Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines




পরবাসে সাবর্ণি চক্রবর্তী-র
লেখা

বই


ISSN 1563-8685




ফরিয়াদ

|| ১ ||

খনও ভোর হয়নি — হবে হবে করছে। আকাশে মেঘ, সেজন্য পুব আকাশ ঠিক লালচে হয়ে উঠতে পারে নি। একটা পাঁশুটে, খুব ফ্যাকাশে আলো দেখা দিয়েছে।

এখন ভাটা চলছে। নদীর জল বয়ে যাচ্ছে দক্ষিণে, সমুদ্দুরের দিকে। কাল রাতে বিষ্টি হয়েছে, গুঁড়ি গুঁড়ি পড়ছে এখনও। তাতে নদীর বুকে ছোট ছোট অসংখ্য বুজকুড়ি, তৈরি হয়েই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

নদীর পাড়টা বেশ ঢালু, উঁচু ডাঙায় ওঠার আগে অনেকটা জায়গা জুড়ে নরম কাদা। জোয়ারের সময় এই কাদার ওপরের দাগ বরাবর জল ওঠে, আবার ভাটার সময় নেমে যায়। কাদাটা থেকেই যায়, শুকোয় না।

হাতে জলভরা একটা হাতলভাঙা প্ল্যাস্টিকের মগ, নদীর পাড় বেয়ে পা টিপে টিপে সাবধানে নামল গোবিন্দ, কাদায় পা হড়কে না যায়। অবশ্য ও জানে কিভাবে কাদায় পা দিয়ে নামতে হয় — ও তো জন্ম থেকে এই নদীর পাড়ের গাঁয়ের বাসিন্দা। ওর বাপ-ঠাকুর্দা, তার বাপ, সবাই তাই। ও বসল উবু হয়ে — জলের বেশি কাছে গেল না। এখানকার জলে আছে কালুরায় — বড় কুমীর। খুব চালাক। ল্যাজের একটি ঝাপটা মারে নৌকোর ধারে হাল ধরে বসা মানুষটির হালে — লোকটা ডিগবাজী খেয়ে জলে গিয়ে পড়ে — কালুরায় তার প্রকাণ্ড হাঁ-মুখ দিয়ে খপ করে তাকে ধরে নেয়। আর নিয়েই চলে যায় গভীর জলের দিকে — দু-পাটি শক্ত ধারালো দাঁতে আটকে ধরা লোকটাকে একবার ওঠায়, একবার নামায়। নৌকোর অন্যান্য লোকেরা দেখে মানুষটা কিরকম নাচতে নাচতে গভীর জলের দিকে চলে যাচ্ছে।

এ-ছাড়া আছে কামঠ — এদিককার নদীর বাসিন্দা। মুখটা লম্বা, মুখে অগুন্তি ধারালো দাঁত। জলে নেমেছে কোন লোক — পুরো একটা ঝাঁক এসে তাকে ধরে। লোকটা প্রথমে বুঝতেই পারে না কামঠে ওর শরীর খেয়ে ফেলছে। জল লাল হয়ে যায় ওর রক্তে, তখন সে বোঝে — আর যখন বোঝে তখন সে মারা যায়।

তবে গোবিন্দর বাপকে কালুরায়ও নেয় নি, কামঠেও খায় নি। নিয়েছিল খোদ বনের দেবতা, দক্ষিণরায়। বাপ মাধব ছিল মউলে, গাঁয়ের একটা দলের সঙ্গে মধু আনতে গিয়েছিল দক্ষিণের জঙ্গল থেকে। কিন্তু সে-সব জায়গা দক্ষিণরায়ের খাস রাজত্ব, তাদের ঘুরে ফিরে বেড়িয়ে বেড়াবার জায়গা। রায়বাঘার ভয় তো আছেই, এছাড়াও রাস্তায় অনেক বিপদ, তার ওপর জলডাকাতের ভয়। নদী বেয়ে নৌকোর বহরে যেতে হয় — গাঁয়ের গুণিন্‌ সুদাম মন্ত্র দিয়ে বেঁধে দিয়েছিল সব কটা নৌকোকেই। কোন বিপদ আপদ আর ছুঁতে পারবে না তার সওয়ারীদের — যক্ষ, রক্ষ, দৈত্য, দানব, জলডাকাত, কেউই আর কিছু করতে পারবে না।

কিন্তু মাধবের বেলায় মন্ত্র খাটে নি। মাধব ছিল বহরের সব-পেছনের নৌকোয়, বসেছিল গলুইয়ের ওপর। চুপিসারে সাঁতরে এসেছিল দক্ষিণরায়, থাবা মেরেছিল গলুইয়ের ওপর। সাঁ করে নিচে নামল নৌকোর ওই মুখ, মাধবের ঘাড় এল দক্ষিণরায়ের মুখের সামনে। রায়বাঘা তা কামড়ে ধরল, দ্রুত জল সাঁতরে ডাঙায় উঠে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে গেল। ওর শরীরটাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। অত ঘন বনের ভেতর ঢোকার সাহস ওর সাথীদের হয় নি।

গোবিন্দ তখন ছোট। এই ন'-দশ বছর বয়েস। প্রথম যখন খবরটা এল ওর ঠিক বিশ্বাস হয় নি। ওর বাপ, যার গায়ে অসুরের শক্তি, যে তরতর করে নারকেল গাছে উঠে যেতে পারে, যার হাতের একটা থাপ্পড় খেলে ওর মা হাঁউমাউ করে কাঁদতে থাকে, সেই বাপ আর ফিরে আসবে না? সেরকম কি কখনও হতে পারে? কিন্তু ও দেখল ঘরের উঠোনে লোকের ভিড়। তাদের সামনে ওর মা গড়াগড়ি দিচ্ছে, সারা গায়ে ধুলো, গায়ের কাপড় এলোমেলো, চোখের চাউনি পাগলের মত, ডাক ছেড়ে কাঁদছে, ভগবানকে গালমন্দ করছে, আর গালাগাল দিচ্ছে সুদাম গুণিন্‌কে। ভিড়ের ভেতর কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়েছিল সুদাম। ফিসফিস করছিল পাশে দাঁড়ানো গোবিন্দর জ্যাঠা হীরুর কানে — আমি কি করব বল? আমার বন্ধন খাটে দক্ষিণরায় ডাঙায় থাকলে আর কালুরায় জলে থাকলে। দক্ষিণরায় যদি জলে নামে — বুঝলে না — এ একেবারে ভগবানের হাত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন যে আমার মন্ত্র খাটবে না — আমি তুচ্ছ মনিষ্যি, আমি কি আর তা আটকাতে পারি?

