ছত্তিশগড়ের চালচিত্র, রঞ্জন রায়-এর বাংলা কাহিনী; পরবাস-৬৬






 


ISSN 1563-8685




ছত্তিশগড়ের চালচিত্র


|| সুদে-আসলে ||

(১)

সেই যে গঙ্গারামবাবু একরাত্তির পঞ্চায়েতের দরবারে এক বদচলন নারীর প্রকাশ্য বিচার দেখেছিলেন (বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন গল্পটি দেখুন), সেটা ওঁর মনের পলিমাটিতে বেশ ভালরকম আঁচড় কেটেছিল। অন্ধকারে হ্যাজাকবাতির আলোয় মেয়েটির আবছা চেহারা, গলার চড়া স্বর, আবার জমিদার দাদুসায়েবের ধমক খেয়ে নেতিয়ে পড়া; এইসব ব্যাচেলর ভ্যাবাগঙ্গারামের বুকের নিস্তরঙ্গ পুকুরে হঠাৎ এমন ঢেউ তুলল যে উনি আরও ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।

আসল কথা: ওই মেয়েটা, উম্মেদ কুঁয়র। ওই তো নষ্টের গোড়া। আর কেমন বুকের পাটা! প্রকাশ্য সভায় বললঃ মিশ্র গুরুজিকে নিয়ে আমার কোন নালিশ নেই। উনি ব্রাহ্মণদেবতা; চেয়েছেন, আমি দান করেছি।

নিজের শরীর দান করেছে, সেটা আবার বড় মুখ করে বলছে!

কোলকাতার ট্রেনিং সেন্টারে এক বাঙালী কলিগের কাছে শোনা কবিতার লাইন ভ্যাবাগঙ্গারামের মাথায় পাক খেতে থাকে।

"এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন, তোমার শরীর
তুমি দান করনি তো?
সময় তোমাকে সব দান করে চলে গেছে বলে
সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত"।

ধ্যেৎ, কিসব ভাবছি! একজন নারী তার নিজের শরীর যাকে ইচ্ছে দান করবে, বা করবে না; তাতে কার বাবার কী? আমিই বা কেন ফালতু মাথাখারাপ করছি?

গঙ্গারাম লজ্জা পেলেন। আজ রোববার, ব্যাংক বন্ধ। গায়ে লাগা স্টাফ কোয়ার্টার। ভাবলেন সময় কাটাতে অফিস খুলে কিছু পেন্ডিং কাজ সেরে নিলে কেমন হয়? এদিকে চাপরাশি বুধরাম ঘর ঝাঁট দিয়ে তাজা খবরের কাগজ আর জলের গেলাস রেখে গেছে।

খেয়াল হল আজকের দৈনিক পত্রিকাটি পড়া হয় নি।

অস্ট্রেলিয়ায় শিবরামকৃষ্ণানের লেগস্পিন ও গুগলি ভালই খাচ্ছে। কিন্তু বর্ডারের ক্যাপ্টেনশিপ? আজহার বলে নতুন ছেলেটা ব্যাকলিফট কম করলে ক্যাঙারুদের দেশে বেশি রান পাবে।

ছত্তিশগড়ের কোন অজ পাড়াগাঁয়ে একটা তেমুণ্ডে বাছুরের জন্ম হয়েছে। আরেকটা জায়গায় একটি মেয়ের কান দিয়ে সুগন্ধি চাল বেরোচ্ছে। ধ্যেৎ, কাগজটা বন্ধ করলে হয়।

এইসব নানারকম ‘ধ্যেৎ, ধ্যাত্তেরি, ধুত্তোর’-এর পালার মাঝখানে বুধরাম এসে বলল যে দাদুসায়েব নাস্তা করতে ডাকছেন। অফিসে পড়ল তালা, গঙ্গারাম চলল বারান্দা পেরিয়ে দাদুসায়েবের অন্দরমহলের বৈঠকখানায় যার দরজা কিছু অম্তরঙ্গদের জন্যেই শুধু খোলে।

