• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৬৮ | সেপ্টেম্বর ২০১৭ | উপন্যাস
    Share
  • আয়নার ভিতরে : কৌশিক সেন


    ‘তিতলি ও বুদ্ধিমান ছেলে। ও ঠিক বুঝবে। ওদের জেনারেশনে যারা বড়ো হচ্ছে তাদের বুঝতেই হবে যে বড়োরা সবসময় ঠিক নন, তাদের ভুলভ্রান্তি, দোষত্রুটি আছে যার ফলে অনেক সময় ঘরে ভাঙন ধরে, আবার নতুন করে ঘর গড়তেও হয়।’

    ‘মেয়ে হয়ে জন্মানোর সবচেয়ে বড়ো সুখটাই সবচেয়ে বড়ো দায় টুকুদা। তুমি যেমন সহজে তোমার ছেলেমেয়েকে ছেড়ে থাকতে পারো, আমি তো তেমনটা পারবো না। মাঝখান থেকে তোমার জীবনে আবার একটা নতুন জটিলতা আসবে। ভেবে দেখো, সত্যিই কি এটার দরকার আছে। তার চেয়ে—’

    সমাদৃতা থেমে গেলেন। বিভাসের হাতটা নি:শব্দে ওঁর হাতের ওপরে উঠে এসেছে, লম্বা লম্বা সার্জিক্যাল আঙুলগুলোর মধ্যে আশ্বাস আর দৃঢ়তা। কথা বাড়ানো এক্ষেত্রে নিরর্থক।

    ‘বহুদিন পরে তিতলি আমি সকালবেলা উঠে এই ভেবে ভালো বোধ করি যে একজনের সঙ্গে দেখা হবে, শুতে যাই এই তৃপ্তি নিয়ে যে একজনের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো। এর মাঝখানের সময়টা কিভাবে কাটলো, আজকাল সেটা প্রায়ই অবান্তর মনে হয়।’

    বিভাস কেমন একটা কোমল অথচ তীব্র দৃষ্টিতে সোজা মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন, হাতের চাপটাও বেড়েছে, একটু ব্যথাই লাগছে সমাদৃতার। যদিও ঘরে এই মুহূর্তে কেউ নেই তাও ভারি অস্বস্তি লাগছে ওঁর।

    ‘তুমি আছো আমি আছি। এই বয়সে এতো রোম্যান্টিক হয়ো না টুকুদা, পেট গরম হবে।’

    ‘তোমাকে বলেছি না টুকুদা বলে ডাকলে সাড়া দেবো না। নতুন নাম তৈরি করো।’

    ‘জোর করে কিছু তৈরি হয় না মশাই। সময় লাগে।’

    ‘এখন তো অফুরন্ত সময়। মুম্বাইয়ের কাজটা মিটে গেলে হয়।’

    ‘কেন জানি না টকুদা, আমার মুম্বাই যেতে ভয় করছে। মনে হচ্ছে যে-জীবন থেকে পালিয়ে এসেছি সুযোগ পেলেই সে কুমিরের মতো আমার পা কামড়ে জলের তলায় নিয়ে যাবে।’

    ‘দূর পাগলি।’ বিভাস হাসলেন, ‘মাত্র তো কয়েকটা লিগাল ডকুমেন্ট সই করা। তারপর আমরা মুক্ত, জীবনের যেটুকু সময় বাকি আছে তা শুধু আমাদের দুজনের জন্য।’

    ‘তোমার আত্মবিশ্বাস দেখে ভালো লাগে, আবার ভয়ও হয় টুকুদা।’

    ‘ওই দুটো নিয়েই তো জীবন তিতলি। আর তুমি যে একটু আগে বললে না, মেয়েরাই শুধু সন্তানের স্বার্থকে নিজের থেকে আলাদা করতে পারে না, ওটাও বোধহয় অর্ধসত্য। আমি জানি প্রতিদিনের জীবনের মাতৃস্নেহটাই বেশি করে চোখে পড়ে। কিন্তু বাবারও একটা আলাদা জায়গা আছে, একটা অন্যরকম দায়বদ্ধতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটুকু বলতে পারি যে যদিও ছেলেমেয়েদের রোজকার জীবনযাত্রার সঙ্গে আমার বিশেষ যোগাযোগ নেই, তাও ওদের জন্য দরকার হলে আমি যে কোনো রকম ত্যাগ করতে পারি। কেন, তা আমি নিজেও জানি না, সমাজবিদেরা হয়তো বলতে পারবেন। আমি শুধু এইটুকুই জানি যে আমি যতো দূরেই যাই না কেন, আমার একটা অংশ ওদের সাথে থেকে গেছে। তাই পাপুকে সেই জায়গাটা থেকে আমি কোনোদিন বঞ্চিত করতে চাইবো না।’

    ‘কাল ঠিক সময় এয়ারপোর্টে চলে এসো।’ সমাদৃতা আস্তে আস্তে বললেন।

    ‘চলে আসবো মানে? তোমাকে তুলে নেবার কথা ছিল তো।’ বিভাস একটু অবাক।

    ‘লক্ষ্মীটি আমার, আমাকে বাবা আর পাপুর সঙ্গে একটু কথা বলতে দাও, ওরাও হয়তো যেতে চাইবে। তুমি থাকলে অস্বস্তি হতে পারে ওদের। একটু ধীরে চলো, পালিয়ে তো যাচ্ছি না, প্লেনের সীটও পাশাপাশি।’

    ‘ঠিক আছে, কষ্ট করে একাই চলে যাবো’, বিভাস ব্যাজার মুখে বললেন। এই মুহূর্তে বিভাসকে জড়িয়ে ধরে একটা নিবিড় চুমু খেতে খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু বাবা আর পাপু যে কোনো সময়ে ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। ভালোবাসা আর মমত্ববোধ যেন শরীর আর ছায়ার মতন, রোদ উঠলে আছে, মেঘ করলে নেই। ভালোবাসার মানুষ হিসাবে সন্দীপের কথা ভাবলেও বিতৃষ্ণা হয় সমাদৃতার অথচ ওর ডায়াবেটিস, অত্যধিক মদ্যপান আর খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম নিয়ে অজান্তেই মনে চিন্তা আসে। একবার ভেবেছিলেন একটা ফোন বা ইমেইল করে ওর গার্লফ্রেন্ড, রচনা নামের ওই মেয়েটিকে কয়েকটা প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের কথা বলে দেন কিন্তু শেষ অবধি করা হয়ে ওঠেনি। উনি লক্ষ্য করে দেখেছেন যে যখন বিভাসের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মনটা ভালো লাগে, হালকা লাগে ঠিক তখনই খুচ করে কোথায় একটা দায়বদ্ধ পোকা কামড় বসায়। মনের মধ্যে যখন রাগ আর অভিমানের কালো মেঘ জমেছিল, তখন তো একবারের জন্যেও এসব কথা মনে হয়নি, কোন অন্ধকার গহ্বরে তখন মুখ লুকিয়েছিল মমতার ছায়ারা?

    *********

    ‘আমাদের খোঁজা কি তাহলে শেষ হয়ে গেল রনি?’

    চট করে কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না রন। কাল রাতের ফ্লাইটে ওদের দেশে ফেরার কথা। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৭০ রহস্যময় কারণে সমুদ্রে পড়ে আছে, তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি, সারভাইভার বলে কেউ নেই। এই গল্পটাই এখন মোটামুটি সকলে মেনে নিয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার দায়িত্ব স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে, আপাতত: সরকারীভাবে খোঁজার পালা। রূপকথার গল্পের মতন প্লেনটা যদি সমুদ্রের তলা থেকে যাত্রী আর মাঝিমাল্লা সমেত ভেসে ওঠে শুধু সেক্ষেত্রেই কাউকে জ্যান্ত ফিরে পাবার সম্ভাবনা আছে। তাও খোঁজা শেষ হয়ে যাবার কথাটা বলতে মুখ আটকায়।

    সন্ধ্যা হয়ে আসছে, বীচের ওপর অসংখ্য লোকের ভিড়, ভেলপুরিওয়ালারা সাংঘাতিক ব্যস্ত। রন লক্ষ্য করলো মিমির চোখদুটো আবার লক্ষ্যহীনভাবে ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেদিন নিউমার্কেটের ওই ঘটনার পর কেমন যেন হয়ে গেছে মিমি। হঠাৎ শব্দ শুনলে চমকে ওঠে, মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। রন লক্ষ্য করেছে কোথাও মানুষের ভিড় দেখলেই ও চোখ বড়ো বড়ো করে উদ্‌ভ্রান্তের মতো তাদের মুখগুলো স্ক্যান করতে থাকে। ও কি রূপকথায় বিশ্বাস করে? ও কি ভাবছে যে ওর বাবা মন্ত্রবলে সমুদ্র থেকে উঠে এসে কোটি কোটি মানুষের এই দেশের কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে? ভারতীয়রা কেমন যেন রহস্যময়, যতই তারা পশ্চিমদেশে জন্মাক, ওদের মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা মস্তো পাগড়ি আর লম্বা দাড়িওয়ালা জাদুকর বসে থাকে। কথা না খুঁজে পেয়ে হঠাৎ একটা অব্যক্ত আবেগের ঢেউ উঠলো ওর মনে। আলগোছে পিঠ জড়ানো ওর হাতের বিরাট থাবাটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরলো মিমির কাঁধ।

    ‘লাগছে,’ খুব আস্তে এমনভাবে কথাগুলো বললো মিমি, যেন লাগাটা ওর ভালোই লাগছে, ‘বাবা ছোটবেলা এইরকম শক্ত করে ধরতো। আমি কি বাবার বদলে তোমাকে আঁকড়ে ধরলাম রনি? এটাকেই কি সিন্ডেরেলা কমপ্লেক্স বলে?'

