• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮০ | অক্টোবর ২০২০ | উপন্যাস
    Share
  • কালসন্ধ্যা : মিহির সেনগুপ্ত
    পর্ব ৬ (শেষ)


    না, আমি দুর্বল নই। অক্ষয় স্বর্গলাভের অলীক স্বপ্ন দেখার মতো মূর্খতাও আমার নেই। মৃত্যু ভয় আমার কখনো ছিল না, এই মুহূর্তেও নেই। তবে বাঁচার আকাঙ্খায় আমি ভরপুর, যদিও বুঝতে পারছি, সময় আর বেশি বাকি নেই। তবু এখনও এই জীবনের অন্তে আমি যুধিষ্ঠিরের মতো মোক্ষ বা মুক্তি বলে কথিত এক কল্পিত অবস্থার প্রত্যাশী নই। আমার প্রত্যাশা ইহজাগতিক ভাবে লভ্য সবরকম সুখ, সম্পদ তথা আনন্দ সম্ভোগ করা। আমি অন্তে একটা স্বর্গেরই প্রত্যাশী, তা হল যেসব প্রজাগণের এতদিন আমি প্রতিপালন করেছি মৃত্যুর পর যেন তাদের স্মৃতিতে প্রশংসার স্বর্গে ভাস্বর থাকি। আমি সারাজীবন যে একমাত্র সৎ গুণটির অনুশীলন করেছি, তা হল প্রজাহিতৈষণার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো। সেই আমার উপযুক্ত স্বর্গ, মোক্ষ, মুক্তি। অন্য কিছুতে আমার বিশ্বাস নেই।

    যতই আস্তিক্যবাদী হোন, মহর্ষি বেদব্যাস যে বিপরীত যুদ্ধের কার্যক্রমটির সূচনা করেছেন, আমার মনে হয়, সেটাই তাঁর জন্য নির্ধারিত স্বর্গ বা ব্রহ্মপ্রাপ্তি হবে। সঞ্জয়ের অভিমতও তাই। সঞ্জয় ঠিক চার্বাকের মতো নাস্তিক্যবাদী নয়। যদিও সে অকৃতদার, ব্রহ্মচারী। তবে খুব একটা ঈশ্বরবাদী নয়। সঞ্জয় বলছিল, -- ‘ঋষি যেমন আমাকে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ চেয়েছিলেন, আমি তা হতে পারিনি। যুদ্ধে অনুষ্ঠিত অন্যায়ের মাত্রা যে পাণ্ডবপক্ষেই ভারী, সেই অভিমত এখনও আমাকে অস্থির এবং অভিমানী করে রেখেছে। ঋষিও জানেন আমার এই বিচার মিথ্যে নয়। কিন্তু ঋষি বলেন সে ব্যাপারে পূর্ণ নিস্পত্তির এখনও সময় আসেনি। সারা আর্যাবর্ত জুড়ে ক্ষুদ্র বৃহৎ ক্ষত্রিয় রাজন্যবর্গ যে অন্যায়, অত্যাচার তথা এককথায় অপরাধ জমিয়ে তুলেছিল, এই যুদ্ধে তা নিঃশেষ হয়নি। সমগ্র সমাজদেহে এই পাপের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে, তাকে দূষিত ও কলুষিত করেছে। তদুপরি এই যুদ্ধ বাসুদেব কৃষ্ণেরই ইচ্ছেয় সংঘটিত হয়েছে বলে ঋষি নিজেও বিশ্বাস করেন এবং তার ফলে ভিন্নতর পাপেরও উদ্ভব ঘটেছে। একারণে, ঋষি মনে করেন না যে এই যুদ্ধে কেউ বিজয়ী বা পরাজিত হয়েছে। এই চিন্তাকে বিশ্লেষিত করতে গিয়ে ঋষি নিজেই যেন এক জটিল দার্শনিকতার জালে আবদ্ধ হয়ে, সব কিছুর জন্য কালকে একমাত্র আশ্রয় করা ছাড়া ভিন্ন উপায় দেখেন না। এখানেই তার সংকট, মহারাজ। সম্ভবত মহাপ্রাজ্ঞ তথা মহাজ্ঞানী বাসুদেব কৃষ্ণেরও এরূপ সংকটই থেকে থাকবে।’ সঞ্জয়কে বলেছিলাম, -- ‘সঞ্জয়, আমার যা গতি হবার ছিল, তা হয়েছে। এখন শুধু প্রাণটুকু গেলেই আমি মুক্ত। এখন প্রজাশূন্য, স্বজনশূন্য পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাস সম্বল করে যুধিষ্ঠির এবং তার ভ্রাতারা রাজত্ব ভোগ করুক। তবে জেনে রেখো, এই পাপ আমার একার নয়। কৃষ্ণকেও এর প্রতিফল ভোগ করতে হবে।’

    সঞ্জয় আমার এই কথায় বলেছিল, -- ‘মহারাজ, কৃষ্ণ বিষয়ে আপনার যা অভিমত, আমার অভিমতও তার থেকে ভিন্ন নয়। কিন্তু মহারাজ, তৎসত্ত্বেও কৃষ্ণ অশেষ গুণসম্পন্ন, জ্ঞান এবং বুদ্ধির অধিকারী বলে আমি মনে করি। আপনি কি কৃষ্ণের ঈদৃশ গুণাবলির কথা আদৌ স্বীকার করেন না?’ বললাম, -- ‘কৃষ্ণের এইসব গুণ বিষয়ে আমি সম্যক অবহিত, নচেৎ পাণ্ডবপক্ষীয় কারোরই সম্ভব হতনা আমাকে আমার এগারো অক্ষৌহিনী সেনাবলসহ এভাবে ধ্বস্ত করা। কৃষ্ণের বিচক্ষণতার যে কোনোই তুলনা হয় না, সেকথা যদি প্রথমে আমি বুঝতাম, তাহলে আজ পরিস্থিতি ভিন্নতর হত। কিন্তু আজ বিভিন্ন সময়ের স্মৃতি মনে যখন জাগরূক হচ্ছে, বুঝতে পারছি, আমি প্রতিটি ক্ষেত্রেই কৃষ্ণের নিকট বুদ্ধিকৌশলে নিজেকে নিকৃষ্টতর বলেই প্রমাণ করেছি। বুদ্ধির প্রগাঢ়তায় কৃষ্ণ অবশ্যই শ্রেষ্ঠ।

