• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৬৬ | মার্চ ২০১৭ | গল্প
    Share
  • তোমার আপন খেলা : দেবাশিস দাস


    কাশটা অনেকটা নিচে নেমে এসেছে। কালো একটা মেঘ ঝুলে আছে সেখান থেকে। বৃ্ষ্টি বোধহয় আর ধরে রাখতে পারছে না সে। এখনই ঢালবে। একটা চওড়া কালো রাস্তা, দু’পাশে ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। তারই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা ধূসর পাহাড়ের রেশ। ঠাণ্ডা একটা বাতাস বইছে চারদিকে। সন্ধ্যা হবে বোধহয় একটু পরে। রাস্তার ওপারে একটা বড় গেটওয়ালা বাগানবাড়ি। তার লোহার গ্রীলের ফাঁক দিয়ে একফালি সবুজ লন দৃশ্যমান। গেট খুলে বেড়িয়ে এল এক কিশোরী, হাতে শিকলে বাঁধা একটা খয়েরী রঙের সুন্দর পোষা কুকুর। আশেপাশের রাস্তার কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে পোষা কুকুরটাকে দেখে। শিকলবাঁধা খয়েরীটাকেও আর সামলানো যাচ্ছে না। লম্বা চেন ধরে রাখতে পারছে না মেয়েটি। হালকা বৃষ্টি শুরু হল। পোষা কুকুরটি রাস্তার কুকুরদের ধাওয়া করার জন্য ছুটে গেল রাস্তার মাঝ বরাবর। মেয়েটিকে শিকল শুদ্ধ হিঁচড়ে নিয়ে চলে এল রাস্তার ওপর । এমন সময় উল্টোদিক থেকে দেখা দিল দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটা ট্রাক। রাস্তার ধার থেকে একটি ছেলে চিৎকার করে বলছে চেনটা ছেড়ে দিতে, মেয়েটি পারছে না। শিকলটা হাতে জড়িয়ে গেছে। ট্রাকটাও গতি সামলাতে না পেরে কালান্তকের মতো এগিয়ে আসছে। রাস্তার ধারের ছেলেটি প্রাণপণ দৌড় শুরু করল ট্রাকটার থেকে মেয়েটাকে বাঁচাবার জন্য। আর ঠিক সেই সময় ঝুলে থাকা মেঘটা বিরাট শব্দ করে ফেটে অঝোরে বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করল, মুহূর্তের মধ্যে আবছা হয়ে গেল সবকিছু।

    শরীরে খুব অস্বস্তি নিয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল পুণ্যশ্লোকের। রাত ক’টা বুঝতে পারলেন না। পাশে তাকিয়ে দেখলেন স্ত্রী আশাবরী অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। এত ঘুমের মধেও ওর একটা হাত তার হাতের ওপর ফেলা। এরকম একটা স্বপ্ন দেখার কি মানে চিন্তা করতে করতে বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস জল খেলেন। তারপর সামনের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বেশ কয়েকদিন পরে আবার দেখলেন এরকম স্বপ্ন। অবসর গ্রহণের পর বছরখানেক আগে দেরাদুনে সেটেল করার পরই শুরু হয়েছিল এরকম স্বপ্ন দেখা। স্বপ্নের ধরন মোটামুটি একই রকম। কোন একটা সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সুন্দর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তারপরেই ভীষণ বিপদ এগিয়ে আসছে। কেউ কিছু করার আগেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায় বা সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়। সেই সময়েই প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়। বুকের মধ্যে অনিয়মিত ধুকপুক। সারাদিন চলতে থাকে তার হাং-ওভার। ভীষণ দুর্বল লাগে শরীরটা। ডাক্তার ওষুধ সবই চলছে, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি ব্যাপারটার।

    বারান্দা থেকে দেখলেন রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে রাস্তার আলোয় দেখা যাচ্ছে দু’-একজন স্বাস্থ্যান্বেষী মানুষ হাঁটতে বেরিয়েছে। পুণ্যশ্লোক আর বিছানায় ফিরে না গিয়ে মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি হতে লাগলেন।

    এই দেরাদুন শহর পুণ্যশ্লোকের অনেক দিন আগের পরিচিত, প্রিয় একটি শহর। নিজের স্কুলজীবনের প্রায় আটটি অমূল্য বছর কাটিয়েছেন এই শহরে। স্কুলজীবন শেষ করে সেভাবে আর আসা হয়ে ওঠেনি এখানে। স্কুলের পর আইআইটি ইঞ্জিনিয়ারিং, তারপরে বিদেশে বহুদিন। বড় চাকরি নিয়ে দেশে ফেরা, বিবাহ, পুত্র, কন্যা, কর্মজীবন পুরোটাই কোলকাতায় কেটেছে। কর্মসূত্রে বহু দেশ বিদেশ ঘুরলেও দেরাদুনে কখনও আসা হয়নি। হয়তো নিজেই আসতে চাননি। হয়তো কিছু অভিমানও জমেছিল। তাই স্কুলের অ্যালুমনি মিট-এর সময়েও এখানে আসা এড়িয়ে গেছেন বারবার।

