Subscribe to Magazines




পরবাসে
প্রদোষ ভট্টাচার্য্যর

আরো লেখা


ISSN 1563-8685




হেমেন্দ্রকুমার রায়ঃ এক পথিকৃতের কীর্তিকাহিনী

অ্যাডভেঞ্চারের পরেই হেমেন্দ্রকুমারকে যুক্ত করা হয় গোয়েন্দা ও ভৌতিক কাহিনীর সঙ্গে। এই পর্বে তাঁর এই দুই ক্ষেত্রে বিচরণের মধ্যে যে স্বকীয়তা প্রকাশ পেয়েছে—বিশেষ করে গোয়েন্দা গল্পে অলৌকিকতার ব্যবহারে—তাই নিয়ে আলোচনা হবে।



তৃতীয় পর্ব

হেমেন্দ্রকুমারের গোয়েন্দা কাহিনীতে অলৌকিকতা:

১৯২৮ সালে S. S. Van Dine কুড়িটি নিয়মের এক তালিকা তৈরী করেন যা, তাঁর মতে, সব ভাল ডিটেকটিভ গল্প লেখকদের মেনে চলা উচিত। এর মধ্যে ৮ নম্বর নিয়ম হলোঃ

The problem of the crime must be solved by strictly naturalistic means. Such methods for learning the truth as slate-writing, ouija-boards, mind-reading, spiritualistic séances, crystal-gazing, and the like, are taboo. A reader has a chance when matching his wits with a rationalistic detective, but if he must compete with the world of spirits and go chasing about the fourth dimension of metaphysics, he is defeated ab initio.

অর্থাৎ, গোয়েন্দা গল্পে অলৌকিকতার কোন স্থান নেই; কোন ঘটনা আপাত অলৌকিক মনে হলেও—যেমন ‘শনি-মঙ্গলের রহস্য’-তে রতনপুরের কাছে জঙ্গলে যে ডাকাত-কালীর মন্দির, সেখানে প্রতি মঙ্গল ও শনিবারে মানুষের মৃতদেহ পাওয়া (‘রচনাবলী’, ২য় খণ্ড)—শেষ অবধি তার যুক্তিগ্রাহ্য লৌকিক ব্যাখ্যা থাকতেই হবে। এই নিয়মটিকে একসঙ্গে মেনে এবং উল্টে দিয়ে একাধিক গোয়েন্দা গল্প রচনা করেছেন হেমেন্দ্রকুমার। তিনটি এমন উপন্যাস এবার আলোচিত হবে।

অমাবস্যার রাত

সুন্দরবনের কাছে অবস্থিত মানসপুর গ্রামে বেছে-বেছে অমাবস্যার রাতেই গায়ে প্রচুর দামী গয়না পরা মহিলা নিখোঁজ হচ্ছেন। সেই সময়ে প্রত্যেকবার শোনা গেছে এক বাঘের গর্জন। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘ভুলু’ নামক ডাকাতের দলের ডাকাতি।

এখনকার পরিভাষা ব্যবহার করে বলি templateটা চেনা লাগছে না? অদ্ভূত ধরনের অপরাধের সঙ্গে জুড়ছে আপাত অলৌকিক এক চতুস্পদ। সেই Hound of the Baskervilles নয় কি? যেখানে এক বংশে একের পর একজন প্রাণ হারাচ্ছেন আর শেষজনের মৃতদেহের পাশে পাওয়া গেছে এক প্রকাণ্ড হাউন্ডের পায়ের ছাপ। ‘নিশাচরী বিভীষিকা’-তে তো পায়ের ছাপটি একাধারে অমানুষিক এবং কোন স্থানীয় জন্তুরও নয়।

খবরের কাগজে এইসব ঘটনার কথা পড়ে কুমার তার কুকুর বাঘাকে নিয়ে হাজির হলো মানসপুরে। বিমল আর রামহরি কয়েকদিন ধরেই অন্য কোথায় রয়েছে। ঠিক এই ভাবেই কোনান ডয়েলের উপন্যাসে, শার্লক হোমসের বদলে অকুস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন ওয়াটসন, অবশ্য হোমসের অনুরোধে, আর ভারতের অনুরোধে কুসুমপুরে গিয়েছিল ভাস্কর।

মানসপুরে পুলিশ ইন্সপেক্টার চন্দ্রবাবু কুমারকে স্বাগত জানান। সেখানে দুজন বিচিত্র নবাগতের সঙ্গে কুমারের পরিচয় হয়ঃ মধ্যবয়স্ক মোহনলাল আর গ্রামের সুরক্ষা দলের উৎসাহী নেতা পটলবাবু—যাঁর চোখ দুটি দেখে মনে হয় যেন কোন মরা মানুষ তাকিয়ে আছে।

প্রতীক্ষিত অমাবস্যার রাত উপস্থিত। কুমার গ্রামের কাছে জঙ্গলের একটি গাছে উঠে বাঘের অপেক্ষায়। ঘড়ি ধরে রাত বারোটায় গর্জনের সঙ্গে আবির্ভূত হয় বাঘ, কুমার ছোঁড়ে তার বন্দুক, এবং পরমুহূর্তে শোনা যায় মানুষের কন্ঠে আর্তনাদ! বাঘের জায়গায় পায়ে গুলি লেগে কাতরাচ্ছেন পটলবাবু! হঠাৎ সেখানে মোহনলালও উদয় হয় এবং চরম অপ্রস্তুত কুমারকে সমর্থন করে বলে সেও বাঘ দেখেছে। মোহনলাল আরো দেখায় মাটিতে বাঘের গায়ের লোম এবং বাঘের পায়ের দাগ!

এমন সময় কুমার ও চন্দ্রবাবু খবর পান যে ভুলু ডাকাতের দল সেখানে আসছে। দুজনেই অবাক হয়ে দেখে যে মোহনলাল এবং পটলবাবু কেউই আর নেই! অতর্কিতে কোন সহযোগী ডাকাতদের পুলিশের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়, আর পালাবার সময় ডাকাতেরা কুমারকে অপহরণ করে। অজানা কারোর সাহায্যে কুমার রক্ষা পায়।

কুমার ও মোহনলাল এবার আরেকদিন একসঙ্গে যায় যে ভগ্নপ্রায় অট্টালিকার এক অংশে পটলবাবু বাস করেন সেখানে। তারা খুঁজে পায় বাঘের বোটকা গন্ধময় এক শুঁড়িপথ যার শেষে তারা আবিষ্কার করে প্রচুর নারীদের কঙ্কাল দিয়ে ভর্তি এক হলঘর! এগুলিই সেই হতভাগ্য অপহৃত নারীদের দেহাবশেষ। হঠাৎ মোহনলাল ও কুমারকে আক্রমণ করে ডাকাতদের দল, আর দুজনে আত্মরক্ষার্থে ঝাঁপ দেয় সামনের কাজলা নদীতে যাওয়া খালে। সেখানে কুমীরের গ্রাস থেকে নিজেদের রক্ষা করে ডাঙায় উঠে আসে। দুজনে আলোচনা করে পটলবাবু, তাঁর বাড়ির শুঁড়িপথে বাঘের গন্ধ, তার শেষে অগুন্তি নারীকঙ্কাল, এবং মহলের ভেতর দিক থেকে ডাকাতদের আবির্ভাব নিয়ে।

