• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৬০ | আগস্ট ২০১৫ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share
  • মুক্তিনাথ যাত্রীর ডায়েরি : সোমদত্তা মণ্ডল


    ১১ই এপ্রিল, রবিবার

    সকালে প্রাতঃরাশ সেরে প্রায় সোয়া আটটার সময় আমরা তুকুচে থেকে ধীরে ধীরে রওনা দিলাম। আজকে আমাদের লক্ষ্য মাত্র সাড়ে সাত কিলোমিটার হাঁটা, তাও প্রায় সমতল রাস্তা দিয়ে। সকলেই তাই বেশ খুশির মেজাজে রয়েছে। ইয়াক হোটেলকে বিদায় জানিয়ে নদীর ডান পাড় ধরে আমরা গল্প করতে করতে বেড়ানোর ঢঙে চলেছি। পথ একদম সমতল। মনে হয় প্রয়োজন হলে জীপও চালানো যেতে পারে। মাঝে মাঝে দেখলাম কাঠের খুঁটি পোঁতা আছে, তাতে তার খাটিয়ে বিদ্যুতের লাইন আনার ব্যবস্থা প্রায় প্রস্তুত। শুনলাম আলো আসতে আরও বছর দুই লাগবে। এখন যেমন বদরিনাথে হয়েছে তখন মুক্তিনাথ যাত্রীরা হয়ত পথের সব হোটেলে গরম জলের গীসারে স্নান সারতে পারবে। অবশ্য তখন এখানকার গ্রামবাসীরা উপকৃত হলেও হিমালয় ভ্রমণপিয়াসু যাত্রীরা কতটা খুশি হবে জানি না। কারণ আমাদের ঠাকুমারা যেভাবে হৃষিকেশ থেকে পায়ে হেঁটে কেদারবদ্রী যাত্রা করেছিলেন, তার সাথে এখনকার প্যাকেজ টুরে চার ধাম ভ্রমণের তুলনা করা চলে না।

    এইসব আলোচনা করতে করতে পথ চলছি। নদীর বুকে নানান আকারের আর নানান রঙের পাথর। সেই দেখে মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে সবাই ঝুলি ভরতি করে তুলছে। আশ আর মেটে না। আগেই বলেছি এখানকার পাথরগুলোর একটা বৈচিত্র্য আছে। বেশিরভাগই কালো বা ধূসর রঙের, তার মধ্যে গোল আকারে সাদা দাগ। এছাড়া কালীগণ্ডকী নদী শালগ্রাম শিলার জন্য বিখ্যাত। কুচকুচে কালো পাথর দেখলেই সবাই সেগুলোর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। এছাড়া আর এক রকমের কালো পাথর আছে যেগুলো ভাঙলে ভিতরে অ্যামোনাইট-এর ফসিল পাওয়া যায়। লক্ষ বছর আগে যখন হিমালয় পর্বত সমুদ্রের নীচে ছিল, তখন এগুলো জলজ প্রাণী ছিল। পরে প্রচণ্ড চাপে ফসিলে পরিণত হয়েছে। সাহেবদের কল্যাণে এখানকার লোকেরাও পাকা ব্যবসাদার হয়ে উঠেছে। পথ চলতে চলতে এইরকম কিছু পাথর ওরা আমাদের বেচতে চায় আর এক একটার দাম হাঁকে পঞ্চাশ টাকা!

    প্রায় ঘণ্টা দুই চলার পর আমরা মারফা গ্রামে এলাম। উচ্চতা সেই একই, ৮৫০০ ফুট। গ্রামে ঢোকার মুখে পাথরের তৈরি তোরণ। তার নীচ দিয়ে গিয়ে ওপারে পথের পাশে পাহাড়ের গায়ে দেওয়ালে সারি সারি বৌদ্ধ ধর্মচক্র সাজানো। এগুলো বেশ প্রাচীন বলে মনে হয়, তবে সদ্য রঙ করা দেখে মনে হয় যে সংস্কারের চেষ্টা চলছে। এরপর আসল গ্রাম শুরু। রাস্তার দুদিকে পাকা দোতলা তিনতলা বাড়িগুলো একে অপরের গায়ে লাগানো। তার মাঝখান দিয়ে পাথর বাঁধানো চলার পথ। রাস্তার একধারে নালা কাটা – তার কিছুটা মাটির নীচ দিয়ে, আবার কিছুটা ওপরে। গাছের গুঁড়ি চিরে তার মধ্যে নৌকার মত করে কেটে পরপর সাজিয়ে ঝরনার জলকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আমরা এখানকার দর্শনীয় বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছি। বাড়ির সামনে দরজায় দরজায় সার দিয়ে ছেলে মেয়ে বুড়োর লাইন, ঠিক যেন রথ দেখছে। মাঝে পথের পাশে কয়েকজন সাহেব মেম ঝরনার জলে কাপড়জামা কাচছে। বুঝলাম এখানকার গ্রামবাসীরা সাহেব দেখতে অভ্যস্ত কিন্তু আমাদের মতো শাড়ি পরা বিদেশিনী একটাও দেখেনি। এখনও পর্যন্ত এই রাস্তায় এক বিহারী সাধু ছাড়া কোন ভারতীয়ের মুখ আমরা দেখিনি। কি জানি হয়ত কুণ্ডু স্পেশালের কল্যাণে কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালিরা এই তীর্থযাত্রা সম্বন্ধে আরও সচেতন হয়ে উঠবে।

    মারফা গ্রামের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ মনে হয় যে এটা সুদূর নেপাল নয়। এ পথ আমাদের বড়ই চেনা। এ যেন কাশীর বাঙালিটোলার গলি। গ্রামের শেষে আর একটা তোরণ পেরিয়ে আমরা পথ চলছি। এবার দুপাশে চাষের ক্ষেত। যব আর বজরা ছাড়া মাঝে মাঝে আপেলের ক্ষেতও চোখে পড়ে। সবে ফুল এসেছে সব গাছে। মাস্তাং জেলার এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্টাল ফার্মও চোখে পড়ল। গ্রামের একটু বাইরে দু তিনটে বেশ ভাল হোটেল আছে। এরই একটাতে চা খেয়ে আবার হেলতে দুলতে চলা শুরু হল। আস্তে আস্তে আকাশটা মেঘলা হতে শুরু করল। মাঝে মাঝে মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল। তুকুচের সেই বিখ্যাত হাওয়া এবার পিছন থেকে ঠেলা মারতে লাগলো। আরও কিছুটা চলার পর ডানদিকে সিয়াং গ্রাম দেখা গেল তবে আমরা ওই গ্রামের পথ ধরলাম না। আমরা নদীর ধারে পাহাড়ের পাদদেশ দিয়েই একই ভাবে এগিয়ে চললাম। আরও কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ একটা প্রাকৃতিক পরিবর্তন চোখে পড়ল। চারিদিকে রুক্ষ নেড়া পাহাড়গুলো একদম গাছপালা বিহীন। শুধু বালি বালি ঝুরো কাঁকরের পাহাড়গুলো কেমন যেন একেবারে শ্রীহীন।

    আরও কিছুটা পরে জোমসোম গ্রাম দেখা গেল। উচ্চতা ৮৯০০ ফুট। গ্রামে ঢোকার আগে “জোমসোম বিমানস্থল” পড়ল। পাহাড়ের কোলে একটা বিস্তীর্ণ ময়দান। আমাদের দেশের সাধারণ হেলিপ্যাডের সমান হয়তো হবে। একটা ছোট্ট বাড়ি, তার চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া। এই হচ্ছে এয়ারপোর্ট। এক দিন অন্তর পোখরা থেকে ছোট ১৩ সিটের প্লেন এখানে আসে। মাঝে মাঝে ট্রেকিং এর দল এই প্লেনগুলো চার্টার করে। ভাড়া নেহাতই কম, মাত্র ১৭০ টাকা। তবে প্লেনে জায়গা পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তেরটা সিটের তিনটে সব সময় সরকারী সংরক্ষণে থাকে। এছাড়া জোমসোম এর বড় বড় ব্যবসায়ী আর ঠিকাদারদেরও মোটামুটি বাঁধা কোটা থাকে। বাদবাকি বিদেশিদের জন্য। শোনা গেল প্লেনের জন্য এক এক জনকে সাত থেকে দশ দিন পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হয়। তার ওপর তুকুচের এই বিখ্যাত হাওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই নাকি প্লেন নামতে পারে না, আবার পোখরা ফেরত চলে যায়। আমরা যখন জোমসোম পৌঁছলাম তখন আমাদের সকলেরই মনে সুপ্ত বাসনা যে ফেরার পথে আর না হেঁটে আমরাও প্লেনে করে ফিরে যাব। কয়েকজন তখনই ছুটল বুকিং অফিসে। ফিরে এলো সুসংবাদ নিয়েই – টিকিট অবশই পাওয়া যাবে দশ জনের, তবে সেটা তেইশ তারিখের আগে নয়। আজ সবে এগারোই। তার আগে “ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী...”

    এয়ারপোর্ট-এর ঠিক সামনেই রাস্তার ওপর একটা ভালো হোটেল – নাম ‘অলকা হোটেল’। আজকের মত এখানেই বিশ্রাম। বাইরে ঘূর্ণিঝড়ের মত সেই প্রচণ্ড হাওয়া, তারই মাঝে আর একবার পিছন ফিরে হোটেলে ঢোকার আগে দেখি সামনের এয়ার স্ট্রিপের ঠিক শেষ থেকেই নীলগিরি পাহাড়টা উঠে গেছে। আমাদের থেকে বড় জোর হাত পঞ্চাশেক দূর। সেটা একদম নীচ পর্যন্ত সাদা বরফে ঢাকা। হোটেলে ঢুকে যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো। সবাই আজ বেশ খুশমেজাজে আছে দেখলাম। বসার বড় লবির মাঝখানে একটা গোল করে গাঁথা নিচু ফায়ার-প্লেস। তার মোটা চিমনিটা সোজা উঠে গেছে ছাদের মধ্যে দিয়ে। সামনে কাঠের দেওয়ালের ওপর দিকটা কিছুটা কাঁচ দেওয়া। সেখান থেকে আলো তো আসেই, উপরন্তু পিছনের পাহাড়গুলোর সৌন্দর্যও ঘরে বসে উপভোগ করা যায়। আমাদের আজকে কাগবেনি পর্যন্ত এগিয়ে যাবার কথা ছিল, কিন্তু খারাপ আবহাওয়া ছাড়াও আরও একটা ভয়ের খবর শোনা গেল। ওখানে একটা পাগলা কুকুরের কামড়ে সারা গ্রাম তোলপাড়। এই পর্যন্ত সেটা নাকি অন্তত পনের-ষোল জনকে কামড়েছে। সে আবার দিনের আলোয় বের হয় না, রাতের অন্ধকারে এসে পিছন থেকে কামড় দেয়। পথে একজন স্থানীয় লোকের সাথে দেখা হল, সে পোখরা যাচ্ছে এই কামড়ের চিকিৎসা করাতে। অতএব ভীরু বাঙালি আমরা কাগবেনি যাওয়া পরিত্যাগ করলাম।

