মহাসিন্ধুর ওপার হতে, অমিতাভ প্রামাণিকের রম্য-ইতিহাস; পরবাস-৬৯






 


ISSN 1563-8685




মহাসিন্ধুর ওপার হতে

|| দুই ||

য়েসুগেই তার মেজ ছেলে তেমুজিনের বিয়ে ঠিক করেছেন ওঙ্গিরাত উপজাতির মেয়ে বোর্তের সঙ্গে। তেমুজিনের বয়স ন’ বছর। নিয়ম অনুযায়ী তেমুজিনকে হবু শ্বশুরবাড়িতে থেকে সে বাড়ির কর্তার খিদমৎগিরি করতে হবে, যতদিন না তার বয়স হয় বারো বছর। বিয়েটা তখন হবে।

তেমুজিনের মা হোয়েলুন খোনগিরাদ উপজাতির। তেমুজিন হোয়েলুনের বড় ছেলে, তার আরও তিন ছেলে, এক মেয়ে আছে। ইয়েসুগেইয়ের সে দ্বিতীয় বৌ। আগের পক্ষের ইয়েসুগেইয়ের আরও দুটো ছেলে আছে, তাদের নাম বাগতার আর বেল্গুতেই। তারা তেমুজিনের সৎভাই। বাগতার তেমুজিনের চেয়ে বড়, বেল্গুতেই ছোট।

ইয়েসুগেই খামাগ মঙ্গোলিয়ার বরজিগিন উপজাতির নেতা। বিভিন্ন উপজাতিদের মধ্যে রেষারেষি ও মারামারি লেগেই থাকে। প্রতিবেশী তাতাররা সুযোগ পেলেই চিরশত্রু মঙ্গোলদের ওপর হামলা চালায়, তাই সবসময় সতর্ক থাকতে হয় এদের। মঙ্গোল উপজাতিরা একজোট হলে তাতারদের আক্রমণ প্রতিহত করা অপেক্ষাকৃত সহজ, তাই সুযোগ পেলে তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়েশাদির ব্যবস্থা করে সে রকম চেষ্টাও করে। তেমুজিনের বিয়ের ব্যাপারটা সেই রকমই।

বোর্তের বাড়িতে থাকতেই তেমুজিনের কাছে খবর এল, বাবা ইয়েসুগেই বাড়ি ফেরার পথে তাতারদের হাতে ধরা পড়েছেন, তারা তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে।

খিদমৎগিরি মাথায় উঠল তেমুজিনের, হবু শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে অবিলম্বে সে বাড়ি ফেরার পথ ধরল। বাবা গোষ্ঠীপ্রধান ছিল, এখন তাকে বাবার সেই পদের জন্যে দাবি জানাতে হবে। কিন্তু জানালেই বা, মানছে কে? ঐটুকু পুঁচকে ছেলের দাবি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল অন্যেরা।

অকূল পাথারে পড়ে গেল তেমুজিনের পরিবার। চরম দারিদ্র্য, অন্ন-সংস্থান করাই সমস্যা। বনের ফলমূল, অন্যের পরিত্যক্ত গোমাংস আর শিকার করে পাওয়া কিছু পশুপাখির মাংস – যেদিন জোটে, এই তাদের খাবার। এই করেই কেটে গেল কিছু বছর। হোয়েলুন বাচ্চাদের আগলে রাখেন পাখির মত, শেখান কী করে তারা মানুষ হতে পারে। সৎ দাদা বাগতার পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ, কিছু সময় অতিক্রান্ত হতে সে নানা ব্যাপারে কর্তৃত্ব শুরু করেছে। একদিন সে তার সৎমা, অর্থাৎ তেমুজিনের মা হোয়েলুনকে রাত্রে তার শয্যাসঙ্গিনী হতে আদেশ করল। ফলে কিছুদিন পরেই বাগতারের লাশ পাওয়া গেল বনের মধ্যে, তেমুজিন আর তার সহোদর ভাই খাসার তার সাথে একত্রে পাখি শিকারে গিয়ে তাকে খুন করেছে।

তাতে অবশ্য বিশেষ সুরাহা হল না তেমুজিনের। কিছুদিনের মধ্যেই তার বাবার এক সময়ের বন্ধু উপজাতিদের এক দল তাকে বন্দী করে নিয়ে গেল, রেখে দিল ক্রীতদাস বানিয়ে। তেমুজিনের বয়স তখন পনের, সে বেশ চালাকচতুর হয়েছে ততদিনে। সহানুভূতিশীল এক পাহারাদারের সহায়তায় সে সেখান থেকে পালাল, রাত্রে লুকিয়ে থাকল নদীর খাঁড়িতে, লোকচক্ষুর আড়ালে ফিরে এল নিজের এলাকায়। চেষ্টাচরিত্র করে আরো দুটো উপজাতির প্রধানকে একত্র করে এবং সেই সহানুভূতিশীল পাহারাদারের ছেলেকে দলে টেনে তৈরি করে ফেলল নিজের ছোট্ট বাহিনি। বন্দী অবস্থা থেকে পালানো ও নতুন দল তৈরি করে তার বেশ একটু নামডাক হয়েছে তখন। পরের বছরই বিয়ে করে ফেলল বাবার পছন্দ করা মেয়ে বোর্তেকেই, ফলে ওঙ্গিরাত উপজাতির সঙ্গেও একটা মৈত্রীবন্ধন তৈরি হল তার।

বিয়ের পরপরই অবশ্য আবার ঝামেলা। বোর্তেকে অপহরণ করে নিয়ে গেল মার্কিট উপজাতির এক দল। বন্ধুদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এল বটে তেমুজিন, কিন্তু বন্দিনী থাকা অবস্থায় ন’ মাসের মাথায় বোর্তের পেটে এসে গেল এক বাচ্চা। তার নাম দেওয়া হল জোচি। সে আদৌ তেমুজিনের সন্তান কিনা, সেই সন্দেহ মনের মধ্যে ঝুলেই রইল আজীবন।

স্বামী বা পিতা নয়, তেমুজিন ততদিনে যোদ্ধা হিসাবে, নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নে বিভোর। আরো কিছু উপজাতিকে সঙ্ঘবদ্ধ করে নিজেকে সে ঘোষণা করল নতুন এক দলের সর্বাধিনায়ক হিসাবে। মঙ্গোলিয়ার ক্ষুদ্র এলাকা নয়, তেমুজিন শাসন করতে চায় সমগ্র বিশ্ব। নিজেকে সে নাম দিল – চেঙ্গিজ খান।

এর পরের ইতিহাস চমকপ্রদ। মঙ্গল শব্দের অর্থ শুভ হলেও মঙ্গোলিয়ার অধিবাসীদের শুভ চোখে দেখত না কেউই। অন্যদের কাছে তারা ছিল যাযাবর, পশুর মত চরে বেড়ায়, বিশৃঙ্খল, আইন কানুনের তোয়াক্কা করে না। খুনখারাপি চুরি-ডাকাতিই যাদের জীবনের মূলধন। কেউ কেউ বলত, আরে ওরা তো ইঁদুর-কুকুরের চামড়া পরে থাকে, বর্বর হুনদের মত দেখতে।

রক্তপিপাসু হলেও তারা বিশৃঙ্খল নৈব নৈব চ, বরং ঠিক তার উল্টো। তাদের সংগঠনের শৃঙ্খলা প্রশ্নাতীত, তাদের পরিকল্পনা ছবির মত। সমগ্র পৃথিবীকে পদানত করতে চেঙ্গিজের নেতৃত্বে তারা ছুটে এল পশ্চিমে – মধ্যপ্রাচ্যে, ইওরোপে। সবচেয়ে বিশ্বস্তদের নিয়ে তৈরি হল তার নিজস্ব দেহরক্ষীবাহিনি। যারা বড় যোদ্ধা আর তার প্রতি যাদের অসীম আনুগত্য, তারা তার আত্মীয় হোক বা নাই হোক, তাদের নিয়েই তৈরি হল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবলয়। যুদ্ধে পারদর্শিতা আর চেঙ্গিজের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার প্রতিদান হিসাবে তাদের জুটত উপঢৌকন এবং তকমা। যে যে এলাকা তার দখলে আসতে লাগল, তাদের সৈন্যদের প্রতিও এই একই নিয়ম চালু করল সে। অতি অল্প সময়ে তার এই রীতি ও তার সুবিন্যস্ত প্রয়োগে এক বিশাল সৈন্যবাহিনি গঠিত হয়ে গেল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর গোড়াতেই, ১২০৬ সালে, সে হয়ে বসল মঙ্গোলিয়ান অধিপতি।

নজর পড়ল আশেপাশের রাজ্যগুলোর ওপর। পরবর্তী পাঁচ বছরে দখল হল কিরঘিজিয়া, ঐরাট, চিনের পশ্চিমে মধ্যপ্রাচ্যের উইগুর। উইগুরের শাসক বারচুককে পরিবারের জামাই বানিয়ে নিল চেঙ্গিজ, শুধু এ জন্যেই নয় যে উইগুর বেশ বড়সড় এলাকা, বরং ওদের মধ্যে পড়াশুনার ব্যাপার আছে, ওদের নিজস্ব লিপি আছে, ওখানে একজন ইতিহাসও চর্চা করে। উইগুরের সংস্কৃতিমনস্ক মানুষদের গণহারে নিজের আমলাতন্ত্রে নিযুক্ত করে চেঙ্গিজ তার নিজের মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত করে ফেলল। সেখানকার তাতার টোঙ্গা নামে একজন বিশিষ্ট শিক্ষাগুরুকে দায়িত্ব দেওয়া হল চেঙ্গিজ খানের নিজের ছেলেদের শিক্ষিত করতে।

