দেশান্তরের কথা, সন্ধ্যা ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণা, পরবাস-৬৯






 


Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines



পরবাসে সন্ধ্যা ভট্টাচার্যের
লেখা


ISSN 1563-8685




দেশান্তরের কথা

বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সব দেশের সঙ্গে আমাদের দেশেও স্মরণাতীতকালের সুখ, শান্তি আনন্দের পরিবেশ আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগল। যে একতার পরিমণ্ডল ছিল সেখানে এক সর্বব্যাপী অশান্তি আর আতঙ্কের জীবনযাপন শুরু হল। এক নিরন্তর অনিশ্চয়তাবোধ দেশবাসীর জীবনের শান্ত নিবিড় পরিবেশকে আলোড়িত করে তুলল। ভীত, সন্ত্রস্ত্র মানুষ স্ত্রী-কন্যাদের সম্মানরক্ষার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অনূঢ়া কন্যাদের বিবাহ দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে উদ্‌গ্রীব হলে পড়লেন অসহায় পরিবারের কর্তারা।

১৯৪২ সালে আমার বয়স তখন চৌদ্দ বছর, আমার দু বছরের বড় দিদির বিয়ের সব আয়োজন প্রস্তুত হল। নির্দিষ্ট দিনে যথাসম্ভব অনুষ্ঠান করে দিদির বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পরদিন সকালে ঘটল এক কাণ্ড। গ্রামে আমাদের এক জ্ঞাতির পরিবারের একজন প্রবাসে নিজের কর্মস্থলে দেহ রেখেছেন এই খবর এল। মৃতের অশৌচে শুভক্ষণে কন্যা বিদায়ে অসুবিধা ঘটতে পারে এই ভয়ে গ্রামবাসী সেই খবর গোপন রেখে যথাসম্ভব নৈতিক সহায়তায় অতি প্রভাতেই বরকনেকে যাত্রা করিয়ে দিলেন।

পালকি কাঁধে বেহারারা কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে গেল। গ্রামের সমুখে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে সরকারি সড়কে পৌঁছোনোর পায়ে চলা রাস্তা। সেই রাস্তা ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে গেছে চাঁদপুরী বিলের শুকনো জমিতে। শীতের সময় জলহীন এই শুকনো জমিকে বলা হত গোপাট। গোপাটে শুকনোর দিনে অসংখ্য গরু ছাগল চরে বেড়াত, দূর থেকে তাদের বিন্দু বিন্দু দেখাত। এই গোপাটের মধ্য দিয়ে বেহারারা পালকি নিয়ে আর গাড়োয়ানরা গরুর গাড়ি নিয়ে অল্প সময়েই বড়রাস্তায় পৌঁছে যেত। বর্ষায় দিনে মাঝি-মাল্লারা এই জলেভরা পথ বেয়ে নৌকা নিয়ে সঠিক রাস্তা ধরে গন্তব্যে পৌঁছে যেত।

আমাদের গ্রামের পিছন দিয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা বেত্রবতী নদী বর্ষার জলে ভরপুর হয়ে যেত। সেই ভরা নদী কয়েক মাইল দূরের গ্রামকে বেষ্টন করে কিছু নিচু জায়গায় মিলে যেত বিলের সঙ্গে। বর্ষাকালে যারা নৌকায় করে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করত, তারা এই বেত্রবতীর ঘাটে নৌকায় চাপত, আর ঘন্টা দুই পরে সেই নৌকাকে দেখা যেত পাল তুলে চলেছে বিলের মাঝখান দিয়ে।

দিদির বিয়ের সময় ছিল শীতকাল। মাঘমাস। চাঁদপুরী বিলে জলের চিহ্ন ছিল না। নতুন সবুজ কচি উদ্ভিদের আস্তরণে ছেয়ে থাকা বিলকে সবুজ গালচের মত লাগত। দিদিকে নিয়ে পালকি সেই বিলের সবুজ প্রান্তরে নেমে আস্তে আস্তে দূরে চলে যেতে লাগল, আমি দুচোখে জলের বন্যা নিয়ে চেয়ে রইলাম সেই অপসৃয়মান পালকির দিকে। ক্রমে তা বিন্দুবৎ হল, তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল। চোখভরা জল আর মনভরা দুঃখ নিয়ে ফিরে এলাম বাড়িতে।

