ISSN 1563-8685





|| ৫ ||


রাহুলের ডায়েরি থেকেঃ

“... আমাদের ক্লাসে, (অর্থাৎ আমার আর পলাশের ক্লাসে) দুই ভাই-বোন পড়ত। শিউলি আর বুড়ো। বুড়োর ভালো নাম বাদল, সবাই বুড়ো বলেই চিনত তাকে। ভাই বোন দুজনেরই মাথাটা খারাপ ছিল একটু। শিউলি একটু বেশি পাগল। ভুলোভালা পাগল। সারাক্ষণ একটা বোকা বোকা হাসি। মাঝে মাঝে হঠাৎ অভিমান। দু-পায়ে দু-রঙের মোজা পরে সে স্কুলে আসত। মাঠে দাঁড়িয়ে চিলদের ডেকে খাবার খাওয়াত। কবিতা মুখস্থ বলতে বললে এমন লজ্জা পেত যেন সিনেমায় অভিনয় করতে বলা হচ্ছে। দুটো চুলের ঝুঁটিতে দু-রঙের রিবন বেঁধে সে দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলত। প্রথম প্রথম খেপে গিয়ে যদুবাবু বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দিতেন। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে খিক খিক করে হাসত। শেষপর্যন্ত একদিন যদুবাবু বললেন—তোর মাথায় গোলমাল আছে নাকি রে? সমস্ত ক্লাস অবাক হয়ে শুনল শিউলি ফিক করে হেসে জবাব দিচ্ছে—আপনার দয়ায়!

যদুবাবু সেই যে রেগে গিয়ে চুপ করলেন (জলধরের ভাষায় ক্যান্টাকুলাস রাগ), তারপর থেকে আর কথাই বলেননি শিউলির সাথে।

আলোচ্য চরিত্রটি হলো শিউলির ভাই বুড়ো। শিউলির চেয়ে এক বছরের ছোটো। বুড়ো পাগল হলেও আমাদের বন্ধু ছিল। বুড়োর খামখেয়ালগুলো শিউলির চেয়ে কিছু কমই ছিল। হাসির রোগটা ছিল। বুড়ো খেলাধুলো করত না খুব একটা। মাঝে মাঝে হৈ হৈ করে মাঠে নেমে বারবার হ্যান্ডবল করে সবার কাছে গাল খেত। বুড়ো বিখ্যাত হয়েছিল প্রাইমারি ক্লাস থেকে মিডল ক্লাসে ওঠার সন্ধিক্ষণে। পাঁচ ক্লাসে। শিউলির মতোই একটি ক্যান্টাকুলাস ব্যাপার ঘটিয়ে। ক্লাস নিচ্ছিলেন রঞ্জনা দিদিমনি। তখন তাঁর এতটা বয়েস হয়নি। দেখতে শুনতে বেশ।

কী একটা কথায় হঠাৎ বুড়ো দেখি হাত তুলেছে। সাধারণত সে হাত-ফাত তোলে না। চুপচাপই থাকে। আরো কিছু ছেলেমেয়ে হাত তুলেছিল, রঞ্জনা দিদিমনি বুড়োকে উৎসাহ দেবার জন্যে বললেন—তুমিই বলো বাদল।

বুড়ো উঠল। কেউ ভাবেনি এমন কিছু হবে। ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল বুড়ো। তারপর ঠান্ডা স্বরে একটি পালটা প্রশ্ন করল।

—আচ্ছা, আপনি কি কুমারী?

সেই আরেক ক্যান্টাকুলাস কাণ্ড। রঞ্জনা দিদিমনি বুড়োকে চুলের মুঠি ধরে সিট থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে নিজের ডেস্কের উপর তার মাথাটা ঠুকছেন। শাড়ির আঁচল-ফাঁচল খুলে গিয়ে লটপট করছে। ওরকম চমৎকার মিষ্টি মহিলার ওই রূপ দেখে আমরা ছেলেরাই ভয়ে দেয়ালের চেয়ে সাদা হয়ে গেছিলাম। রঞ্জনা দিদিমনির নাম হয়ে গেল রণচণ্ডী দিদিমনি।

পরে আমরা বুড়োকে বললাম—তুই কি খ্যাপা নাকি রে? কপালে সিঁদুর নেই, কুমারী ছাড়া আর কী?

বুড়ো বলল—ওটাই মিস করে গেছিলাম। এ ভুল আর হবে না...”