    পুণ্যশ্লোক হাঁটতে হাঁটতে দেখলেন বৃষ্টি-ধোওয়া আকাশটা জেগে উঠছে। আশেপাশের দু’ একটা স্কুলের ভ্যান বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দেবার যাত্রা শুরু করেছে। চারদিকে বহুতল বাড়ি, বিস্তর দোকানপাট। তার স্কুলজীবনের চেনা নির্জন জঙ্গল আর পাহাড় ঘেড়া একান্ত নিজের শহরটা একটা ‘যে-কোনো' শহরে পরিণত হয়ে চলেছে দিনে দিনে। ঘুমটা ভালো না হওয়ায় শরীরে একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। বেশি না হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরলেন।

    ***

    একসময় এই শহরে দাপিয়ে বেড়াতেন পুণ্যশ্লোক। ঠিকানা ছিল একটি নামী বোর্ডিং স্কুলের হস্টেল। পড়াশুনো খেলাধূলা সবেতেই তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানে। এছাড়াও স্কুলফেস্টে ড্রামা, স্কুল কয়্যারে গান-বাজনা ইত্যাদিও তাকে ছাড়া হতো না। স্কুলজীবনে শহরটাকে দারুণ ভালোবেসেছিলেন তিনি। তাঁর লোকাল গার্জেন ছিলেন চৌধুরীকাকু। কাকুর বাড়ি ছিল ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সীমানার ঠিক বাইরেই। ছাদে উঠলেই দেখা যেত জঙ্গলের বিস্তার। স্কুল থেকে বেশি দূরে নয়। কারণে অকারণে মাঝে মাঝেই তাঁদের বাড়িতে যাওয়া হত। স্কুল থেকে বের হতে দেওয়া হত অবশ্য সপ্তাহে এক দিনই।

    চৌধুরীকাকুর বাড়ির পাশেই ছিল বাগানঘেরা একটা সাদা রঙের বিশাল বাড়ি। লোহার গ্রীলওয়ালা গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যেত সামনের বড় সবুজ লন আর তার পাশ দিয়ে চলা লাল সুরকি বিছানো রাস্তা। লনের মাঝখানে একটি তানিয়া আর ডালিয়া ফুলের বেড। যেটা সবচেয়ে চোখে পড়ত সেটা হল লনের পাশেই একটা বেশ বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ। বেদিটা বাঁধানো আর বেদির পাশেই গাছের ডাল থেকে ঝোলানো একটা সুন্দর কাঠের দোলনা। এই দোলনাতেই একটি ফুলের মতো কিশোরী মেয়েকে প্রায়ই বসে থাকতে দেখতেন পুণ্যশ্লোক। ওই পরিবেশে একটি রূপবতী রাজকন্যার মত মনে হত মেয়েটিকে। তখন তিনি ক্লাস টেন। কিছুদিনের মধ্যেই চৌধুরীকাকুর বাড়িতে ওনার ছেলে বুবানের জন্মদিনের পার্টিতে মেয়েটিকে কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। আলাপ পরিচয় সেভাবে হয়নি সেদিন বা কেউ করিয়েও দেয়নি। শুধু একটা অপার ভালোলাগায় মন ভরে গিয়েছিল। পরের দেখাটা হয়েছিল ‘দেরাদুন দূর্গাবাড়ি’র দূর্গাপূজার মণ্ডপে আরও মাস দুয়েক পরে। ভিড়ে অঞ্জলি দেবার সময় হঠাৎই দেখেছিলেন মেয়েটি তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিচ্ছে। লালপেড়ে সাদা শাড়ি আর সোনার অলঙ্কারে ভূষিতা এক পূজারিণী। তৃতীয় বারের অঞ্জলির সময় নিজের ফুল বেলপাতার অর্ধেক দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। ভিড় কম হলে একটু সাহস করে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলেন তার নাম--সুজাতা। পরিচয়পর্ব ঘনিয়ে ওঠার আগেই মেয়েটির গাড়ি এসে যাওয়াতে মায়ের সঙ্গে চলে গিয়েছিল সে।

    সেবারই এক শীতের সন্ধ্যায় চৌধুরীকাকুর বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজোর অনুষ্ঠানে সুযোগ হয়েছিল আলাপ করার। সুজাতাই জিজ্ঞেস করেছিল —

    —‘চৌধুরীকাকিমা বলছিলেন আপনি এখানে হস্টেলে থাকেন। বাড়ি কি কোলকাতায়?’

    মেয়েটির গলার স্বর পুণ্যশ্লোকের অন্তর ছুঁয়ে ফেলল যেন।

    —‘হ্যাঁ, তবে, দেরাদুনই এখন আমার বাড়ি।’

    —‘এখানে আসেন তো মাঝে মাঝে।’

    পুণ্যশ্লোক বুঝলেন মেয়েটিও তাকে লক্ষ্য করে।

    —‘চৌধুরীকাকু আমার লোকাল গার্জেন। প্রায়ই আসি এখানে। পাশের বাড়িটাই তো আপনাদের।’

    —‘হ্যাঁ। আসলে আমার মা পুজো-অর্চনা খুব করেন । তাই পুজোর অনুষ্ঠানগুলোতে আমি আর মা আসি, আপনি তো এবার আইসিএসই দেবেন, না? কাকিমা বলছিলেন আপনি ক্লাসের টপার।’

    —‘না না, ওই প্রথম কয়েকজনের মধ্যে থাকি আর কি। আপনিও কি বোর্ড দিচ্ছেন এবারে?’

