ISSN 1563-8685




কোথাও জীবন আছে

।। ৯ ।।

“আমি জানতে চাই তুমি ছুটির সময়েও একটা দিন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না কেন?”

“আর কতবার বলব তোমাকে? স্কুল খোলবার দিন থেকে পরের টু উইকস আমাদের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা চলবে। তার একটা প্রিপারেশান নেই? তাছাড়া, তোমার সঙ্গে দেখা করা মানে তো তোমার এন্টায়ার ফ্রেণ্ড সার্কলের সঙ্গে হইহই করা। সেটা করার মতো সময় বা ইচ্ছে, কোনোটাই আমার নেই।”

“তোমারই বা সব সময় এত একা একা দেখা করার কি আছে তিলোত্তমা? য়ু আর বিয়িং রিডিক্যুলাসলি পজেসিভ!”

“পজেসিভ হলে আমি বাড়িতে বসে থাকতাম না, সর্বক্ষণ তোমার সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকতাম। আমি তো আর দেখা করবার জন্য চব্বিশ ঘন্টা ফোন করছি না, তুমি করছ। তাও আবার তোমার বন্ধুদের সঙ্গে হ্যাং আউট করার জন্য।”

“আমার বন্ধুদের সঙ্গে তোমার প্রবলেমটা কোথায় আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড। ওরা জাস্ট তোমাকে দেখতে চায় —”

“কেন? তোমার প্রত্যেকটা বন্ধু আমাকে দেখেছে, চাক্ষুষই হোক কি ফোটোতেই হোক। আবার দেখাদেখির কি আছে? আমি কি চিড়িয়াখানার জানোয়ার নাকি যে লোকে আমাকে টিকিট কেটে দেখতে আসবে?”

“য়ু আর আন্‌বিলিভেবল! একটা সামান্য জিনিসকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ইস্যু না বানালে তোমার শান্তি হয় না, না? য়ু আর টকিং অ্যাবাউট মাই ফ্রেণ্ডস হিয়ার।”

“য়ু আর নট দি ওনলি ওয়ান উইথ ফ্রেণ্ড্‌স। বন্ধু আমারও আছে, আর তাদের সঙ্গে আমি হ্যাং আউট করতে যাচ্ছি শুনলে তোমার বিরক্তির শেষ থাকে না।”

“ওয়েল আই অ্যাম জাস্ট নট ইন্টারেস্টেড ইন দেম দ্যাটস অল।”

“দ্য ফিলিং ইজ মিউচুয়াল, রাহুল। আমিও তোমার বন্ধুদের ব্যাপারে একটুও ইন্টারেস্টেড নই। কিন্তু মুশকিলটা হল, তুমি আমার পছন্দ-অপছন্দের দিকটা পরোয়াই করো না! তোমাকে কিভাবে বললে তুমি বুঝবে বলো তো, যে দিস ইজন্ট ওনলি অ্যাবাউট য়ু —”

“ওকে, এনাফ। আমি এইটুকু জানতে চাই, যে আজ তুমি আসছ কিনা।”

“তোমার বন্ধুরা কেউ না থাকলে তবেই যেতে পারি।”

“ফাইন। আমার পাড়ার সি.সি.ডি-তে সাড়ে পাঁচটার সময় চলে এসো। রাখছি,” এই বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে লাইন কেটে দিল রাহুল। সেলফোনটা আছড়ে ভাঙতে ইচ্ছে করল তিলোত্তমার। কেউ কি তাকে শান্তি দেবে না?

অথচ এক হিসেবে দেখতে গেলে, এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবার জন্য কেউ তাকে মাথার দিব্যি দেয়নি। রাহুলের সঙ্গে দৈবাৎ দেখা হয়েছিল তার, বাবার এক কলিগের বাড়ির পার্টিতে। দে আঙ্কল নিজেই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন, “দিস ইজ মাই সান রাহুল, হি ইজ স্টাডিইং টু বী অ্যান ইঞ্জিনিয়ার অ্যাট জে. য়ু.।” বাবাও তখন পাশে দাঁড়িয়েছিল। নীচু গলায় জানিয়ে দিল যে ছেলে নাকি পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট, জয়েন্টে খুব টপ র্যাাঙ্ক ছিল, ভবিষ্যৎ একেবারে সোনার মতো উজ্জ্বল। অর্থাৎ, এই ছেলের সাথে বন্ধুত্বে বাবার কোনো আপত্তি নেই। তিলোত্তমা মনে মনে তিক্ত হেসেছিল। বাবা একজন চুড়ান্ত সফল কন্‌সাল্‌ট্যান্ট লইয়ার। উকিলি বুদ্ধি তার শিরায় শিরায় সঞ্চারিত। সঠিকভাবে, সঠিক জায়গায়, সঠিক জিনিসটাকে লগ্নি করাটাকে একটা মহৎ শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে এতদিনে। তিলোত্তমার ক্ষেত্রে বিষয়টা মার খেয়ে গিয়েছিল প্রথমে। সে ছেলে হলে অঙ্কটা অন্যরকম হত। যেমন হয়েছে কাকানের ক্ষেত্রে। কাকান পড়াশোনা শেষ করতে একটু সময় নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি দেরি নেই। শিগ্‌গিরই বিদেশযাত্রার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে, এবং ফিরে এসেই তাদের ফার্মের এক অংশীদার হয়ে বসবে কাকান। তিলোত্তমা মেয়ে — সে লম্বা রেসের ঘোড়া হতে পারবে না। তবে ছোটবেলায় বাবা একবার তার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিল, তাকে লগ্নি করতে হবে অন্যভাবে, অন্য জায়গায়। সেইদিক থেকে তিলোত্তমা যথেষ্টই দামী।

সেদিন সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এক লহমায় এতগুলো কথা মনে হয়েছিল তার। আরও মনে হয়েছিল, তার বয়সী ছেলেমেয়েদের মতিগতি নিয়ে মা-বাবারা সর্বক্ষণ চিন্তায় থাকেন। বিশেষতঃ মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে গিয়ে তো কত লোকের রাতের ঘুম চলে যায়। কিন্তু তার বাবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বেশ সহজেই একটা অপরিচিত লোকের সামনে রীতিমতো ইঙ্গিতপূর্ণভাবে এগিয়ে দিচ্ছে তাকে।

তিলোত্তমার মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে, সে যদি সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে কোনো বড় রকম কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে বসে কখনোও, তাহলে কি তার বাবার হিসেবগুলো ছত্রখান করে দেওয়া যাবে? তার কৌতুহল হয়, তবে প্রবৃত্তি হয়না।

অন্য দিন হলে হাজার প্ররোচনা সত্ত্বেও তিলোত্তমা বাবার কলিগের কোনো সোনার চাঁদ ছেলেকে গ্রাহ্য করত না। বড় হওয়ার অনেক আগেই সন্দেহ-রোগে ধরেছে তাকে; যাচাই করে না নিয়ে কাউকেই সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে না সে। কিন্তু সেইদিন ওই একটিবারের জন্য অসাবধান হয়েছিল সে। কথায় বলে, রূপে অন্ধ। তিলোত্তমাকে রূপে অন্ধ করা অসম্ভব বলেই হয়তো রূপের একটা বিপরীত এসে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দিয়েছিল তাকে!

