের থেকে, 'অযান্ত্রিক' চলচ্চিত্রটি যে গাড়ি চালকটিকে ব্যবহার করে (১৯৫৭) তাকেই সত্যজিৎ অনেক ভিন্ন তাৎপর্যে উৎকীর্ণ দেখতে পান 'অভিযান' ছবিতে (১৯৬২), আমার তো মনে হয় ঋত্বিক যখন ইতিহাসের দিকে চোখ মেলে দেন নিরভিমান, তখন সত্যজিৎ অনুপুঙ্খে আখ্যান-প্রেমিক। 'পথের পাঁচালী' (১৯৫৫)-তে দুর্গার একটি বৃষ্টিভেজা লো-অ্যাঙ্গেল শট বারবার আবর্তিত হয়েছে নীতার মধ্যে 'মেঘে ঢাকা তারায়' (১৯৬০), যে নৈশাভিযান 'সুবর্ণরেখা'য় (১৯৬২) ঈশ্বরের, তার সঙ্গে 'জন-অরণ্য' (১৯৭৫) ছবির সোমনাথের পার্থক্য মৌলিক, একজন যদি দর্শনের সমুদ্রে অভিযাত্রী হন অন্যজন তবে দৃশ্য ও শ্রবণের কারুপ্রতিমা। এমন এই দুজন, যেন বিপরীতমুখী পিতামাতা — আমাদের চলচ্চিত্র চেতনার, যেন আধুনিকতার মুহূর্তটিতে হর-গৌরী মিলন। বাস্তবিক ভুললে চলবে না যখন আমাদের সিনেমার আধুনিকতা ভূমিষ্ঠ হল, সিনেমাকে শিল্প ভাবার পরিসর তৈরি হল, তখনই যেন অলৌকিক সমাপতন, সিনেমার জনপ্রিয়তাও নবীন নাগরিকের সঙ্গে অন্যরকম করমর্দনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। ১৯৫৫ সাল; একই সঙ্গে 'শাপমোচন' ও 'পথের পাঁচালী' মুক্তি পেল। উত্তমকুমারের শহরে আসাকে আমরা অযান্ত্রিকের বিমলের মোটরগাড়ি ও প্রীতি ও অপরাজিততে যুবক অপূর্ব কুমার রায়ের শাহরিক চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি।

এ পর্যন্ত বোঝা যায় যে প্রগতি, উন্নয়ন অর্থাৎ ইতিহাসের বড়ো পরিপ্রেক্ষিত ঋত্বিক ও সত্যজিৎ ভিন্নভাবে অনুমান করেন। বলতেই পারি যে আধুনিক দৃষ্টিতে এ ধরনের সংকট থাকা অস্বাভাবিক নয়। সত্যজিতের অপূর্ব কুমার রায় যে-অর্থে বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিককে আলোকপ্রাপ্তির নিশানা মনে করে সুবর্ণরেখা'র ঈশ্বর চক্রবর্তী দুস্তর ব্যবধান থেকে গ্যাগরিনের মহাকাশ বিজয়কে উপেক্ষা না করলেও প্রান্তিক সত্যের অতিরিক্ত দাম দিতে চান না। সুবর্ণরেখা ইতিহাসের নিম্নবর্গীয় কথামালাকে ষাট দশকের শুরুতেই প্রতিষ্ঠা করে। সুবর্ণরেখা'র রামায়ণকথা মোটেই ইক্ষ্বাকু বংশীয়া রাজমাতা কৌশল্যার নয়, এক বাগদি বউয়ের, ও তিনি অযোধ্যার রাজান্তঃপুরবাসিনী নন; তাকে ঋত্বিক নিবেদন করেছেন খররৌদ্রে, জনপরিসরে, ঘাটশিলার স্টেশন চত্বরে। ফলে রামচন্দ্রের মাতৃদর্শন ঋত্বিকের ক্ষেত্রে মহাকাব্যের সংগঠন নয় বরং এক উদ্দেশ্যমূলক নাশকতা যা ঘটনাক্রমে পুরাণকথার ক্ষতমুখ খুলে দিয়েছে। সত্যজিৎ সেদিক দিয়ে বড়জোর একজন সংশোধন-প্রত্যাশী মানবতাবাদী। সদগতি-তে তাঁর অস্পৃশ্য নায়ক আমাদের হৃদয়ের সংস্কার দাবি করে। আর শতরঞ্জ কে খিলাড়ি-তে লর্ড ডালহৌসির সেনাদলের প্রতি তার অনুচ্চারিত অভিমান ইতিহাসের বাইরে, শীতার্ত দিগন্তরেখার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিষ্পাপ বালকের চোখে। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্‌-র সুরেলা অবক্ষয়ে আমরা ব্যথা পাই কিন্তু সত্যজিতের ইতিহাসবোধ তাঁকে আখ্যান-অতিরিক্ত প্রত্যাঘাতে উৎসাহ দেয় না।

