• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৫০ | ফেব্রুয়ারি ২০১২ | গল্প
    Share
  • ভাঙা কলমের আন্তরিকে : সুবীর বোস


    নুপম কিছু কথা

    পাপড়ি আমার থেকে ইঞ্চি ছয়েক লম্বা। আমি পাঁচ-দুই, পাপড়ি পাঁচ-আট। আমি পাপড়ির সঙ্গে প্রচুর ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করলেও ওকে সঙ্গে নিয়ে কখনও ক্রিকেট খেলা দেখতে যাই না। কারণ, লক্ষ্য করে দেখেছি ক্রিকেট মাঠে ও আমার পাশে থাকলে,

    ১) মাথার উপর দিয়ে ঘনঘন প্লেন উড়ে যায়।
    ২) সব সর্ট-পিচ বলকেই বাউন্সার বলে মনে হয়।
    ৩) কুড়ি ওভারের খেলা দশ ওভারে শেষ হয়ে যায়।

    এ ব্যাপারে পাপড়ির বক্তব্য হল, পৃথিবীর সব কাচই আসলে চুরমার হতে ভয় পায় আর আশ্চর্য ব্যাপার হল এই যে, প্রবল বৃষ্টিতে ভিজলে আমরাও কেমন যেন ব্যবহৃত কাচ হয়ে যাই। আমাদের গা বেয়ে তখন একই সঙ্গে জ্বর আর জল ঝরে পড়ে।

    পাপড়ি এ রকমই। প্রথমে ও যত্ন করে টবে পাতা-বাহার গাছ লাগায়, তার জন্মদিন পালন করে, তারপর নিয়ম করে পাতা থেকে বাহার খুলে নিয়ে কবিতা লেখে। আমি ওর এই স্বভাবটা জানি বলেই একদিন সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ বাতাবরণে ঢুকে পড়ে সাইকেলের ক্ষেত্রে কোমরের ভূমিকা নিয়ে একটা কঠিন রচনা লিখে ওকে পড়তে দিয়েছিলাম। সে রচনার কয়েক লাইন পড়েই পাপড়ি জানতে চাইল—
    —আচ্ছা অনুপম, কুয়াশায় কার দর বেশি? সাইকেলের নাকি কোমরের?
    —এ ব্যাপারটা নির্ভর করে এই রচনায় একবারও উল্লেখ না থাকা জানালার উপর। আমি ছোট্ট করে উত্তর দি’।
    —সে জানালা কি গরাদহীন?
    —এ ব্যাপারটা আসলে একটা নয়, দুটো জানালার উপর নির্ভরশীল।
    —ঠিক বুঝলাম না।
    —না বোঝার কিছু নেই। যদি একটা জানালা পুরো খোলা থাকে, অন্যটা হাফ-খোলা, তাহলে সাইকেলের দর বেশি। যদি দুটো জানালাই হাট-খোলা থাকে, তাহলে কোমরের দর বেড়ে যায়।
    —হুম বুঝলাম। পাপড়ি যেন একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

    এরপর পাপড়ি একবারও না থেমে পুরো রচনাটা শেষ করে। আমরা কথা বলছিলাম আমার ঘরে বসে। সবে ভাবছি আবারও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, দেখলাম বারান্দায়, কতক্ষণ কে জানে, কাঁচুমাচু বসে আছে চন্দন, আমাদের ফুটবল টীমের ক্যাপ্টেন। বেচারা এত ভালো ফুটবল খেলে, কিন্তু ক্রিকেটটা একদমই খেলতে পারে না। এ নিয়ে ভিতরে ভিতরে ওর একটা কষ্ট আছে, সেটা আমি তো বুঝিই, সম্ভবত পাপড়িও বোঝে।

    পাপড়িই হাঁক পাড়ল, চন্দন ওখানে বসে কেন, ভিতরে এস। চন্দন ভিতরে এল, হাতে একটা পুরোনো দিনের রোঁয়া ওঠা ক্রিকেট ব্যাট। ঘরে ঢুকেই ও হাতের ক্রিকেটা ব্যাটটা পাপড়ির দিকে তুলে ধরে বলল, জানো পাপড়ি, এই ব্যাটটা সেই মধ্যযুগের গাছ কেটে বানানো।

    পাপড়ি কি এ’ কথা শুনে একটু রেগে গেল? খুব কেটে কেটে ও চন্দনকে বলল, মধ্যযুগ হোক বা প্রস্তরযুগ, তাতে আমার কী? চন্দনও দেখলাম একটুও না দমে বলল, পাপড়ি, আমাকে ভালো ক্রিকেটার হবার সঠিক পদ্ধতিগুলো একটু বুঝিয়ে দেবে?

    পাপড়ি ততক্ষণে রচনা ছেড়ে আবার তার কবিতায় মনযোগী হয়ে পড়েছে। সে তার কবিতার খাতা থেকে মুখ না তুলেই বলল, ও তুমি অনুপমের থেকে শিখে নিও, এ ব্যাপারটা ও খুব ভালো বোঝে।

    পাপড়ির এমনতরো উপেক্ষায় চন্দন দুখী হল নাকি রেগে গেল ঠিক বোঝা গেল না। ও কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বসে রইল, তারপর খুব আস্তে আস্তে বলল, আগে ভাবতাম ঝড় উঠলে সকলেরই আম কুড়ানোর অধিকার আছে, কিন্তু এখন দেখছি...।

    ও কথাটা অসমাপ্ত রেখে উঠে দাঁড়াল। আমার চন্দনের জন্যে কষ্ট হচ্ছিল বলে বললাম, শোন্‌। চন্দন সঙ্গে সঙ্গে বলল, পাপড়ি। একটু অবাক আমি জিজ্ঞেস করলাম, মানে তুই কী বলতে চাইছিস? চন্দন একটু হেসে বলল, জিভে দিলে গলে যায়, আহা রে কী পুষ্টি। চন্দনের কথা শুনে পাপড়ির বিরক্ত চোখ একবার উর্ধগামী হয়েই আবার নেমে গেল তার কবিতার পাতায়।

