• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪০ | ফেব্রুয়ারি ২০০৮ | প্রবন্ধ
    Share
  • সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রাম - প্রতিবাদ প্রতিরোধের একটি বিকল্প নাম : চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য

    সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম - একের প্রেরণা নিয়ে পরবর্তী সংগ্রাম । বাংলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক রক্তস্নাত অধ্যায় । গ্রামীণ জীবনে বেঁচে থাকার মূল উপকরণ যে ফসল ফলানো সবুজ মাঠ, তাকেই জোর করে পুলিশী ও শাসকদলের নিপীড়ন চালিয়ে টাটা-সালিমদের হাতে তুলে দেওয়ার খেলায় মত্ত সিপিএম সরকার । এই সর্বনাশের বিরুদ্ধে আবালবৃদ্ধবনিতার মরণপণ লড়াই - সিঙ্গুরে তার সূচনা, পরের ধাপে নন্দীগ্রাম । পুলিশ ও সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর আক্রমণে বহু প্রাণ গেলেও নন্দীগ্রাম দাম্ভিক সরকারের কেমিক্যাল হ্যাবের দম্ভ ঘুচিয়ে দিয়েছে । আজ শুধু এই রাজ্যেই নয়, গোটা দেশ জুড়ে উচ্চারিত হচ্ছে এই দুটি নাম । এমনকি আমেরিকার ভূতপূর্ব এটর্নি জেনারেল, সাম্রাজ্যবাদ - বিরোধী সংগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি রামসে ক্লার্ক নন্দীগ্রাম ঘুরে এসে `সেজ' - এর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের মানুষের প্রতিরোধ সংগ্রামের অনুপ্রেরণাময় ইতিহাসকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন । অবশ্য এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে অনেক - সিঙ্গুরে পুলিশের অত্যাচারে প্রাণ গিয়েছে তরতাজা যুবক রাজকুমার ভুল - এর । কিশোরী তাপসী মালিককে সিপিএম নেতাদের দ্বারা নিযুক্ত খুনীদের পাশবিক লালসার শিকার হয়ে তাদেরই হাতে জ্বলন্ত উনুনে তিলতিল করে পুড়ে মরতে হয়েছে । জমি হারিয়ে কূলকিনারাহীন হারাধন বাগ, প্রশান্ত দাস এবং শঙ্কর পাত্রকে আত্মঘাতী হতে হয়েছে । আর নন্দীগ্রামের মাটিতে ২০০৭ -এর ১৪ মার্চ পুলিশ ও পুলিশের পোষাকপরা সি পি এম হার্মাদ বাহিনীর তাণ্ডবে যে কত মানুষের রক্ত ঝরেছে, কত মানুষের যে নিষ্ঠুর মৃত্যু হয়েছে, কত নারী যে ধর্ষিতা হয়েছেন এবং অবর্ণনীয় বিকৃত লালসার শিকার হয়েছেন, তার কোনও সঠিক হিসাব আজও পাওয়া যায়নি । সেখানে কৃষক রমণীরা সলজ্জ সংকোচের মধ্যেও নির্যাতনের কথা যতটুকু বলতে পেরেছেন, সেটুকু শুনেই শিউরে উঠতে হয় । আর ২০০৭- এর ৫ই নভেম্বর থেকে শুরু করে সিপিএম `নন্দীগ্রাম দখলের' যে অপারেশন চালিয়েছে তার নিষ্ঠুরতা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব । আজও জানবার কোন উপায় নেই ১০ই নভেম্বর নির্যাতিত নন্দীগ্রামের ৫০ হাজার নিরস্ত্র মানুষের মিছিলের উপর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো করা সিপিএম হার্মাদদের গুলিবর্ষণে ঠিক কত মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ! বহু মানুষ আজও নিখোঁজ ! হার্মাদের গুলিতে নিহত ও আহতদের এক দড়িতে বেঁধে হার্মাদরা ঠিক কতজনকে ইটভাটায় পুড়িয়েছে তার ইতিহাস থেকে গেছে আড়ালে । খেজুরিতে উঁচু ঢিবি দেখে সেখানে মাটি খুঁড়ে আধপোড়া মৃতদেহের শুধু হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছে । মাথা আগেই কেটে গায়েব করা হয়েছে । তার হদিশ কোনও দিন আর পাওয়া যাবে না ! শবদেহ চিহ্নিত করার কোন উপায়ই নেই । নন্দীগ্রামে হরেন প্রামাণিকের জামাপরা লাশ মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে । বোধ করি তাড়াহুড়োয় খেজুরির মত সব চিহ্ন লোপাট করতে পারেনি ! প্রকৃত পরিচয় গোপন করার জন্য হরেন প্রামাণিকের স্ত্রী শ্যামলী প্রামাণিকের বুক ভাঙা কান্না চাপা দিতে সিপিএম আরও দুজন মহিলাকে কান্নার অভিনয় করিয়ে এই মৃতদেহ তাদেরই স্বামীর বলে দাবী করতে শিখিয়ে দিয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধোপে টেকেনি । লাশের সঙ্গে মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত আসার ধৈর্য ছিল না তাদের ! কান্না আর কান্নার অভিনয় তো এক নয় ! এ সবই হিমশৈলের একটু খানি চূড়ামাত্র । আসল ঘটনা যে কত বীভত্স, কত নিষ্ঠুর তা এর থেকেই অনুমান করা যায় । একথা আজ দিবালোকের মত সত্য যে, এই নিধনযজ্ঞের জন্যই সিপিএম পুলিশকে সরিয়ে নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ! `পাটকেল' ছোঁড়ার জন্য এসেছিল মানুষ - খুনের উল্লাসে মত্ত তপন ঘোষ - সুকুর আলি - সেলিমের মত ক্রিমিন্যালরা ! এরাই নাকি সিপিএমের সম্পদ ! এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেখে বহু বিশিষ্ট মানুষ গভীর বেদনায় বলেছেন, গুজরাটে মানুষের লাশের উপর প্রতিষ্ঠিত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসা নরেন্দ্র মোদিকে হার মানিয়েছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য - কারণ নরেন্দ্র মোদী দিলেও বুদ্ধবাবু সংবাদ মাধ্যমকেও ঢুকতে দেননি । শুধু তাই নয়, এই পৈশাচিক বর্বরতার উল্লাস নিয়ে স্মিত হাস্যেই তিনি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধন করেছেন ! রক্তের বন্যা বইয়ে CRPF কে তার পরে ঢুকতে দিয়েছে - তাদের দখলদারিত্ব পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে । একেই আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে বসে সিপিএম - এর নেতারা বলেছেন - `সূর্যোদয়' ! প্রশ্ন জাগে - `এ কোন্‌ সূর্য ?' `এ কোন প্রভাত ?' মানুষের সংগ্রামে আগামী দিনে হয়ত আরও অনেক মূল্য দিতে হবে । তবুও মর্মান্তিক এই বেদনাবোধের মধ্যে অনুপ্রেরণা পাই যখন স্বজন হারানো মানুষগুলির প্রত্যয়ে ভরা কথা শুনি - 'I have lost everything, but not my mental strength.' - সিপিএমের হাতে নিগৃহীত, সর্বস্ব হারানো এক প্রবীণ শিক্ষকের কথা এটি ।