১২১১ সালে শুরু হল চমকপ্রদ সব অভিযান। মঙ্গোলিয়ার দক্ষিণে চিন, সেখানে তখন রাজত্ব করছে জিন বংশ। মঙ্গোলিয়া আর চিনের মধ্যে সুবৃহৎ চিনের প্রাচীর। চেঙ্গিজ জানতে পারল সেই প্রাচীরের এক বৃহৎ অংশ মাটির তৈরি, অব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেছে, মধ্যে বেশ অনেকটা ফাঁক। সেখান দিয়ে ঢুকে পড়া যায়। সেইমত পরিকল্পনা করতেই রুখে দাঁড়াল জিন শাসক দুজি শিঝং, তার হাতে সাড়ে সাত লক্ষ সৈন্য। চেঙ্গিজ তার সেজ ছেলে ওগেদেইকে নির্দেশ দিল জিন রাজ্যের পশ্চিমে শিজিং দিয়ে আক্রমণ শানাতে। দুজি শিঝং তার সৈন্যদের সেদিকে নিয়ে যেতেই চেঙ্গিজ নিজে তার দলবল নিয়ে অন্যদিক দিয়ে ঢুকে পড়ল চিনে, আক্রমণ করে দখল করে নিল উষা দুর্গ ও উয়ু শিবির। সেগুলো বেদখল হতেই চিনের সেনাদের খাদ্যাদির সরবরাহ লাইন গেল কেটে। দুজি শিঝং যুদ্ধে নিহত হলেন। তাদের রাজধানী জংদু দখল করে চেঙ্গিজ এক বিশাল অঞ্চলের শাসক হয়ে বসল। একের পর এক নতুন রাজ্য তার পদানত হতে লাগল। বশ্যতা স্বীকার না করলেই গণমৃত্যু এবং ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাল চেঙ্গিজের দলবল।

মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমান শাসন তখন শিথিল। বাগদাদের প্রতাপ কমে আসছে। তার সুযোগ নিয়ে পশ্চিম চিনের খোরজম শাসকরা নিজেদের রাজ্যবিস্তার করে চলেছে। চেঙ্গিজের নজর গেল সেদিকে। এই তো সুযোগ, একগাদা রাজ্য আক্রমণ করার চেয়ে এমন কাউকে করা ভাল, যাকে হারাতে পারলে একলপ্তে হাতে চলে আসবে অনেকখানি রাজ্য। প্রবল উদ্যমে সেনা সংগঠন করে খোরজম আক্রমণ করল চেঙ্গিজ, যুদ্ধে হেরে গেল তাদের শাসক।

কাস্পিয়ান সাগর আর আরল সাগরের মাঝখানে পড়ে এই খোরজম রাজ্য, তার রাজবংশের উত্তরাধিকারী চোদ্দ বছরের এক তরুণ জালালালদিন। সে একাধারে কবি ও যোদ্ধা এবং দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার। খোরজম চেঙ্গিজের বশ্যতা স্বীকার না করায় হুকুম এল, যাও, জালালের রাজপরিবারে যত সদস্য আছে, জীবিত বা মৃত সবাইকে এনে হাজির করো। এই কাজে চেঙ্গিজ বেছে নিলেন তার সবচেয়ে ক্ষিপ্র ঘোড়সওয়ার সেনা জেবে-কে, যাকে অন্যরা ডাকত তির বলে। অন্যরা ধ্বংস করল খোরজম রাজ্য, হত্যা করা হল রাজপরিবারের সবাইকে, কিন্তু জালালের খোঁজ মিলল না। জেবে ছুটল তার সবচেয়ে দ্রুতগতির ঘোড়া নিয়ে জালালের খোঁজে। তার পাশে পাশে ছুটে চলল জেবের অনুচরেরাও।

টানা চল্লিশ দিন ধরে এই ক্ষুধার্ত নেকড়েদের চোখ এড়িয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে পালিয়ে বেড়াল জালাল, শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে লাগল আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ের পথে, গিরিখাতে, কখনো ইরানের মরুভূমিতে। চেঙ্গিজ নিজে যোগ দিলেন জেবের সঙ্গে। শেষে এক খাড়া পাকদণ্ডীতে, যেখান থেকে নেমে এসেছে সিন্ধুনদ, চেঙ্গিজ অবশেষে জালালালদিনের দেখা পেলেন। সেখান থেকে পালানোর আর কোন পথ নেই। কিন্তু চেঙ্গিজের হাতে ধরা পড়ল না জালাল, ঘোড়া নিয়ে লাফিয়ে পড়ল সে নীচের খাদে, যেখান দিয়ে বইছে খরস্রোতা সিন্ধু।

ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ালেন চেঙ্গিজ। জেবেকে বললেন, ঐ যে নীচে নদীর বুকে প্রাণপণে সাঁতরে যাচ্ছে ছেলেটা, ওই হচ্ছে সত্যিকারের সাহসী। তোমরা ওর মত হওয়ার চেষ্টা করো।

বস্তুত এটাই চেঙ্গিজের অন্যতম প্রধান চরিত্র – নির্মমতা এবং বীরত্ব। শত্রুদের মনে বিপুল ভয় জাগিয়ে যুদ্ধের আগেই তাদের যাতে অর্ধেক জয় করে ফেলা যায়, সেই উদ্দেশ্যেই চেঙ্গিজ ছক কষে আক্রমণ করতে লাগল রাজ্যগুলো। শত্রুরা জেনে গেল, চেঙ্গিজের কাছে হার মানেই মৃত্যু। শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যু নয়, পুরো শহর ছারখার করে দেবে চেঙ্গিজের দলবল, নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ হত্যা করা হবে। কোন কোন জায়গায় শুধু মানুষ না, সমস্ত জীবিত প্রাণীকে হত্যা করে শহরের মাঝে তৈরি করা হল বিশাল মৃতদেহের স্তূপ। এর বিভীষিকা শত্রুদের মনে এমন ভীতির সঞ্চার করল যে অধিকাংশ জায়গায় যুদ্ধের প্রয়োজনই পড়ল না। চেঙ্গিজ আসছে জানলেই সামনের রাজ্যের রাজা বশ্যতা স্বীকার করতে লাগল। কর দিতে রাজি হলেই হত্যালীলা নয়, বরং উপঢৌকন মিলতে লাগল তাদের।

যত রাজ্য বিস্তার হতে লাগল চেঙ্গিজের, যুদ্ধব্যবস্থার তত উন্নতি করতে লাগল সে। ব্যবহার হতে লাগল উন্নত ধরনের তির-ধনুকের। আগে বাঁশ, কাঠ বা গাছের ডাল দিয়েই বানানো হত ধনুক, মঙ্গোলিয়ানরা চালু করল যৌগিক ধনুক, যাতে কাঠের ওপর বিভিন্ন তন্তু প্রাণীজ আঠা দিয়ে সেঁটে তার স্থিতিস্থাপকতা বেড়ে যায়। এই আঠা যেহেতু জলে গুলে যায়, তার ওপর জড়িয়ে নেওয়া হত জলরোধী কোন গাছের ছাল। তিরের পেছনে লাগানো হত পাখির পালক। ওরা পরীক্ষা করে দেখেছিল, ডানার পালকের চেয়ে লেজের পালক লাগালে হাওয়ায় চলাকালীন তিরের ব্যালেন্স বেশি ভাল থাকে, ফলে লক্ষ্যে গিয়ে লাগে। মঙ্গোলরা পাকা ঘোড়সওয়ার, দ্রুতগামী অশ্বের ওপর বসে সেখান থেকেই নিপুণভাবে তির ছোঁড়ায় অভ্যস্ত তাদের ধনুর্বিদরা। টিপ পরীক্ষার জন্য তাদের নিয়মিত প্রতিযোগিতা হত। এক একটা ধনুকের দৈর্ঘ্য অন্তত এক মিটার করে, সেই রকম পাঁচশো ধনুকের দূরত্ব থেকে লক্ষ্যবস্তুকে পর পর তিনবার শরাঘাত করতে হত। আর শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, এটা ছিল ক্রীড়াও। খোরজম দখল করার পর চেঙ্গিজ যখন তার কাছের অমাত্যদের নিয়ে প্রমোদে মত্ত, তখন তার ভাইপো প্রায় সাড়ে পাঁচশো মিটার দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে তির ছুঁড়ে তার মনোরঞ্জন করছিল। এর সঙ্গে পাথর ও অন্যান্য গোলা ছোঁড়ার জন্য আধুনিক গুলতির ব্যবহার প্রচলিত হল। যেখানেই কোন উন্নত যুদ্ধাস্ত্রের সন্ধান পেল চেঙ্গিজ, তার নকল বানানোর বরাত পেতে লাগল চিন ও মঙ্গোলিয়ার কর্মীরা।

