ল্যাটিচ্যুড লঙ্গিচ্যুড, সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা গল্প, পরবাস-৬৯






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines





পরবাসে
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের

লেখা


ISSN 1563-8685




ল্যাটিচ্যুড লঙ্গিচ্যুড

বনীতাদের বাড়িটা একতলা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা গ্রীল দেওয়া বারান্দা। বারান্দা পেরিয়ে লিভিংরুম। ঢুকে বাঁ-দিকে সোফা সেট, সামনে সেন্টার টেবিলের ওপর ভাঁজ করা খবরের কাগজ, দু-একটা পত্র-পত্রিকা। ডান-দিকে খোলা জানলার নিচে একটা ছোট্ট ডাইনিং টেবিল। চার জন কাছাকাছি ঘন হয়ে বসার মত। জানলায় তখনও আলো ফুরোয়নি, সন্ধেবেলা সেখানে বসে মা আর মেয়ে চা খাচ্ছিল। নবনীতা ডাকল, ‘এখানেই এসে বোসো।’

আলাপ করিয়ে দিল, ‘মা, এই হল রজত। তোমাকে এর কথাই বলেছিলাম।’

নবনীতার মাকে আমি আগে কখনও দেখিনি। ভদ্রমহিলা অসামান্য সুন্দরী। দুধে-আলতায় গায়ের রঙ, কাটা কাটা চোখ-মুখ। এক ঝলক দেখে মনে হল কোথাও বেরোবেন, অল্প প্রসাধন করেছেন। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসলাম। কাছ থেকে দেখে বুঝলাম গালের লাল আভা তাঁর সহজাত। ঠোঁট দুটিও বিনা আয়াসেই ভিজে দেখাচ্ছে। আমায় দেখে হাসলেন। মানুষ যখন হাসে, সাধারণত তার চোখ দুটিও হেসে ওঠে। ওনার চোখ-দুটি কিন্তু বিষণ্ণ হয়ে রইল। সে যাক! দেখলাম হাসির সময় ঠোঁটের ওপর বয়স-জনিত দু একটি ভাঁজ পড়ে। তাতে তাঁকে আরও আকর্ষণীয় লাগে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল, আর কিছু না, আঙ্গুল দিয়ে একবার ওনার ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু সম্পর্কে নবনীতার মা বলে সামলে নিলাম। ব্যাপারটা নবনীতার পছন্দ নাও হতে পারে।

নবনীতা ঠান্ডা চোখে আমায় জরীপ করছিল। আমি ওর মায়ের দিক থেকে চোখ ফেরাতে চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিল। মনে মনে বলল হয়তো, এতক্ষণে মাপা শেষ হল? আমার একটু অপ্রস্তুত লাগল। নবনীতার মায়ের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজের খালি কাপটা ট্রের ওপর তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘তোমরা গল্প কর, আমি রজতের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে আনি।’

ভদ্রমহিলাকে দেখে খুব চেনা লাগছিল। নবনীতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার মা কি সিরিয়াল - টিরিয়ালে অভিনয় করেন? ওনাকে আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’

নবনীতা ক্যাজুয়ালি বলল, ‘খবরের কাগজে ছবি দেখে থাকবে।’

মা যে একজন সেলেব্রিটি, এই খবরটা নবনীতা বেমালুম চেপে গেছে। আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, ‘আগে বলনি তো! উনি কী করেন?’

নবনীতা মুখের একটা রেখাও না নাড়িয়ে বলল, ‘তোমাকে বলতে আপত্তি নেই। আমার মা একজন প্রোফেশনাল কিলার।’

আমি বললাম, ‘ভ্যাট, ইয়ার্কি মেরো না।’

নবনীতা বলল, ‘সিরিয়াসলি! জুয়েলার হরেকৃষ্ণ শেঠের খুনের মামলায় মাকে পুলিস সন্দেহ করেছিল। কেসটায় সুপারি দিয়েছিল হরেকৃষ্ণর বড় ছেলের শ্বশুর। সেই লোকটাই পরে বেনামী চিঠি পাঠিয়ে মাকে ফাঁসাবার চেষ্টা করে। টাকা গাপ করে দেবার ফন্দি, আর কী? তখন কাগজে বড় করে মার ছবি বেরিয়েছিল। ওই একবারই, বছর দুই-আড়াই আগে। পুলিস কিছু প্রমাণ করতে পারেনি। মা খুব সূক্ষ্ম কাজ করে।’

