Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines



পরবাসে সুনন্দন চক্রবর্তীর
আরো লেখা



ISSN 1563-8685




বাঙাল এবার মিশর-এ


চিরকালীন পিরামিড

ত দু চার বছরে পাড়ায় বেশ একটা অভিযাত্রী ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াই কারণ মহামতি সুকুমার রায় বলেছেন কাউকে বেশি লাই দিতে নেই / সবাই চড়ে মাথায়। কিন্তু হলে হবে কি — পড়িলে ভেড়ার শৃঙ্গে ভাঙে হীরার ধার। মিশর থেকে ফেরার পর থেকে ঠেক-এ যাই মাথায় মিশর থেকে কেনা একটা ইয়াসের আরাফত মার্কা শাদা-কালো স্কার্ফ বেঁধে। উদ্দেশ্য মূর্খরা যাতে বুঝতে পারে লোকটা সবে মিশর ঘুরে এসেছে। ইয়ার দোস্ত-রা বুজুর্গ। তাঁরা আড়নয়নে সবই দেখেন। বাক্যবাণ হানেন অনেক দেরিতে। কিন্তু স্বল্প-পরিচিত লোকেরা সে বান্দা নন। একজন বাজারের থলি হাতে যেতে যেতে বল্ল ‘হ, সাবধান থাকাই ভাল, এই সিজন চ্যাঞ্জের সময়...’। আরেকজন দাঁত বের করে বললেন, ‘ভাইয়াদা, মক্কা গেছিলেন নাকি?’ বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা! কোনো ইতিহাসবোধ নেই? ভূগোল পড়েইনি?

আর, পাঠক, ইতিহাস এ দিলচসপি না থাকলে মিশর ভ্রমণ আপনারও একঘেয়ে লাগতে পারে। প্রাতঃস্মরনীয় মুজতবা আলি কাইরো থাকার প্রথম ছ মাসের মধ্যে পিরামিড দেখে উঠতে পারেননি। কাইরো-র কাফেতে আড্ডা মেরেই সময় কেটে গেছে। আর ঐ টন টন পাথর দেখতে যাবার আছেই বা কি। আরেকবার মুর্শিদ-এর স্মরণে কান স্পর্শ করে বলি মুজতবা আলি-র পঞ্চতন্ত্রে-র ঐ সাকুল্যে আড়াইখানা লেখা থেকে যে মিশর দেখেছি আমাদের ন-দিন এর সফরে কেন আমার দুই জন্ম কেটে গেলেও সে দেখাই আমার হবে না, সে কিসসা বর্ণন তো দুরস্থান। আমাদের যাদবপুরের হোস্টেলে নানা শিক্ষালাভ করেছি। তার মধ্যে একটা হল ফুটো মশারিতে কি করে মশার প্রবেশ আটকানো যায়।যেখানে ফুটো তার উলটো দিকে ঠিক সেই রকম একটা ফুটো করে একটা খবরের কাগজ গোল টিউবের মত করে পাকিয়ে এক ফুটো থেকে অন্য ফুটো অবধি বরাবর চালিয়ে দিলেই কম্ম ফতে। বাবাজি এ-দিক ও-দিক দিয়ে যতই উড়ে বেড়াক না কেন মশারির মধ্যে কিছুতেই ঢুকতে পারবে না। ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো আপনাকে সেই কায়দায় মিশর-এর এ-মাথা থেকে ও-মাথা নীলনদ বরাবর ঘুরিয়ে আনবে। আপনি পিরামিড, আলেক্সান্দ্রিয়া, আসোয়ান, লাক্সর সব ঘুরে ফেলবেন কিন্তু মিশরের পঁচানব্বই শতাংশ আপনার ধরা ছোঁওয়ার বাইরে থেকে যাবে। আমারও গেছে। সেই পাঁচ শতাংশই সামান্য সোয়াদ বদলে পেশ করছি। গোস্তাকি মাফ করবেন।