এদিকে চন্দ্রবাবু নিশ্চিত যে মোহনলালই ভুলু ডাকাত। তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে তিনি তার দ্বারা অতি উপভোগ্যভাবে ব্যর্থ হন, এবং মোহনলাল আবার অদৃশ্য হয়। এর পর চন্দ্রবাবু এবং কুমারের কাছে বেনামী চিঠি আসে আগামী অমাবস্যার রাতে কী করলে গোটা রহস্যের কিনারা হবে তা জানিয়ে।

সেই রাতে কুমার, পত্রলেখকের কথামত, পটলবাবুর অট্টালিকার কাছে এক ঝোপে আশ্রয় নেয়। ঠিক রাত বারোটায় বাঘ দেখা দেয়, কুমারের পেছন থেকে কে যেন বলে গুলি করতে। দুটি বন্দুক গর্জে ওঠে। কুমার দেখে তার পেছনে মোহনলাল, যে স্বীকার করে যে সেইই পত্রলেখক। আর সামনে—বাঘ? না পটলবাবুর মৃতদেহ! ইতিমধ্যে সেই খালের মুখে ডাকাতদল আর পুলিশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়।

মোহনলাল কুমারকে টেনে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। সেখানে তার কাছ থেকে কুমার শোনে Margaret A. Murray-র বই Witch-Cult in Western Europe এবং তাতে আলোচিত lycanthropy-র কথা। (অমাবস্যার রাত-এর সমস্ত সংস্করণে শব্দটি ভুলভাবে ছাপা হয়েছে hycanthropy.) ঘটনা পরম্পরা সাজিয়ে বর্ণনা করে মোহনলাল বলে যে আপাতদৃষ্টিতে এটাই প্রতিপাদ্য যে কোন মায়াব্যাঘ্রই মানসপুরের রহস্যের কেন্দ্রে। সে আরও বলে যে কেউ যদি এই কথা উড়িয়ে দিতে চায়, তাহলেও কিছু বলার নেই—মোহনলাল কাউকে অলৌকিক কিছু বিশ্বাস করতে বলবে না। এটা কিন্তু অনস্বীকার্য যে ভুলু ডাকাত ও পটলবাবু এক এবং অভিন্ন, এবং পটলবাবু তাঁর ভগ্নপ্রায় অট্টালিকাকে ডাকাতদের আশ্রয়স্থান হিসেবে ব্যবহার করতেন।

আবার চন্দ্রবাবুর আবির্ভাব; তিনি মোহনলালকে এখনো গ্রেপ্তার করতে চান। কিন্তু মোহনলাল এবার ছদ্মবেশ ত্যাগ করে মূর্ত হয় বিমল রূপে। ডাকাতদের হাত থেকে সেইই কুমারকে উদ্ধার করেছিল! কোনান ডয়েলের উপন্যাসেও সেই মারাত্মক জলার মধ্যে জেল-পালানো আসামী ছাড়াও ওয়াটসন এক রাতে একজন দ্বিতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি দেখেছিলেন। পরে সে জানতে পারে যে সেই ব্যক্তি স্বয়ং হোমস।

এবার দেখা যাক ডয়েলের template নিয়ে হেমেন্দ্রকুমার কী কী করেছেন--

• ডয়েলের অপরাধীর মূল লক্ষ্য ছিল বিপুল পারিবারিক সম্পত্তি গ্রাসের উদ্দেশ্যে এক অলৌকিক কিংবদন্তিকে ব্যবহার। হেমেন্দ্রকুমারের অপরাধীরও মূল নজর অপহৃত নারীদের বহুমূল্য গয়না।

• কিন্তু ডয়েলের সঙ্গে হেমেন্দ্রকুমারের পার্থক্য এখানেই যে অলৌকিকতাকে তিনি নানা ইঙ্গিতের মাধ্যমে বাস্তবের জগতে প্রতিষ্ঠিত করে তারপর পাঠককে বলছেন, “এবার অবিশ্বাস করতে হলে করতেই পারো।” হোমসনিষ্ঠ পাঠক মনীষী-ডিটেকটিভের বাণী স্মরণ করুনঃ কোনো সমস্যার সম্ভাব্য সমস্ত সমাধান একে-একে পরীক্ষা করে প্রতিটির অন্তর্নিহিত ত্রুটির জন্যে সেগুলিকে বাতিল করার পর, যে সমাধানটি অবশিষ্ট থাকবে, সেটি যতই অবিশ্বাস্য হোক, সেটিই গ্রহণীয়।

পাশ্চাত্যের Supernatural explained-এর ট্র্যাডিশন প্রাচ্যের অতিলৌকিকতার রঙে আরও দুবার রাঙিয়েছেন হেমেন্দ্রকুমার।


মরণখেলার খেলোয়াড়

বিমল-কুমারের পর এবার জয়ন্ত-মাণিক। নতুনপুরের জমিদার শশাঙ্ক সুন্দরবাবুর মাধ্যমে জয়ন্তের কাছে এসেছেন। শশাঙ্কের ভাই মৃগাঙ্ককে কে বা কারা খুন করেছে। হত্যাকারী(রা) পুলিশের মতে বাগানের শেষে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল, যা সাধারণত রাতে বন্ধ থাকে। খুনের পরদিন সকালে দরজাটি খোলা পাওয়া গেছে। শশাঙ্কের মত যে খুনি দেওয়াল টপকে বাগানে ঢুকে, বাড়ির ওপরতলায় উঠে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে বাগানের দরজা খুলে প্রস্থান করেছে।

পুলিশ ভিন্নমত পোষণ করে। তারা বলে যে দরজার বাইরে প্রচুর পদচিহ্ন প্রমাণ করে যে খুনি দরজা দিয়েই ঢুকেছিল। দরজার বাইরে একটি কাঁচা রাস্তা গেছে শ্মশানের দিকে। পদচিহ্নের উপাখ্যান হলো যে খুনি শ্মশান থেকে এসে আবার শ্মশানেই ফিরে গেছে! এছাড়া খুনির সঙ্গে আরেকজন এসেছিল। সুন্দরবাবু তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করেন হত্যাকারী(রা) আদৌ মানুষ কিনা।

জয়ন্তের প্রশ্নের উত্তরে শশাঙ্ক জানায় যে বাগান থেকে বাড়িতে ঢোকার দরজা খুনের পরদিন সকালে ভেতর থেকে বন্ধই পাওয়া গেছে। বাড়ির কেউ কিছু শোনেনি বা দেখেনি! মৃগাঙ্কের ঘর থেকে কিছু চুরি যায় নি। তাহলে খুনের উদ্দেশ্য?

