• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭৫ | জুন ২০১৯ | রম্যরচনা
    Share
  • দেশান্তরের কথা : সন্ধ্যা ভট্টাচার্য


    বিধাতাপুরুষ যাকে সমস্ত রকম সৌভাগ্য দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান, মনে হয় দৈহিক রূপলাবণ্যেও তাকে ঐশ্বর্যময় করে পাঠান। জয়চন্দ্র মহাশয়কে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। শ্বশুরমহাশয় ছাড়াও পরিবারের অন্যদের মুখে শুনেছি, তিনি ছিলেন অপূর্ব রূপলাবণ্যের অধিকারী, কাঁচা হলুদের মত ছিল তাঁর গায়ের রঙ। তাঁর সহোদর অন্যান্য ভাইদের থেকে তিনি দেখতে ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। সুউচ্চ এক সুদর্শন পুরুষ।

    তাঁর সহধর্মিণী সেই অষ্টম বর্ষীয়া বালিকাবধূও নাকি ছিলেন অপূর্ব দেহলাবণ্যের অধিকারী, লক্ষ্মীর মত শ্রীযুক্ত। হতেও পারে, কারণ আমি যখন তাঁকে দেখি তখন তিনি প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে, সেই বয়সেও তাঁর যে সৌন্দর্য আমি দেখেছি, তিনি যে পূর্ণযৌবনে মনোহারিণী সুরূপা ছিলেন সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সোনামণি দাসীর নিষ্ঠাসহকারে সংসার পরিচালনা, যুবক জয়চন্দ্রের কর্মতৎপরতা, আর বালিকাবধূর লক্ষ্মীমন্ত আচার-আচরণে ক্রমে পরিবারের ঐশ্বর্য উথলে উঠছিল। ভূসম্পত্তির পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তে লাগল। প্রাপ্তবয়সে বালিকাবধূ এক পুত্রসন্তানের মা হলেন, পুত্রের নাম রাখা হল বিপিনচন্দ্র। আমাদের উপাধি ভট্টাচার্য।

    ক্রমে সোনামণি দাসী বয়সের ভারে জরাগ্রস্ত হলেন। চলচ্ছক্তি হারালেন। কিছুদিনের মধ্যেই সোনামণি দাসীর দেহান্ত হল। পুত্রসম জয়চন্দ্র মহাশয় বিধি অনুসারে, সাড়ম্বরে পারলৌকিক কাজ করলেন। ব্রাহ্মণভোজন, দরিদ্রনারায়ণের সেবা, দানধ্যান সবই করলেন। দাদামহাশয় জয়চন্দ্র মহাশয়ের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্রদেরও দেখেছি আশ্বিনের প্রেতপক্ষে পিতৃপুরুষের তর্পণের সময় তাঁরা সোনামণি দাসীর উদ্দেশ্যেও তর্পণের জল দান করতেন।

    এবার আসি জয়চন্দ্র মহাশয়ের পুত্রপৌত্রাদির নিয়ে সংসার যাত্রায় কথায়। কালক্রমে জয়চন্দ্র মহাশয়ের তিন পুত্র আর দুই কন্যার জন্ম হ’ল। জ্যেষ্ঠপুত্র বিপিনচন্দ্রের পরে দ্বিতীয় পুত্র আমার শ্বশুর মহাশয় শরৎচন্দ্র আর কনিষ্ঠ যোগেন্দ্রচন্দ্র। জয়চন্দ্র মহাশয় অতি সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ। তাঁর পাণ্ডিত্যে সুসঙ্গ-দুর্গাপুরের তৎকালীন রাজা তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন। গুরুপ্রণামী বাবদ তিনি প্রভূত সম্পত্তি দান করলেন। ঐশ্বর্যপূর্ণ সংসারে উপযুক্ত সময়ে সৎপাত্র দেখে দুই কন্যাকে পাত্রস্থ করলেন। এর পরে পুত্রদের বিবাহ দিলেন। জ্যেষ্ঠপুত্রের বিয়ে দিলেন, গাঙ্গাটিয়ার জমিদার কালীনারায়ণ চক্রবর্তীর প্রথমা কন্যা কামিনীসুন্দরী দেবীর সঙ্গে। আমার শ্বশুর মহাশয়ের বিয়ে হ’ল সুখহারী নিবাসী কৈলাসচন্দ্র ভট্টাচার্যের কন্যা অপূর্বসুন্দরী প্রথমা কন্যা কুমুদকামিনী দেবীর। বিপিনচন্দ্র ছিলেন সুন্দর, কিন্তু তাঁর স্ত্রী ছিলেন সাধারণ চেহারার। কিন্তু জমিদার কন্যা, ফলত রূপোর বিনিময়ে রূপ বিকিয়ে গিয়েছিল অনায়াসে। আমার শ্বশুর মহাশয় ছিলেন দীর্ঘাঙ্গ কিন্তু কালো, কিন্তু আমার শাশুড়ি ছিলেন ফর্সা আর সুন্দরী। ছেলেবেলায় সর্পাঘাতে তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে মামার বাড়িতে মানুষ। গায়ের রঙ আর রূপের জন্য মধ্যবিত্ত ঘরের পিতৃহারা অপূর্ব সুন্দরী কন্যা-আমার শাশুড়ির স্বল্প যৌতুকেই বিয়ে হয়ে গেল। তাঁর বিবাহকালের সৌন্দর্যের কথা শুনেছি আমার দিদিশাশুড়ির মুখে। আমার ছোট খুড়শ্বশুর যোগেন্দ্র ভট্টাচার্যের বিয়ে হয়েছিল শিবপুর নিবাসী যতীন্দ্র ভট্টাচার্যের কন্যা হিরণবালা দেবীর। এঁরা দুজনেই ছিলেন সুশ্রী, হিরণবালা ছিলেন মাঝারি চেহারার।

