• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১ | জুন ১৯৯৭ | গল্প
    Share
  • অ্যাামিবার কাণ্ড : চন্দ্রিল ভট্টাচার্য



    একটা অ্যাামিবা ছিল। ঈশ্বরের পৃথিবীতে অনেকরকম প্রাণী আছে, তারা প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পারে। যেমন মানুষ পারে সভ্যতা গড়তে, বাঁদর পারে সারাজন্ম না কথা বলে কাটিয়ে দিতে। আর সজারু পারে সমগ্র জীবন অনুরক্ত থাকতে একটি-মাত্র মেয়ে-সজারুর প্রতি। তা অ্যামিবারা হচ্ছে এমন এক প্রাণী, যারা যখন যে-রকম খুশি আকার ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ ইচ্ছে করলেই তারা হয়ে যেতে পারে একটা গোল বল, কিংবা ফ্যাকাশে আয়তক্ষেত্র, কিংবা একঠেঙে লম্বা রোগা জিনিশ, যেন বড় ল্যাম্পপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছানা ল্যাম্পপোস্ট। কিন্তু আমাদের অ্যামিবা এসব পারত না। তার মানে এ নয় যে তার এই ক্ষমতা ছিল না; সে নিজেই জানত না, যে সে এগুলো পারে। কী করা যাবে, মূর্খ ছিল। প্রত্যেক অ্যামিবা তো আর অ্যামিবা বিষয়ে পড়াশুনো করে বড় হয় না। তখনকার দিনে সম্ভ্রান্তবংশীয় অ্যামিবাদের মধ্যে, তা সে মূর্খই হোক আর সিড়িঙ্গেই হোক, এই চল ছিল যে একটু বয়েস হলেই তারা বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়বে। তো সেইমতো আমাদের এই অ্যামিবাও, ধরা যাক তার নাম রামু, এক সুন্দর সকালে সোজা বাবা-মা’র কাছে গিয়ে ঢিপ্‌ করে পেন্নাম ঠুকে বলল, সেলাম জাঁহাপনা, অনুমতি করেন তো দেশ দেখতে বেরোই। কেন জাঁহাপনা বলল সেটা বোঝাতে না পারলেও, বাকিটুকু বাবা-মা ঠিকই বুঝলেন। তখন মা- অ্যামিবা শুরু করলেন ক্রন্দন, বাবা-অ্যামিবার মনে লাগলো দ্বন্দ্ব, আর বোন-অ্যামিবা দাদা চলে গেলে কার সঙ্গে খুনসুটি করবে তাই ভেবে ধন্দে পড়ে গেল। যাক গে, বিধিমত কান্নাকাটি সাঙ্গ হবার পর, আত্মীয় পরিজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, রামু সটান নাক বরাবর হাঁটা দিল। কিন্তু হাঁটবে আর কতটা? অ্যামিবারা হল এককোষী প্রাণী, অর্থাৎ এক ক্রোশ যেতে না যেতে হাঁপিয়ে পড়ে। বহুদিন হেঁটে বহু ক্রোশ ঘুরে রামু শেষে এসে পড়ল একটা বাড়ির সামনে। বাড়ি না বলে তাকে অট্টালিকা বলা ভালো। একদম পুরনো আমলের, বড় বড় দরজা জানলা, আর রাশি রাশি ধুলো। আসলে সেটা ছিল কলকাতা শহরের ন্যাশনাল লাইব্রে্রি। রামু সে সব জানে না, বাড়িটা পছন্দ হওয়ায় সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঢুকে তো চক্ষু চড়কগাছ। চেয়ার, টেবিল, মানুষজন, লক্ষ লক্ষ বই, দেরাজ, পাখা—এসব তো জন্মে কোনোদিন দেখে নি। হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকিয়ে এই মহাযজ্ঞ দেখছে, এমনসময় খান পাঁচেক লোক তাকে মাড়িয়ে চলে গেল। রামুর ভারি বিরক্ত লাগল। নাহয় এককোষী প্রাণী, নাহয় মাইক্রোস্কোপ ছাড়া দেখা যায় না, তা বলে একেবারে চাপা দিয়ে চলে যাবে? তখন সে কোণে একটা আলমারিতে ঢুকে, একটা বইএর তাকে বসে, উঁকি মেরে দেখতে লাগল। দেখছে, ওমা কোত্থেকে একটা ফুলঝাড়ু হাতে মুশকো মতো লোক এসে, বইটই একটুখানি ঝেড়ে, আলমারি তালাবন্ধ করে চলে গেল। প্রথমটা রামুর ভীষণ রাগ হল। তার মনে হল এই মানুষ জাতটা শিক্ষা সহবৎ কিছুই জানে না। একে তো তার নাকে ফুলঝাড়ু বুলিয়ে দিয়েছে, তার ওপর দরজা বন্ধ করে চলে গেল। তারপর একটু ভয় হল। আলমারি থেকে বেরোবে কি করে?

    তার দরজা ধাক্কাধাক্কি আর ছটফটানিতে বিভিন্ন বই থেকে বইপোকারা বেরিয়ে এসে বলল ‘কী হয়েছে ভাই? আপনি কে?’ আলমারি থেকে বেরোবার কথা শুনে তারা হেসেই খুন। ‘এ আলমারি খোলা হয় তিনবছরে একবার। এ হল বিশ্বকোষের আলমারি। কেউ পড়ে না। সাফসুফ করে রাখা হয় আমাদের জন্য। একবার যখন ঢুকে পড়েছেন বেরোনোর কোনো প্রশ্ন নেই। আরে কাঁদছেন কেন? খাবার আছে অঢেল, বহাল তবিয়তে থাকবেন।’ কিন্তু সান্ত্বনায় কি আর কান্না কমে? সবে দেশ দেখা শুরু হয়েছিল, এর মধ্যে তিনবছরের জন্যে কালকুঠুরিতে বন্দী? তার চোখের জলে একের পর এক তাক ভেসে যেতে লাগল। সমস্ত পোকারা বেরিয়ে এসে প্রচণ্ড অভিশাপ দিচ্ছে আর হৈ হট্টগোল করছে, কোনজন্মে এই আলমারির ভেতর বৃষ্টি পড়ে না, আজ এ কী দুর্দৈব! বেগতিক দেখে রামু চটপট একটা বইয়ের পাতার মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। মিনিট যায়, ঘন্টা যায়, এমনকি শেষমেশ দিনও যায় এক-আধটা। রামুর আর সময় কাটে না। এপাতা থেকে ওপাতা। ওপাতা থেকে সেপাতা। শেষটা আর না পেরে, ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে, তিতিবিরক্ত হয়ে, সে পাতাগুলোয় যা লেখা আছে, পড়তে শুরু করে দিল। পড়তে পড়তে তার তো দম আটকে আসার যোগাড়। এত কিছু আছে নাকি এই দুনিয়ায়! এমন আশ্চর্য নকশাদার অবিশ্বাস্য গ্রহটিতে সে বাস করে! আর এই জটিলকুটিল মানুষজাত সেই গ্রন্থের উপর কী কাণ্ডই না বাঁধিয়ে তুলেছে! ওয়াশিংটন থেকে ও্যালকট, বেড়াল থেকে ব্যালেরিনা পর্যন্ত সে রুদ্ধশ্বাসে পড়ে যেতে লাগল। নাওয়া নেই খাওয়া নেই, এ মলাট থেকে ও মলাট ছুটে বেড়াচ্ছে। এই নীৎশে থেকে হড়কে গেল নিউমোনিয়ার নীচে, তো ঐ বুঝে ফেলল N.R.I আর I.N.R.I-এর চুলচেরা ফারাক। এই করতে করতে সে একদিন এসে পড়ল বিশ্বকোষের প্রথম খণ্ডে। সেখানে আছে A. A ফর অ্যামিবা। অ্যামিবার সম্পর্কেও মানুষরা জানে তাই বুঝে সে নিজেই যেমন তাজ্জব বনে গেল, লেখা পড়ে তার তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। এই কথা সে নিজেই এতদিন জানত না! রামু সত্যিই গোঁ গোঁ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল। বইপোকারা মুখে অক্ষরটক্ষর দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনার পর সে প্রথম কথাই বলল, ‘জানিস, আমি ইচ্ছেমতো যা খুশি তাই হয়ে যেতে পারি?’ শুনে তারা তো হাঁ। তার মানে? আর মানে—রামুচন্দ্র ততক্ষণে একটি জলের ফোঁটা হয়ে চাবির ফুটো গলে সুড়ুৎ করে বাইরে। তখন রাত্তির। প্রথমেই ধেই ধেই করে খানিক নেচে আর অফুরন্ত ডিগবাজি খেয়ে স্বাধীনতা উদ্‌যাপন করার পর, সে চটপট ঘুমোতে গেল। কাল সকাল থেকেই সে যা ইচ্ছে তাই হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী অ্যামিবা হবার আত্মবিশ্বাস, নিজের মধ্যে শক্তি অনুভব করার তৃপ্তি, মেহগনির পনেরো হাত চওড়া টেবিলে কোষ ছড়িয়ে ঘুমোনোর মজা, সব মিলিয়ে তার ঘুম যা হল, তাকে একটা গোটা বসন্তকালের আনন্দের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সকালে উঠেই তার চোখে পড়ল স্কাইলাইট দিয়ে সূর্যকিরণ এসে পড়েছে একটা ছবির ওপর, সেই ছবিতে দাড়িগোঁফওলা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক স্নিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। রামুর মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। আলখাল্লাটালখাল্লা সমেত অল্প ঝুঁকে পড়ে হাঁটা প্র্যাকটিস করতে করতে তার হাসি আর ধরে না। সহস্র তামাসার পোকা তার মাথায় কিলবিল করতে লাগল। এমন সাংঘাতিক ক্ষমতা ঈশ্বর দিলেন অ্যামিবাকে, আর পৃথিবী শাসন করছে কিনা মানুষজাত, যারা সারাজীবন একটা বই দুটো চেহারা ধারণ করতে পারে না! দরজা খোলার শব্দ হতেই সে আপনমনে মাথা নাড়তে নাড়তে পায়চারি শুরু করল। পাঁচ-ছটা লোক তাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের চোখ কপাল পেরিয়ে ব্রহ্মতালু ছুঁই ছুঁই। সেদিন সারা কলকাতা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ভেঙ্গে পড়ল। ভিড় সামলাতে মিলিটারি নামাতে হল। কোর্টকাছারি সমস্ত ছুটি, কেউ আবেগে ডুকরে কাঁদছে, কেউ লাইব্রেরি প্রাঙ্গনের মাটি নিয়ে যাচ্ছে ঘড়া ঘড়া, কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে হাওড়া ব্রিজ থেকে জলে ঝাঁপ দিচ্ছে। হাওড়া ব্রিজে বেশি ভিড় দেখলে হুগলি ব্রিজে চলে আসছে। চিড়িয়াখানার জন্তুরা অব্দি মুহুর্মুহু হুংকার ছাড়তে লাগল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে কখনো দেখা যায় ছাদে, কখনো ঈশান কোণের জানলায়, কখনো টেবিলে বসে পড়ায় মগ্ন। প্রায় পঁচিশ লক্ষ লোক দিনে সাতাশবার এই দৃশ্য স্বচক্ষে দেখল। যারা ঠেলাঠেলিতে দেখতে পেল না, তারা সব বুজরুকি বলে উড়িয়ে দিতে চাইল। ফুচকাওলা, ঝালমুড়িওলারা ছুটতে ছুটতে এসে লাইব্রেরি চত্বরে দোকান বসিয়ে একদিনে লক্ষপতি হয়ে গেল। যে ‘চায় গরম’ বিক্রি করতে তিন মাইল হেঁটে কলকাতা এসেছিল, সে মারুতি চড়ে বাড়ি ফিরে গেল। কেউ বলল রবীন্দ্রনাথ কালো জামা পরেছিলেন, কেউ বলল সবুজ-মেরুন। খণ্ডযুদ্ধ লেগে গেল রাস্তায় রাস্তায়। একজন প্রজাপতি ধরার জাল দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে পাকড়াও করার তালে ছিল; তাকে জালিয়াতির মামলায় সোপর্দ করা হল। যাবতীয় লোকের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংক লুঠ হয়ে গেল শহর জুড়ে। যে সাংবাদিকরা কবিগুরুর ছবি তুলতে পারল না তাদের চাকরি গেল। প্রাণান্তকর ঠেলাঠেলিতে বহু মানুষ আহত হলেন। কিন্তু চিকিৎসা করবে কে? হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা তো ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে। তাদের সব্বার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করা হল। কুছ পরোয়া নেই, ছাঁটাই হওয়া এডিটর- ব্যাঙ্কের ম্যানেজার- হার্ট স্পেশালিস্ট মিলে ফুচকার দোকান খুলে বসলেন। প্রাক্তন ফুচকাওলারা (বর্তমানে লক্ষপতি) সেই ফুচকা খেয়ে ও ঘড, ইয়ে ফুঁচু তো হাম ভি গুরুচরণ বলে উল্টে পড়তে লাগল। স্বামী স্ত্রীকে না নিয়ে একা একা রবীন্দ্রনাথ দেখতে গিয়েছিলেন বলে তাঁদের ডিভোর্স হয়ে গেল। সমস্ত চিড়িয়াখানাগামী বাস টিকিটের দাম একশোটাকা করে দিল। এই মূল্যবৃদ্ধি- ঘনঘটা- কেলেঙকারির যাবতীয় দায় কেন্দ্রের উপর চাপিয়ে রাজ্য সরকার ভয়াবহ স্লোগান দিতে লাগল। ‘এত জোরে স্লোগান দিচ্ছিলি কেন?’ বলে শব্দদূষণের জিগির তুলে কেন্দ্র গোটা রাজ্য সরকারকে জেলে পুরে দিল। ইন্টারপোল-এর দুঁদে গোয়েন্দারা চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও লাইব্রে্রিতে কিছু খুঁজে পেলেন না। রামু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অ্যামিবার স্বরূপ ধরে খিলখিলিয়ে হেসে ফেটে যেতে লাগল। ধকল সামলাতে মহানগরীতে কারফিউ জারি করা হল। কারফিউ-এর সময় দু’হাত তুলে যেতে হয় বলে ইস্‌কন দাবি করল, সব্বাই তাদের শিষ্য।

    দিনকতক পর আন্তর্জাতিক স্তরে হুলুস্থুল পড়ে গেল। মানব-ইতিহাসের বিভিন্ন মনীষী তাঁদের তাবৎ অঙ্গভঙ্গিসমেত কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় আবির্ভূত হতে থাকলেন। কখনও হিটলার রক্তচক্ষু নিয়ে প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকেন, কখনও বিসমার্ক পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিয়ে দাঁড়িয়ে ওঠেন, কখনও মার্টিন লুথার কিং বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে চৌরঙ্গী পেরিয়ে যান। আজকালকার ছেলেরা একেবারেই ইতিহাস জানে না, শুধুই কমিক্‌স পড়ে, তার কুফলও পাওয়া গেল হাতেনাতে। গোলপার্কের কাছে তৈমুরলংকে দেখে ‘খোঁড়া ল্যাং ল্যাং ল্যাং’ বলে প্রবল খ্যাপানোয় পরের হপ্তাটা তাদের ইস্কুল বসল নার্সিং হোমে। একটা কবি সম্মেলনে ওমর খৈয়াম উপস্থিত হওয়ায় যাবতীয় কবি এত লজ্জায় পড়ে গেলেন, জিভ কাটতে কাটতে তাঁদের জিভের চিকিৎসা চলতে লাগল। মারকাটারি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাত্র দু’রান করে তেন্ডুলকর খোশমেজাজে প্যাভিলিয়ন ফিরে যাচ্ছেন, হেনকালে পিচটিচ মাড়িয়ে গটগটিয়ে এসে রণজিৎ সিংজী আচ্ছা করে কান মুলে দিলেন। স্টেডিয়াম থেকে লেগ আম্পায়ার সব ফ্রিজ শটের মতো নিথর, অ্যাক্‌শন রি-প্লে, পেপসি-ওয়ার্ল্ড টেল আরও চোদ্দরকমের আন্তর্জাতিক সংস্থা কোটি দুকোটির চুক্তি ফড়ফড় করে ছিঁড়ে ফেলল, শচীন ফ্যান ক্লাব চকিতে নাম পাল্টে নচিকেতা ফ্যান ক্লাব হয়ে গেল, নন-স্ট্রাইকার সৌরভ বারবার কানঢাকা হেলমেট চাইতে লাগলেন। সরকারের খরচে শচীনের কানের চিকিৎসা চলতে লাগল।

    অধিকাংশ মানুষ বলতে লাগলেন, পৃথিবীর অনাচার সহ্য না করতে পেরে মনীষীরা নেমে এসেছেন, কদিন পর স্বয়ং ঈশ্বর আসছেন। বিচার হবে। বিচারসভাটা কোথায় বসবে তাই ভেবে ডেকরেটররা পুলকিত হলেও, বহু মানুষের রাতের ঘুম উবে গেল দুশ্চিন্তায়। দেখা গেল দলে দলে শিল্পী- ব্যবসায়ী- পদস্থ চাকুরে- ইনকাম ট্যাক্স অফিসারদের ডেকে ডেকে লুকোনো টাকা বের করে দিচ্ছেন, চার্চে পার্দ্রীদের কনফেশন শুনতে শুনতে কানের পোকা নড়ে যাবার জোগাড়। স্বীকারোক্তির ধুম পড়ে গেল। গ্র্যান্ড হোটেলে ‘কনফেশন রুম’ খুলে এলাহি পার্টি ও ‘স্বীকার-স্বীকার’ চলতে লাগল। (শ্রেষ্ঠ স্বীকারোক্তির জন্য পাচ্ছেন একটি ----- গাড়ি, ---- কোম্পানীর ------ মূল্যের গিফ্‌ট ভাউচার ও একটি ঝলমলে নতুন ------। নিম্নোক্ত স্লোগানটি পূর্ণ করুন, দশ শব্দের মধ্যে: ‘আমি গ্র্যান্ড কনফেশন করতে ভালোবাসি কারণ …..’) সকলেরই ধারণা, দোষ স্বীকার করে নিলে শাস্তি তো হবেই না, বরং খুব তাড়াতাড়ি তা করতে পারলে অক্ষয় স্বর্গবাসের ব্যবস্থা পাকা। অনেকে ভাবালেন সরাসরি মনীষীদের কাছে সুপারিশ করলে কেমন হয়, কিন্তু একে তো অলৌকিক দর্শনের দিনক্ষণ ঠিক নেই, তায় আবার তাঁরা দেখা দিয়েই মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে মিলিয়ে যান। সার্বজনীন স্বীকারোক্তির কিছু অসুবিধাও দেখা গেল। ছাত্র এসে আজীবন টোকাটুকির ফর্দ দাখিল করে তো শিক্ষক অন্যায় মারধোরের কথা ভেবে কাঁদতে থাকেন। জনগণ পুলিশের কাছে গিয়ে দোষের ফিরিস্তি দাখিল করে, পুলিশ মন্ত্রীদের কাছে নিজেদের অপরাধ কবুল করে, মন্ত্রীরা জনগণের কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে থাকেন। স্বীকারোক্তির ঠেলায় প্রায় সব বিয়ে ভেঙে গেল (বাকিগুলো টিকে রইল আরো রগরগে স্বীকারোক্তির লোভে), কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়ের বাবা নিজের বুকপকেটে সমস্ত টাকা রাখতে শুরু করলেন।

    আর রামু? সে কী ভাবছে? সে খায়দায়, সুখে থাকে, তিলতিল করে গড়ে তোলা রাজনীতি- সমাজনীতি-অর্থনীতিকে ইচ্ছেমতো নাড়াঘাঁটা নয়ছয় করে, মাঝে মাঝে এক-আধটা সিনেমা সার্কাস দেখে আসে, আর ভাবে নিঃসন্দেহে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রাণী, কিন্তু সেটা তো সে নিজে ছাড়া আর কেউ জানে না। কেউ তো বলে না ঐ যে রামুসাহেব যাচ্ছেন, উনি ইচ্ছে করলেই মানবসভ্যতাকে ঘোল খাওয়াতে পারেন। খুব ভালো হত, যদি লুকিয়ে-চুরিয়ে নয়, সবার সামনে বুক ঠুকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যেত। মজা দ্বিগুণ হত তাহলে। সবাই বলত আই বাপ, রামুবাবুর কথা বলছ? লাগতে যাও না, বেন্দাবন দেখিয়ে দেবেন। বিশ্বকোষে লেখা থাকত, এক ও অদ্বিতীয় মিস্টার রামু ত্রিভুবনকে চরকিনাচন নাচাইয়াছিলেন। একদিন রামু অবসর সময়ে ম্যাজিক দেখতে গেল। দেখতে দেখতে তার মগজে যেন বিদ্যুৎ চমকাল। তাই তো, ম্যাজিক। তার চেয়ে বড় যাদুকর কে আছে? ঐন্দ্রজালিক হিসেবেই সে বিশ্বখ্যাত হবে। বিরাট বিজ্ঞাপন দিয়ে সে শহরের বুকে মঞ্চে খাটালো। থৈ থৈ জনসমুদ্রের মাঝখানে ম্যাজিক দেখাতে উঠল সন্ধেবেলা। মুহূর্তে সকলের চোখ গোলগোল হয়ে গেল, চুল এমন খাড়া হয়ে উঠল যে পেছনের লোক কিছু দেখতে পেল না। স্পষ্ট চোখের সামনে এই মানুষ, এই হয়ে গেল টাট্টু ঘোড়া, এই পুজোর প্যান্ডেল তো এই হেলিকপ্টার। ট্রেন ভ্যানিশ করে তালি কুড়োবে কী, সে নিজেই হল একটা লম্বা ট্রেন, মায় পতাকা-সিগ্‌ন্যাল-ফাসক্লাস-ভেন্ডর শুদ্ধু নিজেই আবার তার ড্রাইভারটি হয়ে পরিপাটি টেরি বাগাতে লাগল। কেউ বলল সে-ই ভগবান, কেউ বলল সে আসলে ছোট্ট সাবান, কেউ ভাবলে সে লকলকে অজগর। পাগলের মতো হাততালি আর নিঃশর্ত কুর্নিশের মধ্যে রামু তার শেষ খেলা শুরু করল। অদৃশ্য হবার খেলা। লক্ষ লক্ষ হ্যাজাক আর মানুষের জ্বলন্ত চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। দু’হাত সামনে ছড়িয়ে সে চেঁচিয়ে বল ‘ভ্যানিশ!’ যেই না বলা, অমনি দড়াম করে অদৃশ্য হয়ে গেল। ব্যাস, সেই থেকে রামু আর রামুকে খুঁজে পায় না। খুঁজে পেলেই, সতর্ক থাকুন, সে তার পরবর্তী রসিকতা শুরু করবে।



    অলংকরণ (Artwork) : ভাস্কর সরকার
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)