এখন বাড়িতে আমি দিদিহারা। যেদিকে তাকাই সেই দিকই বিষাদপূর্ণ লাগছিল। সেদিনটির কথা আমার আজও মনে আছে। দিদির চিহ্ন চোখে পড়তেই চোখে জল ভরে আসে, বিছানায় আমার পাশে দিদির জায়গাটা ফাঁকা। খালি বালিশ দেখে মনটা হুহু করে উঠত। সারাদিনের কাজের ফাঁকে দিদির শূন্যতা যেন আরো বেশি করে গ্রাস করত মনকে। নির্জন দুপুরে চেয়ে থাকতাম দিদির চলে যাওয়া পথের দিকে। মনটা চৈত্রের শুষ্ক ঝোড়ো বাতাসের মত সবসময় হুহু করে বেড়াত।

প্রতিদিন সান্ধ্য আহ্নিক সমাপনান্তে বাবাকে শ্যামাসঙ্গীত শোনানো ছিল আমার আর দিদির নৈমিত্তিক কাজ। দিদির বিয়ের পর আমি সঙ্গীহারা হয়ে গেলাম। বাবাকে গান শোনাতাম ঠিকই, কিন্তু তাতে যেন প্রাণ থাকত না। এদিকে আমার আবাল্যের সঙ্গীসাথীরাও সবাই প্রায় চোদ্দো-পনেরো বছরে পা দিয়েছে, কাজেই সকলেরই আবাল্যের বাঁধনহারা উচ্ছলতায় মৃদু টান পড়েছে। যখন তখন যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো বা খেলাধুলায় কিঞ্চিৎ ভাটা পড়েছে। সারাদিনই প্রায় বাড়িতে কাটে।

দেখতে দিদির দ্বিরাগমনের দিন এগিয়ে আসতে লাগল। আমি প্রচণ্ড উৎসাহে কাজকর্ম করতে লাগলাম। ঘরদোর পরিষ্কার করে, সারা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে রাখলাম, শুকিয়ে গেলে দুপুরের পরে চালের গুঁড়ো অর্থাৎ পিটুলি গোলা দিয়ে সারা উঠোন জুড়ে নানা নকশা‌র আলপনা দিলাম। মাঘ শেষ হয়ে গেছে। ফাগুন মাসের শুরু। হঠাৎ দেখি আকাশের উত্তর পশ্চিম কোণ জুড়ে মিশ্‌মিশে কালো মেঘ জমছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই মেঘ সারা আকাশে ছেয়ে গেল। বিশাল গর্জনে ধেয়ে এল ঝড়। সঙ্গে শুরু হল শিলাবৃষ্টি। আলপনাকে বাঁচাতে উঠোনে আলপনাকে ঢেকে পেতে দিলাম বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি বড় চাটাই। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। প্রবল শিল আর বৃষ্টির জলের গড়ানে সব ধুয়ে গেল। সন্ধ্যা হয়ে এল, সেদিন আর দিদি এল না। যিনি দিদিকে আনতে গিয়েছিলেন তিনিও সেদিন এলেন না। পরদিন সকালে মনটা খুব খারাপ, এদিকে সকালের আকাশে ঝকঝকে রোদ। শীতের সামান্য আমেজ তখনও আছে। যাই হোক, মনে আশা নিয়ে চলে গেলাম নদীর পাড়ের পূর্বকথিত সেই জায়গায়। দিদির আসার পথ চেয়ে বসে আছি। কাত হয়ে পড়া সেই আধশোয়া আম গাছের কাণ্ডের ওপর বসে ভাবছি পুরনো দিনের কথা।

মনে পড়ে গেল খুব ছোটবেলায় একবার এই গাছটার ওপর বসিয়ে দিদিকে স্নান করিয়ে দিয়েছিলাম। দিদিকে স্নান করিয়ে দেবার পেছনের হাস্যকর ঘটনার কথাও মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়ির পিছনদিকে একেবারে নদীর ধার পর্যন্ত ছিল জঙ্গল। এই জঙ্গলটার কথা আমার আগের লেখাতেও বারবার এসেছে। সেখানে ছিল একটা বাতাবি লেবু গাছ, আচালা গাছ। এছাড়া আরো অনেক রকম গাছও ছিল। পশুপাখির পরিত্যক্ত বীজ থেকেই এসব গাছ জন্মাত। এদের মধ্যে ছিল জলপাই, জাম, গোলাপজাম, ভুবি (লট্‌কা), থৈকর, চালতা ইত্যাদি। জঙ্গল ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে ছিল শেয়াল, ভোঁদড়, বেজি, বনবেড়াল এসব প্রাণীর চলার সরু পথ--শিয়ালপথ, যাকে গ্রাম্য চলিত ভাষায় বলা হত ‘হিয়াইল্যাপথ’। শ এখানে হ উচ্চারিত, মনে হয় অসমীয়া বাংলা ভাষার সঙ্গে যোগাযোগের কারণে এমন সাদৃশ্য।

