• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৩৯ | আগস্ট ২০০৭ | গল্প
    Share
  • করুণা-কামিনী : গৌরী দত্ত

    এখনও মাঝে মাঝে দু:স্বপ্নরা আসে ।

    কিন্তু আগের মতো তাদের আর ভয়ংকর ভাব বা তীব্রতা নেই । দু:স্বপ্ন মানে জীবনের যে ঘটনাগুলি নিজের নিভৃত সত্তার কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য নয়, তাদেরই রূপবদল করে চেতনার তীরে পুনরাবৃত্তি ।

    আমার স্বপ্নে আছে দুর্ঘটনার দাবানল, মৃত্যুর হিম আর একাকীত্ব, পরিত্যক্ততা, সন্দেহ, আকুলতা, প্রতারণার যৌথ শর । ওসবের মধ্যে মঞ্চের অলীক দৃশ্যপটের মতো আছে একটি মুখ, করুণার মুখ ।

    আগের তুলনায় অনুভূতির উদ্বেলতা আপেক্ষিক ভাবে স্তিমিত, শান্ত । এখন স্বপ্নরা শুধু মনে করিয়ে দিতে আসে, কষ্ট দিতে নয় ।


    ফুলঝরিয়ার সন্ধেগুলো সাধারণত বিহারের ছাতুর মতো । সাদামাটা, দৈনন্দিন, আটপৌরে । দুধ দিয়ে গুলে খেলে পেটে ঠাণ্ডা প্রলেপ পড়ে । কিন্তু জিভে উত্তেজনার ওম আসে না । অথচ একটু ধানি লঙ্কার পাতলা কোরা কুচি, এক ছিটে বীটনুন আর আচারের তেল দিয়ে মাখলে শুধু মুখেই নয়, আগুনে স্বাদ ব্রহ্মতালুতে টিকের মতো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে ।

    এমনি এক নির্ভেজাল মফস্বলি সায়াহ্নে একটি ঘটনার উত্তেজনা জতুগৃহে অতর্কিত শলাকার মতো উত্ক্ষিপ্ত হল ।

    আমরা সেদিন ফুলঝরিয়া মেডিকেল কলেজের সুপারিন্টেণ্ডেন্ট ড: মহেশ্বরীনন্দন প্রসাদের বাড়িতে কড়ুয়া চৌথ পূজা দেখতে গেছি । আমরা মানে আমার জ্যাঠামশাই, জেঠিমা ওরফে বড়মা, আমরা বারো বছরের জ্যাঠতুতো বোন দময়ন্তী ও আমি ।

    জ্যাঠামশাই পেশায় পেডিয়াট্রিশিয়ান অর্থাৎ শিশুরোগ চিকিত্সক । আবার প্রশাসনিক পদে মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ও । প্রিন্সিপাল বলতে ঝুমকো-ঝ্যাঁটা-গোঁফ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ মেজাজ, মেগাফোনের মতো স্বরনিনাদ, এসব কিছুই নেই জ্যাঠামশায়ের । নির্লিপ্ত আবলুস মহীরুহের মতো লম্বা ঋজু কালো চেহারা, সমাহিত বুদ্ধের মতো দৃষ্টি, শিশুর গালের মতো কোমল হৃদয় । ভবের কাণ্ডারি কাণ্ডারি ভাব ।

    বড়মা ফর্সা, ছোটখাট, গোলগাল ট্যাঁপারির মতো । পানের পোঁটলায় গাল সর্বদাই ফোলা ও ঠোঁট রক্তিম । রসে টইটুম্বুর ধরন । টিপলে একদিকে চিনির সিরা বেরোবে, অন্যদিকে সর্ষের ঝাঁঝ ঝোল । কিছু একটা স্থির করলে সেটা করেই ছাড়বেন এই রকম একটা অদৃশ্য নোটিস বুকে ঝোলানো । জ্যাঠামশাই ও বড়মার মধ্যে চেহারা ও চরিত্রের পার্থক্য শুধু নয়, অসম বৈপরীত্য সত্ত্বেও বিয়ে হওয়াটা একদিকে সাম্বন্ধিক বিবাহভাগ্যের কৌতুক-খেলা, আবার অন্যদিকে আয়নায় পারদের প্রলেপের মতো একের দোষ অন্যের গুণকে আরো বিচ্ছুরিত করার এক নশ্বর সুযোগ ।

    দময়ন্তী ওরফে দামি আমার থেকে বছর সাতেকের ছোট । লাল নীল ফিতে দিয়ে দুটো লম্বা বিনুনি বাঁধে । বাড়ির পাশের পিসীমার এলিমেন্টেরি স্কুল পাশ করে বড় ময়দান ওয়ালা হেকক মিড্ল স্কুলে গিয়ে এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করছে । সর্বদাই আমার পিছনে বায়নার এক ফিরিস্তি নিয়ে ঘুরছে । - দিদিভাই, এটা চাই, ওটা চাই ।-- তবে মেয়ের মনটা ভাল । দাবড়ানি দিলে চুপ করে শোনে, এঁড়ে তর্ক করে না । ইদানিং অবশ্য ওর আমার সম্বন্ধে অপরিমিত কৌতূহল আমার বিশেষ বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে ।

    আমি চার বছর বয়স থেকে জ্যাঠামশায় জেঠিমার কাছে মানুষ । বাগডোগরা থেকে কাঠমাণ্ডু অভিমুখে যাত্রাকালীন প্লেন দুর্ঘটনায় আমার বাবা মা এক সাথে মারা যান । তখন থেকে নি:সন্তান জ্যাঠামশাই ও জেঠিমা আমায় বুকে তুলে নিয়েছিলেন । তার তিন বছরের মাথায় দময়ন্তী আসার পরেও তাদের আমার প্রতি স্নেহে কোনো খাদ মেশেনি ।


    এদিকে মহেশ্বরীচাচার স্ত্রী রামদাই তার তিন মেয়ে যাতে সুপাত্রস্থ হয় তার জন্যে খুব আড়ম্বর করে কড়ক চতুর্থী পুজোর আয়োজন করেছেন । ময়ূরী, মাধবী, মৃদুলা সারাদিন উপোস করে বুভুক্ষুর মতো আটার মিষ্টি ঠেকুয়া, ছাতুর লিট্টি ও এলাচ ফোটানো দুধেল চা খাচ্ছে । ওদের নতুন বিয়ে হওয়া বৌদি নম্রতা বড় চাঁকনিতে চোখ লাগিয়ে চাঁদ দেখছে ও তারপর প্রাণপণ চোখ বন্ধ করে আছে যাতে বরকে দেখার আগে অন্য পুরুষের দিকে চোখ না পড়ে । নম্রতার বর ময়ঙ্কের দেরি হচ্ছে দিল্লী থেকে আনানো নতুন রাজেশ খান্না-কাট শেরওয়ানি পরে তৈরি হয়ে আসতে । সুলক্ষণ-যুক্ত গরুর সামনে দোয়ানো দুধ ধোওয়া গণেশমূর্তির সামনে ঢোলে আংটি বাজিয়ে সার্জারির হেড অব দা ডিপার্টমেন্টের বৌ রঙীলাচাচী পরপর স্থূলরসাত্মক গান গেয়ে যাচ্ছেন ।

    - চল পিয়া, চল পিয়া হমর্‌ ডর লাগে হৈ

    অঔর মেলা মে কে ছোঁড়া সব কন্কি মারে হৈ-

    রামদাইচাচী কপট আপত্তি জানিয়ে বলছেন, -আরে, রামধনু গাইয়ো বহেনজি-

    উনি আবার ফুলঝরিয়া লেডিজ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট । প্রতিপত্তি আছে । ভুল ইংরিজি, মৈথিলি ও ভোজপুরী মিশিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে গণ্ডক নদীর বন্যাদু:স্থ গ্রামের জন্যে অনেক টাকা তোলেন ।

    দামি বড় বড় চোখ করে সব আদ্যোপান্ত দেখছিল । সদ্য হেনাচর্চিত হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে আমায় ফিসফিস করে বলল, -দিদিভাই, বিকাশদা নিশ্চই ভাবছে যে তুই ওর জন্যে কড়ুয়া চৌথ মানত করছিস ।

    আমি কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গত পরশুর প্যাথলজি টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় কি কি ভুল উত্তর লিখেছি ও তার ফলস্বরূপ বাবুলাল-স্যার নোটবুকে সবুজ কালি দিয়ে নানান বক্রোক্তি লিখে কতটা যে হাতের সুখ করবেন, ভাবছিলাম ।

    ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললাম, - পাকামি করবি না তো । আজেবাজে লোকের নাম করছিস কেন ভর সন্ধেবেলা ।
    -- বা রে, বিকাশদা বাজে লোক হল নাকি ! মা পর্যন্ত ওকে পছন্দ করে । আর বিকাশদার আমার সাথে দেখা হলেই তোর কথা জিজ্ঞেস করে ।
    -- খবরদার, আমার পারমিশন ছাড়া আমাকে নিয়ে আলোচনা করবি না তো ।

    বিকাশকুসুম বাগচী ফিফ্থ্‌ ইয়ারে পড়ে । জ্যাঠামশায়ের চেম্বারে প্রাকটিস্‌ দেখতে আসে । ওর নাকি এম বি বি এস পাস করে জ্যাঠামশায়ের আণ্ডারে পেডিয়াট্রিক্সে এম ডি করার ইচ্ছে । বন্ধুরা মনে করে ওটা একটা ভাঁওতা । আমাকে লাইন মারার জন্যে নাকি জ্যাঠামশায়ের তাঁবেদারি করছে । মাথার মাঝখানে সিঁথি কাটে । ঢোলা পুরনো-ঢঙি প্যান্ট পরে ও একটু ঠাণ্ডা পড়লেই মাফ্লার মাঙ্কি ক্যাপ এঁটে হাজির হয় । ক্যাবলাকার্তিক আর কি । ওয়ার্ডে দেখা হলে দেখি আকুল আকুল ভাব করে তাকিয়ে আছে । আমি এক্কেবারে পাত্তা দিই না । অথচ বন্ধুরা আমায় ক্ষেপিয়ে একসা করে । ওদিকে আবার ধুরন্ধর বুদ্ধি । আমার একটুও পছন্দ নয় । ভালমানুষ জ্যাঠামশাই কে `হ্যাঁ স্যার, না স্যার' করে হাত করেছে । এমনকি শক্ত ঠাঁই বড়মাকে প্রায় পটিয়ে এনেছে । মাথা নিচু করে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে চোখ না তুলে কথা বলে । আমাদের বাড়ির অন্দরমহলে যে কাজের লোক বা কম্পাউণ্ডার জীবন্ময়দা ছাড়া কোনো অনাত্মীয় পুরুষের সমাগম বারণ, সেখানেও এক আধবার ওষুধের স্যাম্পেল নিতে বা জীবন্ময়দার অবর্তমানে রুগির টেলিফোনের জবাব দিতে খাবার ঘর অবধি ওকে আসতে অনুমতি দিয়েছেন বড়মা । এমন আনস্মার্ট অথচ ঘোড়েল আর কখনো দেখিনি ।

