কুমড়ো-দেবতা, ছোটোদের গল্প; ভবভূতি ভট্টাচার্য; পরবাস-৬৯






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines



পরবাসে ভবভূতি ভট্টাচার্যের লেখা



ISSN 1563-8685




কুমড়ো-দেবতা
('বিজুদা সিরিজ'-এর গল্প)

‘কড়্ কড়্ কড়্ কড়্ করে সদর দরোজার কড়াটা কে যেন নেড়ে চলেছে উপর্যুপরি।

এই ভরদুপুরে বৃষ্টি মাথায় করে কে আবার এলো রে?

শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি। স্থান মধ্য কলিকাতায় আমাদের বৌবাজার স্ট্রিটের ভাড়াবাড়ি। ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকের কথা।

বিজুদার আজকের গল্প শুরু হয়ে গেছে।

বাড়িতে সেদিন আর কেউ নেই। মেজপিসির দেওরের মেয়ের বিয়েতে সকলে গেছে সালকে। পরের দিন পরীক্ষা বলে আমি যাইনি।

আধভিজে হয়ে একতলায় নেমে এলুম সিঁড়ি দিয়ে।

‘কে?’

‘আরে বাপু, দরোজাটা একটু খোলেন না দয়া করে। ভিজে যে জাব হয়ে গেলাম একেবারে।’ আগন্তুকের গলায় ঝাঁঝ বেশ।

এবার দরোজা খোলা পেয়ে আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে একেবারে বৈঠকখানা ঘরের মধ্যে ঢুকে এলেন অতি রোগাসোগা পাঁচ-সওয়া পাঁচ ফুটি এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক।

‘বাব্বাঃ! যা বৃষ্টি!’ ঘরের কোণে দরজার পাশে ছাতাটিকে ঠেশ দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতে মিহি গলায় বললেন ভদ্রলোক।

আর আবার একবার মস্ত জোরে একটা বাজ পড়ে তুমুল নেমে এলো বৃষ্টিটা।

‘বন্ধ করুন। বন্ধ করুন দরজাটা। ঘরটা যে ভেসে গেলো!’ বেশ ধমকেই বললেন আমাকে।

আমি বেশ অবাকও হলাম আবার মজাও পেলাম। চেনা নেই শোনা নেই এক উটকো লোক বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে আমাকেই প্রায় ধমকাচ্ছে! তবে, বেশ সরল অলবড্ডে টাইপের লোক বলে মনে হলো এঁকে দেখে। চোরডাকু বলে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই।

‘আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলুম না?’ বলি।

‘পারার কথাও নয়,’ সটান বলে দিলেন সে আগন্তুক চুল থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে।

চুপ করে থাকি। আর কী বলা উচিত এক্ষুণি? চুপচাপ, যাকে বলে, অবলোকন করতে থাকি ভদ্রলোককে। দাড়িগোঁফ কামানো। পরনে সাদাটে হাওয়াই শার্ট, কালো প্যান্ট ভিজে চুপসে গেছে। স্যানড্যাক চপ্পল পায়ে। একটা ভিজে রুমাল বের করে চোখের চশমাটির কাঁচ মুছবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন।

মিনিট খানেক পরে নিজে থেকেই বললেন, ‘এই ঘর? কল-বাথরুম আলাদা?’

‘মানে?’

‘নাও! বলি, বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তো? তা, ঘরটা দেখাবেন না?’

‘সে তো পাশের বাড়ি। আঠেরোর বি। জয়দেব পাল।’ বলি।

‘আরে! সে কি? সেটা আগে বলবেন তো? তখন থেকে ভিজছি।’

‘সে আপনি আর বলবার সুযোগ দিলেন কৈ? ‘টু লেট’ লেখা আছে পাশের বাড়ির গেটে।’

‘হে হে হে হে। তা বটে। তা বটে।’ বেশ যেন একটু মজা পেয়ে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক এবার ।

ভুলটা ধরা পড়লেও এক্ষুণি এই বৃষ্টিতে কারোকে চলে যেতে বলা যায় না। ভদ্রলোকেরও তেমন ইচ্ছে বড়ো একটা নেই বলে মনে হলো। ঘরজোড়া তক্তপোশটার ওপরে বসে পা নাচাতে নাচাতে শুধোলেন, ‘পড়ো? কোন কেলাস?’

‘আজ্ঞে, ক্লাস ইলেভেন। মিত্র ইন্সটিটিউশন।’

‘বেশ, বেশ। সায়েন্স না আর্টস?’

সায়েন্স শুনে বললেন, ‘নরেনের ছাত্র? বলি, নরেন ভৌমিকরে চিনো তো?’

‘আপনি চেনেন স্যারকে?! উনি আমাদের ফিজিক্স পড়ান।’

সেই আলাপ সদাশিব হাজরার সঙ্গে।

তারপর উনি সস্ত্রীক আমাদের পাশের বাড়িতে ভাড়া এসেছেন ও বয়সে বিস্তর বড়ো হওয়া সত্ত্বেও চমৎকার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে ওঁর সঙ্গে। বাসু, মানে বাসুদেব পাল, আমার ছোট্টবেলার বন্ধু ও প্রতিবেশী, যাদের বাড়িতেই সদাশিববাবু ভাড়াটে, অবশ্য বলে উনি বড্ড খেয়ালি মানুষ। এই কাল আঁটিপাটি গেড়ে বসে গপ্প করলেন, আর আজ যেন দেখেও চিনতে পারলেন না। আমাদের নরেনবাবু-স্যারকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘ও, সদা? সদা ভাড়া এয়েচে তোদের পাশের বাড়িতে? বেশ, তবে বেশি মিশো না। পাগল একটা। মাথা খারাপ করে ছেড়ে দেবে।’

‘আপনি ওঁকে চেনেন, স্যার?’

