• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৪০ | ফেব্রুয়ারি ২০০৮ | প্রবন্ধ
    Share
  • গরিবি বাঁচাও : কৌশিক সেন

    নিউ অর্লিন্স শহরে হারিকেন ক্যাট্রিনার পর তখন বেসামাল অবস্থা । ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় শহরের ডাক্তাররা সেই যে লম্বা দিয়েছিল, তারপর অনেকেই আর ওমুখো হয়নি । ওই তল্লাটের গরিব লোকেরা, যারা কিনা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল, যারা বেকার এবং উদ্বাস্তু তাদের উপর চাপটা পড়েছে সবচেয়ে বেশি । তাদের স্বাস্থ্যবীমা নেই, সরকারি সাহায্য লালফিতেয় আটকে আছে, এদিকে প্রাণ ওষ্ঠাগত । নিউ অর্লিন্স শহরের শতকরা ৬৫ ভাগ আফ্রিকান-আমেরিকান এবং তাদের শতকরা ৮০ ভাগের রোজগার দারিদ্রসীমার নিচে । এই জনগোষ্ঠীর প্রায় পুরোটাই শহরের একটা নিচু অঞ্চলের বাসিন্দা । সেখানে সবচেয়ে গরিব সাতচল্লিশটি ওয়ার্ডের মধ্যে সাঁইত্রিশটিই চলে গেছিল পুরোপুরি জলের তলায় । এখানে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সবচেয়ে বেশি এবং বেশ কয়েকদিন অবধি ত্রাণকর্তাদের টিকির দেখা মেলেনি । ওই কদিন ওরা যেন বাস করেছিল যুদ্ধ এলাকায়, যেখানে চরম আতঙ্ক আর জমাট বাঁধা ক্রোধ মিলে মানুষকে পশুর অধম করে তোলে । খুনজখম, লুটপাট শ্লীলতাহানি সবই অবাধে চলেছিল, এমনকি উদ্ধারকারীরাও রেহাই পায়নি । আমেরিকার দারিদ্র যেন সাবধানে ব্যাণ্ডেজ করা ক্ষতস্থান, ক্যাট্রিনার ঝাপটায় তার দগদগে চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সেই কটা দিনে । এসব খবর অবশ্য সকলেরই জানা ।

    তা এই বাজারে আমার কিছুদিন সমাজসেবা করার ইচ্ছে হয়েছিল । একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়ে আমরা কাজ করছিলাম । উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন শহরে ক্যাট্রিনার দৌলতে ঘরছাড়া যাদের কোনো কঠিন রোগের চিকিত্সা আটকে আছে, তাদের একটা ব্যবস্থা করা । এরকম দুজন মানুষ, ধরে নিন তাদের নাম রয় এবং রিটা, নানা ঘাটে ঠোক্কর খেয়ে শেষে ডিউক হাসপাতালে আমার জিম্মায় এসে ঠেকেছিল । দুজনেই ভুগছে একটা অতি ঘ্যানঘেনে এবং যন্ত্রণাদায়ক রোগে-তার নাম সিকল সেল অ্যানিমিয়া । এগুলো সব জন্মাবধি বিগড়ে যাওয়া লোহিতকণিকার অসুখ, আমাদের দেশে যেমন থ্যালাসেমিয়া আফ্রিকায় তেমনি সিকল সেল অ্যানিমিয়া, উপসর্গের দিক দিয়ে এ আরো মারাত্মক । এদের রক্তকোষ কাস্তের মত বেঁকে দলা পাকিয়ে যায় । যার ফলে রক্ত তার কাজ করতে পারে না, প্রবাহ কমে যায়, অক্সিজেনের অভাবে বুকে, পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা হতে থাকে । আরো পাঁচটা খারাপ জিনিষের মত এই রোগটা কালো মানুষদের একচেটিয়া । যেহেতু এর চিকিত্সা বেশ জটিল, গরিব এবং অল্পশিক্ষিতদের পক্ষে এ এক ভয়ানক অচ্ছেদ্য চক্র । যন্ত্রণা আর দুর্বলতার জন্য এরা ঠিকমত কাজ করতে পারে না, কাজ না করলে স্বাস্থ্যবীমার প্রশ্নও ওঠে না । এদের চিকিত্সাও জটিল এবং ব্যয়বহুল । ফলে সরকারি সাহায্য ছাড়া এদের বাঁচার সম্ভাবনা কম, এবং সেই সাহায্যের আয়তন ত্রক্রমাগতই সংকোচনশীল । যার ফলে এদের চিকিত্সা প্রায়ই হয় আধাখ্যাঁচড়া ধরনের । যন্ত্রণা কমাবার জন্য নারকোটিক ওষুধ খেতে খেতে এরা প্রায়শই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তারপর জড়িয়ে যায় মাদকদ্রব্যের চক্রে । যারা আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজের খবর রাখেন তাঁদের ভালোই জানা আছে যে সেখানে চোরাস্রোতের টান কতটা প্রবল । সিকল সেল অ্যানিমিয়া তাই একটি সামাজিক অসুখ, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কালো মানুষদের বেকারি, দারিদ্র, অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, ইত্যাদি নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন ।

