ISSN 1563-8685




কোথাও জীবন আছে

।। ১৩ ।।

ঠাৎ ছুটির দিনে বাবাদের জেঠুমণির বাড়ি যাওয়ার ধুম পড়ল কেন, তাও আবার তাকে বাদ দিয়ে, সেটা আন্দাজ করতে অসুবিধে হল না তিলোত্তমার। এতদিন ধরে এত ভয় আর অপমান সহ্য করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে; তাই সেদিন সকালে বাবাকে ওরকম বেফাঁস একটা কথা বলে ফেলেছিল। ভাব দেখে মনে হচ্ছে ওরা ভয় পেয়েছে। এমনিতে জেঠুমণির সাথে বাবার এমন কিছু হৃদ্যতা নেই; পিসিমণিদের সঙ্গে তো আরোই দূরত্ব। শুধুমাত্র কাকান সম্পর্কে কি যে অন্ধ দূর্বলতা! অবশ্য বাবা যেরকম মানুষ, তাতে কাকানের প্রতি স্নেহের মধ্যেও যে হিসেব নেই, এটা ভাবতে পারা কঠিন। তবে যাই হোক না কেন, কাকান সব সময় পুরো মাত্রায় সুযোগটা নিয়ে নিতে জানে। ও যে কত বড় অভিনেতা, সেটা তিলোত্তমা ছাড়া কারুর বোঝার ক্ষমতাই নেই। নিজের প্রত্যেকটা ভাইবোনের সামনে নিখুঁত একটা মুখোশ পরে থাকে সে। এরকম একটা পরিবারের মধ্যে ও বেঁচে থাকত কি করে? ছয় মাস আগে ওই ফোনটা যদি না আসত?

তার ক’দিন আগেই কাকান জঘন্য কিছু একটা অসভ্যতা করবার চেষ্টা করেছিল, তিলোত্তমার মনে আছে। তার একেবারে পাগল-পাগল অবস্থা তখন। উকিলের বাড়ির মেয়ে হবার দরুন সে এইটুকু বুঝত যে প্রমাণ ছাড়া কারুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই। আর কাকান অত্যন্ত ধুরন্ধর ছেলে। পুলিশ এসে তার ফাইলপত্র টেনে বের করেও এমন কিছু দেখাতে পারবে না যাতে করে শৌর্য্য দত্ত-র আসল চরিত্রটা বেরিয়ে পড়ে। তাছাড়া, ওকে ধরলেই বা কি হবে? এদের সকলেরই আইনকে কাঁচকলা দেখানোর ক্ষমতা আছে। মাঝে মাঝেই মনে হত, স্কুল থেকে বেরিয়ে যদি আর বাড়ি না ফিরে যায়? যদি একদিন টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনে চলে গিয়ে একটা আলোর গতিতে ছুটে আসা ট্রেনের মুখে ঝাঁপ দেয়? …

সেদিন রাতেও শুয়ে শুয়ে এসব কথাই ভাবছিল সে। রাত বেশি না হলেও, খাওয়ার পাট উঠলেই নিজের ঘরে গিয়ে শক্ত করে দরজা বন্ধ করে দেবার অভ্যাস ছিল তার। অন্ধকারের মধ্যেই নানারকম চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছিল মনের মধ্যে। হঠাৎ ফোনের শব্দে চমকে উঠে বসল সে। নম্বরটা অচেনা দেখে একটু ইতস্ততঃ করলেও, শেষ অবধি ধরেই ফেলল।

“হ্যালো?”

“গুড্‌ ইভনিং। আমি কি তিলোত্তমা দত্তর সঙ্গে কথা বলছি?”

গলাটা সম্পূর্ণ অচেনা; এক বয়স্ক ভদ্রলোকের। তিলোত্তমা বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল।

“হ্যাঁ ... আপনি কে বলছেন?”

“আপনিই তিলোত্তমা? ক্যান্‌ য়ু কন্‌ফার্ম ইট্‌?”

“কি ব্যাপার বলুন তো?”

“সরি,” ওপারের আওয়াজটা একটু হাসে, “আপনাকে যেটা বলব, সেটা একটা ইম্‌পর্ট্যান্ট বিষয়। তাই আপনার আইডেন্টিটি ভেরিফাই না করে আসল কথায় যেতে পারছি না।”

তিলোত্তমার উদ্বেগটা বাড়লেও, সেটা প্রকাশ করল না।

“আই আন্ডারস্ট্যান্ড। কিভাবে ভেরিফাই করব, বলুন?”

“সেরকম কিছুই না, জাস্ট আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের নামগুলো... ”

“আমার বাবা-মায়ের নাম শত্রাজিৎ আর দেবযানী দত্ত। আমার কোনো ভাইবোন নেই, বাড়িতে আমাদের সঙ্গে আমার কাকুও থাকেন, তাঁর নাম শৌর্য্য দত্ত। আমার জেঠুর নাম শত্রুঘ্ন, দুজন পিসি আছেন, তাঁদের নাম শতরূপা মিত্র, আর শতভীষা গাঙ্গুলী। আমার ঠাকুর্দা মারা গেছেন, তাঁর নাম সমরেন্দ্র দত্ত, ঠাকুমার নাম —”

“ব্যস্‌ ব্যস্‌, ওতেই হবে। এটা একটা ফর্ম্যালিটি ধরে নিন্‌। আমার পরিচয়টা দিই? আমার নাম অরিন্দম সিন্‌হারয়। আমি সমরবাবুর — মানে আপনার ঠাকুর্দার লইয়ার ছিলাম।”

“ঠাকুর্দার লইয়ার!” তিলোত্তমা উত্তরোত্তর অবাক হচ্ছিল, “কিন্তু উনি তো —”

“হ্যাঁ, এমনিতে তোমার — আপনার জেঠুই পারিবারিক বিষয়ে দেখাশোনা করতেন —”

“আমাকে ‘তুমি’ বলুন প্লিজ।”

“বাঁচালে; তুমি আমার মেয়ের বয়সী। যাইহোক, তোমার ঠাকুর্দার উইল-এর ব্যাপারে কিছু শোনোনি তো তুমি?”

“না তো! ঠাকুর্দা তো মারা গেছেন দশ বছর হতে চলল। এখন উইল ...”

“তোমার ঠাকুর্দার মৃত্যুর সময় যে উইল বেরিয়েছিল, তাতে ওঁর পুরো সম্পত্তির ডিস্ট্রিবিউশান হয়নি। উনি আরেকটা উইল রেখে গেছেন, আমাদের ফার্মকে ট্রাস্টি করে। এতদিন অবধি আমিই সেই উইলটা হেফাজতে রেখেছি। তোমার আঠেরো বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায় আমারই। এত কথা বলার পর নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ উইলের ওয়ারিশ কে।”

তিলোত্তমা কৌতুহলী হয়ে বলে, “আমার নামে উইল? কই, এতদিন তো আমাকে কেউ কিছু জানায়নি?”