এক কথায় বলতে গেলে রাহুলের চেহারাটি অতি কদাকার। ওকে এক নজরে দেখে তিলোত্তমার ফ্রাঙ্কেন্‌স্টাইনের তৈরি সেই প্রাণীর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। বইয়ে ছিল, একজন রূপবান অতিমানব বানানোর আশায় প্রথাগতভাবে সুন্দর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তাঁর প্রাণীর দেহটা গড়েছিলেন ফ্রাঙ্কেন্‌স্টাইন। কিন্তু সে জেগে উঠতেই দেখা গেল তার মুখশ্রী আপাতভাবে নিখুঁত হলেও, তা বীভৎসদর্শন। রাহুলের যেন হুবহু সেই দশা। গায়ের রঙ ফর্সা, কিন্তু দেখে মনে হয় যেন মরা মানুষের বর্ণ; চোখের দৃষ্টি অস্বচ্ছ; দাঁত নিখুঁতভাবে পাটিধরা, কিন্তু হাসলে মনে হয় যেন বাঁধানো দাঁত পরে আছে। হঠাৎ দেখলে মনে হতেই পারে যে ও ঈশ্বরসৃষ্ট মানুষ নয়, কলের পুতুলের মতো কৃত্রিম একটা জিনিস। তিলোত্তমার নিজের পরিবারে এমন কেউ নেই যে সুন্দর নয়। ছোটবেলায় ঠাকুরদা-ঠাকুমাদের মুখে শুনত, বিয়ের ব্যাপারে নাকি তাদের পরিবারে অনেক কিছুতে ছাড় ছিল, কিন্তু সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে লেশমাত্র আপোস চলত না। চার পুরুষ ধরে নাকি সেই নিয়মই চলে আসছে। জিনের প্রভাব যাবে কোথায়! বাবা-মা, জেঠু-জেঠিমা, পিসিমণিরা, কাকান, পিসতুতো আর জ্যাঠতুতো ভাইবোনেরা, সবাই সুন্দর! এমনকি আয়নায় মুখ দেখার সময়ও সৌন্দর্য পিছু ছাড়ে না তার। কিন্তু এই সুন্দর দেখতে মানুষগুলোকে সে যতই জেনেছে, ততই সে টের পেয়েছে যে তাদের মনের চেহারাগুলোর সঙ্গে তাদের খোলসের চেহারাগুলোর কোনো মিল নেই। অনেক ধরণের পরিবারের কথা শুনেছে তিলোত্তমা, কিন্তু তাদের মতো অহংকারী, স্বার্থান্বেষী, ঈর্ষাপরায়ণ পরিবার যে হতে পারে, সে না দেখলে বিশ্বাস করত না। এমনকি আত্মীয় বলেও কেউ কাউকে রেয়াত করে না।

সৌন্দর্যকেই তাই সবার আগে অবিশ্বাস করতে শিখল তিলোত্তমা। ডোরিয়ান গ্রে-র গল্পটা থেকে থেকে মনে পড়ত তার। সৌন্দর্যের বিনিময়ে নিজের আত্মাকেও বিক্রি করতে রাজি ছিল ডোরিয়ান। তাই তার প্রত্যেকটা কুকর্মের ছাপ গিয়ে পড়তে লাগল নিজের মুখে নয়, এক শিল্পী বন্ধুর আঁকা তারই এক প্রতিকৃতির উপর। সব সুন্দর মানুষকে দেখলেই তিলোত্তমার মনে হয়, কে জানে, কোন গোপন কুঠুরিতে সে নিজের এক পচাগলা প্রতিকৃতি লুকিয়ে রেখে দিয়েছে! সে নিজেকে দিয়ে তার এই ধারণার সত্যতা বুঝতে পারে। মনের ভিতরের এই যে এত অন্ধকার; কই, একদিনের জন্যেও তো প্রতিফলিত হয় না তার মুখে!

কিন্তু রাহুল যেন তিলোত্তমার মতো মানুষদের উলটো পিঠ। রাহুলকে দেখে তার মনে হয়েছিল, এই ছেলেটা একটা খোলা খাতার মতো; তা সে ভালই হোক, কি মন্দই হোক। এরকম একটা মুখের দিকে তাকিয়ে কারোর মনেই মানুষটা সম্পর্কে কোনো প্রত্যাশা তৈরি হয় না। এ ছাড়া, রাহুলকে প্রশ্রয় দেবার আরেকটা গূঢ় কারণও ছিল। তিলোত্তমা জানত, এই একটা ব্যাপারে কাকান তার কাছে একেবারে জব্দ হয়ে যাবে। যেখানে স্বয়ং বাবার প্রচ্ছন্ন সম্মতি আছে, সেখানে হাত দিতে যাওয়ার সাহস শৌর্য্য দত্তর নেই। সত্যি বলতে কি, শুধুমাত্র কাকানকে দমিয়ে দেবার জন্যই যেন সেদিন আগ্রহের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গিয়েছিল সে। রাহুল যে আলাপ করতে মুখিয়ে আছে সেটা বুঝতেও তার কোনো অসুবিধে হয়নি।

কি কথা হয়েছিল সেদিন তা মনে নেই। কিন্তু তার যে রাহুলের কথাবার্তা এবং ব্যবহার খুব ভাল লেগেছিল, এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত। বেশিরভাগ ছেলেদের চোখে-মুখে একটা নির্লজ্জ ক্ষুধার্ত ছাপ দেখতে পেত সে; কিন্তু রাহুল ব্যতিক্রম ছিল। সে যে তিলোত্তমাকে দেখে মুগ্ধ তা গোপন করার কোনো চেষ্টা সে করেনি। কিন্তু তার ব্যবহারে ওইদিন কি তার পরেও কখনোও শালীনতার অভাব দেখেনি সে। কিন্তু তার বদলে যেটা গজিয়ে উঠল, তা হয়তো আরও মারাত্মক।

কিছুদিন পরেই তিলোত্তমা আবিষ্কার করল, রাহুল তাকে চেনবার-জানবার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করে না। তার সঙ্গে যতবারই একা একা বেরিয়েছে, ততবারই মনের মধ্যে অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। যে কোনো সম্পর্কেই কথোপকথন যে একটা জরুরি বিষয়, সেটা রাহুলের জানা আছে বলে মনে হয় না। সে কখনোও তাকে কুশল-প্রশ্ন করেনা, তার দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে চায় না, তার ইচ্ছে-অনিচ্ছে, ভাল-লাগা–মন্দ-লাগা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবার চেষ্টা করে না। তিলোত্তমা ক্রমশই বুঝতে পারল, সে রাহুলের বন্ধু নয়; বরং যেন একটা স্টেটাস সিম্বল। রাহুলের বন্ধুমহলে সে একটা প্রদর্শনীর বস্তু। প্রথম প্রথম বুঝেও বুঝতে চাইতনা। ইদানীং কেমন একটা রোখ চেপে গেছে; এই গল্পটারও শেষ না দেখে সে ছাড়বে না।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে বেশ অস্বস্তি বোধ করছিল তিলোত্তমা। মা আর কাকান চোরা চোখে তাকাচ্ছিল বার বার, বাবার মুখ থমথমে। নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে; কিন্তু কী, সেটা এখনই ঠাওর করা গেল না। কাকান যে নানাভাবে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কটা আরও বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তা তিলোত্তমার জানতে বাকি নেই। কিন্তু গত কয়েকদিনে তো তেমন কিছু ঘটেনি, যেটা কাকান কাজে লাগাতে পারে? তবে তার অনুমান যে সত্যি, তা কিছুক্ষণ পরেই ধরা গেল। বইখাতা নিয়ে বসতে না বসতেই মা দরজার কাছে এসে বলল, “মিঙ্কু, তোর বাবা ডাকছে।”

“কেন?”

“তা কি করে জানব? স্টাডিতে আছে, গিয়ে দেখ কি ব্যাপার।”

বাবার সঙ্গে তিলোত্তমার বিশেষ কথা হয়না। তার উপর ঠিক কাজে বেরোবার আগেই যখন তলব করে পাঠিয়েছে, তখন সিরিয়াস কিছু ব্যাপার। অর্থাৎ তিলোত্তমার সারাটা দিন তিক্ত হয়ে উঠবে এবার। নিঃশ্বাস ফেলে স্টাডির দিকে পা বাড়ালো সে।

বাবা ব্যস্তভাবে ফাইলপত্র ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল। তিলোত্তমা দরজার কাছে এসে বলল, “ডেকেছিলে?”

বাবাকে দেখে মনে হল যেন তিলোত্তমাকে আদৌ ডাকেইনি। তার দিকে প্রথমটা যেন অবাক হয়ে তাকাল, তারপর বেশ খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করে, শেষ অবধি যেন কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেই বলল, “বোসো।”

“আমি ঠিক আছি। কি বলবে বলো।”

“তুমি বুবাইয়ের সঙ্গে এত মিসবিহেভ করো কেন?”

“মানে?”

বাবা গম্ভীরমুখে বলল, “মানেটা কি তুমি ভালোই জানো।”

“না, জানি না,” তিলোত্তমা তীক্ষ্ণভাবে বলে, “পরিষ্কার করে বলো কি বলতে চাও।”

“আমি অনেকদিন ধরেই কম্‌প্লেন শুনছি। বুবাই শান্ত, ও মুখ ফুটে কিছুই বলে না। কিন্তু তোমার মা পুরোটাই দেখতে পায়। বুবাই ঘরে ঢুকলে তুমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাও, মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দাও, এসব কি? এমনকি এর মধ্যে একদিন ওর বন্ধু এসেছিল বাড়িতে, তার সঙ্গেও —”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও,” তিলোত্তমা বাবাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে, “গত একমাসের মধ্যে তো কাকানের কোনও বন্ধু বাড়িতে আসেনি। কার কথা বলতে চাইছ তুমি?”