    তিন পুত্র আর তিন পুত্রবধূ নিয়ে জয়চন্দ্র আর মনমোহিনী দেবীর সংসার ভরভরন্ত হয়ে উঠলো। তখনকার দিনে সম্পন্ন পরিবারের আশ্রয়ে আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেক মানুষ এসে থাকতেন, নিজেদের নানা কাজকর্ম করতেন, ব্যবসা করতেন। জয়চন্দ্র মহাশয়ের সংসারেও এইরকম কিছু মানুষ থাকতেন। এদের কেউ ছিলেন কবিরাজ, কেউ হোমিওপ্যাথী ডাক্তার, কেউ সরকারী কানুনগো, কেউ মোক্তার। এছাড়া অধীনস্থ প্রজা, মুনিষ, দাসদাসী সকলেই থাকত। পরিবারের রান্নাঘর থেকেই তাদের সকলের দুবেলার আহারের ব্যবস্থা ছিল। খেয়েপরে থাকা কাজের লোকেরও অভাব ছিল না। সেই ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সোনামণি দাসীর ছোট্ট সংসারে এই সময়ে একবেলায় ষাট জন মানুষের পাতা পড়তো। বৃহৎ সংসারে এত কাজকর্ম, রান্নাঘরের গুরুভার সামলাতে সামলাতে বাড়ির বৌদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়াল, এ ছাড়া সকলের তো আর সমান কর্মক্ষমতা ছিল না। তাই কালক্রমে পরিবারে রান্নার জন্য পাচক ঠাকুরের ব্যবস্থা হল। ব্যবস্থা করলেন আমার শ্বশুরমহাশয়। তিনি তখন কিছুকাল হল সংসারাশ্রমে প্রবেশ করেছেন।

    বাড়ির বউদের পরিশ্রম কমানোর জন্য পাচকের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি নিজে জমি-জিরেতের দেখভাল, আয়বৃদ্ধির জন্য বিষয়আশয় দেখতে লাগলেন। তাঁর বিষয় বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে শীঘ্রই গৌরকান্দা নামক স্থানে একটি তালুক কিনলেন নিলামে। তবে তিনি নিজের নামে কেনেননি, সব তাঁড় অন্য দুই ভাইয়ের নামেই কিনেছিলেন। পরিবারের মধ্যেকার প্রচ্ছন্ন অশান্তি বন্ধ করতে নিজ খরচে পাচকের ব্যবস্থা করলেন, বাইরে অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্পত্তি বাড়ালেন। কিন্তু অতীব পরিশ্রমে সেই বৃহৎ সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করেও শেষপর্যন্ত সংসার ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলেন না।

    কিছুকাল বাদেই যাঁদের পরিবারে গৃহিণী অতি সক্রিয় আর সদস্য সংখ্যা কম, তাঁরা সংসারে ক্ষমতা দেখাতে শুরু করলেন। কিন্তু যাঁর পরিবারের সন্তানসংখ্যা বেশি কিন্তু গৃহিণী তত সক্রিয় নন, সংসারের সব কাজে সমান সহযোগিতা করতে পারেন না, তাঁর ছেলেমেয়েরা অবহেলার শিকার হতে লাগলো। নৈমিত্তিক আবশ্যকীয় আহারের প্রয়োজনও তাদের ঠিকমত মিটত না। আমার শাশুড়ি মা ছিলেন চিররুগ্না। পরিবারের নানা অনুষ্ঠান, দোল, দুর্গোৎসব কোন অনুষ্ঠানেই তিনি সক্রিয় অংশ নিতে পারতেন না। ফলে অন্দরমহলে সক্রিয় সহযোগিতার অভাবে শ্বশুরমহাশয় বাইরের সব কিছু ঠিকঠাক রাখলেও পরিবারের সবকিছু ঠিকঠাক রাখতে পারলেন না।

    বাইরে কাজকর্ম দেখে, সারা পরিবারের জন্য অর্থের যোগান অক্ষুণ্ণ রাখলেও, নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য দাসদাসীদের উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছিল তাঁকে। অখণ্ড বিশ্বাসে পরিবারের কর্তা বড় ভাইকে বিশ্বাস করে, তাঁর হাতে সমস্ত অর্থ তুলে দিয়ে, একসময় তিনি অদৃশ্য চক্রান্তের শিকার হলেন।

    কথায় বলে লক্ষ্মী চঞ্চলা। জয়চন্দ্র মহাশয়ের দেহরক্ষার পর থেকেই লক্ষ্মী চঞ্চলা হতে শুরু করলেন। আমার শ্বশুরমহাশয়ের বহু কষ্টে, পরিশ্রমে অর্জিত আয় তাঁর জ্যেষ্ঠের উপর বিশ্বাসের সুযোগে জ্যেষ্ঠ্যের গোপন পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে লাগল। এই অবস্থায় অন্য ভাইদের একান্ত ইচ্ছায় সম্পত্তি বাঁটোয়ারা হয়ে গেল। প্রায় অর্থহীন, আমার শ্বশুর মহাশয় পুরনো পৈতৃক বাড়ির অধিকার থেকেও বঞ্চিত হলেন। পুরনো বাড়ির সংলগ্ন জংলাজমি পরিষ্কার করে, দিনকয়েকের মধ্যে নূতন বাসগৃহ নির্মাণ করে নিতে হল।