‘বিলক্ষণ! ও-ও তো আমাদের আলিপুরদুয়ারেরই।’

হ্যাঁ, মুডি এবং খেয়ালি মানুষ ছিলেন বটে সদাশিব হাজরা মশাই। আর হঠাৎ হঠাৎ উৎপটাং কথা বলা ছিলো ওঁর অভ্যেস। যেমন, সেদিন সেই ভরা বর্ষার দুপুরে প্রথম আলাপের খানিকটা পরেই বলে উঠেছিলেন, ‘ব্যাস্। তাহলে, সব ঠিকঠাক হয়ে গেল? বেশ, তাহলে আমি চললাম। আজ আবার ইম্পর্ট্যান্ট ম্যাচ আছে জর্জ টেলিগ্রাফের সঙ্গে।’

‘সেকি ? কী ঠিক হয়ে গেল? আপনি পাশের বাড়ি গিয়ে জয়দেববাবুর সঙ্গে কথা বলে নিন বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে।’ বললুম।

‘বলো কী হে? ক’টা বাজে সে খেয়াল আছে? বৃষ্টিটাও তো ধরে এলো। আজ আবার আমাদের শান্ত মিত্র সুধীর কর্মকার দু’জনেরই চোট আছে। ব্যাকে যে কী হবে!’ বলতে বলতে চিন্তিত মনে ছাতা বগলে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন সওয়া পাঁচফুটি মানুষটি।

এই রকম মানুষ ছিলেন শ্রীসদাশিব হাজরা।

***

‘কী করেন রে ভদ্রলোক?’ বাসুকে জিজ্ঞেস করেছি প্রথম দিকে।

‘সেদিন ওঁকে সেটা জিজ্ঞেস করাতে সটান আমায় বলে দিলেন, তাতে তোর কী দরকার? যা, পড়তে বস্ গে যা।’ কাঁচুমাচু মুখে বললো বাসুদেব, ‘বাবা আবার ওঁকে বড্ড ভক্তিশ্রদ্ধা করেন। বলেন, মস্ত পণ্ডিত মানুষ। বাসু, তুই কাল থেকে ওঁর কাছে অঙ্কটা কষবি। সেই থেকে আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই...’ বাসুর সরল স্বীকারোক্তি। সেবার হাফ-ইয়ার্লিতে অঙ্কে সাত পেয়েছে বাসু।

এরপরে একদিনের এক ছোট্ট ঘটনায় গল্পটা একটু অন্যদিকে মোড় নিল।

মা এসে বললেন, ‘দ্যাখ্ তো বাবা বিজু, পোষ্টম্যান এসেছে...’

ব্যাপারটা এইঃ ‘প্রোফ.’ এস হাজরার নামে বিদেশ থেকে একটা খাম এসেছে, তাতে নেদারল্যান্ডের রাণীর ছবি দেওয়া রঙীন স্ট্যাম্প! সদাশিববাবু তখন বাড়ি নেই। সই করে নিতে হবে সে চিঠি। ওঁর স্ত্রী অসুস্থ মানুষ। অতএব, সই করে নিলুম আমি সে বিদেশাগত চিঠি।

বিকেলবেলায় আমি পড়তে বেরিয়ে গিয়েছিলুম। পরের দিন গলির মুখে সদাশিববাবুর সঙ্গে মুখোমুখি হতে বললুম, ‘স্ট্যাম্প দুটো আমায় দেবেন তো।’

‘কেন, তোমার বুঝি স্ট্যাম্প জমানোর শখ?’

‘আপনার কাছে কি দেশবিদেশ থেকে অনেক চিঠিপত্তর আসে?’

‘না, তেমন কিছু নয়। এটা লিখেছিলাম হল্যান্ডে জেরার্ড ক্রয়েস্টকে। উত্তরে লিখেছেন আমার অবজার্ভেশন সব ভুল। ওঁর মতটাই ঠিক। ফ্রেনোলজি আসলে কোনো বিজ্ঞানই নয়।’

‘ফ্রেনোলজি মানে কী?’ শুধোই।

‘ফ্রেনোলজি হলো মানুষের মাথার খুলির শেপ-কার্ভেচার-সাইজ নিয়ে স্টাডি করা। গত দেড়শ বছর ধরে জার্মানি-স্কটল্যান্ডে এর চর্চা বড্ড হয়েছিল। ফ্রেনোলজিস্টরা মনে করেন কোনো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি থেকে আরম্ভ করে তার বিশেষ কোনো প্রতিভা তার খুলির শেপের ওপর নির্ভর করবে।’

নতুন তথ্য পেলুম সদাশিববাবুর কাছ থেকে। জানতুম না আগে।

‘তা, এই জেরার্ড ক্রয়েস্ট মশাই কি একজন ফ্রেনোলজিস্ট?’

‘এক্কেবারেই না। সে একজন প্যারাসাইকোলজিস্ট।’

‘প্যারাসাইকোলজিস্ট? বাব্বাঃ! আচ্ছা, আপনি কি ডঃ হেমাঙ্গ হাজরার কেউ হন?’ হেসে বলি। তদ্দিনে ‘শারদীয় দেশ’ পত্রিকায় ‘সোনার কেল্লা’ ফেলুদা-উপন্যাস বেরিয়ে গেছে।

‘সে আবার কে?’ বোঝা গেল, সদাশিববাবু পড়েননি ‘সোনার কেল্লা’।

‘জেরার্ড ক্রয়েস্টের নাকি অলৌকিক ক্ষমতা আছে কোনো ক্রাইমকে ডিটেক্ট করার। সে নাকি কোনো ক্রাইম সিন মনে মনে অবলোকন করে নিতে পারে। বিশেষতঃ, হারানো মানুষের হদিশ করতে দেশবিদেশের পুলিশ তার শরণাপন্ন হয়।’ সদাশিববাবু বললেন।

‘প্যারাসাইকোলজিস্টদের এ’রকম ক্ষমতা সত্যিই থাকে নাকি, দাদা?’ এবারের প্রশ্নটা আজকের গল্পের আসরের, এলো আমার গৃহিণী সুমিত্রার কাছ থেকে।

‘আদপেই না। দেখা গেছে, এঁদের এমন তিনটে প্রেডিকশন মিলে গেলে সাতটা মেলে না। লাগে তুক্ না লাগে তাক্। সদাশিব হাজরারও তেমনই মত ছিল, আমাকে বলেছিলেন সেদিন।’ বিজুদা উবাচ।

‘তা, দাদা, আপনাদের ঐ সদাশিব হাজরা কি সত্যিই কোনো বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন নাকি? হোয়াট ওয়জ স্পেশাল এবাউট হিম? তাঁর গল্প আজ আমরা শুনতে বসেছি কেন?’ অধ্যাপক শ্যামলকুমারের প্রশ্ন।