বাবাকে একটু অপ্রস্তুত দেখালো এবারে। যে লোকটা দিনের অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে কাটায়, তার পক্ষে তো এইসব খুঁটিনাটির হিসেব রাখা সম্ভব নয়। তাও সামলে নিয়ে বলল, “কেন, তোমার মা-ই তো বলছিল, একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল, কাকানের এক বন্ধু ভিজে ভিজে এসেছিল...”

এবারে মনে পড়ল। সেই ঝড়বৃষ্টির দুপুরে হঠাৎ এসে পড়া অদ্ভুত লোকটার কথা বলছে বাবা। কিন্তু... সে তো অনেকদিনের ব্যাপার। তার কথা এখন উঠছে কেন? পরক্ষণেই আসল কারণটা বোধগম্য হল তিলোত্তমার। সেই দিনের ব্যর্থ আক্রমণের কথাটা কাকান ভুলতে পারেনি। কিন্তু এই কি প্রতিশোধ নেবার নমুনা — বাবার কান ভাঙানো? সত্যি, কাপুরুষতার সীমা থাকে একটা!

সে ঠাণ্ডাভাবে বলল, “সেদিন মা বাড়ি ছিল না। তোমাকে কি একটা ফাইল পৌঁছে দিতে গিয়েছিল। যতক্ষণে ফিরেছে, ততক্ষণে কাকানের সেই বন্ধু চলে গিয়েছিল। তাহলে মা কি করে জানল যে আমি ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি?”

বাবার অস্বস্তিটা বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে এবার। উত্তরটা যেন ঠিক করে গুছিয়ে উঠতে পারল না, “না — মানে এই ব্যাপারটা তোমার মা —”

“কাকানের কাছ থেকে শুনেছে, তাইতো? আসলে যা যা নালিশ, সেগুলো কাকানেরই কথা, মা শুধু সেগুলো তোমার কান অবধি পৌঁছিয়ে দিয়েছে। অ্যাম আই কারেক্ট?”

“কে কি বলেছে সেটা বড় কথা নয়,” বাবার গলার আওয়াজ এবারে চড়ে ওঠে, “বড় কথাটা হচ্ছে —”

“বড় কথাটা হচ্ছে, কে সত্যি বলছে, আমি, না কাকান।”

বাবা স্তম্ভিত হয়ে বলল, “তুমি বলতে চাও বুবাই মিথ্যে কথা বলছে?”

“বলতে চাইছি না,” তিলোত্তমা শান্তভাবে উত্তর দেয়, “ঠিক সেটাই বলছি। শুধু আমার ব্যাপারে কেন, কাকান আরও অনেক ব্যাপারে তোমার কাছে প্রতি মুহূর্তেই মিথ্যে বলছে। কিন্তু তুমি আর মা দুজনে এতটাই অন্ধ, কেউ চোখে আঙুল দিয়ে সেটা দেখিয়ে দিলেও তোমরা সেটা স্বীকার করবে না।”

বাবার মুখটা রাগে গন্‌গন্‌ করছে। তীব্রভাবে বলল, “একদম বাড়াবাড়ি করবে না, বুঝতে পেরেছ? আমার নিজের ছেলে থাকলেও আমি বুবাইকে তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম। ওর সম্পর্কে কোনোরকম অপমানজনক কথা আমি অন্ততঃ সহ্য করব না। য়ু বেটার বিহেভ ইয়োরসেল্‌ফ, নাহলে —”

“নাহলে কী?”

চাঁচাছোলা প্রশ্নটা শুনে বাবা থমকে যায়। তিলোত্তমা আগে কখনোও বাবার সঙ্গে এতটা উদ্ধতভাবে কথা বলেনি। কিন্তু সে ইতিমধ্যে টের পেয়েছিল যে কাকান একটু তফাতে দাঁড়িয়ে তাদের কথাবার্তা শুনছে। সে যে পুরোপুরি অসহায় নয়, সে কথাটা কাকানকে একবার না বুঝিয়ে দিলে চলছে না।

“নাহলে করবেটা কী?” তিলোত্তমা আবার বলে, “বাড়ি থেকে বের করে দেবে? পড়াশোনা বন্ধ করিয়ে দেবে? দিতে পারো। আমার আঠারো বছর পুরতে আর ছটা মাসও বাকি নেই। তারপর যে আমি ফিন্যানশিয়ালি ইন্‌ডিপেন্‌ডেন্ট হয়ে যাচ্ছি, সেটা নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে?”

মাথায় বাজ পড়লেও বোধহয় এতটা চমকাত না বাবা। বিস্ফারিত চোখে তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু।

তিলোত্তমা মৃদু হেসে বলল, “তুমি ভেবেছিলে আমি কিছুই জানি না। কি করে ভাবলে? ঠাকুরদা অত কাঁচা কাজ করার মানুষ ছিলেন না। আমি জানি, কাকান তোমার ছেলে, ওর ভালমন্দ নিয়েই তোমার যত চিন্তা। তুমি সবকিছুতেই ওকে সাপোর্ট করবে, ওর সব কথা বিশ্বাস করবে। সে ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা আমাকেই ভাবতে হয়। তাই আমিও তোমাকে বলে দিচ্ছি, আমার কোনও ব্যাপারে তোমার ইন্টারফেয়ার করার দরকার নেই। বিশেষ করে আমাকে শাসন তো একদমই করতে এসো না, তাতে তোমাকেই অপমানিত হতে হবে।”

বাবা ভীষণ চেঁচিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে মশ্‌মশ করতে করতে বেরিয়ে গেল। তিলোত্তমা ঘরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে দেখল, কাকান ওর দিকে তাকিয়ে আছে, চোখদুটো বাঘের চোখের মতো ধ্বক্‌ধ্বক্‌ করছে। তিলোত্তমা সরল না; কাকানের চোখের উপর চোখ রেখে দাঁড়াল। কাকান বিনা বাক্যব্যয়ে নীচে নেমে গেল। তিলোত্তমার আজকের অস্ত্রটা তাকে সাময়িকভাবে অন্ততঃ কাবু করে দিয়েছে।

*

সি.সি.ডিতে ঢুকে আরও একবার ধাক্কা খেল তিলোত্তমা। রাহুল যে তার কথার কোনও দাম দেয়না সে আগেই জানত, কিন্তু এরকম অম্লানবদনে মিথ্যে বলবে তাও সে ভাবেনি। দরজার বাইরে থেকেই দেখতে পেয়েছিল, সোফায় গা এলিয়ে বসে রাহুল একটা ছেলে আর একটা মেয়ের সঙ্গে হাসিগল্পে মশগুল হয়ে আছে। ছেলেটাকে চেনে; রাহুলেরই য়ুনিভার্সিটির এক জুনিয়ার, রুদ্ররূপ ভট্টাচার্য্য। ওদের পরস্পরের গলায় গলায় ভাব, কিন্তু তিলোত্তমা একে সহ্য করতে পারে না। মেয়েটাকে অবশ্য নতুন দেখছে। ওকে দেখতে পেয়ে রাহুল ওয়েটারকে ডাকার ভঙ্গিতে হাত তুলে বলল, “হিয়ার, তিলোত্তমা।”

তিলোত্তমার একবার মনে হল, চলে যায়। তারপরেই ভাবল, না, ব্যাপারটা কতদূর গড়ায় সেটাও দেখা দরকার। টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমি ভেবেছিলাম তুমি একা আসবে।”

সে দেখতে চাইছিল রাহুলের মুখে সামান্যতম অপরাধবোধের চিহ্ন ফুটে ওঠে কিনা। রাহুল অবশ্য নির্বিকার।

“কি করি বলো, বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি, এরা সব হাজির হল তখনই। একেবারে সঙ্গে নিয়ে চলে এলাম।”

“ইস্‌, কাবাব মে হাড্ডি হয়ে গেলাম রে আমরা!” রুদ্র গা-জ্বালানো হাসি হাসল একটা।

“তিলোত্তমা, মীট মাই ফ্রেন্ড শুচি —”