    —‘আমি নেক্সট ইয়ারে দেব।’

    আর কিছু বলার আগেই প্রসাদ বিতরণ শুরু হয়ে গেল।

    এর কয়েকদিন পরেই এক শীতের দুপুরে আবার দেখা হল। বেশ ঠাণ্ডার মধ্যেও শীতের ঝলমলে রোদ বেশ মিষ্টি একটা আমেজ ভরে দিয়েছিল। দিনটা ছিল স্কুল থেকে সাপ্তাহিক বের হতে দেবার দিন। এক প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে পুণ্যশ্লোক হাজির হলেন রাজপুর রোডের একটা বইয়ের দোকানে। আগেই জানতেন এখানে আজ তার প্রিয় লেখক রাস্কিন বন্ড আসবেন নিজের একটা নতুন বইয়ের উদ্বোধন করতে। অনেক ছাত্র ছাত্রী এসেছে তাদের প্রিয় লেখকের সাথে দেখা করার জন্য। পুণ্যশ্লোকরাও দাঁড়িয়েছিলেন সেই ভিড়টার মধ্যে। তার হাতে একটা অতি প্রিয় বই, নাম 'দি রুম অন দি রুফ,' বাই রাস্কিন বন্ড। কিছুদিন আগেই এই দোকান থেকে কিনেছিলেন বইটি। তখনই জেনেছিলেন লেখকের আসার কথা। হঠাৎ একটা অনুকূল হাওয়া চারদিকে খেলে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি, যার নাম সুজাতা। মেয়েটিকে দেখলে অজান্তেই বুকের ভিতরটা উথালপাথাল করতে থাকে তার। সুজাতার হাতেও একটা বই। রাস্কিন বন্ড-এরই 'অ্যাংরি রিভার'। এই বইটিও তার পড়া। মেয়েটি তাকে দেখে খুব সুন্দর ঝকঝকে একটা হাসি উপহার দিল। বলল সে এসেছে প্রিয় লেখকের একটি অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে। রাস্কিন বন্ড এলেন, গুণমুগ্ধদের উদ্দেশ্যে বললেন কিভাবে দেরাদুন ও মুসুরির প্রকৃতি তাঁর লেখাতে প্রভাব ফেলেছে। প্রকৃতিকে কিভাবে নিজেদের প্রয়োজনেই যেকোন মূল্যে রক্ষা করা উচিত। এরপর তিনি নিজের বইয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন এবং সবাইকে অটোগ্রাফ দিয়ে বিদায় নিলেন। কিন্তু পুণ্যশ্লোকের সময় কাটলো একটা ভীষণ ঘোরের মধ্যে--তার একটা বড় কারণ ছিল পাশে সুজাতার উজ্জ্বল উপস্থিতি।

    সেই রাতে বৃষ্টি নামল খুব। মনে হচ্ছিল যেন রাতারাতি কেউ হোসপাইপ দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছিল দেরাদুন শহরটাকে। হস্টেলের বিছানায় সেই বৃষ্টির অনুষঙ্গে ঘুম আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল পুণ্যশ্লোকের। স্বপ্ন দেখলেন একটা পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর মধ্যে দিয়ে একটা গাছের গুঁড়ি ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির মধ্যে। আর সেই গুঁড়িতে আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজেকে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে একটি মেয়ে। এই ভয়ঙ্কর প্রকৃতি তাকে কোন কূলে নিয়ে গিয়ে ফেলবে কে জানে। মেয়েটাকে খানিকটা সুজাতার মতো মনে হচ্ছিল। সকালে উঠে মনে পড়ল আরে এতো রাস্কিন বন্ড-এর গল্পের একটি চরিত্র ‘সীতা'। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল স্বপ্নে সুজাতাকে এরকম একটা বিপর্যয়ের মধ্যে দেখে। ইচ্ছে হল চৌধুরীকাকুর বাড়ি যাবার নাম করে গিয়ে সুজাতাকে দেখে আসতে। কিন্তু সেদিন ছিল সোমবার। পুরো দিন ক্লাস, সন্ধেবেলা ফোটোগ্রাফি ল্যাব। রাতে আবার এনুয়াল ডে-র রিহার্সাল। পুরো দিনটাই ছেঁড়া ছেঁড়া বিষণ্ণতার মধ্যে কেটেছিল পুণ্যশ্লোকের।