কিন্তু নোটনখ্যাপা বলেছিল অন্য কথা। উহুঁ, উহুঁ, ভগমানকে দোষ দিও নি বাপু। উ বেচারা কি কইরবে? উয়ার তো হাত পা বাঁধা। যা করে সে তো তোমার নিয়তি। আরে বাপু, ভগমান মর্দমানুষ আর নিয়তি মেয়ালোক। মেয়ালোকের সঙ্গে মরদ ঝগড়ায় পারে কখনও? তুমার নিয়তি মু খুইলে গালি দেয় — ভগমান পলায়ে যায়। হে-হে-হে-হে—

এভাবেই হাসত নোটন। প্রথমে কম আওয়াজ করে, তারপর হাসির গমক আর জোর বাড়ত। ওর সারা শরীর কাঁপত, মাথার জটাবাঁধা ঝাঁকড়া চুল আর মুখের দাড়ি এদিক ওদিক নড়ত — যেন কোন পাগলা হাওয়া ওর দাড়ি ধরে নাড়ছে। ওর কথা শুনে বোঝা যেত না ও কোন জায়গার লোক। ওকে এ ব্যাপারে কেউ কিছু জিগ্যেস করলে বলত, উ সব আমি জানি নে রে। মোর মা আমারে প্রসব করি গাছতলায় ফেলে রেখে পলায়ে গেছিল, শরীলের তাগিদে একটা মরদের সাথে পাপ করার জন্যি চলি গেছিল। আমারে তুলি নিয়া গেছিল এক বুড়ি। সে বুড়ি জঙ্গলের বিদ্যা জানিত — রাতে ভূতপিরেতের সাথে কথা বলিত। একদিন ভূতে বুড়িকে নিয়ে গেল — পাতার ঘরেতে পড়ি রইল শুধু উয়ার শরীলটা। তা পরেতে আমারে বড় করিছিল জঙ্গলের সব পশুপক্ষী। একটা কাকপক্ষী আমারে বলিছিল মোর মায়ের কথা, বুড়ির লুকানো বিদ্যার কথা। তা পরেতে আমি বড় হয়ে গেলম, আমার শরীলে পাপ আইল — ওরা মোরে খেদায়ে দিল জঙ্গল থেইকা। তখন আমি চলি আলম তুদের সঙ্গে থাকিতে হে-হে-হে—

সবাই জানত নোটন পাগল। কিন্তু সবাই এও জানত যে নোটন গুপ্তমন্ত্রে সিদ্ধ। ও অঘটন ঘটাতে পারে, মরা মানুষ বাঁচিয়ে তুলতে পারে। মাধবের বুড়ো বাপের সঙ্গে গোবিন্দর মা গিয়েছিল ওর কাছে, ডুকরে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে। তার বুকে লেপ্টে ছিল গোবিন্দর ভাই, একটা এক বছরের বাচ্চা। গোবিন্দকেও নিয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে— যদি শিশুটিকে আর ছেলেমানুষ গোবিন্দকে দেখে নোটনের দয়া হয়, ফিরিয়ে দেয় মাধবকে। হীরুও গিয়েছিল। মাধবের দাদা সে, তার একটা দায়িত্ব আছে তো। সে আবার সঙ্গে নিয়েছিল নিজের দুই ছোট ছোট ছেলেকে — যদি নোটন দয়া করে ওদেরও আশীর্বাদ করে। গাঁয়ের আরও দু চারজন গিয়েছিল ওদের সঙ্গে। নোটন তখন শুয়েছিল ওর ঝোপঝাড় আর গাছের পাতা দিয়ে তৈরি আস্তানায় — গায়ের কাপড় খুলে ফেলে একেবারে আদিম অবস্থায়। মশা, জোঁক, পিঁপড়ে, জঙ্গলের পোকা ওর গায়ে বসত না, বিছে ওকে কামড়াত না। কারণ ওর সারা শরীর ছিল অতি ঘন লোমে ঢাকা।