এ পর্যন্ত যে স্বভাবগত পার্থক্যের কথা বলা হল তা উভয় স্রষ্টার কাহিনীচিত্রকে বিবেচনা করেছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করি যে, দেখার এই রকমফের অত্যন্ত মৌলিক আর তা এমনকি তথ্যচিত্রের আপাত কঠিন নির্মাণেও ডালপালা ছড়িয়েছে। আমি সত্যজিৎ রায় কৃত চিত্রকর বিনোদবিহারীকে ভিত্তি করে তোলা দি ইনার আই (১৯৭২) ও রামকিঙ্কর বেইজকে নির্ভর করে ঋত্বিক ঘটকের অসমাপ্ত প্রকল্পটির (১৯৭৫) দৃশ্যবিন্যাস নিয়ে কথা বলতে চাইছি। কীভাবে ব্যাখ্যা করব বিপরীত দৃষ্টিকোণের এই তাৎপর্য? কেন তিনি, ঋত্বিক ঘটক, রামকিঙ্করে আকৃষ্ট হয়েছিলেন? শুধু এই জন্য কি যে সত্যজিৎ রায় অল্প কিছুদিন আগে বেছে নিয়েছিলেন বিনোদবিহারীকে যেখানে স্থিতির সুষমা, ঋত্বিক তাই রামকিঙ্করকেই খুঁজে নিলেন তাঁর ফ্রেমে, গতির নৈরাজ্যে। কী আশ্চর্য! বিনোদবিহারীর অন্তর্গত প্রশান্তি আকর্ষণ করেছিল সত্যজিৎকে, আর ঋত্বিককে টেনেছিল রামকিঙ্করের অভ্যন্তরীণ অশান্তি। আসলে এই তথ্যচিত্র দুটি পরীক্ষা করলেই দেখা যায় বাস্তববাদ বিষয়ে, শিল্পের উৎস ও আকাঙ্খা বিষয়ে, সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের ধারণাগত মিল ও অমিল।


অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহিরে

একটু গভীরভাবে দেখলেই আমরা নিশ্চিত হই, সত্যজিতের বিনোদবিহারী তথ্যের উপাদান, কিন্তু সত্যজিৎ মোটেই বিনোদবিহারীর জীবনীরচনায় আগ্রহী নন। বরং একজন চলচ্চিত্রকারও যেহেতু মূলত দৃশ্যশিল্পী, বিনোদবিহারীর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন দৃশ্যভাষার মাত্রা ও অনুষঙ্গ সমূহ। বলা বাহুল্য, চল্লিশের দশকের শুরুতে যে চিত্রকরকে তিনি মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়েছিলেন তিনি ও সত্তর দশকের বিনোদবিহারীর মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। একদা যিনি ক্ষীণদৃষ্টি ছিলেন, তিনি দৃষ্টিহীনে পরিণত হয়েছেন, সুতরাং সত্যজিতের পক্ষে উৎসুক হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক যে, দৃশ্যের বস্তুগত দিক একজন শিল্পীর পক্ষে কতটা প্রয়োজনীয়।

মনে রাখা জরুরি যে, পথের পাঁচালী থেকেই সত্যজিৎ বাস্তবতাকে মিলিয়ে দিতে চাইছিলেন অনুভূতির অন্য মাত্রায়, হয়তো সংগীতে। আর সেই জন্যেই, নিজেরও প্রাথমিক ভিত্তি স্পেস বা স্থান বলেই সত্যজিৎ বুঝতে চেয়েছিলেন তাঁর অন্ধ মাস্টারমশাই স্থানকে কিভাবে বুঝতে চান। এই ছবিতেই বিনোদবিহারী তাঁকে জানান, 'স্পেস সম্পর্কে একটা নতুন চেতনা হয়। স্পেসটা হয়ে যায় একটা ঘনবস্তু — যেটাকে হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে সামনে এগোতে হয়। যে জিনিসটা স্পর্শ করছি, সেটা ছাড়া আর কোনোকিছুর অস্তিত্বই থাকে না, তোমরা চেয়ার দেখলেই বুঝতে পারছো সেটা আছে, আমি চেয়ারে বসলে পরে তবে বুঝছি, সেটা আছে ... এছাড়া আবার আরেকটা দিকও আছে। এই যে চায়ের গেলাসটা হাতে নিলুম — কাচ জিনিসটার স্পর্শগত অনুভূতি কোনোদিন আগে এভাবে ফিল করিনি।' (বিনোদদা, বিষয় চলচ্চিত্র)। অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় নিজেকে বোঝাতে চাইছেন যে, বাস্তবতা সম্পর্কে প্রচলিত সংস্কারের সীমানা পার হওয়া জরুরি। একজন অন্ধ শিল্পীরও চক্ষুষ্মান হওয়ার অধিকার আছে শর্তসাপেক্ষে; বোদলেয়ার যাকে correspondence বলেন, সেই অন্য অনুভূতির জগতে অভিজ্ঞতাকে অনুবাদ করে দিলেই বিনোদবিহারী অন্ধের বাস্তবতা খুঁজে পান। আমি শুধু এইটুকু বলব — প্রথম এই বাস্তবতা বঙ্কিমচন্দ্র খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর কানা ফুলওয়ালি রজনীর মধ্যে; যখন সেই কিশোরী প্রথম পুরুষস্পর্শে কুসুমের ঘ্রাণ খুঁজে পায়। অথবা, আমরা দৃষ্টান্ত হিসাবে জীবনানন্দ দাশের কথাও বলতে পারি, বিশেষত যখন তিনি লেখেন — আকাশকুসুম তবু ফুটে আছে পাপড়ি অনুসারে। এটাই বিনোদবিহারীর কাজ, প্রমাণ করা যে প্রাপ্তবাস্তবতা কোনো মতেই শিল্পীর নয়, তাকে বাস্তবতার পুনর্সংগঠনে জোড় দিতে হয়। আর সেই অর্থেই শিল্পীত বাস্তবতা কৃত্রিম। সত্যজিৎ রায় নিজেও যখন তাঁর ক্যামেরা দিয়ে নিসর্গ বা মানুষকে দেখেন, তাতে যে আলোর মলাট থাকে, তা তাঁর নিজস্ব। এইটাই 'অন্তর্দৃষ্টি' বস্তুত ছানি কাটার একটি ব্যর্থ অপারেশনে বিনোদবিহারী অন্ধ হয়ে গেলে, অন্য চলচ্চিত্রকার হয়তো সন্ধ্যার কোনো রাগ, হয়তো বিধুরপূরবী জুড়ে দিতেন, কিন্তু সত্যজিৎ, আমাদের সমালোচকেরা খেয়ালও করেন না যে, প্রয়োগ করেছেন সকালের রাগ আশাবরির একটি অলৌকিক মুহূর্ত। বিনোদবিহারী নয়, বিনোদবিহারীকে উপলক্ষ্য করে সত্যজিৎ রায় নিজেকেই বোঝাতে চাইছেন, শিল্পীর বাস্তব প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতার উপরে নির্ভরশীল নয়। এই জন্যেই কোনারকের মৃদঙ্গবাদিনীর স্তন আজও রক্তমাংসের।