    বাস্তবিকই, জীবন দিয়ে নন্দীগ্রামের মানুষ আমাদের চেতনার তন্ত্রীতে ঘা দিয়েছেন । নিষ্কিয়তার বেড়াজাল থেকে আমাদের কর্মশক্তিকে এঁরা মুক্ত করেছেন । তথাকথিত নিরপেক্ষতার আড়ালে নিরুপদ্রব জীবনের আঙিনাতেও ক্রিয়াশীলতার ঢেউ উঠেছে আজ । বাংলার বিবেক আজ সম্মিলিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামী পথে সামিল । শিল্পী - সাহিত্যিক - বুদ্ধিজীবী - আইনজীবী - ডাক্তার আজ জনতার সঙ্গে পায়ে পায়ে মিছিলে । সেদিন দেখা গেল, উত্তর ২৪ পরগণার এক বন্ধ কারখানার ঝুপড়িতে উচ্ছেদের আগে অশীতিপর এক বৃদ্ধা জোর গলায় বললেন, `পুলিশ এলে লড়ব, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মত লড়ব ।' রিজওয়ানুর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে গোটা বাংলা প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে - রেশনকাণ্ডের দুর্নীতি প্রতিরোধে সামিল হয়েছেন গ্রামের গরীব মানুষ । সিঙ্গুর - নন্দীগ্রামের প্রতিবাদের প্রতিরোধের প্রদীপ আরও অসংখ্য আন্দোলনের দীপশিখাকে প্রজ্জ্বলিত করছে । তাই সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রাম প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের এক নতুন নাম - এই দুটি নাম আজ অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত ।

    যথার্থ অর্থেই নন্দীগ্রাম দু'শ পঁয়ত্রিশের সরকারী ঔদ্ধত্যকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে । যে মুখ্যমন্ত্রী প্রবল দম্ভে বলেছিলেন, `কি করবে ওরা ? আমরা দু'শ পঁয়ত্রিশ !' - তাঁকেই বলতে হয়েছে `নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব হবে না ।' জমি অধিগ্রহণ করে `সেজ' গড়বার পরিকল্পনাকে নন্দীগ্রামের মানুষ বীরের মত রুখে দিয়েছেন । সেলাম নন্দীগ্রাম - লাখো সেলাম । সিপিএম যতই এলাকা দখল করুক, নন্দীগ্রাম সফল - সফল তাদের আন্দোলন । কোথায় নিহিত এই সাফল্যের কারণ ? তা নিহিত রয়েছে, একটা সঠিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের মধ্যে । নন্দীগ্রামের মানুষ ছিলেন সঙ্ঘবদ্ধ । দলমত নির্বিশেষে ঐকবদ্ধ । তাঁদের উত্তপ্ত হৃদয়ে ছিল সংগ্রামের প্রত্যয় । সেই আধারে গ্রামে-পাড়ায় তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের সঙ্ঘবদ্ধ কমিটি । এই সঙ্ঘবদ্ধতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে ঘাতক পুলিশ বা হার্মাদবাহিনী সহজে ঢুকতে পারেনি সেখানে । নন্দীগ্রামে আইনের শাসন নেই - এ জিনিষ চলতে পারে না বলে বলেছেন সিপিএমের নেতারা । প্রশ্ন জাগে, দাগী ক্রিমিন্যাল তপন - সুকুর -সেলিমরা সম্পদ হয়ে এসে গণহত্যা চালাবে, আর তার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়ে আগে থেকে পুলিশ ক্যাম্প সরিয়ে নেবে - এই কী আইনের শাসন ? সরকারী তরফেও একই প্রচার তোলার চেষ্টা চলেছিল যে, নন্দীগ্রামে নাকি আইনের শাসন নেই । মিথ্যা কথা । হ্যাঁ, মালিক এবং সিপিএম নেতাদের তোষণকারী নির্লজ্জ পুলিশ সেখানে ছিল না, পুলিশ এবং ঘাতক সি পি এম বাহিনীকে রুখতে কয়েকটি জায়গায় হয়ত রাস্তা কাটতে হয়েছে মানুষকে । কিন্তু নন্দীগ্রামের স্বাভাবিক জীবন - স্কুল, কলেজ, অফিস সবই চলেছিল স্বচ্ছ গতিতে । এই ক'মাস সেখানে নেই নারীর সম্ভ্রমহানির কোনও ঘটনা, নেই লুঠতরাজ । ফুলের কুঁড়ির মত যে শিশু, তাদের পিষে মারছিল না আর কেউ । কারণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবাদ করেন, তাঁদের সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যে একটা সংস্কৃতি থাকে । নন্দীগ্রামে সেই সংস্কৃতিই ছিল বিরাজমান । তাই সকলকেই সেখানকার মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন । শুধু যারা গণহত্যা সংঘঠিত করেছিল, যারা কৃষকের রক্তে নন্দীগ্রামের মাটিকে রক্তাক্ত করেছিল, নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছিল, শিশুহত্যা করেছিল - তাদের নয় । সত্যিই তো ! এদের তো জায়গা হওয়ার কথা ছিল কারাগারে ! তার পরিবর্তে দুষ্কৃতকারীরা অস্ত্র নিয়ে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে । পুলিশ তাদের সহায় । এটা সম্ভব হল কি করে ? `আইনের শাসন' যারা নাকি প্রতিষ্ঠা করবে, সেই সি পি এম সরকার দুষ্কৃতকারীদের, দোষী পুলিশ অফিসারদের সামান্যতম শাস্তিটুকুও দেয়নি । এমনকি যে দশজন খুনী অস্ত্রশস্ত্র সহ জননী ইট ভাঁটা থেকে সি বি আইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সিপিএম নেতাদের নির্দেশেই পুলিশ ৬২ দিনেও চার্জসীট দেয়নি । আর বিচার ? কথায় আছে - Justice delayed is justice denied --তাই তো ঘটেছে নন্দীগ্রামে । ন্যায়ালয়ের প্রথম বিধান ছিল খুনীদের হাতেই `শান্তিপ্রতিষ্ঠার' দায়িত্ব । পরে হাইকোর্টের সমস্ত আইনজীবীদের অনন্য সাধারণ প্রতিবাদে বর্তমানে কিছুটা সুবিচার আশা করেছেন জনসাধারণ । ভবিষ্যতে অবশ্য কী হবে তা ভবিষ্যত্‌-ই বলবে ।