“রিয়া,” মেয়েটা কথা কেড়ে নিয়ে বলল, “আই প্রেফার রিয়া, ওটা আমার ডাকনাম।”

তিলোত্তমা কিছু না বলে মাথা নাড়ল শুধু। আসলে বলার মতো কিছু খুঁজেই পাচ্ছিল না সে। হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত লাগল। আজ সকাল থেকে একটার পর একটা ঘটনা ঘটেছে। ভেবেছিল আজ অনেকদিন পর রাহুলের সঙ্গে বাড়ির দম-বন্ধ-করা পরিবেশের বাইরে কিছুটা সময় কাটাতে পারবে। মনের কথা বলবার মতো সম্পর্ক নয় তাদের; তবু অবান্তর কথা বলেই না হয় সাময়িকভাবে সব কিছু ভুলে থাকা যেত। অতটা আশা করাই ভুল হয়েছে। মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। বিনা বাক্যব্যয়ে সোফায় বসে পড়ল সে। বাড়ি ফিরে যাওয়ার থেকে বোধহয় এই ভাল। রিয়া এতক্ষণ তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, এবার মুখ টিপে হেসে বলল, “আই ক্যান সী তোমরা দুজন আমাদের গ্রুপে এত পপুলার কেন হয়ে উঠেছ।”

তিলোত্তমা কথাটা ধরতে না পেরে বলল, “কে পপুলার হয়ে গেছে?”

“কেন, তোমরা দুজন! তুমি আর রাহুল, আই মীন।”

“... পপুলার কেন?”

রুদ্র হো-হো করে হেসে উঠল, “তিলোত্তমা ইজ ফিশিং ফর কম্‌প্লিমেন্টস!”

“না, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। পরিষ্কার করে বলবে প্লিজ?”

“না, মানে তোমার ইথিরিয়াল বিউটির কথা তো এখন আমাদের গ্রুপের হট টপিক, তাই আর কি ...” খিল্‌খিল্‌ করে হাসতে লাগল রিয়া। তিলোত্তমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। আবার! এই মেয়েটা তার সঙ্গে আলাপ করতে আসেনি, তাকে পরখ করতে এসেছে মাত্র। দুনিয়াটাকে ভস্ম করে দেবার মতো একটা রাগ তার মাথার দুপাশে দপ্‌দপ্‌ করতে লাগল। রাহুলও বোধহয় এতক্ষণে টের পেয়েছে যে ব্যাপারটা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। গলা ঝেড়ে বলল, “স্টপ ইট্‌ রিয়া, য়ু আর এম্ব্যারাসিং হার।”

“এম্ব্যারাসিং?” রিয়া ভুরু বাঁকিয়ে বলল, “আমাকে কেউ এরকম কম্‌প্লিমেন্ট দিলে আমি তো বর্তে যেতাম রে!”

“ওসব বাজে কথা,” রুদ্র তার কফির গ্লাসের উপরের ক্রীমটা তারিয়ে তারিয়ে খেতে খেতে বলল, “মেয়েরা নিজেদের চেহারা নিয়ে প্রশংসা শুনতে হেবি ভালবাসে। ইনি আবার একটু আঁতেল কিনা, তাই গম্ভীর হয়ে থাকার ভান করেন। মনে মনে যে লাড্ডু ফুটছে সে কি বুঝছিনা ভেবেছিস?”

এই কথার পরে তিলোত্তমা হয়তো কফি-ভর্তি গেলাসটাই ছুঁড়ে মারত রুদ্রর দিকে। ভাগ্যিস ঠিক সেই সময়ই দরজার দিকে চোখ চলে গেল।

কাকানের সেই বন্ধুটা ঢুকছে। একে উপলক্ষ্য করেই সকালের বিপত্তির সূত্রপাত। পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিল তিলোত্তমা। এই ছেলেটা নিমিত্তমাত্র। আসল ঝামেলাটা তো কাকান তৈরি করেছে। এ নিশ্চয়ই সে ব্যাপারে কিছুই জানে না। ... কিন্তু তাই বলেই যে সে খুব নিরাপদ এমনটা ভাবার কোনোও কারণ নেই। ...


ছেলেটার নামটা মনে করতে করতেই দেখল, দরজার হাতল ধরে সেও দাঁড়িয়ে পড়েছে, চোখের দৃষ্টি তিলোত্তমারই উপরে। একটু পরেই তার মুখে চিনতে পারার হাসি ফুটে উঠল। তিলোত্তমা কিছুটা স্বভাববিরুদ্ধভাবেই হাত নাড়ল তার দিকে। ধৃতিমান এগিয়ে এসে স্মিতমুখে জিজ্ঞেস করল, “ভাল?”

“হ্যাঁ। আপনি এখানে?”

“ওই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট রক্ষা করতে। আপনার কি আড্ডা সেশান?”

“... হ্যাঁ, সেরকমই।”

“শৌর্য্য ভাল তো?”

তিলোত্তমা একটু থমকে গিয়েও সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ। ভাল।”

ধৃতিমান এক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কী একটা বলতে গিয়েও বলল না। তারপর হেসে মাথা নেড়ে বলল, “আর ইন্টারাপ্ট করছি না। টাটা।”

ধৃতিমান অন্য টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। বাকিরা এতক্ষণ ওদের দুজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। এবারে রিয়া চোখ গোল গোল করে বলল, “তোর বন্ধু?”

“না। আমার কাকুর বন্ধু।”

রাহুল একটু ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করে বলল, “ওর কাকু খুব ইয়াং, হি ইজ আ পি.এইচ্‌.ডি স্টুডেন্ট অ্যাট সি.য়ু —”

“মাই গড্‌!” রিয়া যেন রাহুলের কথা শুনতেই পেল না, “কি ব্রেথটেকিংলি হ্যান্ডসাম রে বাবা! নাম কি ওর?”

“ধৃতিমান।”

“তোকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ করছিল কেন রে লোকটা?” রুদ্র হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।

তিলোত্তমা প্রশ্নটার তাৎপর্য ধরতে না পেরে একটু অবাকভাবেই বলে, “... কারণ... আসলে আমাদের সেভাবে আলাপ নেই, তাই আই গেস... কেন?”

রুদ্র কিছু না বলে বাঁকা হাসি হাসতে লাগল। রাহুল এবারে আর না থাকতে পেরে বলল, “কি হয়েছেটা কি রুদ্র? হোয়াট দ্য হেল আর য়ু স্মার্কিং অ্যাবাউট?”

রুদ্র হাসিটা বজায় রেখেই বলল, “আমি ভাবছিলাম।”

“কী ভাবছিলি?”

“ভাবছিলাম যে, রিয়া ইজ্‌ রাইট। দ্যাট্‌ গাই ইজ্‌ কোয়াইট গুড-লুকিং। তোর একটা সাংঘাতিক কম্পিটিটর হতে পারবে। বিওয়্যার, বুঝলি রাহুল, তিলোত্তমা যেন হাতছাড়া না হয়ে যায় দেখিস!”

