• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৪ | অক্টোবর ২০২১ | প্রবন্ধ
    Share
  • ডক্টর মেরি-ক্লেয়ার কিং এবং বিআরসিএ : নূপুর রায়চৌধুরি


    “আমি সবসময় ধরে নিয়েছিলাম যে আমি অন্য কারও সহকারী হব, কারণ এই কাজে সাধারণত মহিলারাই থাকেন।। এবং আমি এও ধরে নিয়েছিলাম যে 'অন্য কেউ' একজন পুরুষ মানুষ হবে।" টাইম পত্রিকার সাথে ২০১৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারের সময় ডক্টর মেরি ক্লেয়ার কিং এই রকমের কিছু কথাই বলেছিলেন। ডক্টর কিংয়ের এই কথাগুলো থেকে এটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, সেই ১৯৭০ সালে, ডক্টর কিং যখন মহিলা বিজ্ঞানী হিসাবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন, পুরুষ বিজ্ঞানীদের আধিপত্যের দুর্ভেদ্য দরজা ভেঙে বিজ্ঞানের রাজধানীতে প্রবেশ করাটা অনেক মহিলা গবেষকের মতো তাঁর কাছেও সেই সময় একপ্রকারের দুরাশা বই আর কিছুই ছিল না কিন্তু ডক্টর কিং-এর মতো একজন অনন্যসাধারণ বিজ্ঞানী কি শুধু সহকারী হওয়ার জন্য জন্মেছিলেন? না কখনোই না। বীরদর্পে তথাকথিত লিঙ্গবৈষম্যের সব বেড়াজাল ছিন্ন করে সেখানে তিনি শুধু প্রবেশ করেননি, উপরন্তু জমিয়ে রাজ্যপাট চালাচ্ছেন। বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ এই সাধিকাকে পৃথিবী মনে রাখবে একজন পথিকৃৎ হিসেবে, হাজার হাজার মানুষের ত্রাণকর্ত্রীরূপে।

    জানি আপনাদের মনে এইবার কিছু প্রশ্ন উঠছে।। কে এই ডক্টর কিং? কিসের পথ আর কিসেরই বা সেই ত্রাণকার্য? এসব কথার উত্তর দিতে গেলেই এসে যাবে ক্যান্সার, বিশেষত স্তন ক্যান্সার ও বিআরসিএ জিনের প্রসঙ্গ আর এই বিষয়ে ডক্টর কিংয়ের অসামান্য অবদান। আপাতত শুধু বিআরসিএ জিন বলতে একটি স্তন-ক্যান্সার সংক্রান্ত বিশেষ জিন, এটি জানলেই চলবে। পরে এ-ব্যাপারে আলোচনা হবে।

    ১৯৪৬ সালের ২৭ই ফেব্রুয়ারি শিকাগোর একটি শহরতলি ইভানস্টনে জন্মগ্রহণ করেন মেরি-ক্লেয়ার কিং। তিনি মিনেসোটার নর্থফিল্ডের কার্লটন কলেজে গণিত অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৬৬ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে সেখান থেকে স্নাতক হন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে পরিসংখ্যান বিষয়ে ডক্টরেট করার জন্য যোগদান করেন। মেরি এইসময় রাজনৈতিকভাবে ভালোরকম সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কম্বোডিয়া আক্রমণ করলে মেরি একটি ক্যাম্পাস বিক্ষোভের আয়োজন করেন। ইউ এস ন্যাশনাল গার্ড বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এর প্রতিবাদে মেরি সাময়িকভাবে কলেজ থেকে বেরিয়ে যান। তারপর, ক্লাসে না গিয়ে তিনি এক্টিভিস্ট রালফ নাদেরের হয়ে বার্কলেতে চাষবাসে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের উপর কীটনাশকের প্রভাব খতিয়ে দেখার কাজ আরম্ভ করেন। মেরি বার্কলেতে ফিরে আসেন আবার প্রায় একবছর পর। বদলে ফেলেন তাঁর পিএইচডির বিষয়: ম্যাথমেটিক্স থেকে জেনেটিক্স। বার্কলের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজির প্রখ্যাত অধ্যাপক অ্যালান উইলসনের অধীনে গবেষণা শুরু করেন। বিজ্ঞানের জগতে মেরির যাত্রার সেই সূত্রপাত। ১৯৭৩ সালে জেনেটিক্সে পিএইচডি অর্জন করেন মেরি এবং তারপর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিস্কোতে পোস্টডক্টরাল গবেষণার কাজে যোগদান করেন।