    সঞ্জয়, আমার সর্বাধিক ত্রুটি ছিল, নিজের বুদ্ধি, শক্তি, বিচারবোধকে অন্যের তুলনায় সর্বাধিক উৎকৃষ্ট জ্ঞান করা। সে কারণে, পিতামহ ভীষ্ম ইত্যাদি, বিশেষ করে আমার মাতা গান্ধারীর পরামর্শকে আমি মূল্য দিইনি।’ সঞ্জয় বলেছিল, -- ‘মহারাজ, আপনি যথার্থ কথাই বলছেন এখন, কিন্তু হায়! এই বুদ্ধি যদি যথাসময়ে, অর্থাৎ দ্বারকায় অর্জুন এবং আপনি যখন সাহায্য প্রার্থনা করতে গেলেন, অথবা কৌরবসভায় কৃষ্ণের ভাষণ প্রদানকালে আপনার বিচারবুদ্ধি যথার্থ কূট রাজনীতিজ্ঞের অনুরূপ ছিলনা। আপনার বোঝা উচিত ছিল, এগারো হাজার কেন, এগারো কোটি নারায়ণী সেনাও একক কৃষ্ণের ক্ষমতার সমকক্ষ নয়। আপনি তখন বোঝেননি যে পরমচক্রী কৃষ্ণ সমগ্র পৃথিবীর তাবৎ রণদূর্মরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, শুধু একার বুদ্ধিকৌশলে বিজয়ী হতে সক্ষম। আবার দেখুন, তাঁরই ভাষণে যখন প্রবীণ কৌরবেরা এবং কুরুসভায় উপস্থিত আর্যাবর্তীয় রাজন্যকুল সকলেই মুগ্ধ তথা আশ্বস্ত যে, তাহলে বোধহয় ওই সর্বধ্বংসী যুদ্ধকে পরিহার করা গেল। পাণ্ডবদের দৌত্যে এসে তিনি তাঁদের জন্য মাত্র পাঁচখানি গ্রাম ভিক্ষে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি আপনার বিপুল শক্তি সমাবেশের দম্ভ এবং অভিমানে অন্ধ হয়ে, সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের কথা ভাবলেন না। আপনি চাইলেন, আবার পাণ্ডবদের বসবাসে পাঠাতে। ফলে, আপনার পক্ষের যাঁরা, তাঁরাও আপনাকে মুখে কিছু না বললেও, মনে মনে আপনার প্রতি বিরূপই হলেন।’

    ।। চোদ্দো ।।

    ঞ্জয় তার প্রস্থানের অব্যবহিত পূর্বে বলেছিল, --‘মহারাজ, আপনার ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে এত কথা বললাম বলে, মনে করবেন না যে আমি আপনার প্রতি কিছুমাত্র বিরূপ এবং কৃষ্ণের প্রতি আমার কোনোপ্রকার অতিভক্তি বা আসক্তি আছে। কৃষ্ণকে তাঁর প্রভূত গুণাবলির প্রশংসা করলেও, একথা বলছি যে তিনিই এই ভরতবংশ বিধ্বস্ততার কারণ। মহারাজ একারণে, এখনও তাঁকে আমি শত্রু রূপে গণ্য করি। কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষমতার দিক থেকে একটা মহাযুদ্ধের প্রকোপ থেকে মানবসমাজ এবং প্রকৃতিমণ্ডলকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েও তা না করে, যুদ্ধকে তথা ধ্বংসকে অবধার্যই করেন, তবে তিনি প্রকৃতই পক্ষ নির্বিশেষে সকলেরই শত্রু। কৃষ্ণ এমন এক ব্যক্তি, যিনি সক্ষম ছিলেন, এই কুরু-পাণ্ডব বিরোধকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করতে। মহারাজ, আপনার মাতা মান্যা গান্ধারী একদা কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, যেদিন যাদব কৃষ্ণ পাণ্ডবদের অনুকূলে নিজের প্রভাব বিস্তৃত করেন, সেদিন থেকেই আমি কুরুকুলের উপর শকুনী, গৃধিনীর রূক্ষচ্ছায়া দেখতে পেয়েছিলাম। যাদবেরা অত্যন্ত কলহপরায়ণ এবং উগ্রতার উপাসক। তাদের মধ্যে আবার কৃষ্ণ প্রগাঢ়রূপে কূটবুদ্ধিসম্পন্ন। অনেক গুণের অধিকারী হয়েও কৃষ্ণ অর্থ এবং ক্ষমতার প্রতি বিশেষভাবেই আসক্ত। এই যে পাণ্ডবদের সে যাদব অভিজাত বর্গের শক্তিসামর্থ্য দিয়ে সাহায্য করেছে, যুদ্ধশেষে সে কড়ায়-গণ্ডায় তার অর্থমূল্য তাদের নিকট থেকে সংগ্রহ করে ছাড়বে। এখন যুদ্ধ শেষ বলা যেতে পারে। সুতরাং, আমার শেষ নিঃশ্বাস পড়লেই কাল থেকে হস্তিনাপুর প্রাসাদ, কোষাগার সব লুন্ঠিত হয়ে এরা নিজেদের মধ্যে ধন বন্টন কার্য শুরু করবে।

