• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৬৮ | সেপ্টেম্বর ২০১৭ | গল্প
    Share
  • ঠাঁইনাড়া : সরিতা আহমেদ


    ।। ১ ।।

    ১ নাম্বার কুঠুরির ভেতর থেকে ঘুলঘুলি দিয়ে বাইরে অবিশ্রাম বৃষ্টি দেখতে দেখতে সুধার কেবল মনে হচ্ছিল, প্রীতমের আর বুঝি ঘরে ফেরা হল না। সেই প্রীতম যে কিনা তাকে কথা দিয়েছিল নদীর বুকে দাঁড় বাইতে বাইতে ভাটিয়ালি গান শোনাবে, ঠিক কোন জায়গায় ভাল মাছ ওঠে তা চিনিয়ে দেবে আর সন্ধেবেলা কাকপক্ষী টের পাওয়ার আগেই সুধাকে পেছনের দরজা দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকিয়ে দেবে — সে বুঝি সত্যি হারিয়ে গেল। অথচ এরকমটা হওয়ার কথা ছিল না। সেদিন যদি বড়বাবুর ঘোলাটে দৃষ্টি আর টলমলশরীরকে সুধা স্রেফ হজম করে নিতে পারত, তাহলে এদ্দিন নিশ্চয় সে প্রীতমের বৈঠার গল্প শুনতে শুনতে নদী দেখতে পেত ।

    খবরের কাগজে দিয়েছে আকাশভাঙা বৃষ্টিতে নাকি শহরের রাস্তাগুলো সব নদী হয়ে গেছে। সেই নিয়ে ১৮, ২০ আর ২২ নাম্বার সেলের মেয়েদের কতই না হাসাহাসি। খাবারের টেবিলে অবধি বৃষ্টি আর বন্যা নিয়ে তোলপাড় আলোচনা। ডাইনিং এ কোণার টিভিটারও বিরাম নেই। দিনরাত কেবল খবরের চ্যানেল খুলেই বসে রয়েছে। সুধার বড় ইচ্ছে হয় গানের চ্যানেল দেখতে। রাতদিন খালি নেতাদের আকচা আকচি, ছেলেপুলের খুনোখুনি, আর অস্থির শহরের চালচিত্র দেখতে কারই বা ভাল লাগে!

    ‘ও সুধা, তোমার পাড়ার খপর দিছে গো, দেকে যাও।’ — ২২ নাম্বারের রত্না একদলা ভাত মুখে দিয়ে হাঁক পাড়ল। মুখে খাবার নিয়ে কথা বলা দেখলেই সুধার বমি ওঠে। রত্নার দিকে একবার তাকিয়েই ভাতের থালা হাতে সুধা উঠে এল জানলার সামনেটায়। ওসব খবর যত না জানা যায় ততই মঙ্গল। নাহ, আজ আর চান করা হবে না। কাল থেকে শাড়িটা ভেজা, এত বৃষ্টি হলে শুকাবে কেমনে! নুন লেবুটা ভাতের সাথে মাখতে মাখতেই পেটের কাছটায় চোখ গেল সুধার। নীল পাড়ের কোঁচা ফেঁসে গেছে, একটু টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে। দিনে চারঘন্টা করে রান্নাঘরের নুন-হলুদ-মশলা-শরীরের ঘাম আর তেল চ্যাটে ময়লায় সেদ্ধ হচ্ছে মাস তিনেক ধরে — ক’দিনই বা ফ্যাড়ফ্যাড়ে সুতির শাড়ি আস্ত থাকে! আজ বিকেলেই ম্যাডামের কাছে নতুন শাড়ির জন্য দরবার করতে হবে, সাথে বলতে হবে ‘বাগানের কাজ দিন এবার, রান্নাঘরে অনেক দিন তো ডিউটি হল।’