    সকলেই জানেন, সরকারী নীতির বিরোধিতা করার জন্য একবছর ধরে নন্দীগ্রামের মানুষের উপর অবিরাম আক্রমণ চলেছে । চলেছে নিয়ত বোমা-গুলি বর্ষণ । সত্য সংবাদ জানার কোনও পথই খোলা ছিল না । এমনকি সাংবাদিকদের উপরও গুলি চলেছে । অবস্থা এমন যে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, খেজুরির দিক থেকে তাঁদেরই দল আক্রমণ চালাচ্ছে । আর পি এফ - এর গুলিবিদ্ধ সৈনিকও তাই বলেছেন । এমনকি সরাষ্ট্র সচিব প্রসাদরঞ্জন রায়ও বলেছেন, খেজুরির দিক থেকে গুলি চলার কথা । কিন্তু আশ্চর্য হল, পুলিশতো নয়ই এমনকি CRPF ও খেজুরিতে কোন তল্লাসী চালালো না । এর কারণ কি জানতে অসুবিধা হয় ? অথচ আশ্চর্যের বিষয় তাঁরাই `শান্তি প্রতিষ্ঠা'র কথা বলছেন অহরহ । এক বিচিত্র অবস্থা ! অদ্ভুত বৈপরীত্যও বটে ! শাসক দলের এক হাতে ধরা বন্দুক তাদের পায়ের তলায় কৃষকের লাশ, লাঙ্ছিতা, অপমানিতা রমণীর আর্তনাদ - আর অপর হাতে ধরা `শান্তি চাই, শান্তি চাই' প্রচারের মাইক । প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি তাঁরা শান্তি চেয়েছিলেন ? চাইলে, সি পি এম-ই তো এক নিমেষে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারত । খেজুরি থেকে আক্রমণ বন্ধ করে দিত, সরকার দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার করত এবং দোষী পুলিশ অফিসারদের শাস্তি দিত, নিহত ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিত, কৃষি জমি অধিগ্রহণ না করার লিখিত ঘোষণা করত - তাহলেই তো সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে যেত । আসলে পুলিশ সিপিএম যৌথ ভাবেই এই নৃশংসতার নায়ক । খেজুরির ৫টি কবরের জন্য পুলিশ পাঠালো ছোট ছোট কফিন আর নন্দীগ্রামের কবরটির জন্য পাঠালো বড় কফিন । এত নিখুঁত হিসাব করে তারা কীভাবে কফিন পাঠাতে পারল, তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয় । আসল রহস্য হল পুলিশ সব ঘটনা জানতই এবং সিপিএম-পুলিশের মিলিত চক্রটিই এসব কাণ্ডের নায়ক । তা নাহলে এ জিনিষ ঘটতে পারত না ।

    দু:খের বিষয় এমন একটা প্রচারের বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে যাতে গণহত্যা কাণ্ডটিই পিছনে চলে যাচ্ছে, গণহত্যার নায়করাই `শান্তির দূত' সাজছে । প্রচারকে এমন কৌশলে করা হচ্ছে, যেন সেখানে বিবদমান দু'টি পক্ষ । কিন্তু ঘটনা কি তাই ? এখানে একদল আক্রমণকারী আর আক্রমণের শিকার গ্রামের সাধারণ মানুষ । আক্রমণকারী আর আক্রান্তকে একই দৃষ্টিতে দেখা কি ন্যায়সঙ্গত ? সরকার তার পেশী শক্তি দিয়ে সশস্ত্র আক্রমণ চালাচ্ছে - অসহায় মানুষ আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে । আত্মরক্ষা করতে গিয়ে কোথায় কে একটা বাঁশের লাঠি, বাড়ির উঠোনের একটা কাস্তে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে অথবা ঝাঁটা খুন্তি নিয়ে মহিলারা প্রতিবাদ করছে, প্রতিবাদ করতে গিয়ে হাজারে হাজারে মানুষ নিরস্ত্র মিছিলে সামিল হয়েছে - তাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছে অথবা তাদের বাপ-ঠাকুর্দার জমিকে রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছে - সশস্ত্র পুলিশ ও হার্মাদবাহিনীর সঙ্গে তাকে একই ব্র্যাকেটে রেখে বিচার কি যথাযথ ? এক্ষেত্রে আমরা কি বলব সাধারণ মানুষ অশান্তি সৃষ্টি করছে ? যারা বলছেন তারা কি সত্য বলছেন ?

    `সরকার সশস্ত্র পুলিশ শক্তি দিয়ে আমার জমি ঘিরে পাঁচিল তুলে দেবে, বসতবাটি নিয়ে নেবে, জীবন-জীবিকা থেকে আমাকে উচ্ছেদ করবে আমার মা - বোন - স্ত্রীকে লাঙ্ছিত করবে - তবু আমি `শান্ত', `নিশ্চুপ' হয়ে থাকব । আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে আমাকে পথের ভিখারী করে দেওয়াটা অপরাধ নয় - আর নি:স্ব, রিক্ত আমি যদি তার প্রতিবাদ করি, আমার অবরুদ্ধ কান্না যদি বিক্ষোভের রূপ নেয় তবেই তা অপরাধ ? - তাহলেই আমি `অশান্তি' করছি ? এই কি ন্যায় বিচার ? এই কি সত্য ? মনে পড়ে সাহিত্যিক শরত্চন্দ্রের `পথের দাবী'র কথা - "শান্তি ! শান্তি ! শান্তি ! শুনে শুনে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেছে । কিন্তু এ অসত্য এতদিন কারা প্রচার করেছে জানো ? পরের শান্তি হরণ করে যারা পরের রাস্তা জুড়ে অট্টালিকা প্রাসাদ বানিয়ে বসে আছে, তারাই এই মিথ্যা মন্ত্রের ঋষি ।" প্রকৃতপক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠা যদি সত্যিই করতে চায় কেউ, তাহলে অশান্তির উত্স মুখ - সরকারী নীতি প্রত্যাহার এবং শাসক দলের নৃশংস আক্রমণ, হুমকি দেখানো, গুণ্ডা লেলিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে । এছাড়া `শান্তি'র কথা একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছু হ'তে পারে কি ? আরও বলা হয়েছে, ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির প্রয়োজন কি ? প্রয়োজন ভবিষ্যতে বাঁচবার জন্য । কারণ এ সরকার এবং তার মুখ্যমন্ত্রী সত্যভাষণ করেন কম । সিঙ্গুরের জমির হিসাব তিনি নানান সময়ে নানান সংখ্যায় দিয়েছেন । নন্দীগ্রামে তিনি একবার বলেছেন, `জমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেওয়া হয়নি ।' আবার বলেছেন, `ওই নোটিশ ছিঁড়ে ফেল ।' এই সরকার বা তার মুখ্যমন্ত্রীকে বিশ্বাস করা যায় কি ? তাই সংঘবদ্ধতাকে ভাঙতে দিলেই প্রতিরোধ দুর্বল হবে, সিপিএমের আক্রমণ আরও তীব্র হবে ।

    মনে রাখতে হবে, শান্তির বাতাবরণের আসল উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে অনেক গভীরে । টাটা-সালিমদের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে খুন ধর্ষণ লুঠতরাজ চালিয়ে সি পি এম আজ গোটা দেশে ধিক্কৃত । সাধারণ মানুষ তো বটেই, দেশের অগ্রগণ্য মানুষ বলে যাঁরা পরিচিত এবং এক সময় যাঁদের অনেকে এই দলটাকে প্রগতিশীল বলে মনে করতেন, তাঁদের কাছে সি পি এম-এর আসল চরিত্রটি প্রকাশ হ'য়ে পড়ায় সেই সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা গণহত্যার প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন, সরকারী পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন, কেউ কেউ সরকারী খেতাব প্রত্যাখান করেছেন । ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বয়কট করেছেন । তার জন্য পুলিশ দিয়ে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদেরও আক্রমণ করা হয়েছে । অশালীন কটূক্তি করতেও ছাড়েননি তারা । প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক অপর্ণা সেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব উদ্বোধন যাতে না করতে পারে তার জন্য উদ্যোক্তাদের হুমকি দিয়েছিলেন সিপিএম মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী । যদিও উদ্যোক্তারা মাথা নিচু করেননি ।

    দেশের মানুষ দেখেছেন, সি পি এম হিমাচল প্রদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার বিরোধিতা করেছে, কর্নাটকে কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের প্রতিবাদ করেছে, উত্তর প্রদেশে কৃষিজমিতে শিল্প বা আবাসন করতে দেবে না বলে স্লোগান তুলেছে, হরিয়ানায় শিল্পের নামে জমি নিয়ে কি হচ্ছে তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করার দাবী জানিয়েছে, মহারাষ্ট্রের নাগপুরে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মাননীয়া মেধা পাটকরের সাথে সভাও করেছে । আর পশ্চিম বাংলায় তাঁরা দেখলেন `আর এক' সি পি এমকে । এক কথায় ফ্যাসিস্ট সিপিএমকে । এতে বিব্রত সি পি এম বাঁচবার পথ খুঁজতে চাইছে । তাই `শান্তি প্রতিষ্ঠা'র দূত হিসাবে আসরে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিল । কিন্তু সে আশা তাদের পূরণ হচ্ছে না । এক্ষেত্রে মনে পড়ে নাট্যব্যক্তিত্ব মাননীয় শ্রী বিভাস চক্রবর্তীর টি ভি সাক্ষাত্কার-এর একটি কথা - তিনি বলেছিলেন যে, লেডি ম্যাকবেথের মত নিশুতি রাতে বুদ্ধবাবু হয়ত হাত কচলাবেন, তবু তাঁর হাত থেকে রক্তের দাগ মুছবে না । তাঁর সাদা পাঞ্জাবীতে যে রক্তের ছিটে লেগেছে - অনেক কবিতা আবৃত্তি করেও তাকে মুছে ফেলা যাবে না । তবে রক্তের ছিটে নয় - ১০ই নভেম্বরের পরে পুরোটাই রক্তে ভিজে গিয়েছে - রক্তলোলুপের চেহারা তাঁর । প্রখ্যাত শিল্পী শুভাপ্রসন্নের আঁকা ছবিতে সে চেহারা স্পষ্ট ভাবেই ফুটে উঠেছে ।

    বাস্তবিক পক্ষে যারা রাজনীতির বিন্দুমাত্র খবর রাখেন তারা জানেন, সিপিএমের দ্বিচারিতার সীমা নেই । একদিকে তারা বলেছে, CRPF পাঠাতে দেরি হ'চ্ছে বলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না । আবার বহু বিলম্বে সিপিএম - এরই দোসর কংগ্রেস সরকার যখন CRPF পাঠালো তখন তাকে ঢুকতে দিল না - রাস্তা অবরোধ করে আটকে রাখল । আবার শুধু তাই নয়, CRPF যদি কোন হার্মাদকে ধরে, তাহলে সিপিএমের যোগসাজসে পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয় । বলে, `নির্দোষ'। এখন আবার যেই সিপিএমের কয়েকজন নেতাকে CRPF যখন ধরল - খেজুরি, নন্দীগ্রামে যেসব মানুষকে মেরে জ্বালিয়ে আধপোড়া করে, ধড় থেকে মাথা কেটে নিয়ে মাটির তলায় তার হাড়গোড় পুঁতে রেখেছে তার কয়েকটা যখন ধরা পড়ে গেল - সঙ্গে সঙ্গে তারা দাবী তুলছে, CRPF হঠাও'। যে মুহূর্তে সি বি আই সিপিএম নেতাদের জেরা করতে চাইল - তখন সব নেতা গা ঢাকা দিল এবং সি বি আই-এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে লাগল । কংগ্রেসী দোস্ত কেন্দ্রীয় সরকারও সহানুভূতিসুলভ আচরণ করতে লাগল । এমনি বিদেশমন্ত্রী কংগ্রেসী নেতা প্রণব মুখার্জী তো বুদ্ধদেব বাবুকে `মহান'-ও বলে ফেললেন ! ঘর ছাড়ার হিসাব নিয়ে তো সিপিএমের নানান নেতা নানান সময়ে নানান হিসাব দিয়েছেন । আসলে মিথ্যা যে বহু হয় এ তারই প্রমাণ । সত্য হলে একটাই সংখ্যা সকলে বলতেন । শুধু তাই নয়, ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির শহীদদের মৃত্যুকে লঘু করে দেখানোর কৌশল হিসাবে সিপিএমও ২৭জনের একটা শহীদ তালিকা প্রকাশ করে নন্দীগ্রামে হোডিং টাঙালো । ভাবখানা এমন যে, দুপক্ষেরই কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে - এ লড়াইটা যেন দুপক্ষের সংঘর্ষ ! সেই শহীদ তালিকায় জনৈক `গোষ্ঠ দাস' এখনও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেম । আর একজন `শহীদ' সাপের কামড়ে মারা গিয়েছেন, অপর একজন দশ বছর আগে মারা গিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি । হৈ চৈ হতেই সেই হোর্ডিং নন্দীগ্রাম থেকে খুলে ফেলল সিপিএম । তবে রাজ্যের অন্যত্র এবং কেন্দ্রীয় নেতা প্রকাশ কারাত রাজ্যে রাজ্যে মিথ্যা শহীদ তালিকার ফিরিস্তি দিয়েই চলেছেন । সত্যিই অপূর্ব রাজনৈতিক দল সিপিএম !

    চতুর্দিক থেকে বিপর্যস্ত এবং জনগণের দ্বারা ধিক্কৃত সিপিএম `মাওবাদ', `মাওবাদীদের উপস্থিতি' প্রভৃতি প্রচার তুলে তাদের আক্রমণকে justify করতে চাইছে । অথচ প্রসাদ রঞ্জন রায়ও এই সেদিন পর্যন্ত বলেছিলেন, মাওবাদের অস্তিত্ব নেই । আর আশ্চর্যের কথা CRPF মাওবাদীদের পেল না । সিপিএম প্রচার করল, মাওবাদীরা নাকি তেলেগু হ্যাণ্ডবিল ফেলে রেখে গিয়েছে । সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠল, নন্দীগ্রামের গ্রামীণ বাঙালিদের কাছে মাওবাদীরা তেলেগু হ্যাণ্ডবিল নিয়ে গিয়ে কী করবে ? বলল, নন্দীগ্রামে ল্যাণ্ডমাইন পাওয়া গিয়েছে । শুভবুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগলো, যেখানে মাওবাদীরা তাদের সহযোগী শক্তি `সেই নন্দীগ্রামে' কি ল্যাণ্ডমাইন রাখার কোন কারণ থাকতে পারে ? অথচ খেজুরীতে, যেখানে সিপিএমের ঘাঁটি সেখানে ল্যাণ্ডমাইন নেই ! তাদের এই তত্ত্ব কি বিশ্বাসযোগ্য ? আর ল্যাণ্ডমাইন আগে কেউ পেল না - পেল সিপিএম বাহিনী ঢোকবার পর । বিচিত্র বিষয় বটে ! অনেকে বুদ্ধদেবকে `ক্ষুদে বুশ' বলেছেন । মনে হয় ক্ষুদে বুশ হলেও বুশ সাহেব যদি ইরাক যুদ্ধের আগে বুদ্ধদেবের সাক্ষাৎ পেতেন, তাহলে ইরাকে মার্কিন সেনারা যে অস্ত্র পায়নি, সেটা ঘটত না - বুদ্ধবাবুর বুদ্ধি পেলে বুশ সাহেব অস্ত্র ফেলে রেখে সেগুলিকেই ইরাকের অস্ত্র ভাণ্ডার হিসাবে দেখিয়ে বাজিমাত করতে পারতেন ।

    প্রসঙ্গত: আরও একটা কথা বলতে হয় । মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নন্দীগ্রামে ১৪ মার্চের গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে হঠাৎ করে কপালে হাত ঠুকে বলে উঠলেন `সব দায় আমার, আমিই ভুল করেছি ।' কিন্তু তাঁর পরবর্তী আচরণ ভুল স্বীকারের সততা নিয়েই প্রশ্ন না তুলে পারে না । এতগুলি মৃত্যু এবং এত নারীর সম্ভ্রমহানির পরেও তাঁর কোন অনুশোচনা নেই । বরং দেখা গেল হাসপাতালে ধর্ষিতা মহিলাদের কোন ডাক্তারী পরীক্ষা না করে, আহতদের রিপোর্ট নথিভুক্ত না করে প্রমাণ লোপাটের ঘৃণ্য অপচেষ্টা । পরবর্তীকালে এমন প্রচার তাঁরা করছেন যেন আন্দোলনকারীরাই আন্দোলনকারীদের হত্যা করেছেন । শুধু কি তাই ? ১০ নভেম্বরের হার্মাদ বাহিনীর নৃশংস গুলি চালিয়ে হত্যা র পর লাশ পাচার করার জন্য খেজুরি, হেঁড়িয়া, পটাশপুর, এগরার পথ ধরে গিয়েছে অনেক গাড়ি । ইটভাটায় পুড়েছে মৃত মানুষের শব । এই মুখ্যমন্ত্রী তার সাফাই গেয়ে বলেছেন, `ইট মারলে পাটকেল খেতে হয় ।' যদি সত্যিই মুখ্যমন্ত্রী দায় স্বীকার করতেন এবং নূযনতম বিবেকবোধ থাকত তাহলে তিনি এক মুহূর্তও গদি আঁকড়ে পড়ে থাকতে পারতেন না এবং এসব `মস্তানসুলভ' কথা বলতেন না । বামপন্থী নন, সৎ গান্ধীবাদী নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে পরিচিত ওড়িশার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নবকৃষ্ণ চৌধুরীর দৃষ্টান্ত এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য । তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্ব কালে পুলিশের গুলিতে ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা ঘটে । ঘটনা জানবার পরে তত্ক্ষণাৎ তিনি পদত্যাগ করেন । তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি মন্ত্রীত্বের পদ গ্রহণ করেননি । তিনি বলেছিলেন, `একথা সত্য যে, আমি গুলি চালনার নির্দেশ দিইনি - তবু মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ছাত্রের প্রাণ রক্ষা করতে পারিনি - এটা আমার ব্যর্থতা ।' এই নৈতিক বোধটুকু যা কংগ্রেসী এক নেতার ছিল, বামপন্থার বড় বড় কথা বললেও বুদ্ধদেববাবুদের তা নেই । বরং তারা নানান কৌশলে দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । বারবার অশান্ত মন তাই এই প্রশ্নের উত্তর পেতে চায় - `আর কত মৃত্যু হলে, আর কত নারীর সম্ভ্রম ধূলায় মিশলে, আর কত মানুষ পথের ভিখারী হলে, আর কত মানুষ আত্মঘাতী হলে টাটা-সালিম-সি পি এমের জমির লালসা মিটবে ?'

    অথচ এই দলটিই বারবার ভূমিসংস্কারের কথা বলে কত কত বেনাম জমি উদ্ধার করা হয়েছে তার ফিরিস্তি দেয় । যদিও আমরা জানি, বেশিরভাগ জমিই উদ্ধার করা হয়েছিল ষাটের দশকের শেষভাগের যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে । এবং সেক্ষেত্রেও সিপিএমের শক্ত ঘাঁটির জেলাগুলিতে নয়, দক্ষিণ ২৪পরগণাতেই বেশি বেনাম জমি উদ্ধার হয় । সে কথা বাদ দিয়েও প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, যে বেনাম জমি উদ্ধার করা হয়েছিল, তা কি টাটা-সালিমদের বিলি করে দেওয়ার জন্য ? আজ প্রচার চালানো হচ্ছে, কৃষি অলাভজনক । বিতর্ক বাদ দিলেও যে উত্তর বর্তমান সরকারকে দিতে হবে, তা হল, কাদের সৃষ্ট নীতির ফলে এই অবস্থা ? কেন সরকার কৃষিতে ভরতুকি তুলে দিলেন ? উপযুক্ত সেচের ব্যবস্থা সরকার কেন করছে না ? সারের মূল্যবৃদ্ধি কে বা কারা ঘটাচ্ছে ? কেন এরাজ্যে কৃষি বিদ্যুতের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেশি ? চাষীর কাছ থেকে যথোপযুক্ত দামে ফসল কেনার ব্যবস্থা কেন সরকার করছে না ? কেই বা আম্বানির মত বড় বড় পুঁজিপতিদের কৃষিপণ্য ব্যবসায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে ?

    আমরা জানি, কোন সদুত্তরই এখানে মিলবে না । ধীরে ধীরে দেশের মানুষের সামনে সিপিএম দল ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের আসল চরিত্রটি প্রকাশ হয়ে পড়ছে । তাই অত্যন্ত সুকৌশলে এমনভাবে তাঁরা প্রচার চালাচ্ছেন যেন, তারাই এই `হতভাগ্য' বাংলার উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ । আর যাঁরা সরকারী নীতির বিরোধিতা করছেন তাঁরা সব উন্নয়ন বিরোধী - মানুষের মঙ্গল তাঁরা চান না । গ্রাম-শহর প্রকম্পিত করে তাঁরা শ্লোগান তুলছেন, `উন্নয়ন চাই', `শিল্পায়ন চাই' । জনগণের রক্ত - ঘাম ঝরানো ট্যাক্সের সরকারী টাকায় বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং-এ শিল্পায়ন ও উন্নয়নের জোয়ার আনা হচ্ছে ।

    প্রশ্ন হ'ল কার উন্নয়ন ? শিল্পপতিগোষ্ঠীর, নাকি অগণিত মানুষের ? চকচকে রাস্তা, শহরে আলো ঝলমল শপিং মল, বিশালাকার বাড়ি-ফ্ল্যাট - ক'জন মানুষের জন্য এসব ? যারা কবিগুরুর কথায় `নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে, দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে মরে .... নীরবে' - তাদের কি কোন উন্নয়ন হয় এর দ্বারা ? কবি নজরুল একবার বলেছিলেন যে, `এ তোদের মানচিত্রের ভারত নয় রে অনিম - এ তোদের মন্দিরের ভারত নয়, মসজিদের ভারত নয়, তেত্রিশ কোটি না খেতে পাওয়া মানুষের মহামিলন - মহা - ভারত ।' তাদের উন্নয়ন বাদ দিয়ে যে পন্থা তা প্রকৃত উন্নয়ন বলে মানতে দ্বিধা বোধ করে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে টিকে থাকা বিবেক । অন্যদিকে শিল্পায়নের ও কর্মসংসথানের যে ঢক্কানিনাদ তারা তুলছে, তা এক কথায় মিথ্যার বেসাতি ছাড়া আর কিছু নয় । ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সময় নথিভুক্ত মোট বেকারের সংখ্যা ছিল ১৮ লক্ষ । বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৭৫ লক্ষ । তার উপর প্রতিদিন কর্মচ্যুত শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে । ফলে এই সংকটের অবস্থা কি তা সহজেই অনুমেয় । আর দ্বিতীয়ত: একথা তো সত্য যে, বর্তমান এই যুগটি শিল্পায়নের যুগ নয়, বরং শিল্পসংকটের যুগ । শিল্পায়নের অবিরাম শ্লোগান তুলে সিপিএম শিল্পায়নের অর্থটাকেই গোলমাল পাকিয়ে দিচ্ছে । মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার নিগড় ভেঙে শিল্পবিপ্লবের যে যুগ বা কাল, যখন একদিকে কৃষিতে বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে গ্রামীণ জীবনে আটকে থাকা শ্রমশক্তিকে (labour power in bondage) মুক্ত করা হল এবং অপর দিকে দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ বাজারকে ভিত্তি করে সেই শ্রমশক্তিকে কারখানায় লাগানো হল অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে একের পর এক কারখানা স্থাপিত হল - তাকেই বলে তো শিল্পায়ন । বর্তমানে কি সেই অবস্থা বিরাজ করছে ?