এবার শশাঙ্ক জানায় যে শ্মশানের কাছে কালভৈরবের একটি মন্দির আছে যেখানে দুই জমিদার ভাইদের নিযুক্ত এক পুরোহিত পুজো করেন। দিন-তিনেক আগে হঠাৎ এক সাধু সেখানে ঢুকে দাবী করে যে এবার সেইই সেখানে পুজোর দায়িত্ব নেবে। অভিযোগ পেয়ে রগচটা মৃগাঙ্ক সাধুকে মারধোর করে তাড়িয়ে দেয়। সাধু যাবার সময় প্রতিশোধ নেবার শাসানি দিয়ে যায়। শশাঙ্কের সন্দেহ সেই সাধুই খুনি। কিন্তু, জয়ন্ত প্রশ্ন করে, এক নবাগত, গ্রামে সম্পূর্ণ অপরিচিত সাধু কী করে জানবে বাড়ির ঠিক কোথায় মৃগাঙ্কের শোবার ঘর, এবং বাড়িতে ঢোকার-বেরোবার রাস্তাও সে জানবে কীভাবে। শশাঙ্কের কাছে এর উত্তর নেই।

জয়ন্ত-মাণিক যাত্রা করে নতুনপুরের দিকে। সুন্দরবাবু কাজের অজুহাত দেখাবার পর যোগ করেন যে খুনি যেখানে শ্মশান থেকে এসে আবার শ্মশানেই ফিরে যায়, সেখানে যেন কেউ সুন্দরবাবুকে দেখার আশা না করে!

জমিদার বাড়িটি বৃহৎ হলেও জরাজীর্ণ। সংলগ্ন বাগানকে জঙ্গল বলাই ভাল। আর, পুকুরের অবস্থা দেখে মাণিক শশাঙ্ককে প্রশ্ন করে যে শশাঙ্ক গ্রামে ম্যালেরিয়ার মড়ক লাগাতে বদ্ধপরিকর কিনা! শশাঙ্ক ম্লান হেসে উত্তর দেয় যে জমিদারির আয় বাৎসরিক পাঁচ লক্ষ থেকে বিশ হাজারে নেমে এসেছে। আমরা এও জানতে পারি যে মৃগাঙ্কের মৃত্যুর পর শশাঙ্কই জমিদারির উত্তরাধিকারী, যদিও শশাঙ্ক জানায় যে এ ব্যাপারে তার কোন উৎসাহ নেই, মৃগাঙ্ক বিয়ে করে সন্তান রেখে গেলে তারা উত্তরাধিকারী হলেই ভাল হত।

জয়ন্ত সারা বাড়িটি পরিক্রমা করে জানায় যে বাইরে থেকে ওপর তলায় যাবার কোন উপায় নেই। অতএব, বাড়ির মধ্যে থেকে কেউ দরজা খুলে খুনিকে ঢোকায় এবং হত্যার পর তাকে বার করে দেয়! এরপর সিঁড়ির দেওয়ালে রক্তের দাগ দেখে জয়ন্ত বলে যে এতেই প্রমাণ হয় যে মৃগাঙ্ককে গলা টিপে মারার সময় তার মুখ থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তা খুনির হাতে লাগে, এবং খুনি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সেই রক্তের দাগ দেওয়ালে লেগে যায়।

দুই ভাইয়ের ঘর দেখার পর আমরা জানতে পারি যে শশাঙ্ক স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তন্ত্রসাধনা শুরু করেছে, এবং সে বিশ্বাস করে যে তান্ত্রিক শবকে জীবিত করতে পারে। এ নিয়ে অবিশ্বাসী জয়ন্তের সঙ্গে তার খানিক তর্কাতর্কিও হয়। শশাঙ্কের ঘরে কাপড়ের আলনায় জয়ন্ত দেখে একটি ঘাস-কাদায় মাখামাখি হওয়া শার্ট। শশাঙ্ক বলে যে হত্যাকাণ্ডের পর ছোটাছুটি করার সময় সে কাদায় পড়ে গিয়েছিল আর ভারাক্রান্ত মনে, বেখেয়ালে, তা আলনাতেই রেখে দিয়েছে।

নতুনপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টার কুমুদ চন্দ্র সেন ব্যতিক্রমী অফিসার! তিনি অপরাধবিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল, এবং, সবচেয়ে বড় কথা, হত্যার রাতের পদচিহ্নগুলির তিনি ‘plaster of Paris’ দিয়ে ছাঁচ তুলে রেখেছেন! তাঁর সঙ্গে আলোচনার সময় শশাঙ্ক কৌতূহলবশত দু-জোড়া ছাঁচের এক জোড়া হাতে নিয়ে দেখতে যায়, এবং তার হাত থেকে সেগুলি পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। চরম অপ্রস্তুত ও অনুতপ্ত শশাঙ্ককে জয়ন্ত জানায় যে ছাঁচ ছাড়াও পদচিহ্নের মাপ এবং ছবি নেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাওয়া যাবে। শশাঙ্ক দ্বিতীয় জোড়া ছাঁচের থেকে সযত্ন দূরত্ব রক্ষা করে।

কুমুদবাবু একজন দক্ষ তদন্তকারী। পায়ের ছাপগুলো দেখে তিনি বুঝেছেন যে খুনের রাত্রে প্রথম জন শ্মশান থেকে এসে শ্মশানে ফিরে গেছে বটে, কিন্তু শ্মশান থেকে সে যে অন্য কোথাও গেছে এমন পায়ের ছাপ নেই। সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে! দ্বিতীয় জন আবার শ্মশান থেকে জমিদার বাড়িতেই ফিরে এসেছে।

মাণিক এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চারটি প্রশ্ন উত্থাপন করেঃ

• শ্মশান থেকে আগত হত্যাকারী কে? যে সাধুকে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাকে তো শ্মশানের কালভৈরব মন্দির থেকে মৃগাঙ্ক তাড়িয়ে দিয়েছিল!

• শ্মশান থেকে খুনির আসা এবং শ্মশানেই ফিরে যাওয়া কেন?

• শ্মশান থেকে খুনি কোথায় গেল?

• দ্বিতীয় ব্যক্তিটি কে? সেকি খুনির সহকারী নাকি সে খুনিকে তাড়া করে ধরতে না পেরে জমিদার বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল?

কুমুদ এর উত্তরে একটা কথাই বলেঃ খুনের সম্বন্ধে জানে এমন কেউ জমিদার বাড়িতে বাস করছে।

এর পর জয়ন্ত জানতে চায় কুমুদবাবুর আর কিছু মনে পড়ছে কিনা। উত্তরে কুমুদবাবু বলেন যে মৃগাঙ্কের আগে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিলো। যারা খুন হয়েছিল তারা দুজনেই টাকা ধার দিত। একজন নতুনপুরের শ্যামাকান্ত বক্সী, অপরজন পাশের গ্রাম নন্দনপুরের এক মারোয়াড়ী। এছাড়া, তিনটি খুনের আগেই এক একজন অন্য মানুষ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলঃ শ্যামাকান্ত খুন হবার আগে একজন চণ্ডাল, মারোয়াড়ী খুনের আগে এক গোয়ালা, আর মৃগাঙ্কের হত্যার আগে সেই সাধু। কারোরই কোন খোঁজ কেউ করেওনি, আর তিনজনের কাউকে আর পাওয়াও যায় নি।

সেদিন রাত্রে ও পরদিন সকালে ঘটে যায় এক মারাত্মক ঘটনা। অত্যধিক গুমোট গরমে ঘুমোতে না পেরে জয়ন্ত-মাণিক বাগানে বেরিয়ে পড়ে এবং, মাণিকের কাছে ক্রমশ জটিলতর হয়ে ওঠা, রহস্য সম্বন্ধে আলোচনা করে। ঘরে ফেরবার সময় তারা দেখে একজনকে পালিয়ে যেতে। এরপর সিঁড়ির নীচে জয়ন্ত আবিষ্কার করে একটি প্যাকিং বাক্স যা আগে সেখানে ছিল না। বাক্সের মধ্যে বুনো গন্ধ! জয়ন্ত বলে যে সে রাত্রে ঘরে ঘুমোতে গেলে সেটা তাদের দু’জনের পক্ষে চিরনিদ্রায় পরিণত হবার সম্ভাবনা আছে। বাকি রাতটা তারা বাগানে পায়চারি করেই কাটিয়ে দেয়। পরদিন সকালে তাদের শয্যার ওপরে ও নীচে পাওয়া যায় দুটি উদ্যত-ফণা সাপ! গুলি করে তাদের মারা হয়!

শেষ দৃশ্য শ্মশানে। কুমুদ জয়ন্তকে নিয়ে যায় সেই স্থানে যেখানে প্রথম ব্যক্তির শ্মশানে-ফেরা পায়ের ছাপ শেষ হয়েছে । সঙ্গে যায় মাণিক ও শশাঙ্ক । পায়ের দাগ যেখানে শেষ হয়েছে, তার পাশের ঘন জঙ্গল থেকে জয়ন্ত উদ্ধার করে একটি বেলচা ও একটি কোদাল। অর্থাৎ, খুনিকে দ্বিতীয় ব্যক্তি মেরে সেখানে পুঁতে দিয়ে গেছে। কিন্তু মাটি খুঁড়ে বেরোয় একটি নয়, তিন-তিনটি দেহাবশেষ! একটির লম্বা চুল, গায়ের সিঁদুর-চন্দন আর গলায় জবার মালা দেখে বোঝা যায় যে সেটি সেই সাধুর। বাকি দুটি দেহ এতটাই পচা যে সেগুলো শনাক্ত করা অসম্ভব। জয়ন্ত খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলে যে সে খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে সেই চণ্ডাল আর গোয়ালা নিখোঁজ হবার ঠিক পরে-পরেই খুন হয় শ্যামাকান্ত বক্সী ও পাশের গ্রামের মারোয়াড়ী।

হতভম্ব কুমুদ বলেঃ

• তিনটি গলা-টিপে খুন

• প্রতিটি খুনের আগে একজন করে নিখোঁজ

• শ্মশানের জঙ্গলে তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার

এর মানে?

হঠাৎ শশাঙ্ক দৌড়ে শ্মশান থেকে পালায়!

এবার মাণিকের কথা বলার পালা, যা জয়ন্ত-মাণিকের কীর্তিকলাপে বিরল ঘটনা। মনে করে দেখুন, অমাবস্যার রাত উপন্যাসে অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা এসেছিল কুমারের কাছ থেকে নয়, ওই জুটির যে ‘নেতা’, সেই বিমলের মুখ দিয়ে।

মাণিক জানে যে জয়ন্ত অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী নয়। তাও সে বলে যে বর্তমান রহস্যের বেশ কিছু ব্যাপারের অর্থ একমাত্র অলৌকিককে মানলে তবেই বোঝা সম্ভব। মাণিকের ব্যাখ্যার ধরন বেশ অভিনব। সে নিজেকে শশাঙ্ক মনে করে বলেঃ

• আমি তান্ত্রিক এবং শব-সাধনায় বিশ্বাসী, এটা জানা তথ্য।

• কিছু মানুষকে আমার হত্যা করার প্রয়োজন হয়েছে।

• প্রথমে আমি বেছে নেব সমাজের এমন কয়েকজন নিম্নবর্গের মানুষকে, যাদের অনুপস্থিতি নিয়ে কেউ খুব একটা মাথা ঘামাবে না।

• আমার প্রথম বলি এক চণ্ডাল। কৌশলে তাকে কোন নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে, তাকে হত্যা করে, আমি রাতে তার শবকে জীবিত করে ওই জ্যান্ত মড়াকে দিয়েই খুন করাব। যদি কেউ হত্যাকাণ্ড ঘটতে দেখেও তাহলেও আমাকে তার সঙ্গে জড়াতে পারবে না।

• জ্যান্ত মড়া কাজ সেরে ফিরে এলে আমি তার প্রাণশক্তি তার শরীর থেকে বার করে নিয়ে দেহটা মাটিতে পুঁতে দিলাম।

• এই কাজ আমি আরও দু’বার করলাম। এভাবে আমার তিন শত্রু নিধন হলো, যদিও সেই সঙ্গে তিনজন নিরপরাধ মানুষকেও প্রাণ হারাতে হলো।

জয়ন্ত মাণিকের কথা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতে চাইলে, মাণিক প্রত্যুত্তরে বলে যে যাকে কুসংস্কার মনে করা হয় একমাত্র তাই দিয়েই এই রহস্যের কিছু অংশের ব্যাখ্যা হতে পারে। সাধুর লাশে জবার মালা ও সিঁদুর-চন্দন প্রমাণ করে যে সে লাশের ওপর ওই সব লেপন করে আর পরিয়ে শবসাধনার নিয়ম মেনে তাতে প্রাণ সাময়িকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হয়তো অন্য দু’টি দেহতেও একই কাজ করা হয়েছিল, সেগুলি বেশি পচে যাওয়ায় সেসব চিহ্ন আর নেই। শশাঙ্কের ঘরে জয়ন্ত-মাণিক তন্ত্র-সাধনার উপকরণ দেখেছিল, পাঁচটি করোটি-সহ। সে মৃতদেহ সঞ্জীবিত করা নিয়ে জয়ন্তের সঙ্গে তর্ক করেছিল। কুমুদবাবু স্বীকার করেছেন যে শশাঙ্ক মাঝে-মাঝেই শ্মশানে এসে নানা তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ করত। আর, এভাবে ছাড়া জয়ন্ত কি চণ্ডাল ও গোয়ালার নিখোঁজ হওয়ার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারবে?

পাঠকদের আবার স্মরণ করাই শার্লক হোমসের কথাঃ সমস্ত সম্ভাবনা যুক্তি দিয়ে বাতিল করার পর যেটি বাকি থাকবে সেটি যতই অসম্ভব লাগুক না কেন, সেটিই ঠিক সমাধান হতে বাধ্য।

নিরুত্তর জয়ন্ত বিরক্তভাবে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কুমুদ মাণিকের কথার যৌক্তিকতা স্বীকার করে নেন, তবে বলেন আদালত অলৌকিকতাকে মানবে না।

এই মুহূর্তে জয়ন্ত মাণিকের কথাকে আবার গাঁজাখুরি আখ্যা দিয়ে নিজের পুরোপুরি ‘যুক্তিপূর্ণ’ ব্যাখ্যা দেয়ঃ

• শশাঙ্কের উদ্দেশ্য ছিল মৃগাঙ্ককে সরিয়ে জমিদারির উত্তরাধিকার হাসিল করা

• অতি-চতুর অপরাধীর মতো সে পুলিশের/গোয়েন্দার সঙ্গে সহযোগিতার ভান করেছিল

• শশাঙ্কের আলনায় কাদামাখা শার্ট সে পড়ে গেলে একদিকেই কর্দমাক্ত হতো। কিন্তু তার সবটাতেই কাদা লেগেছিল, এবং হাতায় ছিল ঘাস। অর্থাৎ যে শার্ট পরেছিল, সে মাটি খুঁড়েছিল।

• শশাঙ্ক ইচ্ছে করেই এক জোড়া ছাঁচ ফেলে ভেঙেছিল, কারণ সেগুলি ছিল তার নিজের পায়ের ছাপের ছাঁচ

• শশাঙ্কই সাধুর পেছন-পেছন শ্মশানে গিয়ে, তাকে হত্যা করে তার দেহ পুঁতে দেয়। ভাঙা ছাঁচে সেই পদচিহ্নই ছিল

• অর্থাৎ শশাঙ্কের কথাতেই সাধু মৃগাঙ্ককে গলা টিপে মারে। তাকে শশাঙ্কই দরজা খুলে বাড়িতে ঢোকায় আর মৃগাঙ্কের ঘর চিনিয়ে দেয়

• সাধুকে খুন করে এসে শশাঙ্ক স্বহস্তে বাগান থেকে বাড়িতে ঢোকার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়

• খোঁজ নিয়ে জয়ন্ত জেনেছে যে খুন হবার আগে শ্যামাকান্ত এবং পাশের গ্রামের মারোয়াড়ী শশাঙ্ককে যথাক্রমে ৮ ও ১০ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল, আর খুনের পর ধার সংক্রান্ত কাগজপত্র আর পাওয়া যায় নি। তাদের হত্যাকারী যে শশাঙ্কই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে একথা অনস্বীকার্য যে শশাঙ্কের বারবার মোটা টাকার দরকার পড়ছিল।

• জয়ন্তের কাজে বিপন্ন বোধ করে তার ঘরে সাপ রাখার ব্যবস্থা শশাঙ্কই করেছিল। জয়ন্ত মারা পড়লেও সে বলতে পারত যে অনেকেই বর্ষাকালে সাপের কামড়ে মারা যায়।

যে পাহারাদারেরা পলাতক শশাঙ্কের পিছু নিয়েছিল তারা এবার এসে খবর দিল যে শশাঙ্ক ধরা পড়ার আগেই নিজের ঘরে ঢুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

শশাঙ্কই যে মূল অপরাধী তা নিশ্চিত হলো বটে, কিন্তু আর জানবার উপায় রইলো না জয়ন্ত ঠিক না মাণিক!


বিশ্লেষণ

জ্যান্ত মড়া বারবার জয়ন্তকে তাড়া করে ফিরেছে! তার প্রথম আবির্ভাব জয়ন্তের কীর্তি উপন্যাসে (রচনাবলী, ১০ম খণ্ড), যেখানে মহাদেও কাহারের মতো বহু আগের দিনের, সময়ের নিয়মে মৃত বা বৃদ্ধ, অপরাধীদের যুবসুলভ তারুণ্য বৈজ্ঞানিক উপায়ে বজায় রাখা হয়েছে। বৃদ্ধদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নবযৌবন দান জয়ন্ত আবার পরে দেখবে ‘কাঁচের কফিন’ গল্পে (রচনাবলী, ২৪শ খণ্ড)। জয়ন্তের আরেক অভিযান চট্টগ্রামের কাছে আলিনগরে, যেখানে রাজত্ব করে নবাব ও তার মন্ত্রপূত ছ’টি জীবন্ত মৃতদেহ (মানুষ পিশাচ, রচনাবলী, ২য় খণ্ড)। এর কিন্তু কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জয়ন্ত দিতে পারে নি! এর পরেও ‘মরণ-খেলার খেলোয়াড়’ কাহিনীতে জয়ন্তের উক্তি হলো যে অলৌকিকত্বে বিশ্বাস করলে মাণিকের যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু জয়ন্ত তা নিয়ে চিন্তিত নয়। এছাড়া জয়ন্তকে জীবন্ত মৃতদেহের পাশাপাশি আরও অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় বিমল-কুমারের সঙ্গে ‘তাও’ ধর্মাবলম্বীদের অমৃত দ্বীপে গিয়ে। সেখানে জয়ন্ত দস্তুরমত বিরক্ত বাস্তবতার নিয়মের এইসব অবমাননা চাক্ষুষ করে। তুলনায় বিমল অনেক বেশি মুক্তমনা। প্রমাণ স্বরূপ পাঠকেরা অমাবস্যার রাত (রচনাবলী ২য় খণ্ড), অমৃত দ্বীপ (রচনাবলী ৪র্থ খণ্ড) উপন্যাস দু’টি, এবং ‘অদৃশ্যের কীর্তি’ নামক ছোট গল্পটি দেখতে পারেন।

Van Dine-এর ৮ নং নিয়মের কথা একবার স্মরণ করিঃ সব কিছুর rational, যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা রাখতে হবে, ‘the fantastic is not admitted.’ এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে রচনাগুলির মধ্যে, আমার কাছে, হেমেন্দ্রকুমারের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাসের কথা এবার বলব।