‘তিষ্ঠ তিষ্ঠ, প্রোফেসর সাআব, আমাদের আজকের গল্প তো সেই নিয়েই। পেঁয়াজের খোসা তো একটার পর একটা ছাড়াতে হবে।’ বিজুদা অরগ্যানিক টি-র কাপে হালকা চুমুক দিতে দিতে হেসে বললেন।

***

চা-পান শেষে ফের শুরু হয়ে গেলো বিজুদার গল্প।

সেদিন, বুঝলি, স্কুলের পরে বেরোতে যাচ্ছি, পিছন থেকে আমাদের ফিজিক্সের স্যার নরেনবাবু আমাকে, ‘বিজন, বিজন’ বলে ডাকলেন।

‘কী স্যার?’ বলে ঘুরে দাঁড়াতে বললেন, ‘সদাশিব তোদের পাশের বাড়িতেই ভাড়া এসেছে, সেদিন বলছিলিস না?’

‘হ্যাঁ, স্যার।’

‘কাল সন্ধে ছ’টা নাগাদ আমি একবার আসবো ওর সঙ্গে দেখা করতে। একটু জানিয়ে রাখিস তো। সঙ্গে আমার এক বন্ধুও থাকবেন।’

জানিয়েছিলাম ওঁকে যথাসময়ে। কিন্তু পরের সন্ধেয় ঠিক সাড়ে ছ’টায় নরেনবাবু যখন এলেন এক লালমুখো সাহেব সঙ্গী করে, তখনও সদাশিববাবু বাড়ি ফেরেননি, যদিও বাড়ি থেকে উনি কদাচই বেরোন।

স-সাহেব নরেনবাবু এসে আমাদের বৈঠকখানাতেই বসলেন প্রথমে। বাবাজ্যেঠারা অফিস থেকে ফিরে এসেছেন ততক্ষণে, স্কুলের মাস্টারমশাই এসেছেন শুনে আলাপ করতে এলেন। সাহেব দেখে আমার ন’কাকা ভেতরের দিকে সটকান দিলেন, ইংরিজি বলার ভয়ে।

সন্ধে সাতটা নাগাদ হন্তদন্ত হয়ে সদাশিববাবুকে গলির মোড়ে ঢুকতে দেখে জানালাম স্যারকে। নরেনবাবুও বিদেশিবন্ধুকে নিয়ে উঠে চলে গেলেন পাশের বাড়িতে ওঁর সঙ্গে কথা বলতে।

সেদিন, জানো অয়নবাবু, একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছিলাম আমি, বিজুদার স্বীকারোক্তি।

কেন জানি না, সাহেববন্ধু নিয়ে ফিজিক্সের মাস্টারমশাইয়ের সদাশিববাবুর সঙ্গে দেখা করতে আসাটা আমার কাছে খুবই রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল। ওঁরা দু’জনে আলাপ করতে ঢুকলে আমি আমাদের ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে উপরের জানলা খুলে অলক্ষ্যে শুনতে লাগলাম ঠিক ওপাশের ঘরে ওঁদের কথোপকথন।

সেই সাহেব উপস্থিত থাকার জন্যে বাক্যালাপ ইংরিজিতেই হচ্ছিল বটে তবে তিনি, শুনি, আমাদের চেয়েও ভুলভাল ইংরিজি বলেন।

দু’একটা এ’কথা সেকথার পর নরেনবাবু বললেন, ‘সদাশিব, আমাদের সেই বক্সাফোর্টে পিকনিক করতে যাবার কথা তোমার মনে আছে কি?’

চুপ করে রইলেন সদাশিববাবু।

‘হুঁ? মনে আছে?’ দ্বিতীয়বার শুধোতে হলো নরেনবাবুকে কারণ, প্রশ্নটা শুনেই কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন সদাশিববাবু।

‘আজ হঠাৎ এত বচ্ছর পরে সে কথা কেন, নরেন? তখন তো আমরা ক্লাস টেনে পড়ি, দেশ স্বাধীন হয়নি তখনও।’

‘তাহলে তোমার নিশ্চয়ই মীরার নিরুদ্দেশের ঘটনাও মনে আছে?’ নরেনবাবু।

কোনো জবাব নেই সদাশিববাবুর দিক থেকে।

একটু পরে উনি বিমর্ষস্বরে উত্তর দিলেন, ‘সে ঘটনা নিয়ে থানাপুলিশও তো কম হয়নি। আর আমাকে নিয়েই টানাহ্যাঁচড়া সব থেকে বেশি হয়েছিলো কারণ শ্যামকাকার দুই ছেলেমেয়েকে শেষ আমার সঙ্গেই দেখা গিয়েছিলো, আমরা জলার ধারে পিচারপ্ল্যান্ট দেখতে বেরিয়েছিলাম।’

‘বাট দ্যাট বয় ওয়জ নট লস্ট, আই লার্ন্ট্....’ সেই সাহেব বললেন, ‘সে তোমার হাত ধরে এগোচ্ছিলো আর তার দিদি, কী যেন নাম বললে, হ্যাঁ, মীরা, সে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সামান্য পিছনে পিছনে হাঁটছিলো...’

বাক্যালাপ এগোতে থাকে। নরেনবাবু এরপর কী কথাপ্রসঙ্গে বললেন, ‘ফিজিক্সের এত ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তুমি তো, সদাশিব, সারাজীবন যত্ত অবৈজ্ঞানিক আগডুম-বাগডুম বিষয়ের চর্চা করেই কাটালে...’