    যে বাড়ির গৌরব এতদিন রাজবাড়ির তুল্য ছিল, গৃহাভ্যন্তরীণ কুটিলতায় সেই বাড়ি খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল। বিষয় সম্পত্তি তিনভাগে ভাগ হয়ে গেল, নিলামে কেনা গৌরকান্দা তালুকদারিও বিক্রি হয়ে টাকা তিনজনের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। অথচ আমার সরল শ্বশুরমহাশয়ের নিজের আয়ে, আর সুযোগ বুঝে কেনা তালুকটি তিনি বিশ্বাস করে তিনজনের নামেই রেখেছিলেন। অগ্রজের একান্ত অনুগত, নীতিনিষ্ঠ আমার শ্বশুর মহাশয়কে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বা শুভানুধ্যায়ীরা কেউই ভ্রাতৃ-আনুগত্যের আদর্শ থেকে একচুলও নড়াতে পারল না।

    তখনকার দিনে একান্নবর্তী গৃহস্থ পরিবারগুলিতে সম্মিলিত আয় থেকেই সারা বছরের নানা উৎসব, অনুষ্ঠান, লৌকিকতা চলত। ব্রাহ্মণ পরিবারে গুরুগিরিও আয়ের একটা উৎস ছিল। জমির উৎপন্ন ফসল, জমির খাজনা, আর বিভিন্ন উপলক্ষে শিষ্যদের দানের উপর নির্ভর করেই বিশাল পরিবারে বহু লোকের অন্নসংস্থান হত। পরিবারের কর্তার ছত্রচ্ছায়ায় সুখে শান্তিতে সকলে বাস করতো। এছাড়া, টাকা পয়সা সঞ্চয় করা, বিকল্প আয়ের পথ খোঁজার কথা, বা অন্য উপায়ে আয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা (জমিদাররা ছাড়া) সাধারণ মানুষ অনুভব করত না।

    সামাজিক অবস্থার দ্রুত পটপরিবর্তন, আর্থিক অসুবিধা, সচ্ছলতার ক্রমাবনতি নতুন প্রজন্মকে ভাবতে শেখাল। শ্বশুরমহাশয়ের পুত্ররা তাঁদের বয়ঃসন্ধি অতিক্রম করতে করতেই আধভাঙা, ঘুণ ধরা সংসার আর বিষয় আশয়ের উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চাইল না।

    আমার শ্বশুরমহাশয়ের বিভক্ত সম্পত্তির আয় দিনে দিনে কমতে লাগল, আগের মত তিনি আর তত পরিশ্রম করতে পারেন না। জমির আয় বৃদ্ধির পরিমাণ কমতে থাকায় সংসারের অর্থের যোগানের জন্য সম্পত্তিতে হাত দিতে হল। পরিবারের নানা প্রয়োজনে একে একে অনেক সম্পত্তি বিক্রি হতে লাগল। সংসারের চরম অসচ্ছলতা দেখে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র (আমার স্বামী) চাকুরীর উদ্দেশ্যে কলিকাতায় পাড়ি দিলেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের দিকে।

    বয়ঃপ্রাপ্ত তিন কন্যাকে আগেই পাত্রস্থ করেছেন। ঘরে দুটি শিশু। একটি কন্যা আর একটি আমার সেই ছোট্ট দেওর, তিনটি অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র আর চিররুগ্না স্ত্রীকে নিয়ে নাজেহাল আমার বৃদ্ধ শ্বশুরমহাশয় জ্যেষ্ঠপুত্রের বিয়ে দিয়ে গৃহে ভাত-জলের যোগান দেবার মত বিশ্বস্ত কাউকে আনতে চাইলেন। আমি বিয়ে হয়ে এলাম এই পরিবারে।

    যুদ্ধকালীন অস্থিরতায় গ্রাম বাংলার নির্মল শান্তির পরিবেশ হারিয়ে গেছে। চরম এক আর্থিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছে জনজীবন। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তার অভাব দেখা দিয়েছে তখন। যুদ্ধের কারণে অত্যাবশ্যক পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, যোগান অপ্রতুল। বাতি জ্বালানোর তেলের অভাবে সন্ধ্যা হতেই গ্রামের পাড়াঘর প্রায় নিষ্প্রদীপ। বেলা থাকতে দিনের আলোতেই রাতের খাবার প্রস্তুত হয়ে যেত। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর পরেই খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে ছেলেবুড়ো সকলেই শয্যা আশ্রয় করতে বাধ্য হত। দেশে তখন জ্বালানী তেলও অমিল।


    অন্ধকারে, আকাশের আলোয় বারান্দায় বসে আমার শ্বশুর মহাশয় হুঁকোর নলটি মুখে দিয়ে পুরনো দিনের নানা গল্প করতেন আমার সঙ্গে, আমার সঙ্গী থাকত দুটি শিশু--আমার ছোট ননদ, আর ছোট্ট দেওর। আমার শ্বশুরালয়ের পুরনো দিনের যা কাহিনী লিখেছি সবটুকুই জোনাকজ্বলা আঁধারে বসে এই বাবার মুখে শোনা।