    এভাবেই কেটে গেল আরও বছরখানেক। মাঝে মাঝে দেখা হত তাদের। নিয়ম করে নয়। ছোট শহরে হঠাৎ হঠাৎই দেখা হয়ে যেত। কখনও রামকৃষ্ণ মিশনে অষ্টমী পুজোর সময়, কখনও বা কোন মেলায়। এই নিঃঝুম শহরে নির্জনতার অভাব ছিল না। ছিল ব্যাপ্ত জঙ্গল, ছিল লাজুক নদী। তবে ঘোরটাই লেগে ছিল, সাহস হয়নি নির্জনতা খুঁজে আলাপটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার। শুধু ভীষণ, ভীষণ ভালো লাগতো মেয়েটিকে। অস্থির লাগতো। মনে হত এখুনি মেয়েটিকে জানিয়ে দিতে নিজের ভালোলাগার কথা। মনে হত মেয়েটির হাসির মধ্যেও যেন রয়েছে কিছু জানাবার অস্ফুট ইঙ্গিত। চৌধুরীকাকুর বাড়ির ফটো-এ্যালবাম থেকে কাউকে না জানিয়েই বুবানের জন্মদিনে তোলা একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফটো নিয়ে এসেছিলেন তিনি। বাচ্চাদের সাথে ঐ মেয়েটির একটা গ্রুপ ফটো। একান্ত নিজস্ব মুহূর্তে এখনও দেখেন সেই ছবি। কেউ জানে না। এমনকি আশাবরীও না।

    ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুকে তার এই ভালোলাগার ব্যাপারটা বলেছিলেন সেইসময়। চৌধুরীকাকুদের পাড়াতে লুকিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে দেখিয়েও ছিলেন তাদের। বেশি এগোবার সাহস হয়নি। বন্ধুরা বলেছিল, আলাপ করে নে। ওকে বল তোর মনের কথা। ওঁরাও যেহেতু বাঙালি, আলাপ করলে কিছু মনে করবে না। কারণ, মেলামেশার ব্যাপারে বাঙালিরা অনেক প্রগতিশীল।

    ভীষণ আবেগের বশে তখন ঠিক করলেন আর দেরি করা উচিত হবে না, কয়েকদিন পরে বুবানের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেই মেয়েটিকে জানাতে হবে তার এই ভালোলাগার কথা। এই ভেবে অনেক প্রস্তুতি নিয়ে পুণ্যশ্লোক পৌঁছলেন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগলেন আগত মুহূর্তগুলির জন্য। একে একে সব অতিথিরাই এল সেদিন। অনুষ্ঠান এগিয়ে চলল। হৈ চৈ, খাওয়া দাওয়া, গেমস। কিন্তু পাশের বাড়ি থেকে মেয়েটিই এল না। কাউকে জিজ্ঞেসও করা যাচ্ছিল না। রাত বাড়ছিল, অতিথিরা চলে যেতে শুরু করল একে একে। এরপরে আর থাকতে না পেরে ছোট্ট বুবানকেই ঠাট্টাচ্ছলে জিজ্ঞেস করলেন—

    —‘কি রে তোর মিষ্টিদিদিকে দেখলাম না তো আজকে? নেমন্তন্ন করিস নি নাকি?’

    —‘ওমা, দাদাই তুমি জান না? মিষ্টিদিদি তো ওর মামাবাড়ি চলে গেছে, লন্ডনে, গত সপ্তাহে। ওখানেই থাকবে আর পড়াশুনা করবে এখন থেকে। কি মজা, না! ওর বাবা-মা ও চলে যাবে কিছু দিন পর।’ বুবানের গলায় উত্তেজনা আর জন্মদিনের উপহারপ্রাপ্তির আনন্দ মিলেমিশে একাকার। আর পুণ্যশ্লোকের বুকের ভেতরে একে একে নিভে গেল সমস্ত আলো। একটা চরম প্রত্যাশা, হতাশায় পরিণত হল মুহূর্তে। ভগ্নহৃদয়ে সে রাতে বেড়িয়ে এসেছিলেন চৌধুরীকাকুর বাড়ি থেকে। এ গলি, ও গলি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে, অনেকটা সময় কাটিয়ে দেবার পর একসময় আবিষ্কার করলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আবছায়াতে সুজাতাদের বাড়ির গেটের সামনে। তখন অনেক রাত। সামনে নিঝুম একটা বিশাল বাড়ি, সারা পাড়া নিস্তব্ধ। গেটের সামনে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ আর তাতে ঝোলানো একটা দোলনা। সবকিছুই আগের মত আছে শুধু সুজাতা নেই। অনেকদূরে চলে গেছে সে। আর কোনদিনই হয়তো দেখা হবে না তার সাথে। বলা হবে না তার মনের কথা। হঠাৎ মনে হল দোলনাটা হাল্কা দুলছে। কেউ কি বসে-বসে সবেমাত্র উঠে চলে গেল। চোখেরই ভুল নিশ্চয়ই। কি যে মনে হল তার, কৃষ্ণচূড়া গাছটার উদ্দেশ্যে তার বুকের গভীর থেকে উঠে এলো দীর্ঘশ্বাসে মোড়া একটি অনুরোধ--

    ‘হে প্রাচীন কৃষ্ণচূড়া, মনের না-বলা কথা আজ তোমার কাছেই রেখে গেলাম আমি। সে যদি কখনও আসে তোমার কাছে, তাকে জানিয়ো আমার এই রেখে যাওয়া কথা।’

    অন্ধকারেই সহসা একটা ঝিরি ঝিরি বাতাস বইতে শুরু করল কৃষ্ণচূড়ার সকল ডালপালা দুলিয়ে। ঝরে পড়ল দুয়েকটা পাতা।

    হস্টেলে ফিরেছিলেন অনেক রাতে। বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলতেও হয়েছিল বেশি রাত করার জন্য।