***********


রাহুলের ডায়েরি থেকে:

“...সেই বুড়োর ছিল অঙ্কের মাথা। লাইব্রেরি ঘেঁটে বাংলা হরফে লেখা কেশবচন্দ্র নাগের বই থেকে ভীষণ শক্ত সব অঙ্ক করত সে বসে বসে। দিল্লী বোর্ডে ওসব লাগে না। লাগলেও ক্লাস সিক্সের ছেলেদের জন্য নয়।

ক্লাস এইটে বুড়োরা বদলি হয়ে চলে গেল। যাবার আগে সে বনমালীর কাছে তার অক্ষয় কীর্তির দুটো নমুনা রেখে গেছিল। বনমালীকে খুবই ভালোবাসত বুড়ো। বলেছিল—এগুলো রাখ। একদিন কাজে লাগবে তোর।

অনেক দিন পরে বনমালী এসব অমূল্য জিনিস দেখিয়েছিল আমায়। তখন আমি আর বনমালী একসঙ্গে কুসঙ্গে মিশছি। দুজনে দুজনকে চোখে চোখে রাখি। পাছে পতনের পথে একজন আরেকজনকে পিছু ফেলে এগিয়ে যায়। সন্ধেবেলা ঘরের ভিতর আলো জ্বেলে দেখিয়েছিল দুটো নক্সা। খুবই বিষণ্ণ ছিল। আমি বোধহয় দু-ফোঁটা চোখের জলও ফেলেছিলাম হারানো বন্ধুদের উদ্দেশ্যে। বনমালী অবশ্য জন্মতঃ কাঁদে না।

বড়ো সাদা কাগজে দুটি পিরামিডের নক্সা। অনেক মাথা খাটিয়ে বুড়ো বানিয়েছিল নাকি। কাগজের তলায় খুদে খুদে অক্ষরে অঙ্ক কষা আছে।

বনমালী আঙুল দিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল—এই দ্যাখ। পিরামিডের জমির ক্ষেত্রফলের সঙ্গে পৃথিবীর আয়তন এবং সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব গুণ করলে তা ঠিক পিরামিডের আয়তনের সঙ্গে সূর্যের আয়তন গুণ করলে যা হয় তার সমান। কিম্বা পিরামিডের দেয়ালের আয়তনের বর্গমূলের সঙ্গে পিরামিডের উচ্চতার যোগফল সৌরমণ্ডলের ব্যাসার্ধের ঠিক এক-কোটি ভাগের এক ভাগ।

বাংলায় লেখা সব। বাংলা বই থেকে জ্যামিতি পড়ত বুড়ো।

আরো আছে। পিরামিডের জানলাগুলো এমন বসানো যে অক্ষাংশ অনুযায়ী পিরামিডকে বিশেষভাবে দাঁড় করালে ঠিক বেলা বারোটার সময় পিরামিডের ভিতরে শুধু একটি পাথর ছাড়া আর সব কিছু অন্ধকার হয়ে যাবে। সেই পাথর সরালেই নিচের গর্ভগৃহে যাবার রাস্তা।

এরকম ছত্রিশটা সূত্র মেনে তৈরি করা হয়েছে নক্সাগুলো। অথচ পিরামিড দুটো দেখতে একেবারেই আলাদা হবে। সব দিক থেকেই সমান কিন্তু সাদৃশ্য দেখতে গেলে চোখ বুজে অঙ্কের চোখ নিয়ে দেখতে হবে।

বনমালী বলল—একেবারে আসল পিরামিডের মতো জটিল। কোনো দিক থেকেই তার চেয়ে কম নয়। অথচ সাইজে খুব ছোটো। দু-তলা বাড়ির সমান।

আমি বললাম তাহলে তো আমরাই বানাতে পারি।

বনমালী বলল—সিরিয়াসলি নিচ্ছিস নাকি? পাগলার কাণ্ড। অঙ্কটা ঠিকই আচ্ছে। চেক করে দেখেছি। স্মৃতি হিসেবে রেখেছি। মাঝে মাঝে দেখি।

আমি বলেছিলাম—বানালেই বা ক্ষতি কী? সারাজীবন ধরে পয়সা জমাব। তারপর মরলে সব নিয়ে পিরামিডের ভিতর। সল্টলেকে মায়ের জমি আছে তিন কাঠা। দেশ-দেশান্তর থেকে লোক আসবে দেখতে। কটা বাঙালির পিরামিড হয়? ভালো হবে না?