তা সেই অবস্থাতেই তার আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসেছিল নোটন। মাধবের বৌ শোকাতুরা অবস্থাতেও সে দৃশ্য দেখে লজ্জা পেয়েছিল। সে তার ডুকরে কান্না থামিয়েছিল এবং সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। তার বুকে লটকে থাকা শিশুটি তার কচি দুই হাত দিয়ে মায়ের বুকের কাপড় সরিয়ে দিয়ে মায়ের শরীরের অমৃত আস্বাদনের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু সেই স্ত্রীলোকের লজ্জা তাকে এতই অভিভূত করেছিল যে সে তার শরীর ঢাকতেও ভুলে যাচ্ছিল। তবে স্ত্রীলোকটির যৌবনের অনুসন্ধিৎসা তাকে আবার প্ররোচিত করছিল আড়ে আড়ে তাকিয়ে নোটনের পুষ্ট অঙ্গ জরীপ করার জন্যে। হীরু আর মাধবের বাপ নোটনের কাছে কাকুতি মিনতি করছিল মাধবকে ফিরিয়ে দেবার জন্যে — মাধবের বৌ মাঝে মাঝেই ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠছিল। কিন্তু নোটন মাথা নেড়ে না বলে দিয়েছিল। আরে বাপু তুমরা তো বুঝ না, ই সব নিয়তির খেলা। দক্ষিণরায়কে ডাকি আনিছে কে? সে তো নিয়তি — মাধবের নিয়তি। রায়বাঘা কি দলের সব প্রাণীরেই নেয়? তাহা তো নয়। মাধবের নিয়তি গিয়াছে উয়ার কাছে — চিনায়ে দিয়াছে মাধবেরে। একবার চিনায়ে দিলি পর তুমি যিখানেই যাও রায়বাঘার দুই চক্ষু তুমার উপরেই রহিবে। তুমি দলের সহিত নদীখালের ভিতর দিয়া নৌকা বাহিয়া যাও — দক্ষিণরায় তীরে তীরে হোগলা বনের ভিতর দিয়া তুমার পিছু করিবে। তুমি ডাঙায় উঠিছ মধু ভাঙ্গিতে — রায়বাঘা তুমার পিছনেই চক্র নিবে। দিনের পর দিন এইভাবে চলিবে — তাহার পর আসিবে সেই ক্ষণটি — নিয়তির ঠিক করি দেয়া সেই বিশেষ সময়টি। এইরূপে রায়বাঘা মাধবেরেই তুলি লিয়াছে — আর কাহারেও তো স্পর্শ করে নাই। ভূঁই-এ পড়ি থাকে মনুষ্য — সে তাহার সামনে দেখে রায়বাঘার মুখ, অগ্নির পারা দুই ভাঁটা চক্ষু — কানে শোনে তার গর গর করি আওয়াজ। সে মনুষ্য তরাস পায় — উয়ার মনে তরাস, বুকে তরাস, উয়ার পিথিমি খালি তরাস আর তরাস। তাহার এক মুহূর্ত তখন বছর বছরের তরাস। তাহার পর দ্যাবতা দক্ষিণরায় উয়ার শরীলে দাঁত বসায় — তরাসের সহিত তখন মেশে যন্তন্না — দাঁত উয়ার শরীলে ঢোকে, ঢোকে, ঢুকিতে থাকে অনন্তকাল ধরি। সে মনুষ্যের তরাস আর যন্তন্না বাড়ে, বাড়িতেই থাকে — তখন মনে পড়ি যায় গত জনমের কথা, তাহারও আগের আগের সব জনমের কথা — কি কি পাপ কাম সে করিছিল। সেই সব পাপে তাহার পরাণে সব দাগ পড়িছিল — কালা কালা কুৎসিত সব দাগ। আর ঐ সব দাগ ছবি আঁকি ফেলিছিল তার নিয়তির। এই জনমে জ্যান্ত হইছে সেই মেয়ামানুষ। সে এক ভয়ংকরী — দুই লাল চক্ষু দিয়া চারিদিকে রুষ্ট দৃষ্টি দিতেছে — কুৎসিত দেহখানির কোন বসন নাই — রক্তলাল জেব্বা বাহির করি ভয়ংকর হাস্য করিছে — যাহার নিয়তি তাহারই রক্ত খাইবার ছল খুঁজিছে। সে তার আপন কর্ম করিবে — ভগমান সালিশী করিতে আইলে কুলার বাতাস দিয়া সে তারে দূর করি দিবে।

তবুও লোকজন নোটনকে ছাড়েনি। মাধবের বুড়ো বাপ আর বড় ভাই নোটনের সামনে সাষ্টাঙ্গে উপুড় হয়ে পড়েছিল। বাবা তুমি সব পার — মাধবকে ফিরিয়ে এনে দাও। আবারও ঘাড় নেড়েছিল নোটন। আরে তুরা কিছু বুঝিস না। মাধবের দেহ কি আর আছে? তাহা তো এখন দক্ষিণরায়ের শরীলের সহিত এক হয়্যা গেছে। শরীলে বদ্ধ থাকে পরাণ। তাহা তো এখন খালাস হয়্যা আনন্দে উড়ি বেড়াতেছে। সে তো আর মাধব লয়, একটা খালাস পাওয়া পরাণ। উয়ার নিয়তিরও ক্ষয় হয়্যা গিয়াছে — শেষ হয়্যা গিয়াছে সেই মেয়ালোক।

হঠাৎই নোটন চুপ করে গিয়েছিল। ওর দু চোখ বড় বড় হয়ে খুলে গিয়েছিল, লাল চোখ হয়েছিল আরও লাল — দৃষ্টি চলে গিয়েছিল দূরে — অনেক দূরে। লোমশ ভাল্লুকের মত ওর শরীর শক্ত হয়ে উঠেছিল। আবার সে কথা বলতে শুরু করেছিল — প্রথমে ফিস ফিস, বিড় বিড় করে, তারপর জোরে জোরে। নিজের মনে। তুরা তো দেখিতে পাবি না — কিন্তু মোর সামনে একটা ছবি আসি গেছে। দক্ষিণরায় উয়ার ঘাড় কামড়ি ধরিল, সাঁতার দিয়া তীরে উঠি এক লম্ফ দিয়া হোগলার ঝোপের ভিতর উয়াকে মুখে করি ঢুকি গেল। অনেকদূর নিয়া গেল তাহারে। তারপর উয়ারে ভূঁই-এ ফেলি দিল — থাবা দেয় আর কামড় মারে উয়ার শরীলে — হাড় মাস ছিঁড়ি ছিঁড়ি লয়। আর রক্ত, কেবল রক্ত। একশো আটটো ছাগ বলি দিলি এত রক্ত বেরাবে না। সেই রক্ত আবার ভূঁই থিকা চাটি খাতিছিলি সেই মেয়ালোক — মাধবের নিয়তি। এই অ্যাতবড় জেব্বা বাহির করি রক্ত চাটে — আবার মুখ তুলি খল খল হাস্য করে। তাহার জেব্বায় রক্ত — সারা মুখে রক্ত — বসনছাড়া শরীলে রক্ত। মাধবের তখনও জ্ঞান আছিল — তরাস আর যন্তন্নার ভিতর বাঁচি ছিল। কিন্তু তাহার পরে তাহার মরণকাল আইল — উয়ার তরাস, যন্তন্না, ই সব চলি গেল। উ দেখিতে পাইল উয়ার নিয়তিরে — সেটি ছোট হতি হতি মিলায়ে গেল। শান্তিতে শরীল ছাড়িল মাধবের পরাণ।