১২২৭ সালে মারা গেল চেঙ্গিজ – ততদিনে সে তার খান বংশের প্রথম গ্রেট খান – কিন্তু তার আগে নিজের ছেলেদের ভাগ করে দিল বিভিন্ন এলাকার শাসনভার। জোচির ওপর সন্দেহ যেহেতু যায়নি, তাকে শাসনের উত্তরাধিকারী বানালে পরিবারে ঝামেলা বাধতে পারে। তার পরে আরও তিন ছেলে চেঙ্গিজের – চাগতাই, ওগেদেই আর তলুই। এদের মধ্যে ওগেদেই যোদ্ধা হিসাবে সবচেয়ে নিপুণ, তাই ওগেদেইকে করে দেওয়া হল দলের সর্দার অর্থাৎ পরের গ্রেট খান। সে বাপেরও এককাঠি ঊর্ধ্বে। তার আমলে মঙ্গোলদের রাজ্যবিস্তার হল এমন, যা ইতিহাসে সর্ববৃহৎ, আলেকজান্ডারের কৃতিত্বও তার কাছে ম্লান। কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে তার সেনাবাহিনি ধেয়ে গেল রাশিয়ায়। রাশিয়ানরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দখল হয়ে গেল বিস্তৃত ভূখণ্ড। রাশিয়ার পাদ্রীরা বুঝতেই পারল না কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছেন তাদের ভগবান। একে একে দখল হয়ে গেল নোভগোরোদ, রায়াজান, ত্বের, কিয়েভ। ভ্লাদিমিরের রাজা তার পরিবার আর শহরের বিশপ ও অন্যান্য অমাত্যদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের পবিত্র চার্চে। মঙ্গোলরা চার্চে আগুন লাগিয়ে সবাইকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারল। ভূলুণ্ঠিত হল পুণ্যোদকের পাত্র। যারা ভাবছিল প্রভুর কাছে বর প্রার্থনা করলে প্রভু এসে তাদের উদ্ধার করবেন, তরোয়ালের এক এক কোপে তাদের মুণ্ডু রাস্তায় গড়াতে লাগল।

কেঁপে উঠল ইওরোপ। খবর গেল স্কটল্যান্ডে আসতে চলেছে মঙ্গোল সেনা। ব্রিটেনের পূর্ব উপকূলে হেরিং কেনাবেচা হত, তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। হবে কী করে, বাল্টিক থেকে যে বণিকেরা তা কিনতে আসত, তারা ঘরের বাইরে পা রাখতে সাহস করল না।

১২৪১ সালে মঙ্গোলরা ইওরোপ আক্রমণ করল। নিজেদের দুভাগে ভাগ করে একভাগ ধেয়ে গেল পোল্যান্ডে, অন্যভাগ গেল হাঙ্গেরির দিকে। পোল্যান্ডের রাজা উড়ে গেল ঝড়ের মুখে। তার সঙ্গী সিলেসিয়ার ডিউককে রাস্তায় এক যানের পেছনে বেঁধে প্যারেড করানো হল, তার পেছনে তিন বস্তা ভর্তি তাদের সৈন্যদের কাটা কান। হাঙ্গেরি আক্রান্ত হতে সেখানকার রাজা চতুর্থ বেলা পালিয়ে গেল ডালমেশিয়ার দিকে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত পেছনে ধাওয়া করে গেল মঙ্গোল বাহিনি। পাদ্রিরা চার্চে প্রার্থনা শুরু করল। পোপ নবম গ্রেগরি ঘোষণা করলেন, যে হাঙ্গেরি রক্ষা করতে সাহায্য করবে, তাকে ক্রুসেডে যে সুবিধা দেওয়া হয়, সেসব দেওয়া হবে। তার কথা শুনেও কেউ এগিয়ে এল না। জার্মানির সম্রাট জানতেন এদের কাছে হেরে যাওয়ার শাস্তি কী। মঙ্গোলরা অবশ্য বুঝতে পারছিল পশ্চিম ইওরোপ থেকে তাদের বিশেষ কিছু জুটবে না; খাবার-দাবার ধনসম্পদ অন্যত্র অনেক বেশি। কিন্তু তাও তাদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবে একজন, তা কী করে সহ্য করা যায়! হাঙ্গেরির রাজার কাছে চিঠি গেল, আমরা খবর পেয়েছি আপনি একটা বড়সড় দেশের অধিপতি। আপনার সৈন্যসামন্তও কম নয়। আপনার হয়ত আমাদের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মানে লাগছে। আমরাও অহেতুক রক্তপাত পছন্দ করি না। আমার মনে হয় আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করাই আপনার ও আপনার দেশের পক্ষে মঙ্গলজনক।

ডালমেশিয়ার মধ্যে দিয়ে ছুটে গেল মঙ্গোল সেনা। যাত্রাপথে সমস্ত কিছু ধূলিসাৎ করে দিয়ে গেল।

তবুও যে হাঙ্গেরিসম্রাট বেলা, এবং তার সাথে ইওরোপ প্রায় বেঁচে গেল, তার একমাত্র কারণ হঠাৎ করে এ সময় গ্রেট খান ওগোদেই মারা গেলেন। পরবর্তী গ্রেট খান কে হবেন, তা নিয়ে মঙ্গোলদের আভ্যন্তরীণ আলাপ আলোচনায় বিশেষ সময় লাগত না যদিও, ওরা ভেবে দেখল বলকান রাজ্যে মাছি তাড়িয়ে বেড়ানোর চেয়ে এত যে বিশাল রাজত্ব তাদের অধিকারে এসে গেছে, পূর্বে কোরিয়া উপদ্বীপ থেকে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, উত্তরে রাশিয়া থেকে দক্ষিণে উত্তর ভারত, সেটার দেখভাল করাই আপাতত ঠিক হবে। পশ্চিম ইওরোপের দোরগোড়া থেকে ফিরে গেল তারা। সেটা ১২৪১ সাল।

ইওরোপের আতঙ্ক কিন্তু কাটল না। মঙ্গোলদের সম্বন্ধে খোঁজখবর করার জন্য পরের দশ বছরে গোটা পাঁচেক অভিযাত্রী দল পাঠানো হল পুবদেশে, ভগবানের নামে পোপের লেখা চিঠি নিয়ে গেল তার মধ্যে চারটে দল। তাদের রিপোর্ট পড়ে তো এদের চক্ষু ছানাবড়া। এই মঙ্গোল রাজারা বড় কোন শহরে থাকে না। শাকসব্জি খায় না। কুকুর, শেয়াল, হায়না, নেকড়ে সবই এদের খাদ্য। এদের নাকি পায়ে খুর আছে আর মুখ অনেকটা ঘোড়ার মত।

পোপের পাঠানো চিঠি পড়ে হেসে উঠলেন গ্রেট খান। পোপ লিখেছেন, তার নাকি খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করে প্রভুর পায়ে শরণ নেওয়া উচিত! হাসতে হাসতেই উত্তরে লিখলেন, আমি গ্রেট খান সমগ্র পৃথিবীর অধীশ্বর। দূর থেকে চিঠি না পাঠিয়ে আপনি বরং নিজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করুন, আমাদের সেবা করুন। যদি না করেন, তবে আপনি আমার শত্রু, সেই চোখেই আপনাকে আমরা দেখব। আর প্রভুর পায়ে যে শরণ নেওয়ার কথা বলছেন, কোন প্রভু? প্রভু কাকে কী চোখে দেখেন, তা আপনি কী করে জানেন?

এসব পড়ে পোপের মুখ পাণ্ডুর হয়ে গেল। এদের ঠেকানোর কোন রাস্তাই দেখা যাচ্ছে না। ভীত আর্মেনিয়ান চার্চ থেকে চিঠি গেল গ্রিক অর্থোডক্স চার্চে, সেখান থেকে রোমে। যে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে রেষারেষি করে মরে, মঙ্গোলদের ভয়ে তারা এখন পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শত্রু ঠেকানোর আলোচনায় উদগ্রীব। মুসলমানরা খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি দখল করে নিলে সেখানে যেমন পাঠানো হত একের পর এক ক্রুসেড, ঠিক তেমনি এখন সমস্ত খ্রিস্টানরাজ্য একসঙ্গে মিলে মঙ্গোলদের প্রতিহত করাতে উদ্যোগী।

১২৪৮ সালে পরবর্তী গ্রেট খান ওগেদেইয়ের ছেলে গুয়ুক মারা যেতে এই সমীকরণও বদলে গেল। হঠাৎই গদি নিয়ে মঙ্গোলদের মধ্যে গোলমাল শুরু হল। শোনা গেল বাইজ্যান্টাইনে পাঠানো একদল মঙ্গোল সেনা প্রচুর ঘুরপথে উদ্দিষ্ট রাজ্যে পৌঁছেও ঘুষটুষ খেয়ে রাজ্য দখল না করেই ফিরে এসেছে। সমস্ত পূর্ব ও উত্তর ইওরোপ থেকে মঙ্গোলদের বোঝানো হচ্ছে সেখানে আর কিছু নেই, যা দখল করে মঙ্গোলরা লাভবান হবে।

মঙ্গোলরা সেটা বুঝেও গেছে। গুয়ুকের ছেলেপুলে নেই, তাই তলুইয়ের ছেলে মঙ্গকেকে গ্রেট খান বানানো হল। তার নির্দেশে আপাতত ইওরোপে না গিয়ে মঙ্গোলরা চিনে বাকি যেসব ছোটখাট জায়গা দখল করা বাকি ছিল, সেগুলো দখল করে এক বিশাল অখণ্ড ভূমির মালিক হয়ে বসল। মঙ্গোলিয়ায় তাদের আদি ঘাঁটি কারাকোরাম ছেড়ে তারা রাজধানী স্থাপন করল চিনে তাদের প্রথম দখল করা বিখ্যাত শহর ও জিন বংশের রাজধানী জংদুর পাশে। সেখান থেকেই পরিচালিত হতে লাগল তাদের সাম্রাজ্য। সেই শহরের নাম দেওয়া হল বেইজিং।

শুধু বেইজিংই নয়, আরো বেশ কিছু শহর ঢেলে সাজানো হল। ঘর গুছিয়ে নিয়েই নতুন গ্রেট খান মঙ্গকে আক্রমণ শুরু করল দক্ষিণ পূর্বে। ১২৫৮ সালে উড়ে গেল বাগদাদ, তারপর কালিফ আল-মুস্তাসিম। আহরিত হল প্রচুর সোনা রুপো জহরৎ মণিমাণিক্য ধনদৌলত কাপড়চোপড় পোষাক-আশাক। মঙ্গোলদের রীতিই এমন, অন্য রাজ্য দখলের সময় আগে থেকেই ফর্দ ধরিয়ে দেয়, আমাদের এতটা করে এই এই বস্তু দিয়ে দাও, আমরা তোমাদের দেশের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে নেব।

পরের বছরই আবার তারা ধেয়ে গেল ইওরোপে। পোল্যান্ড দখল হল। প্যারিসে চিঠি গেল ফ্রান্সের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে। অন্য এক দল সিরিয়া হয়ে ঢুকে গেল প্যালেস্টাইন। খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি দেখভালের জন্যে একদল ল্যাটিন সেনা সেখানে মজুত ছিল, তারা তখন থরহরি-কম্প।

মঙ্গোলরা আসার আগে এই ল্যাটিন সেনাদের ভয় ছিল মিশরের নতুন মুসলমান শাসক মামলুকদের ওপর। কৃষ্ণসাগরের উত্তর থেকে ক্রীতদাস হিসাবে তাদের আনা হয়েছিল ক্রিমিয়া বন্দর দিয়ে মিশরের সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়াতে, তারা নিজেরাই শাসক হয়ে বসেছে। এদের দলে সব মঙ্গোলদের মতই যাযাবর।

আগের মত এবারেও ইওরোপ ভয়ে কাঁপতে লাগল। ইংল্যান্ড ও তার কাছাকাছি দেশসমূহে বার্তা গেল সেনা পাঠানোর। অবশ্য এবারে তাদের শত্রু মঙ্গোলদের বাধা দেওয়ার জন্যে এগিয়ে গেল অন্য শত্রু মিশরীয় মামলুকরা। তারা এগিয়ে গেল উত্তরে প্যালেস্টাইন অভিমুখে।

দীর্ঘ ষাট বছর ধরে যাবতীয় যুদ্ধ জিতে মঙ্গোলরা এই প্রথম কোন যুদ্ধে হেরে গেল। ১২৬০-এর সেপ্টেম্বরে প্যালেস্টাইনে তাদের হারিয়ে মামলুকরা দখল করে নিল এক বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড। মঙ্গোলরা বিশাল বিশাল রাজ্য বানিয়েছিল, একটা যুদ্ধে হেরে যাওয়া মানেই সেই এক বিশাল ভূমি এক লপ্তে হাতে এসে গেল মামলুকদের। এ যেন গাছে না উঠতেই এক কাঁদি! প্যালেস্টাইনে যুদ্ধ জিতে তার সঙ্গে তারা ফ্রি হিসাবে পেয়ে গেল সিরিয়া দামাস্কাস।

পবিত্রভূমির কী হবে এবার? খ্রিস্টানরাজ্যে ভাবনার অন্ত নেই। মঙ্গোলদের ভয়ে শুকিয়ে গেছিল তারা, এবার তো সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে চিরশত্রু মুসলমানরা। ধর্মগুরুরা আবার একত্র হলেন। সবাই মিলে ভেবে ঠিক করলেন, মঙ্গোলদের ভয়ে ভীত থাকার চেয়ে তাদের যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে লাভ বেশি। মঙ্গোলরা হারতে শেখেনি, মামলুকদের কাছে হার তারা ভাল চোখে দেখবে না, বদলা নিতে আসবেই। যদি তাদের সাহায্য করলে মামলুকরা হেরে যায়, তবে হয়ত মঙ্গোলরা তার বদলে তাদের প্রতি সদয় হয়ে পবিত্রভূমির অধিকার তাদের ফিরিয়ে দেবে, তাদের রাজ্য আক্রমণেও যাবে না।

১২৬০ সালের পর থেকে একে একে ইওরোপ থেকে মঙ্গোলদের কাছে অনুরোধ যেতে লাগল এই মর্মে।

মঙ্গোলদের অবশ্য তখন আভ্যন্তরীণ ব্যাপারটা আবার বেশ জটিল। এত বিশাল এলাকা দখল হয়ে গেছে যে তার পরিচালনা মোটেও সহজসাধ্য নয়। নিজেদের সুবিধার জন্যেই তারা তাই এলাকাগুলো চারভাগে ভাগ করে নিয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যেও অন্তর্দ্বন্দ্ব ঢুকে গেছে। মঙ্গোলিয়া-চিনে তাদের মূল শাসন, যেই গ্রেট খান হন, সে সেখানে বসে শাসন করেন। তার মূল শাসনেই থাকে সমগ্র মঙ্গোল অধিকার, তবে অন্যান্য তিনটে জায়গার শাসনব্যবস্থা দেখছে সেখানকার আঞ্চলিক প্রধান শাসক। মধ্য এশিয়া বা মুঘলিস্তান শাসন করছে দ্বিতীয় গ্রেট খান ওগেদেইয়ের দাদা চাগতাইয়ের বংশধররা। রাশিয়া আর মধ্য ইওরোপে তাদের গোষ্ঠীর নাম দেওয়া হল কিপচাক বা সোনালি যাযাবর, সেখানে শাসনের দায়িত্বে চেঙ্গিজের বড় ছেলে জোচির বংশধররা। তার দক্ষিণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসক ইলখানিদ ছোট ছেলে তলুইয়ের বংশধররা। ইলখানিদদের সঙ্গে সোনালি যাযাবরদের মাঝে মাঝেই ঝামেলা বাধে।

মামলুকরাও তো এদের মতই যাযাবর, জানে এদের রকম সকম। সেই বুঝে শত্রুদমন করতে ওরা সোনালি যাযাবরদের প্রধান বার্কেকে হাত করে ফেলল। ফলে খ্রিস্টান ইওরোপ হাত বাড়াল ইলখানিদদের সঙ্গে বন্ধুত্বস্থাপনে। কাজটা সহজ নয়, এসব করতে করতে ১২৮০ সাল পেরিয়ে গেল। তবে ইলখানিদদের এক শাসককে রাজি করানো গেল, সে আবার উইগুরিয়ার এক খ্রিস্টান বিশপ।

উত্তেজনায় লাফাতে লাগলেন ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডোয়ার্ড। বছর দশেক আগে তিনি ক্রুসেডে জেরুজালেম গেছিলেন, দেখে এসেছেন সেখানকার অবস্থা। নির্লজ্জ ভেনিসের বণিকদের কাণ্ডকারখানা দেখে এসেছেন সেখানে। অর্থের বিনিময়ে তারা খ্রিস্টানদের চিরশত্রু মুসলমানদের বিক্রি করে আসছে এমন সব বস্তু যা তারা ব্যবহার করছে খ্রিস্টানদের রাজ্য আর দুর্গ দখল করতেই। ইলখানিদ বিশপকে প্রচুর সম্মান দিয়ে মহা আড়ম্বরে অভ্যর্থনা জানানো হল, প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন দেওয়া হল তাকে। মুসলমানদের এবার খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি থেকে উৎখাত করা যাবেই, এতে আর কোন সন্দেহই নেই। দেশে দেশে এই বার্তা রটে গেল। রোমে বিরাট মিছিল বেরিয়ে গেল এই জয়ের আনন্দে। যে মঙ্গোলদের ভয়ে মাত্র কয়েক বছর আগেই তাদের রাতের ঘুম উড়ে যেত, সেই মঙ্গোলরাই যখন তাদের সাহায্য করবে, তখন আর চিন্তা কী!

কিন্তু এই পরিকল্পনা মাঠে মারা গেল পুরোটাই। একের পর এক ক্রুসেডের পরেও যেমন বিশেষ কিছু লাভ হয়নি তাদের, এই সব আলাপ-আলোচনার শেষেও তেমন কাজের কাজ কিছু হল না। হঠাৎ রাজা প্রথম এডোয়ার্ডের মনে পড়ে গেল, আরে, ঘরের কাছে তাদের আরও অনেক সমস্যা রয়েছে, এখন মঙ্গোলদের সাহায্য নিয়ে পবিত্রভূমিতে সৈন্য পাঠানো সম্ভব হবে না। সেখানকার বদলে সৈন্য পাঠানোর দরকার এখন স্কটল্যান্ডে, সেখানকার বিদ্রোহ দমন করা বেশি জরুরি, না হলে তার নিজের গদিই চলে যাবে। একে একে অন্যান্য খ্রিস্টান রাজ্যগুলোও একই রকম ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ায় জেরুজালেমের ভবিষ্যতের কথা ভুলে গেল। দুশো বছর আগে প্রথম ক্রুসেডে জেরুজালেম উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, এতদিনে সেই অঞ্চলের শেষ অধিকৃত জমিও তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। ১২৯১ সালে সমগ্র অঞ্চলই চলে গেল মামলুকদের দখলে।

শতাব্দী শেষ হওয়ার আগে অবশ্য খ্রিস্টানদের মনে আবার এক ক্ষীণ আশা উঁকি দিল। মঙ্গোলরা ততদিনে মামলুকদের হারিয়ে দিয়েছে। তাতে অবশ্য নাচতে লাগল ইওরোপের খ্রিস্টানরা, এমন ভাব যেন তারাই জেরুজালেমের দখল নিয়ে নিয়েছে। গুজব রটে গেল ইলখানিদের শাসক নিজে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে পবিত্রভূমি রক্ষার দায়িত্ব নিজে নিয়ে নিয়েছে। এমন গুজবও রটল যে শুধু সিরিয়া বা প্যালেস্টাইন নয়, পুরো মিশরই এখন মঙ্গোলদের দখলে।

মঙ্গোলরা অবশ্য এখন আর ইওরোপিয়দের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে রাজি নয়। খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি জেরুজালেম ইওরোপিয়ানদের আর দখল করা হল না।

* * *

ভূমধ্যসাগরের পুবদিকের ভূখণ্ডকে রোমানরা বলত লেভান্ত, শব্দটার মানে হচ্ছে উদীয়মান। সেখানেই যেহেতু সূর্য আগে ওঠে, তাই হয়ত উদীয়মান সূর্যের দেশ হিসাবে কথাটা বলা হত। বস্তুত সিরিয়াকে উদ্দেশ করে বলা হলেও এর মধ্যে পড়ে গ্রিস, আনাতোলিয়া, প্যালেস্টাইন এমনকি মিশরও। সেখানে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বন্দর রয়েছে। মিশরে নীলনদের ধারে আলেকজান্দ্রিয়া, তার থেকে উত্তরে ক্রমে ক্রমে প্যালেস্টাইনের হাইফা, সিজারিয়া, আক্কো, ত্রিপোলি, আনাতোলিয়ার অ্যান্টিওক। তার অনেক পশ্চিমে গ্রিসের এথেন্স। ভূমধ্যসাগর আর কৃষ্ণসাগরের সীমান্তে কন্সট্যান্টিনোপল। ভূমধ্যসাগরের মধ্যে বর্তমান ইতালির এক বিশাল অংশ ফিতের মত ঝুলে আছে উত্তরে ইওরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে। এই ফিতের সবচেয়ে উত্তরে পশ্চিম উপকূলে জেনোয়া আর পূর্ব উপকূলে ভেনিস। এই দুটোই প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। জেনোয়া থেকে পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণ-পূর্বে নামতে থাকলে পড়ে পিসা, রোম, নেপলস।

লেভান্তের বন্দর শহরে যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হলে তো ব্যবসা চালানো যায় না, তাই জেনোয়া আর ভেনিসের ব্যবসায়ীরা অন্য রুট দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। পুবদিক থেকে বস্তুসামগ্রী আসে, আসে লোমসহ পশুচর্ম যা দিয়ে উত্তম শীতবস্ত্র প্রস্তুত হয়, আসে গোলমরিচ, আদা, অন্যান্য মশলাপাতি, সোনার কাজ করা মিহি বস্ত্র, মণিমুক্তো, জহরৎ। সেগুলোর কেনাবেচার জন্যে তারা কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূলে ক্রিমিয়ায়, আজভ সাগরের মুখে আর আর্মেনিয়ার সিসিলিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করল। বণিকসম্প্রদায় টাকাপয়সার মর্ম বোঝে। ভূমধ্যসাগর উপকূলে আলেকজান্দ্রিয়ায় কর যেখানে দশ, কুড়ি বা তিরিশ শতাংশ, কৃষ্ণসাগর উপকূলে সেখানে তিন থেকে পাঁচ শতাংশ। তাছাড়া কৃষ্ণসাগরের উত্তরে আর দক্ষিণে খাদ্যশস্যের দামের বিপুল ফারাক। বড় বড় জাহাজে মাল তাই আসা-যাওয়া করে। সেই একই জাহাজ এমনি এমনি ফিরে যায় না, নিয়ে যায় অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে মানুষও। পোপ যাই বলুক, তাতে কর্ণপাত না করে তারা জাহাজ বোঝাই করে ক্রীতদাস এনে বেচতে লাগল মুসলমান মামলুকদের কাছে।

জেনোয়া আর ভেনিসের মধ্যে পুরনো দ্বন্দ্ব। ১২৮২ সালে জেনোয়া পিসায় গিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল তাদের সেনাদের। অধিকৃত সৈন্য টাকাপয়সার বিনিময়েও ছাড়তে রাজি হয়নি। সেই শত্রুতা ছড়িয়ে পড়ল অন্যত্রও। কনস্ট্যান্টিনোপলে, সাইপ্রাসে, ভূমধ্যসাগরের অন্য জায়গাতেও। ১২৯৯ সালে পোপের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হল তাদের।

এই যে ব্যবসায়িক বুদ্ধি জেনোয়া আর ভেনিসের বণিকদের, তার পেছনে মঙ্গোলদের অবদান কম নয়। মঙ্গোলরা শুধু যে শহর ধ্বংস ও নরনারীশিশুবৃদ্ধ নির্বিচারে হত্যা করেছে তাই নয়, তারা তৈরি করেছে নতুন শহর, তারা সুগম করেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ। তারা হত্যা করেছে শত্রুদের, পুরস্কৃত করেছে মিত্রদের। যারাই যত তাদের অনুগামী হয়েছে, তারা তত ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মঙ্গোল শাসনে প্রতিভা ও নিয়মানুবর্তিতার পুরস্কার জুটেছে, তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় আইনব্যবস্থা।

মঙ্গোলদের সাফল্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের বহু নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। বিজয়ী মঙ্গোল শাসকরা বের করত বড় বড় মিছিল, তাদের আগে আগে চলত বিভিন্ন ভূষণে ভূষিত পাত্র-মিত্র-অমাত্যরা। উত্তর ভারতে সেই রীতি চালু হল। সমগ্র চিনের খাদ্যাভ্যাস বদলে চালু হল মঙ্গোলদের যাযাবর রীতি – প্রধানত সেদ্ধ-করা রান্না। যাযাবর মঙ্গোলরা প্রাণীদেহের কোন অংশই ফেলে দিত না, সব খেয়ে ফেলত। চিনের শাসকদের অনেকে আগে খেত গ্যাঁজানো দুধ, ঘোড়ার মাংস, উটের কুঁজের স্যুপ। মঙ্গোল প্রভাবে এ সবের সঙ্গে তাদের খাদ্যে যোগ হল ভেড়ার ফুসফুস, কাকের পা, বাছুরের লেজ, মোষের নাড়িভুঁড়ি, সাপ-ব্যাঙ-ইঁদুর-আরশোলা-কীটপতঙ্গ।

আর শুধু চিনে বা উত্তর ভারতে নয়, ইওরোপেও প্রবেশ করল মঙ্গোল সংস্কৃতি। মঙ্গোল তথা পূর্ব পৃথিবী সম্বন্ধে জানতে তখন ইওরোপের সবাই উৎসুক। একের পর এক মিশন আসতে লাগল গ্রেট খানের দরবারে। পশ্চিমী অভিযাত্রী দল শুরু করল পুবদিকে তাদের যাত্রা। মার্কো পোলো, ইবন বতুতা বের হলেন প্রাচ্যদেশের ডায়রি লিখতে। কেউ স্বচক্ষে দেখে, কেউ না দেখে লিখে দিলেন ভারত ও চিন সম্বন্ধে তাদের অভিজ্ঞতা। তার মধ্যে গাঁজাখুরি গল্পও কম না।

মার্কো পোলোর যাত্রাপথটি অদ্ভুত। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে এসে সিরিয়ার বন্দর দিয়ে ঢুকে গেলেন লেভান্তে। ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী পেরিয়ে পৌঁছালেন তাব্রিজে, সেখান থেকে দক্ষিণে বাগদাদ। বসরা হয়ে ফের পারস্য উপসাগরে জাহাজে চড়লেন। আরব সাগরের মুখে আবার পূর্ব উপকূলে নেমে সোজা উত্তম-পশ্চিম পথে চললেন বলখে। পামির মালভূমি পেরিয়ে কাশগড় হয়ে সোজা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে পৌঁছালেন মঙ্গোলদের ডেরা কারাকোরামে। সেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্বে বেইজিং। দক্ষিণে যাত্রা করে চেংদু কুনমিং হয়ে সোজা ব্রহ্মদেশে নেমে ফের উত্তরে কুনমিং চেংদু হয়ে বেইজিং। তারপর চিনের পূর্ব উপকূলের কিছু বন্দর ঘুরে দক্ষিণ চিন সাগরে জাহাজপথে এলেন অধুনা ভিয়েতনামের ইন্দ্রপুর। সেখান থেকে অধুনা সিঙ্গাপুরের কোল ঘেঁষে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঢুকে আন্দামান নিকোবরের দক্ষিণ দিয়ে সিংহল ও ভারতের মধ্যবর্তী পক প্রণালী দিয়ে ভারতের দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে পড়লেন। আরব সাগর দিয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তরে উঠে এলেন। জাহাজ নোঙর করল সোপারা বন্দরে, যা এখন মুম্বইয়ের শহরতলি নালা সোপারা। মার্কো পোলো জাহাজ থেকে সম্ভবত নামেন নি, সেখান থেকেই আবার ভেসে ওমান উপসাগরের উপকূলে বন্দর আব্বাসে নেমে সেখান থেকে স্থলপথে উত্তর পশ্চিমে তাব্রিজ হয়ে কৃষ্ণসাগর, সেখান থেকে কনস্ট্যান্টিনোপল হয়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে গৃহ অভিমুখে যাত্রা।

অর্থাৎ ভারত তার চরণস্পর্শে ধন্য হওয়ার সুযোগ পেল না। অথচ দিব্যি লিখে ফেললেন, তিনি দেখেছেন ইন্ডিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে পাহাড়ের খাদে হিরে ছড়ানো থাকে। সেখানকার লোকজন পশুর মাংস আর সাপ মেরে সেই হিরে-ছড়ানো খাদে দূর থেকে ছুঁড়ে দেয়, যাতে সেই মরা সাপ আর পশুমাংসে আঠার মত লেগে যায় হিরের কুচি। চিল আকাশ থেকে উড়ে এসে সেই হিরে আর মাংসসুদ্ধ সাপ ছোঁ মেরে নিয়ে যায় তাদের ডেরায়, সেখান থেকে এইভাবে তাল তাল হিরে উদ্ধার করা এমন আর কী কঠিন কাজ! আর একজন লিখলেন, গোলমরিচ জন্মায় জলা জায়গায়, সেখানে কুমিরের প্রবল উপদ্রব। আগুন জ্বালিয়ে কুমির তাড়িয়ে তবে গোলমরিচ সংগ্রহ করে ভারতীয়রা। ইবন বতুতা উত্তর-পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন, জলপথে চিনের পূর্ব উপকূলে গেছিলেন। চিনের রাস্তাঘাটে তেমন ভ্রমণ করেন নি। অথচ তার লেখায় তিনি চিনের রাস্তাঘাট আর সুরক্ষাব্যবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। লিখলেন পর্যটকদের পক্ষে এত সুরক্ষা পৃথিবীর আর কোথাও মেলে না।

পুবদেশ থেকে বাণিজ্যিক বস্তু ইওরোপে আসছিল বহু শত বছর ধরেই। তার সঙ্গে এই গালগল্প জুড়ে পুবদেশ সম্বন্ধে ইওরোপের মানুষের মনে এক রহস্যময়তার জন্ম দিল।

মঙ্গোলদের এই বিশাল এলাকার আধিপত্য কায়েম হওয়ায় পশ্চিমে ইওরোপ থেকে পূর্বে চিন যাওয়ার এক বিশাল রাস্তা – সিল্ক রুট – খুলে গেল। এই দুর্গম পথ এমনিতেই পার্বত্যসঙ্কুল হওয়ায় যাতায়াতের পক্ষে তেমন সুখকর নয়, আর তার ওপরে ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্র বা টাকাপয়সা নিয়ে যাতায়াত করলে যদি বা প্রকৃতির অভিশাপ এড়িয়েও যায়, পার্বত্য দস্যুদের হাতে নিগ্রহ বা মৃত্যু এক রকম অবধারিতই ছিল। মঙ্গোলরা বুঝে গেছিল তাদের টিঁকে থাকতে হলে চাই ধনসম্পদ, যা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর হিসাবে আদায় করা বেশ সহজ কাজ।

এই রাস্তায় প্রতি দশ ক্রোশ অন্তর অন্তর তারা স্থাপন করল সরাইখানা। সেখানে বিশ্রাম নেওয়া যাবে, খাবার দাবারও মিলবে। রাস্তায় সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই রাস্তায় চলাচল বেড়ে গেল বহুগুণ, ফলে কর আদায় করে ফুলে ফেঁপে উঠল মঙ্গোলদের সিন্দুক।

এবং একই কারণে শুরু হল এক অভাবিত সমস্যারও। এক নতুন রোগ বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ল মঙ্গোলদের যাত্রাপথ ধরে। ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ সাল সারা বিশ্বে বিভীষিকা সৃষ্টি করে এর কবলে প্রাণ হারাল কোটি কোটি মানুষ, ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস নামে একধরনের ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে। কী করে যে এত বিরাট অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল এই রোগ, তা তো নিশ্চিত করে জানা গেল না, তবে এর শুরু হয়েছিল মধ্য এশিয়ার শুকনো মাটিতে। পশ্চিমে কৃষ্ণসাগর থেকে পূর্বে মাঞ্চুরিয়ার বিস্তীর্ণ ঊষর ঘাসজমি এমনিতেই প্লেগাক্রান্ত থাকে। এই নতুন রোগেরও প্লেগের মত লক্ষণ, তবে ঠিক প্লেগ নয়। এমন হতে পারে যে চেঙ্গিজের মঙ্গোলবাহিনি যেখানেই হানা দেয়, সেখানেই যেহেতু সমস্ত মানুষকে কচুকাটা করে রাখে, সেখানে আর ফসল ফলানোর মত কেউ থাকে না। ফলে ইঁদুরজাতীয় প্রাণীরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতেই ছুটে চলে মনুষ্য-অধিকৃত অঞ্চলে, সঙ্গে নিয়ে চলে এই রোগের বোঝা। মাছি, উট এরাও এই রোগের জীবাণু বয়ে নিয়ে যায়। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির সামান্য তারতম্যেই এই রোগের জীবাণুর জীবনচক্রে বিরাট পরিবর্তন আনে, এরা মাছিবাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সিল্ক রুটের রাস্তা খুলে যাওয়ায় এক অঞ্চলের মানুষ থেকে অন্য অঞ্চলের মানুষে রোগ সংক্রমণ চলতে থাকে অবিরাম। জলপথে জাহাজে ইঁদুরের উপদ্রব কম নয়, তাদের মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে এক বন্দর থেকে অন্যত্র।

একে বলা হল – ব্ল্যাক ডেথ! নরনারী নির্বিশেষে এর শিকার হতে লাগল। শুরুতে ঊরুসন্ধি বা বগলে আপেল বা ডিমের সাইজে এক টিউমার, তারপর শরীরের অন্যত্র যত্রতত্র। এর পর হাত, ঊরু বা নখের ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে চামড়ায় বিরাট কালো কালো স্পট, দেখলেই শরীর শিউরে ওঠে। এর সঙ্গে প্রবল জ্বর এবং রক্তবমি। উপসর্গ দেখা দেওয়ার দুই থেকে সাত দিনের মধ্যেই অধিকাংশের মৃত্যু।

প্রথম দিকে এই রোগ সীমিত ছিল মধ্য এশিয়া, চিন ও উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে। পরে সিল্ক রুট ধরে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিমে, এসে গেল ভূমধ্যসাগরের কূলে। ১৩৪৭ সালে কৃষ্ণসাগরের উত্তর উপকূলে ক্রিমিয়ার কাফা বন্দরে এই রোগ বয়ে নিয়ে গেল জেনোয়ার বণিকরা। কাফা আক্রমণ করেছিলেন মঙ্গোল সম্রাট জানি বেগ, নিজেও এই রোগেই ভুগছিলেন। মঙ্গোলদের সৈন্যদের মধ্যেও অনেকে তখন এতে মারা গেছে। ফলে কাফা দখল করা সহজ হচ্ছিল না, শহর রক্ষা করে চলছিল তাদের সৈন্যরা বহুদিন ধরে। মরীয়া মঙ্গোলসৈন্য তাদের নিজেদের সৈন্যদের মৃতদেহ বড় বড় গুলতির মত ছোঁড়ার যন্ত্রে ফেলে শহরের দেওয়ালের বাইরে থেকে ভেতরে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। ব্যাস, মারণ রোগ ছড়িয়ে পড়ল কাফায়।

জেনোয়ার বণিকরা ভয় পেয়ে পালাল কাফা ছেড়ে, কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? ১৩৪৭ সালের অক্টোবরে কনস্ট্যান্টিনোপল হয়ে বারোটা জাহাজ ভূমধ্যসাগরের মধ্যে রোমের দক্ষিণে সিসিলি দ্বীপের পূর্ব উপকূলে মেসিনা বন্দরে পৌঁছাতে সেখানে ছড়িয়ে গেল এই রোগ। মেসিনায় যখন পৌঁছাল জাহাজগুলো, দেখা গেল তাতে যতজন যাত্রী, তাদের সবাই হয় এই রোগে আক্রান্ত অথবা মৃত। আগত বণিকদের সর্বাঙ্গে ফোঁড়া, তারা রক্তবমি করছে। তাদের যারা আশ্রয় দিল, তারা সবাই একই রোগে মারা গেল। অন্যান্য কিছু জাহাজ দেখা গেল সমুদ্রে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ভাসছে, কেননা জাহাজ চালানোর মত অবস্থায় কেউ নেই, যাত্রী ও চালক সব্বাই মারা গেছে! সেসব জাহাজ একে একে লুঠ হতে লাগল। যারা লুঠ করল, তারা জানতেও পারল না, লুঠ করার ফলেই তাদের সময় ঘনিয়ে এল। একই রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা নিজেরা তো মরলই, রোগ ছড়িয়ে দিল তাদের কাছাকাছি থাকা মানুষদের মধ্যেও। জেনোয়ার বণিকদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল, ১৩৪৮-এর জানুয়ারিতে তাদের কয়েকজন পৌঁছাল জেনোয়া ও ভেনিসে, সেখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ল। কয় সপ্তাহের মধ্যে পিসাতে এর কবলে পড়ল সেখানকার জনগণ। জানুয়ারির শেষদিকে বন্দর শহর মার্সাইও।

