• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫২ | অক্টোবর ২০১২ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share
  • রাবণের কানপট্টি : সুব্রত সরকার


    ক্যাম্প ফায়ার দারুণ জমে গেছে। কনকনে ঠাণ্ডা। টুপটাপ করে শিশির ঝরছে। তবু কেউ টেন্টে নেই। খোলা আকাশের নীচে আগুন জ্বেলে সবাই গোল হয়ে বসে ক্যাম্পফায়ারে মশগুল। একটু আগেই তমোমিতা খব সুন্দর একটা নাচ করেছে। তারপর কোরাস গেয়ে জমিয়ে দিয়েছিল শুভলক্ষ্মী, রাহুল আর অগ্নিভ। সঙ্গে গীটার বাজিয়েছে স্বপ্নিল। আর বাঁশিতে ফুঁ দিয়েছে অয়ন। এবার শুরু হবে ছোটদের ছোট্ট নাটক, 'আধুনিক রামায়ণ'।

    চারদিন তিনরাত্রির এই নেচার স্টাডি ক্যাম্পের আজই শেষ রাত্রি। তাই সকাল থেকেই শুরু হয়েছিল ক্যাম্পফায়ারে কে কি করবে তার প্রস্তুতি। অরুণাংশু স্যার প্রোগ্রাম কনডাক্ট করছেন। স্যার ভীষণ মজা করতে পারেন। নিজেও মাঝে মাঝে দারুণ মজার মজার সব জোক্‌স বলে খুব হাসাচ্ছেন।

    'আধুনিক রামায়ণ' খুব মজার নাটক। দুপুরেই ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে রিহার্সাল দিয়ে নিয়েছে। ওরা মানে মাত্র পাঁচজন। রাম, সীতা, লক্ষণ, হনুমান ও রাবণও। শুভলক্ষ্মী হয়েছে সীতা। স্বপ্নিল রাম। লক্ষ্মণের ভূমিকায় মহাপাজি, সবচেয়ে দুষ্টু, পিনাকী। হনুমান হয়েছে সব সময়ই তিড়িং-বিড়িং করে লাফানো-ঝাঁপানোর ওস্তাদ ছেলে পিয়াল। আর একবাক্যে সবাই যাকে রাবণ বলে মেনে নিয়েছে সে হল ঋচীক। ঋচীকও রাবণ হয়ে বেজায় খুশি। 'দারুণ ছেলে, সদাই হাসে / বড্ড ভালো, একটু কালো / ভীষণ খায়, অল্প হাঁটে / ওই ছেলেটাই ঋচীক বটে!' মহাদুষ্টু লক্ষ্মণ মানে পিনাকী আবার নিজের বানানো এই ছড়াটা ক্যাম্পে চালু করে দিয়েছে। ছড়াটাও খুব জনপ্রিয় হয়ে গেছে। সবার মুখে মুখে ছড়াটা। তাতে অবশ্য ঋচীকের কোনো প্রতিবাদ নেই ও বেজায় খুশি, মজায় হাসে। সত্যিকারের রাবণ দশমুখে যেভাবে হাসতো, একমুখের ঋচীক - রাবণ তার চেয়েও জোরে হেসে দুপুরের রিহার্সালটা জমিয়ে দিয়েছিল।

    নাটক শুরু হয়েছে। আধুনিক রামায়ণ। দারুণ দারুণ সব মজার ডায়লগ। একদম এখনকার কথা ভেবেই বানানো। এবার সীতাহরণ হবে। রাবণ সেলস্‌ম্যান সেজে সীতার ফ্ল্যাটের দরজায় কলিংবেল টিপল, ডিং ডং .... 'কে? কে?' ঘর থেকে ভেসে এল সীতার গলা।

    — এক্সকিউজ মি, ম্যাডাম একটু বাইরে আসবেন?

    — কেন? কে আপনি? কি দরকার বলুন তো?

    — ম্যাডাম, আমি দারুণ দারুণ সব নেলপালিশ এনেছি। পারফিউম এনেছি। একদম বিদেশী জিনিস। দেখুন একবার, ভীষণ সস্তা! .....

    ওমা! তাই? দেখি, দেখি! .....

    ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সীতা। আর সেই সুযোগে রাবণ এক হেঁচকা টানে সীতাকে নিয়ে দে চম্পট! রিহার্সালের সময় ঋচীক শুভলক্ষ্মীর হাতটা ধরে এমন জোরে টান মেরেছিল যে তখন বন্ধুরা সবাই বারণ করেছিল, ওরে ওর পাটকাঠির মতো হাতটা ভেঙে যাবে রে! আস্তে টান! আস্তে টান! কিন্তু সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এবারও ঋচীক এমন জোরে সীতাহরণ করে বেরিয়ে এসে একটু দূরের শিশির ভেজা অন্ধকার ঘাসের উপর গিয়ে দুজনেই আছড়ে পড়ল। শুভলক্ষ্মী তো উঃ মাগো বলে কঁকিয়ে কেঁদে উঠল। আর ঋচীক ওর মোটা-সোটা, গাবলু-গুবলু শরীরটা নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েই রইল। স্বপ্নিল ছুটে এসে কোনোরকমে টেনে তুলছে। পিনাকী এসে এক গুঁতো মেরে বলল, ওরে লঙ্কার অধিপতি, সীতার হাতটা যে ভেঙে চার টুকরো হয়ে যেত! মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঋচীক-রাবণ তখন ফিক ফিক করে হাসছে।

    নাটক দেখে তো সবাই খুশি। প্রচুর হাততালি পড়ল। বাঃ বাঃ বলে বাহবা দিচ্ছে। সাবাস্‌ সাবাস্‌ করছে সবাই। আর তখন ঋচীকের খেয়াল হল ওর কানপট্টিটা নেই। ক্যাম্পে আসার সময় কানপট্টিটা দিয়েছিল বঙ্কুমামা। বঙ্কুমামা খুব পাহাড়ে যায়। ট্রেকিং করে। বঙ্কুমামা বলেছিল, নর্থবেঙ্গলে এখন খুব ঠাণ্ডা। গারুচিরায় তোদের ক্যাম্পের কাছেই আবার নদী আছে। ভীষণ শীত পাবি। আমার কানপট্টিটা নিয়ে যা। আরাম পাবি। তবে সাবধানে রাখবি। এটা আমাকে দিয়েছিল হিমালয়ের এক সাধু। তুঙ্গনাথে ওঁর কুঠিয়া। ....

    গারুচিরায় এসে প্রথমে সত্যিই দারুণ ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু কানপট্টিটা পরতেই শীত জব্দ। সেই কানপট্টিটাই নেই! ভ্যানিশ। ঋচীক ঠাণ্ডায় হিহি করে কাঁপছে। এতক্ষণ নাটকের নেশায় সে সব টেরই পায়নি। কিন্তু এখন খেয়াল হতেই সীতাকে পাকড়াও করে বলল, তুই দেখেছিস আমার কানপট্টিটা?

    আমি দেখব কি করে? দেখ গিয়ে ওই অন্ধকারেই হয়তো পড়ে আছে। যা জোরে টান দিলি, আমার হাতটাই ভেঙে যেত! শুভলক্ষ্মী ভেংচি কেটে কথাটা বলে চলে গেল।

    ঋচীক এখন একা-একা মাঠের ওই অন্ধকারে যেতে ভয় পাচ্ছে। অথচ ওর ঠাণ্ডাও লাগছে খুব। বন্ধুরা সবাই ক্যাম্পফায়ারে মেতে আছে। বললেও কেউ যাবে না। আবার ও ভয় পাচ্ছে একা ওই অন্ধকারে যেতে শুনলে ওরা হাসবে। ঋচীককে ক্ষ্যাপাবে। ক্যাম্পফায়ারে আগুনের শিখা জ্বলছে লক লক করে। অরুণাংশু স্যার আবার একটা মজার জোকস্‌ বলে খুব হাসালেন সবাইকে। সবাই হাসছে। হাততালি দিচ্ছে। কিন্তু ঋচীক একটুও হাসতে পারল না। হাততালিও দিতে পারল না। কানপট্টিটা ওর বড় দরকার। বড্ড ঠাণ্ডা। হি হি করে কাঁপছে ঋচীক।

    ক্যাম্পফায়ার দেখতে পাহাড়ের নীচের গারো বস্তি থেকে অনেক পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা এসেছে। ওদের গায়ে তেমন কোনো শীতের জামা নেই। এই ঠাণ্ডায় ওরা খুব কষ্ট করে এসেছে। অরুণাংশু স্যার বললেন, ওরা আজ আমাদের অতিথি। আমাদের অনুষ্ঠান দেখতে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করে এসেছিলাম। ওরা আমাদের অনুষ্ঠান দেখবে। তারপর আমরা দেখব ওদের অনুষ্ঠান। ওরা নাচ দেখাবে। গিটার বাজিয়ে নেপালি গান শোনাবে।

    ঋচীক এবার হঠাৎ একটু একটু করে এগিয়ে যায় গিটার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি ছেলেটার কাছে। এই ছেলেটাই হয়তো গিটার বাজিয়ে গান করবে। ঋচীক ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। হিন্দীতেই বলে তুমহারা নাম ক্যায়া?

    পাহাড়ি ছেলেটা ফিস্‌ ফিস্‌ করে বলে, রাজু।

    ঋচীক বলল, রাজু, তুমি আমার সঙ্গে একটু যাবে ওই মাঠে। আমার কানপট্টিটা পাচ্ছি না। মতলব উধার উও গির গিয়া।

    — কিঁউ নেহি? রাজু সঙ্গে সঙ্গে বলল, হাঁ-হাঁ। চলিয়ে না!

    রাজুর সঙ্গে সঙ্গে ঋচীক হাঁটছে। একটু দূরের মাঠটা অন্ধকার। সেখানে হয়তো পড়ে আছে ওর কানপট্টিটা। ক্যাম্পফায়ারের আগুনকে ঘিরে বন্ধুরা হৈ হৈ করছে। ওরা জানতেও পারল না, ঋচীক চুপি চুপি অন্ধকারের দিকে চলেছে। সঙ্গে নতুন বন্ধু রাজু। কয়েক পা এগিয়ে এসে ঋচীক হঠাৎ রাজুকে বলল, তুমি একটা গান শোনাবে?

    — আভি? জরুর করেগি। সংগীত মুঝে বহুত আচ্ছা লাগতা হ্যায়।

    ঋচীক মনে মনে ভাবল, আজ কানপট্টিটা না পেলেও কাল সকালেই ঠিক পেয়ে যাব ম্যাজিক টেবিলে! কেউ না কেউ খুঁজে পেয়ে সেখানে রেখে দেবে। কিন্তু এখন এমন সুন্দর এক নিঝুম অন্ধকারে গিটার বাজিয়ে রাজুর গলায় নেপালি গান শোনার সুযোগ তো আর হবে না!

    রাজু গান ধরল। টুং টাং করে বাজছে গিটার। ক্যাম্পফায়ারে ওর বন্ধুরা খুব নাচ করছে। হৈ হৈ করছে। ঋচীক হঠাৎ যেন অনুভব করল, এখন তো আর অত শীত করছে না। হি হি করে কাঁপুনিটাও আর নেই। রাবণের কানপট্টিটা আজকের মত হারিয়েই না হয় থাক্‌। ঋচীক এখন দু'কান খোলা রেখে রাজুর গান শুনছে। গিটার শুনছে। পাহাড়ি ছেলের নেপালি গান, হা-হা-হা, হো-হো-হো তু-তু-তু, তুতুর তু, তুতুর তু .......



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)