    যাদবেরা যা কিছুই করুক, অর্থের বিনিময় ছাড়া করে না। অবশ্য এটা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। ব্যাপারটা জাতিগত অভ্যেসের। কিন্তু আমার অবাক লাগে, কৃষ্ণ এবং অন্যান্য যাদব অভিজাতবর্গ যাঁরাই পাণ্ডব বা আমাদের পক্ষকে সৈন্য সাহায্য দিয়েছেন, তাঁরা মনে করেন যে এটা তাঁরা বন্ধুকৃত্য করেছেন। কিন্তু না, এর মধ্যে বন্ধুকৃত্যের কোনো স্থান নেই। কৃষ্ণের মধ্যে যে পক্ষপাতটুকু আছে, সেটা তার বন্ধুকৃত্যের জন্য। যেমন, তুমি যে আমার ভুলের কথা বলছিলে, সেটাই যদি বলি, অর্জুনের সেখানে যাওয়ার আগেই আমি কৃষ্ণসকাশে গিয়েছিলাম। কিন্তু অর্জুন যেহেতু আমাদের বয়ঃকনিষ্ঠ, সে কারণে তাকে আগে তার প্রার্থনা জানাবার সুযোগ দেওয়া হল। অথচ শিষ্টাচারসম্মতভাবে তার উচিত ছিল, আমার প্রত্যাশার বিষয়ে অগ্রে সুযোগ প্রদান করা। কারণ, আমরা পরস্পরের বৈবাহিক।

    আমি জানতাম, কৃষ্ণ কোনোভাবেই সখ্যভাবে আমার পাশে দাঁড়াত না। সেজন্যই তার ঈদৃশ কৌশল। তাই, অগত্যা এগারো হাজার নারায়ণী সেনা নিয়েই আমাকে সন্তুষ্ট হতে হল। কৃষ্ণ বলেছিল যে এই যুদ্ধে সে কোনো পক্ষ অবলম্বন করবে না বা অস্ত্রধারণ করবে না। কিন্তু অর্জুনের সারথী হয়েই সে সর্বার্থে তাদের পরিচালনা করে গেছে। মুখে যা বলেছে তার সবটাই ভণ্ডামি।’

    সঞ্জয় আমার এই বক্তব্যের সমর্থনে বলেছিল, -- ‘মহারাজ শুধু কৃষ্ণকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। একমাত্র বলদেব ব্যতিত অন্য যাদব প্রধানদের প্রায় সকলেই ভণ্ডামিতে পারদর্শী। যাদবদের কোপনতার স্বভাব বিখ্যাত। কথায় কথায় ধৃতাস্ত্র হয়ে তারা একে অন্যের প্রতি যুদ্ধের জন্য উদ্যত হয়। শুনেছি, আপনিই বলেছিলেন, আপনার বাল্যসখা সাত্যকি, এই অষ্টাদশ দিবসের যুদ্ধের কোনো একদিন, আপনার সহিত বহুক্ষণ যুদ্ধে যখন উভয়েই ক্লান্ত, তখন উভয়ের সম্মতিক্রমে খানিক্ষণ বিশ্রামের মানসে, তৃণশয্যায় পাশাপাশি শয়ন করে, ক্রমে বিশ্রম্ভ আলাপে মগ্ন হলেন। আপনার মনে তখন আপনাদের বাল্যকালীন নানান স্মৃতির উন্মেষ ঘটলে, আপনি খুব বিমর্ষ হয়ে বললেন, -- ‘সখা, ক্ষাত্রধর্মকে ধিক্‌। স্মরণ কর, আমরা বাল্যকালে কত আনন্দে পরস্পর ক্রীড়া উপভোগ করেছি। আর আজ আমরা একে অন্যের সহিত মরণপণ যুদ্ধ ক’রে পরস্পরকে হনন করতে উদ্যত। তোমার কি মনে পড়ে না, আমরা দুজন বলদেবের নিকট গদাযুদ্ধ প্রশিক্ষণকালে, কত ক্রীড়া যুদ্ধে শস্ত্রাভ্যাস করতাম? হায়, কী আনন্দমুখর সেই ক্রীড়াযুদ্ধ! আর আজ? আজ দেখ, আমরা যুদ্ধ করছি একে অন্যের মস্তক চূর্ণ করার জন্য। ধিক ধিক এই ক্ষত্রিয়াচার।’

    সাত্যকি আপনার এই সুমানবিক অনুভূতির প্রতি কোনোরূপ মনোযোগ না দিয়ে, অকস্মাৎ উত্থিত হয়ে বললেন, -- ‘ওসব বালখিল্য ভাবনা পরিত্যাগ ক’রে ওঠো এবং যুদ্ধ কর। এখন আর আমরা বাল্যকালেও নেই, সখাত্বেও নেই। আমরা এখন পরস্পরের শত্রু।’ মহারাজ, এই বৃত্তান্ত শুনে আমার মনে হয়েছিল, সাত্যকি যদি ওই সময়ে আপনার মানসিক অবস্থার অনুগামী হতে পারতেন, দুজনের প্রচেষ্টায় তখনও যুদ্ধ বন্ধ করে এই মহাবিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়া যেত। কিন্তু হায় পরিতাপ! আপনার অর্জিত ওই সম্ভাবনাটুকু সাত্যকির কঠিন প্রাণকে স্পর্শ করল না। মহারাজ, এইসব মুহূর্ত মানুষের জীবনে খুব বেশিবার আসেনা, অথবা বেশিক্ষণ স্থায়ীও হয় না। এই মানসিকতা মানুষের মহৎ তপস্যালব্ধ।’