    বর্তমান অবস্থা কি ধারাবাহিক শিল্প স্থাপনার সম্ভাবনার যুগ, নাকি ধারাবাহিক শিল্প বন্ধ হওয়ার যুগ ? সামাজিক চিত্রটি কী ? শিল্পায়নের যুগ বললে উত্তর দিতে হবে, কেন এই রাজ্যে ৫৬ হাজার কারখানা বন্ধ ? কেন লে অফ, লকআউট ? কেন নানান শিল্পে downsizing of the industry -র নামে ছাঁটাই, `ভি আর এস' প্রথা ? শিল্পস্থাপন করতেই রাজ্য সরকার উদগ্রীব একথা মানতে হলে বলতে হয়, শিল্পস্থাপনের আগে বন্ধ শিল্প চালু করা কি সঠিক পদক্ষেপ হত না ? তা হচ্ছে না কেন ? কারণ তীব্র বাজার সংকটে জর্জরিত এই উত্পাদন ব্যবস্থা ।

    একথা তো সর্বসাধারণের জানা আছে যে, শিল্পপতিরা পুঁজি ঢালে মুনাফার জন্য । নিশ্চয়ই এদেশের হতদরিদ্র অগণিত বেকার বাহিনীর যন্ত্রণা নিরসনের জন্য নয় । পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক নীতিই হল M-C-M - money - commodity - more money - অর্থাৎ উদ্বৃত্ত মূল্য আর তার থেকে মুনাফা লোটা । উত্পাদনের মূল উদ্দেশ্য এখানে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন । মুনাফা হবে তো তখনই, যখন বাজারে উত্পাদিত দ্রব্য বিক্রি হবে । অর্থাৎ বিক্রির বাজার থাকবে আর বিক্রি হবে তখনই যখন কেনবার ক্ষমতা থাকবে সাধারণ মানুষের । একথা কি সত্য নয় যে, টাকার অঙ্কে কিছু মানুষের মাইনে বা আয় বাড়লেও বাস্তবে কেনবার ক্ষমতা বা কার্যকরী চাহিদা (Purchasing capacity and effective demand) অনেক কম । তাই উত্পাদিত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে না, তা গুদামজাত হচ্ছে - বাজারসংকট দেখা দিচ্ছে - মুনাফা হচ্ছে না শিল্পপতিদের । ফলে নানান অজুহাতে কারখানা বন্ধ করতে হচ্ছে তাদের । মনে রাখা দরকার শ্রমিক আন্দোলনের জন্য কারখানা বন্ধ হয় না । যেখানে মুনাফার সুযোগ আছে সেখানে শ্রমিক অসন্তোষ থাকলেও মালিক কখনোই কারখানা বন্ধ করে না । একমাত্র লোকসানের সম্ভাবনা থাকলেই কারখানা বন্ধ হয় । গঙ্গার তীর ধরে তাই নিস্পন্দ কারখানার যন্ত্র - শ্মশানভূমির মতো ভাঙা বাড়িগুলি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস হয়ে । যেখানে লতা গুল্ম গজিয়ে উঠেছে । সেখান দিয়ে হেঁটে গেলে শীর্ণদেহ কেউ কেউ বেরিয়ে এসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে - কবে আবার ভোঁ বাজবে । কিন্তু তা আর বাজবে না ! কারণ, সেই বাজার সংকট । কোথায় যে কারখানাগুলির শ্রমিকরা সব হারিয়ে গেছে আমরা কেইবা তার খবর রাখতে পেরেছি ?

    তবে শিল্পায়ন না হলেও একটি দুটি শিল্পস্থাপন যে সম্ভব নয়, তা নয় । দু একটি শিল্প হবে । কারণ দেশের বেশিরভাগ লোকের ত্রক্রয়ক্ষমতা না থাকলেও মুষ্টিমেয় মানুষের আছে । জনবহুল ভারতবর্ষে সেই সংখ্যাটা খুব কম নয় । তাদের জন্য কিছু কারখানা হবে । তবে যতগুলি কারখানা হবে বন্ধ হবে তার অনেক বেশি । তাছাড়া সেই শিল্পগুলিতে বেশিরভাগ মানুষের কর্মসংস্থান হবে না । বেশি মুনাফার জন্য মালিকরা সেখানে স্বভাবতই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করবে । একে বলা হয় পুঁজি নির্ভর শিল্প । তাতে কর্মসংস্থান হবে নগণ্য মাত্র । একথাকে কোন মতেই অস্বীকার করা যায় কি ? যেমন হলদিয়া পেট্রোকেমিকেল । যত প্রচারই হোক প্রত্যক্ষ কাজ পেয়েছে এক হাজারের কাছাকাছি ।

    অনেকে বলে থাকেন, আমাদের দেশে পুঁজির স্বল্পতার জন্য বা পুঁজির সংকটের জন্য শিল্পস্থাপনা হচ্ছে না । এ কথা সত্য নয় । বর্তমানে টাটার কোরাস কেনা চোখে আঙুল দিয়ে সে কথা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে । পুঁজি আসলে বাজার সংকটে ভুগছে । কোথায় খাটবে পুঁজি ? তাই একটু নজর দিলেই আমরা দেখতে পাব, পুঁজি আজ শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলছে, লোনের ব্যবসা করছে আর ঢুকেছে স্বাস্থ্যে, শিক্ষায় । শিল্পপতিরা কারখানা না খুলতে পেরে তাই বড় বড় দামী হাসপাতাল আর উচ্চ বেতনের স্কুল-কলেজ খুলছে । পরিষেবার ক্ষেত্রগুলি তাই ব্যবসায় পরিণত আজ ।

    এরই সাথে সে ঢুকছে `রিয়াল এস্টেট বিজনেস' বা আবাসন ব্যবসায় । সিঙ্গুর - নন্দীগ্রামের রহস্য এখানেই । তাই মোটর গাড়ির কারখানার জন্য যত জমি তার চেয়ে অনেক বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে । অনেকটাই যাবে আবাসনে । এখানে লাভ বেশি, শ্রমিক অসন্তোষ নেই, সব ক্যাজুয়াল লেবার - পেনশন, প্রভিডেন্টফাণ্ডের ঝামেলা নেই ।