মুম্বাই থেকে ইজিপ্ট এয়র-এর যে বিমানে চাপলাম তাতে একপাল জোব্বা-টুপি পরা তীর্থযাত্রী দেখলাম অন্য কিসিমের বাঙাল। তাঁদের দলটি সংখ্যাগুরু। তাঁরা মনোমত এ ওর পাশের বোর্ডিং পাস পাননি। কিন্তু বাঙাল মাত্রেই জানে নিয়মের পরোয়া করলে সংসারে টিঁকে থাকা অসম্ভব। তাই তাঁরা যথেচ্ছ পোঁটলা-পুঁটলি ঠুসে দিয়ে নিশ্চিন্তে যে যার মনোমত আসন গ্রহণ করলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমরা তার আগেই জায়গায় বসে পড়েছিলাম। গুটিকয় সাহেব-মেমের বিভ্রান্ত অবস্থা দেখে যুগপৎ হর্ষ ও বিষাদ অনুভব করলাম। অতঃপর একজন বিমানসেবিকা ও দুই অতি বলিষ্ঠ চেহারার বিমানসেবক ভাষাপারাবার সাঁতরে সেই কোলাহলপূর্ণ বিশৃঙ্খলা দশ মিনিটের মধ্যে একেবারে দুরুস্ত করে ফেললেন। পরে সেই ভদ্রসন্তানটিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। রাজি হলেন না।

আধো ঘুমের মধ্যে দেখলাম চমৎকার এক সমুদ্রঘেঁষা বন্দরে নামছি। প্রায় লাফিয়ে উঠে মাথার উপর থেকে ব্যাগ নামাতে গিয়ে থমকে গেলাম। সহযাত্রীদের তো কোন চিত্তচাঞ্চল্য দেখছি না! সামনের স্ক্রীন থেকে মালুম হল এটা ফুএলিং স্টপ। মোকাম আরো প্রায় চল্লিশ মিনিট দেরি। অবশেষে কাইরো-তে নামার পর থেকেই শুরু হল আপ্যায়ন। আমরা রাজার জামাই।

ইমিগ্রেশন পৌঁছোবার আগেই এক দীর্ঘদেহী সুপুরুষ সসম্ভ্রমে আমাদের স্বাগত জানিয়ে আমাদের পাসপোর্টগুলো নিয়ে আমাদের আরবীতে লেখা একটি করে ফর্ম ধরিয়ে দিয়ে তলায় দস্তখত করার জায়গাটা দেখিয়ে দিলেন। আর আমরা সই করে দেওয়া মাত্র ঝড়ের গতিতে বাকিটা ভর্তি করে ইমিগ্রেশন কাউন্টার-র দিকে এগিয়ে গেলেন। এত দ্রুত হল যে অন্য পিঠে ইংরেজিতে লেখা কিনা দেখতেও পারলাম না। তাঁর সঙ্গে ওপারের ব্যাক্তির এক লহমার হাসি বিনিময় হতেই আমাদের সামনের দুয়ার খুলে গেল, আমরা মিশরের মাটিতে পা দিলাম। এজেন্সি-র অতিথি হয়ে এলে সব মসৃণ। বাইরে আরো দুই সহাস্য যুবক দাঁড়িয়ে। আগামী তিনদিন আমাদের দেখ-ভালের দায়িত্ব তাদের।


এলাবাস্টার মস্ক, কাইরো
হোটেলে ইলাহি জলখাবারে বন্দোবস্ত। খেয়ে নিয়েই দৌড়ে গিয়ে মহম্মদ আলি-র এলাবাস্টার মস্ক দেখতে যাওয়া হল। ইস্তাম্বুলের এক টুকরো মনে হবে। (মানে ইস্তাম্বুল আমি ছবিতে যেমন দেখেছি আর কি)। বাইরে দু চারজন অনুগ্রহপ্রার্থী রয়েছেন। কিন্তু চিন্তা নেই। কাকে কী দিতে হবে সে গুরুভাবনার দায়িত্ব এজেন্সি-র, অর্থাৎ আপনার গাইড-এর। সবশেষে তাঁরা হিসেব বুঝে নেবেন।