গঙ্গারাম গিয়ে দেখল ঘর খালি, একজন সাদা থান পরা মহিলা বাবা আদমের জমানার সোফা, টেবিলগুলোকে একটা পালকের ঝাড়ন দিয়ে সাফ করছিলেন। ওকে দেখে চমকে উঠে জিভ কেটে ঘোমটা টেনে পালিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকালেন। মনে হল বয়স চল্লিশ ছোঁয়নি এখনো।

—উনি বড়ী বহুরানি, দাদুসায়েবের সম্পর্কে ভাবীজি। ঠাকুরসাব গুজর গয়ে দশসাল হোথে।

বুধরামের টীকা শেষ হবার আগেই দাদুসাব হাজির। লুঙ্গির উপর চিকনের কাজ করা কুর্তা। কলপ লাগানো চুলের কালো বড্ড বেশি চকচকে, কোথাও কোথাও জুলপি ছাড়িয়ে কপাল আর গালের চামড়ায় জুতোর পালিশের মত লাগছে।

—আইয়ে ম্যানেজার সাব! ছুট্টি কে দিন ভি কাম? আরে থোড়া আরাম কীজিয়ে। কুছ গপসপ হো জায়ে।

কখন যেন বুধরাম ভেতর থেকে নিয়ে এসেছে একথালা ফুলুরি, স্থানীয় ভাষায় ভাজিয়া; সঙ্গে ছোট বাটিতে লাল লংকা-আদা-টম্যাটো পেষা চাটনি। এরপর ফুলকাটা কাচের গ্লাসে ঠান্ডা জল আর অতিথিদের জন্যে বের করা চিনেমাটির বিশেষ কাপে দুধ-চা, কড়িমিঠি।

একপ্রস্থ শেষ হতেই বুধরাম আর একপ্লেট নিয়ে এসেছে। গঙ্গারাম হাঁ-হাঁ করে উঠতেই দাদুসায়েব ধমকে ওঠেন: আরে খান, খান! এই তো খাওয়ার বয়েস। ছত্তিশগড়ে চাকরি করে ভাজিয়ার প্রেমে পড়বেন না, সে কি হয়?

নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠে বললেন—গ্রামীণ ব্যাংকে চাকরি করলে কোথায় অজ পাড়াগাঁয়ে আদাড়ে-পাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হবে; সময়ে অসময়ে খাবেন কী? আজ্ঞে, এই ভাজিয়া। যে-কোন জায়াগায় এর দোকান পেয়ে যাবেন। বেসনের মধ্যে কুচো পেঁয়াজ আর কাঁচালংকা চটকে গরম তেলের কড়াইয়ে ছাড়ুন আর ছেঁকে তুলুন। এই নিয়ে তো ছত্তিশগড়ি দদরিয়া লোকগীত আছে, শোনেননি?

‘চানাকে দার রাজা, চানা কে দার রানি,
চানাকে দার গোঁদলি মেঁ কড়কয়থে।
আরে, টুরা রে পর বুধিয়া, হোটেল মেঁ ভাজিয়া
ঝড়কয়থে’।

(ছোলার ডাল গো রাজা, ছোলার ডাল যে রানি,
ছোলার ডালের ভাজিয়ার গুণ কীই বা বলা যায়!
ছোঁড়ার মাথায় কি যে আছে, বন্ধুর কথায় নাচে,
হোটেলে গো ভাজিয়া সাঁটায়!’)

কি রে বুধরাম, তুই জানিস না?

বুধরাম হেসে মাথা নাড়ে।

(২)

নানান আশকথা-পাশকথার পর দাদুসায়েব জিজ্ঞেস করলেন--আজকের খবরটা দেখেছেন?

–কোনটা? আজহারউদ্দিনের ব্যাটিং?

–ধ্যেৎ, রাখুন তো আপনার ওই ব্যাটবল! আসল খবর হল একজন ঠাকুরসাব রাজকাপুরের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন।

–কেন?