    বৃদ্ধ শ্বশুর মহাশয়ের মনের ও দেহের ভাঙাচোরা অবস্থা দেখে, নিজের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে হতশ্রী সংসারের শ্রী, সুষমা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ব্রতী হলাম। নিত্য নৈমিত্যিক গৃহকর্ম সুচারুভাবে সম্পন্ন করে, পরিবারের সদস্যদের অন্নজলের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে তৎপর হলাম। কর্তৃহীন সংসারের হাল ধরতে গিয়ে, অক্লান্ত পরিশ্রমে, কিছুদিনের মধ্যেই পিত্রালয় আর শ্বশুরালয়ের মধ্যেকার তফাৎটা উপলব্ধি করলাম। কোথায় যেন এক মানসিক নির্ভরতার অভাব অনুভব করলাম।

    যাইহোক বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেছে, স্বাধীনতা আসতে মাস ছয়েক বাকি, ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ কোলকাতা থেকে বিনা খবরেই দেশে এলেন আমার কর্তা। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর পিত্রালয়ের নিমন্ত্রণে, আমাকে নিয়ে গেলেন আমার বাপের বাড়ি, ময়মনসিংহ জেলায় আমতলা গ্রামে। গ্রামের রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন জামাইকে গ্রামের আত্মীয়স্বজন প্রায় প্রত্যেকে বাড়িতেই নিমন্ত্রণ খেতে হল। তাঁর ছুটি শেষ হয়ে আসায় তিনি আবার কর্মস্থলে ফিরে গেলেন। যুদ্ধের সময় তিনি এ আর পি তে (এয়ার রেইড প্রোটেকশান) চাকরি করতেন। সামনেই চৈত্রমাস, তাই সে মাস কাটানোর জন্য আমি পিত্রালয়েই রয়ে গেলাম। বৈশাখ মাস পড়তেই শ্বশুরমহাশয় আমাকে আনতে গেলেন আমার পিত্রালয়ে।

    পরদিন ভোরবেলায় শেষবারের মত আমার আশৈশবের প্রিয় জন্মভূমির আলো বাতাসের স্নেহস্পর্শ নিতে আরেকবার গ্রামে বেড়াতে বেরোলাম।

    গ্রামের দক্ষিণের শেষ প্রান্তে ছিল বহু পুরোনো একটি শিব মন্দির। মন্দিরের বয়স কত তা আমি জানতাম না। মন্দিরের চারদিক ঘিরে ছিল বারান্দা। বারান্দার নীচের অংশ ছিল ফাঁকা। এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে মন্দিরটি মাঝামাঝি অংশ বরাবর ফেটে আলগা হয়ে একদিকের বারান্দার নীচের অংশ মাটিতে দেবে গিয়েছিল। বারান্দার কিছু অংশ ভেঙে কাৎ হয়ে পড়েছিল। মন্দিরের শিবলিঙ্গের পূজারি ছিলেন বৃদ্ধ দীননাথ, বয়সের ভারে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। বিশাল উঁচু মন্দিরের ভাঙা চূড়াটি কাৎ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, মন্দিরের পাশ দিয়ে যেতে জায়গাটুকু আমরা দৌড়ে পেরোতাম, ভয় ছিল পাছে মন্দির ভেঙে মাথায় পড়ে।

    পূজারী দীননাথের বাড়ি ছিল মন্দিরের পাশেই। আমাদের ছেলেবেলায় এই মন্দিরের চত্বরেই বসতো আখ মাড়াইয়ের কল। এটা ছিল দীননাথের জ্যেষ্ঠপুত্র মনমোহনের। তার ছিল লাল চিনি তৈরীর ব্যবসা। গ্রামে তখন আর কোনো গুড় বা চিনি তৈরির কোন কল ছিল না। তাদের বাড়ির সংলগ্ন জমিতে প্রচুর আখ ফলাত আর কেরকিতে (আখ পেষাই কল) আখ পেষাই করে, বাড়িতেই একটা চার-মুখওয়ালা উনুনে কাঠের জ্বালে গুড় ও ঝুরো গুড় (লাল চিনি) তৈরী করতো। একটা বিশাল কড়াইতে আখের রস জ্বাল হত। বড় হয়ে জেনেছি, সেই কড়াইটা ছিল দশ নম্বর কড়াই, আমাদের ছোট চোখে বিশাল লাগত।

    সে সময় এখনকার মত ভ্যান গাড়িতে করে আখের রস বিক্রি হত না। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আখ পেষাই তখন হত না। তখনকার দিনে আখ পেষাইয়ের কলটি ছিল মাটির সঙ্গে যুক্ত একটি খুঁটিতে জোড়া, তেল কলের মতই সেই ‘কেরকি’ ঘোরাতো বলদে। কলের পেষাই মেশিনে একবারে একগোছা করে আখ ঢোকানো হত। মেশিনের কলের মুখের নীচে একটি বড় গামলাতে রস এসে জমত। এই আখের রসের লোভে আমরা মন্দিরের কাছে জড়ো হতাম, হাতে থাকতো ছোটো ছোটো ঘটি। এক এক ফাঁকে আমরা গামলা থেকে ঘটি ডুবিয়ে রস তুলে নিয়ে মন্দিরের বারান্দায় বসে মজা করে খেতাম।

    পিছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে সেই মন্দিরের কাছে বুঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ। চলতে চলতে এগিয়ে গেলাম রাস্তার দক্ষিণদিকে। হাতের ডাইনে পথের মোড়ের ব্রহ্মমাসীদের বাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে পড়ে গেল ব্রহ্মমাসীর কথা।

    বালবিধবা ব্রহ্মমাসী সারাটা জীবন কাটিয়েছিলেন পিত্রালয়ে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ভাইদের সংসারে থেকে, তাঁদের ছেলেমেয়েদের লালন-পালন করতে করতেই তিনি বার্ধক্যে পৌঁছেছিলেন। শেষ বয়সে নিজের খরচ মেটানোর অর্থ নিজের জোগাড় করার দরকার হল। শেষ বয়সে তাঁর তীর্থে যাবার ইচ্ছা হয়েছিল, টাকার দরকার। সেই বয়সে মুড়ির মোয়া তৈরি করে বিক্রি করে দুপয়সা অর্জনের চেষ্টা শুরু করলেন। ব্রহ্মমাসীর চেহারা ছিল অনেকটা বর্মীদের (ব্রহ্মদেশীয় মহিলাদের) মত। সকলে ডাকত ‘বর্‌মী’ বলে। বর্‌মীর সঙ্গে মাসী লাগাতাম বলে খুশি হয়ে একআনায় চারটের বদলে পাঁচটা মোয়া দিত মাসী। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মার কাছ থেকে একআনা পয়সা চেয়ে নিয়েই ছুটতাম ব্রহ্মমাসীর বাড়ির দিকে। ব্রহ্মমাসী বলে ডাক দিলেই ধামাভর্তি মোয়া নিয়ে, ফোক্‌লা মুখের একগাল হাসি নিয়ে বেরিয়ে আসত ব্রহ্মমাসী। অতিরিক্ত মোটা মানুষটির মাথাটি ছিল ক্ষুদে ক্ষুদে পাকাচুলে ঢাকা, মনে হত যেন বড় সাইজের একটি কদমফুল। বয়সের কারণে ঝুলে পড়া চোখের পাতা, বলিরেখাপূর্ণ মুখে হাসিটি বজায় ছিল। একগাল হেসে অস্পষ্ট ভাষায় জিজ্ঞেস করতো, ‘ক পয়তার নিবা গো’। অনেকেই জড়ো হত, কেউ বা এক আনার, কেউ দু আনার, আবার কেউ বা কিছু বেশী পয়সার মোয়া নিত। বেশ কিছু পয়সা হত মাসীর, আর ধামাখানা খালি হয়ে যেত। আমরা ছেলেপুলেরাই ছিলাম তার ক্রেতা।

    সেখানে দাঁড়িয়ে মনে এল ব্রহ্মমাসীর কথা। আজ আর মানুষটি নেই। আমার বিবাহের কিছুদিন আগেই ব্রহ্মমাসী গত হয়েছিল। মাসীর ভাইয়ের বৌটিও এখন বৃদ্ধা, তার ছেলেদের ঘরে এখন নতুন নতুন অতিথির আগমন হয়েছে। বাড়ির পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে গেছে।

    যা হোক, ব্রহ্মমাসীর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। এগিয়ে যেতে যেতে দেখি বাড়ির ভিতর থেকে বেড়ার ফাঁক দিয়ে উকিঝুঁকি দিচ্ছে একটি ছোট্ট বউ, নাকে নোলক পরা, পরনে একটি ছোট্ট লাল টুকটুকে গামছা। বয়স বছর পাঁচ কি ছয় হবে। আমার চোখে চোখ পড়তেই ফিক করে হেসে ছুটে দৌড় দিল বাড়ির ভিতরে, পায়ের মলের ঝুমঝুম শব্দ তুলে। বলতে গেলে দুধের শিশুই বলা চলে। বিয়ের কি বোঝে? উপায় নেই, সমাজের চাপে অতি শৈশবেই মেয়েদের বিয়ে দিতে হত। তখনকার দিনে দেশগাঁয়ে নীচ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে খুব ছোটবেলায় বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল, সামাজিক অনুশাসনের দাপটে শিশুবিবাহ দিতে বাধ্য ছিল অভিভাবকরা। এই বৌটি ব্রহ্মমাসীর ভাইয়ের নাতবৌ।

    আনমনে এগিয়ে চললাম আরও দক্ষিণদিকে, যেখান থেকে দেখা যায় উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত সেই বেত্রবতী নদী। ডানদিকে নদী আর বাঁদিকে জনবসতিহীন ফাঁকা এলাকা, মাঝেমাঝে ঝোপঝাড়। মাঝখান দিয়ে খেতের আলের মত সরু পায়ে চলার পথ। সেই পথের শেষে ছিল হরিবল দাদার বাড়ি, আমাদের ছেলেবেলার খুব প্রিয় জায়গা।