এ পর্যন্ত বোঝা গেল যে, The Inner Eye বাস্তব সম্পর্কিত এক প্রতিবেদন। কিন্তু আমি আরও একটু বলতে চাই, সত্যজিৎ রায়ের বাস্তব সম্পর্কিত ধারণার, বিশেষত দৃশ্যভাষার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম উৎস হয়তো বিনোদবিহারীই। এখন আমরা জানতে পারছি — তথাকথিত Oriental art সম্পর্কে সত্যজিতের অবজ্ঞার কথা। তিনি যে ঠাকুরবাড়ির আঙিনা থেকে উঠে আসা ছবি আঁকার ধরন প্রসঙ্গে খুব উৎসাহী ছিলেন, এমন নয়, 'এইসব তিনরঙা হাফটোন আর্ট প্লেটের মধ্যে এক নন্দলাল বসু ছাড়া আর কারোর ছবি তেমন আমল দেওয়ার যোগ্য মনে হয়নি। ওয়াশ পেন্টিং জিনিসটা জোলো বলে মনে হত। ছবির বিষয়বস্তু ও অঙ্কনরীতিতে একটা পেলব ভাবালুতার ইঙ্গিতে মন বিরোধী হয়ে উঠত।' অথচ নিয়তির এমনই কৌতুক যে শান্তিনিকেতন কলাভবনে পৌঁছনো মাত্র সামনের বারান্দায় সারা সিলিং জুড়ে এমন একটি ছবি তিনি দেখলেন, দেখলেন আর মুগ্ধ হলেন, যে সারাজীবন আর সেই মুগ্ধতা তাঁকে ছেড়ে গেল না। গাছ-পালা, বাংলা পল্লীপ্রকৃতির একটি সাধারণ ছবি। বীরভূমের গ্রাম, কিন্তু কোথাও সম্ভবত একটি গতিময় কথকতা ছিল। আবার সত্যজিৎ রায়কেই উদ্ধৃত করি — 'দৃশ্য না বলে ট্যাপেস্ট্রি বলাই ভালো। অথবা এনসাইক্লোপিডিয়া। এ ছবি এমনই ছবি যার সম্বন্ধে Oriental art সম্পর্কে আমার মন বিষোন কোনো সংজ্ঞাই প্রয়োগ করা চলে না।'

আমরা যারা চলচ্চিত্রবিদ্যার ছাত্র, তারা বুঝতে পারছি, সত্যজিৎ রায় স্থির চিত্রের মধ্যে মন্তাজের মহিমা খেয়াল করছেন। The Inner Eye ছবিতে বিশ্বভারতীর হিন্দি ভবনের দেওয়ালে বিনোদবিহারীর অসামান্য মুরাল, যাতে মধ্যযুগের সাধুসন্তদের জীবন বর্ণনা করা হয়েছে, তাকে অনুপুঙ্খে পরীক্ষা করেছেন সত্যজিৎ। হয়তো এই মুরাল তাঁর কাছে অনেকটাই দাভিদ সিকুয়েরশ অথবা দিয়েগো রিভেরার মহৎ মুরালগুলির সমতুল্য, কিন্তু আরও উল্লেখযোগ্য, যে চলচ্চিত্র যেমন একটি মুহূর্তে নানা সময়ের বিবরণ দিতে পারে। সত্যজিৎ অনুমান করেন, বিনোদবিহারী ভিন্ন মাধ্যমে তা পারেন, আর তাই হয়তো পরিণত প্রতিভাবান ছাত্র মাস্টারমশাইকে প্রণাম করার সুযোগ পেয়ে যান সত্তর দশকের শুরুতে।

কী অসামান্য লাগে, যখন তাঁর প্রিয়, অতি প্রিয় দশাশ্বমেধ ঘাটের কথা টেনে আনেন। তিনি নিজে 'অপরাজিত' ও 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এ, আর ভারতীয় সিনেমা তো অজস্রবার এই ঘাটটিকে নজরে এনেছে। কিন্তু বিনোদবিহারী শুধুমাত্র রেখার সংহতিতে বুনে ফেলেছিলেন দশাশ্বমেধের বাস্তবতা। এই অনুষঙ্গ শুধু স্থিরচিত্র, গতিচিত্রের তুলনার মুহূর্ত নয়। সত্যজিতের আত্মপক্ষের বিবৃতি যে, বাস্তবতার বর্ণনাও এক ঘন সংহতির দাবি করে।

