• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৩৬ | অক্টোবর ২০০৫ | গল্প
    Share
  • বার-বি-কিউ : মীজান রহমান

    পাগলামি কাকে বলে !

    ঝোঁক উঠেছে, ছেলেমেয়ে আর নাতিনাতনি এলে ব্যাকইয়ার্ডে বার-বি-কিউ করবেন । তাক লাগিয়ে দেবেন ওদের । কাণ্ড দেখুন । পঁচাত্তর বছর বয়স লোকটার । এ-বয়সে মানুষ সিনিয়ার্স হোমের বেয়ারাদের কাঁধে ভর দিয়ে ডাইনিংরুমে যায় বা হুইলচেয়ারে বসে শূন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর উনি ছেলেমেয়ে আসবে বলে ব্যাকইয়ার্ডে বার-বি-কিউ বানাবেন ! তাক লাগাবার ঝোঁক উঠেছে বলে । পুরনো দিনের খাতিরে । অনেক, অনেক পুরনো । আজ থেকে আলোকবর্ষ আগে, যখন সে ছিল, আলো ছিল । যখন ওরা ছিল বাড়িতে । যখন কোলাহল ছিল বাড়িতে ।

    কথায় আছে না, স্বভাব যায় না ম'লে । পঁচাত্তর হলে কি হবে, মনটা তো এখনো ঘোড়ায়-চড়ে-দিগন্তে-বিলীন-হওয়া দুরন্ত যুবক । এখনো সেই পাগলা হাওয়ার সঙ্গী । যখন তখন যেখানে সেখানে নিখোঁজ হবার স্মৃতি এখনো তাঁর মনকে চিলের ডানাতে করে মেঘের রাজ্যে নিয়ে যায় । হেনা যদ্দিন বেঁচে ছিলেন কি জ্বালাতনটাই না ভুগতে হত বেচারিকে । বাচ্চাদের সামনে হঠাৎ করে পেছন থেকে এসে জিভ দিয়ে ঠোঁট-গাল ভিজিয়ে দিতেন । নদীর ধারে পিকনিক করতে গিয়ে জোর করে পানিতে নামাতেন । বাজারে পাঠালে মাঝে মাঝে বাজার ভুলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডায় জমে যেতেন, তারপরে চোরের মত বাড়ি ফিরতেন হাতে একজোড়া গোলাপ নিয়ে, যেন গোলাপ খেয়েই সবার পেট ভরে যাবে । রাগ করলে পা ধরে ক্ষমা চাইতেন, এবং ক্ষমা না করা পর্যন্ত পা ছাড়তেন না । হেনা বলতেন, আমার বিয়ে হয়েছে একটি শিশুর সঙ্গে । একবার বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল । বাড়িতে লোকজন আসবার কথা । তাঁরই বন্ধুবান্ধব বেশিরভাগ এবং তাদের স্ত্রী পুত্রকন্যারা । খুব সকালে উঠে রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছিলেন হেনা । পাগল লোকটার ঝোঁক উঠল, সবাই মিলে বেরিয়ে যাবে গাড়ি করে ।

    `কি বললে ?' নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না হেনা ।
    `চল বেরিয়ে যাই ।'
    `বেরিয়ে যাই মানে ? কোথায় ?'
    `উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম যেখানে চোখ যায় । যেখানে মন চায় ।'
    `আমার মন চায় এখানে থাকতে । চোখ যায় হাঁড়ির দিকে । তোমার বন্ধুরা খেতে আসবে, মনে আছে ?'