    বাড়ির মালিক নিঃসন্তান হরিবল নাথের সংসারে ছিল বউ আর জড়বুদ্ধি একটি ছোট ভাই। বাবা-মায়ের শেষ বয়সের সন্তান ভাইটি হরিবল, তার দাদার থেকে বয়সে অনেক ছোট, প্রায় সন্তানের মত। একেই সন্তানস্নেহে বড় করে তুলছিল স্বামীস্ত্রী দুজনে। হরিবল দাদার ছিল মুদির ব্যবসা। একটি ভ্রাম্যমান দোকান, মাথায় বিরাট ঝাঁকায় মুদিখানার জিনিস নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত। ঝাঁকার মাঝখানে থাকত তেলের টাক--মানে একটি জালার মত তৈলাধার। সেটির চারদিক ঘিরে রাখা থাকত মুদিখানার নানা সামগ্রী, এমনকি তামাকও থাকত। হাতে থাকত একটা কেরোসিন তেলভর্তি টিন। সকাল দশটা থেকে দুপুর দুটো-আড়াইটা পর্যন্ত নানা পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করত জিনিসপত্র। আমাদের ছেলেবেলায় তখনও গ্রামেগঞ্জে মুদিখানা দোকান ছিল না। দূরে হাট বা বাজার থেকে সব আনতে হত। পাড়ার বউ-ঝিদের আপৎকালীন জিনিসের অভাব মিটত এই ভ্রাম্যমান দোকান থেকে। তেল মাপার জন্য ছিল বেলাইন বা পলা, যেটা বানাত পুকুরের শামুকের খোল দিয়ে। এই বেলাইন ছিল এক কাচ্চা, এক ছটাক, আধপোয়া, একপোয়া নানা মাপের। এছাড়াও হরিবলদার আর একটি ব্যবসা ছিল, যেটির লোভে আমাদের ছোটবেলায় আমরা সে বাড়িতে যেতে উৎসুক ছিলাম। সেটি ছিল গুড়ের বাতাসা তৈরির ব্যবসা। হাট থেকে গুড় কিনে এনে বাড়িতে জ্বাল দিয়ে বানাত বাতাসা, সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত দেবভোগ্য হিসাবে যে বাতাসার কদর আজও কমেনি। গরম বাতাসার লোভে আমরা ছোটরা প্রায়ই সে বাড়িতে ভিড় করতাম। বেশি বাতাসা পাওয়ার লোভে মাঝেমাঝে দুষ্টুমিও করতাম। একবার আমার বোনঝি পেটের ব্যথায় চীৎকার করছে, তার কান্না শুনে হরিবলদাদার বউ ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ছেমড়ি কান্দে ক্যান?’ আমরাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, যে ও আরও বাতাসা খেতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট একটা ঝুড়ি ভরে বাতাসা এনে দিল। আমরা শাড়ির আঁচলে সেই বাতাসা ঢেলে নিয়ে, বোনঝির হাত ধরে পত্রপাঠ সেখান থেকে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগলাম। পথে কোঁচড় থেকে গরম বাতাসা খেতে খেতে চললাম বাড়ির দিকে, বোনঝি তো কাঁদছে আবার বাতাসাও চিবোচ্ছে।

    জড়বুদ্ধি ভাইটি একটু বড় হলে হরিবলদাদার বউয়ের ইচ্ছায় ভাইয়ের বিয়ে দিতে হল। চার বছর বয়সের একটি মেয়েকে বউ করে ঘরে এনেছিল। সে তো কিছুই বোঝেনি যে তার কী বিয়ে হল। আমার তখনো বিয়ে হয়নি। গ্রাম্য সমাজে মেয়েদের যে কী দুরবস্থা ছিল, তা সেদিন বুঝিনি, আজ সেইখানে ফিরে এসে উপলব্ধি করলাম সেটা। আরও বুঝলাম, সন্তানহীনতা আর সন্তান লালনের কষ্ট সইতে মেয়েরাই পারে। হরিবলদাদার বউ কন্যাসম সেই ছোট্ট জা-টিকে মানুষ করতে লাগল। স্নান করানো, খাওয়ানো, চুল বাঁধা, কাপড় পরিয়ে দেওয়া থেকে রাতে কোলের কাছে নিয়ে ঘুমোনো পর্যন্ত সবই করত পরম যত্নে। চৈত্রের বারুণি মেলায় বিক্রিবাটার শেষে হরিবল দাদা বাড়ি ফেরার সময় সেই বউয়ের জন্য কিনে আনত পুতুল, খেলনা, লাল ফিতে, কাচের চুড়ি। এসবই আমার বিয়ের অল্প কিছুদিন আগের ঘটনা।


    বিয়ের পর দ্বিতীয়বার বাপের বাড়িতে আসা। তখন একটু বড় হয়েছি, একদিন বেড়াবার ছলে গেলাম হরিবলদাদার বাড়ি, উদ্দেশ্য বউ কত বড় হল দেখা। গিয়ে দেখি উঠোনের একপাশে উনুনে গুড় জ্বাল দিচ্ছে হরিবল দাদার বউ আর গামছা পরা ছোট্ট বউ (জা) তার পিঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড় পর্যন্ত ছোট চুলেই লাল ফিতে দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে দেওয়া একটি ছোট্ট খোঁপা, ঘাড়ের কাছে লাল পুঁটুলির মত ঝুলে। দু’হাত ভর্তি শাঁখা, পায়ে রূপোর খাড়ু, নাকে নোলক, সিঁথি আর কপাল মেটে সিঁদুরে রঞ্জিত। আলতা পরা পায়ে নাদুস পেটটি বড়জায়ের পিঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছোট্ট বউটি পেয়ারা খাচ্ছিল, আর নাক দিয়ে গড়াচ্ছিল হলদে সর্দির ধারা। ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা এসেছে দেখেই দাদার বউ হ্যাঁচকা টানে মেয়েটিকে ঘরে মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে গেল, নাকমুখ পরিষ্কার করে, একখানা ছোট আটহাতি শাড়ি পরিয়ে ঘর থেকে বের করে এনেছিল নতুন বউ দেখাতে। আমরা গল্প করতে করতেই একফাঁকে ছোট্ট বউ কখন যে ঘরে ঢুকে গিয়ে খেলনা নিয়ে বসেছিল আমরা কেউ খেয়াল করিনি। চমক ভাঙল খেলনা বাঁশির শব্দে। শব্দ শুনে উঠে গিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি দিতেই বাঁশি হাতে বউ একগাল হাসি নিয়ে তাকাল আমাদের দিকে। সেই অনাবিল আনন্দের হাসিটি আমি আজও ভুলিনি।