আইডিয়াটা মনে ধরেছিল বনমালীর। বলল—একটা তোকে দিতে পারি তাহলে। তোর আর পলাশের বিয়ের যৌতুক।

তখনও সেরকমই হবে বলে ঠিক ছিল। পলাশ আর আমার বিয়ে হবে এ-বিষয়ে সন্দেহ ছিল না আমাদের। প্রত্যাখ্যান করেছিল পলাশ। কিন্তু আশা ছেড়ে দেবার মতো কিছু নয়। মনে হয়েছিল, খেলাচ্ছে। খেলাতে খেলাতে ঠিক ধরে নেবে। দেবুদার কথা একবারও ওঠেনি তখন।

বনমালী ফরাশখানা থেকে ফটোকপি করে দিয়েছিল সেই রাত্রেই। অরিজিনালটা দেয়নি। সেটার অন্য মূল্য আছে। তাছাড়া আমি ভীষণ জিনিস হারাই।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে, নেশা ছুট। দুজনেই হাসাহাসি করলাম। কপিটা বনমালী আর ফেরৎ চায়নি। আমিও দিইনি।

সেই নক্সা এখন আমার বিছানার তোষকের নিচে। বনমালী জানে না। সন্দেহ করতে পারে। রেখে দিয়েছি গুপ্তধনের মতো। ভাবলাম পলাশকে ফুলশয্যার রাতে দিয়ে বলব-লেট্‌স ডু ইট...”


***********


রাহুলের ডায়েরি:

“...লেট্‌স ডু ইট। এমন কিছু একটা করি, যাতে আমাদের ভালোবাসা অমর হয়ে যাবে। জীবনের কাছে, মৃত্যুর কাছে এও তো এক অগ্নিপরীক্ষা। আয় অগ্নিপরীক্ষা দিই।

এখন সেই কথাটাই দেবুদা বলবে। অনেক বেশি মানাবে দেবুদাকে। অনেক সুন্দর হবে সেই বলা। পলাশ হাসবে না। বলবে না—আর কবিতা ফলাস না রাহুল! বরং মন দিয়ে শুনবে। চোখ বড়ো বড়ো করে।

ওদের বিয়েতে কিছু দেব না। কোনো মূল্যবান ক্রকারি সেট নয়। মহার্ঘ্য ফুলদানি নয়। রবি ঠাকুরের জীবনচরিতও নয়। এমন কিছু নয় যা আমারও থাকবে। থাকতে পারে। বা সকলেরই থাকে।

পিরামিডের নক্সাটাই দেব। ওদের পিরামিড হোক। ওদের হোক সুখের সংসার। বাবুই পাখির বাসা। ভবিষ্যৎ। নীড়।

অমরতা ওদের। সৌভাগ্য। ওদের হবে ননদ, ঠাকুরপো, শালা-শালী। জামাইষষ্ঠী। অন্নপ্রাশন। সাধ। গা গুলিয়ে উঠবে বাচ্চা হবার আগে। ওদের জন্য সৌরমণ্ডলের ব্যাসার্ধ অতল হয়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করবে পিরামিডের। রামতেতো বিয়ার খেয়েছি এক বোতল। তাই গা গুলোবার কথা তুললাম।

আমার কিছু হবে না। পিরামিড তো নয়ই। আমি থাকব নর্দমার আবর্জনার মতো। সভ্যতা থেকে দূরে। শূকরের পানীয়ের মতো।

ছোটো কবর হতে পারে। সাত ফুট বাই তিন ফুট। মাটির নিচে, স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারে। সম্ভবত কোনো শেয়াল-ডাকা জঙ্গলের কাছে। গালিবের কবরের থেকে দূরে।

চাঁদের আলোয় মাটি থেকে উঠে এসে বসব সেই মসৃণ কবরের উপর। কোলের উপর পোষা হায়নার নরম শরীর। হাত বুলোচ্ছি। ফলক থেকে ধরে ধরে, একা-একা পাঠ করছি নিজের এপিটাফ—

এক মুঠি ছাই
যদি উড়ে যাই
উড়ে গিয়ে পড়ি
তোমাদের ঘরে
আঁচলের ঘায়ে
আবার উড়িও...
সেন্টিমেন্টাল পদ্য বনমালীকে দেখানো যায় না। নিরাশ হয়ে পড়ে। ভীতু বলে গালাগাল দেয় ..."


**************


রাহুলের ডায়েরি থেকে:

“...বাড়ি ফিরবার পথে পলাশ স্কুটারে উঠে মুখ গোঁজ করে রইল। আমি বললাম—আচ্ছা যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর!

পলাশ হঠাৎ নরম হয়ে বলল—লাভ কী হলো বল? মাঝখান থেকে এতগুলো মিথ্যে কথা বললি। এরপর কেউ তোর কোনো কথা বিশ্বাস করবে?

না করলে তাদেরই ক্ষতি। পলাশকে এসব বোঝানো আমার কম্ম না। আমি চুপ করেই রইলাম।

আশ্চর্য! আমি কি সত্যি কথা বলি না? অধিকাংশ সময়েই তো সত্যি বলি! দু একবার বানিয়ে বললেই কি অ্যাভারেজ খারাপ হয়ে গেল নাকি?

পরে পলাশ বলল - আচ্ছা দেবুদা তোকে ফিস ফিস করে কী বলছিল?..”


*****************


রাহুলের ডায়েরি থেকে:

“...দেবুদার সঙ্গে তার পিসি এসে হাজির। আচ্ছা জুলুম নয়? পলাশকে চোখের ইশারায় অনেকবার বোঝাবার চেষ্টা করলাম - অ্যাবর্ট অ্যাবর্ট! কিন্তু সে আমাকে উপেক্ষা করে যখন বসেই রইল তখন অগত্যা আমিও দেবুদার পিসিমার কাছে পলাশকে ভালোভাবে ইন্ট্রোডিউস করাব বলে বসে গেলাম। পিসিমাকে একটু নার্ভাস মনে হচ্ছিল, সেটা কাটিয়ে দেবার জন্য যেই বলেছি - আপনাকে কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে, অমনি জবাব এল - পাকামো করিস না রে, আমি বম্বে থেকে এসেছি। এটা শুনে আমার চড়াং করে রাগ হয়ে গেল এবং বলতে বাধ্য হলাম যে বম্বেতে আমিও প্রায়ই যাই। পিসিমা চ্যালেঞ্জ করে জানতে চাইলেন - বম্বেতে কোথায় থাকিস? তো পলাশের ভয়ংকর ভুরু কোঁচকানো অগ্রাহ্য করে আমি পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বললাম - কেন? মিঠুনদার বাড়িতে!

দেবুদা বলল - বলো কী? মিঠুন চক্রবর্তী?

আমি বললাম - ভয়ানক স্নেহ করেন আমায়। আর কোথাও উঠতে দ্যান না। মিঠুনদার একটা ছোট সাদা রঙের পিকিনিজ কুকুর আছে দেখেছেন?

— ন্‌-ন্‌-না - মানে থাকলেও আমরা লেবার ক্লাস লোক জানব কী করে বলো?

— কী তার নাম গেস করুন?

— এটা আমি বলে দিতে পারি। পিসিমা উৎসাহের সঙ্গে বললেন। - জিমি নিশ্চই?

— রাহুল।

— তোমার নামে কুকুর পুষেছেন মিঠুন? আর তা সত্ত্বেও তুমি ওদের বাড়ি উঠছো?

— আহ, আপনি যা ভাবছেন তা নয় দেবুদা। এটা ভালোবাসার নিদর্শন।

পরে পলাশ যখন নিজের আসল কথাটা নিবেদন করবে করবে করেও পিসির ভয়ে করে উঠতে পারছে না আর পিসি প্রায় বিয়ের তারিখ ঠিক করতে চলেছেন তখন আমি কাঁটা চামচ সরিয়ে রেখে রেফারির মত পিঁ পিঁ করে বাঁশি বাজিয়ে বললাম - হোল্ড ইট হোল্ড ইট, এ বিয়ে এখন হতে পারে না।

শুনে পলাশও ভড়কে গেছে দেখলাম। পিসিমা বললেন - কেন? তুই ওর গার্জেন?

— আমার মা প্ল্যানিং কমিশনে খুব উঁচু পোস্টে আছেন।

— তার মানে? তাতে আমাদের কী?

— এত তাড়াহুড়ো করায় মা-র মত নেই। পলাশের রেজাল্ট কেমন হয়েছে আপনারা জানেন?

— জানি। ফার্স্ট ডিভিশান পেয়েছে।

— বিয়ে হলে সেটা রাখতে পারবে না। ওর বাবা-মায়ের ইচ্ছে এম-এস-সি করুক।

— আমার দুটো পি-এইচ-ডি আছে সেটা জানিস কি? তার একটা এজুকেশানে। এ বাড়িতে মেয়েদের আমরা পি-এইচ-ডি না করিয়ে থামাই না। সে খবর রাখিস? আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি ওর রেজাল্ট বিয়ের পর আরো ভালো হবে।

— আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি এখন বিয়ে হলে পলাশ ফেল করবে। একটা এমন বিশ্রী উদাহরণ হবে যে আমাদের ব্যাচের আর কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চাইবে না।

ফাইট ভালোই জমে উঠেছিল এমন সময় বোকার মত পলাশ বলে উঠল - দূর, আমি কখনোই ফেল করব না।

এরপর পিসি উঠলেন বাথরুম খুঁজতে। পলাশ সাহায্য করতে গেল। দেবুদা আমায় বলল - আমি একদম তাড়া দিচ্ছি না বুঝলে। ডবল পি-এইচ-ডি-ই করে নিক না হয়। দশ বিশ বছর লাগে লাগুক। তবে পিসিমা সেন্সিটিভ আছেন একটু।

— সেটাই দেখছি। কেন বলুন তো?

— আসলে পি-এইচ-ডি করতে গিয়ে দুটো ভাল পাত্র ফস্কে গিয়েছিল কিনা। তারপর আর বিয়েই হয় নি। ওভার কোয়ালিফায়েড বলে।

— আই সি।

— আমি অবশ্য চাই পলাশ যতটা সময় চায় নিক। ইতিমধ্যে বরং তোমরা পিসিমার জন্যই একটা পাত্র দেখে দাও।

শুনে আমি হা হা করে একটু সবে হাসতে শুরু করেছি কি দেবুদা গলাটা নামিয়ে বলল - তুমি কি কখনো মিথ্যে বলেছ রাহুল?

— দু-একবার মুখ ফস্কে বলে থাকতে পারি। কেন জিজ্ঞেস করছেন বলুন তো?

— কারণ ওরা ফেরার আগে তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই? যদি তুমি সত্যি বলতে না পারো তাহলে জবাব দিও না।

— প্রশ্নটা কী?

— পলাশের কি কোনো প্রেমিক আছে? সে কি বিয়েটা তার জন্য পিছোচ্ছে?

আর কী, ভূত দেখার মত চমকে গিয়ে মারাত্মক বিষম খেলাম।

জল-টল খেয়ে, মাথায় গাঁট্টা মেরে, ধাতস্থ হতে এতটাই সময় লাগল যে ততক্ষণে পলাশরা এসে হাজির। পিসিমা এসেই বললেন - পলাশের সাথে আমার খুব ভালভাবে কথা হয়ে গেছে। এই বছরে বিয়ের ডেট খুঁজছি না। নেক্সট ইয়ারেই হবে। তার বেশি দেরি করতে হবে না। পলাশও রাজি।

দেখি পলাশ কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। অর্থাৎ তার অমত নেই।

ভালই হল। আমাকে কিছু বলতে হল না। আমি মনে মনে দেবুদাকে বললাম - এই তো পেয়ে গেলেন আপনার প্রশ্নের উত্তর।..."


*********


রাহুলের ডায়েরি থেকে:

"... হয়নি। কিন্তু হতেও পারত। পলাশ মানতে চাইলেই হতো। চায়নি। তাই শুধু গল্প।


দুই রাহুলের গল্প


দেবুদা বলছিল—তোমার নামে কুকুর পুষলো কেন বলো তো? আমি বললাম—সে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কুলু মানালীতে শীতকালে শুটিং হচ্ছে। একটাই বড়ো হোটেল। মিঠুনদা উঠেছেন। ডাইরেক্টর, ড্যান্স ডাইরেক্টর, ফাইট ডাইরেক্টর এরাও সব উঠেছে। ইউনিটের লোকেরা এদিক ওদিক ছোটো ছোটো মোটেলে জায়গা করে নিয়েছে। আমরা ছিলাম হিল ভিউ-তে। দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে। শীত পড়েছে বেশ, কিন্তু বরফের দেখা নেই।

দেবুদা বলল—মিঠুনের সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল?

আমি বললাম—সে তো হবেই। আসতে, যেতে দেখা হত। কেশরের ঢাবায় এসে অমলেট খেতে ভালোবাসতেন। আমরা গলা ফাটিয়ে বাংলায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। মিঠুনদা বাইরে থেকে যেতে যেতে এক রাতে চেঁচিয়ে বললেন—কথা কম, কাজ বেশি। ব্যস আমরা হিরো হয়ে গেলাম। ঢাবার মালিক আমাদের টেবিলে এসে গলা নিচু করে বলছে—মিঠুন চক্রবর্তী ক্যায়া বোলা আপলোগোঁ কো? আমরা বললাম—বেশি করে খেতে বলেছেন, যাতে মাস্‌ল হয়। দো দো অমলেট অউর লে আও।

—কিন্তু রোমাঞ্চকর ঘটনাটা ঘটল একদিন সকালে। শুটিং-এর সময়ে। বশিষ্ঠ্‌ বলে একটা জায়গা আছে। মানালী থেকে কিছুটা দূরে। হট স্প্রিং রয়েছে প্রচুর। সেখানে যাবার পথে একটা পাহাড়ি ঝরনা পড়ে। রাস্তা থেকে একটু দূরে। বরফ নেই, তাই গানের সিন তোলা যাবে না। কিন্তু একটা ফাইট সিন বোধহয় তোলা যেতে পারে। এই ঠিক করে ওখানে ইউনিট নিয়ে গিয়েছে ফাইট ডাইরেক্টর। মিঠুনদা কালো চামড়ার জ্যাকেট আর কালো চশমা পরে ইজিচেয়ারে বসে পাহাড় দেখছেন। পাশে মিমো খেলা করছে, যোগিতা-বৌদি উল বুনতে বুনতে রোদ পোয়াচ্ছেন। সঙ্গে একটা সাদা, ছোট্ট, কুটকুটে কুকুর।

দেবুদা বলল—রাহুল!

আমি বললাম—তখনও নামকরণ হয়নি। মিঠুনদা খুব কুকুরের ভক্ত জানেন তো। কুকুরটা স্থানীয়। মিঠুনদার পছন্দ হওয়াতে ফ্যানেরা প্রেজেন্ট করে দিয়েছে। এদিকে হয়েছে কি, খেলতে খেলতে হঠাৎ কুকুরটা পা পিছলে পাহাড়ি ঝরনার জলে ঝপাং করে পড়ে গেছে। সবাই গেল গেল বলছে। হুলুস্থুল কাণ্ড! মিমো তো জলে ঝাঁপ দেয় আর কি!

—তারপর? পিসি জিজ্ঞেস করলেন- তুইও ঝাঁপ দিলি জলে?

—আরে না। বললাম আমি। ডাউনস্ট্রিমে ছিলাম তো! কুকুরটা ভেসে আসতেই একটা পা বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে। মোজা খিমচে ধরে উঠে এল। খুবই বুদ্ধিমান কুকুর। এখানকার কুকুরদের মতো নয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমিই স্লিপ করে জলে পড়ে প্যান্ট-ট্যান্ট ভিজিয়ে ফেললাম। মিঠুনদা যোগিতা-বৌদি, মিমো, সবাই খুব খুশি। ফাইট ডাইরেক্টর বললেন—বোম্বেতে চলে এসো। কাজ দেব। একসাথে বসে লাঞ্চ খেলাম। মিমো তো ছাড়তেই চায় না। যোগিতা-বৌদি বললেন—রাত্রে ডিনারে এসো আমাদের হোটেলে। কিন্তু আমি যেতে পারলাম না।

—তুমি মিঠুনের সঙ্গে ডিনার অ্যাাপয়েনমেন্ট মিস করলে? পিসি-কেও অবাক করে দিয়েছি ততক্ষণে।

আমি বললাম—ভীষণ জ্বর হয়ে গেল। সর্দির ধাত আছে তো। ওরকম হাড়কাঁপানো শীতে ভিজে গায়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। ডিনার খাব কি? হুঁশই নেই প্রায়। রাত্রিবেলা দেখি বড়োসড়ো একটা হাত মাথায় বুলোচ্ছে কেউ। বিলি কেটে দিচ্ছে। আমি ভাবলাম বনমালী। বললাম—খেয়েছিস? জবাব এল হুম। গলাটা একটু ভারি শোনাল। আমি কাৎরে উঠে বললাম—আমার ডিনারটা গেল রে। ওরকম কি আর কোনোদিন খেতে পাব? ভারি গলায় আবার জবাব এল—কথা কম, কাজ বেশি। ডিনার পালিয়ে যাচ্ছে না। এখন ঘুম।