বিনোদবিহারী আরও নানা দিক থেকে তাঁকে বাস্তবতার 'ভারতীয়ত্ব' ও বৈশিষ্ট্য বিষয়ে ধারণা দেন। সত্যজিৎ যে আদি যৌবনে মনে করতেন, Oriental art কোনো না কোনোভাবে শিল্পের মানচিত্রটাকে ছোটো করে দেয়, বিনোদবিহারী তাঁকে এই ধারণার বাইরে প্রায় হাতে ধরে নিয়ে আসেন। শান্তিনিকেতনে স্বল্পকালীন ছাত্রজীবনে তিনি যে অজন্তা-ইলোরা যাওয়ার সুযোগ পান, তা তাঁকে প্রথম ভারতীয় প্রতিমা সম্পর্কে, বাস্তবের সুস্পষ্ট চিহ্নায়ন সম্পর্কে নির্দেশ দেয়। অজন্তা এবং ইলোরার গুহাচিত্রে তিনি বুঝতে পারেন, ইউরোপের দেখা, অন্তত ফ্রেসকোর পরিপ্রেক্ষিতে মূলত জানলা দিয়ে দেখা যা পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সঙ্গে ছোটো বা বড়ো হয়ে যায়। অন্যদিকে ভারতীয় দেখা অনেক সংরক্ত; সেই চিত্র দর্শকের সঙ্গে কথা বলতে সতত অপেক্ষায় থাকে। মিশরীয় শিল্প হয়তো একটু অন্যরকম, কিন্তু সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয়। ভারতীয় ছবি - সত্যজিতের মনে হয়েছিল — অনেক মানবিক। পরিণত বয়সে যখন তিনি বিনোদবিহারীকে খুঁটিয়ে দেখলেন দেওয়ালে, তখন তিনি ঐতিহাসিকের সঙ্গে শিল্পীর পার্থক্যও বুঝতে পারলেন। আদি যৌবনে হয়তো ইলোরায় তিনি লক্ষ্য করেছিলেন কীভাবে বৌদ্ধ চিত্রকলা, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও জৈন ভাবধারা সহাবস্থান করে, কিন্তু বিনোদবিহারীর কাজে সবিস্ময়ে সেই ঐতিহ্যের একটি প্রামাণ্যরূপ পেলেন; স্বয়ং বিনোদবিহারীই তাকে জানালেন — সময়ের এই নানা অধ্যায় ইতিহাসকারের কাছে যতটা জরুরি, শিল্পীর পক্ষে ততটা নয়। শিল্পী বরং সময়ের ডালপালায় লুকোচুরি খেলতে পারেন। সত্যজিৎ হয়তো এই বক্তব্য থেকেও ইশারা পান যে একজন চলচ্চিত্রকার কীভাবে বাস্তবের টুকরো সময় জুড়ে জুড়ে এক অবাস্তব সময় তৈরি করেন।

নানা সময়েই The inner eye দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছে যে, বিনোদবিহারীকে উপলক্ষ্য করে সত্যজিৎ আসলে মন্তব্য করে চলেছেন দৃশ্যশিল্প ও আধুনিকতার করমর্দন বিষয়ে। এই যে তিনি পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি একটি তুচ্ছ গ্রামের তুচ্ছতর জীবনযাত্রাকে শিল্পের বিষয় করে তুললেন ভারতীয় চলচ্চিত্রে তা অভিনব। ভারতীয় চলচ্চিত্র সামাজিক জীবন বলতে দূর ও কাছের নানা তীর্থ সমাজের সদরে ও অন্দরে দেখতে পেত, কিন্তু একটি শিশিরবিন্দু দেখার জন্য তাঁকে পথের পাঁচালীর শরণাপন্ন হতে হল। এরই সঙ্গে প্রতিতুলনা করতে পারি বিনোদবিহারীর। বিনোদবিহারী কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশেপাশের পল্লীপ্রকৃতিকেই তাঁর নিসর্গচিত্রের উপজীব্য ভেবেছিলেন। বৃষ্টির কল্পনার জন্য তাকে মেঘদূতের কাছে অথবা সুদূর রাজপুতানা কিংবা মুঘল যুগের কাছে হাত পাততে হয়নি। একটি সাঁওতাল পল্লীকেই তিনি পৌঁছে দিতে পারতেন উপন্যাসের তালিকায়। বিনোদবিহারী জাপানে গেছেন, নেপালে গেছেন ও সেসব ভ্রমণ তাঁকে সমৃদ্ধই করেছে, কেননা রেখা আর রং বিষয়ে তাঁর অধমর্ণ হতে কোনো আপত্তি ছিল না। আমি বলতে চাই Oriental art বিষয়ে সত্যজিতের বিরক্তির কারণ যে সেই রীতি একটি নির্দিষ্ট প্রকরণের মধ্যে ভারতীয়ত্ব আবিষ্কার করে। অপরদিকে বিনোদবিহারী অবনীন্দ্রনাথের আওতায় থাকা সত্ত্বেও স্বদেশকে সীমামুক্ত করতে পেরেছিলেন। তাঁর মুরালে যেমন ক্লাসিক ঘরানার সঙ্গে মিলেমিশে আছে যুগপরম্পরা, ছবি আঁকার সময় বিনোদবিহারীর কাছে উদাত্ত বা সুগভীর বিষয়ের কোনো মূল্যই ছিল না। তিনি জানতেন, খোয়াইয়ের নিঃসঙ্গ তালগাছটিও তাঁর আত্মজীবনী হয়ে উঠতে পারে। সত্যজিতের ছবিতে এই খোয়াই আর তাঁর 'Solitary তালগাছ' আছেও, বিনোদবিহারীর অনুরোধক্রমেই আছে। এমনকি মুরাল তৈরি করার সময়ও দৃষ্টিগত প্রতিবন্ধী বিনোদবিহারী নিতান্ত অনুমানের ভিত্তিতে সমগ্র রচনার টেনশন তৈরি করেন জীবনের রোজনামচা দিয়ে — 'হ্যাঁ। সবই আমার দেখা জিনিস, জানা জিনিস। দেখলে তো — চানাচুরওলা, কাঁধে বাঁক নিয়ে যাচ্ছে লোক, মেয়ের মাথার ঝুড়ি, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী - সব নিজের চেখে দেখা সাধারণ ব্যাপার। ওসব অ্যাবস্ট্রাকশন-এর যান্ত্রিক ব্যাপারে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। বাড়ির বাইরে থাকবে মিউরাল, সামনে দিয়ে লোক চলাচল করবে, দেখে অন্তত বুঝতে পারবে এগুলো মানুষ'। সত্যজিত রায়ও কিন্তু তাই। পথের পাঁচালী থেকে বাস্তবের যে প্রতিরূপায়ণ শুরু হল, এমনকি চারুলতাতেও, তো আমাদের রোজ-চেনা বাস্তব, তাকে আমরা শনাক্ত করতে পারি, তাতে দূরের পাহাড়ের সম্ভ্রম অথবা সমুদ্রতলের হাতছানি নেই; তা আমাদের এতই চেনা যে সত্যজিৎ না দেখালে হয়তো চিনতেই পারতাম না। বাস্তব গঠনের এই অনুপ্রেরণার উৎস হয়তো বিনোদবিহারী-ই। আর তিনি যে ইতালীয় নববাস্তবতার সৌজন্যে রোজনামচাকে ইতিহাসের পর্যায়ে উন্নীত করতে চান, একটি পরিবারের জীবনবৃত্তান্ত হয়ে দাঁড়ায় ঔপনিবেশিকতার আড়ালমুক্ত নাগরিকতার স্বাধীনতা প্রাপ্তির ইতিহাস — আদানপ্রদানের এই তত্ত্বটুকুও হয়তো উসকে দিয়েছিল বিনোদবিহারীর ক্লাস করার অভিজ্ঞতাই।

