Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazine



পরবাসে ইন্দ্রনীল দাশগুপ্তরলেখা



ISSN 1563-8685




ঘর্মুরি পুরাণ

চরিত্রলিপি

দুর্যোধন
ভীম
যুধিষ্ঠির
অর্জুন
দ্রোণাচার্য
ব্যাসদেব
কৃষ্ণ

[২০১১ সালের সরস্বতী পুজো উপলক্ষ্যে নিউ জার্সির কিশোর-কিশোরীরা 'ঘর্মুরি পুরাণ' নাটকটি মঞ্চস্থ করে। অভিনয়াংশেঃ

মৈত্রেয়ী দাশগুপ্ত--ব্যাস
অভীক সরকার -- দ্রোণ
অর্ণব দে -- দুর্যোধন
সরস্বতী দাশগুপ্ত -- যুধিষ্ঠির
অংশু দে -- ভীম
জহীন চক্রবর্তী -- অর্জুন
সায়ক বাগচী -- কৃষ্ণ

পরিচালনাঃ বর্ণালী দাশগুপ্ত

নাটকের গান ও নাচের দৃশ্যগুলি প্রয়োজনে বর্জন করা যেতে পারে। -- লেখক]

প্রথম দৃশ্য

[দ্রোণাচার্যের আশ্রম। বৃদ্ধ দ্রোণ একটা কাঠের তক্তার উপর বসে ঝিমোচ্ছেন। নাক ডাকছে মাঝে মাঝে। যুধিষ্ঠির আর ভীম বিড়ি খাওয়ার অভিনয় করছে। হাতে তীর ধনুক। দুর্যোধনের প্রবেশ। যুধিষ্ঠির আর ভীম হাতের জিনিস লুকিয়ে ফেলে।]

দুর্যোধন: এ কি, তোরা রাজার ছেলে হয়ে বিড়ি খাচ্ছিস? ক্যান্সারের ভয় নেই? ভীম, তুই না বডি বিল্ডার?

ভীম: (কাশতে কাশতে) আ-আমি ফুসফুসে নিই না। জি-জিজ্ঞেস কর যুধিষ্ঠিরকে।

যুধিষ্ঠির: সুযো, তুইও একটা খেয়ে দ্যাখ। ব্যাসদেবের নিজের হাতে বাঁধা।

দুর্যোধন: না, না। মা ভীষণ বকবে। দু:খে আত্মহত্যাও করতে পারে। আচ্ছা, ব্যাসদেব বিড়িও বাঁধেন?

যুধিষ্ঠির: সেটাই তো আসল ব্যবসা। গাঁজা, আফিং, নিষিদ্ধ বই, এসব হস্তিনাপুরে আসে কোত্থেকে?

দুর্যোধন: বলিস কি? আমি তো ভাবতাম এসব কিরাত আর জুজুদের কারবার।

যুধিষ্ঠির: ছো:। নাটের গুরু বেদব্যাস। পাঠশালা দিয়ে আর বই লিখে কি পেট চলে? যাগযজ্ঞ করে মেলে আট দশ টাকা। এদিকে ভীম একাই মাসে সাড়ে বত্রিশ টাকার চরস খায়।

[ভীম কাশতে কাশতে দূরে সরে পড়ে। ]

দুর্যোধন: (চোখ কপালে তুলে) চরস! সে জিনিস তো এদেশে নিষিদ্ধ!

যুধিষ্ঠির: ন্যাকামো করিস নে ভোঁদা। ভূভারতে আফিং আর চরস রপ্তানি করে কে? গান্ধার। তোর মামাবাড়ি।

দুর্যোধন: তাহলে মামাবাড়ি গেলে ওরা আমায় শুধু দুম্বার দুধ আর বেদানা খাওয়ায় কেন?

যুধিষ্ঠির: কারণ তুমি একটি অতিসিদ্ধ ঢ্যাঁড়স। তোমার শকুনিমামা তোমাকে মানুষ হতে দেবে না। আমার বা ভীমের কথা ছেড়ে দিলাম, নকুল সহদেব? এরা তোর চেয়ে ছোট হয়ে—। তবে আফিং-টাফিং বুড়োদের জন্য, সেকেলে জিনিস। আজকাল ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ঘর্মুরি ভাজা।

দুর্যোধন: ঘর্মুরি ভাজা? সেটা আবার কি?

যুধিষ্ঠির: আস্তে বল। এটা ব্যাসদেবের নিজের আবিষ্কার। অদ্ভুত নেশা। সেরকমই দামি। একবার খেলে—। এই রেঃ দ্রোণাচার্যের নিদ্রাভঙ্গ হচ্ছে।

দ্রোণ: (দুচোখ কচলে) তবে? এই যে কুরু কুলাঙ্গার সুযোধন, ধর্মের বিভীষিকা যুধিষ্ঠির, প-প-পবনের পণ্ডশ্রম ভীম, তোমরা মাইনে এনেছো?

দুর্যোধন: এই নিন গুরুদেব, মা সবারটা মিটিয়ে দিতে বলেছে।

দ্রোণাচার্য: সাধু, সাধু। তোমার মায়ের জবাব নেই।

যুধিষ্ঠির: গুরুদেব। আমার পাওনাটা?

দ্রোণাচার্য: (চোখ কুঁচকে) তোমার আবার কিসের পাওনা বাওয়া?

যুধিষ্ঠির: দুন্দুভিপুরের মেলায় আপনি ফুচকা আর পাঁপড়ভাজা খেলেন, দুটো পাঁঠা কিনলেন। তার জন্য বাহান্ন টাকা ধার হয়েছিল। সুদসমেত এখন তেষট্টি টাকা তিন আনা হয়। তা আপনি তেষট্টিই দিন।

দ্রোণাচার্য: ওরে বাবা, কি সর্বনেশে ছেলে! এত চড়া সুদ? আমি দরিদ্র শিক্ষক, এত কী করে দেব বাবা?

যুধিষ্ঠির: বেশ আপনি মূলের বাহান্ন দিয়ে দিন। সুদের বদলে আপনার স্বর্গবাস ও পুণ্যের এক তৃতীয়াংশ আমার।

দ্রোণাচার্য: (টাকা দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) ঠিক আছে, তাই নাও। হায়, তোমার বাবার কল আর বাতাসে নড়ে না।

ভীম: সে-সে বা-বাতাসও কি আছে? প-পবনদেব বুড়ো হয়েছেন। সারা গায়ে বাত। আর ধ-ধর্ম তো যুধিষ্ঠিরের জন্মের পর থেকে লজ্জায় এ পাড়া মাড়ান না।

দ্রোণাচার্য: সবই ভাগ্য। যাহোক এবার একটু অস্ত্রচর্চা হয়ে যাক। অর্জুন কই? অর্জুন?

যুধিষ্ঠির: আর অর্জুন? সে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই হাতে গাণ্ডীব তুলে নিয়েছিল।

দ্রোণাচার্য: সর্বনাশ! তোমায় বলেছিলাম না সে যেন খবরদার লোকালয়ের মধ্যে এরকম বিপজ্জনক কাজ না করে? তা তুমি ছিলে কী করতে? ধনুকটা সরিয়ে নিতে পারলে না?

ভীম: সে কী আর দিতে চায়? মা-মাথায় একটা গাঁট্টা মেরে কেড়ে নিতে হল। কিন্তু তা-তা-তা-তার আগে তো সে তিনটে তী-তী-তীর চালিয়ে নিয়েছে।

দ্রোণাচার্য: ও হো হো হো।

যুধিষ্ঠির: প্রথমটা ধৃতরাষ্ট্রের মাথায়।

দ্রোণাচার্য: (মুখভঙ্গি করে) আ-আ-আ-আ-হ্‌!

যুধিষ্ঠির: জেঠু সেই থেকে চোখে সরষেফুল দেখছেন আর ভাবছেন দৃষ্টি বুঝি ফিরে এল। মাথার গোলমালও হচ্ছে। দ্বিতীয় তীরটা লেগে বিদুরের পোষা একটা গরু পঞ্চত্ব পেয়েছে।

দ্রোণাচার্য: হায় হায়, গোহত্যা?

যুধিষ্ঠির: মাতা কুন্তি তিনজন কনৌজী বামুনকে ভোজন করাছিলেন। তৃতীয় তীরটা পাশ থেকে এসে তিনজনেরই পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে।

দ্রোণাচার্য: ছি ছি ছি ছি। ব্রহ্মহত্যাও বাদ রাখেনি? এই ছেলেকে ত্যাজ্য না করে আর উপায় নেই ভীম।

ভীম: ভয় নেই, কা-কা-কা-কাকপক্ষী জানার আগে আমি আর পিতামহ ভী-ভী-ভী-ভীষ্ম মিলে সবকটা লাশ হাওয়া করে দিয়েছি।

দ্রোণাচার্য: আর সেই অপোগণ্ড ধানুকী?

যুধিষ্ঠির: ওই তো, আপনার পিছনে!

[দ্রোণ সভয়ে দুহাত দিয়ে মাথা আগলেছেন। লাফাতে লাফাতে ঢুকল বালক অর্জুন। তার হাতে একটি বিশাল ধনুক।]

অর্জুন: গুরুদেব আজকে আমি একটা গরু মেরেছি!

দ্রোণাচার্য: চুপ কর হতভাগা! দ্রোণাচার্যের নাম ডোবাবি তুই। গরু নয়, ওটা একটা শৃগাল বোধ করেছিস তুই।

অর্জুন: গায়ের রং সাদা, শিং আছে, বাঁট আছে। দুধ দিত রোজ। এসব শেয়ালেরও হয়?

দ্রোণাচার্য: প্রাণায়াম করলে হয়। শোন তোর জন্য একটা সুখবর আছে। বলরাম তোকে শিষ্য করে নিতে চাইছেন। তোর দুই হাতই সমান চলে কিনা। আজ থেকে তুই ধনুক ছেড়ে গদা ধরবি।

অর্জুন: (কাঁদো কাঁদো হয়ে) কিন্তু ব্যাসদেব বলেছেন আমি বড় হয়ে বিরাট ধনুর্ধর হব। অনেক কীর্তি হবে আমার।

দ্রোণাচার্য: (ভেংচি কেটে) পড়বে শালার কীর্তির গালে দুটো লপ্পর! ভীম, সু্যোধন, ওর হাত থেকে ধনুকটা কেড়ে নে তোরা।

[ভীম আর দুর্যোধন অর্জুনের দিকে এগোলে সে ঢুঁ মেরে দুর্যোধনকে ফেলে দিয়ে চরকির মত ঘুরতে থাকে। ভীম তাকে চেপে ধরতেই সে ঘ্যাঁক করে ভীমের হাত কামড়ে দেয়। ]

দুর্যোধন: আঁ-আঁ-আঁ-আঁ। উঁ-উঁ-উঁ-উঁ। আঁমি মাঁমাঁর বাঁড়ি চঁলেঁ যাঁবঁ। [পলায়ন]

ভীম: ও: হো: হো:। কামড়ে দিয়েছে শুয়োরের বাচ্চা। আমার জ-জ-জ-জলাতঙ্ক হবে গুরুদেব। [প্রস্থান]

[দ্রোণ মরিয়া হয়ে হুঙ্কার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অর্জুনের উপর। দুজনে মিলে খানিক্ষণ ধস্তাধস্তি। তারপর দ্রোণ সহর্ষে গাণ্ডীব কব্জা করে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাঁর দাড়িটা নেই দেখে যুধিষ্ঠিরের চোয়াল ঝুলে পড়েছে।]

দ্রোণাচার্য: হাঁ হয়ে গেলে দেখছি। দেখলে বুড়ো হাড়ের ভেলকি? কেমন দিলাম বল?

যুধিষ্ঠির: দা-দা-দা-দা—

দ্রোণাচার্য: সে কি রে? এবার তুই তোতলা হয়ে গেলি? কী বলছিস? দারুণ অ্যাঁ?

যুধিষ্ঠির: উ-উ-উ—

দ্রোণাচার্য: উৎকৃষ্ট?

যুধিষ্ঠির: নি- নি-নি—

দ্রোণাচার্য: এটা বুঝলাম না বাবা ধর্মঘট। একটু খোলসা করে বল।

যুধিষ্ঠির: দা-দাড়ি উপড়ে নিয়েছে।

অর্জুন: (দাড়ি চিবোতে চিবোতে উঠে দাঁড়িয়ে) হ্যাঁ নিয়েছি। ও আমার ধনুক নিল কেন?

দ্রোণাচার্য: (মুখ ঢেকে) আ-আ-আ-আ-আ—

[দ্রোণের হাত থেকে ধনুক পড়ে যেতেই অর্জুন সেটা করায়ত্ত করে নেয়। দ্রোণ একবার চোখ খুলে দেখেন অর্জুন মুখ থেকে দাড়িটা বের করে তাঁকে ফেরত দিতে চাইছে। দাড়ি নিয়ে দ্রোণের পলায়ন।]

অর্জুন: দাদা, আমরা কি একটু তীর ধনুক খেলব?

যুধিষ্ঠির: হুম্‌। আচ্ছা অর্জুন, ঋষি শিকার করেছিস কোনোদিন?

অর্জুন: (রোমাঞ্চিত) ঋষি শিকার? না তো। করলে কি আমার কীর্তি হবে?

যুধিষ্ঠির: তা হয়ত হবে না। কিন্তু হাত পাকাতে গেলে আগে কিছু সহজ লক্ষ ভেদ করা দরকার। ঋষিরা যখন তপস্যায় বসে তখন তারা খুব স্থির হয়ে থাকে। নড়ে চড়ে না।

অর্জুন: (চমৎকৃত) তীর ধনুক তাক করলেও না?

যুধিষ্ঠির: ঠিক। তীর ধনুক তাক করলেও না। দু পাঁচবার ফসকে গেলেও উঠে পালায় না।

অর্জুন: এইরকমই তো আমি খুঁজছিলাম। চলো চলো এক্ষুনি কোনো ঋষিদের তপোবনে যাওয়া যাক। আমি অনেক ঋষি বধ করব। ধনুর্ধর হবই।

যুধিষ্ঠির: ধন্যি তোর অধ্যবসায়। চল তাহলে।

[দুজনের প্রস্থান]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[ব্যাসের আশ্রম। ব্যাসদেব বেদীতে আসীন। পাশে একটা ধুনো জ্বলছে। ব্যাসদেব গুনগুন করে একটা শ্লোক আওড়াচ্ছিলেন, এমন সময় হলুদ কাপড় পরে কৃষ্ণের প্রবেশ।]

ব্যাসদেব: আরে আরে কি সৌভাগ্য! স্বয়ং কৃষ্ণ আজ উপস্থিত। বোসো বোসো। কী খাবে বলো। কচ্ছপ আর বরাহ তো তুমি খাও না। তাহলে পাঁঠা না মুরগি?

কৃষ্ণ: জয়তু ব্যাসদেব। এই একটু হস্তিনাপুরে পাণ্ডবদের দেখতে এসেছিলাম। তার আগে একটা প্রশ্নের মীমাংসা করতে হবে। গতবার যুধিষ্ঠির জিগ্যেস করেছিল। উত্তর দিতে পারিনি।

ব্যাসদেব: বলো বৎস কী প্রশ্ন।

কৃষ্ণ: মুরগি আগে, না ডিম?

ব্যাসদেব: হা: হা: হা: হা:। এই প্রশ্নটাই আমাকে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কালে সবাই জিগ্যেস করে। দ্বাদশ আদিত্য, অষ্টবসু, যমজ অশ্বিনীকুমার, সমুদয় দেবতাগণ, মায় স্বায়ম্ভুব মনু—এই ঠিক যেখানে তুমি বসে আছো সেখানে বসে এই প্রশ্ন আমাকে করে গেছেন।

কৃষ্ণ: উত্তরও পেয়েছেন?

ব্যাসদেব: বিলক্ষণ। (গলা নামিয়ে) তবে সবাই এক উত্তর পাননি। যে যেমন মালকড়ি ঢেলেছে। তুমি আসল উত্তরটা চাও না নকল?

কৃষ্ণ: মাসে মাসে আমার যে টাকাটা আপনার পকেটে ঢুকছে সেটা আসল না নকল?

ব্যাসদেব: বেশ বেশ বাবা। হক কথা। তথাস্তু। আসল উত্তরটাই বলি তাহলে। হয়েছে কি, সময় হল অনন্ত এবং অনন্তকাল ধরে মুরগির পরে ডিম আর ডিমের পর মুরগি হয়ে চলেছে। শুধু তাই নয় এই পুরো বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড একটি কুক্কুটের ডিমের মধ্যে আবদ্ধ। এই বিশ্বের বাইরে আরেকটি মহাবিশ্ব আছে। সেখানে বসে একটি মহামুরগি তাতে মহানন্দে তা দিচ্ছে।

কৃষ্ণ: সর্বনাশ! ডিম ফুটে গেলে?

ব্যাসদেব: প্রলয়। কিন্তু তার ঢের দেরি। তোমার আমার কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। শুধু কি তাই, সেই মহাবিশ্বের মহামুরগি আরো কত ডিম পেড়েছে তার ইয়ত্তা আছে? আর সেই মহাবিশ্ব আরেক মহাতিমহা ডিম্বের মধ্যে বদ্ধ হয়ে আছে যাতে তা দিচ্ছে এক মহাতিমহা মুরগি।

কৃষ্ণ: ব্যস ব্যস বুঝে গেছি প্রভু। এবং সেই মহাতিমহা মুরগির উপর রয়েছে আরেক মহাতিমহাতিমহা মুরগি, এই তো?

ব্যাসদেব: (হাস্য করে) জল হয়ে গেছে তো? এই মুরগি আর ডিমের পরম্পরার শেষ কোথায় জানো? যাহা বৃহৎ, তাহাই ক্ষুদ্র। সবচেয়ে বড় যে মহামুরগি সে আছে সবচেয়ে ছোট মুরগির সর্বকনিষ্ঠ ডিমের মধ্যে।

কৃষ্ণ: মানে কোনো শেষ নেই? কুয়োর দড়ির মত এ-মুড়োর সঙ্গে ও-মুড়ো বাঁধা?

ব্যাসদেব: বোঝো? সবাই সবার উদরে। এই গুপ্তবিদ্যা আমি লিখে রেখেছি আমার কুক্কুটোপনিষদে। কেমন লাগছে শুনতে?

কৃষ্ণ: অতি উপাদেয়। বলকারক, ক্ষুধাবর্ধক উপনিষদ হবে এটি। শুনতে শুনতে এমন বেজায় ক্ষিদে আগে পায়নি কখনো। মুরগিই হোক তবে।

ব্যাসদেব: মুরগির মাংসের পুর দেওয়া ডিমের ঝোল হচ্ছে রাত্রে। (গলা নামিয়ে) তোমার বায়না দেওয়া পুরাণের তাগাদা করতে এসেছো?

কৃষ্ণ: না, না। সেজন্য আমার চিন্তা নেই। তবে তাতে মুরগি ফুরগি ঢোকাচ্ছেন না তো?

ব্যাসদেব: পাগল? টাকা যেমন ঢেলেছ, মালও তেমন পাবে বাওয়া। এরকম পুরাণ কেউ কোত্থাও দেখেনি বৎস। এই ভাগবত পুরাণ প্রকাশের পর ভূভারতে তোমার চেয়ে বড় কোন দেবতা থাকবে না। ঘরে ঘরে পুজো হবে তোমার। হাজার বছর পরেও মেয়েরা সারাদিন উপোস করবে তোমার নামে। তারপর বিকেলে গণ্ডা গণ্ডা লুচি খাবে। জোয়ান লোকেরা উদ্বাহু হয়ে নেচে নেচে আনন্দাশ্রু বর্ষণ করবে। আর মহাভারত কাব্যে যদি কিছু ঢালো তো—

[হঠাৎ কোলাহল। হৈ হৈ করে ধনুক হাতে ঢুকে পড়ল অর্জুন। তার হাতে একটি ঋষির মুণ্ডু।]

অর্জুন: ব্যাসদাদু, কত ঋষি বধ করেছি দ্যাখো! আরে কৃষ্ণ তুইও এখানে? কবে এলি?

ব্যাসদেব: (আঁৎকে উঠে) অ্যাঁ, ঋষি বধ? ক-ক-কেন?

অর্জুন: তীর দিয়ে ঋষি মেরে মেরে হাত পাকাচ্ছি। ধনুর্ধর হতে হবে তো।

কৃষ্ণ: তোরা হাত পাকাবার জন্য ঋষি মারিস? বা: বেড়ে তো? আমাদের ওদিকে ঋষি বড় কম। আমরা বুড়োদের আর খঞ্জদের ঘায়েল করি।

ব্যাসদেব: (ভূর্জপত্র দিয়ে আত্মরক্ষা করে) ধনুক নামাও বাবা পার্থ। ছি ছি, ওটা খেলনা নাকি? ভুল করে যদি আমার গায়ে একটা তীর লেগে যায় সেটা ভালো হবে?

অর্জুন: (জিভ কেটে) আজ সকালে ধৃতরাষ্ট্র জেঠুর মাথায় একটা হাত ফস্কে লেগে গেছে। সেই থেকে জেঠুর মাথাটা কেমন গুলিয়ে গেছে। যেখান সেখান থেকে ছিঁচকে চোরের মত জিনিসপত্র তুলে নিচ্ছে। মায় একটা রাজপেয়াদার পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। প্রথমে তো সভাসদরা চিনতে না পেরে দিয়েছে বেধড়ক মার। সে কি কেলেঙ্কারি!

ব্যাসদেব: সব্বোনাশ! ধৃতুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? বাকিরা সব ঠিক আছে? ভাই বোনেদের কাউকে সাবাড় করে দাওনি তো? তাদের এখনও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

অর্জুন: না না, শুধু পিতামহ ভীষ্ম—

ব্যাসদেব: সত্যানাশ! ভীষ্মেরও কি মাথায় মেরেছ?

অর্জুন: না না, পাছায়। বেশ কয়েকটা লেগে সজারুর মত দেখাচ্ছিল।

ব্যাসদেব: অ্যাঁ? শর-সজারু? হা-হা- হা-হা। এটা তো মন্দ নয়। দাঁড়াও লিখে রাখি। (ভূর্জপত্র থেকে মুখ তুলে) কাব্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে।

অর্জুন: কাব্যে? বাহ্! তাতে আমার কীর্তি কিছু থাকছে তো?

ব্যাসদেব: থাকবে। যত ঢালবে ততই থাকবে। তোমার এমাসের হাতখরচের টাকাটা কিন্তু আমায় এখনো দিলে না।

অর্জুন: সেটাই তো দিতে এসেছিলাম। এই নাও। [মুদ্রা প্রদান।] আচ্ছা, কীরকম কীর্তি লিখছ আমার?

ব্যাসদেব: এই তো আদিপর্ব শেষ করছি। তোমার অস্ত্রচর্চা, বিদ্যাচর্চা সব থাকছে। দ্রোণব্যাটা তোমাদের এখনও কিছু শেখায় টেখায় তো? নাকি একেবারেই ফাঁকি দিচ্ছে?

অর্জুন: দ্রোণাচার্য তো চোখে ভালো দেখেন না। সেদিন একটা শুয়োরছানাকে অশ্বথামা ভেবে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন। গুরুপত্নী তাই না দেখে আমাদের ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করলেন। পালাতে পালাতে দ্রোণাচার্য বললেন—তাই তো, এটা সেই শূকরশাবক? তাহলে নৈমিষারণ্যের হাটে শূকরশাবক ভেবে কাকে বেচে দিয়ে এলাম?

কৃষ্ণ: বল কী? অশ্বথামা হত?

অর্জুন: একটুর জন্য বেঁচে গেছে। তাকে আগের দিনই পাকা পেঁপে ভেবে গাছে বেঁধে রেখেছিলেন কিনা। তবে যুধিষ্ঠির মজা দেখার জন্য যেই বলেছে—“হ্যাঁ হাটের থলিতে থামাই ছিল বোধহয়” তো অশ্বথামা কাটা পড়েছে ভেবে দ্রোণাচার্য প্রায় মূর্ছা যেতে বসেছিলেন।

ব্যাসদেব: সাধু সাধু। এটাও মন্দ বলোনি হে। এ তো ভালো ভালো গল্প আসছে আজ। লিখে রাখি লিখে রাখি। আর কী কী সব হচ্ছে তোমাদের বাড়ি অ্যাঁ? কুন্তীর কি আর কোন ছেলেপিলে হল? গান্ধারীর ভাইটা চাকরি বাকরি পেলে?

অর্জুন: না:, কিছুই হয়নি। শকুনিমামা কিছুদিন গানের চর্চা করেছিল। বর্ষার গান ধরতেই দেশ জুড়ে ভয়ংকর খরা। মা সরস্বতীর বন্দনা করতে গেল একদিন রাত্রে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ আকাশ থেকে একটা বীণা এসে ধাঁই করে পড়ল মাথায়। সেই থেকে মামার কোন সাড়াশব্দ নেই। তবে বিরাট খবরটা কী জানো? আগামী রবিবার দ্রোণাচার্যের আশ্রমে তীর চালাবার প্রতিযোগিতা!

ব্যাসদেব: বটে? তোমাকেও অংশ নিতে হচ্ছে?

অর্জুন: না, মানে আমাকে ডাকেনি, কিন্তু আমিও ছাড়ছি না। ঠিক গিয়ে হাজির হব গাণ্ডীব নিয়ে। ধনুর্ধর হতে হবে তো?

কৃষ্ণ: সেরেছে।

ব্যাসদেব: আমরাও এই ভয়ই করেছিলাম। যাহোক, তাহলে অকুস্থলে আমরাও উপস্থিত থাকব।

অর্জুন: আচ্ছা দাদু চলি তাহলে। কৃষ্ণ তোর সাথে বাড়িতেই দেখা হবে।

কৃষ্ণ: সাবধানে যাস। ভুল করে রাক্ষসদের এলাকায় ঢুকে পড়িস না।

ব্যাসদেব: এস বৎস। তোমার জয় হোক। (জনান্তিকে) এই নাও যাবার আগে একটু ঘর্মুরি ভাজা খেয়ে যাও।

[ঘর্মুরি ভাজা চিবোতে চিবোতে ব্যাসার্জুনের গান ও লঘুনৃত্য]

পয়সা কড়ি ঢালে যে       ভরবে মালে মালে সে
চতুর্দিকে ছড়াবে তার নাম
বেদব্যাসের বাক্যি           মহাভারত সাক্ষী
অর্জুন হয় ধনুর্ধর শোনে পুণ্যবান।

[অর্জুনের প্রস্থান]

কৃষ্ণ: মহাভারতটা আবার কী? ওটা কি অর্জুনের বায়নায় ধরেছেন?

ব্যাসদেব: সেটাই তো তোমাকে বলতে যাচ্ছিলাম। যা নাই ভারতে তা নাই ভারতে। এ এক অতি পরাক্রমশালী কাব্য। যেখান থেকে যা পাচ্ছি, গুল গাঁজা সব চাপাচ্ছি। তারপর যে যেমন ঢালছে তেমন তেমন করে সেই সব গল্প নাড়াচাড়া হয়ে যাচ্ছে। সূতপুত্র কর্ণ--তার বেশি টাকাকড়ি নেই। কিন্তু মাগনা দুটো ঘোড়া আশ্রমের জন্য খাটায়। তাকে রাজা করে দিতে হবে। দেব। পাণ্ডবরা সকলেই অল্পবিস্তর দেয়। কিন্তু অর্জুন ছেলেটার জেদ আছে। সে কীর্তিমান হবার জন্য লাখ টাকাও খরচ করতে রাজি। তারটা তো দেখতেই হবে। হেঁ হেঁ হেঁ।

কৃষ্ণ: হুম্। আর আমি?

ব্যাসদেব: তোমাকে ফেলতে পারি পীতু? তোমাকেও দেখছি। সাইড রোলে।

কৃষ্ণ: ব্যাসদেব, আপনি তো জানেন সাইড রোল জিনিসটাই আমার পছন্দ নয়। আমি যেখানেই থাকি লীড রোলে থাকি।

ব্যাসদেব: কিন্তু তা কী করে হবে বাবা? এটা তো অর্জুনের ধনুর্ধর হবার গপ্পো। তেমনভাবেই সাজানো হয়েছে সব চরিত্র। টাকাও কম দেয়নি ছোকরা।

কৃষ্ণ: কত দিয়েছে? দশ? পঁচিশ? তিরিশ হাজার?

ব্যাসদেব: তা ধরো শেষ হতে হতে লাখখানেক তো বার করে নেবই। প্রতি শ্লোকের যদি একটাকা দরও হয়—

কৃষ্ণ: (নখের মধ্যে কী যেন দেখতে দেখতে) আমি যদি তিন-লাখ দিই তাহলে লীড কে হবে?

ব্যাসদেব: (বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে) তুমি। অন্য কারো কথা ভাবিও না আমি। যুদ্ধটা বলো তো কুরু-পাণ্ডবে না লাগিয়ে পাঞ্চাল আর যাদবদের মধ্যে লাগিয়ে দিই। তুমি কী চালাবে? ধনুক না গদা?

কৃষ্ণ: না, না, আমাকে ধনুর্ধর বানাবার দরকার নেই। ওসব ছেলেমানুষী অর্জুনের জন্য থাকুক। আমার জন্য নতুন কিছু ভাবুন।

ব্যাসদেব: অ্যাঁ? নতুন কিছু?

কৃষ্ণ: হ্যাঁ, আনকোরা নতুন। এমন একটা অস্ত্র দিন যা আগে কেউ ভাবেই নি। এমন একটা চরিত্র যে সবার চেয়ে জ্ঞানী, সবার চেয়ে বীর, কিন্তু সবার চেয়ে আলাদা।

ব্যাসদেব: সে তো ভগবান?

কৃষ্ণ: (ধূর্ত হাসি হেসে) তবে?

ব্যাসদেব: তাহলে ভাগবত পুরাণের গল্পটাই এখানে আরো এগোতে থাকুক। আচ্ছা তুমি সবার সামনে অর্জুনকে বলতে পারবে—যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত—

কৃষ্ণ: কী? গদায় রদ্দায় গলদঘর্মস্য? এসব বলতে গেলে আমার দু-কুড়ি দাঁত ভেঙে যাবে। লিখবেন তো আপনি, আমাকে আবার বলতে হবে কেন? পয়সাও আমার, খাটনিও আমার?

ব্যাসদেব: ঠিক কথা, ঠিক কথা। কোন চিন্তা নেই, সব হয়ে যাবে। শুধু একটা কথা বলো বংশী, এর মধ্যে যে কুরু-পাণ্ডবদের যুদ্ধ আছে তাতে জেতাব কাদের? তুমি পাণ্ডবদের পক্ষে না কৌরবদের?

কৃষ্ণ: (হাসতে হাসতে গাত্রোত্থান করে) আমার কী আসে যায়? যে মাল বেশি ঢালে সেই জিতুক। আপনিই তো বলেন—পয়সা কড়ি ঢালে যে ভরবে মালে মালে সে।

[ব্যাস ও কৃষ্ণের একসাথে অট্টহাসি এবং নাচতে নাচতে গান ও প্রস্থান]

পয়সা কড়ি ঢালে যে           ভরবে মালে মালে সে
চতুর্দিকে ছড়াবে তার নাম
বেদব্যাসের বাক্যি

ব্যাসদেব: (কৃষ্ণকে থামিয়ে দিয়ে) এমন কী আর মাগ্যি

এক লাখে ধনুর্ধর তিন লাখে ভগবান।

তৃতীয় দৃশ্য

[দ্রোণাচার্যের আশ্রম। ভীম, যুধিষ্ঠির আর দুর্যোধন তলোয়ার আর গদা চালাচ্ছে। দ্রোণের প্রবেশ। দ্রোণের হাতে পাতার তৈরি অনেকগুলো বৃত্ত আঁকা লক্ষভেদের লক্ষ]

দ্রোণাচার্য: (মাথা চুলকে) কার সাথে কার লড়াই হচ্ছে রে?

যুধিষ্ঠির: আমি আর ভীম ওদের সঙ্গে লড়ছি।

দ্রোণাচার্য: ওরা কারা?

দুর্যোধন: কেন, আমি আর ভীম।

দ্রোণাচার্য: এদিকেও ভীম, ওদিকেও ভীম?

ভীম: আমি দুজনের হয়ে দুজনকেই পে-পে-পে পেটাচ্ছি গুরুদেব।

দ্রোণাচার্য: মানে?

ভীম: দুর্যোধন বলেছে ও রাজা হলে আমাকে সে-সে-সেনাপতি করে দেবে। যুধিষ্ঠির কথা দিয়েছে ও রাজা হলে ক-ক-ক-কলিঙ্গ আমার। দুটোই লোভনীয় প্রস্তাব, তাই দুটোই গ্রহণ করেছি।

[ভীমের থাপ্পড় খেয়ে দুর্যোধন আর যুধিষ্ঠির দুদিকে ছিটকে পড়ল। ভীম হাত ঝাড়তে ঝাড়তে দ্রোণের কাছে এসে দাঁড়ায়।]

ভীম: এই মারামারি আর রোজ রোজ ভা-ভা-ভাল্লাগে না। আচ্ছা আমরা অস্ত্রচর্চাফর্চা ছেড়ে কিছুদিন অন্য কিছু করতে পারি না?

দ্রোণাচার্য: যেমন?

ভীম: যেমন ললিত কলা-টলা? ক-ক-কবিতা টবিতা। না–না–নাটক-টাটক। গা-গা-গান-টান। একটা সাহিত্য পত্রিকা-টত্রিকা—

দ্রোণাচার্য: পাগ্‌লে গেলি নাকি? তোরা ক্ষত্রিয়। তোর বাপ-পিতেমো কস্মিনকালে ললিত বা কলার ধার ধারেনি। অবশ্য ললিত ঋষিকে একবার ভীষ্ম কলা খাইয়েছিলেন। কিন্তু তাও তো ঋষির ইচ্ছের বিরুদ্ধে। ব্যস্‌ এই পর্যন্ত।

ভীম: গুরুমশাই আমার ইচ্ছে করে বড় হয়ে ম-ম-ম-মস্ত কবি হব।

দ্রোণাচার্য: আরে রাম রাম! তার চেয়ে বল গোবরের মস্ত মস্ত ঘুঁটে দেব। নির্বোধ!

ভীম: (সুর করে)

এক ছিল পাণ্ডব নাম তার ভীম
ব্যথাতুর ছিল তার মন অপরিসীম
প্রভাতে কোকিল পারা কাকলি যে গায়
বিকালে কি সে’ই হাতে গদা নিতে চায়?
অবশেষে অস্ত্র ফেলি কহে—দূর ছাই—

[এই না বলে ভীম অস্ত্র ফেলে দিতেই যুধিষ্ঠির আর দুর্যোধন মিলে তাকে মাটিতে ফেলে মহোল্লাসে পিটতে থাকে।]

দুর্যোধন:যুধিষ্ঠির: (একসঙ্গে)
—তখন সকলে তাকে পিটে ধাঁই ধাঁই।

ভীম: গুরুমশাই মরলাম।

দ্রোণাচার্য: মরো তুমি অপদার্থ শুয়ার!

ভীম: ছাড়, ছাড় আমাকে। আমি বলে দেবো তোরা গ-গ-গ-গরু খেয়েছিস।

[যুধিষ্ঠির আর দুর্যোধন ভড়কে গিয়ে থেমে যায়।]

দ্রোণাচার্য: কী? কী বললি? কে গরু খায়?

ভীম: (ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে) এই ধর্মপুত্তুরকেই জিগ্যেস করুন না?

দ্রোণাচার্য: যুধিষ্ঠির, এটা কি সত্যি?

যুধিষ্ঠির: আজ্ঞে ওগুলো গরু নয়, পতিত গোব্যাঘ্র।

দ্রোণাচার্য: পতিত গোব্যাঘ্র? কি আবোল-তাবোল বকছিস হতভাগা? ঠিক করে বল!

যুধিষ্ঠির: আজ্ঞে গরুকে যদি গরুর মাংস আর ধেনোমেদ খাইয়ে বড় করা যায় তবে সে আর ধর্মত: গরু থাকে না। পতিত হয়ে গোবাঘ হয়ে যায়। মনুর এই মত। পরাশর বলেন গোবাঘের সন্তানও পতিত। তাদের খেলে দোষ হয় না, বল ও বীর্য বাড়ে। তাই শকুনি কাবুল থেকে ছোট ছোট গোবাঘ তৈরি করে আনান ও রাজপাচক তা আকছার রান্না করে দেয়। আমরা সবাই খাই, শুধু বিদুর বাদে। বিদুর ঝোল দিয়ে রুটি খান।

দ্রোণাচার্য: ছি ছি ছি। ওয়াক্‌ ওয়াক্‌।

যুধিষ্ঠির: মহর্ষি ব্যাস তাঁর নতুন গ্রন্থের নিবন্ধে লিখেছেন--

মানুষ যদি হতে চাও
গরু শুয়োর দুটোই খাও
তবে যদি হতে চাও রাজা
খাও খর্জুর আর ঘর্মুরি ভাজা

দ্রোণাচার্য: খর্জুর তো বুঝলাম কিন্তু ঘর্মুরি আবার কী?

যুধিষ্ঠির: খুবই দুষ্প্রাপ্য ও রহস্যময় খাদ্য। ব্যাসের নতুন আবিষ্কার। রাজা হওয়ার অব্যর্থ ওষুধ। তীব্র আসক্তিকর। নিত্য সেবনে সত্ত্ব আর তমোগুণের বিনাশ অবধারিত, শুধু রজোগুণ তালগাছের মত তর তর করে বেড়ে যাবে।

[হা রে রে রে করে ব্যাস ও কৃষ্ণের সঙ্গে অর্জুনের প্রবেশ। অর্জুন ঢুকেই হুঙ্কার দিয়ে তীর চালিয়ে দিয়েছে। ফলে দ্রোণের হাতে পাতার তৈরি বৃত্ত আঁকা লক্ষ্যটা ফেঁসে গেছে।]

দ্রোণাচার্য: এটা কি করলি রাস্কেল! কে তোর হাতে তীর ধনুক দিয়েছে? কোন গর্দভ?

ব্যাসদেব: শান্ত হন দ্রোণাচার্য। সে গর্দভ হলাম আমি। ওটা ফেঁসে গেছে বলে দু:খ করবেন না। আপনার জন্য কী দুর্দান্ত জিনিস এনেছি দেখুন।

[দ্রোণাচার্যকে মাটির পাখি প্রদান]

দ্রোণাচার্য: (খেলনা হাতে নিয়ে) কে? ব্যাসদেব? ভালো ভালো। স্বাগতম! এটা কী? মানুষের বাচ্চা মনে হয়? আপনার নতুন নাতি হল?

ব্যাসদেব: মানুষের শাবক নয়, পক্ষী। তাও মাটির। আপনার আশ্রমের শাখায় ঝুলবে। যাও বৎস সুযোধন, এটা ওইখানে ঝুলিয়ে দিয়ে এস তো।

[পাখি হাতে দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের প্রস্থান]

দ্রোণাচার্য: মাটির পাখি গাছ থেকে ঝুলবে? শেয়াল ধরার ফাঁদ বুঝি?

ব্যাসদেব: না, আপনার তীর ধনুকের প্রতিযোগিতার লক্ষ্য। ওই পাখির চোখে তীর লাগাতে পারলে ফার্স্ট প্রাইজ।

দ্রোণাচার্য: ও, এই কথা। তা তো ভালোই। তবে এই যে অর্জুনের হাতে ধনুক, আমার মন বলছে এর ফল ভালো হবে না। ভীম, যুধিষ্ঠির, সুযোধন—শুধু এরাই যদি প্রতিযোগিতায় অংশ নিত তাহলে ভালো হত। চোখে না পারলেও, পাখির পায়ে কি পাখনায় হয়ত লাগিয়ে দিত।

ভীম: গুরুদেব আপনি বলেন তো পু-পু-পু-পুরা গাছই উখাড় দুঙ্গা।

দ্রোণাচার্য: ভীম একবার রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। প্রথম রাক্ষসটাকে লক্ষ করে অনেকগুলো তীর সে মারলে। একটাও লাগল না। তখন রেগে গিয়ে সে রাক্ষসটাকে গাঁট্টা মেরে মেরে বধ করলে। তাই না দেখে বাকি রাক্ষসগুলো কাঁপতে কাঁপতে ভীমের লক্ষভ্রষ্ট তীরগুলো মাটি থেকে তুলে নিজেদের বুকে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে আত্মহত্যা করলে।

ভীম: একটা তীরও নষ্ট হয়নি। শুনেছেন এমন?

কৃষ্ণ: সাধু সাধু। সেই জন্যই ভীমের ধনুক সবচেয়ে নতুন থাকে। লোকে বলে ওটা নাকি শুধু পিঠ চুলকোবার কাজে লাগে। যা হোক, এই তো সুযোধনরা ফিরেছে। দ্রোণাচার্যের অনুমতি পেলে প্রতিযোগিতার আয়োজন করি।

[দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের প্রত্যাবর্তন]

দ্রোণাচার্য: স্বচ্ছন্দে, বৎস, স্বচ্ছন্দে।

কৃষ্ণ: (মাটিতে রেখা টেনে) এই রেখার এদিক থেকে প্রতিযোগিরা তীর ছুঁড়বে। বয়:ক্রম অনুসারে, প্রথমে যুধিষ্ঠির, তারপর সুযোধন, ভীম ও শেষে অর্জুন। পাখির চোখে লাগলে পাবে প্রথম পুরস্কার—এক কুম্ভ ঘৃত। মাথায় লাগলে দ্বিতীয় পুরস্কার—এক দ্রোণি দধি। গায়ে বা পুচ্ছে লাগলে তৃতীয় পুরস্কার—এক ভাঁড় ননী। অন্তত গাছের ডালে যদি লাগে তো সান্ত্বনা পুরস্কার—এক ঘটি লস্যি।

যুধিষ্ঠির: (দুর্যোধনকে জনান্তিকে) ব্যাটা রাজা হলে কী হবে, মনটা পড়ে আছে গোয়ালঘরে। (প্রকাশ্যে) ওহে গোপাল, পুরস্কার থাক। গুরুজনদের আর্শিবাদ পেলেই আমরা খুশি। চল আরম্ভ করা যাক।

কৃষ্ণ: উত্তম প্রস্তাব। সবাই একটু সরে দাঁড়ান। প্রতিযোগিরা এক এক করে এগিয়ে আসুক।

যুধিষ্ঠির: (তীর ধনুক তাক করে) লাগ-লাগ-লাগ-লাগ-লাগ-লাগ-লাগ-লাগ—ছু-উ-উ-উ-উ:

[তীর নিক্ষেপ। সবাই ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টায়। দূর থেকে অকস্মাৎ সরু গলায় আর্তনাদ। সবাই অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।]

দ্রোণাচার্য: (উল্লসিত হয়ে) লেগেছে, লেগেছে। জোর লেগেছে কোথাও। ধন্য আমার শিষ্য! রাজা হও।

ভীম: এই রে! এটা তো অশ্বথামার গলা! গুরুদেব আবার ভুল করে তাকে পে-পে-পে-পেঁপে গাছে বেঁধে রেখেছিলেন নির্ঘাৎ।

দ্রোণাচার্য: অ্যাঁ? অশ্বথামা? হা, হতোস্মি। থা-মা-আ-আ--[দ্রুত প্রস্থান।]

কৃষ্ণ: হুম্‌। তাহলে তৃতীয় পুরস্কার বোধহয় দেওয়া যায়। ব্যাসদেব কী বলেন?

ব্যাসদেব: মনে হচ্ছে পুচ্ছেই লেগেছে। ওই তো দ্রোণাচার্য হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তুমি ঠিকই বলেছ বাসুদেব। তৃতীয় পুরস্কারই বিধেয়। নাও সুযোধন, দেখি তোমার দৌড় কতদূর।

দুর্যোধন: (এগিয়ে এসে) হা-আ-আ-আ-আ-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই [তীর নিক্ষেপ]

কৃষ্ণ: (উঁচু হয়ে) আমি যা দেখছি, আপনিও কি তা-ই দেখছেন ব্যাসদেব?

ব্যাসদেব: আমি যেন দেখছি গাছের চতুর্থ ডাল থেকে একটা ধেড়ে বানর—হ্যাঁ লালমুখো কপীশ, কোন সন্দেহ নেই—তীরটা ধরে মট করে ভেঙে ফেললো। এ: হে, এবার অশ্লীল ভঙ্গি করে কী সব বলছে। বড়ই ভয়াবহ। না: সুযোধন, তুমি ওই বনের দিকে কোনোদিন একা যেও না।

দুর্যোধন: (তোতলাতে তোতলাতে) অ:, হুম্‌, হ্যাঁ, উ:, ও:, ও:, হো:—[আস্তে আস্তে পিছনে সরে যায় ]

কৃষ্ণ: ভীমসেন! এবার তোমার পালা।

[ভীম নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে ও চোখ টেপে কিন্তু ধনুকটা উল্টো ধরার ফলে তীর নির্গত হয় না। অর্জুন হা হা করে হাসতে থাকে। রেগেমেগে ভীম তীরটা বর্শার মত ছুঁড়ে দেয়।]

কৃষ্ণ: তীরটা যাচ্ছে, যাচ্ছে, যাচ্ছে। একটা গাছ পড়েছে, দুটো, তিনটে, পাঁচটা, ও বাবা এ যে সব মুড়িয়ে দিয়ে বন ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত যে গাছটাতে পাখি আছে তার ধার কাছ দিয়েও যায়নি। না: এর জন্য কোন পুরস্কার কি দেওয়া যায়?

ব্যাসদেব: মাথাটা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে দিতে হয়। ওরে আহাম্মক, তুই আমার আশ্রমের অর্ধেকটা যে উড়িয়ে দিলি!

ভীম: সেইজন্যই তো আমি বলেছিলাম আ-আসুন দুটো কবিতা লিখি, একটু লাচগান করি।

এই হাত বধেছে রাক্ষস গাঁট্টা মেরে
আমি কি এ হাতে কোন অস্ত্র ধরতে পারি?

কৃষ্ণ: থাক থাক। অনেক কাব্যি হয়েছে। তোমাকে ডিস্কোয়ালিফাই করা হল। কোন পুরস্কার নেই। মুখে কুলুপ দিয়ে থাকো। এবার শেষ ও শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর, মধ্যম পাণ্ডব অর্জুন। (ব্যাস ও কৃষ্ণের হাততালি) এগিয়ে এস বাবা।

অর্জুন: ডান হাতে চালাব না বাঁ হাতে?

ব্যাসদেব: বেড়ে বলেছ সব্যসাচী। তোমার তো দুই হাতই চলে। তা দক্ষিণেই চালাও। প্রতিযোগিতা একটা মঙ্গলদায়ক ব্যাপার। আচ্ছা, ভালো করে চেয়ে বলো তো কী দেখছো? দেখতে পাচ্ছো কি বনের মধ্যে একটা গাছ?

অর্জুন: (নিষ্পলক ভাবে) না:। আমার দৃষ্টি শুধু লক্ষ্যের উপর থাকে। বন ফন আমি দেখছি না।

ব্যাসদেব: বা: বা:। তাহলে কী দেখছো? গাছের উপর লাল বানর, থুড়ি পাখি?

অর্জুন: কোথায় পাখি? আমি শুধু দেখছি ফার্স্ট প্রাইজ।

ব্যাসদেব: বিলক্ষণ বিলক্ষণ। একেবারে ধুরন্ধর ধনুর্ধরের লক্ষণ। পাখিও দেখছো না। তাহলে কী দেখছো পার্থ?

অর্জুন: আমি দেখছি শুধু একটা চোখ। পলক পড়ছে না। হাসছে বা কাঁদছে না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলছে ফার্স্ট প্রাইজ!

ব্যাসদেব: মারো অর্জুন মারো!

অর্জুন: হা-রে-রে-রে-রে-রে। [চরকির মত পাক দিয়ে বিকট লম্ফ ও তীর নিক্ষেপ।]

ব্যাসদেব: (লাফিয়ে উঠে) লেগেছে, লেগেছে! লক্ষভেদ!

কৃষ্ণ: ঠিক দেখেছেন? একেবারে লক্ষভেদ?

ব্যাসদেব: আলবাৎ।

যুধিষ্ঠির: আমি-ও দেখেছি। ঠিক চোখেই লেগেছে।

কৃষ্ণ: শাবাশ বীর! বলো জয়, অর্জুনের জয়!

অর্জুন: (নিজেই লাফিয়ে) জয় অর্জুনের জয়!

যুধিষ্ঠির: তবে একটা লোচা আছে।

কৃষ্ণ: লোচা?

যুধিষ্ঠির: চো-চো-চোখটা—

ভীম: হ-হ-হল—

ব্যাসদেব: (কাঁদো কাঁদো হয়ে) দ্রোণাচার্যের।

[ভগ্ন শরীর ও হৃদয় বহন করে দ্রোণাচার্যের প্রবেশ। মাথায় রুধির, চোখে তীর। খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ।]

দ্রোণাচার্য: কেন? কেন? কেন এই বৃথা রক্তপাত?

কৃষ্ণ: ভাগ্য!

ব্যাসদেব: ইতিহাস!

অর্জুন: আমি যে ধনুর্ধর হব!

ব্যাসদেব: (সামলে নিয়ে) ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে অর্জুনের এই সুমহান কীর্তি! একমাত্র সে-ই তীরটা লাগাতে পেরেছে চোখে।

অর্জুন: (রোমাঞ্চিত) আমার প্রথম মহান কীর্তি!

ব্যাসদেব: দ্রোণাচার্য, আপনি দু:খ করবেন না। আমরা তো নিমিত্ত মাত্র। অর্জুনের অক্ষয় কীর্তির কাহিনী কেউ আটকাতে পারবে না। আমার হাতে লেখা হবে সেই অমর গ্রন্থ। অর্জুনের যশের জন্য ছোটখাটো দু-একটা ক্ষয়ক্ষতি আমরা নীরবে সয়ে নিতে পারব না? নইলে ধিক্‌ আমাদের ক্ষত্রিয় ধর্ম।

যুধিষ্ঠির: নিশ্চয়ই পারব। ধৃতরাষ্ট্র আজ পকেট কাটা ছেড়ে সিঁধকাটি ধরেছেন। ভীষ্ম রাতেও বর্ম পরে ঘুমোতে যাচ্ছেন। নকুলের দুটো কানেই আর লতি নেই।

দ্রোণাচার্য: আমার তো তবু একটা চোখ এখনও আছে।

কৃষ্ণ: অহো কী মহান এই বংশ! কী মহৎ এই গুরু! ধন্য ধন্য। আপনারা সবাই ধন্য!

অর্জুন: আমার কী আনন্দ হচ্ছে! ইচ্ছে হচ্ছে নাচি।

অর্জুন আমি অর্জুন
ধুরন্ধর ধনুর্ধর যে করেই হবো
কত ঋষি মেরেছি, কত তীর ছেড়েছি
কত -
সে সব যাদের গায়ে করেছে আঘাত
তাদের সবার কাছে করি মাথা নত
ধন্যবা-দ ধন্যবা-দ ধন্যবা-দ

[গোল করে ঘুরে সবার নাচ]

অর্জুন তুমি অর্জুন
ধুরন্ধর ধনুর্ধর যে করেই হবে
কত ঋষি মেরেছো, কত তীর ছেড়েছো
কত -
সে সব যাদের গায়ে করেছে আঘাত
তাদের সবার কাছে কর মাথা নত
ধন্যবা-দ ধন্যবা-দ ধন্যবা-দ

চতুর্থ দৃশ্য

[ব্যাসের আশ্রম। ব্যাস ও অর্জুন ঠোঙা থেকে ভাজা চানাচুরের মত কিছু খাচ্ছেন।]

অর্জুন: তারপর?

ব্যাসদেব: তারপর আর কী? গণেশকে গাঁজা ধরিয়ে দিলুম। সন্ধে হতে না হতেই ব্যাটা ঘুর ঘুর করতে করতে এসে পড়ে। দেখতে দেখতে গ্যাঁটের পয়সা তো সব ফুরিয়ে গেল। তখন সে কেঁদে পড়ে বলল—পয়সা তো ফুরোলো, এবার নেশা করব কিসে? আমি বললুম—খেটে খাও।

অর্জুন: তাই সে এখন তোমার পুঁথি নকল করে?

ব্যাসদেব: দিস্তে দিস্তে। পুরো পৃথিবী থেকে বায়না আসে তো। চীনে যাচ্ছে চণ্ডুপুরাণ তো রুশবর্তে সাম্যবেদ। যেখানে যেটা চলে। গত তিনবছরে আমার সম্পাদিত চতুর্বেদ আর পুরাণগুলোর কটা সংস্করণ বেরিয়েছে বলো তো? ষোলটা। শীগ্‌গিরই খণ্ডে খণ্ডে রচনাবলী বেরোবে, তার জন্য গ্রাহক নিচ্ছি। তবে গণেশ ব্যাটা চালাক আছে।

অর্জুন: শুঁড় দিয়ে লেখে বুঝি?

ব্যাসদেব: চার হাতে চারটে খাগের কলম আর সুঁড়ে দোয়াত। কিন্তু আসল চালাকিটা অন্য জায়গায়। তাকে সারাক্ষণ ধরে ছোট ছোট গাঁজার গুলি পাঠিয়ে যেতে হয়। গুলি ফুরোলে গুলও ফুরোবে, তার সাফ কথা।

[কৃষ্ণ, ভীম ও যুধিষ্ঠিরের প্রবেশ। ]

ব্যাসদেব: এস এস বাবাজীবনরা। (গলা নামিয়ে) সুযোধনকে আনোনি তো?

ভীম: না, তাকে ধৌম্য কোলে বসিয়ে গ-গা-গসাগু আর ল-ল-লসাগুর অঙ্ক করাচ্ছেন। সে ব্যাটা গণিতে তর্কালঙ্কার হতে চায় কিনা।

ব্যাসদেব: আর তোমরা?

