রাঢ় বাংলার মাটিতে যাদুবাস্তবতা— সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের “অলীক মানুষ” — সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ; অংকুর সাহা, পরবাস-৬৯






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে
অংকুর সাহার

লেখা

বই


ISSN 1563-8685




রাঢ় বাংলার মাটিতে যাদুবাস্তবতা — সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের
“অলীক মানুষ”


অলীক মানুষ — সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ; প্রকাশক— দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; এপ্রিল১৯৮৮, বৈশাখ১৩৯৫; প্রচ্ছদ— গৌতম রায়; পৃষ্ঠা- ২৯৬; ISBN – 81-7079-674-1



|| ১ ||

৯৮৮ সালে প্রকাশিত সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের একটি গল্পের সূচনা হয়েছিল এইভাবে — “বুড়ি গিয়েছিল গাছটার তলায় পাতা কুড়োতে। গাছটা তাকে বলল, মর্‌, মর্‌, মর্‌! ভয় পেয়ে বু্ড়ি বাড়ি পালিয়ে এল আর মরে গেল”।

যে কোনো মরমী লেখকের কলমেই জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রকৃতি এবং মেলে ধরে তার রঙিন আঁচল — তাতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ক্ষেত্রে — "কোনও কোনও গাছ কথা বলে। কোনও কোনও গাছ রাগী, কুচুটে আর নিষ্ঠুর হয়"। বাংলা কথাসাহিত্যে প্রকৃতি বেশ কয়েক ধাপ সামনে এগিয়েছে শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ আর তারাশংকরকে পেরিয়ে। মৃত মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির বোঝাপড়াও লেখক রচিত মিথের এক অনন্য অংশ। ‘মৃত্যুর ঘোড়া’ গল্পের কথাকার ন’বছরের একটি বালক — স্কুল থেকে ফিরে সে তার মৌলানা ঠাকুর্দার মৃত্যুসংবাদ পায়। (এখানে মনে রাখতে হবে সিরাজের নিজস্ব পিতামহও ছিলেন মৌলানা।) ঠাকুর্দার কবরে মাটি দেবার জন্য দূরের এক গ্রামে পদব্রজে যাত্রা এই গল্পের উপজীব্য — “মৃতরা তো ওইরকমই। কবরের নীচে পোকামাকড় আর প্রজাপতিদের ডিম, উইপোকারা থিকথিক করে, শেয়াল কি খরগোশ গর্ত বানিয়ে নেয়, কাঁকড়া শামুক বা সাপ শীতের শুরুতেই ঘুমোতে চলে যায় মাটির নীচে এবং এই সবের মধ্যেই দাদুরা বিচরণ করেন...”। কুয়াশাময় রাতের অন্ধকারে এক অজানা কবরের দিকে যেতে যেতে বালকটি টের পায় জীবন মৃত্যুর পারস্পরিক সম্পর্ক। ‘মৃত্যুর ঘোড়া’ এবং ‘গাছটা বলেছিল’ — দুটি গল্পই আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের সমসাময়িক।

তাঁর নিজের ভাষায়, “লেখক লেখেন অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে। প্রকৃত আধুনিকতা থাকে লেখকের মনে। তাঁর চেতনায় — চোখ ও মগজে। এবং হৃদয়েও”। বুদ্ধিজীবীর উঁচু ঝুলবারান্দা থেকে তিনি শ্রমজীবী মানুষদের অবলোকনে বিশ্বাসী নন, তিনি হাত মেলান তাঁদের দিবসের কর্মে। লোকসংস্কৃতি ও লোকজীবনকে তিনি কোন তত্ত্বকলার আতসকাচের মাধ্যমে দেখেন না, তাঁর দেখার চোখটি তাঁর নিজস্ব। ‘রানিরঘাটের বৃত্তান্ত’ তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলির অন্যতম — লেখকের বিষাদজড়িত কথনকুশলতায় চরিত্রগুলি জীবন্ত; তাঁদের সুখদু:খগুলি তিনি অনুভব করেন নিজের মত করে অথচ বর্ণনা করেন এক নিরাসক্ত দূরত্ব থেকে। এই গল্পের মানসিক প্রতিবন্ধী মা সুরেশ্বরী এবং তাঁর প্রথমে পিতৃপরিচয়হীন এবং পরবর্তীকালে পিতৃপরিচয়ের বাহুল্যে বিক্ষুব্ধ সন্তান ফালতু — বাংলা সাহিত্যের চিরকালীন সম্পদ। এই কাহিনি পাঠের পর দু-দশক পেরিয়ে ঝুম্পা লাহিড়ীর একটি গল্পে সুরেশ্বরী চরিত্রের ছায়া দেখেছিলাম। গল্পটিকে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন চিত্রপরিচালক অঞ্জন দাস “ফালতু” নাম দিয়ে।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তাঁর ছোটগল্পের মাধ্যমে — দেশ, অমৃত এবং অন্যান্য সাহিত্যপত্রে। তাঁর প্রথমদিকের বেশ কয়েকটি উপন্যাস খুব সম্ভবত: প্রকাশিত হয়েছিল শারদ সংখ্যা আনন্দলোক পত্রিকায় — যা আমার নিয়মিত পাঠের সুবিধে ছিল না। তাঁর উপন্যাসগুলি পড়েছি অনেক সময় পেরিয়ে পুস্তক আকারে। বিশেষ করে মনে আছে আলকাপ লোকনাট্যশিল্পের কুশীলবদের জীবন যাপন বিষয়ে রচিত ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসটি।

|| ২ ||

বাংলা ভাষার তিনটি প্রধান শিকড় — সংস্কৃত, আরবি এবং ফার্সি ভাষা — সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ছিলেন তিনটি ভাষাতেই দক্ষ; এছাড়া তিনি উর্দুভাষাও বেশ ভালো জানতেন। এতগুলি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার ভূমিজ লোকসংস্কৃতি মিলে গড়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্যের ভুবন। তিনি ছিলেন অন্য ভারতবর্ষের কন্ঠস্বর — গ্রাম্য, দরিদ্র এবং অনতিজটিল — যে সব মানুষের কথা সমসাময়িক সাহিত্যে অনুপস্থিত, তিনি তাঁদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতেন। মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন আগে এক সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “I essentially explore man’s relationship with nature and try to demonstrate that where as trees, rivers, rainfall etc. live out their own course without a obstructing any natural or human cycle, man tries to direct the course of nature by building dams across rivers or curb the freedom of his fellow beings in sundry ways.”

লেখকের জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার খোশবাসপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে। পরিবারটি শিক্ষিত এবং আলোকপ্রাপ্ত — দাদু ছিলেন মৌলানা ধর্মগুরু, মা কবিতা লিখতেন, বাড়ি ভর্তি নানা ভাষার বই — বাংলা, উর্দু, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত। লেখাপড়া শেষ না করেই তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান — প্রথমে বামপন্থী রাজনীতি, পরে ছ’বছর গ্রাম্য যাত্রাপালার দল আলকাপে (১৯৫০ - ১৯৫৬) — সেখানে তিনি বাঁশি বাজাতেন — দলটির সঙ্গে ঘুরেছেন বীরভূম, বর্ধমান, মালদা, মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে এবং কলকাতায়। যাত্রার আসরে কাজ করতেন সারা রাত এবং ঘুমোতেন দিনের বেলায়। গ্রাম বাংলায় ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলেছে তাঁর সাহিত্যে।

আলকাপের দলকে কেন্দ্র করে রচিত প্রথম বাংলা উপন্যাস নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'বৈতালিক'; দ্বিতীয়টি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ১৯৭২ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত 'মায়ামৃদঙ্গ'। ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন তাঁর জীবনস্মৃতির কথা — “এখন সবটাই স্বপ্নবৎ। আজ পনের-ষোল বছর পরে সেগুলো চেতনার অন্ধকারে চলে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক গুহার দেয়ালে আঁকা ছবির মতন কিছু ধূসর ফ্রেস্কো। কিছু কিম্ভূত কার্টুন। কিছু গ্রামপরী। কিন্তু আজও ভয়ের কথা, ঘুমের শিকড়ে তারা গুচ্ছ গুচ্ছ স্বপ্নের ডিম পাড়ে। মেয়েদের হৃদয় ও মুখমণ্ডলবিশিষ্ট তরুণ পুরুষ অবাঞ্ছিত ভালবাসার অবতারণা করে। এখনও বড় মায়ায় আক্রান্ত হই। আমাকে ওরা রেহাই দেয় না এখনও।” সেই আড়াই হাজার দিন এবং আড়াই হাজার রাতে দেখা বিভিন্ন মানুষের কথা তাঁর কথাসাহিত্যে ফিরে আসবে বার বার।

কিন্তু একদিন তিনি নিজের অন্তরে টের পেলেন সাহিত্য-সরস্বতীর ডাক এবং নাচ-গান-অভিনয় ছেড়ে নিমজ্জিত হলেন সাহিত্যচর্চায়। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার ঝুলি হাতড়ে সংগ্রহ করে গেলেন সাহিত্যের উপাদান; লিখলেন মানুষের ইতিহাস ও ইতিহাসের মানুষকে। কালজয়ী গল্প লিখে তাঁর সাহিত্যসাধনার সূচনা — ‘হিজলবিলের রাখালেরা’, ‘ভালবাসা ও ডাউনট্রেন’, ‘উড়োপাখির ছায়া’, ‘ইন্তি পিসি ও ঘাটবাবু’, ‘গোঘ্ন’, ‘রণভূমি’, ‘রক্তের প্রত্যাশা’, ‘মানুষের জন্ম’ ইত্যাদি — পাঁচ দশকে রচিত তিনশোটির বেশি গল্প বাংলাসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ — পাঠক-পাঠিকা এবং সমালোচক উভয়ের কাছেই জনপ্রিয়। ষাটের দশক থেকে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় — আনন্দবাজার পত্রিকাতে সাংবাদিকতা এবং কথাসাহিত্যের জগতে কাটে বাকি জীবন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যের ভিত্তিভূমি — “I deconstruct experience, and it is this deconstruction which brings in an episode, a fragment, giving rise to my story. I do not go beyond experience.” — তিনি বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। আমরা ঋদ্ধ হয়েছি তাঁর অভিজ্ঞতায়।