একদিন দুপুরে স্নানের আগে দিদি আর আমি এই শিয়ালপথে ঢুকেছিলাম জঙ্গলে। হাতে একটা ছোট দা। গাছে অসংখ্য বাতাবি দেখে আর লোভ সামলানো যায়নি। দিদি ছিল গাছে চড়তে ওস্তাদ। দিদি গাছে উঠেছে আর আমি গাছের কাছেই নিচে দাঁড়িয়ে আছি, হাতে একটা বাঁশের লম্বা কঞ্চি। দিদি বাতাবির বোঁটা কেটে ফেলবে আর আমি কঞ্চি দিয়ে টেনে টেনে কাছে আনব। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গলের বাসিন্দাদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলি মানুষ দেখে ভয়ে নিজেদের ভাষায় আওয়াজ তুলে এদিকে ওদিকে পালাচ্ছে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে। যেতে যেতে মাঝে মাঝে পাতার ফাঁক দিয়ে একবার আমাকে দেখে নিচ্ছে। সবসময়ই এদের বাড়ির আশেপাশে দেখা যেত বলে এদের ভয় পেতাম না। তবু নির্জন জঙ্গলের মধ্যে একটু একটু ভয় লাগছিল বৈকি।

আমাদের দেশে বন-জঙ্গলে এক প্রকার গাছ ছিল তার পাতাগুলি দেখতে কদম পাতার মত, ফুলগুলি দেখতে ছিল খুব সুন্দর, গাছের ডগার দিকে প্রতি পাতার সঙ্গে একটি করে ফুলের ছড়া বের হত, তাতে সাদা ধবধবে গোলাকৃতি বলের মত অসংখ্য ফুল হত, মালার মত সাজানো থাকত ছড়ায়। এক একটি গাছ লম্বা ছয় সাত হাত হত। এগুলি ছিল চুতুরা অর্থাৎ বিচুটি গাছ। তীব্রতার গুণে মারাত্মক বলে একে বলা হত রাম চুতুরা (রাম বিচুটি)। বাতাবি লেবুর গাছের তলায় ছিল এই রাম চুতুরার বন।

গাছ থেকে কাটা বাতাবি লেবু দিদি নিচে ফেলছে আর আমি লম্বা কঞ্চি দিয়ে চুতুরা গাছের ফাঁক থেকে টেনে টেনে আনছি। হঠাৎ নজর গেল পিছন দিকে। দুটি বড়মাপের বনবিড়াল পেছনের দুটো পা পেতে সামনের দুটো পা সোজা তুলে বসে। লম্বা লেজ। দুজনাই অনবরত লেজ সঞ্চালন করছে আর ফ্যাকাশে চোখে অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ সেদিকে তাকিয়েই আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল। চুতুরার ছোঁয়া আর বনবিড়ালের উপস্থিতি এই দুয়ে মিলে ভয়ে আমি দিয়েছি এক চিৎকার। আমার চিৎকারে ভয় পেয়ে দিদি তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নামতে গিয়ে শুকনো ডালে যেই না পা দিয়েছে ডাল ভেঙে গাছ থেকে ধপাস্‌ করে পড়ে গেল বিচুটির ঝোপের উপর।

আমাদের হুড়োহুড়ি আর চিৎকারে বনবিড়াল দুটি নিমেষে উধাও হয়ে গেল। দিদির দুটো পায়ে আর আমার দুটো হাতে বিচুটি পাতার ছোঁয়ায় আগুনে পোড়ার মত জ্বলুনি শুরু হয়ে গেল। তীব্র জ্বলুনির চোটে দিশেহারা হয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে দুজনে ছুটলাম নদীর পাড়ে। সেখানে দিদি পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে পা চুলকোতে লাগল।

