Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines



পরবাসে ভবভূতি ভট্টাচার্যের লেখা
বই
Parabaas Bookstore



ISSN 1563-8685




বাপ্পানের বন্ধু

শ্চিমের পড়ন্ত সূর্যালোক এসে পড়েছে ছেলেটির মুখে। চেয়ারের পিঠে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ও। পশ্চিমসাগরের হু হু হাওয়ায় এলোমেলো ওর লম্বা লম্বা চুল।

ঘরের মধ্যে টিভি চালিয়ে কখন দু’চোখের পাতা লেগে গিয়েছিল মেরিরও। হঠাৎ তন্দ্রা ভেঙে দৌড়ে এলো ব্যালকনিতে, ছেলেটির পাশে। আহা, এতো হাওয়ায় ঠান্ডা লেগে যাবে যে বেচারির। হুইল চেয়ারখানি ঘুরিয়ে তাকে ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকিয়ে আনার আগে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মেরি ওর মুখের দিকে। কী মায়া এ’ মুখে, কী মিষ্টি!

ঘরে ঢুকতে-না-ঢুকতেই চটকা ভেঙে গেছে বাপ্পানেরও। ‘উঁ উঁ উঁ উঁ’ করে কীসের যেন প্রতিবাদ জানায়?

‘ক্যা হুয়া?’

‘উঁ উঁ উঁ উঁ,’ কিছুতে অপছন্দ হলে তবেই এমন করে সে। কী হল? আবার ব্যালকনিতে যেতে চাইছ? ঠান্ডা লেগে যাবে যে।

‘উঁ উঁ উঁ উঁ!’

ব্যালকনির দিকে ফিরে তাকিয়ে এবার বুঝতে পারে মেরি। কোল থেকে তার ডগি-টা মাটিতে পড়ে গেছে ওখানে। দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে এনে কোলে বসিয়ে দিতেই মহা আনন্দে ‘জ জ জ জ’ করে উঠলো ছেলেটা। মজা লাগে মেরির। ঘরে দেশি-বিদেশি খেলনার অভাব তো নেই বাপ্পানের। তবু ঐ পুরনো ছেঁড়াখোঁড়া সফট্-টয়টির প্রতি কী যে অমোঘ আকর্ষণ তার! সারাদিন বুকে জড়িয়ে রাখবে, আর মাঝে মাঝেই আদর করে তার নাকে নাক ঘষে নালে নাল করে দেবে।

এর লেজটি ঝালরের মত পুষ্ট। নামটা ঢোল!


***


এখন আটটা বাজে। মুম্বাই মহানগরীতে সন্ধের ঘোর লাগেনি এখনও। মাসটা জুন। বর্ষা শীগগিরই এসে পড়বে, এমন অনুমান। সমুদ্রতীরের এই সাতাশ তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে অবশ্য শহরটার কিছু হদিশ পাওয়া যায় না। এখানে হু হু হাওয়াই সত্যি আর সত্যি দূর ঐ সমুদ্রের অসীম জলরাশি।

এবার উসখুস করতে শুরু করেছে বাপ্পান। ঘড়িটা আছে ওর মাথার মধ্যে। আজ বেরোনোর সময় মায়ের আঁচল মুঠি করে জোরে জোরে ঘাড় নাড়িয়ে কিছু বলেছিল সে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা... যেমন রোজই ‘বলে’। অতসীও ছেলের কপালে চুমো খেয়ে ঘাড় নেড়ে গেছে। তাই সূয্যি ডুবুডুবু হতে না হতেই ছটফটানি শুরু হয়ে গেছে বাপ্পানের। অদ্ভুত মায়া পড়ে গেছে মেরির এই শিশুটির ওপর। আজন্ম, আজ ছ’ ছ’টা বচ্ছর চব্বিশ ইন টু সাত ইন টু তিনশ’ পঁয়ষট্টি তার এই মেরিই ভরোসা। মেরিরও যে যাবার আর কোনো জায়গা নেই। তাদের কোট্টায়ামের বাড়ি তো বেহাত হয়ে গেছে কবেই।