বিনোদবিহারী যে তথাকথিত প্রাচ্যরীতি পরিহার করেন, তিনি যেভাবে জানান, মিশরীয় কী পশ্চিমী চিত্রকলার সঙ্গে ভারতীয় রীতির আপাত কোনো ঝগড়া আছে মনেই করেন না বরং চান একটি সমন্বিত মনোভাব গড়ে তুলতে, সত্যজিৎ রায়ও তেমনই পৌরাণিকতা অথবা দেশপ্রেমের আবহ থেকে ভারতীয় ছবিকে মুক্তি দেন, তাঁর deep focus যদি-বা ওরসন ওয়েলস্‌-এর কাছে হাত পাতে, পথের পাঁচালীর বালকটি যদি-বা বাইসাইকেল থিভ্‌স-এর শিশুটির ছায়া থেকে উৎপন্ন হয়, তা জানান দিলে সত্যজিৎ রায় কোনোদিনই লজ্জিত হবেন না, উপরন্তু নিখিলের আনন্দের স্বাদ যে তাঁর বাস্তবের উপকরণ, এই জানাতে পেরে তার গৌরবের অন্ত থাকে না। আর আজীবন যে detail প্রীতির জন্য সত্যজিৎ রায় বিখ্যাত, তার সঙ্গেও তো বিনোদবিহারীর কোথাও একটা সাদৃশ্য আছে। সত্যজিতের বলা বিনোদবিহারীর একটা গল্প বলি — একবার তাঁর মাস্টারমশাই বাইরে বসে একপাল মোষের ছবি আঁকছেন, তো কয়েকটি সাঁওতাল মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে। হঠাৎ তারা মন্তব্য করে - এতগুলো মোষ আর একটাও বাচ্চা নেই। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো বিনোদবিহারীর সামনে জীবনরহস্যের পাতা খুলে যায়। সত্যজিৎ নিজেও যখন দৃশ্য রচনা করেন, তখন মনুষ্যেতর প্রাণী-- বিড়াল শিশু, কুকুরের লেজ বা জলপিপি তাঁর নজর এড়ায় না, কারণ বিনোদবিহারীর ছাত্র হিসাবে তিনি জানেন যে, সব বাস্তবেরই কিছু অল্প দামি গয়নাগাটি থাকে। তাছাড়া, ক্যামেরায় দেখাও তো খানিকটা বিনোদবিহারীর দেখার সঙ্গে মেলে - দৃষ্টিস্বল্পতার জন্য বিনোদবিহারী দূরের দৃশ্য যা সিনেমার ভাষায় লংশট - আঁকার ঝুঁকি তেমন নিতেন না। আউটলাইনেই কাজ সারতেন। তাঁর অনুধ্যানের বিষয় ছিল ক্লোজআপ। চোখের খুব সামনে থেকে দেখা প্রকৃতি বা মানুষ — একজন চলচ্চিত্রকার হিসাবে সত্যজিৎ নিজে কি অভিজ্ঞতাটি মিলিয়ে নেবেন না? অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিনোদবিহারী যেভাবে রেখার বদলে বস্তুর ঘনত্বে আস্থা রাখতে শুরু করেন, আমার মনে হয়, চারুলতার বিখ্যাত প্রথম সিকোয়েন্সে চারু সেভাবেই ধনী গৃহে আসবাবপত্রের নিরন্ধ্র ঘনত্ব খুঁজে পায়। এই ছবির শেষে সত্যজিৎ বিনোদবিহারীকে উদ্ধৃত করেছেন যে অন্ধতা হল এক নতুন অনুভূতি, এক নতুন অভিজ্ঞতা, অস্তিত্বের এক নতুন স্তর। পিকাসো ভিন্নতর পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ছবি আঁকা হল অন্ধদের শিল্প। সত্যজিৎ রায় হয়তো জানতেনই না, মাস্টারমশায়ের জীবনচিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি আত্মজীবনীর সংযোজনই তৈরি করেছেন। ক্যামেরাতে লুক থ্রু করলে বাস্তবের বাইরের দিকটা দেখা যায়, ভেতরের দিকটি থাকে প্রতিভার রান্নাঘরে। এই সত্য বুঝতেন, বলেই তো তিনি সত্যজিৎ রায়।