    মনে মনে একটা ক্ষীণ আশা ছিল তার যে, নিশ্চয়ই অদূর ভবিষ্যতে মেয়েটি আবার আসবে এখানে। তখন দেখা হবে। কিন্তু কয়েকদিন পরে কথায় কথায় চৌধুরীকাকুর কাছে জানতে পেরেছিলেন যে ওদের আর ফেরার প্ল্যান নেই। ওরা সপরিবারে লন্ডনে শিফ্‌ট করে যাচ্ছে। বাড়িটা থাকবে, যদি কখনও ওরা ফিরে আসে। আবার পরে বিক্রীও করে দিতে পারে।

    পুরো দেরাদুনটাই শূন্য হয়ে গেল ওর কাছে। পড়াশুনো খেলাধূলো কোনোটাতেই আর আগের মতো মন বসানো যাচ্ছিল না। মনের কথা মনেই রয়ে গেল, জানানো হল না। জানা গেল না ও-পক্ষের মনের কথাও। এর চেয়ে বোধহয় জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলেও ভালো ছিল। জানা তো যেত। ও-ও কি কিছুই বোঝেনি বা আন্দাজ করেনি? হয়তো কিছু বলার বা জানাবার ছিল না বলেই না জানিয়ে চলে গেল?

    ***

    মর্নিংওয়াক সেরে বাড়ি ফেরার পর ব্রেকফাস্ট টেবিলে আশাবরী প্রশ্ন করলেন—‘কাল রাতে ঘুম হয়নি মনে হচ্ছে।’

    কি করে যে ও বুঝতে পারে কে জানে! ঘুমের বিভ্রাট প্রায়ই হচ্ছে আজকাল। এ রকম স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা, তারপর নির্ঘুম বাকি রাত। বুকের ওপর একটা চাপ। কি জানি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কি না। ডাঃ ব্যানার্জীকে বলতে হবে। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন,

    —‘জীবনের না-পাওয়া দিকগুলো নিয়ে একদম ভাববেন না। এগুলোই মনের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। কারণ এই বয়সটাই জীবনের হিসেবনিকেশের সময়। দু:স্বপ্নের সেটাও কারণ হতে পারে। আপনি এত সফল মানুষ। শুধু পজিটিভ চিন্তা করুন। শরীর তো ঠিকই আছে।’

    কি করে বোঝাবেন তিনি যে, সব চিন্তার আনাগোনা তাঁর বশে নেই। তবে কি মনের ভেতরের সেই অস্বস্তিই তাকে কুরে খাচ্ছে। হবেও বা। সুজাতা হারিয়ে গেছে আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চলল। কিন্তু এভাবে মনে দাগ কেটে যাবে এতদিন বুঝতে পারেননি পুণ্যশ্লোক।

    চাকরি-জীবনে বহুবার বিদেশ গেছেন। লন্ডনেও গেছেন বেশ কয়েকবার। বাঙালি আড্ডাতেও মিশেছেন। কিন্তু কোথায় খুঁজবেন সুজাতাকে? কোনও রেফারেন্স নেই। চৌধুরীকাকুরাও দেরাদুন থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাওয়াতে বিশেষ যোগাযোগ হয়নি আর। হয়তো চাকরির ব্যস্ততায় সেভাবে খোঁজ করাও হয়ে ওঠেনি।

    কিন্তু ছেলে টুবাই যখন দু’-তিন বছর আগে লন্ডনে সেটেল করল, তখন থেকেই কেন যেন মনে হতে লাগল যে আবার হয়তো দেখা হবে সুজাতার সঙ্গে।

    বছরকয়েক আগে রিটায়ারমেন্টের পর প্রথমে কলকাতায় থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু মন টিঁকল না কোলাহলের শহরে। মনে হল এত বছর যে দেরাদুনকে ভুলে ছিলেন সেখানেই থিতু হওয়া যাক। পুরনো স্মৃতিগুলো নিয়েই বেঁচে থাকা যাবে। আশাবরীকে বললেন ব্যাপারটা। উনিও কিছুটা জানতেন স্বামীর স্কুলজীবনের ঘটনাটা। কিশোর বয়সের সেই অনুচ্চারিত প্রেম বা ভালোলাগাকে যে পুণ্যশ্লোক শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করেন—তাও জানতেন। তাই, না বললেন না। শুধু মজা করে বললেন—

    —‘এতগুলো বছর পেরিয়ে তোমার কি মনে হয় সব আগের মতোই থাকবে? আর এখন যদি আবার দেখা হয় সুজাতার সঙ্গে তবে কি ‘না-জানানো’ প্রপোজালটা রাখবে তার কাছে? ভালোই হবে--আমরা দুই বুড়ি তোমাকে নিয়ে হরিদ্বারে ঘর বাঁধবো। আরে হ্যাঁ, ওরও তো বুড়ো থাকবে একটা। কী দারুণ জমবে ব্যাপারটা এতগুলো বুড়োবুড়ি মিলে।’