এই বলে রুদ্র আবার হাসতে লাগল। তিলোত্তমা দেখল, রিয়া উদ্বিগ্নভাবে রাহুলের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। রাহুলের মুখ সত্যি সত্যিই অন্ধকার হয়ে উঠল। তিলোত্তমা একবার ভাবল, একটা উত্তর দেওয়া কি সমীচীন হবে? কিন্তু তার পরেই মনে হল, দরকার নেই। আজকে রাহুল তার সঙ্গে যে ব্যবহারটা করেছে, তার পর তো এটা তার প্রাপ্য। সে সোফার ভিতর আরও খানিকটা তলিয়ে গিয়ে বলল, “যা বলেছ।” এতে রুদ্রর হাসি থামল বটে, কিন্তু রাহুল সারা বিকেল গোঁজ হয়ে বসে রইল। তিলোত্তমা তাদের ফ্যাকাসে আড্ডাটার মধ্যে মধ্যেই টেবিলের দিকে লক্ষ্য করতে লাগল। দেখল খানিক পরে আর একটি ছেলে এবং বেশ মিষ্টি দেখতে একটা মেয়ে ঢুকে ওইদিকে এগিয়ে গেল। ছেলেটার মুখের আদলের সঙ্গে ধৃতিমানের এমন একটা সাদৃশ্য আছে, যে দেখলেই মনে হয় ছোট ভাই। ওদের আসতে দেখেই ধৃতিমান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটা এসে ঢিপ্‌ করে প্রণাম করতে যাচ্ছিল, ধৃতিমান হাঁ হাঁ করে ধরে ফেলে ওর মাথার চুল ঘেঁটে দিয়ে কি সব বলল। অন্য ছেলেটা পাশে চওড়া হাসি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক কী ঘটছে তা ঠাওর হল না, কিন্তু তিলোত্তমার মনটা অকারণেই ভাললাগায় ভরে উঠল। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা পারিবারিক অন্তরঙ্গতার ছাপ স্পষ্ট। ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল না সে, কিন্তু মাঝে মাঝেই দমকা হাসির আওয়াজ ভেসে আসছিল ওই টেবিল থেকে। মেয়েটা প্রথমে কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল, কিন্তু খানিক পরেই সেও হাসিঠাট্টায় মশগুল হয়ে গেল। ধৃতিমান প্রচুর খাবার অর্ডার করল ওদের জন্য; মেয়েটা বোধহয় প্রথমে আপত্তি করছিল, কিন্তু সে সব ধোপে টিকল না। প্রায় ঘন্টাখানেক পর ওরা একসঙ্গে উঠে পড়ল, তখনও সবার মুখে হাসি। তিলোত্তমা টের পেল, ধৃতিমান তার সঙ্গে দেখা হবার কথা ইতিমধ্যেই ভুলে গেছে। ছেলেমেয়েদুটোর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবারও পিছন ফিরে তাকাল না সে।


।।১০।।


নেক রাত হয়ে গেল, ঘুম আসছে না কিছুতেই। এরকম তো কখনও হয় না! অবশ্য বেশিক্ষণ এলিয়টচর্চা করতে গেলে রাতের ঘুম ছুটে যাওয়া তেমন বিচিত্রও নয়। পরীক্ষার পড়া অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু উপলার মাথায় মাঝে মাঝে মৃত সব কবিদের ভূত এমনভাবে চেপে বসে, কোন ওঝার সাধ্য তাদের তাড়ায়! কতবার ভেবেছে রাতের বেলায় কিছুতেই কবিতা পড়বে না! শুধু প্রতিজ্ঞা করাই সার; ফল কিছু হয় না। আগের বছরেও ঠিক এরকম অবস্থা হয়েছিল একবার। সেবার উইলফ্রেড আওয়েন। লোকটার জন্য নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছিল একরকম। একবার রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে ইন্টারনেট থেকে ওঁর কবিতার প্রিন্ট আউট বার করতে গিয়ে প্রিন্টারের সমস্ত কালি খরচ করে ফেলেছিল। পরদিন সকালে সেই নিয়ে যা তুলকালাম! সেদিন ভালমানুষের মতো ছোটকাকীমার কাছে চান-খাওয়ার পর্বটা সারতে হয়েছিল তাকে।

এ বছর এলিয়ট। উপলা এখনও পর্যন্ত যত কবিদের লেখা পড়েছে, তার সাথে এলিয়টের কোনোও তুলনা চলে না। সিলেবাসের বাইরেও তাঁর অনেক লেখা ইন্টারনেট ঘেঁটে বার করেছিল সে। সে সব পড়তে গিয়ে ক্রমশই আরও গভীর এক ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে। এই সময়টা যদি রনের সঙ্গে একটু আলোচনা করা যেত! রন কবে যেন একবার কথায় কথায় বলেছিল, ওর ছোটমাসী শান্তিনিকেতনে থাকেন, ওখানকার য়ুনিভার্সিটিতে পড়ান। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে ওঁর চেয়ে ভাল লোক আর কে হতে পারে! কে জানে, সেই চিঠির উত্তর এসেছে কিনা? গত একমাস ধরে তো বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তাই বন্ধ। কেন যে পরীক্ষাগুলো ঠিক ছুটির পরে পরেই ফেলল তাদের হতচ্ছাড়া ইস্কুলটা! পড়াশোনা করবার আগ্রহটাই লোপাট হয়ে যায়।

উপলা বিছানায় শুয়ে শুয়েই আবছাভাবে তার অস্বস্তির কারণটা টের পেল। তার এই ক’দিনে কেবলই মনে হয়েছে, Prufrock এবং অন্যান্য কবিতাগুলো বারবার পড়া সত্ত্বেও ঠিক যেন হৃদয়ঙ্গম করতে পারছে না। যেন তার অন্তর্নিহিত মানেগুলো ধরি-ধরি করেও হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে, বাবার বইয়ের সংগ্রহ ঘেঁটে, এলিয়ট এবং তাঁর সমকালীন কবিদের উপর প্রচুর তথ্য জোগাড় করেছে উপলা। অনেক কিছুই পড়ে তার মাথায় ঢোকেনি — ঢোকার কথাও নয় বোধহয়। কিন্তু কোথাও যেন একটা গলদ থেকেই যাচ্ছে।

আসলে সেইদিন ক্লাসে শরণ্যার অভিব্যক্তি ভুলতে পারেনি উপলা। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন তার চোখের সামনে নতুন এক জগৎ এসে দেখা দিয়েছে যা অন্য সবার কাছে অদৃশ্য। কে জানে, Prufrock পড়ে কী বুঝেছে শরণ্যা? উপলার কেন এখনও সেরকম কোনো উপলব্ধি হল না! এ.জি. বলেছিলেন, এই ধরণের কবিতার পরতে পরতে অনেকরকম মানে লুকিয়ে থাকে। ব্যক্তি-বিশেষে মানেগুলো বদলেও যায় হয়তো। তবু উপলা প্রায় নিশ্চিত, সে কবিতাটার গভীরে পৌঁছাতে পারছে না।

কে বলতে পারে, এলিয়টকে বুঝতে গেলে হয়তো মনে গঠনটাই অন্যরকম হওয়া দরকার! শরণ্যার তেমন মন, আর উপলার নয়। সেটা কি ভাল, না খারাপ? উপলা ঠিক বোঝে না। তবে এটুকু তো পরিষ্কার যে প্রত্যেকটা কবিতায় অনেকখানি অন্ধকার লুকিয়ে রয়েছে। জ্ঞানহীন মুমূর্ষু রোগীর মতো এক সন্ধ্যা-বিছানো আকাশের তলায়, ধূর্ত সব অলি-গলি পার করে প্রুফ্রক নামের লোকটা কার সঙ্গে তর্ক করতে করতে চলেছে? এ কি নিজের সঙ্গে নিজেরই বোঝাপড়া নয়, নিজের ব্যর্থতাগুলোকে নিজের কাছ থেকেই সযত্নে লুকিয়ে রাখা নয়, নিজেরই মনকে স্তোকবাক্য দিয়ে ভোলাবার চেষ্টা নয়? পার্টিতে যাওয়ার আগে, লোকসমক্ষে বেরোবার আগে নিজের একটা মুখ তৈরি করে ফেলতে চায় প্রুফ্রক্‌। সেই মুখ কি শুধুই বাইরের জগতের সামনে তুলে ধরার জন্যে? নাকি তার নিজের কাছেও? এই জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই উপলা ইদানীং একটা জায়গাতে এসেই ধাক্কা খাচ্ছেঃ তারা প্রত্যেকেই কি আসলে পরস্পরের কাছে একটা মুখোশ পরে আছে?

উপলা জানে, তার বন্ধুদের জীবনে নানারকম জটিলতা। তাদের মধ্যে শরণ্যা আর তিলোত্তমা তো অন্যতম। অবশ্য তিলোত্তমার আসল সমস্যাটা সঠিকভাবে কেউই জানে বলে মনে হয় না। তবে নিজের চেহারা নিয়ে ওকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধে ভুগতে দেখেছে উপলা, যেন সুন্দর হয়ে জন্মানোর কারণে সে সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী! কিন্তু এমন কেন হবে? সুন্দর হতে কে না চায়! তার কারণে অহংকার হওয়া ভাল নয় হয়তো, কিন্তু অপরাধবোধের কি আছে!