থেমে গিয়েছিল নোটন। ওর চোখে স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে এসেছিল — শরীরও সেই টান টান ধনুকের ছিলার অবস্থা থেকে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল — মাধবের বাপ আর দাদা, হীরু, মাটিতে শোয়া থেকে উঠে বসেছিল। হীরু ধুতির ভেতর হাত ঢুকিয়ে শরীরের গোপন জায়গা চুলকোচ্ছিল। কারণ ও যেখানে সাষ্টাঙ্গে শুয়েছিল সে জায়গাটা ছিল লাল পিঁপড়েদের আসা যাওয়ার পথ। নোটন তাকিয়েছিল হীরুর দুই ছেলের দিকে। বলেছিল, নিয়তি বড় মজার মেয়াছেলা হে। তারপর ছোট ছেলেটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল, ইয়ার নিয়তিরে দ্যাখ তুমরা। লাল পাড়ের শাড়ি পরণে, মাথায় ঘুমটা — ভদ্র, শান্ত, মেয়ালোক। ই ছেল্যা বড় হলি অর্থবান হইবে — ইয়ার অনেক নৌকা থাকিবে — সে সকল নৌকা মধু ভাঙিতে, মাছ ধরিতে যাইবে — সে সব নাওয়ে যন্ত্র থাকিবে — নাও জল কাটি আওয়াজ করিবে ভট ভট করি। আবার আঙুল দেখিয়েছিল বড় বালকটির দিকে। বলেছিল, ইয়ার নিয়তি একটি দুষ্ট প্রকৃতির স্ত্রী শক্তি — দুব-দুবাইয়া চলে নারী, চোখ পাহাইয়া চায় — এ সেই রূপ। গায়ে কাপড় নাই, হায়া শরম নাই, দুই চক্ষু বন বন ঘুরিছে আর মনুষ্যের অনিষ্ট খুঁজিছে। ই ছেল্যারে বেশি দিন বাঁচিতে দিবে না এই দুষ্ট শক্তি — যুবককালেই ইয়ারে খায়ি ফেলাবে।

চুলকুনি ভুলে আবার নোটনের সামনে আছাড় খেয়ে পড়েছিল হীরু। বাবা, তুমি পার আমার ছেলের ওই নিয়তি কাটিয়ে দিতে। দয়া কর বাবা, দয়া কর। কিন্তু ততক্ষণে নোটন ঢুকে গেছে তার কোটরে — ঝোপ ঝাড়ের আড়ালের জন্যে তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। সেই কোটরে ঢোকার সাহস কারোর ছিল না। সে তল্লাটে এটা সকলেরই জানা ছিল যে নোটন যখন উদোম হয়ে তার কোটরের ভেতর থাকে তখন সে ডাকিনী, প্রেতিনী নামায় সহবাসের জন্যে। সেই দৃশ্য দেখা মহাপাপ — তাতে ভয়ংকর কষ্টদায়ক মৃত্যু অনিবার্য।


|| ২ ||


তক্ষণে ভাল করে ভোর হয়েছে। বিষ্টিটাও থেমেছে। মেঘ সরে গিয়ে একটা মোলায়েম রোদ এসে পড়েছে নদীর বুকে, তার দু পাড়ে। মগে করে জল নিয়ে এসেছে গাঁয়ের টিউকল থেকে, সেই জলে সারা মুখ ধুয়ে নেয় গোবিন্দ। পাড়ের নোনতা কাদামাটি আঙুলের ডগায় খুব অল্প একটু তুলে নিয়ে তাই দিয়ে দাঁত মেজে নেয়, তারপর মগের জল মুখে নিয়ে ভাল করে কুলকুচি করে কাদামাটি মেশানো সেই জল মুখ থেকে নদীর জলে ছুঁড়ে দেয়। পাড়ের কাছে জলে অনেক নোংরা, তাতে গোবিন্দর মুখের কাদামাটির জল মেশে — নদীর ভাটার টান সে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় আরও দক্ষিণে, ততক্ষণে আবার নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে আরও নতুন নোংরা এসে ধাক্কা দেয় নদীর পাড়ে।

গোবিন্দ কোমরের কাছে একটা ছোটগোছের ব্যথা টের পায়। বৌ প্রতিমা যে লাথিটা বসিয়েছিল সেটা পড়েছিল ঠিক এ জায়গাতেই। এতক্ষণ ভাল বুঝতে পারে নি, এখন এই ব্যথাটা শরীরের এই জায়গাটাতে জানান দিচ্ছে। বৌ ছেঁড়া কাঁথাটা গায়ে চাপিয়ে শেষ রাতের আরামের ঘুম দিচ্ছিল, গোবিন্দর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ও যে এমন কিছু দোষের কাজ করেছিল তা নয়। বৌয়ের গায়ে হাত দিয়েছিল আর বৌ ঘুম ভেঙে গিয়ে বুঝে গিয়েছিল গোবিন্দ কি চায়। তা পুরুষমানুষ তো ঘরের মাগের কাছে এ কাজ করতে চাইতেই পারে। বৌয়ের প্রতিক্রিয়া কিন্তু অন্যরকম হয়েছিল। প্রথমে এক ঝটকায় গোবিন্দর হাত নিজের বুকের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। তারপর শুয়ে শুয়েই গোবিন্দর কোমরে বসিয়েছিল একখানা মোক্ষম লাথি। মেয়েছেলেটার পা দুটো রোগাটে, কিন্তু তাতে মোক্ষম জোর। তা জোর আর হবে না কেন? ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া মেয়েমানুষের পা তো। ছেঁড়া মাদুরের বিছানা থেকে ছিটকে গিয়েছিল গোবিন্দ। শেষরাতে বাড়ির মরদকে চেঁচিয়ে গাল দেওয়া যায় না, তাতে পাড়া প্রতিবেশির ঘুম ভেঙে যায়। তাই সাপের মত হিসহিস করে গোবিন্দকে বলেছিল, ওরে আমার মরদ রে, একপয়সা রোজগার করার মুরোদ নেই, আবার পীরিত করার শখ হয়েছে। দূর হ — বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে। ফের গায়ে হাত লাগালে তোকে খ্যাংরা মেরে তাড়াব।