    ‘একেবারে বাজে কথা। ছেলে বা মেয়ে সবাই ছোটবেলায় পরিবারের কাছে নিরাপত্তা চায়, বড়ো হয়েও বিপদের সময় বন্ধুর কাছে নির্ভরতা খোঁজে। কেউ কেউ বাইরে সেটা দেখাতে চায় না, তাদের অহংকারে লাগে। তুমি তাদের দলে নও, আমিও নই। আমার মন খারাপ হলে আমি স্বচ্ছন্দে তোমার কাছে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করবো।’ রন রাগার ভান করলো একটু।

    ‘তুমি জানো আমি না থাকলে বাবা অনেক আগেই চলে যেতো। বাবা আর মা কথাই বলতো না আজকাল। আমার কি মনে হচ্ছে জানো? বাবা ওই প্লেনে ওঠেনি, ঠিক অন্য কোথাও চলে গেছে। ভালোই আছে কিন্তু আমাদের কথা ভেবে মন খারাপ করছে এক সময়।’

    আবার সেই জাদুকরটা কোথায় বসে তার বাঁশি বাজাচ্ছে। রনি মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলো সেখানে ঘন পাতার আড়ালে টলটলে জল, জলের তলায় স্ব্বছ আয়না, আয়নার ভিতরে গভীর কালো কনীনিকা, তারও ভিতরে অতল অন্ধকার। সেইদিকে তাকিয়ে বসে রইলো রন। আকাশের আলোও নিভে এলো একসময়, চারপাশে মানুষজনের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে হারিয়ে গেল সেই আধো অন্ধকারে। ওরা টেরও পেল না কখন বিতান আর রবিন ওদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

    ‘জানো বিতান মাঝে মাঝে আমি আর জাভেদ সেন্ট্রাল পার্কে বসে থাকতাম। এক এক সময় মনে হত ধরা যাক সব আলো নিভে গেছে, চারদিকে মানুষের ভিড় মিলিয়ে গেছে কুয়াশায়, আকাশছোঁয়া বাড়িগুলো স্লেটে আঁকা ছবির মতন যেন মুছে দিয়েছে কেউ। আমরা গল্প করতে করতে কিচ্ছু টের পাইনি। এখন সেন্ট্রাল পার্কে শুধু আমরা দুজন, সামনের ওই বিরাট পাথরের চাঁইটা ছাড়া চেনা জিনিস বলতে কিছু নেই। তখন আমরা কি ভয় পাবো না ভীষণ খুশি লাগবে?’

    ‘আমি হলে তো ভয় পেতাম কারণ ছেলেটা একটু কাঠখোট্টা, অঙ্ক করতে ভালোবাসি আর কল্পনাশক্তি বেশ কম। তাই বোধহয় আমার গার্লফ্রেন্ড জোটে না। এরা কিন্তু বাড়াবাড়ি করছে, মিমি এখনো হাইস্কুল পেরোয়নি, এর মধ্যেই অবস্থা দেখো?’ বিতান এক ঝটকায় ওদের ডাকবার আগেই রবিন আটকে দিয়েছে।

    ‘এক মিনিট বিতান। দেখো ওরা কেমন প্রায় পাথরের মতো বসে আছে, নড়ছেও না একটা কথাও বলছে না। এরকম একটা আশ্চর্য সুন্দর সময় আসলে কিন্তু যেমন অবাস্তব তেমনই ভঙ্গুর। আমার বাড়ির শিক্ষা বলে আল্লাহর ইচ্ছা না হলে একটা পাতাও গাছের ডাল থেকে মাটিতে পড়ে না। প্লেনটা হারিয়ে যাওয়ার পর আমিও প্রায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল জীবনের যা কিছু সুন্দর আর পবিত্র, সব এক লহমায়, বিনা দোষে, বিনা কারণে মুছে যাবে, আল্লাহর এ কি রকম ইচ্ছা! এই রকম অবিচার যখন প্রতিদিন হয়ে চলেছে তখন সেই অন্ধ বিচারকের কাছে কেমন করে আত্মসমর্পণ করা যায়!’

    ‘ওটা কিছু নয় রবিন, বিরিভমেন্ট বা শোকের কতগুলো স্তর আছে, তার মধ্যে একটায় মানুষ ভাগ্যের সঙ্গে দরদস্তুর করে তারপর আরেকটা সময় ভগবানের ওপর খামোকা খুব রাগ হয়। রাগ করার জন্য তো একটা পাত্র দরকার, আর কারো ওপর যথেষ্ট পরিমাণে রাগ না করতে পারলে তখন ভগবানই ভরসা। শেষ অবধি মানুষ মেনে নেয়, তারপর নানাভাবে সেই মেনে নেওয়াটাকে র‍্যাশনালাইজ করে। আমার মনে হয় জীবনে সবকিছুই এলোমেলো সমাপতন, শুধু কতগুলো সম্ভাবনার সমষ্টি, ভালো মন্দ, সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য সবই সংখ্যাতত্ত্বের হিসাবে চলছে। এতো সোজা বলেই হয়তো এটাকে মেনে নেওয়া কঠিন। মাঝখান থেকে পাঁচরকম ধর্ম আর পঁচিশরকম নিয়ম বানিয়ে লাঠালাঠি করছে সবাই।’

    ‘আশ্চর্য, তুমি আর জাভেদ কয়েকটা ব্যাপারে ঠিক একরকম। বিশ্বাসীদের আঘাত করতে চাইলে আর কিছু চাও না।’

    ‘কয়েকটা ব্যাপারে একরকম, সব ব্যাপারে কিন্তু নয়। কোনো দুজন মানুষ একরকম হয় না।’

    ‘আমি জানি। তাও একরকম একটা চরম দু:খের সময় তোমার সঙ্গে দেখা হওয়া, বন্ধুত্ব হওয়াটাকে আমি প্রভিডেনস বলেই মনে করি। থ্যাঙ্ক ইউ বিতান।’ রবিনের মুখে হঠাৎ একটা অপ্রস্তুত হাসি খেলে গেল। সেই মুহূর্তেই সমদ্রের হাওয়া এসে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে গেল ওর রেশমি হেডস্কার্ফ, অবাধ্য কয়েকগাছা চুল এসে পড়লো মুখের ওপর।

    ‘ধন্যবাদ তোমাকে আমার দেওয়া উচিত রবিন। ইউনিভার্সিটিতে তোমাকে দেখলে আমি হয়তো তোমার কাছেই ঘেঁষতাম না। তোমার হিজাব দেখেই আমার মগজের ভেতরে একটা ছাঁচে ফেলা ধারণা তৈরি হয়ে যেত। এইরকম একটা দু:সময়ে দেখা না হলে আমি জানতাম না যে বাড়াবাড়ি না করেও নিজস্বতা বজায় রাখা যায়, প্রথা মেনেও আধুনিক হওয়া সম্ভব। জানতাম না যে হিজাব থাকুক আর না থাকুক তুমি ঠিক আমার মতোই একজন বহুত্ববাদী মানুষ। তোমার বন্ধু হতে পারাটা আমার সৌভাগ্য রবিন। আশা করবো বন্ধুত্বটা এইখানেই শেষ হবে না, আমাকে আরো অনেকবার বস্টন থেকে নিউইয়র্ক যেতে হবে।

    অন্ধকার না হলে বিতান দেখতে পেত রবিনের ফর্সা মুখ লাল হয়ে উঠেছে।

    ফেরার পথে ট্যাক্সিতে ওদের কারো মুখে বিশেষ কথাবার্তা নেই। পাওয়া আর হারানো, মৃত্যু আর ভালবাসার এই বিপ্রতীপ স্রোতে সাঁতার কাটতে কাটতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সবাই। হোটেলে একটা ঘরে রন আর বিতান থাকছে আরেকটা ঘরে মেয়েরা। খাওয়ার পর একসাথে বসে অনেক রাত অবধি কথা বলার অভ্যাস হয়ে গেছিল ওদের, কিন্তু আজকে একে একে চারজনেই তাড়াতাড়ি শুতে চলে গেল। আজ সকালে এয়ারলাইনের আর জাভেদের পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার পরে যেন বন্যার জলের মতন নেমে গেছে ওদের উৎসাহ আর উত্তেজনার স্রোত। সেই স্রোতে ভাসা বেদনা, আক্রোশ, অসহায়তা সবকিছু পলির মতন থিতিয়ে পড়েছে মনের চড়ায়। উর্বরা মাটি এখন নতুন আনন্দের বীজ ভিক্ষা করছে, সেই সম্ভাবনায় শিহরিত হয়ে উঠছে ওদের অনিচ্ছুক মন। এই সময় একটা লম্বা ঘুমের খুবই দরকার।