    চন্দন চলে গেছে প্রায় আধঘন্টা আগে, আর পাপড়ি গেছে মিনিট দশেক হল। ক্রিকেটা খেলার সঙ্গে সঙ্গে আমার তুলি ধরা হাতটাও বেশ নাম করেছে বলে মাঝে মাঝে এদিক-সেদিক থেকে এটা-সেটার ডিজাইন করার অর্ডার পাই আমি। ওরা চলে গেছে। ঘর ফাঁকা। আমি তাই ‘সোজাসুজি বেঁচে থাকা’ নাম দিয়ে একটা চপ্পলের ডিজাইন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রথমে ভাবলাম, রাবার সোল-ই ভালো। বেশ নরম, হাঁটতে কষ্ট হয় না। তারপর ভেবে দেখলাম, রাবার সোল একটু বেশি তাড়াতাড়ি ক্ষয়ে যায়। অনেক ভেবে চিন্তে উইলো কাঠের সোল রাখব ঠিক করলাম। উপরে থাকুক গীটারের তার আর সেই তারের জনপ্রিয়তা। উফ্‌, হাঁটা তো নয়, যেন সঙ্গীত সন্ধ্যায় প্রিয় সঙ্গী নির্বাচন।

    কাজটা সবে শেষে হয়েছে, এর মধ্যে একদম শব্দ না করে আমার ঘরে ঢুকে পড়ল রাধেশ্যামদা, পাড়ার নামকরা জুতোর ব্যবসায়ী। রাধেশ্যামদা ঘরে ঢুকে প্রথমেই একটা আন্তরিক হুঙ্কার ছুঁড়ে দিলেন, কিরে জুতোর ডিজাইন শেষ হল? আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ, রাধেশ্যামদা, এই মাত্র শেষ হল। “কোথায় দেখি?” বলে রাধেশ্যামদা হাত বাড়ালেন। আমি ডিজাইনটা ওর হাতে তুলে দিয়ে কলতলার দিকে মুখ করে বসলাম। এ সময় ওই কলতলায় একটা “জোড়া ভুরু, নাকে নথ” শালিক আসে, গা ভেজায় তারপর গা ঝাড়া দিয়ে দু-চারটে রোঁয়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, আমাকে কাঁপিয়ে উধাও হারিয়ে যায় কোথাও। সবে সে শালিকের গা ভেজানো পর্ব শুরু হয়েছে, আমিও মনযোগী দর্শকের মতো সেই ধ্রুপদী স্নানে ডুবে যাচ্ছি, তাল কাটল রাধেশ্যামদার চীৎকারে, এটা কী হল? উইলো কাঠের সোল? ইয়ারকি মারছিস? আমি তখন কলতলা নিয়ে বেজায় ব্যস্ত। তাই রাধেশ্যামদার দিকে পিছন ফিরেই বললাম, দেখ ছোট-বড় সব ইনিংসের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী হল কলতলা। রাধেশ্যামদা আমাকে এক ধাক্কায় তার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
    —আমি জিজ্ঞেস করলাম উইলো কাঠের সোল কেন, আর তুই তার জবাবে বলছিস ছোট-বড় সব ইনিংসের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী হল কলতলা। এত হাবিজাবি বকছিস কেন?
    —কলতলা বলেছি নাকি? স্যরি। আসলে ওই কলতলাটা বদলে গিয়ে উইলো কাঠ বসবে। আমি কথা বলতে বলতে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম শালিকটা উড়ে গেল। কিন্তু আজ কেন জানি না গা ঝাড়া দিল না।
    —তাতে কী হবে? রাধেশ্যামদা নাছোড়।
    —দেখ, কুড়ি ওভার, পঞ্চাশ ওভার বা পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচ, সবই তো টেনে দিচ্ছে ওই উইলো কাঠ, তাই না? আমি সমর্থন পাবার আশায় তাকাই রাধেশ্যামদার দিকে।
    —কেন, আমি কি খালি ক্রিকেটারদের জুতো বেচব নাকি?
    —তুমি বুঝতে পারছ না, আমরা যারা ফুটবল খেলি বা ব্যাডমিন্টন খেলি, তারাও মনে মনে ক্রিকেটটাই খেলতে চাই।
    —তবে সবাই ক্রিকেট খেলে না কেন? রাধেশ্যামদা মনে হল একটু কাবু হয়েছে।
    —আসলে শরীর দেয় না তো, তাই আর কী!

    রাধেশ্যামদা আমার ব্যাখ্যায় খুশি না অখুশি সেটা বুঝলাম না কিন্তু দেখলাম সে ‘সোজাসুজি বেঁচে থাকা’ হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আমিও “বাঁচা গেল” ভেবে ফুড়ফুড়ে আনন্দে বাইরে তাকিয়ে দেখি কয়েকটা পরিচিত মৌমাছি গলির দেয়ালে ইংরেজীতে প্রথমে নিজেদের নাম তারপর প্লাস চিহ্ন দিয়ে অন্য কারও নাম লেখার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝেই ভাঙা ইঁটের গর্তে দুয়েকটা অক্ষর ঢুকে পড়ছে আর আমার ভিতর থেকে যেন কেউ বলে উঠছে, অমর শহীদ......আমরা তোমায় ভুলছি না, ভুলব না। আমার এইসব “ভুলছি না, ভুলব না” শুনলেই কেন জানি মনে হয়, “ভুলে যাব” এই আশঙ্কাই আসলে আমদানি করেছে ওই সব শপথ বাক্যের। একটু পরেই খেয়াল করলাম, একদম ভুলে গেছি যে, বৌদির জন্যে ওষুধ আনতে হবে। বৌদি সেই কখন বলেছে ওষুধ আনার কথা। বাবা-মা তো সেই ক’বেই সব ছেড়ে দেয়ালে ছবি হয়ে ঝুলছেন। এখন দাদা-বৌদিই আমার সব। আজ দাদা যদিও বাড়িতেই আছে, তবু বৌদি চাইছে ওষুধটা আমিই এনে দি’।