‘তার পিছনে মীরার সেই আকস্মিক অন্তর্ধান একটা প্রধান কারণ,’ সপাট জবাব পেয়ে চুপ করে গেলেন নরেনবাবু, ‘কারণ, কোনো যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় দিয়ে সে অন্তর্ধানের ব্যাখ্যা হয় না।’

‘সে ঘটনা আমিও আজ পর্যন্ত ভুলতে পারিনি, সদাশিব। আর সেই সূত্রেই আজ আমার এখানে আসা। এই মিঃ ভিক্তর অসেনডৌস্কির সঙ্গে আমার পরিচয় ‘বৃটিশ কেভ রিসার্চ এসোশিয়েশন’ জার্নালের এক আর্টিকলের সূত্রে। ইনি আবার সারাবিশ্বের এই রকম অব্যাখ্যাতরকম উধাও হয়ে যাওয়া মানুষদের ওপর গবেষণা করছেন। এঁর এক অদ্ভুত থিওরি আছে। তাই এঁকে এনেছি আজ তোমার কাছে।’ নরেনবাবু বললেন।

কী সেই থিওরি, হারিয়ে যাওয়া মানুষের ওপর? আমার রোমাঞ্চ হতে লাগলো, বুঝলি, পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে--বিজুদা বলে চলেন।

‘এ কি তুমি আজ আমায় ডক্টর হু-র গল্প শোনাতে এলে নাকি, নরেন?’ সদাশিববাবুর প্রশ্ন করেছিলেন।

‘না, মহাকাশ থেকে আসা কোনো ডাক্তার হু এই পৃথিবী থেকে মীরাদের তুলে নিয়ে যায়নি, সদাশিব। বরঞ্চ এই পৃথিবীর ভিতর থেকেই... মানে...’

‘মানে?’

‘মানে, পুলিশ পরে তদন্ত করতে গিয়ে মীরার সংগ্রহ থেকে কিছু মুক্তো পেয়েছিলো, মনে আছে? সেগুলো সামুদ্রিক মুক্তো ছিলো না, সেগুলো ছিলো ভূগর্ভস্থ কোনো গুহা থেকে পাওয়া মুক্তো।’

‘স্পেলিওথেম।’

‘হ্যাঁ। আমার চিঠিতে এর উল্লেখেই ভিক্তর উৎসাহী হয়ে পড়ে ও কলকাতায় এখন এসেছে...’

‘আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না, নরেন। কী বলতে চাইছো তোমরা? আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে মীরার সেই আকস্মিক অন্তর্ধানের সঙ্গে এই গুহা-মুক্তোর কী সম্পর্ক, আর তোমার বন্ধু এই ডস্কি সাহেবই বা এতে কী হেল্প করবেন?’

‘আমার বন্ধু এই সাহেবের নাম ভিক্তর ফার্দিনান্দ অসেনডৌস্কি, পোল্যান্ডের মানুষ,’ বলে চলেন নরেনবাবু, ‘এঁর পিতামহ ছিলেন প্রখ্যাত পর্যটক, বিজ্ঞানী ও পলিম্যাথ পণ্ডিত ফার্দিনান্দ এন্টনি অসেনডৌস্কি। লেনিনের এক বিতর্কিত জীবনী লিখে উনি বলশেভিকরাজের কোপে পড়েন।‘ নরেনবাবু বললেন।

‘হ্যাঁ, ১৯১৮ নাগাদ আমার ঠাকুর্দা ভারতবর্ষে এসেছিলেন।’ সাহেব বলতে থাকেন এবার, ‘সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে এক অসাধারণ কেতাব লেখেন উনি, ‘বিস্ট-মেন-এন্ড-গডস্,’ আজও যা এক বেস্টসেলার। এই বইতেই উনি প্রথম অগর্তের কথা লেখেন...’

‘অগর্ত? সে আবার কী?’

‘বজ্রযান বৌদ্ধমতে হিমালয়ের নিচে আছে এক আরেক মস্ত বিশ্বঃ অগর্ত। সম্বল-রাজ্য। সেখানে আছে বুদ্ধিমান প্রাণী, আলোক ও জলের নিজস্ব উৎস...। তিব্বতের মধ্যে দিয়ে বা তরাইয়ের জঙ্গলের কোনো সুড়ঙ্গ দিয়ে প্রবেশের পথ আছে সেই অগর্তপুরীতে।’

‘বলেন কী, দাদা? পৃথিবীর মধ্যে আরেক পৃথিবী?’ বললেন অধ্যাপক শ্যামলকুমার, ‘একটা কথা মানতে হবে যে এতাবৎ আপনি আপনার এই কচিকাঁচা বন্ধুদের যতো উৎপটাং বিষয় নিয়ে গপ্প শুনিয়েছেন, তার মধ্যে আজকেরটিই সবচেয়ে গাঁজাখুরি।’ শ্যামলের সোজাসাপ্টা মত।

‘আরে, এ তো জুলে ভার্নের "জার্নি টু দ সেন্টার অব দ আর্থ"!’ আমাদের ছেলেমেয়ের দল সমস্বরে বলে উঠলো হাততালি দিয়ে, কারণ কিছুদিন আগেই ওরা টিভিতে এই সিনেমাটা দেখেছে।

বিজুদা বললেন, ‘শুনুন, প্রোফেসর সাআব, শুনুন। কচিকাঁচার দল জানে।’

‘সে তো ফিকশন!’ শ্যামল।

‘সেদিন সদাশিববাবু ঠিক এই সন্দেহটাই প্রকাশ করাতে অসেনডৌস্কি বলেছিলেন, প্রফেসর লিওনার্ড অয়লারের চেয়ে বড়ো গণিতজ্ঞ তো আর বেশি জন্মায়নি পৃথিবীর ইতিহাসে... ’

‘কেন, অয়লার কি মাটির তলার দ্বিতীয় পৃথিবীর কথা লিখে গিয়েছিলেন নাকি?’

‘অয়লারেরও অন্ততঃ পঞ্চাশ বছর আগে লন্ডনে বসে ‘এস্ট্রোনমার রয়াল’ এডমন্ড হেলি ‘হলো আর্থে’র তত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন। এই যে পৃথিবীর ভৌগোলিক মেরু ও চৌম্বক মেরুর স্থানিক ভিন্নতা এটার ব্যাখ্যা দিতেই হেলির এ তত্ত্ব। অয়লার তো পৃথিবীর অভ্যন্তরে সূর্যের মতো এক তাপ ও আলোকশক্তির স্বতঃউৎসের কথা বলেছিলেন।’ অসেনডৌস্কি সাহেব বললেন।

‘হেলি মানে যার নামে হেলির ধূমকেতু, জ্যেঠু?’ অয়নের প্রশ্ন।

ঘাড় নাড়লেন বিজুদা।

‘হলো আর্থ? মানে ফোঁপরা পৃথিবী? পৃথিবীর ভিতরটা সলিড নয়, ফুটবলের মতো ফাঁকা? বলছেন কী, দাদা? এ তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!’ গালে হাত দিয়ে অবাক গলায় বললো লিলি, চোখ তার বড়ো বড়ো!

