• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭১ | জুন ২০১৮ | গল্প
    Share
  • জবা ফুল গাছ সংশ্লিষ্ট গল্প : মুরাদুল ইসলাম


    সেদিন সন্ধ্যায় দেখলাম একটা লোক গেইটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের উপরে। মাথায় পাকা চুল, পরনে সাধারণ পোষাক। আমার দিকে চোখ পড়তেই লোকটি এগিয়ে এলো।

    আমি বারান্দায় ছিলাম। নেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাকে চাচ্ছেন?

    লোকটি নরম কন্ঠে বলল, আমি আপনাদের কয়েক বাসা পরে উঠেছি একটা বাসায়, একমাস হলো। একটা সরকারী চাকরিতে ছিলাম। অবসর নিয়েছি তিন বছর। আমার নাম আব্দুর রহমান।

    আমি বললাম, আচ্ছা, আমার নাম হামিদ। আপনি কোন দরকারে এসেছেন?

    লোকটি একটু ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ, একটা দরকারই ছিল বলা যায়। আপনাদের বাগানের কোনার দিকে একটা জবা ফুলের গাছ আছে। বাইরে থেকে দেখা যায়। এই গাছটা আমি নিতে চাই।

    আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। অপরিচিত একটা লোক হঠাৎ জবা ফুলের গাছটি নিতে চাইছে কেন, আমার মনে প্রশ্ন জাগল। গাছটি আহামরি কিছুই নয়। সাধারণ একটি গাছ। বাগানে কিছু ফুল গাছ এনে লাগিয়েছিলাম কয়েকবছর আগে। গাঁদা, সাদা গন্ধহীন গোলাপ, পাতাবাহার ইত্যাদি, এর সাথে জবা ফুলের গাছটাও ছিল। বিভিন্ন কারণে এখন আর যত্ন নেয়া হয় না। গাঁদা ফুলের গাছ প্রায় সব ক’টাই মরেছে। অন্যান্য গাছগুলির মধ্যে পাতাবাহার বেশ বিস্তৃত হয়েছে। এই গাছগুলোর ক্ষেত্রে যত্নের তেমন দরকার পড়ে না। জবা ফুলের গাছটি এক কোনায় কোনরকমে আছে। ফুল ধরেছে কয়েকটি। লাল লাল জবা ফুল। কিন্তু ফুল গাছ মানুষ যে জন্য লাগায়, অর্থাৎ বাড়ির শ্রী বৃদ্ধি করার জন্য, তা এখন করতে পারছে না বাগানের গাছগুলো। তাদের দিকে কেউ তাকায়ই না।

    আমি আমাদের কাজের লোক মজনুকে আগে মাঝে মাঝে বলতাম পানি-টানি দেবার জন্য। এখন আর তাও বলা হয় না।

    এরকম একটি প্রায় শ্রীহীন জবা ফুল গাছ কেন লোকটি নিতে চাচ্ছে, আমার জানতে আগ্রহ হলো।

    কিন্তু আমার প্রশ্ন করার আগেই লোকটি বলতে শুরু করল। আমার সাময়িক নীরবতায় তার মুখে দ্বিধা ফুটে উঠেছিল। লোকটি বলল, আর এর জন্য বিনিময় মূল্য দিতেও আমি প্রস্তুত, মানে গাছটি আমি কিনে নেব। আমি জানি এটি আপনাদের শখের গাছ। হয়ত এতে অনেক স্মৃতি জড়িত আছে। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি। তাই এর ভালো দাম দিয়েই আমি নেব। পাঁচহাজার টাকায় কি হবে?

    লোকটির কথা শুনে এবার আমি অবাক হলাম। সাধারণ ফালতু একটি গাছ পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে চায়। পাগল নাকি!

    আবার এটাও মনে হচ্ছিল, কেন এত দাম দিয়ে কিনতে চায়। রহস্যটা কী?