    আজ দীর্ঘকাল পরে আনমনে গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে সম্বিৎ ফিরল বাড়ি ফিরতে হবে। আজ হরিবলদার বাড়িও আর তেমনটি নেই, সেই ফোকলা হাসির ছোট্ট বউটিও আর ছোট নেই। পূর্ণ যুবতী, ঘরকন্নার কাজে ব্যস্ত। বৃদ্ধা হরিবলদাদার বউ ক্ষীণদৃষ্টি হতে হতে দৃষ্টিহীন, বসে আছে দাওয়ার পাশে, এখন সেই সন্তানসম জা-ই তার ভরসা।

    ঘুরপথে বাড়ি ফিরতে গেলাম, যাতে গ্রামের আরও খানিকটা দেখে নিতে পারি সেই উদ্দেশ্যে। এবার পথে পড়লো কলুদাদা, মনীন্দ্রর বাড়ি। যাকে আমরা ডাকতাম ‘মইন্যাদা’ (পূর্ববঙ্গের ভাষায়) বলে। বাড়ির কাছে আসতেই মনে পড়লো ছোটবেলায় গলায় দড়িবাঁধা তেলের বোতল নিয়ে কতবার এসেছি এ-বাড়িতে, হঠাৎ দরকারে সর্ষের তেল নিতে।

    সেইসময়ে যে সর্ষে পেষাই করে তেল বের করার যন্ত্রটি ছিল সেটিকে আমরা জানতাম ‘কেরকি’ নামে। দেশীয় যন্ত্র, বলদে টানত, সেই বলদের চোখ ঢাকা থাকত দুটি নারকেল মালা দিয়ে। যাতে চোখ বন্ধ থাকায় কোনদিকে নজর না করে এক মনে ঘানিগাছ ঘুরিয়ে চলে। সেই থেকেই বোধ হয় রামপ্রসাদ লিখেছিলেন, ‘মা আমায় ঘুরাবি কত, কলুর চোখ ঢাকা বলদের মত।’

    মোটা গুঁড়ির পুরোনো শক্ত গাছ কেটে এনে, বেশ গভীর গর্ত করে মাটিতে বসানো হত। তৈরি হত তেলের গাছ। এর ওপরের দিকে খানিকটা অংশ আলাদা ছিল, যেটা আবর্তন করত। গাছের মাথায় একটি বড়সড় গর্ত থাকতো যেখানে সর্ষে ঢেলে দেওয়া হত। যে জায়গাটা ঘুরত, সেটির নীচের অংশে লাগান থাকত একটা চওড়া কাঠের পাটাতন, সেখানে কিছু ভারী পাথর বা অন্য ভারী কিছু চাপিয়ে ব্যালান্স রাখা হত, সেখানেই বসত চালক। এই অংশের সঙ্গে জোড়া লাগানো থাকত একটা শক্ত, লম্বা কাঠের ডাণ্ডা‌, এটির মাথায় বাঁধা জোয়ালে লাগানো হত বলদকে। হাতের লাঠির বাড়ি খেয়ে বলদ ঘুরত তেলগাছের চারিপাশে। আর ওপরের সর্ষে ঢালার গর্তে রাখা কাঠের ভারী মুগুরও ঘুরত গাছের সাথে সাথে আর সর্ষে পিষে তেল বের হত। অন্য দিকে লাগানো চোঙা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ত নিচে রাখা বড় টিনের পাত্রে।

    তেলের গাছ-কেরকি চলার ক্যাড়ক্যাড় শব্দ কানে এল দেখে বুঝলাম কলটি এখনো চালু আছে। কিন্তু চালকের আসনে এখন মনীন্দ্রদার পরিবর্তে তার বালবিধবা বোন সীতা, হাতে বলদকে সচল রাখার জন্য কঞ্চির ‘ছিটকি’ (সরু লাঠি)। ছেলেবেলায় এই সীতাকে দেখে আমরা রাবণের বাড়ির চেড়িদের একজন বলেই ভাবতাম। ভয় পেতাম এর কুশ্রীদর্শন চেহারা দেখে, তেল নিয়েই একছুটে পালিয়ে যেতাম বাড়ির দিকে। আজ সেই সীতাও ন্যুব্জদেহী এক বৃদ্ধা। মাথার একরাশ কালো চুল আজ দড়িপাকানো শনের নুড়ির মত ছড়িয়ে পিঠের উপর। ঘোলাদৃষ্টি ছোটছোট দুটি চোখের কোণে লাগা পিচুটি। অনাদর অবহেলার চিহ্ন শরীরের সর্বত্র। কোন কাজে না লাগার মত অক্ষম বৃদ্ধ মানুষও যে অভাবের সংসারে কিছু কাজে লাগতে পারে, বৃদ্ধা সীতাকে না দেখলে হয়ত সেকথা ভাবতামই না। নির্বান্ধব মানুষ সেই সীতা হয়ত এই কাজের বিনিময়ে খাদ্য পায় ভাইপোদের সংসারে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে ফিরে চললাম, পথে একবার দেখলাম আমার ছেলেবেলায় সেই হরচরণ মাস্টারের পাঠশালা। ফেজটুপি মাথায় মুসলিম মাস্টারমশাই ক্লাস নিচ্ছেন, সেই কলরব নেই আজকের পাঠশালায়।