বিভীষণের জাগরণ

বিমল-কুমার (অমাবস্যার রাত), জয়ন্ত-মাণিকের (মরণ-খেলার খেলোয়াড়) পর এবার তৃতীয় জুটিঃ হেমন্ত-রবীন। বিভীষণের জাগরণ এদের চতুর্থ ও শেষ রহস্যভেদের কাহিনী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের রাতে নিষ্প্রদীপ কলকাতায় বন্ধুর বাড়ি থেকে মধ্যরাত্রের পর ফিরতে গিয়ে হঠাৎ দুজনের কানে আসে ‘রাত্রির তিমিরাবগুণ্ঠণ ভেদ করে ... বহু কণ্ঠের আর্তনাদের পর আর্তনাদ, দুড়ুম-দড়াম শব্দ এবং বর্ণনাতীত ও অমানুষিক গর্জনের পর গর্জন।’ সদ্য আফ্রিকা থেকে ফেরা দুই বন্ধুই চিনতে পারে যে এ হলো, রবীনের ভাষায়, “কলকাতার মুখে আফ্রিকার হুহুংকার”, যা হেমন্ত দ্ব্যর্থহীন ভবে চিহ্নিত করে সিংহের ব’লে। কয়েক মুহূর্ত পরেই আবার জেগে ওঠে সিংহনাদ, আর ‘অন্ধকারের ভিতর থেকে ঝড়ের বেগে হুড়মুড় করে তাদের উপরে এসে [পড়ে] একটা তুষারশীতল দেহ ... এবং পরমুহূর্তেই কানফাটানো সিংহনাদেই ফুটল খল-খল-খল অট্টহাস্য আর সঙ্গে-সঙ্গে বন্য দুর্গন্ধে চারিদিক হয়ে উঠল পরিপূর্ণ! তারপরেই কার ভারী-ভারী দ্রুত পদ মাটি কাঁপাতে-কাঁপাতে দূরে চলে গেল!’ (২০২) ধাক্কায় ছিটকে পড়া দুই বন্ধু উঠে দাঁড়াবার পর হেমন্ত যোগ করে আরও এক অবিশ্বাস্য কথাঃ জীবটি সিংহ নয়; মাটি থেকে প্রায় পনেরো-ষোল ফুট উঁচুতে সে দেখেছে জীবটির জ্বলন্ত দুই চোখ! রবীনের কথায়, “সিংহের মতন গর্জন করতে আর মানুষের মতন হাসতে পারে, অথচ হাতীর মতন উঁচু—এমন কোনও জীবই পৃথিবীতে কখনও ছিল না, এখনও নেই।” (২০৩) এ যেন ‘অমাবস্যার রাতে’র মায়াব্যাঘ্র কোন মায়াজালের সাহায্যে পরিণত হয়েছে আরও ভয়ঙ্কর কোন জীবে!

হেমন্ত চৌধুরী জয়ন্তের চেয়ে উন্নত শ্রেণীর গোয়েন্দা। জয়ন্তের মতো শুধু বন্ধুর সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের সম্বন্ধে আলোচনার মাধ্যমে সে নিজের পর্যবেক্ষণ-শক্তি বাড়িয়ে ক্ষান্ত থাকে নি। হেমন্ত দস্তুরমতো বিদেশে গিয়ে অপরাধ-বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেছে। তার প্রথম কাহিনীতে সে রসায়নবিদ্যায় নিজের জ্ঞান ব্যবহার করে বুঝেছে যে হত্যাকারী তার কুকর্ম সিদ্ধ করছে দ্রবীভূত বাতাস ব্যবহার ক’রে (‘অন্ধকারের বন্ধু’, রচনাবলী, ১১শ খণ্ড)। দ্বিতীয় রহস্যে হেমন্তের কাজে এসেছে মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধে তার পড়াশুনো।। এবারের হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল ‘স্নায়ুজমনোক্রিয়া’ বা obsessional neurosis (রাত্রীর যাত্রী, রচনাবলী, ১৪শ খণ্ড)। এ হেন বস্তুবাদী বা সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসিদ্ধ রহস্যভেদীর সামনে এ কী অভিনব সমস্যা?

এ কথা প্রায়ই শুনতে হয়, “আরে হেমেন রায়ের তো সবই বিদেশী গল্প থেকে টোকা!” তিনি প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই বিদেশী অনুপ্রেরণা থাকলে তা স্বীকার করেছেন, অনেক সময় মূল বিদেশী কাহিনী সম্বন্ধে মুখবন্ধও রেখেছেন (উদাহরণঃ বিশালগড়ের দুঃশাসন বা মোহনপুরের শ্মশান)। লেখকের দুর্ভাগ্য যে প্রকাশক বা পুনর্মু্দ্রণকারীরা এই স্বীকারোক্তি বা মুখবন্ধগুলি আর ছাপার প্রয়োজন বোধ করেন না। এই একই অনীহার কারণে যে অবনীন্দ্রনাথের চরণস্পর্শ করেছিলেন হেমেন্দ্রকুমার, সেই অবন ঠাকুরকে বুড়ো আংলা নিয়ে এতদিন পর আক্রান্ত হতে হয়!

এত কথা এই জন্য বললাম যে বিদেশী অনুপ্রেরণাকে কতটা আত্মস্থ করে এক প্রায় মৌলিক সৃষ্টির কাজ তিনি করতে পারতেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বিভীষণের জাগরণ। কাহিনীর উপসংহারে, রহস্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, হেমন্ত বলছে যে হিন্দুধর্মের দেবদেবীরা আসলে “এক-একটি বিশেষ ভাবের বিশেষ মূর্তি” যা সিদ্ধ সাধকেরা তাঁদের সাধনালব্ধ অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ ক’রে সচক্ষে দর্শন করতে পারেন জীবন্ত শরীরী রূপে। হিন্দুধর্মের সঙ্গে এবার লেখক মিশিয়েছেন পাশ্চাত্যের Casting the Runes নামক যাদুবিদ্যা।

এই Casting the Runes এক অলৌকিক প্রক্রিয়ার নামই শুধু নয়, প্রখ্যাত বিলিতী ভৌতিক কাহিনীর লেখক M. R. James-এর একটি ছোট গল্পের নামও বটে। ব্যাপারটির ব্যাখ্যা হেমন্তের ভাষাতেই শুনুনঃ

“‘রুন’ হচ্ছে ইউরোপের একরকম আদিম ভাষার নাম। এ ভাষা এখন মৃত। কিন্তু মধ্যযুগেও এ ভাষা চলিত না হলেও ইউরোপের যাদুকররা ... ‘রুন’ অক্ষরের সাহায্যে বিশেষ-বিশেষ মন্ত্র লিখে ... হয়তো কোনও কাল্পনিক দানবকে জীবন্ত আর মূর্ত করে তুলত। যাদুকরের যে কোনও শত্রুকে সেই দানব বধ করে আসত।” (২৩৯)

এর আগে, হিন্দুধর্মে ভাবের মূর্ত রূপ ব্যখ্যা করে হেমন্ত বলেছেঃ

“... কোনো সাধু যদি শক্তি অর্জন করবার পর সাধনপথচ্যূত হয়ে দুষ্ট অভিপ্রায়ে ভীষণ কোনও হিংস্র ভাবকে জীবন্ত আর মূর্তিমান করতে চান, তাহলে সে চেষ্টাও তো অনায়াসেই সফল হতে পারে! ... অলৌকিক শক্তিশালী পাপাচারী বহু কাপালিকের কথা শোনা গিয়েছে।” (২৩৮)

