• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৯০ | এপ্রিল ২০২৩ | গল্প
    Share
  • সকালের ফোন : পরন্তপ বসু



    সুকল্যাণ বসে থাকেন মোবাইলের দিকে চেয়ে প্রতিদিন। কখন মোবাইলের উপর নীল আলোয় জ্বলে উঠবে প্রতীকের নাম। তারপর সেই পরিচিত গলা,
    —বাবা ভালো আছো তো?
    —হ্যাঁ রে ভালো। তুই কেমন আছিস? কাজকর্ম কেমন চলছে?
    —ভালো, তবে জানোই তো এখানে কাজকর্মের ভীষণ চাপ। কোম্পানিতে অনেক লোক ছাঁটাই করছে।

    আজ দু' বছর প্রতীক অ্যাডোবির একটি মোটা মাইনের চাকরি নিয়ে আমেরিকায় গেছে। একমাত্র ছেলে। সুকল্যাণের স্ত্রী চার বছর গত হয়েছেন দুরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগে। প্রতীক চাকরির অফার পেয়েও যেতে চায়নি। বলেছিল, তুমি তো একলা হয়ে যাবে বাবা! কে দেখবে তোমাকে! একরকম জোর করেই প্রতীককে মার্কিন মুলুকে পাঠালেন সুকল্যাণ। বললেন, এরকম সুযোগ হাতছাড়া করিস না। আর এই বয়সেই তো ওই পৃথিবীটা দেখবি! বুড়ো হলে তো আমার মতো কুয়োর ব্যাঙ হয়ে যাবি।

    প্রতিদিন শিকাগো থেকে যখন প্রতীকের ফোন আসে তখন কলকাতায় সকাল হচ্ছে। ঠিক সকাল সাড়ে ছটায় সুকল্যাণের মোবাইলে আলো জ্বলে প্রতিদিন। আজও জ্বলল।
    —বাবা, ঠিক আছো?
    —একদম ফাইন! তোর কী খবর?
    —ঠিকই আছি বাবা। কাজের খুব চাপ।
    এরপর খানিকক্ষণ নিস্তব্ধতা।
    —কিরে প্রতীক, আছিস?
    —আছি বাবা! একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
    —কী এত ভদ্রতা করছিস? বল!
    আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর যেন অনেক দূর থেকে প্রতীকের স্বর ভেসে এলো।
    —বাবা, তুমি আমায় ভালোবাসো?
    —কী যা তা বলছিস? কী হয়েছে তোর?
    —না, কিছু না! জাস্ট জিজ্ঞেস করছিলাম। ভালো থেকো। রাখছি।

    ফোন রেখে সুকল্যাণ গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। প্রতীক ঠিকই আছে। ফোন লাইন আজ একটু গড়বড় করছে মনে হয়। চটি গলিয়ে বেরোলেন তাঁর সল্টলেকের ফ্ল্যাট থেকে একটু মর্নিং ওয়াকে। পাশের ফ্ল্যাটের আলোক দত্ত এখানে সুকল্যাণের সঙ্গে প্রতিদিন মর্নিং ওয়াকে যেতেন। সুকল্যাণের ছেলে আমেরিকায় যাওয়ার পর আলোক আর তেমন যোগাযোগ রাখেন না। আলোকের ছেলেটিকে ড্রাগের নেশায় ধরেছে। যেদিন প্রতীক আমেরিকার চাকরির অফার পেল সুকল্যাণ প্রথমেই আলোকের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করে খবরটি জানিয়েছিলেন। আলোক খবরটি শুনে নিষ্প্রভ হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, খুবই ভালো খবর। আপনার আর কী চিন্তা! ছেলে তো দাঁড়িয়ে গেল! আমার ছেলেটার কী যে হবে কে জানে!