    সেইজন্যই আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আপনার সাথে পরে যোগাযোগ করব এ ব্যাপারে। গাছটি আমার বাবা লাগিয়েছেন। তিনি এখন ঘরে নেই। বাজারে গেছেন। তাঁর সাথে কথা বলে আপনাকে জানাব।

    ভদ্রলোক দ্বিধাচ্ছাদিত হাসিমুখে এতে সম্মত হলো। আমাকে তার মোবাইল নাম্বার দিলো, আমার মোবাইল নাম্বারও নিলো। এরপর গেইটের বাইরে গেছে কেবল লোকটি, তখন রিকশা নিয়ে আমার বাবা মির্জা আব্দুর রউফ বাজারসহ এসে হাজির হলেন। লাউ, পুঁইশাক ইত্যাদি বাজারের ব্যাগের বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, ব্যাগের নিচের দিকটা ভেজা মাছের জন্য।

    বাবা রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সোজা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলেন তাঁর চিরাচরিত নিয়মে। তিনি কারণ ছাড়া আমার বা অন্যদের অস্তিত্ব যেন স্বীকার করতে চান না, এমনভাবে চলেন।

    ভাড়া দেবার সময় রিকশাওলা বলছিল, চাচা কম হইয়া গেল না। বাবা ধমকের সুরে বলেছিলেন, চুপ থাক বেটা, যা দিলাম তা কম কী!

    আর কারো সাথে কোন কথা নেই। পাশে দাঁড়ানো লোকটাও দেখেন নি, আমাকে দেখেও দেখেন নি।

    কিন্তু আমি দেখলাম লোকটি চোখমুখ উজ্জ্বল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে হয়ত আমি এখনই বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসব। একটা জবা ফুলের গাছের জন্য এত আগ্রহ কেন, ভাবতে ভাবতে আমি গেলাম গেইটের কাছে। গিয়ে বললাম, দেখুন, আমার বাবা অনেক মেজাজি লোক। এখন তার সাথে এসব ব্যাপারে কথা বলা যাবে না। পরে কথা বলে আপনাকে আমি জানাব। এমনিতেই বাজার থেকে আসলে উনার মেজাজ থাকে চড়া।

    এই কথাটি মিথ্যা বললাম। যেমন বাবা গাছটি লাগিয়েছেন এই কথাটিও মিথ্যা বলেছিলাম। আমার আসল উদ্দেশ্য লোকটার ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া, আর জানা কেন সে এই গাছটি এত দাম দিয়ে কিনতে চায়।

    লোকটি সামান্য বিমর্ষ হলেও মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটিয়ে চলে গেলো।

    প্রথমে ভেবেছিলাম কাউকে বলব না, একা একাই খুঁজে বের করব। কিন্তু তা সম্ভব নয় বলে কাজের লোক মজনুকে দায়িত্ব দিলাম ঐ লোকটি যে বাসায় থাকে সেখান থেকে খোঁজখবর নিয়ে আসতে।

    মজনু খোঁজ নিয়ে এসে জানাল লোকটি একাই থাকেন। আত্মীয়-পরিজন কেউ নেই। একটা কাজের ছেলে সাথে থাকে। আর দিনের বেলা এক মহিলা রান্নাবান্না করে দিয়ে আসে।

    এই মহিলাটিই জানাল এই ভদ্রলোক অদ্ভুত। কম্পিউটারে ইংরেজিতে কথা বলেন কার কার সাথে। এছাড়া কথা বলেন খুব কম।

    কাজের ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে কিছু জানা গেল না। মনে হলো সে পণ করে বসেছে মনিবের কোন কথা কাউকে জানাবে না। ব্যাপারটা আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হলো।

    আমি জবা ফুলের গাছটির কাছে গেলাম। ভালোমত পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম গাছটি। কিন্তু অসাধারণ কিছুই পেলাম না তাতে।

    আমার স্ত্রী মিলিকে বলেছিলাম বিষয়টি। সে চোখ বড় বড় করে বলল, গুপ্তধন নয়তো?

    প্রশ্নটি কয়েক সেকন্ড আমার কাছে ভালো প্রশ্নই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরেই মনে হলো গুপ্তধন থাকলে তো থাকবে মাটির নিচে, গাছে কী!

    পরদিন আমার আর মনে ছিল না বিষয়টি। বিকেলের দিকে লোকটির ফোন পেলাম। তিনি বললেন, আপনার বাবার সাথে কি কথা বলেছেন গাছটির ব্যাপারে?