    সঞ্জয় যতক্ষণ উপস্থিত ছিল, আমি যেন শরীর-মানস তাবৎ ক্লেশ থেকে মুক্ত ছিলাম। তখন আবার অসীম একাকীত্বে, নিজস্ব কৃতকর্মের জন্য অনুতাপানলে দগ্ধ হতে হতে গুরুপুত্র অশ্বত্থামা এবং আর দুই যোদ্ধার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া, আর কিছু করণীয় নেই।

    ক্রমশ অধিকতর ভাবে উপলব্ধি করছি, তাঁদের, বিশেষ করে অশ্বত্থামার এরূপ হঠকারি সিদ্ধান্তে আমার সম্মতি প্রদান আদৌ প্রয়োজন ছিল না। পাণ্ডবপক্ষে সাতজন অতিরথ এবং আমার পক্ষে আমি ব্যতিত আর তিন জন যোদ্ধা জীবিত। যদি প্রাণে বাঁচিও, আমার দুই জানুর উপর ভর দিয়ে যুদ্ধ করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তাছাড়া, সকল স্বজনদের হারিয়ে, আর কার জন্য রাজ্যলাভের প্রচেষ্টা করব? গুরুপুত্র যতই আস্ফালন করুক এবং তার নিকট যে অস্ত্রই থাকুক না কেন, কৃষ্ণ, মহর্ষি বেদব্যাস এবং দেবর্ষি নারদ যথাসম্ভব চেষ্টা করবেন যাতে অশ্বত্থামা তার মহাস্ত্র প্রয়োগ করতে না পারে। এই অস্ত্র শুধু শত্রু নাশের জন্য ব্যবহৃত হওয়া অনুচিত। শত্রুমিত্র এবং সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জ, এমনকী গর্ভস্থ শিশুরা পর্যন্ত এই অস্ত্রের ভয়ঙ্করতা থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে না। অশ্বত্থামা মহাবীর, কিন্তু সে প্রাণভয়ে অত্যন্ত ভীত ব্যক্তি। তাই ভাবছি, অদ্য রজনীর ক্রুর যুদ্ধে সে তার এই অস্ত্র প্রয়োগ না করলেই প্রকৃতিপুঞ্জের জন্য মঙ্গল। হায়! আমি অশ্বত্থামাকে নিরস্ত না করে কেন অপযশের ভাগী হতে চলেছি? তাকে আকস্মিক হঠকারি মানসিকতায় সৈনাপত্যে বরণ করা খুবই অন্যায্য কাজ হয়েছে। জীবনের এই অন্তিম মুহূর্তে এসেও আমি স্বীয় অবিবেচনাপ্রসূত কর্মের দ্বারা অকারণ এক সর্বনাশের সম্ভাবনার সৃষ্টি করলাম! গুরু দ্রোণ মাত্র দুইজনকে এই অস্ত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা এবং প্রিয়তম শিষ্য অর্জুনকে। অর্জুন বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অনুশীলন দ্বারা এই অস্ত্রের সংবরণ বিদ্যাও আহরণ করেছিলেন। গুরু বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি এই অস্ত্র প্রয়োগ যেন কখনোই না করা হয়’। গুরুপুত্র এর সংবরণে সক্ষম নয়। সেই শিক্ষা তার আয়ত্ত হয়নি। অস্ত্রটির নাম ব্রহ্মশির বলে আমি শুনেছিলাম। নিজের উপর সম্পূর্ণ সংযম না থাকলে এই অস্ত্র কোনো আচার্য তাঁর শিষ্যকে শেখান না। সহজে লোভ বা ক্রোধ পরবশ শিষ্যকে আচার্য কখনো এই মহাস্ত্রে দীক্ষিত করবেন না। আমার এখন মনে হচ্ছে, গুরুপুত্রের এই অস্ত্রের কথা তাকে সৈনাপত্যে অভিষেক করার সময়ে আমার স্মরণ ছিল না। অবশ্য আমি নিজেও কি আদৌ রিপু বিষয়ে সংযমী? এখন আকাঙ্ক্ষা এই যে কোনো অবস্থায়ই যেন অশ্বত্থামা এই মহাস্ত্রের প্রয়োগ না করে। বিষয়টা এমনও তো হতে পারত যে আমার স্মরণে থাকলে আমিই তৎক্ষণাৎ তাকে তা প্রয়োগ না করার জন্য বাধ্য করতাম না। এখন অনেকটা সময় ধরে নানারকম পরিতাপে দগ্ধ হয়ে হয়ে আমার চিন্তার এই পরিবর্তন ঘটেছে।

    গোটা আর্যাবর্তের অধিকাংশ রাজ্যের রাজকুমার এবং প্রতিপত্তিশালী বীর কুল, আচার্যের নিকট অস্ত্রশিক্ষাকালে এইরূপ অস্ত্র শিক্ষার প্রত্যাশী ছিল। কিন্তু আচার্য ওই দুইজন ব্যতিত অন্য কাউকেই সেই সুযোগ দেননি। অন্য কোনো আচার্য এই অস্ত্র বিষয়ে কিছু জানেনই না, শেখানো তো দূরস্থান। এমনকী মহাধনুর্বিদ পরশুরামও এই অস্ত্র সম্পর্কে কিছু জ্ঞাত নন। বস্তুত, এই অস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়। মানুষের উপর এর প্রয়োগ নিষিদ্ধ, কিন্তু আমি ভাবছি, যে অস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না, তার প্রয়োজন কী? কুশলীরা তাহলে কেন এই অস্ত্রের উদ্ভাবনা করেছেন? যাঁরা এই অস্ত্রের উদ্ভাবক তাঁদের মনে কী অস্ত্র ব্যবহারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য আছে? যা মনুষ্য সমাজের ব্যাপক যুদ্ধজীবিরা এখনও জেনে বুঝে উঠতে পারেনি? কিংবা এমনও কী হতে পারে না যে এই অস্ত্রের উদ্ভাবকদের মনোগত ইচ্ছা, মনুষ্য সমাজে যেন যুদ্ধের সম্ভাবনাই চিরতরে লুপ্ত হয়ে যায় এই অস্ত্রের ভীতির কারণে? কিন্তু আবার এও ভাবছি, যুদ্ধ মানুষের স্বভাবের মধ্যে নিহিত রিপুর কারণে চিরকাল ঘটে চলেছে এবং ঘটতে থাকবে। এই অস্ত্রের ভীতিও একদিন অভ্যাসে জীর্ণ হয়ে যাবে, সেদিন অনেকের আয়ত্বেই এই অস্ত্র এসে যাবে। মাত্র দুই বা তিন ব্যক্তির হাতে এই অস্ত্র না থেকে, এর নির্মাণকৌশল বিভিন্ন রাষ্ট্রের হাতে চলে যাবে। তখন কী অস্ত্রধারীরা সকলে সংযমী হবে?