১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস, “নীল ঘরের নটী” — এক গ্রাম্য নর্তক অভিনেতার কাহিনি — বাবার ভয়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে সেই কাজ করতে হয়। সেই থেকে শুরু — তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা একশো পঞ্চাশ পেরিয়েছে। চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে “নিশিমৃগয়া” (১৯৭০) এবং ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি’ (১৯৮০)। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘অমর্ত্য প্রেমকথা’ উপন্যাসটি নরসিংহদাস স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। ভুবনখ্যাত ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসটি ১৯৯০ সালে ভুয়ালকা পুরস্কার এবং ১৯৯৪ সালে বঙ্কিম পুরস্কার এবং সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে। এগারটি ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে উপন্যাসটি। ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট উপন্যাসটির একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের কাজ শুরু করেছেন সাহিত্য অকাদেমি থেকে সুদেষ্ণা চক্রবর্তীর অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে গ্রন্থটির ইংরেজি ভাষান্তর: Mythical Man : Academy Award winning Novel নামে।

তাঁর গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাসগুলি অসম্ভব জনপ্রিয় — গোয়েন্দা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নীলাদ্রি সরকার — তিনি বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি সংগ্রহ করেন এবং অ্যামেচার পক্ষী-বিশেষজ্ঞ; তিনি পাইপ টেনে ধূমপান করেন এবং স্যান্টাক্লজের মত শাদা দাড়ি-গোঁফ তাঁর। কাহিনিগুলি লেখা হয় তাঁর সহকারী সাংবাদিক জয়ন্তের জবানীতে। হাসিখুশি মানুষটির মুখে অনবরত ফোটে বাংলা প্রবাদ এবং ছেলেভুলানো ছড়া। কিছুদিন আগে ‘ইনসপেক্টার ব্রহ্মা’ নামে গোয়েন্দাকে কেন্দ্র করে আরও একটি গোয়েন্দা কাহিনি সিরিজের সূচনা করেছেন।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা নিবেদিতা সেন লেখকের কর্নেল সিরিজের কাহিনিগুলির ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন এক দশক আগে। সৃষ্টি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম ইংরেজি কিশোর গল্প সংকলন “The Colonel Investigates”। সম্প্রতি তিনি লেখকের দশটি বয়স্কপাঠ্য গল্পের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন — ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে গল্প সংকলন — “Die, Said the Tree and other stories” (প্রকাশক — কথা)।

|| ৩ ||

উনিশ ও বিশ শতকের বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে এই লৌকিক ও অলৌকিক কাহিনির বিস্তার; পটভূমি পরাধীন অখণ্ড, বিভক্ত এবং আবার জোড়ালাগা বঙ্গপ্রদেশ, যদিও তার সমাপ্তি স্বাধীন অথচ খণ্ডিত দুই বঙ্গে। এক উত্তাল, ঘটনাবহুল শতাব্দী জুড়ে এক ধর্মভীরু, নিষ্ঠাবান মুসলিম পরিবারের সাদামাটা জীবনযাপন। কাহিনির নায়ক ও প্রতিনায়ক পিতা-পুত্র, আসমান-জমিন ফারাক তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদে। পিতা রাশভারী, খামখেয়ালি, একনিষ্ঠ ধর্মগুরু — মানুষটি তাঁর নামের মতই জমকালো — “হজরত সৈয়দ আবুল কাশেম মুহম্মদ বদি-উজ-জামান আল্‌-হুসায়নি আল্‌-খুরাসানি’ — সংক্ষেপে ‘মৌলানা বদিউজ্জামান’ — আরো সংক্ষেপে ‘বদি-পীর’। প্রতিনায়ক তাঁর কনিষ্ঠপুত্র শফি-উজ-জামান ওরফে ছবিলাল, সংক্ষেপে শফি — সে কার্যত; সেকুলার — উর্দু-আরফি-ফারসি-র বদলে বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষিত, ব্রাহ্মসমাজের এবং স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে প্রান্তিকভাবে যুক্ত এবং শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সরকারের ফাঁসিকাঠে দণ্ডিত। পিতাপুত্রের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব-বিভেদের টানাপোড়েন প্রোথিত হয়েছে বাঙালির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