    আমার বকুনি খেয়ে দামির ফোটা কাঠচাঁপার মতো মুখটা একটু চুপসে গেল । আর তর্ক করে বিশেষ লাভ নেই দেখলো । উপরন্তু ক্ষতিও হতে পারে । কারণ আর নয় দিন পরে দেওয়ালি । সেদিনের জন্যে ও যে চিকনের ঘাঘরা-চোলি কিনতে চায় তার জন্যে জেঠিমার কাছে সুপারিশ আমাকে দিয়ে করাবে ।

    এমন সময় শুনি বাইরের বসার ঘরে দারুণ হট্টগোল । দরজা খোলা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ । বহু দ্রুত পদশব্দ । চটিজুতোর ফট্ফট্‌ । উত্তেজিত কন্ঠস্বরের ওঠা নামা ।

    মহেশ্বরীচাচা হন্তদন্ত হয়ে দরজার থেকে মুখ বাড়িয়ে যা বললেন তার সারমর্ম এই - মেডিকেল কলেজের সিকিউরিটি গার্ড পাণ্ডেজি দৌড়ে এসেছে খবর দিতে । ছেলেদের হস্টেলে দারুণ হাঙ্গামা হয়েছে । মারামারি তো বটেই, খুনখারাবিও হতে পারে । পুলিশ, এস ডি ও আর ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে খবর দেওয়া হয়েছে । উনি প্রিন্সিপাল অর্থাৎ ডা: সেন ওরফে জ্যাঠামশাইকে নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যাচ্ছেন ।

    জ্যাঠামশাই দেখি ততক্ষণে উত্সবি সিল্কের পাঞ্জাবীর উপর একটা কট্স উলের বুণ্ডি চাপিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছেন । তড়িঘড়ি বেরোতে বেরোতে বলে গেলেন যে আমরা যেন ড্রাইভার জয়লালের সাথে সময়মতো বাড়ি চলে যাই ।

    বড়মা বড় ছোট নানান আকারের মাটির কলসে ব্রত অনুযায়ী বিহারী বন্ধুদের সাথে গলানো ঘি ঢালছিলেন । কাঁপা কাঁপা হাতে বাটি নামিয়ে রাখলেন । জ্যাঠামশাইকে বললেন, -- ঠাণ্ডা লাগিয়ো না । উলের মাফলারটা গাড়ির পিছনে আছে, নিতে ভুলো না ।--

    তারপর আর হাসি গল্প জমলো না । মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির ও অতিথি বয়:প্রাপ্ত পুরুষেরা সকলে ঘটনাস্থলের দিকে রওয়ানা হল ড্রাইভওয়ে তে দাঁড়ানো আম্ব্যাসেডর বা জীপে । মহেশ্বরীচাচাদের নেপালী দারোয়ান অম্বর কোমরের ভোজালিটা হাত চেপে কায়েমী দেখে নিল ও এক লাফে জীপের পাদানিতে চড়ে চললো যেন যুদ্ধপ্রত্যাশি ব্রিগেডিয়ার । চাচার ছেলে ময়ঙ্ক শেরওয়ানির উপরেই হংকং থেকে আমদানী-করা কালো চামড়ার জ্যাকেট গলিয়ে চললো । হাতে নিল একটা ক্রিকেট ব্যাট ।

    সবার চোখে ত্রাসের ছাপ । মেয়েরাও একে একে উঠে পড়লো । মহেশ্বরীচাচী নতুন বৌয়ের গয়না দেখানো শেষ না করে গদরেজ্‌ আলমারিতে তুলে রাখলেন । মেহেন্দিওয়ালি বুড়ি বারান্দায় ছোটছোট লালচে সবুজ মেহেন্দি পাতাগুলি বাটালি দিয়ে সদ্য খোদাই-করা শিলনোড়ায় বাটছিলো । ঘটনার সঙিনতা বুঝে ছ্যাঁচা পাতার কালচে কাদার মতো তালটাকে সাপটে কৌটায় ভরে নিল ।

    বড়মা, দামি ও আমি গাড়িতে গিয়ে মন্ত্রচালিতের মতো বসলাম । জয়লাল গাড়ির সব কাঁচ হাতল ঘুরিয়ে উঠিয়ে দিল । দরজা গুলো লক্‌ । মেডিকেল কলেজের রাস্তা এড়িয়ে, রেলের গুমটির পাশ দিয়ে, শেতলামাঈ-তালাব পুকুরের ধার ঘেঁষে, বীণাপাণি ক্লাবের সামনের ঘোরানো পথ দিয়ে চললো বাড়ির দিকে ।

    পথের পাশের আলো-আঁধারির বাড়িগুলিকে কে যেন সিনেমার রীলের মতো পাক খুলে ছায়াছবি দেখাচ্ছিল । গড়গড়িয়ে একতালা, দোতালা, মাটির কুটির, বাঁশ ও খড়ের ঝুপড়ির দৃশ্যপটগুলি গাড়ির সাথে সাথে চললো । গা শিরশির করছিল অজানা ভয়ে । দামি আমার সোয়েটারের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে তাপ নিচ্ছিল । বড়মার পানের গন্ধ কিছুটা বাস্তবের ছোঁয়া আনছিল এই অধিবাস্তব হেমন্তের প্রাকরাত্রে ।

    বাইরে দেখলাম কার্তিকের হিমক্লিষ্ট আকাশে চতুর্থীর আধক্ষয়া চাঁদ অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে আছে ।


    ***********************************************


    কি কারণে মারামারি হয়েছে কেউ সঠিক বলতে পারলো না । মুখে না বললেও সবার সর্বোতপরি ভয় যে প্রাতিজনিক ঝগড়া থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না শুরু হয়ে যায় । অর্থাৎ শ্রেণিবিদ্বেষ । বিহারের কায়স্থ বনাম ভূমিহার ব্রাহ্মণ বনাম মৈথিল্‌ ব্রাহ্মণ বনাম রাজপুত বনাম তফশিলী নিম্নবর্গ । তাছাড়া অন্যান্য বিভাজন, বিবাদ তো আছেই ।

    যেমন দুই বছর আগে আলিগড় কোটাভুক্ত এক দল ছাত্রের সাথে সংঘর্র্ষ বাধলো জামশেদপুর কোটার ছেলেদের । আমি তখন মেডিকেল কলেজে সবে র্ফাস্ট ইয়ারে ঢুকেছি । সাংঘাতিক র্যাগিং চলছে । অর্থাৎ নতুন জুনিয়ার মুর্গা মুর্গিদের উপর অমানুষিক অত্যাচার ও অকথ্য অপমান প্রবর্তন করে সিনিয়রদের শ্রেষ্ঠত্ব জারি করা । প্রিন্সিপালের ভাইঝি বলে কিছুটা রেহাই পাচ্ছি । তবু ভয়ে জবুথবু হয়ে আমরা মেয়েরা একা বাথ্রুমে পর্যন্ত যাচ্ছি না । এমনি সময় দুই দলে মারামারি বাঁধলো । টাটার একটি ছেলেকে ইলেক্ট্রিক হীটারের উপর প্রসাব করতে বাধ্য করায় সে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে জ্ঞান হারায় । দুষ্কৃতিকারীরা আলিগড় থেকে পড়তে-আসা ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র । ব্যস, লাঠি শোটা সড়কি বর্শা, এমনকি রাজপুত দলের থেকে ধার করা তলোয়ার দিয়ে দুই দলের সুন্দ-উপসুন্দ শুরু হয়ে গেল । শেষ পর্যন্ত টিয়ার গ্যাস ও কারফিউ জারী করে পুলিশ ব্যাপারটা আয়ত্তে আনতে পারলো । দুষ্টের সাসপেন্শন ও শাস্তি, র্যাগিঙের সেই বছরের মতো কিয়তাবসান হয়ে আমাদের র্ফাস্ট ইয়ারদের শাপে বর হল । সারা কলেজ এক সপ্তাহের জন্যে বন্ধ । নটে গাছটি মুড়োলো । তবে জ্যাঠামশাইয়ের কাঁধে সব অনুশাসনের বোঝা বলে জেরবার হতে হল । সঙ্গে আমাদের উদ্বেগ । যদি উনিও এই ডামাডোলে আহত হন বা বিপত্তিতে পড়েন । আমার টেলিফোনের ধারে বসে থাকা । বড়মার ঘর-বার করা । বাড়ির কাজের লোকেদের চিন্তান্বিত কর্মশ্লথতা । দামির পুন:পুন: একই জিজ্ঞাসা, বাবা কখন আসবে -।

    এসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না । জীপের ইঞ্জিনের গুমরানো গর্জন ও সামনের কোলাপ্সিবল গেট টানার আওয়াজে বুঝলাম জ্যাঠামশাইকে কোনো ডাক্তার কলিগ পৌঁছে দিয়ে গেলেন । হাতঘড়িতে দেখি রাত সাড়ে এগারোটা ।

    দামিও উত্তেজনায় এক কান খাড়া করে ঘুমিয়েছিল । উঠে পড়ল । জ্যাঠামশায়কে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল । বড়মা দেখলাম প্রশ্নগুলো স্থগিত রাখলেন । শিবজি কে বললেন ছোট চুল্লিতে আরো কিছু কাঠকয়লা জ্বালিয়ে খাবার ঘরে এনে দিতে । অব্যক্ত সঙ্কেত বুঝে আমরা আমাদের রুটিনমাফিক জ্যাঠামশায়ের জামা হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে দিলাম । জুতো দুতিনবার বুরুশ বুলিয়ে তাকে তুলে দিল দামি । সারা দিনের ধুলো যাতে রাতভর কায়েমী না হয়ে বসে । প্লীটে প্লীটে ভাঁজ করে প্যান্ট আলনায় ঝুলিয়ে দিলাম । পকেট থেকে খুচরো পয়সা রোজকার মতো ঝনঝনিয়ে মাটিতে পড়লো । আর দামি হরির লুটের মতো নয়া পয়সা কুড়াতে থাকল । যেন নিত্যকার তালিকাভুক্ত কাজ দু:সংবাদের তীব্রতা হ্রাস করবে ।

    হাতমুখ ধুয়ে পেশেন্টের ফি-র বদলে দেওয়া জয়নগরের মোয়া দিয়ে দই খেতে খেতে জ্যাঠামশাই ঘটনাবিধি বললেন ।

    ফিফ্থ ইয়ারের শত্রুঘ্ন সিন্হা, জাতে ভূমিহার ব্রাহ্মণ, হার্নিয়া অপারেশনের পরে হস্টেলে নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছিল । কড়ুয়া চৌথের ছুটিতে অনেকে বাড়ি গিয়েছিলো । তাই হস্টেল প্রায় ফাঁকা । তিনজন ছাত্র অতর্কিতে তার ঘরে ঢুকে তাকে ছোরা দিয়ে আক্রমণ করে । আর্তনাদ শুনে অন্যান্য মুষ্টিমেয় ছাত্রেরা যারা নিজের নিজের ঘরে পড়াশুনা করছিল, ছুটে আসে । আততায়ী দুজন পালিয়ে যায় । কিন্তু একজন ধরা পড়ে এখন পুলিশের জিম্মায় কুওঁরপট্টি থানায় । নাম উদয় ঝা । আততায়ীরা তিনজনেই নাকি মৈথিলি ব্রাহ্মণ ।