‘তার সঙ্গে মীরার অন্তর্ধানের কী সম্পর্ক, নরেন?’ সদাশিববাবু প্রশ্ন করেছিলেন সেদিন। বিজুদা বলে চলেন-- ‘বজ্রযানী পুঁথিতে লেখা আছে, এই আভ্যন্তরীণ দ্বিতীয় বিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে, সভ্যতা আছে। তাই এই পৃথিবী থেকে কেউ "চলে" গিয়ে সে হয়তো আছে ভূতলস্থ অন্য সেই পৃথিবীতে। তার পরোক্ষ প্রমাণও পাওয়া গেছে। আমার বন্ধু এই ভিক্তর অসেনডৌস্কির তত্ত্ব সেই ঘিরেই।’

‘তার মানে নরেন, তোমার এই সাহেব বন্ধু বলতে চাইছেন যে মীরা হারিয়ে যায়নি। সে আছে আভ্যন্তরীণ আরেক পৃথিবীতে? তা, হঠাৎ এ’হেন অনুমানের কারণ কী?’

তারপর হঠাৎ পাশের বাড়ির রেডিওতে জোরে জোরে নীলিমা সান্যালের গলায় আকাশবাণীর সান্ধ্য-সংবাদ শুরু হয়ে যাওয়ায় আর বাকি কথা আমি শুনতে পাইনি। আরও মিনিট দশেক পরে কেবল শুনলুম বেরোতে বেরোতে সদাশিববাবু বলছেন, ‘...আর ...., নরেন, তুমি কিনা বললে যে আমি ফিজিক্স ছেড়ে আগডুম-বাগডুম বিষয়ের চর্চা করে চলেছি? তুমি বললে? হেঁ হেঁ হেঁ ....আরে হ্যাঁ রে, আজকের মহমেডানের খেলার রেজাল্টটা কী হলো? রেডিওতে কী বললো?...’

***

অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছিলুম, জানিস, সেই সন্ধেয় স্যারেদের বাক্যালাপ আড়ি পেতে শুনে থেকে। সামনে পরীক্ষা, পড়ায় মন বসছে না। আমার মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যেত না। হাতের রিং বাঁধা টেবিলক্লথে কুরুশের নক্সা তুলতে তুলতে মা আমায় বললেন, ‘যা ভাবছিস সেটা আমায় বলে ফ্যাল্। তারপর মন ঝেড়ে পড়তে বস। নৈলে পড়ায় মন বসবে না।’

সব কথা শুনে মা বললেন, তা অদ্দূর বৌদ্ধধর্ম পর্যন্ত যেতে হবে কেন, আমাদের রামায়ণে পাতালবাসী অহিরাবণের গল্প নেই? মহাভারতেও বালক ভীমসেনকে বিষাক্ত লাড্ডু খাইয়ে দুয্যোধন নদীতে ফেলে দিয়েছিলো। পাতালে পৌঁছে সে অমৃতপান করে আরও শক্তিধর হয়ে ফিরে এলো। তবে জেনে রাখো, ও’বাড়ির ঐ ভাড়াটে সদাশিববাবুর গিন্নিটিও এক রহস্যময় চরিত্র!

‘সেকি? কেন মা?’

‘উনি সম্পূর্ণ মূক-বধির, সেটা জানো কি? সেদিন ফুলি-ঝি বলছিলো গায়ের রঙ কী কালো মা, যেন ঘন সবুজ! তিনিই আবার কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো গণক-পুঁতি আব্যাকাস দ্রুত তারের ওপর সরিয়ে সরিয়ে সারাদিন কী হিসেব করেন আর খড়ি দিয়ে স্লেটের ওপর লিখে লিখে রাখেন।’

মায়ের কথা শুনে তাজ্জব হয়ে গেলুম।

***

এরপর থেকে সদাশিববাবুর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে তাঁর এই মীরা-রহস্য উন্মোচনের দিকে ধাবিত হওয়াটাই হয়ে উঠলো আমার এক প্রধান লক্ষ্য, আর সে সুযোগও এসে গেলো হঠাৎ।

পরের সপ্তাহ থেকেই ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লেন সদাশিববাবু। টাইফয়েড। আমি আর বাসুদেব পালা করে ওঁর শুশ্রূষার ভার নিলুম, ডাক্তার ডাকা ঔষধ কিনে আনা থেকে যার শুরু। বাসুদেব, অবিশ্যি, অঙ্কের ভয়ে একটু পালিয়ে পালিয়েই বেড়াতো ওঁর থেকে। ক্রমশঃ একটু সুস্থ হয়ে উঠতে সিআরডিজি-র বই থেকে অঙ্ক কষে নিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখাই সদাশিববাবুকে, উনিও সারাদিন শুয়ে শুয়ে বোরড হওয়ার হাত থেকে বাঁচেন।

এক দুপুরে উনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার কষা অঙ্কের খাতা দেখছেন, আর আমি বসে আছি পাশেই, মোড়া পেতে। পিছন থেকে এক মহিলাকণ্ঠ ভেসে এলো হঠাৎ, ‘তোমরা বাবা এত করলে ওঁর অসুখের সময়, এই দু’শোটা টাকা রাখো।’ পিছনে ফিরে দেখি কখন সেই অবগুণ্ঠনবতী শিক্ষকপত্নী এসে দাঁড়িয়েছেন, আমার বেশ কিছুটা পিছনে কিন্তু। এই প্রথম আমি ওঁকে দেখলাম এত কাছ থেকে। অতি কৃশকায়া, দীর্ঘাঙ্গিনী। একটি লালপাড় সাদাশাড়ি পরা। হঠাৎ দেখলে গণেশঠাকুরের পাশের কলাবৌ বলে মনে হয়, কারণ গলা অবদি ঘোমটা টানা।

ভয়ানক চমকে উঠেছিলুম আমি। তার কারণ এই নয় যে ইনি নাকি বোবা-কালা শুনেছিলুম; কারণটা এটাই, যে কথাটা যেন উনি পিছন থেকে ‘বললেন’ না, কথাটা যেন আমার মাথার মধ্যে স্বতঃই ধ্বনিত হলো। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

আমি কী করবো বুঝতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বসে রইলুম। সদাশিববাবুর দিকে তাকিয়ে দেখি উনি বিছানায় শোয়া অবস্থায় গৃহিণীর দিকে ফিরে ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন, আর সে মহিলাও কোঁচড় থেকে হাতটি বার করে দুটি একশ’ টাকার নোট আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।

এত রোগা যে মানুষের হাত হতে পারে না দেখলে বিশ্বাস হওয়া শক্ত।

আর বর্ণ তার ঘন সবুজ!!

‘সে...সে আপনি জ্যাঠামশায়কে দেবেন এখন টাকা। আমি নিজে তো আর টাকা খরচ করিনি...’ কোনো মতে থতমত খেয়ে বললুম আমি।

উনি এক মিনিট অপেক্ষা করে পাশের ঘরের মধ্যে চলে গেলেন।

আমি হতভম্ব ভাব কাটিয়ে বললাম, ‘স্যার, উনি কী করে কথা বললেন?’

নরেনবাবুর সঙ্গে সেদিনের সেই দীর্ঘ কথোপকথনের পর থেকে আমি সদাশিব হাজরাকে ‘স্যার’ বলেই ডাকতে লেগেছিলুম।

উনি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘উনি তো কথা বলতে পারেন না, বাবা বিজন!’

‘সে কী? এই মাত্র যে টাকা নিতে বললেন আমায়?’

‘ওটা কথা বলা নয়। ওটা মনঃযোগে বলা, টেলিপ্যাথি!’

‘বলেন কি দাদা? আপনি সত্যি সত্যি টেলিপ্যাথি শুনেছেন বা অনুভব করেছেন? টেলিপ্যাথি বলে আসলে কিছু হয় নাকি?’ বন্ধুবর সুদীপের অবাক প্রশ্ন বিজুদাকে, আজকের এই গল্পের আসরে।

‘শ্ শ্ শ্ শ্,’ ঠোঁটে হাত দিয়ে লিলি মানা করে। এই মোক্ষম মুহূর্তে বিজুদার মুড অফ হয়ে গেলে গল্প শোনাটাই মাটি।

ভ্রূক্ষেপ না করে বিজুদা বলে চললেন, ‘ঐ তাকের ওপর হলদে মলাটের বইটা নিয়ে এসো তো বাবা বিজন, বলেছিলেন সদাশিববাবু। যাও, কাল এই বইটা পড়ে এসে আমার সঙ্গে কথা বলবে। ...না, না, তোমার তো আবার সামনে এগজামিন...’

ওমা, সে বই হাতে নিয়ে দেখি, কী যেন হেডিং ‘মিশন দে ল’ইন্দে এন ইউরোপ’। স্যার, এ’তো ফরাসীভাষায় লেখা বই বলে মনে হচ্ছে। আমি তো জানি না ও’ ভাষা।

‘অ’ বলে, বিনাবাক্যে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন সেই আজব মানুষ সদাশিব হাজরা।

আমার মনের খিঁচটা লেগেই রইলো।

***

ভাষা জানি না, তবু কী এক উৎসাহে সে ফরাসী বইটি নিয়ে এসেছিলাম সদাশিববাবুর ঘর থেকে। পৃষ্ঠা উল্টে আর ম্যাপ-ছবিছাবা দেখে বড্ড ইচ্ছে করছে জানতে, কী নিয়ে লেখা এ’বই? আমার মন বলছে, সদাশিববাবু ও মীরা রহস্যের চাবিকাঠি হয়তো লুকিয়ে আছে এই বইয়ের মধ্যে।

আমাদের পাড়ার কাছে, শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ধারে, এক সিধুজ্যাঠা থাকতেন, বিজুদা বলে চলেন…

‘সোনার কেল্লার সিধুজ্যাঠা?’ অয়নের প্রশ্ন।

‘তেমনই এক, ধরো।’

বিকেল না হতে হতেই সেই বই-বগলে সচি-জ্যাঠার চারতলার ঘরে গিয়ে হাজির হলুম। সচ্চিদানন্দ সামন্ত ব্যাচেলার মানুষ, আমার বড়জ্যাঠামশায়ের বন্ধু হতেন। চারটে ঘর ভর্তি বই কেবল বই তাঁর। উনি ফরাসী ভাষা জানেন বলে শুনেছিলুম।

আমার মুখে সংক্ষেপে শুনে আর সেই বইয়ের পাতা উল্টে-টুল্টে বললেন সচি-জ্যাঠা, ‘উরিব্বাস, বিজু! এ’বই তো এককালে সারা বিশ্বে দু’কপি ছিলো বলে শোনা গিয়েছিলো রে!’

‘এই বিষয়ে বিশেষ কিছু জানি না আমি’ বলেও যা শোনা গেলো ওঁর মুখে, আমার অনুসন্ধিৎসা নিবৃত্তিতে কম ছিলো না তা,’ বলে চলেন বিজুদা--

‘এনার্কি’র বিপরীত হলো ‘সাইনার্কি’: নৈরাজ্যের অপর দিকে হলো তথাকথিত ‘রামরাজ্য,’ যদিও রামায়ণের কালের বহুবছর পূর্বেও ভারতে এই ‘সুরাজ্য’ ছিলো বলে লেখা আছে বজ্রযান বৌদ্ধশাস্ত্রে। হিমালয় পর্বতমালার তলায় লুকিয়ে আছে এক মোহিনীরাজ্যঃ নাম তার ‘সম্বল!’