উপন্যাসটি শুরু হওয়ার আগেই পাঠক পেয়ে যান ঘৃণা, সুবিচার এবং প্রতিশোধ বিষয়ক এইচ জি ওয়েলস (১৮৬৬-১৯৪৬) এর একটি জনপ্রিয় উদ্ধৃতি — “Hatred is one of the passions that can master a Life, and there is a temperament very close to it, ready to see life in terms of vindictive melodrama, ready to find stimulus and satisfaction in frightful demonstration of ‘justice’ and ‘revenge’.” সত্যিসত্যিই ঘৃণা এই দীর্ঘ আখ্যানের প্রধান চরিত্রগুলির অন্যতম চালিকাশক্তি — মুসলমান-হিন্দুর অন্তহীন; পারস্পরিক ঘৃণা; ইংরেজ শাসক ও শাসনের প্রতি উভয়ের ঘৃণা; প্রতিবন্ধী স্বামীর প্রতি রূপসী স্ত্রীর ঘৃণা; অশিক্ষিত স্ত্রীর প্রতি অবিবেচক স্বামীর ঘৃণা; উদারপন্থী হানাফি ও সুফি মুসলমানদের প্রতি পিউরিটান, মৌলবাদী ফরাজিদের ঘৃণা; আতলাফ (দরিদ্র, অশিক্ষিত মুসলমান)-দের প্রতি আশরাফদের (ধনী, প্রতিপত্তিশালী মুসলমান) ঘৃণা — তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই, তবে ঘৃণা-জর্জরিত আত্মদ্বন্দ্বে ডুবে ছিল আমাদের সমাজ, তার জের চলছে এখনও — লেখক অলৌকিক দক্ষতায় উপস্থাপিত করেছেন তাকে। মৌলানা বদিউজ্জামান ছিলেন ‘অমায়িক, মিষ্টভাষী আর ভাবপ্রবণ’ আবার ‘খামখেয়ালি, জেদি আর হঠকারী’ — “বার বার ঠাঁইনাড়া হওয়া ছিল স্বভাব”। স্ত্রী সাইদ-উন-ন্নিসা, মা কামরুন্নিসা এবং তিন পুত্র নিয়ে তাঁর সংসার। বড় ছেলে নুরুজ্জামান “সুদূর দেওবন্দ মাদ্রাসায় তালেব-উল-আলিম অর্থাৎ শিক্ষার্থী। মেজ ছেলে মনিরুজ্জামান জন্ম-প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে ‘শফিউজ্জামানের জন্ম কাঁটালিয়া নামক পদ্মাতীরবর্তী এক গ্রামে’। কয়েক বছর অন্তর অন্তর বাসস্থান বদল করতেন। তিনি ফরাজি ধর্মগুরু এবং প্রচণ্ড পিউরিটান — কোনো গ্রামে তাঁর শরিয়তী নিয়মকানুন এতটুকু অমান্য হলেই তিনি সপরিবারে তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওনা হতেন অন্যত্র। শফির জন্ম থেকে তার সতের বছর বয়েস হওয়ার মধ্যেই তাদের আস্তানা বদল: কাঁটালিয়া—>পোখরা—>বিনুটি—>গোবিন্দপুর—>নবাবগঞ্জ—>কুতুবপুর-->খয়রাডাঙা—>মৌলাহাট।

কাহিনির সূচনায় তাঁর সাত গরুর গাড়ির ক্যারাভান রওনা হচ্ছে খয়রাডাঙা ছেড়ে — পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও সঙ্গে বাঁজা গরু মুন্নি, বাচ্চাসহ ছাগল কুলসুম এবং কয়েকজন বিনা মাইনের ভৃত্য ও মুরিদ। তাঁদের গন্তব্য ছিল সেকেড্ডা গ্রাম। কিন্তু পথিমধ্যে বিপর্যয়ের জন্য তাঁদের থামতে হয় মৌলাহাটে এবং স্থানীয় মানুষজনের অনুরোধে তাঁরা সেখানেই পাকাপাকিভাবে থেকে যান। প্রথম দিনেই শফির সঙ্গে পরিচয় দিলরুখ (রুকু) এবং আফরোজ (রোজি) নামে দুই যমজ বোনের। প্রথম দর্শনেই রুকুর সঙ্গে তার প্রেম। পরিবারটির ঘরকান্না পাতা হ’ল একজনের পরিত্যক্ত বাড়িতে; মৌলানা আশ্রয় নিলেন স্থানীয় মসজিদে। একদিন রোজি-রুকুর বাড়িতে বেড়াতে এলেন তাদের এক আত্মীয় —শফির সঙ্গে পরিচয় ঘটল তাঁর।

শিক্ষিত, যুক্তিবাদী, নাস্তিক চৌধুরি আবদুল বারিকে প্রথমবার দেখার পর বালক শফির মনে হয়েছিল, “...পৃথিবীতে কোনো-কোনো লোক আছে — তাকে কেন যেন ভীষণ চেনা মনে হয়। মনে হয় তার সবকিছুই লোকটির জানা। অসহায়ভাবে ধরা পড়ে যেতে হয় তার কাছে। অথবা আত্মসমপর্ণ করতে হয় অগাধ বিশ্বাসে।” মহান লেখকের কালজয়ী উপন্যাসের সঙ্গেও পাঠকের সম্পর্ক হতে পারে একই রকম — অগাধ বিশ্বাসে আত্মসমর্পণের। বারিচাচা হয়ে উঠলেন শফির গুরু এবং উপদেষ্টা — মৌলানার অনুমতি নিয়ে তিনি শফির লেখাপড়ার ব্যবস্থা করলেন দু-ক্রোশ দূরে হরিণমারা গ্রামের ইংরেজি হাইস্কুলে।

মৌলাহাটের লোকজন সহজ সরল, খেটে-খাওয়া মানুষ — তারা নিষ্ঠাবান মুসলমান, কিন্তু বিপদে আপদে পীরের থানে গিয়ে মানত করতে বা প্রদীপ জ্বালাতে দ্বিধা করে না। তারা অপেক্ষা করছিল নিজস্ব এক ধর্মগুরু পীরের জন্যে — তাঁদের পিতা-পিতামহ বলে গিয়েছেন আসন্ন এক মহিমাময় পীরের কথা; তাঁরা মৌলানাকে পেয়ে ধন্য। বদি-পীর কিন্তু তাঁর কঠোর ফরাজি নিয়মকানুন চালু করতে উদ্যত — মেয়েরা হবে পর্দানশীন, গানবাজনা সম্পূর্ণ বন্ধ, কোনোরকম মেলায় যাওয়া নিষেধ, পীরের দরগায় প্রদীপ জ্বালানো চলবে না, ইত্যাদি। শফি এসবের থেকে দূরে বিদ্যালয়ে পাঠরত, কিন্তু সে খবর পায় যে রোজি-রুকুর বিবাহের ব্যবস্থা হচ্ছে তার দুই দাদার সঙ্গে — অর্থাৎ রুকু হবে তার অর্ধমানব, প্রতিবন্ধী মেজভাইয়ের বিবি। তার জীবনে আঁধার ঘনিয়ে আসে — বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে সে। রুকুর এই দুর্ভাগ্যের জন্যে নিজেকে দায়ী করে ডুমুর গাছে গলায় দড়ি দেন তার বিধবা মা দরিয়া বিবি।