    হুট করে মিথ্যা বলতে বাধ বাধ ঠেকে, আমি ইতস্তত করে উত্তর দিলাম, না, এখনো বলতে পারি নি।

    লোকটি বললেন, বলে ফেলুন প্লিজ। উনি চাইলে আমি আরো বাড়িয়েও দেব।

    এইদিন সন্ধ্যায় আমি বাবাকে সব খুলে বললাম। তিনি প্রথমে কোন গাছ চিনতেও পারলেন না। তাঁকে নিয়ে গিয়ে দেখাতে হলো গাছটি। তিনি বললেন, এই লোকের সাথে আমি কথা বলব। তুই পারবি না।

    বাবা যখন বলে ফেলেছেন তিনি কথা বলবেন তা আর বদলানো যাবে না। আমি বাবাকে বললাম, আচ্ছা, তাহলে আজকেই উনাকে আসতে বলি। আমাদের পাশেই থাকেন। আর লোকটির সাথে কথা বলার সময় গাছের দাম বাড়ানো যায় কি না দেখবেন। মনে হচ্ছে সে আরো দুয়েক হাজার বাড়াতে পারে।

    বাবা কথাটিকে হাত দিয়ে উড়িয়ে দেবার মত ভঙ্গি করে বললেন, সে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।

    ভদ্রলোক আসলেন সন্ধ্যার কিছু পরে। বাবা তাঁর সাথে কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললেন, গাছটা আমার বড় প্রিয়। বলতে পারেন আমাদের বংশের সাথে জড়িয়ে আছে গাছটি। তাই এত কম দামে গাছটি আমরা ছাড়তে পারছি না। সরি ভাই।

    আমি বাবার কথা শুনে ভয় পেলাম লোকটি বুঝি না কিনে চলে যায়। বাবা আপাদমস্তক দুর্নীতিতে সার্থকতার হস্তপদ সঞ্চালন করতে করতে তাঁর কর্মজীবন শেষ করেছেন। সব কিছুতেই তাঁর একটা বাড়াবাড়ি করার প্রবণতা থাকে।

    লোকটি বিনীতভাবে বললেন, আমি আপনাদের আবেগ বুঝতে পারছি। কিন্তু গাছটি আমার দরকার।

    বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কেন দরকার?

    লোকটি বিব্রত হয়ে বললেন, সে আমি বলতে পারব না। কিন্তু ভালো দাম দেব।

    বাবা হাত কচলে বললেন, আচ্ছা, আপনার কেন দরকার তা আমার জিজ্ঞেস করাটা বোধহয় ঠিক হলো না। পার্সোনাল অনেক ব্যাপার-স্যাপার থাকতে পারে। তবে এতো করে যখন চাইছেন, তাহলে, এই ধরেন রাউন্ড ফিগার একই ভালো। কী বলেন?

    ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, মানে?

    বাবা মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, এক লাখ।

    এটা শুনে আমার মনে হলো সেখানেই কিছু বলে ফেলি। বাবার বুদ্ধিশুদ্ধি নিয়ে আমার প্রশ্ন দেখা দিল মনে। একটা জবা ফুল গাছের দাম এক লাখ কেউ চাইবে? তাও বাবার ভয়ে কোনরকমে মুখ বন্ধ রাখলাম, কথা বললাম না। কথা বললে এই অপরিচিত লোকের সামনেই তিনি বিদঘুটে এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবেন।

    কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, আমি বুঝতে পারছি আপনার আবেগ। কিন্তু এত টাকা তো ভাই আমি সাথে আনিনি। পঞ্চাশ হাজার আছে সাথে। এটা রাখতে পারেন। আগামী কাল বাকি পঞ্চাশ ব্যাংক থেকে তুলে দেব।

    বাবা বললেন, তা হচ্ছে না। আপনি পুরো টাকাটাই কাল দেবেন, ও মাল নিয়ে যাবেন।

    লোকটির কথায় আমার প্রায় মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কিন্তু বাবা নির্বিকার। যেন নিত্যই জবা ফুল গাছ তিনি লাখ দেড়লাখে বিক্রি করে আসছেন। লোকটা চলে যাবার পর দেখলাম বাবা আমাকে হাসি দিয়ে বুঝাচ্ছেন, দেখলি কেমন খেলটা দেখালাম।

    আমি পড়ে গেলাম চিন্তায়। এই গাছে আছেটা কী?

    উদ্ভিদবিজ্ঞানে পড়ত আমার এক বন্ধু, এখন বিজ্ঞানী হিসেবে সরকারী চাকরি করে। তার সাথে যোগাযোগ করলাম। এও জানালাম যে যেই লোকটা গাছ কিনতে চাচ্ছে তার বিদেশে যোগাযোগ আছে।

    বন্ধু বলল, আমি কালই টিম নিয়ে আসছি গাছটি পরীক্ষা করতে। এর আগে বেচবি না, খবরদার!