    সকালে উঠে ওরা সবাই ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বাড়ি ফেরার কথা ভেবে এখন বেশ ভালোই লাগছে। জাভেদের বাবা এসেছিলেন, রবিনের জন্য অনেক দোয়া করে গেলেন ভদ্রলোক। পুত্রশোক যতই গভীর হোক, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা পাওয়া কম কথা নয়। এয়ারলাইন সব মিলিয়ে প্রায় একশো ষাট হাজার আমেরিকান ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেটা প্রাথমিকভাবে যাত্রীদের স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের প্রাপ্য। রবিন যে সেটা নিজের ইচ্ছায় ভাগ করে নিয়েছে তাই নিয়ে ওদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এমন মেয়েকে কাছে রাখতে পারলেন না সে দু:খও কম নয়।

    ‘আমি আবার আসবো আব্বাজান। আমার ওপর আপনাদের পুরো অধিকার রইল।’ রবিন ওঁকে আশ্বস্ত করে বললো। ওর মুখে একটা অদ্ভূত শান্তির আভাস। ওদিকে আবার মিমি হইচই করে সবাইকে ব্যস্ত করে ফেলেছে।

    ‘দাদা আমার সেলফোন চার্জারটা দেখেছিস? রনি তুমি দেখেছো? আশ্চর্য কোথায় যে গেল জিনিসটা।’

    ‘মিমি তুই আবার নিজে জিনিস হারিয়ে অন্যদের ওপর চোটপাট করছিস। আমরা সবাই আইফোন ব্যবহার করি শুধু তোরটাই গ্যালাক্সি, আমরা তোর চার্জার নিয়ে কি করবো।’ বিতান গলা তুলেছে এবার। রন হন্যে হয়ে দুটো ঘরেই চিরুনি তল্লাশ চালিয়ে যাচ্ছে।

    ‘আ: বকাবকি করছো কেন? ওই তো পাশেই অ্যাত্তোবড়ো শপিং মল রয়েছে, একটা কিনে নিলেই হবে। এই ধরনের ইউএসবি চার্জার সব দেশেই তো এক। চল মিমি আমরা গিয়ে কিনে আনি একটা।’ রবিন এসে মিমির হাত ধরেছে এবার।

    ‘তাই ভালো, এমনিতে আমাদের লাঞ্চ তো খেতেই হবে কোথাও।’ খাটের তলা থেকে থেকে রনের গলা শোনা গেল।

    ‘এই নিয়ে তিনবার চার্জার হারালি।’ গজগজ করতে করতে উঠে পড়লো বিতান।

    মলের নাম হাইস্ট্রিট ফিনিক্স, জাঁকজমকে পৃথিবীর যে-কোনো মলের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে। যাবতীয় ব্র্যান্ড নেম আর আমেরিকান ফাস্টফুড রেস্টুরেন্ট এখানে হাজির আছে। রবিবার দুপুরবেলা গিজগিজ করছে লোক, ওরা এটা ওটা দেখতে দেখতে ফুডকোর্টের দিকে চললো। মিমির জিনিস কেনা হয়ে গেছে। রন অবাক চোখে চেনা নামগুলো দেখছে, ওর চোখে সবকিছু যেন বড্ড ক্লিশে, গতানুগতিক আর বেমানান। পুব দেশের সেই জাদুকর এখানে গরহাজির।

    গোলমালটা শুরু হলো ফুডকোর্টের দিক থেকেই। প্রথমে পটকা ফাটানোর মতো কতগুলো আওয়াজ, দেখা গেল কিছু লোক দৌড়তে শুরু করেছে। মলের মাঝখানে বিরাট বিরাট স্ক্রীনে নানারকম বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে, তার সঙ্গে তারস্বরে চলছে বলিউডি গানবাজনা, তাই প্রথমে ওরা কেউ ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। হঠাৎ কানফাটানো কয়েকটা শব্দের সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল ব্যান্ড আর বিজ্ঞাপনের মিলিত ক্যাকোফোনি। তার বদলে শোনা গেল হাজার মানুষের আতংকিত কোলাহল। টেররিস্ট! হামলা! ফিদাইন! ভাগো!

    রন সবার আগে ব্যাপারটা বুঝে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে ও প্রায় ঘাড়ে ধরে সবাইকে সামনের একটা বেঞ্চির তলায় ঢুকিয়ে দিল। ফটাফট উলটে দিল চারদিকের টেবিল চেয়ারগুলো। পটকা নয় ওগুলো অটোমেটিক রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ। ফুডকোর্টের মধ্যেই গুলি চলছে, আততায়ীরা খুব কাছে, এখন এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি করলে মারা যাবার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি।

    **********

    হোটেলের জানলা দিয়ে আলো ঝলমলে দোকান আর বিজ্ঞাপনের বোর্ড বেশ সুন্দর দেখায়। প্যালাডিয়াম। স্কাই জোন আর গ্র্যান্ড গ্যালারিয়া, সিনেমা হল আর বোলিং অ্যালি। ম্যাকডোনালডের পাশে সাদা লাল রং করা বিরাট উঁচু এক চিমনি, এইসব নিয়ে এক টুকরো আমেরিকা, হাইস্ট্রিট ফিনিক্স মল। সমাদৃতা এতো দামী হোটেল বুক করার জন্য বকাবকি করছিলেন কিন্তু বিভাস পাত্তা দেননি। এই মুহূর্তে দুজনেই জানলার সামনে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন শহরের আলোকমালা।

    কাগজপত্রে সই হয়ে গেছে, মাথার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছে সমাদৃতার। এক গ্লাস ওয়াইন খেয়ে ঘুমোতে পারলে বেশ হতো কিন্তু বিভাস পালিয়ে প্রেম করতে আসা কলেজ ছাত্রের মতন অধৈর্য।

    ‘একটু দাঁড়াও স্নান করে আসি।’ সমাদৃতা বললেন।

    ‘খুব ভালো কথা। চলো স্নান করে আসি।’ বিভাসের হাত আলগা হবার কোনো লক্ষণ নেই।

    ‘এক্ষুনি নয় টুকুন। আস্তে আস্তে সব হবে।’

    ‘ও: তিতলি, কি সুন্দর নামটা দিয়েছো। আবার ডাকো প্লীজ!’ বিভাস উত্তেজিত।

    ‘টুকুন, টুকুন, টুকুন। এবার ছাড়ো।’

    হাসতে হাসতেই বাথরুমে ঢুকে গেলেন সমাদৃতা। দরজা বন্ধ করে আলোটা জ্বালাতেই বিরাট আয়নায় নিজের ছবিটা ফুটে উঠলো। ওইটা কি আমার প্রতিফলন নাকি আরেকটা আমি, যে আয়নার ভেতরে ছিল এতদিন। এক এক করে পোষাকগুলো মাটির ওপর ফেলে দিলেন সমাদৃতা। ওঁর শরীরটা এখনও ছিপছিপে, কোমর আর বুকের রেখা নিটোল, সেই কলেজের দিনগুলোর মতোই প্রায়। শুধু চোখের চারপাশে ক্লান্তি আর বিতৃষ্ণার কাটাকুটি খেলার চিহ্ন পড়েছিল অনেক। আয়নার মুখের ওপর সেই দাগগুলো খুঁজতে থাকলেন সমাদৃতা।

    ‘টুকুন আমি এখানেই আছি। আমার আজকেই ডিভোর্স হয়েছে, নিষিদ্ধ প্রেমের উত্তেজনাও থিতিয়ে গেছে। এই মুহূর্তের বেদনাতুর মুক্তির স্বাদটুকু নিয়ে নিতে দাও আমায়। তারপর না-হয় আবার তোমার সঙ্গে নতুন বন্ধনে জড়াবো, সেই খ্যাপাটার মতন পরশপাথর খুঁজবো আবার। আমাদের মন যে অনির্দেশ্য টুকুন, অসঙ্গতি আর স্ববিরোধিতা তার হাড়ে-মজ্জায় জড়ানো। কেন আমার ভালোবাসায় অক্ষম হয়ে পড়ি, যোগাযোগ ভেঙে যায়, কামড় বসায় বিরক্তি আর বিপন্নতা তার খবর তুমিও রাখো না, আমিও না। সভ্যতার শুরু থেকে এতদিন অবধি মেয়েরা সেই অক্ষমতার বিষ শুষে নিয়েছে, নদীর কিনারায় গাছের সারির মতন নিজেরা আহত হয়েও ঠেকিয়ে রেখেছে ভূমিক্ষয়। আজ নারী পুরুষ সকলেই যখন এক পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে একই পুরস্কার দাবী করছে, ভাঙন তখন আর ঠেকায় কে? তাও তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না টুকুন। তোমার সঙ্গে আমার মেয়েবেলার মায়াবাস্তব জড়িয়ে আছে তাছাড়া তোমার মুখে কেমন একটা ভয় পাওয়া, হারিয়ে যাওয়া ভাব যা বয়স্ক পুরুষমানুষের মুখে আমি কখনো দেখিনি। জীবনের রাস্তা এখন এক দানবিক হাইওয়ে, এখানে সামনের দিকে তাকাতে আমার ভয় করে, চলো আমরা বরং হাঁটাপথে পিছন ফিরি।’

    গরম জলের ধারার মধ্যে দাঁড়িয়ে মনটাকে শান্ত করে নিয়েছেন সমাদৃতা। আয়নার ভেতরের ছবিটাও সেই বাষ্পের স্রোতে আবছা হয়ে গেছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখেন বিভাস বিছানার একদিকে আধশোয়া হয়েই কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। টেবিলে হুইস্কির গ্লাস খালি, টেলিভিশনে কি একটা প্যাচপ্যাচে সিরিয়াল চলছে।

    আলোটা নিভিয়ে দিয়ে খুব সাবধানে লেপের ভেতর ঢুকে পড়লেন সমাদৃতা। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে কিন্তু বিভাসকে এইরকম অবস্থায় রেখে দিলে যদি কাল ওর ঘাড়ে পিঠে ব্যথা হয়। পিঠের পিছন থেকে বালিশটা বার করে লেপটা একটু টেনে দিলেন উনি, বিভাসের কিন্তু তাও ঘুম ভাঙলো না। এবার অন্ধকার ঘরে ওরা পাশাপাশি শুয়ে, দুজনের মাঝখানে কেটে যাওয়া বছরগুলোর একঘেয়েমির গল্প আর চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাস।

    বিভাসের ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে, ঘরের মধ্যে তখন রোদ্দুর।

    ‘গুডমর্নিং টুকুন। নেশার ঘুম কাটলো?’