তাৎক্ষনিক উপশমের ঔষধও আমাদের জানা ছিল। আমাদের দেশে একপ্রকার কচু জন্মাত, তাকে বলত বিষকচু। সচরাচর মানুষের খাবার উপযোগী ছিল না। তবে হ্যাঁ, এমন অভাবী মানুষও ছিল যারা এই বিষকচুকেও বিভিন্ন উপায়ে খাদ্যযোগ্য করে রান্না করে খেত। বনেজঙ্গলে এই কচু প্রচুর পরিমাণে জন্মাত। বিষকচুর ডালগুলি মাটির ওপর অনেকখানি লম্বা হয়ে বেড়ে থাকত। বিষকচুর ডাল কেটে এনে লম্বাভাবে চিরে দুভাগ করলে তা থেকে দুধের মত সাদা কষ বার হত। । নদীর ঢালুতে বসে দুইবোনে বিষকচুর ডাটি ছিঁড়ে এনে চিরে রস বার করে হাতে পায়ে বেশ করে লাগালাম। চুলকুনির চিড়বিড়ে ভাবটা একটু কমলে নদীতে স্নান করতে গেলাম। নোংরা জঙ্গলে ঢুকেছি তাই স্নান না করে তো ঘরে ঢোকা যাবে না!

স্নান করতে গিয়ে আরেক বিপদ উপস্থিত। কারণ চুতুরা (বিচুটি) লাগা জায়গায় জল লাগলেই আবার দ্বিগুন চুলকানি শুরু হবে। দিদির পায়ে চুতুরা লেগেছিল তাই সে তো জলে নামতেই পারবে না। আমি যদি বা দুহাত উঁচু করে নদীতে ডুব দিয়ে উঠলাম, দিদি জলে নামতেই পারল না। কাজেই দিদিকে সেই আধশোয়া আমগাছের ওপর দুদিকে দু-পা ছড়িয়ে বসালাম। আমি সতর্কভাবে দু-আঙুলের সাহায্যে জলের ঘটি ভরে ভরে জল এনে দিদিকে স্নান করিয়ে দিলাম।

এইসব ভাবতে ভাবতে নদীর পূবপারের বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে হঠাৎ নজরে এল দূরের সড়ক দিয়ে রঙিন কাপড়ে ঢাকা একটি সোয়ারী সড়ক ছাড়িয়ে গ্রামের রাস্তায় ঢুকছে। ঢাকা দেওয়ার শাড়িটি আমার পরিচিত। পলকমাত্রেই আমি তিরবেগে ছুটলাম।

আমাকে দেখেই দিদি সোয়ারীর ঘেরা দেওয়া কাপড় একটু ফাঁক করেছে আর আমি তখন সোয়ারীর কানা ধরে বেহারাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি এলাম। নানা নিয়মকানুন সম্পন্ন হবার পর দিদি ঘরে গেল। বর্তমান সময়ে যেমন নববিবাহিত বর-কনে একসঙ্গে দ্বিরাগমনে বাপের বাড়িতে আসে, তখনকার দিনে এ-রকম নিয়ম ছিল না। বিবাহের পর যখন কনে প্রথমবার শ্বশুর বাড়িতে যেত তখন নতুন বউয়ের সঙ্গে বাপের বাড়ি থেকে যে লোক যেত সেই লোকই পাকস্পর্শের (বৌভাত) পর কনেকে বাপের বাড়িতে নিয়ে আসত এবং তেরাত্র (তিনরাত্রি) পর শ্বশুরবাড়ির লোক এসে বউকে নিয়ে যেত। এই তেরাত্রের মধ্যে যাতায়াতের কোনো দিনক্ষণ বা শুভ সময়ের অর্থাৎ পঞ্জিকার প্রয়োজন হত না।

যাইহোক সঙ্গীসাথী মিলে দিদির সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ঘরে গেলাম। নতুন সাজে দিদিকে দেখছি গা-ভর্তি গয়না, পরনে বাহারি শাড়ি, আলতা, সিঁদুর। দিদিকে দেখতে কী সুন্দরই না লাগছে! তবু মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা ফাঁকা ভাব ঘুরে মরছে। আবাল্যের অভিন্ন সঙ্গী দিদিকে আর সবসময়ের জন্য কাছে পাব না এই ভাবনা মনে এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। সে সময়ের কিশোরী আমি দিদির এই রূপান্তর মেনে নিতে পারছিলাম না। এখনকার দিনের ছেলেমেয়েদের দেখি আর আমাদের সেই দিনগুলির কথা ভাবি। সময়ের পরিবর্তনের ১৩/১৪ বছরের ছেলেমেয়েরা জেনে বুঝে আজকাল কত পরিণত। ভাবি সে সময় আমাদের মানসিকতা কত অপরিণত ছিল!