ভূমধ্যসাগর উপকূলে জেনোয়া-ভেনিস বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। জিনিসপত্র যেমন সেখান থেকে রপ্তানী হয়, রোগও তেমনি ছড়িয়ে পড়ল গোটা ইওরোপে। ১৩৪৮-এর মাঝামাঝি ফ্রান্স, বাভারিয়া, অ্যারাগন ও কাস্তিল অর্থাৎ স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ডে পৌঁছে গেল ব্ল্যাক ডেথ। পরবর্তী দেড় বছরে জার্মানি ও অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে। ১৩৪৯-এ নরওয়ে, পরের বছর আইসল্যান্ড, ১৩৫১ সালে রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে। কোনো কোনো শহরের ৯০ শতাংশ মানুষই মারা গেল, তাদের কবর দেওয়ার লোকও পাওয়া যাচ্ছিল না। পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, মিলান ও নেদারল্যান্ড সহ যেসব রাজ্য ইতালির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করত অপেক্ষাকৃত কম, সেখানেই যা একটু কম প্রভাব পড়ল এর।

শুধু ইওরোপই নয়, মধ্যপ্রাচ্যও পতিত হল ব্ল্যাক ডেথের করাল গ্রাসে। ১৩৪৭ সালে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতে শুরু হল ব্ল্যাক ডেথ, যেহেতু কনস্ট্যান্টিনোপল আর কৃষ্ণসাগরের অন্যান্য বন্দরের সঙ্গে এর বাণিজ্যিক লেনদেন খুবই ঘনিষ্ঠ। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এর ছায়া নেমে এল একে একে লেভান্তের সিরিয়া, প্যালেস্টাইনে। জেরুজালেম-দামাস্কাস আক্রান্ত হল। দামাস্কাসে রোজ হাজারখানেক করে লোক মরতে লাগল। কায়রো থেকে প্যালেস্টাইনের দীর্ঘ পথ মৃত মানুষের লাশে ছেয়ে গেল। উত্তর মিশরের করদাতার সংখ্যা ছ’ হাজার থেকে এক লাফে নেম এল একশো ষোলতে!

শহরের লোকজন ভয় পেয়ে উত্তরে পালাতে শুরু করলে পরের দু বছরে সেখানেও ধাওয়া করল এই মারণ রোগ। ১৩৪৯-এ মক্কায় ছড়িয়ে পড়ল ব্ল্যাক ডেথ। পরের বছর বাগদাদে। মিশরের কায়রোয় বন্দী ছিলেন ইয়েমেনের সুলতান আল-মুজাহিদ আলি সেনাবাহিনি নিয়ে। ১৩৫১-তে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরলেন তিনি, ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ল মারণব্যধি।

বিপন্ন মানুষজন ভেবে পেল না কী করা উচিত। পোপ বললেন, তোমরা যে পারো চার্চে এসে পাপ স্বীকার করো, আমি মাপ করে দেব। ফ্রান্সের জনগণ বলল, আকাশ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে প্রভু খুশি নন, আকাশ থেকে সাপ-ব্যাঙ-টিকটিকি-কাঁকড়াবিছে বৃষ্টি হচ্ছে! ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডোয়ার্ড উপোস করা শুরু করলেন, বিশপকেও বললেন উপোস করতে। আরবের মুসলমান ধর্মগুরুরা নিদান দিল কোন এক আয়াৎ মহম্মদের নাম করে দিনে এগারোবার বললে বগলে ফোঁড়া হবে না। রোমে জনগণ প্রার্থনা করতে গেল খালি পায়ে হেঁটে। সুইডেনের যাজক পরামর্শ দিলেন, মেয়েদের দিকে লালসার চোখে তাকাবে না, যৌনসঙ্গম একেবারে বন্ধ রাখো, চান করবে না। জার্মানিতে রটে গেল ইহুদিরা নাকি জলে বিষ মিশিয়েছে, তাই এই রোগ। কোলোন আর অস্ট্রিয়ায় ইহুদিদের ধরে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হতে লাগল।

মাত্র সাত বছরেই ইওরোপের প্রায় অর্ধেক লোক মারা গেল, পৃথিবীর জনসংখ্যা কমে গেল দশ থেকে কুড়ি কোটি।

ব্ল্যাক ডেথের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হতে চলে গেল বহু দশক। এর মধ্যে ইওরোপের দক্ষিণে প্রচুর পরিবর্তন দেখা গেল। ব্ল্যাক ডেথের প্রভাব ভেনিসের ওপর খুব বেশি পড়ায় জেনোয়া তার সুযোগ নিয়ে ব্যবসা দখল নেওয়ার চেষ্টা করল। সে চেষ্টা অবশ্য সফল হল না। প্রচুর অর্থব্যয় করে তারা অন্যান্য বন্দরে কর্তৃত্ব করতে গিয়ে নিজের পতন ডেকে আনল, ততদিনে ভেনিস এই মারণরোগ থেকে বেরিয়ে এসেছে।

জেনোয়ার পতন মানে ভেনিসের পোয়াবারো। ব্ল্যাক ডেথের দুর্বিষহ স্মৃতি যত ফিকে হয়ে আসতে লাগল, ভেনিসের ব্যবসা ততই ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল। প্রাচ্যদেশ থেকে আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে ভেনিসের বাজারে আসতে লাগল একের পর এক মশলার জাহাজ। গোলমরিচ, আদা, জায়ফল, লবঙ্গ বোঝাই জাহাজের সংখ্যা বাড়তেই লাগল। দক্ষিণে মিশর হয়েই আসত বছরে চারশো টনের ওপর মশলা, তার সঙ্গে ছিল পুবের লেভান্তের থেকেও। পঞ্চদশ শতকের শেষে পঞ্চাশ লক্ষ পাউন্ড মশলা হাজির হত ভেনিসে, বিক্রির জন্যে, সে খাবারে, ওষুধে বা প্রসাধনীদ্রব্যে যাতেই ব্যবহৃত হোক। লাভের অঙ্ক উপচে পড়ত ব্যবসায়ীদের ঝোলায়।

আর শুধু মশলাই তো নয়। এর সঙ্গে ছিল ছবি আঁকার রংও। এর মধ্যে ছিল ভার্দিগ্রিস নামে গ্রিস থেকে আসা এক ধরনের সবুজ রং, সিঁদুর, মেথি, সিসা-টিন ইয়েলো, বোন চারকোল ব্ল্যাক আর পুরপুরিনাস গোল্ড নামে সোনালি এক বিশেষ রং। সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের খনি থেকে আসা লাপিস লাজুলি নামে এক উজ্জ্বল নীল রং, চিত্রকরদের কাছে যার চাহিদা প্রচুর। মশলার তুলনায় লাভের ব্যাপারে এগুলো হয়ত তত উল্লেখযোগ্য নয়, কিন্তু এশিয়া থেকে এসব দ্রব্য না এলে ইওরোপিয় চিত্রকররা ছবি আঁকবে কী করে?

* * *

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় পবিত্রভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশিয়া ও ইওরোপের মাথাব্যথা ধীরে ধীরে কমে গেল, তার বদলে উঠে এল এক নতুন অন্যতর চিন্তা। যে জাতি ধ্বংসোন্মুখ, তার যেমন হয় আর কী! মুসলমান শাসন তাদের পবিত্র ভূমি গ্রাস করে নিয়েছে, তাকে কোনভাবেই মুক্ত করা যাচ্ছে না এতবার ক্রুসেডের পরও। নিশ্চয় প্রভুর ইচ্ছা অন্য, বলে উঠল একদল গোঁড়া খ্রিস্টান। বস্তুত খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গোঁড়ামি এক হাস্যকর পর্যায়ে চলে গেছে প্রথমে মঙ্গোল, পরে মিশরের মামলুকদের হাতে মার খেয়ে। রাশিয়ার পাদ্রীরা হিসাব কষতে বসল, অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্যে কী আছে। এই তো, প্রভু তো বলেই গেছেন যে অষ্টম সহস্রাব্দীর শুরুতেই অধার্মিকরা যখন ধার্মিকদের ওপর অত্যাচারে ন্যস্ত হবে, তখন যিশুখ্রিস্ট আবার আসবেন তাঁর শেষ জাজমেন্ট শুনাতে, সেই হবে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী, তারপরেই শুরু হবে মহাপ্রলয়। এখন যে অনাচার চলছে, নিশ্চয় এ তারই সূচনা। এ ওকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, আপনার হিসেবমতে কবে তাহলে সেই শেষ জাজমেন্ট শোনা যাবে? এ তো মহা পুণ্যের দিন। ঠিক কোথায় প্রভু যিশু এসে দেবেন তাঁর শেষ ভাষণ? কেউই বলতে পারে না। শেষমেষ একজন বয়স্ক পাদ্রীকে রাশিয়া থেকে পাঠানো হল পশ্চিম ইওরোপে, যে গিয়ে জেনে আসবে কবে কখন কটায় শুরু হবে মহাপ্রলয়। সামনে ইস্টার আসছে, অথচ তা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা নেই, সবাই অ্যাপোক্যালিপ্সের সময় নিয়েই চিন্তিত। রাশিয়ার বাইজ্যান্টাইন ক্যালেন্ডার যারা অনুসরণ করেন, তাদের একজন বললেন, আরে, এ তো জলের মত পরিষ্কার। যিশুর জন্মের ৫৫০৮ বছর আগে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়েছে, সুতরাং মহাপ্রলয় আসবে ১৪৯২ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর। এই তো এসে গেল বলে, আর মাত্রই ক’মাস!

পশ্চিম ইওরোপেও ছড়িয়ে পড়ল সেই একই চিন্তা। তবে শেষ জাজমেন্টের আগে তো ধার্মিক বনাম অধার্মিকদের লড়াই হবে। ধার্মিক মানে অবশ্যই খ্রিস্টান, কিন্তু অধার্মিক কে? নিশ্চয় মুসলমান ও ইহুদিরা। সেনা লাগিয়ে স্পেন থেকে বিতাড়ন করা হল মুসলমানদের। ইহুদিদের বলা হল, হয় খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করো, নয় মুণ্ডু কেটে নেওয়া হবে। দলে দলে ইহুদিরা পালাতে লাগল স্পেন ছেড়ে। তারা বহুদিন ধরে বাস করছে ওদেশে, এখন হঠাৎ এই অবস্থায় ঘরবাড়ি, জমিজমা ছেড়ে যাবে কোথায়! কীভাবে যাবে? এক একটা জামা বা জুতোর বদলে তাদের বিক্রি করে দিতে হল তাদের প্রাসাদ, তাদের আঙুরের ক্ষেত। তারা ঠিক করল, তারা কনস্ট্যান্টিনোপলেই যাবে! সেখানকার মুসলমান শাসকরা তাদের আশ্রয় দিতে দ্বিধা করল না। সেখানকার মুসলমানরা তখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। পক্ষান্তরে ইওরোপের খ্রিস্টানদের মধ্যে তীব্র কলহ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, হতাশা।

একজন অবশ্য এত সহজে হাল ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সে দিনরাত অঙ্ক কষে যায়, কী করলে এই অবস্থার পরিবর্তন আসতে পারে। মহাপ্রলয় নিয়ে সে বিশেষ ভাবিত নয়। কেননা, তার হিসাব মতে বাইজ্যান্টাইন ক্যালেন্ডার ভুল, এখন তো মোটে ১৪৯২ সাল, মহাপ্রলয় আসতে এখনও ১৫৫ বছর বাকি। তার আগে জেরুজালেমকে যে করেই হোক মুক্ত করতে হবে। এর জন্যে চাই প্রচুর সৈন্য, আর তাদের খরচাপাতি চালানোর জন্যে চাই অনেক টাকাপয়সা। কোত্থেকে আসবে?

যদি কোনভাবে খোলা যায় পূর্ব-পৃথিবীর জানালা, সেখান দিয়ে আনা যায় সম্পদের সূর্যালোক। পুবের দেশ ভারতে আছে মহার্ঘ মশলাপাতি, যা কেনাবেচা করে ভেনিসের বণিকরা এতদিন বারফট্টাই করেছে। সেখান থেকে মশলা সংগ্রহ করে আনতে পারলে পুরো লাভটাই পাওয়া যাবে। তাছাড়া পুবের দেশ চিন শাসন করে গ্রেট খানদের বংশধর, তাদের পরাক্রমের কথা ইওরোপে কে না জানে? তারা এখন আর এমুখো হয় না বটে, কিন্তু তাদের কাছে এই মশলার লাভের টাকাপয়সা দিয়ে জেরুজালেম মুক্ত করার জন্যে সেনাবাহিনির সাহায্য চাইলে তারা কি ফিরিয়ে দেবে? মনে হয় না। টাকাপয়সার জন্যেই তো তারা দেশ দখল করতে বেরিয়েছিল।

সে পড়তে থাকে টলেমির লেখা বই, কম্পাস দিয়ে ম্যাপের জায়গা মাপে। তার বিচিত্র পরিকল্পনা নিয়ে সে ছুটে ছুটে যায় রাজা-রাজড়াদের দরবারে সাহায্য ও সমর্থনের প্রত্যাশায়। সমুদ্রে পশ্চিমমুখে যাত্রা করে ইন্ডিজ তথা ভারতে পৌঁছানোর তার যে ক্যালকুলেশন, তাতে নিঃসন্দেহ না হলেও তার এই সার্বিক ভাবনা ছায়া ফেলল স্পেনের রাজা-রানি ফার্দিনান্দ-ইসাবেলার মনেও। প্রথমে দোনামনা করেও শেষমেষ তারা চিঠি লিখে দিলেন গ্রেট খানকে উদ্দেশ করে, শুধু নামের জায়গাটা ফাঁকা রাখা হল। এই মুহূর্তে কে যে গ্রেট খান, তা তো জানা নেই। পুবদেশীয় ভাষা-জানা লোক নিয়োগ করা হল, যাতে গ্রেট খানের সঙ্গে বার্তালাপ করা সম্ভব হয়। তিনখানা জাহাজ নিয়ে পশ্চিমমুখে আটলান্টিকে জাহাজ ভাসালেন জেরুজালেমের মুক্তিকামী এইসব চিন্তাভাবনার জনক ক্যাথলিক খ্রিস্টান নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস।

রাশিয়ান ক্যালেন্ডারমতে তখন মহাপ্রলয় আসতে আর এক মাসও বাকি নেই।

* * *

কলম্বাসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভাস্কো ডা গামা এসেছিল ভারতে। সে যখন ফিরে গেল তার দেশে ততদিনে ইওরোপ পেয়ে গেছে নতুন দু দুখানা দেশে সরাসরি যাত্রার নৌপথ। নতুন দেশ আবিষ্কার মানেই নতুন ব্যবসার সূত্রপাত, বেশি বেশি লাভ। তার সঙ্গে এসে গেছে নতুন এক শতাব্দী – ষোড়শ শতাব্দী। ইওরোপিয়ানদের মনে জেগে উঠল নতুন সম্ভাবনার, নতুন আশার পুনরুজ্জীবন। সেই আশার রেশ ছড়িয়ে পড়ল তাদের সাহিত্যে, তাদের সঙ্গীতে, ভাস্কর্যে, চিত্রকলায়।

ইতালির ফ্লোরেন্সের ধনী রেশম ব্যবসায়ী ফ্রাঁসোয়া দেল বার্থেলোম্যু জিওকোন্দো তার নতুন বাড়ি আর দ্বিতীয় সন্তান আঁদ্রিয়ার জন্মোৎসব পালন করতে দেওয়ালে টাঙানোর জন্যে তার স্ত্রীর এক ছবি আঁকার বরাত দিলেন এক খ্যাপাটে চিত্রকরকে। বছর পঞ্চাশ বয়স সেই চিত্রকরের। তার বন্ধুরা ছবি-টবি এঁকে ও বিক্রি করে প্রচুর পয়সা রোজগার করে বিখ্যাত হয়ে গেছে, কিন্তু এর ছবি লোকে বিশেষ কেনে না। খুঁতখুঁতে অলস প্রকৃতির মানুষ সে, নিজেই বলে, একটা কাজও শেষ করতে পারি না আমি। মানুষ ও নিসর্গের ছবি আঁকার সঙ্গে সঙ্গে তার উৎসাহ জীবজন্তু এমনকি মানুষের পেট-ফেট কেটে ভিতরে কী আছে তা ঘেঁটেঘুঁটে দেখা আর তাদের ছবি এঁকে রাখা। সে এক শখের বিজ্ঞানীও, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে তার কৌতূহল প্রবল, এর মধ্যেই বেশ কিছু যন্ত্রপাতির মডেল বানিয়ে তার ছবি এঁকে রেখেছে সে। একটা নোটবইতে সে অনেক কিছু লিখে রাখে, কিন্তু তা পড়ে বুঝে ওঠা দুষ্কর, কেননা অনেক পাতায় সব উল্টো করে লেখা, আয়নার সামনে ধরলে সোজা হয়। চুপচাপ ধরনের লোক, অন্যদের সঙ্গে হা হা হি হি করার বদলে নিজেকে নিয়েই মগ্ন সে।

জিওকোন্দোর এটা তিন নম্বর বৌ, ফ্লোরেন্সের অভিজাত ঘেরার্দিনি পরিবারের মেয়ে সে, বয়স চব্বিশ, নাম লিসা। সাদা পপলার প্যানেলের ওপর তেলরঙে তিরিশ ইঞ্চি বাই একুশ ইঞ্চির আঁকা ছোটখাট ছবিটাতে তার মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে ভিঞ্চি-গাঁয়ের খ্যাপা শিল্পী লিওনার্দো ছবিটার নাম দিল লা জিওকোন্দা – মোনা লিসা।

(চলবে)



(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)