"জলবায়ু বদলে যাচ্ছেঃ পৃথিবী বিপন্ন-প্রদীপ দত্ত; শান্তনু চক্রবর্তীর আলোচনা, পরবাস-৬৯"






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines








পরবাসে শান্তনু চক্রবর্তীর লেখা



ISSN 1563-8685




পুস্তক-সমালোচনা - জলবায়ু বদলে যাচ্ছেঃ পৃথিবী বিপন্ন


জলবায়ু বদলে যাচ্ছেঃ পৃথিবী বিপন্ন প্রদীপ দত্ত; প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০১৫; গাঙচিল - কলকাতা; ISBN: 978-93-84002-49-7

ত্তরের দশকের প্রথমদিকে, যখন আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র, আমাদের একজন একটু-অন্যরকম অধ্যাপক মেশিন-ডিসাইনের ক্লাস নিতে নিতে হঠাৎ বলেছিলেনঃ "এই যে আমরা প্রকৃতির ওপর নির্বিবাদে যথেচ্ছাচার চালিয়ে যাচ্ছি , কী হবে যদি প্রকৃতি কোনওদিন প্রতিশোধ নেবে বলে ঠিক করে ?" আমাদের হতভম্ব হতে দেখে তিনি পরের বিস্ফোরণটি ঘটালেন: "ধরো এক সেকেন্ডের জন্য যদি মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পৃথিবী নিষ্ক্রিয় করে দেয়?" তাঁর ঐ অদ্ভুত সম্ভাবনার কথা বোধহয় আমাদের হাসিরই খোরাক হয়েছিল সে'দিন।

মাধ্যাকর্ষণ স্তব্ধ হয়নি ঠিকই, কিন্তু স্বর্গত বিভু মুখোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ ভবিষ্যবাণী অর্ধ-শতাব্দী পরে অন্য অর্থে তার করাল মুখ ব্যাদান করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

এই গ্রন্থটি হাতে নিয়ে সব থেকে প্রথমে তাই তাঁকেই মনে পড়লো।

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে ১৮৯৬ সাল গভীর গুরুত্বপূর্ণ। হেনরি ফোর্ড যানবাহন জগতের বিপ্লবের হ্রস্ব-ইকারটি লিখলেন তাঁর চতুষ্‌চক্রযান আবিষ্কারের মাধ্যমে; আর নেপথ্যে এবং প্রায় অজান্তেই এক বিজ্ঞানী Svante Arrhenius ঘোষণা করলেন বায়ুমণ্ডলে CO2-র পরিমাণ যত বাড়বে, পৃথিবী তত গরম হবেঃ গ্রিন হাউস প্রভাবের বাড়বে প্রতিপত্তি! উন্নয়ন আর গতির বিরুদ্ধে পরিবেশ ও সুস্থায়ী জীবনযাত্রার শীতল যুদ্ধের বোধহয় সেই শুরু।

কিন্তু সে যুদ্ধ আর শীতল নেই; থাকার কথাও নয়। এই বইটি আমাদের সেই রণাঙ্গনে পৌঁছে দেয়।

বইয়ের প্রথম blurb-এ পুস্তক-পরিচিতিতে লেখা --"লেখক প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে। ... এ-গ্রন্থ পৃথিবীকে বোঝার উপযুক্ত উপায়।"

পাতা উল্‌টে মূল গ্রন্থে ঢুকবার আগেও তিনটি প্রাক্‌কথন পাচ্ছিঃ অধ্যাপক সুজয় বসুর লেখা 'সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি'; শ্রী সমর বাগ্‌চির 'ভোগবাদই সংকটের কারণ' এবং স্বয়ং লেখকের 'প্রস্তাবনা'। নিঃসন্দেহে এই তিনটি লেখাই মূল সমস্যার এবং আমাদের স্থানাংক খুঁজে পেতে যৎপরোনাস্তি সাহায্য করে। তবে, প্রথম দু'জনের সামান্যতম পরিচিতি থাকলে হয়তো সর্বাঙ্গসুন্দর হ'ত যাত্রার শুভারম্ভটুকু!