ডিং ডং ডোরবেল বেজে উঠতেই ‘লম্ফঝম্ফ’ শুরু করে দিলো বাপ্পান, চেয়ারে বসে বসেই। মালকিন কিন্তু আজ ফ্ল্যাটে ঢুকে ছেলের চুলে একটু ইলিবিলি কেটে দিয়েই সটান নিজের কামরায় ঢুকে ধপাস করে বেডে গা এলিয়ে দিলেন। ক্রক্ করে ডোর লকের শব্দ পাওয়া গেল।

প্রমাদ গণল মেরি। আজ নিশ্চয়ই মুড অফ ম্যাডামের। আর সেটা বুঝতে ছেলেরও দু’মিনিটের বেশি লাগে না। আর এমন রাতগুলোতে ভয়ানক রেস্টলেস হয়ে পড়ে ছেলেটা। সারাদিন বেচারা একলা থাকে সন্ধে-রাতে মাকে একটু কাছে পাবার আশায় উন্মুখ হয়ে। অতসীরও মুড যেদিন ভালো থাকে সন্ধেয় বাড়ি ফিরে ছেলেকে নিজের হাতে গরাসে গরাসে ভাত মেখে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে দিতে গল্প শোনায়---গোহ-বাপ্পাদিত্যের গল্প, পাগলা দাশু, টংলিং! আর ছেলেও একাগ্রমনে শুনতে থাকে আর ‘উঁ উঁ মঁ মঁ’ করে কত কথাই না শোনায় মাকে। গল্পগুলো ভালো যে তার খুউব-ই লাগে, তা আর বলে দিতে হয়না---উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ছেলেটার মুখ। সে-সব দিনে ঘুমন্ত বাপ্পানের সুডৌল মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘোর লাগে মেরির। বোধহয় আর-জন্মে তার আপন ভাই ছিল ও।

আধঘন্টা পরে বেডরুমের দরোজা খুলে বেরিয়ে যখন এলেন ম্যাডাম, না, মুখে ঝড়ের আভাস কাটেনি তখনও। কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে কার যেন ফোন এসে গেল; উনিও প্রথমে মৃদু পরে তীব্রস্বরে কার সঙ্গে কথা বলে যেতে লাগলেন। না, বাঙলাভাষাটা বোঝে না মেরি। তবে এটা ওর কানে এসেছে, ‘বিপুল’ বলে কোনো এক লোকের সঙ্গে কথা বললেই ম্যাডাম এমন উত্তেজিত হয়ে পড়েন! ওদিকে ছেলেটা গোঁজ হয়ে বসে আছে, কার্টুন চ্যানেলে মন নেই। মায়ের ব্যাড মুড বুঝতে অসুবিধে হয় না ছ’বছরের ছেলেটিরও। এরপর কোনোমতে ছেলেকে দু’গ্রাস খাইয়ে পাশে নিয়ে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই হয় না সেই রাতে। মালকিনের নিজের জন্য কনিয়াক ঢালা দেখে আরও ভীত হয় মেরি। অসুখটা তাহলে আজ বড়ই গভীর!


***


আর, এই রাতেই প্রথম অভিজ্ঞতাটা হলো মেরির!

মাঝরাতে তার ঘুমটা ভেঙে গেল হঠাৎ।

প্রথমটায় ঠাহর হয়নি মৃদু নীল আলো-আঁধারিতে। তারপর একটু চোখ কচলে দেখল। দেখল, কিন্তু বুঝলো না। চোখ কচলে আবার দেখলো তার ড্রইং-কাম-ডাইনিং-রুমের বেডে শুয়ে শুয়ে।