    ধোঁয়াওঠা কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সমাদৃতা। স্বচ্ছ নীল রঙের শাড়ি আর ম্যাচিং কার্ডিয়ান, হালকা লিপস্টিক আর কাজলে মুখের রেখাগুলি নরম আর স্নিগ্ধ। চুলগুলো একটা বাঁকা চাঁদের মতো রুপোলী রঙের ক্লিপ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা সেখান থেকে রেশমি কালো পার্ম করা চুলের ঢেউরা ইচ্ছেমতন লুটিয়ে পড়ছে ওঁর পিঠের ওপরে, গলা আর দুই কানে রুপোয় গাঁথা মুক্তোরা দোল খাচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা নিখুঁত সকালবেলার ছবি।

    ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তুলে দিলে না কেন? আপশোষ আর সাফাই মেশানো গলায় বললেন বিভাস।

    ‘কালকে ঘুমের দরকার ছিলো তোমার আমার দুজনেরই। আজকে তার শোধ তুলতে পারো তবে বয়েস হয়েছে, হুইস্কি খাওয়াটা কমাতে হবে। জানো তো শেক্সপীয়র কি বলে গেছেন?’

    ‘প্রোভোকস দি ডিজায়ার বাট টেকস অ্যাওয়ে দি পারফরমেনস। জানি।’ হতাশ ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙলেন বিভাস, ‘কি প্ল্যান তাহলে আজকে? সারাদিনটা কিন্তু একেবারে ফ্রি।’

    ‘চলো একবার শপিং সেন্টারে যাবো। তোমাকে কয়েকটা জিনিস কিনে দিতে চাই। তারপর মহারাজের যেমন ইচ্ছে।’ সমাদৃতার গলায় আদর আর কৌতুক মিশে ভারি মিষ্টি একটা আমন্ত্রণ। বিভাসের ইচ্ছে হল কালকের রাত্তিরের বকেয়াটা এক্ষুনি মিটিয়ে ফেলা উচিত কিন্তু সমাদৃতা এখন সাজ নষ্ট হলে রেগে যাবেন। বিভাস দেখলেন ওঁর আঙুলে একটাও আংটি নেই, শুধু দাগটা দেখা যাচ্ছে। এমন নিখুঁত সাজের সঙ্গে এটা বেমানান।

    ‘ঠিক আছে চলো। আমি তোমার জন্য একটা আংটি কিনবো। হীরের আংটি।’

    *******

    ফুডকোর্টের ভেতরটা এখন কালো ধোঁয়ায় ভর্তি। ওরা একটা হ্যান্ড গ্রেনেড ফাটিয়েছে, চারদিকে পোড়া গন্ধ, তার মধ্যে আহতদের গোঙানি আর এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত কতগুলো শরীর। টেবিলের তলা থেকে রন আক্রমণের পরিকল্পনাটা বোঝার চেষ্টা করলো। দলের বাকি তিনজন আতঙ্কে আর আকষ্মিকতায় মোটামুটি আড়ষ্ট হয়ে আছে। নিজেদের সামনে একটা বেঞ্চি উলটে আড়াল বানিয়েছিল রন, তার ওপরেও এসে লেগেছে কয়েকটা বুলেট, ভাগ্যক্রমে কেউ আহত হয়নি। হামলাদাররা এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে চালাতে চলে গেছে, ওরা এখন মলের অন্যদিকে। অল্পবয়েসী কয়েকটা ছেলে, গালে সদ্য ওঠা দাড়ি, ভাবলেশহীন মুখ, একজনকে দাঁত বার করে হাসতেও দেখেছে রন। ফুডকোর্টের বাইরে একজনকে ওরা রেখে গিয়েছে, সে দাঁড়িয়ে আছে ওদের দিকে পিছন করে, পরনে জিনস, আর টিশার্ট, তার ওপরে ভারি জ্যাকেট আর ব্যাক প্যাক, হাতে কালাশনিকভ রাইফেল। রন আন্দাজ করলো মলের বিভিন্ন দরজা দিয়ে ঢুকে ওরা ট্যাকটিক্যাল পজিসন নিয়েছে। বাইরে সাইরেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, একটা লাউডস্পীকারের শব্দও আসছে, তার মানে নিরাপত্তা বাহিনীও হাজির। এদের উদ্দেশ্য যদি শুধু গণহত্যা হয় তাহলে এক্ষুনি আবার গুলিগোলা চলতে শুরু করবে। যদি ওরা বন্দী নিয়ে সরকারের সঙ্গে দরাদরি করতে চায় তবে ওদের একটা জায়গায় লোকজনকে জমায়েত করতে হবে। হামলাদার ছেলেটা প্রায় কুড়ি ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে, এই মুহূর্তে চুপ করে বসে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ। রন ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখলো, ওর বিরাট শরীরটার আড়ালে যতটা পারে আড়াল করে রাখলো বাকি তিনজনকে। পিছনের দোকানটা থেকে কাবাব লাগানো লোহার শিকগুলো মাটির ওপর ছড়িয়ে পড়েছে, তার একটা এখন ওর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা। মাঝে মাঝে কট কট করে গুলি, কান্না, আর্তনাদ, আর কাঁচ ভেঙে পড়ার শব্দের মধ্যে কয়েকটা নারকীয় ঘন্টা কেটে গেল ওদের। মিমি আর রবিন মোটামুটি চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে। বিতান খুব অল্পের জন্য বেঁচে গেছে, ওর চোখ মুখ অপ্রকৃতিস্থ, মাঝে মাঝে হাত-পাগুলো থরথর করে কেঁপে উঠছে। খানেকটা দূরে বন্দুক হাতে ফিদাইন ছেলেটা এদিক থেকে ওদিকে পায়চারি করছে কিন্তু কাছাকাছি আসছে না। ডানদিকে যারা এতক্ষন গোঙাচ্ছিল তাদের ওপরে একটু আগেই ও একটা ম্যাগাজিন খালি করে দিয়েছে, সেখানটা এখন নিস্তব্ধ, শুধু মেঝের ওপর রক্তের স্রোত গড়াচ্ছে। বাঁদিকে একটা স্টোভ উলটে আগুন লেগেছিল সেটা এখন আস্তে আস্তে বেড়ে উঠছে, তার ধোঁয়ায় উলটে পড়া বেঞ্চি আর টেবিলগুলো কিছুটা আবছা। রন নি:শব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে কাউন্টারের দিকে সরে গেল। জলের বোতল দরকার, ভিজে কাপড়ে নাক ঢাকতে না পারলে এখানে আর বেশিক্ষণ টেঁকা যাবে না।

    ‘রবিন আমাদের কিছু কাপড় দরকার।’ ফিসফিস করে বললো রন।

    ‘এই নাও।’ মাথায় জড়ানো স্কার্ফটা খুলে দিয়েছে রবিন।

    ‘বিতান আমাকে একটু হেল্প করো। কাপড়টা সমান চারটে টুকরোয় ছিঁড়তে হবে, তারপর এই বোতলের জলে ভিজিয়ে সবাই যে যার নাকমুখ ঢেকে নাও। মিমি অত জোরে হাঁ করে নি:শ্বাস নিয়ো না, ধোঁয়া গিলে এক্ষুনি অসুস্থ হয়ে পড়বে।’

    স্বাভাবিক অবস্থায় বিতান এই দলটার নেতা কিন্তু এই মুহূর্তে রনের কাছে ও শিক্ষানবিশ। মিমি প্রাণপণে ওর কনুইয়ের কাছটা খিমচে ধরে ছিল, অনেক কষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে রন। রক্তমাখা, জিনিসপত্র ছড়ানো মেঝের ওপরে ও এখন চিতাবাঘের মতই নি:শব্দে নড়াচাড়া করছে আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা ভয় পাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই।

    ‘নো সাডেন মুভমেন্ট। ব্রীদ স্লো-লি।’ জলের বোতলগুলো হাতে হাতে ধরিয়ে দিল রন। ঠিক সেইসময় কানফাটা একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে সামনের বন্দুকধারী ছেলেটা মাটির ওপরে উপুড় হয়ে পজিশন নিলো। হেলিকপ্টারের পাখা ঘোরার আওয়াজের সঙ্গে নিশে গেল একটানা মেশিনগানের শব্দ। তার মানে কাউন্টার অফেনসিভ শুরু হয়ে গেছে, সম্ভবত: মলের ছাদ বা একদিকের দেওয়াল ভেঙে সিকিউরিটি ফোর্স ঢুকে পড়েছে। এদিকে আগুনটা যেভাবে বাড়ছে, এখানে আর বেশিক্ষণ টেঁকা যাবে না। ওদিকে মলের ভেতরে সমানে গুলি চলছে তার সঙ্গে এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি আর চিৎকার। রন লোহার শিকটা শক্ত করে চেপে ধরলো। এইটুকু রাস্তা দৌড়ে ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে কতো সেকেন্ড লাগবে? সম্ভবত: ও বন্দুক ঘোরাবার সময় পাবে না কিন্তু ওর কাছে যদি সুইসাইড বেলট থাকে তাহলে বাঁচার আশা কম, মাঝখান থেকে অন্যান্য হামলাদাররাও এদিকে চলে আসতে পারে।

    কিছুক্ষণ বাদে লড়াইটা হঠাৎ করেই থেমে গেল যেন। আক্রমণকারীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মলের বিভিন্ন জায়গায় ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে। এবার ফ্লাশিং আউট অপারেশন, মানে এক এক করে প্রতিটি এলাকা আক্রমণকারী-মুক্ত করতে হবে। এইটাই সবচেয়ে ভয়াবহ সময় কারণ ফিদাইনরা এই সময়ে নির্বিচারে খুন করবে, নিজেদের সুইসাইড ভেস্ট ডেটোনেট করার আগে যতটা পারবে হত্যালীলা চালিয়ে যাবে। এই মুহূর্তটা ঝড়ের আগে থমথমে আকাশ।

    ‘এক্ষুনি আবার গুলি চলতে শুরু করবে।’ ফিসফিস করতে বললো রন, ‘আস্তে আস্তে বুকে হেঁটে ডানদিকে সরে যাও। নাহলে আগুনটা এবার গায়ের ওপর এসে পড়বে। চারদিকে অনেক ডেড বডি আছে, ঘাবড়ালে চলবে না। আমার পেছনে পেছনে এসো সবাই।’

    ওরা কয়েকশো ফুট গেছে কি যায়নি নরক ফেটে পড়লো জায়গাটায়। বারান্দার ওপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে আসছে, জলপাই রঙের উর্দিরা একটা থাম থেকে আরেকটা থামের আড়ালে ছোটাছুটি করছে, চোখ জ্বালানো ধোঁয়ায় পুরো এলাকাটা ভর্তি। নাকে মুখে ভিজে কাপড় জড়ানো থাকার ফলে ওরা কোনোরকমে নি:শ্বাস নিতে পারছে। জলপাই রঙের উর্দিরা আরেকটু কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে সামনের ফিদাইন ছেলেটা বিকট চিৎকার করে দুহাত তুলে লাফিয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিরাট একটা বিস্ফোরণ, রক্ত আর হাড় মাংসের একটা বৃষ্টি ওদের মাথার ওপর নেমে এল। মিমি একটা আর্তচিৎকার করে যেদিকে চোখ যায় ছুটতে শুরু করে দিয়েছে।

    ‘মিমি। কোথায় যাচ্ছিস!’ এবার বিতানও উঠে ওর পিছনে ছুটলো।

    ‘মিমি! বিতান! গেট ডাউন অ্যান্ড ফর গডস সেক ডোন্ট রান।’

    রন যেটা ভয় পেয়েছিল ঠিক সেটাই হয়েছে। ওরা দুজন চারদিকের প্রচণ্ড প্যানিক আর দৌড়াদৌড়ির মধ্যে মিশে গেছে। বারান্দাগুলোয় এখন খণ্ডযুদ্ধ, লোকেরা বাইরে যাবার দরজাগুলোর দিকে ছুটছে, আর সেখানেই ঘাঁটি গেড়ে গুলি চালাচ্ছে আততায়ীরা। লাউডস্পীকারে বারবার বলা হচ্ছে যে যেখানে আছেন আড়াল নিন, মাটির ওপর শুয়ে পড়ুন কিন্তু প্যানিকে পাগল জনতা সেসবে কান দিচ্ছে না।

    একটা ভাঙা শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে গায়ে মাথায় লেগে থাকা রক্ত মোছার চেষ্টা করছিল মিমি। ওর চোখমুখ পাগলের মতন, থরথর করে হাত পা কাঁপছে। চারদিকে হালফ্যাশনের জামা কাপড়, জুয়েলারি, ভাঙা পারফিউমের শিশি, মেকআপ, আইলাইনার, লিপস্টিক, দামী হাইহিল জুতো সব যেন একগাদা আবর্জনার মতন ছড়ানো। বিতান ভিড়ের চাপে আরেকদিকে চলে গেছে। এক্ষুনি একদল লোক ওকে ধাক্কা মেরে চলে গেল, আরেকটু হলেই ও তাদের পায়ের তলায় পিষে যেত। মাটি থেকে উঠতে না উঠতেই একটা কর্কশ হাত ওকে চেপে ধরলো, চুল ধরে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিলো ওর পায়ের ওপর। ও অনুভব করলো কানের ওপর একটা ধাতব বস্তু চেপে বসেছে। হিন্দীতে বলা কথাগুলো ও বুঝতে পারলো না, কিন্তু তার মধ্যে হিংস্র শাসানিটা এক ফোঁটা অস্পষ্ট নয়।

    আততায়ীর মুখ ও দেখতে পাচ্ছে না কিন্তু লোকটা প্রাণপণে হাঁপাচ্ছে, ওর নি:শ্বাসের দুর্গন্ধ টের পাচ্ছে মিমি। চোখের সামনে কালো ইউনিফর্ম পরা চারজন সৈন্য, চারটে ইনস্যাস এইদিকে তাক করা। লোকটা ওকে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে একটা দোকানের মধ্যে ঢুকে গেল। আরেকটা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো চারদিক, ওদের মাথার ওপর ভেঙে পড়লো দোকানের ঝাড়লন্ঠন, মিমি বুঝতে পারলো ওর কাঁধের ওপর থেকে কর্কশ হাতটা আলগা হয়ে এসেছে। উষ্ণ তরল পদার্থের একটা ধারা ওর গায়ের ওপর ছড়িয়ে পড়লো, মিমির মনে হলো লাল রঙের একটা পিচকারি ওর ঘাড়ের ওপর থেকে রং ছড়াচ্ছে। চারদিকে আগুন আর ধোঁয়া, তার মধ্যে থেকে আরেকটা হাত এসে ওকে টেনে তুলেছে। হাতটা শক্ত অথচ স্নেহময়, সেই অস্পষ্ট শৈশব থেকে এই পরিচিত হাত ওকে আশ্রয় আর ভরসা দিয়েছে।

    ‘বাবা!’

    ‘মিমিসোনা। কোনো ভয় নেই রে মা। এই তো আমি এসে গেছি।’

    রক্তাক্ত কাচের টুকরোটা ফেলে দিয়ে মিমিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন বিভাস। ফিদাইন ছেলেটার মিমির মতোই বয়েস হবে, এখন কাউন্টারের ওপর উলটে পড়ে আছে, ওর গলার বাঁদিকে কাটা শিরা থেকে টাটকা রক্তের স্রোত।

    ‘বাবা আমি জানতাম তুমি আসবে। তুমি ওই প্লেনটার সাথে হারিয়ে যাওনি। কিন্তু এতদিন আমার কাছ থকে লুকিয়ে ছিলে কেন? খুব কষ্ট হয়েছিল আমার।’

    ‘আমি সত্যিই হারিয়ে গেছিলাম রে মিমি। কিন্তু ভালোবাসা বিশ্বস্ত কুকুরের মতন আমাদের অনন্তযাত্রাসঙ্গী, তাকে ছেড়ে স্বর্গেও যাওয়া যায় না। মানুষ যখন স্বভূমি থেকে বিতাড়িত, সহজাত সংস্কৃতির আশ্রয় সে যখন হারিয়েছে, আগ্রাসী লোভ আর উৎকন্ঠা যখন তার আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করছে, তখনও ভালোবাসা প্রদীপের মতো আলো দেয়। অন্ধকার চেতনার সব বিভীষিকা তুচ্ছ করে আমরা সেই প্রদীপের কাছে ফিরে আসি। ভালোবাসায় বিশ্বাস হারালে চলমান প্রেতাত্মা হয়ে যায় মানুষ, তখনই সে আততায়ী ফিদাইন, তার হাতে বন্দুক থাকুক বা না থাকুক। এই আক্রান্ত পৃথিবীতে ভালোবাসার আশ্চর্য আয়নায় আমার প্রতিফলন ফিরে এসেছে। এই দ্যাখ, এই হচ্ছে তিতলি, আমার হারিয়ে যাওয়া বুকের সাম্রাজ্য। তিতলি এই আমার মিমিসোনা, তুমি ওকে দেখো, আমি ছেলেকে খুঁজে নিয়ে আসি।’