    কালকের চলার কষ্টের পর আজ সকলের মনে যেন কেমন ছুটির মেজাজ। মনে হচ্ছে যে আমরা যেন কোন একটা শহরে প্রমোদভ্রমণে এসেছি। দুপুরবেলা কারও হাতে কোনও কাজ নেই। অতএব যে যেমন করে পারে সময় কাটাচ্ছে। পোখরা থেকে হাঁটা শুরু করে আজ সাতদিন পার হল। বেশিরভাগ সকলের গায়ে সেই দিনের জামাকাপড়। এখন ফরাসী সুগন্ধের খুব প্রয়োজন। তাই আজ সুযোগ বুঝে সকলেই স্নান করতে লাগল। এখানে সোলার হিট দিয়ে জল পরম হয়। স্নানের দক্ষিণা জনপ্রতি পাঁচ টাকা। বিচক্ষণ হোটেল দিদির ট্যাঁকে সব সময় বাথরুমের চাবিটা গোঁজা। ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ আইনে আগে তার হাতে নগদ পাঁচ টাকা দাও, তারপর গরম জলে স্নান করতে যাও।

    স্নান-পর্ব সমাধা করেই ডান হাতের কাজ শুরু। আজ রাজকীয় মেনু – ফ্রাইড রাইস আর অমলেট। উদরপূর্তির পর ছেলেদের আবার ব্রিজের আড্ডা আর মহিলাদের চিরন্তন সাংসারিক গুলতানি শুরু হল। সন্ধ্যাবেলাও অলস ভাবে কাটানো হল। ওজন বেড়ে যাবার ভয়ে আমরা কেউ একটা বইও আনিনি। অতএব ফায়ার-প্লেস-এর ধারে প্রচণ্ড ধোঁয়ার মধ্যে বসেই সমবেত সংগীত গাওয়া হল। জনগণের অনুরোধে আমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠা বড় মাসিমাকে পাঠানো হল রান্নাঘরে বাঙালি খিচুড়ি রান্না করতে। তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে আটটার মধ্যে সকলে শুতে চলে গেল। কালকের রাস্তা নাকি সবচেয়ে কঠিন। তা ছাড়া আমরা কাগবেনি থেকে কিলোমিটার চারেক পিছিয়ে আছি।

    ১২ই এপ্রিল, সোমবার

    সকলের মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বা উৎকণ্ঠার জন্যই হোক, আর তাড়াতাড়ি ঘুমোনোর জন্যই হোক, ভোর চারটের আগেই সকলে বিছানা ছেড়ে উঠে তাড়াতাড়ি বাঁধাছাঁদা করতে লাগলো। তখনও মনে হচ্ছে জ্যোৎস্না রাত্রি, আকাশে চাঁদ আর তারা ফুটে আছে। আলুসিদ্ধ দিয়ে প্রাতরাশ সেরে আমরা যখন মুক্তিনাথ উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা। সবে চারিদিক ফর্সা হয়েছে। আমরা ছিলাম শহরের বাইরে, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে প্রকৃত গ্রাম শুরু হল। জোমসোম-এর নাকি আসল মানে ‘নূতন দুর্গ’ কিন্তু আক্ষরিক অর্থে দুর্গ আকারের তেমন কোন বাড়ি চোখে পড়ল না। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এখান থেকে আরও উত্তরে যেতে গেলে ইনার লাইন পারমিট করাতে হত, এখন সেটা উঠে গেছে। একটু এগোতেই এখানকার পুলিশ চৌকিতে ভোরের বিউগল বেজে উঠল। শুনতে বেশ ভালো লাগছিল।

    আমরা কালীগণ্ডকীর ডান তীর ধরে চলেছি। একটু এগিয়েই একটা কাঠের ব্রিজ। সেটা পার হলে ওপারে গ্রামের বিস্তার অনেক বেশি। সেই দিকে না গিয়ে আমরা সরাসরি নদীর বুকে নেমে পড়ি আর নদীর চরের ওপর দিয়ে চলতে থাকি। মাঝে মাঝে সরু সরু জলের ধারা ডিঙিয়ে পেরতে হয়, না হলে নুড়ির ওপর দিয়েই চলা। এতদিনে সকলের পায়ের বাটার ‘পাওয়ার’ জুতোও হার মেনে যায়। পায়ের নীচে পাথরগুলো ক্রমাগত ফুটতে থাকে। মনে হয় জুতোর সোলটা যদি খুব মোটা হতো তাহলে এইরকম নুড়ি পথের ওপর দিয়ে চলতে সুবিধা হত। এত সকালে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। যদিও সকলেই যথাসম্ভব গরম পোশাকের আচ্ছাদনে ঢাকা – মাঙ্কি ক্যাপ, দস্তানা, মাফলার আর দুটো করে সোয়েটার পরে আছে, তবুও ঠাণ্ডা হাওয়া পিছন থেকে হুল ফোটাচ্ছে। রাস্তা একেবারেই সমতল, তাই সবাই মোটামুটি আনন্দেই হাঁটছে। তবে সকলের নজর কিন্তু মাটির দিকে। চারিদিকে ছোট ছোট নুড়ি পাথর ছড়ানো। আগের থেকে আরও সুন্দর আর প্রত্যেকটার রঙ আর আকারের বৈচিত্র্য দেখবার মত। আমাদের মধ্যে অনেকেরই মনোবাসনা যদি পথ চলতে চলতে বাবা মুক্তিনাথের দয়ায় একটা শালগ্রাম শিলা কুড়িয়ে পায়। সারা রাস্তা জনহীন। তার মধ্যে শূন্য নদীর বুকে চলতে চলতে বড় বেশি একাকীত্ব অনুভব করি। সামনে যারা এগিয়ে গেছে তাদের দূর থেকে দেখলে চলন্ত পিপীলিকাশ্রেণী বলে মনে হয় কিন্তু তাদের কিছুতেই ধরা যায় না। এইভাবে নদীর ওপর দিয়ে প্রায় কিলোমিটার তিনেক রাস্তা চলা হল। হঠাৎ জনহীন মরু-প্রান্তরে যেন একটা মরূদ্যান নজরে এলো। রাস্তার ডানদিকে একটা ছোট দোকানঘর। শুনলাম ছাং, অর্থাৎ স্থানীয় মদের দোকান। দোকানের মালিকের বেশভূষা তিব্বতি, আর ভিতর থেকে যে দুজন তথাকথিত মহিলা চা পরিবেশন করতে বের হলেন, তাদের চেহারা দেখে ডাইনি বুড়ি বললে ভুল হবে না। কুলিরা জানালো যে এর পরে ঝারকোটের আগে আর কিছুই পাওয়া যাবে না, তাই শত নোংরা সত্ত্বেও চায়ের বিরতি দেওয়া হল। এই জায়গাটার নাম একেলভাটি – মনে হয় একলা ভাটিখানা থেকে হয়ত এর উৎপত্তি।

    এখান থেকে রাস্তাটা এবার দু ভাগ হয়ে গেল। নদীর চরের ওপর দিয়ে গেছে যে বাঁ-দিকের পথটা সেটা সোজা কাগবেনি যাচ্ছে। অন্য পথটা ডানদিকে খাড়া পাহাড়ের ওপর উঠে গেছে। কিছুদূর গিয়ে কাগবেনি থেকে আসা আর একটা পথও এর সাথে মিশেছে। আমরা যেহেতু কাগবেনি যাব না, তাই আমরা ডান দিকের পথটাই ধরলাম। এটা দিয়ে সোজা মুক্তিনাথ গেলে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা কম হয়। কাগবেনি থেকে রাস্তাটাও বেশি চড়াই। বেশ কিছুটা যাবার পর ওপর থেকে কাগবেনি গ্রামটা আর তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি পরিষ্কার দেখা গেল। কাগবেনি গ্রামটা দুই নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। উত্তর থেকে সোজা নেমে আসছে নারায়ণী নদী আর ডানদিকে মুক্তিনাথ থেকে আসা গণ্ডকীর আর তার একটা শাখা যার নাম জং খোলা এই গ্রামের ঠিক পাশে এসে মিশেছে। প্রচণ্ড হাওয়ার জন্য বোধহয় গ্রামের বাড়িগুলো দুর্গের মত একে অপরের সাথে জোড়া। এটাই হচ্ছে শেষ নেপালি গ্রাম যেখানে আমাদের, অর্থাৎ বিদেশীদের যাবার অধিকার আছে। কাগবেনির পর নদীর উজান ধরে যেতে গেলে নেপাল সরকারের আলাদা অনুমতিপত্র লাগে। তাছাড়া শুনলাম যে এখান থেকে স্থানীয় তিব্বতি কাউকে গাইড করে না নিয়ে গেলে পথে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। এই জায়গা থেকে তিব্বতের সীমান্তে মাস্তাং গ্রাম মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার দূর। আজকের সমস্ত রাস্তাটাই চড়াই তাই যত বেলা বাড়ছে ততই পায়ের গতি মন্থর হচ্ছে।

    একটা ছোটোখাটো ‘পাস’ পেরোনোর পর রাস্তাটা একদম ডানদিকে মোড় নিলো। এখন থেকে এই পথটা পূর্বমুখে সোজা মুক্তিনাথ পর্যন্ত চলে গেছে। জোমসোম-এর পর থেকেই আমরা প্রকৃতির অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। পাহাড়গুলো কেমন যেন রুক্ষ আর নেড়া। এখন থেকে সেই ভৌগোলিক পরিবর্তন আরও প্রকট হয়ে উঠল। হিমালয়ের পাহাড় বললে আমাদের মনের মাঝে যে ছবি ভেসে ওঠে তার সাথে এখানকার কোন কিছুরই বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য নেই। তখন মনে পড়ল এটা আমাদের ছেলেবেলায় পড়া ভূগোল বইয়ে তিব্বতি মালভূমির ছবি। পাহাড়গুলো বেশি উঁচু নয়, কেমন যেন ঢেউখেলানো ক্ষয়ে যাওয়া ভাব। মরুভূমির মতো একদম শুকনো বালি আর কাঁকরে ভরা। আমরা যেপথ দিয়ে চলেছি তার পাশে বহু নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জং খোলার ওপারে যে পাহাড়গুলো আছে সেগুলো কেমন যেন অদ্ভুত দেখতে। পাথরগুলো হলদে আর গেরুয়া রঙের আর তাদের গায়ে বড় বড় গুহার মত অসংখ্য খোপ বা খাঁজ। হাওয়ার বেগে ক্ষয়ে গেছে। যে কোনও লোক অনায়াসে ওর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারবে।