    —‘আর কোথায় সুজাতা? খুঁজেই তো পেলাম না সারা জীবন। হা: হা:। দেরাদুনটাই কি আর আগের মতো থাকবে? তবু মনে হচ্ছে ওখানে ভালোই থাকবো আমরা। ওয়েদার-টা তো ভালো লাগবে। মেজর কোন অসুখ-বিসুখ নেই আমাদের। হলেও দিল্লী তো কাছেই। শুনেছি চৌধুরীকাকুর নাতি টিটু এখন দেরাদুনে আছে, আরে টিটু মানে আমাদের বুবানের ছেলে গো। ও.এন.জি.সি. জয়েন করেছিল না? ওর পোস্টিং হয়েছে। ওদের ফ্যামিলির সাথেও আমাদের সময় ভালোই কাটবে। চেনা লোক পেয়েই যাবো অনেক।’

    তারপরই দেরাদুনে শিফট করে আসা। রামকৃষ্ণ মিশনের পেছনে পাহাড় ঘেরা পাড়াতে একটা ভাড়া করা তিন কামরার ফ্ল্যাট-এ। তার পর থেকেই শুরু হয়েছে এই অদ্ভুত স্বপ্নবিভ্রাট।

    দুপুরে খেতে বসে মনে পড়ল, আজ বিকেলে বুবানের ছেলে টিটু আসবে। ‘দেরাদুন দুর্গাবাড়ি’তে দুর্গাষ্টমী পুজোর আরতি দেখতে নিয়ে যাবে। ওরা কি সব অনুষ্ঠান করছে তাও দেখা যাবে।

    সন্ধে নাগাদ এসে পড়লেন দুর্গাবাড়িতে। অনেক বদলেছে পুরো জায়গাটা। জমি জিরেত অতটুকুই আছে, কিন্তু লোক বেড়েছে অনেক। ডাকের সাজের একচালার প্রতিমা, অপূর্ব। ঢাক বাজছে। মনে পড়ল এখানেই একদিন অঞ্জলি দিয়েছিলেন সুজাতার পাশে দাঁড়িয়ে। পুজোমণ্ডপের পেছনের স্টেজে আবৃত্তি, গান আর নাচ মিলিয়ে একটা খুব জোরদার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছিল। সবাই মিলে বসলেন সেখানে গিয়ে। স্মৃতি আর বর্তমান মিলিয়ে এক অপার ভালোলাগায় ভাসতে লাগলেন তিনি। হঠাৎই অনুষ্ঠানের এক জায়গায় একটা পঙ্‌ক্তি শুনে চমকে উঠলেন তিনি। কবি খোঁজ করছেন তার মেঘবালিকার—‘তুমিই কি সেই মেঘবালিকা? তুমিই কি সেই?’ সত্যিই তো, সবাই-ই তো ছেলেবেলার মেঘের মাঠে গিয়ে নিজের নিজের মেঘবালিকার খোঁজ করে। তিনি একা তো নন।

    অনুষ্ঠান শেষ হবার পর সবাই যখন শিল্পীদের বাহবা দিচ্ছে আর চলে যাওয়ার তোড়জোড় করছে, সেইসময় চৌধুরীকাকুর নাতি টিটু একজন উজ্জ্বল মধ্যতিরিশের যুবককে নিয়ে তাদের কাছে এল—‘জেঠু এনার দাদুরা একসময় দেরাদুনে আমার দাদুর বাড়ির পাশে থাকতেন। এখন থাকেন আমেরিকাতে। দেরাদুনের বাড়িটা রয়েই গেছে। আর ওনারা আসেন বছর কয়েক পর পর। উনি বলেন ওনার মা’র জন্যই বাড়িটা বেচা হয়নি। ওনার মার ছোটবেলাটা এখানেই কেটেছে। কখনও না কখনও দেরাদুনে ফিরতে চান তিনি।'

    —‘কোন বাড়িটা ছিল বল তো তোমাদের? ওদিকটা তো অনেক বদলে গেছে শুনেছি।’

    —‘জেঠু, বাবা একজন মিষ্টিদিদির কথা বলতো্‌, উনিই এই ভদ্রলোকের মা। তুমি তো আসতে, হয়তো শুনে থাকবে। দাদুদের ডানদিকের দোতলা বিশাল বাড়িটাই ওনাদের।’

    চমকে উঠলেন পুণ্যশ্লোক। বুকের ভেতরে একটা আশার ঝরনা ঝরতে শুরু করল। অনেক দিনের আটকে থাকা রুদ্ধ জলরাশি একবারে বের হতে চাইছে। মণ্ডপে ঢাকের শব্দ হঠাৎ যেন বেশি উত্তাল হয়ে উঠল।

    —‘তোমার মা বাবা আসেন এখানে?’ নিজের আবেগ যথাসম্ভব লুকিয়ে সপ্রতিভ যুবকটিকে প্রশ্ন করলেন পুণ্যশ্লোক।

    —‘খুব একটা না। অনেক দিন পর বছর তিনেক আগে একবার মা এসেছিলেন। এই বাড়ি বিক্রি করার জন্য। মার নামেই তো বাড়ি। কিন্তু এখানে আসার পর কেন জানি না উনি মত বদলান। বাড়ির বাগানের কৃষ্ণচূড়া গাছে টাঙানো একটা দোলনার ওপর বসে বসেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। এভাবে নাকি তার ছোটবেলার কথা মনে পড়েছিল আর আমাকে বলেছিলেন তার জীবতকালে যেন এ বাড়ি বিক্রি না করা হয়। তাই প্রোমোটার দারুণ ভালো অফার দিলেও মার অমতে বেচা যাচ্ছে না।’