    তাড়াতাড়ি বেরোলাম। আমাদের বারান্দা পেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই মৌমিতার সঙ্গে দেখা। আমাকে আদৌ পাত্তা দেয় না মেয়েটা। তবে শুনেছি ও নিয়মিত ক্রিকেট মাঠে যায়, ভালো বোলিং করে এবং রাধেশ্যামদার সঙ্গে ওর খুব ভালো যোগাযোগ আছে। খুব আফশোষ হচ্ছিল রাধেশ্যামদাকে উইলো কাঠের ডিজাইনটা অত তাড়াতাড়ি দিয়ে দেবার জন্যে। কী জানি, এখন যদি মৌমিতা বোলিং করতে চায়, আমার কাছে তো সে ডিজাইনটা নেই। কী হবে! দেখলাম মৌমিতা আমাকে পাত্তা না দিয়ে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত আমিও, “আমার কী, আমি তো বৌদির জন্যে ওষুধ আনতে যাচ্ছি” ভেবে হাঁটা দিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে মৌমিতার ডাক, অ্যাই অনুপম, দাঁড়া, তোর সঙ্গে কথা আছে—
    —কথা আছে? আমি তো উইলো কাঠের আলপনা দিয়ে গড়া “সোজাসুজি বেঁচে থাকা” রাধেশ্যামদাকে দিয়ে দিয়েছি। আমি তাড়াতাড়ি মুক্তি পেতে চাই।
    —হ্যাঁ, রাধেশ্যামদা আমাকে দেখিয়েছে তোর ডিজাইন করা জুতো। সুন্দর হয়েছে ডিজাইনটা। তবে পুরো সোলটা উইলো কাঠের না হলেই ভালো হত।

    মনে পড়ল, একই কথা রাধেশ্যামদাও বলছিল। আমি কি একটু বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেললাম! আমি কি একটু বেশি ক্রিকেটমুখী হয়ে পড়লাম! ভাবলাম, এই তালে মৌমিতার থেকে একটা আইডিয়া বিনি পয়সায় পেলে মন্দ হয় না। বললাম,
    —কেন, তোর কি এর থেকেও ভালো কোনও আইডিয়া জানা আছে নাকি?
    —না, মানে হ্যাঁ...
    —পরিষ্কার করে বল তো কী বলতে চাস। আমি ধৈর্য হারাই।
    —আমি বলছিলাম, তুই কিছুটা জায়গা রাবারে মুড়ে দিলে ভালো করতি। মানে ক্রিকেট ব্যাটে গ্রিপিংয়ের সুবিধার জন্যে যেমনটা করা হয় আর কী।

    মৌমিতার আইডিয়াটা আমার ভালো লাগল। সব চেয়ে বড় কথা এ মেয়েও তো ক্রিকেট প্রেমী। ফলে ওর উদাহরণগুলোও সব ক্রিকেট-ছোঁয়া আর কী! মন ভালো হয়ে গেল। বললাম,
    —হুম্‌ম্‌, তুই আইডিয়াটা খারাপ দিসনি। ঠিক আছে এ নিয়ে তোর সাথে আরও ডিটেইলসে পরে আলোচনা করব। এখন আমি বৌদির জন্যে ওষুধ আনতে যাচ্ছি।
    —আজ বিকেলে ফ্রী আছিস? ফ্রী থাকলে চলে আসিস নবীন সংঘের মাঠে। মৌমিতার আমন্ত্রণ।

    শুনেছি মৌমিতার আমন্ত্রণ যারাই গ্রহণ করেছে, তারা একই সঙ্গে “লিলি-টমসন”এর বোলিংয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এও শুনেছি, মৌমিতা এখন প্রাণপণে একজন “ভিভ রিচার্ডস”এর খোঁজে আছে। আমি বিপদ এড়াতে আলোচনা আর না এগিয়ে বললাম,
    —না রে, সময় হবে না আজ। ইন ফ্যাক্ট এ সপ্তাহটা আমি খুব বিজি থাকব। একটা কালো গোলাপ গাছের ডাল পেয়েছি। ওটার এক মাথায় গোবর লাগিয়ে, অন্য মাথাটা মাটিতে পুঁতে দিয়ে দেখতে হবে বাগানে ফুল আসে কিনা।
    —ঠিক আছে তবে নেক্সট উইক...। মৌমিতা ডান দিকের গলিতে ঢুকে যায়।

    আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। ওষুধের দোকানে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমি পয়সা আনতে ভুলে গেছি। সত্যি এমন ভুল যে কী করে করলাম কে জানে। সব দোষ ওই শালিকটার আর রাধেশ্যামদার। মনে পড়ল, আজ শালিকটা গা ঝাড়া না দিয়েই উড়ে গেছে। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম, ‘দাম পরে দিয়ে যাব’ বললে চাঁদুদা, দোকানের সেলসম্যান, পয়সা ছাড়াই এখন ওষুধটা আমাকে দিয়ে দেবে। কিন্তু মনে হল যাই বাড়ি ফিরে পয়সা নিয়েই আসি, কী জানি যদি কলতলায় ফের ফিরে আসে সে শালিক! বাড়ি ফিরে আচমকা চোখে পড়ল বৌদির ঘরের জানালার পর্দাটা উড়ছে বেখাপ্পা। আমি কি বড্ড তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলাম? পর্দার ওপাশে দাদা আর বৌদির আশ্চর্য খেলা দেখে অকাল প্রয়াত কবি প্রবীর দাশগুপ্তের কবিতার একটা লাইন মনে এল—
    “দূরে যে বরফ পড়ে আমি তার ছোটকাকু হই”।



    নুপম আরও কিছু

    কালো গোলাপের ডালটার জন্যে কিছুটা সময় দিতেই, কী আশ্চর্য, সে দিব্যি বেঁচে উঠল। ডালটার এক মুখ গোবরে ঢেকে দিয়ে, অন্য মুখ চালান করে দিয়েছিলাম মাটির নীচে। কয়েকদিনের মধ্যেই খেয়াল করলাম, কিছু কচি পাতা, শরীরে হাল্কা আভা নিয়ে সে গোলাপের ডাল বেড়ে উঠছে। আমি আরও মন দিয়ে বাগান পরিচর্যার কাজে লেগে পড়ি। সব ঠিকঠাক চললে, আর মাস খানেক পরেই আমার বাগানে ‘কালো গোলাপের সঙ্গীত সন্ধ্যা’ অনিবার্য। মাঝে একদিন পাপড়ি, যেমন আসে, এসেছিল কয়েকটা কবিতা হাতে। ওর কবিতায় লক্ষ্য করে দেখেছি, পাতা থাকে কিন্তু ফুল থাকে না। এ নিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করা মাত্র ও বলল, অনুপম, তুমি ক্রিকেটটা ভালো বোঝ, তুমি ক্রিকেট নিয়ে কিছু বললে শুনব। কিন্তু কবিতার তুমি কিস্‌সু বোঝ না। কবিতা নিয়ে তুমি কিছু বললে আমি শুনব কেন? একটুও উত্তেজিত না হয়ে ওকে বললাম,
    —মনে রেখ, কবিতা আর ক্রিকেটের একটা পারস্পরিক বোঝাপড়া আছে।
    —সেটা কী রকম? পাপড়ির অবাক প্রশ্ন।
    —খেয়াল করলে দেখবে ক্রিকেটের অনেক আগেই কবিতায় হেলমেট এসেছে। আমি প্রাঞ্জল হবার চেষ্টা করি।
    —কবিতায় হেলমেট? তোমার মাথাটা কি গেছে অনুপম? পাপড়িকে বেশ বিরক্ত মনে হল।
    —হ্যাঁ, কবিতায় হেলমেট আছে তো। বলতে চাইছি কবিতায় হেলমেট এসেছে বহুদিন আগে, অনেকটাই আগে। আমার বক্তব্যে আমি অটল থাকার চেষ্টা করি।
    —তুমি একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দাও তো তোমার বক্তব্য।
    —মনে নেই, কবিগুরু লিখলেন, “রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে”। ওটা হেলমেট নয়?
    —কবিগুরুর এই বিখ্যাত লাইনে তুমি হেলমেট কোথায় পেলে অনুপম?
    —পাপড়ি, খেয়াল করে দেখ, “দিনের আলো” এখানে হেলমেটের কাজ করেছে, আড়াল করেছে সমস্ত তারাদের।

    আমার উত্তর শোনার পর পাপড়ির মুখটা পাঁপড়ের মতো হয়ে গেল। ও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর একসময় খুব নীচু গলায় আমাকে বলল,
    —অনুপম, আমি তো জানতাম, তুমি ক্রিকেট নিয়েই ব্যস্ত থাকো। কবিতা বলতে আমি যতদূর জানি, তুমি শুধু আমার কবিতারই খোঁজ রাখো, কারণ আমি নিজেই সেগুলো তোমাকে পড়ে শোনাই। তুমি কি লুকিয়ে লুকিয়ে আজকাল অন্যের কবিতাও পড়? কবিতা নিয়েও ভাব?
    —লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ব কেন? আমি তো সময়-সুযোগ পেলেই কবিতা পড়ি।
    —হঠাৎ করে এমনতরো কবিতাপ্রেমী হবার পিছনে নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। কী সেই কারণটা সেটা কি জানতে পারি অনুপম? পাপড়ি আমাকে মেপে নিতে চায়।
    —যেহেতু ভালো ক্রিকেট খেলতে গেলে কবিতা জানাটা জরুরী, আমি সময় সুযোগ পেলেই একবার কবিতার পাড়ায় ঘুরে যাই।
    —হুম্‌ম্‌, বুঝতে পারছি, তোমার ক্রিকেট দর্শন বাঁক নিচ্ছে অন্যদিকে। আমি বুঝতে পারলাম না, পাপড়ি কথাগুলো হতাশা থেকে বলল কিনা!
    —ধন্যবাদ পাপড়ি। খুব সুন্দর বললে তুমি। পাপড়ির প্রশংসা বাক্য শুনে আমি তখন বেশ তৃপ্ত।
    —তো, কার কবিতা পড় তুমি অনুপম? পাপড়ি আলোচনার আরও গভীরে ঢুকতে চায়।
    —তোমার কবিতা পড়ি। বিখ্যাত কবিদের কবিতা পড়ি। একই সঙ্গে উঠতি অনেক কবির কবিতাই পড়ি।
    —এই জন্যেই কি আজকাল আমার কবিতাকে একদম পাত্তা দিচ্ছ না অনুপম? পাপড়িকে একটু যেন বিমর্ষ দেখায়।

    পাপড়ির কবিতা যে আমি আজকাল খুব একটা পড়ি না বা পাত্তা দি’ না, এটা ও বুঝে গেলে গণ্ডগোল। তাই আলোচনাকে একটু অন্য দিকে নিয়ে যাবার জন্যে বললাম, পাপড়ি, তোমার কবিতার একটা লাইন আমাকে আজকাল খুব ভাবায়। পাপড়ি, মনে হল, আমার এ কথায় খুব খুশি হয়েছে। সে দ্রুত নিজের পছন্দের স্রোতে ফিরে জিজ্ঞেস করে, কোন লাইনটা? আমিও এটাই চাইছিলাম। বললাম,
    —ওই যে তুমি লিখেছ, “ভোরের জানালা বেয়ে ভোর নেমে আসে”। আমার কাছে ওই লাইনটা অতি মাত্রায় ক্রিকেটীয়। আহা, কী লিখেছ, “ভোরের জানালা বেয়ে ভোর নেমে আসে”, আহা।
    —তাই নাকি, ওই লাইনটা তোমার এত ভালো লাগে? আমি তো প্রথম “ভোর”টা লিখেছি, নিয়মের কথা ভেবে। মানে ওটা একটা সময়। দ্বিতীয় “ভোর” কিন্তু রূপক, মানে স্নিগ্ধভাব, শুভ্রভাব ইত্যাদি। ভোর হলেই যে সবার জীবনে ভোর হবে ব্যাপারটা তেমন হলে, ওই লাইনটা লিখতে হত না। কিন্তু তুমি ক্রিকেট কোথায় খুঁজে পেলে এর মধ্যে?
    —পাপড়ি, প্রথম “ভোর”কে আমিও তোমার মতো প্রাকৃতিক সময় ধরেই এগিয়েছি। কিন্তু দ্বিতীয় “ভোর” আমার কাছে আরও ব্যাপ্ত কিছু হয়ে ধরা দিয়েছে। খুব অল্প কথায় বললে, দ্বিতীয় ভোর আমার কাছে নেট প্র্যাকটিস, ফোর প্লে, খেলার আগে গা গরম করা, খেলার আগের খেলা, এইসব আর কী! কবিও বোধহয় সে জন্যেই ওই “ভোর”কে জানালা দিয়ে এনেছেন, দরজা দিয়ে নয়।

    আমার এত বড় বক্তৃতা শুনে পাপড়ি কিছুক্ষণ থম্‌ মেরে রইল। বুঝতে পারছিলাম না, বেচারাকে আমি পুরো ঘুলিয়ে দিয়েছি কিনা। এরপর মেয়েটা যদি কবিতায় আরও গভীরতা খুঁজতে গিয়ে কবিতা লেখা ভুলে যায়, তার পুরো দায় আমাকে নিতে হবে ভেবে কথাবার্তাকে একটু হাল্কা পরিসর দেবার জন্যে বললাম, পাপড়ি তুমি তো গাছ নিয়ে কবিতা লিখেছ অনেক। এবার গাছকে যে পোষে তাকে নিয়ে কিছু লেখ।

    পাপড়িকে খুব বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। বলল, গাছকে তো মানুষ পোষে। তুমি কি মানুষ নিয়ে কবিতা লিখতে বলছ? মানুষকে নিয়ে তো বহু কবি বহু কবিতা লিখেছেন। আমি আর নতুন করে কী লিখব? আমি হেসে বললাম, তুমি ভুল বুঝেছ, আমি, মানুষ নয়, টব নিয়ে লিখতে বলছি। এ নিয়ে আমি একটা ধাঁধাঁ শুনেছিলাম। “গাছ উলটে গাছ পোষে/ সূত্র ভুল? আমার দোষে”। গাছ বলতে এখানে “বট”কে বলা হয়েছে, যাকে উল্টালে “টব” হয়, আর সেটা ভেবেই ওই ধাঁধাঁ আর কী! আমার তো কখনও কখনও গাছের থেকেও টব বেশি ভালো লাগে। আমার এত কথা শুনে পাপড়ি, হুম্‌ম্‌, ঠিক আছে লিখব, বলে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হঠাৎ বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

    পাপড়ি সেদিন চলে যাবার পর আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমি ক্রিকেট ভালোবাসি, ও কবিতা। দু-জনে রোজই এই নিয়ে খুঁটিনাটি, এলোমেলো আলোচনা করি। মাঝে মাঝে তা নিয়ে আন্তরিক ঝগড়া লেগেই থাকে। সেটা আমরা দুজনেই খুব উপভোগ করি। এভাবে ভালোই চলছিল। মাঝে এই কালো গোলাপ গাছের ডালটা এসে আমাকে টেনে নিয়ে গেল বাগানে। তারপর থেকে যে কি হল আমার কে জানে! আমি সেভাবে আর পাপড়ি বা পাপড়ির কবিতাকে সময় দিতে পারছি না ক’দিন। ঠিক করলাম বিকেলেই একবার যাব পাপড়ির বাড়িতে।

    পাপড়ি জানত না যে আমি বিকেলে ওর বাড়ি এসে হাজির হব, ফলে ওর জামার সবকটা বোতামই আটকানো ছিল। ওকে সেদিনই প্রথম আমি কালো জামা পড়তে দেখলাম। ভেবেছিলাম পাপড়িকে আবার কবিতার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্যে ওর কবিতা নিয়েই আলোচনা করব। কিন্তু দু-চার কথার পর পাপড়ি কেন জানি না জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা অনুপম, তোমার ওই কালো গোলাপ গাছটার কী খবর? ওতে কি পাতা গজিয়েছে? খেয়াল করলাম, পাপড়ি সেই ফুল ছেড়ে পাতায় ঢুকে পড়েছে। বললাম, হ্যাঁ, দু-চারটে কচিপাতা উঁকি-ঝুঁকি মারছে আর কী। পাপড়ি মাথা নীচু করে খানিকক্ষণ কী যেন চিন্তা করে বলল,
    —অনুপম, তুমি ওই গাছটাকে টবে পুষছ না কেন?
    —ধুর, আমার তো বাগান আছে। আমি সোজাসুজি বলে দিলাম।
    —তুমি কি ওই কালো গোলাপ গাছটাকে খুব ভালোবাস? পাপড়ি আরও ব্যাপ্ত হয়।
    —হ্যাঁ, আপাতত ভীষণ ভালোবাসি।
    —তবে তো ক্রিকেটের নিয়ম মেনে তোমার উচিৎ গাছটাকে চোখের সামনে বারান্দার টবে ঝুলিয়ে রাখা। পাপড়ি “প্রকৃত প্রস্তাবে” ঢুকে পড়ে।

    লে হালুয়া, এ মেয়ে তো দেখি এবার আমাকেই গুলিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। তার মানে মাঝের ক’দিন দিদিমণি কবিতা ছাড়া আরও অনেক কিছু নিয়ে ভেবেছে। বুঝতে পারছিলাম, তার ভাবনায় তখন কালো গোলাপের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটও অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে। এটা আমার পক্ষে ভালো নাকি খারাপ, সেটা বুঝতে না পেরেও পাপড়িকে বললাম, টবের সঙ্গে ক্রিকেটের মিলের ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে দাও তো ভালো হয়।

    পাপড়ি যেন তৈরি হয়েই ছিল সেদিন। বলল, দেখ অনুপম, ক্রিকেট খেলা মানে তো শুধু ব্যাটিং আর ছক্কা মারা নয়। এখানে বোলার আছে, বল আছে। খেয়াল করে দেখ এখন দু-রকম রঙের বলে খেলা হয়। সাদা এবং লাল। এবার চোখ বুজে টবের কথা ভাব। দেখ এখানেও টবের রঙ মানে সেই লাল অথবা লাল নয়, কিংবা সাদা। সেলাই নষ্ট হয়ে গেলে নতুন বল। হারিয়ে গেলে নতুন বল। আর দেখেছ তো একেকটা বাক্সে অনেকগুলো করে নতুন বল রাখা হয়। আবার কোনও কোনও বাক্সে অল্প ব্যবহৃত বল রাখা হয়। মানে, যখন যেমন প্রয়োজন, ডাকো তাকে, খেল তাকে নিয়ে। কি মজা না? পাপড়ির মাঝের কথাগুলো আমার খুব মনে ধরল। নষ্ট হলে, হারিয়ে গেলে...ঠিকই তো, নতুন। মনে হল, পাপড়ির বাড়িতে এসে ভালোই হল। দৃষ্টিতে থেকেও আড়ালে থাকা ক্রিকেটের এমনতরো প্রাসঙ্গিকতার পাঠ পাপড়ির থেকে পেয়ে ঋদ্ধ আমি ঠিক করলাম, আমার বাগানের প্রথম কালো গোলাপটা আমি সাজিয়ে রাখব আমার টেবিলে অযত্নে পড়ে থাকা ফুলদানিতে। পাপড়িকে বললাম, এমনভাবে ক্রিকেটের অন্য কিছু দিক বুঝিয়ে দেবার জন্যে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। পাপড়ি হাসল। পাপড়ির সেই হাসিতে কি আমি কয়েক টুকরো বিষণ্ণতার আসা-যাওয়া দেখলাম! হতেই পারে, আমি ভুল দেখেছিলাম, ভুল ভেবেছিলাম। তারপর ক্রিকেটের আমি টব আর ফুলদানির কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরলাম।



    পাপড়িতে শেষ হোক কথা

    অনুপম, কোনও সন্দেহ নেই, বড্ড বেঁটে। তবে ক্রিকেটটা কিন্তু সত্যিই ভালো বোঝে, ভালো খেলে। ক্রিকেট মাঠে ও আমাকে নিয়ে যেতে চায় না। তবু জোর করে যে দু-চারবার গেছি, তাতে দেখেছি, ওই ছোট্ট চেহারা নিয়ে যখন স্টেপ-আউট করে ছক্কা হাঁকায়, মনে হয় যেন আমাকেই ডেকে বলছে, পাপড়ি বাড়ি যা। ওর বারণ সত্বেও আমি ক্রিকেট মাঠে হাজির হয়েছি বলে, অনুপম সম্ভবত জবাব হিসেবে আমার কবিতার খাতায় ঢুকে পড়ে কিছু একটা লেখা শুরু করে। পরে দেখলাম, ওটা নির্ভেজাল একটা রচনা। রচনার বিষয় “সাইকেলের ক্ষেত্রে কোমরের ভূমিকা”। সবটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, অনুপম সাইকেল আর কোমর নিয়ে যে রচনাটা লিখেছে, সেটাকে কিছুতেই সম্পূর্ণ রচনা বলা যেতে পারে না। অনেক ঘেঁটে দেখেছি, ওই রচনাতে কোত্থাও কোনও চিতি সাপের অস্তিত্ব নেই। আজ এতদিন পর অনুপমকে এই ঘাটতির কথা জানাতেই ও বলল, সুন্দরীদের কোনও আয়না লাগে না। আমি ওর এই ধরণের উত্তরে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বলে, একটুও না দমে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ও, ওই জন্যেই বুঝি হরিণ আয়না ব্যবহার করে না? আমার কথা শুনে অনুপম একটু যেন উদাস হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও ও ধার থেকে কোনও উত্তর আসছে না দেখে ওর চুল ধরে হালকা একটা টান মারলাম। অনুপম মনে হল একটু ধাতস্থ হলো। তারপর আমাকে অবাক করে বক্তৃতা দেবার ঢঙে একটানা বলে গেল,

    —হরিণরা জেনে গেছে যে, ক্রিকেট খেলতে হলে আয়না লাগে না, কিন্তু রোদচশমা লাগে। এত তাপ! কীভাবে সামলাবে বলো? এ তো আর স্কুলে ছুটির ঘন্টা বাজলো আর আমি বাড়ির দিকে দৌড় দিলাম, এমন নয়। এখানে দৌড়তে হয় হিসেব কষে। এ ক্ষেত্রে মাঠের কন্ডিশনও একটা বড় ব্যাপার। দেখতে হবে আউটফিল্ড ভিজে আছে নাকি, পীচের কভার চুঁইয়ে জল ঢুকে পীচকে খেলার অনুপযুক্ত করে তুলেছে নাকি, ইত্যাদি। আগে তবু জনৈক “ঈশপ” তার গল্পে হরিণদের ভালো মাইলেজ দিয়েছিলেন। এখন তো আর সে দিন নেই। তাই রোদচশমায় চোখ আড়াল। এক কথায় আমি দেখছি, কিন্তু তুমি তা দেখছ না বা দেখতে পাচ্ছ না। প্রয়োজনে অবশ্য রোদচশমা উলটো করেও রাখা যায়। মানে রিয়ার ভিউ আর কী।!

    —অনুপম, তুমি কি তোমার রচনাতে সেই রোদচশমা ব্যবহার করতে চেয়েছ? মানে তুমি বলতে চাইছ যে, তোমার ওই রচনায় চিতি সাপ আছে, কিন্তু খুঁটিয়ে না দেখলে আমি তার দেখা পাব না। তাই তো? আমি অনুপমকে চেপে ধরার চেষ্টা করি।

    আমার কথা শুনে অনুপম খুব সুন্দর করে হাসল। ওর এই হাসিটা আমার খুব প্রিয়। ওর একজোড়া গজদাঁত আছে। ওই গজদাঁত জোড়ার জন্যেই ও সুন্দর আবার কখনও কখনও আমার মনে হয়, ওই গজদাঁত জোড়ার জন্যেই হয়ত ও ভয়ঙ্কর। আচ্ছা, আমি কি অনুপমকে ভালোবাসি? আমরা কি দুজন দুজনকে ভালোবাসি? আমি অন্তত এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তাহলে কীসের এত কড়াকড়ি? ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি, আমি চাই ও আমার কবিতা ভালোবাসুক আর আমি কবি দূর থেকে তা উপভোগ করি। একই সঙ্গে অনুপমও চায়, আমি ওর ক্রিকেট ভাবনার শরিক হই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ক্রিকেট আমার তেমন ভালো লাগে না। অনুপম সম্ভবত আমার এ দর্শনের খবর রাখে, তাই কি আজকাল অভিমানী ও কবিতা ছেড়ে বাগানের পথে? কালো গোলাপের পথে? এ ব্যাপারে খুব সাবধানে একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে ভেবে অনুপমকে প্রশ্ন করলাম, মেঘলা দিনের ক্যানভাসে বিদ্যুৎ চমক তোমার কেমন লাগে? আমার প্রত্যাশার থেকে অনেক কম শব্দে অনুপম নির্বিকার জানিয়ে দিল, ভালো লাগে না। এমন একটা উত্তর আমি প্রত্যাশা করিনি। তাই একটু রেগেই বললাম,

    —মেঘলা দিনের ক্যানভাসে প্রকৃতির অমন মোহময় তুলির টান তোমার ভালো লাগে না? তুমি তো শুনলাম আজকাল প্রচুর কবিতা পড়। তারপরেও মেঘলা দিনের ক্যানভাসে বিদ্যুত-তুলির টান তোমার ভালো লাগে না। তুমি কেমন পাঠক হে? আমি অনুপমকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করি।
    —দেখ, ওই তুলির টানটা সম্যক উপভোগ করতে পারে কেবল সম্পন্ন লোকেরা। আমরা যারা দুর্বল কাঠামোর বাড়িতে বাস করি, তারা ভয় পাই, বড় ভয় পাই ওই বিদ্যুতের চোখ-রাঙানিকে। মনে হয়, এই বুঝি মৃত্যু নেমে এল ডালপালা বেয়ে। সে জন্যেই, হাতে ক্যামেরা নিয়েও ছবি তোলা হয় না সে সৌন্দর্যের।
    —কেন ছবি তোলা হয় না কেন?
    —ভয়ে।
    —একবার ভয় কাটিয়ে দেখই না কি হয়। আমি অনুপমকে অভয় দেবার চেষ্টা করি।
    —না, তা হয় না। অনুপম অনড়।
    —কেন? হয় না কেন?
    —ভেবে দেখেছি, ভয় কেটে গেলে ছবি হয়ত উঠবে, কিন্তু যার ছবি তুললাম, সে তো সেই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেল। কারণ প্রকৃতি তাকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে অন্য কারোর জন্যে। আমি কেন শুধু শুধু তার ছবি বয়ে বেড়াই বলো? অনুপম তার যুক্তি দাখিল করে।
    —অনুপম, তোমার কালো গোলাপ গাছ তো মৃত্যুহীন নয়। তবে কেন তার পিছনে দৌড়ে মরছ?
    —আসলে আমি জেনে গেছি যে, সে গাছের ডাল থেকে পাওয়া যেতে পারে গাছ, আরও গাছ, আরও ফুল...কুড়ি ওভার, পঞ্চাশ ওভার, পাঁচদিনের টেস্ট ম্যাচ...অথবা একটা গোটা জীবন...
    —মানে, ঘুরেফিরে তুমি সেই ক্রিকেটের। তাই তো? আমি আমার বিরক্তিকে প্রকাশ্যে এনে ফেলি।
    —হ্যাঁ, আমি ঘুরে-ফিরে ক্রিকেটেরই বটে। তবে আমি ততক্ষণই ক্রিকেটের, যতক্ষণ আমি ক্রিকেটের পোশাক পরে আছি।
    —তারপর তাহলে তুমি কার? আমি যেন দরজার ফাঁক গলে আসা রোদ্দুরের খোঁজ করি।
    —তারপর আমি নাগালে থাকা অন্য কিছুর হয়ে যেতেই পারি। অনুপমের সংক্ষিপ্ত জবাব।