    ।। ২ ।।

    বিকেলের দিকে এই সময়টায় সুধা বাগানে হাঁটে। পরিমলদার হাতে গোলাপের চারাগুলো কেমন জেল্লা দিয়েছে দেখতে বেশ ভাল লাগে তার। আগের হপ্তায় পরিমলদা বলেছিল, এবারের ১৫ই আগষ্টের লিস্টে তার নাম আছে। ‘তুমি চলে যাবে, দাদা? এই বাগানটা ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে থাকতে পারবে?’ — প্রশ্ন শুনে ফোকলা হাসিতে পরিমল বলেছিল, ‘‘যাতি তো চাই না দিদি। তিনবছর থিকা আটকে রাখছি। মেজবাবু যদ্দিন ছিলেন, আমার নাম লিস্টে দেন নাই। এবারে নতুন কত্তা আর শুনলেন নাই। কইলেন ‘আর কদ্দিন এরকম থাকবি পরিমল? অনেকদিন তো জেলের ভাত খেলি, তিনবছর ধরে সাজা মকুব হয়েছে তোর। এবার আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বাড়ি যা।’’

    অন্যান্যদের মত সুধাও এই গল্পটা জানে। পরিমলদার তিনকুলে কেউ নেই। এগারো বছর আগে মিথ্যে খুনের কেসে এখানে এসেছিল। ছেলের বৌ আর বেয়াইমশাই মিলে তাকে ফাঁসিয়ে দেয় নিজের ছেলেকে হত্যার মামলায়। সেই তবে থেকে আর বাড়ির নাম মুখেও আনেনি সে। প্রতিবার ১৫ই আগষ্টের দিন মন্ত্রী যখন সাজা মকুব হওয়া বন্দীদের নামগুলো পড়তেন, সে লুকিয়ে থাকত কোথাও। মেজকর্তার হাতে পায়ে ধরে সে এখানেই থেকে গেছে, বাড়ি ফেরার নাম শুনলেই বলে ‘‘মোর কেউ লাই, কুথাবে যাব? এহানে দিব্যি আছি। কুনো কষ্ট লাই। অন্যরা দ্যাশে ফিরে যাক, মুই এহানেই থাকব।’’

    পুরুষ বন্দী আর মহিলা বন্দীদের সেলের মাঝে বিশাল করিডর আর খান দশেক অফিস ঘর। তার সামনেই এই বাগান, যেখানে পরিমলদার সাথে আরো তিনজন কাজ করে। পরিমলদার মত সদাহাস্য, পরোপকারী ভালমানুষের সাথে কেন যে এমন হল — সুধার খারাপ লাগে। নীল অপরাজিতা চারাটার পচা পাতাগুলো একটা একটা করে ছেঁটে ফেলছে পরিমলদা।

    — ‘‘আমিও তোমার সাথে বাগানের কাজ করব, নতুন কত্তাকে একবারটি বল না পরিমলদা।’’ সুধার আবদার শুনে বুড়ো আবারও ফোকলা হাসল। ‘‘আইচ্ছা, আইচ্ছা।’’ — বলে অপরাজিতার দিকেই মন দিল আবার।

    ।। ৩ ।।

    বাগানের এই দিকটায় কলতলার দড়িতে প্রায়ই একটা আসমানি শার্ট মেলা থাকে — আজও আছে। কার কে জানে! তবে বেশিক্ষণ সেইদিকে চেয়ে থাকলে চোখ কড়কড় করে সুধার। খালি মনে পড়ে প্রীতমের কথা। বড্ড নীল পাগল ছিল ছেলেটা। নীল ফতুয়া, ফ্যাকাশে নীলচে রঙের টুপি পরে যখন মাঝ নদীতে ছিপ ফেলে বসে থাকত সে, দূর থেকে মনে হত মাছরাঙা বসে আছে ।

    পুজোর পরে যেবার নৌকায় নীল রং করল সেই বছর, খুব গর্বের সাথে সে সুধাকে বলছিল ‘‘এইবার পানির জিনিসের পানির মত রং হইছে, না রে!’’

    সুধার খুব মজা লেগেছিল, হি হি হেসে বলেছিল — ‘পানির আবার রং হয় নাকি! ও তো আকাশের রং, জলে ছায়া পড়ে নীল দেখায়।’

    তোম্বা মুখে প্রীতম ঝাঁজের সাথে বলেছিল ‘‘হুঁ, একপাতা বই পড়ে পণ্ডিত সাজছে মেয়ে! দেখবি দেখবি, যেদিন তোকে নিয়ে পালাব, সেদিন পানির রং কেমন হয়, নিজের চোক্ষেই দেখবি।’’

    সুধার গাল দুটো আচমকা লাল হয়ে গিয়েছিল ।

    ‘‘যাহ, বদমাশ কোথাকার, কোনও কথা নেই তোমার সাথে। ভাগো!’’ — দৌড়ে পালিয়েছিল সে।

    কুড়িটা বছর কেটে গেল — অথচ মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা সব। রাতের কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনতে শুনতে টিমটিমে আলো জ্বলা সেলের ভূতুড়ে কুঠুরিতে চোখ বুঝে সুধা দিব্যি দেখতে পায় ফেলে আসা দিনের ক্যালাইডোস্কোপ।

    ।। ৪ ।।

    বড়বাবুর বাড়িতে যেদিন লাল রঙের ফ্রক পরে সুধা এল পরাণকাকার হাত ধরে, তখন কত্তামা তাকে দেখে বলেছিলেন, ‘ও পরাণ, এ কাকে আনলে গো! এ যে এক্কেরে পুতুল খেলা মেয়ে। একে দিয়ে বাড়ির কাজ হবে?’ সুধা তখন ফ্রকের ফিতের খুঁট চিবাচ্ছিল আর কত্তামাকে দেখছিল। ঠিক যেন পালপাড়ার দুগগাঠাকুরের মত মুখখানা। অমন ঢলোঢলো পান পাতার মুখের দিকে চেয়ে ছোট্ট সুধার ভেতর থেকেই কে যেন ‘মা’ বলে ডুকরে উঠেছিল। পানের ডিবে থেকে সাজানো পান মুখে নিয়ে কত্তামা যখন ওইসব কথা বলছিলেন, সুধা তখন লাল পেড়ে শাড়ির জীবন্ত দুর্গাকে প্রণাম জানাচ্ছিল মনে মনে। আর ওদিকে পরাণকাকা এক টানা বলেই যাচ্ছিল ‘‘আপনার কোনও চিন্তা নেই, মা। সুধা সব কাজ পারবে। বাপ-মা মরা মেয়ে, আমার ভরসায় আর কদ্দিন রাখি বলেন? দিনকাল যা! মেয়েটা বড় ভাল। সাত চড়ে রা কাড়ে না। আপনার গেরস্থবাড়িতে হাতে হাতে সব যোগাড় দেবে, এক কোণায় পড়ে থাকবে, আপনি টেরও পাবেন নি কো। রেখে নিন।’’

    সেই থেকে সুধা রয়ে গেল শাড়ি পরা বয়স অবধি। মাঝে যে সময়টায় সে নীল-সাদা চুড়িদার পরত, তখনই আলাপ হয় প্রীতমের সাথে। অবশ্য সেটাও কত্তামার জন্য ।

    কিছুদিন রান্নাঘরের কাজ, কলতলার কাজ ইত্যাদির ভার দিলেও ক্রমে একরত্তি মেয়েটার উপর তাঁর বড্ড মায়া পড়ে গেল। আসলে সুধার মুখখানিই এমন মায়ামাখা যে ওর দিকে চাইলেই বারবার সেইসব দুর্বিসহ দিনগুলোর মনে পড়ে যেত। তিনবালতি কাপড় কেচে ছোট্ট সুধা যখন ছাদের দড়িতে লাফিয়ে লাফিয়ে সেগুলো মেলত, কত্তামার বুকের ভেতরটা চুরমার হয়ে যেত। তাঁর দুঃখও তো কম না, পাঁচ পাঁচবার মেয়ে ধরেছিলেন পেটে, একটাও টিকলে না। বড়বাবুর বিস্তর জমিদারি, সদাব্যস্ত মানুষ, তায় আবার নিত্য বারবণিতা গমন আছে। কাজেই স্ত্রীর মনের ক্ষতে মলম দেওয়ার সময় কই? তিনি ফি মাসে গয়না, টাকা ইত্যাদি ছড়িয়েই কর্তব্য পালন করেন। বাঁজা স্ত্রীর আর বেশি কি বা চাহিদা থাকতে পারে!