    আমার আরেক বন্ধু মোফাজ্জল, আমাদের থানার ওসি। তাকেও বিষয়টা জানালাম। তাকে জানানোর কারণ হলো, আমার সন্দেহ হচ্ছিল লোকটার ঘরের ভিতর কিছু একটা থাকলেও থাকতে পারে। চেক করে দেখা দরকার। আর কোনভাবে কয়েকটা দিন দেরি করাতে হবে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখুক, রিপোর্ট আসতে আসতে তো অন্তত এক দুইদিন লাগবে।

    মোফাজ্জল বলল, কেইসটা তো বেশ জটিল বন্ধু। এভাবে কেমন করে আটকাব ওরে?

    আমি বললাম, দেখ দোস্ত, কোনভাবে।

    মোফাজ্জল আমাকে আশ্বাস দিয়ে ফোন রাখলো।

    এলাকায় যেন কীভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল লোকটি আমাদের জবা ফুল গাছটি কিনবে এক লাখ টাকায়। তাই একটি অন্যরকম হইচই পড়ে গেল। পাড়ার লোকেরা আসতে শুরু করলো গাছটিকে দেখতে। আমি আর মজনু মিলে রাতে গাছটিকে পাহারা দিচ্ছিলাম।

    রাতে গাছটিকে দেখতে দেখতে মজনুকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, কীরে, তোর কি মনে হয়? কেন এই লোক এত টাকা দিয়ে এই গাছ কিনতে চায়?

    মজনু বলল, আমার একটা সন্দ আছে। আপনে কিছু মনে না করলে কইতে পারি ভাই।

    আমি বললাম, মনে করব না। বল।

    মজনু বলল, মানে ওই কিছু বদ পোলাপান আছে না, জবাফুল দিয়া হাত মারে, আমার মনে হয় এই কেইস। বুড়াটার মুখ দেখছেন, বেশ সুবিধার না। থাকেও একলা।

    মজনুর কথাটা শুনে তাকে ধমক দিতেও পারলাম না যেহেতু আগেই বলার অনুমতি দিয়েছি। আবার কথাটিকে এই মুহূর্তে আমার একেবারে ফালতুও মনে হলো না। এই ধরনের বুড়ো লোকদের ভীমরতি হয় ভালোই। আমি সিগারেট ধরালাম।

    পরদিন সকালে আমাদের বাড়ির সামনে এসে পুলিশের গাড়ি থামল। আমি নির্ঘুম লাল, ফোলা চোখ নিয়ে জেগেই ছিলাম।

    দেখলাম গাড়ি থেকে নেমে আসছে লোকটি। হতভম্ব চেহারা তার। একেবারে গাছের সামনে এলেন তিনি। গাছটিকে দেখলেন, স্পর্শ করলেন। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, আমার একটা ঝামেলা হয়েছে। থানায় যেতে হচ্ছে। আপনার বাবাকে বলবেন কয়দিন পরে গাছটিকে ঐ দামেই কিনে নেব।

    এটা বলে তিনি গিয়ে আবার গাড়িতে উঠলেন। দেখলাম সেখানে তার কাজের ছেলেটিও আছে। তাদের নিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে গেল।

    পরে জানতে পারলাম লোকটার বাড়িতে শেষরাতের দিকে পুলিশ হানা দিয়েছিল। ইয়াবা পেয়েছে। তাই তাকে মাদক আইনে থানায় ধরে নেয়া হয়েছে।

    আমি মোফাজ্জলকে ফোন করে ধন্যবাদ দিলাম। এটার দরকার ছিল। কয়েকদিন সময় হলেই হবে আমার। এর ভিতরেই জানতে পারব গাছটি আসলে কী।

    আমার উদ্ভিদবিজ্ঞানী বন্ধু ও তার টিম দুপুরের দিকেই চলে এসেছিল। সাথে দুয়েকজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীও। তাদের একজন বললেন, গাছটিকে অন্য গাছের চাইতে ভিন্ন মনে হচ্ছে। এর ভেতর নিশ্চয়ই কিছু রয়েছে।

    কিছু স্যাম্পল নিয়ে যাওয়া হলো। আমাকে বলা হলো, কাল রিপোর্ট পেতে পারি।

    বিকালের দিকে এসব কাজ শেষ হলো। গাছটি চুরি হয়ে যেতে পারে তাই আমি মজনুকে পাহারায় রেখে ঘুমালাম। একরাত না ঘুমানোর দরুন গাঢ় ঘুম হলো। রাত বারোটার পরে আমার ঘুম ভাঙল মোবাইল ফোনের রিংটোনে।

    ঘুম থেকে সদ্যজাগ্রত অবস্থায় আমি রিসিভ করলাম ফোন। ওপাশে মোফাজ্জল।

    উত্তেজনায় সে যেন কথা বলতে পারছে না।

    সে খুব দ্রুত বলল, বন্ধু, মারাত্মক একটা ঝামেলা হইছে। ঐ লোকটারে ভুল করে ক্রসফায়ারে দিয়া দিছে। সব শেষ!