    `তার আগেই তো ফিরে আসব প্রিয়ে । চল না সখী বৃন্দাবন থেকে ঘুরে আসি এবেলা ।' হেনা হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাননা । এ বালকস্বামীকে নিয়ে তিনি নিরুপায় । তাকে ভাল না বেসে গতি নেই, বেসেও গতি নেই । বাচ্চাদু'টিকে ঘুম থেকে তুলে তিনিও তৈরি হয়ে যান পাগলের সঙ্গে পাগলা-নাচ নাচতে । ঠিক আছে, মনে মনে ভাবেন তিনি, দুপুরের মধ্যে ফিরলেই চলবে । রান্না তো কিছু করাই ছিল আগের দিন । আজকে শুধু পোলাও, সবজি আর সালাদটা করার কথা । ঘন্টাদুয়েক সময়ই যথেষ্ট । তবুও পাগলের মাথা ঠাণ্ডা হোক । আসলে মুখে যা'ই বলুন, প্রেমিক স্বামীর তালে তাল দেবার মত মন তাঁরও ছিল খানিক । বিয়ের পর থেকেই লোকটার পাগলা স্বভাব দেখে তিনি অভ্যস্ত । ঝড়বৃষ্টি হলে স্বাভাবিক মানুষ ঘরে বসে থাকে, তিনি ছিলেন উল্টো । বাচ্চাদের মত ওঠানে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতেন, বউটাকেও জোর করে ভেজাতেন । কৈশোর আর যৌবনে হেনার খুব নামডাক ছিল লম্বা চুলের জন্যে । প্রায় গোড়ালি ছোঁয়ার অবস্থা । লোকে তাকিয়ে থাকত । কিন্তু তাঁর জন্যে ছিল জ্বালা - এত লম্বা চুল রোজ রোজ সামাল দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয় । ক্যানাডায় এসে সিদ্ধান্ত নিলেন সেলুনে গিয়ে ববছাঁট করিয়ে আসবেন । বাধ সাধলেন স্বামীদেবতা । বলেন, চুল ছোট করলে তিনি আত্মহত্যা করবেন । সব্বনাশ, কেন ? ববছাঁটা চুল দিয়ে খোঁপা হয় ? খোঁপা না হলে আমি বাগানের ফুল গুঁজব কোথায় ? তাঁর আর সেলুনে যাওয়া হয়নি । বিধির এমনই পরিহাস যে তার কয়েক বছরের মাঝে তাঁর চুল আপনা আপনিই পড়ে গিয়েছিল - কিছুটা হয়ত বিদেশী পানির দোষে, কিন্তু মূল কারণটা ছিল স্বাস্থ্য । দুরারোগ্য ব্যাধি ।