    এভাবেই কবে যেন সুধা হয়ে গেল কত্তামা’র মেয়ে। হাতে হাতে সংসারের কাজ শিখে, অ-আ-ক-খ-র গণ্ডী পেরিয়ে শেষমেশ সে ইস্কুলে গেল বেণী দুলিয়ে। প্রথমদিকে পরাণকাকা মাঝেমাঝে তাকে দেখতে আসত, সুখদুঃখের গল্প করত, গ্রামের বর্ষার কথা, রীনা আর খোকনের স্কুলে যাওয়ার কথা — ক্রমে ক্রমে সে গল্প ফিকে হতে লাগল। তারপর কাকা শুধু বড়বাবুর পায়ের কাছে বসতেই আসত। কী যে গুজগুজ ফিসফাস করত প্রভু-ভৃত্যে, সেকথা সুধার বোঝার সাধ্য ছিল না। তার তখন গল্পের বইয়ে মন আর সেই মন মাঝেমাঝে হু হু করত প্রীতমের অনুপস্থিতিতে। স্কুলে যাওয়ার পথে ঘাটে যদি তার নৌকা বাঁধা না দেখত, সুধার চোখ অকারণ চঞ্চল হত, মন অজান্তেই মেঘলা হত।

    প্রীতম বরাবরই বড়বাবুর খেলার পুতুল — যখন ইচ্ছে কর্তার পা টিপে দেয়, হুকুম মত ফুটফরমাশ খেটে দেয়, বাবু মহিলা নিয়ে শখের নৌকাবিহারে বেরলে সে হয় তাঁর বিশ্বস্ত মাঝি। সতেরো বছরের প্রীতম আজন্মের জল পাগলা ছেলে। তার উপর সুধার সান্নিধ্যে তার দার্শনিক হতে সময় লাগল না। এদিকে বছর ঘুরতে বাপ মরলে পরে তার নৌকা আর মাছধরার জালেরও মালিক হল সে। মাথার উপর গুরুজন না থাকলে আর হাতে চাট্টি কাঁচা পয়সা এলে মানুষের লাগাম খানিক ঢিলে হয়। প্রীতমই বা ব্যতিক্রম কিসে! ইস্কুল যাওয়া আসার পথে কত্তামার নির্দেশে যে ছেলে সুধার প্রহরী হয়েছিল, সেই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে জলের দেশে যাওয়ার খোয়াব দেখতে লাগল। সুধার মাঝেমাঝে মনে হত এ ছেলের বুকের মাঝে আস্ত এক নদী আছে, যেখানে বিশাল এক আকাশের ছায়া পড়ে। নইলে পেটে গামছা বেঁধে জমিদারবাড়ির ফুটফরমাস খেটে অমন নীল সাগরের স্বপ্ন বোনা তো এলেবেলে ব্যাপার নয়।

    সেবারের বর্ষায় তুমুল নিউমোনিয়ায় ভুগে কত্তামা চলে গেলেন। দাহ-টাহ সেরে সবাই যখন ক্লান্ত শরীরে এলিয়ে পড়েছে, তখনই সুধার কানে প্রথম সে বলল ‘এবার তালে যাবি তো আমার সাথে?’

    এ বাড়িতে সুধার যে বিশেষ কিছু স্থান হয়েছে এত বছরে তা নয়, স্থান হয়েছিল কত্তামার বুকের মাঝে। চিতার আগুনে হাড়পাঁজরের সাথে সে নরম স্থানও ছাই হয়ে গেছে। এখন সুধার ব্যাপারে মাথা ঘামাবে এমন এ সংসারে কেউ নেই। তবু এতদিনের মায়া, বড়বাবুর মেজাজ, প্রাত্যহিক কাজের চাকর-বাকরদের নজর কেটে পালাবার কথা ভাবতেই সুধার বুক কেঁপে উঠেছিল। বরাবর প্রীতমের ডাক শুনে সে যা করে, সেদিনও তাই করেছিল সে। তাকে ধাক্কা মেরে এক দৌড়ে অন্দরমহলে চলে গিয়েছিল ।

    ।। ৫ ।।

    ২১ নাম্বার সেলের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে বসে আজকাল সুধার আফশোষ হয়, যদি সেদিন সত্যিই সে পালিয়ে যেত তবে হয়তো প্রীতমের বুকের সেই নদীটার খোঁজ নিশ্চয় সে পেত। মাস ছয়েক হয়ে গেল, সুধা দেখেনি তাকে। অমন ভোলানাথের মত ছেলের বুকে যে এত আগুন থাকতে পারে কেই বা জানত! প্রীতমের অমন রূপ সুধা সেই রাতে দেখেছিল। কলুটোলা থেকে মেয়েমানুষ নিয়ে নৌকাবিহার শেষে নেশাতুর বড়বাবু যখন বাড়ি ঢুকলেন, তখন সেই শূন্যপুরীতে তিনটে বুড়ো চাকর ছাড়া একমাত্র সুধাই ছিল জেগে। ইস্কুলের পাট চুকে গেলেও বই পড়ার নেশা সে ছাড়তে পারে নি। কর্তাবাবুর ডাকে জানলা দিয়ে উঁকি দিয়েই বুঝেছিল আজ বাবু নিজের বশে নেই। বিছানার উপর শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ তখনো খোলা।

    ‘কই রে সুধা! এই সুধা, জুতোটা খুলে দে দিকিনি ...’ — কর্তার এই শমন পেয়েও সুধা তাঁর কাছে যেতে সাহস করেনি। বিকেলে পরাণকাকার সাথে বুড়োর কথাবার্তা মোটেই ভাল ঠেকেনি তার। বিশেষত পরাণকাকার হাতে অতগুলো টাকার বাণ্ডিল দেওয়া, আর এদিক ওদিক দেখে সেই বাণ্ডিল টুক করে লুকিয়ে কাকার হনহন করে বেরিয়ে যাওয়া দেখেই সুধা বুঝেছিল মতলব ভাল না।

    ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে বড়বাবুর সামনে খাবার বেড়ে দিয়েই সে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। বাইরে পূর্ণিমার ফকফকে জ্যোৎস্নায় দালান-উঠোন ভেসে গেলেও সুধার মনের কোণায় আঁধার জমাট বাঁধছিল। বারো বছর ধরে সে এই বাড়িতে আছে, কই মনের ভেতর এমন কু’ডাক তো আগে জাগে নি।

    খাটের নিচে রাখা ব্যাগে তখনো দুটো শাড়ি নেওয়া বাকি, দুরের কোথাও থেকে ঘণ্টাধ্বনি শুনে সুধা সন্ধ্যা থেকে প্রহর গুনেছে। বুকের মাঝে দ্রিম দ্রিম শব্দ এড়াতেই সে বইয়ের মাঝে মুখ গুঁজেছিল। সে পারবে তো কথা রাখতে! প্রীতম দেরি করবে না সেটা নিশ্চিত, কিন্তু তার দেরি হয়ে যাবে না তো! আজ যে তাকে নদীর ডাক শুনতেই হবে, জল পাগল ছেলে যে অনেক দিন তার অপেক্ষায় আছে একবুক আকাশ নিয়ে।

    গভীর শ্বাস নিয়ে, মন শান্ত করে সুধা দ্রুত হাতে ব্যাগ গোছায়, চেন টানার আগে ভরে নেয় কত্তা মা’র সাদা কালো ছবিটাও। ব্যাগটাকে খাটের নিচে ভরার আগেই দরজায় ধাক্কা পড়ল। প্রীতম কি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে? দ্বিধাগ্রস্ত পা নিয়ে শেকল নামাতেই যে দশাসই চেহারা ঘরে ঢুকে তাকে ছিটকে দিল — তা প্রীতমের নয়।

    নাহ, অঘটনটাকে আটকানো গেল না। ‘বুকে ব্যথা হচ্ছে, মালিশ করে দে’ — ফরমান জারি করে বড়বাবু একরকম জোর করে ঘরে ঢুকেই সুধার বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন। সুধা টের পেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামছে, হাঁটু জোড়া তুমুলভাবে কাঁপছে। বুড়ো চাকরগুলো তখন ঘুমের দেশে।

    তারপর কি থেকে কি যে হল... ঘরের আলো নেভার সাথে সাথে একটা লোমশ কালো হাত আর পাহাড়প্রমাণ দেহটা তাকে যখন আচ্ছাদিত করছিল ধীরে ধীরে, তখনই তীব্র চিৎকারে সেই দেহ হঠাৎ ছিটকে পড়ল।

    গোঁঙানি আর হুটোপাটির অন্ধকার নিমেষে খান খান হয়ে আলো জ্বলে উঠল হঠাৎই। জ্ঞান হারাবার আগে সুধা কেবল শুনতে পেল ‘সু-ধা! একি, ক-কি হল!’

    ।। ৬ ।।

    পেছনের জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে প্রীতম দেখল সুধা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে, চোখে শূন্য দৃষ্টি, চেহারা বিধ্বস্ত, সারা হাত লাল আর সামনে বড়বাবুর নিথর দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তার বুকের মাঝে গাঁথা একটা রাজস্থানী ছোরা। এটা প্রীতমের খুব চেনা। কত্তামার প্রিয় জিনিসের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। অসুস্থ অবস্থায় সুধাকে এটা দিয়ে উনি বলেছিলেন ‘কাছে রাখ, বিশ্বাস রাখিস বিপদে এই রক্ষা করবে।’

    সেই যেবার সুধাকে চুপিচুপি প্রথম জড়িয়ে ধরেছিল সে, সেইদিন জানতে পেরেছিল এটার কথা।

    মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল প্রীতম। ছোরায় ধরা সুধার হাত সাফ করে, ছোরার বাঁট সাফ করে ফেলল সে। তারপর সুধার চোখে মুখে জল ছিটিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে চাপা স্বরে বলতে লাগল ‘তুই পালা সুধা, তুই পালা। একছুটে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়া। কিচ্ছু ভাবিস না তুই। আমি সব সামলে নেব।’

    তারপর কিভাবেই বা সেই রাত কাটল, কিভাবেই বা সে পুলিশের খপ্পরে পড়ল মনে করতে গেলেই মাথা ভারি হয়ে আসে সুধার। শুধু এটুকু আবছা মনে পড়ে পালাতে সে পারে নি। ইস্কুলে দু’বার দৌড়ে সেকেন্ড হয়েছিল সে, সেদিনও ফার্স্ট হওয়া হল না। রক্তমাখা ভিজে কাপড়ে, খালি পায়ে কাঁকুরে রাস্তায় কতক্ষণই বা দৌড়তে পারত সে। বারবার তার মনে হচ্ছিল ওই বুঝি নদীর ঘাট দেখা যায়। ওই বুঝি নীল রঙের নৌকা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে!

    ।। ৭ ।।

    জজ সাহেবের একশ’আঠারো প্রশ্নের জবাবে সে এতদিন ধরে একটা কথাই বলেছে, ‘আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, মারতে নয়।’ কিন্তু কেউ তার জবাবে পাত্তা দেয় নি। কালো কোটপরা বাবুরা সমানে জিজ্ঞেস করে গেছে ‘তোর সাথী কই? নাম বল।’

    কিন্তু ছ’মাস হয়ে গেল সুধার মুখ থেকে অন্য কারু নাম কেউ শোনে নি। জুভেনাইল জেলের রান্নাঘরের কাজ, পরিমলদার বাগান আর মাঝেমাঝে বই পড়ার অভ্যেস নিয়ে সে ভালই ছিল। মনের মধ্যে একরাশ হিজিবিজির মধ্যে একটা আলো নিভতে নিভতেও নেভে নি — প্রীতম। সে জানত প্রীতম ঠিক তাদের দুজনার জন্য কোনও এক ভিনদেশী নদীর পাড়ে একটা ঠাঁই বানিয়ে নিয়েছে এতদিনে। তার নীল নৌকা, মাছ ধরার জাল, ভাটিয়ালি সুর আর নদীর বুকে আকাশের ছায়া পড়া স্বপ্ন নিয়ে নিশ্চয় সে সুধার অপেক্ষায় আছে কোথাও। কিন্তু কাল সকালে খবরের কাগজের তিন নাম্বার পাতাটায় চোখ পড়তেই সুধার গোপন আলোর শিখা দপদপ করতে লাগল। ২০ নম্বরের দীপালির থেকে ছোঁ মেরে নিয়েই সে দেখল তার চোখ ভুল দেখে নি।

    প্রীতমের সাদা কালো ছবি বেরিয়েছে — ফেরারী আসামীর তালিকায়। পুলিশ তাকে হায়নার মত খুঁজছে। কিভাবেই বা পুলিশ ওর নাম পেল, ছবি পেল — একসাথে এত জটিল অঙ্ককষার মত বুদ্ধি সুধার নেই।

    রান্নাঘরের তেলকালির নিত্য ঝগড়ায় যখনই ওই আসমানি শার্টের দিকে সুধার চোখ পড়ে, তখনই সে বিচিত্র ভাবনায় অস্থির হয়। তার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে যে ছেলে মারাত্মক আগুনে নিজেকে সঁপে দিল, তাকে পালাবার পথ বলে দিয়ে নিজের পথ যে রুদ্ধ করল, তার কি এমনভাবে ঠাঁইনাড়া হওয়া মানায়! জলদেবতার সন্তান যে মানুষ সে আর যেখানেই ভেসে যাক না কেন, লোহার গারদ অথবা জজ সাহেবের ঘর তার যোগ্য নয় কিছুতেই। যার একটা আসমানি রঙের জীবন আছে, বুকের মাঝে আস্ত একটা নীল নদী বয়, তাকে নীল-সাদা ডোরাকাটা পোষাক মানাবে না কিছুতেই। সে বরং ভেসে যাক। হারিয়ে যাক। মাছের সাথে ডুব দিয়ে সে বরং সাগরতলার ঝিনুক হয়ে থাকুক। তবু ফেরার তাকে থাকতেই হবে। একটা পাপীর খুনে দু’জনের ঠাঁইনাড়া হওয়া কোন স্বাধীন দেশের ন্যায়বিচার?

    সামনে আবার ১৫ই আগষ্ট। এবারের না হোক, সামনেবার কি তার পরেরবার ... ১৫ই আগষ্ট তো বারবার আসবে। পরিমলদার মত তার নামও হয়তো একদিন লিস্টে উঠবে। এই ক’টা দিন জুভেনাইল জেলের ঘোলাটে জীবনে একটামাত্র আশা জ্বালিয়ে সুধা দিব্যি বেঁচে থাকবে। সে তো এটুকু জানবে তার একটা নদী আছে আপন।

    আকাশের ছায়া ফেলা একান্ত আপন আস্ত একটা টলটলে নদী ছাড়া মানুষ বাঁচে কেমনে!



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)