বইটি মোট ১৬টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এবং ১৭০ পৃষ্ঠায় বিধৃত। শুরুতে সংক্ষেপিত শব্দের পূর্ণরূপের একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা আছে, যেটিতে ইংরিজি অক্ষরে সংক্ষিপ্ত রূপটির পাশে পাশে বাংলা অক্ষরে তার বিস্তার ধরা আছে, যেমন IPCC (আই পি সি সি): ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ। সম্পূর্ণ গ্রন্থটিতে কোথাওই ইংরিজি রূপটি ব্যবহার করা হয়নি, একমাত্র এই প্রারম্ভিক পৃষ্ঠা ছাড়া। বাংলা-ইংরিজির এইজাতীয় পৌনঃপুনিক উদ্ভট সহাবস্থান বইটির মর্যাদা বৃদ্ধির অন্তরায় হয়েছে।

অধ্যায়গুলির তালিকা এখানে বাহুল্য হ'তে পারে; কিন্তু কয়েকটির উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন--মহাসংকটে পৃথিবী, জলবায়ু বিতর্ক, পৃথিবী গলছে, আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, মার্কিন রাজনীতি, জীবাশ্ম জ্বালানি আর নয়, এখনই যা করতে পারি ইত্যাদি।

কিন্তু গ্রন্থটি আদৌ সেখানে শেষ নয়; ১৯০ নম্বর পৃষ্ঠায় মূল গ্রন্থ আপাতভাবে সমাপ্ত হলেও পরবর্তী ১৩২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে পরিশিষ্ট। এবং সেখানেও নয়টি অধ্যায়: শব্দার্থ (Glossary), বর্ণানুক্রমিক সূচী (Index) ছাড়াও ৪৫ পৃষ্ঠা ব্যাপী উল্লেখপঞ্জি (Reference list)। এবং আর-ও ছ' ছ -টি প্রবন্ধ/অধ্যায়, যা সম্ভবত মূল গ্রন্থের কাঠামোতেই যুক্ত করা যেত।

এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রচুর তথ্যভারাক্রান্ত এই বইটির আলোচনায় আরও বেশ কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠে আসে--

এক: বইটি যদি পৃথিবীকে চিনবার এক উপযুক্ত উপায়ই হয়, তাহলে এটি কাদের জন্যে রচিত? গবেষক, বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক সংস্থা, নাকি আম-জনতার জন্য? পরিষ্কার দেখার জন্য কারো কারো চশমা দরকার হতেই পারে, কিন্তু সবার চোখের 'পাওয়ার' সমান হয় না কখনোই।

দুই: global warming বা climate change-ই যদি বইটির প্রধান উপজীব্য হয়, তাহলে Greenhouse Effect কাকে বলে, কেন তা' হয়, ইত্যাদির বিশদ বিবরণ পরিশিষ্টে নিক্ষিপ্ত কেন? এ যেন গৎ, জোড়, ঝালার পর যন্ত্রীর মনে পড়লো -- আলাপটা বাদ পড়ে গিয়েছে!

তিন: গবেষণা-মূলক প্রবন্ধে বা গ্রন্থে (Research Monograph) পরিপ্রেক্ষিত, সমস্যার স্বরূপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিবরণ ও ফলাফল উপস্থাপনার পরে উপসংহার (Conclusion) আসে। 'পৃথিবী বিপন্ন' বইটি গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে লেখা হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু শুধু সংগৃহীত তথ্যের সম্ভার নিয়ে রচিত। সেখানে প্রত্যাশা ছিল বিষয়বস্তুকে যথাযথ যুক্তিসঙ্গতভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এই প্রত্যাশা মেটেনি।

তার অন্যান্য কারণও আছে। তবে সেই আলোচনায় প্রবেশ করার আগে দেখে নেওয়া যেতে পারে আমরা কী কী পেয়েছি--

এক: সুন্দর প্রচ্ছদ (বিপুল গুহ); চমৎকার কাগজ ও ছাপা এবং মুদ্রণপ্রমাদ তুলনামূলকভাবে কম

দুই: দুই মলাটের মধ্যে Global Warming বা ভূ-উষ্ণায়ন নিয়ে জানা-অজানা বহু তথ্য এবং ঐতিহাসিক সত্য