দুধসাদা নাইট স্যুট পরা ছেলেটা মায়ের বিছানার পাশ থেকে উঠে বেডরুম থেকে হেঁটে হেঁটে বেরিয়ে এসেছে। হ্যাঁ, হেঁটে হেঁটে!! সোজা বেরিয়ে এসে বাথরুমের দরজায় ঠোক্কর খেয়েছে একবার। সেই শব্দেই পাতলা ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মেরির। এবার মোড় ঘুরে তারই দিকে এগিয়ে আসছে বাপ্পান। এগিয়ে আসছে, এগিয়ে আসছে। ভয়ে সিঁটিয়ে মেরি। কেন? কিসের ভয়? যে ছেলেটাকে আজ ছ’ বছর ধরে উদয়াস্ত প্রতি পলে পলে দেখছে, যার প্রতি তার ভ্রাতৃবৎ স্নেহ, তাকে ভয় কিসের? মেরির বেড পেরিয়ে কী বিড়বিড় করতে করতে ব্যালকনির দিকে হেঁটে চলে গেল ছেলেটি। চোখ বন্ধ। বুকে জড়িয়ে ধরা সেই সফট্ টয় ডগিটি! ডানহাতের মুঠোয় ওটি কী?

এবার ভয় পেয়ে গেল মেরি। ঘুমের ঘোরে যদি ব্যালকনির রেলিং টপকে নিচে পড়ে যায় ছেলেটা? ধড়মড় করে উঠে, একবার ভাবলো ম্যাডামকে ডাকবে। কিন্তু সময় যে একেবারেই নেই। ব্যালকনিতে পৌঁছে গেছে বাপ্পান। পেছন পেছন দৌড়ে এসে... কী করবে এবার? নাড়িয়ে ডেকে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে ছেলেটার? এমন পরিস্থিতিতে আগে কোনোদিন পড়েনি যে!

বাপ্পান পৌঁছে গেছে রেলিং-এর কিনারে। মেরি আলতো করে তার কাঁধে হাতটা রাখলো। থমকে গেল ছেলেটি। দু’কাঁধ তার হাত দিয়ে ধরে এবার মুখটা ঘুরিয়ে দিলো ফের ঘরের দিকে। নিজে থেকেই ফের তেমনই ধীরপদক্ষেপে হেঁটে ফিরে এসে বেড রুমে ঢুকে মায়ের খাটের পাশে আটকে গেল ছেলেটি। কাঁধ ধরে বসিয়ে দিতে বসে পড়লো খাটে, শুইয়ে দিতে শুলো। ঘুমোচ্ছিলোই বরাবর। কিন্তু কী সব যেন বিড়বিড় করে জপে যাচ্ছিল ছেলেটা, এক বর্ণ তার বোঝে না মেরি, ‘শান্তকর্ম ভূজগ শয়নম্... পদ্মনাভম্ সুরেশম্...’। শুনে মনে হয় সংস্কৃত ভাষা। কোত্থেকে শিখলো বাপ্পান? শুনে ভয় লাগে। যেন তার এতো বছরের চেনা ভাইটি নয়, যেন অন্য কেউ!

অতসী তখন অতল ঘুমে! তরল-প্রভাব!

মেরির আর সে রাতে ঘুম আসেনি।

তার না-ঘুমের ছটফটানির আরেকটা কারণ এক অসহ্য বুনো গন্ধ, যেটা আজ বাপ্পানের হাঁটার সময় থেকে পেতে শুরু করেছিল। কোথায় যেন পেয়েছে, কোথায় যেন পেয়েছে এমন বোটকা গন্ধ? হঠাৎ মনে এলো, গত সপ্তাহে তারা জু-তে বেড়াতে গিয়ে এমন গন্ধ পেয়েছিল বটে। কিন্তু সাগরতীরের এই সুউচ্চ ফ্ল্যাটে বাঘ-সিংগীর গন্ধ আসবে কোত্থেকে? মনের মধ্যের কোনো গা-ছমছমে ভাব কাটাতে ঈশাপ্রভুর নাম স্মরণ করতে করতে ঘুমানোর চেষ্টা করল মেরি। ক্রমে ক্রমে অবশ্য কমে আসতে লাগলো গন্ধটা...