যাই হোক যথাসময়ে দিদি পুনরায় শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। বাড়িখানা যেন ভাঙা হাটের মত হয়ে গেল। সঙ্গীসাথিদের সাথে আর যখন তখন যেখানে সেখানে ছোটাছুটিতে ভাটা পড়ে গেল। সেবার গরমের ছুটিতে কর্মস্থল থেকে মেজদা বাড়িতে এল। আমার হাতে একটি প্যাক করা বাক্স দিয়ে বলল, ‘খুলে দেখ তো ওতে কী আছে?’ বাক্স খুলে দেখে মনটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বাক্সে ছিল মস্ত বড় একটা ডল পুতুল। এই পুতুলকে কোলে নিয়ে পাশাপাশি সব বাড়িতে ঘুরলাম। একে তাকে দেখলাম। মেজদা এই পুতুলের নাম দিল ‘রানু’। এবার পুতুলের পোশাক তৈরিতে মন দিলাম। আমাদের গ্রামে আমার এক মাসতুতো দিদির বিয়ে হয়েছিল। একবার সেই দিদিদের বাক্সে কীভাবে উইপোকা ঢুকে ভাল ভাল শাড়ি নষ্ট করে দিয়েছিল। সেই উইপোকায় খাওয়া একখানা পার্শি শাড়ির টুকরো এনে তৈরি করলাম রানু পুতুলের জামা। সূঁচসূতো দিয়ে খড় সেলাই করে বানালাম পুতুলের মাথার সাহেবি টুপি।

মেজদা তো এসব দেখে খুব খুশি। আমায় ডেকে বলল, ‘হ্যাঁরে তোর মেয়ের মুখেভাত কবে হবে?’ বললাম, ‘সবকিছু এনে দে তবেই হবে। ’

পুতুলের মুখেভাত-এর দিন ঠিক হল। মেজদার কথামত সাথিদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করলাম। মা পায়েস রান্না করে দিলেন। নিকোনো উঠোনে কলাপাতা পেতে সবাই গোল হয়ে বসলাম। মাঝখানে পুতুলকে বসিয়ে আমাদের পায়েস খাবার পালা। মেজদা নিজে পায়েস পরিবেশন করল। পাড়ার বড়রা এসে তামাশা দেখল। কী আনন্দই যে হয়েছিল সেদিন তা বলে বোঝাতে পারব না।

এত হুল্লোড় আর আনন্দের ফাঁকে দিদির অভাবটাই মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল। যাইহোক বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম পুতুল এনে দেওয়াটা ছিল মেজদার একটা কৌশল। বড় হয়ে যাচ্ছি, তাই কৌশলে ছেলেবেলার বাল্য-চাপল্যটুকুকে ধরে রাখা ছিল মূল উদ্দেশ্য।

১৯৪৩ সাল, বাংলা ১৩৫০ সন। বাংলায় দেখা দিল এক ঘোরতর দুর্দিন। অপর্যাপ্ত ফসল হওয়া সত্ত্বেও বাংলায় দেখা দিল সর্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষ। সাধারণ মানুষের বোঝার ক্ষমতা ছিল না কেন এই অভাব। ক্রমশ সমস্ত জিনিসের অমিল দেখা দিল। চতুর্দিকে হাহাকার। নুন অমিল, কেরোসিন উধাও।

ধান, চাল, নানারকম শস্যসামগ্রীর মধ্যে যার যা মজুত ছিল তাই দিয়ে কিছুদিন চলল। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের তো দুর্দশার সীমা নেই। সেই দুর্ভিক্ষ ছিল মানুষের তৈরি নকল দুর্ভিক্ষ। খরা বা অজন্মা জনিত ছিল না এই দুর্ভিক্ষ। সরকারী দূরভিসন্ধির ফলে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্ট ছিল সেই আকাল।