    এই অবধি বলে দামির দিকে তাকিয়ে জ্যাঠামশাই একটু থামলেন । অর্থাৎ দামির সামনে পরের প্রসঙ্গ বলা যাবে না । দামি জ্যাঠামশায়ের চুল পরিদর্শন করছিল । সামনের রবিবার দুপুরে পাকা চুল তুলে কত রোজগার করতে পারবে, তার হিসেব । তাছাড়া আরো রোমহর্ষণের আশায় ছিল । তাই ইঙ্গিত বুঝেও না বোঝার ভান করলো ।

    বড়মা বললেন, - দামি, অনেক রাত হয়ে গেছে । এবার শুতে যাও । বড়দের কথার মধ্যে ছোটদের থাকতে নেই ।-

    দামি গাঁইগুঁই করতে করতে নাতি-সজোরে পা দাপিয়ে শুতে গেলো ।

    শত্রুঘ্ন মারাত্মক ভাবে জখম । হস্পিটালে ইন্টেনসিভ্‌ কেয়ার ইউনিটে পুলিশ পাহারায় ভর্তি করা হয়েছে । একটা চোখ কোটর থেকে বের হওয়া অবস্থায় ঝুলে আছে । বুকে পিঠে এলোপাথাড়ি বহু আঘাত । লিভারের কিয়তাংশ বাদ দিতে হবে । স্প্লীনে হেমোরেজ, পুরোটাই একসাইজ্‌ করতে হবে । এখন যমে মানুষে টানাটানি ।

    বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে ফুলঝরিয়ার আশেপাশের শহরতলিগুলিতে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে । সীতামারী, ঝঙঝারপুর, সমস্তিপুর, মুজফ্ফরপুর থেকে ধেয়ে হস্টেলে ফেরত আসছে ছুটিতে বাড়ি যাওয়া ছাত্রেরা । এক দিকে ভূমিহার দল অর্থাৎ সিন্হা, রাই, চৌধুরিরা আসছে ট্রেনে বাসে গাড়ি ট্যাক্সিতে শত্রুঘ্নকে সমর্থন ও আশ্বাস জোগাতে, রক্তদান করতে, ওর হয়ে আস্ফালন করতে । প্রতিশোধের বাচন বুলি ঝাড়তে । প্যারেড ও রিকশায় মেগাফোন নিয়ে সুর করে গেয়ে অন্য জাতভায়েদের প্ররোচিত করতে । অন্যদিকে মৈথিল-ব্রাহ্মণেরা অর্থাৎ মিশ্রা, তেওয়ারি, ঝা, পাণ্ডের দল আসছে উদয় ঝাকে জামিন-মুচলেকা দিয়ে হাজত থেকে বার করে আনতে । পলাতকদের আশ্রয় দিতে । মৈথিল্‌ জাতবংশীয়দের নিয়ে পালটা মিছিল করতে ।

    রেলস্টেশনে, বাসস্টপে, ট্যাক্সি-স্ট্যাণ্ডে, মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ পাহার.ংআ মোতায়েন করতে হুকুম দিয়েছেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট । দরকার হলে হোমগার্ড ডাকা হবে । সবার ভয়, দলীয় সংঘর্ষ হয়ে না দাঁড়ায় ব্যাপারটা ।

    - মারামারির কারণটা কি ? - বড়মা জ্যাঠামশায়ের বড় সোনালি বর্ডার দেওয়া কাপে চামচ দিয়ে হটর হটর আওয়াজ করে হরলিক্স গুলছিলেন ও মাঝেমাঝে শিবজীকে ফ্রীজ থেকে এটা ওটা আনতে ফরমাইস করছিলেন । তার মধ্যে জিজ্ঞেস করলেন ।

    -মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপার শুনছি । - জ্যাঠামশাই জল এ গালে ও গালে ঘুরিয়ে কুলকুচির মতো করছিলেন ।

    বড়মা চামচ নামিয়ে রাখলেন ।

    - মেডিকেল কলেজে র্ফাস্ট ইয়ারে পড়ে । নাম করুণা ভারতী । চিনিস নাকি, উমা ? - আমাকে প্রশ্ন করলেন জ্যাঠামশাই ।

    করুণা !!

    গেঞ্জির পাশ দিয়ে জ্যাঠামশায়ের পিঠ চুলকে দিচ্ছিলাম । নামটা শুনে অবিশ্বাসজনিত অবাক অনুভবে হাত বন্ধ হয়ে গেলো ।


    ***********************************************


    জ্যাঠামশায়ের মুখে ও পরে ওনার কমপাউণ্ডার জীবন্ময়দার কাছে শোনা কথার জোড়াতালি দিয়ে ঘটনার বিবরণ দাঁড়ালো এই ।

    করুণা ভারতী বলে একটি মেয়ে মেডিকেল কলেজে তিন মাস হল ভর্তি হয়েছে । বরৌনিতে বাড়ি । হস্টেলে থাকে ।

    লেডিজ হস্টেলের সামনে ক্লাসের পরে সন্ধ্যায় লাইন দিয়ে ছেলেরা আসে । দারোয়ানের হাতে নাম লিখে স্লিপ পাঠায় । অমুক নাম্‌ংঈন দিদিকে খবর দাও যে অমুক আবেদনকারী দেখা করতে এসেছে । ডাক হরকরা দারোয়ান স্লিপ নিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় । পছন্দসই হলে দিদি ওরফে ছাত্রী স্তাবকের সাথে দেখা করতে বাইরে আসেন । হস্টেল বিল্ডিং এর বাইরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা কম্পাউণ্ডে বসার ব্যবস্থা নেই । জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কপোতবত ছাত্রছাত্রীরা ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে ।

    এ রসে আমি বঞ্চিত । কারণ একে তো আমি বাড়ি থেকে যাতায়াত করি । তদুপরি আমি প্রিন্সিপালের ভ্রাতুষ্পুত্রী । মেডিকেল কলেজের কোনো ছেলেই আর সাহস করে এগোয় না । অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং কোনো ছেলে ।

    সারাদিন জয়লাল ছোট বেবী অস্টিন গাড়িটা নিয়ে কলেজের সামনে বসে থাকে । আমায় এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্ট নিয়ে যাবার জন্যে । অন্যদের মতো হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই আমার । মাঝে মাঝে বেশ রাগ হয় আমার । বিশেষ করে বড়মার উপর । বেশি কড়াকড়ি ওনারই । এদিকে মেয়েকে ডাক্তারি পড়ানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা । ওদিকে আবার রক্ষণশীলতার হাতকড়ি পরিয়ে রাখা ।

    যাইহোক, করুণার কিছুদিন ধরে বার্তালাপ চলছিল ফোর্থ ইয়ারের উদয় ঝার সাথে । হঠাৎ উদয় তার বোনের বিয়েতে গ্রামে যাওয়া কালীন একদিন ফিফ্থ ইয়ারের শত্রুঘ্ন সিন্হা করুণার দর্শনপ্রার্থী হয়ে লেডিজ হস্টেলে আসে । করুণা দেখা করে । তারপর থেকে নাকি মাঝে মধ্যেই উদয় বাড়ি গেলে অ্যানাটমির ডিসেক্সন হলে টহল দিতে আসতো শত্রুঘ্ন । বা বায়োকেমেস্ট্রির এক্সপেরিমেন্ট রুমে । বা ফিজিওলজির ল্যাবে । উদ্দেশ্য করুণার সাথে মোলাকাত ।

    ব্যাপারটা কানাঘুষো উদয়ের কানে পৌঁছাতে বেশি দেরি হয়নি । শত্রুঘ্নের এই দু:সাহসিক হঠকারিতায় রাগে ষত্ব-ণত্ব জ্ঞান হারিয়ে ফেলে উদয় । দুই সাকরেদ সহ অস্ত্রোপচারের পরে বিশ্রামরত শত্রুঘ্নকে আক্রমণ করে । সম্ভবত মেরে ফেলারই অভিপ্রায় ছিল । কিন্তু শত্রুঘ্নের চিত্কারে অন্যেরা দৌড়ে আসায় সেই ঘটনায় বাধা পড়ে ।

    সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে এতো আলোড়ন-বিলোড়নের মধ্যমণি, করুণা, সে কিন্তু অন্যান্য নাট্যকাণ্ডের নায়িকাদের মতো নয় । হেলেন অব ট্রয় যেমন দুই প্রদেশের মহাবিনাশি যুদ্ধের কারণ হয়ে ছিল, করুণাও আজ এই শুম্ভ-নিশুম্ভ সংঘাতের অনুঘটক । কিন্তু করুণাকে দেখে মনে হয় না যে তার মধ্যে এই বিস্ফোরণ ঘটাবার শক্তি নিহিত আছে । তার গজেন্দ্রগামিনী হিল্লোলিত যৌবনভারে মত্তা ভাব নেই । সাজের জৌলুষ নেই । কটাক্ষের বহ্নি নেই । ছিপছিপে, রোগা রোগা চেহারা । ফর্সা রঙে একটা রক্তশূন্য ফ্যাকাশে ভাব আছে । যেন রঙিন ফটো বৃষ্টির জলে ধুয়ে ঈষৎ বিবর্ণ । সর্বদা পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি পরে আঁচল গায়ে টেনে রাখে । সাধ্বী সাধ্বী ধরন ।

    গত মাসে এক বৃহস্পতিবার বিকেলে আমি হস্টেলে আমার গ্রুপের রীনার কাছ থেকে জুরিস্প্রুডেন্সের টিউটরিয়াল নোট্স্‌ নিতে গিয়েছিলাম । কোনার ঘরটা পেরোতে গিয়ে খুব সুন্দর ধূপের গন্ধ পেলাম ।

    - নতুন মুর্গি । বহুত পূজা পাঠ করতি হ্যায় । - রীনা জানাল ।

    খোলা দরজা দিয়ে দেখি ছোট্ট পরিসরের সেই হস্টেলের ঘরে ইঁট সাজিয়ে বেদী বানিয়েছে নতুন মেয়েটি লাল সোনালি সিল্কের স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে ; তার উপর নানান দেব-দেবীর ছবি । কয়েকটা ফটো - সাঁইবাবা, রামকৃষ্ণ, শিবানন্দ স্বামীর । অন্যগুলো ক্যালেণ্ডার থেকে সযত্নে কাটা । কার্ডবোর্ডের উপর আলপিন দিয়ে আটকানো । হলুদ, কালচে-লাল গাঁদা ফুল, বেগুনি জিনিয়া ও শাদা বকুল ফুল দিয়ে সাজিয়েছে । হস্টেল ক্যাম্পাসের গাছ থেকে তোলা । পেতলের ধূপদানিতে গন্ধরাজ ফুলের সুগন্ধি মাখা মাটি রঙের ধূপ জ্বলছে । শাদা হাউসকোট মতন একটা জোব্বা পড়ে একটি রোগা মেয়ে মেঝেতে ত্রক্রসস্টিচ্‌ করা আসনে বসে গুণগুণ করে মন্ত্র পড়ছে । সেই ঘরেরই আরেক দিকে নিচু সরু একটা খাট পাতা । তার উপর র্ফাস্ট ইয়ারদের পরম সঙ্গী পর্বতপ্রমাণ আদি ও অকৃত্রিম গ্রেজ্‌ আনাটমি বই খোলা । তার চারপাশে কঙ্কালের মাথার খুলি ও জঙ্ঘার হাড়, হিউমারাস, ও হাতের রেডিউস্‌ ও আল্নার্‌ ছড়ানো । ঘরের দুই দিকের বৈষম্য দেখে একটু মজা লাগল ।