প্রতিমার কথাটা কড়ুয়া হলেও সত্যি। এই সময়টায় গোবিন্দ একেবারে বেকার, এক পয়সাও রোজগার নেই ওর। বৌয়ের রোজগারেই দিনকের দিনের খাওয়া চলছে। লাথি খেয়ে ওর রাগ যে হয় নি তা নয়, কিন্তু পাল্টা লাথি মারবার সাহস ওর নেই। নদীর ওপারে গঞ্জশহরের যে পুলিস থানা, তার মেজবাবুর বাড়িতে প্রতিমা কাজ করে। ঘরের সব কাজ, খালি রান্নাটা ছাড়া। বৌয়ের গায়ে হাত তুললে বৌ যদি ওই পুলিসবাবুর পরিবারের কানে কথাটা তুলে দেয় তাহলে গোবিন্দর কপালে প্রচুর দুর্ভোগ হবে। থানায় পুলিসের মার, সে নাকি এক সাংঘাতিক পিটুনি। তাই খেলে বাঘ বেড়াল হয়ে যায়, বেড়াল হয় ইঁদুর। গোবিন্দ মনের রাগ মনে চেপে হাতে মগ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ঘর মানে চারটে বাঁশের খোঁটার ওপর টাঙানো বিডিও আপিস থেকে পাওয়া সরকারি রিলিফের ত্রিপল, আর চারপাশে দেয়ালের জায়গায় ছেঁড়া, পুরনো কাপড় টাঙিয়ে আব্রুর মত করে রাখা। গাঁয়ের শতকরা নব্বুইটা ঘরেরই এই অবস্থা। মাস দুই আগে যে ঝড় আর বান হয়ে গিয়েছিল তার ছোবল খেয়েছিল এদিককার সব গাঁ-গঞ্জই। তারপর থেকে এভাবেই চলছে।

উঠে পড়বে কিনা ভাবছিল গোবিন্দ। বৌ ভোর ভোরই ঘর থেকে খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ঘরে ভাত পান্তা করে রাখা থাকে, সেই সঙ্গে টিফিন কেরিতে করে কাজের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা ডাল তরকারি। কোন কোন দিন এক আধ টুকরো মাছও নিয়ে আসে প্রতিমা। ছেলেটাকেও ঘুম থেকে তুলে খাইয়ে দেয়। গোবিন্দর জন্যে রাখা থাকে খালি খানিকটা ভাত, সেই সঙ্গে নুন, লেবু আর লঙ্কা। মা আর ছেলে খেয়ে যদি কিছু বাঁচে তবেই হয়তো বা একটু নিরিমিষ তরকারি বা ডাল থাকে। মাছ কখনই থাকে না। গোবিন্দ তাই খায়। এখন ওর হাতে কোন কাজকর্ম নেই, কাজেই টাকা পয়সাও নেই। পুরুষ মানুষের আসল জোর হল টাকা। তা না থাকলে কারোর কাছেই তার খাতির নেই — বৌ ছেলের কাছেও নয়। সেজন্যে গোবিন্দ একটু দেরি করেই ফিরবে — বৌ ততক্ষণে নদী পেরোবার প্রথম ফেরির ভুটভুটিটায় উঠে পড়বে।

পায়ের কাছে কাদার ওপর গোবিন্দর চোখ পড়ল। একটা বাচ্চা কাঁকড়া, গুটিগুটি এদিক থেকে ওদিক চলে যাচ্ছে। ও ঝুঁকে পড়ে খপ করে ওটাকে ধরে ফেলল — এটাকে পুড়িয়ে পান্তা ভাতের সঙ্গে তোফা খাওয়া যাবে। কিন্তু জুৎ করে ধরতে পারে নি, কাঁকড়াটা হাতের মুঠোর ভেতর ছটফট করে, গোবিন্দর হাতে একটা কামড় বসিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে গোবিন্দর মুঠো আলগা হয়ে যায়, কাঁকড়াটা থপ করে কাদার ওপর পড়ে সরসর করে দৌড়ে গোবিন্দর থেকে দূরে চলে যায় আর কাদার মধ্যে গর্ত করে ঢুকে পড়ে। গোবিন্দ পাড়ের কাদা তুলে হাতের কামড়ানো জায়গাটায় ঘষে আর কাঁকড়াটাকে বিড়বিড় করে গাল দেয়, শালা শুয়োরের বাচ্চা।

নদীর পাড় থেকে ঘরে যাবার পথে প্রথমে পড়ে নগেন মণ্ডলের ঘর। ঘর মানে ঘর ছিল, এখন আর কিছু নেই। ঘরটা ছিল একটা বেলগাছের নিচে, ঝড়ের তাণ্ডবে গাছটা ভেঙে পড়েছিল ওই ঘরের ওপর। তারপর এসেছিল বানের জল। নগেন, ওর বৌ, দুটো ছেলেমেয়ে — কেউই বাঁচে নি। খালি নগেনের শরীরটাই পাওয়া গিয়েছিল — একটা প্রকাণ্ড মোটা গাছের গুঁড়িতে আটকে ছিল। বাকিদের কারোর দেহ পাওয়াই যায় নি। নগেনের বুড়ো বাপ মা মরেছিল ঐ ঝড়ের অনেকদিন আগেই। বুড়ো বয়েসের শুকিয়ে মরা — ছেলের বৌ তো আর ভরপেট খেতে দিত না। নগেনের বোন বিলাসী বেওয়া হওয়া ইস্তক দাদার কাছেই থাকত, বেঁচে থাকলে হয়তো ও-ও মারা পড়ত। কিন্তু বিলাসীও মরেছিল অনেক আগে, নগেনের মা বাপ মারা যাওয়ারও আগে। ওর মরার কারণটা ছিলে একেবারে আলাদা।

