• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪০ | ফেব্রুয়ারি ২০০৮ | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • আঁধার-মঞ্চে স্বগতভাষণ : চিত্ত সাহু

    তিলোত্তমা মজুমদার ; একতারা ; আনন্দ; কলকাতা; ২০০৬ ; পৃ: ২৩৮ ; ISBN : 81-7756-613-X

    কেউ একজন একতারা বাজাতে বাজাতে চলে যায় । যন্ত্রটায় ঔদাস্যের সুর বাজে, বিষাদের সুর বাজে, কান্নার সুর বাজে, হাসির কিংবা উল্লাসের সুর বাজে কি ? বাজে না । আর সেই একতারার সুর শোনে তালগাছ, নদীপারের তালগাছ, যে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে, দাঁড়িয়েই থাকে ।

    এ লেখাটাকে `রিভিউ' `সমালোচনা' ইত্যাদি কড়া ভাষায় সম্বোধন না করাই ভালো, একে বড়োজোর বলা যায় - একটি উপন্যাস-পাঠ, যে উপন্যাসের নাম `একতারা'। লেখিকা হলেন, সরি লেখক হলেন - তিলোত্তমা মজুমদার ।

    পুস্তকটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলার পরে স্বত:ই মনে হবে, `একতারা' উপন্যাস বটে, তবে তা আত্মজৈবনিক উপন্যাস । এই আত্মজীবন কার ? কেন্দ্রীয় চরিত্র দেবারতির, না উপন্যাস রচয়িতা তিলোত্তমার ? বাংলা সাহিত্যে এ প্রশ্ন অনেক আগে উঠেছিল শরত্চন্দ্রের `শ্রীকান্ত' উপন্যাসটিকে ঘিরে - শরত্চন্দ্রের শ্রীকান্ত, না শ্রীকান্তের শরত্চন্দ্র ? মোহিতলাল মজুমদার `শ্রীকান্তের শরত্চন্দ্র' শীর্ষক একটি গ্রন্থই রচনা করেছিলেন । উপন্যাস থেকে আত্মজৈবনিক উপন্যাসের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, আবার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে উপন্যাসের দায়বদ্ধতা অনেক অনেক, কিন্তু আত্মজৈবনিক উপন্যাসের দায়বদ্ধতা সংকুচিত, অনেক কিছুতে তার দায় মেনে চলার দরকারই হয় না লেখকের ।

    সীমাবদ্ধতা ও দায়বদ্ধতার কুটিল বিতর্ক মুলতুবি রেখে আপাতত বলা যায়, `একতারা' উপন্যাসটিকে দুই খন্ডে বা পর্বে ভাগ করা চলে । এক পর্বে, বাঙালি পরিবারতন্ত্রের প্রতি একালীন নারীদের বিদ্রোহ, যার পুরোভাগে আছে দেবারতি, পেছনে আছে বুডিড এবং আরো কেউ কেউ ।

    দ্বিতীয় পর্বে আছে পরিবার-ব্যতিরিক্ত পুরুষতন্ত্রের প্রতি নারীর বিতৃষ্ণা-বিদ্রোহ । এখানেও সামনে দেবারতি, অনুষঙ্গী হিসেবে সৌমিত্রি, উজ্জ্বলা । সামগ্রিকভাবে পুরো উপন্যাসটাই দেবারতির প্রতি পীড়ন ও বঞ্চনার ইতিহাস, এবং দেবারতি বিদ্রোহ করেছিল, যে বিদ্রোহ অনি:শেষ কিন্তু এক অসামান্য চলমান চিত্রের আধারে ত্রক্রমশ পরিবেশিত হয়েছে । একটা ঢিলেঢালা ওয়ার্ডরোব, যার লক নড়বড়ে, পাল্লার পালিশে আঁচড়, হাতলের নকশায় গেঁয়ো প্লাস্টিক, কাঙাল দু:খী গুরুত্বহীন আত্মীয়ের মতো যার প্রতীয়মানতা - সেই তুচ্ছ ওয়ার্ডরোবটা সারা উপন্যাসে প্রতীক হয়ে আছে । ওয়ার্ডরোব, নীলের সঙ্গে দেবারতির বিয়েতে মা-বাবার দেওয়া অন্যতম যৌতুক হিসেবে হিসেবে দেওয়া তুচ্ছ ওয়ার্ডরোবকে শ্বশুর পরিবারে নিয়ে আসার উপলক্ষেই পীড়নের ছবি উন্মোচিত হয়েছে । সাত বছরের তিল তিল অংকুশ বেঁধানোর, এবং শাশুড়ি, তথাকথিত শাশুড়ি মাধবীই যার প্রধান সূত্রধারিকা - সেই রক্তাক্ত কাহিনির রক্ত-প্রলেপন দেবারতিকে ছাপিয়ে যেন এই ওয়ার্ডরোবটাই মেখে নিয়েছে । উপন্যাসের সমাপ্তিতে সামান্য হলেও ওয়ার্ডরোবটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে দেবারতির উক্তিতে -