    নিজের ভুলে কোন রোগী মারা গেলে ভালো ডাক্তার যেমন অপরাধবোধে ভুগেন, এমন একটা অপরাধবোধের ব্যঞ্জনা ছিল মোফাজ্জলের কথায়।

    আমি জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে? কীভাবে এটা সম্ভব?

    মোফাজ্জল বলল, বন্ধু আমি কিছুই বুঝাইতে পারব না। সব এলেমেলো হইয়া গেল, মানে ও যেন কীভাবে লিস্টে চলে গেলো...সব পরে বলব।

    আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। কয়েকদিন ধরে মাদকবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া মাদক ব্যবসায়ীদের খবর প্রায়ই দেখছিলাম পত্রিকা, টিভিতে। সেইসব খবর যেন ভিন্ন এক অর্থ নিয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছিল লোকটির মৃত্যুর খবর শুনে।

    এইদিনই আমার উদ্ভিদবিজ্ঞানী বন্ধু ফোন দিয়ে জানায় তারা পরীক্ষা করে দেখেছে গাছটি সাধারণ একটি জবা ফুলের গাছই, হিবিসকাস রোসা-সাইনেনসিস।

    লোকটির বাসার কাজের ছেলেকে পুলিশ ছেড়ে দেয়। এই ছেলে একদিন পরে আসে আমাদের বাসায়, দেখলাম ছেলেটি ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে এনেছে।

    আমাকে বলল, ওই গাছটারে দেখাইবেন? আমি আজ চইলা যাব গ্রামের বাড়িতে। তাই দেইখা যাইতে চাই।

    আগে পাড়ার প্রায় সব লোকই এসেছে গাছটিকে নতুন করে দেখতে, যখন হঠাৎ করে গাছটির অর্থমূল্য বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ছেলেটি এসেছে আমার চোখে পড়ে নি।

    আমি ছেলেটিকে নিয়ে গেলাম গাছটির সামনে। গাছটিকে স্পর্শ করে ছেলেটি কেঁদে উঠল।

    আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঐ ভদ্রলোক এই গাছটি কেন কিনতে চেয়েছিলেন তুমি জানো?

    অশ্রুসজল লাল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছেলেটি বলল, স্যারের এক মেয়ে ছিল। সেই মেয়ের এমন একটা গাছ ছিল জবা ফুলের। স্যার বলতেন দুইটা গাছ নাকি এক্কেবারে সেইম সেইম।

    এই গাছটি আমি উপড়ে ফেলেছি। কারণ প্রতিদিন বের হলেই ওদিকে চোখ যেত, গাছটি যেন চোখকে টেনে নিত। আর আমার মনে পড়ে যেত লোকটির কথা।

    কিন্তু এভাবে তো হয় না।

    তাই গাছটি উপড়ে ফেলেছি। এখন সেখানে কিছু কিছু ঘাস। তাও মাঝে মাঝে ওখানে জবা ফুলের গাছটিকে দেখা যায় বলে অনেকেই বলেছে। হঠাৎ হঠাৎ অনেকেই দেখে। বাবা কয়েকবার দেখেছেন, এবং তিনি যেন এর পর থেকে আরো গম্ভীর হয়ে উঠেছেন। মিলি একবার দেখে ভয়ানক চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। মজনুও দেখেছে, সে ওদিকটাতে যায় না আর। পাড়ার আরো অনেকে দেখে এবং আমাদের এসে জানিয়ে যায়। আমিও দেখেছি। কিন্তু আমার মনে হয় এসব আমার মনের ভুল। একবার মধ্যরাতে বারন্দায় সিগারেট খেতে এসে দেখেছিলাম গাছটি তার জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, টকটকে রক্তলাল ফুলদের নিয়ে। এতো লাল, চোখে এসে লেগেছিল। কিন্তু রাতের আবছা আলোতে ফুলকে এতো লাল দেখানোর কথা না। তাই আমি বিশ্বাস করি না গাছটি সত্যি সত্যি সবার অলক্ষ্যে ওখানে এসে বসে।




    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)