    এইসব দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরতে অনেকটা বেলা হয়ে গেছে, ঠাকুরঘরের ফুল তোলা বাকি। বাবা আর শ্বশুরমশায় বেরিয়েছেন আমাদের গ্রাম ঘুরে দেখতে। আমাদের বাড়ির আঙিনার এককোণে ছিল একটি রক্তকাঞ্চনের গাছ, লাল ফুলে গাছটি ভরে ছিল। আমি ফুল পাড়তে যেই না গাছে চড়েছি, দেখি বাবা আর শ্বশুরমশায় বাড়িতে ঢুকছেন। নিঃসাড়ে গাছেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ওঁরা ভিতরে ঢুকে গেলে আমি নেমে এলাম। সেইদিনটিই দেশের বাড়িতে, আমার বাপের বাড়িতে শেষবারের মত যাওয়া। এরপর তো বাপের বাড়ি কেন, গোটা দেশটাই আর আমাদের রইল না। পরের দিনই ফিরে গেলাম শ্বশুরবাড়িতে। আমার মা-বাবা, বড়বৌদি আর ছোট্ট ভাইপো শঙ্করকে নিয়ে দেশ ছাড়লেন, চলে গেলেন বেনারসে, আমার বড়দার কাছে, যিনি আগেই রাজনৈতিক কারণে দেশছাড়া হয়েছিলেন।

    শেষবারে যখন বাপের বাড়ি গেলাম, গ্রামদেশের অবস্থা তখন ভীতিপ্রদ। হিন্দু-মুসলমানে একটা সাম্প্রদায়িক ফারাকের শুরু হয়ে গেছে, শাসকদের অঙ্গুলিহেলনে। দিনের বেলা যেমন-তেমন, রাতের বেলা খুবই থমথমে পরিবেশ। প্রতি রাতেই বিশাল জনতার সম্মিলিত কণ্ঠে ‘আল্লা হো আকবর’ জিকিরে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠত। এই নতুন বিপদের অর্থ যারা বুঝেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মুসলমানরাই ছিলেন বেশি। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, দেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের শুরু হতে যাচ্ছে। একটু লেখাপড়া জানা, বুদ্ধিমান, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা আক্ষেপ করতেন আড়ালে, নতুন আবির্ভূত সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষদের চোখ বাঁচিয়ে বন্ধু হিন্দুদের সতর্ক করতেন। এঁদেরই একজন ছিলেন আতর আলি। যাঁর কথা আগেও বলেছি। সাধারণ গ্রামের মানুষ, যারা আজীবন মিলেমিশে, পাশাপাশি বাস করেছে, সুখে-দঃখে, তিহারে পরবে একে অপরের সাথী থেকেছে তারা সহজে এই বিভেদ মানতে পারছিল না। এদেরই একজন ছিলেন মিলুকজান, নদীর ওপারে থাকতেন এই মহিলা, আমার বড়দির ছেলেবেলার সই। আমার মাকে ডাকতেন ‘মাইয়া’। গ্রামে সেইকালে সই পাতানোর মান রাখতেন এই মেয়েরা সারা জীবন। এই সখ্যতা ছিল চিরকালের গাঠবন্ধন। সেখানে হিন্দু-মুসলমানে কোন ভেদাভেদ ছিল না।

    দেশে যখন সাম্প্রদায়িকতার বাতাস বইছে, তখন এইসব সইরা বাড়ির পুরুষদের লুকিয়ে দেখা করত সই বা তাদের পরিবারের সাথে। কোন বিপদের গন্ধ পেলে এরা এসে জানাত হিন্দু সইদের। নদীর ওপারেই ছিল প্রধানতঃ মুসলিম গ্রাম। এরা নদী পেরিয়ে এসে ঝোপঝাড়ে বসে লুকিয়ে হিন্দু সইদের সঙ্গে সুখদুঃখের কথা কইতো।

    আমার বিয়ের পরপরই, দেশের অবস্থা যখন বেশ ভয়াল হয়ে উঠেছে, সেই সময় একদিন দুপুরে বাড়ির পিছন দিকে, নদীর পারে ঝোপের পাশ থেকে মিলুকজানের গলা পেলাম, খুব নীচুস্বরে ডাকছে। আমি শুনে সেখানে গেলে, তিনি বললেন মাইয়াকে, মানে আমার মাকে ডেকে দিতে। মাকে দেখেই মিলুকজানের সে কী কান্না বলে বোঝাতে পারব না। মুখে খালি এক কথা, ‘মা ঠাকরুন, আল্লার কি অভিশাপে দেশের এই দুর্দশা উপস্থিত হইল। একটুখানি চরণধূলি দ্যাও মা-ঠাকরুন, মরণকালে তো আর দেখতে পাইতাম না (পাবনা)’, ইত্যাদি নানা কথা আর অঝোরে কান্না।

    (ক্রমশ)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)