    সকালের খাওয়া আলুসিদ্ধ কখন ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ঝোলা থেকে সঙ্গে আনা নাড়ু, বিস্কুট ইত্যাদি খেতে খেতে আমরা ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। বেলা অনেক হল, আকাশে রোদও যথেষ্ট, তবু প্রচণ্ড হাওয়ার জন্য এখনও হাত থেকে গ্লাভস খোলার উপায় নেই। অন্যদিনের তুলনায় আজ পথ চলতে কম কষ্ট হচ্ছে। শুধু মনে হচ্ছে আর কতক্ষণ পর মুক্তিনাথ পৌঁছব। এরপর রাস্তাটা গিয়ে পড়ল বিরাট এক অধিত্যকায়, যাকে ইংরাজিতে টেবিলল্যান্ড বলে। প্রায় দশ হাজার ফুট উচ্চতায় এইরকম বড় ময়দান অকল্পনীয়। আমাদের কলকাতার গড়ের মাঠের দ্বিগুণ তো হবেই। সারা রাস্তায় কোথাও এতটুকু জল দেখলাম না। খালি মাঝে মাঝে ছোট ছোট কাঁটা ঝোপ এখানে ওখানে ছড়ানো। কাঁটাগুলো প্রায় সরু সরু লোহার পেরেকের মতো শক্ত। এই ফাঁকা জনমানবশূন্য মালভূমিতে দুটো মেষপালক এক পাল ছাগল চরাচ্ছে। এদের ঘর কোথায় কে জানে। এত বড় ধুধু প্রান্তরের মধ্যে যারা সামনে যাচ্ছে তারা প্রায় কিলোমিটার খানেক এগিয়ে গেছে। তবু মনে হয় যেন সামনেই যাচ্ছে, একটু তাড়াতাড়ি পা চালালেই বুঝি ধরা যাবে। রাস্তাটা বেশ পরিষ্কার আর চওড়া। এক এক জায়গায় সমতলভূমি বলে ভ্রম হয়। মাঝে মাঝে ছোট ছোট হিমবাহের ভগ্নাংশ পড়ে। ওগুলোর ওপর ময়লা পড়ে বোঝা যায় না যে নীচে বরফ আছে। সাবধানে পা না দিলেই পিছলে যাবার সম্ভাবনা। চলতে চলতে পথের ধারে একটা বড় পাথরের গায়ে বিরাট হরফে তিব্বতি ভাষায় ছবি আঁকা। শুনলাম ওদের বৌদ্ধ মন্ত্র ‘ওঁম মনি পদ্মে হুম’ লেখা।

    চলেছি তো চলেছি। আমাদের ডানদিকে নীলগিরি আর মাস্তাং পাহাড়গুলো সারাক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চারিদিকের এই ধূসর পরিবেশের মধ্যে সাদা চূড়াগুলো আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। একটা বাঁক ঘোরার পর দূরে একটা গ্রাম দেখা গেল। শুনলাম ওইটাই মুক্তিনাথ। মনে মনে বেশ আনন্দ হল। যতক্ষণই লাগুক না কেন, দেখা গেছে যখন তখন আর চিন্তা কি? ঠিক পৌঁছে যাব। মনটা আত্মগরিমায় ভরে উঠল। এ আর এমন কি কঠিন রাস্তা। নিজেদের বাহবা কুড়োবার জন্য লোকেরা বেশি করে বাড়িয়ে বলে। কিন্তু তখন কি আর জানি যে এর পরেই আসল কষ্টের শুরু? চলছি তো চলছি, পথ আর ফুরোয় না। তার ওপর পেটে প্রচণ্ড খিদের চোটে পথ চলতে আরও কষ্ট হচ্ছে। এক ফারলং এগোই তো ভাবি বুঝি কিলোমিটার খানেক এসে গেছি। কুলিদের জিজ্ঞাসা করি, “আর কত দূর?” ওরাও নিরাশার বাণী শোনায়, “আর বেশি নয়। এখনও ঘণ্টা দুয়েকের পথ”। সবার কাছে যেটুকু বিস্কুট আর সন্দেশ ছিল তা বহু যুগ আগেই শেষ হয়ে গেছে। এবার উপায়? একটাই উপায় তা হল পেটে কিল মেরে এগিয়ে চলা। মনের মধ্যে যতটুকু উৎসাহ আর উদ্দীপনা সঞ্চিত হয়েছিলো, সবই আস্তে আস্তে কমে যেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর একটা বাঁক ঘুরে হঠাৎ দেখি সামনে একটা দোকানঘর। তার সামনে মাটির দাওয়ার ওপর আমাদের দলের সকলে অপেক্ষা করে আছে। ক্লান্তি আর খিদের মিলিত আক্রমণে সকলের মুখের ওপর যে বিরক্তি ফুটে উঠেছে সেটা লক্ষ্য করার মতো। সকলেই মোটামুটি ‘বোল্ড আউট’। তাই আমাদের ক্যাপ্টেন এই অখাদ্য পরিবেশেই মধ্যাহ্নভোজের বিরতি ঘোষণা করেছে।

    শুনলাম আমাদের জন্য ভেতরে রুটি আর আলুভাজা তৈরি হচ্ছে। এরই মাঝে যে যেমন করে পারে বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ লাঠির ওপর ভর দিয়ে একটা ছোটোখাটো ঘুম দিচ্ছে। আরও দুই তিনজনকে দেখলাম স্থানাভাবে টেবিলের ওপরেই পা মুড়ে কাত হয়ে পড়েছে। জায়গাটার নাম শুনলাম খিয়াগার বা থিঙ্গার। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে আসল গ্রামটা অনেক নীচে নদীর পাড়ে। এই দোকানটা পথ চলার রাস্তার ওপরে। গৃহপালিত আর আরামপ্রিয় বঙ্গ-সন্তানদের কষ্ট তো হবেই। অথচ পথ চলতে চলতে যে অগুনতি বিদেশী পর্যটকদের ‘নমস্তে’ আর ‘হ্যালো’ বলতে বলতে যাচ্ছি তাদের মহিলাদের সাথে আমাদের তুলনা করতেও লজ্জা হয়। বিশেষত আমার মতো সাতাত্তর কিলো ওজন তো আর কাউকে বইতে হচ্ছে না। তাই আমাকেই সব চেয়ে বেশি কষ্টও ভোগ করতে হচ্ছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে আমাদের খাবার এলো। যে মহিলা সেটা আমাদের পরিবেশন করল, তাকে ডাইনি বুড়ি বা সুকুমার রায়ের সেই “ঝুরঝুরে পোড়ো ঘরে থুরথুরে বুড়ি”র সঙ্গে তুলনা করা চলে। এখন মাঝে মাঝে ভাবি কি করে ওই পরিবেশে ওই নোংরা হাতের খাবার খাওয়া সম্ভব হয়েছিল কে জানে। বাড়িতে হলে ঠিক বমি উঠে আসতো। এখানে দুই জন সাহেবের সাথে পরিচয় হল। ওরা মানাং থেকে থরং পাস দিয়ে মুক্তিনাথ হয়ে পোখরায় নামছে। আমরা ঠিক যেই পথ দিয়ে উঠেছি, ওরা সেই পথ দিয়েই ফিরবে। শুনলাম এখানকার সেই বিখ্যাত হাওয়ার ভয়ে ওরা রাত বারোটা থেকে চাঁদনী রাতে হাঁটা শুরু করেছে। ওদের দেখে ঈর্ষা হয়। পিঠের রুকস্যাকে যাবতীয় সংসার নিয়ে দিব্বি চলেছে ওরা – এত কষ্টেও আমাদের মত ব্যাজার মুখ নয়। বেশ প্রশান্ত হাসি লেগে আছে মুখে। আমরা এদিকে পদে পদে মা বাবা আর পূর্বপুরুষদের স্মরণ না করে পারছি না।

    আবার চলা শুরু হল। বাঁ দিকের গ্রামটা মনে হয় জনমানবহীন। কেবল বেশিরভাগ বাড়ির ওপর বাঁশের গায়ে অগণিত তিব্বতি কাপড়ের পতাকা উড়ছে। গ্রামের পাশে নদীর চরে অল্প অল্প চাষআবাদের চেষ্টা করা হয়েছে। মাঝে মাঝে রাস্তার দুই পাশে কতগুলো বড় বড় গাছের সাদা রঙের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে যেন। বোঝা গেল এতদিন বরফ চাপা থাকার ফলে ওগুলোর এইরকম শ্রীহীন অবস্থা। আদৌ পাতা জন্মায় কিনা কে জানে! চলেছি তো চলেছি – দূরের দেখা গ্রামটা কিছুতেই আর কাছে আসে না। এ যেন সত্যিই সেই আবোল তাবোলের খুড়োর কল। যতই এগোই, কিছুতেই নাগাল পাওয়া যায় না। এরপর আবার চড়াই শুরু হল। সকলেরই প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে উঠতে, তবে কেউ কেউ সেটা প্রকাশ করছে না। আমি অবশ্য হাঁপাতে হাঁপাতে ‘বাবা-গো মা-গো’ রবে উচ্চস্বরে নিজের পিতা মাতাকে স্মরণ করতে করতে সবার শেষে এই দুই মণ শরীরটাকে টেনে তুলছি। অনেকক্ষণ বাদে একটা অদ্ভুত গ্রামে এলাম। এটাকেই আমরা দূর থেকে মুক্তিনাথ বলে ভুল করেছিলাম। গ্রামটা বেশ বড় – নাম ঝারকোট। উঁচু দুর্গের মত প্রাচীর দেওয়া গ্রামে প্রত্যেকটা বাড়ি একে অপরের সাথে যুক্ত। গ্রামে অনেক লোকজন দেখা গেল, আগের গ্রামটার মত ঘুমন্ত-পুরী নয়। কিন্তু গোটা গ্রামটারই কেমন যেন ভগ্নদশা, সংস্কারের অভাবে জীর্ণ। যেন পাথরের পোড়ো বাড়ির লাইন। গ্রামের রাস্তাগুলোও তেমনি নোংরা আর অপরিচ্ছন্ন।

    ঝারকোট এসেও মুক্তিনাথ দেখা গেল না। শুনলাম সামনের এই পাহাড়টা ডিঙোতে পারলেই ওপারে মুক্তিনাথ। রাগে, দুঃখে, কষ্টে, অবসাদে সে এক তিক্ত অবস্থা। রাস্তার ধারে একটা পাথরের ওপর বসে পড়লাম। মনে হচ্ছে আর এক পা-ও যেতে পারব না। এখানেই একটু শুয়ে পড়ে বিশ্রাম করি। আবার সেই চিরন্তন প্রশ্ন, “আর কত দূর?” উত্তরটাও একই, “এই এসে গেছি”। নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য ওদের ওপর অকারণে রেগে উঠি। শেষে এত কষ্ট ছিল কে জানে। মাঝে মাঝে মাথাটা ঘুরে যায়, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে ওঠে। ইলাস্টিকের কিলোমিটার শেষ হবার আগেই পথের ধারে একটা স্কুল পড়ল। দূর থেকে পড়ুয়াদের জোরে জোরে নামতা পড়ার আওয়াজ শোনা গেল। সামনের বরফের চূড়াগুলো একদম হাতের কাছে। এপাশে আমরা নেড়া পাহাড়ের ওপর উঠছি তো উঠছি। অবশেষে যখন ভাবছি যে এখনই ভেঙে পড়ব, ঠিক তখনই আবিষ্কার করলাম যে আমাদের কষ্টের অবসান হয়েছে। আমরা মুক্তিনাথ পৌঁছে গেছি। তখন বিকেল তিনটে বাজে। সামনে টুরিস্ট লজের কায়দায় ‘মুক্তিনাথ হোটেল’ নামে একটা একতলা হোটেল। এখানেই অবস্থান। একটা বড় ডরমিটারিতে বারোটা খাট পাতা। এবার শুরু হল মন্দিরে যাবার প্রস্তুতি। কোনোরকমে এতদিনের বাসী জামাকাপড় ছেড়ে সবাই দেখলাম নববস্ত্র পরিধানে ব্যস্ত। অবশ্য আমিও তার ব্যতিক্রম নই। ট্রেকিং-এর পোশাক ছেড়ে চিরন্তন বাঙালির সাজপোশাকে সকলকে বেশ লাগছে। মহিলাদের পরনে নতুন তাঁতের শাড়ি আর পুরুষরা পাজামা আর পাঞ্জাবী।