–কেন আবার কি? উনি ‘প্রেমরোগ’ বলে একটা সিনেমা বানিয়েছেন তাতে একজন ঠাকুরাইনকে বিধবা হওয়ার পর আবার বিয়ে করতে দেখানো হয়েছে। এতে দেশের সমস্ত ঠাকুরসমাজ, মানে ক্ষত্রিয়রা অপমানিত হয়েছে। আমিও। এগুলো ফিলিমওলাদের অবাস্তব কল্পনা। কোন ঠাকুরপরিবারের বিধবা দু’বার বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারে না। ওসব নীচুজাতের মধ্যে হয়।

যেমন ছত্তিশগড়ে সতনামী ও অন্য অচ্ছুৎ সমাজে শুধু বিধবা নয়, অন্যরাও কয়েকবার বিয়ে করতে পারে। একে বলে ‘চুড়িপরানো’। মন লাগলো তো একস্বামীর ঘর ছেড়ে আরেকজনের সঙ্গে পালিয়ে গেল, আর সে ব্যাটা ওকে চুড়ি পরিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে এল, মেয়েটি হবে ‘চুড়িহাই পত্নী’। এ’রম ঠাকুর পরিবারে জন্মানো কোন মহিলা করবে? মরে গেলেও না!

—আরে দাদুসায়েব! আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। জল খান। মেয়েরাও মানুষ তো, ঠাকুর বা যেকোন পরিবারেই জন্মাক না কেন?

দাদুসায়েব হাঁফাতে লাগলেন।

—আপনারা বুঝবেন না। দু’পাতা আংরেজি পড়া সেদিনের ছোকরার দল। আমাদের সংস্কার জানেন না। আমাদের ঘরের বিধবা জানে যে বিয়ে জীবনে একবারই হয়, আর সেটা ঠিক হয় ভগবানের দরবারে।

আমাদেরই সমাজের পদ্মিনী জৌহরব্রত করেছিলেন, জানেন তো? বিধবা মেয়েছেলে ঘর-গেরস্থালি, মন্দিরের দেখাশুনো পুজোআচ্চা নিয়ে এমন ব্যস্ত থাকে যে মনে কোন কুচিন্তা আসতে পারে না।

আমাদের বাড়িতেই দেখুন আমার বৌদিকে। বিধবা মানুষ, আমার ঠাকুরাইনের স্বর্গবাসের পর উনিই এ বাড়ির মালকিন। ভাঁড়ারের চাবি ওনারই আঁচলে বাঁধা। নিষ্ঠাবতী মহিলা। আপনার কি মনে হয় এত সম্মান পেয়েও উনি সুখে নেই?

মাসখানেক পরে একদিন ব্যাংক বন্ধ হওয়ার মুখে বুধরাম এগিয়ে দেয় একটা পাসবুক আর টাকা তোলার উইথড্রয়াল ফর্ম।

—কী ব্যাপার রে?

—নারাজ না হোনা সাহাব! দিদি আজ খুদ নহী আ সকতি। দস্তখত করকে মোলা দিহিস। খাতে সে পৈসা আমি নিয়ে যাব।

—কে তোর দিদি?

—উম্মেদ কুঁয়র। তবিয়ত ঠিক নহী হ্যায়।

—কিন্তু ও তো সই করতে পারে না, অংগুঠা ছাপ। এতে তো বিয়ারার পেমেন্ট করা যায় না।

বুধরাম গরুর মত ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে থাকে কিন্তু নড়ে না।

—আচ্ছা, ঠিক আছে। সত্তর টাকা তো? এককাজ কর্। আমার মোটরবাইকের পেছনে বোস্। দুজনেই যাব তোর দিদির বাড়ি, সামনে টিপছাপ নিয়ে তবে পেমেন্ট করব। তোর দিদি বলে কথা!

রাত্তিরে ফিরে এসে গঙ্গারাম নিজের হাতে ডিমের ঝোল, আলুসেদ্ধ-ভাত রাঁধলেন। বুধরামকে বল্লেন ট্রানজিস্টর চালিয়ে দিতে—রায়পুর স্টেশন। লোকগীতের মনকেমন করা উদাস সুর ভেসে আসে।

‘তঁয় একেলা যাবে, হংসা মোর, একেলা যাবে।
জায়েকে বেলা রে, একেলা যাবে’।

(যে পথে যেতে হবে, সে পথে তুমি একা! ও মোর হংসরূপী আত্মা।)