সাধারণ মানুষও বুঝতে শুরু করেছিল এই দুর্ভিক্ষ অজন্মার জন্য নয়। পর্যাপ্ত ফসল ফলেছে মাঠে মাঠে। তবে মাঠে মাঠে কচি ঘাসের অভাব না থাকাতে গরুছাগলের খাদ্যের অভাব ছিল না। একআনা দু-পয়সা সের দুধ পাওয়া যেত অপর্যাপ্ত। যাদের নিজেদের গরু ছিল তাদের শিশুদের দুধের অভাব হয়নি। যারা কিছুদিন পয়সা দিয়ে কিনে খাওয়াতে পেরেছে তাদের বাচ্চারা কিছুদিন কেনা দুধ খেতে পেয়েছে। যারা একেবারে নিঃস্ব ছিল তারা কোনরকমে পেট ভরিয়ে রাখার জন্য অখাদ্য কুখাদ্য খাইয়ে ছেলেপুলেদের বাঁচিয়ে রেখেছে, কোনক্রমে কিছুদিন টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

দিনমজুর মানুষদের পরিবারের অবস্থা দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে সবচেয়ে শোচনীয় হয়েছিল। বনের কচু, শাকপাতা, মাটির নিচের সব রকমের কন্দমূল, শিকড়, বুনো আলু মাটি খুঁড়ে তুলে এনে সিদ্ধ করে নুন দিয়ে খেয়েছে মানুষ। ক্রমে চারদিক উদ্ভিদশূন্য হয়ে গেছে, তখন শুরু হয়েছে অখাদ্য শাকপাতা খাওয়া। অভক্ষ্য ভক্ষণের ফলে দেখা দিয়েছে নানা রকম পেটের রোগ। নানা রোগপীড়ার প্রকোপ মহামারীর আকারে দেখা দিয়েছে গ্রামগঞ্জে।

গ্রামের সাদাসিধে, শান্তিপ্রিয় মানুষ চোখের সামনে প্রিয় সন্তানের, প্রিয়জনের মৃত্যু দেখেছে। দীর্ঘকাল অভুক্ত থাকা মানুষগুলি ক্রমে হয়ে উঠেছে অনুভূতিহীন, আত্মসর্বস্ব। চারিদিকে প্রথমে শোনা যেত ‘ভাত দাও মা দুটি ভাত দাও’, এরপর মানুষ চাইত ‘একটু ফ্যান হবে মা?’ শীর্ণদেহ অভুক্ত মায়ের বুকে দুধ নেই, চীৎকার করতে করতে ক্ষুধায় মায়ের কোলেই মৃত্যু হয়েছে তাদের। খিদের জ্বালায় মানুষ শেষে খেয়েছে এঁটেল মাটি, ভেদবমি হয়ে ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে। মাঠ ঘাট গাছতলায় পড়ে রয়েছে মৃত শিশুর, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃতদেহ। শ্বাপদ প্রাণীদের খাবার হয়েছে তাদের শব।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় কাতর মানুষ অসহায়ভাবে দেখেছে প্রিয়জনের মৃত্যু, সন্তানের মৃত্যু, মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে অনেকে, পাগল হয়ে বাউণ্ডুলের মত ঘুরে বেড়িয়েছে চারদিকে। কত যুবতী মেয়ে পেটের জ্বালায় বা সংসারের, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেবার জন্য নিজের দেহের শুচিতা নষ্ট করেছে বা বাধ্য হয়েছে। তবু শেষরক্ষা হয়নি।

কেরোসিনের অভাবে গ্রামকে গ্রাম সুর্যাস্তের পর হয়ে উঠেছে নিষ্প্রদীপ, প্রেতলোকের মত। শিশু ভয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে। যতদিন মজুত ছিল ততদিন মানুষ ঘরের বাইরে প্যাকাটি জ্বালিয়ে আলোকিত করেছে। অত্যাবশ্যক জিনিস কদাচিৎ পাওয়া গেলেও পয়সার অভাবে তা কিনতে পারেনি মানুষ। এককথায় গ্রামাঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষের দল প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল।

