• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | Rabindranath Tagore | গ্রম্থ-সমালোচনা
    Share
  • বর্জনের চেয়ে গ্রহণেই বেশি রবীন্দ্রনাথ: "আমার রবীন্দ্রনাথ : গ্রহণে বর্জনে"; সুমিতা চক্রবর্তী : শচীন দাশ

    আমার রবীন্দ্রনাথ : গ্রহণে বর্জনে; সুমিতা চক্রবর্তী; রত্নাবলী, কলকাতা; ২০১০

    রবীন্দ্র সার্ধশত জন্মবর্ষ উপলক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন স্তরে নানান অনুষ্ঠান হয়ে গেল গত এক বছর ধরে । হয়তো এবারে পূর্তি উৎসবও হবে । হওয়াটাই স্বাভাবিক । ইতিমধ্যে আমরা পৃথকভাবে গোরা-র শতবর্ষ নিয়ে আলোচনা হতে দেখেছি । শতবর্ষে গীতাঞ্জলী নিয়েও নানান জায়গায় আয়োজন করা হয়েছে সেমিনারের । এছাড়া ছিল রবীন্দ্রনাথকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা । অনুভব করতে চেয়েছি তাঁর বিজ্ঞানচেতনা, তাঁর সমাজভাবনা, তাঁর পল্লীভাবনা, তাঁর দেশগঠনের চিন্তা ও সভ্যতার সংকটে তিনি কীভাবে মানবজাতিকে পথ দেখাতে চেয়েছিলেন । এসব তো ছিলই, সর্বোপরি ছিল তাঁর সাহিত্যের মূল্যায়ন । তাঁর কবিতা, তাঁর ছোটোগল্প, তাঁর উপন্যাস, তাঁর নাটক ও গান । তাছাড়া যে কথা বারবারই উঠে এসেছে, একুশের শতকে এসে রবীন্দ্রনাথ কি আজও আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক !

    আর এ প্রসঙ্গে, গত একবছর ধরেই আমরা বিভিন্ন প্রবন্ধে বিশিষ্টজনের মতামত যেমন পেয়েছি তেমনই আবার অনেক বিদগ্ধজন এখনও তাঁকেই আঁকড়ে ধরে মানবজাতির উত্তরণের পথ খুঁজে পেয়েছেন । এই তো কিছুদিন আগে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক অশোক মিত্র-র একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম একটি সাহিত্য পত্রিকায় । তিনি জানিয়েছেন : 'আমি কবিতা ছেড়ে দিলাম, রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস ছেড়ে দিলাম । আমি বলব, অন্য কিছু নয় শুধু গীতবিতান নিয়ে সারাজীবন পড়ে থাকা যায় । বাঙালি মধ্যবিত্ত, যাঁরা লেখাপড়া একটু শিখেছেন, তাঁরা হয়তো সহজভাবে রবীন্দ্রনাথের বিষয়ে প্রবেশ করতে পারেন কিন্তু আমার ধারণা, যে মানুষটা এখনও সাক্ষর হওয়ার সুযোগ পায়নি, কিন্তু তাঁর মানবিক বৃত্তিগুলি বিকশিত হয়েছে আমাদের সমাজের এই দ্বান্দ্বিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই মানুষটিও রবীন্দ্রনাথ থেকে শুধু শ্রবণের সাহায্যে জীবন সম্পর্কে প্রেরণা পেতে পারেন । আর পড়াশোনা জানা মধ্যবিত্তের তো কথাই নেই । ....... সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে কোথায় যাব ? ...... হ্যাঁ, নিশ্চয় সময় পাল্টাবে, যুগের আদল অন্যরকম হবে, আমাদের চিন্তায় নতুন ভাবনার প্রলেপ পড়বে, কিন্তু নতুন ভাবনাকে যদি আরও গভীরে গিয়ে প্রকাশ করতে চাই, তার ব্যঞ্জনা অনুভব করতে চাই, তাহলে আমাদের রবীন্দ্রনাথের কাছেই ফিরতে হবে ।'

    সত্যিই কি ফিরতে হবে ? রবীন্দ্রনাথ কি পারেন আমাদের চিন্তা-চেতনা ও ভাবনার জগতকে এমন এক উচ্চতায় তুলে ধরতে যাতে বাঙালি হিসেবে আমরা আমাদের নিজস্ব সত্তাকে প্রকাশ করতে পারি ! এ উত্তর খুঁজতে গিয়েই সম্প্রতি হাতে এল রবীন্দ্র সম্পর্কিত একটি বই । বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও চিন্তক সুমিতা চক্রবর্তীর 'আমার রবীন্দ্রনাথ : গ্রহণে বর্জনে' । অবাকই হলাম । রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণের পাশাপাশি আবার বর্জনের কথাও উঠছে তাহলে । কিন্তু কোথায় বর্জন আর কোথায়ই বা তাঁকে গ্রহণ ? এ প্রসঙ্গে গ্রন্থের অন্যান্য প্রবন্ধগুলিতে যাওয়ার আগে এ-গ্রন্থের প্রাক্‌-কথন অংশটির দিকে একবার নজর রাখা অবশ্যই জরুরি । যেখানে গ্রন্থের শিরোনামেই একটি আত্মকথন আছে প্রাবন্ধিকের । এবং তিনি জানাচ্ছেন :

    'প্রথমেই বলতে চাই - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরও অনেকের মতোই আমারও ভাবনা, রুচি, নান্দনিকতার বোধ, জীবনযাপন, কর্তব্য নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন । বিশেষ করে বাঙালির বেঁচে থাকায় তাঁর দুর্মর উপস্থিতি । কিন্তু তা সত্ত্বেও একজন মানুষ প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই আর একজন মানুষের সবটাই গ্রহণ করতে পারেন না, পার্থক্যের জায়গা থাকেই । মানুষের মস্তিষ্কে স্বাতন্ত্র্যের লক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট । কোনো দুজন মানুষ একরকম হতে পারেন না । কোনো দুজন মানুষের বুদ্ধি, মেধা, কর্মক্ষমতাও একরকম নয় । কাজেই একজন মহৎ মানুষকেও যখন তাঁর অনুরাগী ব্যাক্তিও আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন, তখনও সেই আদর্শের সবটাই গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয় । সেই অ-গ্রহণ খানিকটা ক্ষমতার অভাবে; খানিকটা আদর্শ এবং ভাবনার পার্থক্যের কারণেও । এটা কোনো নতুন কথা নয়, চিরকালের কথা । রামকৃষ্ণের আচরণের আদর্শ গ্রহণ করেননি বিবেকানন্দ । আবার বিবেকানন্দের অভিমত সর্বাংশে গ্রহণ করেননি নিবেদিতা । গান্ধীজির কোন দিকটা জওহরলাল নেহরু গ্রহণ করেছিলেন, তা আমার কাছে কোনো সময়েই বোধ্য হয় না । এই সব বিখ্যাত মানুষের উদাহরণ দেওয়া কেবল এই জন্যই যে, সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে বিষয়টি । খুব সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য ।'
    অতএব বলাই যায় এই অংশের মধ্যেই এ গ্রন্থের গ্রহণ ও বর্জনের বিষয়টি ধরা আছে ।

    কিন্তু কীভাবে তাঁকে গ্রহণ বা বর্জন ! বা তিনি তাঁকে কোথায় কোথায় কিংবা কতটুকুই বা গ্রহণ করতে চাইছেন ! বা বর্জনের অংশই বা কতটা ? এ প্রসঙ্গে তিনিই আবার লিখছেন, 'আমার আজকের কথা প্রধানতই আমার ব্যক্তিগত অনুভব । কোথায় রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে পারি, আর কোথায় পারি না - তারই স্বীকারোক্তি । এ-বিষয়ে কারো সঙ্গে কোনো বিতর্কেই যাব না । বহুজনের সঙ্গেই মিলবে না অনুভব । সেক্ষেত্রে পৃথক থাকার ব্যাপারে সহমত হব ।'

    প্রাবন্ধিকের কথায়, তিনি যে অঞ্চলে বেড়ে উঠেছেন পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে বরাকর নদী পেরিয়ে ছোটো আধা শহর সেই কুমারডুবিতে সেসময়ে বই প্রায় পাওয়াই যেত না । ফলে পারিবারিক সূত্রে যেটুকু যা সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন তা রবীন্দ্রনাথের বই । কাজেই বছর পনেরো বয়স থেকেই রবীন্দ্র কবিতাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান । ইতিমধ্যে কলেজে গিয়ে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব গীতিকবিতা, শাক্ত পদাবলি থেকে মাইকেল, বিহারীলাল, মোহিতলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ-এর কবিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছে । কিন্তু তবুও কবিতায় রবীন্দ্রনাথই তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান । রবীন্দ্র কাব্যভাষার শরীরের সঙ্গে তিনি আদ্যন্ত জড়িয়ে গেছেন । কিন্তু প্রথম চমকে উঠলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতা পড়ে । তাও কী, গোটা কবিতা নয়, একটি কবিতার মাঝখানের একটি অংশ । হঠাৎই কার আলোচনার মধ্যে পেয়ে গিয়েছিলেন । এবং পেয়েই খুঁজতে শুরু করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথের কবিতার বই । কেননা এমন আধুনিক, এমন নতুন কথা আর ব্যঞ্জনা বুঝি রবীন্দ্রনাথেও পাননি তখনও তিনি । এমন নৈরাশ্য ও আত্মধ্বংসের ভয়ংকর অনুভূতি যে কোনো-কবিতায় থাকতে পারে তা সুধীন দত্ত-র ওই কবিতা না পড়লে বুঝি বুঝতেও পারতেন না ।

    'ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে ?
    মনস্তাপেও লাগবে না ওতে জোড়া,
    অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে-
    কেবল শূন্যে চলবে না আগাগোড়া'

    ফলে সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল । পরিচিত হলেন বিষ্ণু দে ও আরও কিছু সামান্য পরে জীবনানন্দের সঙ্গে । টের পেলেন কবিতার আধুনিকতা । বিষ্ণু দে-র কবিতার বৈদগ্ধ্য ও সুন্দরের বিচিত্র বর্ণনায় এবং জীবনানন্দের কবিতায় সময় ও কালচেতনার ভাষা তাঁকে অন্য এক পৃথিবীর খবর জানাল । ফলে রবীন্দ্রনাথ আর তখন তাঁর কাছে একমাত্র হয়ে রইলেন না । 'আমার রবীন্দ্রকাব্যরস নিষিক্ত কল্প-পৃথিবী একেবারে ঘুরে গেল ।' কেবল তাইই নয়, খুঁজতে গিয়ে দেখলেন আধুনিক সময়ের কবিতা রবীন্দ্রনাথ খুব একটা পছন্দ করছেন না । এমনকি আধুনিক কবিতার অনেক শব্দও । রবীন্দ্রনাথকে খানিকটা প্রত্যাখ্যানের শুরু এখানে । আরও খানিকটা প্রত্যাখ্যান করলেন যখন রবীন্দ্রনাথ বললেন : 'জড়িয়ে গেছে সরু মোটা দুটো তারে / জীবন-বীণা ঠিক সুরে আর বাজে নারে' । কিন্তু তাঁর ধারণায়, সরু ও মোটা তারের বাজনা মিলেই তো জীবন-বীণার ঠিক সুরটা ঠিকঠাক বেজে ওঠে । রবীন্দ্রভাবনার এ দর্শনটি তাঁর পছন্দ হল না । এছাড়া 'রবীন্দ্রনাথের নিবিড় ও নির্দ্বিধ' অধ্যাত্মভাবনা, তাঁর গভীর ঈশ্বরবিশ্বাসও তাঁকে টানল না । ফলে '.... রবীন্দ্রনাথের ভক্তিগীতি বা পূজার গান আমি গ্রহণ করতে পারি না । তার ভাববস্তু আমি বর্জন করি ।' তবে উপলব্ধির প্রকাশশৈলী অবশ্যই তাঁকে মুগ্ধ করে । সেকথা তিনি নানান ভাবে প্রমাণও করেছেন ।

    আরও একটি বর্জনের প্রধান জায়গা রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনা । রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনার দিকটি খুবই জটিল ছিল । সেসময়ে নারী সম্পর্কে পুরুষ-প্রধান সমাজের ধারণাটাই ছিল অন্যরকম । তবে তারই মধ্যে ঠাকুরবাড়ি ব্যতিক্রম । যেভাবে ঠাকুরবাড়ির কন্যা ও পুত্রবধূদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এগিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা সেসময়ে দাঁড়িয়ে অন্য কেউ করতেই পারেনি । তবে এ ব্যাপারে সিংহভাগ কৃতিত্বটাই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের । কিন্তু 'রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনায় অনেক স্তর ছিল, অনেক বাঁক ও ঘূর্ণি । তাঁর কোনো কোনো দিকের প্রগতিশীলতা আজও আমাদের স্তম্ভিত করে রাখে, আবার কোথাও কোথাও মনের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠে আপত্তি ।' আপত্তির আরও একটি জায়গা বিভিন্ন সময়ে নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নানান উক্তি । নারী সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ভাবনাস্রোত রবীন্দ্রমানসে সবসময়ে যে ঠিকঠাক সমন্বিত হয়ে উঠতে পেরেছিল তা নয় ।

    রবীন্দ্রভুবনে নারী নামে এই গ্রন্থের ভিন্ন একটি প্রবন্ধে এ জায়গাটি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন অধ্যাপিকা চক্রবর্তী । ১৮৯৩ সালে সাধনা পত্রিকায় (চৈত্র, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত 'নরনারী' প্রবন্ধে সদ্য তিরিশ পেরোন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, 'স্ত্রীলোকের প্রধান কার্য আনন্দ দান করা । তাহার সমস্ত অস্তিত্বকে সঙ্গীত ও কবিতার ন্যায় সম্পূর্ণ সৌন্দর্যময় করিয়া তুলিলে তবে তাহার জীবনের উদ্দেশ্য সাধিত হয় ।' কিছুকাল পরে ১৩১০ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে রবীন্দ্রনাথ 'সাহিত্য' নামক একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, '.....মেয়েদের কাজ হৃদয়ের কাজ । তাহাদিগকে হৃদয় দিতে হয় ও হৃদয় আকর্ষণ করিতে হয় । এইজন্য তাহাদিগকে নিতান্ত সোজাসুজি, সাধাসিধা, ছাঁটা-ছোঁটা হইলে চলে না । পুরুষদের যথাযথ হওয়া আবশ্যক । কিন্তু মেয়েদের সুন্দর হওয়া চাই ।' বা যখন তিনি বলেন, 'পূর্বকালে মেয়েরা পুরুষের অধীনতা গ্রহণকে একটা ধর্ম মনে করত; তাতে এই হত যে চরিত্রের ওপর অধীনতার কুফল ফলতে পারত না, অর্থাৎ হীনতা জন্মাত না, এমন কি অধীনতাতেই চরিত্রের মহত্ব সম্পাদন করত । প্রভুভক্তিকে যদি ধর্ম মনে করে তাহলে ভৃত্যের মনে মনুষ্যত্বের হানি হয় না ।' কিংবা এ কথাও শোনা যায় যখন তিনি এই অভিমত প্রকাশ করেন,'সাধ্বী স্ত্রীর প্রতি যদি কোনো স্বামী পাশব ব্যবহার করে, তবে সে ব্যবহারের দ্বারা স্ত্রীর অধোগতি হয় না, বরং মহত্বই বাড়ে ।' 'গুপ্ত প্রেম' কবিতায় তিনি লিখেছেন :

    'তবে পরাণে ভালোবাসা             কেন গো দিলে
                  রূপ না দিলে যদি, বিধি হে
    পূজার তরে হিয়া                  ওঠে যে ব্যাকুলিয়া
                 পূজিব তারে গিয়া কি দিয়ে ।'

    তাহলে রূপ না থাকলে কি নারীর ভালোবাসার কোনো অধিকার নেই ! পুরুষ কি কেবল শরীরী রূপকেই ভালোবাসে ? বা ভালোবাসবে ? কিংবা 'মেয়েদের সুন্দর হওয়া চাই' কিন্তু কোথায় নারী সুন্দর হবে, দেহে না মনে ? দেহে হলে তো সমাজে নারীর ভোগ্যপণ্য অবস্থানই আরও জোরালো হয় । আবার যখন তাঁরই কণ্ঠে শুনছি, 'স্ত্রীলোকের প্রধান কার্য আনন্দ দান করা' তখন কি এ কথাও সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়না কাকে আনন্দ দান করবে স্ত্রীলোক ! পুরুষকে ? তাহলে নারীর জন্মই কি পুরুষের আনন্দ দানে ? আসলে নারীর প্রকৃত অবস্থান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও সংশয়ে ছিলেন । নাহলে আবার এই রবীন্দ্রনাথই তাঁর কোনো কোনো কবিতায় নারী জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহণ করবেন কেন ? 'মুক্তি' কবিতায়ই তো পড়ি : 'রাঁধার পরে খাওয়া আর খাওয়ার পরে রাঁধা / বাইশ বছর এক চাকাতেই বাঁধা' বা আমরা মনে করতে পারি 'স্ত্রীর পত্র' গল্পের মৃণাল-এর কথা । যে নারী প্রায় বিদ্রোহ করে বসেছে পুরুষশাসিত সমাজের বিরুদ্ধে । কিংবা 'অপরিচিতা' গল্পের কল্যাণী-র কথাও এখানে মনে করতে পারি আমরা । কিংবা মনে করতে পারি 'মানভঞ্জন' গল্পের গিরিবালা অথবা 'শাস্তি' গল্পের চন্দরা । এগুলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন প্রাবন্ধিক । আবার ওদিকে 'চতুরঙ্গ' ও 'যোগাযোগ' উপন্যাসদুটির কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে । যেখানে রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনার দিকটি সুমিতা চক্রবর্তী সমর্থন করতে পারেননি । অধ্যাপিকা চক্রবর্তী লিখছেন, 'নারীর হৃদয়ে পুরুষের স্থান অবিচলিত ও একান্ত কিনা - তা নিয়ে পুরুষের মনে একটা আশঙ্কা ও আর্তি আছে । তারই প্রকাশ সমগ্র বৈষ্ণব কবিতায় । রাধা সর্ব অবস্থায় কৃষ্ণের জন্য ব্যাকুল । কৃষ্ণের জন্য বিবাহ-সংস্কার, পারিবারিক প্রতিকূলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে সর্বদাই তিনি ছুটে আসবেন । যদিও কৃষ্ণের আছে বহুসঙ্গিনী এবং বহু কর্তব্যের অগ্রাধিকারও তাঁর কাছে বিবেচ্য । কিন্তু রাধা হবেন কৃষ্ণপ্রেমে সমর্পিত । এভাবেই নারীকে পেতে চান পুরুষ । এই চাওয়াটাকেই রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেছেন চতুরঙ্গ উপন্যাসের দামিনী চরিত্রে । দামিনীর ভালোবাসা সত্য । কিন্তু সেই ভালোবাসায় আত্মমর্যাদাকে সে নষ্ট করেছে বলে দামিনীকে কোনোদিনই তেমন পছন্দ করতে পারিনি ।' কিংবা 'বিশেষভাবে মনে পড়ে যোগাযোগ-এর কুমুকে । সন্তান ধারণের শরীরী বাধ্যতার শেকল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেনি বলে তার নিজের পৃথিবী পাওয়া হল না । তাকে পেতে দিল না পুরুষশাসিত সমাজ ।' সুমিতা চক্রবর্তী উল্লেখ করেছেন, 'কুমুর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না, উপায় ছিল না স্বাধীনভাবে থাকার - এই সত্যটি রবীন্দ্রনাথ কিন্তু আমাদের বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন । এখানে বিপ্রদাসের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের স্বর শোনা যায় বলে মনে হয় না । রবীন্দ্রনাথের অকথিত বাণীটি কুমুকে ঘিরেই আবর্তিত হয় - কুমু তোমার কোনো ঘর নেই । তোমার স্বামীর আছে, দাদার আছে, তোমার যে সন্তান এখনও ভূমিষ্ঠ হয়নি - তারও আছে । কিন্তু তোমার নেই ।' এভাবে নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা বারেবারেই বিভিন্নভাবে আন্দোলিত হয়েছে । কিন্তু কেন ? কেনই বা রবীন্দ্র নারী ভাবনায় এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব । যার অনেকটাই মেনে নেওয়া যায়না । আসলে 'রবীন্দ্র-ভুবনে নারীর অবস্থান, রবীন্দ্র-মানসে নারীভাবনা এক দ্রুত পরিবর্তনশীল কালপর্বের মধ্যে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে । সেই গতিমুখ পিছনের দিকে নয়, সামনের দিকেই । রবীন্দ্র-মানসের প্রগতিমুখীন চলিষ্ণুতা এর মধ্য দিয়েই অনুভব করা যায় ।'

    কেবল এখানেই নয়, রবীন্দ্রনাথের আনুগত্যের প্রতি ভালোবাসাও প্রাবন্ধিকের চোখে ভালো লাগেনি তা তিনি স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন । রবীন্দ্র জীবনকথায় এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায় যাতে দেখা যায়, স্তাবকদের কথায় একটু যেন বেশিই কান দিতেন তিনি । এ প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথকে উপহার দেওয়া ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সেই চেয়ার ও জাহাজের কেবিনের দরজা কাটার গল্পটিও শোনান । রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ওখানে গিয়ে যে চেয়ারে বসতেন ফিরে আসার সময় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো তাঁকে সেটি তাঁর সঙ্গে দিতে চাইলেন । রবীন্দ্রনাথ আপত্তি করলেন না । কিন্তু সমস্যাটা হল জাহাজের কেবিনের দরজা ছোটো হওয়ায় চেয়ারটি সে দরজা দিয়ে ঢুকছে না । অগত্যা কেবিনের দরজা কেটে তা ঢোকানো হল । ব্যাপারটায় রবীন্দ্রনাথের আপত্তি তো ছিলই না বরং তিনি উপভোগই করেছেন ।

    কিন্তু সে যাই হোক, বর্জনের তুলনায় গ্রহণের তালিকাও যে আবার বেশি তাও অবশ্য স্বীকার করেছেন সুমিতা চক্রবর্তী তাঁর এই গ্রন্থে । বর্জনের পালা সামান্যই । সমগ্র রবীন্দ্রজীবনে শতাংশের হিসেবে হয়তো তা দশভাগ কিন্তু বাকি নব্বইভাগই গ্রহণের পালা । তা সাহিত্য থেকে রবীন্দ্র জীবনাদর্শের নানান জায়গায় । সাহিত্যে কবিতা ছাড়াও ছোটো গল্প, উপন্যাস, নাটক ও গানে রবীন্দ্রনাথ আজও স্মরণীয় । ভাবায় তাঁর প্রবন্ধের জায়গাটি । ভাবায় তাঁর বিজ্ঞানচেতনার দিকটি । প্রকৃতি পরিবেশ ও লোকসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান ভোলার নয় । পরিবেশ সচেতনায় রবীন্দ্রনাথ যেমন অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তেমনি লোকায়ত জীবন থেকে তার নিজস্ব অনুভূতিকে তুলে এনে লোকায়তসাহিত্য চর্চাকে তিনি মানুষেরই মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ।

    রবীন্দ্রনাথ যখন সাহিত্য রচনায় এসেছেন তখনও বাংলাভাষা তার নিজস্ব ভাব ও আকার নিয়ে নিজস্ব ছন্দ খুঁজে পায়নি । একদিকে তখন সংস্কৃত ঘেঁষা, তৎসম শব্দবহুল ভাষায় বাংলা ভাষা ছিল ভারাক্রান্ত । রবীন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে পড়লেন । ভাষায় ছাঁটলেন সংস্কৃত ঘেঁষা শব্দ । তৎসম শব্দের বাহুল্যকে পরিত্যাগ করলেন । করে ভাষায় আনলেন বিপ্লব । বাংলাভাষা হয়ে উঠল বাঙালির মনের ভাষা । প্রাণের ভাষা । সে ভাষায় অতঃপর তিনি লিখলেন অনবদ্য সব ছোটোগল্প । বলাবাহুল্য রবীন্দ্রনাথের হাতেই বাংলা ছোটো গল্পের জন্ম হল । জন্ম নিল আবহমানকাল বাঙালির জীবনের গান । বাঙালির প্রাণের সংগীত । রচিত হল আধুনিক উপন্যাসের ধারা । লিখিত হল নতুন এক নাটক, যে নাটকের ভাষা হয়ে উঠল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী । ফলে রবীন্দ্রনাথে আমাদের যত না বর্জন, গ্রহণের পাল্লা ততই ভারী । কী করে ভুলব আমরা তাঁর স্বদেশী ভাবনা, তাঁর সমবায়নীতি, বাংলার কৃষককুলের প্রতি তাঁর ভাবনা, তাঁর দেশ গঠনের চিন্তা ও সভ্যতার সংকটে তাঁর এগিয়ে আসার কথা । ফলে রবীন্দ্রনাথের কাছে আজও আমাদের আশ্রয় । জানিয়েছেন প্রাবন্ধিক তাঁর এই গ্রন্থে ।

    আর একটা কথা । অধ্যাপিকা চক্রবর্তী বলেছেন, 'রবীন্দ্রনাথের নিবিড় ও নির্দ্বিধ' অধ্যাত্মভাবনা, তাঁর গভীর ঈশ্বরবিশ্বাসও তাঁকে টানেনি । কিন্তু প্রশ্ন হল, রবীন্দ্রনাথের এই ঈশ্বর কে ? তিনি কি সত্যিই তেত্রিশ কোটি দেবতার কোনও প্রতিনিধি? না বোধহয় । রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর তাঁরই প্রাণের এক সর্বশক্তিমান প্রতিনিধি । অবশ্য সেকথা সুমিতা চক্রবর্তীও মেনে নিয়েছেন । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এতটা আত্মসমর্পণ বোধহয় তিনি মেনে নিতে পারছেন না । যাই হোক, এ গ্রন্থে বর্জনের কথা যা তুলেছেন সুমিতা চক্রবর্তী তা রবীন্দ্র ভাবনাকেই বুঝতে আরও সাহায্য করে আমাদের । ফলে সামান্য এ পরিসরের আলোচনায় নয়, সুমিতা চক্রবর্তীর রবীন্দ্র গ্রহণ-বর্জনের পালা বুঝতে গেলে তাঁর আমার রবীন্দ্রনাথ : গ্রহণে বর্জনে বইটি পড়ে ফেলা দরকার ।


  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)