গঙ্গারাম রেডিও বন্ধ করে দিলেন।

খাওয়ার পর বুধরাম বাসন ধুচ্ছে, গঙ্গারাম ওকে ডাকলেন।

—শোন, সারাজীবন অংগুঠাছাপ হয়ে থাকা বড় অভিশাপ রে! কাল থেকে লেগে যা। আমি তোকে লিখতে পড়তে শেখাব। ঢের সময় পাস্, খামোকা বিড়ি টেনে আর দাদুসায়েবের মুনিষজনের সংগে গুলতানি করে নষ্ট করিস না।

রাত্তিরের মনখারাপ করা বিষণ্ণতা আর ব্রাত্যজনকে অক্ষর পরিচয় করানোর তাগিদ সকালের রোদ্দুর কড়া হতেই কেমন উবে গেল। তবু সন্ধেবেলা বুধরামকে গঙ্গারামের সামনে আসনপিঁড়ি হয়ে বসতে হল। ওর হাতে সদ্যকেনা স্লেট-পেন্সিল।

আধঘন্টাও কাটল না, গঙ্গারাম হাঁফিয়ে উঠলেন।

ভারি বালতি-বওয়া, কুড়ুল দিয়ে কাঠ চেরা কড়া পড়া হাতে পেন্সিল ধরতে শেখানো যে এত কঠিন হবে ভাবতে পারেননি। আঙুল বেঁকছে না। কি ঝকমারি রে বাবা!—হবে, হবে। সময় লাগবে, ঘাবড়াস নে।

গঙ্গারাম কাকে বললেন? বুধরামকে? কি নিজেকে?

সেদিন কোন স্থানীয় পরব ছিল। ব্যাংকে লোকজন নেই বললেই চলে। চা খেয়ে, মাছি তাড়িয়ে সময় কাটছে না। ভাতঘুম চোখের পাতায় জেঁকে বসছে। এমন সময় ক্যাশিয়ার মাঠের দিক দিয়ে হেঁটে যাওয়া কাউকে দেখিযে প্রায় ‘অমানুষ’ সিনেমার উৎপল দত্তের কায়দায় বলল—ও যা রহে হ্যায় সরকার, আপকা কাম কা আদমী!

ওর তর্জনী অনুসরণ করে গঙ্গারাম দেখলেন একজন বছর তিরিশের লোক ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছে, কিন্তু পা পড়ছে ঢিমে তেতালায়। ঠিকমত সমে আসছে না। লোকটাকে চিনতে পারলেন। মাত্র গত সপ্তাহে শাকসব্জি বিক্রির ব্যবসা করতে ‘আই আর ডি পি’ সরকারি প্রজেক্টে পাঁচহাজার টাকা লোন দিয়েছেন।

গলা চড়ল—এ, এ সোহন! ইধর আ! ইধর আ নিপোড়! (এদিকে আয়! আয় বলছি, ক্যালানে কোথাকার!) যা বুধরাম, পকড় কে লে আ উস্ বেওকুফ কো।

খানিক পরে বুধরামের সঙ্গে ঢুকল এক মূর্তি; পরনে চেককাটা লুঙ্গি ও সস্তা সিল্কের পাঞ্জাবি, গলায় লাল রুমাল, মুখের কষ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানের পিক। কামরার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে মহুয়ার তীব্র গন্ধ।

—নমস্তে সরকার! মাফি দেও মালিক, বুরা না মানো!

—কি রে হতভাগা! ব্যাংকলোনের পুরো পয়সাটা দারুভাট্টিতে দিয়ে এলি?

—নহী সরকার! ইয়ে গলত বাত হ্যায়। লোনকা এক ভী পৈসা দারু মেঁ নহী গয়া। মদ তো আমি নিজের পয়সায় খাই।

—ইয়ার্কি মারার আর জায়গা পাসনি? ব্যাংকের পয়সায় কেনা শাকসব্জি কোথায়?