একটু থেমে আমার দিকে ভুরু নাচিয়ে বলল, ‘তোমার তো মেমারি খুব শার্প! এত দিন আগের কথা মনে করে রেখে দিয়েছ।’

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলাম। আগেও অনেকবার নবনীতা চোখের পাতা না ফেলে মিথ্যে বলেছে। পরে যখন সত্যি জানতে পেরে ওর কাছে জবাবদিহি চেয়েছি তখন কোনো না কোনো বাহানা করে এড়িয়ে গেছে। দু-চারটে কথা আবার সত্যি মিথ্যের মাঝামাঝি আলগোছে ঝুলে থাকত। সে আরও ঝামেলার! রাত্তিরের দিকে মনে হত সত্যি, আবার দিনের বেলা রোদ বাড়লে মনে হত – ধ্যুর, ডাহা মিথ্যে। আমার কাছে ব্যাপারটা বেশ চাপের হয়ে যাচ্ছিল। নবনীতার কোন কথাটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে তাই বুঝতেই হু হু করে সময় বেরিয়ে যাচ্ছিল। মন লাগিয়ে ওর সঙ্গে প্রেম করতেও পারছিলাম না।

কথায় কথায় অদিতিকে একদিন বলেছিলাম ব্যাপারটা। অদিতি আমার ছোটো বেলার বন্ধু। আমাদের বাড়ির ঠিক দুটো বাড়ি পরেই ওদের বাড়ি। মাঝখানে ওর বাবা জামশেদপুরে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। ওরা পুরো ফ্যামিলি বাড়ি তালাবন্ধ করে সেখানে চলে গিয়েছিল। রাত্তিরে বারন্দায় আলো জ্বেলে একটা ওয়াচম্যান শুত। অসময়ে বেগ এলে সে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি আসত। অদিতির বাবা আমার বাবাকে বলে ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। অদিতির বাবার রিটায়ারমেন্টের পর ওরা আবার ফিরে এসেছে। অদিতি গভীর সহানুভূতির সঙ্গে সবকিছু শুনে-টুনে বলল, ‘দেখো, আমি যা বুঝছি, তোমাদের এই সম্পর্কটা দাঁড়াবে না।’

আমি খুব দুঃখ পেলাম। আর দুঃখ পেলে যা হয়, ভর দিয়ে কান্নাকাটি করার জন্য মানুষ একটা কাঁধ খোঁজে। অদিতি তখন আমায় খুব সাহায্য করেছিল। আমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার সিসিডিতে বসে কফি খেয়েছিল। আবেগঘন মুহূর্তে নাক মোছার জন্য নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়েছিল। দু-একবার ওড়না দিয়েও চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিল। তখনই আমি জানতে পারি সুতির ওড়না ভালো জল সোক করে। জ্যালজ্যালে সিন্থেটিক কাপড়ের ওড়না কোনো কাজের নয়। অদিতি বলেছিল, ‘দেখো রজত, আমার মনে হয় নবনীতার সঙ্গে তোমার ব্রেক-আপ করে নেওয়া উচিত। মিছিমিছি একটা উটকো ঝামেলা ঝুলিয়ে রাখা ঠিক নয়। পরে বেশি কষ্ট পাবে।’

নবনীতাকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবলেই আমার বুক টনটন করে ওঠে। গলার কাছে ব্যথা ব্যথা লাগে। হঠাৎ করে ব্রেক-আপের কথা বললে নবনীতাই বা কীভাবে নেবে! আবার অদিতির কথাটাও ফেলে দেবার মত নয়। কোন দিকে যাই? কোনখানে গিয়ে দাঁড়াই? নিজের কোওর্ডিনেট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। দোনামনা করে ফোন করেছিলাম নবনীতাকে। কথাটা ফেলতেই নবনীতা বলল, ‘ফোনে এসব ডিস্কাসান হয় না। তুমি বরং সন্ধেবেলা বাড়ি চলে এসো। তখন ঠান্ডা মাথায় ভাবা যাবে।’

এখন ব্রেক-আপ ট্রেকাপের কথা পাড়ার আগেই আলোচনাটা অন্যদিকে ঘুরে গেল। নবনীতা বলল, ‘কী হল? বিশ্বাস হল না বুঝি?’

আমি বললাম, ‘কী করে হবে? তুমি গল্পের গরু সিম গাছে তুলবে আর আমায় মেনে নিতে হবে?’