    আমাদের উঁকি মারতে দেখে মেয়েটি আসন ছেড়ে উঠে আসল ।

    - আইয়ে দিদি । ভিতর মেঁ আকর্‌ বৈঠিয়ে । -

    মেয়েটির হাসির মধ্যে কোথায় যেন একটা করুণ ভাব । ছাগশিশুর মতো অসহায় । আবার হরিণশিশুর মতো নির্মল ।

    ফার্স্ট ইয়ারে অ্যাডমিশানের পর তিন মাস কেটে গেছে । অর্থাৎ র্যাগিঙের সময় পার হয়ে গেছে । সিনিয়ার ছাত্রীদের কাছ থেকে দেখা হলেই নির্যাতনের ভয় আর নেই । তবুও মেয়েটির চোখে কিসের ছায়া ? পরাধীনতা নয় । পদলেহীতা নয় । আমাকে -দয়া- করো এরকম একটা আর্তি ।

    নাম বলল, করুণা ভারতী । ভারতী মানে বিহার, উত্তরপ্রদেশে জাতি-নিরপেক্ষ-স্বরূপ নেওয়া পদবী । যেমন অনেকে কুমার পদবী নেয় । জাতি-বৈশিষ্ট্যের দলাদলি থেকে নিজেদের বাঁচাতে । আমি বাঙালি শুনে ও কিছুটা টান যুক্ত বাঙলায় পরবর্তি আলোচনাগুলি চালালো । দশ বছর বয়স অবধি করুণা বর্ধমানে বড় হয়েছে । তারপর ওর বাবা রেলের চাকুরিতে বদলি হয়ে পরিবার শুদ্ধ ধানবাদ চলে আসেন ।

    কিছুক্ষণ কথা বলে, নকুলদানা ও তিলকুটের প্রসাদ নিয়ে রীনার সাথে বেরিয়ে আসলাম ।

    সেই করুণা ।

    তাকে নিয়ে এত গোলযোগ ।

    বিশ্বাস করতে অসুবিধা হল ।


    ***********************************************


    দাঙ্গা রোধ করতে মোড়ে মোড়ে পুলিশ টহল দিতে থাকলো প্রায় সপ্তাহ দুই । মেডিকেল কলেজ বন্ধ রইলো প্রায় সপ্তাহ তিনেক ।

    উদয় ঝার দুই সঙ্গী নেপাল বর্ডার অতিক্রম করার সময় ধরা পড়ল । তিন অপরাধীকে পাটনা জেলে ট্রান্সফার করা হল । তাদের মেডিকেল কেরিয়ার পাহাড়ি ধ্বস নামা উপত্যকার মতো ধ্বংস হয়ে গেল ।

    শত্রুঘ্ন সিন্হা ফুলঝরিয়া ছেড়ে রাঁচি মেডিকেল কলেজে গেল । প্রায় ছয় মাস লেগেছিল তার সম্পূর্ণ সুস্থ হতে । এক বছরের পড়া নষ্ট । শরীরে মুখে নানান ক্ষতের বীভত্স দাগ । এক চোখে জলদস্যুদের মতো কালো পট্টি । লোকমুখে শুনলাম ইদানিং তাকে ভয়ঙ্কর দেখতে লাগে । ভাবী বৌয়ের বাড়ি থেকে যে দেড় লাখ টাকার দহেজ দেওয়ার কবুল করেছিল, তারা টাকা কমিয়ে পঁচাত্তর হাজারে রফা করলো । চেহারার কৌমার্যে ঘাটতি হওয়ার জন্যেই ।

    আর করুণা ? করুণার কোনো হেরফের দেখলাম না । সকলে ভেবেছিল যে এতো গোলমালের সময় হয়তো বাবা-মার কাছে বরৌনি চলে যাবে । কিন্তু রীনা বলল যে হস্টেলেই রয়েছে । ছেলেদের টিকা-টিপ্পুনি-টিট্কিরির দৌরাত্মে এক মাস বাইরে বেরোয়নি । দারোয়ান ওর জন্যে খাবারদাবার বাজার করে নিয়ে আসতো । হস্টেলের অন্যান্য মেয়েদের কারোর সাথে খুব একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না । তবে বিদ্বেষ ও ছিল না । নিরুদ্বেগ না হলেও শান্ত মুখ করে হস্টেল কমনরুমে মাঝে মাঝে খেত । ও নিজের ঘরে পড়াশুনা ও পূজা করতো ।

    ধীরে সময়ের আবর্তনে বছর কাটল ।

    ঝুটঝামেলার ব্যাপারটা শান্ত হয়ে আসলো । সবাই যে যার কাজে আমরা মগ্ন হয়ে গেলাম । জ্যাঠামশায়ের কাঁচাপাকা চুলে আরেকটু সাদার পোঁচ এলো । ভুরুতেও দেখলাম সেই রঙবদল । বড়মা বাড়ির তদারকি আর ফুলঝরিয়া লেডিজ ক্লাবের হাউসী খেলা ও ডাক্তারগৃহিণীদের পলিটিক্স নিয়ে যথানুপূর্ব মেতে গেলেন । দামি তেরোতে পা দিয়ে, বড়মার ভাষায়, একটু কম ধিঙ্গিপনা প্রকট করতে লাগল । আর লাউডগার মতো ফনফনিয়ে লম্বায় বাড়তে থাকল ।

    আমি থার্ডইয়ার থেকে ফোর্থইয়ারে উঠলাম । এই বছরে প্যাথলজি, ফার্মাকলজি, ও জুরিস্প্রুডেন্স - তিনটে বাঘা বাঘা সাব্জেক্টের ফাইনাল পরীক্ষা হবে বলে পড়াশুনায় এবার বেশ কিছুটা মনোযোগ দিলাম । সন্ধ্যেবেলা পড়ার সময় গুডম্যান এণ্ড গিলম্যান ফার্মাকলজি বইয়ের নিচে লুকিয়ে সমরেশ বসুর `বিবর' বা `লোলিটা' গোগ্রাসে না গিলে বা রেডিওতে শনিবার রাত্রের বিনাকা হিট প্যারেড কিংবা রবিবার দুপুরের বিবিধ ভারতীর হিন্দী গান চুরি করে না শুনে, একাগ্র ভাবে হুকওয়ার্ম ও ই-কোলাই এর মাইক্রোস্কোপিক চেহারার বিভিন্নতা ও ফরেনসিক মেডিসিনের আর্সেনিক বা স্ট্রিকনীন্‌ বিষক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে নিদারুণ মনোসংযোগ শুরু করলাম ।

    এর মধ্যে একদিন একটা চিঠি বোলতার মতো উড়ে এসে আমায় হুল ফুটিয়ে গেল ।

    ধানবাদ থেকে নীলচে সবুজ ইনল্যাণ্ড লেটারে লিখেছেন কুমুদকুসুম বাগচী । তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ভাবী ডাক্তার বিকাশকুসুমের সাথে আমার বিয়ের প্রস্তাব পেশ করে । বড়মা ওনাদের শোবার ঘরে আমায় ডেকে জ্যাঠামশায়ের সকাশে চিঠিটা পড়ে শোনালেন । খুশিখুশি গলায় পড়া শেষ করে আমার দিকে আশান্বিত মুখ করে তাকালেন বড়মা ।

    --ছেলেটাতো ভালোই । আবার ডাক্তার । তাছাড়া ওনারাই পত্রালাপ করছেন ।

    বড়মা চিঠিটা সযত্নে ভাঁজ করে ড্রেসিংটেবিলটার উপর রাখলেন হিমানী ট্যাল্কম পাউডারের কৌটো চাপা দিয়ে । অর্থাৎ এমন পাত্র হাতছাড়া করা উচিত নয় ।

    ভীষণ রাগ ও অভিমান হল । বড়মা কি আন্দাজ করতে পারেননি যে বিকাশকে ওনার পছন্দ হলেও আমার রোমান্টিক স্বপ্নের সাথে ওর কোথাও মিল নেই ? জাতক্যাবলার মতো যে অত চুলে তেল দেয়, কেঁদোবাঘের মতো মাঝখানে কপাল থেকে ব্রহ্মতালু অবধি সিঁথি কাটে, কলকাতার নিউমার্কেট থেকে আনানো ব্লু-জীন্সের উপর কালো শার্ট পরে না, তার সাথে আমি কী করে জীবন কাটাবার কথা ভাবতে পারি ? তাছাড়া যা ভেবেছি । ছোকরা কি ধড়িবাজ । নিশ্চয়ই নিজের বাড়িতে বলেছে আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছের কথা । তারপর তার বাবাকে দিয়ে চিঠি লিখিয়েছে । এতো পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা করি । তা ও লজ্জা নেই । বেশরম্‌, কামীনে, বদ্তমিজ্‌ । হিন্দী সিনেমার গালভরা গালাগালগুলো মনে মনে আওড়ালাম ।

    মুখের ভাব যথাসম্ভব নির্বিকার করে খাটের মশারি টানাবার দণ্ডটা নিয়ে দুই তিনবার মোচড় দিলাম ।
    --আমি এখন বিয়ে ফিয়ে করব না । হৈমন্তীদি কেমন ইসিএফমজি দিয়ে আমেরিকা যাবার জোগাড় করছে । আমিও করবো ।

    --কেন বিয়ের সাথে আমেরিকা যাওয়ার না যাওয়ার সম্পর্ক কি ? -- বড়মার সুরে বিরক্তি । যুক্তি তর্কে কিছু লাভ হবে না দেখে আমি ক্ষোভমণ্ডিত হাঁউ মাউ খাঁউ-য়ের পন্থা নিলাম ।
    --দেখছো আমার শিয়রে সংক্রান্তি । আজ বাদে কাল টিউটোরিয়াল পরীক্ষা । বিয়ে বিয়ে করে আরো আমার মাথা খারাপ করছ ।--

    জ্যাঠামশাই এতক্ষণ স্বভাবসুলভভাবে পেছনে দুহাত খিলের মতো করে ধরে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে কথা শুনছিলেন । বেগতিক দেখে বলে উঠলেন, - আহা, থাক্গে এখন বিয়ের কথা । মণি, তুমি লিখে দাও যে আর দুটো বছর না গেলে আমরা বিয়ের কথা ভাবছি না । ফাইনাল ইয়ারটা পাস তো করুক ।-

    বড়মার নাম মণিকুন্তলা । শ্বশুরবাড়িতে নাম দিয়েছিল মনীষা । জ্যাঠামশাই আড়ালে সোহাগ করে ডাকেন, মণি । বড়মাকে নিরস্ত্র করতেই হয়তো জ্যাঠামশাই এই অন্তরালের সোহাগি ব্রহ্মাস্ত্রটা ছাড়লেন ।