    যা বলছিলাম । পাগলের নাচ । দু:খের বিষয় সেদিন তাদের দুপুরের মধ্যে ফেরা হয়নি । ফিরতে ফিরতে রাত ন'টা বেজে গিয়েছিল । এমন কোন দূরের পথ ছিল না । ছোট্ট শহর - ক্যাসেলম্যান । লোকসংখ্যা হয়ত হাজারখানেকের বেশি নয় । একটি কি দু'টি রেষ্টুরেন্ট । তারই একটি থেকে চা খেয়ে তাঁরা ফিরে আসছিলেন গেঁয়ো রাস্তা ধরে । এমন সময় হঠাৎ করে সেই দুর্ঘটনা । বিপরীত দিক থেকে জোরে গাড়ি চালিয়ে আসছিল দুটি টিনেজ ছেলে । তাদের সামনে ছিল একটি শিথিলগতি ট্রাকটার-ট্রেইলার । ছেলেদুটি ওটাকে পাশ কাটাবার জন্যে অধীর হয়ে উঠছিল । একসময় সুযোগ বুঝে অ্যাক্সিলিটারে পা বসিয়ে দিল কষে । ঠিক সেই মুহূর্তে হেনাদের গাড়িটা বিপরীত লেনে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি । বেঁচে গেল কিভাবে সেটাই রহস্য । সৌভাগ্যবশত ওদের লেনে অন্য কোন গাড়ি ছিল না । ডানপাশে ছিল ভূট্টার ক্ষেত, মাইলের পর মাইল । হেনার স্বামী পাগল হলেও উপস্থিতবুদ্ধিটা ছিল ভীষণ প্রখর । চরম সংকটের মুহূর্তেও লোকটা মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারতেন । জীবনকে সবসময় আনন্দ আর উত্সবের অবকাশ বলে ভাবতেন বলেই হয়ত তা সম্ভব ছিল তাঁর পক্ষে । টিনেজ ছেলেদের মতলব হয়ত টের পেয়েছিলেন তিনি । ওদের গতি বাড়ানোর মুহূর্তেই তিনি নিজের গাড়ির গতি কমিয়ে দিলেন, এবং একটু ডানের দিকে চাকা ঘোরালেন । ফলে হেড-অন সংঘর্ষ না হয়ে হল পাশাপাশি সংঘর্ষ । গাড়ির বাঁদিকের ফেণ্ডারটা সাঁ করে উড়ে চলে গেল ভূট্টার ক্ষেতে । গাড়িটা দু'তিনবার ঘুরপাক খেয়ে আছড়ে পড়ল ভূট্টার ঝোপে । কিন্তু টিনেজদের গাড়িটা অতিরিক্ত বেগের কারণে নিশ্চয়ই, রক্ষা পায়নি । রাস্তার ধারে বেশ কয়েকবার ডিগবাজি খাওয়ার পর একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল । একটি ছেলে ধাক্কার মুহূর্তে গাড়ি থেকে ছিটকে পড়াতে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল । দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ ড্রাইভারটি, বেরোতে পারেনি । পুড়ে ছাই হয়ে গেল কয়েকমিনিটের মধ্যে । সে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য । কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এল, অ্যাম্বুলেন্স এল, দমকলের গাড়ি এল । তারপর হাজাররকমের প্রশ্ন । ইন্সিওরেন্সে খবর দাও । গ্যারাজে খবর দাও । শেষে গাড়ি ভাড়া করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত অন্ধকার । বন্ধুরা নিশ্চয়ই ফিরে গিয়ে ভাবছে কি হল এদের । কি জবাব দেবেন ওদের কাছে । দুর্ঘটনার কথা শুনে অবশ্য সবাই আশ্বস্ত যে ওদের কারো কিছু হয়নি, কিন্তু লোক ডাকার দিন সপরিবারে শহরের বাইরে চলে যাওয়া এককাপ চা খাওয়ার জন্যে, সে আবার কেমন কথা । নিশ্চয়ই তারা ভেবেছিলেন এবাড়ির লোকগুলো আস্ত উন্মাদ । হেনা অনেকদিন লোকের সামনে মুখ দেখাতে পারেননি ।

    বার-বি-কিউ করতে কি কি লাগে সেটাও প্রায় ভুলে গেছেন তিনি । পুরনো চুলোটা ফেলে দেওয়া হয়নি, রক্ষে । ওটা কোথায় যেন ? গ্যারাজে নিশ্চয়ই নয় । গ্যারাজে এখন গাড়ি ছাড়া আর কিছুই থাকে না । ছেলেমেয়েরা যখন ছিল, ওদের মা ছিল, তখন গ্যারাজ ব্যবহার হত জিনিস রাখার জন্যে (যা ফেলে দেওয়া উচিত অথচ ফেলতে মায়া লাগে), গাড়ি বেচারাকে থাকতে হত বারান্দায় । এখন জিনিসগুলো সব চলে গেছে, বাড়ি-থেকে-বেরিয়ে-পড়া মানুষগুলোর পিছুপিছুই যেন । এখন গাড়ি তার নিজের জায়গা ফিরে পেয়েছে । না, চুলোটা গ্যারাজে নয় । বেইজমেন্টে হবে হয়ত । বেইজমেন্টে আর কি আছে ? অর্ধেকটা জীবন ? বিগত যৌবন, বিশাল ট্রাঙ্কের ভেতরে চেপে রাখা অনেকগুলো প্রিয় মানুষের হাসি, কান্না, ঝগড়া, চেঁচামেচি ? চুলোটা এত ভারি হয়ে গেল কেমন করে ? পঁচিশ বছর আগে তো এত ভারি ছিল না । এখন তো প্রায় দম বেরিয়ে যাবার দশা !