    আধঘণ্টার মধ্যে আবার যাত্রা শুরু। এখান থেকে আসল মন্দির আরও আধঘণ্টার চড়াই পথ। সবাই আবার নতুন উদ্যমে চলতে শুরু করল। মনে মনে পুজো দেবার জন্য একধরনের বিশেষ উৎকণ্ঠা। আজ জোমসোম থেকে ৮৯০০ ফুট উচ্চতায় চলা শুরু করেছিলাম, এখন ১২,৪৬০ ফুটের ওপরে পৌঁছে গেছি। হোটেলের থেকে মন্দিরের অবস্থান আরও কিছুটা উঁচুতে। পথে যেতে যেতে ছোট ছোট হিমবাহের ভগ্নাংশ পড়ে থাকতে দেখলাম। একদম ঝুরো ঝুরো তাজা বরফ। মনে হচ্ছে যেন সিরাপ ঢেলে খেলেই হয়। রাস্তার ধারে একটা বৌদ্ধ চোরটেন পেরিয়ে আরও একটু উঠে একটা ধরমশালা দেখা গেল। একেবারে ভগ্নদশা, সংস্কারের অভাবে জীর্ণ। কয়েকদিন আগেই রামনবমীর সময় এখানে বড় উৎসব আর মেলা হয়ে গেছে। পথের ধারে যাত্রীরা তাদের কিছু চিহ্ন রেখে গেছে। ধরমশালার আশপাশে কোথাও কোন লোক দেখলাম না। এই জায়গাটা একদম একটা বড় পাহাড়ের কোলে। আগেকার মত গাছপালা-বিহীন নয়। কিছু ঝোপঝাড় আর কয়েকটা বড় অশ্বত্থ গাছও চোখে পড়লো। তার মাঝে বৌদ্ধ মন্দিরের আকারে তিন থাক দেওয়া মুক্তিনাথজির কাঠের মন্দির। একেবারে প্যাগোডার মত গঠনশৈলী।

    এই তবে এতদিনের ঈপ্সিত সেই মুক্তিনাথ! মূল মন্দিরে ঢোকার আগে সামনে একটা ছোট পাথর বাঁধানো রাস্তা আছে আর তার দুই ধারে দুটো জলের চৌবাচ্চার মত করা। তারপর প্রাচীর দেওয়া ফটকের মধ্যে ঢুকে একটা ছোট উঠোন বা চত্বর পড়ে। এরপর মন্দিরের মূল গর্ভগৃহ। ভিতরে বৌদ্ধ আকারে মানুষের সমান উঁচু পিতলের নারায়ণ মূর্তিটা সোনার মত চকচক করছে। নারায়ণের দুই পাশে আরও দুটো মূর্তি যাদের লক্ষ্মী আর সরস্বতী বলে পূজারী পরিচয় দিল। তবে ওই দেবতাদের আমরা যে প্রচলিত রূপ কল্পনা করি বা সচরাচর দেখে থাকি, এই মূর্তিগুলো সেরকম দেখতে নয়। এদের গঠনশৈলীতে বৌদ্ধ ছাপ এতটাই প্রবল যে জাতকের কোন দেবদেবী বলে এদের পরিচয় দিলেও আমরা সেটা মেনে নিতাম। তবে এখানেও মতদ্বৈধতা আছে। একজন বললেন যে তিনি নাকি কোন পৌরাণিক বইএ এদের কথা পড়েছেন আর এরা আসলে হচ্ছেন শ্রীদেবী আর ভূদেবী। নারায়ণের সামনে ছোটখাটো গরুড়ের বিগ্রহটা অবশ্য চিনিয়ে দিতে হয় না। মন্দিরে পুজো দেবার বিশেষ কোন নিয়ম নেই। তাই যে যেমন করে পারে পুজো দিচ্ছে। পূজারী আমাদের কপাল কিছুটা চাল আর সিঁদুর লেপে দিলেন কিন্তু ওঁর পাশে মন্দিরের সেবিকা যে তিব্বতি ভিক্ষুণী দাঁড়িয়ে ছিল, সে আমাদের নিশ্চিন্তে প্রণামও করতে দেয় না। তার দাবী আমরা যেন দানপত্রে কোন টাকা না দিই তাহলে ওরা কিছুই পাবেনা। ওর হাতেই সব টাকা দিতে হবে।

    এতদিনের অভিলাষ সফল হওয়ায় এক একজনের এক একরকম বহিঃপ্রকাশ দেখলাম। কেউ কেউ ঠাকুরের গায়ে হাত রেখে আনন্দে কেঁদে যাচ্ছে, কেউ কেউ কলকাতা থেকে সযত্নে আনা পূজার জিনিস মন দিয়ে সাজাচ্ছে, কেউ আবার মনের কোন বিশেষ অভিলাষ ব্যক্ত করে সাষ্টাঙ্গে ঠাকুরকে প্রণাম করে যাচ্ছে। বাইরে এসে দেখি ফটোগ্রাফাররা কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ভালো ছবি উঠবে তাই নিয়ে খুব চিন্তিত। এর মধ্যে কয়েকজন সন্ধ্যা নামার আগেই হোটেলে ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমার এই পাপী মনের গতি কিন্তু বিচিত্র। এতদিনের কষ্ট যে সার্থক হয়েছে কই মন্দিরে এসে সেটা তো মনে হল না। হয়ত কঠিন পথ পেরিয়ে আসাটাই প্রধান লক্ষ্য ছিল বলে এরকম মনে হচ্ছিল। বাকি সকলের উচ্ছ্বাসের নানান রকম অভিব্যক্তির মাঝে আমার মনটা বড়ই দমে গেল। আশ্চর্যের বিষয় হলেও মনে মনে এর একটা ব্যাখ্যা খাড়া করতে চেষ্টা করলাম। এতদিনের এই এগিয়ে চলার আনন্দ কে যেন হঠাৎ এক ফুঁ-তে নিবিয়ে দিল। মন্দিরটা যে নিতান্ত মামুলি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সত্যি বলতে কি বেশ নিরাশাজনকই বটে। এইরকম মানসিকতা নিয়েই বোধহয় কবি ওয়ার্ডসওয়ারথ তার ‘ইয়ারও ভিসিটেড’ কবিতাটা রচনা করেছিলেন। একটা কথা বার বার মনের মধ্যে আসতে লাগল – এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেল? এবার তো তাহলে ঘরে ফেরার পালা।


    পড়ন্ত বিকেলের আলোয় মন্দিরের আশেপাশে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মন্দিরের বাইরে যে পাথর বাঁধানো উঠান তার একপাশে ঝরনার জল ১০৮ ধারায় বিভিন্ন আকারের জন্তু জানোয়ারের মুখের মত দেখতে নলের মধ্যে দিয়ে এসে পড়ছে। এই জলের ধারা আবার নীচে গিয়ে গণ্ডকী নদীর সাথে মিলেছে। আমরা এরপর আশে পাশে অন্যান্য মন্দিরগুলো দেখতে গেলাম। জায়গাটা খুব নিস্তব্ধ আর মানালির হিড়িম্বা দেবীর মন্দিরের কথা মনে করিয়ে দেয়। একটু উঠে বাঁ-দিকে আরও একটা গুহা। ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার তাই দেশলাই জ্বেলে ঢুকতে হয়। এককালে হয়ত কোন বৌদ্ধ গুম্ফা ছিল। ভিতরে নরসিংহদেবের প্রকাণ্ড মূর্তি। তার পাশে কালী বলে যাকে দেখালো, তার সাথে আমাদের দেশের মা কালীর চেহারার কোনরকম সাদৃশ্য নেই। এই জায়গায় বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্মের এমন সংমিশ্রণ ঘটেছে যে আলাদা করে কোন কিছু চিহ্নিত করার কোন উপায় নেই। এর পর আরও একটা বিখ্যাত মন্দির দেখতে গেলাম। জ্বওলা মাই-এর মন্দিরটা পাহাড়ের গায়ে একটা বিরাট গুহার মধ্যে অবস্থিত। সামনেটা পাথর দিয়ে গাঁথা। তার মধ্যে অন্ধকারে দেখি দেওয়ালের গায়ে বিরাট এক বুদ্ধ মূর্তি। ডানদিকে পাথরের গায়ে বড় বড় তিব্বতি তংখা ঝুলছে। মূর্তির নীচে একটা বড় গর্ত। সেখান দিয়ে কলকল শব্দে জল বয়ে যাচ্ছে। জ্বালামুখীর মতো এখানেও দেশলাই জ্বাললে আগুন জ্বলে ওঠে। মাটির নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জল অনেক দূর পর্যন্ত গেছে তার শব্দ ওপর থেকেই শোনা যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখায় ওখানে যে প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য আগুন জ্বলে তা আমরা সকলেই জানি, তবুও পূজারী যখন সরল চিত্তে আর ভক্তি ভরে আমাদের ওটা দেখাতে লাগলো তখন মনে হল কিছুক্ষণের জন্য ওটা দেবতার মহিমা বলে মেনে নিলে ক্ষতি কি?

    ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে আর সাথে সাথে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আসার সময় পুজো দিতে যাবার সুপ্ত উত্তেজনায় কেউ তেমন বেশি গরম জামা নেয়নি। এখন সবাই রীতিমত কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত পদক্ষেপে হোটেলের দিকে নামতে লাগলাম। প্রায় সাতটা বাজে তবে তখনও পুরো অন্ধকার নামেনি। আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। যাবার সময় পিছনে ছিল বলে ততোটা লক্ষ্য করিনি, এখন সামনে একদিকে অন্নপূর্ণা-১ আর অন্যদিকে ধবলগিরির বিশাল তুষারচূড়া দেখে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে গেল। মনের মধ্যে একটা অনাবিল, অপার্থিব আনন্দ অনুভব করলাম। সন্ধ্যার অন্ধকারে সাদা বরফের ওপর অদ্ভুত সব রঙের আভা – নীল, বেগুনি, হাল্কা গোলাপি। আহা ঠিক এই দৃশ্যটা যদি তুলে নিয়ে গিয়ে কলকাতার সকলকে দেখাতে পারতাম! এই দৃশ্য বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই। এ যেন শুধু যে যার মনে অনুভব করার বস্তু।

    হোটেলে ফিরে আধ্যাত্মিক জগৎ থেকে একেবারে পার্থিব পরিবেশে এসে পড়ে মনে হল খিদে কাকে বলে। সারা রাস্তায় অনেকগুলো হোটেলেই তো থেকে এলাম, কিন্তু এটার মত চরম অব্যবস্থা কোথাও নেই। অতএব পেটে কিল মেরে বসে থাকা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পরে কফি এল, তারও অনেক পরে পোড়া অমলেট। সব জায়গায় বিচক্ষণ হোটেল ‘দিদি’ থাকে, এখানে তিনি অনুপস্থিত। তিনি পিত্রালয় গমন করেছেন আর তাই ‘দাজু’ চোখে অন্ধকার দেখছেন। সকলেই প্রচণ্ড ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত। সবাই চাইছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেয়ে দেয়ে লেপের ভিতর অবসন্ন শরীরগুলো ঢোকাতে পারে। কিন্তু বিকেল চারটেয় অর্ডার দেওয়া খাবার অবশেষে এলো রাত নটায়। ততক্ষণে সকলে ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। খাবার মেনু তিবেতিয়ান ব্রেড আর বাঁধাকপির তরকারি। খাবার দেখে চোখের জল বাধা মানে না। ব্রেডগুলো রীতিমত কাঁচা আর তরকারিকে তার স্বনামে ডাকলে তার অপমান করা হয়। সেটা খেতে গরুও অস্বীকার করবে। কোনোরকমে কিছুটা গলাধঃকরণ করে সবাই সোজা যে যার স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকলাম। আজকে আমরা বারো কিলোমিটার হাঁটার রেকর্ড করেছি।