পূজা ফুল না ফুটিল দুঃখনিশা না ছুটিল না টুটিল আবরণ;

বোর্হেসের একটি গল্প আছে যে একজন শিল্পী নানা ধরনের ছবি আঁকছেন: প্রাসাদ, ভূদৃশ্য, নারী, প্রান্তর, সমুদ্র, গ্রাম ও নগর; আর জীবনের শেষে তিনি উপলব্ধি করলেন যে সমস্ত ছবি শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রতিকৃতি। রামকিঙ্কর তথ্যচিত্রটি আসলে ঋত্বিক ঘটকের জীবন ও কর্ম বিষয়ে ঋত্বিক ঘটককৃত মন্তব্য। এমন এক শিল্পী, অগ্রজপ্রতিম যাঁর মধ্যে ঋত্বিক ঘটক খুঁজে পান সৌন্দর্যের সারাৎসার। এমন এক শিল্পী, যিনি শান্তিনিকেতনে সমবেত আশ্রমিকদের মধ্যে চূড়ান্ত ব্রতহীন আর তাই তাঁকেই ঋত্বিক বন্দনা করলেন আলোকের এই ঝরনাধারায়, যার নাম চলচ্চিত্র।

১৯৭৫ সাল, ডিসেম্বর মাসের প্রথম রবিবার। ঋত্বিক জনৈক আগ্রহী ক্রেতাকে সেদিন রামকিঙ্কর তথ্যচিত্রের 'রাশ' দেখাবেন — তখনও শব্দ সংযোজিত হয়নি। সস্ত্রীক ঋত্বিক কুমার ঘটক প্রথম সারিতে ভদ্রলোকের সঙ্গে। আমি, কবি অনন্য রায়, মহেন্দ্রকুমার সহ পিছনের সারিতে। গ্যেটে একবার বলেছিলেন — পৃথিবীর সব কবিরাই নিজেদের সঙ্গে কথা বলেন, আমরা আড়ি পেতে শুনে ফেলি। আমি সেদিন দেখেছিলাম রামকিঙ্কর বেইজ ও ঋত্বিক ঘটক কী নিঃশব্দে পরীক্ষা করে চলেছেন দৃশ্যকলার রূপকথা। হঠাৎ আমার চোখে পড়ে সেই অলৌকিক মুহূর্ত; ঋত্বিক ঘটককে ঈষৎ উত্তেজিত দেখাল - তিনি সোজা হয়ে বসলেন, তাঁর তর্জনী পর্দার দিকে নির্দিষ্ট। আলোর অবিশ্বাস্য বিন্যাস এসে রামকিঙ্করের ক্লোজআপ গঠন করেছে। রক্তমাংসের রামকিঙ্কর যেন ক্রমে প্রস্তরীভূত হয়ে গেলেন। একেই তো রঁদ্যা বলেছিলেন — শ্রাব্য আয়তন বা audible space; আর রবীন্দ্রনাথ, বেঠোফেনের প্রসঙ্গে, শব্দহীন শব্দের জগৎ প্রকৃত প্রস্তাবে ঋত্বিক রামকিঙ্করের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আগুনের বীজসমূহ - ধ্বংসের উৎসব, যা নিজেকে প্রথা থেকে সরিয়ে নেয় অনিয়মে, প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে কেবলই দূরে নিয়ে যায় পরিধির প্রান্তিকতায়। সকল নিয়ে যিনি বসে আছেন সর্বনাশের আশায়, শান্তিনিকেতন যাঁকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, ওই তপোবনে যিনি পবিত্র অসঙ্গতি, তাঁকেই ঋত্বিক অর্ঘ্য নিবেদন করেন, ওই হন্তারক ক্লোজ আপ-এ।

ফরাসি মনীষী আঁদ্রে মালরো তাৎপর্যপূর্ণ জানিয়েছিলেন, দস্তয়ভস্কির কারামজভ পরিবারের প্রকৃত বাসস্থান হতে পারে 'কিন্তা দেল সরদো' অর্থাৎ বধির মানুষের কুটির; আমাদের হাতের সামনে আছে বধির বেঠোফেনের নবম সিম্ফনি। আধুনিকতার স্রোত - প্রতিস্রোতে এইসব চিহ্নমালা উৎকীর্ণ থাকে। ঋত্বিক তাকেই দেখেছিলেন শান্তিনিকেতনের বাইরে রামকিঙ্করের ওই টালির ঘরে। ঋত্বিক ঘটক জানতেন, জানতেন বলেই ঋত্বিকের ক্যামেরা ক্রমাগত জোর দিতে থাকে রামকিঙ্করের আধিভৌতিক প্রাণীচিত্রে আর ঋত্বিক বিশ্বাসও করেন যে, নিম্নবর্গীয় রামকিঙ্কর সভ্যতার অধিক বয়সি ও আদিম বলেই সভ্যতার অসম্পূর্ণতা বিষয়ে রায় দিতে পারেন। আশিরপদনখে সভ্যতার বিচারক হওয়াই তাঁর নিয়তি। এই জন্যেই ষাট দশকের শুরুতে সাঁওতাল রমণীদের পায়ের তালে তালে এগিয়ে আসার অনুষঙ্গে সুবর্ণরেখায় রামকিঙ্করের 'চাল কলের ডাক' নামের শিল্পকর্মটিকে চকিত বিদ্যুল্লতার মতো উপহার দেন তিনি। রামকিঙ্কর যে অন্তরতমকে একা দেখার জন্য মদ ও নারীকে বেছে নিয়েছিলেন, তা ঋত্বিকের নজর এড়ায়নি। আমাদের চোখের সামনেই তো কলকাতায় সমস্ত পানশালাগুলি এই চলচ্চিত্রকারেরও বিদায়গাথা রচনা করে দিচ্ছিল। সকল লোকের মাঝে বসে একান্ত যে দুঃসাহস, রাবীন্দ্রিক পরিশীলনের হাস্যকর পরিমণ্ডল থেকে সুদূর হয়ে যাওয়ার যে কারুবাসনা, রামকিঙ্করকে আলাদা করে দিয়েছিল, তা ঋত্বিকের ঈর্ষা ও অনুধ্যানের বিষয় ছিল। রামকিঙ্করকে হঠাৎ তিনি তথ্যচিত্রের প্রয়োজনে পাঠ্য ভাবেননি। রামকিঙ্করের রেখায় যে উন্মাদ, বক্রিমার সীমাছাড়ানোর ডাক, যা বোলপুরের নিজস্ব নিসর্গচিত্র, তাঁকে ঋত্বিক প্রাণাধিক আদরে চিনতে পেরেছিলেন। অযান্ত্রিক ছবিতে, মেঘে ঢাকা তারায় যে প্রকৃতি, তা মানুষ নিরপেক্ষভাবেই সংযুক্ত। আইজেনস্টাইনের ভাষায়, Non indifferent nature। রামকিঙ্করের পথে ঋত্বিক সেই প্রবণতাকেই পুনরাবিষ্কার করেন। ছবিতে আমরা স্থির নিথর বুদ্ধদেবকে দেখতে পাই। কিন্তু এই বুদ্ধ তো শিল্পীর আরাধ্য; সঙ্কল্পবদ্ধ; গায়ে শ্রমবিন্দু, কোনো ইশারা সেই বুদ্ধকে বিচলিত করতে পারেন না। তা রামকিঙ্কর ও ঋত্বিককেও টলাতে পারেনি।