    যাদের কথা হচ্ছিল, সেই রয় এবং রিটা, বয়েস দুজনেরই প্রায় এক, তিরিশের এধার ওধার । অসুখে ভুগতে ভুগতেই রয় পড়াশোনা শেষ করেছিল, স্কুলে পড়াত, রিটা কাজ বিশেষ একটা করতে পারত না কিন্তু ওর আবার বই পড়ার নেশা । ওদের দুজনের দেখা হত একটা সরকারি ক্লিনিক, যেটা পুরোপুরি কালো মহল্লায় । ওরই কাছাকাছি এক কুখ্যাত পাড়ার স্কুলে রয়ের চাকরি, ওখানেই ওদের আজন্ম কেটেছে । ওরা পরস্পরকে ভালই চিনত, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু নয় । ওদের প্রেম এসেছিল ক্যাট্রিনার ওলটপালটের মাঝখানে যখন ওরা বন্দী ও ক্ষুধার্ত, রোগের যন্ত্রণায় আর মৃত্যুভয়ে শিঁটিয়ে রয়েছে । এরকম অস্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে খাবার নেই, জল নেই, চারদিকে লুটপাট খুনোখুনি চলছে, সেখানে দুটো অসুস্থ মানুষ বেঁচে থাকার মরিয়া তাগিদে পরস্পরকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিল । সেই থেকে ওরা একসঙ্গে যাকে বলে পাক্কা সর্বহারা হয়ে কিছুদিন ছিল হিউস্টনে । সেখানে তখন উদ্বাস্তুদের ভিড়ে বেসামাল অবস্থা, ওরা চিকিত্সার অভাবে প্রায় মরতে মরতে কোনরকমে এসে পৌঁছেছে ডারহামে আমার পাল্লায় । চিকিত্সায় একটু সুস্থ হয়েই ওরা খুচখাচ দুটো চাকরি জোগাড় করে নিয়েছে, যদিও ঘর বাঁধার জন্য ওটুকু যথেষ্ট নয় । অনেকের মত ওরা খয়রাতি ব্যবস্থার উপর বসে থাকতে চায়নি, তাইতেই ওদের প্রতি আমার কৌতুহল বাড়তে থাকে, শেষ অবধি সম্পর্কটা প্রায় বন্ধুত্বে এসে দাঁড়ায় ।