    আমার কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে। কষ্টের কারণ এই নয় যে অনুপম আমাকে আর সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে, সে কিছুতেই আর মূল স্রোতে ফিরছে না। আমি অবশ্যই চাই অনুপম আমার কবিতা ভালোবাসুক, পড়ুক। কিন্তু বুঝতে পারি, অনুপমের ওই বাগান নিয়ে ব্যস্ততা, কালো গোলাপের দর্শনে গভীর মনোনিবেশ, এগুলোই আমার আসল কষ্টের উৎস । ভেবেছিলাম, ক’দিন পার হলেই বন্ধ হবে ওর এই পাগলামো, আমরা আবার ফিরব কবিতায়, ক্রিকেটে। কিন্তু দেখলাম আমার অভিমানও ওকে আর তেমনভাবে স্পর্শ করছিল না।

    আজ তাই অনুপমকে না জানিয়েই ঢুকে গেলাম ওর বাগানে। দেখলাম, বাগানে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গোলাপ গাছ। ইচ্ছে ছিল কালো গোলাপ গাছটাকে উপড়ে ফেলে দিয়ে অনুপমের প্রতিক্রিয়াটা দেখব। কিন্তু এত গাছের মধ্যে কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, কোনটা সেই কালো গোলাপ গাছ, যেটা উপড়ে দিলে অনুপম ফের ফিরে আসলেও আসতে পারে আমার কবিতায়। ভেবে দেখলাম, সব গাছ উপড়ে দেওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়। এতে অনুপম আঘাত পাবে, আর “সম্ভবত” নয়, “নিশ্চিতভাবেই” আমার কবিতায় আর কখনও ফিরবে না। আক্ষরিক অর্থেই হতাশ আমি তাই পায়ে পায়ে বাগান পেরিয়ে একটুও শব্দ না করে ঢুকে পড়লাম অনুপমের ঘরে। দেখলাম ঘর খালি। অনুপম ঘরে নেই। দু-চার মিনিট পরেই বুঝলাম সে তখন ঘর-লাগোয়া বাথরুমে স্নান সারতে ঢুকেছে। এই ঘরে আগে এতবার এসেছি তবু অনুপমের এই ঘর এর আগে আমি কখনও সেভাবে খুঁটিয়ে দেখিনি। অনুপম আমার কবিতা শুনত, আমি অনুপমের ক্রিকেট দর্শন শুনতাম। আমাদের দুজনেরই ভালো লাগা না-লাগা নিয়ে সময় কেটে যেত। সে সময় অন্য কিছু ভাবার বা দেখার কথা সেভাবে কখনও ভাবিনি। আজ কেন জানি না, খুঁটিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল সব। আজই প্রথম খেয়াল করলাম, অনুপমের ঘরের দেয়ালে বিখ্যাত ক্রিকেটারদের ছবি ছাড়াও ঘরের প্রত্যেকটা কোণে ছড়ানো-ছেঁটানো পড়ে আছে ক্রিকেটের যাবতীয় সরঞ্জাম। ঘরময় শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। কী নেই সেখানে! অনেকগুলো ক্রিকেট ব্যাট, যেটাকে অনুপম বলে উইলো কাঠের তরবারি দেখলাম হেলান দেওয়া পড়ে আছে দেয়ালের গায়ে। পাশে প্রায় সমসংখ্যক হেলমেট। অনুপমের হেলমেট প্রীতি আমার জানা আছে, তাই অবাক হইনি ওগুলো দেখে। টেবিলে একটা বাতিল কাপে জমা রাখা ওর প্রিয় তুলিগুলো অবশ্য আমি এর আগেও দেখেছি। হঠাৎ নজরে পড়ল, টেবিলে খুব যত্ন করে সাজানো পুরোনো একটা ফুলদানিতে ভিজে আছে একটা কালো গোলাপ। সে ফুলের পাপড়িতে লেগে আছে ফোঁটা ফোঁটা জল। ফুলটা, মনে হল আমাকে দেখে হাসছে, ব্যাঙ্গের হাসি। খুব রাগ হল। ভাবলাম চীৎকার করে বলি, অনুপম, এ তুমি কী করলে? আমার কবিতাকে এভাবে দূরে সরিয়ে দিলে? টের পেলাম, অভিমানে আমার গলা ধরে গেছে। তাই কিছুই বলা হল না। বলা হল না, অনুপম, আমিও ক্রিকেট ভালোবাসতে চাই, তোমারই মতো।

    ভাঙা কলমের যন্ত্রণা নিয়ে আমি ফিরে আসব বলে পা বাড়ালাম ঘরের পথে। তখনই, ঠিক তখনই বাথরুম থেকে উদাত্ত ভেসে এল অনুপমের গলা, ভোরের জানালা দিয়ে ভোর নেমে আসে। চমৎকৃত আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। এ তো আমার কবিতার লাইন। অনুপম তাহলে আমার কবিতা ভোলেনি। অনুপম তাহলে আমার কবিতাকে উপেক্ষা করে না। ফের ফিরে এলাম অনুপমের ঘরে। দেখলাম, কালো গোলাপটা তার হাসি বন্ধ করে হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে। দুলছে এক দীর্ঘস্থায়ী পাতার পাশে সাময়িক বাহারের মতো।



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ অনন্যা দাশ
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)