শরণ্যার ব্যাপারটা বুঝতে অবশ্য একটুও অসুবিধে হয়না ওর। সারা জীবন এক জায়গায় বসবাস করে তারপর হঠাৎই একটা অচেনা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাড়ি দেওয়া না জানি কতটা কঠিন! কে জানে কেন চলে এল ওরা এখানে! ... কিন্তু এইসব অভিজ্ঞতাগুলোই কি শরণ্যাকে এলিয়টের কবিতা বুঝতে সাহায্য করেছে? ও তো কবির শহরেই বাস করত এতদিন! কিন্তু, সেদিন ক্লাসের পরেই তো শরণ্যা বলেছিল, কবিতায় যে শহরটার বর্ণনা দেওয়া আছে, সেই লন্ডন তার অচেনা। পৃথিবীর যে কোনও শহরের পেটের ভিতরেই হয়তো একটা করে এলিয়টের শহর লুকিয়ে আছে। ঠিক যেমন প্রুফ্রক বাস করে আমাদের সবার মনে — একজন ভীরু, কাপুরুষ, মুখোশধারী মানুষ!

উপলা ভুরু কুঁচকে মশারির চালের দিকে তাকিয়ে থাকে। কই, সে তো মুখোশধারী নয়! সে বরাবরই স্পষ্ট কথার, স্পষ্ট আচরণের মানুষ। আজ পর্যন্ত কোনোদিন কারুর কাছে বড় কোনো মিথ্যে বলেছে, কি সত্য গোপন করেছে, কি অভিনয় করেছে, এমনটা তো মনে পড়ল না। কিন্তু আজকাল তার যেন বেশি করে মনে হচ্ছে যে তার আশেপাশের আর পাঁচটা লোকের আসল মুখগুলো আলাদা। এমনকি, মৃণালিনীর মতো একটা মেয়েও অনেক কিছুই মনের ভিতর চেপে রাখতে শিখেছে। ওর সমস্যাটা অবশ্য একটু অন্যরকম। আসলে লিনী খানিকটা দিশাহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে; যেন বিশ্বসংসারের কাছে কী চায়, তা নিজেই ভাল জানে না।

কণিষ্কর কথা তো ভাবলেই অস্থির হয়ে ওঠে উপলা। সেই জন্ম ইস্তক একটার পর একটা বেড়া ডিঙোতে হয়েছে ওকে। খুব ছোটবেলায় আবিষ্কার হয়েছিল যে ওর হৃৎপিন্ড স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই দুর্বল। এতটাই, যে শেষমেশ হয়তো পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়ে নাকি ওর মা-বাবার বিস্তর ভোগান্তি এবং খরচ হয়েছে। এইসব সমস্যার ফলে তেমন পোক্ত ছাত্র হতে পারল না কণিষ্ক। সে যে নিরেস নয় এটুকু সবাই সহজেই মেনে নিল, কিন্তু তার দাদা শাক্যর মতো উজ্জ্বল হতে পারলনা কখনোও। এবং এই উজ্জ্বল দাদার ছায়ায় অনেকটাই চাপা পড়ে গেল সে। বিশেষ করে ওদের বাবা দিনে দিনেই বড় ছেলের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে লাগলেন, তার পড়াশোনা, কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। এদিকে অবন্তিকা আন্টির কণিষ্কর দিকেই বেশি নজর ছিল। রবিন আঙ্কলের এই অবহেলা উনি মেনে নিতে পারেননি। কণিষ্কর ধারণা, এখানেই তাঁদের মনোমালিন্যের সূত্রপাত। এক কথায় বলতে গেলে, তার মা-বাবার বিচ্ছেদের জন্য কণিষ্ক নিজেকে দায়ী করে। উপলা অনেকবার অনেক যুক্তি দেখিয়েছে তাকে। কণিষ্ক সবই শুনেছে, মাথা দুলিয়েছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে তার মতের বদল হয়নি, তাও পরিষ্কার। এসব কথা ভাবলেই খুব অসহায় লাগে উপলার। সত্যি, তার আর কীই বা করার আছে?

এমনিতে ইহজগতের খোঁজ খুব কমই রাখে সে। তার একমাত্র আনন্দ হল বইয়ের জগতে নিরন্তর ভেসে বেড়ানো। তার নিজের বাড়িতেই কখন কি ঘটছে না ঘটছে, কতটুকু কানে আসে ওর? অথচ এ বাড়িতে কি লোকের অভাব! বাবা-মা বাদে বড়জেঠু-জেঠি, মেজজেঠু-জেঠি, বড়কাকু-বড়কাকী, ছোটকা-ছোটকাকী, বড়দা, সঞ্জুদা, মিঠি, পুলু — এদের কারুর জীবনে কি কোনো সমস্যা নেই? তাও কি সম্ভব? তবু উপলা কিছুই টের পায়না। হয়তো তাকে টের পেতে দেওয়াই হয় না। বাড়ির লোকেরা তার মন বুঝেই তার পরিবেশটা নির্বিঘ্ন করে রাখেন। কৃতজ্ঞ বোধ করতে গিয়েও হঠাৎ উপলার মনে হল, এই যে তার কাছে তার পরিবারের একটা শান্তিপূর্ণ ছবি তুলে ধরার প্রয়াস, এটাও তো এক হিসেবে সত্য-গোপনই বটে? তাহলে কি তার বাড়ির প্রত্যেকেও আসলে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ? উপলা এতদিন ধরে তাদের তৈরি করা মুখগুলোই দেখে আসছে? ভাবতেই মাথা ঝিম্‌-ঝিম্‌ করে উঠল তার।

অথচ মুখোশ তো কতরকম কারণেই পরতে বাধ্য হয় মানুষ। নিজেকে আড়াল করতে চাওয়া তো এক হিসেবে আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এক উপায়। উপলার অবস্থাটা কি তার মানে ভঙ্গুর? কই, এমন তো কখনোও মনে হয়নি তার। সে যেমন, পৃথিবীটাকে ঠিক তেমনটাই দেখানো যে দূর্বলতার পরিচয় দেওয়া, এটা সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনা। তার কারণ হয়তো এই, যে ওর নিজের জীবনে জটিলতা জিনিসটা একেবারেই অনুপস্থিত। অন্যদের ক্ষেত্রে তা নয় — বিশেষ করে কণিষ্কর ক্ষেত্রে।

*

সেই দিনটা এখনও ছবির মতো মনে আছে! তখন সল্ট লেকের কাছে এক স্কুলে পড়ত। বয়স কতই বা হবে, বড়জোর আট-নয়। ক্লাসে ঢুকেই তার পাশের বেঞ্চের দিকে চোখ চলে গিয়েছিল উপলার।

রোগাপাতলা ছোটখাটো চেহারার একটা ছেলে বসে বসে বই পড়ছে। চোখে মোটা ফ্রেমের হাই পাওয়ারের চশমা। কষে আঁচড়ানো সত্ত্বেও মাথার চুলগুলো সজারুর কাঁটার মতো খাড়া-খাড়া হয়ে আছে। উপলা কৌতুহলী হয়ে এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কে?”

বন্ধু হাত উলটে বলল, “নিউকামার, দেখতেই তো পাচ্ছিস। রোল্‌কলের সময়ই বোঝা যাবে।”

উপলা অবশ্য তার আগেই ছেলেটার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেলল। ছেলেটা প্রথমে বেশ আড়ষ্টভাবে কথা বলছিল, যেন নতুন পরিবেশে খানিকটা ভয় পেয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য অনেকটা সহজ হয়ে গেল। বলল, আগে কখনও কো-এডুকেশানে পড়েনি, তাই ভিতরে ভিতরে দুশ্চিন্তা ছিল। ওর পুরোনো ইস্কুলের বন্ধুরা নাকি ওকে মেয়েদের ব্যাপারে নানারকম ভয় দেখিয়ে রেখেছিল। কিন্তু উপলা তো মেয়ে, ওকে তো বেশ স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। উপলা ইতিমধ্যে তাদের দুজনের চশমা অদলবদল করে ফেলে, ছেলেটার পেন্সিল-বক্সের সম্পত্তি ঘেঁটেঘুটে বেশ একটা কাণ্ড বাধিয়ে ফেলেছিল। হঠাৎ খেয়াল হতে জিজ্ঞেস করল, “এই, তোর নাম কি রে? আমি উপলা রয়।”

“আমার নাম কণিষ্ক চ্যাটার্জী।”

উপলা হি হি করে হেসে বলল, “কণিষ্কের মুণ্ডু!”

ছেলেটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “মানে?”