মূল প্রার্থনাকক্ষ বিশাল এবং তার ঝাড়বাতি শ্রীভূমির পুজো প্যান্ডেলের ঝাড়বাতির থেকেও বোধহয় বড়। গম্বুজ খিলানের চমৎকারিত্ব থেকে চোখ নামিয়ে সবে ইতিউতি দর্শণার্থীদের দিকে নজর করেছি ইহাব (আমাদের প্রথম গাইড) কোরাণে বর্ণিত প্রার্থনার নিয়মাবলী কেমন নিশ্ছিদ্র তাই ব্যাখ্যানায় লেগে গেল। আমি পাপিষ্ঠ নিশ্ছিদ্র ধর্মের আবহে হাঁসফাঁস করি। ছবি তোলার অছিলায় বেরিয়ে এলাম।

শহরের একটা বড় টুকরো দেখা যাচ্ছে। দেখে পিপাসা পেয়ে গেল। যতদূর চোখ যায় ধূসর। খুব ইচ্ছে করছিল অলিগলি ঘুরে ঘুরে দেখতে একটু পাড়াগুলো কেমন। কোথাও কি রঙ নেই? কাফেগুলোয় সেই আড্ডা কি এখনও বসে? তার বদলে আমরা এবার গেলাম হ্যাঙ্গিং চার্চ আর সিনাগগ দেখতে। বেশ ভিড়। তারপর ইহুদি সিনাগগ। স্বয়ং মেরি মাতা নাকি শিশু যিশু-কে নিয়ে এইখানে কিছুকাল কাটিয়ে গেছেন। মিশর দেশের মুশকিল এই যে দ্রষ্টব্য সব কিছুই প্রায় কম সে কম চার হাজার বছরের পুরোন। ফলে মাত্র হাজার দুই বছর আগের ঘটনার তো বোধহয় প্রত্যক্ষদর্শী-ও পাওয়া সম্ভব। এজেন্সি-র কতগুলো বাঁধা জিনিষ আছে। আপনার ইচ্ছে হলেই আপনি ফট করে একটা দোকানে ঢুকে পড়বেন তার জো নেই। গাইড আপনাকে নিয়ে যাবে হয়তো কোন পারফিউমের কারখানায় বা কোন কিউরিও-র দোকানে। আপনার বাঙাল রক্তে বিদ্রোহের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলে উঠবে। সিনাগগ থেকে বেরোনোর পর যখন দু চারটে দোকানে আমরা হাঁফিয়ে উঠেছি ইহাব আমাদের বসাল সেই রাস্তা-র মোড়ের এক কফিখানায়। চওড়া ফুটপাথে দিব্যি টেবিল চেয়ার পাতা। ঘন টার্কিশ কফি খেয়ে মেজাজ বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল।


পিরামিড প্রহরী স্ফিংস
এবার হোটেলে অল্প সময় সাফসুতরো হয়ে নিয়ে যেতে হবে স্ফিংস এর চত্বরে। সেখানে লাইট এন্ড সাউন্ড শো। মার্চ এর প্রথমে আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। মুরুব্বিরা ভয় দেখিয়েছিলেন পিরামিড চত্বরে হু হু ঠান্ডা হাওয়া আসে। সাইবেরিয়ার মতো ঠান্ডা। আমাদের দিন অত হাওয়া ছিলনা বলে বেশ মনোরম। কিন্তু শো দেখে হতাশ হলাম। ধারাবিবরণী বেশ জোলো। তারপর ওখানের এক বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় নৈশাহার। গাইড আগেই জেনে নিয়েছিলেন আমাদের ছজনের কে গরু খাবেন, কে মুর্গি, কে মাছ কে নিরামিষ। বসে বুঝলাম খাবার অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ চল্লিশটা অচেনা খাবারের নাম নিয়ে হিমশিম খেয়ে আধঘন্টা তূরীয় সুখ পাবার কোনো উপায় নেই। দেখলাম বাস-লরি ভর্তি আর যে সব ভ্রমনার্থীরা এসেছেন তাঁরাও চাঁদপানা মুখ করে তাঁদের গাইড-এর ঠিক করে দেওয়া খাবার-ই খাচ্ছেন। বুঝলাম পাল পাল লোককে খাইয়ে আবার পরের খেপ ভ্রমণার্থীদের জন্যে দ্রুত টেবিল খালি করে ফেলার জন্যে এই প্রথাটি চালু হয়েছে। আর নৈশাহারের দায় এজেন্সি-র। সুতরাং তারা কাউকে বাঁধা রাস্তার বাইরে উৎসাহ দেয় না। পানীয় চয়নের স্বাধীনতা আপনার আছে, কারণ তার দাম আপনাকেই মেটাতে হবে।