হঠাৎ চোখ গেল মেঝের দিকে... আহা রে, বাপ্পানের ঐ প্রিয় সফট ডগিটা পড়ে রয়েছে পায়ের কাছে। ওর হাত থেকে পড়ে গেছে বোধহয়। তুলে রাখতে হবে।

ভাবতে ভাবতে চোখটা জড়িয়ে এলো মেয়েটির।


***


না, পরের দিনে সকালে এ’ঘটনা কারোকে বলেনি মেরি আব্রাহাম। কারণ বিশ্বাস করবে না কেউ এ’কথা। মনটা যদিও তার ছটফট করছিলোই।

সপ্তাহের মাঝ। বুধবার। আটটা বেজে গেল, তবু ম্যাডাম স্টুডিওতে বেরোনোর জন্যে তৈরি হচ্ছেন না দেখে অবাক হল মেরি। আরও অবাক করে দিয়ে হঠাৎ ওনার ঘোষণা, ‘মেরি, সামান বাগারা প্যাক কর লো, আজ হম এসেলওয়ার্ল্ড চলেঙ্গে! চেয়ার ছাদ পর বাঁন্ধ লেনা, রামপ্রীত কো বোলো...’

সারাদিন ছেলের সঙ্গে নানা রাইড নিয়ে আর ওয়াটার কিংডমে দাপাদাপি করে আর হৈ হৈ করে স্বপ্নের মত কেটে গেল দিনটা। কাল রাতের ঐ ঘটনাটা স্বপ্নের মত ভুয়ো মনে হচ্ছিল মেরির। হ্যাঁ, স্লিপওয়াকের কথা তো শোনাই যায়। এ’ এক মানসিক ডিসঅর্ডার। এতো ভয় পাওয়ার কী আছে এতে?


***


এই কালো গোলাচে মসৃণ প্রস্তরখণ্ডটি কী করে এই বাড়িতে এসেছে, কারও মনে পড়ে না। কোনো আর্টপিস হিসেবে কি? না পেপার-ওয়েট? উত্তর-শহরতলির বিরারে এই ফ্ল্যাট যখন সবে সবে কেনা হয়েছে আজ থেকে বছর সাত-আট আগে, অতসী আর নারায়ণ মণ্ডলের ডিজাইনার ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের ব্যবসা যখন সবে ডানা মেলতে শুরু করেছে, তখন নারাণ তার সিংভূমি এবরিজিনাল আর্ট নিয়ে বহু কাজ বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিল। নানান ফর্মের গৃহপালিত পশু, বিশেষত, সারমেয় ছিল তার প্রিয় বিষয়, ফিদা-হুসেন সাহেবের যেমন তুরগ! আদতে গোঁড়-সম্প্রদায়ের মানুষ কিনা, আদিবাসী আর্ট ছিল নারায়ণ মণ্ডলের রক্তে। গালুডির অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলের কাছে কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুল অতি দূরের বস্তু ছিল। কোন্ ঐশ্বরিক শক্তিবলে সম্ভব তো হয়েছিল তা! সেখান থেকে অতসীর এই ক্লাসমেটের সঙ্গে মুম্বাই নগরী পাড়ি দেওয়া, ঘর বাঁধা, এক স্বপ্নসত্যি বিষয়। অনন্য প্রতিভাশালী শিল্পী ছিল নারায়ণ। আজ ছ’ বচ্ছর হলো তার আকস্মিক প্রয়াণের পরেও তার করা অনেক কাজ ভাঙিয়ে অতসী আজও খাচ্ছে। দুবাইয়ের এক ক্লায়েন্টের এ’হেন এক কাজ পছন্দ হয়েছে গত সপ্তাহেই। মুঠ্ঠিভর এ’ পাথরকুচো হয়তো সে সময়কার। সম্পূর্ণ বলের মতো গোল নয়, অনিয়মিত অবয়বের।


***


কিন্তু আজকে ঐ পাথরের প্রসঙ্গ একটু অন্যরকমে এলো। স্টুডিও থেকে ফিরে নিজের হাতব্যাগে কিছু খুঁজতে খুঁজতে অতসী এই পাথরখণ্ডটি আবিষ্কার করে তার ভেতর থেকে। অবাক হল! এ’ পাথর আমার ব্যাগে এলো কী করে? ‘মেরি, মেরি....’