    ব্যাকইয়ার্ডে অনেকদিন যাওয়া হয়নি । ঘাস কেটে দিয়ে যায় পাড়ার একটি ছেলে - প্রতি গ্রীষ্মে তিনশ' ডলার নেয়, মন্দ না । সবজির ক্ষেতটা পোড়োজমিতে পরিণত হয়েছে । চাষ করতে এখনো ভাল লাগে তাঁর, কিন্তু নিয়মিত যত্ন নেবে কে ? সার দেওয়া, নিড়ানো, আগাছা ছাঁটা, এসব করতে হাঁটু গেড়ে বসতে হয় । এ-বয়সে হাঁটু হল পচা কাঠের মত, একটু টোকা দিলেই ভেঙে যাবে, এমন তার নড়বড়ে অবস্থা । বসলে দাঁড়াতে কষ্ট, দাঁড়ালে বসতে কষ্ট । ফাটা গরমের সময় রোজ রোজ পানি দেওয়া বাগানে সে'ও এক ঝামেলা । তাছাড়া এত সবজি খাবে কে ? ডাক্তার বলেছেন টমেটো তাঁর জন্যে ক্ষতিকর, পেটে একটা হার্নিয়া হয়েছে বলে । কাঁচামরিচ একসময় খুব খেতে পারতেন, এখন খেলে পেট জ্বলে । বেগুন আর জুখিনি লাগানো যেত, কিন্তু খরগোশ এসে চারা খেয়ে ফেলে, বড় হবার আগেই । ধনেশাক চাষ করতে যত খরচ কিনে খেতে তার চেয়ে কম খরচ । সুতরাং বাগানের বালাই ছেড়ে দিয়েছেন । সামনের লনে ছোট একটা ফুলের বেড আছে, তাও হেনা পছন্দ করতেন বলে । হেনা নেই বলে তার ফুল থাকবে না কেন ? ফুল তো আর মানুষের মত নিষ্ঠুর নয় যে একবার গেলে আর ফিরে আসে না ।

    হেনার মৃত্যুর বছরখানেক আগে নিশার, তাঁদের প্রথম সন্তান, ফ্যামিলিরুমের লাগোয়া কোণাটিতে একটা ছোটখাট ডেক বানিয়ে দিয়েছিল সিমেন্টের পাত বসিয়ে । প্রধানত তার রুগ্ন মায়ের জন্যে - বিকেলবেলার ছায়াতে লন চেয়ারে বসে বইটই পড়বেন, এই ছিল তার মনে । অসুখটা এমনই জাপটে ধরল শেষের দিকে বেচারির ডেকে বসা হয়নি একদিনও । এখন সেখানে কেউ বসে না । ফাঁকে ফুকে আগাছা গজায়, দুর্বা গজায়, সেগুলো প্রতি গ্রীষ্মে তিনি স্প্রে করে মেরে ফেলেন । কোন কোন বছর তা'ও হয়ে ওঠে না । আগের সেই উদ্যমটাই নেই এখন । যাকগে । মানুষ না থাকলেও ডেকটা তো আছে । ত্রিশপঁচিশ বছরের পুরনো পিকনিক টেবিলটা এখনো তার ওপর দাঁড়িয়ে । আগেকার গাঢ় লাল রংটা রোদে-বৃষ্টিতে-বরফে ফ্যাকাশে হয়ে জায়গায় জায়গায় সবুজ হয়ে গেছে, কোথাও বা একেবারে পচা কাঠ । ওটাকে ফেলে দেওয়া উচিত, কিন্তু কে ফেলে দেবে, এবং কোথায়, কিভাবে ? আজকে ওটাকেই ঝেড়েমুছে কাজে লাগানো যাক । নাহয় বেইজমেন্ট থেকে আরো কিছু লনচেয়ার এনে বসানো যাবে । সেগুলোরও পায়া ঠিক আছে কিনা দেখতে হবে ।

    বার-বি-কিউর চুলোটা এনে তিনি ডেকের ওপর স্থাপন করেন । একটা কাজ সিদ্ধ হল ! মন্দ কি । তারপর ? ও হ্যাঁ, কয়লার বাক্স খুলতে হবে, সেটা এখনো গাড়ির ট্রাঙ্কে । ওটাও খুব হালকা নয় । ঠিক আছে, আনা হল । একটুখানি দম নিতে হবে বসে । হার্ট অ্যাটাক একবার হলে দ্বিতীয়বার হতে একটা ছুতোর অপেক্ষা মাত্র । হার্টের রোগীরা সবাই জানে সেটা । তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবেন তারপর কি দরকার । একটু তেল, একটা দেশলাই । তাইতো, দেশলাইর কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন । ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন এক যুগ হল । তাহলে ? দেশলাইর জন্যে আবার বাজারে যেতে হবে ? আর কিছু ভোলেননি তো ? ও না, দেশলাই তো বাড়িতেই আছে, ওপরের কাবার্ডের একেবারে শেষ কোণে । ক'টা মোমবাতিও রাখা আছে সেখানে, বিদ্যুৎ চলে গেলে যাতে খানিক আলোর ব্যবস্থা থাকে । কয়লা নাড়ার জন্যে কিছু দরকার । কি যেন ওটার নাম ? ছাই, নামধাম কিছুই মনে থাকে না আজাকাল । যাইহোক, ওটা না থাকলেও ক্ষতি নেই । কিচেন থেকে ছেনি খুন্তি একটা কিছু নিয়ে এলেই চলবে । না, আর দেরি করা যাবে না । চুলো ধরাতে হবে শিগগির । ওরা এসে গেলে বিপদ । সব পণ্ড হয়ে যাবে । ওদের আসতে কতক্ষণ লাগবে ? মন্ট্রিয়ল থেকে অটোয়াতে মাত্র দু'ঘন্টার পথ । ফোন করেছিল কিছুক্ষণ আগে : আমরা বেরুচ্ছি বাবা । অর্থাৎ তারা এখন রাস্তায় । ওরা এসে গেলে বাবার কাণ্ড দেখে তুলকালাম বাধাবে । ছেলেমেয়েদের তো আর ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখবার উপায় নেই, বরং ওরাই ধমক দিয়ে তাঁকে বসিয়ে রাখার চেষ্টা করে । তার ওপর আছে নাতিনাতনি । নিশারের দুই মেয়ে, বড়টির বয়স বারো, সে'ও দাদুর ওপর কড়া নজর রাখে । মেয়ে জেরিনের এক ছেলে এক মেয়ে । ছেলেটি বড়, ষোলতে পড়েছে এবার - গোঁফ গজিয়ে রীতিমত পরিপক্ক পুরুষ । ইচ্ছে করলে নানুকে পাঁজা করেই বাড়ির ভেতরে নিয়ে যেতে পারে । না বাবা, ওদের আসার আগেই কাজ সেরে ফেলতে হবে ।

    চুলো ধরাতে আশাতীত বেগ পেতে হল । দেশলাই জ্বালাতে গিয়েই প্রথম ধাক্কা । বারবার জ্বলে, বারবার নেভে । জুলাইর গরমবাতাস, তেমন জোরের বাতাসও নয়, তাতেই । আসল কথা তাঁর হাতের কাঁপুনি । এটা কি পার্কিন্সন্সের লক্ষণ ? নাহ, পার্কিন্সন্স হলে অনেক আগেই হত, তাই না ? এটা হয়ত ক্লান্তির লক্ষণ । দু'টি ভারি জিনিস বইতে হয়েছে, এতদিন পর । শরীরকে সইতে হবে তো ঝক্কিটা । বয়সটাকে একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না । হেনার মুখটা ভেসে ওঠে মনে । ওঁর দেশলাই জ্বালানোর ব্যর্থ চেষ্টা দেখে হয়ত হেসে লুটপাট হতেন । তারপর নিজেই ফ্যামিলিরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এসে কাঠি ঠুকে আগুন ধরিয়ে দিতেন । হেনা, তুমি কোথায় গেলে ।

    আগুন ধরানোর পর মনে পড়ল আসল জিনিসটাই আনা হয়নি ঘর থেকে । মাংস । কাল রাতেই তিনপাউণ্ড স্টেক ধুয়ে-টুয়ে পরিষ্কার করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলেন । বাটা মশলা মাখানোর কথা ভেবেছিলেন একবার, যেমন করে হেনা করতেন । হেনা বাটা মশলা ছাড়া আর কিছু ব্যবহার করতেন না শেষের দিকে । আজকাল তো বাটা মশলা বাজারেই পাওয়া যায় । মেয়েটার রান্নার হাত ছিল বটে । একবার তার রান্না খেলে অন্য কিছুতে রুচি হত না । নাহ্‌, আবার হেনার দিকে চলে যাচ্ছে মন । দশ বছর পরেও মন মানে না কেন । না, এখন হেনা নেই । পৃথিবী হেনাহীন । হেনাকে ছাড়াই চন্দ্রসূর্যগ্রহতারা নিজ নিজ কক্ষপথে ঠিক আগের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে । হেনাকে ছাড়াই বার-বি-কিউ হবে । বাটা মশলার দরকার নেই । বার-বি-কিউ সস দিয়েই চলবে । ছেলেমেয়েরা এদেশে জন্মেছে, বড় হয়েছে । এদেশের খাবারই ওদের বেশি পছন্দ । নাতিনাতনিরা আরো এককাঠি বাড়া । তারা বার-বি-কিউ সস পেলে খুশিতে আটখানা হবে । বাজার থেকে এক নম্বর সস কিনে এনেছেন তিনি । খাঁটি মিসিসিপির তৈরি অল্পঝালের সস । এ-সসের সঙ্গে চাকা চাকা স্টেক আর বানরুটি পেলে আর কি লাগে । ওঁর নিজের জিভেই জল এসে যায় । খেতে পারবেন না, এই দু:খ । কলেষ্টরেলে ভর্তি । তবে ওদের জন্যে রাঁধতে দোষ কি ।

    ঘড়িতে ক'টা বাজে ? প্রায় সাড়ে চারটা । ওরা এসে পড়বে আধঘন্টার মধ্যে । এসেই দেখবে নীল ধোঁয়া উঠছে ব্যাকইয়ার্ড থেকে । প্রথমে ঘাবড়ে যাবে, ধোঁয়া কেন । বাবা কোথায় । তারপর গাড়ির দরজা খুলে গন্ধ শুঁকে বুঝবে বার-বি-কিউ হচ্ছে কোথাও । ভাববে ওপাশের বাসা থেকে আসছে গন্ধটা । তাদের মাথায়ই ঢুকবে না যে এটা বাবার কাজ । বাবার পাগলামি তারা সারাজীবনই দেখছে, তা ঠিক, তবে পঁচাত্তর বছর বয়সে একা একা বার-বি-কিউ করতে যাবেন সেটা তারা কল্পনা করবে কেমন করে । এসব চিন্তা তাঁর মনে পুরনো চাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনল খানিক । কিছু পুরনো স্মৃতি । একবার, সে বহুদিন আগের কথা, তখনো রোগের অসুর থাবা বিস্তার করেনি হেনার গায়ে, তিনি বার-বি-কিউর আয়োজন করেছিলেন ব্যাকইয়ার্ডে । আজকেরই মত । তখন সিমেন্টের ডেক ছিল না, তাতে কি আসে যায়, আগস্টের সবুজ ঘাসই হোক আগুনের শয্যা । ছেলেমেয়ে দুজনই ছোট, বার-বি-কিউর উত্তেজনায় নেচে বেড়াচ্ছে ঘরেবাইরে । চুলোতে আগুন, কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া ছড়াচ্ছে এপাড়া থেকে ওপাড়ায় । বাতাস তাদের আনন্দের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বাড়ি বাড়ি । আকাশভরা রোদ । দু'তলা বাড়ির ছাদের ছায়াতে পেছনের পরিবেশে গাঢ় প্রশান্তি । তাঁর ইচ্ছে ছিল দুচারজন গানের বন্ধু ডাকার । খাওয়াদাওয়ার পর আসর বসানো যাবে । হেনা বললেন, না, আজকে শুধু আমরা । আর কেউ নয় । আজকে তোমার জন্মদিন । তাইতো । আজকে আমার জন্মদিন । আমার মনে থাকে না, তোমার থাকে কেমন করে । সেটা তুমি বুঝবে কেমন করে ? খোঁটা দিয়ে বলতেন, পুরুষের মোটা মাথায় কি ওসব ঢোকে ? ওঁর জন্মদিনে একটা-না-একটা কিছু করাই চাই তাঁর । আর কিছু না হোক, সেজেগুজে একটা মুভিতে যেতেন সবাই মিলে । স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলতে হত, স্যুটটাই পরে । এই একটা জিনিস তাঁর জানের দুশমন - স্যুটটাই । আর হেনার জেদ, স্যুটটাই না পরলে তোমার সঙ্গে বেরুব না । মেয়েটা চলে যাওয়ার পর সেই যে স্যুটটাই ছেড়েছেন, আর স্পর্শ করেননি । অনেকটা যেন হেনার সঙ্গে রাগ করেই । তুমি ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে কেন ? এখন আমাকে স্যুট পরায় কে দেখি ।

    কিসব আবোল তাবোল চলছে মাথায় । ঘটনাটা যেন কিভাবে শেষ হল ? হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তিনি কুর্নিশের ভক্তিতে মাথা নুইয়ে বলেছিলেন, তথাস্তু মহারানী, আপনার আজ্ঞাই শির পেতে মানলাম । আপনি বারণ করেছেন, তাই আমার বন্ধুরা আসবে না, তারা খাইবে না, তারা গাইবে না । কেবল আমরা দুটিতে কুঞ্জবনে গুঞ্জন করে বেড়াব দীর্ঘরজনী । এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই কোথা থেকে বাজের ডাক বেজে উঠল আকাশে । নিশ্চয়ই কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে ওপার থেকে । এপারে রোদ, ওপারে ঘোর ঘনঘটা । বাহ্‌ মজা তো । ভেতর থেকে হেনা হাঁক দিচ্ছেন, এই শুনছ, মেঘ ডাকছে, বৃষ্টি হবে মনে হয় । বৃষ্টি ? বৃষ্টি তো আকাশের প্রেম সখী । অভিসারের উত্কৃষ্ট সময় । হাসতে হাসতে বলেছিলেন তিনি । তারপর সত্যি সত্যি বৃষ্টি নেমে এল ঝুপঝাপ করে । হাসি থামিয়ে তাড়াতাড়ি করে একটা প্লাস্টিকের পর্দা চুলোর ওপরে রাখলেন, একাংশ নিজের মাথাতেও । কিচেনের জানালা দিয়ে হেনা ছুঁড়ে মারলেন বাক্যবাণ ; অভিসার কেমন চলছে মহারাজ ? বলে ছাতাহাতে বেরিয়ে এসে স্বামীর মাথার ওপর ধরে দাঁড়ালেন । ইতিমধ্যে বাচ্চাদু'টি মজার গন্ধ পেয়ে গায়ে রেইনকোর্ট জড়িয়ে বেরিয়ে এল । যাকে বলে ফ্যামিলি বার-বি-কিউ ইন্‌ দ্য রেইন । তারপর আরো অনেকবার তাদের পারিবারিক বার-বি-কিউ হয়েছিল, কিন্তু সেবারকার মত স্মরণীয় হয়ে থাকেনি কোনটিই । হে বিধাতা, তুমি কেন নিয়ে গেলে ওকে ? ভালবাসা কি পাপ ? তাহলে এই শাস্তি কেন ?

    চুলোর আগুন বেশ চাগিয়ে উঠেছে । মাংস প্রায় নরম হয়ে গেল । আর ক'মিনিট পরেই তোলা যাবে । একপাট হয়ে গেলে আরেকপাট চাপাতে হবে গ্রিলের ওপর । তিনপাউণ্ড মাংস অনেকখানি মাংস । জনপ্রতি ছয় আউন্স করে পড়ে । খেতে পারবে তো সব ? নিশ্চয়ই পারবে । অল্প বয়স সবার, পারবে না কেন । এবয়সে তিনি একটা আস্ত মুরগী খেয়ে ফেলতে পারতেন । আজকালকার ছেলেমেয়েরা তো আরো বেশি খায় । খেয়ে খেয়ে মোটা হয় । তাঁর চারজন নাতিনাতনির মধ্যে তিনজনই একটু মোটার দিকে । ওদের যেন কোন তালই নেই । আজেবাজে জিনিস খেয়ে খেয়ে, এ অবস্থা । বাবামা দু'জনই চাকরি করে । রান্নাবান্নার সময় কোথায় তাদের । ফাষ্ট ফুড খেয়ে খেয়ে দিন কাটায় । পরে বুঝবে মজা । ওমা, আকাশে এত মেঘ হল কখন ? বৃষ্টি হবে নাকি ? বৃষ্টির কথা ছিল বুঝি ? টিভিতে তো রোজ একই বুলি : বিকেলবেলা বৃষ্টির সম্ভাবনা চল্লিশ থেকে ষাট, শতকরা হিসেবে । চল্লিশ হলে সাধারণত বৃষ্টি হয় না ষাট হলে সাধারণত হয় । আজকের পূর্বাভাসটা শোনা হয়নি । শোনা উচিত ছিল । বৃষ্টি হলে তো মহাবিপদ । যেই না ভাবা অমনি কাজ । শুরু হয়ে গেল দুমদাম । ক্যানাডার এসময়ের বৃষ্টির ধারাই এই । ঝুমঝাম ঢালবে ক'মিনিট, তারপর সব সাফ হয়ে একেবারে চকচকা রোদ । মুস্কিল এই যে আজকে তিনি বৃষ্টির জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না । প্লাস্টিকের শিট কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে । ছাতাও খুব একটা ব্যবহার করেন না তিনি । মনেও নেই কোথায় ওটা । আজকে সে নেই । ভেতর থেকে কেউ টিটকিরি দিচ্ছে না : অভিসার কেমন চলছে মহারাজ ? আজকে তিনি একা । মাথায় ছাতা নিয়ে দাঁড়াবার কেউ নেই । আজকে বৃষ্টির কাছে তিনি পরাজিত । বার-বি-কিউর সব আয়োজন ফেলে তাঁকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে হবে । বৃষ্টিতে ভেজার বয়স তাঁর চলে গেছে । তিনি বৃদ্ধ । তিনি ক্লান্ত । তাঁর সখী চলে গেছে ।

    ওরা কখন এল খেয়াল নেই । ঘরের চাবি ছিল দুজনেরই হাতে । না, তারা বার-বি-কিউর গন্ধ পায়নি । বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সব । তাক লাগানো হল না কাউকে । তারা ঢুকে দেখল বাবা কিচেনের টেবিলে দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন, মা যে চেয়ারটিতে বসতেন সবসময় । মায়ের মৃত্যুর পর আর কাউকে বসতে দেননি ও চেয়ারে । বাবা কি কাঁদছেন ? অসম্ভব । বাবা তো কোনদিন লোকের সামনে কাঁদেননি । ছেলে-মেয়ে দুজনই জড়িয়ে ধরল বাবাকে । বাবা, তুমি কাঁদছ ? তখন বৃষ্টি নেমে এল ঘরের ভেতরেও ।


    ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া, মুক্তিসন ৩৪


    (পরবাস, অক্টোবর, ২০০৫)

  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)
  • কীভাবে লেখা পাঠাবেন তা জানতে এখানে ক্লিক করুন | "পরবাস"-এ প্রকাশিত রচনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রচনাকারের/রচনাকারদের। "পরবাস"-এ বেরোনো কোনো লেখার মধ্যে দিয়ে যে মত প্রকাশ করা হয়েছে তা লেখকের/লেখকদের নিজস্ব। তজ্জনিত কোন ক্ষয়ক্ষতির জন্য "পরবাস"-এর প্রকাশক ও সম্পাদকরা দায়ী নন। | Email: parabaas@parabaas.com | Sign up for Parabaas updates | © 1997-2024 Parabaas Inc. All rights reserved. | About Us