• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫২ | অক্টোবর ২০১২ | গল্প
    Share
  • কথাচিত্র : শ্রাবণী দাশগুপ্ত


    || ওয়ক্ত ||

    রাত্রে খেতে বসে দাদাভাই বলেছিল, ‘পুপে, ইচ্ছে হলে গিয়ে দেখে আয় যা। না হলে আফশোষ থাকবে।’ তাই বলে কনকনে ধোঁয়াশা ভোরে কাউকে না জানিয়ে আসার কথা ছিলনা। ডিপো থেকে রওনা হওয়া ঘুমভাঙা প্রথম ট্রামে এখন সে একাই। সেই টিংটিং অবিকল কন্ডাকটর। বুবুল ছোটবেলায় বলত গন্ডারগাছ। গলি তস্য গলি মোটামুটি অপরিবর্তিত। একতলার ভাড়াটেদের রাস্তার দিকের জানালাগুলো বন্ধ। তাদের নোটিশ দেওয়া হয়ে গেছে যথাসময়ে। অন্ধকার রোগা লাল সিঁড়ি বেয়ে দোতলা। সেই ভারী কলাপ্সিবল গেট। কতকালের অভ্যাসবশে কলিং বেলের বোতামে হাত ছোঁয়াল পুষ্পিতা। আওয়াজ হলনা। দুতিনটে মিনিট থতমত হয়ে ভারী চাবিটা ঢোকাল তালায়। তারপর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। সিদ্ধান্ত তো কবেই নেওয়া হয়ে গেছে। দাদাভাই, দিদিভাই, ছোড়দা, বুবুল আর সে মিলে। সইসাবুদটা কাজ, বাকিটা পারিবারিক সম্মেলন। সেজন্যে এবারে ছুটি নিয়ে কতবছর পরে কোলকাতায় আসা। আর এখানে কিসের টান! ক্যাঁক করে আঁট দরজাটা খুলল, হয়তো এই শেষবার। পিছন ফিরে ভারী খিলটা তুলে দিয়ে মনে হল, একা না এলেই হত। বন্ধ জানালার দুয়েকটা ভাঙা খড়খড়ির ফাঁক বেয়ে অস্পষ্ট ধোয়াঁটে আলো। কোনো ঘরে তালা নেই। নিঝুম টানা বারান্দা, রেলিং-এর একঘেয়ে নক্সা, নিস্পন্দ শূন্য ঘরগুলো এত বেশি সরব! নির্ভার ছোট্ট পুপে সম্মোহিতের মত উড়ে বেড়ায়। বৈদেহী অস্তিত্ব, পরলোক এসব মনেও আসেনা। বারান্দায় শেষ মাথায় খাবার ঘর, নিচে ঝুঁকলে নিঝুম উঠোন খটখটে। নাকি জলময়? শিরদাঁড়া বেয়ে কেমন তিরতির বরফস্রোত নেমে গেল, হাওয়ার ছোট্ট ঘূর্ণি কানের পাশে। “আমারে ত তমরা ভুইল্যাই গেছগা!” বারান্দার জং-ধরা রেলিং সজোরে চেপে ধরল পুষ্পিতা। পার্সে মোবাইল সরব,“হ্যাঁ দাদাভাই বলো...হুঁ ঠিক ধরেছো...আচ্ছা এসো গাড়িটা নিয়েই এসো...ছাড়ছি।” ভুলবে বলে তো সে ভোলেনি। অথচ মনে থাকবেই, তার প্রত্যয়ই কী ছিল?


    ।। এক মওত।।

    —মেল-ওয়ার্ডের ডাক্তার সকালের রাউন্ডে এসে গভীর নিরীক্ষণ করলেন মিনিটদুই।
    “সাপোর্টগুলো খুলে দিন সিস্টার। রাতে খেয়াল করেননি? প্রায় ঘন্টাচারেক আগেই গেছে।”
    “আমার ডিউটি ছিলনা স্যর। আমি তো এই এলাম।”
    “হুম, এক্ষুণি বাড়িতে খবর দেবার ব্যবস্থা করুন।”

    অপরিসর ঘিনঘিনে বেডে চামড়ায় মোড়া নিথর কৃষ্ণ কঙ্কাল। গভীর ডিহাইড্রেশন। আধখোলা কোটরগত হলদে চোখ, দু’হাত বুকের কাছে জড়ো। ডাক্তার নির্লিপ্তভাবে ময়লা কম্বল দু’আঙুলে টেনে মুখ ঢেকে দিলেন। বেড একশো-তের, নাম বিশ্বম্ভর ধর, বয়স আনুমানিক সত্তর। ফোন নম্বরও দেওয়া আছে। ব্র্যাকেটে লেখা ‘জরুরি অবস্থার জন্যে’। বোধহয় এখন অবস্থাটা বাস্তবিক জরুরি। রিসেপশনিস্ট মুখ বিকৃত করে রিসিভার তোলে।
    “হ্যালো, পুষ্পিতা মিত্র বলছি। বাবা ঘুমোচ্ছেন...শরীর ভালো না! এ্যাঁ? ও! কতক্ষন আগে? হ্যাঁহ্যাঁ, আসছি।”


    ।। তসবীর ১।।

    —উটপাখির ডানার মতন কনুইজোড়া পেছনে উঁচিয়ে খানিক ঝুঁকে চলছিল মানুষটা। রাস্তা দিয়ে প্রায়শই অমনি করে হাঁটে। মনে হয় হঠাত ডানা খুলে কিছুটা উড়ে যাবে নয়তো দৌড়বে। শেষ পর্‍যন্ত কোনোটাই করে না। শেকলটা আদ্যিকালের, ভারী আর কড়া! একবার খুলে ফেললে কী হত, হয়তো ভেবে দেখেনি। তাই কখনও খানিকটা সোজা হবার অলস চেষ্টা করলেও পুরোটা পথটা এভাবে যাতায়াত করে, সারাদিনে কমপক্ষে আধডজন বার। একঝলকে হঠাত সোমালিয়াবাসী মনে হতেও পারে। কালো মুখের আঁকিবুকিতে সব অনুভূতির রং এক। মালকোঁচা-মারা ন’হাতি নরুন পাড় মোটা ধুতিটা হয়তো বড়দি দিয়েছিল পুজোতে, কিম্বা মেজদা বা আর কেউ। ফতুয়াও তেমনই। হাতাওলা গেঞ্জি পরেও সময়ে-অসময়ে রাস্তায় নামে। পায়ে টায়ারের চটিজোড়া যতদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে, ততদিন।
    “বিশু! কানে শুনস না নাকি? কি করত্যাছিলি?”
    “কন মা। বাসন মাইজা ওঠলাম...অহনে গিয়া...”
    “অবেলায় আর শোওন লাগবনা। তর ঘুম আর ঘুম! গিয়া মিষ্টি লইয়া আয়। বিন্তির ননদের পোলা আইসে।”

    সে নীরব। অনিচ্ছার হাত বাড়িয়ে পয়সাটুকু তুলে নিল
    “দেইখ, দেরি করবা না। নড়তে চরতে ছয় মাস লাগাইও না!”
    “চপ্পলখান ফাইট্যা গেছেগা মা। সিলাই কইরাও চলব না।”
    “অ। তয় খালি পায়েই যা। পূজায় না কিন্যা দিছিল হেই বছরে! সবর্দা পায়ে দেওন লাগব ক্যান? বাবুয়ানি!”

    গৃহিণী গুনে মিষ্টির টাকা দিয়েছেন, একটা আধলাও বেশি নয়। নিত্যদিন এবাড়িতে এসো-জন বসো-জন। কবে, কোন যুগ থেকে দেখে আসছে সে। বুধবার সন্ধ্যেবেলায় রেডিওতে যাত্রা থাকে। আজও আছে। রামায়ণ মহাভারত বা পুরাণের গল্পের টান বেশি। কেজানে শোনার সময় হবে কিনা! অনিশ্চিত উদ্বেগ আঁচড়ায়। মহাকালী মিষ্টান্ন ভান্ডার তাদের বাড়ি থেকে শুধু একটা মোড় ঘুরলেই। দোকানের কর্মচারিরা সবাই তাকে চেনে, তবু কতক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে অকারণ। চোখের সামনে দিয়ে অন্যেরা সওদা নিয়ে চলে যায়।
    “বাবু আমারে দিয়েন গো, খাড়াইয়া আছি। বাসায় কুটুম আইছে।”
    “ভীড় দেখছ না? আরে এ পল্টু, এর মিষ্টি চারটে দিয়ে দে না।”

    বিরক্ত চোখে তাকাল ছোকরাটা। ছোট্ট ভাঁড়টা ধরিয়ে দিয়ে পয়সা গুনল। বিশু বিড়বিড় করল,“দেরি করাইয়া দিছে।’’ তাড়াতাড়ি হাঁটার চেষ্টায় কষ্টে সোজা হল। ঘষা কালো ফাটাফাটা পায়ের পাতা। তার আঙুলের ফাঁকে বিজবিজে হাজা। বষার্কালে ব্যথার কথা বললে তখন বড়দা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ দেয়।
    “এত সময় লাগাইলি ক্যান? যা, বড়বৌরে দিয়া আয় গিয়া পাকঘরে।”

    বড় বৌদির জলখাবারের পরে চা বানানোও শেষ।
    “এরকম দেরি করলে পারা যায় নাকি? কয়লার দোকানে খবর দিয়ে এসেছিলে? রাত্তিরটা হয়ে যাবে কোনোরকম, কাল ইস্কুল অফিস। গিয়ে বল, এক্ষুণি কানাই একবস্তা ঢেলে দিয়ে যাক।”
    “অহনই ত ঘুইরা আইলাম। কইতে পারলেন না?”
    “কালও বলেছি। থাক, দাদাবাবুরা অফিস থেকে ফিরে ব্যবস্থা করবে! রেশনে কেরাসিন এল কিনা খোঁজ নিলে? কাজের কথা বললেই তো তোমার মেজাজ গরম।”

    বিশু আবার রাস্তায়। কাঠগুলো চেলা করে না রাখলে বউদিরা বকাবকি করে। কয়লা ভেঙে উনুন ধরিয়ে দিতে হবে ফিরে এসে। এখন প্রত্যেক পদক্ষেপ যন্ত্রনার, কোমর ঝুঁকে যায় ক্রমশ। দুপুর-শেষে না শুলে আজকাল পেটব্যথা করে, বমির উদ্রেক হয়। ক্লান্ত উটপাখি ফুটপাথ ধরে চলছিল এঁকেবেঁকে। কয়লার দোকানটা আরো আধমাইল। টুংটাং দু’একটা টানারিক্সা চলে গেল। ফুটপাথে বলরামের জুতো-সারাই দোকান আপাতত খদ্দেরবিহীন। বলরাম বসে বিড়ি ফুঁকছিল। তাকে দেখে হাসল। সে চা-পান-বিড়ি কোনোটাই খায় না। ছোটদা খুব সিগ্রেট খায়।
    “হেই বিসু, যাও না আসো?”

    বুধবার সন্ধের ওই একঘন্টা কোনদিন সে নড়তে চায় না। বুড়াবাবু আর মা এরিয়েল লাগানো বড় রেডিওর পাশে খাটে আর আরাম-চেয়ারে আধশোয়া। মাঝে মাঝে পড়া ফেলে ছোটোগুলো উঠে এসে গোল বাধালে বড় রাগ হয় বিশুর। উতকর্ণ সে উবু হয়ে মাটিতে বসে। রাম চীৎকার করেন,‘‘ওহে ও পাপিষ্ঠ রাবণ/এত বড় দুঃসাহস তোর/লক্ষ্মণেরে দিলি শক্তিশেল/আজি তোরে করিব বধন।’’ তার মন উথালপাথাল, কেমন বীর রাম-লক্ষণ, ভাইয়ে-ভাইয়ে কত ভালোবাসা। বাবাঠাকুর খুব পণ্ডিত মানুষ। “বাবু, শ্যাষে লক্ষ্মণ তো মরে নাই? বিশল্যকরণী আইন্যা দিছিল হনুমান, গন্দমাদন পরবতখান...।”
    “হ, জানস ত তুই। কইছি, পড়ছস।”

    দাদারা অফিস থেকে ফিরলে সন্ধ্যের চা-জলখাবার, রাত্রের ভাত-রুটি, বৌদিরা রান্নাঘরে ব্যস্ত।
    “বিশু কই? যাত্রা শোনে নাকি? অ, আজ বুধবার! হুঁহ, নেশা!”
    “আর কি? আটটার আগে ওকে ডেকেও পাবেনা। কাঠগুলো চেলা না করে রাখলে সকালে উনুন জ্বালাব কি করে?”


    ।। তসবীর ২।।

    “তাপ্পল দত্তন তি তল্ল বিতু? দুদ্দ?”
    “লক্ষ্মণ তার দাদা বউদিরে খুব মানত, তাই বউদির কতা শুইন্যা, সুনার হরিণেরে ধরতে গেল। তহন, রাইক্কশ রাবণ আইস্যা...সীতারে লইয়া, উড়াল দিল।”

    বোগড়া হলদে দাঁতে প্রশ্রয়ের হাসি। তার পুরোন মোটা কৃত্তিবাসী রামায়ণে রবিবর্মার আঁকা ছবিটার ওপর তুলতুলে আঙুলগুলো। ছোটদার ছেলেটা খুব ন্যাওটা। চারবছর বয়সেও কথা অস্পষ্ট, ভারি হাল্কা, চঞ্চল। কোল ঘেঁষে ফুটফুটে দেবশিশুর কাজল পরানো অবোধ চোখ, কপালের নজরটিপ সে অবিমিশ্র মুগ্ধতায় দেখে। দুধ ও বেবিপাউডারের নরম সুবাসে মন কেমন হাল্কা হয়ে উড়াল দিতে চায়। অতি অসম্ভব ইচ্ছেগুলো জ্বালাতন করে। ছোটদা-ছোটবউদি দুজনে অফিসে চলে গেলে বাড়ির আর সবাই যখন ব্যস্ত, বুবুলকে কিছুক্ষণ পাশে বসিয়ে রাখা তার দায়িত্ব। সেই সময়টুকু গল্প শোনায় রামায়ণ মহাভারত ঘেঁটে।
    “বিশু বই নিয়ে বসলে যে! মা’র বারের পুজো আছে আজকে। সকালে পাঁচফল এনেছ? যাও ডাকছেন।”

    মেজবৌদি বুবুলকে কোলে তুলে নিয়ে যাবার সময়ে বাচ্চাটা হাতপা ছুঁড়ে চেঁচায়,
    “নাআঁ আঁ...আ...মি বিতুল তাচে দঅঅপ...অ।”

    সে বই মুড়ে রেখে পিছন ফিরে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখে। গর্তে-ঢোকা অনুজ্জ্বল চোখদুটো ছলছলে। সকাল থেকে তিনবার বাজারে যাওয়া হয়ে গেছে। পায়েপায়ে কর্ত্রীর ঘর। ফর্সা ছোটখাট শরীর,‘মা’। আঁকাবুকি কাটা প্রসন্ন মুখ, সেও ভাবে মা। ‘কিন্তু তবু তাহলে’র খোঁচাগুলো আমল দিতে মন চায়না।
    “পাঁচফুল পাঁচফল আনবা। সন্ধ্যার সময় ঠাকুরমশয় আইব।”
    “মা আমার ব্যাল ফুরাইছে কাইল। খাইতে পালার্ম না। পয়সা দিয়েন।”
    “ল’ টোকা লইয়া যা। ব্যাগার্তা করতে পারমু না, আইয়া আমারে হিসাব দিবি।”

    ক’দিন আগে একজোড়া চটি কিনে দিয়েছিল ছোটবৌদি, ওই টায়ারের চটি। বিশু খুব খুশি। গলির মুখে মগন-ধোপার ঘুপচি ঘরে মুখ বাড়াল। মাঝেমাঝে ঢুঁ মারে সে। জল ছিটিয়ে টানটান করে কাপড় ইস্ত্রি করছিল মগন, বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট। নোতুনবৌ সাহায্য করছিল। দু’জনে মিলে খবরের কাগজ দিয়ে ঠোঙাও বানায়। তাকে দেখলে বৌটি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকে। মগন লোহার ভারী ইস্ত্রি উনুনে বসাল,“ব্যেঠো না বিসুদাদা।” সে মাথা নাড়ল, নাঃ। কুঁতকুঁতে চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ্য করছিল এক ডবডবে বৌ, মগনের ইস্তিরি। উঁচু খোঁপায় হলুদ ঘোমটা। মাইয়ামানষের রহস্য সে ঠিক জানে না, সুযোগ হয়নি। মগনের দিকে চেয়ে কী ভেবে নিবোর্ধের মত হাসে।

    ফিরে এলে গৃহিণী রোজ হিসেব চান তার কাছে।
    “চারানির হিসাব মিলে না ক্যান? কই ফালাইছস?”
    “কইলাম না শশার দাম বারসে...আপনে ত শুনেনই না।”
    “হ, তুই আমারে বুঝাইবি? আসুক বড়খোকা...জিগাইমু।”

    বেলা তিনটের পর খাওয়া শেষ হলে সে মাদুর পেতে মহাভারতখানা খুলে বসল। এইটুকু তার সারাদিনের বিশ্রামের সময়। বুবুল তার বড়মা বা মেজমার বিছানায় ঘুমোয়। ছোট্ট গোলাপি ঠোঁটদুটো আধো খুলে থাকে। হঠাৎ বিশু তন্দ্রা ভেঙে চমকে উঠল “বিতুতাতা”! না, বুবুল নয়, ঘুম চটকানো লালচোখে মেজবৌদি ডাকছিল,
    “বিশু, মিনি-পুপেকে শিগগীর নিয়ে এসো ইস্কুল থেকে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, দেরি হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে থাকবে ওরা।”
    “খাইয়া উটলাম অহনি! দুফরের সমস্ত বাসন পইরা, কেডা ধুইব? আপনে?”
    “কাজের কথা বললেই খ্যাঁচখ্যাঁচ কর কেনগো? দেবু-রবুও একটু পরে এসেই ‘খেতে দাও খেতে দাও’ করবে!”

    বৌদি আঁচলের খুঁট থেকে চারানি ঘুষ দিল। রাস্তায় উটপাখি। ক’দিন ধরে গোলমাল করছিল পেট, তার আজন্মের যন্ত্রণা। মেজবৌদির পয়সাটা জমিয়ে রাখল সে। সকালের চারানিও তার বাক্সে।

    মিনি পুপে স্কুল থেকে ফিরেই চেঁচাল,
    “মা কেন যাওনি? বিশুকাকা খালি পায়ে কেমন করে হাঁটে! সব মেয়েরা হাসে জানোনা?”
    “তোদের বেশি বেশি। যাতো। বিশু একটু দূর দিয়ে হেঁটো। ওদের নাকি লজ্জা করে! যাও বাসনগুলো মেজে উনুনটা ধরাও। যা কয়লা এনেছ, খালি ধোঁয়া।”

    সন্ধ্যেবেলায় বারের পুজোর শেষে ‘ওঁ শান্তির্ভবতু শান্তিঃ।’ ছোটগুলো যথাসম্ভব পা ঢেকেছে কারন একফোঁটা জল পায়ে পড়লেই ভীষণ দোষ, ঠাকুমা বলে দিয়েছেন! তিন দাদাবৌদি, বাবাঠাকুর, মা, আজ আবার বড়দিও, ছেলের বৌকে নিয়ে। সবার পিছনে নুয়ে সে।
    “মা, আমারে।”
    “হ অরে দিয়েন ঠাকুরমশয়। বড়বৌমা সক্কলেরে প্রসাদ দিয়া দাও।”

    শুভর বৌ রত্না কলেজে বাংলা নিয়ে পড়ে।
    “বিশুমামা তোমার কাছে মনসামঙ্গল আছে বললেন দিদিমা। পড়তে দেবে?”
    “হ আছে, পদ্মাপুরান। পদ্মা কার নাম আছিল ক’ন ত?”

    খুশি হয়ে সে চাঁদসওদাগরের গল্প শোনাতে শুরু করে দেয়। খাওয়া সারতে মধ্যরাত। একতলা দোতলার ঘরগুলোয় দরজা বন্ধ। নিশাচর বিশু চাতালের কোণে একরাশ এঁটো বাসন ছাই-মাটি-নুটি নিয়ে অভ্যস্তভাবে ঢুলতে থাকে। সকালের জন্যে উনুন সাজিয়ে শেষরাতে টানা বারান্দার এককোণে বিছানা পাড়ে। দুচারটে বড় আরশোলা উড়ে গায়ে বসলে সে টের পায়না।


    ।। তসবীর ৩।।

    গৃহিণী চালের পিটুলি দিয়ে তৈরি করলেন ষষ্ঠীমা। কাঁচা হলুদ বেটে পায়ের গোদ। তার ছানাপোনাও একগাদা। জ্যৈষ্ঠের দুরন্ত গরমে তীব্র অস্বস্তি, এরই মধ্যে কত কাজ। বাড়িশুদ্ধ সবাই ভোর থেকে ব্যস্ত। ছেলেরা অফিস যাওয়ার আগে আজ স্নান পুজো সেরেছেন গৃহিণী। বিশুর ফুরসৎ নেই। ছোটবৌদিও অফিসে বেরোনর আগে আস্য রক্ষা করে গেল। বিশু সব জানে, যেন সেই গতজন্ম থেকে দেখছে! বড়দি এল দুপুরে। সন্ধ্যেবেলায় অফিসফেরত বড়জামাইবাবু। “ষাটষাট। নাই-য়ের জল পাখায় নিয়া বাতাস দাও মেজবৌমা। পরে সুতা বাইন্দ্যা বানা দিবা।”
    “আমাতেও থাত-থাত...আম-মা!”
    “হ, তোমারে তোমার মায়ে করব দাদু।”

    ছোটগুলো সারি দিয়ে মাটিতে বসল বাবা-জ্যেঠার সঙ্গে। ছোট্টছোট্ট কলাপাতায় আম, কাঁঠাল, দিশি খেজুরের প্রসাদ, একটু কাঁচা চাল। মায়েদের পুজো, নাড়ির ধনেদের জন্যে। একেবারে শেষবেলায় গৃহিণী ডাকলেন,
    “আয় বিশু।”

    সকালের নীরব প্রতীক্ষা অবহেলার ধুলোয় ঢেকেছিল। এসে বানা নিল বিশু। মা-ই তো! সময় পেলে কতদিন মায়ের পায়ের কাছে এসে সে বসে থাকে। কবে বাবু খড়ম দিয়ে মেরেছিলেন, চোর অপবাদে বের করে দিয়েছিলেন বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে।
    “খেদাইয়া দিলে কই যামু গ মা? কনহানে কন?”

    মনে পড়ে যায় জাতিদাঙ্গা; সোনার দেশ দু’টুকরো। দাদাবাবুদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। অপরিবর্তণীয় সে পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছে। কত মাইল হেঁটে গেছে দূত হয়ে। এখনো বড়দির বাড়ির খবর নিতে মা তাকে পাঠিয়ে দেন।
    “কী কইল খুকি? রত্নার নাকি শরীর ভাল নাই? চিঠি দিছে?”
    “হ। আজ বড়দি দুইটা ট্যাহা দিল আমার। কইল যা খাইবার মন লয়...।”
    “না করতাছিলি না যাওনের লইগ্যা?”
    “হাইট্যা যাওন-আওন...ঘরের কামগুলা করব কেডা? পারি না আইজকাল।”
    “বিশুকা বড়পিসির বাড়ি হেঁটে যায় কেন? এত দূরে!”
    “ভয় পাও,না? এমা,বাসে চড়তে ভয় পায়! আমরা তো পাইনা।”

    সে নীরব, বাসভাড়া কবে কে দিয়েছে তার হাতে! অভ্যেস হয়নি আর।
    “বড়দিরা ভালো আছে বিশু?”
    “হ, ছোটদিরা কোলকাতায় আইব কইছে পূজায়। বড়জামাইবাবুর ওপিসে ফোন করছিল ছোট-জামাইবাবু।”
    “পাম্পে জল কম উঠছে। কীযে হবে এতগুলো লোকের চান-কাচাকাচি! বিশুকে তো বাড়তি কাজ বললেই...! মান্তুর মাটাও ফাঁকিবাজ।”
    “চিন্তা কইরেননা বড়বৌদি, হইয়া যাইব।”

    উৎসবের ভীড়। ন’টার ভোঁ, বাজার দোকান, কয়লা কাঠ। বিশু মস্ত শিলনোড়ায় মশলা পেষে আদা-হলুদ-লঙ্কা-জিরে-ধনে। বড়দি; ছোড়দির দুই ছেলে-মেয়ে। অঞ্জলি, ঠাকুর দেখা। জলাভাব, অনিয়ম। দিনের শেষে তার শরীর আর বয় না।
    “অনেকগুলা কাপড় হইছে তোমার, না বিশু?”

    সে তাড়াতাড়ি টিনের বাক্স খুলে বের করে সব। সযত্নে গুছিয়ে রাখা নোতুন কাপড়ের মিঠে সোঁদা গন্ধ। ছোটদি খাটে, সে মেঝেয়।
    “ধুতি ফতুয়া মায়ে দিছে। এইখান ছোটবৌদি। বড়দির ট্যাহা দিয়াও কিনছি। শুভর বৌও।”
    “মিলের ধুতিগুলা খুব ফাইন দেখি, ভাল হইছে। আটহাতি না নয়হাতি?”

    ছোটদিও টাকা দিল। ছোটদির ছেলে তার কাশীরামদাসী মহাভারতখানা অনেকটা ছিঁড়ে দিয়েছে। কলম দিয়ে সে নিজের নামটা বানান করে করে লিখে রেখেছিল, সেটাও গেছে। বাবাঠাকুর তখন লিখতে শিখিয়েছিলেন, এখন মনে নেই।

    ছোড়দিরা কালীপুজা-ভাইফোঁটা কাটিয়ে ফিরে গেল। আবার কবে আসা হবে! পটকা আর বাজীতে বিশুর বড় ভয়, তবুও কতবার যে বেরোতে হল। কালীপুজোর রাতে মগনের বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল। মোটামোটা পুরি, আলু-চোখা, উরদ দাল, ভিন্ডি কী সবজি, বুঁদিয়া। বেশ রান্না করেছিল বৌ। সেইরাতে ঘুম এলনা বিশুর, শরীরে ভয়ানক অস্বস্তি। জল খেল বারবার, জেগে উঠে ছটফট করল। দ্বিতীয়ায় সযত্নে থালা সাজিয়ে তিন ভাইকে ফোঁটা দিল বোনেরা। বৌদিরা গেল বাপের বাড়ি। সে দরজার পাশে অন্ধকার টানা বারান্দায় চুপ। বড়দি ডাকল,
    “ওবিশু, তরেও দিমু। তর থালখান লইয়া আয়।”


    ।। তসবীর ৪ ।।

    ছোটদাকে অফিস বদলি করে দিল বিহারের টাটানগর না কোনখানে। খুব সুন্দর জায়গা, বুড়াবাবুর কাছে বলছিল ছোটদা। মগনধোপা বলে সে বিহার থেকে এসেছে, গয়ার কাছে গ্রাম। গয়ায় বিষ্ণুর উঁচু মন্দির শ্রীচৈতন্য সিনেমায় দেখেছে বিশু। গয়াসুরের গল্পও পড়েছে। বাড়ির কাছে অশোকা হলে ভালো বাঙলা সিনেমা আসে। সে দু’বার মাত্র সিনেমায় গেছে। মেজবউদি ছোটবউদি আর রত্না সিনেমা দেখতে ভালোবাসে। ছোটদা যেখানে যাবে সেটা ভাগলপুর থেকে কতদূর বিশু জানে না। ভাগলপুরে ছোটদি থাকে। সে ভেবেছিল ছোটবউদি যাবে না, অফিস আছে। আর বুবুলও স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। ছোটবউদি ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিস যায়। ছুটির পর বুবুল তার হাত ধরে নেচে নেচে বাড়ি আসে। মাঝে মাঝে স্কুলের প্যান্টে পটি করে ফেলে,সে ধুয়ে দেয়।
    “মা’কে কিন্তু বোলনা বিশুকা, এ্যাঁ? বকবে।”

    ওদের যাওয়ার তোড়জোড় চলছিল মাসখানেক ধরেই। ছোটদা গিয়ে দেখে এল জায়গা। বাসাভাড়া নিতে হল অফিসের কাছে। ছোটবউদি নাকি ওখানেও কাজ পেয়ে যাবে। মনখারাপ সকলের। ছোটদা বলে গেল, যখন খুশি আসা যাওয়া করা যায়, ট্রেণে মাত্র একদিনের জার্নি। বড়দিরা এসে দেখা করে গেল। রত্না এখন তার বাপের বাড়িতে, এই বাড়ির কাছেই। তার ছোট্ট মেয়েকে দেখতে বিশুকে নিয়ে গিয়েছিল মা আর ছোটবউদি। রিক্সার পাদানিতে কোনোরকমে বসেছিল সে। যাবার আগের দিন বুবুল গল্প শুনতে শুনতে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল হঠাৎ।
    “বিশুকা তুমি আমাদের কাছে যাবে?”

    ছোটদা চিঠিতে জানাল, বুবুল ওখানে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ইদানিং দুপুরে বিশুর খানিকটা সময় বেড়েছে। ঘুমোয় কিম্বা বই নিয়ে বসে। কাজ ফেলে রাখলে বৌদিরা রাগারাগি করে। মগনের বৌও দেশে গেছে, ফেরার ঠিক নেই। ওর জমজ ছেলে হয়েছে। বাবুর শরীর ভালোনা, শুয়েই থাকেন। ছোটদা সেই যেবার এল, সেইদিন বিশুকে বড় কাঁকড়াবিছে কামড়েছিল। কয়লার ঘরের সামনে বসে কয়লা ভাঙছিল সন্ধ্যের পরে।
    “বইয়া বইয়া ঘুমাইতেছিলি? চিপায় গিয়া বইছস! এমনেই তরে আহাম্মুক কই?”
    “জানেনই তো মা, ও ঐরকম করেই কাজ করে।”
    “কয়লার ঘরখানরে এ্যামন নুংরা কইরা রাখছস ক্যান? এ্যদ্দিন পর আইছে ছটন, অহন তর লইগ্যা দৌড়াক পোলাডা। আহাম্মুক।”

    না-বলা অভিমান জমল। তবু ছোটদাই জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে ইঞ্জেকশন দিয়ে আনল। ডাক্তার ভয় দেখাল, পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। ছোটদা বাবাঠাকুরের কাছে ছিল সেই রাত্রিটা।
    “বড়দা, এই উনানের ঝামেলা মিটাইয়া গ্যাস নিয়া নাও! এখন তো সব্বাই নিচ্ছে।”
    “কী যে কস তুই ছোটন? এট্টা এ্যাক্সিডেন্ট হইলে?”
    “হইবনা মেজদা। বৌদিদেরও ঝামেলা কমবে। এই কয়লা কাঠ কেরোসিন...। আমি তো অ্যাপ্লাই করেছি মাস দুই হল।”
    “কদ্দিনে দেয় ঠাকুরপো?”
    “তা সময় লাগবে বড়বৌদি। সাবধানে ব্যবহার করলে খুব কাজের জিনিস।”
    “ভেবে দেখি অখন...তোর বউদিরা কি অত স্মার্ট নাকি?”

    বিশু উৎকর্ণ, কাজ এবারে অর্ধেক কমল তাহলে। ছোটদারা চলে যাওয়ায় ফাঁকা লাগে ঠিকই, তবে নিজস্ব একখানা ঘর হয়েছে তার। গৃহিনীর ঠাকুরের সাম্রাজ্য নিয়ে ছোড়দার ঘরে। আগের একটেরে ছোট্ট ঠাকুরঘরটায় বিশুর স্যুটকেস, বিছানা। পালাপাবর্ণে উপহার বা অমনি কিছু হাতে জমেছে। আয় ব্যয় কোনোটাই তার নেই, সে একঅর্থে বাড়িরই ছেলে। নিজের বাড়ির কাজ করে বেতনের কথা চিন্তাও করা যায়না। মগনের বেশ রোজগার বেড়েছে বউয়ের পয়ে। গ্রামে নিজের ঘর তুলেছে। যাবার আগে বুবুলকে কোলে নিয়ে বিশুর ফোটো তুলে দিয়েছিল ছোটদা, ওটিকে বাঁধিয়ে রেখেছে।

    সন্ধ্যেবেলা গৃহিণী ডাকলেন। তাঁর আজকাল ঘনঘন হাঁফের টান ওঠে, থুতু-গয়ের সাফ করল বিশু।
    “ঠাকুরমশয়রে খবর দিছিলি? আইলেন না। সকালের হিসাব মিলাস নাই অহনও! একটাহা পঁচাত্তর পয়সার হিসাব দিস নাই। নৈবেদ্য শনিমন্দিরে দিয়া আয় গিয়া।”
    “পেটটা বড় খারাপ হইতাছে মা।”
    “তর ত লাইগ্যাই আছে। বড়খোকা আইলে ওষুধ দিয়া দিব’নে। অহন যা।”

    উটপাখি রাস্তায়। আজকাল কখনই সোজা হয়ে হাঁটতে চায়না সে। দেবু চাকরি পেয়ে টেলিভিশন বলে যন্ত্র আনল ক’দিন আগে। সাদা-কালো সিনেমার মত। চারপাই-এর উপরে রাখা। এখন ওটাতে সবাই সংবাদ দেখে। পুরোন বড় রেডিওটা ভাল চলেনা। তাসত্বেও মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পাঠ হয়, মাঝে মাঝে যাত্রা। মেজদা নোতুন এনেছে যেটা ব্যাটারিতে চলে। টাংজিটার না কী যেন নাম।


    ।। তসবীর ৫ ।।

    বুড়াবাবু স্বর্গারোহন করলেন। অষ্টাশি বছর বয়স হয়েছিল। কষ্ট পেলেননা কোনো। সবাই বলল নিরাসক্ত ঋষিতুল্য মানুষ। গৌরবর্ণ দৃঢ়মুখ, অন্যায় করেননি জীবনে। ছোটদিরা দেরিতে পৌঁছাল। বিশুর শ্বাসটুকু নেওয়ার সময় ছিলনা। গৃহিণী জটিল রোগে দীর্ঘদিন শয্যাগত। তাঁরও প্রায় আশি। বৈধব্যের সংবাদ তাঁকে তেমন করে ছুঁলনা। কিছুদিন আগে বড়জামাইবাবুও চলে গিয়েছেন। বিশু আজকাল সন্ধ্যেবেলা মেজদার কাছে বাজার খরচের মেলায়। গৃহিণীকে তাঁর আয়া বিছানায় বসিয়ে দেয়। কথা জড়ানো, অস্পষ্ট, সংসারের টান তবু। আয়া প্রতিদিনের মজুরি নেয়। সে অনুপস্থিত থাকলে বউদিরা মায়ের দেখাশোনা করে। বেডপ্যান দেওয়া ও পরিষ্কারের কাজ বিশুর। একদিন মা চলে গেলেন। তাঁর সব রইল পড়ে। তিন দাদাবাবু দাহ করে ফিরল অশৌচের ধড়াচূড়ো নিয়ে, কোমরে লোহা। তার অধিকার নেই, দায়ও নেই।
    “দাদাবাবু!”
    “আয়। তুই তো সবচেয়ে বেশি করছস মা আর বাবার জন্যে।”
    “করছি ত। আপন বাপ-মায়েরে মনে আছিল না।”
    “এইখানে ত সব পাইছস! আমাগো পাস নাই? মা-বাপ-দাদা-বউদি আপনজন?”
    “আপন? কি পাইছি কেডা জানে! মায়ে আমারে আহাম্মুক কইতেন। আপনে কামের লইগ্যা নিয়া আইছিলেন বাবুর কাছে।”
    “এত বড় নিমকহারামের কথা কইস না। ছিরাফাটা হাফপ্যান্ট পইরা আইলি মনে আছে... আশ্রমের মহারাজ কইলেন, অনাথই কওন যায়, মায়ে-বাপে পদ্মাপারে কই যেন থাকে। খাইতে পায় না...ফালাইয়া গেছে।”

    অন্ধকারে একা ঘরে চোখ ভেসে যায়। নিমকহারাম! কবে থেকে সে এদের সঙ্গে? বড়দাবাবু বলে, তার তখন ষোল না সতের। ওদেশ ছেড়ে এদেশে এসে জমি নেই, ঘরবসত নেই, আয় নেই। ব্যয় ছিল, বিশু ছিল, আর ফিরে দাঁড়ানোর সুদীর্ঘ লড়াই। আবার সব হল ধীরে ধীরে। বিশুর জন্য বেঁচে রইল অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের অনড় আশঙ্কা। কোথায় যায় সে দাদাবাবুরা তাড়িয়ে দিলে? বউদিরা ডেকে ডেকে ফিরে গেল। সে খাবেনা, তারও অশৌচ। বুবুল আজকাল বড় শান্ত, কথা বলে কম। শ্রাদ্ধ শেষে ফিরে গেল ছোটদারাও। বড়দা রিটায়ার করেছে। বড় ছেলে দেবু চাকরিতে উন্নতি করে নোতুন বাসা নিল। বাবা-মা’কে নিয়ে যেতে চায়। রবু অনেক দূর দেশে কোথায় পড়তে গেছে। দেবু নিয়ে যাবার প্রায় ঠিকঠাক, হঠাত চলে গেল বড়দা সন্ন্যাসরোগে। তার চেয়ে মাত্র পাঁচছয় বছরের বড়। এই বাড়ির ছাদ ছিল বড়দা, মা-বাবুর ভরসা। ঘোর অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরছিল বিশুকে। বড়দা থাকলে...!
    “আমারে ত একবারেও তমাগো কাছে যাইতে কইলা না দেবু...।”
    “যেও। আচ্ছা এসে নিয়ে যাব’খন একবার।”

    বড়বৌদিকে নিয়ে চলে গেল দেবু। সে মগনের ঘরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বড় হয়ে উঠেছে মগনের ছেলেরা, ইসকুলে পড়ে। আবার একটা সুন্দর খুকিও হয়েছে।
    “আমি তো রইলাম রে। চিন্তা করস ক্যান?”
    “মেজদা, আপনে আমার থিক্যা বয়সে ছুটো। না?”
    “হ। দাদার পর দিদি তারপর ছোটদি। তারপর আমি, শ্যাষে ছোটন।”

    সে কি ভেবে নিশ্বাস ফেলে। গর্তের চোখদুটো পিটপিট করে ওঠে। মেজদার কাছে বাজারের হিসেবের পাইপয়সা মেলাতে শুরু করে। মেজবউদি হাসে, মিনি-পুপে বাড়িতে থাকলে তারাও,
    “তোমাদের ঝিঙে-পটলের হিসাব আর শেষ হয়না দেখি। দুলালের এখন কাজই বা কী! এইতো চারপাঁচজনের সংসার।”
    “অভ্যাস। হিসাব না রাখলে চলবে?”


    ।। আখরী তসবীর ।।

    মিনি চাকরি পেয়ে গেল। খোঁজখবর চলছিল সুপাত্রের। দেবুরও বিয়ের ঠিক। মেজবউদির শরীরে গোলমাল, গ্যাস-অম্বল। বিশুরও প্রায়ই পেটখারাপ। ভীষণ ক্লান্তি শরীর জুড়ে, চলাফেরা কষ্টকর। মেজবউদিকে বড় ডাক্তার দেখানো হল। বাড়াবাড়ি শুরু হলে বড় হাসপাতালে ভর্তি করে দিল মেজদা। সে একবার দেখতে গিয়েছিল। ক্যান্সার। মেজবউদির গলায় আর শব্দ নেই।
    “আমি চলে গেলে তোমার মেজদাকে দেখো।”
    “ঐসব কইতে নাই, সাইরা যাইবেন। মাইয়াগো বিয়া দিবেন না?”

    মনভার করে বাড়ি ফিরল বিশু। বউদিরা তার আপনজনের মতই ছিল।
    “মাকে কেমন দেখলে বিশুকা?”
    “সাইরা যাইব। বড়বড় ডাক্তারে দ্যাখতাছে।”

    মেজবৌদির মৃত্যুতে কেমন হয়ে গেল মেজদা। সে জানতনা, এই সময় কী কথা বলতে হয়। ছোটদা-বৌদি বড়বৌদি, দিদিরা এল, বোঝাল। মেজদা ক্রমশই নিরাসক্ত।
    “মেজদা! আপনে এমন হইলে আমারে কেডা...!”

    সেদিন সামনেই কেঁদে ফেলেছিল সে। মেজদাকে ডাক্তার দেখে বলে গেলেন ফুসফুসে ইনফেকশন।
    “ডরাইস না। আমি অহন যামু না। ঠিক আছি, এই ত তুই আর আমি। যা, কাইলের বাজারের হিসাবটা লইয়া আয়।”

    বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিল মেজদা। খুব ভালো পাত্র। মিনি এলাহাবাদ চলে গেল বরের কাছে। বিশুর ইদানিং রাত্রে জ্বর আসে। সারাদিন ঘুমঘুম ভাব, কথা জড়িয়ে যায়। তোলা কাজের জন্যে লোক রাখা হয়েছে, একটি সারাদিনের মেয়েও থাকে। দেবু আসে, ছোটদাও কলকাতায় এলে এখানেই থাকে। বিশু ঘুরে ঘুরে দেখে বাড়িখানা, ফাঁকা ঘরগুলো যেন চেনা লাগে, হয়তো অচেনাও। একটা ঘরে মেজদা থাকে, রাত্রে ওষুধ খেয়ে ঘুমোয়। কত দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে গেল মেজদা। পাশের ঘরটায় পুপে আর রাতদিনের জন্যে রাখা বাচ্চা মেয়েটা। রাত জেগে পড়াশোনা করে পুপে। বন্ধ দরজার তলা দিয়ে রেখায় রেখায় টেবিল ল্যাম্পের আলো পড়ে টানা বারান্দায়। বিশুর ঘরে রাতে নীল নাইটবাল্ব জ্বলে। মাথার কাছে ইহজীবনের যাবতীয় অস্থাবর ধন। টিনের সুটকেসে গোটাকয়েক ধুতি-ফতুয়া, হাজার তিনেক টাকা, দু’তিনটে বই। কখনো সে মরণঘুম ঘুমোয়, অথবা ঘুম না এলে খসখসে হাতে পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে বেড়ায় সারারাত। পুপে বেড়িয়ে এলে ধমকায়।
    “ঘরে যাও। বাবা উঠে পড়বে। বাবার শরীর ভালো না জানো না নাকি?”
    “হ, যাই।”

    মাঝরাতে মেজদার বন্ধ দরজার পাশে বসে থাকে। ফিসফিস করে,
    “মেজদা, মেজদা...মায়ে ডাকতাছে।”

    কতদিন ওখানেই কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। শরীর চলেনা, সে আর যুঝতে পারেনা। পুপের ইউনিভার্সিটি থাকে। বাচ্চা মেয়েটা বিশুকে ভাত বেড়ে দেয়।
    “দাদু, খে’নাও এসে। দ্যাখো ভাত, আর দুবো?”
    “কম দিছস? বউদিরা আমারে কত গুছাইয়া দিত!”

    মেয়েটা ভাতের হাঁড়ি উপুড় করে দেয়। খানিক খায় সে, খানিক ছড়ায়, বিড়বিড় করে কী বলে। পেট ছাড়লে পুপেকে ছুটতে হয় ওষুধ আনতে। কথাবার্তা ক্রমশ অসংলগ্ন ঘোরঘোর, বিছানা ছেড়ে আর সে উঠতে চায় না। জল গড়ায় চোখ থেকে।

    কে জানে সেই শীতরাতে রাস্তার কুকুরগুলো কতক্ষণ কেঁদেছিল! কেনই বা পুপে ওই কাকভোরে উঠেছিল। তখন নীচে উঠোনভরা কনকনে জলে উলঙ্গ সংজ্ঞাহীন কঙ্কালসার যেন গভর্চ্যুত বয়স্ক ভ্রূণ পা দাপিয়ে ছটফট করছিল। ঠোঁট নড়ছিল ভীষণ অস্পষ্ট ‘মা মা, আমারে নিমকহারামি কইছে দাদারা...আঃ আঃ...।’

    গলা কাঠ, পুপে নিজের শালটা মুঠোয় চেপে আতর্নাদ করে উঠেছিল,
    “বাবা-আ...শিগগিরি নীচে এসো!”



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)