আলেক্সান্দ্রিয়া-র সকাল
পরের দিন আমাদের ছজন-কে নিয়ে আমাদের শকট পৌঁছে গেল আলেক্সান্দ্রিয়া। নামেই শিহরণ। আর ভূমধ্যসাগর-এর সুনীল অর্ধচন্দ্রাক্রিতি উপকূলরেখা দেখেই বোঝা গেল দিগবিজয়ী এখানে কেন বসত করেছিলেন। আলেক্সান্দ্রিয়ার বিখ্যাত সৌধগুলি সব উধাও। একটি দুর্গ রয়েছে যেখানে একদা সেই বিখ্যাত লাইটহাউস ছিল। আর সে গ্রন্থাগার তো বহুবার আগুনে পুড়ে, লুন্ঠিত হয়ে লোপাট হয়ে গেছে। কিন্তু আলেক্সান্দ্রিয়ার নতুন লাইব্রেরি-ও চমক লাগানো — গঠনে, আকৃতিতে, মেজাজে। মনে হল আমা হেন মূর্খও একবছর এখানে লেখাপড়া করতে পারলে একটা হিল্লে হয়ে যেত। এ শহর কাইরো-র থেকে অনেক ঠান্ডা। লোকজন মনে হল আরো উষ্ণ। অবশ্য আমার কুল্লে তিরিশ ঘন্টা দেখার ভুলও হতে পারে। কিন্তু সারা শহরে একটা ফুরফুরে মেজাজ আছে। মেয়েরা যেন একটু বেশি সহজ। সাধারণতঃ মিশর-এ আপনাকে ভারতীয় মনে হলেই লোকে একগাল হেসে বলবে ইন্ডি, অমিতাভ বচ্চন, শারুখ খান। কিন্তু এরা মূলতঃ হয় আপনাকে কিছু একটা বেচতে চান অথবা উটে চড়াতে চান বা ঐ গোছের কোন একটা লেনদেনের মুখবন্ধ হিশেবে এই কথাগুলো আপনাকে বলছেন। কিন্তু আলেক্সান্দ্রিয়ার সিটাডেল-এর প্রাকারে সেলফি তুলতে ব্যস্ত কলেজের মেয়েদের ঝাঁক যে আপনাকে দেখে অমিতাভ বচ্চন,শারুখ খান বলে হেসে গড়িয়ে পড়বে তা অনাবিল কৌতুক।

আমি যখন সবচেয়ে মুখরা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম শেষ কোন সিনেমাটা তাদের ভালো লেগেছে বোঝা গেল তার ইংরেজি আমার থেকেও টুটাফাটা। বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে সে দলের যে মেয়েটি ইংরেজি জানে তার কাছ থেকে শিখে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি আরবী জানি কিনা। আমি না বলাতে সে বিজয়িনীর হাসি দিয়ে আমার সঙ্গে একটা হাই ফাইভ করল। গোটা দলটা তারপর হৈ হৈ করতে করতে নিচে নেমে গেল। মন্তাজার প্রাসাদের বিশাল বাগান চত্বরেও দেখলাম একঝাঁক তরুণ-তরুণী হা হা করে হাসছে, গান চালিয়ে নাচছে, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে, অর্থাৎ অবিকল তরুণদের যা যা করার তাই করছে। কাইরোয় এই উচ্ছলতা দেখিনি। ইহাব বলল মিশরের দক্ষিণ বেশি গোঁড়া।