তিন: Fossil fuels (জীবাশ্ম-জ্বালানি), Alternative energy (বিকল্প শক্তিঃ যেমন বায়ু-বিদ্যুৎ, জল-বিদ্যুৎ, সৌর-কোষ ইত্যাদি), CO2-emission (CO2-নিঃসরণ), জনসংখ্যা, জলবায়ু সম্পর্কিত নানান্‌ সংখ্যাতত্ত্ব

চার: পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বা আন্দোলনকে প্রতিহত করার নানা প্রচেষ্টার কিছু উত্তেজক বিবরণ

পাঁচ: নেপথ্যের কারিগর নয়জন বিজ্ঞানীর ও তাঁদের কর্মকাণ্ডের সুন্দর পরিচিতি

ছয়: শুধু সমস্যার স্বরূপ-উদ্‌ঘাটন নয়, সমস্যার গুরুত্ব এবং আমাদের আশু কর্তব্যের একটি সুসম্পাদিত তালিকা

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের সংখ্যায় বিশ্ববিশ্রুত National Geographic পত্রিকা 'জলবায়ু বদলে যাচ্ছে' শীর্ষক নিবন্ধে সাত সাতটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল। এই সাতটির প্রায় প্রত্যেকটি নিয়েই প্রদীপবাবু আলোচনা করেছেন, একমাত্র ৬ নম্বরটি ছাড়া। প্রাণীজগৎ এবং উদ্ভিদ জগতের ওপর উষ্ণায়নের প্রভাব নিয়ে একটি ছোট অধ্যায় থাকতেই পারতো; পৃথিবীর বিপন্নতায় তারাও তো সমান ভুক্তভোগী, তাই না?

সাতটি বার্তা এইরকমঃ

১) The world is warming (পৃথিবী গরম হচ্ছে)
২) It's because of us (হচ্ছে আমাদেরই জন্য)
৩) We're sure (এ'ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত)
৪) Ice is melting fast (বরফ গলছে, দ্রুত)
৫) Weather is getting intense (জলবায়ু ক্রমশঃই তীব্রতর হচ্ছে)
৬) Wildlife is already hurting (উদ্ভিদ ও জীবজগতে ইতোমধ্যেই তার কুপ্রভাব পড়ছে)
৭) We can do something about it (আমরা এ'ব্যাপারে কিছু করতেই পারি)

ছবি ও তথ্য সহযোগে ঐ পত্রিকাটি যে শঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেছে কয়েকমাস আগে, আলোচ্য গ্রন্থটি দু' বছর আগেই এ'বিষয়ে বিশদ আলোচনায় ব্রতী হয়েছিল। সেখানে গ্রন্থকারের পাণ্ডিত্য ও পরিশ্রমের নিঃসংশয়ে প্রভূত প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু লেখক এবং বিশেষ করে প্রকাশক/সম্পাদকের তরফে আরও অনেকখানি সতর্কতা প্রত্যাশিত ছিল। কারণ অসংখ্য:-

ক) একক (unit) ব্যবহারে সামঞ্জস্যের অভাব বড়ই দৃষ্টিকটুঃ পাউন্ড, গ্যালন, টন, বা ইঞ্চি, সেন্টিমিটার, কিলোমিটার, মাইলের যথেচ্ছ সহাবস্থান মেনে নেওয়া যায়না

খ) ঐ অনিয়মের ছাতার তলাতেই দেখি সংখ্যা ও কথার ব্যবহারে গরমিলঃ চারশত, ৩০, পাঁচ, ২০ ... কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা নিয়ম খুঁজতে গিয়ে বিফল হয়েছি; অথচ এটা কাম্য ছিল

গ) সাধারণ পাঠকের কাছে অপরিচিত শব্দ অনেকগুলিই প্রায় আকাশ থেকে পড়েছেঃ ফোর্সিং, আলবিডো, ব্রাউন-আউট, প্লাগ-ইন গাড়ি, গ্লেসিয়াল ম্যাক্সিমাস, গোল্ডিলক্স প্ল্যানেট ইত্যাদি। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটির ব্যাখ্যা পরিশিষ্টে শব্দার্থবিভাগে পাই। অথবা পরের পরের কোনও অধ্যায়ে। অথবা কোথাওই নয়!