যে নারী-পুরুষ ও শিশুটিকে আমরা দেখি ভাস্কর্যায়িত, তাতে গতির তরঙ্গ, আলোর অপেরা; কিন্তু আমরা খেয়াল করিনি ঋত্বিকের ক্যামেরা অনুপুঙ্খ এই উৎফুল্ল দম্পতিকে না চেনালে হয়তো অজানাই থাকত — পাথরের এই সংগীত যে সকালে সদ্যস্নাতা এই রমণীর কাপড় শুকিয়ে নেওয়ার আধুলা, বাস্তব থেকে মুহূর্তে বাস্তবাতিরিক্ত অথবা পুরাণে পৌঁছে যাওয়া আর সেখান থেকে আবার মাটির পৃথিবীতে নেমে আসা - এ তো ঋত্বিকের প্রথম প্রণয়পত্র, আর রামকিঙ্কর কী অবলীলায়, কী অবহেলায়, দিনের পর দিন সানন্দে, তালে বর্ণনা করে গেছেন চিত্রে ও ভাস্কর্যে।

সুইস পার্কে সেদিন ছবির শেষে ঋত্বিক পিছন ফিরে তাঁর ভক্তদ্বয়কে তাচ্ছিল্যভরে জানিয়েছিলেন, - কিঙ্করদার কাছে তো একটাই জিজ্ঞাসা, art কোথা থেকে হয়। রামকিঙ্কর কী জবার দিয়েছিলেন, আমাদের জানা নেই, কিছু আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই, তাঁর চোখ আর্যস্থাপত্যকে ছাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে প্রাচীন আশিরীয়, দ্রাবিড় বা মিশরীয় অভিজ্ঞানে। রামকিঙ্কর, রামকিঙ্করের রবীন্দ্রনাথকে ঋত্বিক যেখাভাবে ক্যামেরায় ধরেন তাতে দেখা যায়, বাস্তব ক্রমশ ত্বকের বদলে আত্মায় হাত রাখতে চায়। এত বিষন্ন, গম্ভীর ও নির্জন, এত পরিত্যক্ত কবিকে কখনো আমরা দেখেছি কি? রামকিঙ্কর মৃত্তিকার সন্তান, তাঁর স্তনদায়িনীকে তিনি শনাক্ত করেন। কিন্তু একই সঙ্গে সভ্যতার অধিক বয়সি তাঁর কেশরাশিতে, তার মুখের রেখায় প্রাক্‌পৌরাণিক স্মৃতি। ঋত্বিকের ক্যামেরা কী উৎফুল্ল হয়ে নারী শরীরের উদ্‌বেলতাকে চিনে ফেলে, আর গান্ধীকে ইতিহাসপুরুষ হিসেবে বর্ণনা করেন, সমধর্মী এক অগ্রজের কাজে তিনি প্রার্থনা করেন জীবনের লুপ্ত সংকেতসমূহ, কিংবদন্তী। চিড়িয়াখানার বাসের মধ্যেই রিলকে যেমন অনুভব করেছিলেন শক্তির নর্তন এক, স্থির কেন্দ্রে অপ্রতিহত, ঋত্বিক তেমনভাবেই আকুল হয়ে দেখেন রামকিঙ্করের পাথর। ঋত্বিকের ফ্রেম ও রামকিঙ্করের পট — উভয়েই সীমাবদ্ধতাকে যুগপৎ ঠাট্টা ও স্বীকার করে যায়।

ঋত্বিকের সুবর্ণরেখায় যে রামায়ণকথা, তা সমাজের তলানি থেকে উঠে আসা। তাঁর রামচন্দ্র ঘাটশিলার অদূরে ছাতিমফুল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যে মাতৃবন্দনা করে, যে কৌশল্যাকে আবিষ্কার করে, সে কোনো উচ্চবর্ণসম্ভূতা রাজমাতা নয়। সামান্য বাগদি বউ। রামকিঙ্করের যক্ষিনীও — তার শ্রোণিযুগ ও নিম্নোদর দেখলেই বোঝা যায়, নন্দনতত্ত্বের অভিজ্ঞান নয়, কোনো প্রান্তিক রমণীর গোপন প্রদেশ। দু'জনেই অনার্য, দু'জনেই ব্রাত্য, ঋত্বিক ও রামকিঙ্কর আসলে ক্রমাগত নিজেদের আত্মার সম্প্রসারণ ঘটান ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে।