এবার কাইরো। সরকারি প্যাপিরাস বিক্রয়কেন্দ্রে নামলাম আমরা। ইহাব পইপই করে বলে দিয়েছিল অন্য কোথাও থেকে আমরা যেন প্যাপিরাস না কিনি। বেশির ভাগই নাকি লোকঠকানো। আমরা ঢুকতেই আপ্যায়ন করে জিজ্ঞেস করা হল আমরা কি ইচ্ছে করি চা, কফি, ঠান্ডা কিছু? বুঝলাম সব সরকারি হস্তশিল্প কেন্দ্রের মতই এখানেও দাম একটু চড়া হবে। কিন্তু এখানকার কর্মীরা বড্ড হাসিখুশি, সুভদ্র, অনলস। তাই সবাই সাধ্যমত প্যাপিরাস কিনে, তাতে নিজেদের ইচ্ছে মত হিয়েরোগ্লিফিক অক্ষরে এটা ওটা লিখিয়ে হোটেলে ফিরে চললাম। কাল আমরা যাব পিরামিড দেখতে।

আজ থেকে আমাদের ভার ইহাব-এর বড়কর্তা ফ্রাঁসোয়া-র হাতে। সে মিশর-এর কুড়ি শতাংশ কপটিক খ্রিস্টানদের একজন। সে আরো ঝানু গাইড। দুর্দান্ত গল্প বলতে পারে। এরপর থেকে আমরা যে গন্ডা গন্ডা মন্দির দেখব তার গায়ের সচিত্র পুরাণ সে ব্যাখ্যা করে না দিলে অত পাথর সত্যি হয়ত আমাদের একঘেয়ে লাগত।

পিরামিড চত্বরেও রাশি রাশি ছোটখাটো ফেরিওয়ালা আর উটচালক। ফ্রাঁসোয়া আগেই সতর্ক করে দিয়েছিল তাদের যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতে। দেখলাম সেই ছেলেবেলার ইতিহাস বই-এ যেমনটি দেখেছি, হুবহু তাই। বাড়তির মধ্যে পিরামিডের গা বেয়ে খানিকটা ওঠার সুযোগ পাওয়া গেল। চমৎকার ঠান্ডা ঠান্ডা পাথর।

কাইরোর যাদুঘরটি ভারী জ্যান্ত। মমি ভর্তি ঠান্ডা ঘরটি পর্যন্ত। সারা পৃথিবী ভেঙে পড়েছে। ফলে গমগম করছে যাদুঘর। এক ধবধবে শাদা দাড়িওয়ালা কপটিক যাজক এসেছেন শাদা সুতোর কাজ করা কালো আলখাল্লা পরে। চোখে সরু সোনালি রিমের চশমা। ইচ্ছে হচ্ছিল একটা জানালার পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে গোটাকতক ছবি তুলি ওনার। ব্রীড়াবশত পারলাম না।

যে ট্রেন আমাদের আসওান নিয়ে যাবে তার দেরি আছে। তাই ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে বিনা বাক্যব্যয়ে যাওয়া গেল এক সুগন্ধি-র দোকানে সেখানেও প্রথমে আপ্যায়ন, তারপরে পণ্যের ব্যখ্যানা এবং গুণকীর্তন, অতঃপর কেনাকাটা।

আমাদের খাওয়ার কথা আজ এক খুব নামী ইজিপসিয়ান রেস্তোঁরায়। কিন্তু ও হরি, সেখানে পাওয়া যায় শুধু কুশারি — ভাত, ম্যাকারণী, ছোলা ইত্যাদির একটা খিচুরির উপরে ভিনিগারে ভেজানো টোম্যাটো ছড়ানো। নানা টক ঝাল সস আপনি যোগ করে নিতে পারেন। তিনতলা একটা রেস্তোঁরা শুধু এই বিক্রি করে চলেছে, তিলধারণের ঠাঁই নেই।


নুবিয়ান গ্রাম
একঘন্টা দেরীতে ছেড়ে ট্রেন একঘন্টা দেরীতে আসওান পৌঁছল। তিনতলা বিলাসতরণী অপেক্ষা করছে সেখানে। আবার ইলাহি নাস্তা। তারপর পালতোলা নৌকা ফেলুকায় চড়ে আমরা গেলাম নীলনদের অন্য পাড়ে। একটা মনোরম বাগানের মধ্যে দিয়ে দশ মিনিট হেঁটে আমরা পৌঁছলাম লঞ্চঘাটায়। সে আমাদের নামিয়ে দিল নুবিয়ান গ্রামের অল্প আগে। এবার সামান্য কসরত করে উটের পিঠে চড়ে যাওয়া। আসলে এটা নুবিয়ানদের গ্রাম ছিলনা। আসওানের বিখ্যাত নাসের বাঁধ যখন হল তখন এখানে তাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়। আর সরাসরি লঞ্চে করেও এখানে চলে আসা যায়। কিন্তু ফ্রাঁসোয়া জানে যে পর্যটক মাত্রেই আমোদগেঁড়ে। শিশুসুলভ বিশৃঙ্খলাই তাদের প্রাণের জিনিষ।