ঘ) বিদেশি শব্দের উচ্চারণের ভুলও অগুনতি; Al Gore কখনও গোড়ে, কখনও গোরে; জার্মানির Aachen (আখেন) হয়েছে আচেন, Oregon (ওরিগন) হয়েছে আরগোনে, Harvey Weiss (হার্ভে ভাইস) হয়েছেন হার্ভি উয়াইস্‌, Mitt Romney (মিট রমনি) হয়েছেন মিট রোমানিঃ জানি না এগুলো অসাবধানতা না অজ্ঞানতা-প্রসূত; অস্বস্তি হলেও, সংখ্যাধিক্য কিন্তু দ্বিতীয়টির দিকেই অঙ্গুলি-নির্দেশ করে।

ঙ) উচ্চারণ-বিচ্যুতি যদি মুদ্রণের ভূতের ঘাড়েও চাপানো যায়, এইরকম একটি প্রামাণিক/আকর গ্রন্থে Shale গ্যাস কেন Shell গ্যাস হবে? শিলীভূত তৈল/জ্বালানি সম্পদ তো কোনওকালেই Shell কোম্পানির সম্পত্তি নয়। অন্যত্র, জ্বালানি কোষ বোঝাতে গিয়ে লেখা হয়েছে 'ফুয়েল শেল' (পৃ - ১৭০); এই জাতীয় শেল হৃদয় বিদ্ধ করে!

চ) Landfill gas বাংলা হরফে কি ল্যান্ডফিল্ড গ্যাস হয়ে গেছে (পৃ - ১৬৩)?

ছ) বইটির লেখচিত্রগুলি মূল অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও নির্দিষ্ট বা যুক্ত নয়; তাদের গুণগত মানও নিকৃষ্ট না হলেও প্রশংসনীয় নয়। ৮৯ পৃষ্ঠারটি তো প্রায় দুষ্পাঠ্য। ১২১ পৃষ্ঠার লেখচিত্রে Y-axis-এ পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রার একক লেখা হয়েছে মিলিমিটার; ১৬১ পৃষ্ঠায় লেখচিত্রতে Y-axisএ কোনো পরিমাপই লেখা নেই!

জ) প্রায় সমস্ত উদ্ধৃতিই বাংলা-অক্ষরে-ইংরিজি-বাক্য রূপে উপস্থাপিত (যথাঃ "ইফ দে ওয়্যার টু ডিসকাস ফিউচার ..."); প্রকাশক বা লেখকের এই জাতীয় খেয়ালের পেছনে কি যুক্তি থাকতে পারে বুঝলাম না। যে জাতীয় (?) পাঠকের কথা ভেবে এই বই লেখা, তাঁদের তো ইংরিজি অক্ষরে উদ্ধৃতি পড়তে কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়!

ঝ) বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহারে কখনও গ্রন্থকারকে মনে হয়েছে বিশুদ্ধবাদী ও কট্টর; যেমন উৎকেন্দ্রিক (eccentric), সমস্থানিক (isotope), হৈমগতি (glacial motion), বিকেন্দ্রীয় (decentralized), হিমমুকুট (ice-cap), অভিযোজন (adaptation), সুস্থায়ী (sustainable); কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই যখন জানি ওজোনস্তরে ছ্যাঁদা হয়েছে (পৃ - ১৮৩), বা কয়েকডজন গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে (পৃ - ১২৪), বা নিঃসরণকে থিতু করে ফেলা উচিত (পৃ - ৫৭) বা পড়ি মাস্টার টেলর /হোলসেল দাম / গণ্ডা গণ্ডা অ্যালগরিদম — তখন বিরক্ত লাগে।