এ রাস্তায় যখনই গোবিন্দ যায় একবার ওদিকে না তাকিয়ে পারে না। বিলাসীর কথা মনে হয়, মনের ভেতর আনচান হয়। অথচ মেয়েটা যখন বেঁচে ছিল তখন এরকম কিছু গোবিন্দর কখনই মনে হয় নি — বিলাসী যখন গাঁয়ে ছিল তখন নয়, যখন বিয়ে হয়ে ভিন্‌ গাঁয়ে চলে গেল তখনও নয়। গোবিন্দ ছোট থাকতে ওদের চার পাঁচটা ছেলের একটা দল ছিল। সারাদিন ওরা খেলে বেড়াত, হার্মাদপনা করত। বিলাসীর একই রকম বয়েস, ও-ও ছিল ওদের দলে। দুরন্ত ডানপিটে ছিল, জামগাছ, তেঁতুলগাছে উঠত তরতরিয়ে, ঝগড়া মারামারিতে ছেলেদের থেকে কিছু কম ছিল না। ঘুষি, লাথি চালাত ছেলেদের মত সমানভাবে। গোবিন্দ অনেকবার ওর হাতে মার খেয়েছে — সেরকম পাল্টা মার দিতে পারে নি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা সবাই আর একটু বড় হয়ে গেল — তখন বিলাসী ওদের দলছুট হয়ে গিয়ে ঢুকল নিজেদের বাড়িতে। খুব বেশি আর বেরোত না বাইরে। তবে একই গাঁয়ে কাছাকাছি ভিটেয় বাস, গোবিন্দর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত — রাস্তার ওপর, ডোবার পাড়ে, বাঁশঝাড়ের ওধারে। বিলাসী প্রায় কখনই একা থাকত না — সঙ্গে হয় ওর মা হয়তো কোন সখী। আর দেখা হলেও কিছুই নয় — দুচারটে মামুলি কথা, তারপর যে যার রাস্তায় চলে যাওয়া। আরও কয়েক বছর পর বিলাসীর বিয়ে লাগল। শ্বশুরবাড়ি ভিন্‌ গাঁয়ে, চলে গেল সেখানে। ওর বিয়েতে গোবিন্দ নেমন্তন্ন পেয়েছিল। গোবিন্দ মনের সুখে পেট পুরেই খেয়েছিল।

বিয়ের ক-বছরের ভেতরেই বেওয়া হল বিলাসী, পেটে তখনও কোন বাচ্চা ধরে নি। ওর বর মনোহর ছিল এই শা-জোয়ান পুরুষ, মিশকালো দশাসই চেহারা। ওদের গাঁয়ে বনবিবির পালা হত, মনোহর সাজত দক্ষিণরায়, হুংকার ছাড়ত রায়বাঘার মতই। ওদের গাঁয়ে একবার একটা কুমীর খুব উপদ্রব শুরু করেছিল। নদীর পারে গ্রাম, মাঝে মাঝে কুমীর উঠে আসত ডাঙায়। তা এই কুমীরটা একটু বাড়াবাড়ি করেছিল, গেরস্তের খোঁয়াড় থেকে গরু ছাগল টেনে নিয়ে যেতে শুরু করেছিল। গাঁয়ের পুরুত বলেছিল কালুরায়ের পুজো দিতে, তাহলে কালুরায় তার প্রজাকে আবার নদীর জলেই ফিরিয়ে নেবেন। পুজোটা ঐ পুরুতই করে দেবে। নগদ লাগবে হাজার টাকা, তার সঙ্গে চাল কলা ঘি সন্দেশ এসব তো আছেই।

গাঁয়ের লোক পুরুতের কথা শোনে নি। মনোহর তাদের কানে অন্য মন্তর দিয়েছিল। ওরা সেই চতুর কুম্ভীরের জন্যে ফাঁদ তৈরি করল। নদীর তীরে বাঁশের চাঁচের বেড়া দেওয়া একটা বড় ঘর, একদিকে একটা বড় ঝাঁপের দরজা। ঘরের ভেতর পোঁতা কাঠের শোয়ানো কপিকলের মত একটা চাকা, তার ওপর মোটা দড়ি জড়ানো। সেই দড়ির একটা ধার বাঁধা দরজার ঝাঁপের সঙ্গে, তার একধার বাঁধা একটা ছাগলের গলায়। কেউ ছাগলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ঐ চাকি ঘুরবে আর ঝাঁপের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ছাগলের চার পা আবার দড়ি দিয়ে বাঁধা — ছাগল নিজেই নড়াচড়া করে ঝাঁপ না বন্ধ করে দেয়। ছাগল বাঁধা থেকে ম্যা ম্যা করে, রাতের বেলা ডাঙায় উঠে এল সেই কুমীর, ছাগলের পা কামড়ে ধরে টানল জলের দিকে। কুমীর যত টানে ঝাঁপ তত ভাল করে বন্ধ হয় — এই করে করে সকাল হয়ে গেল। এল গাঁয়ের জোয়ানরা, সঙ্গে মাছ মারা কোঁচ আর পাকা বাঁশের লাঠি। সকলের আগে মনোহর, বিলাসীর মরদ। হ্যাঁ, মরদ বটে। কোঁচ দিয়ে কুমীরের মাথাটা ফুঁড়ে চেপে রেখেছিল ভূঁইএর সঙ্গে, আর এক হাতে লাঠিপেটা করেছিল সেই বলশালী সরীসৃপটাকে। সেই সঙ্গে লাঠির প্রহার করেছিল বাকি পুরুষেরা। কুমীরের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হতে বেশি দেরি হয় নি।

কিন্তু কুম্ভীরের দেবতা কালুরায় বোধহয় রুষ্ট হয়েছিলেন মনোহরের ওপর। এই ঘটনার পর মনোহর বেশিদিন বাঁচে নি। অপঘাতে মরণ হয়েছিল তার। দক্ষিণে গিয়েছিল মাছ ধরতে। তখন উঠেছিল ঝড়, নৌকো টাল খেয়ে কাত হয়ে পড়েছিল, জলে পড়ে গিয়েছিল মনোহর, আর ঐ নৌকোরই আরও দুজন। বাকি দু জন ফের নৌকোয় উঠেছিল, উঠতে পারে নি মনোহর। কামঠের ঝাঁক কাছেই ছিল, ধরেছিল মনোহরকে।