প্রয়োজন মানুষকে ভাবতে শেখায়। বিকল্প পথ বার করার সুযোগ করে দেয়। পরিশ্রম ফিরিয়ে দেয় সৌভাগ্য। গ্রামের মানুষ খাদ্য ও জ্বালানীর বিকল্প আবিষ্কার করতে শিখল। মানুষের বাড়িতে আর নদীর পাড়ে ছিল অজস্র ফলের গাছ। নানাজাতের আম, যেমন সিঁদুরে আম, রসুনে আম, খুব মিষ্টি আর ছোট টুনটুনে আম। আর ছিল নানা জাতের কাঁঠাল। একটা ছিল গঙ্গাজলি কাঁঠাল, একটি বড় গাছে ছোট ছোট হাজারখানেক কাঁঠালও ফলত। সেই কাঁঠালের কোয়া হাতের মুঠোয় ধরে চিপলে হাতে থাকত সরু সুতোর মত একটু অংশ। এই কাঁঠাল গাছের আঠাকেও মানুষ কাজে লাগিয়েছিল, জ্বালানী তৈরির কাজে। সদ্য গাছ থেকে পেড়ে আনা অগুনতি কাঁঠালের বোঁটা থেকে বের হত গাঢ় আঠা। সেই সাদা দুধের মত ঘন আঠাকে দুহাত মত লম্বা কঞ্চি বা প্যাকাটির গায়ে মোটা করে জড়িয়ে সেগুলি রোদে শুকিয়ে নিয়ে, জ্বালানি তৈরি করে জমিয়ে রাখত বর্ষাকালের জন্য। আবার রাতের আঁধারে এই কাঠির মশাল জ্বেলে আলোর অভাব পূরণ করত। অন্ধকারে পথ চলতে মশালের মত ব্যবহার করত।

সাবান সোডার অভাব মেটাতে মানুষ আবিষ্কার করল তার বিকল্প। কলার খোসা বড় গামলায় ভিজিয়ে রেখে সেই খোসা ভেজানো জলে কাপড় জামা কাচত। আর কলাগাছের শুকনো ছাল (বাসনা) পুড়িয়ে তৈরি করত মাথা ঘসার শ্যাম্পূর মত জিনিস আর গা পরিষ্কার করার সাবান। নিত্যব্যবহার্য জিনিস দৈবাৎ বাজারে দেখা গেলেও আকাশছোঁয়া দামের জন্য তাতে হাত দেওয়া ছিল সাধারণের সাধ্যের বাইরে।

দুর্দিন কখনো একা আসে না। সঙ্গী করে আনে নানা আধিব্যাধি। অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে মানুষের আগে থেকেই কলেরা ভেদবমি হচ্ছিল, এবার গ্রামকে গ্রাম জনশূন্য হতে লাগল ম্যালেরিয়ার প্রকোপে। গ্রামগঞ্জে প্রায় সব বাড়িতেই কারও না কারো ম্যালেরিয়া হচ্ছে, ছেলে, বুড়ো, শিশু কারো রেহাই নেই। কোনও কোনও বাড়ীতে সবারই ম্যালেরিয়া হয়েছে। কারও মুখে জল দেবার মত কেউ নেই। সকলেই জ্বরের কাঁপুনিতে নাজেহাল।

ম্যালেরিয়া রোগীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসত দুপুরের দিকে। হাই টেম্পারেচারে চার পাঁচ বছরের বাচ্চাদের আবার দেখা দিত তরকা। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর বাড়ার সঙ্গে শুরু হত খিঁচুনি, চোখ উল্টে যেত, সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। বাড়িতে বাড়িতে কান্নার রোল উঠত। দুর্ভিক্ষের প্রকোপে সকলেই দুর্বলতা আর অপুষ্টির শিকার, তার সঙ্গে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে প্লীহা বেড়ে পেটটা ফুলে উঠত, হাত-পা গুলো সরু লিক্‌লিক্‌ করত। এই অবস্থায় অর্থাভাবে, চিকিৎসার অভাবে, স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক লোকের মৃত্যুও হয়েছে ম্যালেরিয়ায়। ঔষধ বলতে তখন হাতের পাঁচ ছিল একমাত্র কুইনাইন। অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টায় কুইনাইনও অমিল হল। বাজারে পাওয়া যেতে লাগল কুইনো-হিমোজিন টনিক, কিন্তু সেই ঔষধ নিম্ন ক্রয়ক্ষমতার মানুষদের সামর্থ্যের বাইরে।

