জাদু ঘন্টা, বন্দনা মিত্রর বাংলা ছোটোগল্প; পরবাস-৬৯






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines




পরবাসে
বন্দনা মিত্র-র

লেখা


ISSN 1563-8685




জাদু ঘন্টা

গ্যাংটকের গলিতে এটা ওটা কিনতে কিনতে পেতলের ঘন্টাটা চোখে পড়ে নীপার। অপূর্ব কাজ করা বেশ ভারী জিনিস, বেশ প্রাচীন, দেখে অ্যান্টিক মনে হয়। গম্ভীর অথচ মিষ্টি আওয়াজ, একবার দোলা দেওয়ার পরও অনেকক্ষণ রণন থাকে। বুড়ি দোকানী অজস্র বলিরেখা আঁকা মুখে একগাল হেসে ভাঙা হিন্দিতে বোঝাতে লাগল এটা সাধারণ চাইম নয়, বিশেষ মন্ত্রপড়া, বাড়িতে রাখলে সারাক্ষণ আনন্দে থাকবে, “খুলা খুলা লাগেগা।“দামটা বেশ বেশিই চাইল, রাস্তায় বিছিয়ে রাখা দোকানের পক্ষে। সন্দীপের ভুরু কুঁচকে উঠেছে, ও অন্যদিকে চেয়ে সিগারেট ধরালো একটা। বারো বছর বিয়ের পর সন্দীপের শরীরী ভাষা জলের মত পড়ে দিতে পারে নীপা, এর মানে, কিনতে হয় তোমার নিজের টাকায় কেন, আমি এসব বাজে খরচে নেই। সরাসরি বারণ করে না চাকরী করা বউকে, মান অপমান জ্ঞান ওর টনটনে। নীপা অল্প দরদাম করে ব্যাগ খুলে টাকা মিটিয়ে দিল। জিনিসটা কাগজে মুড়ে ঝোলায় রাখতেই কেন জানি ভীষণ একটা খুশিতে ভরে গেল মন, জিনিসটা এবার থেকে ওর নিজের হয়েগেল এটা যেন কি আশ্চর্য ব্যাপার একটা! সন্দীপ দাঁতে দাঁত চেপে বলল ওটার ওজন বোধহয় দশ কেজি, ফ্লাইটে নেবে কি করে? ঝুপ করে নিভে গেল নীপা — আরে এ কথাটাতো ভেবেই দেখে নি। কত মাশুল লাগবে কে জানে! সন্দীপের চোয়াল শক্ত, ভুরু আরো জুড়ে গেছে, এই ঘন্টা কেনার জের এখন চলবে। ও বাবা, কিনতে না কিনতেই আনন্দ আসা চুলোয় যাক, অশান্তির ঝোড়ো হাওয়া ঘরে ঢুকছে যে।

হোটেলে ফিরে অন্ধকার মুখে একটা বিয়ার অর্ডার করে গুম হয়ে সোফায় বসে পড়ল সন্দীপ।ছেলে সায়ন্তন ব্যস্ত কার্টুন দেখতে। নীপা জানে এখন কোন কথা বলতে গেলে ঝামেলা বাঁধবে, যতক্ষণ সম্ভব চুপ থাকাই ভাল, গায়ে একটা শাল জড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল, অভ্যাসমত রোজকার দুঃখ অভিযোগ ডাইরির পাতায় বন্দী করবে বলে।ঘন্টাটা ঝুলিয়ে দিয়েছিল গ্রীলের ফাঁকে, সে মৃদু পাহাড়ী হাওয়ায় ডিং ডং আওয়াজে বাজছে। দূরে সন্ধের অন্ধকারে ঢাকা আবছা কাঞ্চনজঙ্ঘা, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মিটমিটে আলো — ওখানে কারা থাকে! এক আকাশ ঝকঝকে নক্ষত্র — এক সময় তারা চেনার শখ ছিল নীপার, অন্যমনস্ক ভাবছে নীপা, ঘন্টার শব্দটা কোথায় যেন শুনেছে আগে, ঠিক মনে পড়ছে না। হঠাৎ চোখের ওপর ভেসে উঠল এক বিশাল ড্রইং রুম, ওপরেঝাড় বাতির উজ্জ্বল আলো, মাঝখানে রাখা এক বিশাল পিয়ানো —এক মহিলা লম্বা আঙুলে পিয়ানোর চাবি টিপে অপরূপ সুর তুলছে। সাদা ধবধবে পাথরের মেঝেতে গোলাপী ফ্রক পরা পরীর মত এক বাচ্ছা মেয়ে নেচে যাচ্ছে সুরে পা মিলিয়ে। আর নীপা? সোফায় বসে যে ছোট্ট কাল ভীতু মেয়েটা উৎসুক চোখে চেয়ে আছে তার সঙ্গে নীপার ছোটবেলাকার ছবির খুব মিল। মেয়েটা ভাবছে, ওর মা এরকম পিয়ানো বাজাতে পারে না কেন! শুধু বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে! ও নিজে যদি এমন নাচতে পারত! নীপা বাবা মা’র সঙ্গে বেড়াতে এসেছে বাবার সম্পর্কে মামাতো বোন শুভাপিসির বাড়িদার্জিলিং। পিসেমশাই চা-বাগানের ম্যানেজার। এই নিয়েও বাবার সঙ্গে মায়ের রাগারাগি, মা গজগজ করছে, “বিয়ের আগে দুজনে যা করেছ, করেছ — কিন্তুএখন এই বয়েসে ছেলে মেয়ের সামনে নতুন কেলেঙ্কারি না বাঁধালেই নয়! বাবা হিসহিস স্বরে বলছে, আঃ চুপ কর, অজয়দা শুনতে পাবে, কেলেঙ্কারি বাঁধালে তুমিই বাঁধাবে। চারজনের থাকা খাওয়ার খরচটা বাঁচছে বুঝতে পারছো না?”আর নীপা পিয়ানোর গম্ভীর ডং ডং সুর শুনতে শুনতে ভাবছে, পৃথিবীটা আসলে খুব ভাল জায়গা, এখানে এসব কথা কেমন বেমানান। শুভাপিসি সাদা কাল রীড টিপে ঝম ঝম সুর তুলে ওকে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক বোঝাচ্ছে, বাতাসে শব্দ উড়ে বেড়াচ্ছে বাখ, বীটোফেন, সিম্ফনি, সোনাটা — কি সুন্দর শব্দগুলো — যেন টুং টাং ফুটে ওঠা এক একটা ফুলকি।নীপা ভাবছে — কই ওদের নিজের বাড়িতেতো এত সুন্দর গানের মত শব্দ ঝরে পড়ে না, সেখানে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা শব্দগুলো কি বেসুরো কর্কশ, কি বিচ্ছিরি।

হঠাৎ সন্দীপের গলায় খুশির স্বর শুনে নীপা চমকে উঠল, “আরে তোমার এই ঘন্টার আওয়াজ শুনে হঠাৎসাউন্ড অফ মিউজিকের কথা মনে পড়ে গেল। সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছিলাম গ্লোবে, বাবার সঙ্গে, হাফ টাইমে বাবা চিংড়ির কাটলেট কিনে খাইয়েছিল। রেকর্ডটা কিনে প্রায়ই বাজাতাম বাড়িতে, গানগুলো মুখস্ত ছিল আমার।”আরো অবাক হয়ে নীপা শুনল সন্দীপ খোলা গলায় গাইছে,

When the dog bites, when the bee stings
When I'm feeling sad
I simply remember my favorite things
And then I don't feel so bad.

কলকাতায় ফিরে ঘন্টাটাকে পিছনেদক্ষিণের বারান্দায় সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিল নীপা, সারাদিন চুরি করে যেটুকু হাওয়া আসে, ঘণ্টা নিজের ছন্দে বেজে যায়। সেদিন অফিস থেকে ফিরে কফির কাপ হাতে ব্যলকনিতে বসেছে নীপা, বাইরে কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছে, ঘন্টা বাজছে জলতরঙ্গের সুরে। জলতরঙ্গ না মাউথ অর্গান? ঝোড়ো হাওয়ায় ভেসে আসা মাউথ অর্গানের সুর, অতনুদা বাজাচ্ছে, কলেজের মাঠে — ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’।কি মহা সমারোহে প্রেমে পড়েছিল নীপা, ঝাঁকড়া চুলে গীটার বাজিয়ে খোলা গলায় গান আর কথায় কথায় সুনীল শক্তির লাইন শুনেই “তুঁহু মম মন প্রাণ হে”। প্রতিদানে নীপাকে বাংলা কবিতার রাজকোষের খবর দিয়েছিল অতনুদা, চিনিয়েছিল বিটলস থেকে রক, সলিল চৌধুরী থেকে বব ডিলান — অতনুদা ছিল ওর কাছে তখন সাদা ঘোড়ার সওয়ার। বছর চারেক পর ঘোর কাটল যখন, অতনু তার আইএএস বাবার বন্ধু, এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করে শ্বশুরের ব্যবসা সামলাচ্ছে, অনেক দিন আগেই এনগেজমেন্ট করা ছিল, নীপাকে জানাতে ভুলে গিয়েছিল বোধহয়। এরপর নীপার মধ্যবিত্ত আত্মবিশ্বাসে বড়সড় টান ধরেছিল, আয়নার সামনে দাঁড়ালে চেহারার হাজারটা খুঁত চোখে পড়ত।নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারত না, মনে হত বোকার মত কথা বলছে বুঝি, আড়ালে সবাই হাসবে। তারপর যা হয়, সময়ের তুলো অনেক রক্তপাত বন্ধ করে। এক সময় সন্দীপের সঙ্গে বিয়ে হয়, সায়ন্তন আসে, নীপা ক্রমশ অতনুকে একটা নিরেট দেয়ালের আড়ালে পাঠিয়ে দেয় জোর করে। এতদিন পরে আজ এই ঘন্টার শব্দে কোথা থেকে কি যে মনে পড়ে গেল! ভীষণ ইচ্ছে হয় অতনুর খোঁজ নেওয়ার জন্য, এখন কেমন আছে ও? নীপাকে মনে আছে? এখনও নীপার কথা ভাবে?কেমন এক অদম্য কৌতূহলে অতনুর নাম লিখে ফেসবুক সার্চ করতে বসল নীপা, পেয়েও গেল। প্রোফাইল পিকচারটা ব্যাংকক কি মালয়েশিয়ার কোন সী বীচে তোলা, রংচং বারমুডা পরে, বিয়ারের বোতল হাতে হ্যামকে ঝুলছে অতনু — মুখেলেগে বেশ তোয়াজ করা সুখের গুঁড়ো। প্রায় পনের বছর কেটে গেছে, স্বাভাবিকভাবেই আগের ধারালো ভাবটা ভোঁতা হয়েছে চর্বির আদুরে পরতে।ছবিতে দামী ঘড়ির মুকুট আঁকা লোগো, মোবাইলের আধখাওয়া ফলটি বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উত্তর চল্লিশের মলিন ছাপছোপ লাগা নীপা নিজেকে এই সফল পুরুষটির পাশে দাঁড় করিয়ে কল্পনায় দেখতে চাইল কেমন মানায় — হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় ঘন্টাটা কেমন ঠা ঠা করে হেসে উঠল, এবং নীপা পরিষ্কার বুঝল, নাঃ নীপাকে অতনুর আর মনে নেই, থাকা সম্ভব নয়, ওরা এখন দুটো আলাদা পৃথিবীর বাসিন্দা। মনখারাপ হওয়া উচিত ছিল কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে নীপা হালকা মেজাজে গুণ গুণ গাইছে “তরে হেথায় মানাইছে না গো”।

এরপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। মাঝে সায়ন্তন জয়েন্টে চান্স না পাওয়ায় খুবই মনমরা হয়ে পড়েছিল ওরা স্বামী স্ত্রী — ওদের চেনা জানা সকলের ছেলে মেয়েই কোথাও না কোথাও ঢুকে গেছে — কি লজ্জা! সেদিন ব্যালকনিতে গুমোট গরমে ঘন্টা খুব চুপিচুপি বেজেছিল — নীপার কেন জানি মনে হল ঘন্টা বলছে “বোকা মেয়ে” বোকা মেয়ে”। সায়ন্তন এখন আর্কিওলজি নিয়ে পড়ছে — মনে হয় ভালই পড়াশুনো করছে — নিজে থেকেই ব্রিটিশ কাউন্সিলের মেম্বার হয়েছে, খাবার টেবিলে খুব উৎসাহে বোঝায় দেশে কোথায় কি কাজ চলছে — মোগলমারীতে বৌদ্ধ মঠ খুঁড়ে বের করার সময় ওর সে কি উত্তেজনা! বিদেশে পড়তে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। সন্দীপের একজন নতুন প্রেমিকা হয়েছে — আজকাল প্রায়ই রাতদুপুর অবধি ল্যাপটপে কথাবার্তা চলে, মনে হয় এক দুবার একসঙ্গে ঘুরেও এসেছে কোথাও। গতবার যখন সাত দিনের জন্য ট্যুরে গিয়েছিল ওর এক অনুগত অধস্তন ফোন করে উদবিগ্ন সুরে জানতে চেয়েছিল “স্যার কেমন আছেন? জ্বরটা ডেংগুতে দাঁড়ায়নি তো?” কিন্তু নীপা কেজানে কেন তেমন দুঃখ পায় নি, আয়না দেখতে ভয়ও করে নি আর — যদিও এখন আরো গভীর, আরো সূক্ষ্ণ ডিজাইন বোনা হয়েছে ওর কপালে, চোখের কোলে, চিবুকে — ভারীও হয়েছে শরীর। বরং ও আবার আঁকতে শুরু করেছে — এমনই হিজিবিজি — এই বয়েসে কেউ আবার শিল্পীহয় নাকি! মাঝে মাঝে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে, পুরোনো কলকাতার যে কটা বাড়ি এখনও প্রোমোটারের বদ্যানতার মায়া কাটিয়ে বেঁচে আছে, তাদের ছবি তোলে। কত রকমের আর্কিটেকচার — ব্রিটিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, পর্টুগীজ, মুঘল — নীপা এসব নিয়ে পড়াশুনো আরম্ভ করছে, লাইব্রেরীতে নিয়মিত যায় — অবাক, যে শহরে জন্মে বড় হয়েছে তার সম্বন্ধে কত কম জানে ও। ঘুরতে ঘুরতে রাস্তায় কত মজার দৃশ্য দেখতে পায় — আগে কেন দেখতে পেত না কে জানে! এই যেমন কাল সকালে পার্কসার্কাসে সিগনালে দাঁড়ানো বাস থেকে দেখতে পেল, ফুটপাথে তেরপল খাটানো অন্ধকার ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এল এক ছোট্ট মেয়ে, স্কুলের জামা পরে,আগাগোড়া তাপ্পি মারা-তার সঙ্গে মানানসই হাওয়াই চটি, চেন কাটা স্কুলব্যাগ। তার খড়খড়ে মা’টি, প্রবল বকুনি দিতে দিতে আলোর দিকে মেয়ের মুখ ফিরিয়ে গাল টিপে আঁচড়ে দিচ্ছে তেল চিপচিপে চুল! এবার ক্রীসমাসের দিন সাহেব পাড়ায় দেখতে পেল ফুটপাথে প্যাকিং বাক্স বিছিয়ে চেনা বুড়ো ভিখারিটি নেশা করে ঘুমোচ্ছে আর তার ছোট্ট ছেলে (ছেলে কিনা ভগবান জানেন) কি উৎসাহে কুড়িয়ে পাওয়া মোমবাতি জ্বালাচ্ছে রেলিং বরাবর, মেরি ক্রীসমাস — মনে মনে তাকে বলে এল নীপা। বাড়ি ফেরার পথে ব্যস্ত রাস্তার ধারে একটা শিমূল গাছ আবিষ্কার করেছে নীপা, এই বৈশাখের দুঃসহ গরমে কি অহংকারে নগ্ন ডালে ফুল সাজিয়ে সমারোহে দাঁড়িয়ে থাকে — নীপা ওর সঙ্গে সই পাতিয়েছে — বড্ড মিল দুজনের।

সময় কাটে — সায়ন্তন জিআই-তে ভাল স্কোর করেছে — স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাচ্ছে বাইরে — নীপা জানে ও আর ফিরবে না — অচেনা বিদেশী হয়ে যাবে যত দিন গড়াবে। সন্দীপ ডিভোর্সের নোটিশটা দিচ্ছে না হয় চক্ষু লজ্জায় নয়তো কুঁড়েমি করে — ভাবতেই হেসে ফেলে নীপা। নীপার অফিসে দুটো প্রোমোশন মিস হল — তবে ভাল খবর হল এই যে ও চাকরিটাই হয়ত ছেড়ে দেবে কিছুদিনের মধ্যে — একটা এনজিও ওকে ডাকছে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিনা পয়সায় কোচিং দিতে — টাকা তেমন দেবে না তবে নীপার চলে যাবে — উপরি মিলবে অঢেল সময়, নিজের জন্য।

না ও সুখে নেই ঠিকই, তবে আনন্দে আছে, বেশ খোলা খোলা লাগে চারদিক।

ঘন্টা এখনও দক্ষিণের বারান্দায় বেজে যায়, যেদিন যেমন হাওয়া সেই ছন্দে। সে ভাষা যে বোঝে সে বোঝে —কোটিকে গুটিক!



(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)