    ডক্টর কিং-ই বিশ্বের প্রথম বিজ্ঞানী যিনি বিআরসিএ জিন আবিষ্কার করেছেন এবং স্তন ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য এর বংশগত সংক্রমণ প্রমাণ করেছেন। আজ যে আমরা বিআরসিএ জিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে এত কিছু জানি, তার প্রধান কারণ হল ডক্টর কিং-এর বৈপ্লবিক গবেষণার ফলাফল। বিশ্বের লক্ষ লক্ষ রোগী ও তাঁদের পরিবার আজ ডক্টর কিং-এর নিরলস বিজ্ঞান সাধনার ফল ভোগ করতে পারছেন।

    এই সুযোগে আরও যোগ করি যে, ডক্টর কিং শুধুমাত্র স্তন ক্যান্সার জিন সনাক্তকরণের কৃতিত্বের জন্যই সারা বিশ্বে বিখ্যাত নন, এছাড়াও মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি যে ৯৯% জিনগতভাবে অভিন্ন, তা তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে যেসব মানুষদের সেই দুর্ভাগাদের চিহ্নিত করার জন্য জিনোমিক সিকোয়েন্সিংয়ের প্রয়োগও তাঁর অমূল্য আবিষ্কার। এইভাবেই বার বার তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ঔৎকর্ষ তিনি ব্যবহার করেছেন সমাজের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধনের কাজে।

    তাহলে ডক্টর কিং-এর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের খুঁটিনাটি নিয়ে এইবেলা একটু খোলসা করেই আলোচনা করা যাক।

    ক্যান্সার সম্পর্কে সহজ কথায় বলা যেতে পারে যে এটি একটি জেনেটিক রোগ। বার্ধক্য, হরমোন, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ, সূর্যের অতিবেগনি রশ্মি, ধূমপান, কয়েকটি বিশেষ ভাইরাস, শরীর এবং পরিবেশের অন্যান্য কারণে আমাদের কোষস্থিত জেনেটিক তথ্য সংরক্ষক ডিএনএ ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডিএনএ-র এইসব ক্ষতি নিরসনের জন্য শরীরের নিজস্ব একটা মেরামত প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু সবসময় সেই প্রক্রিয়া নিখুঁত হয় না। প্রক্রিয়ার এই ছোট ছোট ত্রুটিগুলো আমাদের জিনে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটায়। সময়ের সাথে সাথে, এইসব মিউটেশনগুলো শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিক কোষের সৃষ্টি করে এবং তাদের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের কারণে ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব হয়।

    এবার আসা যাক বিআরসিএ জিনের প্রসঙ্গে। আপনারা অনেকেই সম্ভবত এই জিনের নাম শুনেছেন। আমাদের প্রত্যেকেরই শরীরে এটি আছে, কিন্তু এই জিনে মিউটেশনের ফলে এমন কিছু পরিবর্তন হয় যা আমাদের বেশ কয়েক ধরনের ক্যান্সারের জন্য বড় ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এসবের মধ্যে স্তন এবং মহিলাদের ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইদানিংকালে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সার, মেলানোমা, এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারের সাথেও এই জিনের যথেষ্ট সংযোগ রয়েছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে যদি আপনি আপনার বিআরসিএ জিনের অবস্থা আগেভাগে জানতে পারেন, তাহলে এই মারাত্মক রোগসমূহের প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি আপনি সময় থাকতে থাকতেই নিতে সক্ষম হবেন। তবে এটাও মনে রাখা দরকার যে বেশিরভাগ কান্সোরের কারণ আমরা এখনও জানি না। শুধু ৫-১০% স্তন ক্যান্সার বিআরসিএ জিনের সঙ্গে সংযুক্ত। তার মানে, এই জিন ছাড়াও কান্সার হতে পারে এবং হয়ও। এ সম্বন্ধে বিশদভাবে পরে লিখছি।