—সচ্ বোলতা হুঁ হুজুর। মেরে উস্তাদ কী কসম! সব্জি কেনাবেচার ধান্ধা? ও তো আমার বাঈ করে। আজকেও দুই ঝুড়ি শাকপাতা নিয়ে কাঠঘোরার হাটে গেছে, রাত্তিরে ফিরবে। কাল সকাল সাতটায় যদি এই গরীবের ঘরে পায়ের ধুলো দেন তখন সব হিসেবনিকেশ কিলিয়ার করে দেব। আমি কলাকার, বেইমান নই।

হ্যাঁ হুজুর, আমি কলাকার, মানে আপনাদের আর্টিস্ট। বাড়ি থেকে পালিয়ে সেই কলকাতায় গিয়ে মেটিয়াবুরুজের উস্তাদ হাফিজ নগীনার কাছে পাঁচবছর সাগরেদি করে গজল-কাওয়ালি শিখেছি। এ’বছর গণেশপুজোয় এই গাঁয়েই আমার প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শেষ সময়ে সরপঞ্চ ধোঁকা দিল।

গঙ্গারামবাবু হতভম্ব। এর বৌ শাকসব্জি বেচে, তো এ কী করে?

—খুলে বলি সরকার। মেটিয়াবুরুজ থেকে ফিরে গাঁয়ে গাঁয়ে গান গেয়ে বেড়াই, কিছু দক্ষিণা পাই, দিন চলে যায়। এমনসময় ‘নজর লড় গয়ি হ্যায়, তো মনমেঁ খটকওয়া হইবে করি!’

যে নারীর সঙ্গে দো-আঁখে-চার হল সে জাতে চামার। বাড়ি থেকে বের করে দিল, সমাজে একঘরে হলাম। তাতে কি? ভিনগাঁয়ে ঘর বাঁধলাম, ছেলেপুলে হল। এখন বৌ রোজগার করে, আমি ঘর সামলাই, রান্নাবান্না করি আর বাচ্চা সামলাই।

আর কখনও সখনও গানের প্রোগ্রাম পেলে শ’দুই কামিয়ে নিই।

ইতিমধ্যে ক্লার্ক বলার চেষ্টা করল—ব্যাটা পাঁড় মাতাল, ওর সব কথা বিশ্বাস করবেন না।

ধমকে উঠল সোহনলাল—তুম চুপ রহো জী! হম দেবতা সে, হমারে মালিক সে বাত কর রহেঁ হ্যাঁয়, নৌকর সে নহীঁ। আপনি চিন্তা করবেন না সরকার। লোনের কিস্তি ঠিক সময়ে জমা হয়ে যাবে।

আমার বাঈ করবে। কখনো কখনো আমিও আসব, আপ দেবতাকে দর্শন কে লিয়ে।

এবার সোহন সামনে হাত মেলে দিয়ে গেয়ে উঠল—দরশন দো ঘনশ্যাম নাথ মোরি, আঁখিয়া পিয়াসী রে!

তারপর হাত নেড়ে নেড়ে অদূশ্য ব্যাঞ্জো বাজাতে লাগল—টিংরিং—রিংরিংরিংরিং-রিং, টিংরিং—রিংরিংরিংরিং-রিং।

সোহনলালের গান শোনা গেল একমাস পরে, হোলির দিনে।

বিশাল মিছিল, প্রায় জনা চল্লিশ লোক। নাচতে গাইতে আসছে রাজবাড়ির অর্থাৎ, দাদুসায়েবের কোঠির দিকে। মাদল বাজছে, সঙ্গে করতাল—এরা বলে মঞ্জিরা। লিড করছে সোহনলাল, বাকিরা দোহার। অনেকেই ভাঙ খেয়েছে। কেউ কেউ আলু কেটে তাতে ব্লেড দিয়ে যৌনক্রিয়ার সবচেয়ে পরিচিত হিন্দি শব্দটি খুদে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। আর রঙ লাগিয়ে সবার বুকে ছাপ লাগাচ্ছে।

গঙ্গারামকে দেখামাত্র ভীড় চেঁচিয়ে উঠল—লাগা, লাগা! ব্যাংকওয়ালে সাহাবকো লাগা।

আর মুহূর্তের মধ্যে গঙ্গারামের জামায় মুদ্রিত হল গালিটি। ওর ভ্যাবাগঙ্গারাম চেহারা দেখে আরও একপ্রস্থ হাসির হররা ছুটল। খানিকক্ষণ পরে ব্যাংকসাহাবও সবার সঙ্গে মিলে সোহনলালের গানের সাথে নাচতে লাগল।