    এরই মধ্যে একদিন একটা চমত্কার বিকেলে কাফেটেরিয়ায় টাটকা কফির গন্ধ যখন ঘাসের উপর ছড়ানো, আমরা গরিবি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম । রিটা সদ্য খানিকটা ভুগে উঠেছে সে কাউচে গা এলিয়ে দিয়ে দেখছিল কাফের বাইরে অল্পবয়েসী ডাক্তার-নার্সদের একটা উজ্জ্বল জটলা, তাদের সাদা অ্যাপ্রন আর সোনালি চুল, বাগানের পথে ছায়া-রোদ্দুরের আবছা কোলাজ । একটা ল্যাপটপ নিয়ে বসে রয় আমাকে গরিবির উপর কতগুলো পরিসংখ্যান দিল । এগুলো জানা কথা, কিন্তু হঠাৎ করে একসঙ্গে শুনলে একটু মাথা গুলিয়ে যায় । যেমন কিনা দুনিয়ার ঠিক অর্ধেক লোক দিনে দুই ডলার বা পঁচাশি টাকার কম রোজগার করে । দুনিয়ায় এক বিলিয়ন লোক একুশ শতকেও নিরক্ষর । উন্নত দেশগুলোর ২০% মানুষ পৃথিবীর মোট সম্পদের ৮৬% ভোগদখল করে থাকে । ১৯১৩ সালে দরিদ্র ও ধনী জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ১১:১, ১৯৫০ সালে সেটা দাঁড়াল ৩৫:১, ১৯৭৩ এ ৪৪:১ এবং সাম্প্রতিক ১৯৯২ সালে ৭২:১ । দুনিয়ার প্রথম ২০০ জন ধনীর আয় এক ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা দুনিয়ার আড়াই বিলিয়ন গরিব লোকের সম্মিলিত আয়ের চেয়ে বেশি । অর্থাৎ শিল্প যুগের প্রথম থেকে আজ অবধি ধনী-দরিদ্রের ফারাক বেড়েই চলেছে । শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকায় ধনী-দরিদ্রের ফারাক সবচেয়ে বেশি । দুনিয়ার সব লোককে যদি আর্থিক সম্পদের ভিত্তিতে পাঁচভাগে ভাগ করা যায় তবে তার একনম্বরে থাকবে পৃথিবীর মোট সম্পদের ৮২ শতাংশ এবং পাঁচনম্বরে ১ শতাংশেরও কম । সারা দুনিয়ায় ৫০ মিলিয়ন উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে যতটা সম্পদ রয়েছে আড়াই বিলিয়ন গরিবের হাতেও ততটাই । অন্যভাবে বললে দুনিয়ার মোট সম্পদের পরিমাণ যদি একটা রুটির সমান হয় তবে একজনের যা বরাদ্দ হওয়া উচিত, ৫৭ জন গরিব সেটাই কাড়াকাড়ি করে খাবে । সেক্ষেত্রে এটাও একান্ত স্বাভাবিক যে পৃথিবীতে প্রায় ৭৯০ মিলিয়ন মানুষ এই মুহুর্তে ক্ষুধার্ত এবং প্রত্যেক দিন তিরিশ হাজার শিশু অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায় । এরা প্রায় সবাই দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অধিবাসী । সত্যি কথা বলতে কি দক্ষিণ এশিয়ার হিসাব অনেক ক্ষেত্রে আফ্রিকার থেকেও খারাপ ।

    সবচেয়ে মজার কথা এই যে গরিবি হটানোর কাজটা এখন সরকারের বদলে প্রাইভেট সেক্টরের হাতে চালান হয়ে গেছে । দেখা যাচ্ছে যে ঠিকমত বিজ্ঞাপন দিলে গরিবি বেশ চড়া দামেই বিকোয় । তাই পরিসংখ্যান বলছে গত দু দশক ধরে বেসরকারি এন-জি-ও সংস্থাগুলি ভুরি পরিমাণ অর্থ পেয়েছে, অনেক জায়গায় কাজও দেখিয়েছে কিন্তু যে গরিবি সেই গরিবিই থেকে যাচ্ছে । উন্নয়ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে গিমিক, তার সাদা আলখাল্লার নিচে উঁকি মারছে নানা ধান্ধা, নানারকম লুকানো মতলব ।

    'Development may become a strategy of evasion. When you can't give people land reform, give them hybrid cows. When you can't send children to school, try non-formal education. When you can't provide basic health to people, talk of health insurance. Can't give them jobs? Not to worry, just redefine the words "employment opportunities." Don't want to do away with using children as a form of slave labour? Never mind. Talk of "improving the conditions of child labour!" It sounds good. You can even make money out of it." (Palagunmi Sainath, Everybody Loves a Good Drought; Stories from India's Poorest Districts, Penguin Books, 1996, p.421)