    - যা ভাল বোঝো করো তোমরা । মেয়ে আইবুড়ো হয়ে থাকলে আমায় দোষ দিও না । -বড়মা রান্নাঘরের দিকে চললেন বাড়িতে পরার চটির চটর্‌ পটর্‌ আওয়াজ তুলে ।

    সেদিন মনটা এমন বিস্বাদে ভরে গেল যে ভাল করে পড়ায় মন বসাতে পারলাম না । রাত্রে একটা দু:স্বপ্ন দেখে জেগে উঠলাম ।

    একটা গাড়ি করে যাচ্ছি । সঙ্গে একটি পুরুষ । লম্বা শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারা । জ্যাঠামশাইয়ের মতো দেখতে । কিন্তু জ্যাঠামশায় নয় । আমার ওপাশে এক নারী । কিন্তু বড়মার মতো অত ফর্সা নয় । অত গোলগাল নয় । উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ । কোঁকড়া চুল । গলায় সরু সোনার চেনে নক্ষত্রের গঠনে মিনে করা লকেট । নারী পুরুষ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে । তারপরেই কি করে গাড়িটাতে মেঘের মতো ধোঁয়ায় ভরে গেল । ধোঁয়ায় রং বদলাতে লাগলো । সিপিয়া । বার্নট অ্যাম্বার । সাঁওতাল প্রদেশের সিঁদুরে মাটি । স্টীল কারখানার ধূসর বাষ্প । নীলকুঠির বেগুনি ভস্ম । - গাড়ির দরজা লক, ড্রাইভারও দরজার লিভার ঘুরিয়ে জানলার কাঁচ নামানোর চেষ্টা করছে । কিন্তু সব বৃথা । সকলে জ্ঞান হারিয়ে নেতিয়ে পড়ছে । আমি শুধু জেগে আছি । শুধু আমি । ভয়ে কাঠ হয়ে । ভয়ংকর ভাবে একলা ।

    দু:স্বপ্নের ভীষণ আমেজে কিছুক্ষণ নি:শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল । পাশের সিংগল খাটে দামি শুয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে । উঠে বাথরুম গেলাম । মুখ চোখে জল ছিটিয়ে স্বপ্নের ঘোর কাটাবার প্রচেষ্টা করলাম ।

    অনেকক্ষণ পরে ভোরের দিকে ঘুম আসলো অনিচ্ছুক কৃপাদাত্রীর ভিক্ষার মতো ।


    ***********************************************


    ফোর্থ ইয়ারের ফার্মেসী ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছি । মোটামুটি চলনসই হয়েছে । বড়মার মনে খুব আশা যে আমি যেন অন্তত একটা সাবজেক্টে অনার্স পাই । তাহলে লেডিজ ক্লাবে গর্বিত মুখ করে বলতে পারবেন । যেমন মিসেস দুবে তাঁর ছেলের অ্যানাটমিতে গোল্ড মেডেল পাওয়ার কথা সুযোগ পেলেই বলেন । বড়মার সে গুড়ে বালি । আমার দ্বারা ওসব অনার্স, ডিস্টিংশন্‌, স্বর্ণপদক, কাগজে ছবি-কিছুই হবে না । জ্যাঠামশাই অবশ্য অল্পেতে তুষ্ট । আমি পাশ করলেই হল । খুশি খুশি মুখে নিশ্চিন্ততার হাসি হেসে স্টেথিস্কোপ্‌ ঝুলিয়ে চেম্বারে যাবেন । আর আমাকে পেপার, উত্তর, প্রশ্নাবলী ইত্যাদির বিষয়ে জেরা করতে ব্যস্ত বড়মাকে বলবেন, - আহা, অত জিজ্ঞাসাবাদ করছ কেন । খেটেখুটে পরীক্ষা দিয়ে এসেছে । উমিকে একটু বিশ্রাম করতে দাও ।

    পরীক্ষার হলের সামনে বিকাশ আজ ঘুরঘুর করছিল । আমার প্রথামত এক্কেবারে পাত্তা দিইনি । রীনা আমার কোমরে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, -দেখ, তোর জন্যে দেবদাস এসেছে ।

    দেবদাস অর্থাৎ প্রেমে প্রত্যাখিত । বিয়ের ব্যাপারে ওর বাবাকে লেখা বড়মার আধা-মুলতুবি, আধা-নাকচ করা চিঠি পাওয়ার পর কিছুদিন বিকাশকে কলেজের ধারে কাছে দেখিনি । জ্যাঠামশায়ের চেম্বারেও আসেনি ।

    -তোর দু:খে আবার দেশান্তরী হয়ে গেল না তো ছেলেটা ।- রীনা ঠাট্টা করেছিল ।

    সপ্তাহ খানেক গায়েব থেকে আবার এসে হাজির বিকাশ । জীবন্ময়দার সাথে জ্যাঠামশাইয়ের প্র্যাকটিসের রুগীর ভিড় সামলাতে । ঘেমো শার্ট পরে এক পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে । শনিবার রবিবার উদয়াস্ত চেম্বারে দাঁড়িয়ে জ্যাঠামশায়ের এক্সরে ফটোগুলো ভিউ-বক্সে টাঙিয়ে দিতে । প্রেস্ক্রিপশনগুলো গ্রাম থেকে আসা পেশেন্টদের বুঝিয়ে দিতে । প্যাকেট খুলে খুলে ওষুধের স্যাম্পেল বিলি করতে । দরকার হলে পাশের ছোট অফিসে প্রাইমাস স্টোভে জলে ফোটানো সূঁচ দিয়ে দাহ্য-বমি জর্জরিতদের স্যালাইন চালাতে । যেন দ্রোণাচার্যের একলব্য শিষ্য !

    যাইহোক পরীক্ষার পরে মনটা বেশ হাল্কা লাগছিল । বাড়ি গিয়ে আমাদের মালি রফিক মিয়াঁর করা ইস্পেশাল মুর্গি রেজালা আর শিবজীর রুমালি রুটি দিয়ে জলখাবার খাবো ভাবতে আরো মনে ফুর্তি জাগলো । জয়লালকে বললাম যে সামনে কদিন যে গ্যাপ পাব, তখন যেন ও আমায় নিয়ে বীণাপাণি ক্লাবের মাঠে গাড়ি চালানোর তালিম দিতে নিয়ে যায় । ভোরবেলা যাব, কাকপক্ষী ওঠার আগে ।

    জয়লাল রিকশা, টাঙ্গা, স্কুটার, গরুর গাড়ির পাশ কাটিয়ে সুদক্ষ ভাবে অস্টিনটা নিয়ে যাচ্ছিল । উত্সাহে মাথা নাড়লো ।- হাঁ উমাদিদি, ইয়েহি অচ্ছা মৌকা রহেগা ।-

    হঠাৎ বলভদ্রপুরে ঢুকে অগ্রওয়াল এণ্ড সন্স কাপড়ের দোকান ছাড়িয়ে মোড় ঘুরতেই দেখলাম রাস্তা জ্যাম । তুমুল ভিড় । পুলিশের জীপ । তিন চারটে খাকি উর্দি ও মিনারের মতো মাঝখান উঁচু পাগড়ি পরা পুলিশ বেটন হাতে ভিড় হাঁকাচ্ছে । জয়লাল মুখ বার করে জরুরি চালে বললো, --মেড্কেল কৌলেজ কে প্রিন্সিপাল সাব কা গাড়ি হ্যায় । জানে দিজিয়ে ।--

    বেবী অস্টিনটায় অ্যাম্বাসাডরের মতো চিকিত্সকের লাল ত্রক্রস নিশানা সাঁটা ছিল না । অহমিকা ভরা পেটমোটা ভ্রুকুঞ্চিত পুলিশ মাতব্বরের মতো পথ করে দিল । খোলা রাস্তায় বেরোবার আগে জয়লাল কৌতুহলের প্রশ্নটা করল, --ক্যা বাত হ্যায় ? ভীড় কাহেকা ?-

    দু একবার ইতস্তত করে উঁকি ঝুকি মেরে একজন পুলিশ মৈথিলী তে বলল, -তিরবেদী ডগ্ডর্‌ সাব খুন ভৈল্‌ ।--

    চমকে সীটে সোজা হয়ে বসলাম । অবিশ্বাস আর ভয় আমার কিছুক্ষণ আগেকার খোশমেজাজকে খেদিয়ে দূর করে দিল ।


    ***********************************************


    ডা: শিউশরণ ত্রিবেদী মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রির লেকচারার । বয়স উনপঞ্চাশ-পঞ্চাশ । বৌ তিন ছেলেমেয়ে সহ সক্রি গ্রামের বাড়িতে থাকে । ডা: ত্রিবেদী মাসে একবার পরিবারের সাথে দেখা করতে বাসে করে গ্রামে যান । অন্য সময় ফুলঝরিয়ার বলভদ্রপুর অঞ্চলে ভাড়া বাড়িতে থাকেন ।

    সকাল ন'টার সময় তার ঠিকে ঝি রসোই-বর্তন-ঝাড়পোঁছের কাজ করতে এসে দেখে যে মালিক উঠোনে গোসল্খানার কাছে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন । কুকরি জাতীয় ছোরার ঘায়ে শির প্রায় ধড় থেকে বিচ্যুত । মেডিকেল এগ্জামিনার বডির রাইগার মর্টিস ইত্যাদি দেখে রায় দিয়েছে যে সম্ভবত ভোর রাতে হত্যাকাণ্ডটি হয়েছে । ত্রিবেদীজির এক কানে পৈতের সূতো প্যাঁচানো -- অর্থাৎ ভোর রাতে বাথরুম যেতে উঠেছিলেন । হয়তো আততায়ী বা আততায়ীরা উঠোনের একপাশে ওত পেতে লুকিয়েছিল ।

    জ্যাঠামশাই তাঁর এক্তিয়ারের ডাক্তারের এই অপঘাতে মৃত্যুতে প্রশাসনিক ভাবে আবার জড়িয়ে পড়লেন । মিটিং, সাক্ষাত্কার, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান, পুলিশ তদন্ত - সব মিটিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফিরতেন ।

    দিনের শেষে খাবার টেবিলের আলোচনায় যা জানতে পারলাম তাতে কিছু সমাধান হল না । বরং মনে আরো প্রশ্নের উদ্রেক হল । কে মারলো ? কী কারণে মারলো ? প্রথমে পুলিশের ধারণা ছিল যে হয়তো চুরির উদ্দেশ্যে । কিন্তু দেখা গেল যে ডা: ত্রিবেদীর সোনার রিস্ট-ওয়াচ, ড্রয়ারের উপরে রাখা টাকা, রুপোর সিগারেট-কেস সবই অক্ষত মোতায়েন রয়েছে ঘরে । খুনী ওসবের দিকে নজর দেয়নি । অর্থাৎ মূলত: খুনের জন্যই খুন ।

    আবার খাবার টেবিলের বৈঠকেই জ্যাঠামশাইয়ের কাছে জানলাম যে বাজারে গুজব প্রেম-প্রতিহিংসা প্ররোচিত এই হত্যা । এক বছর আগে কানাঘুষোর জলে যে নামের বুদ্বুদ বুজকুড়ি কেটে উঠেছিলো, আবার সেই একই নাম সজোরে ঘাই মেরে ভাসলো ।