    —‘তোমার মা কি এবারে এসেছেন।’ অনেক দ্বিধা কাটিয়ে দুরুদুরু বুকে প্রশ্ন করলেন।

    —‘সেটাই তো আরও দুঃখের। গত বছর একটা ম্যাসিভ সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছিল মার। তারপর থেকে চলাফেরা বিশেষ করতে পারেন না। স্মৃতিশক্তি প্রায় পুরো লোপ পেয়েছে। নিজের বাড়ির লোকজনকেও ঠিকমতো চিনতে পারেন না এখন।’

    কথাটি খানিক্ষণের জন্য বিবশ করে দিল সবাইকে। আশাবরী হাল্কা করে সবার চোখ এড়িয়ে একটা চাপ দিলেন পুণ্যশ্লোকের হাতে। সংযত হতে সাহায্য করলেন তাকে।

    —‘এই যে তোমরা চলে এসেছো, ওখানে কে দেখছেন ওনাকে?’ নিস্তব্ধতা ভাঙলেন আশাবরী।

    —ওনার দেখাশুনো মোটামুটি বাবাই করেন। বাবা নিজেও ডাক্তার আর ওখানে হসপিটালও খুব কাছেই।’

    —‘কিন্তু ওনারও তো বয়স হয়েছে।’

    —‘সেইজন্যই তো বেশিদিন থাকবো না। খুব দরকারি, বাড়ির ট্যাক্স সংক্রান্ত কয়েকটা কাজ শেষ করে পরশুই চলে যাব।’

    —‘আচ্ছা, তুমি এত ভালো বাংলা কি করে বল?’ জিজ্ঞেস করলেন আশাবরী।

    —‘সেটাও মার জন্যই। মায়েরা কারডেফে বঙ্গ-সংস্কৃতি নিয়ে রেগুলার চর্চা করেছেন। এখন নিউ জার্সিতে আমরাও করছি।

    —‘তোমরা কি নিউ জার্সিতেই থাকো? শুনেছিলাম তোমার দাদুরা লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন এখান থেকে?’ না চাইলেও এই প্রশ্ন আটকাতে পারলেন না পুণ্যশ্লোক।

    —‘দাদুরা অ্যাকচুয়ালি এখান থেকে কারডেফে চলে গিয়েছিলেন। আর মা’র বিয়ে হয়েছিল নিউ জার্সিতে। বাবা ছিলেন হোবোকেনের একটা বড় হসপিটালের মেডিসিনের ডাক্তার। এখন রিটায়ার্ড। আমি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছি কেমিক্যাল ইঞ্জিনীয়ারিং-এ। চাকরি করি ব্রুকলিনে। বাড়ির থেকেই কমিউট করি।

    —‘আচ্ছা কাকু আপনি কি মাকে চিনতেন?’ যুবকটি হঠাৎ প্রশ্ন করল।

    বুকের মধ্যে একটা ব্যথা মুচড়ে উঠল পুণ্যশ্লোকের। কি বলবেন তিনি এই ছেলেটিকে। রক্তপাত হয়েই চলল হৃদয়ে। কোনও মতে বললেন—

    —‘হ্যাঁ, আমি তোমাদের পাশের বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতাম। টিটুর দাদু ছিলেন আমার লোকাল গার্জেন। সেই সময় চিনতাম তোমার মা কে।’

    তিনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলেন, হৃদয় এক কথা বলতে চাইল, আর মুখ বলল অন্য কথা। কেন তিনি চিৎকার করে জানাতে পারলেন না সুজাতা তাঁর হৃদয়ের খুব গভীরে জেগে আছেন এখনও। বুঝলেন, সব কথা সবসময় বলা যায় না।

    —‘কাকু আপনি মাকে চিনতেন বলেই একটা আশ্চর্য কথা আপনাদের বলি। মার স্মৃতিশক্তি প্রায় পুরো লোপ পেয়েছে। কারডেফের কথা এমন কি নিউ জার্সির কথাও ঠিকমতো মনে করতে পারেন না তিনি। কিন্তু মাঝে মাঝে ছাড়া ছাড়া দেরাদুনের কথা বলেন। এখানকার বাড়ির কথা, স্কুলের কথা, দুর্গাপূজার কথা। খুব গুছিয়ে নয়, তবে ওই সময়কার আরো কথা বলতে চান। আমরা পুরোটা বুঝতে পারি না। বাবা কিছুটা পারেন। এর আগে কিন্তু কখনও মার কাছে এখানকার কথা বিশেষ শুনিনি।’

    —‘সত্যি আশ্চর্য তো? ডাক্তাররা কিছু বলছেন?’