    রয়ের মতে সরকার এবং বৃহৎ কর্পোরেশন, এই দুয়ে মিলে নিজেদের দায়িত্ব এড়াবার জন্য এন-জি-ও নামক এই দুর্বল, আধাখ্যাঁচড়া তৃতীয় সেক্টরটি সৃষ্টি করেছে । এটাকে একটা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা বলা যায়, পট্টি লাগানোই যার পেশা । সাহায্য যখন সমাজের ভিতর থেকে আসে তখনই সেটা কাজের হয় । যেখানে সরকার ও ক্ষমতা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কায়েমি স্বার্থের আস্তানা সেখানে দালাল লাগিয়ে উন্নয়ন হয় না । সে উন্নয়ন হয়ে দাঁড়ায় বিকলাঙ্গ, একপেশে । দুনিয়ার যেখানেই গরিবি, সেখান থেকেই দুটো জিনিস পরিকল্পিতভাবে শুষে নেওয়া হয়েছে- ক্ষমতা এবং মেধা । এদুটো ফিরিয়ে দিতে না পারলে, বাকি সব বোগাস ধাপ্পাবাজি । আসলে বিশ্বায়িত দুনিয়ায় গরিবিও একরকম পণ্য তাকে বাঁচিয়ে না রাখলে তার কারবারিদের চলবে না, কর্তাদেরও ভারি অসুবিধা হবে ।

    যেমন কিনা এদেশে কালো লোকদের অবস্থা ।

    পঞ্চাশ বছর আগেও আমেরিকায় সাদা এবং কালো লোক এক স্কুলে পড়ত না, এক রেস্টুরেন্টে খেতে পারত না । এখন তারা দেদার সরকারি সাহায্য পায়, কলেজে বা চাকরিতে তাদের বাড়তি সুবিধা, যার পোষাকি নাম অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন । উদ্ভট ব্যাপারটা এই যে আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজের অবস্থা দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে, কালোদের গরিবি হটার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না, নেশা এবং গ্যাং ঘটিত অপরাধ, বেশ্যাবৃত্তি, খুনোখুনি, অস্বাস্থ্য, অশিক্ষা সবকিছুর অবস্থাই তথৈবচ । ক্যাট্রিনার পরে সেসব ছবি দেখে সারা দেশ শিউরে উঠেছিল । এই অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশনের যুগে কালো সমাজে যাদের পালে হাওয়া লেগেছে তাঁরা অবিলম্বেই ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে তুরীয়ানন্দ হয়েছেন । তাঁদের দেখা যায় গলফ কোর্স থেকে ইউনিভার্সিটিতে, ফুটবলের মাঠ থেকে রাজনীতির আখড়ায় অথচ শহরের বস্তিগুলো যেমনকে তেমনই থেকে গেছে । সমাজের ভেতর থেকে বৈষম্য কাটেনি তাই বাইরে থেকে চাপানো সাহায্য ভালোর থেকে খারাপ করেছে বেশি ।

    ওদের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা । কিছুদিন বাদে ওরা ফিরে গেছিল নিউ-অর্লিন্সে । ওদের এখানেই থিতু হতে বলেছিলাম, রিটা রাজিও হয়েছিল কিন্তু রয় নারাজ । ওর কাছে স্কুলের কাজটা শুধু কাজ নয়, গরিবি হটানোর লড়াইতে ওটা হাতিয়ার এবং সেক্ষেত্রে ও `একলা চল রে' নীতিতে আস্থা রাখে । যাবার আগে রিটা আমাকে ছোট্ট যে একটা চিঠি লিখেছিল সেটা ওর অনুমতি নিয়ে তুলে দিলাম ।