    ইদানিং সুকল্যাণের বড় একা লাগে। জনবহুল এই শহরে একটাও মনের মত বন্ধু নেই। সুকল্যাণের স্কুল কলেজের বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই অকালে তারা হয়ে গেছে। বাকিরা অনেকেই দাদু, রোগে ভোগে জর্জরিত। কেউই খুব একটা যোগাযোগ রাখে না। মাঝে মাঝে সহেলী এসে খবর নিয়ে যায়। মিষ্টি মেয়েটি। সহেলী প্রতীকের বান্ধবী। সল্টলেকেরই চার নম্বর ট্যাংকের কাছে থাকে। গতকালও এসেছিল।
    —কেমন আছেন মেসোমশাই?
    —ঠিকই আছি। প্রতীকের সঙ্গে তোমার কথা হয় সহেলী?
    সহেলী একটু নিবে যায়।
    —হয়।
    —প্রতিদিন?
    —না মেসোমশাই! প্রতিদিন নয়। ও খুবই ব্যস্ত। কল করে উঠতে পারে না।
    সুকল্যাণ চুপ করে যান। কোথায় যেন একটা ছন্দপতন হয়েছে! প্রতীকের সঙ্গে যখন এ বাড়িতে আগে আসতো সহেলী, ওর চোখে আলো জ্বলতো। সেই আলোটা আর জ্বলে না আজকাল। তবু মেয়েটি এলে, কথা বললে ভালো লাগে একটু।

    আই বি ব্লক ধরে সল্টলেক বিগ বাজার প্রদক্ষিণ করে, একটু বাজার করে বাড়ির রাস্তা ধরলেন সুকল্যাণ। সকাল সাড়ে নটা বাজে। আজও সেই শীর্ণ ছেলেটি দোতারা নিয়ে ভারতীয়ম কালচারাল মাল্টিপ্লেক্সের মুক্ত মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে গাইছে, আমায় ভাসাইলি রে বন্ধু…অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে। বেশ গায় ছেলেটি। প্রতীকেরই মতো বয়স। মনে হয় ছেলেটি শিক্ষিত। আশপাশেই থাকে। একটু দলছুট। আজকালকার ছেলেরা তো এ ধরনের গান আর গায় না।

    পকেটে ফোন বাজলো। মোবাইল বের করে দেখলেন অনেকগুলি মিসড কল! দেখাচ্ছে আননোন নম্বর। অনেক সময়ই এরকম অনেক বাজে কল আসে টেলি মার্কেটারদের কাছ থেকে। সুকল্যাণ ধরেন না। এবার একটি মেসেজ ভেসে উঠল ফোনে, ইংরেজিতে।
    —মিস্টার মিত্র, দিস ইজ শিকাগো পুলিশ কলিং। উড ইউ প্লিজ পিক আপ দা ফোন।
    তারপর আবার পাঁচ মিনিট বাদে ফোন বাজলো। তড়িঘড়ি সুকল্যাণ ফোনটি তুললেন।
    —হ্যালো! ইজ দিস মিস্টার মিত্র?
    —ইয়েস।
    —আর ইউ দা ফাদার অফ প্রতীক মিত্র?
    —ইয়েস, ইয়েস! এনিথিং রং!
    —মিস্টার মিত্র, আই অ্যাম সরি, আই হ্যাভ টু গিভ ইউ আ ব্যাড নিউজ। ইয়োর সান ইজ নো মোর। উই ফাউন্ড হিম ডেড ইন হিজ অ্যাপার্টমেন্ট টুডে। হি ডায়েড টু ডেজ এগো!
    —হোয়াট আর ইউ সেয়িং! আই জাস্ট টকড টু হিম টুডে!
    সুকল্যাণের গলা ভেঙে গেল।
    —মিস্টার মিত্র, ইউ ডিড নট টক টু প্রতীক। ইউ টকড টু আ চ্যাটবট। হি হ্যাজ কমিটেড সুইসাইড!