    না, আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার এখন একমাত্র কাজ হল, ওই তিন যোদ্ধার জন্য অপেক্ষা করা। একথা আর ভাবছিনা, তারা এই কুশ্রী, কদাচারী নৈশযুদ্ধে সার্থককাম হবে, অথবা নিজেরাই নিহত হবে। শুধু ভাবছি, হত্যা, হিংস্রতা বন্ধ হোক্‌। মানুষ তাদের পূর্ণ আয়ুষ্কালব্যাপী জীবিত থাকুক। জীবা তবে ন মৃত্যবে। আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধসম্ভাবনা চিরতরে লুপ্ত হোক। আগামী দিনের পৃথিবী অহিংসায় উজ্জ্বল হোক, পারস্পরিক প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসায় সুন্দর হোক। যুদ্ধ, হত্যা, মৃত্যুর অলাতচক্রের থেকে নবীন পৃথিবী বেরিয়ে আসুক। আমি আর পাণ্ডব, পাঞ্চাল, বিরাট প্রভৃতিদের ধ্বংস প্রত্যাশা করে গুরুপুত্র, আচার্য কৃপ এবং কৃতবর্মার অপেক্ষায় কোনো সুখস্বপ্ন দেখছি না। বরং তারা যেন অকৃতার্থ হয় এমনই আমার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা এখন।

    অনেক ভাবতে পারছি না। তবে যতটুকু চেতনা অবশিষ্ট আছে তাতে এটুকু বুঝতে পারছি যে আমার চিন্তন খুবই অসংলগ্ন, এটাও বুঝতে পারছি এই মুহূর্তের আমি আর এতকালের ভূমি এবং ক্ষমতালোভী, অহংকারী তথা অভিমানী দুর্যোধন এক ব্যক্তি নেই। অবশ্য এখন যে মনুষ্যসমাজের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় আমি ধীর নম্র সুবিবেচক রূপে ক্রমশ প্রাক্তন স্বভাব থেকে পরিবর্তিত হচ্ছি, তার বীজ আমার মধ্যে ছিলই। প্রজাহিতৈষীরূপে আমার সুখ্যাতি ইতোপূর্বে অবশ্যই ছিল। শুধু যা ছিল না, তা নিরহংকারী ব্যবহার। হায়! আমি যদি দাম্ভিকতা, আত্মম্ভরিতার ঊর্ননাভের জালে আবন্ধ না থেকে, সহজ সরল থাকতাম, এই জীবন অর্থপূর্ণ হতে পারত। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, নিজের আত্মম্ভরিতা আর হঠকারিতার জন্য আমি কুলের সকলকে এবং নিজেকেও মজালাম।

    আমি তো নিজেই জানতাম এবং প্রচার করতাম যে মানুষের জন্মের উপর তার নিজের কোনো হাত নেই। তাহলে পাণ্ডবেরা কার বা কাদের ঔরসজাত, সে বিষয়ে আমার দ্বেষ পোষণ করার কারণ কি? আমি সতত বলে এসেছি, পাণ্ডবেরা অজ্ঞাত কুলশীল, কুরুকুলের বংশগৌরব বা রাজরাজত্বের উপর তাদের কোনো দাবিই থাকতে পারে না। তাই যদি একমাত্র বিচার হয়, তাহলে শান্তনুপুত্র বিচীত্রবীর্যের ক্ষেত্রে মহর্ষি বেদব্যাসের ঔরসে জাত, আমার পিতা ধৃতরাষ্ট্র এবং পিতৃব্য পাণ্ডুর কৌরবত্ব কীভাবে লভ্য হয়। মহর্ষির বীজন্যায় এই যে তিনি মহাজননী সত্যবতীর কানীন পুত্র। সেক্ষেত্রে পাণ্ডুর অক্ষমতাজনিত কারণে, তাঁর মতানুযায়ী, কুন্তি, মাদ্রির স্বেচ্ছাহৃত (??) পুত্রদের কেন কুরুবংশের গৌরব প্রদান করা সম্ভব বলে আমি গণ্য করলাম না। প্রবীণ কৌরবেরা তো স্বচ্ছন্দে তাদের গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। আমাদের পিতা অন্ধরাজাও তো তার মধ্যেরই একজন। আসলে, মূল বিরোধের বিষয়টা ছিল রাজ-রাজত্বের অধিকারগত, বংশগত নয়। সেক্ষেত্রে পিতা এবং আমার বিচারে একদেশদর্শিতা এবং স্বার্থপরতা ছিল। একথা প্রবীণ কৌরবেরা, তথা ঋষিমুনি শুভার্থীগণ সকলেই আমাদের বলেছেন, আমরা তা মানিনি।

    এখানেই চার্বাকের দর্শনের সীমাবদ্ধতা আছে বলে এখন আমার মনে হচ্ছে। তার দার্শনিক মতে কোথায় যেন একটা সর্বগ্রাসী আত্যন্তিক ভোগবাদ নিহিত রয়েছে। সেখানে নৈতিক কোনো সূক্ষ্ম মানদণ্ড নেই। যতদিন বাঁচো, সুখে বাঁচো, ঋণ করে হলেও ঘৃত পান কর। কিন্তু, সকলেই যদি সুখের জন্য ঋণ করে ঘৃত পান করতে চায়, ঋণ দেবে কে?