    ১৩ই এপ্রিল, মঙ্গলবার

    সকালবেলা সবাই যখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে মুক্তিনাথ ছেড়ে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই একটা দুঃসংবাদ শোনা গেল। খুব ভোরে উঠে আমাদের দলের একজন একটু দূরে ঝরনার জলের পাইপের কলের কাছে যেতে গিয়ে খুব জোর আছাড় খেয়েছে। সকলেই তাকে নিয়ে যখন বেশ হাসাহাসি করছে তখন শোনা গেল যে আরো দুজনের সেই একই দশা হয়েছে। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। রাত্রে চারিদিকে সরের মত পাতলা বরফ পড়েছে আর তার ওপরে সবাই পা পিছলে আছাড় খাচ্ছে। সাতটার সময় মুক্তিনাথ থেকে রওনা দেওয়ার আগে দলনেতা প্রদীপদা বাইরের টেবিলের ওপর পড়া বরফে আঙুল দিয়ে ‘জয় বাবা মুক্তিনাথ’ লিখে ফরওয়ার্ড মার্চ ঘোষণা করল।


    সকালে সবাই সতেজ, তার ওপর উতরাই রাস্তা। আমরা সবাই গড়গড় করে নেমে আধঘণ্টার মধ্যে ঝারকোট পৌঁছে গেলাম। একটা মোটামুটি পরিষ্কার গোছের হোটেল দেখে ব্রেকফাস্ট খাবার ব্যবস্থা হল। মেনু – রুটি, আলুভাজা, ডিমসিদ্ধ আর চা। বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ আবার নামা শুরু। পথ যদিও পুরোই উতরাই কিন্তু বেশিরভাগ সকলেরই হাঁটুর জন্য নামতে কষ্ট হচ্ছে। নি-ক্যাপ পরেও কয়েকজন রীতিমতো খুঁড়িয়ে চলছে। কিছুদূর নামার পর তুকুচের সেই বিখ্যাত হাওয়া শুরু হল। আমি আপনমনে নেমে চলেছি। যে মুহূর্তে আমরা নদীর চরায় নামলাম, ঠিক তখনই হাওয়াটা প্রায় ঘূর্ণিঝড়ের রূপ ধারণ করল। এবারে হাওয়া আসছে সোজা সামনের দিক থেকে। মাঝে মাঝে দুচার সেকেন্ড স্থির থেকে তারপর হঠাৎ এমন করে এক একটা ঝাপটা দিচ্ছে যে পিছনে উলটে পড়ে যাওয়ার জোগাড়। তার ওপর হাওয়ার দাপটে ছোট ছোট পাথর কুঁচি আর বালি উড়ে এসে সারা গায়ে আর মুখে যেন হুল ফোটাচ্ছে। কথা ছিল যে যাবার সময় অনাবশ্যক ভার বয়ে লাভ নেই তাই ফেরার পথে যে যত ইচ্ছা সুন্দর সুন্দর পাথর কুড়াবো। কিন্তু এই হাওয়া সকলকে এমন কুপোকাত করে দিল যে সকলের ইচ্ছা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। মোটা হবার জন্য আমার তো বেশ সুবিধা, হাওয়ায় উড়ে যাবার ভয় নেই। কিন্তু সঙ্গে যাচ্ছেন ডলিদি। তিনি রোগা তো বটেই, একদম যাকে বলে তালপাতার সেপাই। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় তিনি সত্যিই উড়ে অন্যদিকে চলে যেতে লাগলেন। যতই সামনের দিকে এগোতে যান, হাওয়ার বেগে ততই বাঁ দিকে চলে যান। শেষ পর্যন্ত দাদা ওঁর সহায় হয়ে ওঁর হাত ধরে টেনে আবার সামনের দিকে ঠেলা মেরে এগিয়ে নিয়ে চললেন।

    জোমসোম গ্রামে ঢুকে মনে হয় আর পা যেন এগোচ্ছে না। প্রায় দেড়টা বাজে। আবার সেই এয়ারপোর্টের সামনে ‘অলকা হোটেলে’ ঢুকলাম। মনে হল ধড়ে প্রাণ এলো যেন। খাবারের অর্ডার দিয়ে সকলে তাদের কুড়িয়ে আনা পাথরের তুলনা করতে লাগলো। আমি একটা বিরাট পাথর কুড়িয়েছি, সেটা শালগ্রাম শিলা না হোক কিলোগ্রাম শিলা তো বটেই। আর কিছু কাজে না লাগুক, ভাল পেপার-ওয়েট হবেই। একে একে দলের সকলে এসে গেল, তার মধ্যে কয়েকজন অর্ধমৃত অবস্থায়। বাইরে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর তার সাথে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। ঘন মেঘে সামনের নীলগিরি পাহাড় সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে গেছে। আজ আরও এগোনো হবে নাকি এখানেই অবস্থান করা হবে সেই নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক হল। প্রচুর মতবিরোধ দেখা দিল। অনেকক্ষণ অনিশ্চয়তায় ভোগার পর দলনেতা হুকুম জারি করলেন যে এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় আজ আর এগোনো হবে না। অতএব আজকের মত এখানেই বিশ্রাম। লাঞ্চ খেয়ে আরাম করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। বাঙালির আড্ডার যেগুলো মূল মন্ত্র – গান, গল্প, তাস, পরচর্চা – সবই চলতে লাগল পুরোদমে।

    সন্ধ্যাবেলা রান্নাঘরের উনুনের ধারে বসে হোটেলের ‘দিদি’ আর ‘দাজু’র সঙ্গে অনেক গল্প হল। বাঙালি আচার-ব্যবহার আর খাওয়াদাওয়া সম্বন্ধে ওদের অসীম কৌতূহল তাই নানারকম প্রশ্ন করতে লাগল। পণপ্রথা ওদের কাছে অপরাধের বস্তু। যদিও ওরা নিজেরা পছন্দ করে বিয়ে করেছে, তবুও ওরা খুব গর্বিত যে শ্বশুরের কাছ থেকে এক কানাকড়িও নেয়নি। ভদ্রলোক পেশায় কনট্রাকটর, ঠিকাদারি ব্যবসায় প্রায়ই পোখরা যাতায়াত করেন। আমাদের সাতদিনের রাস্তাটা ওরা তিন দিনে কাবার করে। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় দুজন কাঠমাণ্ডুর বোর্ডিং স্কুলে পড়ছে। ‘দিদি’ যেভাবে হোটেল পরিচালনা করে তা দেখবার মত। কোথাও এতটুকু বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ল না। দরকার হলে নিজেই লেগে পড়েন আমাদের এঁটো বাসন ধুতে। সুদূর এই নেপালি গ্রামে বিদেশের মতো ‘ডিগনিটি অফ লেবার’-এর প্রকাশ দেখে বড়ই ভাল লাগল। দিদি আমাদের তিব্বতি মোমো আর কোথে চাখালো। খেতে আমাদের দেশের ভাপা পিঠের মতই, খালি ভিতরে মাংস আর সবজির পুর দেওয়া। খুবই মুখরোচক খাবার। রাত্রে আমরা সকলেই বেশ তাড়াতাড়ি শুতে গেলাম। আজ আর কাউকে রিলাক্সিল দিয়ে পদসেবা করতে দেখলাম না। সকলের পায়ের মাশুলগুলো বোধ হয় অনেক সহজ হয়ে গেছে।

    ১৪ই এপ্রিল, বুধবার

    ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে উঠে আবার রুটিন মাফিক বাঁধাছাঁদা, ব্রেকফাস্ট খাওয়া, আর তারপর তাড়াহুড়ো করে আবার পথে নামা। তখন সকাল সাড়ে ছটা বাজে। রীতিমত গদাইলস্করি চালে বেড়াতে বেড়াতে নদীর পথ ধরে খুব সহজেই দু ঘণ্টার মধ্যে মারফা পৌঁছে গেলাম। এখানকার হোটেলের ব্যবস্থা খুবই ভালো। হোটেলের সামনের বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে দেখলাম যে একটা প্লেন পোখরা থেকে জোমসোমের দিকে যাচ্ছে। বেশ কয়েকবার চক্কর খেয়ে প্লেনটা আবার ফেরত চলে গেল। প্রচণ্ড হাওয়ার জন্য মাটিতে নামতে পারল না। আজ বছরের শেষ দিন। বাঙালিদের মতে চৈত্র সংক্রান্তি। কিন্তু নেপালিদের আজই নববর্ষ। সকালবেলা জোমসোমে দেখেছিলাম হোটেল দিদি খুব ভোরে উঠে সমস্ত চৌকাঠগুলো পরিষ্কার করে গেরুয়া রঙের মাটি দিয়ে নিকোচ্ছে। রাস্তায় যেতে যেতে খচ্চরগুলো ওদের নতুন রঙিন ফিতে আর রংচঙে ঝালরে জানিয়ে দিতে লাগল যে আজ একটা বিশেষ দিন।

    পথ চলতে চলতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তুকুচে এসে গেল। যাবার সময়ের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা কেউ ভোলেনি। পাছে আবার নদীর জলে নামতে হয়, তাই আমরা এবার গ্রামের ভিতরে একটু অন্য রাস্তা দিয়ে আবার সেই বিস্তীর্ণ নদীর বুকে পড়লাম। আজ হাওয়া খুব কম, প্রায় নেই বললেই হয়। নদীর বুকে চলতে চলতে আরও একবার পাথর কুড়ানো আর শালগ্রাম শিলা খোঁজা শুরু হল। ডানদিকে সোকুং আর লারজুং গ্রাম ফেলে রেখে আমরা চলেছি তো চলেছি। পথ ফুরাচ্ছে না। বেলা যত বাড়ছে সকলের পায়ের গতিও তত মন্থর হয়ে পড়ছে। ইঞ্জিনে কয়লার প্রয়োজন। সকালের আনা আলুসিদ্ধ বহুক্ষণ আগেই ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এইভাবে একপ্রকার নির্জীব হয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেলা আড়াইতে নাগাদ আমরা কালোপানি পৌঁছলাম। আবার সেই একই ‘সি-উ লজ’এ আজকের মত বিশ্রাম। জোমসোম থেকে কালোপানি সাড়ে ষোল কিলোমিটার রাস্তা। সোজা নদীর চরার ওপর দিয়ে আসার জন্য আমাদের অবশ্য দুই তিন কিলোমিটার রাস্তা কম হাঁটতে হয়েছে।