    বাবার শক্ত মুঠো থেকে মিমিকে টেনে নিয়েছে উষ্ণ আর কোমল দুটো হাত। অসম্ভব একটা ক্লান্তি মেশানো আরামে দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে মিমির। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ও শুনতে পেলো বাবা ডাকছে, ‘বিতাই এদিকে আয়--এদিকে।’

    ********

    ওরা কেউ জখম হয়নি তাও নিয়মমাফিক চারজনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। দু একবার চেষ্টা করে মিমি বুঝে গেছে যে অন্তত: বাইরের লোকের কাছে বাবার কথাটা না বলাই ভালো। ওরা এমনিতেই ওর মাথা স্ক্যান করেছে, এর পরে পাগলের চিকিৎসা করবে। শুধু একজনই ওকে কিছুটা বিশ্বাস করে। সেই মহিলার নাম সমাদৃতা ওরফে তিতলি, ওঁর সঙ্গে মিমিকে পাওয়া গেছিল বাথরুম পরিষ্কার করার ক্লোজেটে। বেশ লুকোনো আর নিরাপদ এই জায়গাটায় ওরা কেমন করে গিয়ে পৌঁছলো তা নিয়ে দুজনের কেউই কিন্তু খুব একটা স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছে না। সমাদৃতা বলছেন এক অপরিচিত ভদ্রলোক নাকি ওঁর হাত ধরে টেনে ওই খুপরির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে হাওয়া হয়ে যায়। সেই লোকটিই আবার ঘন্টাখানেক পরে মিমিকে কোলে নিয়ে হাজির হয়েছিল। রহস্যময় উদ্ধারকারীটি ওদের নাম ধরেও ডেকেছিল কিন্তু ধোঁয়া, ভিড় আর চূড়ান্ত বিভ্রান্তির মধ্যে উনি তাঁকে চিনতে পারেননি। তাছাড়া ধোঁয়া থেকে বাঁচবার জন্য একটা কাপড় দিয়ে নাকমুখ জড়িয়ে নিয়েছিলেন ভদ্রলোক। রনি, বিতান আর রবিন অনেকক্ষণ বাদে খুঁজতে খুঁজতে ওদের আবিষ্কার করে। এগারোজন আক্রমণকারীর মধ্যে মাত্র জনাদুয়েক গুরুতর আহত অবস্থায় ধরা পড়েছে, তারা দুজনেই স্থানীয় ছেলে। বাকিদের নাম-গোত্র এখনও সব জানা যায়নি তবে রাজনৈতিক চাপান-উতোর শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। মুম্বাইতে এখন পুলিশ, গোয়েন্দা, সরকারী অফিসার, রাজনৈতিক কর্মী আর দেশবিদেশের সংবাদ মাধ্যমের লোক গিজগিজ করছে। লিপিকা খবরটা শোনা মাত্র প্লেনে উঠেছিলেন, কাছাকাছি হোটেল না পাওয়ার দরুন আপাতত: উনিও সমাদৃতার বাড়িতে। কলকাতা থেকে মিঠু চৌধুরিও হাজির। মিমি প্রথমে বলেছিল যে ওই ক্লোজেটে বসেই বিভাসের কথা বলেছে, সমাদৃতাও সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ছোটবেলার বন্ধুটিকে মনে করতে পেরেছেন। মিমির বদ্ধ ধারণা বিভাস সশরীরে ওখানেই ছিলেন, সবাই অবশ্য সেটাকে মানসিক বিভ্রম বলেই মনে করছে। বিস্ফোরণের ফলে অনেকগুলো দেহ ঠিক করা সনাক্ত করা যায়নি তবে মৃতদের মধ্যে বিভাস দাশগুপ্ত বলে কারো নাম নেই। সমাদৃতার স্বামী সন্দীপ উঁচু পদের সরকারী অফিসার, খুবই মার্জিত আর স্নেহশীল স্বভাবের ভদ্রলোক। ওদের একটিই ছেলে, নাম পাপু, কিছুদিন আগে তার হার্টে সার্জারি হয়েছিল, কাণ্ডকারখানা দেখে সে রীতিমতন ঘাবড়ে গেছে। এই ভয়ানক বিপদে যারা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ছিল, সন্দীপ তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে পরমাত্মীয়ের মতই ব্যবহার করছেন। আরেকটা দিন বিশ্রাম নিয়ে ওরা সবাই আমেরিকায় ফেরৎ যাবে।

    খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল সমাদৃতার। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বার করে ঢকঢক করে অনেকটা গলায় ঢেলে দিলেন। সারারাত স্বপ্ন দেখে মাথা গরম হয়ে গেছে। ডাক্তাররা সাবধান করে দিয়েছেন এইরকম ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর অনেক সময় ফ্ল্যাশব্যাক হয়, ওকে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসর্ডার বলে। সমাদৃতা কিন্তু দু:স্বপ্ন দেখেননি, সত্যি কথা বলতে কি সেদিন মলে কেনই বা গেছিলেন আর হামলা শুরু হবার পরে ঠিক কি হয়েছিল সেসব ওঁর ভালো করে মনেই পড়ছে না। যখন থেকে উনি মিমির সঙ্গে ওই ক্লোজেটের মধ্যে ছিলেন সেই সময় থেকে সব পরিষ্কার। ওঁর মাথায় নাকি বেশ একটু চোট লেগেছিল ডাক্তার বলেছে এর নাম রেট্রোরেড অ্যামনেশিয়া। সে যাই হোক বিভাসের মেয়েকে দেখার পর উনি সারারাত ধরে দফায় দফায় শুধু বিভাসেরই স্বপ্ন দেখেছেন, যাকে বলে লুসিড ড্রিমিং, অনেকটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সিনেমা দেখার মতন। আমেরিকা চলে যাবার পর বিভাসের সঙ্গে ওঁর কোনোরকম যোগাযোগ ছিল না কিন্তু এই স্বপ্নে বিভাস কয়েক বছর পরেই ফিরে এসেছেন, কলকাতায় তাঁর প্র্যাকটিস, কিছুদিন আগে কলকাতায় ওঁদের দেখা হয়েছে। ওঁরা একসাথে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গেছেন, আরো যা যা সব হয়েছে তার কথা ভেবে এই ঠান্ডার মধ্যেও কান গরম হয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নের অভিজ্ঞতা কেমন করে এমন প্রগাঢ় আর প্রাণবন্ত হতে পারে যে এখনো শরীররের কোণায় কোণায় তার স্পন্দন টের পাচ্ছেন সমাদৃতা! ওই অভিশপ্ত মলে কেউ একজন ওঁর ডাকনাম ধরে ডেকেছিল, গোলমালের মধ্যে হাত ধরে টেনে ওঁকেও ঢুকিয়ে দিয়েছিল বাথরুমের পাশের ওই খুপরিটায়। ভিড়ে আর ধোঁয়ার মধ্যে তার মুখটাও ভালো করে দেখতে পাননি সমাদৃতা, তাছাড়া এতদিন বাদে মুখ দেখলেই কি বিভাসকে হঠাৎ করে চিনতে পারতেন উনি? এখন অবশ্য পারবেন কেননা স্বপ্নের মধ্যেও উনি মলে গেছেন, পছন্দ করে আংটি কিনেছেন, সেই আংটি আঙুলে পরিয়ে দিয়েছেন বিভাস। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সেদিন বেমক্কা ওই সময়ে কেন যে মলে গেছিলেন সেটা কিছুতেই মনে করতে পারছেন না সমাদৃতা। হঠাৎ করে এইরকম দোকানবাজারে চলে যাওয়া একেবারেই ওঁর স্বভাব নয়, নিজের জন্য গয়না কেনা তো আরোই অস্বাভাবিক। আঙুলের নতুন আংটিটা তাহলে কোথা থেকে এলো?

    ‘হ্যালো আন্টি,’ মিমি এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। ভোরের রোদ্দুরে একটা তাজা ফুলের মতই সুন্দর আর সজীব লাগছে মেয়েটাকে। এই টুকুদার মেয়ে, একেবারে ওর বাবার ছোটোবেলাকার মুখ কেটে বসানো! সেই কবিতাপাগল টুকুদা এতবড়ো ডাক্তার হয়েছিল, তার জীবনে প্রেম এসেছিল, এসেছিল সংসার, সম্মান, অর্থ আর প্রতিষ্ঠা, তবুও সে হারিয়ে গেল একদিন। হারিয়ে গিয়েও এতদিন পরেও কি রহস্যময়, প্রায় আধিভৌতিক যোগাযোগ হলো ওর সঙ্গে সমাদৃতার। ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে, যেন এক অদেখা অস্তিত্বের নি:শ্বাস এসে লাগছে ঘাড়ের ওপর।

    ‘মিমি চলো তোমাকে ব্রেকফাস্ট দিই। তোমার মা উঠেছেন? বন্ধুরা?’ হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সমাদৃতা। বাস্তবে ফিরে আসা দরকার নাহলে মাথাটাই খারাপ হয়ে যাবে।

    ‘আন্টি তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি। অ্যাবাউট বাবা?’

    ‘শিওর ডার্লিং। চলো এক কাপ কফি নিয়ে বসি। আমারও অনেক কথা জানার আছে।’

    ‘আন্টি তুমি সত্যি সত্যি কি মনে করো? আমরা হ্যালুসিনেট করেছি?’

    ‘দ্যাখো মিমি, আমাদের অচেনা বন্ধুর মুখ আমরা কেউ দেখিনি। গলার আওয়াজ শুনেছি কিন্তু ওইরকম গণ্ডগোল আর প্যানিকের মধ্যে ভুল শুনতেই পারে যে কেউ। অনেকে অনেকের নাম ধরে ডাকছিল সেই সময়। সাধারণ বুদ্ধিতে এটাই মনে হবে যে অপরিচিত কেউ আমাদের সাহায্য করেছে, আমরা বাকিটা কল্পনা করে নিয়েছি। কিন্তু আমার মতে এটাকে যুক্তি দিয়ে বিচার করার চেষ্টা অর্থহীন।’

    মিমি বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকলো।

    ‘তোমার আর আমার যা হয়েছে সেটা হয়ত একটা অতীন্দ্রিয় যোগাযোগ যার কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই। আমি ওটাকে সেইভাবেই মনে রাখতে চাই। আমি বিশ্বাস করতে চাই যে বিভাসের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল কিন্তু সেই ব্যক্তিগত অনুভূতি আমি সবার সঙ্গে ভাগ করতে চাই না।’

    ‘আমিও চাই না আন্টি। কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আমার অসম্ভব ভালো লাগছে। আমি তোমার কাছে বাবার সব কথা শুনতে চাই। আমি আবার আসবো। আই লাভ বাবা সো মাচ। আই মিস হিম।’

    শ্রাবণের ধারার মতোই কান্না নেমে আসছে এখন। দু-সপ্তাহের জমিয়ে রাখা কান্না। বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি চলে গেলো, ভিজে মাটির ওপরে ফুটে উঠলো পায়ের ছাপ। ওরা বুঝতেও পারলো না অন্যদিকে দোতলায় সিঁড়ির পাশে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ওদেরই মতন মনের ভার নামাচ্ছে রবিন আর বিতান। শেষরাত থেকেই ওরা ওখানে।

    ‘রবিন তোমার সামনে কাঁদতে আমার লজ্জা করছে না। আমি সকলের সামনে শক্ত থাকতে চাই কিন্তু আসলে রনের তুলনায় আমি খুবই দুর্বল পুরুষমানুষ।’

    ‘যার হৃদয় আছে কাঁদতে তাকে হবেই বিতান। এটা দুর্বলতা নয়, মনুষ্যত্ব।’

    ‘বাবা নেই এই কথাটা এতদিন জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে রেখেছিলাম। এখন আর পারছি না রবিন। এটাকে কিছুতেই নিতে পারছি না।’

    ‘পারতে তো হবেই বিতান। তোমাকে, আর আমাকেও। আমি তোমার কাছে গিয়ে কাঁদবো, তুমি আমার কাছে। তাহলে কেউ জানতে পারবে না। এমন দু:সময়ে আমরা একসাথে থেকেছি, সমান যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয়েছি একসাথে যে তোমাকে বাদ দিয়ে আর কিছু ভাবতেও পারছি না বিতান। এই দেখো আমি তোমার সামনে, আর আমি মাথা ঢেকে রাখবো না।’

    ওরা পরস্পরের হাত ধরে আছে, দুজনেরই চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে।

    ‘না রবিন মাথা ঢাকা যদি ছাড়তেই হয়, নিউইয়র্কে ফিরে ছেড়ো।। এইভাবে ভয় পেয়ে চাপের মুখে নয়।’

    ‘বিতান তুমি দেখেছো লোকেরা কিভাবে তাকায়? আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে জানো। আমার আর জাভেদের মতন লক্ষ লক্ষ লোক আছে যারা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে চায়। তারা চিহ্নিত হয়ে শত্রুশিবিরে বাস করতে চায় না, সবার সঙ্গে নিশ্চিন্তে একই রাস্তায় হাঁটতে চায়। প্রথা আর সংস্কৃতির চিহ্নগুলো কি কুষ্ঠরোগের মত সারাজীবন তাদের ঘৃণিত করে রাখবে? তার চেয়ে কি এগুলো ত্যাগ করাই ভালো নয়?’

    প্রিয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে পেরে এতক্ষণে একটু উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো বিতান। ওর জলভরা লালচে চোখে বিদ্যুৎ খেলে গেল এইবার।

    ‘রবিন তুমি জানো ব্যক্তিগতভাবে আমি ঈশ্বর-উদাসীন কিন্তু সংস্কৃতি-উদাসীন নই। আমাদের বুঝতে হবে একটা জনজাতিকে সামগ্রিকভাবে শক্রু বানানো উন্মাদের কাজ, এই গণ-হিস্টেরিয়া আমাদের যেভাবে হোক রুখতে হবে। আজ তুমি ভয় পেয়ে হিজাব ছাড়বে, কাল মসজিদে যাওয়া বন্ধ করবে, তার পরদিন হয়তো নামটাও বদলে ফেলবে। পরিচিতির এই চিহ্নগুলো তোমার মনে এতটাই জায়গা নিয়েছিলো যে সেই খালি জমি ভর্তি করার জন্য আক্রোশ আর ঘৃণা ছাড়া তোমার কাছে আর কিছু থাকবে না তখন। না রবিন পরিবর্তন যা আসে ভেতর থেকে আসুক, বাইরের চাপে পড়ে নয়।’

    ‘তোমার কথা শুনে আমার ভেতরটায় আরাম লাগে বিতান।’ রবিন আস্তে করে বললো।

    ‘রবিন আমরা কেউই নিখুঁত নই। সেদিন থেকে আমি নিজের ক্রুটিগুলো নিয়ে ভাবছি আর আমার চোখ খুলে যাচ্ছে। আমাদের আমেরিকান সমাজ মাথামোটা আর যুদ্ধবাজ, এই কথাটা আমি নানাভাবে, নানা জায়গায় শুনেছি, বিশ্বাসও করেছি। কিন্তু যখন একটা সত্যিকারের আক্রমণ এলো, আমার বিদগ্ধ সমাজচেতনার বদলে রনের ন্যাশন্যাল গার্ড ট্রেইনিং কাজে লেগে গেল অনেক বেশি। সবচেয়ে বড়ো কথা আমি ভয় পেয়েছিলাম। এমন সর্বনাশা অবশ করে দেওয়া ভয় জীবনে পাইনি। এখন বুঝতে পারছি এই ভয় দেখিয়েই অন্ধকারের শক্তিগুলো বাজিমাত করে।’

    ‘আমি ভয় পেয়ে কিছু করবো না বিতান। যা করবার ভালোবেসেই করবো।’

    ওরা সিঁড়ির ওপরে, মিমি আর সমাদৃতা রান্নাঘরের টেবিলে বসে একই স্রোতে ভেসে চলেছেন। ওদের বুকের দরজা্য এখন এক পরম বন্ধুর রথ এসে থামার অপেক্ষায়, তার সামনের পথ ওদের চোখের জলে ধোয়া।

    আলো ফোটার আগেই যে যার ঘরে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে নিয়েছে। সন্দীপ আর লিপিকারও ঘুম ভেঙেছে, এর মধ্যে টেবিলের ওপর এক রাশ ব্রেকফাস্ট হাজির, প্লেট আর কফি হাতে নিয়ে ওরাও একে একে বারান্দায়। এটা একটা বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, দশতলায় দুটো ফ্লোর নিয়ে ওদের পেন্টহাউজ। লিপিকার মনে হলো এখান থেকে ধোঁয়াশার চাদরে মোড়া শহরটাকে খুব শান্ত, অহিংস আর নিরাপদ লাগছে। এত বড়ো একটা রক্তারক্তি হয়ে গেল এই মুহূর্তে তার কোনো চিহ্নই নেই। আবার আস্তে আস্তে সব স্বাভাবিক হয়ে আসবে যতক্ষণ না পরের দুর্ঘটনাটা ঘটার সময় হয়। পাথরের তলায় ফুটন্ত লাভার মতন একঘেয়ে গতানুগতিক দিন কাটানোর আড়ালে চাপা থাকবে ঘৃণা, ক্রোধ আর জিঘাংসার বারুদ। এই অসুস্থ মাটির ওপর আমরা যে যার জীবনের প্রাসাদ বানিয়েছি। তাই হয়তো আমাদের সম্পর্কগুলোও এমন অকালে শুকিয়ে যায়। বিভাস আমার বিভাস, যেখানেই থাকো, ভালো থেকো তুমি। এতো সংঘাতের মধ্যেও আমরা পরস্পরের বন্ধুই রইলাম। সারারাত ধরে আমার কান্না সেই বন্ধুত্বের সাক্ষী। আমি জানি ভালোবাসা স্বল্পস্থায়ী, ভুলে যাওয়াটাই প্রলম্বিত, তাও ওই অল্প সময়টুকুর মধ্যেই অনন্তকাল। সবাই এসে গেছে। নিজেকে সামনে নিয়ে অভ্যস্ত সৌজন্যে আলাপ শুরু করলেন লিপিকা--‘সমাদৃতা, সন্দীপ, আপনাদের যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো।’

    ‘ধন্যবাদ দেবার কিছুই নেই। এইটুকু করা আমাদের কর্তব্য। আমাদের দেশে এসে আপনারা এমন একটা বিপদে পড়লেন, তার জন্যে আমরাই বরং লজ্জিত। এইরকম জঘন্য অপরাধ যারা করেছে তাদের উচিত শিক্ষা দেবো আমরা।’ সন্দীপ বললেন। দেখা গেল এই মৃদুভাষী শিক্ষিত ভদ্রলোকটি এদিক দিয়ে ঘোর সাম্প্রদায়িক।

    আলোচনাটা বেশ চড়া সুরেই শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে রবিন আর বিতানও এসে যোগ দিয়েছে, রবিনকে দেখে সবাই একটু সাবধানে মত প্রকাশ করছে এখন। সবার শেষে আসলো রন, ওর ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। অনেক লোককে সাহায্য করেছে রন, ওর জন্যে প্রাণে বেঁচে গেছে বেশ কয়েকজন। খবরের কাগজে ওর ছবি ছেপেছে, ও এখন বেশ একজন হিরোই বলা যায়। ওকে দেখে মিমির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কিন্তু সকলের মিলিত প্রশংসা এককথায় উড়িয়ে দিলো ছেলেটা।

    ‘ওটা কোনো ব্যাপার নয়। আমার পরিবারের অনেকেই আর্মিতে আছেন, দাদু জেনারেল প্যাটনের থার্ড আর্মিতে ছিলেন, নানা রকম ফায়ারআর্মস আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। এর মধ্যে গর্ব করবার কিছু নেই, শুধু সাহায্য করতে পেরেই আমি খুশি। সত্যি কথা বলতে কি আমার খুবই ভয় করছিলো।’

    ব্রেকফাস্ট খাওয়া শেষ। বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে রন, মিমি শুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, ব্যথা আর মুগ্ধতায় মেশানো অদ্ভুত সেই চোখের ভাষা। রবিন আর বিতান সরে গেছে বারান্দার অন্য কোণায়, ওরাও নিজেদের মধে মগ্ন। বারান্দার দুই প্রান্তে এখন হাওয়ার স্রোতে ওড়া শস্যবীজের মতন ভারহীন অমিত সম্ভাবনার ইতিহাস। মাঝখানে রয়েছেন লিপিকা, সন্দীপ আর সমাদৃতা তাঁদের যে যার জমিয়ে তোলা জটিলতার বোঝা পিঠে নিয়ে, ক্ষতস্থানগুলো লুকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টায়। তা সত্ত্বেও দুর্ঘটনার পরে যেমনটা হয়--ওঁদের মধ্যে সাযুজ্য আর সহানুভূতির ঢেউ বইছে এখন। বেলা গড়িয়ে বিকেল হবে, ওঁরাও এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেবেন। পড়ন্ত রোদ্দুরে ধাতব ডানা ঝলসিয়ে পশ্চিম আকাশে উড়ে যাবে এরোপ্লেনগুলো। মৃত্যু আর ধ্বংসের বিভীষিকারাও ওদের সঙ্গে সঙ্গে উড়বে, কিন্তু নাগাল পাবে না। স্থবির মৃত্যুর চেয়ে জীবন মহান বলেই তো প্রতিদিন নতুন করে সূর্য ওঠে, ফুলেদের ঘোমটা খুলে যায়।

    *********

    ওঁর পথটি এখন বৃত্তাকার তাই ফুরিয়ে যাবার ভয় নেই। এখন আর ক্লান্তি বলেও কিছু নেই, শীত গ্রীষ্ম ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছুই আর পীড়িত করতে পারে না। বেহালা, টালিগঞ্জ, চেতলা, নিউ আলিপুর নিয়ে যে ম্যাপ এতদিন বিভাসের মাথায় গাঁথা হয়েছিল, তার প্রতি ইঞ্চি জমি উনি চষে ফেলেছেন, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোও সব আবার করে শোনা হয়ে গেছে। পার্কের ধারে সেই ছাতিমগাছটার তলায়, বাতাসে যেখানে তীব্র সুগন্ধে বিবশ হয়ে থাকে সবসময়, সেইখানে একটা আদ্যিকালের কাঠের বেঞ্চিতে বসে উনি এইবার একটু জিরিয়ে নেবেন। তারপর সামনে আবার লম্বা সফর।

    মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন ফ্লাইট ৩৭০ যে ভারত মহাসাগরে আছড়ে পড়েছিল, তার নিশ্চিন্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই, হারিয়ে যাওয়ার ঠিক ষোলো মাস পরে। ভারত মহাসাগরের রিইউনিয়ন দ্বীপে প্লেনটার ডানদিকের ডানার একটা অংশ পাওয়া যায়। কেন এবং কিভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটলো আজ অবধি তার কোনো কিনারা হয়নি। আজকের এই সংযুক্তির যুগে যখন প্রতিটি মানুষের টিকি পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা, তখন আস্ত একটা বোয়িং এয়ারক্র্যাফট কি করে বেমালুম উধাও হয়ে যেতে পারে তাই নিয়ে কর্তাব্যক্তিরা আরো বহুদিন ধরে চিন্তাভাবনা চালিয়ে যাবেন। যাদের প্রিয়জনেরা হারিয়ে গেল তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো বিশ্বাস করে যে কোনো আশ্চর্য সকালবেলায় তাদের কাছের মানুষটি ফিরে এসে দরজায় কলিং বেল বাজাবে।

    আমাদের মিমি আর তিতলির মতন মাত্র কয়েকজনই শুধু আসল খবরটা জানে। প্লেনটা আসলে উড়ে গিয়েছিল আয়নার ভেতরে। সেই আয়নাটা আমরা অনেকেই বুকের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলেছি। আমরা সেই হলুদ অরণ্যে দুভাগ হয়ে যাওয়া পথের সামনে দাঁড়ানো একলা পথিক যে কি না অনেকক্ষণ ধরে মনস্থির করতে পারেনি। শেষ অবধি সেই পথটিই তার মনে ধরলো যেখানে অনেক লোকের আনাগোনা নেই, যার ঘাসের ওপর এখনও লেগে আছে অনাঘ্রাত শিশিরকণা। কিন্তু তাই বলে তার সংশয় ঘুচলো না। শেষ অবধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে চলে গেল তার কল্পনার ঘাসে ঢাকা যাত্রীবিরল পথে, চিরদিনের মতন বদলে গেল তার জীবন। অন্য পথে হেঁটে চলেছে তার ছায়া। প্রতিটি অসফল মুহূর্তে, জীবনে বৃক্ষ যখন ফলবান নয়, সেই ছায়াপথিক এসে পাশে বসেছে। কানে কানে বলেছে--যদি এইরকম না হয়ে অন্যরকম হতো? যদি ওই পথে না গিয়ে জানা পথে হাঁটতে তুমি। আমরা তখন আয়নার ভেতরে, আমাদের ছায়ার জীবনে উঁকি দিই আর দগ্ধে দগ্ধে মরি। মনে হয় যদি বদলাবদলি করে নেওয়া যেত জীবনটা। বিভাস ছায়ার সঙ্গে কাটিয়েছেন এই কটা দিন তাই জীবন বদলানোর ইচ্ছা ঘুচে গেছে ওঁর। উনি বরং কিছুদিন রিউনিয়ন দ্বীপের তলায় প্রবাল প্রাচীরের ওপর শুয়ে থাকবেন। এখানে যতদূর চোখ যায় কোটি কোটি আণুবীক্ষনিক প্রাণ শব্দহীন শূন্যতায় ভেসে বেড়াচ্ছে, তীক্ষ্ণ দাঁত বার করে ঘুরছে প্রেতচ্ছায়ার মতো দানবিক সব মাছের দল। বিভাস এখন জানেন মাটির ওপর মানুষের মিছিলও ঠিক ওই একই রকম। এলোমেলো ঘটনার স্রোতে ঘুরপাক খাচ্ছে জীবনের সবকিছু, আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে মানুষের প্রাপ্তি, ক্ষয়, আনন্দ, বিষাদ, সম্ভোগ, হতাশা, প্রেম, ঘৃণা, বন্ধুত্ব, শক্রুতা, রোগ, আরোগ্য, সুখ, যন্ত্রণা। কেননা এই সব আয়নাগুলোর ভেতরে রয়েছে শুধু আমি আর আমি। বিভাস দেখতে পেলেন অসংখ্য জীবন একসাথে বয়ে চলেছে, হারিয়ে যাচ্ছে, বিকৃত হচ্ছে, সুন্দর হচ্ছে অগণন প্রতিফলনে। সব ওই আয়নায় দেখা নিজের ছায়ার কারসাজি। বিভাস এও জানেন যে ওঁর জীবনের ছায়ায় পাখিরা এতদিনে খুঁজে পেয়েছে তাদের নীড়, কদিন বিশ্রাম নিয়ে উনিও সেখানে ফিরে যাবার জন্য তৈরি। তিতলিও কিছুদিন বাদে ওই বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াবে। ওদের সেই নতুন বাড়িতে যেখানে দেওয়ালে শুধু ছবিরা আছে, কোথাও একটাও আয়না নেই।



    (সমাপ্ত)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)