    তবে এবার গুরুপুত্র এবং তার সহযোদ্ধারা আসুক। আমি তাদের বিজয় আর আকাঙ্ক্ষা করিনা। বরং তারা ব্যর্থ হয়ে পলায়ন করে আসুক। আমি সব অবসাদ ভুলে গিয়ে তাদের তাদের স্বাগত জানাব। আর হিংসা না ঘটুক, হত্যা, যুদ্ধ, বিরোধ সব দূরীভূত হোক এমনই আমার এক্ষনের প্রার্থনা।

    প্রার্থনা? আমি কোনোদিন প্রার্থনা করিনি। কারণ, আমি জানতাম না, কার কাছে প্রার্থনা করতে হয়। সখা এবং পথপ্রদর্শক চার্বাক নিজেও কোনো অপ্রাকৃত সত্ত্বায় বিশ্বাস করেন না, তাঁর অনুগামীদেরও তদনুরূপ শিক্ষা কখনো দেননি বা দেনও না। অবশ্য আমি যদিও চার্বাকের মতবাদের অনেকটাই পক্ষপাতী, কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ে আমি অজ্ঞেয়বাদিই বোধহয় থেকে গিয়েছি, তাই সম্ভবত এই স্বতোৎসারিত প্রার্থনা। জানিনা, এর কোনো সার্থকতা আছে কিংবা নেই। সেটা আমার অজ্ঞেয়তা বলা যায়।

    মাংসাশী হিংস্র শ্বাপদেরা এখন আর আমার প্রতিরোধে ভ্রূক্ষেপ করছে না। বোধহয়, তারা অনুভব করতে পারছে যে আমি আর নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম নই। আমার দেহনিঃসৃত শোণিতধারার আমন্ত্রণী গন্ধ তাদের আকৃষ্ট করছে। ক্রমশ নির্জীবতা আমাকে গ্রাস করছে। প্রকৃতিতে সব কিছুই সরব, একমাত্র আমি সেই সরবতার অংশী হতে পারছি না। একে একে যেন সব ইন্দ্রিয় নিশ্চয় আমাকে পরিহার করে চলে যাচ্ছে। একমাত্র শ্রবনেন্দ্রিয়ই কিছুটা শক্তি ধারণ করে আছে। সে কারণে, শুনতে পাচ্ছি শতসহস্র শবভোজী মাংসাশী শ্বাপদকুল, যুদ্ধে নিহতদের দেহ নিয়ে একে অন্যের সহিত একই প্রলুব্ধতায় হানাহানি করছে, যেরকম আমরা কৌরব-পাণ্ডবরূপী পশুতুল্যরা মাংসখণ্ডতুল্য ভূমিখণ্ড নিয়ে, এই অষ্টাদশ দিবস ব্যাপী হিংস্রতায় মত্ত ছিলাম।

    তাঁরা, অর্থাৎ পাণ্ডবপক্ষীয়গণ, বিশেষত প্রবীণ ও ঋষিগণ বলেন যে পাণ্ডবেরা ধর্মযুদ্ধ করেছে। সেই ধর্মযুদ্ধের সর্বশেষ পরিচয় তো এই যে চূড়ান্তভাবে যুদ্ধাহত আমাকে একাকী এই নির্জন, নিঃসহায় স্যমন্তপঞ্চকের তীরে ফেলে রেখে সবাই বিশ্রামার্থে প্রস্থান করল। এটা কি মানবতার ধর্ম? যুদ্ধের নিয়মবন্ধে তো এরূপ কোনো কথাই ছিল না। সেই মানবতার প্রতিজ্ঞা কোথায় গেল? তাহলে, আমি আর কতটা অধর্ম করেছি? হে কৃষ্ণ, তোমার অনুসারী ভক্তেরা তোমাকে পুরুষোত্তম বলে। দীনবন্ধু জগৎপতি, গোপেশ, গোপীকাকান্ত বলে ‘নমোহস্তুতে’ মন্ত্র উচ্চারণ করে। তোমাকে করুণাসিন্ধু, দীনবন্ধু বলে তারা তোমার আশ্রয় নেয়। না, আমি অহংকারী, অভিমানী দুর্যোধন কিছুতেই তোমার স্মরণ নেব না। মৃত্যুকে আমি বীরের আলিঙ্গনে গ্রহণ করব। তোমাকে আমি ঘৃণ্য মনে করি। কারণ, সক্ষম হয়েও তুমি যুদ্ধ রোধ করলে না।

    ।। পনেরো ।।

    ই, গুরুপুত্ররা ফিরে এসেছে। তাদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। বোধহয়, তাদের বিজয়লাভ হয়েছে। কিন্তু কই? আমার তো কোনো বিশেষ হর্ষ অনুভূতি হচ্ছে না। কাষ্ঠখণ্ডের উপর পৃষ্ঠ রক্ষা করে আমি চেতনাহীনের মতো পড়ে আছি।

    অশ্বত্থামা সোৎসাহে বলল, -- ‘মহারাজ, ওঠো। এ তোমার উপযুক্ত শয্যা নয়। তুমি কুরুকুলের এখন একচ্ছত্র অধীশ্বর। তোমার শত্রুকুল, পাণ্ডব, পাঞ্চাল, মৎস্য ইত্যাদি সকলেই গতাসু হয়েছে আমাদেরই অস্ত্রাঘাতে। তোমার হর্ষোৎপাদনের জন্য এই নাও, পঞ্চপাণ্ডবের পঞ্চমুণ্ড, তোমার জন্য উপহারকল্পে এনেছি। এবার ভীমের এই ছিন্নমুণ্ডের উপর তোমার বাম পদের আঘাতে তুমি তার কাপুরুষোচিত পদাঘাতের প্রতিশোধ গ্রহণ কর। যাজ্ঞসেনীকে অতঃপর তুমি নিঃসপত্নীরূপে ভোগ কর। ইন্দ্রপ্রস্থও এখন থেকে তোমারই। ময়সভার রত্নসিংহাসন এবং যাবতীয় সম্পদ একমাত্র তোমার।

    তুমি নিশ্চয় এবার স্বীকার করবে যে তোমার সন্দেহ সঠিক ছিল না। আমি সমূলে তোমার শত্রু নাশ করে, বিশেষ ক’রে পঞ্চপাণ্ডবের মুণ্ডচ্ছেদ করে প্রমাণ করতে পেরেছি যে আমিই তোমার উপযুক্ত সেনাপতি পদের যোগ্য। এই এক হাতেই আমি পাণ্ডব পাঞ্চালদের নির্বংশ করেছি। ধৃষ্টদ্যুম্নকে বিনা অস্ত্রে, শুধুমাত্র জানু দ্বারা পেষণ করেই হত্যা করেছি। দূরাত্মা প্রার্থনা করেছিল, আমি যেন তার স্বর্গপ্রাপ্তির জন্য অস্ত্রাঘাতে বধ করি। কারণ, সম্মুখযুদ্ধে অস্ত্রাঘাতে নিহত ক্ষত্রিয়দের স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে। সে সুযোগ তাকে দিইনি। সে গুরুঘাতি পাপীদের জন্য নির্দিষ্ট নরক প্রাপ্ত হয়েছে। তা ছাড়াও, হে নরশার্দুল, আপনার পরম শত্রু পঞ্চপাণ্ডবের ঔরসজাত পঞ্চ পুত্রকেও, যতদূর বোধহয় আমি সংহার করে পাণ্ডববংশ নির্মূল করেছি। অতএব এই শুভ সংবাদে আপনি সমস্ত ব্যথা-যন্ত্রণা এবং পুত্র-পরিজন, স্বজন-বান্ধবদের বিয়োগজনিত ক্লেশ বিস্মৃত হয়ে বিজয়ের উল্লাসে উজ্জীবিত হয়ে উঠুন। ‘জেতু জেতু মহারাজ দুর্যোধনঃ।’

    বললাম, -- ‘গুরুপুত্র, তোমার এই কর্মকে আমি যথার্থ উচ্ছ্বাসে গ্রহণ করতে পারছি না। আমার উচিত ছিল এই নিষ্ঠুর কর্ম থেকে তোমাদের নিরস্ত করা। গুরুপুত্র, তোমরা এই কুকর্মে প্রস্থান করার পর সুদীর্ঘ সময় পূর্বাপর চিন্তা করে সম্পূর্ণভাবে এক ভিন্ন মানসিকতায় আমি প্রস্থান নিয়েছি। তোমরা এই তিনবীর সঠিকভাবে যদি পূর্বাহ্নে আমাকে উপযুক্ত মন্ত্রণা প্রদান করতে, তাহলে এই মহাপাতকের কর্ম ঘটত না। কিন্ত এর জন্য তোমরা দায়ী নও। এর সম্পূর্ণ দায় আমারই। কিন্তু হে গুরুপুত্র, তুমি কি সত্যই সপুত্র পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যা করেছ? আর কারা কারা তোমার হাতে গতাসু হয়েছে, বল। কৃষ্ণ, সাত্যকি এবং অন্যান্য যাদববীরেরাও কী নিহত?

    আমরা হর্ষ এবং বিষাদমণ্ডিত প্রশ্নে অশ্বত্থামা প্রত্যুত্তর করার আগেই কৃতবর্মা বলে উঠলেন, -- ‘মহারাজ, আচার্য কৃপ এবং আমাকে শিবিরের দ্বাররক্ষক নিযুক্ত করে গুরুপুত্র স্বয়ং ভিতরে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন। তিনি ঠিক কোন কোন রথী, মহারথীকে নিহত করেছেন তা প্রত্যক্ষভাবে আমরা জানিনা। আমরা পলায়মান কিছু সাধারণ যোদ্ধা অথবা সৈনিককে হত্যা করেছি। তাদের মধ্যে মশালের মন্দ আলোয় উল্লেখযোগ্য কাউকেই পেয়েছি বলে মনে হয় না। তবে তাদের কেউই মহাবীর আখ্যাধারী ছিল বলে আমার অন্তত মনে হয়না। আমরা দুজনের কেউই জানিনা ভিতরে পাণ্ডবেরা কেউ ছিলেন কিনা।’ তার কথা শুনে অশ্বত্থামা তীব্র অভিমানে বলল, -- ‘একথা সত্য কৃষ্ণ বা সাত্যকিকে আমি ভিতরে পাইনি। সম্ভবত, তাঁরা ওই শিবিরে ছিলেন না। হয়তো, তাঁরা ভিন্ন কোনো শিবিরে থেকে থাকবেন। কৃতবর্মা সঙ্গে ছিলেন বলে আমি কৃষ্ণ, সাত্যকি বা যাদবদের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগী ছিলাম না। পাণ্ডব এবং পাঞ্চালগণ আপনার এবং ব্যক্তিগতভাবে আমারও প্রধান শত্রু বলে পাণ্ডবদের পঞ্চভ্রাতার কর্তিত মুণ্ড-পঞ্চ আমি বহন করে নিয়ে এসেছি। ধৃষ্টদ্যুম্নকে যেহেতু জানুর পেষণে হত্যা করেছি, তাই তার নিদর্শন আনিনি। অন্যান্য নিহতদের সকলের নিদর্শন নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। আমার মাতুল তথা আপনাদিগকের আচার্য কৃপের এবং যাদববীর কৃতবর্মার এই যুদ্ধে বোধ করি তেমন অভিরুচি ছিলনা। মাতুল অতিবৃদ্ধ এবং কৃতবর্মা কৃষ্ণের প্রিয় তথা স্বয়ং যাদব বলেই বোধ করি, তাঁদের এইরূপ বীতস্পৃহতা। কিন্তু আমি আপনার সখা এবং সেনাপতি।