“না জানানোই স্বাভাবিক। যদি এ বিষয়ে তুমি কিছু শুনে থাকতে সেটাই চিন্তার কারণ হত। সমরবাবু আমাকে ট্রাস্টি করে গিয়েছিলেন যাতে গোপনীয়তা রক্ষা হয়। আই থিংক ওঁর চিন্তা ছিল যে এই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে অনেকে সেকেণ্ড উইলের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নেবার চেষ্টা করবেন। প্রথম উইলে তোমাকে দিয়ে যাওয়া প্রপার্টির ভ্যালু ডিস্‌ক্লোজ করা হয়নি, আর ওয়ারিশ হিসেবে তোমার নামও করা হয়নি। ডিক্লারেশানটা যে দু-হাজার নয় সালে হবে, সেটা উনি বলে গিয়েছিলেন।”

তিলোত্তমা একটু অধীরভাবে বলল, “কিন্তু এতসবের দরকারটা কী? এত গোপনীয়তা কিসের জন্য সেটাই তো বুঝতে পারছি না!”

অরিন্দমবাবু একটু হাসলেন, “সত্যিই দরকার ছিল না। আসলে টাকার অ্যামাউন্টটা সাব্‌স্ট্যান্‌শিয়াল তো, তাই আর কি।”

“কত টাকা?”

“ওঁর প্রপার্টির প্রায় হাফ উনি তোমার জন্য রেখে গেছেন। স্থাবর, অস্থাবর, অন্যান্য অ্যাসেট ইত্যাদি মিলিয়ে অনেকটাই। এতটাই বেশি, যে তোমার পরিবারের লোকেদের তা চোখে পড়তে বাধ্য।”

“কিরকম ভ্যালু দাঁড়াচ্ছে সব মিলিয়ে?”

“আহিরীটোলার পুরো বাড়িটাই তোমার নামে, তারপর —”

“কি বলছেন!” তিলোত্তমা উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

“ঠিকই বলছি। সম্পত্তি-ভাগের সময় ওই নিয়ে একটা বড়সড় ইস্যু তৈরি হয়েছিল; কারণ বাড়িটা কেন এই মুহূর্তে ভাগ করা যাচ্ছে না, সেটার এক্সপ্ল্যানেশান দু হাজার নয় সালের আগে পাওয়া যাবে না। ওঁরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি, কিন্তু বাড়ির ভাগ পাওয়া কারুর পক্ষেই তখন সম্ভব হয়নি। অবশ্য অন্যান্য যা সম্পত্তি তোমার নামে আছে, সেসবের বেশির ভাগটা নিয়েই ওঁদের কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না, তার কারণ তোমার ঠাকুর্দা চট্‌ করে কাউকে বিশ্বাস করার মতো লোক ছিলেন না। নিজের বিষয়-সম্পত্তি কোথায় কি আছে না আছে, সেসব ডীটেল কারুরই জানার কথা নয়। এমনকি তোমার জেঠুরও নয়।”

“আপনি বলছেন, যে শুধু বাড়িটা নয়, আরও প্রপার্টি আছে আমার নামে?”

“হ্যাঁ, অফ কোর্স।”

তিলোত্তমার মনে হঠাৎ এক অসম্ভব আশার আলো উঁকি দিয়ে যায়। এই নরক-কুণ্ড থেকে কি তবে পালাবার পথ রয়েছে তার? কথা শুরু করবার আগে তার গলা কেঁপে ওঠে।

“আচ্ছা... এই বাকি প্রপার্টি — মানে বাড়িটা বাদ দিয়ে — ওটা কি একজন লোকের খাওয়া-পরা-এডুকেশান চালিয়ে নেওয়ার মতো? অ্যাট লীস্ট ধরুন বছর পাঁচেকের জন্য?”

ফোনের ওপারের গলাটা হঠাৎ হাসতে শুরু করে। বেশ কিছুক্ষণ হাসির পর কৌতুকের সুরে বলে, “ইট্‌ ডিপেন্ড্‌স। পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে কি তোমার পাঁচ বছর চলবে? আমার তো সারা জীবন চলে যাবে।”

তিলোত্তমা হতভম্ব হয়ে বসেছিল বাকি সময়টা। অরিন্দমবাবু অনেক কিছু বলে চলেছিলেন, কাজের কথা; কখন, কোথায়, কিভাবে বিষয়টা নিয়ে এগোতে হবে, তার আলোচনা। তিলোত্তমার কানে কিছুই ভাল করে ঢুকছিল না। খালি খালি সন্দেহ হচ্ছিল, সে হয়তো আসলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। ঠাকুর্দা এত বড়লোক ছিলেন? আর, তাঁর এতগুলো ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনী থাকা সত্ত্বেও অর্ধেক রাজত্ব শুধু তার ভাগে পড়ল? এরকম আবার বাস্তবে হয় নাকি! যখন কথা বলার মতো অবস্থায় ফিরে এল, ততক্ষণে অরিন্দমবাবু বক্তব্য শেষ করে ফোন নামিয়ে রাখতে যাচ্ছেন।

তিলোত্তমা অস্ফুটে বলল, “আমি জানি না যে ঠিক কী বললে —”

“কিছুই বলার দরকার নেই,” ওপার থেকে শান্ত স্বরে অরিন্দমবাবু বলেন, “আমি তোমার কোনো উপকার করছি না। একদিন তোমার ঠাকুর্দা আমাকে অনেক বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। উনি না থাকলে আমি বাঁচতাম না। সমরবাবু নেই, কিন্তু ওঁর কাছে এই কাজটা ইম্পর্ট্যান্ট ছিল। সেই কাজটুকু ঠিক মতো শেষ করে কিছুটা হলেও ঋণ-শোধ করতে পারব।”

তার পর বেশ কিছুটা সময় মুখ বুজেই ছিল তিলোত্তমা। কিন্তু সেদিন হঠাৎ মাথাটা এমন গরম হয়ে গেল! এ কথা ঠিক যে ওই ঘটনার পর কাকান বেশ কিছুদিন তাকে ঘাঁটায়নি। তাও, জেঠুদের বাড়িতে যে পরামর্শ করতে দৌড়াল ওরা, তার ফল খুব ভাল নাও হতে পারে ওর পক্ষে। যাই হোক, তিলোত্তমা এসব নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা না করার চেষ্টাই করছে। অরিন্দমবাবু বারবার আশ্বাস দিয়েছেন যে এই ক্ষেত্রে ওদের ক্ষমতা সীমিত। ভদ্রলোককে একজন নির্ভরযোগ্য মানুষ মনে হয় তার। শুধু আরও কটা দিন ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা।

ওরা বেরোবার পর দুপুরের দিকে গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন লাইব্রেরীতে এসেছিল তিলোত্তমা। বেরিয়ে এসে দেখে, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। শীতের মাসে অন্ধকার বেড়েই চলেছে। তবু, এদিককার রাস্তাঘাটগুলো, বিশেষ করে ক্রসিং-এর দিকটা সব সময়ই আলো-ঝলমলে আর জমজমাট। শাঁইশাঁই করে গাড়ি ছুটছে, লোকজন দ্রুত পায়ে রাস্তা পারাপার করছে। তাদের নিঝুম হয়ে থাকা পাড়াটার তুলনায় এ জায়গাটা অনেক বেশি আকর্ষক। খানিকক্ষণ এই ব্যস্ততার ছবিটা বেশ উপভোগ করে তিলোত্তমা। কিন্তু তারপর এক লহমায় দৃশ্যটা যেন পালটে যায়। রাস্তার আলোগুলো ঘোলাটে মনে হতে থাকে, মানুষের চলার ভঙ্গিতে অসীম ক্লান্তি ফুটে ওঠে, গাড়ির আওয়াজকে মনে হয় মড়াকান্না। হঠাৎ করে কী হল তার? কেন দৃশ্যটাকে এরকম পরিবর্তিত মনে হচ্ছে? তিলোত্তমা বুঝতে পারল না। শুধু মনের ভিতরের কেউ যেন জানিয়ে দিয়ে গেল, আজ এক মুহূর্তের জন্যে শহরের লুকিয়ে থাকা আসল রূপটা দেখে নিয়েছে সে। এই অবসাদ মানুষের তো নয়, শহরেরই; এবং তা একদিনের নয়, তা চিরন্তন। এমন সময় যেন অনেক দূর থেকে কবিতার দুটো লাইন ভেসে এল তিলোত্তমার মনেঃ

I am moved by fancies that are curled
Around these images, and cling:
The notion of some infinitely gentle
Infinitely suffering thing.
এলিয়ট লোকটা জাদুকর কিনা কে জানে!

নিঃশ্বাস ফেলে রাস্তা পার করতে যাচ্ছিল, এমন সময় পিছন থেকে গমগমে গলায় কেউ ডাকল, “আরে, মিঙ্কু না!”

চমকে ঘুরে তাকাল তিলোত্তমা। দেখল রেলিং-এর ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে পাঞ্জাবি-পরা একটা খুব লম্বা, শ্যামলা ছেলে।


*

নীরার বিরক্তির শেষ নেই আজকে। সপ্তাহে ক’বার উইক-এণ্ড আসে? ওই একটা দিনের জন্য সারা সপ্তাহের পাগলামির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। আর ওই একটিমাত্র দিনেই অত্রির সঙ্গে আর একটু বেশি সময় জুড়ে আড্ডা মারা যায়। সেই অত্রিই ভ্যানিশ!

সকালবেলা জলখাবারের পাট সেরেই ওদের বাড়ি গিয়েছিল নীরা। দরজা অবধি না পৌঁছাতেই দেখে বিশাল এক তালা ঝুলছে। তাজ্জব হয়ে ফিরে আসছিল, এমন সময় নিজের বাড়ির বারান্দা থেকে শিল্‌দা ডাকল, “অভিসার তো গভীর রাতে হয় শুনেছিলাম; বেলা দশটার সময় কি ব্যাপার?”

ভীষণ রাগ হলেও, খোঁচাটা নির্বিবাদে হজম করে বলল, “রিকুরা কোথায় গেছে জানো?”

শিল্‌দা একটু অবাক হয়ে বলল, “না তো! কেন, কাকিমাও বাড়ি নেই?”

“না, কেউ নেই, দরজায় তালা মারা।”

“কি কাণ্ড! গেলে কাল দুপুরের পরেই গেছে, কারণ সকালেও ওকে রাস্তায় দেখেছি আমি। তোকে বলে যায়নি?”

বেশ বিরক্ত লাগল নীরার; ব্যাজার হয়ে উত্তর দিল, “বলে গেলে আর জিজ্ঞেস কেন করব বলো।”

“না, তা ঠিক... ” শিল্‌দা এতক্ষণ হাসছিল, হঠাৎ বিনা-নোটিসে কেমন যেন ভাবুক-ভাবুক হয়ে গেল। নীরা নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিল, এমন সময় পিছু ডেকে বলল, “এই নীরু, শোন্‌ না!”

ফিরে তাকাতেই শিল্‌দা ইতস্ততঃ করে বলল, “ফুল্‌কির কি খবর রে?”

নীরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠতে গিয়েও সামলে নিল। শিলাদিত্যর সঙ্গে ইয়ার্কি মারা তার স্বভাব নয়, যতই তার পিছনে লাগুক না কেন। কিন্তু আজকের এই প্রশ্নের পর তার পক্ষে গাম্ভীর্য রাখাই দায় হচ্ছে। আগের রবিবার যে শিল্‌দা লিনীকে নিয়ে গাছের-ছায়া-ঘেরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তা রন্‌-পল্‌ নিজের চোখে দেখেছে। এই পুরো সপ্তাহটায় যে প্রত্যেক বিকেলে পাড়ার লোককে লুকিয়ে ওরা বেড়াতে বেরিয়েছে, সেটাও তার জানতে বাকি নেই। লিনী নিজেই তো বলেছিল, সেই কলেজ-স্ট্রীট থেকে গড়িয়া বাজার, কোনো জায়গাই ঘুরতে বাদ রাখেনি এই ক’দিনে। এদিকে শিল্‌দা তার কাছে ‘ফুল্‌কির খবর’ জানতে চাইছে! অভিসার করতে যে কারা ব্যস্ত, তা নীরা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে। অতি কষ্টে গলায় আওয়াজকে স্বাভাবিক রেখে বলল, “ফুল্‌কির খবর আবার কি হবে? সেলিব্রিটি তো নয় যে রোজ রোজ নতুন নতুন খবর বেরোবে?”

শিল্‌দা একটু যেন সতর্কভাবে বলল, “না, মানে... ও ভাল আছে তো?”

নীরা ভুরু তুলে বলল, “ভাল না থাকার কোনো কারণ ঘটেছে বলে তো শুনিনি। কেন, তোমায় কিছু বলেছে? এর মধ্যে কথা হয়েছে নাকি ওর সঙ্গে?”

এবার শিল্‌দা মারাত্মক রকমের অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে বলল, “আরে, না, না! আমার সঙ্গে কি করে কথা হবে! ইন্‌ ফ্যাক্ট অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ হয় না বলেই তো ... বেশ, আজ আসি, কেমন? টাটা!”

নীরা হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে এসে অত্রিকে ফোন করল। ওপার থেকে বেশ খোশমেজাজী স্বরে অত্রি বলল, “হ্যালো!”

“কি ব্যাপারটা কী অত্রি? বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে কোন চুলোয় গিয়েছিস তোরা?”

“অ্যাঁ! এই য্‌যাঃ, কী কেলেঙ্কারী! তোকে বলতে বেমালুম ভুলে গিয়েছি! আসলে রুদ্রকে ফোন করেছিলাম তো, তার পরেই —”

“আ-বা-র?” নীরা দাঁত কিড়মিড় করে, “তুই নেই সেটা রাস্কেল রুদ্র জানে, আর আমি জানি না?”

“এই, এই, প্লিজ রেগে যাস না,” অত্রি বিপন্নভাবে বলে।

“না রেগে যাওয়ার মতো কোনো কাজ কি তুই করেছিস?”

“না, আমি স্বীকার করছি, আমি একটা গাধা। আমি ভুলো, আমি কেয়ারলেস, আমি একটা আস্ত ছাগল —”

“আচ্ছা আচ্ছা, ঢের হয়েছে। কিন্তু বাড়িসুদ্ধ লোক মিলে গেলিটা কোথায়?”

“দার্জিলিং! ভাব একবার!” অত্রি উচ্ছ্বসিতভাবে বলে, “বাড়ি থেকে প্ল্যান করা হয়েছিল, আমি কিছুই জানতাম না! বাবার নাকি ছুটি জমে জমে পাহাড় হয়ে গিয়েছিল, এদিকে পুজোর সময় কোথাও বেরোনো হয়নি... এখানে কী শীত রে বাবা!”

নীরা খবরটা শুনে হাঁ হয়ে বলল, “কী কাণ্ড! এরকম অফ্‌ সীজন-এ হুট্‌ বলতে একেবারে দার্জিলিং চলে গেলি তোরা! তা, কবে ফিরবি?”

“নেক্সট্‌ স্যাটারডে। ... রিয়লি সরি ভাই। তোকে যে কি করে বলতে ভুলে গেলাম, আমি নিজেই ঠাওর করতে পারছি না!”

নীরার মনে হঠাৎই বিষন্নতা ঘনিয়ে এল, তবে সেটাকে বেশি আমল দিতে চাইল না সে।

“আমি বেশ ঠাওর করতে পারছি,” নীরা হাসল, “তুই রুদ্র-র প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস কিনা; ওর সঙ্গে একবার কথা শুরু করলে আর দিকবিদিক জ্ঞান থাকেনা তোর।”

অত্রিও হেসে ফেলল, “সত্যি, ক্ষমা চাইবার ভাষা নেই আমার।”

“থাক, আর ফর্ম্যালিটিতে কাজ নেই। এন্‌জয় কর, আর ছবি তুলিস।”

“তুলবই তো। নেক্সট উইক দেখা হচ্ছে, কেমন? টাটা!”

ফোনটা নামিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল নীরা। সত্যি, অত্রিটা যে কী করেনা এক একটা সময়। হাসবে, না কাঁদবে, ভেবে পায়না। নীরাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বেরোবার সময়ও একবার ফোন করার কথা মনে পড়ল না? আজব ছেলে বটে! অবশ্য কিছু করারও নেই। ভেবেছিল, বিকেলে অত্রির সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবে। তা, সে গুড়ে বালি। লিনীর সঙ্গে কোথাও ঘুরে আসা যায় কিনা ভাবছিল। তারপর খেয়াল পড়ল, আজ আবার তার পেয়ারের শিল্‌দার সঙ্গে কোথাও ডেটে যাওয়ার গল্প নেই তো? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মৃণালিনীকে ফোন করল। সে তো আবার ফোন ধরতেই চায় না! লাইন কেটে যাওয়ার ঠিক আগে ধরে জড়ানো গলায় বলল, “হ্যালো...”

“কি যা তা! এখনও ঘুমোচ্ছিস?”

“হুম্‌ম্‌... কটা বাজে?”

“সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে রে কুম্ভকর্ণ! উঠবি না?”

“উঁ... ফোন করলি কেন?”

“বলছি যে বিকেলে ফ্রি আছিস?”

“বিকেলে?” এক ঝট্‌কায় ঘুম ছুটে গেল মৃণালিনীর, “কেন? বিকেলে কী?”

“আরে, কি আর ব্যাপার! সিনেমা দেখতে যাব ভাবছিলাম, তা অত্রি তো ঝোলালে। তোর সময় থাকলে তোকে নিয়েই যেতাম আর কী!”

“ওঃ! তাই বল্‌। না, মানে হয়েছে কী —”

“আর বলতে হবে না, বুঝেছি। শিল্‌দার সঙ্গে ডেট, তাই তো? সিরিয়াসলি মাইরি, আর কদ্দিন ডুবে ডুবে জল খাবি? ভণিতা না করে এবার দিনের আলোয় এসো না বাবা!”

“আরে শালা, অতই সহজ নাকি? শিল্‌দা এখনো কিছুই —”

“শিল্‌দা স-ব জানে। সকালবেলায় যা দেবদাসের মতো মুখ করে বারান্দায় বসেছিল, ও দেখলে অন্ধেও টের পাবে। তুই গরু, তাই পাচ্ছিসনা। যাক, মরুকগে যাক, তুই তো বেরোলিনা আমার সঙ্গে, আমি একাই হাওয়া খেয়ে আসব’খন। রাখলাম।”

অগত্যা লাঞ্চ সেরে একাই বেরিয়ে পড়েছে নীরা। খুব যে মন্দ লাগছে তা নয়। ইদানীং তো কোথাও বেরোতে গেলেই অত্রি লেজুড় হয়ে যেত। ব্যাপারটাকে একেবারে অভ্যাসের মতো করে ফেলতে চাইছিল না। আজ একা বেরিয়ে ভালই হয়েছে। যদিও তার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই। সিনেমা জিনিসটা হলে গিয়ে কিছুতেই একা একা দেখা যায়না। তাহলে কোথায় যাবে? ভাবতে ভাবতে মেট্রো স্টেশন অবধি চলেও এসেছিল। অবশেষে গড়িয়াহাটের দিকে হাঁটা লাগাল সে। অনেক মাসের পকেটমানি কি করে যেন জমে আছে। একটু শপিং করে আসা যেতেই পারে।

গড়িয়াহাট মোড়ের মাথায় চলে এসেছিল প্রায়। হঠাৎ তার পাশে ঘ্যাঁস করে একটা ট্যাক্সি থেমে গেল। দরজা খুলে প্রায় লাফ দিয়ে নেমে রুদ্র ডাকল, “নীরা যে! এখানে হঠাৎ?”

ঘটনাটার আকস্মিকতায় নীরা একটু হক্‌চকিয়ে গিয়েছিল। রুদ্র ততক্ষণে ভাড়া চুকিয়ে ট্যাক্সিটাকে বিদায় করে দিয়েছে। নীরা আমতা আমতা করে বলল, “তুমি... মানে... ”

“আমি আসলে পার্ক স্ট্রীট যাচ্ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে হ্যাং আউট আর কি। তোমার কি খবর?”

“আমি জাস্ট — কিন্তু তুমি ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিলে কেন?”

রুদ্র হাসল, “তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তো, তাই। ওটা কিছু না, বন্ধুদের বলে দিচ্ছি, যাব না। ইন্‌ ফ্যাক্ট প্ল্যানটা কাটানোর একটা এক্সকিউজ খুব দরকার ছিল আমার।”

এই বলে পকেট থেকে ফোন বার করে দ্রুত মেসেজ টাইপ করতে লাগল। নীরা কী করবে বুঝতে পারছিল না। পরক্ষণেই মনে হল, অত্রির দার্জিলিং যাওয়ার কথা ও জানে। তাহলে কি ওকে একা দেখেই সঙ্গ দেবার জন্য থেকে গেল? কী কাণ্ড! তেমন হলে নীরা ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করবে।

রুদ্র মেসেজ টাইপ করতে করতেই বলল, “তুমি যে এখানে কি করছ সেটা কিন্তু এখনও বললে না।”

নীরা মাথা চুলকে বলল, “স্পেসিফিক কিছু করতে আসিনি। আসলে আজ অত্রির সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাব ভেবেছিলাম —”

“আজ!” রুদ্র অবাক হয়ে বলে, “কিন্তু অত্রি তো কাল দার্জিলিং চলে গেছে!”

“হ্যাঁ, সেটা আমাকে জানাতে ভুলে গিয়েছিল,” নীরা হাসল।

“ও গড্‌!” রুদ্র কপাল ঠুকল, “এই ছেলেটা না, জাস্ট কোনোদিন শোধরাবে না!”

“তা ঠিক,” নীরা হাসতে হাসতে বলে, “জন্ম থেকে তাই দেখে আসছি।”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমরা তো আবার চাইল্ডহুড ফ্রেণ্ডস্‌; সত্যি, কি করে হ্যাণ্ডেল করো বলো তো অত্রিকে?”

“এই, যেভাবে তুমি হ্যাণ্ডেল করো, সেভাবেই আর কি।”

রুদ্র হা হা করে হেসে উঠল, “এটা দারুণ বলেছ তো! যাইহোক, এখন কী করবে ভাবছ?”

নীরা ইতস্ততঃ করল, “না, ভাবছিলাম একটু শপিং করব, তা তোমার সঙ্গে যখন দেখা হয়েই গেল, তখন —”

রুদ্র ভুরু কুঁচকে বলল, “আমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল বলে শপিং ক্যানসেল করতে হবে? আমি তো তোমার কাজে ব্যাগড়া দেবার জন্য আসিনি।”

নীরা তাড়াতাড়ি বলল, “না না, তার জন্যে একেবারেই নয়। আসলে আমি ভাবছি যে তুমি শুধু শুধু বোর হয়ে যাবে। জাঙ্ক জুয়েলারী, চুলের ক্লিপ, এসব আল-ফাল জিনিস ছাড়া তো আর কিছু শপিং করবার নেই।”

“ওঃ, এই কথা! কে বললে আমি বোর হব? আমার তো শপিং দারুণ লাগে। কলেজের মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এন্‌তার শপিং-এ যাই আমি।”

“তাই নাকি?” নীরা একটু অবাক হয়ে বলে, “অত্রি ভীষণ বোর হয় আসলে। আমি আবার ঘন্টার পর ঘন্টা জিনিস বাছাবাছি করি তো, তাই আরও সমস্যা।”

“ধুর, অত্রির কথা বাদ দাও। কিছু মনে কোরোনা নীরা, কিন্তু ও নিজেই একটু বোরিং। আই মীন্‌, হি ইজ আ রিয়লি নাইস গাই। কিন্তু পৃথিবীতে কি ফিজিক্স আর তুমি ছাড়া অন্য কোনো টপিক নেই! অত্রি বড় হয়ে পাগলা সায়েন্টিস্ট হবে, দেখে নিও তুমি।”

নীরা অপ্রস্তুতভাবে হাসল, “আমারও তাই সন্দেহ। যাইহোক, থ্যাংক য়ু সো মাচ ফর স্পেন্ডিং টাইম উইথ মী। আই রিয়লি অ্যাপ্রিশিয়েট ইট।”

“এনি টাইম।”

*

“সরি, মুখ দিয়ে ডাকনাম বেরোল। আপনার ভাল নামটা আমার কিছুতেই মনে থাকে না!” ধৃতিমান এগিয়ে এসে হাসল।

তিলোত্তমা প্রথমটায় একটু থমকে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে মাথায় একগাদা কথা ভিড় করে এসে জট পাকিয়ে ফেলেছিল। সেসব সামলাতে একটুক্ষণ সময় লাগল তার।

“... তিলোত্তমা। আমার ভাল নাম।”

“রাইট, রাইট। আসলে শৌর্য্য সব সময় ‘মিঙ্কু’ ‘মিঙ্কু’ বলে তো, তাই। আর ভুলব না।”

তিলোত্তমা বলল, “ইট্‌স ওকে। আপনি আমাকে ‘মিঙ্কু’ বলে ডাকলেও কোনো অসুবিধে নেই।”

“সিরিয়াসলি? দ্যাট্‌স গ্রেট। আপনিও আমাকে ফুচ্‌কা বলে ডাকতে পারেন।”

তিলোত্তমা তাজ্জব হয়ে গিয়ে বলে, “আপনার ডাকনাম ফুচ্‌কা?”

“ইয়েস। মুখরোচক নাম, কি বলেন?”

তিলোত্তমা এবারে হেসে ফেলল, “তা ঠিক। এরকম নাম কে দিয়েছিলেন?”

“কে আবার, মা দিয়েছেন। আমি ফুচ্‌কা, আমার ভাই চুর্‌মুর্‌।”

“ভাই?... ওঃ, সেদিন ক্যাফেতে যিনি এসেছিলেন?”

“হ্যাঁ, ওই আমার ভাই। ওর ভাল নাম ঋদ্ধিমান। আপনার থেকে কিছুটা বড়ই হবে... বছর দুই-তিন।”

একটু থেমে ধৃতিমান হাসল, “সেদিন ওর বান্ধবীর সঙ্গে আলাপ করাতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। নাকি এখনই বাড়িতে ডাকা যাবে না, মা পড়াশোনার কথা তুলে বকে শেষ করবে, এদিকে আমার সঙ্গে আলাপ না করালে নাকি তার রাতে ঘুম হচ্ছে না – ছেলেমানুষ আর কাকে বলে! যাইহোক, সেদিন ফাইনালি আলাপ হল ইশার সঙ্গে।”

তিলোত্তমা এতক্ষণ একদৃষ্টে চেয়েছিল ধৃতিমানের দিকে। কথা বলবার সময় তার মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করছিল সে; সেদিন ক্যাফেতে এরকমটাই দেখেছিল। ভাইয়ের কথা বলতে বলতে তার চোখের দৃষ্টি আশ্চর্যরকম নরম হয়ে উঠেছিল; সত্যিকারের বাৎসল্যের চেহারা হয়তো এরকমই হয়। তিলোত্তমা জানে না। সে কোনোদিন কারুর চোখে তার প্রতি এমন অভিব্যক্তি দেখেনি।

মুখে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়ের গার্লফ্রেণ্ডকে পছন্দ হল?”

“সে আর বলতে, চমৎকার মনে হল। আপনি খেয়াল করেছিলেন?”

“দূর থেকে দেখেছিলাম। আমারও সুইট লেগেছিল।”

ধৃতিমান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এদিকে?”

“ওই রামকৃষ্ণ মিশন। ওখানকার লাইব্রেরীতে মাঝে মাঝে যাই।”

“ও। এখন বোধহয় বাড়ি যাচ্ছেন।”

অন্য কেউ হলে তিলোত্তমা নিশ্চয়ই ‘হ্যাঁ’ বলে কথা না বাড়িয়ে চলে যেত। আজ তার কী হয়েছে কে জানে! আসলে, প্রথমবার একজন ছেলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তেমন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে না তার। এমনিতে রাস্তায় চলাফেরা করতে গেলে তার কেবলই মনে হতে থাকে, হাজার হাজার অদৃশ্য চোখ তাকে প্রতি মুহূর্তে গিলে খাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ছেলেটার চোখ তেমন নয়; সেটা প্রথমদিনই তিলোত্তমাকে অবাক করে দিয়েছিল। দক্ষ অভিনেতা অনেকেই হয়। কিন্তু চোখের দৃষ্টি কি কখনোও এতটা সাবলীলভাবে মিথ্যে বলতে পারে?

“না... বাড়ি যাচ্ছি না।”

“তবে?”

“এমনিই... খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরব ভাবছি।”

“আচ্ছা... !”

ধৃতিমানের গলায় বিস্ময়ের চিহ্ন স্পষ্ট। কিন্তু সে কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে রইল চুপচাপ; যেন তার মনের ভিতর থেকে উত্তরটা নিজেই খুঁজে নেবে। তিলোত্তমার অদ্ভুত লাগল। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “আসলে বাড়িতে কেউ নেই। এখনই ফিরে গিয়ে কি করব, তাই আর কি।”

“ও, আচ্ছা,” ধৃতিমান মাথা নাড়ল, “কোথায় গিয়েছেন সবাই?”

“আমার জেঠুর বাড়ি।”

“আই সী। তা, আপনি গেলেন না?”

“না, আমার এখন কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। জানুয়ারি মাসে প্রি-বোর্ড তো।”

“বাবা, আপনি দেখছি সাংঘাতিক সিরিয়াস মেয়ে! এখনও মাসখানেকের উপর দেরি আছে, এর মধ্যেই একটা বেলাও বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন!”

“এটা একটা বেলার ব্যাপার নয় তো,” তিলোত্তমা হাসল, “ওরা উইক-এণ্ড কাটিয়ে ফিরবে।”

“ও... !” ধৃতিমান কিছুক্ষণ কি যেন ভেবে নিয়ে বলল, “দুটো দিন বাড়িতে আপনি একা?”

তিলোত্তমা অবাক হয়ে দেখল, তার মুখে আবার সেই অভিব্যক্তি — সেদিন ট্যাক্সিতে যেমন তার গলার স্বরে অকপট ভাবনা প্রকাশ পেয়েছিল, ঠিক তেমন। চোখের কোণটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল। সেই ছোটবেলা থেকে আজ অবধি তিলোত্তমার মনটা শুধুই অন্ধকারে ভরে উঠেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও একটা মানুষকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না সে। কিন্তু এ যেন নাছোড়বান্দার মতো তার অবিশ্বাসের দরজা ভেঙে ঢোকার চেষ্টা করছে; জেনে-বুঝে, বা নিজের অজান্তেই, যাই হোক না কেন!

তিলোত্তমা হাসবার চেষ্টা করে বলল, “দুটো রাত একা থাকা তেমন কিছু ব্যাপার নয়। মেয়ে মানেই আমাকে অসহায় ভাবার কারণ নেই।”

কথাটা শুনে ধৃতিমানের মুখটা যেন কেমন একরকম হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর হঠাৎ বেশ জোরের সঙ্গে বলে উঠল, “মেয়েদের অসহায় আমি ভাবি না। আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার চার বছর বয়স; ভাই সবে হয়েছে। আমার মাকে তখন একটা লোক সাহায্য করতে আসেনি, উলটে যা হয় আরকি। সিঙ্গল মাদার মানে লোকে ধরেই নেয় যে ইজি টার্গেট। আমার মা কিন্তু সব ব্যাটাকে একাই ঢিট করে দিয়েছিলেন। আর এমনও নয় যে এক আদর্শ ত্যাগী নারীর মতো সারা জীবন বসে বসে শুধু ছেলে মানুষ করেছেন। শি হ্যাজ হ্যাড আ থ্রাইভিং ক্যারিয়ার। তাঁর জীবনে অন্য লোকের প্রেম-ভালবাসা সবকিছুই এসেছে; জীবনটাকে কখনও বাঁচতে ভুলে যাননি। এমন মায়ের ছেলে হয়ে, মেয়েদের আমি কি করে অসহায় ভাবব? সেটা ফ্যাক্টর নয়। তবে কি বলুন তো; আপনি এখনও খানিকটা ছোট, আর যে জায়গাটায় আপনাদের বাড়ি, সেটা মোটেই একটা সেফ এলাকা নয়। ওখানে ধারেকাছে তো একটা লোকও থাকেনা; ভগবান না করুন, কিছু একটা এমার্জেন্সি হলে সামলানো মুশকিল। আপনার জায়গায় আমি থাকলে আমি কিন্তু যথেষ্ট ভয় পেতাম।”

তিলোত্তমা হতভম্ব হয়ে ধৃতিমানের দিকে তাকিয়েছিল। এই প্রথমবার বোধহয় একসঙ্গে এতগুলো কথা খরচ করতে শুনল ওকে। বিষয়টা যে এত ব্যক্তিগত দিকে গড়িয়ে যাবে, সেটা কল্পনাতেই আসেনি! ধৃতিমানও বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেছে।

একটু অপ্রস্তুতভাবে বলল, “সরি। আই গট পার্সোনাল। আসলে আপনার কথায় আমার একটু আঁতে লেগে গেল।”

তিলোত্তমা আমতা আমতা করে বলল, “না... আসলে আমার একা থাকা অভ্যেস আছে। মাঝে মাঝেই তো...”

“বুঝলাম।”

ধৃতিমান রাস্তার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কিছুটা যেন স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল, “তাহলে কোথায় যাচ্ছেন তার কোনো ঠিক নেই, কেমন?”

তিলোত্তমা আরও একবার চমকে উঠল। এর সঙ্গে যতবারই দেখা হয়েছে, ততবারই মনে হয়েছে, যেন ছেলেটা সবকিছুই জানে। কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে?

তিলোত্তমা সংক্ষেপে বলল, “না।”

একটুক্ষণ কারুরই কোনো কথা নেই। অবশেষে তিলোত্তমাই জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথায় যাচ্ছিলেন?”

“আমি?” ধৃতিমান রাস্তার দিকে তাকিয়েই অন্যমনষ্কভাবে বলে যেতে লাগল, “সকালবেলা ন্যাশনাল লাইব্রেরী গিয়েছিলাম। সেখান থেকে গেলাম আমার পি.এইচ্‌.ডি গাইড-এর বাড়ি; ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের কাছে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন গোলপার্কের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। এখানে এসে টের পেলাম, বাড়ি যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।”

তিলোত্তমা সমস্তটা শুনে কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। কিছুটা যেন বোকার মতোই বলল, “তার মানে... আপনারও কোথাও যাওয়ার নেই।”

“ঠিক; আপনার, আমার, কারুরই কোনও গন্তব্য নেই। এটাকেই বলে কো-ইন্‌সিডেন্স। আবার দেখুন, দুই গন্তব্যহীন লোকের দেখা হল এই এক ব্যস্ত ভিড়ভাট্টার ক্রসিং-এর কাছে। এটাকে কি বলবেন? আয়রনি বোধহয়।”

তিলোত্তমা হেসে ফেলল, “আপনাকে দেখলে বোঝা যায়না, আপনার একটা সেন্স অফ হিউমার আছে।”

“তা, মুখ দেখে আর মানুষের কতটুকু বোঝা যায় বলুন।”

“পি.এইচ্‌.ডি-র কথা বলছিলেন — আপনিও কি ল’ নিয়েই...”

“না না। হোলোকস্ট হিস্ট্রির উপর করছি। কলেজে আমার সাবজেক্ট ছিল আধুনিক য়ুরোপীয় ইতিহাস।”

তিলোত্তমার হঠাৎ করে ইলেক্‌টিভ ইংলিশ ক্লাসে পড়ানো একটা কবিতার কথা মনে পড়ে গেল; ছোট্ট পাঁচ-ছয় লাইনের মোটে। কবি নাকি হিটলারকে মনে করে লিখেছিলেন সেটা! সে বিড়বিড় করে বলে ফেললঃ

“When he laughed, respectable senators burst with laughter.
And when he cried the little children died in the streets.”
ধৃতিমান শুনতে পেয়ে অবাক হয়ে বলল, “আপনি অডেন-এর কবিতা পড়েছেন নাকি?”

“আপনিও?” তিলোত্তমা ততোধিক অবাক হয়ে বলে।

ধৃতিমান হেসে বলল, “আমার আবার টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির ইংরেজি কবিতা খুব প্রিয়। বিশেষ করে মডার্নিস্ট আর অডেন-গ্রুপের।”

তিলোত্তমা খানিক চুপ করে থেকে তারপর বলল, “আচ্ছা, কাকানের সঙ্গে কিভাবে বন্ধুত্ব হল?”

“একই য়ুনিভার্সিটি তো — লাইব্রেরীতে মাঝে মাঝেই দেখা হত। খুব বেশিদিন পরিচয় নয় অবশ্য। এই ধরুন, বছর-দেড়েক।”

“আই সী।”

“কফি চলবে?”

তিলোত্তমা থতমত খেয়ে বলল, “কফি?”

“সি.সি.ডি কাছেই তো। অবশ্যই আপনার আপত্তি না থাকলে।”

তিলোত্তমা একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “না আসলে... মানে আজকে আমি বেশি টাকা নিয়ে বেরোইনি...”

ধৃতিমান অবাকভাবে মাথা নাড়ল, “কি অদ্ভুত! ভাবলেন কি করে আমি আপনাকে বিল পে করতে দেব? বড়দের সঙ্গে কোথাও গিয়ে ছোটরা টাকা দেয়, শুনেছেন কখনোও?”

তিলোত্তমা আরোই অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না, কিন্তু আপনাকে তো ঠিক সে অর্থে —”

“বড় বলা যায় না?” ধৃতিমান হেসে উঠল, “আমার বয়স কত জানেন? টোয়েন্টি ফাইভ। আপনার চেয়ে অনেক বড় আমি।”

তিলোত্তমা স্বগতোক্তি করল, “কাকানের থেকে ছোট।”

“হে ভগবান!”

“না, না, চলুন।”

*

নীরা একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ওদের দিকে। অন্ধকার হয়ে গেলেও তিলোত্তমাকে স্পষ্টই ঠাওর করা গেল, রাস্তা পেরোচ্ছে। কিন্তু সঙ্গে ওটা আবার কে? রাহুল তো নয়... ওর কাকুও নয় খুব সম্ভব; তাকে বোধহয় একবার কোনও একটা ছবি-টবিতে দেখেছিল। তবে কি... তবে কি সেই অন্য লোকটা, যার কথা তিল্লী সেদিন ক্লাসে বলছিল? হতেও পারে... কি তাল-ঢ্যাঙা রে বাবা! তিলোত্তমাই বেশ লম্বা, এ তাকে হাত-দেড়েক ছাড়িয়ে গেছে। ... কিন্তু, এর সঙ্গে এখন কি করছে তিল্লী? ... তবে কি রাহুলের সঙ্গে ইতিমধ্যে ব্রেক-আপ হয়ে গেল? কই, তেমন কিছু তো শুনতে পায়নি? অবশ্য তিল্লী যা মেয়ে, লুকিয়ে পাঁচটা খুন করে এলেও কেউ সারা জীবনে জানতে পারবে কিনা সন্দেহ...

“অ্যাই নীরা, কি হল তোমার?” রুদ্রর ডাকে চট্‌কা ভাঙল নীরার।

“না, কিছু না... আসলে হঠাৎ মনে হল যেন একজন চেনা লোককে দেখতে পেলাম।”

“ওঃ... কাকে দেখলে?”

“ওই, স্কুলের এক বন্ধু।”

“আচ্ছা। যাইহোক, এটা রাখো,” রুদ্র একটা চৌকো-মতো ফাইল বাড়িয়ে দিল ওর দিকে।

নীরা অবাক হয়ে বলল, “মানেটা কী!”

“তুমি যে অনেকক্ষণ ধরে ওই ফোল্ডারটা নাড়াচাড়া করছিলে সেটা দেখলাম। মনে হল পছন্দ হয়েছে।”

“রুদ্র, য়ু আর নাট্‌স! আমি এটা কিছুতেই নিতে পারব না! এটার সাতশো টাকা দাম!”

দুজনে ঘুরতে ঘুরতে ক্রসিং-এর ধারের ফুটপাথে পুরোনো বইয়ের দোকানে এসে পড়েছিল। অনেকরকম বিষয়ের উপর বই পাওয়া যায় এখানে। নীরার অবশ্য ফোল্ডারগুলোতেই চোখ আটকে গিয়েছিল। এক একটায় এক একজন বিখ্যাত চিত্রকরের আঁকা বিভিন্ন ছবির কপি রাখা। সেগুলো ঘাঁটতে গিয়ে মনে-র একখানা ফোল্ডার বেরোল। প্রায় গোটাদশেক ছবি ভরা আছে ওতে! ওর পক্ষে এক সাংঘাতিক লোভনীয় বস্তু, কিন্তু দোকানদার যা দাম হাঁকলে তাতে নীরা নিঃশ্বাস ফেলে জিনিসটা রেখে দিল। দু-তিনমাসের হাতখরচ জমিয়ে কেনা যায় হয়তো। ইস, আগে জানলে আর অন্য সব হাবিজাবিগুলো কিনে পয়সাগুলো নষ্ট করত না! অবশ্য সেটুকুতেও মোটে কুলোত না, এক যদি না ধস্তাধস্তি করে দাম খানিক কমানো যেত। নীরা আবার একেবারেই দরদাম করতে পারেনা। এইসব ভাবতে ভাবতেই খানিকদূর চলে গিয়েছিল, আর তখনই তিলোত্তমার দিকে চোখ পড়ল। এখন খেয়াল হতেই দেখে রুদ্র ফোল্ডারটা কিনে বসে আছে!

“সাতশো নয়,” রুদ্র জিতে যাওয়া হাসি হাসল, “পাঁচশো টাকা। একটু বারগেন না করলে চলে নাকি?”

“কিন্তু —”

“আরে, কি মুশকিল!” রুদ্র এবার অধৈর্য্যভাবে বলে, “ভেবে নাও না এটা তোমার বিলেটেড বার্থডে গিফ্‌ট? তোমার সঙ্গে তো তখনোও আলাপ হয়নি, তাই এখন দিলাম।”

নীরা খানিক দোনামোনা করে তারপর জিনিসটা নিয়েই ফেলে। সত্যি, মনে-র লোভ সামলানো খুবই কঠিন!

“কি বলে থ্যাংক্‌স দেব, সে আর —”

“আরে, রিল্যাক্স, কিচ্ছু বলতে হবে না,” রুদ্র হাত তুলে থামিয়ে দেয়, “আমারই ইম্‌প্রেশানিস্টদের আঁকা ছবি দেখে মনে হয় ঘরে টাঙিয়ে রাখি, আর তুমি তো নিজেই আর্টিস্ট।”

নীরা অবাক হয়ে বলে, “তুমি ইম্‌প্রেশানিস্টদের চেনো?”

“অফ্‌ কোর্স! কে না চেনে? আমার অবশ্য ওদের আগে রোম্যান্টিক ল্যান্ডস্কেপ পেন্টারদেরও খুব ভাল লাগে, বিশেষ করে টার্নার...”

নীরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল রুদ্রর দিকে। সে আপন মনেই বকে যাচ্ছিল, হঠাৎ ওর মুখের ভাব দেখে অবাক হয়ে বলল, “হোয়াট্‌স রং?”

নীরা অবিশ্বাসের স্বরে বলল, “না মানে... তোমার কথা শুনছি। য়ু নো সো মাচ অ্যাবাউট আর্ট!”

“ধুর, ‘সো মাচ’ আবার কি!” রুদ্র অপ্রস্তুত হয়ে বলে, “আমার জাস্ট ছবি দেখতে খুব ভাল লাগে।”

*

কখন যে ঘড়ির ছোট কাঁটাটা আটের ঘরে সরে গেছে, টেরও পায়নি। খেয়াল পড়তেই লাফিয়ে উঠল তিলোত্তমা।

“কি সর্বনাশ! ভীষণ দেরি হয়ে গেল যে! আমি উঠি।”

ধৃতিমানও উঠে পড়ে বলে, “দাঁড়ান, দাঁড়ান। এতটা পথ যাবেন কি করে? তাও আবার শীতের রাত —”

“ও আমি কিছু একটা ধরে চলে যাব, আসছি।”

তিলোত্তমা অস্থির হয়ে বেরোতে যাচ্ছিল, কিন্তু ধৃতিমান ওর কাঁধে হাত রেখে থামিয়ে দিল।

“একা একা যাবেন না। আপনি নিজেকে অ্যাডাল্ট ভাবেন আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু পথটা মোটেই সেফ নয়; আমিও ওইদিকেই থাকি তো, আমি জানি। তাছাড়া, আপনাকে এতক্ষণ আমিই বসিয়ে রেখেছিলাম, তাই আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আমার উপরেই বর্তায়। আমি আপনার বাড়ির লোকেদের মতো নিশ্চিন্ত হতে পারছি না, আই অ্যাম সরি।”

তিলোত্তমা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ পর কথা খুঁজে পেয়ে বলল, “আচ্ছা... ঠিক আছে, নাহয় আপনি পৌঁছেই দেবেন, তার জন্য এত বকছেন কেন?”

ধৃতিমান একটু চুপ করে থেকে বলল, “মাঝে মাঝে বকার জন্যেও কাউকে দরকার হয়। যা হোক, চলুন।”

ট্যাক্সিতে চেপে কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলল না। অবশেষে ধৃতিমান একটু অপ্রস্তুতভাবে শুরু করে, “আপনার বাড়ির লোকেদের নিয়ে আমার কিছু বলা উচিৎ হয়নি। আজকে আমি একটার পর একটা বাজে কথা বলছি। রিয়লি সরি।”

তিলোত্তমা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “খুব একটা ভুলও বলেননি। আমার ফ্যামিলি... ওরা আমার ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন।”

“কেন বলুন তো?”

“আমি মেয়ে বলে।”

“কি বলছেন? আপনার মতো একটা ফ্যামিলিতে —”

“হয়। আপনি হয়তো বুঝবেন না।”

“কেন?”

“আজ অনেকক্ষণ ধরে আপনার সঙ্গে কথা বলে মনে হল দুনিয়া-সম্পর্কে আপনি একটু বেশিই আশাবাদী।”

“... আপনি নন্‌?”

“আমি? আমি রিয়লিস্টিক।”

বাকি পথটা বিশেষ কথা হয় না। ট্যাক্সিটা কিছুতেই তিলোত্তমাদের বাড়ির গলি অবধি ঢুকতে রাজি হল না। বড় রাস্তার উপরেই দাঁড় করিয়ে দিল ওদের।

“আপনার নামার কি দরকার? ট্যাক্সি ছেড়ে দিলে তো অনেকটা না হেঁটে কিছু পাবেন না!”

“অত চিন্তা করবেন না; আমার বাড়ি এখান থেকে খুব বেশি দূর নয়। এ জায়গাটা বেশ অন্ধকার, আপনার বাড়ি অবধি যাব আমি।”

ধৃতিমান নেমে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দেয়। তিলোত্তমা ইতিমধ্যে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিল। গলির মাঝামাঝি এসেই হঠাৎ করে থমকে গেল সে।

রাস্তার ধারে স্ট্রীটলাইটের পাশের ছায়ার মধ্যে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃশ্যটা বেশ অস্বস্তিকর। তিলোত্তমা চোখ সরিয়ে নিতেই যাচ্ছিল, কিন্তু ওদের মুখের দিকে চোখ পড়তেই হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে উঠল। অন্ধকারের জন্য প্রথমটা মনে হয়েছিল ভুল দেখছে; কিন্তু না, এখন আর কোনও সন্দেহ নেই। ধৃতিমান ততক্ষণে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।

“কি হল, আপনি হঠাৎ —” তিলোত্তমার চোখ অনুসরণ করে দৃশ্যটার দিকে চোখ যেতে ধৃতিমানও থমকে গেল।

“গড্‌! পাবলিক প্লেসে যে এইগুলো করবার কি দরকার —” চাপা বিরক্ত গলায় বলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু কথা শেষ হবার আগেই তিলোত্তমা তার পাঞ্জাবির হাতা চেপে ধরল।

“চুপ! ওরা যেন টের না পায়।”

বাকিটা রাস্তা প্রায় ফেরারি আসামীর মতো স্ট্রীটলাইটগুলো এড়িয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে চলল। অবশ্য এত সাবধানতার দরকার ছিল না; ওই ছেলেমেয়েদুটোর কোনোদিকেই হুঁশ নেই তখন। ধৃতিমান অবাক হলেও কথা না বাড়িয়ে তাকে অনুসরণ করে গেল চুপচাপ। খানিক পরে গলিটা বাঁক নিতেই তিলোত্তমা দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁফ ছাড়ল একটা।

“ওরা কি আপনার চেনা কেউ?” ধৃতিমান জানতে চায়।

তিলোত্তমা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর অস্ফুটে বলল, “হ্যাঁ।”

“কে?”

তিলোত্তমার কানে নিজের উত্তরটা কেমন ঠাট্টার মতো শোনাল, “... আমার বয়ফ্রেণ্ড।”




(ক্রমশ)



(পরবাস-৭৭, ১০ জানুয়ারি ২০২০)