ঞ) অন্যরকম গুরুচণ্ডালীর উদাহরণেও এই বইটি সমৃদ্ধঃ

* অধঃক্ষেপণের অর্ধেকই রিসাইক্‌ল্‌ড্‌ হয়
* অনুভূমিকভাবে ২৫০ বাই ২৫০ কি.মি.
* গ্রিনহাউস এফেক্ট মালুম হবে
* বিজ্ঞানীদের এক নেটওয়ার্ক
* পিয়ার রিভিউড বিজ্ঞানের পত্রিকা
* কার্বন নিঃসরণ বেড়েছে হই হই করে
* বায়ু, সৌর ও জলবিদ্যুৎ সবই বাড়ছে তর তর করে
ঘোর বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে লেখা হলেও ভাষার শুদ্ধতা সম্পর্কে এই জাতীয় স্বাধীনতা বোধহয় গ্রাহ্য নয়।

ট) বাতাসে CO2 বা CH4এর মাত্রা বা পরিমাণ ppm বা parts per millionএ প্রকাশ করাই রীতি বলে জানতাম; অনুপাত (ratio) বা ঘনত্ব (density)র সংজ্ঞা তো আলাদা। অথচ বইটিতে সেগুলিই ব্যবহৃত হয়েছে বার বার!

ঠ) বইটির শেষাংশে ৪৩-পৃষ্ঠাব্যাপী পাঁচশতটি আকর প্রবন্ধ/পুস্তক/রিপোর্ট ইত্যাদির যে তালিকাটি সংযুক্ত হয়েছে, তার সঙ্গে মূল গ্রন্থের আত্মীয়তা আছে বুঝতে পারছি, কিন্তু কোথাও cross-referencing বা সূত্র-নির্দেশ নেই! এ'জাতীয় গন্ধমাদনে পাঠক কীভাবে বিশল্যকরণী খুঁজবেন, এটা যদি জানা থাকতো!

ড) বেশ কিছু তথ্যগত বিচ্যুতি বা অসঙ্গতিও নজরে পড়ে, তবে সমালোচকের অজ্ঞানতা মার্জনীয়:--

* ফিনল্যান্ডে পরমাণু চুল্লি বসাতে ৪৫০ কোটি ডলারের জায়গায় ১২০০ হাজার কোটি ডলার লেগেছিল (পৃ - ২৪৪); ১২০০ কোটি নয়?
* কলম্বাসে চার মাইল বরফের আস্তরণ সংরক্ষিত আছে ৩০0 সেলসিয়াসে (পৃ-২৩৬) ?
[ঋণাত্মক চিহ্নটি বাদ পড়ে গিয়েছে?]
* ম্যানোমিটার দিয়ে গ্যাসের পরিমাণ মাপা যায়, ( পৃ-২২৮/৯), চাপ নয়?
* নেপোলিয়ন ১৯৭৮ সালে ১৮০টা জাহাজ, দুশো বিজ্ঞানী আর ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে জিব্রাল্টার পেরিয়ে মাল্টা পৌঁছে ৭০ লক্ষ ফ্রাঁ দখল করলে? (পৃ - ২১০)
* "বৈদ্যুতিক তারের রোধের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ নষ্ট হয়" (পৃ-১৪৩) ... এর পরের পরের বাক্যই হল "বৈদ্যুতিক তারের রোধের জন্য বিদ্যুৎ নষ্ট হয় কম"। কোনটা সত্যি?
* বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত তাপ ... জেনারেটরের সাহায্যে পাম্প করে ... জল গরম করার কাজে লাগানো হয় (পৃ - ১৪২); জেনারেটর তাপ পাম্প করে?
* বিজ্ঞানী John Tyndall-এর জন্মস্থান ব্রিটেনের কলোনি কাউন্টিতে? (প্রকৃতপক্ষে আয়ারল্যান্ডের কার্লো কাউন্টিতে)

তালিকা দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই। এমন একটি পরিশ্রম-সাপেক্ষ প্রচেষ্টায় এই পরিমাণ অসঙ্গতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি যে কোনো মননশীল পাঠককেই ব্যথিত করবে। সমস্ত বইটিতে শব্দবন্ধ বা বাক্যগঠনে অসংলগ্নতা, অসাবধানতা ও অসম্পূর্ণতার প্রাচুর্য দেখে সন্দেহ হয় গ্রন্থকার কথোপকথনের ঢঙে বলে গিয়েছেন, আর অন্য একজন তার অনুলিখন করেছেন। বিশেষ করে পরিশিষ্টে বিজ্ঞানীদের জীবনীতে, কিম্বা 'সংশয়ীদের কেরামতি' অধ্যায়ে এমন সব চটুল বাক্য, ঘটনা, চিত্রকল্প রয়েছে তাতে ঐ সন্দেহ দৃঢ়তর হয়। এবং পুরো গ্রন্থটি রচিত হবার পরে, লেখক/অনুলেখক/সম্পাদক সম্ভবতঃ দ্বিতীয়বার দেখেননি।