এই মহাকাব্যিক উপন্যাসের পরবর্তী ঘটনা আর সরলরেখায় চলে না। চলচ্চিত্রের কোলাজের মতন লেখক রচনা করেন রাঢ় বাংলায় মুসলিম-সমাজের প্রামাণ্য তথ্যচিত্র। বদি পীরকে পথ দেখায় সাদা জিন অথবা কালোজিন। সাদা জিনের প্রভাবে তিনি সত্যদ্রষ্টা, ধর্মগুরু — গ্রামের গরীব চাষিদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখেন, কথা বলেন ধর্মগ্রন্থের ভাষায়, উপদেশ-পরামর্শ দেন তাদের বিপদে আপদে। কালো জিনের প্রভাবে জেগে ওঠে তাঁর জাগতিক বুদ্ধি এবং শরীরী কামনা বাসনা — তিনি বীজ বপন করতে যান তাঁর শস্যক্ষেত্রে, কিন্তু সাইদা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি জেনেছেন তাঁর পবিত্র-আত্মা স্বামী পরনারীতে আসক্ত। ধ্যানের জগৎ থেকে তিনি নেমে আসেন ডাইনি বলে পরিচিত আবদুল কুঠোর যুবতী স্ত্রী ইকরাতুন ওরফে করুণার আলিঙ্গনে এবং তাঁর একটি সন্তান জন্মে। তাঁর পরবর্তী জীবন কাটে পথে পথে আল্লার বাণীর প্রচারে, নি:সঙ্গ। মৃত্যুর পরে এই পীরবিরোধী ধর্মাত্মা নিজেই হয়ে ওঠেন পীর, তাঁর শেষ শয্যার কবরটি হয়ে ওঠে মাজার, তীর্থস্থান।

এদিকে শফি ইংরেজি শিখতে গিয়ে বংশ ও ধর্মচ্যুত। তাকে প্রভাবান্বিত করে বিদেশি দর্শন, বাংলার প্রকৃতি ও নারী — গ্রাম্য রমণী আসমা তাকে প্রথম শরীরী পাঠ শেখায়, তারপর লালবাগ শহরের যুবতী সিতারার মোহিনী মায়ায় সে নরহত্যা করে বসে। তারপর আর ফেরার পথ নেই — ব্রাহ্মসমাজের তত্ত্ব-আলোচনা এবং বিশুদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ফাঁকে ফাঁকে সে যোগ দেয় স্বদেশী আন্দোলনে এবং হয়ে ওঠে একাধিক ইংরেজের ঘাতক। তার নামে গালগল্প, উপকথা ছড়িয়ে পড়ে — শফি হয়ে দাঁড়ায় এক অলীক মানুষ, ছবিলাল। সরকারের চোখে সে বিপজ্জনক ব্যক্তি — সাত বছরের জন্যে জেলা থাকে নির্বাসিত। মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্যে সে গ্রামে এলে পিতার এক ঘনিষ্ঠ শিষ্য পুলিসের হাতে ধরিয়ে দেয় তাকে — বিচারে ফাঁসি হয় তার। “এবং কথিত আছে, লোক সকলকে স্বপ্নে দেখা দিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, ‘আমি সেই ছবিলাল’। পরবর্তীকালে প্রাজ্ঞ গ্রামীণেরা ব্যাখ্যা করিত, ‘তিনি ছবির ন্যায় রাঙা ছিলেন, সেই হেতু ছবিলাল....”। এইভাবেই সৃষ্টি হয় কিংবদন্তীর এবং ছড়িয়ে যায় আধুনিক উপকথা।

|| ৪ ||

প্রায় সাতশো বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করেও আমরা হিন্দু বাঙালি এবং মুসলমান বাঙালি একে অন্যের রীতিনীতি, আচার-আচরণ, ধর্ম, সংস্কার ও জীবনযাপন বিষয়ে খুব কম জানি। আমার মতে এই অজ্ঞতা হিন্দুবাঙালিদের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে বেশি। আলোচ্য গ্রন্থের সংলাপে ও বর্ণনায় আরবি ফার্সি শব্দের ব্যবহার প্রচুর এবং তা খুবই যুক্তিসঙ্গত — গ্রাম্য মুসলমান মানুষের মুখের ভাষা লেখক দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। আমি গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশী লেখকদের গল্প উপন্যাস অল্পবিস্তর হলেও পড়ে চলেছি এবং সেই কাজ সহজ করে দেবার জন্যে সংগ্রহ করেছি আরফি-ফারসি-তুর্কি শব্দের এক বাংলা অভিধান। বেশ কয়েকবার সেই অভিধানের পাতা ওলটাতে হয়েছে অলীক মানুষ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে। উপন্যাসে ব্যবহৃত কিছু শব্দের উদাহরণ দেওয়া আশা করি এখানে অসমীচীন হবে না —