‘রং পিচকারি, সন্মুখমারি; ভিগি আঙ্গিয়া, অউর ভিগি শাড়ি। আরে হোলি মেঁ ঝুম গয়ে শ্যাম, অরে হোলি মেঁ’।

দুপুরে পুকুরে চান করার সময় ঘাটে বসে গায়ে সাবান মাখতে মাখতে গঙ্গারাম দেখলেন এপারে ওপারে অশ্লীল গালাগালির কম্পিটিশন চলছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা হাসিমুখে অনায়াসে এ ওর বৌ ও বোনের সাথে সম্পর্ক জুড়ছে। যাহোক করে চান শেষ করে দুটো ভাতডাল খেয়ে বিছানায় ডাইভ মারার আগে বুধরামকে বলা হল হোলির মিষ্টির থালিতে নমকিন, গুঁজিয়া এসব সাজিয়ে দাদুসাহেবের বাড়িতে পৌঁছে দিতে।

(৩)

সপ্তাহ দুই কেটে গেল। বাতাস গরম হচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ ধুলোর ঘূর্ণি ওড়ে। ঝেঁটিয়ে দেয় যত ঝরাপাতা। বাতাসে ম’ ম’ করে মহুয়া ফুলের গন্ধ।

গঙ্গারাম বেলা একটা নাগাদ মোটরসাইকেলে করে একটা রিকভারি ট্যুর থেকে ফিরছিল, ব্যাংকের কাছে পৌঁছতেই দেখতে পেল বিরাট ভিড়। ওকে নামতে দেখেই ভিড় থেকে আওয়াজ উঠলো—আ গয়ে, আ গয়ে!

আর ও মোটরবাইক থেকে নামা মাত্র একজন আধবয়সী মহিলা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল ওর হাঁটু।

—হুজুর! আমার ছেলেকে বাঁচান!

বারান্দার থামের গায়ে পিছমোড়া করে বাঁধা রয়েছে বুধরাম। কষের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পরনে একটা হাফপ্যান্ট, গায়ে জামা নেই। ফলে গায়ে দাগড়া দাগড়া কালসিটে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটা মোষবাঁধার মোটা দড়ি পাকিয়ে ওকে চাবকেছেন দাদুসায়েব। অনেকক্ষণ ধরে চলায় হাঁফিয়ে পড়েছেন। এখন শুধু গালাগাল আর চিৎকার।

বুধরাম নেতিয়ে পড়েছে, কোন প্রতিবাদ নেই।

গঙ্গারাম প্রথমেই দাদুসায়েবের হাত থেকে মোটা দড়িটা ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

—কী করছেন কি? ছেলেটা মরে যাবে যে!

—মরে যাওয়াই ভাল ছিল ওর। দুধকলা দিয়ে ঘরে নাগ পুষেছি। আমাকে না বলে ওকেই জিজ্ঞেস করুন,—জানেন কী করেছে ও? চুরি করেছে।

—চুরি? বুধরাম চুরি করেছে? বিশ্বাস হয় না।

—আমি কি মিথ্যে কথা বলছি? চারদিন আগে ধানবেচার চারশ’ টাকা টেবিলের নিচের ড্রয়ারে রেখেছিলাম, হ্যাঁ, ওর সামনেই। বিশ্বাস করতাম যে! কাল থেকে পাচ্ছি না। আজ ওর টিনের তোরঙ্গ থেকে বেরিয়েছে। পানদোকান থেকে বিড়ি না কিনে সিগ্রেট কিনেছে, তখনই সবার সন্দেহ হয়েছিল। সবাই জানে আপনি সিগ্রেট খান না, তবে?

গঙ্গারাম চুপচাপ ওর বাঁধন খুলে দেয়। বুধরামের মা আর ক’জন ওদের সমাজের লোক এসে ওকে নিয়ে যায়। গঙ্গারাম বললেন—আগে মিশ্র ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। আমার নাম করলে পয়সা লাগবে না।

এবার মুখ খুললেন দাদুসায়েব—ম্যানেজারবাবু, আপনাকে অন্য লোক দেখতে হবে। চোরকে তো আর ব্যাংকে রাখা যায় না! ছোটবেলা থেকে দেখছি, পুলিশে দেব না। কিন্তু কাল সকালে ওকে এই গ্রাম থেকে চলে যেতে হবে।

গঙ্গারাম আস্তে আস্তে মাথা নাড়েন।

ভোরবেলা। বিজলী চলে গেছে। মশারির ভেতরে গুমোট, গঙ্গারামের ঘুম ভেঙে গেল।

একটা মোমবাতি কে যেন টেবিলের ওপর রেখে গেছে। আস্তে আস্তে একটি ছায়ামূর্তি বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকছে। বুধরাম—হাতে চায়ের কাপ।

—কি রে, তুই? এত ভোরে?