    সকলেই একথাও জানেন, জনৈক সিপিএম নেতা যখন বলেছিলেন, `শিল্প কি আকাশে হয় ? - তার উত্তরে সিঙ্গুরের এক কৃষক বলেছিলেন, `ধান-পাট-আলু কি আকাশে হয় ?' কারখানা যে কোন জমিতে হতে পারে । কিন্তু ফসল ফলে কৃষিজমিতে । আর অসংখ্য মানুষের রক্তে - ঘামে সে জমি উর্বরা হয় । তাই উর্বরা জমিকে সভ্য দেশ অন্য কাজে লাগায় না । এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে মুখ্যমন্ত্রী অকৃষিজমির যে হিসেব দিয়েছিলেন তা সত্য ছিল না । তাঁরই সরকারের কৃষিদপ্তরের হিসাবের সঙ্গে তাঁর নিজের হিসাবের সামঞ্জস্য নেই । এমনকি তিনি যা বলেছিলেন তাকে ঠিক বলে ধরলেও কোন কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনই হয় না । তবু কেন এই কৃষিজমি অধিগ্রহণ তার কোন উত্তর নেই । বা কেন টাটাকে প্রায় বিনামূল্যে জমি দেওয়া হচ্ছে তারও জবাব নেই । তাঁরা বলছেন, সবটাই `ট্রেড সিক্রেট' । বিদ্বজ্জনেরা বন্ধ কারখানার জমিতে শিল্প স্থাপনা করতে বললে, সরকার জোর গলায় বলছেন, কারখানার মালিকরা জমি দিচ্ছে না । প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মানুষগুলি যে সকল জমির মালিক পুলিশ দিয়ে তা নিতে তো আটকায়নি সরকারের । দরিদ্র কৃষকরা অসহায় বলে ?

    সরকার খুব জোর করে দেশে সবচেয়ে বেশি হারে পুনর্বাসন দিচ্ছে বলে বলছে । কিন্তু তাও সত্য নয় । হরিয়ানাতেই বাস্তবে তা সবচেয়ে বেশি । আর কৃষিজমির পুনর্বাসনের প্রশ্নে সিঙ্গুরের এক বৃদ্ধা যে কথা বলেছিলেন তা বহু ডিগ্রীধারীকেও ভাবায় । তিনি বলেছিলেন, মাটির হাঁড়ির জল গড়িয়ে খেয়ে কদিন চলবে ? অভাবের সংসারে যত টাকাই দাও তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে । কিন্তু কয়েক পুরুষ ধরে জমি খাইয়ে আসছে । তার কি ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় ? সত্যিই কৃষিজমির ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় না ।

    প্রকৃতপক্ষে আবাসন ব্যবসায়ে যে পুঁজি ঢালবার জন্যই দেশী-বিদেশী পুঁজিপতিদের সুযোগ করে দিতে বদ্ধপরিকর বুদ্ধদেববাবুরা তার অন্যতম প্রমাণ হ'ল - হিন্দমোটরের জমি বিড়লাকে আবাসনের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, কলকাতার প্রিন্স আনোয়ারশাহ রোডে ঊষা ইঞ্জিনীয়ারিং-এর বন্ধ কারখানার জমিতে সাউথসিটি নামে ৩৫ তলা বিল্ডিং করা, ডাবর, অন্নপূর্ণাসহ অসংখ্য বন্ধ কারখানার জমিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তৈরি করে বিক্রি করা । সেই সমস্ত বন্ধ কারখানা খোলা বা সেখানে শিল্পস্থাপন হচ্ছে না ।

    বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা সেজ নিয়েও একই কথা । বিশ্বায়নের অংশ হিসাবেই এই পরিকল্পনা । তীব্র বাজার সংকট থেকে বাঁচবার জন্যই ব্যবস্থা । রাজ্য সরকারও সেই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে দেশী - বিদেশী পুঁজিকে আমন্ত্রণ করছে পুঁজি বিনিয়োগ করার জন্য । পশ্চিমবঙ্গ সরকার মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতার ভাব দেখালেও সেজ আইন তৈরি করেছে ২০০৩ সালে । এন ডি এ সরকার প্রথম এ পরিকল্পনা করে । বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এ আইন পাশ করে ২০০৫ সালে । তখনই সে বলেছিল এর উদ্দেশ্য হ'ল, `আর্থিক সংস্কার ত্বরাণ্বিত করা ।' এতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল রিয়েল এস্টেটের কারবারীরা সেজের নামে নেবে । তারা হবে ডেভলাপার । তাদেরকে জল বিদ্যুৎ সহ অন্যান্য পরিষেবা - যা তার প্রয়োজন হবে তা দিতে বাধ্য থাকবে রাজ্য সরকার । সেজের অভ্যন্তরে কোনও অধিকার শ্রমিকের থাকবে না । দেশের আইন সেখানে কার্যকর করা যাবে না । সেখানে ধর্মঘটের অধিকার নেই, মজুরি নিয়ে ভেদাভেদ থাকলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই । শ্রম বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দায়িত্ব শ্রমকমিশনের পরিবর্তে ন্যস্ত থাকবে সেজের ডেভলাপারদের হাতে । এই ডেভলাপমেন্ট কমিশনারের হাতে থাকবে সেজের জমি নির্ধারণের কাজ । পুলিশ ফৌজদারি বিধিমতেও এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না । এই কমিশনারই ঠিক করবেন, উত্পাদন এলাকার কতটা অংশে ওয়াটার পার্ক, সুইমিং পুল, নাইট ক্লাব, রিয়াল এসেস্ট করবেন । এসব ক্ষেত্রেই আর্থিক ছাড় বহাল থাকবে । সেজ সম্পর্কে চীনের উদাহরণ দিয়ে পক্ষে মত তৈরি করা হচ্ছে - এইটুকু শুধু বলব সমাজতান্ত্রিক চীন নয় - সমাজতন্ত্র থেকে বিচ্যুতির পথেই তাদের `সেজ' প্রতিষ্ঠা । সেজ-এর পরিণতি আমরা কিছুটা পাই ফলতায় । কী উন্নয়ন হ'য়েছে তা আমাদের অজানা নয় । সেজের পরিণাম বুঝে মহারাষ্ট্রের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আজ সকলেই বলছেন - এটা `স্পেশাল ইকনমিক জোন' নয়, এ হ'ল `স্পেশাল এক্সপ্লয়টিং জোন' । আশ্চর্যের বিষয় - সিপিএম এখানে আনছে সেই সালিম গোষ্ঠী, যাদের হাত ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট নিধন যজ্ঞে রক্তাক্ত, বা আনছে সেই ডাউ কেমিক্যাল যাদের তৈরি ন্যাপাম বোমা ফেলে ভিয়েতনামের বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলেছিল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা । সর্বনাশা এই নীতির বিরুদ্ধে চাই আরও বৃহত্তর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রস্তুতি ।