নসিহত = বকুনি;
মোজেজা = অলৌকিক দৃষ্টি অথবা vision;
ইস্তেঞ্জা = হিসি করা;
ইতেফাক = নির্জনে বসবাস;
তালেবুল আলেম = শিক্ষার্থী, ছাত্র; [‘তালিবান’ শব্দের উৎস এই ‘তালেব’]
লেককার = পুণ্যবতী;
এজিন = সম্মতি;
কায়দাবহি = আরবি বর্ণপরিচয়;
তৌহিদ্‌ = এক ঈশ্বর বাদ;
বাহাস্‌ = তর্কবিতর্ক;
তালিকা আর দীর্ঘ করে লাভ নেই। লেখক অবশ্য অনেক অচেনা শব্দেরই অর্থ উল্লেখ করেছেন মূল শব্দের পাশাপাশি বন্ধনীর মধ্যে, তাতে সুবিধে হবে পাঠক পাঠিকাদের।

আমাদের চেনা বঙ্গপ্রদেশও ভীষণভাবে উপস্থিত কাহিনির পটভূমিতেঃ সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্কিমচন্দ্র ও আনন্দমঠ — বন্দেমাতরম এবং স্বদেশী আন্দোলনে তার প্রভাব, ব্রাহ্মসমাজ ও কেশবচন্দ্র সেন, ভাই গিরীশচন্দ্র এবং তাঁর অনুবাদে প্রথম বাংলা কোরান, বঙ্গভঙ্গ ও রাখীবন্ধন এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ! তাঁর কথা মৌলানা বদিউজ্জামানের জবানীতে — “মাশাল্লাহ্‌! ওই ‘শাইর’ বাবুকে দেখিতে বড় ইচ্ছা হইল। শুনিলাম যে বীরভূমে জেলার বোলপুর সন্নিকটে তিনি এবাদতখানা বানাইয়া বাস করেন। এবং তিনি ওই এবাদতখানা এলাকায় বুত-পরস্তি (পৌত্তলিকতা) হারাম বলিয়া হুকুম জারি করিয়াছেন। মারহাব্বা! মারহাব্বা!..” অনেক বছর পরে নাতনির পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে রুকু মন্তব্য করেন — তাঁর সঙ্গে বদিউজ্জামানের চেহারার অদ্ভুত মিল।

|| ৫ ||

১৯২৫ সালে জার্মান চিত্রসমালোচক ফ্রান্‌জ্‌ রো (১৮৯০ - ১৯৬৫) প্রথমবার ‘যাদুবাস্তবতা’ শব্দটি ব্যবহার করেন চিত্রশিল্পের একটি ধারাকে বোঝাতে। ‘পরাবাস্তবতা’ অর্থাৎ সুররিয়ালিজমের একান্ত উত্তরসূরি ম্যাজিক রিয়ালিজম একদিকে চিত্রশিল্পের মাধ্যমে বাস্তবকে তার সৌন্দর্যময় বৈভবে প্রকাশ করা আবার অন্যদিকে বাস্তবের দুর্জ্ঞেয় হেঁয়ালিগুলিকেও। যখন নিখুঁতভাবে বর্ণিত এক বাস্তব পরিবেশে এমন কিছু প্রবেশ করে (এমনকী আক্রমণ করে) বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা করা মুশকিল এবং অসম্ভব, তখন তা হয়ে ওঠে যাদুবাস্তবতার পরিবেশ।

পরবর্তী দু-দশকে শব্দবন্ধটি ছড়িয়ে যায় সাহিত্যের জগতে — সেখানে শব্দবন্ধটির ব্যবহার দ্বন্দ্বমূলক — জীবন ও মৃত্যুর দ্বন্দ্ব, শুভ আর অশুভের দ্বন্দ্ব, লৌকিক আর অলৌকিকের দ্বন্দ্ব, প্রাক-উপনিবেশিক এবং উত্তর-শিল্পবিপ্লব জীবনযাত্রার দ্বন্দ্ব। রুশ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার মিখাইল বুলগাকভ (১৮৯১ - ১৯৪০) রচিত ‘প্রভু এবং মার্গারিটা’ (রচনা ১৯৩৭; প্রকাশ ১৯৬৭) যাদুবাস্তবতার উপাদানে রচিত প্রথম উপন্যাস। সাহিত্যরীতিটি গভীরতর শিকড় ছড়ায় লাতিন আমেরিকায় — কুবার কথাসাহিত্যিক আলেহো কার্পেন্তিয়ের তার নাম দেন “লো রিয়াল মারাভিয়োসো” — তাঁর ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত “এল রেইনো দে এস্তে মুন্দো” (“পৃথিবীর রাজ্যপাট”) — এইতির পটভূমিকায় প্রথম প্রকাশিত যাদুবাস্তবতার উপন্যাস। কয়েকবছর পরে মেহিকোর লেখক হুয়ান রুলফো (১৯১৭ - ১৯৮৬)-র দুটি কৃশকায় গ্রন্থ — “এল ইয়ানো এন ইয়ামাস” (“জ্বলন্ত প্রান্তর”, গল্পগ্রন্থ, ১৯৫৩) এবং “পেদ্রো পারামো” (উপন্যাস, ১৯৫৫) এই সাহিত্যরীতিকে শক্ত ভিতের ওপর স্থাপিত করে। যাদুবাস্তবতার চারটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং আলোচ্য উপন্যাসের সঙ্গে তার মিলগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই:

