Subscribe to Magazines






পরবাসে
জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের

লেখা


ISSN 1563-8685




সব কিছু সিনেমায়

|| ৮ ||

৯৮১-র কোনও একটা সময়ে লিন্ডসে স্ট্রীটের গ্লোব সিনেমা হলে অন্য ধরনের বাংলা সিনেমার উৎসব হয়েছিল। সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। হাতে সময় গুনি। জীবনে একটা দিশাহীনতার চর্চাতে দিন কাটাচ্ছিলাম। কয়েকটা মাত্র বাংলা ছবি আমার শেষ কিশোরের দিনে রং ধরিয়ে গেল। সত্যজিৎ রায়ের 'প্রতিদ্বন্দী', মৃণাল সেনের 'ইন্টারভিউ' আর 'পদাতিক', ঋত্বিক ঘটকের 'যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো' আর শঙ্কর ভট্টাচার্যের 'দৌড়'। সবকটি ছবিই সমকালীন রাজনৈতিক আর সামাজিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত, পরিচালকদের মুন্সিয়ানায় সমৃদ্ধ। ছবিগুলো কেমন কোমল পরশে আমর হৃদয় ছুঁয়েছিল যে আমি নিজের মধ্যেই অজান্তে সিনেমার প্রেমে পড়ে গেলাম।

সত্তর দশকের প্রারম্ভ আমার বাল্যকাল। রাজনীতি বা সমাজনীতি বা সমাজ পাল্টানোর লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত বাল্যকালের রূপকথায় আসে না। সহজ পাঠ এর তমিজ মিঞার গল্পে মেঘ উজার করা বর্ষার জমা জলে পানকৌরির ডোবা-ওঠার গল্প এক বাঙালি আচ্ছন্ন বোধ কল্পনায় জানান দিত। সেই সব অনাবিষ্কৃত চিত্রপটই আমাদের ছোটবেলায় সিনেমার আলেখ্য। আলগা দৃষ্টিতে অল্প কিছুই সত্তর শুরুর স্মৃতি যেন প্রশস্ত কোনও ব্যালকনির চিলতে আলো ঢাকা অপরিসর অঙ্গ। বাবা মায়ের আশ্রয়ে নিরাপদের বাল্য-জীবনে এহেন চারু মজুমদার-সরোজ দত্ত-কথা অতি প্রগলভতা। সে সময়ে বাবা শিবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা করতেন, ক্যাম্পাস কোয়ার্টারে আমরা থাকতাম। আমার পৃথিবী বলতে ছিল মডেল স্কুল থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথের ঐ সামান্য পৃথিবী। চারতলার বারান্দা দিয়ে ততটুকুই দেখা কলেজের তরুন ছাত্রদের রাজনৈতিক স্বপ্নপান। ঐ টুকুই আমার বাল্যকালের নকশালবাড়ি। আকাশ-উপরের যুদ্ধ বিমানের ভয় দেখানো ছোবলের হাত থেকে পরিত্রানের জন্য জানলার কাচে কালো কাগজের আস্তরনে তৈরি হতো শহর নাগরিকদের ডার্ক রুম খেলা, যেখানে ভয়ের চিন্তা থেকেও মজার রোমাঞ্চ অনেক গ্রহনযোগ্য ছিল। ভারত বনাম পাকিস্তানের যুদ্ধ লেগেছিল বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের প্রস্তাবনায়। সুতরাং আরো প্রায় বছর দশেক পরে যখন আমি নিজেই হবু তরুণ, তখন সেই অল্প আগে নির্বোধ বাল্যকালে ঘটে যাওয়া সমাজ জীবনের বাস্তব প্রেক্ষিত যখন এই ছবিগুলোর মাধ্যমে আমার চোখে আসল সত্য-চিত্র লেখে, সে সময়ের দেখা কিন্তু না-জানা জীবন চিত্রের সন্ধান দেয়, স্পষ্টতই সেই ছবিগুলো অনেক communicative হয়ে ওঠে। এই ছবিগুলোর ক্ষেত্রেও আমার তাই-ই হয়েছিল। যা ছিল মনের ঘেরাটোপে, তা চোখের সামনে উন্মোচিত হল। সিনেমার দোরগোড়ায় কড়া নাড়ল তমিজ মিঞাকে সরিয়ে দিয়ে 'প্রতিদ্বন্দী'র সিদ্ধার্থ, 'ইন্টারভিউ'-র রঞ্জিত,'পদাতিক'-এর সুমিত, 'যুক্তি, তক্কো আর গপ্প-এর নীলকন্ঠ আর 'দৌড়'-এর মন্দার।

একেকটা সিনেমা সময়কে এঁকে দিয়ে যায়। 'প্রতিদ্বন্দী'ও তাই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে আগেও ছবি করেছেন সত্যজিৎ। 'অরণ্যের দিন রাত্রি'। 'প্রতিদ্বন্দী'র সিদ্ধার্থ অনেক বেশি radical মনে হয়েছিল অরণ্যের অসীমের থেকে। দুটো ছবির দুটো চরিত্রকেই তাড়া করে বেরিয়েছিল জীবনের নানান অনুভূতির রোম্যানটিসিজম। ছবিতে রাজনৈতিক দৃষ্টান্তস্থাপনের ক্ষেত্রে ঋত্বিক ঘটক অনেক সহজ, আক্রমনাত্মক ও সাহসী। নীলকন্ঠ 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'তে অবলীলায় সত্তরের রাজনৈতিক পাঠশালার সাথে যুক্তি সাজিয়েছিলেন। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে সমকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ স্পষ্ট হলেও মসৃন। তাই ছবিকেন্দ্রিক আবেগ একটা রোম্যান্টিক রাজনৈতিক বৃত্তের পরিমণ্ডলে আবৃত। সিনেম্যাটিক্যালি হৃদয়গ্রাহী। 'প্রতিদ্বন্দী'তে সিদ্ধার্থ বাবার অকাল মৃত্যুর পর নিজের ডাক্তারী পাঠক্রম থেকে সরিয়ে নিয়ে সংসার বাঁচানোর তাগিদে চাকরির চেষ্টা করতে থাকে। চরিত্রটির বামপন্থী radicalism প্রচ্ছন্নভাবে ব্যক্ত হয় সিদ্ধার্থর চাকরির একটি ইন্টারভিউয়ের দৃশ্যে। প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করেছিল বিগত দশ বছরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সিদ্ধার্থের কাছে কি মনে হয়। চাঁদে মানুষের অবতরণের ঘটনার থেকেও সিদ্ধার্থের মনে হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসণের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের সাধারন মানুষের ঐতিহাসিক লড়াই, যা অনেক বেশি প্রাণসঞ্চারী। বোর্ড কর্তার ধারনা হয়েছিল সিদ্ধার্থ বোধহয় একজন কম্যুনিস্ট। চাকরি হয় নি তার। সময়টা সেরকমই নির্ভুল ছিল। ব্যক্তিত্বের মতাদর্শগত বিভাজনের ক্ষেত্রে। ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইকেও সমকালীন priviledged class একটা উল্টো তকমা লাগিয়ে সংঘবদ্ধভাবে সম্ভাব্য ভয়ের অস্তিত্বকে আত্মীয়তা করত।

'প্রতিদ্বন্দী'তে ঘটনাক্রম প্রোটাগনিস্ট সিদ্ধার্থকে ধরেই এগিয়েছে — সুনীলের গল্পপ্রবাহের মতো, সত্যজিৎ এর সিনেমাপ্রবাহের মতো। কফির দোকানে কম্যুনিস্ট পার্টি নেতা সিদ্ধার্থকে আন্দোলনের পথে নামতে বলে। কিন্তু সিদ্ধার্থর মেডিক্যাল রিপ্রেসেন্টেটিভের ঈষৎ উষ্ণ নিশ্চিন্ততাকেই বেছে নিয়ে শহরত্যাগী এক চরিত্র নিয়ে বড় ঝেমানো তর্ক হয়েছিল সে সময়ে। সে ক্ষেত্রে মৃণাল সেনের কলকাতা ট্রিলজির ('ইন্টারভিউ', 'কলকাতা '৭১' আর 'পদাতিক'-এ প্রোটাগনিস্ট চরিত্রগুলোর তর্জমা পরিচালকের রাজনৈতিকভাবে non-compromising বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। লড়াইয়ের ময়দান সম্মিলিতভাবে ভাগ করে নেবার ইঙ্গিত বহন করে। 'যুক্তি তক্কো গপ্পো'-এ ঋত্বিক তাঁর প্রতিবিম্বিত স্ব-চরিত্রে আঁকা নীলকন্ঠ চরিত্রটিকে সেই স্রোতে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন যেখানে যেন তিনি সমকালীন রাজনৈতিক বিয পান করতে পেরেছিলেন সাঁইথিয়ার জঙ্গলে অতি বামেদের সাথে পুলিশের প্রত্যক্ষ এনকাউন্টারের মাঝে পড়ে। যেন আত্মাহুতির মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক শুদ্ধিকরনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক আর্ত চেষ্টা।

সেবেলায় ছবিগুলো দেখেছি বটে। ভালো মন্দের বিচার করি নি। মৃণাল, ঋত্বিক, সত্যজিৎ এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে অন্য তরঙ্গের ভারতীয় ছবির ইতিহাস। সিনেমার প্রতি দায়বদ্ধতা, মুন্সিয়ানা বা তর্ক যুক্তির প্রগাঢ় জ্ঞানভাণ্ডারে তিন জনেই সমান উদ্দীপক। চিন্তাগত দৃষ্টি ফারাক থাকতেই পারে। তাঁরা একেকজন একেকভাবে কলকাতা ৭০ দশকীয় রাজনৈতিক ব্যাখ্যা করেছেন, একেকজন একেকভাবে প্রোটাগনিস্টদের রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ এঁকেছেন।

আমরা আমাদের সমবয়সীরা হাপুসভাবে যেন আমাদের ঠিক আগের বছরগুলোর শহর রাজনীতির প্রেক্ষাপট দেখেছি এই ছবিগুলোর মধ্যে দিয়ে। সে সময়টাতেও আমরা স্রোতে সাঁতার কাটতাম — মূল্যবোধ থেকে জীবনবোধের। আর সেই কিশোর প্রেমের নিষিদ্ধ রাজনৈতিক ছবিগুলো কোন প্রস্তরে যেন লিখে দিয়ে যেত ভবিষ্যতের সিনেমার পথ-পরিক্রমাকে। এক মুক্ত বয়স্ক পৃথিবী যেখানে শঙ্কর ভট্টাচার্যের 'দৌড়' সিনেমায় মন-উন্মুক্ত মন্দারের সাথে, সাগর ঢেউকে পেছনে রেখে, ক্রাচ দুটোকে শূন্যে উড়িয়ে আমরাও গেয়ে উঠতে পারি —

"হারে রে রে রে রে, আমায় ছেড়ে দে রে, দে রে—
যেমন ছাড়া বনের পাখি মনের আনন্দে রে।।"
কেমনতর লোকেশান ছিল 'অরন্যের দিন রাত্রি'র? বেশি দিন আগের কথা নয়। চল্লিশ বছর আগের ছাড়াছাড়ি হওয়া স্কুলের বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করেছিলাম বেতলা জঙ্গল পার্শ্ববর্তী কোয়েল নদীর পারে কেচকি গিয়ে স্বচক্ষে দেখে আসা 'অরন্যের দিন রাত্রি'র লোকেশানের বর্তমান প্রেক্ষাপট। সত্যিই যেন বনের পাখির মতোই হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই নদী তির তির অল্প সূর্য্যালোকে রূপোলি রং ছিটিয়ে বয়ে চলেছে। এখনও। সে বাংলো বাড়ি রং মেখেছে নতুন, আদল বদলায় নি। সে ঘর এবং ঘরগুলো, সেই পাতকুয়ো, সে গাছ এবং গাছগুলো ক্লান্তিহীন স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে আজও, ষাট বছর পেরিয়ে যাওয়া ক্লাসিক ছবির লোকেশানের। কুন্তল ঘোষ আমাদের বন্ধু-ডাক্তার,'অরন্যের দিন রাত্রি'র পরম ভক্ত আর সেদিনের ভ্রমনসঙ্গী।

প্রস্তাবটা ক্ষণিক সময়ের মধ্যে ভাবিত ও প্রস্তাবিত। সন্তোষ ভট্টাচার্যের একটা ক্যামেরা ছিল। শখের ক্যামেরা যদিও। পার্থ মোদক, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মানিক সর্বজ্ঞ আর অভিজিৎ ঘোষদের নিয়ে ভ্রাম্যমান মাঝবয়স্ক দলের লোকেশান ভিসিটকে নিয়ে তাৎক্ষণিক মস্তিষ্কপ্রসূত চিত্রনাট্য সাজিয়ে আসল ছবিটির বেশ কিছু দৃশ্য শুটিং করে ফেললাম। এটা এক ধরনের সিনেমা প্রেম। আগা নেই পাস্তালা নেই। হুড়মুড়িয়ে একটা তথ্যচিত্রের শুটিং হয়ে গেল। পরে কলকাতায় ফিরে অভিনেতা বন্ধু দেবজিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি নতুন চরিত্র কল্পনার রূপে সাজিয়ে ছবিটি শেষ করেছিলাম। হঠাৎ করে করা অপেশাদারী ছবি হলেও আমাদের বন্ধুময় জীবনের পড়ন্ত বেলায় সত্যজিৎ মিশে গিয়েছিলেন কেচকির পথে প্রান্তরে। অরন্যের মধ্যে ফেলে আসা দিনের মাঝে, নিশীথ রাত্রির মাঝে। একটা ক্লাসিক ছবির সার্থকতা বোধহয় এখানেই। নিস্তার নেই প্রজন্মান্তরের কাছেও।


(ক্রমশ)



(পরবাস-৮০, ১২ অক্টোবর, ২০২০)


ছবি : ইন্টারনেট এবং ডা. সৃজন রায়-এর সৌজন্যে প্রাপ্ত