রোষ, কালুরায়ের রোষ। এ রকমই বলেছিল সে গাঁয়ের পুরুত। তার কথা শুনে পুজোটা দিলে আজ জোয়ান ছেলেটা বেঁচেবর্তে থাকত। দেবতার রোষ যদি না হবে তাহলে কামঠের ঝাঁক বেছে বেছে মনোহরকেই ধরল কেন? বাকি দুজনকে নয় কেন? জবাব দাও দেখি এই প্রশ্নের? গাঁয়ের লোক এর কোন জবাব দিতে পারে নি, মাথা নিচু করে পুরুতের কথা মেনে নিয়েছিল। পুরুতের পশার প্রতিপত্তিও বেড়েছিল এই ঘটনার পর থেকে।

কিন্তু বিলাসী বেশিদিন বিধবা হয়ে শ্বশুরবাড়ি থাকতে পারে নি। শাউড়ি বিশেষ খেতে-টেতে দিত না। বলত, ভাতারখাকি, আমার ছেলেকে খেয়েছিস, তোর আবার খাওয়া কি? এঁটোকাঁটা খেয়ে কোনরকমে টিঁকে ছিল বিলাসী, কিন্তু আর এক উপসর্গ দেখা দিল। শউরোটা ওর দিকে রাগের চোখে তাকাত ঠিকই, কিন্তু বিলাসী পুকুরে ডুব দিয়ে উঠে ভিজে কাপড় গায়ে জড়িয়ে ঘরে এলে তার চাউনি অন্যরকম হয়ে যেত। বেওয়া হওয়ার পর থেকে বিলাসীকে ওর শাউড়ি শুতে দিত রান্নাঘরে, সেখানে দরজাটা আগল দিয়ে বন্ধ করে যেত না। একরাতে বিলাসীর ঘুম ভাঙল, কে যেন গায়ে হাত দিচ্ছে। ও হাঁউমাউ করে উঠতেই লোকটা দুড়দুড় করে বেরিয়ে গেল। ঘর অন্ধকার, তাতেও বিলাসীর বুঝতে অসুবিধে হল না ঐ আধবুড়ো লোকটা কে।

ওর শাউড়িও সেটা ভালই বুঝেছিল। পরের দিন এঁটো বাসন ভাল করে ধোয়া হয় নি এই অজুহাতে ধরল ওর চুল, অন্য হাতে খ্যাংরা দিয়ে ওকে বেধড়ক পিটল। তারপর বাড়ি থেকে একবস্ত্রে বার করে দিল। যা, চলে যা বাপের বাড়ি। আমার ঘরে ভাতারখাকি অলক্ষীর জায়গা নেই। শউরোটা চুপ করে দেখল — একটাও রা কাড়ল না।

বাপের বাড়িতে বাপ মা একেবারে অথর্ব বুড়োবুড়ি। সংসারটা দাদার — আসলে বৌদির। বিনে পয়সায় একটা বাঁদি পেয়ে গেল বৌদি। অ বিলাসী, কাপড়গুলো নিয়ে পুকুরঘাটে যা, ভাল করে ধুয়ে রাখ। খাবার জল ফুরিয়েছে, ঘড়াটা নিয়ে যা, টিউকল থেকে জল নিয়ে আয়। আরে নবাবের বেটি, এত বেলা পর্যন্ত ঘুম দিচ্ছিস, এঁটো বাসনগুলো মাজবে কে? বাপ মা সব দেখে — চুপ করে থাকে। নগেন তাদের রোজগেরে ছেলে — তার বৌ তো এসব কথা বলতেই পারে। আর দোষটা তো বিলাসীরই। কাঁচা বয়েসে বেওয়া হয়েছে — অনেক জন্ম পাপের ফল। সেই পাপের শাস্তি তো ওকেই পেতে হবে। আর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর যে মেয়ে বেওয়া হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসে তার কপালে ঝাঁটা ছাড়া আর কিই বা জুটতে পারে?

বিলাসী গিয়েছিল নোটনের কাছে। ডানপিটের সাহস বিলাসীর — ও একাই গিয়েছিল, সবাইকে লুকিয়ে। নোটনের পায়ের কাছে সাষ্টাঙ্গে ভূঁই-এ লুটিয়ে পড়বে — সিদ্ধ পুরুষের আশীর্বাদ চাইবে। বাবা, দয়া কর — যাতে একটু সুখে থাকতে পারি তার ব্যবস্থা করে দাও। আর একটা পুরুষের সঙ্গে সাঙ্গা লাগিয়ে দাও। নইলে আমি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাব, শহরের বাজারে গিয়ে নাম লেখাব। আর তো সহ্য হয় না বাবা।

সেদিনটা ছিল শুক্লপক্ষের চতুর্দশী। সূর্য ডুবে গিয়েছে, গোধূলির আলোও আর নেই বললেই হয়, পুরুষ্টু প্রায় গোল চাঁদটা পুব দিক থেকে একটা বাঁশঝাড় আর একটা লম্বা লম্বা ডালপালা মেলে দেওয়া প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছের আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছে, তখন বিলাসী পৌঁছেছিল নোটনের আস্তানার ধারে। নোটনকে চোখে পড়ে নি। কিন্তু সে দেখে ফেলেছিল একটি ভয়ংকর রূপের অপদেবীকে। পাঁচ হাত দিঘল একটি স্ত্রীলোক, একেবারে দিগম্বরী — ঘন, ঠাসা ধোঁয়া দিয়ে তৈরি তার শরীর, বুকের ওপর ঝুলন্ত আধ হাত লম্বা দুই স্তন, হাঁ মুখে করাতের মত ধারালো দাঁত, দু চোখের গর্তে নীল আগুনের ঝিলিক। উঠিপড়ি করে দৌড়ে ফিরে এসেছিল বিলাসী — দাদার বাড়ির উঠোনে পৌঁছে মূর্ছা গিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।