নবনীতা বলল, ‘মানা না মানা তোমার ইচ্ছে। আমার বাবা আর্মিতে ছিলেন, জানো তো? আমি তখন খুব ছোট, চার পাঁচ বছর বয়স হবে। বাবা ছুটিতে এসেছিল। লোকাল মাফিয়ারা পাড়ার মধ্যে একটা মদ আর জুয়ার ঠেক চালাত। বাবা আপত্তি করে। সেই নিয়ে তাদের সঙ্গে বচসা হয়। ওরা চার পাঁচ জন মিলে ঘিরে ধরে বাবার ওপর চড়াও হয়। পিছন থেকে ছুরি মারে, মাথায় লোহার রড দিয়ে বাড়ি মারে। দু-দিন পরে বাবা হাসপাতালে মারা যায়, ব্রেনে ইন্টারনাল হ্যামারেজ ছিল।’

আমি ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললাম, ‘এবার বলবে তোমায় মানুষ করার জন্য তোমার মাকে এই পেশায় নাম লেখাতে হয়।’

নবনীতা বলল, ‘একদম ঠিক ধরেছ। বাচ্চা মেয়ে নিয়ে মা চোখে অন্ধকার দেখেছিল। পেনশনের আর কটা পয়সা আসত? আলমারির লকারে বাবার সার্ভিস রিভলভারটা মা খুঁজে পায় মাস খানেক পরে। বেশ কয়েক রাউন্ড বুলেটও ছিল সঙ্গে। লোকাল গুণ্ডাগুলোকে এক এক করে মেরে টিপ প্র্যাকটিস করার পর মা পয়সা নিয়ে খুন করা শুরু করে।’

আমি সন্দেহ ভরা চোখে তাকালাম ‘আর্মির লোকেরা রিভলভারটা ফেরত নিয়ে যায়নি?’

‘ওরা ভেবেছিল রিভলভারটা গুণ্ডাগুলোই চুরি করেছে। পরে ওদের বডির মধ্যে পাওয়া বুলেটগুলো ফরেনসিক টেস্ট করে নিঃসন্দেহ হয় সেগুলো বাবার সার্ভিস রিভলভার থেকেই ফায়ার করা হয়েছে। অনুমান করে নেয় ওরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে মরেছে।’

নবনীতা যেকোনো অবাস্তব কথাও এত গুছিয়ে বলে যে যুক্তির ফাঁক পাওয়া যায় না। নবনীতার মা চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে কিছু বিস্কিট, পেস্ট্রি। জানি না আমাদের কথাবার্তা কিছু শুনতে পেয়েছেন কিনা। বললেন, ‘কথা বলতে বলতে মুখ চালাও।’

নবনীতার মায়ের রোমাঞ্চকর গল্প শুনতে শুনতে আমার বেশ খিদে পেয়ে গিয়েছিল। আমি দেখেছি উত্তেজিত হলে আমার বেশি খিদে পায়। নবনীতার গল্প যদি সত্যি হয় আমি একজন অসাধারণ রূপবতী পেশাদার খুনির সামনে বসে আছি। তিনি নিজে হাতে আমায় চা বানিয়ে এনে দিয়েছেন। আমি ক’চামচ চিনি খাব জেনে নিয়ে চায়ের কাপে চামচ নাড়াচ্ছেন। তাঁর হাতের সরু এবং লম্বা আঙ্গুলগুলি দেখে মনে হচ্ছে হোয়াইট লিলির পাপড়ি। কাপের গায়ে চামচ লেগে ঠুং ঠুং করে শব্দ হচ্ছে। এই অপার্থিব মুহূর্তটির ভঙ্গুরতা উপলব্ধি করে আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমি সামান্য কেঁপে উঠলাম।

নবনীতার মা আমার দিকে পেস্ট্রির প্লেট এগিয়ে দিলেন। মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমি একটু বেরবো। তোর কি কিছু লাগবে?’

নবনীতা বলল, ‘ইঁদুরের উৎপাত হয়েছে খুব। কাল আমার মোবাইলের কাভারটা কুরে খেয়ে গেছে। একটা ইঁদুর-কল পাও কিনা দেখো তো!’

আমি চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবলাম, ইঁদুর-কল কি এখনও বাজারে বিক্রী হয়? আমার ধারণা ছিল আজকাল ইঁদুর-কলের প্রচলন কমে গেছে। ইঁদুর তাড়ানোর বা হত্যা করার অন্যান্য পদ্ধতি বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। ট্রেনের হকাররা সেই বিষয়ক চটি বইও বেচে দেখেছি। কয়েক বছর আগেও ঘরে ঘরে ইঁদুর-কল দেখা যেত। আমার অনেক দিনের জানার ইচ্ছে, যে ইঁদুরগুলো কলে ধরা পড়ে সেগুলোর কী হয়। তারা কোথায় যায়? নবনীতার মা একটা ঢাউস হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাবার পরে আমি নবনীতাকে সেকথা জিজ্ঞেস করতে নবনীতা বলল, ‘সিম্পল! কল সুদ্ধু ইঁদুরগুলোকে এক বালতি জলে ডুবিয়ে দাও। ইঁদুর খতম, পয়সা হজম।’

বলতে বলতে নবনীতার চোখে মুখে একটা নৃশংস খুশি ফুটে উঠল। যেন চোখের সামনে ইঁদুরগুলোর ছটফট মৃত্যু যন্ত্রণা দেখতে পাচ্ছে। নবনীতার মধ্যে একটা চাপা নিষ্ঠুরতা আছে, সে আমি আগেও লক্ষ্য করেছি। আমার একটু ভয় করল। অদিতির কথাই ঠিক, এই মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি বললাম, ‘নবনীতা, তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরী কথা আছে।’

নবনীতা বলল, ‘জানি। তুমি আমাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চাও। তাই তো? মায়ের সঙ্গে সেই নিয়েই কথা বলছিলাম।’

আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘তুমি আমাদের ব্যাপারটা মাকে জানিয়েছ? কী বললেন উনি?’

‘মা বলল, বেশি ব্যাগড়বাঁই করলে মাকে জানাতে। এমনিতেই ক’দিন হাতে কোনও কাজ নেই। হাত সুলসুল করছে।’

‘তুমি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছ?’

‘আরে, না না। ভয় দেখাব কেন? তুমি “মা কী বলল” জিজ্ঞেস করলে, তাই বললাম।’

আমি বেশ কড়া করে বললাম, ‘দেখো নবনীতা, তোমার একটা কথাও আমার বিশ্বাস হয় না। মাসীমাকে দেখে মনে হয় না একটা উকুনও নখে টিপে মারতে পারেন।’

নবনীতা মুচকি হাসল, ‘ওইটাই তো মায়ের সাফল্যের চাবিকাঠি। মাকে দেখে কেউ ভাবতেই পারে না যে মা হাসতে হাসতে মানুষ মারতে পারে। অন্যদের কথা ছাড়, বিধানকাকুও বিশ্বাস করেননি মা সুপারি কিলার। তাহলে হয়তো... ’

‘বিধানকাকু কে?’

‘তোমাকে একবার দেখিয়েছিলাম, উত্তমকুমার মেট্রো ষ্টেশনে, তুমি ভুলে গেছ। দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম! একদম সন কোনারির মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের মত দেখতে। মা দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।’

আমার মনে হল নবনীতা আবার একটা আজগুবি গল্প ফাঁদছে। বাইরে মেঘ ডাকার শব্দ হল। আজকাল বৃষ্টি আসার সময় অসময় নেই। মেঘলা সাঁঝবেলা, ফাঁকা বাড়িতে শুধু আমি আর নবনীতা। এই সময় নবনীতাকে একটা চুমু খাওয়াই যায়। ঠোঁটে নাহোক গালেই সই। পার্টিং কিস! নবনীতা চেয়ারটা টেনে একটু সরে বসল। কিছু আঁচ করল কিনা কে জানে? করলেই বা কী? কাল থেকে আমার আর নবনীতার পথ আলাদা। ইচ্ছা ছিল কোনোদিন নবনীতাকে বাইকের পিলিয়নে বসিয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে “এই পথ যদি না শেষ হয়” গাইতে গাইতে যাব। ব্যাপারটা স্বপ্নই রয়ে গেল। কোত্থেকে কী মাথায় চলে আসে! গানের কথায় মনে পড়ল বাইকটা নবনীতাদের বিল্ডিঙের সামনে রাস্তায় পার্ক করে এসেছি। মেটাল পার্টে অ্যান্টি-রাস্ট লাগানো হয়নি এখনও। বৃষ্টি এলে বাইকটা দাঁড়িয়ে ভিজবে। গল্পটা শুরু হবার আগেই উঠে পড়লে কেমন হয়? আমি একটু যাচিয়ে নেবার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিধানকাকু না কে... তাঁর সঙ্গে মাসীমার পরিচয় হল কী করে?’

নবনীতা টেবিলের ওপর রাখা কোস্টারগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, ‘মা তখন ডিপ্রেসানে ভুগছিল। যে কোনও প্রফেশনে কম্পিটিশন তো থাকেই। বিশেষ করে নতুনদের কাছ থেকে। বয়স তো আর থেমে থাকে না। লোকজন বলাবলি করতে শুরু করেছিল মায়ের রিটায়ার করে যাবার সময় এসে গেছে। কাজ কমে আসছিল। মা আস্তে আস্তে অবসাদের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। আমিই সাজেস্ট করেছিলাম মাকে সাইকিয়াট্রিক হেল্প নিতে। মা ইন্টারনেট ঘেঁটে খুঁজে-পেতে বিধানকাকুর চেম্বারে গিয়েছিল। ব্যাস, প্রথম দর্শনেই প্রেম।’

‘তোমার সেই বিধানকাকুও কী মাসীমার প্রেমে পড়েছিলেন?’

‘জানি না। মা একবার বিধানকাকুকে বাড়িতে ডেকেছিল ডিনারে। তখন আমার সঙ্গে আলাপ হয়। মায়ের প্রতি বিধানকাকুর একটা সফট কর্নার ছিল সেটা বুঝেছিলাম। মায়ের মধ্যেও একটা পরিবর্তন এসেছিল। একটা খুশি খুশি ভাব, আমায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে সেবার পুজোর বাজার করল। বিধানকাকুর জন্য একটা কুর্তা পাজামা কিনেছিল। আমি নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম। মা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছিল।’

নবনীতার গল্প বলার ঢঙটি বেশ মনোহর। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর?’

‘একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম তখন। মা ভীষণভাবে বিধানকাকুর ওপর ডিপেন্ড করতে শুরু করেছিল। বিধানকাকুকে জিজ্ঞেস না করে কোনও ডিসিসান নিত না। বিধানকাকু যেন ভগবান। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিধানকাকুকে কি সব কথা খুলে বলেছ? মা বলেছিল, সেতো বলেইছি, জানিস না, ডাক্তারের কাছে কিছু লুকোতে নেই।’

আমি বলে উঠলাম, ‘ভাগ্যিস, বিধানকাকু পুলিসের কাছে যাননি। তাহলে মাসীমা ধরা পড়ে যেতেন!’ কথাটা নিজের কানেই কেমন অদ্ভুত শোনাল। যেন আমি নয়, অন্য কেউ বলল। বলার পর মনে হল, দেখো কাণ্ড, আমিও তার মানে নবনীতার আষাঢ়ে গল্প বিশ্বাস করতে শুরু করে দিয়েছি।

নবনীতা বলল, ‘ক্লায়েন্টের কথা গোপন রাখা সাইকিয়াট্রিস্টদের প্রফেশনাল এথিক্সের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া বিধানকাকু নিজেই মাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলেন।’

আমি আকাশ থেকে পড়লাম, ‘সেকী?’

নবনীতা বলল, ‘হ্যাঁ, তাঁর নিজের বৌ আর বৌয়ের প্রেমিককে খুন করার জন্য মাকে নিযুক্ত করেছিলেন।’

এই হল নবনীতার দোষ। সব থেকে জরুরী কথাটা বলবে সবার শেষে, বললাম, ‘বিধান কাকু বিবাহিত ছিলেন আগে বলনি তো!’

নবনীতা ঠোঁট উলটে, ঘাড় ঝাঁকিয়ে এমন একটা ভাব করল যেন ব্যাপারটা খুবই ন্যাচারাল। জেমস বন্ড ব্যাচেলর বলে কী তার ভাই বিয়ে করবে না? নাকি জেমস বন্ডের ভাই-বৌয়ের প্রেমিক থাকতে নেই? বলল, ‘বিধানকাকু অ্যাডভান্সের টাকা দিতে চেয়েছিলেন। মা বলছিল টাকাটা ওনার ফীজে অ্যাডজাস্ট করে নিতে।’

‘তার মানে, মাসীমা রাজী হয়েছিলেন?’

‘মায়ের তখন এমন দশা, বিধানকাকু দশ তলার ওপর থেকে ঝাঁপ দিতে বললেও নির্দ্বিধায় লাফিয়ে পড়ত।’

আমি বিজ্ঞের মত বললাম, ‘সাইকিয়াট্রিস্ট এবং তাদের পেসেন্টদের মধ্যে এই ধরনের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠা খুব অস্বাভাবিক নয়। মাসীমাকে দোষ দেওয়া যায় না।’

নবনীতা বলল, ‘দোষ কে দিচ্ছে? আমি কখনই মায়ের কোনও দোষ দেখি না। মায়ের জায়গায় থাকলে আমিও একই কাজ করতাম।’

আমি গলায় একটু আশঙ্কা নিয়ে বললাম, ‘মানুষ খুন করা এতই সহজ নাকি? তোমার দ্বারা হবে বলে মনে হয় না।’

নবনীতা তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। যেন খুন করা তার বাঁয়ে হাত কা খেল। বলল, ‘তারপর শোন, কথা হয়েছিল বিধানকাকু চেম্বারে যাচ্ছেন বলে বেরিয়ে বাড়ির আসেপাশেই কোথাও ঘাপ্টি মেরে বসে থাকবেন। নজর রাখবেন কখন বৌয়ের প্রেমিক বাড়ি ঢোকে। সে যেই ঢুকবে মাকে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ করবেন। মায়ের কাছে বাড়ির দরজার ডুপ্লিকেট চাবি থাকবে। মা চুপচাপ বাড়িতে ঢুকে কাজ সেরে আসবে।’

‘তুমি এত কথা জানলে কী করে?’

‘আমাদের বাড়ি বিধানকাকুদের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। মা বাড়িতেই অপেক্ষা করছিল। মেসেজটা যখন টুং করে বাজে মা তখন কিচেনে, চা বানাচ্ছিল। আমিই মোবাইলটা নিয়ে গিয়ে মার হাতে দিই। মা ধীরেসুস্থে চা খেয়ে বেরল। চা খেতে খেতে বলেছিল, বিধানকাকুর বৌ আর তার প্রেমিককে মারতে যাচ্ছে। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এর পর তুমি কি বিধানকাকুকে বিয়ে করবে?” মা বলল, “দেখি”।’

আমার টেনসান হচ্ছিল। আমি হাত বাড়িয়ে প্লেট থেকে একটা পেস্ট্রি নিলাম। নবনীতা বলতে থাকল, ‘আধ ঘন্টার মধ্যে মা কাজ মিটিয়ে ফিরে এল। সব কিছু নরম্যাল। পরের দিন আমার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছিল। চোখে মুখে জল দিয়ে লিভিংরুমে এসে দেখলাম মা খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর বিছিয়ে বসে আছে। ডাকলাম সাড়া দিল না। কাছে গিয়ে গায়ে নাড়া দিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাল। কাগজটা টেনে নিয়ে দেখলাম প্রথম পাতায় হেডলাইন – বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট এবং তার পত্নী অজ্ঞাত আততাতীর গুলিতে নিহত। নিচে একজন মহিলার সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় বিধানকাকুর ছবি। মহিলার মুখ দেখা যাচ্ছে না। অনুমান করলাম বিধানকাকুর বৌ।’

‘মানে? বিধানকাকু কোথা থেকে এলেন?’ আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

নবনীতা বলল, ‘আমিও মাকে একই কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। মা বলল, “ঘরের জানলা বন্ধ ছিল। আবছা তরল অন্ধকারের মধ্যে দেখলাম দুজনে বিছানায়। লোকটা আমার দিকে পিছন ফিরে ছিল। বৌটা আমায় দেখে চিৎকার করে লোকটাকে জড়িয়ে ধরেছিল। ক্লোজ রেঞ্জ থেকে ফায়ার করেছিলাম। গুলিটা লোকটার বডি আরপার করে বৌটার বুকে গিয়ে বিঁধেছিল। লোকটার মুখ দেখার রুচি হয়নি আর। কী করে জানব বিধান আমায় এভাবে চীট করবে?” বলতে বলতে মায়ের চোখের কোণে জল চিক চিক করে উঠেছিল।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তার মানে বিধানকাকু নিজেই নিজের খুনের জন্য সুপারি দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন?’

নবনীতা ঠোঁট ওলটাল, ‘বিধানকাকু অসতী বৌকে খুন করাতে চেয়েছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরে নিজেও চিরকালের মত ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন কেন, তা জানি না। ভালবাসা ব্যাপারটা বেশ জটিল, বুঝলে রজত, অনেকটা নদীর মত। কখন কোথায় বাঁক নেবে, পাড় ভাঙবে বলা শক্ত।’

আমি খুব বোদ্ধার মত বললাম, ‘বুঝলাম। মাসীমা এখন কেমন আছেন? ডিপ্রেসান সেরেছে?’