    করুণা ভারতী ।

    এবার করুণার প্রেমাকাঙ্খী থার্ডইয়ারের মেডিকাল স্টুডেন্ট প্রতাপ শ্রীবাস্তব । লেডিজ হস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের দৈনিক দীর্ঘ সান্ধ্যালাপ চলছিল দুই মাস ধরে । ইদানিং সেকেণ্ড ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যে বায়োকেমেস্ট্রির ডা: ত্রিবেদীর কাছে করুণা টিউশন পড়তে ক্লাসের পরে ডিপার্টমেন্টে যাচ্ছিল । এই বিশেষ অধ্যয়নের জন্যে দুই এক দিন স্যারের বাড়িতে বিকেলে নোটস্‌ নিতে গেছে ।

    পরের ব্যাপারটা অনুমান করা যায় । কারণ তারপরেই ডা: ত্রিবেদীর বিনাশ সাধন আর প্রতাপ ক্যাম্পাস ছেড়ে নিপাত্তা । কলেজ এবার বন্ধ হল না । তবে বেশ কিছুদিন ব্যাপারটা গড়িয়ে দলীয় সংগ্রামে পরিণত হওয়ার ভয় শীতের কুয়াশার মতো কলেজ এলাকায় ঢেকে রইলো । ত্রিবেদী উত্তর প্রদেশের ব্রাহ্মণ । বিহারে বহু দিনের বাসিন্দা । তবে এ এলাকায় ইউ পি-র লোক সংখ্যালঘু । শ্রীবাস্তবরা বিহারী কায়স্থ । প্রসাদ, লালা, নিগম, অস্থানাসমেত শ্রীবাস্তবের দলে ভারি । এই দুই সমষ্টি সংখ্যার অসঙ্গতির কারণেই বোধহয় দলাদলি আর এগোলো না ।

    মেডিকেল কলেজের মেয়েদের মধ্যে করুণার চরিত্র সম্বন্ধে বিভিন্ন মতামত সৃজিত হল । এক দল, যার মুখপাত্র রীনা, বলল, -- ওর মধ্যে যে ছেলেরা কি দেখে কে জানে । এমনকি আহামরি রূপ ।

    আরেকজন টিপ্পুনি কাটল । - জানিস তো মজনুকে যখন কেউ বলেছিল যে তোমার লায়লা এমন কি দেখতে । তখন প্রেমিক মজনু বলেছিল, -ইয়ার, মেরি আঁখো সে তো দেখ্‌ ।

    দ্বিতীয় দল বলল, -- ওই শান্তশিষ্ট লেজবিশিষ্ট দেখতে হলে কি হয় । পেটেপেটে ছেলেধরার কারসাজি । নইলে এতো খুনোখুনি মারদাঙ্গা হয় একটা মেয়ের জন্যে ! ওর নাম করুণা না হয়ে কামিনী হওয়া উচিৎ ছিল ।

    তৃতীয় শিবিরের মত, --মেয়েটা আসলে নির্দোষ । ওর ভাগ্যটাই খারাপ । শুধুমাত্র কথা বললেই বা টিউশন পড়তে গেলেই ছেলেরা ভাবছে প্রেম ।

    আমি তৃতীয় দলের সাথে একমত । পাত্তা না দিলেও যে ছেলেরা স্তাবক হতে পারে সে কথা আমার পুরো দস্তুর জানা আছে ।

    করুণার জন্যে করুণায় আমার মন ভরে গেল ।

    জ্যাঠামশাই পরদিন এসে বললেন যে লেডিজ হস্টেলের সুপারিন্টেণ্ডেন্ট ডা: শোভারাণী শাস্ত্রী ওনার কাছে করুণা সংক্রান্ত বিষয়ে সাহায্যের জন্যে সুপারিশ করেছেন । করুণা এমন কিছু দোষ করেনি যাতে ওকে কলেজ ছেড়ে যেতে বলা যেতে পারে । শোভাদি করুণার বাবা মার সাথে দেখা করে ব্যাপারটা আলোচনা করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু করুণার বাবা নেই, আর মা নাকি অন্ধ । চলাফেরা করতে পারেন না । বিহারের অন্য মেডিকেল কলেজে ট্রান্সফার নিতে বলেছিলেন শোভাদি কিন্তু করুণা নাকি সেকেণ্ড ইয়ারের ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ না করে মাঝপথে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি নিতে রাজি হয়নি । অথচ এত কাণ্ড হয়ে গেল যাকে ঘিরে তাকে কিছুটা তদারকে রাখা দরকার তার নিরাপত্তার প্রয়োজনেই ।

    বড়মার সাথে কিছুক্ষণ পরামর্শের পরে স্থির হল যে করুণাকে কয়েক সপ্তাহের জন্যে আমাদের বাড়িতে এনে রাখা হবে । আমার মতো বাড়ির গাড়িতে সে কিছুদিন কলেজ যাতায়াত করবে । হস্টেলের গুজব গুঞ্জরণে পড়ার ব্যাঘাত ঘটবে না । আমাদের পারিবারিক নিহিত রক্ষণশীলতা তার রক্ষাকবচের মতো কাজ করবে ।

    দামি তো আরেকজন দিদি এসে বাড়িতে থাকবে শুনে খুব খুশি । জয়লাল, রফিক মিঁয়া ও শিবজী মিলে ধরাধরি করে আরেকটা খাট আমাদের ঘরে ঢোকালো । নাপতানি বহেনজিকে দিয়ে উপরের চোরাকুটুরিতে রাখা তোরঙ্গ থেকে বড়মা তোষক নামিয়ে বিছানা পাতালেন । জয়পুরি প্রিন্ট ছাপা আকাশি রঙের চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন । বড়মা ও জ্যাঠামশাইয়ের একটা মেয়ের জীবনের বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতির সাথে তাকে সমঝোতা করতে সুযোগ দেওয়ার মতো হৃদয়ের প্রসারতা দেখে আমার মনেও একটা তুরীয় ভাব এসে গেল । আহা কি পরিবারেই না জন্মেছি, গোছের পরিতৃপ্তি ! এমন কি বড়মার উপর আমার বিয়ের জন্যে জোরাজুরি করার অভিমানেরও কিছুটা উপশম হল ।

    জীবন্ময়দা পর্যন্ত যে যখের ধনের মতো মেডিকেল রেপ্রিসেন্টেটিভ্দের দেওয়া কলম, কাগজের প্যাড, চাবির চেন জ্যাঠামশাইয়ের চেম্বারের আলমারিতে বন্ধ করে রাখে ও আমরা কাকুতি মিনতি করলে কৃপণের মতো একটা দুটো হিসেব করে দেয়, সেও সীবা-গায়গী কোম্পানির একটা ডেস্ক ঘড়ি দিয়ে গেল নতুন অভ্যাগতের জন্যে ।

    আমি আমার পড়ার টেবিলের এক দিকটা খালি করে দিলাম করুণার বই রাখার জন্যে । দামি লাফিয়ে লাফিয়ে বড়মার প্রিয় অগুরু সেন্ট ছিটিয়ে দিল করুণার বালিশে ।

    পাশে একটা বেডরুম খালি ছিল যেটা অতিথির জন্যে ব্যবহার হত । কিন্তু বড়মা চাননি যে করুণা একা সেখানে থাকুক । সকলের সান্নিধ্যে থাকলেই মেয়েটির মনটা ভারমুক্ত থাকবে, বাড়ির মেয়ের মতো মিলেমিশে থাকবে, এই স্থির করেছিলেন । দামিও । নতুন মানুষ সম্পর্কে কৌতূহল প্রণোদিত হয়ে একই ঘরে থাকবে । তাছাড়া আমাকে ছাড়া ও শোবে না ।

    করুণার জন্যে একটা আলাদা আলনা এল । প্যাঁচানো গলার ডেস্ক-ল্যাম্প, একটা ফোল্ডিং চেয়ার, পেয়ার্স সাবান, ও বিশেষ অতিথিদের জন্যে তুলে রাখা এক জাম্বো সাইজের ত্রক্রীম-হলুদ তোয়ালে ।

    এই ভাবেই করুণার সেন বাড়িতে প্রবেশের পর্ব শুরু হল ।


    ***********************************************


    করুণা আসার পর প্রথম দিন ছিল রবিবার ।

    গড়িমসি করে বেলা আটটায় উঠে দেখি করুণার বিছানা তোলা । খুব ভোরে উঠে ঠাণ্ডা জলেই স্নান করে ফেলেছে সে । বালতিতে সার্ফ সাবানে সায়া ব্লাউজ কেচে ধুয়ে বাথরুমের দড়িতে টাঙিয়েছে । একটু লজ্জা পেলাম । চিরকালই আমাদের জামাকাপড় নাপ্তানি বহেনজি কেচে দেয় । কিংবা ধোপানি বাড়িতে এসে মাড় দেওয়ার ও ইস্ত্রী করার কাপড়গুলো বস্তা বেঁধে নিয়ে যায় । নিজে কোনোদিন একটা রুমাল ছাড়া কাচাকাচি করিনি ।

    তারপর বড়মার পুজোর ঘরে গিয়ে মেঝে ন্যাতা দিয়ে মুছে, চন্দন বেটে, প্রদীপের অনেকগুলো সলতে তুলো চুমড়ে পাকিয়ে, ফুল দিয়ে ঠাকুরের আসন সাজিয়ে, হনুমান চালিশা ও মহামৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র পড়েছে । পরীক্ষা পাসের বা নিতান্ত স্বার্থপর আর্জি ছাড়া কোনো দিন ঠাকুরঘরের চৌকাঠ মাড়াইনি । এবার আরো কিছুটা লজ্জা পেলাম ।

    জ্যাঠামশাই সকালে উঠে হাসপাতাল যাওয়ার আগে দশ বার সিঁড়ি উপরনিচ করে ব্যায়াম করেন, তারপর চিরতার জল ও কালমেঘ খেয়ে টোস্ট আর চা খান । করুণা বড়মার সাথে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে পাখা দিয়ে মাছি তাড়িয়েছে যতক্ষণ জ্যাঠামশাই জলখাবার খেয়েছেন । যখন নিচে নামলাম দেখি করুণা একটা সাদা ভয়েলের উপর হাতির দাঁতের রঙের ফুল তোলা শাড়ি পরে জ্যাঠামশাইয়ের চা ঢালছে টী-পট থেকে । আধভেজা চুলে একটু ব্রাউনের স্ফটিক ঝিলিক । গা থেকে চন্দন গন্ধের রেশ আসছে । অর্ধচেতনার কোনো এক পবিত্র স্মৃতির মতো । রোগারোগা চেহারায় একটু পলকা ভঙ্গুর ভাব । শ্বেত দোপাটির মতো ।