‘তলায়?’ আমার মুখ দিয়ে আপনি বেরিয়ে গেলো প্রশ্নটা।

ঘাড় নাড়লেন বিজুদা, ‘তেমনই তো শুনেছিলুম সচি-জ্যাঠার কাছে। শুধু তাই নয়, ১৯৩০ এর দশকে স্তালিনিস্ট সোভিয়েত রাশিয়া ও হিটলারের নাৎসি জার্মানি থাকমিসার ব্লুমকিন ও আর্নস্ট শেফারের নেতৃত্বে আলাদা আলাদা এক্সপেডিশন টিম পাঠিয়েছিলো সম্বল-অগর্ত মোহিনীরাজ্যের সন্ধানে, কারণ তারও পঞ্চাশ বছর আগে এই বইটির রচয়িতা প্রখ্যাত ফরাসী ওরিয়েন্টালিস্ট, মস্ত নাম তাঁর, জোসেফ আলেক্সান্দার সেন্ট ঈভ্‌স ডি’আলভিদ্রে, সেন্ট ঈভ্‌স নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন, প্রথম ইয়ুরোপের কাছে সুগ্রথিত সাইনার্কি (সাযুজ্য) তত্ত্বের অবতারণা করেন। মস্ত জনপ্রিয় হয় এই বই। কম্যুনিজম্, ফ্যাসিজমের মতো এই সাইনার্কিও এক সম্ভাব্য রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে প্রচার পায়। আফঘানিস্তান ও তিব্বত থেকে দুই সাধু টেলিপ্যাথির মাধ্যমে প্রথমে সেন্ট ঈভ্‌সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ও পরে প্যারিসে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন ১৮৮০-র দশকে। ঈভ্‌স যে তা বই হিসেবে লিখে বিশ্বকে জানিয়ে দেবেন সাধুরা ভাবেননি তা, ও অসন্তুষ্ট হন তাতে। তা জেনে দার্শনিকপ্রবর সেন্ট ঈভ্‌স নিজের লেখা সে বই জ্বালিয়ে দিলেন। শুধু দুটো কপি বেঁচে গিয়েছিলো। ওঁর প্রয়াণের পরে, প্রিয় মার্টিনিস্ট শিষ্য পাপু এই বই ছেপে বার করেন বিংশ শতকের গোড়ার দিকে । এ’সেই বই। তা, তোদের ফিজিসিস্ট ভাড়াটে সদাশিববাবু এই সব বই পড়েন কেন রে? সচি-জ্যাঠার প্রশ্ন।

কী গল্প রে বাবা! কোথা থেকে কোথায় চলে এলুম, বিজুদা বলে চলেন…

সচি-জ্যাঠাকে প্রশ্ন করেছিলুম, তা, ভূপৃষ্ঠের তলায় কি বুদ্ধিমান জীবের থাকা সম্ভব? পৃথিবী কি ফুটবলের মতো ফাঁপা হতে পারে? অভিকর্ষের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কি তাহলে ভ্রান্ত?

‘রুকো রুকো দাঁড়াও দাঁড়াও!’ হঠাৎ ফুকারিয়া উঠিল বন্ধুবর নীতিন মুকেশ, ‘গত বছর দিদির কাছে ওহায়ো গিয়েছিলাম না, ইউ এস এ? সেখানে পাশের পার্কে দেখেছিলাম বটে এক কবরস্তান। ঘেরা স্ট্যাচুর ওপর এক কুমড়োর মতো দেখতে ফাঁপা পাথুরে বল বসানো। শুনেছিলুম এখানকার এক ব্যক্তি নাকি এই ফাঁপা পৃথিবীর তাত্ত্বিক ছিলেন!’

‘হ্যাঁ, আমেরিকার জন ক্লিভ্‌স সীমস জুনিয়র। তিনি তো ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকে এই ফোঁপরা পৃথিবীর তত্ত্বকে মস্ত এক আন্দোলনে পরিণত করেন। ফাঁপা, তবে ফুটবলের মতো নয়, বরঞ্চ কুমড়োর মতো, কারণ সীমসের মতে ভূপৃষ্ঠের ঠিক তলায় অন্ততঃ হাজার মাইল পুরু হলো আমাদের এই ধরিত্রীদেবতা। শুধু তা-ই নয় সীমস বলেছিলেন পৃথিবীর অভ্যন্তরে একাধিক স্তর রয়েছে যারা নিজ নিজ অক্ষে ঘুরে চলেছে।’

এবার মাথাও ঘুরতে লাগলো আমাদের।

***

পরেরদিন সদাশিববাবুকে সেই বই ফেরত দিতে গেছি, উনি দেখি খাটে শুয়ে মুচকি মুচকি হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে।

‘হাসছেন কেন, স্যার?’

‘তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি এ’ কেতাবের রহস্য হয়তো কোনোভাবে উদ্ধার করেছ, কিছুটা হলেও।’

‘টেলিপ্যাথিতে বুঝলেন নাকি, স্যার?’ হেসে বলি।

হো হো করে হেসে উঠতে গিয়ে কেশে ফেললেন সেই সওয়া পাঁচফুটি রহস্যময় মানুষ। তারপর কেমন যেন স্থির হয়ে গিয়ে একদৃষ্টে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে নিজে নিজেই বলতে শুরু করে দিলেন--

মীরাকে হারিয়ে এবং পুলিশ ও সমাজের চোখে প্রায় দোষী সব্যস্ত হয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ি আমি। সে বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা আমার। পড়ায় মন বসাতে পারি না। মা-মরা মেয়ে ছিলো মীরা, সৎ-মা নিপীড়নও কম করতো না তাকে। ওদের দুই ভাইবোনের গৃহশিক্ষক ছিলাম আমি। একদিন মীরা আমার হাতে আমলকির সাইজের কয়েকটা ফল দিয়ে বললো, খেয়ে দেখো। খেয়ে দেখি, এক্কেবারে পাকা আমের মতো খেতে। এ’ আবার কী ফল রে, এই শীতকালে পেলি কোথায়? দু’দিন পরে, সেদিন ভয়ঙ্কর শীত পড়েছে, পড়াতে বসে বললাম, গায়ে র‍্যাপার-সোয়েটার কিছু দাওনি কেন এই শীতে? সে হালকা হেসে আমার মুঠোয় এক ছোট্ট মার্বেল গুলি ধরিয়ে দিলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার প্রচণ্ড গরম লাগতে শুরু করলো! অবাক কাণ্ড! কী বস্তু এ'?