    —‘ডাক্তাররাও বেশ আশ্চর্য। বলছেন এই অ্যাটাক মার মস্তিষ্কের স্মৃতির পাহাড় ওলোট পালোট করে দিয়েছে। ওপরের স্মৃতি সব মুছে গেছে বা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে গেছে। কিন্তু অনেক পুরনো স্মৃতি সামনে চলে এসেছে।’

    —‘এরকম হয় নাকি?’ যদিও প্রশ্নটা করলেন, তবুও মনের গভীর থেকে একটা অজানা বোধের বুদ্বুদ তাকে নাড়িয়ে দিয়ে উঠে এলো। মনে মনে বুঝলেন, তারও তো একই রকম দশা। সারাজীবন নানা কাজে ভুলে থাকলেও, এই অবসর জীবনে সেই ধুলোপড়া পুরনো স্মৃতিই সজীব হয়ে তাকে স্বপ্নে জাগরণে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

    —‘ডাক্তাররা তো তাই বললেন। হয়ত মা এই স্মৃতিগুলোকে কোনো কারণে জোর করে মনের গভীরে ধরে রেখেছিলেন। দৈনন্দিন জীবনে আসতে দেননি সেভাবে। অথবা, হয়তো এখন তিনি ফিরে গেছেন সেই জীবনে, সেই সময়ে। ওনার কথা বলার সময়ে আচ্ছন্নতা বা ব্যাগ্রতা দেখলে মনে হয় ওনার সেই সময়ে কোনও কাজ করার ছিল যেটা উনি করতে পারেননি তখন। হয়তো কাউকে কিছু বলার ছিল। বা ওনার কারোর কাছ থেকে কিছু জানার ছিল। যা জানা হয়নি তাঁর। তারপর পুরো জীবনটাই ওনার হয়তো বয়ে গেছে অন্য খাতে। আজ উনি আবার সেই জীবনে, সেই মানসিক ভাবের মধ্যে ফিরে গেছেন। সেভাবেই ভাবছেন, যেভাবে এক কিশোরী মন ভেবে থাকে। কি আশ্চর্য না? ওঃ হো কাকু--আপনাদের অনেক দেরি করিয়ে দিলাম।’

    শেষ কথাগুলো শুনতে পেলেন না পুণ্যশ্লোক। শুধু দেখলেন, সামনের সুদর্শন যুবকটি হাত মুখ নেড়ে যাচ্ছে। আবছা হয়ে আসছে চারিপাশ। মনের মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন, একটা খরস্রোতা নদী, প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির মধ্যে নদীতে ভেসে চলা একটি গাছের গুঁড়ি, আর তার ওপর আশ্রয় নেওয়া একটি মেয়ে।

    খানিক বাদে আবার ভেসে উঠলেন বাস্তবে। দেখলেন সামনের যুবকটি নমস্কার করছে বিদায় নেবার জন্য। আশাবরী তাকে বলছেন,

    —‘আমরা তো এই শহরেই থাকছি। যখনই এখানে আসবে আমাদের বাড়িতে এস কিন্তু।’

    বাড়ি ফেরার পথে ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে পুণ্যশ্লোক ভাবতে থাকলেন। কে সুজাতাকে ফিরিয়ে দিল সেই পু্রনো স্মৃতি? তার অসুখ? দেরাদুনের এই প্রকৃতি? নাকি সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটি, যার কাছে তিনি রেখে গিয়েছিলেন নিজের মনের কথা, সুজাতাকে জানাবার জন্য? সেই কি তবে সব জানিয়ে দিয়েছে সুজাতাকে? তাই কি সুজাতা বাড়ি বিক্রী করতে দিল না? আর তাকেই বা কে সারা পৃথিবী ঘুরিয়ে আবার এখানে এনে ফেলল? কে তাদের নিয়ে খেলছে এই অদ্ভুত খেলা? সেই কি তবে মানুষের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে, ফিরিয়ে আনে বহু যুগের ওপার থেকে?একটা আচ্ছন্নতা ক্রমশ: গ্রাস করে নিল তাঁকে।

    সে রাতেও একটা স্বপ্ন দেখলেন পুণ্যশ্লোক। একটা বিশাল মাঠ। ছেলেমেয়েরা খেলছে। আকাশে একটা কালো মেঘ ঝুলে আছে। ভেজা হাওয়া বইছে। সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। এক রাখাল এল, একটা বাঁশের বাঁশীতে অদ্ভুত একটা মন কেমন করা সুর তুলছে সে। বড় চেনা মনে হল তাকে। বড়ই চেনা। নিজের এলবামেই কি দেখেছেন তাকে? তার নিজেরই বালক মুখচ্ছবি? বাঁশী থামিয়ে একটা প্রশ্ন করল রাখালটি--‘তুমি কি সেই মেঘ বালিকা? তুমি কি সেই?’

    কেউ রিনিরিনি গলায় উত্তর দিল—‘আমি এখন মেঘ নই আর, সবাই এখন বৃষ্টি বলে ডাকে আমায়।’ রাখালরূপী ‘তিনি’ বৃষ্টিতে ভিজছেন আর আপ্লুত হচ্ছেন। একটা কথা কানে বাজছে, ‘ওনার হয়তো কাউকে কিছু বলার ছিল… কারোর কাছ থেকে কিছু জানার ছিল। কোন কাজ বাকি থেকে গিয়েছিল হয়তো।’

    এই স্বপ্ন দেখে অন্যদিনের মতো ঘুমটা কিন্তু ভাঙলো না পুণ্যশ্লোকের। একটা প্রশান্তির হাসি যেন জড়িয়ে রইল তার ঘুমন্ত মুখটার মধ্যে। পাশ ফিরে ঘুমের মধ্যেই আশাবরীর হাতে হাত রাখলেন তিনি।



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)