    নিজেকে ভীষণ অলস ও অপদার্থ মনে হল ।

    সন্ন্যাসিনীর মতো নিজের কাছে শপথ করলাম । নিজেকে আরো অনুশীলিত করব ।

    দিনের পরে দিন এগোলো । করুণা আমার সাথে গাড়ি করে কলেজ যায় । ওর ক্লাসের রুটিনের সাথে আমার মিল না হলে, জয়লাল একজনকে নামিয়ে আরেকজনকে নিতে আসে । দামির রুটিনে কোনো মারপ্যাঁচ নেই । সকাল ন'টায় যায় । বিকেল চারটেয় ফেরে ।

    করুণা আসাতে জয়লালের কাজ বেড়েছে । কিন্তু দেখলাম খুশি মনেই জয়লাল করছে । আগে বেবী অস্টিনটাকে সপ্তাহে একবার ধুতো । ইদানিং দেখলাম দুই দিন অন্তর লাইফবয় সোপ আর কাপড় কাচার সাবানের মিশ্রণ করে, বাগানের কলের জল হোজ্‌ পাইপ দিয়ে ঝর্ণার মতো ঝরঝরিয়ে গাড়িটাকে চকচকে করে তুলেছে ।

    করুণা থাকাতে আমারও কতগুলি সুবিধা হচ্ছে । আমার বইয়ের টেবিলটা রোজ গুছিয়ে দেয় । সিল্কের শাড়ি ছাড়লে পটাপট পাট করে রাখে । আমার আলমারিতে ওর জামাকাপড়ের জন্যে জায়গা করে দিয়েছি । নিজের শায়া ব্লাউজ গোছানোর সাথে আমারটা ও সযত্নে ম্যাচ করে রাখে । ওর সব শাড়ি দেখলাম শাদা বা অফ্‌ হোয়াইট । বুটি দেওয়া । এম্ব্রয়ডারি করা । পাড়ের নানান সূক্ষ্ম তারতম্যে পৃথক । শৌখিন ঋষিকন্যার মতো । ভাবলাম আমিও ওর মতো আজীবন শাদা পরব । কিন্তু প্রিয় মুর্শিদাবাদি সিল্ক ও কটকি প্যাটার্নগুলোর মায়া ত্যাগ করতে পারলাম না । নিজের ইন্দ্রিয়াতুর লোভী স্বভাবের জন্যে নিজেকে অযুতবার ধিক্কার দিলাম ।

    করুণা নিরামিষাশী । ধীরে বাড়ির রান্নার ভোল বদলে যেতে লাগলো । রোজ মাছের বদলে সপ্তাহে তিন দিন শুধু ছোট বাঁশপাতা বা পাব্দা আসতে লাগল । রবিবারের মাংস তো উঠেই গেল । রফিক মিঁয়া যে কাবাবের দুরুস্ত মাহের, সেও দেখি একদিন দুপুরে শিবজীর সঙ্গে করুণার কাছে আলুর পাঁপড় বানানো শিখছে । দামি যে কথায় কথায় চপ্‌ কাট্লেট ভালবাসে, সেও দেখি এখন সোনামুখ করে বেসন আর দইয়ের কঢ়ি আর ধনে পাতা দেওয়া দোখ্লা খাচ্ছে ।

    সারাদিন একরকম কাটে কিন্তু করুণার রাতগুলো দেখি অন্যরকম ।

    প্রথম দুই রাত্রি কাটবার পরে তৃতীয় রাতে শুনি করুণা ঘুমের মধ্যে উশ্খুশ্‌ করছে । একটু পরে অস্ফুট গোঙানির আওয়াজ এলো । বেশ কিছুক্ষণ চললো । তারপর কান্নার দমক । ভয় পেয়ে বেড্‌ সুইচ টিপে ঘরের নিওন লাইটটা জ্বাললাম । করুণা ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । আমি খাট থেকে নেমে ওর মশারিটা তুলে করুণার পায়ে আস্তে চাপ দিলাম ।
    --এই করুণা, কি হয়েছে-
    --উঁ-
    --করুণা, আমি উমাদিদি । কি হয়েছে ? ব্যাথা হচ্ছে ?

    করুণা চোখ খুললো । দৃষ্টিতে ঘোর । ক্যা হুয়া ? কহাঁ হুঁ ম্যায় ? -- আধ-জাগরণে মাতৃভাষাটাই বেরোলো ।
    --তুমি আমাদের বাড়িতে । বাঙালিটোলায় । তোমার কোনো ভয় নেই ।
    দামিও কথাবার্তা শুনে উঠে পড়েছে । -দিদিভাই, কি হয়েছে রে ।
    --বহুত খরাব্‌ সপ্না দেখ রহি থি । খুব খারাপ স্বপ্ন । -- করুণা নিদ্রালসা ভাবে চোখ কচলালো । হাল্কা পেঁয়াজি রঙের চাদরের উপর সাদা নাইটি পরা গুটিশুটি মেরে শোওয়া করুণাকে একটা ছোট পাখির বাচ্চার মতো মনে হচ্ছিল ।

    আমি নিজে দু:স্বপ্নের ভুক্তভোগী বলে করুণার প্রতি একটা গভীর সমবেদনা অনুভব করলাম । আহা, বেচারার উপর কতই না ঝড় গেছে ।

    প্রতি রাত্রেই প্রায় চলতো এই দু:স্বপ্নের নিপীড়ণ ।

    জ্যাঠামশাই পরপর ওর এই দু:স্বপ্নের কষ্টের কথা শুনে চিন্তিত হলেন । আমার দু:স্বপ্ন তো কস্মিন্‌ কখনো । করুণার তো আরো ঘনঘন । তাছাড়া মনে হল ওর স্বপ্নগুলো আরো নির্মম ও সত্তা-প্রহরণকারী । জ্যাঠামশাই ওকে ঘুমের আগে আধখানা কাম্পোজ খেয়ে শুতে যেতে বললেন । ওষুধের নিদালিতে কিছুটা কাজ হল ।

    বড়মা ওকে পরীক্ষার পরে ওর মার কাছে ঘুরে আসতে বললেন । আমরা যেমন একা কোথাও যাই না, ওকেও অরক্ষিত একা যেতে হবে না । জগন্ময়দা বা জয়লাল ওকে ট্রেনে করে দিয়ে আসবে । করুণা বললো যাবে কিন্তু দেখলাম দিনক্ষণ কবুল করলো না । মার কাছে যাওয়ার তাগিদা নেই, এটা আমায় আশ্চর্য করল । তবে ও যখন যেখানে থাকে তখন তাদের আপন করে নেওয়ার অসামান্য শক্তিই বোধহয় ওকে বাড়ির জন্যে আকুলতা থেকে বর্মমণ্ডিত রাখে, এই ভাবলাম ।

    এক সন্ধেবেলা শুনি জ্যাঠামশাই বড়মাকে বলছেন, --ইনস্পেক্টার কেজ্রিওয়াল খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে যে ওর বাবা মৃত নয় । জেলে আছে বহু বছর ।

    দামি ও করুণা অন্য ঘরে বসে রেডিওতে নাটক শুনছিল । আমাকে দেখে জ্যাঠামশাই একটু থামলেন ।

    বড়মা বললেন, উমি শুনতে পারে, বলো ।

    জেলে কি কারণে গেছে সেটা সঠিক জানা যায়নি । শোনা যাচ্ছে যে ধর্ষণের চার্জ ।

    হঠাৎ কান মুখ গরম হয়ে গেল । একে তো জ্যাঠামশায়ের মুখে রেপ্‌ কথাটা শুনে । আর রাগে । লোকে করুণাকে সরল সোজা পেয়ে যা নয় তাই বলে যায় ! সব নিন্দুকদের বানানো । বললাম, --আমি একদম বিশ্বাস করি না । ভাল মেয়েটাকে পেয়ে--...

    জ্যাঠামশাই ও বড়মা একটু চিন্তিতভাবে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন ।


    ***********************************************


    প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেছে ।

    শনিবার দিন দুপুরে দামি আর আমি ছাতে শুকনো কাপড়গুলো তুলতে গেছি । দেখি জগন্ময়দা রাম্দা হাতে ছাতের উপর এসে পড়া নারকেল গাছ থেকে ডাব কাটছে । আর পাশে একটা বেতের ডালা হাতে করুণা দাঁড়িয়ে আছে । জৈষ্ঠ্য মাসের নিদাঘ নিরন্তর রোদ এসে করুণার ঈষৎ কটা চুল পরিবৃত ফর্সা রোগা মুখকে দীপশিখার মতো আলোকিত করেছে । করুণা সরল সুন্দর শিশুর মতো হাসছে । হাসছে ।

    জগন্ময়দা সেই নকশালের সময়ে কলকাতা থেকে পিসির কাছে ফুলঝরিয়া চলে আসে । ম্যাট্রিক পাস করা চট্পটে সেই কিশোরকে জ্যাঠামশাই হাতে কলমে নিজের চেম্বারে কম্পাউণ্ডারির কাজ শিখিয়েছেন । আজ পনেরো বছর আমাদের বাড়ির সাথে সংসৃষ্ট সে, বাড়ির ছেলের মতো ।

    নতুন বিয়ে হয়েছে জগন্ময়দার, বছর খানেক । বড়মা নবরত্নের সেট দিয়ে বৌয়ের মুখ দেখে বরণ করেছেন । বিজলি বৌদি নাকে ছোট্ট নথ পরা লাজুক চোখের শেওড়াফুলির মেয়ে । বৌদির সাথে আমরা প্রায়ই লুডোর চ্যাম্পিয়ানশপ্‌ খেলি ও মাঝেমধ্যে ম্যাটিনি হিন্দী সিনেমা দেখতে যাই ।

    জগন্ময়দা কপাল থেকে ঘাম মুছে একটা কি বলছে করুণাকে ।

    হঠাৎ বুকটা ধক্‌ করে উঠলো ।

    করুণাকে বললাম, --বড়মা তোমায় ডাকছেন, রোদ্দুরে বড়ি দিতে । দামি বরং ডালাটা ধরুক । --দামি একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল । -কিন্তু- । তারপর আর প্রতিবাদ করল না ।

    করুণার মুখটা আরো খুশিতে উদ্ভাসিত হল । -হ্যাঁ, নিশ্চয়ই । এক্ষুনি যাচ্ছে সে । বড়ি দিতে সে খুব ভালবাসে । বড়মা আগে কিছু বলেননি তো ।

    দামি ও জগন্ময়দাকে ডাব পাড়ার কাজে রেখে, আমিও করুণার সাথে নিচে চললাম । বড়মাকে বড়ির কথাটার ইঙ্গিত দিতে হবে তো ।

    সিঁড়ি দিয়ে করুণার পায়ে নামতে নামতে নিজেকে বড় হীনচেতা মনে হল । আমিও কি তাহলে অন্যদের মতো করুণাকে সম্মোহিনী সাইরেন ভাবছি । ছি: ।


    ***********************************************


    সেদিন রাত্রে করুণা আমার মাথায় জবাকুসুম তেল ঘষে বিলি করে দিল । ব্লাউজের হুক ছিঁড়ে গিয়েছিল, চোখে দেখা যায় না এমন সরু ফোঁড় দিয়ে সেলাই করে দিল । সেলাই রিফু করাতে আমার দারুন অনীহা, খুশি না হয়ে পারলাম না ।