১। বিষম অস্তিত্বের সমন্বয় অথবা হাইব্রিডিটি —

বিপরীত অস্তিত্বের সংগ্রাম আবহমান কাল ধরে বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ — ধনীর সঙ্গে দরিদ্রের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের, বহিরাগতের সঙ্গে ভূমিজের। এই দিগন্তবিস্তারী আখ্যানও তার ব্যতিক্রম নয় — এক ধর্মগুরু; গ্রাম্য, অশিক্ষিত মানুষের চোখে তিনি গগনবিহারী ঐশ্বরিক শক্তি — তাঁর সন্তান ঘটনাচক্রে আপন ধর্মদ্রোহী, বিপ্লবী ও নৈরাজ্যবাদী চিন্তাভাবনায় জর্জরিত এবং শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুর ঘাতক। আত্মদ্বন্দ্বে জর্জরিত পিতা বদিউজ্জামান — তিনি মর্ত্যভূমিতে আল্লার নিদর্শন খোঁজেন রাতদিন, অথচ অন্তরের অবদমিত পুরুষটিও জেগে ওঠে মাঝে মধ্যেই। এরকম এক প্রচণ্ড ঝড়ের রাতে — “যে-কোনো মুহূর্তে মসজিদ বুঝি ওই মিনারের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে। তিনি তো সর্বত্যাগী সাধুপুরুষ নন। তিনি ভ্রান্ত মতানুগামী সুফিও নন। তিনি ওহাবপন্থী ফরাজি মুসলিম। ইহলোকের সবরকম নৈতিক সুখ উপভোগ করাই তো যথার্থ ইসলাম।” এইরকম যুক্তিতর্কের সাহায্য নিয়ে তিনি, “জীবনের বাস্তবতাগুলিকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরতে বাজপাখির মতন বেঁকে মাটির দিকে নেমে এসেছিলেন।” পিতার মতন পুত্রও বিপরীত অস্তিত্বের দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ — সাহিত্যে, দর্শনে, বুদ্ধিবৃত্তির নির্যাসে নিমগ্ন থাকার চেষ্টা সত্ত্বেও মাথা চাড়া দেয় শরীরী আদিমতা — “আবার প্রতীক্ষায় থাকা, কবে ফিরবে প্রিয়তম ঘরে। কবে ফিরে পাবে সে নারীর শরীর, নারীর স্তন, নারীর ঠোঁট এবং নারীর জরায়ু — শরীরের পারুষ্যের যৌবনের রক্তমূল্য দিয়ে সবল পেশীর শক্তি দিয়ে হবে তার প্রত্যাবর্তনজনিত পুনরাভিষেক। কবে ফিরবে সে পুরনো কোমল ঘরে? কৈশোরের সেই প্রতীক্ষা আর নির্বাসনের কাল...”। পিতা ও পুত্রের ব্যক্তিগত, অন্তরঙ্গ দিনলিপি সবসময়ের এক অনবদ্য ডকুমেন্টেশন।

২। লেখকের নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে ব্যঙ্গ —

আখ্যান-বিশ্বের বাস্তবতার পরিবেশকে অক্ষুন্ন রাখার জন্যে লেখককে বজায় রাখতে হয় সমীচীন দূরত্ব — তিনি যদি কাহিনির চরিত্রের এবং ঘটনাবলীর কাছাকাছি নিজেকে স্থাপিত করেন, তাহ’লে যাদুবাস্তবতার শর্ত লঙ্ঘিত হবে। পরিবেশের যে নিহিত যাদু বর্তমান, লেখক থাকবেন তার চেয়ে সসম্ভ্রম দূরত্বে; যাদুর প্রকাশ যদি মিশে যায় সরল, গ্রাম্য মানুষের গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসে অথবা সম্পূর্ণ কষ্টকল্পনা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে লেখকেরই ক্ষতি। যাদু থাকবে বাস্তবতার গায়ে আঠার মতন লেগে, একতালে পা ফেলবে একই ড্রামের বাদনে। যাদু যেন লেখকের বিশ্ববীক্ষার অথবা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে না দাঁড়ায়। অলীক মানুষ এক বিস্ময়কর বৃত্তান্ত — তার আবেদন চিরকালীন। বদি-পীরের জীবন খুব সম্ভবত: ১৮৪৫ থেকে ১৯২০ সাল, কিন্তু তাঁর জীবনকাহিনি হাজার বছরের। সেখানে সাদা জিন আর কালো জিন ঘুরে বেড়ায় — লেখক নির্মোহ ভঙ্গিতে বর্ণনা করেন তাদের কীর্তিকলাপ তাঁর সহজাত ভাষায় — অসংখ্য কাহিনি ও উপকাহিনি সহযোগে এক মহাকাব্যিক সমারোহ। চলচ্চিত্রের কোলাজের মত — কখনও সরলরেখার ন্যারেটিভ, কখনও মিথ, পুরাণ অথবা কিংবদন্তী, কখনও সংবাদপত্রের রিপোর্টের ছিন্ন অংশ, কখনও ব্যক্তিগত ডায়েরি — সব মিলিয়ে বিস্তৃত এক সময় এবং বিস্ময়কর কিছু ভাল ও মন্দে মেশান মানুষের আখ্যান। লেখকের জ্ঞান এবং অধীত বিদ্যাসমূহ তাঁকে সাহায্য করেছে উপন্যাসটির নিরাসক্ত নির্মাণে — সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন, পুরাতত্ত্ব, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব — সব মিলিয়ে ধূসর এক সময়ের ধূসরতর কিছু মানুষের বৃত্তান্ত। গালিব, হাফিজ, উগো, আফলাতুন (প্লেটো), আরিস্তোন (অ্যারিস্টটল), গ্যেটে, পো, বোদল্যের, হোমার এবং থরো — সবাই এই মহান আখ্যানের অংশিদার। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের কাহিনি উন্নীত হয়েছে সমসময়ের প্রামাণ্য দলিলে।