“তুই ‘কাকাবাবু’ পড়িসনি?” এবার উপলার অবাক হবার পালা।

“না তো।”

“সে কি রে! বই পড়িসনা তুই? একটু আগেই তো কি একটা বই পড়ছিলি দেখলাম —”

“ওটা তো সায়েন্স-ফিকশান। ইংলিশ বই। আমার বাড়িতে কোনো বাংলা বই নেই।”

“এ বাবা! তুই কি ফেলুদা, টেনিদা, প্রফেসার শঙ্কু, কিছুই পড়িসনি? তারপর গিয়ে টিনটিন —”

“টিনটিন?” কণিষ্ক অবাক হয়ে বলে, “টিনটিন বাংলায় বেরোয়? আমি তো ইংলিশেই পড়েছি! আর তুই যেগুলো বললি আই হ্যাভেন্ট রেড দোজ। আমার আগের স্কুলের ক্লাসমেটরাও পড়েনি আই অ্যাম শিওর। আমাদের মিশনারি স্কুল ছিল, বাংলা বলাই অ্যালাওড্‌ ছিল না।”

“এঃ হে! তবে ভাবিসনা, আমি তোকে আমার বই পড়তে দেব। বাংলা পড়তে পারিস তো, নাকি?”

“অফ্‌ কোর্স!” কণিষ্ক হাসে, “বাংলা তো সেকেণ্ড ল্যাঙ্গোয়েজ।”

উপলা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলল, “আমার আবার সেকেণ্ড ল্যাঙ্গোয়েজ হিন্দি; ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে পাটনায় ছিলাম তো, এখানে এসে আর সুইচ্‌ করা হয়নি।”

কণিষ্ক কৌতুহলী হয়ে বলল, “তোর প্যারেন্টস্‌ কী করে?”

“দুজনেই ব্যাঙ্কে চাকরি করে। মা অ্যাকাউন্ট্যান্ট, বাবা ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। তবে দুজনের আলাদা ব্যাঙ্ক। আর তোর মা বাবা?”

“মা স্কুলে ম্যাথ্‌স টীচার আর বাবা ডক্টর।”

ওই একদিনেই বোঝাপড়া হয়ে গেল। এত বছর পরে, যখন ওরা কৈশোরের চৌকাঠ পেরোই-পেরোই করছে, তখন উপলার মনে হল, ওরা দুজনেই যে যার নিজের মতো বেড়ে উঠেছে, দুজন আলাদা প্রকৃতির মানুষ হয়ে। এই ক’বছরে কণিষ্ক উপলার সঙ্গে যত বেশি দিলখোলা হতে পেরেছে, বাইরের জগতের কাছে তত বেশি অন্তর্মুখী হয়েছে যেন। উপলার সঙ্গে তার ছোট ভাই নীলোৎপল অর্থাৎ পুলুর সম্পর্কের কোনও পরিবর্তন হয়নি। হবার কথাও নয় — পুলুটা এতই ছোট! অতি কষ্টে ক্লাস সেভেনে উঠল এই বছর। কিন্তু কণিষ্কর সঙ্গে শাক্যর সম্পর্কটা উত্তরোত্তর জটিল হয়ে উঠছে। কণিষ্ক যতই শাক্যকে আড়াল করার চেষ্টা করুক না কেন, উপলা বেশ বোঝে যে ওর দাদা এই কয়েক বছরে অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আগে তো বন্ধু বলতে কণিষ্কর সবেধন নীলমণি ওই দাদাই ছিল। কিন্তু পারিবারিক অশান্তি বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, শাক্য মরিয়া হয়ে কেরিয়ার গড়তে শুরু করল। শেষ দিকে আর ভাইকে দেওয়ার মতো সময় ছিল না তার। আর এখন তো আমেরিকায় চলেই গেছে। বাবা-মার বিচ্ছেদের পুরো বোঝাটাই কণিষ্কর ঘাড়ে এসে পড়েছে। শাক্যদা আদৌ কোনোদিন দেশে ফিরবে কিনা কে জানে। তবু ভাল, মাকে কিছুটা আর্থিক সাহায্য করছে। ... নাকি সেটাও বানিয়ে বলল?

অবশ্য কণিষ্কর জীবনটা অন্য খাতে বওয়া সত্ত্বেও তাদের বন্ধুত্বে কোনোদিন ছেদ পড়েনি। অন্ততঃ উপলার তো তাই ধারণা। আজকাল অবশ্য মনে হয় কণিষ্ক তাকে অনেক কিছুই বলে না। ও এলে পুরনো বন্ধুদের খবর সরবরাহ করা, সাধারণ আড্ডা, ঠাট্টা-ইয়ার্কির মধ্যেই কথাবার্তা সীমাবদ্ধ থেকে যায়। কে জানে, হয়তো তার নিজের পরিবারের মতোই কণিষ্কও তাকে বিব্রত করতে চায় না। কিন্তু... তার কেন মনে হবে যে উপলা তার কথায় বিব্রত হতে পারে? নাকি আসলে তার ধারণা যে উপলার পক্ষে এত জটিলতা ঠিক-ঠিক বুঝতে পারা অসম্ভব? তার চারপাশে সবাই কি তাকে অপরিণতমনষ্ক ভাবে!

মোবাইলটা বালিশের পাশেই রাখা ছিল। উপলা খানিকক্ষণ দোনামোনা করে শেষ পর্যন্ত নম্বরটা ঘুরিয়েই(??) ফেলল। বেশ কিছুক্ষণ বাজবার পর ওপার থেকে ঘুম-ঘুম গলা ভেসে এল, “হুম্‌ম্‌ম্‌...”

“ঘুমিয়ে পড়েছিলি, না?”

“হ্যাঁ ... তুই এত রাতে? এনি প্রবলেম?” কণিষ্ক এবারে সজাগ হয়।

“না, না। আসলে ঘুম আসছিল না।”

“তোর ঘুম আসছিল না! সেকি রে! তুই না সাড়ে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়িস!”

“পড়ি তো।”

“তাহলে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে।”

“সেরকম কিছু নয়। মাথায় নানারকম চিন্তা আসছিল।”

“চিন্তা!”

কথাটা বলার ধরণে উপলা অবাক না হয়ে পারল না।

“এত অবাক হচ্ছিস কেন রে? আমার কি চিন্তা হতে নেই?”

“না, না,” কণিষ্ক অপ্রস্তুতভাবে বলে, “তা কেন হবে। আমি বলছি, এমন কী চিন্তা যার জন্য রাতে ঘুম হচ্ছে না?”

“আসলে কয়েকটা কবিতা পড়বার পর —”

“ওঃ হরি! তাই বল্‌,” কণিষ্ক নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলে বলল, “আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। কিন্তু... আমাকে ফোন করলি কেন সেটাই ঠিক বুঝলাম না।”

একটু চুপ করে থেকে উপলা বলল, “এমনিই।”

কণিষ্ক এবারে একটু সন্দিগ্ধভাবে প্রশ্ন করল, “কি হল তোর বল্‌ তো? এই ফোন করলি, এখন আবার পরিষ্কার করে কিছু বলছিস না — হোয়াট্‌স রং?”

উপলা বেশ খানিকটা ইতস্ততঃ করে বলল, “আচ্ছা কণিষ্ক, আমি কি খুব বোকা?”

“অ্যাঁ!” কণিষ্ক হতভম্ব হয়ে বলে, “রাতদুপুরে একি নাটক ভাই!”

“নাটক নয়। এটা সিরিয়াস প্রশ্ন। অনেস্টলি বল্‌ তো, তোর কী ধারণা?”

“কি আশ্চর্য! বোকা হতে যাবি কেন? বোকা হলে ফি বছর গাদা গাদা মার্কস পেয়ে ক্লাসে উঠতে পারে?”

“সেরকম না।”

“তবে কি রকম?”

রকমটা যে কী, সেটা পরিষ্কার করে কণিষ্ককে বলা যাবে না তা উপলা বুঝতে পারল। বললে হয়তো বিষয়টাকে ঠিকভাবে নাও নিতে পারে। হয়তো মনে করবে, উপলা তাকে তিরস্কার করছে; এই নিয়ে পরে অশান্তি হলে মোটেই ভাল লাগবে না।

উপলা শুধু বলল, “মাঝে মাঝে মনে হয় আমি মানুষ চিনতে ভুল করি।”

কণিষ্ক আশ্বস্ত হয়ে বলে, “বোঝো! কে ভুল করে না? এভ্‌রিবডি মেক্‌স মিসটেক্‌স ইন চুজিং ফ্রেন্ডস। প্রশ্ন হল, ডু য়ু লার্ন ফ্রম দ্যাট অর নট্‌? তা ছাড়া, সব সময় যে ভুল চিনি, এমনও নয়। সামটাইমস্‌ পীপল চেঞ্জ, অ্যান্ড উই কান্ট ডু এনিথিং অ্যাবাউট ইট।”

উপলা অন্যমনষ্কভাবে বলল, “হুঁ।”

“এই শোন। সিরিয়াসলি, কি হয়েছে বলবি?”