চিত্রিত নুবিয়ান বাড়ি
নুবিয়ান গ্রামের বাড়িগুলো খুব সুন্দর ছবি আঁকা। গ্রামের ছবি-আঁকা ইশকুলে আমাদের নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেওয়া হল এক ক্লাসঘরে। সেখানে মাস্টামশাই আমাদের কিছু আরবি অক্ষর আর এক থেকে দশ শেখালেন এবং পড়াশেষে প্রত্যেকের নাম আরবি অক্ষরে বোর্ডে লিখে তলায় সেটা লিখতে বললেন। নমস্কারের পালার পর ফ্রাঁসোয়া আমাদের হয়ে তাঁর হাতে অল্প কিছু টাকা গুঁজে দিল। সভ্যতা যাঁদের জীবনযাত্রা উল্টোপাল্টা করে দিয়েছে সামান্য ফেরত দেবার দায় তো তার আছেই। সেই কারণেই প্রথা হল এরপর কোন এক নুবিয়ান পরিবারে গিয়ে তাদের সঙ্গে একটু চা খাওয়া, তাঁদের বাড়িতে পোষা কুমিরছানা নিয়ে ছবি তোলা এবং শেষে কিছু টাকা তাঁদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া। অলিখিত চুক্তি মত বিভিন্ন পর্যটকদের দলকে বিভিন্ন বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে সবকটি পরিবারের-ই কিছু কিছু রোজগার হয়। আমাদের পরিবারটি বেশ বড় এবং অতিথিপরায়ণ। আমাদের দলের দুটি মেয়ের হাতে তাঁরা চটপট উল্কি এঁকে দিলেন। এটাই খেলার নিয়ম।

বিকেলে আমরা গেলাম ফিলা মন্দির দেখতে। সুবিপুল নাসের বাঁধ যে সুবিশাল নাসের হ্রদ তৈরি করেছে তাতে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল এমন বাষট্টিটি মন্দির নাকি খুলে খুলে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ফিলা তার মধ্যে একটি। নীলনদের মধ্যে একটা ছোট্ট দ্বীপে রয়েছে ফিলা। ভারি মিষ্টি দেখতে তাকে।


আবু সিম্বেল মন্দির
পরের দিন ভোর চারটেয় বেরোন। হু হু করে সাহারার বুক চিরে গাড়ি গেল তিনশো কিলোমিটার। মাঝখানে ছোট চা-বিরতি। সুদান অবধি চলে যাওয়া এই রাস্তা মসৃণ। আমাদের ছ'শো কিলোমিটার যাতায়াতে সময় লাগল ঘন্টা ছয়েক। আবু সিম্বেল এর এই মন্দিরও তুলে এনে এখানে বসানো হয়েছে। দেখেশুনে মাথা ঘোরাই স্বাভাবিক। ফেরার সময় আলো কড়া হয়েছে। আমাদের স্কুলের ফিজিক্স স্যর ছেলেদের হাতে কলমে শেখাতে ভালবাসতেন। দপ্তরীর নাম করে মাঝে মাঝেই হাঁক পাড়তেন, দ্বিzপদ, ব্যারমিটার দ্যাখাও ইত্যাদি। যেই ক্লাসে আলোর প্রতিসরণ পড়াতে এসে বলেছেন আজ তোমাদের বলব কী করে মরীচিকা হয় পিছন থেকে একজন চেঁচিয়ে বল্ল, দ্বিzপদ, মরীচিকা দ্যাখাও। ফেরার পথে সেই মরীচিকা দেখলাম অবশেষে। অনেকবার।