৩। লেখকের স্বল্পভাষিতা —

কাহিনির বাস্তবতা-অবাস্তবতা অথবা সত্যতা-অসত্যতা নিয়ে লেখকের কোন নিজস্ব মতামত থাকলে চলবে না। ঘটনা যতটাই অবাস্তব হোক না কেন, লেখক তাকে আপন করে নেবেন এবং আন্তরিকতা সহযোগে উপস্থাপিত করবেন পাঠকদের সামনে। এইভাবেই যাদুবাস্তবতার অবিশ্বাস্য জগৎ পাঠকের মনোজগতে বাস্তব হয়ে ফুটে উঠবে — পেদ্রো পারামো উপন্যাসের কোমালা এক ভূতুড়ে শহর — সেখানে যা ঘটে, তা সত্যিই কি ঘটে — বাস্তব সেখানে ভঙ্গুর, ক্ষীয়মান — ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায় তাকে। “শতবর্ষের একাকীত্ব” উপন্যাসের কাল্পনিক শহর ‘মাকোন্দো’ — যে নামের কোন অর্থ নেই, যে নাম কেউ কোনদিন শোনেনি — সব মানুষ শহর ছেড়ে চলে গেলেও তাদের স্বপ্নের অতিলৌকিক প্রতিধ্বনিতে শহরটি মুখর। যে বাস্তবতাকে গার্সিয়া মার্কেস-এর জবানীতে — “A reality not of paper, but one that lives within us and determines each instant of our countless daily deaths and that nourishes the source of insatiable creativity, full of sorrow and beauty of which this roving and nostalgic Columbian is but one cipher more, singled out by fortune.” গাবোর চেয়ে সাড়ে তিন বছরের কনিষ্ঠ সিরাজের রচিত মৌলাহাটেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা, “highly detailed and realistic”, কিন্তু “invaded by something too strange to believe.” দুটি হঠকারী, বিপরীত ব্যক্তিত্বের বিচিত্র ও নানামুখী সংঘাতে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে প্রথাবিরোধী এবং অনন্যসাধারণ। মানুষগুলি ভৌতজগতে থাকেন, ঘটনাগুলি মাটির পৃথিবীতে ঘটে, কিন্তু তাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায় অজানা, আদিম, পৌরাণিক কিছু সত্তা, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না।

৪। লৌকিক এবং অলৌকিক —

যাদুবাস্তবতার অচ্ছেদ্য অঙ্গ অলৌকিক বা অতিলৌকিক ঘটনা। পাঠক জানবেন লৌকিক আর অলৌকিকের সীমারেখা, কিন্তু সেই নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না। কারণ আখ্যানবিশ্বের সঙ্গে তা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অলৌকিকতাকে পাঠকের সহজাত বোধশক্তির অংশ করে তোলাই লেখকের সাফল্যের পরিমাপ। মায়া ও বাস্তবতার টানাপোড়েনেই রক্তমাংসের মানুষ পরিণত হয় অলীক মানুষে। গ্রামবাংলার মানুষের মনে অলৌকিকতার শিকড় ছড়াতে বিশেষ সময় বা প্রচেষ্টা লাগে না। মৌলাহাটের মানুষ বদি-পীরকে ঈশ্বর ভেবেই অভ্যস্ত — “আসলে মানুষের এই স্বভাব, চারপাশের সবকিছুতে অলৌকিককে ঢুঁড়তে চায়। মোজেজা অন্বেষণ করে। ওরা ভাবে এই মাটির দুনিয়াই কি সব? ঠিকই তো। মাটির দুনিয়া নিশ্চয়ই সব নয়। পানির তলার ওই প্রতিবিম্বের মতো অনেক কিছু আছে। তা জানার জন্যে ইলম (প্রজ্ঞা) অর্জন করা চাই।” তিনি বনভূমিতে পায়চারি করতে গেলে লোকে ভাবে তিনি নির্জনে বৃক্ষবাসী জিনদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে যান। তিনি সূর্যাস্তের পর একদিন মায়ের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে শিষ্যেরা তাঁর সঙ্গ নেয় এবং কথিত আছে, তাদের চোখের সামনেই ঘটে অলৌকিক উত্থান — সেই নিয়ে লোককবি মুন্সি মেরাতুল্লা কাব্য লেখেন। এইভাবেই মিথের সৃষ্টি হয়। লেখকের দক্ষ কুশলতায় এই প্রথাবিরোধী উপন্যাসটি সমাপ্তির দিকে এগোয়।

২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি বিরাশি বছর পূর্ণ করতেন। তার আগেই স্বল্প রোগভোগের পর তিনি অমৃতলোকে চলে গেলেন ৪ সেপ্টেম্বর। তিনি চিরশান্তিতে শুয়ে থাকবেন তাঁর নিজের গ্রামে, তাঁর সাহিত্য হবে চিরস্থায়ী।



(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)