“কিছু না রে। জাস্ট মনে হল এরকম। মাঝে মাঝে কত কীই তো মনে হয়।”

“হে হে। তা ঠিক। আমারও এরকম অনেক কিছু মনে হয়।”

“হয়? কই, আমাকে বলিস না তো।”

“আরে বলার মতো তেমন কিছু হলে তো বলব!”

“বাড়ির কি খবর, কণিষ্ক?”

“কী আর খবর। ফাইনাল হিয়ারিং ডিসেম্বরে। জিনিসপত্র যা ভাগাভাগি করবার সে তো অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল ... লীগাল ব্যাপারগুলো — আই মীন প্রপার্টি অ্যান্ড অল দ্যাট — সেসবের ফিরিস্তি ওই দিনেই হবে। কাস্টডি নিয়ে তো আর কোনো তর্ক নেই; আমি মায়ের কাছে থাকছি। আর... ও হ্যাঁ, দাদা নেক্সট জানুয়ারী ফিরে আসবে, অ্যারেঞ্জমেন্ট করে ফেলেছে সব।”

“শাক্যদা পার্মানেন্টলি ফিরে আসছে!” উপলা অবাক হয়।

“আসছে তো। তুই এত অবাক হচ্ছিস যে?”

“না... আমি ভেবেছিলাম আরও কিছুদিন থাকবে।”

“থাকত হয়তো, কিন্তু ফ্যামিলিতে এরকম একটা ক্রাইসিস চলছে, এখন তো ওকে বেশি করে দরকার। ও ফিরলে অবস্থাটা অনেক নর্মাল হবে আই থিংক। তাছাড়া এখানে ফিরে আসার পর ও আরও অনেক হাই পোস্টে কাজ করতে পারবে। সেটা ওর পক্ষেও ভাল, আমাদের পক্ষেও।”

“সে তো ঠিকই। ... আন্টি ভাল আছেন?”

“হ্যাঁ, এখন বেটার। অনেকটা রিলীভ্‌ড হয়েছে তো। ... বাবাও এর পর ভাল থাকবে আই হোপ।”

কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলে না। অবশ্য এই নিস্তব্ধতা যে যোগাযোগের নয়, এ যে বলার মতো কথার অভাবে চুপ করে থাকা, সেটা উপলা টের পেল। বোধহয় কণিষ্কও পেল।

একটু পরে সে বলে উঠল, “পলা, তুই ঘুমোবি না?”

উপলা চটকা ভেঙে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো! ইস্‌, বক্‌বক্‌ করে তোর ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিলাম একেবারে।”

“থাক, আর ফর্ম্যালিটিতে কাজ নেই। তবে হ্যাঁ, এবার বেশ ঘুম পাচ্ছে। তোর এক্স্যাম্‌স কবে যেন?”

“নেক্সট উইক। শেষ হলে বাঁচি।”

“হাঃ হাঃ, শুরুই হল না, এখনই?”

“আর মনে করাস না প্লিজ। এক্স্যাম্‌ শেষ হলে দেখা করবি তো?”

“সেটা কি বলে দিতে হবে! যাক্‌, এবার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাচ্ছে কিন্তু। আমি ঘুমোলাম। তুইও চোখ বোজ, মা, মাথাটা ঠাণ্ডা কর।”

“হে হে, হুম্‌। গুড নাইট।”

“গুড নাইট। হ্যাপি ড্রীম্‌স।”

ফোনটা রেখে দিয়ে একটু হাসল উপলা। শত বদলের মাঝেও কিছু কিছু জিনিস একই রকম থেকে যায়। কণিষ্ক কখনও ‘সুইট ড্রীম্‌স’ বলে না। বলে, ‘হ্যাপি ড্রীম্‌স’। কেন, কে জানে। ওই অভ্যেসটা ঠিক থাকলেও আর সবকিছুই যে কতটা পালটে গেছে, সেটা আজকের এই ফোনটার পর বোধগম্য হল উপলার। কণিষ্ক যে আর খোলা পাতার মতো নেই, সেটা তো স্পষ্ট। আগে মা-বাবার খবর জিজ্ঞেস করলে কত কী বলত। ভাল খবর হলে তো বটেই, খারাপ হলেও। সেসব আসলে তার নিজেরই মনে খবর। সে নিজে লোকজনের সম্পর্কে কি ভাবে, কি নিয়ে সে খুশি, কি নিয়ে তার নালিশ, সবকিছুই মন খুলে জানাত। ইদানীং সে যাই বলে, তাতেই অনেকখানি আড়াল থাকে। শাক্যদার সম্পর্কে বলতে গিয়ে আগে উচ্ছ্বাস-অভিযোগ কোনোটাতেই আটকাত না। কিন্তু আজকাল তাকে টেনে একটা শব্দ উচ্চারণ করলেও হাঁ-হাঁ করে ওঠে। উপলার মাঝে মাঝে মনে হয়, শাক্যদাকে নিয়ে কণিষ্ক যা যা বলে, তার অনেকটা ও নিজেও বিশ্বাস করে না। ওর বয়সী একটা ছেলের রাগ হয় না, অভিমান হয় না, এও কি সম্ভব? তাহলে এইসব অনুভূতিগুলো উপলার কাছ থেকে লুকোতেই বা কেন চায়?

কিন্তু শুধুই কি কণিষ্ক? তার নিজের কি কোনোই ভূমিকা নেই এর মধ্যে? একটু আগের হওয়া ফোনালাপটা কাঁটার মতো বিঁধছিল তাকে। সে কণিষ্ককে ফোন করেছিল খোলাখুলিভাবে তার সংশয়গুলোর কথা জানাতে। কিন্তু তার বদলে কী বলল সে? কণিষ্ক পাছে কিছু মনে করে, এই ভয়ে আসল কথাটাই তো বলা হল না। হঠাৎ করে উপলা টের পেল, আজ জীবনে প্রথমবার তাকেও একটা মুখোশ পরতে হল। উপলা বিছানা ছেড়ে পা টিপে টিপে পড়ার টেবিলের কাছে গিয়ে টেবিল-ল্যাম্পটা জ্বালল। সামনেই তার সব-কাজের-কাজি ডায়রিটা পড়ে ছিল। চেয়ার টেনে বসে খানিকক্ষণ কলম কামড়ে তারপর লিখলঃ

I’ll think of you
When the wind blows by
And when the sun is low
Against the sky.
When the evenings are the same
Again and again,
When coffee fumes and smoke
Mist the window pane.
I’ll think of you
When women sit and talk,
And when men argue world
In their walk,
When flowers dry up
In the sitting room vase;
When we have rehearsed our roles
And worn our masks.
I’ll think of you
When Monday follows Sunday,
And time remains frozen
In sand and in clay.
When buildings and towers
Stand and stare,
And people dissect Prufrock
With a stony glare.
I’ll think of you
When I’ll be a fossil in a rock
And when death with cold hands
On my coffin will knock,
When in death I’ll learn
All that I’d unlearned;
I’ll think of you, and salute you,
And let myself be burnt.
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো লাইন লিখে ফেলে থেমে গেল উপলা। বেশ অবাক লাগছে তার। সে এর আগে কোনোদিন কবিতা লেখেনি। ওসব তো রনের আওতায় পড়ে। কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল? সঠিক বুঝে উঠতে পারল না, কিন্তু টের পেল, এলিয়ট সম্পর্কে তার মনের ভিতরের ধোঁয়াশাগুলো যেন একটু একটু সরে যাচ্ছে। অনেকটা হালকাও লাগছে যেন। এতক্ষণ ধরে বৃথা সাধ্য-সাধনার পর অবশেষে ঘুম এল উপলার। ডায়রিটা বন্ধ করবার আগে জায়গাটায় একটা বুকমার্ক দিয়ে রাখল সে। পরীক্ষার হ্যাপা চুকলেই শরণ্যাকে দেখাতে হবে জিনিসটা।



(ক্রমশ)



(পরবাস-৭৫, ৩০ জুন ২০১৯)