উচ্চৈঃস্বরে ডাক শুনে টিভি সিরিয়াল ফেলে ড্রইংরুম থেকে ঘরে ছুটে এলো পরিচারিকা।

‘এই পেপারওয়েটটা আমার হ্যান্ডব্যাগের ভেতরে তুমি রেখেছিলে নাকি?’ অতসী এ’প্রশ্ন করতে করতেই জানতো তার উত্তরটাও। এ’কাজ মেরি কখনও করতেই পারে না।

একপাশে ঘাড় কাৎ করে ‘না’ জানায় দক্ষিণী মেয়েটি। যাহোক্, আজ মালকিনের মেজাজ শরীফ থাকায় কথা আর আগে বাড়লো না। হোম ডেলিভারিতে ফোন করে মস্ত এক আইসক্রিমের অর্ডার দিয়ে ফেললো অতসী। ‘ফেমা’-ভায়োলেশনের ঝামেলাটা অযাচিতভাবে আজ চুকে গিয়ে মনটা ফুরফুরে হয়ে রয়েছে তার।

খাটে শুয়ে শুয়ে বাপ্পান তখন মিচকে মিচকে হাসছে! এই পাথুরে ‘খেলনা’-টা তারও যে খুব প্রিয়!


***


এর পরের ঘটনাটি আরেকটু অদ্ভুত!

সেদিন দুপুরে রোজকারের মত ড্রইং রুমে মস্ত টিভিটা চালিয়ে বসে আছে মেরি। পাশে বাপ্পান তার চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছে, মা তার যথারীতে স্টুডিওতে। হঠাৎ তার ‘উঁ উঁ’ ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ছেলের চোখ মুখ লাল, লালা ঝরছে মুখ দিয়ে, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। কোনো কারণে প্রচণ্ড রেগে গেলে এমনধারা রূপ হয় ছেলের। হকচকিয়ে গেল মেরি। হঠাৎ ছেলের এতোটা উষ্মার কারণ কী? উঠে কাছে যেতে ঘাড় নাড়িয়ে বেডরুমের দিকে দেখালো ছেলেটা। চেয়ার ঠেলে ঘরে নিয়ে যেতে একটু শান্ত হল সে। সামনের দেওয়ালে টাঙানো বাপের ছবি। তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে বাপ্পান। না, বাবাকে কোনোদিন চোখে দেখেনি সে। নারায়ণের মৃত্যুর মাসখানেক পরে ছেলের জন্ম। তবু কী এক অদ্ভুত টানে এই ছবিটার সামনে হঠাৎ হঠাৎই ফিরে ফিরে আসে শিশুটি।

আচমকা পেছন দিক থেকে ঠক ঠক শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে মেরি দেখলো কাঠের টেবিলে রাখা সেই পাথরের ড্যালাটা খুব কাঁপছে—ঠক্ ঠক্ ঠক্ ঠক্!

প্রথমেই ভূকম্পের অনুমান হল মেরির। গত মাসে এমনই এক দুপুরবেলা সমগ্র পশ্চিম ভারত কেঁপে উঠেছিল ভূকম্পে, এই টেবিল থেকে পড়ে এক পুরনো টাইমপিস চুরমার হয়ে গিয়েছিল। এ’বার বোধহয় সামান্য কম্পন হয়েছে। কারণ কম্পনও দু’এক মিনিটেই থেমে গেল, আর তার পর পরই নিউজ চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়েও কোথাও আজকের কম্পনের খবরটা পাওয়া গেল না। বাপ্পানের শান্ত হতে কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টা লেগেছিল। বিকেল পাঁচটা নাগাদ, যেন খুব পরিশ্রান্ত হয়ে, ঘুমিয়ে পড়েছিল ছেলেটি।


***


সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে মালকিনের রূপ দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গেল মেরি। ড্রাইভার রামপ্রীত ধরে ধরে নিয়ে এসেছে। ম্যাডামের মাথায় এক মস্ত ব্যান্ডেজ। মায়ের এই রূপ দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো ছোট্ট বাপ্পান। ভয় পেয়ে ইন্টারকমে মিনিদিদির নাম্বার লাগালো মেরি। অতসীর বেস্টফ্রেন্ড মিনি ও শরৎ থাকে বারো তলায়। বিপদে আপদে ওরাই ভরোসা।

ঘটনাটা পরে রামুর কাছেই জানা গিয়েছিল। দুপুরে সেই গোয়ানিজ এলবার্ট গোমজ এসেছিল ফের টাকা চাইতে। না পেয়ে তর্ক-বিতর্কের পরে হঠাৎ একটা বোতল তুলে মারে অতসীর মাথায়। ঘটনাটা থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

জানা গেল, ঘটনাটা দুপুর আড়াইটে নাগাদের, যখন নাকি এখানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।

কোলাবা অঞ্চলে অতসীর অফিসে, অবশ্য, কিছুই বোঝা যায়নি!


***


এরপর থেকে এ’বাড়ির ঘটনাবলী হঠাৎই আমূল বদলে যেতে লাগলো। খারাপের দিকে।

এর শুরু অতসীর কোনো এক পুরনো বন্ধু বিপুল সরকারের পুনঃ-আগমন থেকে।

আগে আগে ফোনেই তাদের বাক্যালাপ শোনা যেত। পরে সে নিয়মিত আসতে শুরু করলো অতসীর এই ফ্ল্যাটে। কেন যে সে আসে এখানে, কেন যে ম্যাডাম ওকে এলাউ করেন, কোনখানে যে তার জোর... বোঝা যায় না কিছুই। সে নাকি এক মস্ত ফ্যাশান-ফটোগ্রাফার! দিনের বেলাতেও মদ্যপান করে থাকে, চক্ষুদু’টি সর্বদা লাল! অসহ্য বডি-লাঙ্গুয়েজ। বাপ্পানকে মোটেই পছন্দ করে না বিপুল। বাপ্পানও অত্যন্ত অপছন্দ করে যুবকটিকে। অতসী কি বোঝে না সেটা? বোঝা যায় না, বিপুল সরকার কি কোনোভাবে ব্ল্যাকমেল করছে অতসীকে, নইলে সে এতো মাথায় চড়ে কোত্থেকে?


***


এরপর, গত পরশুদিনের ঘটনা অবাক করা!

ইদানীং প্রতি রাত্রে অতসীকে এই হাউজিং-কমপ্লেক্সের ফটকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত বিপুল। আজ দু’জনে ফিরলো কটকটে সূর্যালোক থাকতে থাকতেই, ও সোজা উঠে এলো এ’ফ্ল্যাটে। এবং একসাথে ডিনার-টিনার করে রাতে রয়েই গেল বিপুল এখানে! যে গেস্টরুম কোনো অজানিত কারণে কখনই খোলা হতে দেখা যায়নি, সেখানেই রাত্রে আশ্রয় হল তার।

সে রাত্রে ডিনারে একগ্রাস ভাতও মুখে তোলেনি বাপ্পান। অতসী তো পাশেই ছিল!


***


গতরাতে ফের এসে বিপুল রয়ে গিয়েছিল এ ফ্ল্যাটেই। এবং আশ্চর্য, মেরিকে আদেশ দিলেন মালকিন ঐ গেস্ট রুমে রাতে বাপ্পানের বেড পেতে দিতে। নিজের কানকে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি মেরি! যে প্রাণাধিক পুত্রকে নিজের বুকে জড়িয়ে না ধরে ঘুমোতে পারেন না ম্যাডাম সে শোবে ঐ উত্তরের চাপা ঘরে আর ওনারা বড় ক্যামেরা, স্ট্যান্ডওয়ালা আলো আর সাদা সাদা ছাতা নিয়ে এই রাতে বেডরুমে... কী এমন কাজ?!

কিন্তু, যতই ভালোবাসুক বাপ্পানকে, সামান্য পরিচারিকা মেরি আব্রাহামের কীই বা বলার থাকতে পারে এক্ষেত্রে?

কিছুক্ষণের মধ্যে বন্ধ বেডরুমের ভিতর থেকে অতসী-বিপুলের উচ্চৈঃস্বরের বাকবিতণ্ডা শোনা যেতে লাগলো। বাপ্পানকে বুকে জড়িয়ে মেরি তখন তাকে নতুন বিছানায় নতুন ঘরে শুয়ে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত। অসম্ভব ছটফট করছে ছেলেটি। মেরিরও চোখে জল।

হঠাৎ দড়াম করে খুলে গেল ঐ বেডরুমের দরজা আর অতসীকে ধাক্কা মেরে ঘরের বাইরে মেঝেতে ফেলে দিয়ে ফের ভিতর থেকে দরোজা লক করে দিলো সেই লোকটা।

অতসীর মাথার সেই পুরনো ক্ষতে বোধহয় লেগেছে আবার। অচৈতন্য হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে সে।

দৌড়ে এসে তার পাশে মাটিতে বসে অতসীর মাথাটা কোলে তুলে নেয় মেরি। কপালের বাঁ দিকটা কেটে গেছে, রক্ত ঝরছে।

‘একটু চেষ্টা করুন, ম্যাডাম, উঠে ঐ বেডটায় শুন।’

কোনক্রমে তার কাঁধ ধরে ধরে এসে কমন স্পেসে মেরির বিছানাতেই শুলো অতসী। অঝোরে কাঁদছে, ‘আমি ভুল করেছি। আমি কি ভুল করেছি...!’

আর বাপ্পান তখন তার নতুন বেডে শুয়ে বন্ধু ডগির গলা জড়িয়ে ধরে ‘জ জ র র’-করে কত কথাই শোনাচ্ছে তাকে... চোখের জলে বুক ভেসে যায় তার!


***


সে রাত্রেই বোধহয় এসে পড়ল এবারের বর্ষাটা!

পাশের আরনাল গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি ছাপিয়ে কড়কড়াৎ বজ্রপাতের শব্দ শোনা যায়। মাঝরাত পেরিয়ে অঝোর ধারে বজ্রবিদ্যুৎ সহকারে বৃষ্টিতে ভেসে গেল মুম্বাই মহানগরী। ক্রমাগত বাজের শব্দে বারে বারে ঘুম ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে অতসীর, মেরির। প্যাসেজে সেই মেরির বেডেই শরীর ঢেলে পড়েছিল অতসী, ওঠার ক্ষমতা ছিল না তার। পাশে মেঝেয় বসে মেরি, বেডে ঠেস দিয়ে---ঘুমঘোরে।

হঠাৎ গেস্টরুমের দরোজা খোলার ক্যাঁচ্‌ শব্দ শুনে চমকে ঘোর ভেঙে অবাক-বিস্ময়ে অতসী দেখলো পাঁচ-ফুটের এক শীর্ণ অবয়ব দরোজাটা খুলে বেরিয়ে আসছে হেঁটে হেঁটে! হ্যাঁ, হেঁটে হেঁটে!! দুধসাদা নাইট-স্যুটে তার বিদ্যুৎচমকের প্রতিফলন বারেবারে! চমকে মেরির কাঁধ খামচে ধরেছে অতসী। ততক্ষণে ঘুম ভেঙে গেছে মেরিরও।

ধীরপদক্ষেপে হেঁটে আসছে ছেলেটা। বাম বগলে চেপে ধরা তার সেই প্রিয় সফট টয় ডগিটি, আর ডান মুঠোয়... ডান মুঠোয় ওটি কী?

দু’চোখ কিন্তু বোজা তার।

মেরি মেঝে থেকে উঠে বসেছে বেডে, অতসীর পাশেই। দু’জনেই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। সেই পথেই অতি ধীর পদক্ষেপে হেঁটে হেঁটে ছেলেটি এখন বন্ধ বেড রুমের দরোজায়।

ঠক্‌ ঠক্‌ ঠক্‌ ঠক্‌...ঝড়বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে...ডান হাতে ধরা সেই কালো পাথরের টুকরোটা দিয়ে বেডরুমে কাঠের দরজায় ক্রমাগত মেরে চলেছে ছেলেটা, যার কোনো হাত যে আদৌ চলে, তা কখনও দেখেনি তার মা!

এবার আস্তে আস্তে দরজাটা খুলে গেল। বেডরুম থেকে তীব্র সাদা আলো এসে তির্যক পড়েছে বাইরের সাদা দেওয়ালে।

বিপুলও বাপ্পানকে সমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক!

‘তু...তু...তুম...’

অদ্ভুত হাসি ছেয়ে গেল ছেলেটির মুখমণ্ডলে। হাসছে সে, হাসছে। অদ্ভুত সে হাসি। আবার চমকে উঠল বিদ্যুতের ঝলক। খেলে গেল সে আলো বালকের মুখমণ্ডলে।

বেডরুমের দরজার ঠিক বাইরে ছেলেটি। ঘরে ঢুকছে না। হেসেই চলেছে। নিঃশব্দ সে হাসি, দু’চক্ষু মোদা!

বাপ্পানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন সেই বিপুল সরকার।

‘এ...এ...তু...’ ভীত-বিহ্বল বিপুল বাক্যহীন! এবার প্রবল ভয়ে ধাক্কা মেরে সে সরিয়ে দিতে চাইলো বাপ্পানকে তার সমুখ থেকে। পারলো না একরত্তি ঐ ছেলেটাকে নড়াতে। সে এবার ধীরেসুস্থে নিচু হয়ে তার প্রিয় বন্ধু ডগিটিকে মাটিতে বসিয়ে দিলো। তার ডান হাতে ধরা সেই মসৃণ কালো প্রস্তরখণ্ড এবার ছুঁইয়ে দিলো সফ্‌ট ডগিটার নাকে।

মুহূর্তে ঘৌ ঘৌ চিৎকারে মেঝে থেকে ছিটকে উঠে সেই জীবন্ত সারমেয় লাফিয়ে গিয়ে কামড়ে ধরলো অত্যাচারী লোকটির কণ্ঠনালী!!

শেষ আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন শ্রীমান বিপুল কুমার সরকার! রক্তে ভেসে গেল দুধসাদা মার্বেলের ফ্লোর!


***


পরের দিন ভোর থেকেই প্রবল বর্ষণ উপেক্ষা করে পুলিশ আর টিভি-ওয়ালাদের ভিড়ে ভিড়ে ছয়লাপ ‘রুস্তমজী কমপ্লেক্সে’র সাতাশতলা। কোনো বলশালী নেকড়ে-জাতীয় পশুর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কাল ভোর রাতে মারা গেছে বিপুল সরকার নামক বছর চল্লিশের এক ফ্যাশান-ফটোগ্রাফার। গলায়, মুখে শ্বদন্তের স্পষ্ট দাগ। কিন্তু বিরারের মত জনবহুল অঞ্চলের এক আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ির সাতাশ তলায় এক নেকড়ে আসবে কী করে, সেটাই প্রহেলিকা!

চ্যানেল-ওয়ালারা অনেক ফটো তুলছিল।

ওরা কেউ তোলেনি দেওয়ালে ঝোলানো এক আদিবাসী যুবকের ছবির ফটো, যার সামনে তখনও এক খণ্ড মসৃণ কালো পাথর রয়ে গেছে বুকসেলফের ওপরে। বলের মতো গোল না, অনিয়মিত আকারের গোলাচে।

আর, লোকের পায়ে পায়ে ডগি টয়টা খাটের তলায় কোথাও ঢুকে গিয়ে থাকবে, সে-হেন তুচ্ছ জিনিসের খোঁজ আর পুলিশ করেনি।



(পরবাস-৬৩, ৩০ জুন, ২০১৬)