    আজ সবাই দেখছি মোটামুটি সুস্থ। এতদিনের দেখা নেড়া আর রুক্ষ পাহাড়গুলো আবার যেন সজীবতা ফিরে পেয়েছে। সামনে সবুজ পাইন আর চির গাছের বন, তার ঠিক পিছনেই সাদা বরফের পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে সকলেই বেশ খুশি। এখন রোদের বিশেষ তেজ নেই। যদিও আগের চেয়ে ঠাণ্ডা কম, তবুও বেশ শীত করছে। অলস দুপুরে কারও কোন কাজ নেই তাই আমরা খাওয়া দাওয়ার পর গ্রাম পরিদর্শনে বেরলাম। রাস্তায় মুরগির ছড়াছড়ি। স্থানীয় ভাষায় কুকরা। গ্রামের মাঝখানে একটা পাথর বাঁধানো কল আছে। সেখানে কাপড় কাচতে বা কলসিতে জল ভরতে এসে গ্রামের মেয়ে বউরা গল্পে মশগুল। আমাদের দেখে কি সব বলাবলি করছে আর এ ওর গায়ে হেসে হেসে ঢলে পড়ছে। মেয়েদের হাসির কারণ ব্যাখা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তো বলেই গেছেন যে মেয়েরা কেন হাসে তা “দেবা ন জানন্তি, কুত মনুষ্যা”। কারণ ব্যতীত কাজ হয় না, জগতে এ নিয়ম কেবল পুরুষের পক্ষেই খাটে। এদের দেখে বার বার সেই কথাই মনে হচ্ছিল। অন্য জায়গায় দেখলাম রাস্তার ধারে বসে মেয়েরা ভেড়ার লোম থেকে উল বানাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ছোট ছোট তাঁতে বসে সেই উল থেকে আসন আর কম্বল বুনছে।

    সন্ধ্যাবেলাও কারো কিছু করার নেই। রান্নাঘরে ‘দিদি’র সাথে ভাব জমিয়ে ডিম আর আলু দিয়ে তরকারি রান্না করলাম। বাঙালি খানা পেয়ে সবাই খুব খুশি। আপনি রাঁধুনি, আপনি বাড়ুনি, আপনি খেয়ে করে ধন্নি ধন্নি। তারপর রাত্রে উনুনের ওপর যেখানে সার দিয়ে শিকে করে মোষের মাংস ঝুলছে, তার পাশেই নির্বিবাদে আমাদের সব ভিজে জামাকাপড় শুকাতে দিয়ে, কাঠের খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যে যার ঘরে ঘু্মোতে গেলাম। বাড়ি ফেরার আরও একটা দিন এগিয়ে এল।

    ১৫ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার

    আজ বাংলা নববর্ষ। বাড়িতে থাকলে পয়লা বৈশাখে কত অনুষ্ঠান আর খাওয়াদাওয়া হত। কালোপানিতে ভোরবেলা উঠে যার কাছে যা খাবার অবশিষ্ট ছিল, তাই দিয়েই মিষ্টিমুখ করে সবাই নতুন বছর শুরু করল। তারপর যথারীতি আলুভাজা, হালুয়া, আর তিবেতিয়ান ব্রেড খেয়ে সাড়ে ছটার মধ্যে আবার পথ চলা শুরু হল। একঘণ্টা পরে লেতের সেই ব্রিজের ধারে হোটেলে পৌঁছে কফি পানের বিরতি। ব্রিজ পেরিয়ে একটা বড় ধসের জায়গা ধীরে ধীরে পেরিয়ে আমরা আরও নেমে চললাম। কিছুক্ষণ পর ঘাসায় পৌঁছে গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে সেই একই হোটেলে গিয়ে শুনলাম যে এখান থেকে ভাত না খেয়ে গেলে রাস্তায় আর কোথাও খাবার পাওয়া যাবে না। অতএব রাই শাকের অখাদ্য তরকারি দিয়ে কয়েক গ্রাস ভাত গিলে আমরা আবার তাড়াতাড়ি রওনা দিলাম। তখন বেলা সাড়ে এগারোটা। কিছুটা পথ সিঁড়ি দিয়ে নেমে তারপর ব্রিজ পেরিয়ে কালীগণ্ডকী নদীর বাঁ ধার দিয়ে রাস্তা। সাধারণ পাহাড়ি রাস্তা – কিছুটা চড়াই আবার কিছুটা উতরাই। আজ আমাদের তাতোপানি পৌঁছাবার কথা। সকলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পা চালাচ্ছে। কিছুক্ষণ ধরে একটা গোটা পাহাড় উতরাই নেমে পথ চলল একদম নদীর বুকের ওপর দিয়ে। তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে সামনের পাহাড়টা আবার চড়াই ওঠা। এ যেন সেই সাপ লুডো খেলা – কষ্ট করে ওপরে ওঠার পর হঠাৎ সাপের মুখে পড়ে সোজা পাতালে ফেরত। আজ আকাশ মোটামুটি মেঘলা তাই পথ চলতে সুবিধা হচ্ছে। যাবার সময় এই রাস্তায় প্রচণ্ড রোদে সবাই ভাজা হয়েছিলাম। সকলেই দেখি বেশ সহজভাবে উঠে যাচ্ছে, কিন্তু কাল হয়েছে আমার। একে তো এই দু মণ ওজনের শরীরটাকে টেনে তোলাই কষ্টকর, তার ওপর হঠাৎ করে বি-কোলাই এর আক্রমণ। পেটের যন্ত্রণায় কাবু হয়ে পথ চলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। দু পা করে চলি আর যন্ত্রণায় পাথরের ওপর বসে পড়ি। সঙ্গে একমাত্র গ্লুকোজ ছাড়া অন্য কোন ওষুধ নেই।


    একটু পরে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হল। রূপসে ঝোরা পেরিয়ে আমরা যখন ভিজতে ভিজতে আপার দানায় পৌঁছলাম তখন বিকেল তিনটে বেজে গেছে। বৃষ্টি ধরার অপেক্ষায় সবাই একটা বাড়ির বারান্দায় বসে রইল। আজ আরও এগোনো হবে কিনা সেই নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ আলোচনা হল। কেউ বলে পাহাড়ি বৃষ্টি একটু পরেই থেমে যাবে, আবার কেউ বলে কোন কিছুই বলা যায় না। পথে নেমে আবার যদি বৃষ্টি আসে তা হলে সকলেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজবো। এইরকম অনিশ্চয়তার মধ্যে আবার পথ চলা শুরু হল। লোয়ার দানায় এলাম বিকেল চারটেয়। মনে হচ্ছে আর এক পাও চলতে পারব না। এখান থেকে তাতোপানি আরও আড়াই ঘণ্টার পথ। অনেক তর্ক বিতর্কর পর শেষ পর্যন্ত এখানেই থাকা ঠিক হল। দানা বড় গ্রাম হলেও ঠেকায় না পড়লে খুব বেশি টুরিস্ট এখানে থাকে না। তাই অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে থাকার ভাল হোটেল নেই। আমরা যে হোটেলে উঠলাম তার নাম ‘হোটেল কাবিন’। এক স্কুল-মাষ্টারের হোটেল। ভদ্রলোক যথেষ্ট অমায়িক আর অথিতিবৎসল। হোটেলে থাকার জায়গাটা বেশ অদ্ভুত। দোতলায় শোবার ঘরে যেতে হলে পাঁচিল ডিঙিয়ে ছাদের স্লেট পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে তারপর জানালা গলে ঢুকতে হয়। সেটা করতে গেলে আমাদের প্রত্যেকের একটা করে লেজের প্রয়োজন। বাড়ির অন্য পাশে অবশ্য একটা সহজ রাস্তা আছে – একটা খাড়া মই। সেটা বেয়ে ওপরে ওঠা যাবে একমাত্র যদি ষাঁড়ে তাড়া করে তবেই। এছাড়া নামার সময় সত্যি জিমন্যাস্টিকস জানতে হবে। অতএব আমাদের মত অসুস্থ লোকেদের ভাগ্যে যে ঘরটা পড়ল সেটা বাড়ির বাইরে আস্তাবলের ওপর দরজা জানালা বিহীন একটা গুদামঘর। তার মধ্যে কত লক্ষ আরশোলা আর ইঁদুরের বাসা কে জানে। অগত্যা সেখান থেকে নেমে একটু এগিয়ে আমরা অন্য একটা বাড়িতে আশ্রয় নিলাম।

    ‘দানা লজ’ নামে এই বাড়িটার ব্যবস্থা অনেক ভালো। বাড়ির পিছনে বিরাট বড় লেবুর বাগান। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে চাটাই দিয়ে আড়াল করা দুটো ঘরে আমরা নয়জন মহিলা স্থিতু হলাম। এখানে দাদারা সব বেরলেন ভুজা বা গোল-ফুলির খোঁজে। সারা গ্রাম ঘুরে অনেক খুঁজে যে অমূল্য সম্পদ জোগাড় করে আনলেন তা আর কিছুই নয়, আমাদের দিশি মুড়ি। কিন্তু সেটা পেয়েই সবাই বেজায় খুশি। এখানে একটা নির্দিষ্ট মাপে মুড়ি বিক্রি হয়। নাম মানা। এক মানার দাম দেড় টাকা। হোটেলের দাজুর চালে অনেক কুমড়ো ছিল যেগুলো দেখি সাহেবরা বেশ পাম্পকিন সূপ করে খায়। সেই কুমড়ো কেটে দিশি প্রথায় দারুণ তরকারি রান্না হল। রাত্রে ডিনারে সেই তরকারি আর মুড়ি খেয়ে সবাই গ্র্যান্ড হোটেলে ছ-দফা খাবারের চেয়েও বেশি তৃপ্ত পেল। রাত্রে শোবার সময় আমাদের তিন ‘বাহাদুর’ কুলি নীচে পাহারায় রইল।

    ১৬ই এপ্রিল, শুক্রবার

    সকালে আলস্য কাটিয়ে উঠতে একটু বেলা হল। ততক্ষণে অনেকেই জামাকাপড় পরে তৈরি। এখানে বেশ গরম। কলকাতার শীতের সকালের মত আবহাওয়া। আরাম করে স্নান সেরে, সেই চিরাচরিত ডিম আর আলু সিদ্ধ খেয়ে আমরা আবার দানা থেকে রওনা দিলাম পৌনে সাতটা নাগাদ। সকালবেলা সবাই সতেজ, তাই দেড় ঘণ্টার মধ্যেই তাতোপানি পৌঁছে গেলাম। এখানে একটু কফি খেয়ে আর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নটা নাগাদ আবার চলা শুরু হল। দুটো ব্রিজ পেরোনোর পর সেই সাঙ্ঘাতিক সিঁড়ির চড়াই শুরু হল। বেলা বেশি হয়নি তবুও রোদের তেজ বেশ প্রখর। গরমে গলদঘর্ম হয়ে সবার জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে। সকলেই যে যার নিজেদের লোকেদের সঙ্গে সুবিধামত এগিয়ে গেছে। দলের শেষ দুজন রয়েছে অনেক পিছনে। মাঝখানে আমি বেচারা চলেছি একদম একা। মাঝে মাঝে গ্লুকোজ খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করছি, তারপরেই দু চারটে ধাপ উঠেই পাথরের ওপর বসে পড়ছি। কান্নায় দু চোখ বেয়ে যে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে তা হাত দিয়ে মোছার শক্তিও নেই। মাঝে মাঝে যখন মনের জোর কমে যাচ্ছে তখন মনে হচ্ছে যে আর উঠতে পারব না, রাস্তার ধারে শুয়ে পড়ে ঘুম দিই। পথ আর ফুরায় না। চারিদিক একদম নিস্তব্ধ, শুধু একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সঙ্গ দিচ্ছে। বেলা সাড়ে এগারটায় চড়াইয়ের প্রথম পর্ব শেষ হল। ততক্ষণে কুলিরাও এসে গিয়ে মানসিক শক্তি যোগাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় যেখানে সিঁড়ি শেষ সেখানে মরুভূমিতে মরূদ্যানের মতো একটা চায়ের দোকান। এখানে বেশ খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবার পথে নামতে হল। কিছুটা সমতল রাস্তায় গিয়ে এবার দ্বিতীয় দফার চড়াই শুরু। বেলা বারোটা বাজতে না বাজতেই কোথা থেকে একরাশ কালো মেঘ এসে আকাশটা ধীরে ধীরে ঢাকতে শুরু করল। ঘারা গ্রামে পৌঁছতে বেলা একটা বাজল।


    পথের সেই বড় ধসটা পার হয়ে আবার উঠছি তো উঠছি। যাবার পথে উত্তেজনা বশে এতখানি নেমেছিলাম বলে মনে পড়ছে না। শিখা গ্রামে পৌঁছনোর কিছুটা আগে বৃষ্টি শুরু হল। ভিজতে ভিজতে ‘শান্তি লজ’ নামে হোটেলে পৌঁছানোর প্রায় সাথে সাথে প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি আর তার সাথে শিল পড়া শুরু হল। আধঘণ্টা ধরে একটানা শিল পড়ে উঠোন যখন প্রায় সাদা, তখন বৃষ্টির তোড় একটু কমল আর আস্তে আস্তে আকাশটাও পরিষ্কার হল। খানিক পরে দেখি পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে রোদ উঁকি মারছে আর আমাদের দেখে হেসে বলছে, “কিরে আজ তোদের কেমন জব্দ করলাম?”