যুধিষ্ঠির: আমরা শটকার্ট নিয়েছি। সকাল সকাল কচুরির সঙ্গে লঙ্কার তড়কা খেয়ে পেটটাকে একটু ঝাঁকিয়ে নিয়েই কেটে পড়েছি।

ব্যাসদেব: সাধু, সাধু। শোনো বাবাজীবনরা—কেন তোমাদের ডেকেছি তাহলে বলি। গান্ধারী তার পুত্রদের আমার কাছ ঘেঁষতে দেয় না। নিজেও আসে না। আমার গায়ে নাকি গন্ধ। সুযোধনকে অনেক চেষ্টা করেও চণ্ডু, গাঁজা কিছুই ধরাতে পারিনি। ছেলেটা এমন অপদার্থ হয়েছে—সে দুধ ছাড়া আর কোনো তরল খায় না। ওই পরিবার থেকে আমার কোনো অর্থাগম নেই। এই অবহেলার মূল্য ওদের দিতে হবে।

কৃষ্ণ: শুনেছি আপনি মহাকাব্যে ওদের নাম পর্যন্ত পাল্টে দিচ্ছেন?

ব্যাসদেব: হ্যাঁ, তা করছি কিছু কিছু। ধৃতরাষ্ট্র নামটা পালটে চোট্টারাজ করেছিলুম। কিন্তু অর্জুন তাতে বাধা দিচ্ছে। যা হোক, মহাভারতের জন্যে এতদিন যেমন তোমরা মুক্তহস্তে ঢেলেছো, ভবিষ্যতেও যেন ঢালতে থেকো। এ-গ্রন্থ প্রকাশ হলে দশদিকে নাম হবে তোমাদেরই। ভারতবর্ষ জুড়ে জয়-জয়কার হবে।

সবাই: ধন্য ধন্য।

ব্যাসদেব: অর্জুন! তোমার খ্যাতি হবে অদ্বিতীয় ধানুকী বলে। তুমি মাঝে মাঝে গাণ্ডীবে টঙ্কার দিতে থেকো, কিন্তু দেখো আমার আশ্রমের আশেপাশে তীর চালিয়ো না।

অর্জুন: তথাস্তু। ওই কর্ণ ব্যাটা সেদিন আমার হাত থেকে চমচম কেড়ে নিয়েছিল। ওটাকে সমুচিত শিক্ষা দিতে হবে।

ব্যাসদেব: কোনো চিন্তা নেই। ভীম, তুমি হবে সবচেয়ে পরাক্রমশালী, বহু বহু রাক্ষস ক্ষয় হবে তোমার হাতে। শুধু কবিতা লিখলে ছদ্মনামে প্রকাশ কোরো। যুধিষ্ঠির, তোমাকে বানিয়ে দিচ্ছি ধর্মের অবতার। সত্যি কথা বলতে যদি অসুবিধে থাকে তো মনে মনে বোলো। তাতেও সমান পুণ্য। আর বাসুদেব—তোমার সাথে তো আমার বহুদিনের সম্পর্ক—হেঁ হেঁ হেঁ—তোমার কথা আর কী বলব। তুমিই সব।

কৃষ্ণ: তাহলে সবাই মিলে একটা জলসা হয়ে যাক। ওরে কে কোথায় আছিস? একটু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন কর বাবা। ভীম তুই একটা ভালো দেখে গান ধর না?

ভীম: কোনটা গাইব—"ওই নদী কুলকুল, প্রাণ চুলবুল", না "সাঁইয়া, সাঁইয়া"? নাকি "ঝেড়ে দে ঝেড়ে তোর গ্যাঁট"— এটা নতুন রা-রা-রাগামিশ্রিত গান।

কৃষ্ণ: "ঝেড়ে দে ঝেড়ে দে"-টাই ঝাড়। (অর্জুনের খাওয়া লক্ষ করে) অ্যাই তোরা কী খাচ্ছিস রে? দে দে আমাদেরও চানাচুর দে।

ব্যাসদেব: চানাচুর নয়, ঘর্মুরি ভাজা।

কৃষ্ণ: এই সেই ঘর্মুরি? এ তো অনেকদিন থেকে খুঁজছি। কোথায় পেলেন? কোথায় পেলেন?

ব্যাসদেব: আমারই আবিষ্কার। খুব দুর্লভ বস্তু। গ্রীষ্মকালে কয়েকদিনের জন্য ওঠে, চম্বলের দস্যুরা গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে উপাদানটা সংগ্রহ করে আনে। তবে হয়।

কৃষ্ণ: (খেতে খেতে) বাহ, বেড়ে খেতে তো! এই খেলে রাজা হয়? আচ্ছা কী দিয়ে তৈরি জিনিসটা?

ব্যাসদেব: ঘর্মুরি মানে ঘর্মরি। অর্থাৎ ঘামাচি। গরমের চোটে চাষাভুষো আর ভীলদের গায়ে যে বড় বড় ঘামাচি হয় সেগুলো তারা খুঁটে খুঁটে জমিয়ে রাখে। তারপর নুন, লঙ্কা, আদাবাটা আর খর্জুরের রস দিয়ে ভাজা করতে হয়। একটি অতুলনীয় আবিষ্কার।

সবাই: অ্যাঁ? অ্যাক্ থু! ঘামাচি !!

ব্যাসদেব: বৎস না-খেতে চাইলে নষ্ট কোরো না, এ বিষম দুষ্প্রাপ্য বস্তু।

কৃষ্ণ: কিন্তু তাই বলে ঘামাচি?

ব্যাসদেব: তবে এর গুণের কথাটাও শোনো। এক অপ্সরা আমায় সন্ধেবেলা সিদ্ধির সঙ্গে মিশিয়ে এই ঘর্মুরি চূর্ণ খাইয়েছিল। সে কি অভিজ্ঞতা! মনে হল জগৎটা ওলটপালট হয়ে গেছে। মিথ্যের মায়াজাল কেটে বেরিয়ে এসেছে সত্যের সূর্য। এতদিন যা দেখছি, যা শুনেছি, বুঝলুম সব ভুল। চতুর্বেদ স্রেফ গাঁজা, বেদান্তটা অর্ধেক ধাপ্পা। দেব, দানব, মানব, অপ্সরা সবার মুখোশ খুলে বেরিয়ে পড়েছে আসল রূপ। আমার চোখ থেকে মোহের ঠুলি খুলে গেল। বুঝলুম এতদিন ধরে আমরা যা জেনেছি আর লিখেছি তার পুরোটাই হয় কল্পনা, নয় অন্ধবিশ্বাস। ইতিহাসের বিন্দুবিসর্গও নেই তার মধ্যে। বাস্তবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বুঝলুম এই আশ্চর্য চূর্ণের মধ্যে রয়েছে বাস্তবের ঘাম, রক্ত আর পুঁজ—আমাদের কীর্তির যা প্রকৃত উপাদান। এই চূর্ণ খেয়ে আমি একটা উচ্চাঙ্গের পুরাণ লিখছি যাতে শুধু আমাদের সত্যিকারের ইতিহাস লেখা থাকবে। এই যেমন ধরো এখন যা যা ঘটছে আমাদের চারদিকে ঠিক তাই তাই। তার নাম হবে ঘর্মুরি পুরাণ। সে পুরাণ যারা পড়বে এবং ঘর্মুরিভাজা যারা খাবে তাদের দেব দ্বিজে ভক্তির প্রয়োজন হবে না। অন্ধবিশ্বাস দূর হবে তাদের। তারা কোনোদিন কারো কাছে ঠকবে না। বরং তারাই সকলকে ঠকাবে।

(সবাইকে দেখে হাস্য করে) তারাই হবে রাজা। এখন দেখা যাক তোমাদের মধ্যে কে কে রাজা হতে ইচ্ছুক।

[সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একসঙ্গে ঘর্মুরি ভাজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।]

সবাই: আমি, আমি।

[নেপথ্যে গান ]

ঝেড়ে দে, ঝেড়ে দে তোর গ্যাঁট
দে রে তা রে, দির দির দা রে, না রে দে রে, দে রে দুন


[সমাপ্ত]



(পরবাস-৬১, ডিসেম্বর ২০১৫)