    এই প্রতিবাদ - প্রতিরোধের মডেল হ'ল সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম । বাস্তবিক পক্ষে নন্দীগ্রাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক দৃষ্টান্তমূলক পবিত্র পীঠস্থান । দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের উষ্ণ অভিনন্দন স্বত:স্ফূর্তভাবেই পাবেন নন্দীগ্রামের বীর জনগণ । হার্মাদ বাহিনীর দখল অভিযান দেখে যারা বলছেন বা ভাবছেন আন্দোলনের পরাজয় - তাদের বলি, কোথায় পরাজয় ? হার্মাদরা এলাকা দখল করল তো কী হয়েছে ? ভেঙেছে নাকি মানুষের মনোবল ? আবার তারা মিছিলে মিছিলে পা মিলিয়েছে । আবারও সংগ্রামের শপথে ভাস্বর নন্দীগ্রামের সকাল-সন্ধ্যার আকাশ বাতাস । ইতিহাস বলে, আন্দোলনের চেতনা মানুষকে উন্নত সংস্কৃতির সন্ধান দেয়, তাদের উপলব্ধিকে যে কত গভীর করতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল দিল্লীর মসজিদের ইমাম বুখারিকে নন্দীগ্রামে ঢুকতে না দেওয়ায় । শুরু থেকেই চতুর রাজ্য সরকার আন্দোলনকে ভাঙতে সম্প্রদায়িক বিভেদ আনতে চেষ্টা করেছিল । ইমামকে আনা এবং নন্দীগ্রামে পাঠানোটা ছিল আরও পরিকল্পিত কৌশল । কিন্তু আন্দোলনের উচ্চ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় আন্দোলনকারী মানুষ হিন্দু - মুসলমান নির্বিশেষে বলেছেন, আমরা কেউ হিন্দু বা মুসলমান নই - আমরা নন্দীগ্রামের মানুষ । ১০ নভেম্বরের বীভত্স হত্যালীলার পর শ্যামলী মান্নার মুখাগ্নি করে তার ১২ বছরের সন্তান যখন কাঁদছে, তখন তারই পাশে দাঁড়িয়ে মুসলমান এক চাষী বললেন, কত মুসলমানকে এমন করেই পোড়াতে হয়েছে, কত হিন্দুকে মাটিতে কবর দিতে হয়েছে তার হিসেব নেই । এসব হিসেব করতেও ইচ্ছে করে না - আজ আমরা সবাই সমান - সবাই আমরা নন্দীগ্রামের সংগ্রামী মানুষ । এই ঘটনা দেখে সত্যিই বড় আশা জাগে ধর্ম - বর্ণ - জাতপাতের দাঙ্গায় দীর্ণ এ দেশে । এই তো এদেশের শুভবুদ্ধির বহু আকাঙ্খিত কামনা । আর যাঁরা আন্দোলনের গতিপথে আত্মনিয়োগ করতে গিয়ে ধর্ষিতা হয়েছেন, গোটা দেশ বেদনাভরা শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় তাঁদের দেবে বীরাঙ্গনার মর্যাদা - যেমন করে বিপ্লবের অব্যবহিত পরের চীনে আগ্রাসী জাপানী সেনাদের দ্বারা ধর্ষিতাদের স্থানটি চিহ্নিত হয়েছিল চীনের সবচেয়ে পবিত্র অঞ্চল এবং দর্শনীয় স্থান হিসাবে । এলাকা দখল করে বিজয় উল্লাসে মত্ত হয়ে সিপিএম যাই বলুক, যতই গলায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে মানুষকে দিয়ে `শান্তিতে আছি' বলে বলাক - হিটলার - বুশদের মত একদিন সিপিএম নেতাদেরও বুঝতে হবে যে, তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন ।

    এতবড় সংগঠিত রাষ্ট্র শক্তি, পুলিশ, গুণ্ডাবাহিনী আর কোটি কোটি টাকার দাপটে এই এলাকা দখলদারীই শেষ কথা হবে না । শেষ কথা অবশ্যই বলবে মানুষ - সাধারণ মানুষ । বলবে আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সঠিক রাজনীতি - সংস্কৃতির আধারে সংগঠিত অগণিত জনতার মিলিত কন্ঠস্বর । যতই সরকারী প্রচারে তপন-সুকুর-সেলিমকে সম্পদ করে সিপিমের জয়গান গাওয়া হোক - নন্দীগ্রামের মানুষের সংগ্রামী মনোবলে এতটুকু চিড় ধরেনি । সন্তান হারা মায়ের কান্না, ধর্ষিতার অব্যক্ত বেদনা, আহতদের যন্ত্রণার মধ্যেও অনির্বাণ রয়েছে মাথা নিচু না করার প্রত্যয় - প্রদীপ শিখা । এই প্রদীপ থেকেই আবারও জ্বলবে অন্যায়ের প্রতিবাদে আরও প্রদীপ - আলোকিত হবে, উদ্ভাসিত হবে মানুষের মনুষ্যত্ববোধ, চেতনাবোধ । বাংলার মানুষ তথা দেশের মানুষ এত অন্যায় এত নিপীড়ন মেনে নিতে পারবেন না । সুবিধাভোগীরা ছাড়া সকল সৎ সিপিএম সমর্থক কর্মীরাও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখর হয়েছেন, বামফ্রন্টের শরিক দলও প্রতিবাদ করেছে বাধ্য হয়ে । রাজ্যপালও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবিক কারণে প্রতিবাদ করেছেন । যদিও এর জন্য বিমানবাবুরা অত্যন্ত নিম্নরুচির অশালীন কটূক্তি করতেও দ্বিধা করেননি । তবু তিনি তাঁর মন্ত্যব্যে অনড় । সুশীল সমাজ মুখর প্রতিবাদে । দিল্লীসহ দেশের অন্যান্য রাজ্য শহরে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে । মনে রাখতে হবে নির্বাচনের স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক দল নয় চাই এই মালিকী রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সঠিক রাজনীতি, সঠিক সংস্কৃতির আধারে গড়ে ওঠা উন্নত মানের চরিত্র সাধনা নিয়ে সত্যিকারের রাজনীতির চর্চা । কারণ এক সরকারের পরিবর্তে আর এক সরকার মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করতে পারে না - সে বিজেপি-র এনডিএ হোক, কংগ্রেসের ইউপিএ হোক বা সিপিএম ফ্রন্টই হোক । সংগঠিত রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সংঘশক্তি উন্নত ও সঠিক রাজনৈতিক শিক্ষার ভিত্তিতে সংগঠিত জনতার সংগ্রামী হাতিয়ার ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে সাধারণ মানুষ বিজয় অর্জন করতে পারবে না । এই সংঘবদ্ধ, সচেতন সংগ্রামী প্রক্রিয়ার সূচনার আভাস সিঙ্গুর - নন্দীগ্রামের মাটিতে । এটাই আশার - সম্ভাবনার ।

    পরিশেষে স্মরণ করি, আমাদের দেশের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের কথা । তাঁর অনুগামীদের হারানোর বেদনায় তিনি অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলেছিলেন যে, `আমার চোখের জল দু:খের নয়, আনন্দের উদগত অশ্রু । কারণ আমি জানি, এদের পবিত্র শ্মশান স্তূপের উপর গড়ে উঠবে স্বাধীনতার স্মৃতিসৌধ ।' আমরাও বলি, সিঙ্গুর - নন্দীগ্রামের আন্দোলনের নিহতদের শ্মশান আর গোরস্তানের উপর আগামী দিনের মুক্তির সৌধ রচিত হবে । এই শপথ - এই কামনা আমাদের সংঘবদ্ধ অগণিত জনতার - এরাজ্যের প্রতিবাদী সংস্কৃতির - শুভবুদ্ধির ।



    (পরবাস-৪০, জানুয়ারি, ২০০৮)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)