    সুকল্যাণ নিথর হয়ে বসে থাকলেন মোবাইল হাতে ধরে। তারপর বসা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, হাউ ডিড ইউ গেট মাই নাম্বার?
    —উই ফাউন্ড ইওর নাম্বার ফ্রম প্রতীক'স ফোন। আই নো ইউ আর আপসেট। উই উইল কন্টাক্ট ইউ এগেন অ্যাবাউট দিস।
    প্রতীকের ফোনে যতবার চেষ্টা করলেন সুকল্যাণ, রেকর্ডেড মেসেজে আনরিচেবল জানালো। বজ্রাহত সুকল্যাণ চুপ করে জানালার বাইরে অপসৃয়মান আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাথা কাজ করছে না। ওইভাবেই, ঠিক কীভাবে নিজেও জানেন না সুকল্যাণ, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতও কেটে গেল। সারারাত দু' চোখ এক মুহূর্ত বন্ধ করতে পারেননি। কড়িকাঠের দিকে চুপ করে তাকিয়ে আকাশ-পাতাল চিন্তা করে গেছেন। আত্মীয় বলতে তো দাদা আর বৌদি! ওঁরা থাকেন মধ্যপ্রদেশে। কারুর সঙ্গে এই বিপর্যয় নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছিল না। কী করবেন সুকল্যাণ? কী করে প্রতীকের বডি এখানে আনবেন? আমেরিকায় কাউকে চেনেনও না উনি।

    দেখতে দেখতে রাত কেটে গেল। ভোর সাড়ে ছটা। আবার ফোন বাজলো। সেই আলো, সেই লেখা! প্রতীক!
    হাঁচোরপাঁচড় করে সুকল্যাণ বোতাম টিপলেন ফোনের।
    —বাবা!
    —কী রে! কী সব শুনছি? আমার সঙ্গে ফাজলামো করছিস নাকি? এক থাপ্পড় খাবি!
    ফোনের ওপারে খানিক স্তব্ধতা।
    —বাবা, মন দিয়ে শোনো! কোন কথা বলো না।
    আবার সেই দুই সেকেন্ডের নীরবতা।
    —বাবা, আমি জানি গতকাল বিকেলে শিকাগো পুলিশ ফোন করেছে তোমায়। আমি সেরকমই ঠিক করে রেখেছিলাম। বাবা, আমি আর এই পৃথিবীতে নেই! আমার কোম্পানিতে বহুদিন ধরে ছাঁটাই চলছিল। দু' মাস আগে আমাকে বস্ ডেকে বললো, আমরা ডাউনসাইজ করছি। আর কাল থেকে আসতে হবে না!
    এই দু' মাস ধরে চাকরির অনেক চেষ্টা করলাম। সব জায়গাতেই একই গল্প! আমি যে কাজ করতাম সেটা এখন থেকে এআই নিজেই করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বাবা! আমাকে আর প্রয়োজন নেই! কী হবে! আমি বেকার হয়ে দেশে ফিরে যাব! কী করব! তাও হয়তো দেশে ফিরে একবার চেষ্টা করে দেখতাম! ইদানিং আমার পেটে একটা অসহ্য যন্ত্রণা হতো। এখানকার ডাক্তার টেস্ট করে বলল, স্টেজ থ্রী ক্যান্সার! এর জন্য চিকিৎসার যা খরচ তা এখানে করার সামর্থ্য আমার নেই। দেশে অসুস্থ হয়ে ফিরতেও ইচ্ছে করে না! সহেলীর সঙ্গেও আজকাল তেমন বনিবনা হচ্ছিল না। তাই ভাবলাম বেঁচে থাকার কোন মানে নেই। আমার যেটুকু সঞ্চয়, সব আমি তোমার ব্যাংকে ওয়্যার ট্রান্সফার করে দিয়েছি। তুমি ভালো থেকো। আমি চ্যাটবটকে প্রোগ্রাম করে রেখেছি। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছটায় তুমি আমার একটি ফোন কল পাবে। আমি তোমার সেই প্রতীকই থাকবো সর্বদাই। বাবা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।

    অবিকল প্রতীকের সেই ধীর স্থির কণ্ঠস্বর! এতক্ষণ বাজ পড়া গাছের মতো প্রতীকের সব কথা শুনছিলেন সুকল্যাণ। না, প্রতীক নয়, প্রতীকের প্রোগ্রাম করা চ্যাটবট! বাবার জন্য এতোই চিন্তা ছিল যখন, এ কী করলি প্রতীক! সুকল্যাণ মোবাইলটি জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

    চৈত্রের সকালেও আকাশে মেঘ জমেছে। সুকল্যাণের বেডরুমের জানলার পাল্লার উপরে পায়রাটা বকবকম থামিয়ে নিথর চোখে সুকল্যাণকে দেখছিল।


    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)