আরও কয়েকবছর বাদে তাঁর স্বপ্নপর্যায়ের একটি ছবিতে টুপি পরিহিত উন্মাদ ভ্যান গঘের কাকেরা ফ্রেমের বাঁধন ছাড়িয়ে উড়ে গিয়েছিল — কুরোসাওয়া চাইছিলেন ছবির স্থিরতা মুক্তি পাক সংগীতের চলমানতায়। ঋত্বিক মূলত চলমান চিত্রমালায় নিবেদিত বলেই তিনি রামকিঙ্করের মধ্যে প্রতিমুহূর্তেই চিহ্নিত করেন সম্ভাব্যতার উৎস। যা কিছু অ-সম্ভব, যা কিছু অ-বাস্তব, রামকিঙ্করের সৌজন্যে রেখা আর রঙে পর্বত যে কী করে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ হতে পারে, তা এই চলচ্চিত্রকার জানাবার সুযোগ পান। তাঁর কাছে রামকিঙ্কর বিপরীতের মিলন, মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিকতার একটি মূর্ত দৃষ্টান্তও।

সমস্যা এই যে, ঋত্বিক ছবিটিকে সম্পাদনা করতে পারেননি। এমনকি শব্দসংযোজনের সুযোগও পাননি। আর আজ, মৃত্যুর পরে এই ছবির সম্পাদনায় দায়িত্ব নেওয়া তো প্রায় পাপ! আইজেনস্টাইনের 'কে ভিভা মেজিকো' - নামক অসমাপ্ত ছবিটিকে নিয়ে এরকম একটি চেষ্টা হয়, আর সঠিক কারণেই সবান্ধব জঁ ল্যুক গোদার সে প্রচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ করেন। বস্তুত আজ, রামকিঙ্কর সম্পাদিত হলেও স্রষ্টার মূল পরিকল্পনা কী ছিল, তিনি কিভাবে প্রাক্‌ ও উত্তর ইতিহাসকে চিত্রায়িত দেখছিলেন, আমাদের পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলি, আন্তনিওনির Beyond the cloud ছবিটি স্রষ্টার স্নায়ুবিপর্যয়ের কারণ, সম্পাদনা করেন ভেণ্ডার্স। সবচেয়ে করুণ পরিণতি হচ্ছে এই ভেণ্ডার্সের যাবতীয় আন্তরিকতা সত্ত্বেও ছবিটি দেখলে প্রায় বোঝাই যায় না যে তা আন্তনিওনি স্বাক্ষরিত। সংক্ষেপে বলার, পৃথিবীর স্রষ্টারা, ঋত্বিক ও আন্তনিওনি নির্বিকল্প। তাঁদের প্রদেশে হস্তক্ষেপ করা অনৈতিক।

ঋত্বিক ঘটক হয়তো রামকিঙ্করকে পরতে পরতে দেখতেও চাননি। যেমন সত্যজিৎ চেয়েছিলেন বিনোদবিহারীকে। নিজে মূলত বক্তব্যধর্মী বলেই তাঁর উদ্দেশ্য রামকিঙ্কর নামক সন্দর্ভকে নিবেদন করা। তিনি যতটা তথ্যচিত্রের আড়ালে ইতিহাসকা্র ও দার্শনিক, ততটা মানতেই হবে আখ্যানপ্রণেতা নন।

সত্যজিৎ বিনোদবিহারীকে দেখেছেন ও ঋত্বিক রামকিঙ্করকে। কিন্তু একজন শিল্পী কি কাউকে দেখতে পান? তিনি তো পিকাসোর ছবির মতোই 'আয়নার সামনে নারী'। হয়তো দু'জনেই দেখতে চেয়েছিলেন, অপর দুই শিল্পীকে, আর শেষপর্যন্ত দু'জনেই জীবনীর বদলে যা উপহার দিয়ে গেছেন, তা আত্মজীবনী। যদি সত্যজিতের পছন্দের তালিকা দেখি, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তিনি শিল্পীর সংসারেও এক ধরনের গৃহিণীপনা দেখতে পান। তা ধ্রুপদী হলিউড ছবিই হোক বা নববাস্তববাদী ডি-সিকার ছবিই হোক, কিংবা ত্রুফোর 'ফোর হাণ্ড্রেড ব্লোজ' বা আন্তনিওনির 'লাভেনচুরা'ই হোক। আর ঋত্বিক নাশকতার উৎক্ষেপ দেখতে পান তাঁর আরাধ্যদের তালিকায় — তত্ত্বের মধ্যে মন্তাজ নিয়ে আইজেনস্টাইন ও পুডভকিনের 'ঝগড়া' তাঁকে ভাবায়। বুনুয়েল তাঁর প্রিয় পাত্র। ফেলিনির অন্তর্ঘাত, অন্তত 'লা দলচে ভিতা' তার পাঠসংকেত। ফলে, তথ্যচিত্রের আপাতদূরত্ব যে সত্যজিৎ ঋত্বিকের ক্ষেত্রে মনোপ্রবণতারও দূরত্ব রচনা করবে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। আসলে শিল্পী হতে গেলে তাঁকে বাঁহাতের বুড়ো আঙুলের ছাপ তো রেখে যেতেই হবে।



Published in Parabaas June, 2012

Send us your feedback

©Parabaas, 2012