এই কদিন এই বিলাসতরণীই আমাদের বাসস্থান। প্রায় ছত্রিশ ঘন্টা আসওান এ নোঙর করে থাকার পর জাহাজ রওয়ানা দিলাম লাক্সর-এর উদ্দেশে। পথে অবশ্য আমরা থামব। পরদিন বেশ ভোরে উঠে আমরা টাঙায় চড়ে গেলাম এডফু মন্দির দেখতে। সে মন্দির আপনি ইউ টিউব-এ দেখে নিতে পারবেন। কিন্তু সেই আধো আলোর সকালে যখন বাতিস্তম্ভগুলো জেগে আছে আর শহরটা আস্তে আস্তে জেগে উঠছে, রুটির দোকানে ইতিমধ্যেই ভিড় হয়ে গেছে, লোকেরা খবরের কাগজ হাতে চা-কফির দোকানে জড় হচ্ছে তখন আপনি এই মিশরের সঙ্গে একটা আরামদায়ক আত্মীয়তা অনুভব করবেন ফারাওদের মিশরের সঙ্গে যেমনটি হবার কোন উপায়ই নেই।

জাহাজ আবার ছাড়ল। জাহাজের ছাদে একটি পুঁচকে সুইমিং পুল আর সারি সারি ডেক চেয়ার পাতা আছে। দুপুরের রোদ্দুর। কিন্তু ছুরির মত হাওয়া। যে দু চারটি সিংহ-হৃদয় ছাদে রয়েছেন তাঁরা হয় শীতের পোষাকে সুসজ্জিত, নয় বাথ টাওএলে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে মমি সেজেছেন। অল্প থেকেই নিজেদের ঘরের প্রশস্ত কাঁচের জানালা দিয়েই জলযাত্রা নিরীক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।


কো লম্ব মন্দির
বিকেলে যেখানে থামলাম তার থেকে পাঁচ মিনিটে হাঁটাপথ কো লম্বো মন্দির। এটা একটা যমজ মন্দির। তাছাড়া আরো দু চারটি মন্দিরের মত এর গায়েও বিশেষত রোমানরা মন্দিরের খোদিত গাত্র নষ্ট করে নিজেদের করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সেই দুষ্কর্মের সাক্ষ্য আছে। বোঝা যাচ্ছে উপাসনাগৃহ হড়পে নেওয়া ক্ষমতাসীনদের স্বাভাবিক ধর্ম।


ওড়বার অপেক্ষায় বেলুন
প্রবল উত্তেজনা নিয়ে ঘুমোতে গেলাম। কারণ পরেরদিন রাত থাকতে উঠে যেতে হবে বেলুন চড়তে। জুল ভার্ণ পড়ার সময় থেকে স্বপ্নে যা কতবার চড়েছি। আমদের বেলুনটি বড় বেশ, কুড়ি জনের জায়গা। চালক তাদের কী করা আর কী করার নয় পাখিপড়া করলে, বিশেষ করে নামার সময় কি সাবধানতা নিতে হবে সে ব্যাপারে। আকাশে ছিলাম আমরা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। নীলনদের এক পাড়ে সবুজ চৌখুপী গালিচা। অন্য পাড়ে উষর মরুভূমি আর পাহাড়ের গায়ে দেখা যাচ্ছে কিংস ভ্যালি, কুইনস ভ্যালি, ওয়ার্কার্স ভ্যালি, হাটশেপসুটের সমাধি ইত্যাদি। বেলুন থেকে নেমে সেসবই পরে দেখলাম বটে মায় তুতেনখামেনের মমি অবধি কিন্তু চোখে লেগে আছে ওপর থেকে দেখাটাই। হাটশেপসুট একমাত্র মহিলা ফারাও। তাঁর সৎ ছেলে চটেই ছিল মায়ের ওপরে তাকে বঞ্চিত করে ফারাও হবার জন্যে। মায়ের মৃত্যুর পর তার কাজ হল সমাধিমন্দিরটি ধ্বংস করে হাটশেপসুটের নাম মুছে দেওয়ার। প্রায় দিয়েওছিল। সৌভাগ্যবশতঃ কিছু চিহ্ন থেকে যায়। যা থেকে ইতিহাস এবং এখনকার মন্দিরটি পুনঃনির্মিত হয়। মহিলার পরিকল্পনা বলেই হয়ত এর গঠনটি অন্য সমাধিমন্দিরগুলোর থেকে ভিন্ন রুচির।