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন খবরে জানছি ইরাকের ভূমিকম্প প্রাণ কেড়ে নিয়েছে প্রায় সহস্রজনের; ভিয়েৎনামে হানা দিয়েছে Damrey টাইফুন; চেন্নাই ভেসে যাচ্ছে প্রবল বর্ষণে; আমেরিকাতে পাইন গাছের পোকা ধ্বংস করে দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ একরের পাইন-বন; দাবানল জ্বালিয়ে দিয়ে চলেছে মাইলের পর মাইল অরণ্য; বন্যা, খরা, বজ্রপাত, সাইক্লোন ... এই সবের মধ্যে দিয়ে যেন প্রকৃতির প্রতিহিংসাই প্রতিফলিত হচ্ছে।

মনে পড়ছে গত শতাব্দীর ৮০র দশকে ইংল্যান্ডের Open University থেকে প্রকাশিত পরিবেশ-সংক্রান্ত ৩/৪-টি পাঠ্যপুস্তক দেখার/পড়বার সুযোগ হয়েছিল। তত্ত্ব বা তথ্যের অসাধারণ সমাহারের মধ্যে থেকে যে ক্ষুদ্র অংশটি এখনও স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে, আজকের পরিপ্রেক্ষিতে এবং এই গ্রন্থ সমালোচনার পশ্চাৎপটে তার প্রাসঙ্গিকতা অতুলনীয়। বইয়ের শেষ অধ্যায়ে তিনটি জ্বলন্ত প্রশ্ন রাখা ছিল ছাত্র/শিক্ষক/পাঠকের জন্যঃ

এক: ক্রমবর্ধমান energy demand (শক্তির চাহিদা) কি মেটানো সম্ভব? (Can The Demand Be Met?)
দুই: যদি মেটানো যায়ও বা, প্রকৃতি কি তা সহ্য করতে পারবে? (Can The Demand Be Tolerated?)
তিন: যদি তা সহনীয়ও হয়, তা কি সহ্য করা উচিত? (Should The Demand Be Tolerated?)

প্রথম দুটি প্রশ্নের আঙ্কিক বা তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়া বিজ্ঞানীদের পক্ষে সম্ভব, কিছুটা মতান্তর হলেও। কিন্তু তৃতীয় প্রশ্নটি সম্পূর্ণভাবেই ethical বা নীতিগত।

এই বইয়ের দ্বিতীয় মুখবন্ধের (শ্রী সমর বাগ্‌চি লিখিত) শীর্ষকেই এই সমস্যা প্রতিভাতঃ "ভোগবাদই সংকটের কারণ"। শেষ অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতিতে সেই সত্যই প্রতিফলিত "Civilisation is a limitless multiplication of unnecessary necessities".

শ্রী প্রদীপ দত্ত 'জলবায়ু বদলে যাচ্ছে/ পরিবেশ বিপন্ন' গ্রন্থটিতে সমস্যার স্বরূপ উদ্ঘাটনের যে প্রয়াস করেছেন, তাতে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেবার জায়গা ছিল না, প্রত্যাশিতও ছিল না। কিন্তু সচেতনতার প্রসারে এবং বিরুদ্ধশক্তির সম্পর্কে অবগত করবার চেষ্টায় তাঁর গ্রন্থটির ভূমিকা সদর্থক।

আশা করতে দোষ নেই যে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলে উল্লিখিত এবং অনুল্লিখিত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি সংশোধিত হবে।

তাহলে পাঠকের এবং ততদিনে, সামান্য হলেও, পৃথিবীর বিপন্নতা হ্রাস পাবে।




(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)