নবনীতা বলল, ‘অনেকটা ভাল। তবে সেই ঘটনার পর থেকে মা চীটার-কক্‌দের দু-চক্ষে দেখতে পারে না। কেউ চীট করেছে জানতে পারলেই সাংঘাতিক রেগে যায়। তখন আর তার রক্ষা নেই।’

বাইরে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামল। নবনীতা উঠে গিয়ে জানলার পাল্লা ভেজিয়ে দিয়ে এসে বসল। আমরা দু-জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ টেবিলের ওপর রাখা খালি কাপের দিকে চেয়ে বসে রইলাম। নবনীতার যত কথা ছিল সব ফুরিয়ে গেছে। আমারই বা কী বলার আছে? নবনীতা দুহাতে চায়ের খালি কাপটা আঁকড়ে রেখেছে। ওর আঙ্গুলের নখগুলো লম্বা, নিখুঁত করে কেটে গাঢ় নীল রঙের নেলপালিস লাগানো। অনেকদিন ওর হাত ধরিনি। নবনীতা আগেও কি এত বড় বড় নখ রাখত? কে জানে? মনে পড়ছে না। এমন তো নয় আমাকে গল্প বলার সময় নখগুলো নবনীতার আঙ্গুল থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেক্ষেত্রে ও নেলপালিস কখন লাগাল? সারাক্ষণ তো আমার সামনেই বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টির একঘেঁয়ে আওয়াজ। ঘরের মধ্যে দেওয়াল ঘড়িটাই যা টিক টিক করছিল। নবনীতা সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘মায়ের এতক্ষণে ফিরে আসার কথা।’

আমি বাঁকা হেসে বললাম, ‘বাজারে তোমার ইঁদুর-কল খুঁজতে গিয়ে দেরি হচ্ছে মনে হয়। মাসীমা কত দূরে গেছেন?’

নবনীতা বলল, ‘তোমাদের ওদিকেই... তোমাদের বাড়ি থেকে দু-একটা বাড়ি ছেড়ে। কী যেন নাম বাড়িটার... নকুল নিবাস।’

আমি চমকে উঠলাম। নকুল নিবাস অদিতিদের বাড়ি। অদিতির ঠাকুর্দার নাম ছিল নকুল চন্দ্র ভড়। আমি তুতলিয়ে বললাম, ‘ম্‌-মাসীমা সেখানে কেন গেছেন?’

নবনীতা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তোমার নতুন প্রেমিকার সঙ্গে গল্প করতে।’

বাইরে কড় কড় করে বাজ পড়ল। ঝোড়ো হাওয়ায় সঙ্গে বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। জানলার ওপর জলের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কল-লগ থেকে অদিতির নাম খুঁজে ডায়াল করলাম। ফোন লাগল না। কান থেকে নামিয়ে দেখলাম উইক নেটওয়ার্ক। মনে হল এরা মা মেয়ে দু-জনেই পাগল। কী করে বসে ঠিক নেই। বললাম, ‘আমাকে যেতে হবে, এক্ষুণি।’

নবনীতা বলল, ‘যাবে যাবে এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? বৃষ্টিটা ধরুক, তারপরে যেও। ততক্ষনে মা ফিরে এলে রিপোর্টও পেয়ে যাবে।’

আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নামল, ‘কীসের রিপোর্ট?’

নবনীতা বলল, ‘কীসের আবার? চোখের সামনে মৃত্যুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অদিতি কতটা ভয় পেয়েছিল, কেমন করে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল, খুলির মধ্যে গুলি ঢোকার পর তার শরীরটা কেমন ভাবে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল...।’

আমি চিৎকার করে বললাম, ‘চুপ কর, চুপ কর...।’

দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে বেরোলাম। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দার ভিজে মেঝে পেরোবার সময় পা হড়কাল। গ্রীল ধরে কোনোমতে টাল সামলালাম। হাতটা খানিকটা ছেঁচে গেল। সিঁড়ি টপকে রাস্তায় নামলাম। সামনের ল্যাম্পপোস্টে আলো জ্বলছে না। বাইকের চাবি খুলতে গিয়ে দেখলাম হাত কাঁপছে থর থর করে। কোনোমতে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে কী-হোলে চাবি ঢোকালাম। স্টার্ট স্যুইচ কাজ করছে না, বর্ষায় ব্যাটারি ডাউন। কিক করতেই পা স্লিপ করল, রিবাউন্ডে মনে হল গোড়ালিটা গুঁড়িয়ে গেল। ভ্রূক্ষেপ না করে রেস দিলাম। উড়ে যেতে পারলে ভালো হত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অদিতির কাছে পৌঁছোতে হবে। এখনও হয়তো সময় আছে।