পাক্কা তিনদিন জ্বরে পড়ে রইলাম। মিঠুনদা যোগিতা-বৌদি শুটিং-এর ফাঁকে ফাঁকে এসে খোঁজখবর নিতেন। ফলের টুকরি রেখে যেতেন। সেসব আমার বন্ধুরা খেত। তারপর সেরে উঠে রোজ দুপুরে মিমোর সাথে ওদের হোটেলে গিয়ে খেলতাম। যোগিতা-বৌদির সাথে গল্প করতাম। মিঠুনদা ঘরে এলেই গম্ভীর ভাবে বলতেন—কথা কম কাজ বেশি। তাই নিয়ে হাসাহাসি করতাম বৌদি আর আমি। শুটিং-এর শেষ দিন দারুণ ডিনার পার্টি হলো। ফিল্মের হিরোইন কিমি কাটকার হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন—রাহুল একটি প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ বিপন্ন করেছে। লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলমেন, প্লিজ গিভ হিম আ বিগ হ্যান্ড। পটপট করে তালি পড়ছে। তখন মিঠুনদা হলের মাঝখানে এসে বললেন—আজ থেকে এই কুকুরটার নাম হলো রাহুল। যাতে ও কোনোদিন না ভোলে কে ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। আবার গড়গড় করে হাততালি। তারপর কিমিদি দুই রাহুলের কপালে দুটো করে চুমু দিলেন। রাহুলের কানে কানে বললেন—আই লভ্‌ ইউ।

পিসি বললেন—কিমি তোকে এসব বলেছে? গুল দিস না রাহুল।

আমি বললাম—আমাকে নয়। অন্য রাহুলকে।

সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দেবুদা বলল—অন্য রাহুলের বয়েস কত এখন?

আমি বললাম—পাঁচ। প্রত্যেক জন্মদিনে ছবি পাঠায় ওরা।

আরো অনেক কিছু বলার ছিল। অনেক দায়িত্ব ছিল আমার কাঁধে।


(সমাপ্ত)


*********


রাহুলের ডায়েরি থেকেঃ

“...পরে পলাশ বলল—আচ্ছা দেবুদা তোকে ফিস ফিস করে কী বলছিল?..”

আমি বললাম-দেবুদা আমার কানে কানে বলল, তোমার পলাশকে চাই, রাহুল। ওকে মানালীতে, ঝুরো ঝুরো বরফের মধ্যে লগ কেবিনে আগুন জ্বালিয়ে কুস্তি করতে নিয়ে যাব। পলাশের কি তা ভালো লাগবে না, বলো?

পলাশ বলল—আবার গুল?

কিন্তু দেবুদার চোখে সেই ফায়ারপ্লেস-এর শত শত চেলাকাঠের আগুন পলাশও দেখেছিল।

আমি পলাশকে বললাম—কী শুনতে চাস বল। যদি বলি দেবুদা বলেছে-বিয়েটা পিছোতে দিও না রাহুল...?

কেমন হলো পলাশ? কোনো জবাব জোগালো না তো মুখে। এটা তাহলে বিশ্বাসযোগ্য হলো কি? কাঁটা দিয়ে উঠল গায়ে? সবাই তোর বিয়ে দিতে চায়। কী করে ঠেকাব আমি? আমিও তাতে খুশিই।

তোদের সঙ্গে হনিমুনেও যাব। নেপালী দারোয়ান হয়ে। শেরপা রাহুল থাপা। তোদের লগ কেবিনের বাইরে কুড়ুল দিয়ে দুইঞ্চি করে চিরে রাখব কাঠ। সকালে দরজার বাইরে পাবি সাজানো ব্রেকফাস্ট। কফি-পট। দেবুদা তোকে মাঝে মাঝে বকবে নিশ্চয়ই। তখন তোর মন ভালো করতে আসব আমি। সারা দুপুর কার্পেটের উপর শুয়ে পাহাড়ের গল্প করব দুজন। গল্প শোনাব বলেই তো বসে আছি।

যখন ইচ্ছে। যত চাই... ”


**********

(ক্রমশ)



(পরবাস-৭২, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮)