• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৪ | অক্টোবর ২০২১ | গল্প
    Share
  • লাকি নাম্বার : রাহুল রায়


    বিবারের এক সকালে আনন্দ তার বস্টনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেশ অনেকটা দূরে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই আউটলেট মল-টায় এসেছে। এখানে বছরের মধ্যে ছ’মাসের ওপরে গায়ে জ্যাকেট দিতে হয়, আর শীতকালে মোটা কোট, মাথায় টুপি, হাতে গ্লাভস ছাড়া কোন উপায় নেই। তাই কিছুদিন আগে অন-লাইন-এ নিজের জন্য একটা ‘হেভি’ কোট কিনেছিল। কিন্তু হাতে পাওয়ার পর দেখে তা গায়ে ঠিকমত ফিট করছে না, যদিও ছবি দেখে কিছুই বোঝা যায় নি। কোন কারণে তা দোকানে গিয়ে ফেরত দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। আর সেই জন্যই ৫০-৬০ মাইল রাস্তা ড্রাইভ করে মেরিম্যাক, নিউ হ্যাম্পশায়ার-এ আসা।

    আনন্দ স্থানীয় এক ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করছে। গ্র্যাজুয়েট স্টাইপেন্ড হিসাবে যা পায় তাতে বস্টনের আকাশচুম্বী বাড়ি ভাড়া দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে। তবে এদেশে গাড়ি ছাড়া জীবন চালানো মুশকিল, তাই একটা পুরনো গাড়ি কিনেছে। তাতে গ্যাসোলিন পুড়িয়ে এতদূর আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না আনন্দর, কিন্তু উপায় কি। তবে অক্টোবরের মাঝামাঝি পাতা ঝরার দিন বা ‘ফল সীসন’ একেবারে, যাকে বলে ‘ইন ফুল সুইং’। এই দেখতে দূর দূর থেকে লোকে আসে। আনন্দের আগে আসা হয়নি। কোট ফেরত দেওয়ার নামে তার এই সুযোগ হয়ে গেল। ঝরে পড়ার আগে মেপল, অ্যাশ, বার্চ ইত্যাদি গাছের পাতা লাল, কমলা, হলুদ, বাদামি রঙে সেজেছে। কোন এক শিল্পী যেন রঙ আর তুলি নিয়ে প্রত্যেকটি গাছের পাতা অনেক যত্ন নিয়ে রঙে-রঙ্গে ভরিয়ে তুলেছে। এর ক’দিন পরই সব পাতা ঝরে গিয়ে গাছগুলো একেবারে ফাঁকা ডালে আকাশের গায়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে। আনন্দ এসব দেখতে দেখতে যাচ্ছে আর মনে পড়ে যাচ্ছে সেই কবে শোনা — শেষ করে দাও শিউলি ফুলের মরণ সাথে/ শারদ প্রাতে আমার রাত পোহালো। দেশে তো এখন পুজো শেষ হয়ে বিজয়ার ভৈরবী বাজছে — তাই না? আনন্দর মনটা কেমন এক অজানা ব্যথায় ভরে উঠল।

    দোকানে পোঁছে ফেরত দেওয়ার জামাকাপড়গুলি দোকানের কাউন্টারে রাখতে সেখানে দাঁড়ানো মেয়েটি সব দেখে, টিকিট স্ক্যান করে বলল ফেরত-দেওয়া কোটের বাবদ ৬৬.৮৬ ডলার স্টোর ক্রেডিট হয়েছে। তাই দিয়ে অন্য যা কিছু এই দোকান থেকে এখন কেনা যাবে, অথবা পরে ফিরে এসে ব্যবহার করলেও হয়।

    আবার এতদুর আসা? নাঃ। কিন্তু কি কেনা যায়? মনে পড়ে গেল তার উইন্টার কোট অবশ্যই দরকার, আবার একটা গ্লাভসও আঙুলের কাছে ছিঁড়ে গেছে। শীত তো শীগগিরই আসছে, এগুলো দরকারই। এইভাবে এইসব টুকটাক কিনে, সব মিলিয়ে যেন ৬৬.৮৬ ডলারের কিছু বেশি হয় এমন অঙ্কটা মনে মনে হিসেব করে সে কাউন্টারে এসে দাঁড়িয়েছে। এর বেশি যা হয় আলাদা করে দিয়ে দেবে। কাউন্টারের মেয়েটি সব মিলিয়ে কম্প্যুটার স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো — ‘সিক্সটি সিক্স ডলার অ্যান্ড এইটি-সিক্স সেন্টস, প্লীস।’

    এই কথা শুনে আনন্দের প্রতিক্রিয়া হোল একেবারে, যাকে বলে প্রায় চেয়ার থেকে পড়ার মত। এটা কী করে সম্ভব? ঠিক গুনে-গুনে, মিলিয়ে-মিলিয়ে না কিনলে একেবারে সঠিক ব্যালান্সে পৌঁছনো তো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এতো একেবারে, যাকে বলে মিরাকল, তাই।

    কিন্তু, মিরাকল–টিরাকলে তার কোন বিশ্বাস নেই। তাই নিজে বৈজ্ঞানিক বলে তার চিন্তার মোড় ঘুরল এই ঘটনার যদি কোন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায় কিনা সেদিকে। কোনরকম পরিকল্পনা ছাড়া তার একেবারে সঠিক ৬৬.৮৬ ডলারের জিনিস কিনে স্টোর ক্রেডিটের সংখ্যার সাথে মিলিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা পরিসংখ্যান বিজ্ঞান বা স্ট্যাটিস্টিকস অনুযায়ী বোধ হয় খুব কম। সে স্ট্যাটিস্টিকস ভালো জানে না। কিন্তু কোথায় যেন একটা গল্প শুনেছে যে একটা বাঁদরকে টাইপ রাইটার বা কম্প্যুটারের সামনে বসিয়ে দিলে সে এলোমেলো টাইপ করতে করতে একদিন না একদিন ‘হ্যামলেট’ লিখতে পারবে। এই গল্প বিশ্বাস করা মুশকিল। তাই বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি চালাতে চালাতে আনন্দ নিজেকে বোঝাল এটা নিতান্তই একটা ‘স্ট্যাটিস্টিকাল অ্যাবারেশন’ অথবা ‘বুদ্ধিতে যার বিচার চলে না’ গোছের ঘটনা। অতএব এই নিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ার কোন কারণ নেই।

    মাস তিনেক কেটেছে। নিউ হ্যাম্পশায়ার-এর সেই দোকানের আশ্চর্য ঘটনা আনন্দ প্রায় ভুলে গেছে। কিন্তু আবার অঘটন ঘটল, আবার সেই অপ্রত্যাশিত ভাবেই। সেদিন কাজ থেকে বাড়ি ফিরছে। সন্ধে সাতটা বাজে, কিন্তু জানুয়ারি মাসে এর মধ্যেই চারদিক একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে। আগের দিন স্নো পড়েছে কিছুটা, রাস্তা বেশ একটু পিচ্ছিল। তাই সে বেশ সাবধানে, অল্প গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ গাড়ি স্কিড করতে আরম্ভ করল। ড্রাইভার-ট্রেনিং স্কুলে পইপই করে বলে দিয়েছিল যে স্নোর ওপর গাড়ি স্কিড করলে ব্রেক চেপে ধরা একেবারে বারণ। কিন্তু এই অবস্থায় মাথা ঠিক রাখা অসম্ভব। সন্ধের অল্প আলোতে কাজ থেকে ফেরা ট্রাফিকের ভিড়ে চারপাশে গাড়ি। এদিকে তার গাড়ি নিজের ইচ্ছেমতো চলছে। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আনন্দ কিছুতেই গাড়িটাকে বাগে আনতে পারছে না। এ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। তাই সব সাবধানবাণী ভুলে গিয়ে আনন্দ সব শক্তি পায়ে এনে ব্রেক চেপে ধরল। আর সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা থামল তো না-ই, বরং এক পাক ঘুরে উলটো দিক থেকে আসা একটা গাড়িতে অল্প ধাক্কা দিয়ে থেমে গেল। আনন্দ গাড়ির মধ্যে বসে দরদর করে ঘামছে। একটা মস্ত বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে সে বেঁচে গেছে। তবে অন্য গাড়ির ক্ষতি বিশেষ কিছু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

    তার ধারণা ঠিক। একটু পরে উলটো দিকের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে আনন্দের গাড়ির জানলার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

    — ইয়ু আর লাকি। ড্যামেজ টু আওয়ার কার’স ইস নট মাচ। বাট ইয়ু কুড হ্যাভ বীন সিরিয়াসলি হার্ট ইফ আই ডিড নট স্টপ মাই কার।

    — ইয়েস। আই নো। থ্যাঙ্ক ইউ ফর সেভিং মাই লাইফ।

    এরপর অন্য গাড়ির ড্রাইভারের সাথে ইন্স্যুরেন্স-এর কাগজ-পত্র আদান-প্রদান করতে গিয়ে আনন্দের চোখ আটকে গেল সেই গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের দিকে — টি আর ৬ ৬ ৮ ৬। মাথাটা ঝম ঝম করে উঠলো আনন্দর। আবার সেই চারটে নাম্বার, নিউ হ্যাম্পশায়ারের সেই দোকানে পাওয়া। স্নো-তে স্কিড করে গাড়িতে ধাক্কা মারার ব্যাপারটায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তার সাথে সেই নাম্বারের জড়িয়ে থাকা আবার সেই মিরাকলের মতোই। আর যেন মিরাকলের মতোই সে একটা মস্ত বড় অ্যাকসিডেন্টের হাত থেকে বেঁচে গেছে।

    একটা ঝিম ঝিম করা মাথাব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরল আনন্দ। এরকম অঘটন বার বার ঘটা, ও কারও জীবনে একই নম্বর ঘুরে ঘুরে আসার সম্ভাবনা সেই ‘বুদ্ধিতে যার বিচার চলে না’-র মতোই ব্যাপার। তাহলে কি এই সংখ্যার বিশেষ কোন তাৎপর্য আছে? এটা কি বিশেষ কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছে? চারটে সংখ্যা পর পর সাজালে ক্যালেন্ডারের কোন বছরের বিশেষ একটা দিন হতেই পারে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ৬ই জুন তার চেনা-জানা কারওই জন্মদিন, মৃত্যুদিন বা অন্য কোন বিশেষ দিনের কথা আনন্দ মনে করতে পারল না। ইন্টারনেটে গিয়ে গুগুল সার্চ এঞ্জিনে জুন ৬, ১৬৮৬ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত খুঁজে দেখল আনন্দ। নাঃ, এইদিনে বিশেষ কিছু ঘটে নি পৃথিবীতে, নামকরা কেউ জন্মায় নি, মারাও যায় নি। তাহলে এই নাম্বার কেন তার কাছে বারে বারে ফিরে আসছে! আগু-পিছু অনেক ভেবেও আনন্দ এর কোন কূলকিনারা করতে পারল না।

    এদিকে এই বিশেষ সংখ্যার চিন্তায় আনন্দর নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাওয়ার অবস্থা হল। শেষে আনন্দর চিন্তাধারাটা একটু অন্য দিকে মোড় নিল। আচ্ছা, একেই কি লোকে লাকি নাম্বার বলে? শুনেছে অনেকে নাকি এইরকম নাম্বার নিয়ে লটারির টিকিট কেনে, আর তার ফলে নাকি বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া, অর্থাৎ লটারির মোটা অঙ্কের প্রাইজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়। এইসব ব্যাপারে আনন্দর কোন আস্থা নেই, কিন্তু বার বার ফিরে আসা সংখ্যার ব্যাপারে কোন মাথামুণ্ডু খুঁজে না পেয়ে শেষে আনন্দ যা তার কাছে অভাবনীয় তাই করে ফেলল।

    আনন্দের অ্যাপার্টমেন্ট যে রাস্তায় তার ঠিক উলটো দিকে একটা কনভেনিয়েন্স স্টোর বা বাংলায় যাকে বলে মনিহারি দোকান আছে। কত দিন পাশ দিয়ে যেতে যেতে আনন্দ দেখেছে দোকানের জানলায় নানারকম সাইন ঝোলানো আছে, কোনটায় মাথায় কাউবয় হ্যাট পরা, হাতে ল্যাসো, মুখে সিগারেট-ঝোলানো মার্লবোরো সিগারেটের কাউবয়ের ছবি। আবার কোনটায় ধোঁয়া-ওঠা কফির কাপের ছবি। তার তলায় লেখা --দ্য বেস্ট কফি ইন টাউন। তার ওপর কে আবার মজা করে লিখে দিয়েছে — রিয়েলি? আর এক পাশে বেশ বড় বড় অক্ষরে আলো ঝিকমিক করা ‘লটারি’ লেখা নিয়ন-সাইন। আনন্দ বহুবার এই দোকানে ঢুকে খবরের কাগজ, কফি ইত্যাদি টুকটাক কিনেছে। দেখেছে একপাশে সার সার নানা রঙের লটারির টিকিট রোল করে রাখা আছে। তাদের গায়ে চৌকো চৌকো ঘরে দেওয়া আছে নানান নম্বর। আবার অন্য কোন সময় লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে সামনের কয়েক জনকে টিকিট কিনে, সেগুলোকে ভরতেও দেখেছে। তার বেশি দেখা বা জানার কোন উৎসাহ আনন্দর হয়নি।

    আজ কয়েকটা টিকিট কিনে নিজের ‘লাক’ পরীক্ষা করবে এই সংকল্প নিয়ে সে দোকানের কাউনটারে গিয়ে দেখে লটারির সংখ্যা কিছু কম নয়। আর কত তাদের নাম — ম্যাস-মিলিয়ন, পাওয়ার-বল, কিনো, লোটো, মেগা-মিলিয়ন ইত্যাদি। কাউনটারে দাঁড়ান লোকটাকে দাম চুকিয়ে দিয়ে তিনটে টিকিট কিনল আনন্দ। সে বদ্ধপরিকর যে সেই চারটে নাম্বার নিয়েই সে খেলবে। কিন্তু টিকিটে নম্বর ভরতে গিয়ে দেখে সব গুলোর জন্যই ছ’টা নম্বর দরকার। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করায় সে বলল যে চারটে নম্বর দিয়ে লটারির টিকিট এখানে নেই, তবে ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে।

    বাড়ি ফিরে ইন্টারনেটে চারটে নম্বরওলা বেশ কয়েকটা লটারির খবর পাওয়া গেল। চারটে নম্বর দিয়ে খেলা যায় বলে এতে জ্যাকপটের অঙ্ক বেশ কম, কিন্তু ছোট অঙ্কের কিছু-না-কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা ছয় অঙ্কের লটারির থেকে অনেকটা বেশি। আবার সেই স্ট্যাটিস্টিকসের ব্যাপার। এলোমেলো চিন্তা জোর করে বন্ধ করে সে বেশ কয়েকটা ‘ডেইলি ফোর’ নামের চার-নম্বরী লটারি টিকিট অন-লাইনে কিনে প্রত্যেকটিতে একই নম্বর বা ৬ ৬ ৮ ৬ লাগিয়ে দিল। দেখা যাক কি হয়। কাল সকালে দেখা যাবে তার ‘লাক’ কি বলে।

    রাত প্রায় দশটা বাজে, কিন্তু রাতের খাবারের জন্য কোন তাড়া নেই। এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে নজর পড়ল কিচেনের এক কোণে রাখা হুইস্কির একটা বোতল। সস্তার হুইস্কি। এ ছাড়া ওর কেনার সাধ্য নেই। আজ ঠিক করল একটু হুইস্কি না খেলে মাথা ঠিক হবে না।

    টিভি-র মুভি চ্যানেলে মাইকেল ডগলাস আর গ্লেন ক্লোস-এর ‘ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশান’ চালিয়ে দিয়ে সে হাতে হুইস্কি নিয়ে বসল। শীগগিরই বুঝল যে মুভিতে কি হচ্ছে তা তার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। সেই নম্বরগুলো তার মাথার মধ্যে তিং-পাং, তিং পাং করে লাফাতে লাফাতে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আনন্দ বেহুঁশ হয়ে এই মজা দেখছে। আর এই করতে গিয়ে তার খেয়ালই নেই যে সে কতবার বোতল থেকে হুইস্কি ঢেলেছে। হুইস্কি খেয়ে তার কোনদিন বিশেষ নেশা হয় না। কিন্তু, আজ এদিক-ওদিক ভাবতে ভাবতে বেশ অনেকখানিই গলা দিয়ে নামিয়েছে আনন্দ। অল্প একটু হুঁশ যখন হল তখন ওয়াল ক্লকটার দিকে কোনরকমে তাকিয়ে যা মনে হল তাতে বোঝা গেল রাত অনেক হয়েছে। কিচেনের আলো জ্বেলে রেখেই আনন্দ সোফায় টাল হয়ে শুয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল, আর একেবারে স্বপ্নে ভেসে গেল।

    আনন্দ দেখল সে মাতাদরের সোনালি গিল্টি করা ঝকমকে পোশাক, মাথায় কালো রঙের, কানাওলা বেরে টুপি পরে মস্ত একটা অ্যাম্ফিথিয়েটারে মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাকে চারদিক থেকে ঘিরে কয়েক হাজার লোক গ্যালারি থেকে ‘করিডা, করিডা, মাতাদর, মাতাদর’ বলে কান ফাটিয়ে চিৎকার করে চলেছে। আনন্দের ডান হাতে একটা লম্বা, সরু তলোয়ার আর বাঁ হাতে একটা টকটকে লাল কাপড়। তাতে নানান আঁকিবুকি করা, আর সোনালি রঙে জ্বলজ্বল করছে ৬৬৮৬ নম্বরটা। হঠাৎ একটা ঘণ্টা বাজল আর সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্ফিথিয়েটারের একটা দরজা দিয়ে একটা মস্ত কালো ষাঁড় শিং বাগিয়ে আনন্দকে দেখে এগিয়ে এল।

    আনন্দ হাতের লাল কাপড়টা মেলে ধরতেই জন্তুটা প্রচণ্ড রেগে চার্জ করল কাপড়টাকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দ জন্তুটার ধারালো শিং এড়িয়ে খুব দ্রুত পাশে সরে গেল। এইভাবে মাতাদরের লাল কাপড় ষাঁড়টার সামনে মেলে ধরে দ্রুত পাশে সরে যাওয়া, আর জন্তুটার ক্রুদ্ধ হয়ে, মুখে ফেনা নিয়ে চার্জ করা চলল কিছুক্ষণ। এদিকে দর্শকদের চিল-চিৎকারে কান পাতা দায়। তারা থেমে থেমে স্লোগান দিচ্ছে — ‘করিডা, করিডা, মাতাদর, মাতাদর’।

    এর আগেই ঘোড়ায় চড়া একজন ‘করিডা’ জন্তুটার চারদিকে ঘুরে ঘুরে উত্তেজিত করেছে, আর দূর থেকে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়েছে। আনন্দ দেখতে পেল ষাঁড়টার সারা গা ভীষণভাবে রক্তাক্ত, আর সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি দিয়ে আনন্দকে জরিপ করছে, যেন চার্জ করার আগে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। আনন্দের মতো অভিজ্ঞ মাতাদরের জানা আছে যে জন্তুটা তার শক্তির শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এদিকে দর্শকরাও রক্তের গন্ধ পেয়েছে। তাদের মধ্য থেকে সমস্বরে উন্মত্ত চিৎকার ভেসে আসছে — উনো, দোস, ত্রেস। তারা জানে যে ‘তিন’ গোণা শেষ হতেই মাতাদর তরোয়াল হাতে চার্জ করবে। আনন্দও অপেক্ষা করছে সেই মুহূর্তের জন্য।

    হঠাৎ ক্লান্ত ষাঁড়টা অতর্কিতে চার্জ করল। আনন্দ যেন এর জন্যই অপেক্ষা করছিল। টুক করে জন্তুটার প্রায় গা ঘেঁষেই সরে গেল, আর হাতের তরোয়ালটা সোজা ঢুকিয়ে দিল ষাঁড়টার পিঠের কুঁজের ভিতর দিয়ে একেবারে হৃদপিণ্ডের মধ্যে — এফোঁড়-ওফোঁড়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অত বড় রক্তাক্ত ষাঁড়টা মাটিতে শুয়ে পড়ল। আর উঠল না। এদিকে হাজার সম্মীলিত কণ্ঠে ‘মাতাদর, মাতাদর, মাতাদর’ বজ্রনির্ঘোষে কান কালা হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আর আনন্দ এক হাতে লাল কাপড়, আর অন্য হাতে মাথার টুপিটা তুলে ধরে সেই অ্যারেনার এদিক থেকে ওদিকে ঘুরে ঘুরে দর্শকদের অভিবাদন জানাল মাথা নিচু করে।

    হঠাৎ আনন্দের ঘুম ভেঙে গেল। ঘামে সারা শরীর, সোফা সব এক্কেবারে জবজবে ভিজে। কিচেনের আলোটা সোজা চোখের ওপরে পড়ায় সে হাত দিয়ে চোখে চাপা দিয়ে ঠিক কি হয়েছে বোঝার চেষ্টা করল। একটু বেশি মাত্রায় ড্রিঙ্ক করে সে সোফায় শুয়েই রাতটা কাটিয়েছে। কিন্তু সে এত ঘামছে কেন? কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছে কি? কিছুই মনে করতে পারল না আনন্দ। তাছাড়া, দুটো ব্যাপারে সে ভীষণ অবাক হল। সারা অ্যাপার্টমেন্টে কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। বাতাস ভাল করে শুঁকে আনন্দ বুঝল এ কোন এক জন্তুর গায়ের গন্ধ। কিন্তু তার অ্যাপার্টমেন্টে জন্তু এল কি করে! অনেক ভেবেও সে তার কোন কূলকিনারা পেল না। এদিকে গন্ধে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। উঠে গিয়ে সব জানলা খুলে দিল আনন্দ। বদ গন্ধ বেরিয়ে গিয়ে একটু টাটকা হাওয়া ঢুকুক। আর দ্বিতীয়ত, সে আবিষ্কার করল যে তার সোফার পাশে একটা বেশ বড়সড় লাল কাপড় এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে। তার গায়ে কি সব লেখা, যার থেকে ‘৮৬’ লেখা আছে পড়তে পারল আনন্দ। কোথা থেকে এল কাপড়টা? অনেক ভেবেও এই রহস্যগুলোর মাথামুণ্ডুর কোন হদিশ করতে পারল না আনন্দ।

    এদিকে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল ভোর হয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে বদ গন্ধটাও প্রায় চলে গেছে। কফি-মেকারে কফির গুঁড়ো আর জল দিয়ে সুইচ অন করে দিতেই তাজা, কড়া কফির গন্ধে সারা অ্যাপার্টমেন্ট ভরে উঠল।

    লিভিং রুমে বসে অলসভাবে কফিতে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ তার মনের ওপর থেকে একটা আবরণ সরে গেল — হঠাৎ কাল রাতে সে কি স্বপ্ন দেখেছিল সব মনে পড়ে গেল। সেই বুল-ফাইটের অভিজ্ঞতা। কানে ভেসে এলো হাজার-হাজার লোকের চিৎকার - উনো, দোস, ত্রেস। চোখের সামনে সে স্পষ্ট দেখতে পেল যে ষাঁড়টা চোখ লাল করে আর মুখে ফেনা নিয়ে তার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তবে অনেক ভেবেও শেষে যে কি হল তা সে কিছুতেই মনে করতে পারল না। কিন্তু এ তো কেবল স্বপ্ন। কিন্ত তার ঘরেতে সেই ষাঁড়টার গায়ের বিকট গন্ধ, আর সেই ‘লাকি নাম্বার’-লেখা লাল কাপড়টা যে কি করে এল, আনন্দ অনেক ভেবেও কোন হদিশ করতে পারল না। কিন্তু, কোথায় গেল কাপড়টা? সারা অ্যাপার্টমেন্ট অনেক খোঁজার পরও সেই কাপড়ের কোন টিকি পাওয়া গেল না। এতক্ষণ কি সে হ্যালুসিনেট করছিল?

    বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকার পর তার মনে হল লাকি নাম্বারটা কি তাহলে সত্যিই ‘লাকি’। প্রায় এক বছর আগে নিউ হ্যাম্পশায়ারের দোকানে অঙ্ক মিলিয়ে দেওয়া থেকে শুরু। তারপর গুরুতর অ্যাকসিডেন্ট-এর থেকে বাঁচানো। শেষে আবার বুল ফাইটে জন্তুর ধারালো শিংয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে ভয়ঙ্কর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত। তারপরেই মনে পড়ে গেল, আরে, এই নাম্বারটা ‘লাকি’ কিনা তা পরীক্ষা করার জন্যই তো লটারির টিকিটগুলো কেনা! গতকাল সকালে লটারির টিকিট কিনেছে। আর যেহেতু লটারিগুলো ‘ডেইলি লটারি’-র পর্যায়ের, তাহলে বিজয়ীর তালিকা তো আজ সকালের মধ্যেই বেরিয়ে যাওয়ার কথা।

    আনন্দ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল যে প্রায় ন’টা বাজে। মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা রয়েছে। কেন সে জানে না, তবু মনের মধ্যে একটা আশা অল্পসল্প হলেও উঁকি দিচ্ছে যে সেই লাকি নাম্বার দিয়ে সে লটারিতে কিছু পেতে যাচ্ছে। সে তার মনকে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছে না যে এরকম চিন্তা করার কোন কারণ নেই। কিন্তু এতগুলো অভাবিত ঘটনা ও ঘটনার ইঙ্গিত তার যুক্তিটুক্তিকে একেবারে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

    সে আস্তে আস্তে ল্যাপটপের ডালা খুলে ‘লগ-ইন’ করল। তারপর, তার কেনা বিভিন্ন লটারির সাইটগুলোয় এক এক করে গিয়ে সে তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছোট-বড় কোন উইনার-তালিকায়ই তার নাম দেখতে পেল না। অবসন্ন হয়ে ল্যাপটপের ডালা বন্ধ করল আনন্দ।



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)