জ্বর কমানোর জন্য জড়িবুটির আশ্রয় নিয়েছে গরিব সাধারণ মানুষ। গাছের ছাল, পাতা সেদ্ধ পাঁচন খেয়ে সেরে ওঠার বদলে রোগযন্ত্রণায় ধুঁকতে ধুঁকতে প্রাণ দিয়েছে কত শিশু, বৃদ্ধ, নরনারী তার ইয়ত্তা নেই। পুরুষানুক্রমে বাড়িতে বাড়িতে যে বারমাসের তের পার্বণ হত, ম্যালেরিয়া আর দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে সেসব বন্ধ হল, বাড়িকে বাড়ি জনশূ্ন্য পোড়ো বাড়িতে পরিণত হয়ে গেল। সোনার গ্রামবাংলা শ্মশান হয়ে যেতে লাগল।

এইরকম শোচনীয় অবস্থার সঙ্গে আর এক উপসর্গ জুটলো। সেও মহামারীর আকারে দেখা দিল। মারাত্মক চুলকানি, খোস-পাঁচড়া সংক্রামক আকারে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের মানুষের মধ্যে। দেশের লোকের মুখে মুখে প্রবাদের মত চালু হয়ে গেল এই কথা যে, ৪৩-এর দুর্ভিক্ষের দিনে যাদের চুলকানি, খুজলি পাঁচড়া হয়নি তার জন্ম সম্বন্ধেও সন্দেহ আছে। কোন কোন বাড়িতে সংক্রামক পাঁচড়ায় কিছু কিছু মানুষের সর্বাঙ্গ একেবারে গলিত অবস্থা হয়ে গেল, বেদনা আর অস্বস্তিতে চলতেও পারত না তারা।

আমাদের পাড়ারই দীপালি নামে একটি মেয়ের পাঁচড়ায় এমন বিকৃত চেহারা হয়েছিল যে তাকাতেও কষ্ট হত আমাদের। পরে এই রোগেই শরীরের রক্ত বিষাক্ত হয়ে গিয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল দশ বছরের মেয়ে দীপালি। দুর্ভিক্ষের ফলে অভক্ষ্য জিনিস আর ময়লা জল খেয়ে উদরপূর্তির ফলে পেটের রোগ দেখা দিয়েছিল আর রক্তদুষ্টির ফলে দুর্বল দেহগুলিকে আক্রমণ করেছিল বিষাক্ত চুলকানি। চর্মরোগের মহামারীও অনেকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। বাংলার মাটিতে যেন মহাকালের তাণ্ডব শুরু হয়েছিল।

এই দুর্ভিক্ষ, আর প্রাণান্তকর মহামারীর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে উঠতে প্রাকৃতিক নিয়মেই আবার বছর ঘুরে এল, নতুন বছর শুরু হল। প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত গাছপালা, বনানীর পত্রেপুষ্পে নতুনভাবে সেজে ওঠার মত খাদ্যাভাব, রোগ, শোক, মৃত্যুর বিভীষিকাময় পরিস্থিতি ভুলে ক্লান্ত দেহ, শ্রান্ত মন, ক্ষীণতনু, অবসাদগ্রস্ত বেঁচে থাকা মানুষগুলির মুখে ক্ষীণ, নিষ্প্রভ হাসি দেখা গেল। প্রকৃতি নিজের নিয়মেই পার্থিব সন্তানদের জন্য আবার জল দিল, ফসল দিল, পত্রেপুষ্পে সাজিয়ে দিল বনানী, ক্ষেত-খামার।

মনে নতুন আশার সঞ্চার হল বটে কিন্তু বিগত বছরের দুর্ভাগ্যের ফলে যে প্রিয়জনদের হারিয়েছে, বিনা খাদ্যে, বিনা চিকিৎসায় যারা প্রাণ হারিয়েছে তাদের জন্য দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে রইল তাদের মন। ধরিত্রীর অকৃপণ দয়ার দানেও সে ক্ষতি তো পূরণ হবার নয়। কেউ কেউ পুরনো দিনের বিপদের ধাক্কায় চিরদিনের মত নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলল, পরিজন হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাকি জীবনের জন্য পথকেই আশ্রয় করল। নতুন বছরে খাদ্যাভাব খানিকটা মিটল বটে কিন্তু ম্যালেরিয়া স্থায়ী আসন করে নিল গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে।

(ক্রমশ)