বিলাসীর মরণ নিয়ে গাঁয়ে অনেক চর্চা হয়েছিল। গাঁয়ের সব লোকই বিশ্বাস করেছিল যে বিলাসী মরত না যদি না সেই প্রেতিনীর সঙ্গে তার দেখা হত। আর যদিই বা দৈবাৎ দেখে ফেলেছিল ও ওর সখী গোলাপীকে সে সব কথা না বললেই পারত। ওসব কথা ওর দ্বিতীয় লোকের কানে তোলা ঠিক হয় নি — না নোটনের কাছে যাওয়ার কথা, না ওই অপদেবীকে দেখে ফেলার কথা। বিলাসী অবশ্যি গোলাপীকে মাথার দিব্যি দিয়েছিল আর কাউকে ওসব কথা না বলতে। কিন্তু সব কথা চাউর হয়ে গিয়েছিল ঠিকই। আরে বাবা, যতই হোক গোলাপী মেয়েমানুষ। ওকি আর ওসব সাংঘাতিক কথা পেটে চেপে রেখে হজম করে ফেলতে পারে? টিউকল থেকে জল আনতে গেলে, পুকুরে চান করতে গেলে যদি ওরই বয়েসী দু চার মেয়েছেলের সঙ্গে ওর দেখা হয় তাহলে কি ও ফিসফিস করে তাদের কানে দু চার কথা বলবে না? আর কথাটা বলে ফেলে তাদেরও কি মাথার দিব্যি দেবে না আর কাউকে না বলতে?

তবে ওই অপদেবীর কথা বিশ্বাস না করার লোকও ছিল। পেল্লাদ মণ্ডল, যার বর্গা নেওয়া জমিতে গোবিন্দ এখন জনমজুর, তার ছোট শালা পরাণ হালদার কলেজে পড়ে পাশ দিয়েছে — সে এখন শহরের হাই-ইশকুলে ছেলে পড়ায়। সে বলেছিল, আরে দূর, ওসব আবার কিছু আছে নাকি? বিলাসীর হিস্টিরি অসুখ হয়েছে। ওটা মনের ব্যামো, ওই অসুখে মেয়েমানুষ চোখের সামনে ওসব অলীক ছবি দেখে। ও ঘরে ফিরে মুচ্ছো গিয়েছিল না? ওই অসুখে ওরকমও হয়।

কিন্তু গাঁয়ের লোক বুঝেছিল পরাণের কথাটা ঠিক নয়। সাতদিনের মাথায় বিলাসীকে ধরল কঠিন উদরাময়। নোটনের কানেও নিশ্চয়ই বিলাসীর বলা কথাটা পৌঁছেছিল। রুষ্ট হয়েছিল নোটন। ওলাবিবিকে বলে দিয়েছিল বিলাসীকে অসুখ দিতে। আর তাই ওলাবিবি বিলাসীকে দিয়েছিল ওলাউঠো। মেয়েটাকে বাড়ির উঠোনে বার করে দিয়েছিল ওর দাদা আর বৌদি — ঘরদোর নোংরা করা চলবে না। ও যখন উঠোনে নোংরার মধ্যে ছটফট করেছে তখন ওর দাদাই গাঁয়ের আরও দুজন লোককে নিয়ে নোটনের আস্তানায় গিয়েছিল। নোটনের দয়া চাইবে, প্রার্থনা করবে বোনকে সারিয়ে দেবার জন্যে। নোটনের কোটর ভোঁ ভোঁ, কেউ কোথাও নেই। আবার নোটনের দেখা পাওয়া গিয়েছিল বিলাসী মরে গিয়ে তার দাহকর্ম হয়ে যাবার পর। গাঁয়ের লোক ঠিক বুঝেছিল — ব্যারামটা লাগিয়ে দিয়ে নোটন অপদেবীদের আড্ডায় গিয়ে লুকিয়ে বসেছিল। তার পরে পরেই নোটন একদিন উধাও হয়ে গেল। একদিন, দু-দিন, সাতদিন — নোটনের আস্তানা খালি। সে আস্তানায় ঝোপঝাড় গজিয়ে গেল, তারপর বর্ষার জল পেয়ে সে সব তরতর করে বড় হয়ে গেল — ঘন জঙ্গল হয়ে গেল জায়গাটা। লোকে প্রথম প্রথম বলাবলি করত — নোটনের অপদেবীরা তাকে উড়িয়ে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে গেছে, আর আসতে দেয় নি। আরও কিছুদিন গেল, লোকে নোটনকে প্রায় ভুলেই গেল। সকলেরই বহুৎ কাজ, রোজকার ঝুটঝামেলা, তার মধ্যে নোটনকে মনে করে রাখলে চলবে কি করে? যাই হোক, নোটন একেবারে গেল না। রইল — তবে একটা গল্পকাহিনি হয়ে।

কিন্তু নোটনের আস্তানায় গজানো সেই ঘন জঙ্গল আর তার ধারের বিরাট সেই তেকেলে তেঁতুলগাছটার পাশ দিয়ে লোকজনের যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। দিনমানেও ওখান দিয়ে যেতে কেমন গা ছমছম করে — লোকে সময় বেশি লাগলেও নোটনের জঙ্গলকে এড়িয়ে ঘুরপথেই যাওয়া আসা করতে লাগল।

আজকাল গোবিন্দ প্রায়ই বিলাসীকে ভাবে, নিজের বিছানায় রাতে শুয়ে। রাতে বৌ যখন ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়, তখন। বিলাসী রে, আমার বৌ আমাকে ওর গায়ে হাত লাগাতে দেয় না।

তাতে কি হয়েছে। তোর বৌ তোকে ধাক্কা মারে, দূরে সরিয়ে দেয় — আমি তো তা করি না।

সত্যিই বিলাসী তা করে না। গোবিন্দ চোখ বোজে আর অমনি বিলাসীকে দেখতে পায়। ও হাত বাড়ায়, বিলাসীকে ছুঁয়েছে মনে হয়। বিলাসী তখন খিলখিল করে হাসে — সেই হাসি শুনতে পায় গোবিন্দ — ও ছুঁয়েছে যুবতী বিলাসীকে, কিন্তু সেই যুবতী হাসে যেন সে গোবিন্দর ছেলেবেলার খেলার সাথী, ডানপিটে গাছে ওঠা বিলাসী। গোবিন্দ সেই ঘুমপাড়ানি হাসি শোনে, তখন ও আরাম করে ঘুমোয়।

(ক্রমশ)



(পরবাস-৬৯, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭)