• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫০ | ফেব্রুয়ারি ২০১২ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share
  • হিয়ার গল্প : সুব্রত সরকার


    || এক ||

    শুভ্রকাকু অ্যানিকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছে। গল্পটা কাগজে ছাপাও হয়েছে। কি সুন্দর রঙিন ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে। অ্যানির তো খুব মজা। আহ্লাদে একেবারে আটখানা! একে বলে। তাকে বলে। ওকে শোনায়। তাকে শোনায়। গল্পটায় হিয়ার নামও আছে। কিন্তু সেই গল্পে হিয়া খুব পুঁচকে একটা মেয়ে। একটুখানি তার কথা। তাই হিয়ার খুব অভিমান। রাগ হয়েছে শুভ্রকাকুর উপর। আড়ি করেছে মনে মনে। শুভ্রকাকু, প্রমিস। তোমার সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলব না। তোমার কোনো গল্প আমি পড়ব না। নতুন গল্প শোনাতে এলেও শুনব না। তুমি আর আমার বন্ধুকাকু নও। শুধুই শুভ্রকাকু!

    হিয়ার এই গোপন রাগের কথা, অভিমানের কথা, ঠোঁট ফুলিয়ে দুঃখ পাওয়ার কথা মা সব বুঝতে পেরে গেছে। মায়ের সঙ্গে হিয়ার খুব ভাব। মা হল হিয়ার বেস্ট ফ্রেণ্ড। মাকে এসব কথা বলা চাই। মার সঙ্গে মজা করা চাই। সেদিন কাচের গুলিগুলো নিয়েও দুজনে কত মজাই না করল। মাকে হিয়া একটুও কাছছাড়া করে যেন থাকতে চায় না। মা অফিস থেকে এলে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। মায়ের গায়ের গন্ধ শোঁকে। আদর করে। মা তখন বারবার বলে, ওরে আমার পোশাকটা পাল্টাতে দে। আমি তো ঘামছি। গায়ে আমার ঘামের গন্ধ। ছাড়। ছাড়। হিয়া তখন আরও জাপ্টে ধরে আদর করে বলে, না। তোমায় ছাড়ব না। তোমার গায়ে মায়ের গন্ধ। এই গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে। উম্‌ম্‌ ...

    -- তুই তো বড্ড হিংসুটি। শুভ্রকাকু গল্পে তোর কথাও তো লিখেছে। মা হাসতে হাসতে বলল।

    হিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, আমি কি পুঁচকে মেয়ে! গল্পে আমি একদমই ইমপর্টেন্স পাইনি। অ্যানি আর অ্যানির অঞ্জনা আন্টিই তো সব। আমি নমঃ নমঃ।
    -- তা লেখক যা মনে করবেন তাই তো লিখবেন।
    -- লেখকটা কে? শুভ্রকাকু আমাকে পুঁচকে মেয়ে মনে করল কেন? শুধু কয়েকবার আমার নামটা গল্পে না দিলেও তো পারত?
    হিয়ার রাগ চড়তে থাকে। মা এবার মজা করে বলল, বেশ তো তুইও একটা গল্প লেখ না। সেখানে শুভ্রকাকুকে ছোট্ট ছেলে করে দে। ইমপর্টেন্স কমিয়ে দিয়ে মজা কর। দেখ না শুভ্রকাকু কেমন জব্দ হয়!

    হিয়া একথায় চমকে ওঠে। অবাক হয়ে বলে, মা, আমি গল্প লিখতে পারব?

    কেন পারবি না! মা হিয়াকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, তুই তো কত বই পড়িস। কি সুন্দর গান করিস। কথা বলিস। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত গাছ দেখিস। পাখি দেখিস। ছাদে উঠে নক্ষত্র দেখিস। তারাদের চিনিস। তুইও পারবি গল্প লিখতে। শুধু একটু ভাবতে হবে। চিন্তা করতে হবে। কল্পনাকে মেশাতে হবে। দেখবি তখন তুইও গল্প লিখতে পারছিস।

    -- কিন্তু গল্প তো বানিয়ে বানিয়ে লিখতে হয় মা।
    -- তাই লিখবি। দেখিস না শুভ্রকাকু কেমন চেনা চেনা জিনিসগুলোর মধ্যে থেকেই অচেনাকে খুঁজে বের করে গল্প লেখে। তোকেও এমন খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে।

    হিয়ার রাগ হঠাৎ কেমন জল হয়ে গলে যায়। সব অভিমান ভুলে যায়। শুভ্রকাকুর ওপর আর রাগ হয় না। একটু আগেও রাগ করে মনে মনে বলেছে, তোমার সঙ্গে আড়ি। তোমার গল্প আর কোনোদিন পড়ব না। ট্রেকিংয়ের ছবি দেখাতে এলেও দেখব না। সুন্দরবনের কথা শুনতেও চাইব না। তোমার ওই স্কুলেও বেড়াতে যাব না। লজ্জা পেল হিয়া। ছিঃ, এসব আর ভাববে না। এখন খালি ভাবছে, সত্যিই তো একটা গল্প লিখলে কেমন হয়? মা তো দারুণ কথা বলল। কিন্তু কেমন করে লিখতে হয় গল্প? কিভাবে শুরু করব? কেমন করে সাজাব গল্পটাকে? শেষ করবই বা কি ভাবে?

    শুভ্রকাকু, তুমি বলবে? শেখাবে আমায় গল্প লেখা? আমি তোমার মতো গল্প লিখতে চাই শুভ্রকাকু!....


    ।। দুই।।

    হিয়ার স্কুলের ম্যাগাজিনের নাম 'এক্সপোজার'। এক্সপোজার প্রকাশের দায়িত্বে আছেন বেঙ্গলি আন্টি এস ডি জি। আন্টির পুরো নাম সঙ্গীতা দাশগুপ্ত। সঙ্গীতা-ম্যাম হিয়াকে খুব পছন্দ করেন। হিয়ারও খুব ভালো লাগে ম্যামকে। ম্যাম আজই বললেন, হিয়া এবছর তুমি ম্যাগাজিনের সাব এডিটর। বন্ধুদের বলো লেখা দিতে। ছবি দিতে। আর তুমিও লিখবে কিন্তু। তোমার লাস্টইয়ারের ভ্রমণকাহিনিটা খুব ভালো হয়েছিল। ল্যাঙ্গুয়েজটা ছিল দারুণ লুসিড। ভীষণ ঝরঝরে। এমন সুন্দর বাংলা পড়তে খুব ভালো লাগে।

    'গোয়ার সৈকতে সাতদিন' -- এই নামে হিয়া একটা ভ্রমণকাহিনি লিখেছিল ম্যাগাজিনে। সে লেখা পড়ে বন্ধুরা তো দারুণ বলেছেই। ম্যাডামরাও প্রশংসা করেছিলেন। সেই লেখাটায় মার অনেক টাচ্‌ ছিল। মা সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছিল। মা সাহিত্য খুব ভালো বোঝে। ভীষণ ভালোবাসে সাহিত্য।

    আজ স্কুল থেকে এসে হিয়া খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল, চিন্তিত হয়ে বসে রইল। মা জিজ্ঞেস করল, কি রে, কি এত ভাবছিস?

    হিয়া গম্ভীরভাবে বলল, সঙ্গীতা-ম্যামকে বলেছি, এবছর আমি গল্প লিখব। ম্যাম তো খুব খুশি। কিন্তু কি লিখব তাই তো ভেবে পাচ্ছি না!

    মা মুচকি মুচকি হাসছে। হাসতে হাসতে বলল, কেমন মজা? লেখকের কষ্ট বুঝতে পারছো? ভাবো। চিন্তা কর। কল্পনাকে ডানা দাও। গল্প হবে।

    হিয়া কষ্টের মধ্যেও হেসে বলল, মা, কিভাবে লিখব সত্যি বল না। বল না, গল্প কিভাবে শুরু করতে হয়? মা, প্লিজ হেল্প মি!


    ।। তিন।।

    'পাখিপাহাড়ে পিকনিক' এই নামে একটা গল্প তিনদিনের চেষ্টায় লিখে ফেলল হিয়া। জীবনে প্রথম লেখা এই গল্পটা লিখতে মা ওকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। কিন্তু লেখাটা হিয়ারই। ভাবনাটাও হিয়ারই। মা শুধু ভাবতে সাহায্য করেছে। আর লিখতে লিখতে যখনই আটকে গেছে, অসুবিধায় পড়েছে -- মুশকিল আসান মা। সেই প্রথম লেখা গল্প আজ দুরু দুরু বুকে সঙ্গীতা-ম্যামকে দিয়েছিল। ম্যাম গল্পটা হাতে পেয়ে বলেছিলেন, আমি আজই পড়ব। টিফিন আওয়ার্সে তোমায় জানাব।

    টিফিন আওয়ার্সে সঙ্গীতা-ম্যাম হিয়াকে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, দারুণ হয়েছে। গল্পের থিম তো আমার চেনা। চরিত্রগুলোকেও বুঝতে পারছি। আমাকে তো তুমি গল্পে দারুণভাবে প্লেস করেছো। আই অ্যাম ভেরি মাচ অনার্ড।
    হিয়া তখন লাজুক হেসে বলে, থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম!

    স্কুল থেকে গতবছর এডুকেশনাল ট্যুরে পুরুলিয়ার অযোধ্যাপাহাড় ও পাখিপাহাড়ে গিয়েছিল হিয়া। পঁচিশজনের সেই টিমে সঙ্গীতা-ম্যামও ছিলেন। পাখিপাহাড়ে নেচার স্টাডি ক্যাম্প করে থাকার সময় একটা বেশ অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল হিয়ার। সেই অভিজ্ঞতার কথাই গল্পে বুনে দিয়েছে। সঙ্গীতা-ম্যাম তাই খুব অবাক হয়েও ভীষণ খুশি। একসময় ম্যাম কৌতূহল দেখিয়ে বললেন, হিয়া, তুমি ওই ট্রাইবাল মেয়েটাকে কোথায় দেখলে? ওর কথা এত সুন্দরভাবে জানলে কেমন করে?
    -- ও জঙ্গলে কাঠ কুড়োচ্ছিল। আমি ওকে বিস্কিট দিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে গল্প করেছিলাম। তখন ও আমাকে পাখির ওই নীল সুন্দর পালকটা গিফট্‌ করেছিল। ওটা নাকি নীলকণ্ঠ পাখির পালক!
    -- তাই! বাঃ। কি নাম যেন মেয়েটার?
    --খুশি। খুশি টুডু।
    -- ওটাই ওর নাম বুঝি?
    -- হ্যাঁ। ও সাঁওতালি মেয়ে। ক্লাস ফোর-এ পড়ে বলেছিল।
    --তাই! ম্যাম মুগ্ধ হয়ে বললেন, তুমি ওকে গল্পে দারুণভাবে নিয়ে এসেছো। ওর কথাগুলো সুন্দরভাবে বলতে পেরেছো। গল্পটা ভেরিমাচ সেনসেটিভ। আই থিঙ্ক, সবাইকে টাচ্‌ করবে!


    ।। চার।।

    স্কুল ম্যাগাজিন 'এক্সপোজার'-এ হিয়ার জীবনের প্রথম লেখা গল্প 'পাখিপাহাড়ে পিকনিক' প্রকাশিত হল। সবাই পড়ে বলছে, ভীষণ ভালো হয়েছে। খুব সুন্দর হয়েছে। বন্ধুরা বলছে, হিয়া কনগ্রাটস্‌। আরও লেখ। চালিয়ে যা। বাবাও খুব খুশি। একটু যেন গর্বিত। মা তো ভীষণ চাপা। কিচ্ছু বুঝতে দিতে চায় না। হিয়া তবু মার আনন্দ টের পায়। ও তো জানে, গল্পটায় মা-র অনেক ছোঁয়া আছে। স্পর্শ আছে। তবেই না গল্পটা এত সুন্দর হল। এত মানুষের প্রশংসা পেল।

    আজ স্কুল থেকে ফিরে ছটফট করছে হিয়া মায়ের জন্য। মা অফিস থেকে ফিরতেই হিয়া জাপ্টে ধরে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ! মেনি মেনি থ্যাঙ্কস্‌!
    মা তো অবাক হেসে বলল, কিসের জন্য?
    ফর ইওর কাইণ্ড কো-অপারেশন। বিকজ আই হ্যাভ ফিনিশড্‌ মাই ফার্স্ট স্টোরি রাইটিং ইন মাই লাইফ, অ্যাণ্ড ইট ইজ ওয়েল একসেপ্টেড!
    -- ওঃ। মা হাসতে হাসতে বলল, তাহলে তো সেটা আমার প্রাপ্য নয়।
    হিয়া অবাক হয়ে বলল, মানে! কার প্রাপ্য? হু ইজ দ্যাট পার্সন?
    মা হাসছে। কথা বলছে না কোনো।
    হিয়া ছটফট করে বলল, বল না মা কে? প্লিজ!
    -- এই থ্যাঙ্ক ইউটা তোর শুভ্রকাকুকেই জানানো উচিত।
    -- হোয়াই? হিয়া অদ্ভুত হেসে জানতে চাইল।

    মা হিয়াকে এবার কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলল, তুমি যখন লিখতে লিখতে অসুবিধায় আটকে যেতে, আমার কাছে জানতে চাইতে মনে আছে তোমার, আমি একটু সময় চেয়ে নিতাম।
    -- হ্যাঁ। নিতে তো। মনে আছে। কিন্তু--
    -- আসলে আমি তখন ফোনে শুভ্রকাকুর থেকে সে-সব টিপস্‌গুলো জেনে নিতাম। আর তোমায় এভাবেই সাহায্য করতাম।
    তাই! হিয়ার বিস্ময় যেন ফুরায় না।
    মা হাসছে। হাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ, তাই!

    হিয়া এবার মাকে সজোরে জাপ্টে ধরে বলল, উম্‌, আমায় বলোনি কেন? প্লিজ দাও শুভ্রকাকুর নাম্বারটা। আমি এক্ষুনি ফোন করে থ্যাঙ্ক ইউ জানাব। থ্যাঙ্ক ইউ শুভ্রকাকু। থ্যাঙ্ক ইউ। ইউ আর মাই ডিয়ার শুভ্রকাকু!



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)