বছর দুয়েক আগে থেকেই মীরার মাথার মধ্যে যন্ত্রণা হতো। এবার রোগটার বাড়াবাড়ি হলো, শয্যাগত হয়ে পড়লো সে। শোনা গেলো, ডাক্তার ভালো বুঝছেন না।

তখন কেবল ওর ভাই একাই পড়ে। পাশের ঘরের রোগশয্যা থেকে, ‘সঞ্জু, একবার স্যারকে ডেকে দে তো?’ ক্ষীণস্বরে বললো মীরা।

আমি ঘরে ঢুকতে আমার হাতে সেই মার্বেল পাথরটা দিয়ে বললো, ‘রামু-শামু আসবে। ওদের দিয়ে দিও। আমি মরে গেলে এর আর কোনো দরকার পড়বে না।’

‘তোমার মরার কথা উঠছে কেন? আর রামুশামুটাই বা কে?’ জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি মীরাকে, সদাশিববাবু বললেন।

পরেরদিন ভোরে অভ্যাসমত দৌড়তে বেরিয়েছি। স্কুল মাঠ পেরিয়ে একটু জিরোচ্ছি। কে যেন মাথার মধ্যে বলে উঠলো, ‘এদিকে, এদিকে।’

কোন্‌ দিকে? কে কথা বললো? কী ভাবে?

ঝোপের মধ্যে থেকে দেখি এই শীতসকালে দুটো বছর চারেকের ন্যাংটা ছেলে বেরিয়ে এসে আমার দিকে হাত পেতে কী যেন চাইছে। পয়সা চাইছে নাকি?

হঠাৎ মীরার কালকের কথাটা মনে পড়ে গেল। আমার পকেট থেকে গুলিটা বের করে খোকাদুটোর হাতে দিতেই তারা ঝোপের পেছনে মিলিয়ে গেলো, আর আমারও খুব শীত করতে লাগলো হঠাৎ।

ন্যাংটা কচি দুটোর গায়ের রঙ ঘন সবুজ!

পরের রবিবারের বক্সাফোর্টের পিকনিকে মীরাদের যাবারই কথা ছিলো না, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে হঠাৎ ওর শারীরিক বিশেষ উন্নতি হতে সবাই চললো ওরা, আর তারপরেই তো সেই বিপত্তিঃ মীরার অকস্মাৎ অন্তর্ধান, সদাশিববাবু বললেন।

এই ঘটনায় ভয়ঙ্কর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি আমি, কারণ পুলিশ ও সমাজ, কোনো প্রমাণ ছাড়াই, আমাকেই যেন দোষী সব্যস্ত করেছিলো এর জন্য। কোনক্রমে ম্যাট্রিকটা দিলাম। এমন সময় একদিন লাইব্রেরিতে ‘ঊরুস্বতী হিমালয়ান রিসার্চ ইন্সটিট্যুটের’ এক জার্নাল পড়ে বড্ড মথিত হয়ে পড়ি ও থার্ড ক্লাসের এক টিকিট কেটে কালকা মেল ধরে কুল্লু পৌঁছে যাই। রোয়েরিকের আশ্রম বড় শান্তির স্থল!

'রুশ চিত্রশিল্পী রোয়েরিক, মানে দেবিকারাণীর বর?’ শুধিয়েছিলাম।

‘না, শ্বশুর। নিকোলাস রোয়েরিক। জওহরলাল নেহরু আসতেন ঐ আশ্রমে।’

দশ বচ্ছর ধরে বারে বারে ফিরে ফিরে গেছি আমি ঐ আশ্রমে। রোয়েরিক-সাহেবের তুলিতে পাতালের ‘স্বর্ণরাজ্য’ সম্বল-অগর্তের অপরূপ রূপ ফিরে এসেছে বারে বারে। মোহিত হয়ে দেখতাম। আর এ’অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে হিমালয়ের কোলে ‘পাতাল-ভুবনেশ্বরে’-র কাছে মনঃডাক শুনতে পেলাম একদিন, এক অতল গুহার মধ্যে ফিরে পেলাম মীরাকে, দশ বচ্ছর পরে। রূপ চলে গেছে তার, বিশীর্ণ, বিবর্ণ সবুজ গাত্রবর্ণ। বাণী চলে গেছে তার মুখের, যদিও মানসিক যোগাযোগে কোনো অসুবিধে নেই আমাদের। কিন্তু সবচেয়ে জরুরী কথা, সম্পূর্ণ রোগমুক্ত হয়ে গেছে সে! উপরন্তু, অতি তীক্ষ্ম হয়েছে তার মেধা। গণিতে অসাধারণ পারদর্শী, আমার সুযোগ্যা সহকর্মিণী ও সহ...! এ’সবই ভুগর্ভস্থ সেই সম্বল-অগর্তপুরীর অতি বুদ্ধিমান অতি সংবেদনশীল অধিবাসীদের বদান্যতায়।

ঘরের দরোজাটা সেদিন খোলাই ছিলো আমাদের সেই বৌবাজার স্ট্রিটের পাশের বাড়ি আঠেরোর বি-র। নরেনবাবু স্যার কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করিনি।

'উনি কি সদাশিববাবুর কাহিনীর শেষাংশটুকু শুনেছেন নাকি?'

হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে বলে উঠলেন নরেনবাবু, ‘কে? কে যেন শুধোয়, নরেনদা তুমি? কে সে মহিলা? কোথায় সে?’

পিছন ফিরে দেখি কখন সদাশিববাবুর পত্নী এসে দাঁড়িয়েছেন! আজ আর অবগুণ্ঠন নেই তাঁর।

অবাক বিস্ময়ে নরেনবাবু তাকে দেখে শুধোলেন, ‘মীরা, তুই?’

***

“যাক্, জুলে ভার্নের প্রফেসর লিন্ডেনব্রক তো উত্তরে আইসল্যান্ড দিয়ে ঢুকে পুরো ইউরোপ খুঁড়ে দক্ষিণ ইতালি দিয়ে বেরিয়েছিলেন। আর আপনার স্যারের ভার্যা জলপাইগুড়ির তরাই দিয়ে ঢুকে হিমালয়ের পাদদেশে পিথৌরাগড় দিয়ে। বেশ, বেশ।” শ্যামল হাসতে হাসতে বললোঃ “ভাগ্যিস বলেননি যে আপনিও সাথী ছিলেন তেনার!”

ভাবো, পুরো গল্পটা শুনে নিয়ে এই মন্তব্য করলো প্রোফেসর শ্যামলকুমার—এমন বদমাইস বন্ধু আমার!





(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)