    এই হোটেলের মালিক যারা তারা প্রায় ওবেরয় গ্রুপের সঙ্গে তুলনার যোগ্য কারণ সারা রাস্তায় বেশিরভাগ যত হোটেলে আমরা থেকেছি তার প্রত্যেকটার পরিচালনার ভার এই একই পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক একটা ভাই বোন এক একটা গ্রামে হোটেলের ভার নিয়ে ব্যবসা করছে। এদের প্রত্যেকটা ভাইবোনের ব্যাবহার অতি অমায়িক, কেবলমাত্র এখানেই তার ব্যতিক্রম দেখছি। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠরা একটু আদুরে আর আহ্লাদী হয়েই থাকে, তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এখানে ওদের যে ছোট বোন কল্পনা থাকে তার মুখ ঝামটার চোটে সকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। মেয়েটার সাজপোশাক আর চালচলন দেখে বনফুলের সেই কবিতার বিখ্যাত লাইনটা মনে পড়ছিল – “এ যে বাঙ্গালির (এক্ষেত্রে অবশ্য নেপালির) মেয়ে, নব কালচার পেয়ে চপ ও শুক্তো একসঙ্গে...”।

    ভাত খেয়ে উঠে বাইরে ঘূর্ণিঝড়ের মতো হাওয়ায় সকলে কাঁপতে লাগল। এখন একমাত্র কাজ কম্বলের তলায় ঘুম কিন্তু সেটাও হবার উপায় নেই। একটা বড় ঘরে বারোটা বিছানা পাতা আর তারই মধ্যে আমাদের ষোল জনের সম্পূর্ণ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যাবেলা তাস খেলা শুরু হল। তারপর যে যার বিছানায় বসে বসে আলুর দম আর রুটি খেয়ে ঘুম। আজ আমরা মাত্র আট কিলোমিটার হেঁটেছি কিন্তু সারাক্ষণ চড়াই ভাঙার ফলে সকলেই বেশ পরিশ্রান্ত।

    ১৭ই এপ্রিল, শনিবার

    সকলে যথারীতি ভোর চারটেয় উঠে তৈরি হয়েছে। তারপর সোয়া ছটার মধ্যে আলু আর ডিম সিদ্ধ আর কফি খেয়ে ‘শান্তি লজ’ থেকে বিদায়। একটু পর থেকেই বনের পথ শুরু হল। আমরা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছি। আজকের চড়াই অবশ্য কালকের মত অভদ্র নয়। গতকাল শিলাবৃষ্টি হবার পর অনেক পাহাড়ের মাথায় আবার নতুন করে বরফ পড়েছে। রডোডেনড্রন বনেরও আর সেই সৌন্দর্য নেই। অনেক ফুল বৃষ্টিতে নীচে কাদা মাখা রাস্তায় ঝরে পড়েছে। চারিদিক একেবারে নিস্তব্ধ। তার মধ্যে দূরে কয়েকজন নেপালি তাদের নিজেদের সুরে গান গাইতে গাইতে কাঠ কাটছে। ভাষা না বোঝা গেলেও সেই সুরের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত মেঠো গ্রাম্য ভাব ফুটে উঠেছে তা কেবল আমাদের দেশের লোকগীতিতেই নয়, সুদূর আমেরিকায় পল রবসনের গানেও তার প্রতিফলন শোনা যায়।

    বনের মধ্যে চড়াই শেষ করে আমরা দেউরালি পৌঁছে মধ্যাহ্নভোজের বিরতি নিলাম। অখাদ্য ভাত, ডাল আর রাই শাকের তরকারি কোনোরকমে খেয়ে আমরা সাড়ে বারোটায় ওখান থেকে আবার রওনা দিলাম। আকাশ একেবারে মেঘে ঢাকা। ঘোরেপানির পর থেকে উতরাই। বৃষ্টির ভয়ে যে যত জোরে পারে এগোচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে গড়গড় করে মেঘ ডাকতে শুরু করল। পথে নয়াথান্তির সেই চায়ের দোকানের কাছে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। পরনে ধুতি আর পাঞ্জাবি দেখে বেশ অবাক লাগল। তিনিও স্বজাতি তায় কলকাতার বাঙালি দেখে মনে হল খুশিই হয়েছেন। নিজের পরিচয় দিলেন লেখক বলে, একা একা চলেছেন মুক্তিনাথের ওপর ভ্রমণকাহিনি লেখার উদ্দেশ্যে। পথে নাকি কুলি তাঁর সর্বস্ব চুরি করে কেটে পড়েছে আর তাই তিনি এক বস্ত্রে যাত্রা করছেন। সত্যি মিথ্যা জানিনা, তবে এই পথে আমরা স্থানীয় লোকেদের ওপর যে অন্ধ বিশ্বাস করেছিলাম, অন্তত আমাদের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি।

    আবার পথ চলা শুরু। ভালুয়ারা ফলস পেরোনোর সাথে সাথে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। গতকাল রাতের বৃষ্টিতে রাস্তা একদম কাদায় পিছল। একটু অসাবধান হলেই নিশ্চিত আছাড়। প্রায়ই পা হড়কাচ্ছে তাই তাড়াতাড়ি চলাও যাচ্ছে না। এখানে রাস্তায় কোনোরকম আশ্রয় নেই। তার ওপর কারো সাথে রেনকোট নেই। কয়েক মিনিট পরেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। আসার সময় কাঠমাণ্ডু থেকে যে উইন্ড-চিটার কিনেছিলাম তার ভিতর দিয়েও হুড়হুড় করে জল ঢুকছে। সম্পূর্ণ কাকচান করে প্রায় দশ পনের মিনিট পরে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর পাওয়া গেল। জায়গাটার নাম শুনলাম বনথান্তি। সকলে মিলে কোনোরকমে সেই ঘরে ঢোকামাত্র আবার শিলাবৃষ্টি শুরু হল। মাঝে মাঝে চালের স্লেট পাথরের ফাঁক দিয়েও শিল ঢুকে পড়ছে কয়েকটা। সেই ঘরের উনুনে হাত পা সেঁকে আর গরম চা খেয়ে সবে একটু কাঁপুনি থেমেছে তখনই দলনেতা ফরওয়ার্ড মার্চের নির্দেশ জারি করল। বৃষ্টি এখন অনেকটা কমেছে, তবে আকাশ একদম কালো মেঘে ঢাকা। সবে একটু এগিয়েছি, আবার নতুন ধারায় বৃষ্টি নামল। ছুটতে ছুটতে সবাই এবার এক বুড়ির ঝুপড়িতে আশ্রয় নিলাম। এখানে উমাপ্রসাদ বাবুর লেখা পথের বর্ণনার সঙ্গে যথেষ্ট মিল পাওয়া গেল। অন্ধকার ঘর। তার সামনে একধারে গরু বাঁধা। ঘরের মধ্যে গায়ের ওপর আর আশপাশ দিয়ে অগুনতি মুরগির ছানা চরে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে কতগুলো ভিজে ডাল দিয়ে বুড়ি আগুনটা একটু উস্কে দিচ্ছে আর সেই মৃদু আলোয় তার মুখের অসংখ্য বলিরেখাগুলো ফুটে উঠছে। বৃষ্টি কিন্তু ধরার কোন লক্ষণ নেই। এপাশে সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। দার্জিলিং যাবার পথে মাঝে মাঝে ঘুমে যেরকম কুয়াশায় সবকিছু আড়াল হয়ে যায়, এখানেও সেইরকম পরিস্থিতি। সামনের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে যে মেঘগুলো আমাদের অনেক নীচ দিয়ে যাচ্ছে। ভিজে গায়ে কাঁপুনি লাগছে। এই অবস্থায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর নিরুপায় হয়ে আমরা আবার পথে নামলাম।

    উলেরির সেই ‘মহাদেব হোটেল’এ যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের সর্ব অঙ্গে কোথাও এতটুকু শুকনো জামাকাপড় নেই। কুলির মাথায় রাখা বিছানা, কম্বল আর স্লিপিং ব্যাগ থেকেও জল ঝরছে। যাবার পথে আমরা এই হোটেলে লাঞ্চ করেছিলাম কিন্তু এখন রাত্রিবাস করতে এসে অবস্থা খুব সঙ্গিন হয়ে উঠল। ব্যবস্থা খুবই খারাপ – রুটি নেই, হাত পা আর জামা জুতো সেঁকার জন্য একটু আগুনও দেয় না। আমরা মহিলারা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দোতলায় আশ্রয় নিলাম। ঘরটা যেন যাত্রাদলের গ্রিনরুম। সকলে জামাকাপড় বদলাতে ব্যস্ত। ছেলেরা সব তিনতলায় জায়গা পেল। সেখানে শুনলাম অব্যবস্থা আরও চরম। জানালায় কাঁচ নেই, সেখানে রেনকোট চাপা দিয়েও বৃষ্টির ছাঁট আর কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া আটকানো যাচ্ছে না। এছাড়া, ওরা যতই ওপরের ঘরে ঘোরাফেরা করে, কাঠের মেঝের ফাঁক দিয়ে আমাদের মাথার ওপর ততই অনর্গল ধুলা বর্ষণ হতে থাকে। এ তো গেল স্বর্গ থেকে আশীর্বাদ। এপাশে নীচে রান্নাঘরে এমন ধোঁয়া দিয়েছে যে সারাক্ষণ চোখ রগড়াতে হচ্ছে। এত সব প্রতিকূলতার মধ্যে সবে আমরা খেয়ে দেয়ে শুয়েছি, হঠাৎ হোটেল দিদি এসে আমাদের পিঠের নীচ থেকে সব লেপ কম্বল টেনে নিয়ে চলে গেল। তার নাকি অনেক আরও যাত্রী এসেছে, তাদের দিতে হবে। শক্ত কাঠের তক্তপোশের ওপর কাঁপতে কাঁপতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই।