—হ্যাঁ, চা খেয়ে নিন। আমি এখন যাব, জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়েছি।

—কোথায় যাবি?

—দিদির গাঁয়ে, অমরতাল।

—দিদি?

—হ্যাঁ, উম্মেদ কুঁয়র। ওর কাছে থাকব, নিতে এসেছে।

গঙ্গারাম কিছু ভাবেন। তারপর বালিশের তলা হাতড়ে একটা পঞ্চাশটাকার নোট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দেন।

—নে, এটা রাখ।

বুধরাম যেন ভূত দেখেছে, মাথা নাড়ে, পিছিয়ে যায়।

গঙ্গারাম বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন, এগিয়ে যান।

—কি হল? ধর, আমি দিচ্ছি।

বুধরামের হাত থেকে চায়ের পেয়ালা পিরিচ মাটিতে পড়ে খানখান হয়ে যায়। অস্ফুট স্বরে বলেঃ

—রুপিয়া তো ওহু দিহিস্।

—কৌন দিহিস্?

—বড়ে মালিক, দাদুসাব!

(৪)

ফোঁপানি ও ঢোঁকগেলার মাঝে একটু একটু করে বুধরাম শোনায় এক আজব গল্প।

সেই হোলির দিন দুপুরে বুধরাম ব্যাংকের কোয়ার্টার থেকে হোলির প্রসাদ নিয়ে দাদুসাহেবের কোঠিতে থালা পৌঁছাতে যাচ্ছিল। শুনশান চারদিক। ঠাকুর-চাকর সিদ্ধির নেশায় ঢুলছে। বুধরাম পেরিয়ে যায় বারান্দা, করিডর, খালি ঘরগুলো—একের পর এক।

বৈঠকখানার দরজাটা ভেজানো; ও ভাবে টেবিলে ঢাকা-থালা রেখে চলে আসবে। দরজা একটু ঠেলে ভেতরে যেতে গিয়ে ও পাথর হয়ে যায়। তক্তপোষে শায়িত দুই মানবশরীর। খেলায় মেতেছে। দেয়ালের দিকে পাশ ফেরা বয়স্ক পুরুষ তো ঠাকুরসায়েবের মত, কিন্তু ওদিকের নারীশরীরটি?

ওপাশ থেকে গড়িয়ে আসার সময় নারীমূর্তিটি দেখতে পায় বুধরামকে, চমকে উঠে গায়ে কাপড় টানে।

বুধরামের যেন অঙ্গদের পা’, মাটিতে সেঁটে গিয়েছে। হঠাৎ পেছন ফিরে প্রাণপণে দৌড় লাগায়। ক’দিন আর ও’মুখো হয় না, ব্যাংকেই এঁটুলির মত সেঁটে থাকে।

গতকাল দাদুসায়েব ওকে ধরে ফেলেন। ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়া বুধরামকে চারটে বড় পাত্তি দিয়ে বলেন––হোলির বকশিস, কাউকে বলার দরকার নেই; ম্যানেজার সায়েবকেও না।

খানিকক্ষণ পরে গঙ্গারাম বলেন—তোকে কোথাও যেতে হবে না, এখানেই থাকবি। আমি দাদুসায়েবের সঙ্গে কথা বলব।

—থাক না সায়েব, কোন লাভ নেই। খামোকা আপনার সঙ্গে অশান্তি হবে। বড়ে মালিকের সম্বন্ধে আমার মুখের কথা কে বিশ্বাস করবে? আর আমি যে কাল পানঠেলা থেকে সিগারেট কিনেছি—সেটা তো সত্যি! তার চেয়ে এই ভাল।

(ক্রমশ)



(পরবাস-৬৬, মার্চ ২০১৭)