    একটা কথা এখানে জেনে রাখা ভাল যে, ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে যে জিনটির মিউটেশন সর্বাধিক লক্ষ করা গেছে সেটি হল টিউমার প্রোটিন ফিফটি থ্রি, সংক্ষেপে টি পি ফিফটি থ্রি ওরফে শুধুই পি ফিফটি থ্রি। গবেষকরা দেখেছেন যে, বেশিরভাগ সময় পি ফিফটি থ্রি জিনটির মিউটেশন বংশপরম্পরায় অর্জিত হয়।

    ভাবছেন কথা হচ্ছিল বিআরসিএ জিনের, এর মধ্যে আবার পি ফিফটি থ্রি জিনকে নিয়ে টানাটানি কেন? হ্যাঁ, একটা নিগূঢ় উদ্দেশ্য আছে এর পিছনে। বিআরসিএ এবং পি ফিফটি থ্রি জিনের জার্মলাইন মিউটেশনগুলিই বংশগত স্তন ক্যান্সারের সর্বাধিক পরিচিত কারণ। কার্যত সমস্ত বিআরসিএ জিনের অভাবজনিত স্তন ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে পি ফিফটি থ্রি জিনেরও মিউটেশন পরিলক্ষিত হয়। এর থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, পি ফিফটি থ্রি জিনের নিষ্ক্রিয়করণ স্তন টিউমারের অগ্রগতির জন্য বিশেষভাবে জরুরি।

    এখন একথা অনেকেই বিশদভাবে জানেন যে ডিএনএ-র মিউটেশনের ফলে ক্যান্সার হয়। কিন্তু সেই ১৯৭০ সালে, ডক্টর কিং যখন তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন, তখন সকলে মনে করত যে, ভাইরাস-এর মাধ্যমেই ক্যান্সার-এর সৃষ্টি হয়। হ্যাঁ, একথা অনস্বীকার্য যে হেপাটাইটিস বি অথবা হিউমান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) থেকে ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু একটা জিনিস ডক্টর কিং গভীরভাবে লক্ষ করেছিলেন যে কিছু কিছু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। এই ঘটনাটা ভাইরাল তত্ত্ব দিয়ে তিনি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারছিলেন না। ডাক্তার কিং তখন ভাবতে শুরু করেন, এমনও তো হতে পারে যে কোনো একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন আছে ওইসব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এবং ওই জিনটাই অতিবাহিত হচ্ছে এক প্রজন্ম থেকে আরেকে, এবং ফলস্বরূপ ঘন ঘন তাদের ক্যান্সারের আক্রমণ হচ্ছে।

    যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। ডক্টর কিং এইসময় আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে জেনেটিক্সের প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শুরু করে দিলেন কঠিন গবেষণা। রাত দিন সব এক হয়ে গেল। আর এত পরিশ্রম, এত অধ্যবসায় ফেলা গেল না। ১৯৯০ সালে ডক্টর কিং মানুষের ক্রোমোজোম সংখ্যা ১৭-এর একটা ক্ষুদ্র অঞ্চল--যার নাম বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় লোকাস ২১, সেখানে অবস্থিত একটা নতুন জিন-এর হদিস পান। অক্লান্ত গবেষণার মাধ্যমে এই জিনটির সাথে বংশগত স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের গভীর সংযোগও তিনি প্রমাণ করে দেন। জিনটির নতুন নাম দেন ব্রেস্ট ক্যান্সার জিন-ওয়ান, সংক্ষেপে বিআরসিএ-১।

    যেই এই আবিষ্কারের ফল প্রকাশিত হল, ব্যাস, অমনি হুড়োহুড়ি পড়ে গেল ফার্মা কোম্পানিগুলোর মধ্যে। কে আগে এই জিনটাকে নিয়ে ব্যবসা জমাতে পারে! ডক্টর কিং-এর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ঠিক চার বছর পরেই ১৯৯৪ সালে আমেরিকার উটা প্রদেশের সল্ট লেক সিটি-র মিরিয়াড জেনেটিক্স নামের কোম্পানিটি এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হল। মার্ক স্কোলনিক-এর নেতৃত্বে মিরিয়াডের গবেষকরা শুধু এই জিনটিকে ক্লোন করেই ক্ষান্ত হল না, গোটা জিনটার সিকোয়েন্সও করে ফেলল এবং জিনটির পেটেন্টের জন্যও আবেদন করল।

    এরপর ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে, লন্ডনের দ্য ইনস্টিটিউট অফ ক্যান্সার রিসার্চে প্রফেসর স্যার মাইক স্ট্রাটোন-এর নেতৃত্বে রিচার্ড উস্টার এবং আরও দশ জনের এক দল গবেষক স্তন ক্যান্সার সংবেদনশীল দ্বিতীয় জিনটিও সনাক্ত করে ফেলে এবং ক্রোমোজোম ১৩ স্থিত এই জিনটি বিআরসিএ-২ নামে পরিচিতি পায়। বিআরসিএ-২ জিনের একটি নির্দিষ্ট মিউটেশন (বিআরসিএ ২-৮৭৬৫ডেল এ. জি.) বিজ্ঞানীরা প্রথম সনাক্ত করেন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত ফরাসি-কানাডিয়ান পরিবারের সদস্য এবং ইহুদি-ইয়েমেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে। পরবর্তীকালে এই মিউটেশনটিকে সার্ডিনিয়ান পরিবারের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের মূল উৎস বলে চিহ্নিত করা হয়।

    একেবারে হইহই পড়ে যায় ক্যান্সার গবেষণার ক্ষেত্রে। স্তন, ডিম্বাশয় এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারে জেনেটিক টেস্টিং চালু হয়ে যায়। ওলাপারিব, নিরাপারিব রুকাপারিবের মতো পিএআরপি ইনহিবিটর জাতীয় শক্তিশালী ওষুধ ব্যবহারের ফলে ক্যানসারের কবলে দিন গুনতে থাকা অগুনতি মানুষের হতাশার অন্ধকার দুনিয়ায় আলোর প্রবেশ ঘটে।

    এখানে একটা কথা জোর দিয়ে বলা দরকার, তা হল বিআরসিএ জিন থাকা মানেই যে স্তন ক্যান্সার হবে তা কিন্তু মোটেই নয়। তবে এরা একজন ব্যক্তির স্তন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রতিটি মানুষেরই বিআরসিএ-১ এবং বিআরসিএ-২ এই দুটো জিনই আছে। একজন সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে জিন দুটি কোষের অনেক অপরিহার্য কাজের সাথে জড়িত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএর মেরামত এবং পুনর্গঠন, স্তন, ডিম্বাশয় এবং কোষের আরো অন্যান্য ধরনের টিউমার দমনে বিআরসিএ-১/২ জিন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যদি মিউটেশনের ফলে বিআরসিএ জিনগুলি নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবেই তারা আর তাদের কাজ করতে পারে না এবং অপ্রয়োজনীয় ডিএনএ, সময়ের সাথে সাথে ক্যান্সারের দিকে পরিচালিত করতে পারে। বিআরসিএ জিনগুলি স্বাভাবিকভাবে কাজ করলেও স্তন ক্যান্সার হতে পারে, কিন্তু বিআরসিএ মিউটেশন করলে একজন মহিলার এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৭% থেকে বেড়ে গড়ে ৫৫-৬৫% হয়ে যায় এবং সাথে সাথে অনেকটাই বৃদ্ধি পায় ডিম্বাশয় ও অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও।

    দেখা গেছে ইউরোপের আশকেনাজি ইহুদি পরিবারের লোকেরা বিআরসিএ মিউটেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ডাচ, ফরাসি কানাডিয়ান, আইসল্যান্ডিক এবং নরওয়েজিয়ান জনগণদেরও বিআরসিএ মিউটেশন বহন করার সম্ভাবনা বেশি। আশার কথা এই, যে পরিসংখ্যান বলছে, এশিয়ার জনসংখ্যার সামগ্রিক বিআরসিএ মিউটেশনেএর অনুপাত ইউরোপীয় এবং ল্যাটিন আমেরিকান মহিলাদের তুলনায় কম।

    এশিয়ান মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ক্যান্সার হল স্তন ক্যান্সার এবং এর প্রবণতা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। এর কারণ কিন্তু জানা নেই। হয়ত হরমোন বা অন্য কিছু। এশিয়ান মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রায় ১০%-এর স্তন ক্যান্সার বংশগত বলে মনে করা হয়, এবং এর মধ্যেও আবার প্রায় ২৫%-এর স্তন ক্যান্সার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিআরসিএ১/২ মিউটেশনের কারণে ঘটে। যদিও সমস্ত স্তন ক্যান্সার রোগীদের ৫%-এরও কম জন বিআরসিএ-১/২ মিউটেশনের বাহক, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বাহকদেরই স্তন ক্যান্সার বিকাশের সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে। এই রোগীরা যখন ৭০ বছর বয়সে পৌঁছান, ততদিনে তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭%-৫৫%। তখন এদের ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার হওয়ারও ঝুঁকি থাকে ১৭%-৩৯%।

    স্তন ক্যান্সার ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে এক নম্বর ক্যান্সারে স্থান পেয়েছে। সাম্প্রতিক জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি থেকে প্রাপ্ত ডেটা রিপোর্টগুলোর মধ্যে ক্যান্সারের ঘটনা, মৃত্যুর হার এসব তুলনা করে জানা যাচ্ছে যে প্রতি ১০০,০০০ মহিলাদের মধ্যে ক্যান্সার বিকাশের হার ২৫.৮ এবং মৃত্যুর হার ১২.৭।

    এখন একটা স্বাভাবিক প্রশ্ন আমাদের সকলেরই মনে আসে। বিআরসিএ১ এবং বিআরসিএ২ এর মধ্যে কোনটা বেশি ক্ষতিকারক? পরিসংখ্যান বলছে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে, মহিলাদের বিআরসিএ১ বাহকদের বিআরসিএ২ বাহকদের তুলনায় স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি। এছাড়াও, বিআরসিএ১ মিউটেশনগুলি প্রায়শই ট্রিপল নেগেটিভ স্তন ক্যান্সারের সাথে যুক্ত হয়, যা অন্যান্য ধরনের স্তন ক্যান্সারের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক এবং তার চিকিৎসা করাও কঠিন।

    এই বিষয়ে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হল বংশগত স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে বাঁচবার জন্য বিখ্যাত আমেরিকান অভিনেত্রী, অ্যাঞ্জেলিনা জোলির দৃঢ় পদক্ষেপ। একটি সম্পাদকীয়তে, জোলি প্রকাশ করেছিলেন যে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁর মা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে মারা যান। জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়ে যে উত্তরাধিকার সূত্রে মায়ের দিক থেকে মিউটেটেড বিআরসিএ ১ জিনটি তাঁর শরীরে এসে গেছে। বিশেষজ্ঞরা এও জানান যে ভবিষ্যতে তাঁর ক্ষেত্রে ৮৭% স্তন ক্যান্সার এবং ৫০% ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রোফাইল্যাক্টিক দ্বিপাক্ষিক মাস্টেক্টমির মাধ্যমে একই সময়ে উভয় স্তন অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০১৩র ১৪ মে এই জটিল অস্ত্রপ্রচার হয়। জোলি সেখানেই থেমে থাকেন না। ক্যান্সারের সম্ভাবনাকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর ডিম্বাশয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউবও অপসারণ করিয়ে ফেলেন। এই ঘটনা শুধুমাত্র বিজ্ঞানের জয়যাত্রা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রগতির চিত্রটিই আমাদের কাছে তুলে ধরে না, উপরন্তু হাজার হাজার মানুষের মনে ক্যান্সারকে প্রতিহত করার সাহস এবং শক্তি জোগায়।

    এত কিছুর পরেও ক্যান্সারের ঝুঁকি কিন্তু পুরোপুরি দূর হয় না। কারণ ক্যান্সার তো শুধু কোনো একটা মাত্র বিষয়ের জন্য হয় না। জেনেটিক, পরিবেশগত বা ব্যক্তির নিজস্ব শারীরিক বৈশিষ্ট্য--একসাথে নানা কারণ মিলেমিশেই এটা তৈরি হয়। আর কে না জানে মানবসভ্যতার আজকের এই দুরন্ত প্রগতির জোয়ারে এই কারণগুলোও ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে চলেছে, দ্রুত, অতি দ্রুত।

    এখানে আরো একটা ব্যাপার জেনে রাখা দরকার যে স্তন ক্যান্সারের কথা উঠলে প্রায়শই আমরা বিআরসিএ জিনের দিকেই সরাসরি আঙ্গুল তুলে থাকি কিন্তু এমন অনেক মহিলা আছেন যাঁরা তাঁদের পারিবারিক ইতিহাসের ভিত্তিতে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, অথচ বিআরসিএর স্ক্রিনিংয়ে তাঁরা নেগেটিভ প্রমাণিত হয়েছেন। আজকাল বিআরসিএ টেস্ট তো আকছার হচ্ছে। এদের সবার টেস্ট করা এখনো সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা এখন প্রমাণ পেয়েছেন যে বিআরসিএ ছাড়াও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আরও বেশ কিছু নন-বিআরসিএ জিনের মিউটেশন আমাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। আর এই সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রায় ১০০টিরও বেশি জিনের মিউটেশন এই তালিকায় আছে এবং ক্যান্সারের জেনেটিক্স সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধির সাথে সাথে এই সংখ্যা আরও বাড়বার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এই ব্যাপারে লক্ষণীয় যে বিআরসিএ১/২র মতোই স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত এই জিনগুলির অনেকগুলোই হল টিউমার দমনকারী জিন।

    ভারতের থেকেও প্রতিবেশী পাকিস্তানে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা অনেক বেশি। এবং সেই সূত্রে উত্তর ভারতীয়দের মধ্যেও। এর মূলে হয়তো ওইরকম কোনো মিউটেশন--যা এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায়। সম্প্রতি কিছু গবেষণায় মনে হচ্ছে যে পাকিস্তানের একমূলতা বা জন্মসূত্রে রক্তের সম্বন্ধও (consanguinity) বংশসূত্রে এই মিউটেশন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

    বর্তমানে ডক্টর কিং আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবং সিয়াটেলের ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারেরও একজন অধিভুক্ত সদস্য। এই তো সেদিন ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে কানাডার টরোন্টোতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কানাডা গায়ার্ডনার আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী সম্মেলন। জৈব চিকিৎসা বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য যে চারজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর নাম ঘোষিত হয় সেখানে তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডক্টর কিং।

    ডক্টর কিং এমনই একজন বিজ্ঞানী যিনি তাঁর গবেষণাকে ল্যাবরেটরির চার দেয়ালের মধ্যে রাখেননি, নিজের গবেষণার ফল শুধুমাত্র নামি-দামি বৈজ্ঞানিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে আত্মতৃপ্তি উপভোগ করেননি, কিংবা, বৈজ্ঞানিক মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি, তিনি লড়াই করছেন সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকারের জন্য। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, বহু মহিলারাই জানেনই না যে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এই ভয়ঙ্কর মিউটেশনটি বাবা বা মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে তারা পেয়ে গেছেন এবং ভবিষ্যতে স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বহন করছেন। "ক্যান্সার হওয়ার পর একজন নারীকে ক্যান্সারের বাহক হিসেবে চিহ্নিত করা ক্যান্সার প্রতিরোধে আমাদের ব্যর্থতাকেই কেবল প্রতিপন্ন করে।'' তিনি মনে করেন, “পারিবারিক ক্যান্সারের ইতিহাস নির্বিশেষে ৩০ বছরের বেশি বয়সি সব যুবতী মহিলাদের বিআরসিএর জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের সুবিধা দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।''

    সারা বিশ্বে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য আজ যে জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের চল হয়েছে, ডক্টর কিং-এর আবিষ্কারই তার পুরোধা। আশার কথা যে শুধু স্তন নয়, ডিম্বাশয়, প্রোস্টেট, মলাশয়, মূত্রথলি. অগ্ন্যাশয়. থাইরয়েড মেলানোমা, সারকোমা ইত্যাদি নানা রকমের ক্যান্সারের জেনেটিক টেস্টিং এখন মানুষদের এই সব মারণব্যাধির বিরুদ্ধে সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করছে। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে ক্যান্সার এমনি একটা অসুখ যে এর চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেহ এবং মন দুইয়েরই বিশাল ভূমিকা আছে। শরীরের সর্বাঙ্গীণ সুস্থতার উপরই এই রোগের নিরাময় নির্ভর করে। সঠিক পুষ্টি, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অনেকাংশেই আমরা ক্যান্সার আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারব।

    আপনার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসাবে প্রতিদিনের জীবনধারণের জন্য সচেতনভাবে কিছু নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে। বেশি করে শাকসবজি ফলমূল খান। অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত করুন। ধূমপান বন্ধ করুন। আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। হাঁটাহাঁটি, যোগ ব্যায়াম, প্রতিদিনের ঘরোয়া কাজ এসবের মাধ্যমে নিজেকে সচল রাখুন। সানস্ক্রিন ব্যবহারের মাধ্যমে আপনার ত্বক রক্ষা করুন।

    ডক্টর কিংয়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলা যেতেই পারে যে স্বাস্থ্য পরিষেবার নীতিমালায় এ ব্যাপারে আশু পরিবর্তন হওয়া দরকার যাতে করে মহিলারা তাদের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসাবেই এই পরীক্ষার সুযোগ পেতে পারেন। একমাত্র তখনই আমরা এই ভয়ঙ্কর রোগের উপযুক্ত মোকাবিলা করতে সমর্থ হব।

    তথ্যসূত্র:
    1. The contribution of large genomic rearrangements in BRCA1 and BRCA2 to South African familial breast cancer. BMC Cancer. Nerina C. et. al. 2020, 20, Article number: 391

    2. Screening of over 1000 Indian patients with breast and/or ovarian cancer with a multi-gene panel: prevalence of BRCA1/2 and non-BRCA mutations. Breast Cancer Res Treat. Jaya Singh et. al. 2018, 170(1):189-196

    3. Breast cancer risk factors differ between Asian and white women with BRCA1/2 mutations. Monique A de Bruin et. al. Fam Cancer. 2012



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ আন্তর্জাল থেকে নেওয়া
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)