    আমি বোঝাতে চাই নিজেকে, কোনও দুরারোগ্য ব্যাধি হয়নি আমার । হতে পারে না । আমি বাঁচার জন্য বেরিয়ে এসেছিলাম । মৃত্যুর জন্য নয় । চারপাশে আমার জীবনের আয়োজন পূর্ণ । ওয়ার্ডরোবের গায়ে হাত বোলাই আমি । চুমু খাই । আমাদের আদরের ওয়ার্ডরোব ফিরে এসেছে আমার কাছে । `একতারা' উপন্যাসে আর একটি ভালো লাগার ছোট্ট ব্যাপার রেখে দিয়েছেন তিলোত্তমা । দেবারতির প্রিয় লেখক হলেন ওয়ালিউল্লাহ । ওয়ালিউল্লাহর রচনাসংগ্রহ গ্রন্থটি নিয়ে দেবারতির হৃদয়স্পন্দনের উচ্চাবচতা ধরা পড়েছে কোনো কোনো সিচ্যুয়েশনে । `লাল সালু' উপন্যাস, `তুলসীগাছের কাহিনি' ছোটগল্প প্রভৃতির রচয়িতা ওয়ালিউল্লাহ প্রতীকনির্মাণে সুদক্ষ । প্রতীক চরিত্র হয়ে ওঠে তাঁর লেখায় । ওয়ালিউল্লাহর অনুসরণে কি ওয়ার্ডরোব এসেছে উপন্যাসে ? তবে ওয়ার্ডরোব উপন্যাসে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে অবশ্যই । সৌমিত্রী একদিন নিয়ে গেল দেবারতির প্রিয় বইটি, দেবারতি ছিল না তখন, নিয়ে গেল । আবার একদিন ফেরতও পাঠাল । মাঝখানে গঙ্গা দিয়ে কিছু বিষাদজলও বয়ে গেল । সৌমিত্রী শেষ পর্যন্ত বিবাহও করল । এ বিবাহ কতোটা পরিবারতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ, নাকি একটা সাময়িক অ্যাডজাস্টমেন্ট সে প্রশ্ন আমাদের কাছেই থেকে গেল ।

    তবে এ প্রশ্নের সদুত্তর দিয়েছে স্বয়ং দেবারতি তার সাতবছরের, শুধু সাতবছরের কেন পরবর্তী সময়ের প্রতিটি দিনের প্রতিটি ঘন্টা-মিনিটের তপশ্চর্যা দিয়ে । `তপশ্চর্যা' শব্দটি কিছুটা পুরাণের অলি-গলিতে ঘুরে-বেড়ানো শব্দ হলেও দেবারতির জীবনচর্যায় এর থেকে ভালো অভিধা আর কিছু হয় না । তবে দেবারতির তপশ্চর্যা পৌরাণিক নয়, একেবারেই সাম্প্রতিক - সাম্প্রতিক কালের দুর্দান্ত জীবনজিজ্ঞাসা । জিজ্ঞাসাটি হল - সমাজে নারীসত্তায় সহজ স্বমহিম বিকাশ ঘটবে কোনপথে ?

    মাধবী-শিবানন্দ-নীলার্ণব, দিদি-নির্মলদা-সহ পুরো ভট্টাচার্য পরিবার ছেড়ে আসার দিনই দেবারতি ওখানে কী কী কর্ম করেছে - তার ছাঁট-কাটা বর্ণনা উদ্ধৃত করা যেতে পারে : `টিকোজি ঢাকা দিয়ে চায়ের পট রাখি টেবিলে । বিস্কুটের কৌটো দিই । নীল ও শিবানন্দ দুটি খবরের কাগজ নিয়ে বসে । মাধবী চা ঢালতে ঢালতে গতকাল নেমন্তন্ন-বাড়িতে দেখে আসা দামি আসবাবপত্রের কথা বলে । আমি চা খাওয়া হলে দুটি বিছানা তুলি । বাসি ঘর ঝাঁট দিই । চেয়ার টেবিল আলমারির ধুলো মুছি নিয়মমতো এবং মাধবী স্নান করতে চলে যাবার আগে কী রান্না হবে জানতে চাই । তখনও আমার গোছানো স্যুটকেশ নিয়ে কেউ কথা তোলে না ।'

    এই সুনিপুণ গৃহকর্মপঞ্জির আড়ালেই তার আশ্চর্য সংযমের পরিচয়টি নিহিত আছে । দীর্ঘ সাতবছর ধরে মাধবীর যাবতীয় আক্রমণের বিষ আকন্ঠ পান করেও দেবারতির এই গৃহকর্মপরায়ণতার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি । অথচ তার জীবনাভীপ্সা অনেক বড়ো । কী সেই জীবনাভীপ্সা, দেবারতি নিজেও স্পষ্ট জানত না, পরেও কী আর সম্পূর্ণ জেনেছে ? একদিন অনাঘ্রাত যৌবনারম্ভে সে ভেবেছিল হয়তো, প্রেমই সেই কাঙ্খিত অভীপ্সা । কিন্তু সুবিধালোভী ঋতবান সেই প্রেমকে নিষ্ঠুর জল্লাদের মতো ভেঙেচুরে অবলীলায় হত্যা করেছে । তারপর কী করতে পারে দেবারতি ? কী করার থাকে তার !

    নীল একটা অখাদ্য যুবক । কিছুপরিমান রূপবন্ত হওয়া ছাড়া তার অন্য কোন যোগ্যতা নেই, অবশ্য সে পুরুষত্বহীন নয় । কিন্তু মিথ্যুক সে, ব্যবসার নামে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নষ্ট করে, স্ত্রীর, এবং মায়ের গয়না চুরি করে সে, রাত্তিরে বিছানায় হিসি করে সে, এমন কি স্ত্রীকে অন্যের কাছে নিজেই নিয়ে আসে, এবং কখনোই দেবারতির কোনো দায়িত্ব নেয় না । বস্তুত নীল এবং দেবারতির মধ্যে কোন ভালোবাসাই তৈরি হয়নি । অথচ বিবাহ হয়েছিল, দেবারতির সম্মতিও ছিল না এমন নয় । দেবারতির মনোরাজ্য, অন্তর্লোক ছাপিয়ে ঋতবানের প্রতি যে ভালোবাসা, সে ভালোবাসা চুরমার হয়ে যাওয়ার পরে তথাকথিত সমাজ-প্যাটার্নের মধ্যেই তাকে ঢুকে পড়তে হয়েছে, অথবা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে মা-বাবা, বাড়ির অন্যান্য লোকজন ইত্যাদি ইত্যাদির চাপে । তার ফলেই `একতারা'র পাঠকবর্গ পেয়ে যান বিবাহধর্মের অন্ত:সারশূন্যতা । শুধু অন্ত:সারশূন্যতা বললে যথেষ্ট হয় না, বিবাহ নামক হাড়-গোড়-বের-করা করোটিমাত্রসার শরীরী ব্রহ্মদৈত্যের খলবল-করা অট্টহাস্য । তিলোত্তমা তার অসাধারণ, পুঙ্খ থেকে অনুপুঙ্খ শৈল্পিক বর্ণনা দিয়েছেন । ভাষা তীক্ষন ধারালো, ভিজে কম্বলের গদ্য নয় এ, গদ্যের শর গদ্যের কিরীচ, দ্বিধাহীন নির্ঘাত ঢুকে যায় পাঠকের হৃদ্পিন্ডে, প্রায়শই একটি শব্দে অথবা একটি ক্রিয়াপদে সম্পূর্ণ হয় বাক্য । আপামর বাঙালিকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, ওরে তোরা ছুটে আয়, গদ্য দেখবি আয় । গদ্য চাখবি আয় ।

    প্রেম পাহাড়চুড়ো থেকে খাদে ঠেলে দিতে পারে, বিবাহ গিলে ফেলতে আসে । আগে প্রেম, তার পরিণতি বিবাহ, অর্থাৎ প্রেমজ বিবাহেরও ব্যর্থ পরিণাম, তা দেখানো হয়েছে সৌমিত্রীর চরিত্রে । এ সম্পর্কে উপন্যাসের বিশ্লেষণটি নিখুঁত : `সৌমিত্রী - অনিন্দ্যর মতো সম্পর্ক, বিয়ের আগে যারা ঘনিষ্ঠ মিশেছে অন্তত আট বছর, তাদের বিয়ের এক বছরের মধ্যে সম্পর্কের সব রস শুকিয়ে এলে, তা লাগে বিস্ময়কর, অর্থহীন, প্রায় অসামাজিক কর্মের মতো গর্হিত ।'

    আসলে সমাজের শর্তাবলী যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন কি আট বছর ধরে প্রেমপর্বের পরেও তার কোনো নিশ্চিন্ত পরিণতি নেই । সৌমিত্রীর জীবনবৃত্তের নিরিখে তিলোত্তমা বলতে চেয়েছেন : `মানুষের চিত্ত স্বাধীন, সমাজ সেই স্বাধীনচিত্ততায় নানারকম বাঁধন দেয় । তবু, কোথাও না কোথাও কোনও-না-কোনো পরিমাণে মানুষের চিত্ত স্বাধীন । ইচ্ছা স্বৈরাচারী, চিন্তাপ্রক্রিয়া জটিলতম । সুতরাং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাকরণ গড়ে ওঠে না কখনও ।

    শেষ পর্যন্ত সৌমিত্রী বেরিয়ে এসেছিল । দেবারতিও বেরিয়ে এসেছে । যদিও দুজনের প্রেক্ষাপট আলাদা । সৌমিত্রীর বেলায় একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, ভালোবাসা সেই সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছিল । তাই সামাজিক স্বীকৃতি সে মেনে নিয়েছিল । পরে যখন সম্পর্ক থাকল না, যথেষ্ট সাহসী সৌমিত্রী, সে আর ভাঙা সম্পর্কের দায় রাখল না, শুধু দিনযাপনের গ্লানিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সে বেরিয়ে এল । কিন্তু দেবারতির বেলায় কথিত সম্পর্কের কোনো গোড়াবন্ধনই ছিল না । শুধুই গতানুগতিক সমাজপদ্ধতি, শুধুই একটা সমাজস্বীকৃতি আশ্রয় কিংবা নিরাপত্তা, যা মাতাপিতা-সমেত সকল শুভার্থীই চেয়ে থাকেন - তা যে নিতান্তই ঘুন-ধরা, ঠুনকো অথচ উত্পীড়ক এবং ঘোরতর অবমাননাকর, দেবারতির সাতবছরের দৈনন্দিনতায় লেখক তা ফুটিয়েছেন । সুতরাং দেবারতির বেরিয়ে আসা আরো অনিবার্য ছিল ।

    তারপর অথই অকূল পুরুষের বল্গাধৃত পৃথিবীচত্বরে দেবারতির টিকে থাকার, বেঁচে থাকার নিষ্কঠিন চেষ্টা । এই টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার অর্থ দ্বিবিধ - এক. খাওয়া-পরার জন্য, দুই. বৌদ্ধিক যন্ত্রণা প্রশমনের জন্য । আর এই দু'রকমের কাজ করতে গিয়ে তাকে কিছু পুরুষের কাছে আসতে হয় । এ সব পুরুষেরা কেউ চেনা কেউ অচেনা, কেউ বন্ধু কেউ হিতকামী, কেউ বসে আছেন প্রতিষ্ঠানের চুড়োয় । এদের মধ্যে আছে একটি দ্বিমাসিক পত্রিকার সম্পাদক তপেশ ভৌমিক, `প্রভাতী সংবাদ'-এর অল-ইন-অল দিব্য, যাকে দেবারতি দিব্যদা বলে, এবং আরো অনেক ।

    দিব্য `প্রভাতী সংবাদ'-এ কাজের বিনিময়ে অন্তত তিন মাস দু হাজার করে টাকা দেবে, এই ভরসাতেই দেবারতি বেরিয়ে এসেছিল । দিব্যকে রীতিমতো শ্রদ্ধা করে দেবার্তি, তার চেষ্টাতেই সে একা যুদ্ধ করতে পারছে । সেই দিব্যদাই একদিন দেবারতিকে চুমু খেতে চাইল । দেবারতির `না' সত্ত্বেও কাতরভাবে বলে - একবার, একটিবার মাত্র । দেবারতি রাজি হয়নি, কিন্তু দিব্য তার কোনো ক্ষতি করল না । এর পরেও দিব্য প্রভাতী পুজোসংখ্যায় দেবারতির উপন্যাস ছেপেছিল ।

    তপেশ ভৌমিক প্রকাশক । দেবারতির উপন্যাসটা বই করে ছেপে দেবে, দেবারতিকে বিখ্যাত করে দেবে, এই দাবিতে সে দেবারতিকে নির্জন ঘরে ধর্ষণ করতে চায় । `কাউচ ঘিরে চলতে থাকে এক আশ্চর্য গোল্লাছুট খেলা ।' এর নিখুঁত বর্ননা আছে বইতে । অভিজ্ঞতাটি দমবন্ধ-করা এবং রক্ত-ঘিনঘিন-করা । অথচ বর্ণনা কঠিন নিষ্ঠুর নিরাসক্তি-মাখানো । শেষ পর্যন্ত লোকটার তলপেটে জোড়া পায়ের সটান লাথি মেরে দেবারতি বেরিয়ে আসতে পেরেছিল ।

    অনুরূপ পরিস্থিতিতে আর একবার পড়ে দেবারতি । তখনো সে ভট্টাচার্য পরিবারে । বিজনেসে সর্বস্বান্ত নীল এক ক্লায়েন্টের ডিনারের নেমন্তন্নে দেবারতিকে অনেক তুতিয়ে-পাতিয়ে নিয়ে গেল । স্টার হোটেলের সুসজ্জিত রুমে `লম্বা চওড়া সামান্য ভুঁড়িদার এবং ধবধবে ফর্সা' মিস্টার সাহা এদের অভ্যর্থনা করেন । `একটু কাজ সেরে আসি' বলে নীল বেরিয়ে যায় । লোকটা মদের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে তার লম্বা হাতের বিশাল পাঞ্জা রাখে দেবারতির কোলে । দেবারতি ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ে । পুরো বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন, কিন্তু এখানেও উপন্যাসকার সংলাপ-সমেত ডিটেলস্‌-এর ব্যবহার করেছেন । তবে লোকটি অদ্ভুত । ভাগ্যিস্‌ অদ্ভুত । যে মুহূর্তে শুনল, দেবারতি তাকে রেপিস্ট বলছে এবং দেবারতি মি: নীলার্ণব ভট্টাচার্যের স্ত্রী, সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বদলে যায় । সে-ই ধাক্কা মেরে দেবারতিকে ঠেলে সরিয়ে দেয় । বলতে থাকে, সে সেক্স এনজয় করে । রীতিমতো অর্থের বিনিময়ে শয্যাসঙ্গিনী ত্রক্রয় করে । (আই বাই হোরস্‌ ...) । তাকে কিনা রেপিস্ট বলা ! তারপর যখন সে শুনল যে দেবারতি নীলার্ণব ভট্টাচার্যের স্ত্রী, তখন মি: সাহা দেবারতির পিঠে হাত রেখে দু:খ প্রকাশ করে । মন্তব্য করে, `আমি বুঝতে পারিনি মি: ভট্টাচার্য এত বড় স্কাউন্ড্রেল ।

    সেক্স এনজয়ার হয়েও সাহা চরিত্রের এই নৈতিকতাবোধ ও গৃহবধূর প্রতি মর্যাদাবোধ তাকে সত্যই বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র করেছে । পুরুষবিদ্বেষের মধ্যেও মানব-নীতিধর্মের এ দিকটি তিলোত্তমার কলমে উপেক্ষিত হয়নি । অথচ পুরুষবিদ্বেষ দেবারতির আত্মকথনে এক বৃহৎ অংশ জুড়ে আছে । দেবারতি বলে,

    `আমার গা গুলোয় । সুশান্ত গা গুলোয় । অমিতেশ গা গুলোয় । নীল গা গুলোয় ...। শুভাশিস গা গুলোয় আমার । গুলোয় না কেবল নাটকের অন্য বন্ধুরা । কারণ তারা আমাকে ভালোবাসা জানায়নি । ... এবং আমার গুলোয় না দিব্যেন্দু ও দীপায়ন । ... দিব্যেন্দু আগের মতোই । যাই ওদের বাড়ি । থাকি । খাই । চুলে ক্লিপ এঁটে ঘুমিয়ে পড়ি । দিব্যেন্দু আলতো খুলে নেয় ক্লিপ । বলে, মাথায় গেঁথে যায় যদি ।'

    এই প্রেম, সেক্স, পরিবারের শকুনবৃত্তি, পুরুষের ইগলবৃত্তি, অন্যদিকে নারীর স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য, নারীসত্তার বিকাশ - ইত্যাকার সংঘাত ও সংঘর্ষের মধ্যে সত্যিকারের নারী-পুরুষের ভালোবাসা, ভালোবাসার আধারে কামতৃপ্তি এবং সন্তান-বাত্সল্য `একতারা' উপন্যাসে তিলোত্তমা ছুঁয়ে গেছেন, কিন্তু প্রশ্নগুলি প্রশ্নই থেকে গেছে । সেজন্য তাঁকে অবশ্যই দায়ী করা চলে না । কারণ তিনি সাহিত্যনির্মাণ করেছেন, সমাজসমস্যার সমাধান করতে বসেননি । কেন তিনি ফজলি আম দিলেন, ফজলিতর আম দিলেন না কেন - এ নিয়ে ঝগড়া চলে না । তিনি যে প্রশ্নগুলি ছুঁতে পেরেছেন, তিনি যে সমাজমনস্ক ব্যক্তিদের মনে প্রশ্নগুলি তুলে দিয়েছেন - এই যথেষ্ট ।

    এখন আরেকজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলে চলবেই না, তিনি হলেন তসলিমা নাসরিন । তাঁর জন্যে আমাদের, মানে পুরুষজাতের দু:খ-সমবেদনা, সঙ্গে সঙ্গে ভয়ভীতি মিশিয়ে আছে । আহা, আমাদের এই বাঙালি ঘরের মুখবাজ মেয়েটিকে বাংলার নরম মাটি থেকে কিনা দূরেই সরে থাকতে হয়েছে । তসলিমা, তুমি আমাদের আরো বকে দিও, তবু ফিরে এসো চাকা, ফিরে এসো তসলিমা ।