    পরের দিন বড়মাকে ব্যসন ও ঝামা দিয়ে পা রগড়ে ঘষে, কাঠির মাথায় তুলো তুলির মতো জড়িয়ে আলতা পরিয়ে দিল । জ্যাঠামশায়ের রুমাল গুলোকে নতুন কেনা ইলেকট্রিক ইস্ত্রি দিয়ে মসৃণ করে দিল ।

    দামিকে তেঁতুল বীচি দিয়ে সাত-গুটি-বাঘ-চাল খেলতে শেখালো । দামি ইদানিং আর আমার পেছনে, -দিদিভাই, ক্যারম খেলবি ? দিদিভাই, সিনেমা দেখতে যাবি ? --বলে দৌড়ায়না । করুণার সাথে টিভি সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত থাকে । আগে ওকে কত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার ভান করে নিজের দাম বাড়িয়েছি । এখন ফাঁকা লাগে ।

    বাড়ির কাজের লোকেদের জন্যে পানিফলের আটা দিয়ে এক দিস্তা রুটি বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিল । শিবজী আর আমায় বিকেলে, -ক্যা খাইয়েগা দিদি, -বলে জিজ্ঞেস করতে আসে না । করুণা আসে । কিছুটা অভিমান হয় । কিন্তু করুণার মুখে কোথায় একটা কাতর আকুল আকুল ভাব থাকে যে আমি ওর উপর রাগ করতে পারি না । অথচ সোয়াস্তি পাই না । ওদের সবার মুখে, করুণা দিদি, করুণা দিদি- ।

    আমি নিজের বাড়িতেই নিজেকে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না । গভীর ভাবে একা বোধ করতে লাগলাম ।

    প্যাথলজির প্র্যাক্টিকাল পরীক্ষাটা খুব খারাপ দিয়ে এসে হলের বাইরে ব্যাজার ভাবে দাঁড়িয়ে আছি । জয়লালের পাত্তা নেই । করুণাকে আনাটমির ডিসেকশন হলে পৌঁছে দিয়ে ওর কখন গাড়ি নিয়ে চলে আসার কথা । খুব মাথা ধরেছে । একটাও রিক্শা ধারে কাছে নেই যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ধরে নেব । একে তো চড়চড়ে রোদ, তারপর বাড়ি থেকে একা রাস্তায় হাঁটার অনুমতি নেই ।

    সাধারণত বিকাশ আড়ালে আবডালে ঘুরঘুর করে কিন্তু আজ সেও অন্তর্হিত । হঠাৎ মনে হল যে বিকাশকে যেন কদিন ধরে দেখছি না । এক অশরীরী আত্মার মতো ওর অস্তিত্বটা বোধহয় আমার সংজ্ঞা অনুভব করত কিন্তু স্বীকার করতে চাইতো না । আজকে যেন ওর না থাকাতে প্রথম আফশোস বোধ করলাম । আজ যখন বিকাশ একটু রিক্শা ডেকে দেওয়ার কাজে লাগতে পারতো, তখন সে নিপাত্তা ।

    বিরক্তি ও বিহারের লু তে জিভ বিস্বাদ লাগছে আর চোখ জ্বালা করছে । এক যুগ পরে শুনলাম অস্টিনের মিহি হর্ন । পোর্টিকোর নিচে গাড়ি এসে দাঁড়ালো । দেখি পিছনে করুণা বসে । জয়লাল একটু অপ্রস্তুত মুখ করে গাড়ির দরজা খুলে দিল ।

    করুণা আমার জন্যে জায়গা করতে সীটে সরে বসলো । -- আমাদের ডিসেক্শন ক্যান্সাল হয়ে গেল । তাই ভাবলাম একটু কালীবাড়ি ঘুরে আসি ।

    আমি গম্ভীর মুখে কিছু বললাম না । কালীবাড়ি অনেকটা দূর । কলেজের আনা নেওয়ার সময়ে ওর যাওয়াই উচিত হয়নি, বিশেষ করে পরীক্ষার দিনে ।

    জয়লাল বুঝল আমার রাগ হয়েছে । --রাস্তে মেঁ বহুত ভীড় থা দিদি । -অর্থাৎ তাই দেরি হয়েছে ।

    তাও চুপ করে রইলাম ।

    --জানা হি নহিঁ চাহিয়ে থা । -স্বীকার করল জয়লাল ।

    করুণা ততক্ষণে শালপাতার ঠোঙা খুলে আমায় বোঁদে আর বাতাসার প্রসাদ ভেঙে দিচ্ছে । ওর আর জয়লালের কপালে দেখলাম পুজোর সিঁদুরের টিপ । একটা অব্যক্ত দোলাচলে আমার মনটা যেন অকারণেই শংকিত হল ।


    ***********************************************


    এরকম একটা মানসিক উথ্থান ও পতনের নাগরদোলায় আমার দিন ও রাত্রি কাটতে লাগলো । কখনও আমার মন করুণার প্রতি অনুকম্পা ও মমতায় ভরে থাকতো । আবার মুহূর্তের মধ্যে এমন একটা হয়তো সামান্য ঘটনা ঘটতো যাতে উটকো সন্দেহ ও ভয়ের ঢেউ আমায় প্রস্তরখচিত বেলাভূমিতে আছড়ে ফেলতো । সে কি মায়াময়ী না মায়াবিনী ? সে কি তাপসী না কুহকিনী ? সে কি করুণাময়ী না কামিনী ?

    তারপরই আবার একটা আফশোস ও হীনম্মন্যতার কষ্ট আমায় বিঁধে ফেলতো । ইস্‌, আমি এত নীচ কথা কি করে ভাবছি, ইত্যাদি ।

    ভোরবেলা শিবজীরও আগে উঠে পড়ে করুণা । জ্যাঠামশাইয়ের কাছে ভোরে উঠতে পারাটা মানুষের সর্বোপরি গুণ । করুণা ওনার দাড়ি কামাবার জল ইলেক্ট্রিক হীটারে ছোট কেটলিতে ফুটিয়ে গরম করে দেয় । তোয়ালে এগিয়ে দেয় । আনাটমির সম্বন্ধে দু একটা কথা জানতে চায় । জ্যাঠামশাই খুব খুশি হয়ে ওঠেন । মানুষের মন জয় করার এই ক্ষমতা যেন করুণার একটা অতিপ্রাকৃত সপ্তেন্দ্রিয় ।

    যতক্ষণে বড়মা তৈরি হয়ে নিচে নামেন ততক্ষনে করুণা খাবার টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম গুছিয়ে রেখেছে । ফ্রীজে রাখা শক্ত ইঁটের মতো মাখনের খণ্ড ঈষৎ গলিয়ে রেখেছে । পেয়ারার জেলি বাটিতে বার করে রেখেছে ।

    পরপর দুই রাত্রে একই দু:স্বপ্ন দেখলাম ।

    চলেছি নৌকায় সবশুদ্ধ ছয়জন । জ্যাঠামশাই, বড়মা, দামি, আমি ও আমার ঘরের সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ছবির সেই পুরুষ ও নারী । আকাশে গালফোলা রাগী কালো মেঘ । পাগলা ষাঁড়ের মতো উদ্দাম লাফাচ্ছে বাতাস । গঙ্গার জলে মৃতদেহের গন্ধ । নৌকা টালমাটাল । আমার গায়ে একদিকে ছবির কুঞ্চিতদাম নারীর পাপড়িকোমল স্পর্শ । অন্য দিকে বড়মার সুগোল স্তনযুগল আমার কাঁধে বরাভয়ের অনুভবে ন্যস্ত । দামি আমার হাঁটু জড়িয়ে অকাতরে ঘুমাচ্ছে এতো ঝঞ্ঝাবর্তেও । জ্যাঠামশাই ও তাঁর যমজের মতো দেখতে পুরুষটি প্রাণপণ বৈঠা বাইছেন । কিন্তু জলের ঘূর্ণি আমাদের পাতালে নিয়ে যাচ্ছে পলকা নৌকা সমেত । ঘূর্ণির চরকিতে এক মত্সকন্যা, লেজের ঝাপটায় চেপে দিচ্ছে নৌকা আরো অনলান্ত গভীরে । বিদ্যুতের ঝলকে দেখলাম মত্সকন্যার মুখ । কটা চুল । সরু চিবুক । সমুদ্রের লবণের মতো সাদা ত্বক ।

    সেদিন ডা: মোহন মিশ্রার কাছে বড়মার সাথে চোখ দেখাতে গেছি । মাইক্রোস্কোপে হীমাটোলজির স্লাইডগুলো স্পষ্ট দেখতে পাই না । মুকুন্দ-স্যার ফারমোকলজির ফর্মুলা বোর্ডে লিখলে শুধু কাটাকুংইট দেখি । একটু রোদে বেরোলেই চোখ বাগানের কুদরুম ফুলের মতো লাল হয়ে যায় ।

    নবীন ফার্মেসী থেকে লকুলা আই-ড্রপস্‌ কিনে ফিরে আসতে আসতে দেখি প্রায় রাত সাড়ে আটটা । চেম্বারের আলো বন্ধ । শিবজী বললো জ্যাঠামশাই জগন্ময়দাকে নিয়ে নাকি কার বাড়িতে রুগীর ভিজিট করতে গেছেন ।

    চেম্বারের অন্য দিকের বারান্দার কোল্যাপসিবল্‌ গেটের পাশে দাঁড়িয়ে দেখি দুই জন কে যেন কথা বলছে । মুখোমুখি দাঁড়ানো । অনেকটা যেন লেডিজ হস্টেলের কপোত-কপোতীর আলাপের ধরন । আট্রোপিন দিয়ে বিস্ফারিত চোখে ঠিক চিনতে পারছিলাম না ।

    ঠাহর করে দেখি করুণা ও বিকাশ ।

    হঠাৎ বুকের মধ্যে একটা বোমা ফাটার মতো শব্দ হল ।

    বড়মা আমার দিকে তাকালেন । আমি বড়মার দিকে ।

    গ্রীষ্মের আকাশের বঙ্কিম চাঁদ, ঘুড়ির আকারের সপ্তর্ষিমণ্ডল, সেই ছবি ও স্বপ্নের নারীর লকেটের মতো ধ্রুবতারা, ইতস্তত নক্ষত্রেরা - সবই যেন একটা অঘটনের অপেক্ষায় স্তব্ধ হয়ে গেল । বাগানের ইউক্যালিপ্টস গাছের প্যাঁচা ছটফটিয়ে উঠলো । একটা ইঁদুরের তীক্ষণ শিষ শুনলাম । বোধহয় বেজিতে ধরেছে ।

    বড়মা যেন আপন মনেই বললেন, -কালই আমি নিজে গিয়ে ওকে ওর মার কাছে দিয়ে আসবো- ।

    নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম, বিকাশের প্যান্টটা যেন আর ততটা ঢোলা মনে হচ্ছে না । মাথার সিঁথিটা যেন আর বিসদৃশ নয় । এমন কি ঘন কেশরাশির আরো বিন্যাস করছে । ওর কোনো ভঙ্গিমাই আর অমানানসই লাগছে না ।

    দূরে নেউলটা ইঁদুর ছেড়ে আগাছার মধ্যে পালিয়ে গেল ।

    (পরবাস ৩৯, জুলাই, ২০০৭)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)