    অশ্বত্থামা এরূপ বললে, ভাবলাম, একে ঘোর অন্ধকার, তার উপরে হত্যার উন্মত্ততা, অশ্বত্থামা বলছে, সে পাঁচ পাণ্ডুপুত্র এবং পাঁচ যাজ্ঞসেনীর পুত্রদের হত্যা করেছে। এই ঘোর অবস্থায় পাঁচ, পাঁচ মুণ্ডের মধ্যে কী নিশ্চয় করে জানা সম্ভব হয়েছে, সে পঞ্চপাণ্ডবের মুণ্ডই নিয়ে এসেছে? হে দৈব, পাণ্ডবদের সন্তান ওই পঞ্চ শিশুকে যেন অশ্বত্থামা নিহত না করে থাকে। আমার এই মানসিক দৌর্বল্যে আমি নিজেই এই মুহূর্তেও অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, -- ‘কই, নিয়ে এসো পাণ্ডবদের মস্তক এবং আমাকে তা পরীক্ষা করতে দাও।’ অশ্বত্থামা পঞ্চভ্রাতার কল্পিত মস্তক আমার আয়ত্তে স্থাপন করলে, আমি হস্তপেষণে সবকটি মস্তক চূর্ণ করে দিলাম। বললাম, হায় অশ্বত্থামা, তুমি এ কী অকার্য সাধন করেছ। এ তো পঞ্চভ্রাতার মস্তক নয়, এযে পাঁচটি শিশুমুণ্ড মাত্র। আঃ, হে বিষাদ, তুমি আমাকেও চূর্ণ কর। শেষপর্যন্ত শিশুহত্যা করাবার অপযশের কলঙ্কেরও ভাগী হলাম!’

    আমার হুতাশ শুনে অশ্বত্থামা খুবই বিচলিত হয়ে পড়ল। সে সম্ভবত অনুমান করল, এক্ষুনি ভীমার্জুনাদি এসে তাকে হত্যা করবে। স্বভাবে সে অস্বাভাবিক ভীত। সে কারণেই সে, অপর দুই যোদ্ধাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে এই হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করেছিল। আমি যতই অন্যায় কর্ম করে থাকি না কেন, ওই মুহূর্তে ন্যায়ান্যায়ের বিচার লোপ আমার পক্ষে একান্তভাবেই অমানবিক এবং বুদ্ধিহীনতার কার্য হয়েছে।

    আচার্য কৃপ এবং কৃতবর্মা বললেন, -- ‘আমরা নিরুপায় দাঁড়িয়ে মরব না। আমরা অরণ্যে পালিয়ে যাচ্ছি।’ অশ্বত্থামা বলল, -- ‘আমি পালিয়েও বাঁচব না। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি পাণ্ডবদের ক্ষতিসাধন করেই যাব। আমার নিকট পিতৃদত্ত এক মহা দিব্যাস্ত্র আছে যার নাম ব্রহ্মাশির। তার তেজ সহ্য করার মতো কেউই এ ভুবনে নেই। তারা যদি আমাকে নিহত করতে আসে, আমি অবশ্যই তা মোচন করব। তাতে যদি চরাচরও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় হোক। আপাতত আমি গঙ্গাতীরে মুনিদের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নেব। সর্বাঙ্গে ঘৃত এবং ভস্ম প্রলেপ দিয়ে কদর্য-দর্শন ছদ্ম আবরণে আত্মগোপন করব।’ বললাম, -- ‘আমাকে কার কাছে রেখে যাচ্ছ গুরুপুত্র?’ অশ্বত্থামা বলল, --‘তোমার জন্য চিন্তা নেই। এক্ষুনি মৃত্যু এসে তোমার সব চিন্তা দূর করবে।’

    তারা সকলেই চলে গেল। পাঁচটি চূর্ণিত শিশুমস্তক সামনে নিয়ে আমি মৃত্যুর অপেক্ষা করতে থাকলাম। এতক্ষণ আমার একটা প্রতীক্ষা ছিল বেঁচে থাকার জন্য। মৃত্যুকে ধ্রুব জেনে প্রতীক্ষা অর্থহীন। একটা কিছু অন্তত সামনে থাকা দরকার। মৃত্যু সেই একটা কিছুর মধ্যে পড়ে না। সেটা একটা ঘটনামাত্র। তা যখন ঘটে, তখন আপনিই ঘটে, তার জন্য প্রতীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। এই একটিমাত্র ঘটনা, যা ঘটার কোনো কারণের দরকার হয় না। ওটা ঘটে, এই যা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা ঘটার কোনো উপলক্ষ্য দরকার নেই।

    এরকম একটা ভাবনার নির্বেদ আমাকে আচ্ছন্ন করলে, আমি সর্বপ্রকার বোধহীনতায় নিষ্ক্রিয় হলাম।



    (সমাপ্ত)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ৬ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)