    প্রিয় ডাক্তার,

    জ্ঞান হবার সময় থেকেই আমি অসুস্থ কিন্তু কোনদিন কোনো ডাক্তারকে বন্ধু বলে ভাবতে পারিনি । বাবাকে চিনি না, মা আরেকজনের সঙ্গে থাকত, সে লোকটা গুণ্ডা এবং মাতাল । আমাদের নিখরচার ক্লিনিক ছিল নিউ-অর্লিন্সের সবচেয়ে মলিন আর বিষন্ন রাস্তাটায়, ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারের রোম্যান্স আর বুর্বন স্ট্রিটের লাস্যলীলা থেকে অনেকটাই দূরে । ওখানে বাতাস দুর্গন্ধ, বিছানা নোংরা, ওষুধ বাড়ন্ত এবং রোগী অফুরন্ত । ডাক্তারবাবুরা কেউ বিরক্তি চেপে রাখতেন কেউ রাখতেন না, কিন্তু আমরা জানতাম আমাদের ছন্নছাড়া, বেকার আর নেশাখোর রোগীদের ওঁরা কি চোখে দেখেন ।

    আমাকে নিয়মিত রক্ত নিতে হত । মেথাডন খেয়ে খেয়ে বুক-পিঠের ব্যথা যতটা পারি সহ্য করতাম কারণ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছিল আরো বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা । কিন্তু মহল্লা যখন জলের তলায়, অ্যাটিকে একটা ঘরের মধ্যে যন্ত্রণা কাকে বলে নতুন করে বুঝছিলাম কারণ সঙ্গে আমার ওষুধগুলো ছিল না । ওই সময় রয় না থাকলে আমি মারা যেতাম । তারপর ও নিজেই যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল, আমরা তখন হিউস্টনে, তোমাদের সংস্থা ওর ভার নিয়েছে । আমার স্পষ্ট মনে আছে যেদিন তুমি আমাদের চিকিত্সার ভার নিলে । তোমার জোরগলায় হাসি, অন্যরকম উচ্চারণ, টগবগে উত্সাহ আর শার্টে নটিকার তরতাজা গন্ধ-সব মিলিয়ে কি ভালো যে লেগেছিল সেদিন । মনে হয়েছিল এই ডাক্তারটির সাথে দিব্যি বন্ধুত্ব করা যায় । কিন্তু তোমাকে বন্ধু হিসাবেই দেখতে চাই, ঘাড়ে চেপে থাকতে চাই না । এটাকে অহংকার বা অকৃতজ্ঞতা মনে কোরো না প্লীজ ।

    তোমার কাছেই শুনেছি যে ঘন ঘন রক্ত দেওয়া আসলে কোনো চিকিত্সা নয় । সিকল সেল অ্যানিমিয়া জেনেটিক অসুখ ওই জিনের গণ্ডগোল যত দিন না শুধরানো যাবে ততদিন এ অসুখ সারার নয় । একদিন তোমরা সেকাজে সফল হও এই শুভকামনা রইল ।

    আসলে রয় ওর স্কুলে ফিরে যেতে চায় । নিউ-অর্লিন্সে কেউ ফিরে যেতে চাইছে না, ডাক্তারের অভাবে আমাদের ক্লিনিকটাও হয়ত বন্ধ হয়ে যাবে । ওই স্কুলটার এমনিতেই খারাপ অবস্থা ছিল, এখন কিছু ফাণ্ড পাওয়া গেছে, হয়ত ওটাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা যায় । তাই ঝুঁকি নিয়েও ও ফিরে যাবে, আর সাথে সাথে আমিও । জীবনে একবার অন্তত: ঠিক কাজটা করার চেষ্টা করে দেখি ।

    ইতি, রিটা

    প্রার্থনা করি আমার গরিব বন্ধুরা সফল হোক, সুখী থাকুক । অ্যানিমিয়ার সঙ্গে গরিবির আচ্ছা তুলনা দিলে যা হোক । আশা রাখা যাক উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে । তবে দালাল লাগিয়ে আর গিমিক দিয়ে সেকাজ যে হবার নয়, রয় সেটা আমাকে শিখিয়ে গিয়েছে ।

    (পরবাস-৪০, জানুয়ারি, ২০০৮)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)