বাইকটা টলমল করে এগোল। একবার পিছন ফিরে দেখলাম নবনীতাদের বারান্দার গ্রীলে একটা সাদা মুখ লেগে আছে। অটো-টোটো, উড়ে আসা খিস্তির পাশ কাটিয়ে জি টি রোডে উঠতেই লেগে গেল দশ মিনিট। রাস্তা খালি পেলে এখান থেকে মিনিট কুড়ির বেশি লাগার কথা নয়। দানা দানা বৃষ্টি চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। চোখ খুলে রাখা যাচ্ছে না। উল্টো দিক থেকে আসা লরির হেড লাইটগুলো তীব্র গতিতে পেরিয়ে যাচ্ছে। সামনে একটা লরি ঢিকিস ঢিকিস করে চলছে। কিছুতেই জায়গা দিচ্ছে না। দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভীষণ দেরি হয়ে যাচ্ছে। গিয়ে কী দেখব জানি না। হয়তো এতক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। অদিতি মেঝের ওপর থোকা থোকা রক্তের মধ্যে শুয়ে আছে। হা ভগবান! কী কুক্ষণে নবনীতার গল্প শুনতে বসেছিলাম।

বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট ছাড়িয়ে একটা আন-ম্যানড লেভেল ক্রসিং। পার হয়ে দুটো টাউনশিপের মাঝখানে খোলা মাঠ। আগে চাষবাস হত, ইদানীং সিন্ডিকেটের কল্যাণে প্লট কেটে জমি বিক্রি-বাটা শুরু হচ্ছে। এ জায়গাটায় জনবসতি কম। দু-একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বিল্ডিঙ, লেবারদের ছাউনি। সামনের লরিটাকে ওভারটেক করতে রেস বাড়ালাম। রাস্তাটা এখানে অল্প বাঁক নিয়েছে। উল্টো দিক থেকে আসা লরিটাকে দেখলাম অনেক পরে। তখন আর বিশেষ কিছু করার ছিল না। বাইকটা ডানদিকে সরিয়ে নিতে শেষ চেষ্টা করলাম। ছোট্ট একটা টোকায় বাইকটা উড়ে গেল। আমি পালটি খেয়ে রাস্তার ধারে ছিটকে পড়লাম। মাথাটা একটা পাথরে ঠুকে গেল... অন্ধকার।

চেতনার নিচে তলিয়ে যাচ্ছি। ডুবে যেতে যেতে আবার হাঁকুপাকু করে ভেসে উঠছি। উঃ মা! শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা। জলে কাদায় আপাদমস্তক ভিজে সপ সপ করছে। পকেটে মোবাইলটা বাজছে, বার বার... থেমে যাচ্ছে, আবার বাজছে। চোখ খুললাম... রাস্তার আলোগুলো ভীষণ উজ্জ্বল... চোখের মধ্যে সটান বিঁধে যাচ্ছে। কোনোমতে মোবাইলটা বার করে চোখের সামনে ধরলাম... অদিতি! হাতটা তুলে ধরে রাখতে পারছি না এত ভারি। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে স্ক্রিনের ওপর সবুজ চিহ্নটায় টান দিলাম। ফোনের ওপর রক্তের দাগ পড়ল। অদিতির উদ্বিগ্ন গলা পেলাম, ‘কোথায় তুমি? বার বার ফোন করছি ধরছ না কেন?’

ঠোঁটের নোনতা স্বাদ জিভে চেটে বললাম ‘অদিতি, তুমি ঠিক আছ?’

‘আমার আবার কী হবে? তুমি কোথায়?’

আমার চোখে জল এল। অদিতির কিছু হয়নি। অদিতি সুস্থ আছে, ভালো আছে। জানতে চাইছে আমি ঠিক কোথায় আছি। আমার কোওর্ডিনেট কী? জিপিএস লোকেশনএ প্রচুর এরর থাকে। সেটা জানালে ও কি আমার কাছে পৌঁছোতে পারবে? আমি চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখলাম। ভোরবেলা ঘাসের ওপর ঝরে পড়া শিউলির মত অসংখ্য তারা ফুটেছে। আমি যেন কম্পাস-ভাঙ্গা নাবিক, হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলাম... এপাশ থেকে ওপাশ, মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে... কোথায়? কোথায়? ঐ যে কালপুরুষ... একটু সরে এসে সপ্তর্ষি... ঐ তো নর্থস্টার। ল্যাটিচ্যুড, লঙ্গিচ্যুডের হিসেব কষে মোবাইল তুলে অদিতিকে ফোন করার আগেই সমস্ত চরাচর জুড়ে আবার অন্ধকার নামল।



(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)