M. R. James-এর ‘Casting the Runes’ গল্পের আরেকটি উপাদান ব্যবহার করেছেন হেমেন্দ্রকুমার। হেমন্তর কৌশলে শেষ রাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে একজটা স্বামীর দানব। হেমন্ত বলছে যে সে দানব বিফল হলেও তার মৃত্যুক্ষুধা নাও কমে থাকতে পারে। ফলে নিজের সৃষ্ট দানবের হাতে ইউরোপের মধ্যযুগীয় যাদুকরের মতো প্রাণ দিতে হ’তে পারে স্রষ্টাকেই। বিদেশী গল্পটিতে কাহিনীর খলনায়ক ‘রুন’ ব্যবহার করে এক অদ্ভুত জীব সৃষ্টি করে এবং তার বিরাগভাজন ব্যক্তির পেছনে তাকে লেলিয়ে দেয়। যতক্ষণ হতভাগ্য ব্যক্তির কাছে খলনায়কের লেখা ‘রুন’লিপি থাকবে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার আপাত-অপঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত। হন্তারক জীবটিকে বিফল করার একমাত্র উপায় কালান্তক ‘রুন’লিপিটি খলনায়ককে তার অজান্তে তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। আশা দেবী (আশাপূর্ণা নন) James-এর গল্পটির একটি মোটামুটি চেনা যায় এমন রূপান্তর করেছিলেন। রক্তলিপি নামে এই বইটিতে লেখিকা James-এর আরো একটি গল্পের (‘Lost Hearts’) সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন, ফল হয়েছে বেশ হাড়-হিম করা! কিন্তু অভিশপ্ত লিপিটি খলনায়কের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াটা—যা ইংরেজি গল্পটিতে রুদ্ধশ্বাসে পড়তে হয়—যেন বড় বেশি সহজে করে ফেলা হয়েছে।

হেমেন্দ্রকুমার এই পথেই হাঁটেন নি। দানবকে হেমন্ত প্রতিহত করেছে প্রেততত্ত্ব ব্যবহার করেঃ

“প্রেততত্ত্ববিদরা যখন ‘চক্রে’ বসেন, তখন ঘর করে রাখেন অন্ধকার বা প্রায়ান্ধকার। তাঁদের মতে, যে শক্তিকে তাঁরা চোখের সামনে শরীরী দেখতে চান, তার উৎপত্তি হয় ইথারের কম্পন (vibration of ether) থেকে। সাধারণ আলোক সে সইতে পারে না, ফ্ল্যাশ-লাইটের মতো অতি প্রখর আলোকের তো কথাই নেই।” (২৩৯)

ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে হেমন্ত শুধু দানবকে প্রতিহতই করে নি, গোয়েন্দার কাজে অপরিহার্য চাক্ষুষ প্রমাণ হিসেবে তার প্রতিকৃতি বন্দী করেছে ওই ক্যামেরার কারাগারে। প্রতিহত দানব ফিরে গিয়ে সংহার করে তার স্রষ্টা এবং তার চ্যালাচামুণ্ডাদের। আর তার মূর্তি হ’লো মানুষের দেহে সিংহের মুণ্ড! হতভম্ব রবীন বলে যে ভগবান তো নৃসিংহরূপ ধারণ করেছিলেন পাপীকে শাস্তি দেবার জন্য। প্রত্যুত্তরে হেমন্ত বলেঃ “এ মূর্তি ভগবানের নয় রবীন, এ কেবল সেই মূর্তির বাইরের খোলস! এর মধ্যে আত্মাও ছিল না, পরমাত্মাও ছিলেন না, ছিল কেবল দুরাত্মার দুরন্ত ইচ্ছাশক্তি!” (২৪২)

তার কুকর্ম সিদ্ধ ক’রে, স্রষ্টাকে সংহার করে, সে মূর্তি এখন অন্তর্হিত হয়ে গেছে ভাবের রাজ্যে, হাওয়ায় মিশে গিয়েছে।

মরণ-খেলার খেলোয়াড়ে, আপনাদের মনে থাকবে, মাণিক যখন অতিপ্রাকৃত ব্যখ্যার পক্ষে তার অকাট্য যুক্তিগুলি খাড়া করেছিল, তখন জয়ন্ত চরম বিরক্তি প্রকাশ করে, এবং যে মানুষগুলির নিখোঁজ হওয়ার ব্যাখ্যা একমাত্র অলৌকিকতা অবলম্বন করেই সম্ভব, তাদের হিসেবের বাইরেই করে দেয়। বিভীষণের জাগরণে অবিশ্বাস এসেছে এই জুটির মধ্যে যে মাণিকের মতো, সেই রবীনের দিক থেকে। হেমন্তের পাঠাগারে তাকে প্রেতবিদ্যাচর্চায় মগ্ন দেখে রবীন প্রথমে উক্ত বিদ্যাকে “রাবিশ” বলে অভিহিত ক’রে, আর যখন হেমন্ত রবীনকে প্রেতাত্মাদের ফোটো দেখায়, পরম তাচ্ছিল্যের স্বরে রবীন সেগুলিকে বলে, “জাল”। ক্রুদ্ধ হেমন্ত রবীনকে প্রশ্ন করে যে সে খ্রিস্টধর্মকে জাল মনে করে কিনা। উত্তরে রবীন বলে যে বিশ্বাস না করা আর ‘জাল’ বলা এক কথা নয়, সে খ্রিস্টধর্মের ভালোমন্দ জানে না বলে তা বিশ্বাস করে না। হেমন্ত প্রত্যুত্তরে প্রশ্ন করে যে তাহ’লে প্রেততত্ত্বে রবীনের ঠিক খ্রিস্টধর্মের মতোই বিশ্বাস নেই বলে সে ফোটোগুলোকে জাল বলল কোন যুক্তিতে। এর পর একাধিক পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক, রাসায়নিক, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, ও লেখকদের—যাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রেততত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন—নামোল্লেখ ক’রে হেমন্ত বলে, “যা জান না, তাকে অবহেলা কোরো না। ও বাহাদুরি নয়, ও মূর্খতা।” (২২৬)

হেমেন্দ্রকুমার জয়ন্তকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছেন, এমনকি মুক্তমনা বিমলের চেয়েও এগিয়ে গেছেন হেমন্তের চরিত্রচিত্রণে। আধুনিক যুগে গোয়েন্দা গল্পে অলৌকিকতা বোধহয় অজানা নয়, যেমন William Hjortsberg,-এর Falling Angel উপন্যাসে, কিন্তু ডিটেকটিভ গল্পের যে স্বর্ণযুগের প্রভাবে হেমেন্দ্রকুমার ও তার সমসাময়িকেরা লিখছিলেন, সেই যুগের দিকপালেরা কিন্তু তাঁদের গল্পে গোয়েন্দাদের যুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান ও অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছিলেন। কোনান ডয়েল বা আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা বনাম ভৌতিক গল্পগুলি এখানে স্মর্তব্য।