হাটশেপসুট-এর সমাধি


চলমান ফেরিওয়ালা
ফ্রাঁসোয়া বলে দিয়েছিল নীলনদের আসনা লক গেট পার হওয়ার সময় ডেকে থাকতে। গেট পার হওয়ার কারিগরির থেকে আমাদের মন টানল রংচঙে নৌকায় করে আসা এক ঝাঁক ফেরিওয়ালা। তারা প্রথমে তোয়ালে, চাদর, এইসব মেলে ছাদের লোকেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারপর দরাদরির মধ্যেই সেগুলো গোল করে পাকিয়ে টিপ করে ছুঁড়ে দিতে থাকল তিন-চার তলা উচ্চতায়। পছন্দেরগুলো রেখে দাম বাড়তি পোঁটলার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিলেই কেনাকাটা সম্পূর্ণ। ইস্টবেঙ্গল মাঠে অবিকল এই কায়দায় আমরা কাঠি আইসক্রিম কিনতাম। টিশার্ট বা জামায় পয়সা বেঁধে নিচে ছুঁড়ে দিতে হত। তাতেই আইসক্রিম বেঁধে গ্যালারির উপর থাক অবধি টিপ করে পৌঁছে যেত। পরম বিশ্বাসে সেই খেয়ে আজও বুক চিতিয়ে বেঁচে আছি। মন্বন্তরে মরিনি।

ফেরিওয়ালা

অবশেষে লাক্সর। এখানকার মন্দির দর্শণের পর লাক্সর বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে পাওয়া গেল দু ঘন্টা সময়। বিকেল হয়ে গেল প্রায় দুপুরের খাওয়া খেতে। ফ্রাঁসোয়ার সঙ্গে আমাদের এবার ছাড়াছাড়ি হবে। গাড়ি নিয়ে আমরা রাত সাড়ে আটটা নাগাদ পৌঁছলাম হুরগুডা। সেখানের যে পাঁচতারা হোটেলে আমাদের রাখা হল আমাদের তো চোখ ট্যারা হয়ে গেল। লোহিতসাগরের এক কোনা ঘিরে নিয়ে তারা নিজস্ব বেলাভূমি বানিয়ে নিয়েছে। তবে সে সমুদ্র এমন শান্ত যে হোটেলের তিনটে সুইমিং পুলের যে কোন একটাতে চান করলেও একই ফল।


মরুভূমির নর্তন
পরদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হল বেদুঈন গ্রামে। নিজের যদি ভাল চান যাবেন না। এই তীব্র স্বাধীনচেতা দলগুলো এখন হতশ্রী অবস্থায় বেঁচে আছে সরকারি সাহায্যের উপর। বাড়তি রোজগার পর্যটকদের বেদুঈন জীবনের ঝলক দেখিয়ে কিছু পয়সা পাওয়া। খুদা কসম, গলা আটকে আসবে আপনার। এই মন খারাপ নিয়েই হয়ত ফিরতে হত যদিনা ফেরার পথে মরুভূমির খানাপিনা আর নাচ দেখার বন্দোবস্ত থাকত। একটু এলেবেলে দু চারটে নাচ হওয়ার পর এক ঋজু চেহারার নট এলেন। এক জায়গায় বাঁই বাঁই করে ঘুরতে ঘুরতে তিনি অনায়াসে গোটা পাঁচেক জিপসি নিয়ে খেলা দেখালেন। তারপর কতগুলো ফ্লুরোসেন্ট ছাতা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে স্টেজের বাতি নিভে গেল। একটা স্পটের নিচে তিনি অবিরাম ঘুরেই চললেন আর সেই ছাতাগুলো খুলতে আর বন্ধ করতে করতে নেচেই চললেন আর ঘুরেই চললেন। বেদুঈন জীবনে আবার আস্থা ফিরে এল।

মরুভূমির নর্তন



(পরবাস-৭৪, ৩১ মার্চ ২০১৯)