    ১৮ই এপ্রিল, রবিবার

    প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে সবাই রাত তিনটে চারটের থেকে ছোটাছুটি শুরু করেছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে, পায়ে গতকালের ভিজে জুতো মোজা পরে আমরা সকাল ছটা নাগাদ উলেরি ছাড়লাম। তারপর সেই খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উতরাই পথ নামা। নামার সময়ও সমান কষ্ট – মাঝে মাঝে হাঁটুগুলো যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তিরখেদুঙ্গা এসে গেল। সেখানে নিজেরা রান্নাঘরে ঢুকে স্বহস্তে প্রস্তুত রুটি, ডিম ভাজা আর কফি খেয়ে আবার যখন বিরেথান্তির উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করলাম তখন প্রায় আটটা বাজে। এবার রাস্তার ঢালটা অনেক ধীরে ধীরে। মাঝে মোদিখোলার বুকে নেমে কিছুটা পথ নুড়ির ওপর দিয়ে চলা হল। আজ সারা পথটাই একা চলেছি। বেশ ভাল লাগল। চারিদিকে উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে নিজেকে এতো গৌণ লাগার এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় মনের মধ্যে। মাঝখানে এক ঝরনায় দেখলাম অনেক সাহেব মেম স্নান করছে। বিরেথান্তি পৌঁছতে সাড়ে দশটা বেজে গেল। হোটেলের চত্বরে অপেক্ষা করার কিছুক্ষণের মধ্যে সকলে একে একে এসে গেল।

    প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ আবার চলা শুরু। এবার এখান থেকে চন্দ্রকোট পর্যন্ত পুরোটাই চড়াই। সবাই দম নিতে নিতে উঠছে। এখানকার সিঁড়িগুলো আগের মত বেয়াড়া রকমের উঁচু নয় তাই অত কষ্ট হল না। চন্দ্রকোট পৌঁছে আবার লাঞ্চের বিরতি। খেতে খেতে হঠাৎ ঠিক হল যে আমরা আর লুমলেতে রাত্রিবাস করব না। একেবারে সোজা নউদাণ্ডা গিয়ে আজ পা-গাড়ির ছুটি হবে। আমরা যখন চন্দ্রকোট থেকে তিনটের সময় বের হলাম তখনই পরিশ্রান্ত পাগুলো প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। কেউ কেউ পায়ে বড় বড় ফোস্কা নিয়ে রীতিমত খোঁড়াচ্ছে। লুমলের পর থেকে কাঁড়ে পর্যন্ত চড়াই উঠে মনে হচ্ছিল যে আজকে আরও এগিয়ে যাবার সম্মতি জানিয়ে খুব বোকামো হয়েছে। আমাদের উচিৎ ছিল লুমলেতে থেকে যাওয়া। কিন্তু অ্যাডভানস পার্টি বহু আগে চলে গেছে। অগত্যা আমরা নিরুপায় হয়ে পা গুনে গুনে এগিয়ে চলেছি। এর মধ্যে মাঝে মাঝে পেটের যন্ত্রণার চোটে দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নামছে। কাঁড়ে পৌঁছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল। সামনে পাহাড়ের আড়ালের থেকে পোখরার ফেওয়া লেক উঁকি মারছে। দূর থেকে দেখা এই সন্ধ্যার মুখে সম্পূর্ণ লেকের দৃশ্যটা শুধু ক্যামেরায় বন্দী করে রাখার জন্য নয়। এর সৌন্দর্য অনেকটাই কেবল মনের মধ্যে অনুভব করার।

    রাস্তা এবার নউদাণ্ডার দিকে নামতে থাকে। সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে, কুলিরাও তাড়াতাড়ি পা চালাতে অনুরোধ করছে, কোথা থেকে আকাশে আবার এক রাশ মেঘ ছুটে এল। যেন আমাদেরই তাড়া করে ফিরছে। কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি শুরু হল। সামনে দূরে নউদাণ্ডা, দেখা যাচ্ছে কিন্তু যথারীতি আমাদের গন্তব্য স্থল কিছুতেই এসে পৌঁছায় না। আবার এক প্রস্থ কাকচান হল। অন্ধকারের ক্ষীণ আলোয় কোথাও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে সাহস হল না। অবশেষে সাতটা নাগাদ আবার সেই ‘মচ্ছপুছারে হোটেল’। আজ সকাল থেকে এখানে আসতে মোট সাড়ে চোদ্দ কিলোমিটার হাঁটা হয়েছে। এত তাড়াহুড়ো না করে আজ লুমলেতে থাকলেই হত – এই নিয়ে আমাদের কয়েকজনের মধ্যে তর্কাতর্কি লেগে গেল। কিছুক্ষণ বাদে সেই তর্ক কথা কাটাকাটিতে পরিণত হল। তারপর যথারীতি ভুল বোঝাবুঝি, মান অভিমানের পালা শুরু। বাইরের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, তার সাথে ভিতরের এই ঝগড়াঝাঁটি মিলে এতদিনের তিল তিল করে সংগ্রহ করা আনন্দগুলোকে যেন এক ফুঁতে নিবিয়ে দিল। একে ফেরার পথ, তাতে সকলেই মনে মনে বাড়ি ফেরার জন্য দিন গুনছে, এই অবস্থায় সব আনন্দ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়ে মনটা বড়ই ভারাক্রান্ত হয়ে রইল। কাল সকালেই আমাদের পোখরা ফিরে যাবার কথা।

    ১৯শে এপ্রিল, সোমবার

    আজ আর কারোর মধ্যেই ভোর থেকে উঠে তৈরি হবার তাগিদ নেই। ধীরে সুস্থে উঠে সবাই বেশ মৌজ করে কফি খাচ্ছে। গতকাল রাত্রের বাইরের সেই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর সকলের মনের ভিতর জমে থাকা অভিযোগ সবই কেটে গেছে। সকাল নটা নাগাদ আমরা সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে ফেদি গ্রামের দিকে রওনা হলাম। ওখানে পৌঁছাতে এক ঘণ্টাও লাগল না। সকলে মিলে আর একবার জীপে চেপে পোখরার নিউ হলিডে হোটেলে নিশ্চিন্তে ফিরে এলাম। সন্ধ্যাবেলা এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটলো। আমাদের সঙ্গে যে তিন ‘বাহাদুর’ কুলি আর গাইড গিয়েছিল তাদের আমাদের সাথে একই টেবিলে বসিয়ে ফেয়ারওয়েল ডিনার খাওয়ানো হল। হোটেলের ম্যানেজার তো প্রথমে এই প্রস্তাব শুনে প্রবল আপত্তি করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের জিদে সায় দিতে বাধ্য হয়েছিল। ‘ক্যানডেল লাইট’ ডিনারটা বেশ ভালই জমেছিল।

    ২০, ২১ আর ২২শে এপ্রিল, ১৯৮২

    এই কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছুই ঘটেনি। যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছে তার সাথে মুক্তিনাথ যাত্রার কোন সংস্পর্শ নেই। পোখরা থেকে ফেরার পথে সেই সরকারী ডাক বহন করা এক্সপ্রেস বাসের একটা কথাই মনে আছে। অনেকেই ছেলেমেয়ে আর ঘর সংসারের প্রচুর জিনিস পত্র নিয়ে কাঠমাণ্ডু চলেছে। এক ভদ্রলোক অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে নিয়ে চলেছে এক ‘কুকরা’ অর্থাৎ মুরগি, যার পা সিটের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা। হঠাৎ দেখা গেল তিনি মাঝ রাস্তায় অতি সন্তর্পণে একটা ডিম কুড়িয়ে ওনার ব্যাগে পুরছেন। ব্যাপার আর কিছুই নয়, বাসের এই সাত ঘণ্টার যাত্রায় বিরক্ত হয়েই বোধহয় মুরগীটা ডিম পেড়ে ফেলেছে।

    কাঠমাণ্ডু ফিরে এসে হোটেলে পৌঁছেই সবাই ছুটল একটাই নেশায় – কে কত সুন্দর বিলিতি জিনিস কিনে নিয়ে যেতে পারে। তারপর তো নিজেদের সওদা আর তুলনামূলক সমালোচনা আছেই। আমাদের মধ্যে যারা প্রথম বার নেপালে এসেছেন, তারা স্থানীয় দ্রষ্টব্য সব কিছু দেখতে বেরলেন। মুখে প্রকাশ করুক বা না করুক, মনে মনে সকলেরই ঘরে ফেরার তাড়া।

    ২৩শে এপ্রিল, শুক্রবার

    সকাল নটায় আমরা সবাই এয়ারপোর্টে হাজির। কাস্টমস অফিসার বিদেশী পণ্যের বদলে সবার ঝুলিতে অজস্র কালীগণ্ডকীর পাথর দেখে বেশ বিস্মিত আর বিরক্ত হয়েছে মনে হল। তীর্থযাত্রী আমরা, আমাদের কি বিদেশী টুরিস্ট হিসাবে গণ্য করা যায়? আমরা ঠিক যেন আমাদের দেশের দেহাতী গঙ্গাসাগরের যাত্রীদের মত। তাই অন্য সময় যা পারতাম না, এখন ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেকিং-এ দড়ি দিয়ে বাঁধা দিশি প্রথায় শতরঞ্চি আর বিছানার পুঁটলিটাকে বগলে নিয়ে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করলাম না। যাবার পথে যে অফিসারটা আমাকে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে আমি মুক্তিনাথ যেতে পারব না, তাকে একবার দেখতে পেলে বেশ ভাল হত। জানিয়ে দিতাম যে সত্যিই আমি গিয়ে ফিরে এসেছি।

    এরপর তো যথারীতি বিচ্ছেদের সুর। এতদিন ষোলোজনের একান্নবর্তী পরিবারে সুখে দুঃখে দিন কেটেছে। এবার যে যার বাড়ির দিকে পাড়ি দিল একটাই আশার বাণী শুনিয়ে – শীঘ্রই একটা ‘গেট টুগেদারে’ আবার সকলের সাথে দেখা হবে। এরপর কি দিনলিপি বা ডায়েরি আর এগোতে পারে?

    একটা কথা অবশ্য উল্লেখ করে তবেই ইতি টানা ভালো। শুনলাম যে জনৈক এক লেখক সম্প্রতি মুক্তিনাথ ঘুরে এসে একটা বই প্রকাশ করেছেন। তাতে কিন্তু বৈতালিক মহাশয় মাত্রার চেয়ে একটু অতিরিক্ত কষ্টের বর্ণনা দিয়েছেন। হয়ত তিনি বর্ষাকালে গিয়েছিলেন তাই বৃষ্টি আর জোঁকের উপদ্রবে রাস্তা আরও কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবুও আশার বাণী না শোনালে আমাদের মত সর্ব বিষয়ে ভীরু আর গৃহকোণে থাকা বাঙালি মহিলারা কি কোন দিনও মুক্তিনাথ যেতে ভরসা পাবে? রাস্তা নিঃসন্দেহে কঠিন, তবু মনে হয় আমরা যখন যেতে পেরেছি তখন সকলেই পারবেন। আসলে একটানা পনেরো দিন ধরে হাঁটতে পারাটাই বড় কথা। অবশ্য এর পরে যারা যাবেন তারা যদি হাতে আরও কয়েকদিন সময় বাড়িয়ে নিয়ে যান তা হলে আরও সুবিধা হবে। প্রতিদিন গড়ে দুই বা তিন কিলোমিটার কম হাঁটলে নিঃসন্দেহে কষ্ট অনেক কম হবে। অবশ্য সবার উপরে রয়েছে মুক্তিনাথজির আশীর্বাদ। ওই যে কি যেন একটা প্রবাদে বলে না, “রাখে হরি তো মারে কে?” জয় মুক্তিনাথজির জয়।




    অলংকরণ (Artwork) : ছবিঃ লেখকের সৌজন্যে
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)