    হ্যাঁ, তসলিমা নাসরিন এবং তিলোত্তমা মজুমদার । তসলিমা পুরুষবিদ্বেষ ও নারীবাদের সোচ্চার অগ্রদূত, আর `একতারা' উপন্যাসে তিলোত্তমা তারই বর্ণোজ্জ্বল পতাকা উত্তোলন করেছেন বাংলা সাহিত্যের মাটিতে । তসলিমা বিদ্রোহ, তিলোত্তমা তপস্যা ।

    কিন্তু .......
    এ `কিন্তু' আর কিছু নয়, উপন্যাসের আঙ্গিকগত । এবং খুবই সামান্য ।
    `একতারা' উপন্যাসের ইপ্সিত দুই পর্ব বিভাজনের কথা, যা শুরুতে বলা গিয়েছিল, তার প্রথমপর্ব যতোটা `উপন্যাসীয়', শেষ পর্ব ততোটা নয় । সব শিল্পকর্মেরই এক একটা স্ট্রাকচার বা গঠনশৈলী থাকে, এবং একথাও ঠিক যে সময়ের পালাবদলের সঙ্গে সাহিত্যশৈলীরও পালাবদল ঘটতে পারে, ঘটেও । `একতারা'র শেষার্ধটি যেন দ্রুত লেখা হয়েছে, যার ফলে বিন্যাসমনস্কতার অভাব ঘটেছে । ডায়েরি ধর্মই বেশি প্রকটিত হয়েছে । এই উত্ক্রান্তিটুকু না থাকলেই ভালো হত ।

    এলোপাথাড়ি য়্যাতো সব ঝঞ্ঝা ও ঝঞ্ঝাটের মধ্যেও একটি ছোট্টো জুঁইফুল ভালোবাসার ছবিও আছে কিন্তু । সে হল মেজ তরফের ছোটো ছেলে আধপাগলা উদাসীন টুকুনকে নিয়ে ।

    -কীরে শানু ! তোকে নাকি কে রোজ গালাগালি দিচ্ছে ফোনে ?
    আবার ফোন আসতেই বাড়ির সকলের সামনেই ও ফোন নিয়েই বাছাবাছা খিস্তি শুরু করে । অশ্রাব্য । অসহ্য । এবং সেই ফোন আর আসে না কোনও দিন ।

    তারপর এক একাকী দুপুরে, সেই সুন্দর ছবিটুকু : দেবারতি বলেছে, আমার বিমর্ষ, বিষণ্ণ, অন্ধকার ঘরে প্রগাঢ় আলিঙ্গনের মধ্যে অপূর্ব পুলক জাগে আমার । অনির্বচনীয় আনন্দ হয় ।

    এই ভালোবাসাটুকু একেবারেই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু স্বয়ংপূর্ণ । উদাসীন টুকুনের কোনো প্রত্যাশাও নেই ।
    আর এই সব কিছু মিলিয়ে উপন্যাসের নাম `একতারা' । কেন `একতারা' তাও দেবারতির ভাবনায় ধরা পড়েছে : `কখনও মনে হয়, জীবন আসলে নিভৃত প্রাণের নিরুচ্চার সংলাপ । অর্থনিরপেক্ষ আত্মকথন । অন্ধকার মঞ্চে, মাত্র একটি স্পটলাইটের গোল বৃত্তে ধরা, একজন মাত্র অভিনেতার উচ্চারিত নিখুঁত সলিলকি ।'

    তিলোত্তমা মজুমদারের `একতারা' উপন্যাস সম্পর্কে এই উক্তির প্রত্যেক শব্দই সত্য ।
    অত:পর স্পষ্ট হয়েছে আশা করি, যে - তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে চলমান একতারার গান শোনে, সে নিতান্তই পাঠক মাত্র, আলোচক নয় ।

    (পরবাস-৪০, জানুয়ারি, ২০০৮)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)