যে তিনটি উপন্যাস নিয়ে লিখলাম, একবার সেগুলির দিকে তাকানো যাক। অমাবস্যার রাতে শার্লক হোমসের জনপ্রিয়তম উপন্যাস, The Hound of the Baskervilles-এর template-টি নিয়ে কিন্তু উপসংহারে কোনান ডয়েলকে পুরো উল্টে দিলেন হেমেন্দ্রকুমার। অলৌকিক পশুটি যে অলৌকিকই, তার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মোহনলালরূপী বিমল বলল যে, চাইলে, যারা মায়াব্যাঘ্রের কথা অস্বীকার করতে চায়, তারা তা করতেই পারে! মরণ-খেলার খেলোয়াড়ে রুদ্ধমন জয়ন্ত মাণিকের সমস্ত যুক্তি অকাট্য দেখে আশ্রয় নিল এই কথায় যে বস্তুবাদী ব্যাখ্যার জগতে মাণিকের চিন্তার ঠাঁই নেই। কিন্তু নমস্য ডিটেকটিভ The Sign of Four-এ স্পষ্ট বলেছেন, when you have eliminated the impossible, whatever remains, however improbable, must be the truth. জয়ন্তের কীর্তিতেই আমরা জেনেছি যে জয়ন্তের আদর্শ শার্লক হোমস। এবং তাকে চেপে ধরলে জয়ন্ত বলবে যে শার্লক হোমসের জগতে অলৌকিকতার কোন স্থান নেই, সবই supernatural explained যেমন The Hound of the Baskervilles বা ‘The Sussex Vampire’. কিন্তু শেষ বিচারে শার্লক হোমসের যোগ্য ভাবশিষ্য বিমল, এবং তার চেয়েও, হেমন্ত।

আমি বিভীষণের জাগরণকে হেমেন্দ্রকুমারের, এবং বাংলা, তথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ রহস্যকাহিনীর মধ্যে স্থান দিতে চাই। অন্য দুটি কাহিনীতে, পাশ্চাত্য রীতি মেনে হেমেন্দ্রকুমার দ্ব্যর্থতার উপস্থিতি রেখেছেন, এই তৃতীয় উপন্যাসে কিন্তু হেমন্তের ভাষায় তিনি “সকল সন্দেহ ধূলোর মতো উড়িয়ে” (২৩৮) দিয়েছেন। এখানে আবার যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ ব্যবহার হয়েছে অলৌকিকতা যে এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য তা প্রমাণ করার জন্য। হেমন্তর বক্তব্য থেকে বিস্তৃতভাবে উদ্ধৃতি এখানে দেওয়া প্রয়োজনঃ

“… কোনও কিম্ভূতকিমাকার প্রেত যে মানুষের হুকুমের দাস হয়ে যেখানেসেখানে নরহত্যা করে বেড়ায়, প্রেতবিজ্ঞান আজ পর্যন্ত তার দৃষ্টান্ত দেয় নি। সুতরাং ... রামাশ্যামা, যদু-মধু যেসব তথাকথিত কাল্পনিক ভূতের ভয়ে রাত্রে লেপমুড়ি দিয়ে কেঁপে মরে, আমাদের হত্যাকারী সে শ্রেণীর অন্তর্গত নয়। প্রেততত্ত্ববিদরা চক্রে বসে যেসব দুরাত্মার শরীরী প্রকাশ দেখেছেন, এই হত্যাকারী তাদের দল থেকেও আত্মপ্রকাশ করেনি। মোট কথা একে প্রেতাত্মাই বলা চলে না।

“... হঠাৎ একটি নতুন তথ্য পেলুম।

“অনেক বিখ্যাত প্রেততত্ত্ববিদের মত হচ্ছে, বিভিন্ন ভাবের আর চিন্তারও বিশেষ-বিশেষ রূপ আছে। গভীর ধ্যান বা প্রবল ইচ্ছাশক্তির দ্বারা বিশেষ-বিশেষ ভাবরূপকে মূর্তিমান করা যায়।” (২৩৭-২৩৮)

M. R. James-এর ছোট গল্পে ছিল যাদুলিপি দিয়ে অলৌকিক হত্যাকারী এক সত্তাকে জাগ্রত করে তাকে দিয়ে বিরাগভাজন মানুষের আপাত-অপঘাতে বিনাশ। এই প্রচ্ছন্ন দ্ব্যর্থতাকে একেবারে প্রকট অলৌকিকতাতে পরিবর্তন করে, হিন্দু পৌরাণিক উৎস ব্যবহার, তার সঙ্গে তৎকালীন প্রেততত্ত্বের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে হেমেন্দ্রকুমার রচনা করেছেন এমন এক ‘ডিটেকটিভ’ গল্প যা আমার কাছে গোয়েন্দা কাহিনীর ইতিহাসে যুগান্তকারী।

[১] https://www.wired.com/beyond-the-beyond/2019/01/s-s-van-dines-twenty-rules-writing-detective-stories/ 16 Feb. 21

[২] রচনাবলী ২য় খণ্ড, সম্পাদনায় গীতা দত্ত (এশিয়া, কলকাতাঃ ১৯৭৬, ৫ম মুদ্রণ ১৯৮২) ৯-৮৩।

[৩] শ্রী অভিরূপ মাশ্চরক সর্বপ্রথম আমাকে বোঝান কিভাবে বিলিতী supernatural explained-এর ধারাটি – আপাত অলৌকিককে আসলে মানুষের কারসাজি বলে প্রতিপন্ন করা, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ কোনান ডয়েলের Hound of the Baskervilles –হেমেন্দ্রকুমার উল্টে দিয়েছেন অমাবস্যার রাত উপন্যাসে।

[৪] রচনাবলী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, সম্পাদনা গীতা দত্ত ও সুখময় মুখোপাধ্যায় (এশিয়াঃ কলকাতা, ১৯৮৪) ১৪৭-২০৬।

[৫] কিশোর ভৌতিক সমগ্র, ১ম খণ্ড (পত্র ভারতীঃ কলকাতা, ২০০৫, পুনর্মুদ্রণ ২০০৮) ২৯০-২৯৬।

[৬] সুমন বিশ্বাস মশায় মন দিয়ে আমার এই শখের ধারাবাহিক লেখাটি পড়ে আমাকে মনে করান শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শৈল রহস্য’ গল্পটির কথা। যে ব্যোমকেশ বরদাকে এককালে বলেছিল যে ভূতকে সে তার হিসেবের বাইরেই রাখতে চায়, সেই ব্যোমকেশ নির্দ্বিধায় অজিতকে চিঠিতে ভূতের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তার পরিবর্তিত মনোভাব জানাচ্ছে! সুমনবাবুকে আমার অনেক ধন্যবাদ।

[৭] রচনাবলী, ১৬শ খণ্ড, সম্পাদনা সম্পাদনা গীতা দত্ত ও সুখময় মুখোপাধ্যায় (এশিয়া, কলকাতাঃ ১৯৯৭) ১৯২-২৪২।

[৮] আশা দেবীর রক্তলিপি বই-আকারে প্রকাশিত হয় আশুতোষ লাইব্রেরী থেকে। এছাড়া, আনন্দ পাবলিশার্সের আনন্দ পূজাবার্ষিকীতে কোন এক বছরে এটি পাওয়া যাবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, আর কোন তথ্য আমার কাছে নেই।

[৯] https://sherlock-holm.es/stories/pdf/a4/1-sided/sign.pdf 17, 16 Feb. 21

  


(শেষ)



(পরবাস-৮২, ১৪ এপ্রিল, ২০২১)